Saturday, 1 April 2023

যুগল মালি

স্কুলের  অশিক্ষক কর্মীদের  নাম মনে করতে গেলেই যুগল কাকার কথা মনে পড়ে।মনে পড়ে আরও অনেকের কথা যারা শিক্ষক না হয়েও আমাদের  অনেক শিক্ষা দিয়েছেন তাদের  আচার ব্যবহারের মাধ্যমে। শিক্ষা মানে তো শুধু স্কুলে বা কলেজে গিয়ে কয়েকপাতা মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় নিজের  সাধ্যমত লিখে এসে ক্লাশের গণ্ডি পেরোনো নয়, যা পড়লাম  তা ব্যবহারিক জীবনে কতটা প্রতিফলিত  করতে পারলাম,  সেটাই বড় ব্যাপার। সেইজন্য পুঁথিগত বিদ্যার কচকচানিতে অনেক সময়ই  মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে যায়। ডিগ্রির মোহে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটা তকমা এঁটে নিজেদের  অনেক পণ্ডিত বলে মনে হতে পারে কিন্তু সেই পাণ্ডিত্য যদি ব্যবহারিক জীবনে কোন মানুষের  কাজে না লাগে তাহলে একটা ভাল স্টিলের ছুরি কিনে সাজিয়ে রাখার  মতো হবে ।মানুষের  সেবার  জন্য  ভীষণ  বড় মাপের  পণ্ডিত  হওয়ার চেয়ে তার সেবামূলক মনোবৃত্তি অনেক  বেশি প্রয়োজন। সুতরাং আজকের প্রতিবেদন এই প্রায় অশিক্ষিত ( মানে স্কুল বা কলেজের গণ্ডি না পেরোনো) মানুষদের  নিয়ে।

যুগল কাকা ছিলেন  আমাদের  স্কুলের অশিক্ষক  কর্মী।  মাথায় বেশি লম্বা নন কিন্তু বয়সকালে যে শরীরটা বেশ মজবুত  ছিল তা দেখলেই বোঝা যেত। আর তাঁর মাথাটা ছিল বেশ বড় মাপের। হাঁটুর ওপর ধুতি আর হাফ হাতা প্রায় লাল হয়ে যাওয়া সাদা শার্ট থাকত পরনে আর খালি পা বেশিরভাগ সময়েই। কখনো সখনো বাইরে বেরোতে হলে পায়ে গলাতো টায়ার কেটে তৈরী করা চটি যা অনেকদিন চলত কারণ সেইসময় ছিলনা হাওয়াই  চটি। বেশিরভাগ গরীব মানুষ ই খালি পায়ে হাঁটত আর কোন বিশেষ জায়গায় যেতে হলে সম্বল ছিল তাদের  টায়ার কেটে তৈরি  করা চটি। 
প্রাইমারি স্কুল  হতো সকালবেলায়। সাতসকালে দেখতাম যুগলকাকাকে  স্কুলের  সামনে থাকা বাগানে নানাধরণের ফুলগাছের পরিচর্যা করতে। রাজবাড়ি সদৃশ ছয়টি বিশাল থামওয়ালা স্কুলের বাগানের বাঁদিকে ছিল  একটা বিশাল  ইউক্যালিপটাস গাছ আর ডানদিকে ছিল একটা রাধাচূড়া ও কৃষ্ণচূড়া গাছ যা স্কুলের  সৌন্দর্য্য  আরও অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। বৃত্তাকার বাগানে যুগল কাকার যত্নে লালিত হরেক ফুলের সমাহার। কাঁটাতারের  বেড়ায় ঘেরা সেই বাগানের  কোন ফুল ছেঁড়া প্রায় দুঃসাধ্য ব্যাপার। হেডমাস্টারমশাইএর বাড়ি ছিল  স্কুলের  পরিধির  মধ্যে এবং তাঁর  বাড়ির  পাশেই  ছিল যুগল কাকার চালাবাড়ি। হেড মাস্টার মশাই এর বাড়ির দোকান বাজার ও যুগল কাকাই করে দিতেন কারণ আমরা কোনদিন হেড মাস্টার মশাইকে বা তাঁর  ছেলেকে বাজার  করতে দেখিনি এবং যুগল কাকাকেই দেখতাম  বাজারের থলি হাতে নিয়ে। খুবই  কম কথা উনি বলতেন  মানে স্যারের  কাছাকাছি থেকে উনিও চোখ উঠিয়ে একবার  দেখে নিয়ে সমস্ত ব্যাপারটা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করতেন এবং প্রয়োজন মতো হেডমাস্টার মশাইএর কানে তুলে দিতেন। তখন  কিছুতেই  বুঝে উঠতে পারতাম না আমাদের করা দুষ্টুমি কি করে হেডমাস্টার মশাই এর কানে চলে যায়। হেডমাস্টার মশাইএর ঘরের  সংলগ্ন  ছিল অফিস ঘর এবং দীর্ঘ বারান্দার পরের ঘরটাই  ছিল  স্যারদের  বসার  ঘর। লম্বা টেবিলের  দুই পাশে সারি সারি পাতা চেয়ারে ঘর আলো করা  সমস্ত  দিকপাল মাস্টার মশাইরা বসতেন। দেখে মনে হতো যেন এক ঝাঁক তারা, কেউ  দ্যুতিময় আবার  কেউ বা সামান্য  নিষ্প্রভ।  জেলার  সবচেয়ে নাম করা স্কুল, ছাত্র এবং মাস্টার মশাইরা সবাই  যেন একটা চাপা অহঙ্কারে ভুগতাম।

সকাল সাড়ে দশটায় পিতলের  ঘন্টায় কাঠের  হাতুড়ির ঘা পড়ে শুরু হতো স্কুল আর বন্ধ হয়ে যেত গেট। দেরী করে এলে ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকানো যুগল কাকাকে বোঝানো প্রায় একটা ভয়ানক ব্যাপার ছিল।  শিক্ষা দীক্ষা বিশেষ  না থাকলেও  স্কুলের  ডিসিপ্লিনের প্রথম পাঠ কিন্তু তাঁর ই কাছে। সমস্ত ক্লাশে নোটিশ  নিয়ে যাওয়া ঐ অতবড় স্কুলের  চত্বরে একা যুগল কাকার  পক্ষে আর সামাল দেওয়া সম্ভব হয়ে উঠছিল না। আর তাছাড়া দিন দিন তো বয়স বাড়া বই কম তো হচ্ছিল না। সুতরাং তাঁর  জায়গায় অন্য  লোক  নেওয়ার  প্রয়োজন হয়ে পড়ল। কিন্তু তখন  তো এত শত বুঝতাম না। গরমের ছুটির  পর আর সেই পরিচিত  মুখ যুগল কাকা কে দেখতে পাচ্ছিনা, আমাদের  পাড়ারই বাদাম  বিক্রি করা কাঁদনকে(ভাল  নাম সুষেন) দেখছি নোটিশ  নিয়ে আসতে। প্রথম  প্রথম ভাবলাম  যে ও হয়তো কিছুদিন  সামাল দিতে এসেছে যুগলকাকার জায়গায় কিন্তু তা নয়, যুগল কাকা যে সবার  অলক্ষ্যে আমাদের  কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন সেটা জানতে পারলাম কাঁদনের একদিন  বিনা পয়সায় বাদাম খাওয়ানোর মাধ্যমে।

ব্যালকনিতে বসে আজ হঠাৎই  যুগল কাকা আমার  মনে উদয় হলেন বুঝতে পারছি না কিন্তু একটা জিনিস  ঠিক যে মনের মধ্যে কেউ গভীর  ছাপ না ফেললে ষাট বছর পরেও  সে মনের  দালানে  উঁকিঝুঁকি  মারতে পারেনা।

Wednesday, 8 March 2023

বখাটে ভগবান

ভগবানকে দেখেছ কিনা জিজ্ঞেস করলে সবাই  হাঁ করে এমনভাবে চেয়ে থাকবে যেন একটা পাগল কোথা থেকে এসে জুটেছে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবকেও বহু লোক পাগলের  আখ্যা দিয়েছেন,  আবার  কেউ বা তাঁকে ভণ্ড জাতীয় কিছু বিরূপ মন্তব্য করেছেন আবার  সেইখানেই  তাঁর অনেক অনেক  শিষ্যও  হয়েছেন। আজ সমস্ত পৃথিবীর বুকে রামকৃষ্ণ মঠ ছড়িয়ে আছে, সেটা কি বিনা কারণে হয়েছে?  তাঁর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর শিষ্যদের মাধ্যমে যাঁদের  মধ্যে স্বামী  বিবেকানন্দের নাম কে না জানে? তিনি ছাড়াও  আরও অনেক শিষ্যদেরও  যথেষ্ট  অবদান  রয়েছে। লেখাপড়া না জানা মানুষটা কি রকম প্রাঞ্জলভাবে ভগবান  এবং সমস্ত  জটিল প্রশ্নের  সমাধান  দিয়েছেন  তা বিভিন্ন  গল্পের  মাধ্যমে পরিস্ফূট  হয়েছে।
স্বামী বিবেকানন্দ  তো বলেছেন, " বহুরূপে সম্মুখে তোমার  ছাড়ি কোথা খুঁজিছ  ঈশ্বর, 
জীবে প্রেম  করে যেই জন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর। " সুতরাং যাঁরাই বিভিন্ন  কাজের  মাধ্যমে সেবা করছেন, তাঁরা সবাই  ভগবানের ই দেওয়া কাজ করছেন। তাঁরই  সৃষ্টি ভাল মানুষ  এবং তাঁরই  সৃষ্টি চোর, ডাকাত এবং বদমাস লোকেরাও। চোররাও  চুরি করতে যাবার আগে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে যেন বেশ ভাল  কিছু  দাঁও মারতে পারে এবং অবশ্যই যেন  ধরা না পড়ে। এ তো গেল সেইসব ভগবানের  দাস দাসীদের কথা বা সেবকদের কথা। কিন্তু প্রশ্ন  হচ্ছে ভগবানকে কেউ দেখেছেন  কি না? যদি দেখে থাকেন  তাহলে তিনি দেখতে কেমন? 
আমরা সবাই  তাঁকে দেখেছি কিন্তু ভিন্ন  ভিন্ন  রূপে। আমার দেখা ভগবান  সেই রকে বসে থাকা গুলতানি  করা কিছু চেটো চ্যাংড়া ছেলেদের  মধ্যে। বাপের পয়সায় রাজা উজির মারা ছেলেরা যাদের দৌরাত্ম্যে পাড়ার মেয়েরা এবং তাদের  বাবামায়েরা সদাই  সন্ত্রস্ত, কি হয় কি হয় ভাব সদাই  মনের মধ্যে ঘুরপাক  খায় কিন্তু কারও  বিপদে আপদে বুক চিতিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া  সেই তথাকথিত  বাজে ছেলেরা বা বখাটে ছেলেরা। এদের  সময়ই  সময়। কুছ  পরোয়া  নেই এই মন নিয়ে আপনাকে বিপন্মুক্ত করে তবেই এদের  শান্তি। এরা কিন্তু মাঝপথে আপনাকে বিপদে ফেলে পালাবে না। এদের  নীতি হলো মরদ কি বাত, হাতি কি দাঁত। এরা হয়তো কেউই বেশী পড়াশোনার ধার ধারেনি  কিংবা কেউ কেউ দুয়েকটা  ধাপ এগোলেও প্রতিযোগিতায়  এরা কেউ এঁটেও  উঠতে পারবে না। তবে এরা করবে টা কি? কি করে এদের  সংসার চলবে? আর এদের  বাবামায়েদের পক্ষেও একটা সময়ের পরে এদের  টানা সম্ভব  নয়। তাহলে এরা কি চিরকাল  এইভাবেই থাকবে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই  এদের  শোষণ করে রাজনৈতিক  নেতারা। তাঁরা নিজেদের  স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে এদের ব্যবহার  করে এবং প্রয়োজন  মিটলেই এদের  ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কেউ বা এই দলের  আবার  কেউ বা অন্য দলের।  এদের  ভবিষ্যত  দেখার দায়িত্ব কার? এই বিশাল  যুবসমাজের  সুকুমার বৃত্তিগুলো  এই দাদাদের  কল্যাণে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং এদের  হাতে তুলে দেওয়া হবে ছোরা, বন্দুক এবং বোমা। কিছুদিনের মধ্যেই  যারা দুদিন  আগেই  গলায় গলায় বন্ধু ছিল  তারাই হয়ে উঠবে পরস্পরের  শত্রু। তবে এটাকে সামলানোর  উপায় কি, কোন রাস্তাই কি খোলা নেই? আছে, সমস্যা যখন আছে তখন  তার সমাধান ও আছে। একটু ভেবেই  দেখা যাক না কেন এই সমাধানের রাস্তা খোঁজার। 
আচ্ছা আমাদের  রাজ্যে তো ক্লাবগুলোকে প্রতি বছরই কিছু অনুদান  দেওয়া হয়। এই অনুদানকেই একটু অন্যরকম ভাবে দিলে কিছুটা বেকার সমস্যার সমাধান ও হয় আর সাধারণ জনগণের ও কিছু উপকার হয়। আজকাল  প্রত্যেক সংসার ই খুব ছোট হয়, একটা কি দুটো বাচ্চা। সমস্ত বাবা মায়েরাই আপ্রাণ চেষ্টা করেন তাঁদের  সন্তানদের  নিজেদের  সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও ভালভাবে শিক্ষা দান করার।  যদি তারা খুব ভাল ভাবে সফল হয় তারা জীবিকার সন্ধানে বিদেশে  চলে যায় এবং সেখানেই তারা থিতু হয়ে যায়। মেয়েদের  বিয়ে হওয়ার পর  তারাও অনেক সময়ই বাইরেই থেকে যায় এবং এখানে আমাদের  দেশে বৃদ্ধ  বাবা মায়েরা অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকেন। এঁদের  মধ্যে যাঁদের  অনেক  পয়সা আছে তাঁরা বিলাস বহুল বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে পারেন কিন্তু যাঁদের  পয়সা মোটামুটি আছে কিন্তু সেরকম  আহামরি কিছু নেই তাঁরা এইসব ক্লাবের  ভরসা থাকতে পারেন অবশ্যই  কিছু টাকার বিনিময়ে। এতে বহু কর্মসংস্থান হতে পারে এবং এই ক্লাবগুলোই  সরকারের  পরিপূরক  হিসাবে কাজ করতে পারে। যাঁদের অর্থ সংস্থান সেরকম  নয় তাঁরাও  এই ক্লাবগুলোর সাহায্যে যাতে বঞ্চিত  না হন সেদিকে সরকারের  নজরদারি অবশ্যই  থাকা উচিত।  এই ক্লাবগুলো হবে সম্পূর্ণ  অরাজনৈতিক, ধর্ম নিরপেক্ষ  এবং জাতপাতের  ঊর্ধে  নাহলে সবই পণ্ডশ্রম হবে এবং কিছু ক্ষমতাসম্পন্ন  লোকের কুক্ষিগত  হবে। এই ক্লাবগুলির  সঙ্গে হাসপাতালের  সমন্বয় থাকবে এবং সমস্ত  জনগণ এতে উপকৃত  হবেন। কিন্তু এইসবের  পিছনে যে মূলকারণ  থাকবে তা  হলো  সমবেদনা এবং সংবেদনশীলতা।
কিছুদিন  আগে একজন পরিচিত  ভদ্রলোক  যিনি অত্যন্ত  পরোপকারী তিনি অসুস্থ  হয়ে পড়লেন।  অনেক  বড় বড় ডাক্তার  দেখানোর  পর তাঁরা এই রায় দিলেন  যে একটা বড় ধরণের অপারেশন করা দরকার।  তাঁর পরিবারের লোকজন এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে রক্ত  নেওয়া সত্ত্বেও  তা অপ্রতুল হলো। বিভিন্ন  সংস্থার  সঙ্গে যোগাযোগ  করার  পর  একজন হৃদয়বান ব্যক্তি এগিয়ে এলেন এবং তিনি দুইজনের  খবর দিলেন  যাঁরা রক্ত দান করতে ইচ্ছুক। সম্পূর্ণ  অজানা অচেনা ভদ্রলোক যাঁদের  একজনের  একটি ছোট্ট  দশকর্মা  ভাণ্ডারের দোকান  এবং অন্যজন উবের সংস্থার  মোটরসাইকেল চালক। সেদিন  ছিল  রবিবার।  তিনি দোকান  বন্ধ  করে দূরে থাকা হাসপাতালে যেখানে ভদ্রলোক  ভর্তি আছেন  রক্ত দিতে চলে এলেন  এবং অন্য জন সকাল  থেকে যাত্রী সেবা দিয়ে ব্লাড ব্যাঙ্ক  বন্ধ  হবার আগে পৌঁছে গেলেন রক্ত  দেবার  জন্য।  এটা এমনই  এক জিনিস  যা টাকা দিলেও মেলেনা।  অনেকে এখানে সেখানে রক্ত দান শিবিরে রক্ত দান  করেন এবং বিনিময়ে তাঁরা একটা কার্ড ও পান কিন্তু কিছু হাসপাতাল  আছে তাঁরা এই কার্ড স্বীকার  করেন না এবং তাঁরা তাঁদের  ওখানেই  রক্ত  দেবার জন্য চাপ দেন। তাহলে রক্ত দান শিবিরে প্রাপ্ত রক্তগুলো কি কাজে আসবে যদি ঐ কার্ড গুলো ভবিষ্যতে অন্য  হাসপাতালে না নেওয়া হয়? এই দুজন ভদ্রলোক ই যাঁরা নিজেদের  কথা না ভেবে সম্পূর্ণ  এক অপরিচিত  ব্যক্তিকে সাহায্যের  জন্য  এগিয়ে এসেছেন  এঁরাই  আমার  কাছে ভগবান।  পরিচিত  কেউ বা আত্মীয় কেউ রক্ত দান করতে পারেন  কিন্তু এই সামান্য  ব্যক্তিরাই নিজগুণে তাঁদের  অসাধারণত্ব প্রমাণ  করেছেন  এবং  অন্য লোকে তাঁদের  কি হিসেবে দেখবেন জানিনা ,আমার  কাছে এঁরাই  প্রকৃত ভগবান ।
 

Monday, 6 March 2023

দোলপূর্ণিমা ও হোলি

আজ দোলপূর্ণিমায় সারা শহর মেতে উঠেছে দোলযাত্রা উদযাপনে।  বরাবরের মতো গল্ফগ্রীন  এই ব্যাপারে ভীষণ  অগ্রণী এবং আমাদের কাউন্সিলর শ্রী তপন দাশগুপ্ত  মহাশয়ের উদ্যোগে পুরোপুরি শান্তিনিকেতনের ঢঙে এখানে সেন্ট্রাল পার্কে দোলযাত্রার অনুষ্ঠান  সম্পন্ন হয়। গল্ফগ্রীনে কলকাতার  অন্যান্য জায়গার  তুলনায় গাছপালার আধিক্য একটু বেশী হওয়ায় পরিবেশটাও অনেক  শান্ত এবং লালপলাশের উপস্থিতি এই বসন্তোৎসবকে একটা আলাদা মাত্রা দেয়। বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের যথাযথভাবে প্রশিক্ষণ  দিয়ে অভিজ্ঞ শিল্পীরা এই অনুষ্ঠানের উপযুক্ত  করে তোলেন  এবং নাচ ও গানের মাধ্যমে গল্ফগ্রীনকে উৎসব মুখরিত করে তোলেন।  অনেক বর্ষীয়ান শিল্পীরাও  অংশ গ্রহণ করে অনুষ্ঠানটিকে  মনোজ্ঞ  করে তোলেন। 
নীল দিগন্তে ওই ফুলের আগুন  লাগল গানে মনটাও হিন্দোলিত হয়ে ওঠে কিন্তু এবার  যেন  কোন অজ্ঞাত  কারণে মনটা তেমন ভাবে সাড়া দিলনা।  হয়তো বা বয়সজনিত কারণ  কিংবা কোন নিকট আত্মীয় বা বন্ধুর অসুস্থতার কারণেও হতে পারে। এই সব কারণগুলো তো প্রত্যেক  বছর ই কিছু  কম বা কিছু বেশী পরিমাণে থাকেই তবে এইবার  এরকম  কেন মনে হচ্ছে। চিন্তার  গভীরে ডুব দিয়ে কারণ  অনুসন্ধানে মন দিলাম।  হ্যাঁ , পেলাম খুঁজে। হাজার হাজার  যোগ্য  চাকরিপ্রার্থীরা উপেক্ষিত  হয়ে দিনের পর দিন  বিভিন্ন  জায়গায় অবস্থানরত আর তাদের  জায়গায় অযোগ্য  প্রার্থীরা টাকার বিনিময়ে রাজনৈতিক নেতাদের হাত ধরে সেইসব জায়গা দখল  করে বসে আছে এবং এই অযোগ্য অশিক্ষিতদের হাতে ভবিষ্যত  প্রজন্ম কতটা  সুরক্ষিত সেটা ভাবার  সময় ভীষণ ভাবে এসেছে।  প্রত্যেক  যুগেই  মানে বিভিন্ন  সরকারের  আমলেই  এটা হয়েছে কিন্তু গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এই ব্যাপকতা ভবিষ্যত প্রজন্মকে কিভাবে পিছিয়ে দিয়েছে এটা ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। মধ্যবিত্ত  সংসারে সবার  পক্ষে প্রাইভেট স্কুলে পড়ানো সম্ভব নয় কারণ  অতিরিক্ত খরচ তাঁদের  পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। কিন্তু এই অসৎ  রাজনৈতিক  নেতারা তাঁদের  ছেলেমেয়েদের  ভুলেও  এই সরকারী স্কুলে পড়তে পাঠাবেন না। অনেকটা এইরকম  কথা," ডু হোয়াট আই সে, ডোন্ট  ডু হোয়াট আই ডু।" নেতাদের  ছেলেমেয়েরা ভাল স্কুল,  ভাল  কলেজে পড়ে তাঁদের  মতন নেতা হবে আর সাধারণ  মানুষের ছেলেমেয়েরা তাঁদের  তাঁবেদারি করবে আর এই ব্যবস্থাটাই পাকাপোক্ত করার  ভীষণ প্রয়োজন। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এই ঘূণ যাঁরা ধরিয়েছেন তাঁদের  কি ধরণের  শাস্তি হওয়া উচিত  তার প্রতিবিধান করবেন আদালত। সর্বস্তরে এই ব্যাপক দুর্নীতির প্রকোপে মন আজ ভীষণ ভারাক্রান্ত  এবং মন আর সায় দিচ্ছেনা গেয়ে উঠতে, " ওরে বকুল পারুল, ওরে শাল পিয়ালের বন, কোনখানে আজ পাই এমন মনের  মতো ঠাঁই, যেথায়  ফাগুন ভরে দেব দিয়ে সকল মন।"
হে বসন্ত,  আমায় মাফ করো, এবারের  মতো আমায় রেহাই  দাও, আমাকে ঐ যোগ্য  চাকরি প্রার্থীদের সমব্যথী হতে দাও। জীবন সায়াহ্নে এসে একবার অন্তত এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করে আমায় এই অন্যায়ের  বিরুদ্ধে প্রতিবাদ  করতে দাও।

Tuesday, 14 February 2023

"প্রেম দিবস"

প্রেম দিবস বলতে কি বোঝায় এই কথাটা অনেক লোককে জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু একই উত্তর  সকলের কাছে  না পেয়ে আরও বেশি ঘুলিয়ে গেল মাথাটা। কেউ বলে প্রেম এক অতি স্বর্গীয় ব্যাপার, কেমন যেন  একটা ঠাকুরের লীলার মতো ব্যাপার, আবার কেউবা  বলল," অ্যাই তুমি আমাকে ভালবাস? আমি কিন্তু তোমাকে খুব  ভালবাসি।" কিন্তু ব্যাপারটা একতরফা হওয়ার জন্য জিনিসটা খুব মাখো মাখো হলোনা। কিন্তু যেখানে দুই তরফেরই সম্মতি সেখানে আমে দুধের মেলামেশা, যেটা খুবই কম ক্ষেত্রে দেখা যায়। ছোটবেলায় পেটভরে খাওয়ার পরেই কিছু একটা লোভনীয় জিনিস  দেখলেই খিদেটা যেন আবার  চাগিয়ে উঠত আর মায়ের  কাছে একটু জিনিস টা চাইলেই ঠাণ্ডা চোখে এমনভাবে তাকাতো যার মানে চোখের  খিদে ছাড়, জিনিসটা পালিয়ে যাচ্ছেনা, পরে খাবে।  এখন  বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লোকের  চোখের  খিদে। এই ভাল  লাগল তো বলেই ফেলল যে আমি তোমায় ভালবাসি, তারপর  চোখের  মাথা খেয়ে লাজলজ্জ্বাহীন হয়ে এখানে সেখানে ঘোরাঘুরি, তারপর বিয়ে বা আরও দুই কান কাটা হলে লিভ ইন আর তার কিছুদিন  পরেই  সব ভোঁ ভাঁ আর কিছুদিন পর এডালে ইনি তো সেডালে তিনি। আবার  তার উপরেও আর এক কাঠি হয় যখন  একডালে বসে জিরাতে জিরাতে অন্য ডালে অন্য জোড়া কেমন আছে তা পরীক্ষার জন্য  দেখতে আসে। এদের  কাছে প্রেম  মানে চোখের খিদে। সুইচ অন করলেই  ভালবাসা শুরু, সুইচ অফ মানেই  অনেক হয়েছে, এবার কেটে পড়। কিন্তু একটা কথা ভেবে ভীষণ চিন্তা  হচ্ছে। এই ধরা ছাড়ার যুগে যদি সবাই (মানে প্রাক্তন এবং বর্তমান) একই সঙ্গে হাজির হয় বিশেষ একজনের  প্রতি প্রেম নিবেদনে। ওরে বাবা,  ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। কিন্তু তিনি মেসি না এমব্যাপে না নেয়মার কোন মাপের  খেলোয়াড় সেটা তার ড্রিবলিং  না দেখলে বোঝা যাবেনা।

এখন এই প্রেম দিবসের  উৎস কোথায়? এর আগে কি প্রেম বলে কোন বস্তুই  ছিলনা? যতদূর  জানি এই প্রেম আদি অকৃত্রিম নিখাদ  সোনার  মতন। কিন্তু নিখাদ  সোনায়  যেমন অলঙ্কার  তৈরী হয় না, তেমনই প্রেমেও  বোধহয় সামান্য হলেও  একটু সংশয়, একটু কি হবে কি হবেনা এই চিন্তাটা না থাকলে হয়তো ঠিক  দানা বেঁধে ওঠেনা। আমাদের  এক মুশকিল আসান দাদা রতুদার  শরণাপন্ন হলাম।  অকৃতদার হলেও  রতুদার  কাছে যেন সব সমস্যার সমাধান আছে এমন কি প্যামও ( রতুদা প্রেম বলেনা)। রতুদা নাদুস নুদুস  মানুষ বেশ বড় বেলের মতন মাথা, সুতরাং তাঁর মাথা থেকে যে সব সমস্যার সমাধান  মিলবে এটা তো অত্যন্ত স্বাভাবিক  কথা। রতুদার  কাছে এই প্রেম দিবস বা ভ্যালেন্টাইন ডের কথা তুলতেই একগাল  হেসে ফুৎকারে এমনভাবে উড়িয়ে দিলেন  যে এটা আবার  একটা জিজ্ঞেস করার  মতন কথা বা বকলমে তাঁর প্রজ্ঞার  প্রতি নিতান্তই  অবিশ্বাস!  বললেন,  আরে বাবা প্যাম কি একদিনে  হয় রে ভজা? আমি বোকার মতন ফুট কেটে বলে ফেললাম  কিন্তু ঐ কি যে একটা গান আছে না, প্রেম একদিন  এসেছিল  নীরবে আমার  এই দুয়ার প্রান্তে। রতুদার  ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে আমার  হাড়ের  মধ্যে যেন বরফশীতল  হাওয়া বয়ে গেল আর একদম স্পীক টি নট। আরে বাবা শোন, কথার মাঝে ফোড়ন কাটলে কেটে পড় এখান থেকে। রতুদার  জ্ঞান গর্ভ বাণী থেকে বঞ্চিত  হতে চাইনা, বললাম সরি দাদা, আপনি বলুন। তবে শোন। এই প্যাম আট দিনে পুরোপুরি জমে ওঠে। প্রথম  দিন একটা সুন্দর দেখে গোলাপ নিয়ে যদি কোনভাবে দিতে পারলি আর দেখলি যে বেশ খুশী মনেই নিয়েছে,  তবেই দ্বিতীয় দিন  একটু ইনিয়ে বিনিয়ে হাজার  কথা বলার ফাঁকে একটু সুযোগ বুঝে বলবি যে আমি তোমায় ভালবাসি। যদি চোখ  কটমটিয়ে চলে না যায় এবং পরেরদিন আসব বলে সম্মতি দেয় তবেই একটা খুব দামী ভাল চকোলেট যেটা ও বেশ পছন্দ  করে সেটা ওকে প্রেজেন্ট  করবি।
 কিন্তু কি করে বুঝব যে কোন চকোলেট  ও পছন্দ করে? 
একটা আস্ত গাধা তুই। তোর প্যামের দরকার  নেই। প্যামের  জন্য  এলেম দরকার। বাবা,মা যখন  দেখে দেবে  তখন বিয়ের পিঁড়িতে বসবি  অন্যথায়  নয়।  আচ্ছা বলুন বলুন,  তারপর দিন কি করব?
 হাঁদুরাম, যদি চকোলেট নিয়ে  বেশ খুশীতে ডগমগ হয় তবে কথায় কথায় জানতে চেষ্টা করবি  যে কোন  সফ্ট টয় পছন্দ করে  কিনা। যদি বলে হ্যাঁ, তবে পরদিন একটা খুব  ভাল  দোকান  থেকে একটা ব্র্যান্ডেড টেডি  বিয়ার কিনে প্রেজেন্ট করলি। যদি ওটা নিয়ে নেয়, তাহলে পরেরদিন  বলবি যে তোমাকে ছাড়া আমি আর বাঁচব না। কিন্তু খুব বুঝে সুঝে কথা বলিস।  একটু বেসামাল  হলেই কিন্তু সব গুবলেট হয়ে যাবে। অবশ্য  কথাবার্তার গতি প্রকৃতি দেখে তুই বুঝতে পারবি যে ঘটনাটা কোন দিকে গড়াচ্ছে। যদি দেখিস যে পরেরদিন না ঘুমানোর জন্য চোখ  ফুলোফুলো ,তবে সুযোগ বুঝে একটু শরীরের  কাছাকাছি হতে পারিস এবং আলিঙ্গন করলেও করতে পারিস। কিন্তু মনে রাখবি  যে এগুলো সব আজকের  দিনে ভিন্ন  স্টেজের  ইন্টারভিউ। জানিস তো আজকাল  একটা ইন্টারভিউয়ে কোন চাকরি হয়না। বিভিন্ন রাউন্ডের মাধ্যমে ফাইনাল ইন্টারভিউ হয়  এবং তারপর চাকরি। অতএব  বাপু, খুব  সাবধানে এগোস। যদি এই রাউন্ডে উতরে যাস, তাহলে পরেরদিন একটা কিস করার  চেষ্টা করতে পারিস  কিন্তু বারবার  সাবধান করে দিচ্ছি, যে কোন মুহুর্তে বরফ জমা থেকে গলে জল হবার সম্ভাবনাও কিছু কম নয়। যদি এই সাতদিন ভালভাবে উতরে  গেলি তাহলে কোন  ভাল রেস্তোরাঁয় পরেরদিন  অর্থাত  চৌদ্দ ই ফেব্রুয়ারি একটা ক্যাণ্ডেল লাইট ডিনার  করবি অর্থাত  প্যাম দিবস  সম্পূর্ণম।  রতুদার  উত্তর  পেয়ে গেছি । এবার  আমার  দিক থেকে এক ব্রহ্মাস্ত্র  নিক্ষেপ।  আচ্ছা রতুদা, প্রেম সম্বন্ধে এত স্বচ্ছ  ধারণা সত্ত্বেও আপনার  কেন বিয়ে করা হয়ে উঠল না? বলাই বাহুল্য,  উত্তরের  জন্য  অপেক্ষা না করে পড়ি কি মরি দে দৌড়।

Tuesday, 17 January 2023

অনীকের অনেক না বলা কথা(এক)

হাতে সময় খুব কম, কিছু না বলা কথা এখনই না বললে হয়তো আর সময় পাবেনা বলার।  ডাক্তার তো প্রায় জবাব দিয়েই দিয়েছে।
অনীক বোস সুন্দর ল্যান্সডাউন রোডে নতুন খোলা ব্যাঙ্কের হেড ক্যাশিয়ার। ছিমছাম  ব্যাঙ্কের ঝকঝকে কাউন্টার আর গ্রাহকরাও সবাই বেশ ঝকঝকে। গ্রাহকেরা আসছে ,চটপট কাজ সারছে আর কিছু মিষ্টি হাসি দামী সেন্টের গন্ধের  সঙ্গে ছড়িয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। গ্রাহকরাও  বেশ  নামী দামী, নানাধরণের গাড়ি নিয়ে আসেন ব্যাঙ্কের কাজ সারতে যদিও অনেক সময়ই দরকার  পড়েনা গাড়িটা  আনার কারণ বাড়ি থেকে দু পা ফেললেই তো ব্যাঙ্ক। কিন্তু স্টেটাস বলে একটা কথা আছে না যেটা গাড়ি না আনলে ঠিক মানানসই  হয়না। তবে কিছু ব্যবসায়ীরা আসেন  যাঁরা একেবারে কাজ সেরে তাঁর নিজের  কাজে চলে যান।  সেক্ষেত্রে গাড়ি আনাটা  ভীষণ প্রয়োজন। এইরকম  একটা ব্যস্ত দিনে গ্রাহকের আনাগোনা বেশ ভালই চলছে, হঠাৎই  একটা ভীষণ জোরে আওয়াজ এল যেন কিছু একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।  ক্যাশ রিসিপ্ট এবং পেমেন্ট  কাউন্টারেও বেশ লোকজন রয়েছে, এমন সময় ঐ আওয়াজে একটু সতর্ক হয়েই অনীক বেরিয়ে এল কি ব্যাপার ঘটেছে দেখার জন্য।  হেড  ক্যাশিয়ার হবার জন্য স্ট্রংরুমের  চাবি সে সবসময়ই নিজের  কাছেই  এমনভাবে রাখে যাতে চাবি তার শরীরকে স্পর্শ  করে থাকে। ও কখনোই নিজের  ড্রয়ারে  রাখেনা।কাউন্টার ঘুরে বাইরে এসেই দেখে একজন  বৃদ্ধ  ভদ্রলোক উপুড়  হয়ে রাস্তায় পড়ে আছেন  এবং একটা ট্যাক্সি তাঁকে বেশজোরে ধাক্কা মেরে পালিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই আছেন  রাস্তায় কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেন না। উল্টোদিকের হকার্স  কর্ণারে  একটা টিভি সারানোর দোকান  ছিল। ঐ ভদ্রলোক কে নিয়ে একজন কাস্টমারের গাড়িতে বসে থাকা ড্রাইভারকে নিয়ে ভদ্রলোককে উঠিয়ে শিশুমঙ্গল হাসপাতালে নিয়ে গেল  এমার্জেন্সিতে।  ওরা কিন্তু ভর্তি করল না। তখন তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো শম্ভুনাথ পণ্ডিত  হাসপাতালে। সেখানেও  তারা দেখলনা। তখন  অগত্যা পিজি হাসপাতালে যাওয়া হলো এবং সেই টিভি সারানোর দোকানের  লোকটিকে সেই অ্যাক্সিডেন্ট হওয়া ভদ্রলোককে জিম্মা করে অনীক  বলল যে চাবিটা  হ্যান্ড ওভার করে ও ফিরে আসছে। ঐ গাড়ির  মালিক  ছিলেন  ভাল্লা  ফুটওয়্যারের মালিক  মিস্টার  ভাল্লার। তিনি তাঁর  কাজ সারতে সারতে অনীক  ফিরে এসেছে এবং মিস্টার ভাল্লার কাছে তাঁর  অনুমতি ছাড়া গাড়িটি নিয়ে যাওয়ার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে এবং ড্রাইভারের কোন দোষ নেই এবং তাকে প্রায় একরকম  জোর  করেই  সে নিয়ে গেছে একথাও  জানিয়ে দিল যাতে ড্রাইভার বেচারা আর বকুনি না খায়। যাই হোক, চাবিটা অন্য একজনের  কাছে দিয়ে ম্যানেজারের  পারমিশন নিয়ে ট্যাক্সি ধরে ফিরে গেল পিজি হাসপাতালে।
কিন্তু ততক্ষণে ঘটে গেছে বিপত্তি। ঐ বয়স্ক  ভদ্রলোক  ততক্ষণে না ফেরার দেশে চলে যাওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দিয়েছে এবং তারা তো অনীক  এবং টিভি সারানোর দোকানের  মালিককে প্রায় গ্রেফতার করার  জোগাড়। যাই হোক সমস্ত ঘটনা আদ্যোপান্ত  শোনার পর  দুই জনের  নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর  নিয়ে ছেড়ে দিল কিন্তু ততক্ষণে অনেক  সময় পেরিয়ে গেছে। ভদ্রলোকের  পকেট থেকে একটা কাগজে লেখা  ফোন নম্বর দেখে ফোন করে জানা গেল যে সেটা তাঁর  মেয়ের ।ফোন  করে ডেকে আনা হলো তাঁর মেয়েকে। প্রথমে তাদের  সন্দেহ  যে অনীক  এবং টিভির  দোকানের মালিকের  দ্বারাই কিছু  হয়েছে কিন্তু সমস্ত কিছু জানার  পর আর কিছু বললনা। কিন্তু এখানেই সমস্যার  শেষ  নয়। দু চার দিন  বাদে বাদে অনীক দের  ডেকে পাঠায় লালবাজার থেকে। অনেকগুলো ছুটি নষ্ট  হয়েছে তার আর ভদ্রলোককেও  দোকান  বন্ধ  রেখে হাজিরা দিতে হয়েছে এবং ঘন্টার পর ঘন্টা বসেথেকে একই    প্রশ্নের  ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করার  উত্তর  দিতে হয়েছে। একদিন  অত্যন্ত  বিরক্ত  হয়ে অনীক সেই পুলিশ ইন্সপেক্টরকে  বলে ফেলল যে আপনাদের  এই ধরণের  ব্যবহারে অতিষ্ঠ  হয়ে আর কেউ কোনদিন  কার ও বিপদে সাহায্য  করতে এগিয়ে আসবে না। তারপর মৃতের মেয়ে এবং জামাইএর  কাছে লিখিত বয়ান  যে অনীকদের তাঁকে বাঁচানোর  সাহায্য  করা ছাড়া আর কোন  উদ্দেশ্য  ছিলনা নিয়ে তাদের  মুক্তি দেওয়া হলো।
মানবিকতা দেখাতে গিয়েও যে কত বিপদের  সম্মুখীন হতে হয় তার এক প্রকৃষ্ট নিদর্শন।  তা বলে কি অনীকরা আবার ও ঐভাবে কাউকে সাহায্য  করতে এগিয়ে আসবে না?

Friday, 7 October 2022

বুড়ো বুড়ির গপ্পো

বেশ বড় মাপের  পার্কের  একটা দিক সিনিয়র সিটিজেন  মানে বুড়োবুড়িদের জন্য নির্দিষ্ট  হয়েছে। রয়েছে নানাধরণের ফুলের গাছ আর বার্ধক্য নগরীর পার্ক বলে অনেকটা জায়গাই এই বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের জন্য  রাখা হয়েছে। আজকাল শহরের  বিভিন্ন  লোকালয়ে এই ধরণের ছোটখাটো পার্ক হয়েছে যেখানে এই বুড়োবুড়িরা এসে একটু বুকভরে নিঃশ্বাস  নিয়ে নিজেদের  মধ্যে একটু গল্পগুজব  করতে পারে। এই পার্কটা বেশ বড়, সুতরাং বাচ্চাদের জন্য ও অনেকটাই  জায়গা রয়েছে তাদের  খেলাধূলার জন্য,  রয়েছে নানাধরণের উপকরণ, আর তার পাশেই রয়েছে একটা জিমন্যাসিয়াম যেখানে অল্পবয়সীদের ভিড়, নানাধরণের কসরত হচ্ছে সেখানে।  আছে সেখানে কিছু মাঝবয়সীরাও যাঁরা শরীর সচেতন এবং সবচেয়ে মজার  ব্যাপার কিছু মেয়েরাও এই সচেতনাতে  সাড়া দিয়েছেন এবং অবশ্যই  সেখানে কিছু মাঝবয়সী মহিলারাও  আছেন। অবাক  হওয়ার কথা, শ্বাশুড়ি ও বৌমাও রয়েছেন তাঁদের  মধ্যে খানিকটা হাম কিসিসে কম নেহির  মতন ব্যাপার স্যাপার। বাচ্চাদের  নিয়ে মায়েরা কিংবা যেখানে একটু বেশী পয়সা আছে সেখানে কাজের  লোকেরা বাচ্চাদের  নিয়ে খেলাচ্ছে এবং মায়েরা নিজেদের মধ্যে নানান বিষয়ে আলোচনায় মত্ত-- কোন কোন সময় শ্বশুর শ্বাশুড়ির পিণ্ডি চটকানোও তার মধ্যে আছে। উল্টোদিকে শ্বাশুড়িদের মধ্যেও  বৌমা এবং তার  বাপের বাড়ির  নিন্দেবান্দাও  বাদ নেই। অবশ্য  এই সব নিয়েই তো সংসার , নাহলে আর মজাটা কোথায় ?  এই সবনিয়ে  হাজারো সিরিয়াল  হয়ে গেছে আর লোকে  হাঁ করে এই সব মহাভারতের মতো সিরিয়ালগুলো গোগ্রাসে গেলে। ঐসময় যতই প্রিয় বন্ধুই হোক না কেন  নট ওয়েলকাম অ্যাট অল, নো ডিসটার্বেন্স পারমিটেড। যাক গে, আজকের  বিষয় বস্তু হচ্ছে বুড়োবুড়ির গপ্পো।

গেট দিয়ে ঢুকেই ডানদিকে একটা ছোট্ট  সাইনবোর্ডে বাঁকা ট্যারা ভাবে লেখা আছে ফর সিনিয়র সিটিজেন'স ওনলি। সুন্দর  ফুলের গাছ দিয়ে বেড়া দেওয়া বেশ প্রশস্ত একটা জায়গা। সুন্দর সাজানো গোছানো ফুলের গাছ এখানে ওখানে। মাথার  উপর ছাতা করা সিমেন্টের  বাঁধানো গোল বসার  জায়গা অনেকগুলো যেখানে  অনেক ভিন্ন বয়সী ভিন্ন  স্বাদের আলোচনাকারী বুড়োবুড়ি বসে গল্প গুজব করতে পারেন। এখানকার  মেম্বারশিপ প্রায় বাঁধা। নতুন  কোন বুড়ো বুড়ি এলেই হঠাৎ ঐ বাঁধা মেম্বারের জায়গায় বসতে পারবেন  না। ঐ ছাতাগুলোও ভিন্ন  আলোচনাকারী মেম্বারদের জন্য।  কোন জায়গায় ধর্মীয় আলোচনা তো কোথাও  রাজনীতি বা কোথাও   সঙ্গীতের  আলোচনা চলে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে এক রসের  ব্যক্তি অন্য রসে বেমানান। এছাড়াও  রয়েছে বুড়িদের আলাদা বসার  জায়গা। জীবনের  শেষ প্রান্তে এসেও  লেডিজ  আর জেন্টস।  কিছুদিনের  মধ্যেই  তো একই জায়গায় পৌঁছাতে হবে, সেখানেও  কি লেডিজ আর জেন্টস থাকবে? যাই হোক, ঐ বাঁধানো সিমেন্টের ছাতাওয়ালা সিটে মাথা ঢোকানো যে সে  কম্মো নয়, সেখানেও  কারও  রেকমেন্ডেশন বা কেউ হঠাৎই  না ফেরার  দেশে চলে গেছেন  এবং একই ধরণের আলোচনায় অংশ গ্রহণ করবেন এইরকম  লোকই  ঐ বিশেষ  জায়গায় বসতে পারবেন  নাহলে হয়  অন্য টাইম স্লটে বসতে হবে আর তা নাহলে ইতিউতি উঁকিঝুঁকি  মেরে কোথায় জায়গা খালি আছে দেখে বসতে হবে। অন্য পাড়ার  কুকুর  বেপথু হয়ে যদি অন্য কোন  জায়গায় ঢুকে পড়ে তার যা হাল হয় এখানেও  প্রায় সেইরকম অবস্থাই  হয়। এখানে কেউ কামড়াকামড়ি করেনা বটে কিন্তু জোড়া জোড়া কোটরাগত  ঠাণ্ডা  হিমশীতল দৃষ্টিতে নবাগত বৃদ্ধ প্রায় দগ্ধ হয়ে যান।
বিভিন্ন  ছাতার তলায় বিভিন্ন ধরণের আলোচনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বুড়োবুড়িদের খিটিমিটির কথা নয়তো বৌমার উপেক্ষার কথা। সত্তরোর্দ্ধ ব্যক্তিদের আলোচনার বিষয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বৌমার এবং বৌ ন্যাওটা ছেলের উপেক্ষার কথা বিশেষত  যেখানে বাবা ও মা তাঁদের  সন্তানের  উপর নির্ভরশীল আর ষাটোর্দ্ধ  এবং সত্তরের মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্যের কথা, প্রায় হিন্দুস্থান পাকিস্তানের  মতন। এ যদি বলে ডান তো অন্যজন বলেন  বাম। যাক যতই  ডান বাম চলুক  না কেন নিজেদের মধ্যে, জিত  সেই একপক্ষের। আলোচনায় ক্ষান্তি  দিয়ে বলতে হবে আচ্ছা বাবা তুমিই  ঠিক নতুবা কোন অজুহাতে স্থান  ত্যাগ করা, নিদেন পক্ষে বাথরুম  চলে যাওয়া। যাঁরা তুমিই ঠিক  বলতে পারেন  তাঁরা এই সিটে বসবেন না আর যাঁরা তা মেনে নিতে পারেন  না তাঁরা পরদিন  এসে বন্ধুবান্ধবদের  সঙ্গে প্রসঙ্গ উত্থাপন করে খানিকটা হাল্কা হয়ে ফিরে যান তাঁরই  কাছে। এটা ঠিক  কথা  যে একটু  ফ্যাঁস ফোঁস  না হলে সংসারের মজাটা ঠিক  জমেনা। এই ফ্যাঁস ফোঁস  করতে করতেই  একদিন  এই সংসারের  সব মায়া কাটিয়ে চলে যেতে হবে সবাইকে,  কেউ দুদিন  আগে  আর  কেউ দুদিন পরে। 


Monday, 26 September 2022

গরীবের সন্ধানে

পূজো এসে গেছে। চারদিকে  সাজো সাজো রব। এক নিদারুণ  উন্মাদনা সবাইকে কেমন যেন  গ্রাস করেছে। কুচি কাচা থেকে বুড়ো হাবড়া সবাই যেন কেমন  চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন রকম  সমস্যা কিন্তু হিন্দুদের  বিশেষত  বাঙালিদের  সবচেয়ে বড় উৎসব এই দুর্গাপুজো ম্রিয়মান অর্থনীতিকে এক কোরামিন ইঞ্জেকশন দিয়েছে যেন,  চোখ মেলে চাইছে বাঙলার অর্থনীতি।
                     
                   গত দুবছর করোনার প্রকোপে লোক সেরকম ভাবে উৎসব উদযাপন  করতে পারেনি, সাধারণ  গরীবগুর্বোদের অবস্থা তো আরও  তথৈবচ।  চারদিকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের  দুর্দশা ছিল  সীমাহীন। না আছে রোজগার পাতি, না আছে তাদের  ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ভালোমন্দ  কিছু কিনে দেওয়ার সামর্থ্য।  এবছর মায়ের  আগমনের  আগেই করোনা নামক  দৈত্য বিদায় নিয়েছে , অবশ্য একেবারেই  যে আপদ বিদায় হয়েছে তা নয়, নব কলেবরে নতুন নামে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন  কিন্তু টীকার প্রভাবেই হোক আর মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বাড়ার জন্যই হোক তারা এখন  মরিয়া হয়ে গেছে। সমস্ত রাজ্যে দুর্নীতির  রমরমা, এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায় দেখ কিন্তু এ সত্ত্বেও  পূজোর  সংখ্যা বেড়েছে আর তারই সঙ্গে বেড়েছে লোকের  আয় করার ক্ষমতা বিশেষ করে এই সময়। দুর্নীতির নাগপাশে আষ্টে পৃষ্টে বাঁধা সরকারের  নেতা মন্ত্রীরা কিন্তু টিভি চ্যানেলে কোমরবেঁধে ঝগড়া দেখলেই আপ্তবাক্য মনে পড়ে যায় চোরের  মায়ের  বড় গলা। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার উপরতলায় চোর এবং সাধুর কুশল বিনিময় দেখলে মনেই হবেনা যে কিছুক্ষণ  আগেই টিভির  চ্যানেলে এরা প্রায় বাহুযুদ্ধে সামিল হচ্ছিল। আসলে ব্যাপারটা কি,বর্তমান দলে কখন দমবন্ধ  অবস্থা হবে কেউ জানেনা, সুতরাং নতুন  পদক্ষেপে যাতে বিন্দুমাত্র  দুর্ভোগ  না হয়, তার আগাম প্রস্তুতি রাখা সবসময়ই  ভাল। পূজোর বাজেটে কেউ কম যায়না। প্রতিবছর বাজেটের পরিমাণ বেড়েই চলেছে এবং প্রতিটি পূজোরই  পৃষ্ঠপোষক কোন নেতা বা মন্ত্রী। যার যেমন ওজন,  তার বাজেটের ওজন ও সেইরকম।  নেতারা চাপ দেন ব্যবসায়ীদের  আর তাঁরা থোড়াই  নিজের  পকেট থেকে দেন, সুদে আসলে সাধারণ মানুষের পকেট কাটেন।  এর ওপর আছে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা। ফি বছর বাড়ছে পূজোয়  সরকারী অনুদান।  যত পূজো,ততই  অনুদান।  দেশে চাকরির  সংস্থান নেই, যোগ্য চাকরি প্রার্থীকে ঘেঁচুকলা দেখিয়ে অযোগ্য  লোকজনদের উৎকোচের বিনিময়ে চাকরি  দিয়ে  দেওয়া, এ এক অসহনীয়  পরিস্থিতি। ছেলেমেয়েদের মধ্যে পড়াশোনার  চল কমেছে, মাস্টার মশাইদের সম্মান  কমেছে, ফলে ফুলে বেড়েছে শুধু নেতা,মন্ত্রী ও তাঁদের  পারিষদবর্গের। রমরমিয়ে রথের চাকা চালিয়ে যান নেতা, চাকার তলায় পিষ্ট হন সাধারণ জনতা। যত কম  বলা যায় ততই  মানসিক  শান্তি বজায় থাকে। আরে বাবা, এত কথা বলা কেন? খেয়ে দেয়ে চুপ করে বসে থাকতে পারনা? সেটা পারলেই আসবে অপার শান্তি।

গতকয়েক বছর ধরে এক নতুন হুপোৎ হাজির  হয়েছে। সেটা হচ্ছে দরিদ্র জনগণের উপকার করা। কিছু লোকের  এটা বরাবরের অভ্যেস  কারণ তাঁরা হয়তো সেই দারিদ্র্যকে খুবই কাছ থেকে দেখেছেন  কিম্বা তাঁদের যে শিক্ষা প্রাপ্তি ঘটেছে তা সত্যিই খুব সুন্দর। যে কারণেই  হোক না কেন সাধারণ মানুষের কষ্ট  দেখলে তাঁরা স্থির  থাকতে পারেন না এবং তাঁরা সাধ্যমতন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। বহু সংস্থাই আছে যারা বিপদে আপদে সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান এবং এদের মধ্যে রামকৃষ্ণ মিশন এবং ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের  নাম প্রথমেই  মনে পড়ে। এঁরা সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী এবং কোনরকম  নাম কামানোর জন্য  এঁরা কিছু করেন না, এঁদের  কর্মযজ্ঞ বিশাল। এঁরা ছাড়াও  কিছু সংস্থা আছে যারা বিভিন্ন সময়ে সাধারণ জনগণের  পাশে এসে দাঁড়ান। কিন্তু এদের  মধ্যে কতজন নিঃস্বার্থ ভাবে আসেন  তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। এঁরা বিভিন্ন  পেশায় যুক্ত এবং তাঁদের  পেশার  প্রসারের জন্যই  এগিয়ে আসেন।  তাঁদের  দরকার  একটা প্ল্যাটফর্ম  এবং একবার  সেই উঁচুতলার সোপানে উঠতে পারলে আর পায় কে? দুই থেকে চার, চার থেকে আট, এঁদের  খ্যাতি দিনদিন  বেড়ে ওঠে এবং তার সঙ্গেই  বেড়ে ওঠে তাদের ব্যবসায়িক দিক। একটা প্ল্যাটফর্ম  পেলেই সেটা ভাঙিয়ে নানান কায়দায় লোকের  ঘাড় ভাঙা এবং কেষ্টবিষ্টুদের সঙ্গে ওঠাবসার সুবাদে সরকারী, বেসরকারি সুযোগের  সদ্ব্যবহার করেন  এঁরা এবং অধিকাংশ  লোক ই এই জাতীয় মতলববাজ। আর কুম্ভীরাশ্রু বহানোয় এঁদের  জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু এঁরা নিজের গাঁটের  কড়ি থোড়াই খরচ করেন? না, সেই সব হয়ে গেছে প্ল্যাটফর্ম  পাওয়ার আগে। এখন  ধীরে ধীরে সূতোটানার পালা এবং যা খরচ হয়েছে তা সুদে আসলে উঠিয়ে আনা। এঁরা ফটোশুটে  খুবই পারদর্শী এবং এঁদের  বাহন এই গরীব  জনগণ। সুতরাং, গরীব  খোঁজ।  আর এই গরীব  খোঁজার প্রতিযোগিতায় সামিল  হন এই জাতীয় বহুলোক।  আর এই তথাকথিত  গরীবদের ও পোয়াবারো। এরা একবার  এই সংস্থা আর একবার  ওই সংস্থায় মুখ দেখায় এবং তাদের  কাছ থেকে প্রাপ্ত সামগ্রী বাজারে বেচে দেয়। শীতের  সময় যদি একই মানুষ চারটে কম্বল পায় তারা কি চারটে কম্বল গায়ে দেবে না একটা রেখে বাকি তিনটে বিক্রি করবে? আর এই বিতরণের  সময়  পেটোয়া ফটোগ্রাফার  ফটাফট ছবি তুলে বিভিন্ন  জায়গায় পাঠিয়ে দেয় এবং কেল্লা ফতে।এই প্রক্রিয়ায়  সামিল  হয়েছে বহু  ব্যাঙের ছাতার  মতো গজানো সংস্থা এবং বহু  গজুদারা। আর এই তথাকথিত  গরীবরাও আছে খোশ মেজাজে। বহু সংস্থা আবার  এই তথাকথিত  গরীবদের উন্নয়নের জন্য  বিদেশ থেকে প্রচুর টাকা পায় এবং তার  বহুলাংশই  নিজেদের বিলাস ব্যসনে ব্যয় করে এবং নামমাত্র  কিছু গরীবদের  জন্য বরাদ্দ করে। ব্যানার লাগানো, ফেস্টুন লাগানো খান চারেক গাড়ি থেকে কিছু তথাকথিত গরীব দরদী লোক নেমে, " অ্যাই এখানে তোরা কজন আছিস? জামাটা খুলে একটা  নোংরা বা ছেঁড়া গেঞ্জি পড়ে এখানে এসে লাইন  দিয়ে দাঁড়া।" কেউ বা ছেঁড়া লুঙ্গি বা গেঞ্জি আবার কেউ বা আদুর গায়েই খালি পায়ে এসে লাইনে দাঁড়ালো এবং একটা দামী গাড়ি থেকে একটু হিরো গোছের লোক, চোখে দামী সানগ্লাস,  পায়ে হেব্বি জুতো নেমে এলেন  এবং একজন পার্শ্বচর  একটা বড় গোছের  সাদা বাক্স এবং একটা মিনি বোতল তাঁর হাতে দিতে থাকল এবং তিনি সেই লাইনে দাঁড়ানো গরীবদের  হাতে দিতে থাকলেন  এবং  ফটাফট  ছবি উঠতে থাকল।  সবাইকে দেওয়া হলে এক আত্মতৃপ্তির হাসি ও ঢেকুর  তুলে তিনি গাড়িতে উঠে  পড়লেন। সম্প্রচারের গাড়িটাও তাঁর গাড়ির  পিছু পিছু চলে গেল  এবং এই সঙ্গেই সাঙ্গ হল' গরীবদের  উন্নয়নের  পালা । 

সিরিয়ালের শুটিং না  সত্যি সত্যিই কোন জনহিতকারি সংস্থার দান সেটা বোঝা গেলনা কিন্তু একটা জিনিস প্রকট হলো যে সবটাই  মেকি, লাভের  মধ্যে ঐ কয়েক জন গরীবদের অন্তত একদিন  ভাল মন্দ খাওয়া দাওয়া। কবে বন্ধ  হবে এইরকম  চটজলদি দারিদ্র্য  দূর করার কৌশল? যদি সত্যিই  কিছু জনহিতকর কর্ম করতে হয়, তবে এমন কিছু করা দরকার  যাতে লোকজন  নিজের  পায়ে দাঁড়াতে পারে এবং তাদের  ভিক্ষার আশ্রয় না নিতে হয়। ভিক্ষার দান নিতে নিতে তাদের  কর্মক্ষমতা একদম শূন্যে এসে ঠেকে এবং কোন  কাজই তাদের  করতে ইচ্ছা করেনা। কায়িক  পরিশ্রমের ফসল একবার  উঠতে শুরু করলে হাত পাততে  তার লজ্জ্বা বোধ হবে এবং আমরা সেইদিনের প্রতীক্ষায় থাকব। যেদিন  এরা মাথা তুলে দাঁড়াতে শিখবে সেইদিন এই ভেকধারী সমাজসেবীও উধাও  হয়ে যাবে। আমরা কি একটু চেষ্টা করতে পারিনা?