এসেছে সুবেশ, ছেলেবেলার বন্ধু যদিও জীবদ্দশায় তার সঙ্গে শেষ কথা হয়নি। শেষ দেখা এবং চুটিয়ে আড্ডা দেওয়া সেও তো বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল, ঠিক মনে পড়েনা কত বছর হলো। শেষ আড্ডায় নন্দনের প্রাঙ্গণে বসে চা ও ফিশ ফ্রাই ধ্বংস করতে করতে উঠে এসেছে সেই ছেলেবেলার কথা, প্রথম প্রেম, দ্বিতীয় প্রেম, তৃতীয় প্রেমের কথা, আম চুরির কথা, সাইকেল নিয়ে টো টো করে শহর পরিক্রমার কথা, বৃষ্টির মধ্যে জলজমা রাস্তায় জোরে সাইকেল চালিয়ে অতি সন্তর্পনে জলবাঁচিয়ে ধুতি যাতে ভিজে না যায় লোকের গায়ে জল ছিটিয়ে চলে যাওয়া এবং তার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ মুখনিঃসৃত গালাগালি না শুনে পালিয়ে যাওয়া সব কথাই মনে পড়ছিল। হাসি কান্না মেশানো পুরোনো কথাগুলোই বারবার মনে পড়ছিল সুবেশের। এইসব কথা শেয়ার করার মতো কেউই নেই, লোকজন যাঁরা এসেছেন তাদের বেশীরভাগ লোককেই সে চেনেনা। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তো একেবারেই নৈব নৈব চ। অতএব, মনের কথা মনেই থাক, যদি সেরকম কোন পরিস্থিতি আসে তখন দেখা যাবে।
অচিন ছিল খুবই গরীব কিন্তু বাড়ি তাদের ছিল প্রাসাদোপম। এ তো সেই সোনার পাথর বাটির মতো। হ্যাঁ, ঠিক তাই। ওর দাদু ছিলেন জজ। তাঁরই তৈরী বাড়িতে ওরা ছিল কিন্তু ভাগ্য বিপর্যয়ে ওর বাবার ব্যবসায় বহু টাকা লোকসান হয় এবং গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতন ব্যাংক ফেল করায় ওরা একদম বিধ্বস্ত হয়ে যায়। কিন্তু পড়াশোনায় মোটামুটি ভাল হওয়ার সুবাদে ফুল ফ্রি স্টুডেন্টশিপ থাকার ফলে পড়াশোনা সে সম্পুর্ণ করতে পারে এবং মোটামুটি একটা ভাল চাকরীও জুটিয়ে ফেলে। কিন্তু তার আগে আরও কিছু ছোট্ট ঘটনার উল্লেখ না করলে অচিনের কথা কিছু অসম্পূর্ণই থেকে যায়। যতই ফুল ফ্রী স্টুডেন্ট হও না কেন, পয়সা না থাকলে কেউই পোঁছে না। সব জায়গায় হ্যাডা হয়ে যাওয়া। কি পাড়া, কি ক্লাব , কি স্কুল। সবজায়গায় যদি কাউকে ঐরকম হেয় হতে হয়, তবে কোন জায়গায় সামান্যতম ভালবাসার সন্ধান পেলেই তা আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। সুতরাং, কোন মেয়ে হয়তো কোন কারণে একটু হেসেছে এবং ঘটনাচক্রে ওর দিকে চোখ পড়ে গেছে, অচিন ভেবে বসলো যে ঐ মেয়েটা তার দিকে যখন তাকিয়ে হেসেছে তখন নিশ্চয়ই ঐ মেয়েটা তার প্রেমে পড়ে গেছে। যতই বোঝানো যাক না কেন ও কিছুতেই বুঝতে চাইতো না। এ এক অদ্ভুত জ্বালা। আর ওর সঙ্গে যেতে হলে কেমন যেন বোকা বোকা মনে হতো কিন্তু বন্ধুত্ব বলে কথা, অতএব যেতেই হতো। কোথায় থাকে রে, কি নাম রে, কোথায় পড়ে এতসব প্রশ্ন ওর মনে ঘুর ঘুর করতো আর সেইসব উত্তর আমাকে যোগাতে হতো। কি বিড়ম্বনা। একবার একান্ক নাটক প্রতিযোগিতা হচ্ছে, কোন একটা মেয়ে একটা মিষ্টির বাক্স পাঠিয়েছে হয়তো সবার খাবার জন্য আর ও একটা আকাট গাধা, না বুঝেই ফেরত দিয়ে দিল। মিষ্টির বাক্স ফেরত আসায় মেয়েটারও হয়ে গেল রাগ আর সেটা বোঝা গেল তার হল ছেড়ে চলে যাওয়ায়। যে বাক্সটা এনেছিল সে যখন ফিরে এসে জানাল ঘটনার কথা তখন তার কি আফশোস। আবার আমার পিছনে পরা, যেমন করেই হোক একটা সমাধান করা চাই। এটা কি হাতের মোয়া নাকি না আমার কাছে আলাদিনের প্রদীপ রয়েছে? যাই হোক, অনেক দিনের চেষ্টায় জানা গেল তার নাম ও ঠিকানা আর তার পরে শুরু হলো আমার পিছনে পরা। কত আর বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলা যায়। আর আমার গল্পের জোরেই হোক বা মেয়েটার কিছু মজা করার জন্যই হোক অচিনের মনের রথ তো আকাশে পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতো ছুটছে। তারপর ই ঘটলো ছন্দপতন। একদিন মেয়েটার দাদা আমার সামনেই তাকে কড়কে দিল এমনভাবে যে তার প্রেম গেল কর্পূরের মতন উবে। আমার নিজেকে কেমন যেন অপরাধী বলে মনে হচ্ছিল কিন্তু সেদিন আমি না থাকলে হয়তো ওর ওপর হাত পা চলত। এ যাত্রায় রক্ষা পেল অচিন কিন্তু খুব ভেঙে পড়েছিল বেচারা। এদিকে কলেজে এক সহপাঠিনী তার অনুরাগী হয়ে পড়েছিল কিন্তু তখনও সে পুরোনো ঘায়ের যন্ত্রণা ভুলতে পারেনি এবং তার নিট ফল তাকে পাত্তা না দেওয়া। অনেক বোঝানো হলো তাকে কিন্তু ভবি ভুলবার নয়। অতএব, সেখানেও ডাল গললনা। কিন্তু যার হৃদয় প্রেম পেতে এত উদগ্রীব সে আবার কোন দিকে ঢলে পড়বে না এটা কেমন করে হয়? আবারও ভুল পদক্ষেপ ,আবারও ঝাড় খাওয়া। শেষ পর্যন্ত নাক কান মলে প্রতিজ্ঞা করা যে আর ভুল করবে না সে , তাতে যদি বিয়ে হয় হোক বা না হোক। পরে বিয়ে থা করে সংসারী হলো এবং যথেষ্ট ভাল ভাবেই জীবনও কাটলো। আজ সংসারের মায়া ছাড়িয়ে অচিন পাড়ি দিয়েছে অচিন দেশের পানে। জানিনা, এই দেশের অভিজ্ঞতা সে নতুন দেশে মনে রাখবে কিনা। চোখের জল দুফোঁটা গড়িয়ে পড়লো, রুমালটা বার করে সবার অলক্ষ্যে মুছে যথাসম্ভব স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে ওর ছেলেমেয়েদের কাছে বিদায় নিল সুবেশ।
No comments:
Post a Comment