বহু পাখী এই গাছদুটোয় আশ্রয় নেয়। সন্ধ্যের আমেজ আসতে না আসতেই কে কোথায় থাকবে সেটা নিয়ে রোজ কলহ। বড়সড় চেহারার কাকের সঙ্গে কে ঝগড়া করবে? বুলবুলি, বাবুই, ময়না, পায়রা বা চড়াই কেউ ওদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেনা। ঘুঘু , তারা যে কোথায় থাকে কেউ জানেনা। একমাত্র ব্যতিক্রম শালিক। ছোটখাট চেহারার হলেও একমাত্র তারাই এগিয়ে আসে কাকেদের মোকাবিলা করতে। ঝগড়ায় এরা বিশেষ পারদর্শী। কোন কোন সময় তাদের চিৎকারে বিরক্ত হয়ে কাকেরা পাশের শালগাছ কিংবা কাঠবাদাম গাছে আশ্রয় নেয়। শালিকদের যুক্তি লালফুলের কৃষ্ণচূড়া গাছে তোদের কালো চেহারা বড্ড বেমানান। অতএব, দূর হ। অন্যসব পাখিদের ও সেই অভিমত। একরকম বাধ্য হয়েই তারা অন্যত্র যেতে বাধ্য হয়। ব্যালকনিতে বসে বসে তাদের ঝগড়া দেখি আর বোঝার চেষ্টা করি কে কি বলছে। কিন্তু আমি তো ডঃ সালিম আলি নই যে তাদের ভাষা বুঝতে পারব, কেবল কল্পনাই করে যাই। বেশ চলছিল তাদের ঝগড়াঝাঁটি দেখে। হঠাৎ এসে গেল ঘূর্ণিঝড় আম ফান। মে মাসের কুড়ি তারিখে মাঝরাতে এলো সেই প্রলয়ঙ্করী ঝড় যা সমস্ত বিটপ বিটপীকে একেবারে দুমড়ে মুচড়ে দিল। এদিকে ওদিকে তাদের তাণ্ডবে বহু গাছপালা ভেঙে পড়ল, কোথাও একটা গাছ সমূলে উৎপাটিত হয়ে বাসের কোমর ভেঙে দিল আবার কোথাও বা রাস্তা জুড়ে আড়াআড়ি ভাবে পড়ে রাস্তা বন্ধ করে দিল। লাইট নেই, পাখা নেই, জলের অবস্থাও তথৈবচ। প্রচণ্ড বৃষ্টির তেজ, ঝড়ের ফোঁসফোঁস করায় একের পর এক গাছ উপড়ে পড়ছে। ছাদের ওপর তৈরী করা শেডের চাল উড়ে যাচ্ছে ভয়ানক বেগে, হঠাৎই মড়মড় করে এক প্রচন্ড আওয়াজ। লালফুলে ভরে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছটা ভেঙে পড়ল। হাউসিং এস্টেটে বাড়িগুলো বিভিন্ন কোণে অবস্থিত হওয়ায় সব গাছের ই এক অবস্থা হয়নি। যেখানে হাওয়া বাড়িগুলোতে বাধা পেয়েছে সেইখানে গাছগুলো খানিকটা রেহাই পেয়েছে কিন্তু যেখানে তার কোন গতিরোধ হয়নি সেখানে গাছগুলো আর কোন প্রতিরোধ করতে না পেরে ধরাশায়ী হয়েছে। রাধাচূড়া গাছের কিছু ডাল ভেঙে গিয়ে মনে হচ্ছে যেন টেরি কাটা উত্তমকুমারের চুল। শাল গাছটা তেমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি কিছু ডালপালা ভাঙ্গা ছাড়া। কাঠবাদাম গাছের বেশ ক্ষতি হয়েছে, ঝাউগাছটাও অনেক শীর্ণকায় হয়েছে কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, হিলহিলে সুপুরি গাছটাকে ঐরকম দাপুটে আমফান ও কিছুই করতে পারেনি। কোথা থেকে এত শক্তি পেল ঐ রোগা ডিগডিগে ঐ গাছটা? আমার মনে হয় ও আজকের যুগের রাজনৈতিক নেতাদের মতো। তাঁরা যখন যেমন হাওয়া সেই বুঝেই চলেন। তাঁরা জানেন যেন তেন প্রকারেন ক্ষমতা ভোগ করতে হবে।অতএব, হাওয়া যেদিকে চলবে সেইদিকে চলব। ঐ বড় বড় গাছগুলো নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করতে গিয়ে হয়েছে কুপোকাত। অতএব, ঐসবের মধ্যে নেই। ঐ দুর্দান্ত গতিময় ঝড় যেদিকে যেমন ঝাপটা মারছে উনিও তেমনই সেই সেইদিকে মাথা নাড়ছেন। অতএব, পুরস্কার স্বরূপ তোমাকে দিলাম আরও এক জীবন। গাছের মধ্যে ইনি নিশ্চয়ই বুদ্ধিজীবী নাহলে পাশের আমগাছ তিনি যথেষ্ট হৃষ্টপুষ্ট অথচ হলেন ধরাশায়ী আর ইনি গেলেন বেঁচে এবং স্বমহিমায় বিরাজমান।
এদিকে একের পর একগাছ ভেঙে পড়ায় পাখিদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। মানুষের বাড়িঘর ভেঙে গেছে, এগিয়ে এসেছে সরকারি, বেসরকারী বহু সংস্থা। এসেছে রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম সংঘ, এসেছে বহু নামী, অনামী সংস্থা যাদের কেউ কেউ সেখান থেকে কিছু উপার্জনের আশায়। সরকারি টাকা যাদের কাছেপৌঁছে দেবার কথা তাদের নাম করে নিজেদের পেটভরিয়ে নেবার মতো বহু লোক। আবার অনেক লোক আছেন যাঁরা নিজেদের সাধ্যমতো সাহায্য করেছেন কোনরকম ফটোশুটের আশা না করেই। এরই মধ্যে বিভিন্ন পাখিরা তাদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া আপাতত স্থগিত রেখে ঐ ভাঙাচোরা গাছেই সমঝোতা করে নিয়েছে। এরা হতে পারে পাখী, জানিনা এদের ভাষা কিন্তু মানুষের চেয়ে এরা কোন অংশে কম? আমরা নিজেদের মানুষ বলে বড়াই করি কিন্তু আমাদের বহু কিছু শেখার আছে ভগবানের সৃষ্ট এই জীবগুলোর কাছে।