Friday, 15 November 2024

গুরু নানক জন্ম জয়ন্তী --স্মৃতি রোমন্থন

শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী গুরুনানকজীর আজ জন্মদিন। তাঁর  জন্মদিন নিয়ে একটু দ্বিমত রয়েছে । কেউ কেউ  বলেন যে তাঁর জন্ম হয়েছিল  পাকিস্তানের  নানকানা সাহেবের  তালওয়ান্দি  গ্রামে। কিন্তু ভাইবালা জন্মসখী এবং  অন্যান্য বিশিষ্ট শিখ ধর্মগ্রন্থের লেখকদের পরিভাষায় কার্তিকমাসের পূর্ণিমার দিন  নানকজীর জন্ম হয়েছিল  এবং  সেটাই সরকারের মান্যতা পেয়েছে এবং  সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ  মহা সমারোহে এই দিনটি পালন করেন এবং  তাঁর বাণী প্রচার করেন সঙ্গীত ও লঙ্গরখানায় বহু লোককে খাওয়ানোর মাধ্যমে ।
আজ ১৫ইনভেম্বর ২০২৪ শ্রী নানকজীর জন্মদিন । কিন্তু ৫২ বছর আগে ১৯৭২ সালে কার্তিকপূর্ণিমা ছিল ২০ই নভেম্বর, সোমবার সারা ভারতবর্ষে স্বীকৃত ছুটির দিন  এবং   আমার  বন্ধুবান্ধবেরা ঠিক করল যে শনিবার তাড়াতাড়ি কাজ সেরে লালগোলা প্যাসেঞ্জারে  বহরমপুর  যাবে এবং সেখান থেকে মুর্শিদাবাদ বেড়াতে যাবে রবিবার ও ফিরে আসা সোমবার অর্থাৎ গুরু নানকজীর জন্মদিনে । কোথায়  থাকা হবে? ঠিক হলো তারা সবাই উঠবে আমাদের বাড়ি। শ্যামল দা যেতে পারলেন না, অমরনাথ মিত্র মুস্তাফি,  হরিশচন্দ্র, শিবু, সুজিত, জয়ন্ত, চৌধুরি, শিবুর এক বন্ধু দীপু ও মেয়েদের মধ্যে ছায়াদি,  মাধবিকা ও কনিকা। তখন বহরমপুরে বেশ ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করেছে,অন্তত কলকাতার  তুলনায়  তো যথেষ্ট  ঠাণ্ডা । আমার ঘরে দাদুর দুটো জম্পেশ খাটে ছায়াদিদের শোয়ার ব্যবস্থা হলো, মুস্তাফি সাহেবের ব্যবস্থা হল ঐ বাইরের বিশাল ঘরে আর সুজিত, শিবু , জয়ন্ত, চৌধুরী,  হরিশচন্দ্র ও দীপুদের সদ্য কেনা লালুদার বাড়িতে। সবার জন্য  লেপ, তোষক ও মশারির ব্যবস্থা করতে হয়েছে নাহলে যত ই নাক মুখ চাপা দিয়ে  লেপ মুড়ি দিয়ে  শোওয়া যাক না কেন মশা তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। ওরা সবাই এসেছে এসপ্ল্যানেড থেকে বাসে। আমি একদিন আগে ছুটি নিয়ে  এসে গেছি। দাদাও এসে গেছে বিরাট মাছ নিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে থাকা কুতুবপুর  থেকে। হৈ হৈ ব্যাপার আর কি। বাবা ও আমি সাইকেল  নিয়ে  বাস স্ট্যাণ্ডে ওদের  নিয়ে  আসতে গিয়েছি। লালু দা, সেজদি এবং  আজিমগঞ্জ থেকে  বড়পিসিমাও এসে গেছে ওদের  আদর আপ্যায়নে যাতে কোন ত্রুটি  না হয়। রিক্সা সব বলাই ছিল। ওরা  আলো ঝলমলে জজসাহেবের বাড়িতে এসে পৌঁছানো মাত্র ই  গরমজলে হাত পা ধুয়ে বসে পড়ল বাইরের ঘরে। গরম চা ও  হালকা জলখাবার খেয়ে  বেশ খানিকক্ষণ  আলাপ পরিচয়ে কেটে গেল।   আমাদের  বাড়ির ভেতরের বারান্দায় আসন পেতে রাতের খাওয়া দাওয়া  হলো। মুস্তাফি সাহেব জমিদার বাড়ির ছেলে এবং যথেষ্ট  ভোজন রসিক, বড়সড় মাছের মাথাকে কি করে খেতে হয়, তা দেখিয়ে দিলেন । মুস্তাফি সাহেব বললেন উনি একা বাইরের ঘরে থাকবেন না, তিনিও লালুদার বাড়িতেই থাকবেন । ওখানে তিনটে বেশ বড় ঘর ছিল , ভালভাবেই  সেখানে সবাই ঠিকঠাক ভাবেই ম্যানেজ হয়ে গেল। লালুদার  বাড়িটা ছিল  আমাদের  বাড়ির  তিনটে বাড়ি পরে। সকাল বেলায় গরম চা নিয়ে দাদা, আমি ও লালুদা যখন এলাম তখন দেখি অনেকে ফ্রেশ হয়ে গেলেও হরিশচন্দ্র এবং  মুস্তাফি সাহেব  তখনও  বিছানা ছেড়ে ওঠেন নি। শিবু সুজিতের পিছনে লাগছে এবং  হাসি ঠাট্টার মধ্যে দিয়ে  এবাড়ির আনন্দের  রেশ  ও বাড়িতে পৌঁছে যাচ্ছে।  যাই হোক, এক প্রস্থ চায়ের পর  সবাই স্নান সেরে আমাদের  বাড়িতে এসে গেছে এবং  লুচি, তরকারি, বেগুনভাজা এবং  মিষ্টি সহযোগে জলখাবার সেরে চা খেয়ে একটা মিনিবাসে সবাই রওনা দিলাম  লালবাগের  পথে। একটু বেলাই হয়ে গেল হাজারদুয়ারি  দেখে ফিরে আসায় কিন্তু খিদেটা বেশ চাগিয়ে উঠেছে ইতিমধ্যে । জবরদস্ত খাওয়া দাওয়ার পর দরকার  একটু গা গড়িয়ে নেওয়ার তবে কেউ আর লালুদার বাড়িতে  গেলনা, বাইরের  ঘরেই সবাই মিলে গল্পগুজব করে কাটিয়ে দিল। সন্ধের সময়ে মোহন হাউসে সবাই মিলে সিনেমা দেখতে যাওয়া এবং রাতে মাংস ভাত ও বহরমপুরের বিখ্যাত ছানাবড়া।  অনেক রাত অবধি গল্প গুজব করে রাতে গভীর ঘুম। এদিন আর মুস্তাফি সাহেব লালুদার বাড়িতে গেলেননা, বাইরের ঘরেই শুয়ে পড়লেন। সকাল  হতেই সব চা জলখাবারের ব্যাপার  কিন্তু মুস্তাফি সাহেব বললেন বাসি মাংস  দিয়ে মুড়ি খাবেন। তাই হলো, অন্যরা লুচি তরকারি আর মিষ্টি খেল। দুপুর  বেলায় খাওয়া  মাছের ঝোল,  ভাত, চাটনি দই ও মিষ্টিতে সারা হলো তারপর রিক্সায় চড়ে স্টেশনে লালগোলা প্যাসেঞ্জারে শিয়ালদহে ফিরে আসা । দুদিনের ঠাসা প্রোগ্রাম,  এক ঝাঁক পায়রা ঘুটুর ঘুঁ, ঘুটুর ঘুঁ করতে করতে সবাই  ফিরে এল।
ইতিমধ্যে এদের মধ্যে অনেকেই চলে গেছেন না ফেরার দেশে । শ্যামল দা, মুস্তাফি সাহেব,  সুজিত,  চৌধুরী , দীপু আগেই চলে গেছেন । সেই লিস্টে  নবতম সংযোজন ছায়াদি । হরিশচন্দ্র কোথায় আছেন জানিনা। 
আজ এতদিন  বাদে এই লেখার উদ্দেশ্য স্মৃতিটাকে একটু ঝালিয়ে নেওয়া এবং যারা অবশিষ্ট রয়েছে তাদের হৃদয়ে পুরনো দিনের  একটু বিদ্যুতের ঝলক আনা।

No comments:

Post a Comment