Friday, 13 November 2020

সত্যের মুখোমুখি (২)

উচ্চপদে আসীন সরকারী কর্মচারী সম্বন্ধে সাধারণ জনগণের ধারণা যে ঐ ব্যক্তি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং আড়ালে আবডালে তাদের সবসময়ই মুণ্ডপাত করে। কিন্তু সবলোক ই সমান হননা এবংতাঁরা ঐ ভীড়ের মধ্যে সদাই জ্বলজ্বল করেন। সাধারণত উচ্চ পদস্থ অফিসাররা তাঁদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনেক কিছুই করিয়ে নেন যেটা সাধারণভাবে হয়না কিন্তু এঁদের মধ্যে অনেক এমন ব্যতিক্রম আছেন যাঁদের কথা মনে পড়লে শ্রদ্ধায় মাথা নত করতে হয়। 
এইরকম ই একজন মিস্টার পি দিবাকর রাও। উনি ছিলেন ভিজিয়ানগরম জেলায় অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট ডিরেক্টর। কোন ব্যাঙ্কে কত টাকা জমা রাখতে হবে সেটা উনি দেখতেন। সুতরাং, বলাই বাহুল্য যে সমস্ত ব্যাংকার রাই ওনাকে তোয়াজ করে চলবেন এবং তিনি মুখের একটা কথা খসানো মাত্রই সেটাকে তামিল করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যাবে। কিন্তু, দিবাকর বাবু অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি, কখনও কাউকে উচ্চ গ্রামে কথা বলেছেন এটা শুনিনি অন্তত আমি তাঁর কর্তৃত্বাধীন থাকাকালীন। উনি বসতেন কালেক্টরেট অফিসে এবং আমার সঙ্গে তাঁর দেখা হতো বুধবারে। ঐ দিন ছিল নন পাবলিক বিজনেস ওয়ার্কিং ডে তার মানে হলো ঐদিন পাবলিকের সঙ্গে কোনরকম লেনদেন হবেনা কিন্তু ব্যাঙ্কের কিছু ফেলে রাখা কাজকর্ম সম্পূর্ণ করতে হবে এবং কাস্টমার ও জেলা আধিকারিকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। পরিবার বিশাখাপত্তনমে থাকায় আমাকে রোজ যাতায়াত করার পারমিশন দেওয়া হয়েছিল। আমি সেই কারণে বুধবার দিন ভিজিয়ানগরমে জেলা আধিকারিকদের সঙ্গে দেখা করতাম এবং এতে একটা দারুণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল সবার সঙ্গে। কোন কোন সময় ব্রাঞ্চে কাজ থাকলে ওখানে দেখা করে তারপরে যেতাম। একদিন দিবাকর বাবু আমায় দেখতে পেয়ে ওনার চেম্বারে নিয়ে গেলেন এবং নানাকথা হবার পরে উনি অত্যন্ত কুণ্ঠিতভাবে আমাকে বললেন যে উনি একটা টিভি কিনতে চান এবং আমি যদি তাঁকে লোন দিই তাহলে ওনার পক্ষে খুব ভাল হয়। আমি ওনাকে সবিনয়ে জানালাম যে ওটা আমার ক্ষমতার বাইরে তবে আমাদের রিজিওনাল ম্যানেজার এর সঙ্গে কথা বলে ওটা করিয়ে দেওয়া যাবে। আমি তেলুগু ভাষা বলতে পারতামনা বলে একদিকে যেমন কিছু অসুবিধে ছিল তেমন কিছু সুবিধাও ছিল। উনি আমাকে আর কিছু বললেন না কিন্তু আমি ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম উনি বলে ফেলেই খুব লজ্জিত। যাই হোক, আমি ওঁর কাছে অনুমতি নিয়ে ফিরে এলাম বিশাখাপত্ত্নমে রিজিওনাল অফিসে এবং সরাসরি আইয়ার সাহেবের চেম্বারে। ওঁকে আদ্যোপান্ত বললাম আর উনি আমাকে তখনই বললেন যে এইরকম ক্ষেত্রে আমি যেন হ্যাঁ বলে দিই এবং পড়ে ওঁকে জানিয়ে দিই। আমি আর কালক্ষেপ না করে সঙ্গে সঙ্গে  দিবাকর বাবুর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। পেয়েও গেলাম তাঁকে এবং বলে দিলাম যে তাঁকে দেওয়া হবে। উনি এতটা ভাবতেই পারেননি যে এইটা বলার জন্য আমি ওখান থেকে বিসাখাপত্তনম গিয়ে আবার ফিরে আসব। কিন্তু সেইদিন থেকে আমার প্রতি তাঁর বিশেষ স্নেহ এসে গেল।
পরেরদিন উনি এলেন কিন্তু অফিসের গাড়িতে নয়, এলেন বাসে কারণ ওঁর ব্যক্তিগত কাজে এসেছেন যা একজনের চরিত্র বর্ণনা করে। সমস্ত কাজ সেরে তিনি ফিরে গেলেন আমার সঙ্গেই। এরপর উনি যখনই ইনস্টলমেন্ট দিতে এসেছেন তখন ই আমার সঙ্গে দেখা হলে হাতে দিয়ে দিয়েছেন নাহলে উনি বাসে এসে আবার বাসেই ফিরে গেছেন। এমন কোনদিন হয়নি যখন নিজের কাজে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেছেন। 
আমার ব্রাঞ্চ ছিল তাটিপুরিতে যেটা ভিজিয়ানগরম থেকে শৃঙ্গভরাপুকোটা বা সংক্ষেপে এস কোটা রুটে। ভিজিয়ানগরম থেকে এসকোটা যাবার চারটে রুট ছিল- ভায়া তাটিপুড়ি, ভায়া ধর্মাভরম, ভায়া জামি ও ভায়া কোট্টাম। এর মধ্যে ধর্মাভরম ও তাটিপুড়ি যাবার রুট অনেকটাই এক কিন্তু একটা জায়গা যেখান থেকে আমার ব্রাঞ্চ আট কিলোমিটারের কিছু বেশি সেখান থেকে ধর্মাভরম হয়ে বাসটা বাঁ দিকে ঘুরে যায়। একদিন গরমকালে উনি তাটিপুড়ি যাবার বাস মিস করেছেন ইনস্টলমেন্ট জমা করার জন্য। পরের বাস দুঘন্টা পরে যেটায় এলে তাঁর অন্যান্য কাজ পন্ড হয়ে যাবে কিন্তু উনি ঐ দিনই জমা দেবেন। দেখলেন যে  ধর্মাভরম হয়ে এস কোটা যাবার বাস ছাড়ছে আর সেটাতেই উঠে পড়লেন আর নামলেন সেই আট কিলোমিটার দূরের মোড়ে। এরপর শুরু হলো হাঁটা এবং গলদঘর্ম হয়ে যখন উনি এসে পৌঁছালেন তখন আমি লাঞ্চ করার উদ্যোগ নিচ্ছি। ওঁকে দেখেই আমি নারায়নমূর্তিকে বলে ওঁর লাঞ্চের ব্যবস্থা করলাম। টাকা জমা করার পরে উনি পরের বাসে ফিরে এলেন। ওঁর কমিটমেন্ট দেখে সত্যিই অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। আজকের দিনে যখন সরকারি অফিসের অফিসার বা কর্মী সম্বন্ধে কেউ বক্রোক্তি করেন তাঁদের দিবাকর রাও এর মতো মানুষদের কথাও মনে করিয়ে দিতে হয়। কারণ, ভীড়ের মধ্যে এঁরা ও আছেন এবং এঁদের যদি প্রকৃত সম্মান না দেখানো হয় তবে প্রায় লুপ্ত এঁরা একেবারেই লুপ্ত হয়ে যাবেন। এইরকম অনেক দিবাকর রাও বা হেমন্ত মোতয়ানি আছেন যাঁদের আমরা জানিনা কিন্তু এঁরা আজও আছেন এবং এই কারণেই পৃথিবী আজ ও চলছে তার নিজস্ব গতিতে। যেভাবেই হোক এই লুপ্তপ্রায় শ্রেণীকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

No comments:

Post a Comment