Monday, 30 November 2020

" রাধাকৃষ্ণ ভিলা"

হাউসিং এস্টেটে একটা বাড়ি যাকে চেনা যায় তার নম্বর দিয়ে। কিন্তু এই বাড়ির মালিকেরা ঠিক করলেন বাড়ির নম্বর যাই হোক না কেন এই বাড়ির নাম হবে রাধাকৃষ্ণ ভিলা। তাঁরা উদ্যোগী হয়ে একটা মার্বেল পাথরে নাম লিখে বাড়ির সামনে গেঁথে দিলেন । বেশ পুরোনো হয়ে গেছে বাড়ি, তা বছর চল্লিশ তো হবেই। কিন্তু হঠাৎ করে বাড়ির নামকরণ কেন করা হলো? যাঁরা প্রথম কিনেছিলেন তাঁরা আজ কেউই নেই - হয় অন্যলোকে চলে গেছেন নাহলে হাত বদল হয়ে গেছে। এরই মাঝে মোটামুটি একজন পুরোনো ভদ্রলোকের সঙ্গে যোগাযোগ হলে তিনি জানালেন যে এই বাড়িতে দুটো ফ্ল্যাটে একটি ছেলে ও একটি মেয়ের প্রেমকাহিনী নিয়ে এই বাড়ির নামকরণ হয়েছে। দুইজনেই খুব সুন্দর, যেমন দেখতে তেমনই তাদের সুন্দর ব্যবহার। পরবর্তীকালে তাদের প্রেমলীলা বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় এবং ঐ দুই পরিবারই তাঁদের ফ্ল্যাট বিক্রি করে চলে যান এবং তাঁদের প্রেমোপাখ্যানকে স্বীকৃতি দিয়ে বাড়ির নাম দেওয়া হয় রাধাকৃষ্ণ ভিলা। আরও একটা সঙ্গত কারণ অন্য এক ভদ্রলোক বললেন। ঐ বাড়ির সামনের দিকে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ যার লাল ফুল বাড়ির সামনের ব্যালকনিতে এসে পড়ে আর পিছনের দিকে একটা রাধাচূড়া গাছ যার হলুদ ফুলে পিছনের ব্যালকনিতে পড়ে এক অপূর্ব আমেজ সৃষ্টি করে। আর এই দুই মহীরুহের মাঝে বাড়ির নাম রাধাকৃষ্ণ ভিলা তার যথার্থতা প্রমাণ করে। যে কারণ ই হোক না কেন বাড়ির কাছাকাছি এলে কেমন যেন একটা মাদকতার সৃষ্টি হয়।
বহু পাখী এই গাছদুটোয় আশ্রয় নেয়। সন্ধ্যের আমেজ আসতে না আসতেই কে কোথায় থাকবে সেটা নিয়ে রোজ কলহ। বড়সড় চেহারার কাকের সঙ্গে কে ঝগড়া করবে? বুলবুলি, বাবুই, ময়না, পায়রা বা চড়াই কেউ ওদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেনা। ঘুঘু , তারা যে কোথায় থাকে কেউ জানেনা। একমাত্র ব্যতিক্রম শালিক। ছোটখাট চেহারার হলেও একমাত্র তারাই এগিয়ে আসে কাকেদের মোকাবিলা করতে। ঝগড়ায় এরা বিশেষ পারদর্শী। কোন কোন সময় তাদের চিৎকারে বিরক্ত হয়ে কাকেরা পাশের শালগাছ কিংবা কাঠবাদাম গাছে আশ্রয় নেয়। শালিকদের যুক্তি লালফুলের কৃষ্ণচূড়া গাছে তোদের কালো চেহারা বড্ড বেমানান। অতএব, দূর হ। অন্যসব পাখিদের ও সেই অভিমত। একরকম বাধ্য হয়েই তারা অন্যত্র যেতে বাধ্য হয়। ব্যালকনিতে বসে বসে তাদের ঝগড়া দেখি আর বোঝার চেষ্টা করি কে কি বলছে। কিন্তু আমি তো ডঃ সালিম আলি নই যে তাদের ভাষা বুঝতে পারব, কেবল কল্পনাই করে যাই। বেশ চলছিল তাদের ঝগড়াঝাঁটি দেখে। হঠাৎ এসে গেল ঘূর্ণিঝড় আম ফান। মে মাসের কুড়ি তারিখে মাঝরাতে এলো সেই প্রলয়ঙ্করী ঝড় যা সমস্ত বিটপ বিটপীকে একেবারে দুমড়ে মুচড়ে দিল। এদিকে ওদিকে তাদের তাণ্ডবে বহু গাছপালা ভেঙে পড়ল, কোথাও একটা গাছ সমূলে উৎপাটিত হয়ে বাসের কোমর ভেঙে দিল আবার কোথাও বা রাস্তা জুড়ে আড়াআড়ি ভাবে পড়ে রাস্তা বন্ধ করে দিল। লাইট নেই, পাখা নেই, জলের অবস্থাও তথৈবচ। প্রচণ্ড বৃষ্টির তেজ, ঝড়ের ফোঁসফোঁস  করায়  একের পর এক গাছ উপড়ে পড়ছে। ছাদের ওপর তৈরী করা শেডের চাল উড়ে যাচ্ছে ভয়ানক বেগে, হঠাৎই মড়মড় করে এক প্রচন্ড আওয়াজ। লালফুলে ভরে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছটা ভেঙে পড়ল। হাউসিং এস্টেটে বাড়িগুলো বিভিন্ন কোণে অবস্থিত হওয়ায় সব গাছের ই এক অবস্থা হয়নি। যেখানে হাওয়া বাড়িগুলোতে বাধা পেয়েছে সেইখানে গাছগুলো খানিকটা রেহাই পেয়েছে কিন্তু যেখানে তার কোন গতিরোধ হয়নি সেখানে গাছগুলো আর কোন প্রতিরোধ করতে না পেরে ধরাশায়ী হয়েছে। রাধাচূড়া গাছের কিছু ডাল ভেঙে গিয়ে মনে হচ্ছে যেন টেরি কাটা উত্তমকুমারের চুল। শাল গাছটা তেমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি কিছু ডালপালা ভাঙ্গা ছাড়া। কাঠবাদাম গাছের বেশ ক্ষতি হয়েছে, ঝাউগাছটাও অনেক শীর্ণকায় হয়েছে কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, হিলহিলে সুপুরি গাছটাকে ঐরকম দাপুটে আমফান ও কিছুই করতে পারেনি। কোথা থেকে এত শক্তি পেল ঐ রোগা ডিগডিগে ঐ গাছটা?  আমার মনে হয় ও আজকের যুগের রাজনৈতিক নেতাদের মতো। তাঁরা যখন যেমন হাওয়া সেই বুঝেই চলেন। তাঁরা জানেন যেন তেন প্রকারেন ক্ষমতা ভোগ করতে হবে।অতএব, হাওয়া যেদিকে চলবে সেইদিকে চলব। ঐ বড় বড় গাছগুলো নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করতে গিয়ে হয়েছে কুপোকাত। অতএব, ঐসবের মধ্যে নেই। ঐ দুর্দান্ত গতিময় ঝড় যেদিকে যেমন ঝাপটা মারছে উনিও তেমনই সেই সেইদিকে মাথা নাড়ছেন। অতএব, পুরস্কার স্বরূপ তোমাকে দিলাম আরও এক জীবন। গাছের মধ্যে ইনি নিশ্চয়ই বুদ্ধিজীবী নাহলে পাশের আমগাছ তিনি যথেষ্ট হৃষ্টপুষ্ট অথচ হলেন ধরাশায়ী আর ইনি গেলেন বেঁচে এবং স্বমহিমায় বিরাজমান।
এদিকে একের পর একগাছ ভেঙে পড়ায় পাখিদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। মানুষের বাড়িঘর ভেঙে গেছে, এগিয়ে এসেছে সরকারি, বেসরকারী বহু সংস্থা। এসেছে রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম সংঘ, এসেছে বহু নামী, অনামী সংস্থা যাদের কেউ কেউ সেখান থেকে কিছু উপার্জনের আশায়। সরকারি টাকা যাদের কাছেপৌঁছে দেবার কথা তাদের নাম করে নিজেদের পেটভরিয়ে নেবার মতো বহু লোক। আবার অনেক লোক আছেন যাঁরা নিজেদের সাধ্যমতো সাহায্য করেছেন কোনরকম ফটোশুটের আশা না করেই। এরই মধ্যে বিভিন্ন পাখিরা তাদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া আপাতত স্থগিত রেখে ঐ ভাঙাচোরা গাছেই সমঝোতা করে নিয়েছে। এরা হতে পারে পাখী, জানিনা এদের ভাষা কিন্তু মানুষের চেয়ে এরা কোন অংশে কম? আমরা নিজেদের মানুষ বলে বড়াই করি কিন্তু আমাদের বহু কিছু শেখার আছে ভগবানের সৃষ্ট এই জীবগুলোর কাছে। 

Saturday, 28 November 2020

" ঘুঘু"

প্রায়ই শোনা যায় এই কথা, ঘুঘু দেখেছ ফাঁদ দেখনি বা তোর ভিটেমাটিতে ঘুঘু চরিয়ে ছাড়ব। আচ্ছা, ঘুঘু কি সত্যিই খুব খারাপ বা অশুভ বা তাকে কি দেখাই যায়না?  
যায় তাকে দেখা মনের ভিতর যেখানে লুকিয়ে আছে অনেক স্মৃতি,গ্রামের গোয়ালবাড়ী, ধানের গোলা যার দেয়ালটা গোবর আর মাটি দিয়ে লেপা ও নিকানো, উপরে খড়ের ছাউনি যার একটু নীচে একটা দরজা যেখান দিয়ে ধান ঢালা হয় গোলার মধ্যে আর  গোলার তলার দিকে একটা ছোট্ট গর্তর মতো রয়েছে যেখান দিয়ে ধান বের করা হয়। এদিক ওদিক ছড়িয়ে থাকা ধান খেতে আসে সেই ধূসর রঙের পায়রার মতো কিছু পাখী যার নাম ঘুঘু। ভোর বেলায় অদ্ভুত সেই মিষ্টি ডাকে ভেঙে যাওয়া ঘুম কচলানো চোখে দেখি সেই ছোট্ট সুন্দর পাখিগুলো খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে পড়ে থাকা সেই ধান গুলো। ভাবতে থাকি কেন এদের অশুভ বলে। এরা হয়তো একটু নিরিবিলি পছন্দ করে, পারেনা সহ্য করতে লোকের কোলাহল কিন্তু তাই বলে তাকে অশুভ বলে ছাপমেরে দেওয়া? আমাদের মধ্যেও তো বহু লোক আছে যারা নীরবতা ভালবাসে, দূরে সরিয়ে রাখে নিজেদের , যাঁরা চিন্তার স্রোত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে অসন্তুষ্ট হন ,তাঁরা কি খারাপ লোক? নিশ্চয়ই না। বরং, তাঁরা অনেকের চেয়ে অনেক বেশী ভাল। ভদ্রবেশী মুখোশ পরা এত শয়তান আমাদের মধ্যে মিশে আছে তাদেরথেকে এঁরা হাজারগুণ ভাল। এঁদের কোন প্রচার নেই বলে সবাই এঁদের খারাপ লোক বলেই মনে করেন কিন্তু সেটা তো সত্যি নয়। ঘুঘুদের অবস্থাও অনেকটা একই রকম। নির্বিবাদী, ভীতু এই পাখিটা লোক দেখলে ভয়েপালায়, জল খেতেও আসে সকলের শেষে পাখীদের জন্য রাখা জলের পাত্রে। গ্রামের বাড়ীতে যখন কেউ থাকেনা তখন শুরু হয় ওদের মুক্ত বিচরণ কারণ ওদের খেলায় আর কেউ বিরক্ত করতে পারবে না আর সেই কারণেই হয়তো লোকে বলে তোর ভিটেমাটিতে ঘুঘু চরিয়ে ছাড়ব। বেচারা ঘুঘু ফাঁকা জায়গায় খেলতে ভালবাসে বলে তারই পিছনে অপবাদের ছাপ।
পায়রার মতো হওয়া সত্ত্বেও পায়রার মতো আদর সে কখনোই পায়না, পায় শুধু লোকের ধিক্কার আর নিন্দার ভাগী হয়। একটু ভালবাসা সেও কি পেতে পারেনা?

Monday, 23 November 2020

ভালবাসার সন্ধানে

আজ অচিনের ছেলে মেয়েরা এসে গেছে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে। সেই কারণে মর্গ থেকে বার  করা হচ্ছে তার দেহ। আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে বিশেষ কেউই নেই, এসেছে কিছু বিশেষ বন্ধুরা এবং তার ছেলেমেয়েরা। মর্গের কিছু নিয়ম কানুন আছে যেটা শেষ করার পর এবার শ্মশান যাত্রার পালা। শব দেহ বহনকারী গাড়িও এসেগেছে, এসেছে ফুলের মালা ও আনুষঙ্গিক কিছু জিনিসপত্র।
এসেছে সুবেশ, ছেলেবেলার বন্ধু যদিও জীবদ্দশায় তার সঙ্গে শেষ কথা হয়নি। শেষ দেখা এবং চুটিয়ে আড্ডা দেওয়া সেও তো বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল, ঠিক মনে পড়েনা কত বছর হলো। শেষ আড্ডায় নন্দনের প্রাঙ্গণে বসে চা ও ফিশ ফ্রাই ধ্বংস করতে করতে উঠে এসেছে সেই ছেলেবেলার কথা, প্রথম প্রেম, দ্বিতীয় প্রেম, তৃতীয় প্রেমের কথা, আম চুরির কথা, সাইকেল নিয়ে টো টো করে শহর পরিক্রমার কথা, বৃষ্টির মধ্যে জলজমা রাস্তায় জোরে সাইকেল চালিয়ে অতি সন্তর্পনে জলবাঁচিয়ে ধুতি যাতে ভিজে না যায় লোকের গায়ে জল ছিটিয়ে চলে যাওয়া এবং তার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ মুখনিঃসৃত গালাগালি না শুনে পালিয়ে যাওয়া সব কথাই মনে পড়ছিল। হাসি কান্না মেশানো পুরোনো কথাগুলোই বারবার মনে পড়ছিল সুবেশের। এইসব কথা শেয়ার করার মতো কেউই নেই, লোকজন যাঁরা এসেছেন তাদের বেশীরভাগ লোককেই সে চেনেনা। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তো একেবারেই নৈব নৈব চ। অতএব, মনের কথা মনেই থাক, যদি সেরকম কোন পরিস্থিতি আসে তখন দেখা যাবে।
অচিন ছিল খুবই গরীব কিন্তু বাড়ি তাদের ছিল প্রাসাদোপম। এ তো সেই সোনার পাথর বাটির মতো। হ্যাঁ, ঠিক তাই। ওর দাদু ছিলেন জজ। তাঁরই তৈরী বাড়িতে ওরা ছিল কিন্তু ভাগ্য বিপর্যয়ে ওর বাবার ব্যবসায় বহু টাকা লোকসান হয় এবং গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতন ব্যাংক ফেল করায় ওরা একদম বিধ্বস্ত হয়ে যায়। কিন্তু পড়াশোনায় মোটামুটি ভাল হওয়ার সুবাদে ফুল ফ্রি স্টুডেন্টশিপ থাকার ফলে পড়াশোনা সে সম্পুর্ণ করতে পারে এবং মোটামুটি একটা ভাল চাকরীও জুটিয়ে ফেলে। কিন্তু তার আগে আরও কিছু ছোট্ট ঘটনার উল্লেখ না করলে অচিনের কথা কিছু অসম্পূর্ণই থেকে যায়। যতই ফুল ফ্রী স্টুডেন্ট হও না কেন, পয়সা না থাকলে কেউই পোঁছে না। সব জায়গায় হ্যাডা হয়ে যাওয়া। কি পাড়া, কি ক্লাব , কি স্কুল। সবজায়গায় যদি কাউকে ঐরকম হেয় হতে হয়, তবে কোন জায়গায় সামান্যতম ভালবাসার সন্ধান পেলেই তা আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। সুতরাং, কোন মেয়ে হয়তো কোন কারণে একটু হেসেছে এবং ঘটনাচক্রে ওর দিকে চোখ পড়ে গেছে, অচিন ভেবে বসলো যে ঐ মেয়েটা তার দিকে যখন তাকিয়ে হেসেছে তখন নিশ্চয়ই ঐ মেয়েটা তার প্রেমে পড়ে গেছে। যতই বোঝানো যাক না কেন ও কিছুতেই বুঝতে চাইতো না। এ এক অদ্ভুত জ্বালা। আর ওর সঙ্গে যেতে হলে কেমন যেন বোকা বোকা মনে হতো কিন্তু বন্ধুত্ব বলে কথা, অতএব যেতেই হতো। কোথায় থাকে রে, কি নাম রে, কোথায় পড়ে এতসব প্রশ্ন ওর মনে ঘুর ঘুর করতো আর সেইসব উত্তর আমাকে যোগাতে হতো। কি বিড়ম্বনা। একবার একান্ক নাটক প্রতিযোগিতা হচ্ছে, কোন একটা মেয়ে একটা মিষ্টির বাক্স পাঠিয়েছে হয়তো সবার খাবার জন্য আর ও একটা আকাট গাধা, না বুঝেই ফেরত দিয়ে দিল। মিষ্টির বাক্স ফেরত আসায় মেয়েটারও হয়ে গেল রাগ আর সেটা বোঝা গেল তার হল ছেড়ে চলে যাওয়ায়। যে বাক্সটা এনেছিল সে যখন ফিরে এসে জানাল ঘটনার কথা তখন তার কি আফশোস। আবার আমার পিছনে পরা, যেমন করেই হোক একটা সমাধান করা চাই। এটা কি হাতের মোয়া নাকি  না আমার কাছে আলাদিনের প্রদীপ রয়েছে? যাই হোক, অনেক দিনের চেষ্টায় জানা গেল তার নাম ও ঠিকানা আর তার পরে শুরু হলো আমার পিছনে পরা। কত আর বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলা যায়। আর আমার গল্পের জোরেই হোক বা মেয়েটার কিছু মজা করার জন্যই হোক অচিনের মনের রথ  তো আকাশে পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতো ছুটছে। তারপর ই ঘটলো ছন্দপতন। একদিন মেয়েটার দাদা আমার সামনেই তাকে কড়কে দিল এমনভাবে যে তার প্রেম গেল কর্পূরের মতন উবে। আমার নিজেকে কেমন যেন অপরাধী বলে মনে হচ্ছিল কিন্তু সেদিন আমি না থাকলে হয়তো ওর ওপর হাত পা চলত। এ যাত্রায় রক্ষা পেল অচিন কিন্তু খুব ভেঙে পড়েছিল বেচারা। এদিকে কলেজে এক সহপাঠিনী তার অনুরাগী হয়ে পড়েছিল কিন্তু তখনও সে পুরোনো ঘায়ের যন্ত্রণা ভুলতে পারেনি এবং তার নিট ফল তাকে পাত্তা না দেওয়া। অনেক বোঝানো হলো তাকে কিন্তু ভবি ভুলবার নয়। অতএব, সেখানেও ডাল গললনা। কিন্তু যার হৃদয় প্রেম পেতে এত উদগ্রীব সে আবার কোন দিকে ঢলে পড়বে না এটা কেমন করে হয়?  আবারও ভুল পদক্ষেপ ,আবারও ঝাড় খাওয়া। শেষ পর্যন্ত নাক কান মলে প্রতিজ্ঞা করা যে আর ভুল করবে না সে , তাতে যদি বিয়ে হয় হোক বা না হোক। পরে বিয়ে থা করে সংসারী হলো এবং যথেষ্ট ভাল ভাবেই জীবনও কাটলো। আজ সংসারের মায়া ছাড়িয়ে অচিন পাড়ি দিয়েছে অচিন দেশের পানে। জানিনা, এই দেশের অভিজ্ঞতা সে নতুন দেশে মনে রাখবে কিনা। চোখের জল দুফোঁটা গড়িয়ে পড়লো, রুমালটা বার করে সবার অলক্ষ্যে মুছে যথাসম্ভব স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে ওর ছেলেমেয়েদের কাছে বিদায় নিল সুবেশ।

Friday, 13 November 2020

সত্যের মুখোমুখি (২)

উচ্চপদে আসীন সরকারী কর্মচারী সম্বন্ধে সাধারণ জনগণের ধারণা যে ঐ ব্যক্তি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং আড়ালে আবডালে তাদের সবসময়ই মুণ্ডপাত করে। কিন্তু সবলোক ই সমান হননা এবংতাঁরা ঐ ভীড়ের মধ্যে সদাই জ্বলজ্বল করেন। সাধারণত উচ্চ পদস্থ অফিসাররা তাঁদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনেক কিছুই করিয়ে নেন যেটা সাধারণভাবে হয়না কিন্তু এঁদের মধ্যে অনেক এমন ব্যতিক্রম আছেন যাঁদের কথা মনে পড়লে শ্রদ্ধায় মাথা নত করতে হয়। 
এইরকম ই একজন মিস্টার পি দিবাকর রাও। উনি ছিলেন ভিজিয়ানগরম জেলায় অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট ডিরেক্টর। কোন ব্যাঙ্কে কত টাকা জমা রাখতে হবে সেটা উনি দেখতেন। সুতরাং, বলাই বাহুল্য যে সমস্ত ব্যাংকার রাই ওনাকে তোয়াজ করে চলবেন এবং তিনি মুখের একটা কথা খসানো মাত্রই সেটাকে তামিল করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যাবে। কিন্তু, দিবাকর বাবু অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি, কখনও কাউকে উচ্চ গ্রামে কথা বলেছেন এটা শুনিনি অন্তত আমি তাঁর কর্তৃত্বাধীন থাকাকালীন। উনি বসতেন কালেক্টরেট অফিসে এবং আমার সঙ্গে তাঁর দেখা হতো বুধবারে। ঐ দিন ছিল নন পাবলিক বিজনেস ওয়ার্কিং ডে তার মানে হলো ঐদিন পাবলিকের সঙ্গে কোনরকম লেনদেন হবেনা কিন্তু ব্যাঙ্কের কিছু ফেলে রাখা কাজকর্ম সম্পূর্ণ করতে হবে এবং কাস্টমার ও জেলা আধিকারিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। পরিবার বিশাখাপত্তনমে থাকায় আমাকে রোজ যাতায়াত করার পারমিশন দেওয়া হয়েছিল। আমি সেই কারণে বুধবার দিন ভিজিয়ানগরমে জেলা আধিকারিকদের সঙ্গে দেখা করতাম এবং এতে একটা দারুণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল সবার সঙ্গে। কোন কোন সময় ব্রাঞ্চে কাজ থাকলে ওখানে দেখা করে তারপরে যেতাম। একদিন দিবাকর বাবু আমায় দেখতে পেয়ে ওনার চেম্বারে নিয়ে গেলেন এবং নানাকথা হবার পরে উনি অত্যন্ত কুণ্ঠিতভাবে আমাকে বললেন যে উনি একটা টিভি কিনতে চান এবং আমি যদি তাঁকে লোন দিই তাহলে ওনার পক্ষে খুব ভাল হয়। আমি ওনাকে সবিনয়ে জানালাম যে ওটা আমার ক্ষমতার বাইরে তবে আমাদের রিজিওনাল ম্যানেজার এর সঙ্গে কথা বলে ওটা করিয়ে দেওয়া যাবে। আমি তেলুগু ভাষা বলতে পারতামনা বলে একদিকে যেমন কিছু অসুবিধে ছিল তেমন কিছু সুবিধাও ছিল। উনি আমাকে আর কিছু বললেন না কিন্তু আমি ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম উনি বলে ফেলেই খুব লজ্জিত। যাই হোক, আমি ওঁর কাছে অনুমতি নিয়ে ফিরে এলাম বিশাখাপত্ত্নমে রিজিওনাল অফিসে এবং সরাসরি আইয়ার সাহেবের চেম্বারে। ওঁকে আদ্যোপান্ত বললাম আর উনি আমাকে তখনই বললেন যে এইরকম ক্ষেত্রে আমি যেন হ্যাঁ বলে দিই এবং পড়ে ওঁকে জানিয়ে দিই। আমি আর কালক্ষেপ না করে সঙ্গে সঙ্গে  দিবাকর বাবুর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। পেয়েও গেলাম তাঁকে এবং বলে দিলাম যে তাঁকে দেওয়া হবে। উনি এতটা ভাবতেই পারেননি যে এইটা বলার জন্য আমি ওখান থেকে বিসাখাপত্তনম গিয়ে আবার ফিরে আসব। কিন্তু সেইদিন থেকে আমার প্রতি তাঁর বিশেষ স্নেহ এসে গেল।
পরেরদিন উনি এলেন কিন্তু অফিসের গাড়িতে নয়, এলেন বাসে কারণ ওঁর ব্যক্তিগত কাজে এসেছেন যা একজনের চরিত্র বর্ণনা করে। সমস্ত কাজ সেরে তিনি ফিরে গেলেন আমার সঙ্গেই। এরপর উনি যখনই ইনস্টলমেন্ট দিতে এসেছেন তখন ই আমার সঙ্গে দেখা হলে হাতে দিয়ে দিয়েছেন নাহলে উনি বাসে এসে আবার বাসেই ফিরে গেছেন। এমন কোনদিন হয়নি যখন নিজের কাজে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেছেন। 
আমার ব্রাঞ্চ ছিল তাটিপুরিতে যেটা ভিজিয়ানগরম থেকে শৃঙ্গভরাপুকোটা বা সংক্ষেপে এস কোটা রুটে। ভিজিয়ানগরম থেকে এসকোটা যাবার চারটে রুট ছিল- ভায়া তাটিপুড়ি, ভায়া ধর্মাভরম, ভায়া জামি ও ভায়া কোট্টাম। এর মধ্যে ধর্মাভরম ও তাটিপুড়ি যাবার রুট অনেকটাই এক কিন্তু একটা জায়গা যেখান থেকে আমার ব্রাঞ্চ আট কিলোমিটারের কিছু বেশি সেখান থেকে ধর্মাভরম হয়ে বাসটা বাঁ দিকে ঘুরে যায়। একদিন গরমকালে উনি তাটিপুড়ি যাবার বাস মিস করেছেন ইনস্টলমেন্ট জমা করার জন্য। পরের বাস দুঘন্টা পরে যেটায় এলে তাঁর অন্যান্য কাজ পন্ড হয়ে যাবে কিন্তু উনি ঐ দিনই জমা দেবেন। দেখলেন যে  ধর্মাভরম হয়ে এস কোটা যাবার বাস ছাড়ছে আর সেটাতেই উঠে পড়লেন আর নামলেন সেই আট কিলোমিটার দূরের মোড়ে। এরপর শুরু হলো হাঁটা এবং গলদঘর্ম হয়ে যখন উনি এসে পৌঁছালেন তখন আমি লাঞ্চ করার উদ্যোগ নিচ্ছি। ওঁকে দেখেই আমি নারায়নমূর্তিকে বলে ওঁর লাঞ্চের ব্যবস্থা করলাম। টাকা জমা করার পরে উনি পরের বাসে ফিরে এলেন। ওঁর কমিটমেন্ট দেখে সত্যিই অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। আজকের দিনে যখন সরকারি অফিসের অফিসার বা কর্মী সম্বন্ধে কেউ বক্রোক্তি করেন তাঁদের দিবাকর রাও এর মতো মানুষদের কথাও মনে করিয়ে দিতে হয়। কারণ, ভীড়ের মধ্যে এঁরা ও আছেন এবং এঁদের যদি প্রকৃত সম্মান না দেখানো হয় তবে প্রায় লুপ্ত এঁরা একেবারেই লুপ্ত হয়ে যাবেন। এইরকম অনেক দিবাকর রাও বা হেমন্ত মোতয়ানি আছেন যাঁদের আমরা জানিনা কিন্তু এঁরা আজও আছেন এবং এই কারণেই পৃথিবী আজ ও চলছে তার নিজস্ব গতিতে। যেভাবেই হোক এই লুপ্তপ্রায় শ্রেণীকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

Thursday, 12 November 2020

সত্যের মুখোমুখি

সত্য চিরদিনই খুব কড়া এবং তেতো। নিজের অভিজ্ঞতার ভান্ডার থেকে এইরকম কয়েকজনের নাম এই মূহুর্তে মনে পড়ছে কিন্তু সবাইকে এই স্বল্প পরিসরে স্থান দেওয়া সম্ভব নয় আর সেই কারণে আমি এক একজন করে এই সৎ লোকদের কথা বলতে চাই যারা নিজেদের কথা কখনোই বলেননি। এই প্রচারবিমুখ সৎ লোকদের নাম বদলে তাঁদের পাদপ্রদীপের আলোয় তুলে আনতে চাই।
প্রথম ব্যক্তি হচ্ছেন একজন ইনকাম ট্যাক্স কমিশনারের কথা। তিনি হচ্ছেন মিস্টার হেমন্ত কুমার মোতোয়ানি। হেমন্ত বাবু ছিলেন অত্যন্ত সৎ একজন অফিসার ছিলেন। অফিসে থাকাকালীন ঠিক সকাল নটায় অফিসে ঢুকতেন এবং সন্ধ্যে আট টার সময় বেরিয়ে যেতেন এবং তাঁকে দেখে লোক ঘড়ি মিলিয়ে নিত। অনেকদিন ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট এইধরনের অফিসার দেখেনি। একটু কড়া ধাতের মানুষ হিসেবে তাঁর পরিচিতি কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সম্বন্ধে কেউ ভুলেও সততার প্রশ্ন তুলতে পারবে না। 
সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব তাঁর নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন কিন্তু সেটা করতে গিয়ে তাঁর একমাত্র ছেলের প্রতি সেরকম নজর দিতে পারেননি এবং ভাল ছেলে হওয়া সত্বেও আজকের দিনে যেখানে বেশী ভাগ লোক শঠ এবং ধূর্ত সেখানে তাঁর ছেলে যতীন একেবারেই অচল। যতীন কিন্তু পরীক্ষা দিয়েই একটা সরকারী অফিসেই ঢুকেছিল। চাকরি করে কিন্তু সাংসারিক বুদ্ধি একেবারে নেই বললেই চলে। মাইনে পায় কিন্তু বন্ধুবান্ধবরা তার কাছে টাকা ধার নেয় আর কয়েকদিন বাদে ফেরত দেবে বলে আর দেয় না। এতই ভদ্রলোক যতীন , টাকা ফেরত না দিলেও সে জোরকরে বলতে পারেনা টাকার কথা। এমতাবস্থায়, সংসার চালাতে গিয়ে হিমসিম খাওয়া হেমন্ত বাবুকেই এই বৃদ্ধ বয়সে কাঁধে জোয়াল টানতে হয়। রিটায়ারমেন্ট এর পর যে টাকা পেয়েছিলেন সেটার বেশীরভাগ টাকা চলে গেছে তাঁর স্ত্রীর খরচ যোগাতে কিন্তু বাঁচাতে পারেননি ।বৃদ্ধ হেমন্ত বাবু তাঁর ছেলের সংসারেই একটা নাতি ও নাতনিকে নিয়ে বরোদায় একটা এক কামরার সরকারি ফ্ল্যাটে থাকেন। 
যতীনকে তার সহকর্মীরা মাথায় ঢোকাল যে ব্যাঙ্ক থেকে লোন নেওয়ার কথা এবং লোন নিয়ে শোধ না করলেও ব্যাঙ্ক কিছুদিন বাদে ভুলে ই যায় আর টাকা ফেরত না দিলেও চলে। তাঁর নিজের ঘটে বুদ্ধি না থাকলেও তার বাবাকে  জিজ্ঞেস করতে পারতো কিন্তু তার না করে সে বন্ধুদের প্ররোচনায় লোন নিল এবং যথারীতি শোধ না করায় ব্যাঙ্ক থেকে নোটিশ পাঠানো হলো। প্রথম নোটিশ পাবার পরে হেমন্ত বাবু ভয়ানক উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন এবং ব্যাঙ্কে ফোন করলেন।ম্যানেজারের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলেন যে তাঁর ছেলে দুলাখ টাকা ধার নিয়ে আর শোধ করেননি এবং সেই টাকা বেড়ে বেড়ে প্রায় আড়াই লাখ ছুঁই ছুঁই। ভদ্রলোক তো আকাশ থেকে পড়লেন। এত টাকা নিয়েছে অথচ সংসার তাঁর পেনশনের টাকায় চলে। এ এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। তিনি যে রকম মানুষ তাতে কোনরকম চিঠি চাপাটি পেলেই অস্থির হয়ে পড়বেন এটাই খুব স্বাভাবিক। তিনি ফিল্ড অফিসারকে একটু সময় দেবার কথা বললেন। ছোট্ট একটা বারান্দা যেখানে বাইরের লোককে বসানো হয়, মাঝে একটা ছোট টেবিলের চারপাশে চেয়ার পাতা-- দেখেই বোঝা যায় ওটা একটা মাল্টিরুম এবং তার পরে একটা বেডরুম। বাইরে এক চিলতে উঠোন এবং এক পাশে রান্নাঘর আর অন্যপাশে পায়খানা ও বাথরুম। এইটাই হেমন্ত মোতয়ানি সাহেবের রাজপ্রাসাদ। প্রথমে কোন ম্যানেজার ই বিশ্বাস করতে চাইবে না যে একজন ইনকাম ট্যাক্স কমিশনারের বাড়ি এরকম হতে পারে। কিন্তু এটাই ছিল বাস্তব। ফিল্ড অফিসারের কথা এককথায় ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে ম্যানেজার নিজে না দেখে কোন মতামত প্রকাশ করবেন না বলেও জানিয়ে দিলেন। 
এক রবিবার সেই ম্যানেজার ফিল্ড অফিসারকে নিয়ে হাজির হলেন বরোদায়। গাড়ি বেশ খানিকটা দূরে রেখে আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে থাকলেন হেমন্ত মোতয়ানি সাহেবের বাড়ি। তখন দুপুর বেলা। তাঁকে এইসময় ডিস্টার্ব করার ইচ্ছা হচ্ছিল না কিন্তু তিনি সম্যক দেখতে চাইছিলেন যে বাস্তবটা কি। দরজায় বেল টিপতেই  মোতয়ানি সাহেব চোখ কচলাতে কচলাতে দরজা খুলে দিলেন এবং ফিল্ড অফিসার মনোজকে দেখেই চিনতে পারলেন এবং তাড়াতাড়ি চাদর ও বালিশটা উঠিয়ে লাগোয়া মাল্টিরুমে রেখে তাঁদের অভ্যর্থনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মনোজ যে এক বিন্দু বাড়িয়ে বলেনি সেই কথাটাও উনি ভাল করেই বুঝতে পারলেন। এইদিকে হেমন্ত বাবু তাঁর ছেলে যতীনকে ও ডাকলেন। কথায় কথায় জানা গেল যে ওকে যে দুই বন্ধু ব্যাঙ্কে নিয়ে গিয়েছিল তারা টাকা পাওয়ার পরেই টাকাটা তার কাছ থেকে নিয়ে নেয় এবং আজ দেব কাল দেব করে টাকাটা আর ফেরত দেয়না।কিন্তু এই সত্যি কথাটা সে বাড়িতে এসে বলতে পারেনি এবং পরবর্তী ঘটনাটা সবারই জানা হয়ে গেছে। মিস্টার মোতয়ানি একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক, অতবড় পোস্টে কাজ করেছেন সেটা তাঁর আচার ব্যবহারে সুস্পষ্ট কিন্তু বাড়ির আসবাবপত্রে নিশ্চয়ই নয়। সব ঘটনা জেনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল ম্যানেজারের কিন্তু চাকরি এমনই জিনিস তেতো কথাটা বলতেই হয় গলায় যথা সম্ভব মধু ঝরিয়ে। উনি জিজ্ঞেস করলেন যে কিছু ছাড় দেওয়া সম্ভব কিনা। একটা অ্যাপলিকেশন দিতে বলে ম্যানেজার উঠে পড়লেন। তিনি জানালেন যে তাঁর একাউন্টে যে টাকা আছে সেটা যথেষ্ট নয় কিন্তু টা সত্বেও তিনি ফ্রিজ, টিভি এবং অন্যান্য আসবাবপত্র বিক্রি করে ব্যাংকের টাকা শোধ করে দেবেন। লজ্জায় ম্যানেজার এবং তাঁর ফিল্ড অফিসারের মাথা হেঁট হয়ে গেল। ছেলের অনবধানতায় যে ক্ষতি হয়ে গেছে তাতে তাঁর সংসারে যে কি প্রভাব ফেলতে পারে সেদিন তাঁরা বুঝতে পারলেন। যিনি একজন ইনকাম ট্যাক্স কমিশনারের পদ থেকে রিটায়ার করেছেন তাঁর তো কোন অসুবিধে হবার কথা নয় কিন্তু সেই মানুষটাকে ঐ অবস্থায় দেখে যে কোন মানুষের মন খারাপ হবারই কথা।
মিস্টার হেমন্ত মোতয়ানি তাঁর ছেলের বয়ানে একটা অ্যাপলিকেশন পাঠালেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁর একটা ব্যক্তিগত চিঠিও পাঠালেন যেখানে তিনি টিভি বিক্রি করে কত টাকা পাওয়া যাবে এবং অন্যান্য আসবাবপত্র বিক্রি করে কত টাকা পাওয়া যাবে এবং তাঁর ব্যাংক একাউন্টে যে টাকা আছে সেটা দিয়েও তাঁর ছেলের লোনের টাকা পুরো মিটবে না। বাকি টাকা তাঁর পেনশন থেকে মাসে মাসে তিনি দিয়ে দেবেন। চিঠি পড়ে এই কথাটাই মনে পড়ে যায় যে সিংহ বুড়ো হয়ে গেলেও সে সিংহ ই থাকে। যতীন ও হেমন্ত বাবুর চিঠি এত ই মর্মস্পর্শী ছিল যে জেনারেল ম্যানেজার সুদ পুরোই মকুব করে দিয়েছিলেন।
এর মধ্যেই মনোজের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় যতীনের অফিসের বড় সাহেবের নজরে আসে ঘটনাটি এবং উনি তাদের ধমকানোর ফলে তারা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে এবং টাকাটা তারা ফেরত দেয় আর হেমন্ত মোতয়ানি সাহেবকে আর ফ্রিজ বা টিভি বিক্রি করতে হয়নি। সৎ লোকদের ভগবান বোধহয় এইভাবেই রক্ষা করেন।