Sunday, 24 January 2021

খ্যাপামি সংকলন

ক্ষ্যাপা নানা ধরণের হয় এবং তাদের খ্যাপামিও। মাঝে মাঝে যখন ঐ কথাগুলো মনে পড়ে তখন নিজের মনেই হাসি আসে কিন্তু একটা কথা আছে না, যে আনন্দ সবসময় অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে হয় কিন্তু দুঃখটা অন্তরেই চেপে রাখা ভাল। এবার আসা যাক এক এক করে সেই ক্ষ্যাপা খেপির উপাখ্যান।
 প্রথমেই আসি সুরোধনি মাসির কথায়। মাসি লোকের বাড়িতে ফাই ফরমাশ খেটে দিন গুজরান করতো। বেচারার ছিল অস্টিও আর্থ্রাইটিস কিন্তু চেহারাটা ছিল বেশ ভারিক্কি এবং সঙ্গে সঙ্গে মেজাজটাও। কিন্তু কারো সাতে পাঁচে থাকত না বেচারা তবুও ছেলে ছোকরারা তার পিছনে পড়ত তার হেলে দুলে চলার কারণে। তাতে ওর কি দোষ- কিছুই না। ওটাতো ওর পায়ের অসুখের জন্য। যেহেতু ও হেলে দুলে চলতো ছেলেরা ওকে বলতো হেলকা ভারী। মাসি কানে একটু কম শুনতে বলে তবু খানিকটা রক্ষা কিন্তু যেই মাত্র ও বুঝতে পারত যে ওকে ঐ বলে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে তখনই শুরু, হতো অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ। ইঁটক্যাল( ইঁট+পাটকেল) দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেব। তাতেও ওর আশ মিটত না ,গজগজ করতে করতে নিঃসৃত হতো ক্ষুরধার সব গালাগালি যা লেখা যায়না। আর যত তার তোড়জোড় ততটাই মজাদার হতো চ্যাঙড়া ছেলেগুলোর কাছে। একদিন মায়ের কাছে কেঁদে কেটে একসা," বৌদি, ছোটনকে একটু বলে ঐ বদমাইশ ছেলেগুলোকে কড়কে দিতে বল না গো।"  তা যাই হোক, বললেই কি শোনে, তবুও খানিকটা কমলো কিন্তু চ্যাংরাগুলোর আনন্দ একেবারে বন্ধ হলো মাসীর ইহজগত ছেড়ে চলে যাওয়ায়।

আরও একজনের কথায় এবার আসা যাক। ভজন কাকার বয়স কিছুতেই বাড়তে চায়না মেয়েদের মতন। কি কাকা, কত বয়স হলো? ঐ হবে পঞ্চাশ বাহান্ন। আঁতকে ওঠার মতন অবস্থা। চোখে ভাল দেখেনা, কানে ভাল শোনে না, গাল গেছে ভেঙ্গে তবুও চুলে কলপ লাগানো চাই বয়সকে ধরে রাখতে। ওঁকে দাদু বললেও খুব একটা ভুল হয়না। কিন্তু উনি শুনতে চান দাদা। দাদা বললে খুব খুশি, বলবে চল চা খেয়ে আসি। কাকা শুনলে মোটামুটি নিমরাজি কিন্তু দাদু ডাকলেই শুরু হবে অনর্গল গালাগালি। দাদু বলবি কেন রে, তোরা কি পঞ্চাশ বছরের লোককে দাদু বলিস? কি যে মানসিকতা কে জানে? এই ভজন কাকার জন্য একদিন প্রচণ্ড উত্তম মধ্যম জুটেছিল ভাগ্যে। সেদিনছিল মহানবমী। সন্ধ্যে বেলায় পাড়ার ছেলেরা বিভিন্ন গ্রুপে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিল। তাদেরই কেউ একজন  ভজন কাকার থুতনিতে হাত দিয়ে দাদু বলে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আমাদের বাড়িতে পাড়ার দুর্গাপূজায় নবমীর দিন দরিদ্র নর নারায়ণ সেবা হতো এবং ধুনুচি নাচের কম্পিটিশন হতো। সুতরাং, হঠাৎ করে ঠাকুর দেখতে যাওয়াটা আমাদের পক্ষেসহজ ছিলনা। এরই ফাঁকে একটু আশ পাশের ঠাকুর দেখবো বলে আরও দুজনকে নিয়েবেরিয়েছি। ভজন কাকাকে কেউ যে ঐ ভাবে হেনস্থা করেগেছে সে সম্বন্ধে বিন্দুবিসর্গ ধারণাও ছিলনা। হঠাৎই কাকা আমার দিকে তেড়ে এলো আর গালাগালি দিয়ে শুরু করে একটা আধলা ইঁট হাতে ধরে আমার মাথা ফাটাবে বলে। কোন কিছু না বুঝেই কাকার ঐ রণমূর্তি দেখে আমার রিফ্লেক্স কাজে লাগিয়ে পিছন দিক থেকে জাপটে ধরলাম আর কাকা আমার হাতে ইঁট দিয়ে মেরে ক্ষতবিক্ষত করে দিল। রক্ত ঝরছে কিন্তু আমি ছাড়ছি না। ছেড়ে দিলেই উনি আমার মাথা নির্ঘাত ফাটিয়ে দিতেন। কিন্তু ইতিমধ্যে আমার দুই সহযোগী তাঁর হাত থেকে ইঁট ছাড়িয়ে নিয়েছে আর আমিও দে দৌড়। একটা ডিসপেনসারি তে গিয়ে হাতে ওষুধ লাগিয়ে ইনজেকশন নিয়ে মণ্ডপে ফিরে এসেছি। এর কিছুক্ষণ পরে আমার বাবা আসছিলেন ঐ রাস্তা দিয়ে এবং শুনলেন একতরফা কথা আর লজ্জায় মাথা নীচু করে চলে এলেন। বাড়ি এসেই আমার খোঁজ করে জানতে পারলেন যে আমি মণ্ডপে আছি। অন্য ছেলেরা আমাকে বলল যে বাবা আমাকে খুঁজছেন এবং পালানোর জন্য বলল কিন্তু আমি তো কোন দোষ করিনি সুতরাং পালানোর প্রশ্নই নেই। আমি বেরিয়ে আসামাত্রই বাবা আমাকে পেটাতে শুরু করলেন কিন্তু আমি কোন প্রতিবাদ করিনি। মারের চোটে আমার গায়ে হাত পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা। কাঁদতে গেলেও ব্যথালাগছে। সমস্ত লোক খাওয়া হয়ে গেলে পাড়ার লোকদের বসার কথা। কিন্তু আমার খাওয়ার মতন অবস্থা নেই। ইতিমধ্যে কারো কাছে বাবা জানতে পেরেছেন যে আসল ঘটনা কি। তখন বাবার কি অনুশোচনা। দাদা বলল,"বাবা তোকে ডাকছেন।" আমি ধীরে ধীরে তাঁর কাছে আসলে তিনি বললেন," তুমি আমাকে আসল ঘটনা বলনি কেন?" আমি বললাম আপনি তো কিছু জিজ্ঞেস করেন নি, সেই কারণে ই কিছু বলিনি। সেটা আরও কষ্টদায়ক। যাই হোক, বাবার কাছে আমার ঐ প্রথম এবং ঐ শেষ মার খাওয়া। উনি একটা কথা জেনে খুশি হয়েছিলেন যে হাজার কঠিন অবস্থাতেও আমি মিথ্যে কথা বলব না। আর ঐদিকে ভজন কাকাও পরে আসল ঘটনা জেনে খুবই অনুতপ্ত হয়েছিলেন। একদিন আমার কাছে এসে আস্তে আস্তে বললেন ," কিছু মনে করিস না রে ,আমি তোকে ভুল বুঝেছিলাম।" আমি কি আর বলব। পরে একটা সংস্কৃত শ্লোক পড়েছিলাম যেটা জীবনের সর্বক্ষেত্রে কাজে লাগে। " ক্ষণে তুষ্ট, ক্ষণে রুষ্ট, রুষ্ট তুষ্ট ক্ষণে ক্ষণে,
অব্যবস্থিত চিত্তস্য প্রসাদপি ভয়ঙ্কর।" হঠাৎ রেগে গিয়ে কিছু অঘটন ঘটিয়ে পরে তার জন্য পরিতাপ করার কোন মানে হয়না।
এক বিশেষ বন্ধুর কাছে শোনা আরও একটা ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। ভদ্রলোকের মুখে এমন একটা জরুল ছিল যে কারণে তাঁকে খানিকটা বাঁদরের মতো লাগতো। কিছু বিচ্ছু ছেলে কাছে গিয়ে হুপ করে আওয়াজ করলেই নিঃসৃত হতো চোখা চোখা বাণরূপী গালিগালাজ। কোন কোন সময় তিনি ইঁট পাথরও ছুঁড়তেন দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে। ঐ দিকে পাথর ছোঁড়েন তো এদিক থেকে আওয়াজ আসে হুপ। কোনদিক সামলাবেন ভদ্রলোক? এরকম হাজারো খ্যাপামির কাহিনী লিপিবদ্ধ করা যায়। এর উপায় কি? কোন মনস্তত্ত্ববিদ না হয়েও এই কথাটা বলা যায় যে  এই ধরণর মন্তব্যকে উপেক্ষা করা । কজনকে পাথর ছুঁড়ে মারা যায়? আর দুর্ভাগ্যক্রমে যদি ঐ পাথর লেগে মারাত্মক কিছু ঘটে যায় তার দায় কিন্তু খুবসহজ নয়।
ভজন কাকা ঐ ঘটনার কিছুদিন পরে কোথায় চলে গেলেন কেউ জানতেই পারলো না। হয়তো আমাকে মারার ঘটনায় উনি খুবই বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন এবং ওঁর বাড়ি  ভাড়ায় থাকার জন্য ওঁর চলে যেতে বিশেষ একটা অসুবিধে হয়নি কিন্তু আমাদের শহরে আর কোনদিন ভজন কাকাকে দেখতে পাইনি।

Wednesday, 13 January 2021

মকর সংক্রান্তি

আজকের এই সুন্দর দিনে মনে পড়ে অনেক কথা। পিঠে পুলির কথা মনে পড়লেই জিভে ও চোখে জল চলে আসে। মা, জেঠিমা দের ভোর বেলায় উঠে গঙ্গা স্নান করে এসেই শুরু হয়ে যেত পিঠে পুলির তোড়জোড়। একটা উৎসব উৎসব মেজাজ।কত রকমের পিঠে তাঁরা যে করতেন তার নামধাম মনে রাখা বেশ কঠিন কারণ বহুদিন এত রকমের পিঠে একসঙ্গে খাবার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। সেদ্ধ পিঠে, রস পিঠে, ভাজা পিঠে, পুলি পিঠে এবং তার সঙ্গে খেজুরের গুড়ের পায়েস। ওঃ, জিভে জল আসবেনা আর এগুলো ভাবলে চোখে জল আসবে না? যাই হোক, এর মধ্যেই যতটা সম্ভব ততটা করতে হবে এবং বাকিটা মনে মনে ভেবে রাখতে হবে। মাসিমার করা মালপোয়া, আহা যেন অমৃত। একটু বোস বাবা, গরম গরম ভাজছি , একটু খেয়ে যা বাবা। কি আর্তি তাঁদের কথা বার্তায়, সেটাকে অগ্রাহ্য করা কারও সাধ্য নেই। হাজার পেট ভরা থাকলেও না খেয়ে ওঠার ক্ষমতা ছিলনা। উঠোনের ঐ পাশে রান্নাঘরের বারান্দায় বসে  ছোট্ট উনুনে কড়াইয়ে ঘি ঢেলে মাসিমা মালপোয়া ভেজেই রসে ডুবিয়ে এনে দিচ্ছেন আর এদিকে দাওয়ায় বসে একটার পর একটা মালপোয়া খেয়েই চলেছি। ভাবতেই অবাক লাগে যে কত খেতে পারতাম। মা, জেঠিমা, মাসিমা দের এত আনন্দের সঙ্গে লোককে খাওয়ানোর মধ্যে যে এত তৃপ্তি, সেটা কিছুতেই ভুলতে পারিনা। আজ কেউ ভাল করে খেতেও পারেনা আর সেই আন্তরিকভাবে খাওয়ানো যেন উবে গেছে। এখন বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরাও ক্যালরি মেপে খায়, মিষ্টি বেশিরভাগ বাচ্চা খেতেই চায়না। আর আমাদের সময় শেষে মিষ্টি না হলে মনে হতো কিছুই যেন খাইনি।
সন্ধ্যে বেলার কথা আগেই বলা হয়ে গেল। তাহলে সকালবেলায় কি হলো?  মা, জেঠিমা গঙ্গা স্নানের পর পূজোয় বসলো, তার পর শুরু হয়ে গেল পিঠে করার ধূম। চালের গুঁড়ো ভিজিয়ে একটু নেড়ে নেওয়ার পর নারকেল কুঁড়ে নতুন গুড়ে পাক করে পিঠের মতন তৈরী করে জলে সেদ্ধ করে দিলেই হয়ে গেল সেদ্ধ পিঠে। গুড়ে পাক করা নারকেলের জায়গায় চাঁছি দিলে হবে অন্য রকমের স্বাদ। জলে সেদ্ধ করার জায়গায় ঘন দুধে মিষ্টি দিয়ে( সাধারণত নতুন গুড়ে) ফোটালে হয়ে যাবে পুলি পিঠে কিন্তু সেক্ষেত্রে  পিঠে গুলো হবে ছোট ছোট এবং তার পুর হবে চাঁছির। রস পিঠের জন্য হবে মিষ্টি আলু সেদ্ধ করে পিঠের আকারে ঘিয়ে ভেজে আগে থেকে তৈরী করা ঘন রসে দিয়ে দেওয়া। তারপর খুব সন্তর্পণে একটা একটা করে উঠিয়ে প্লেটে দেওয়া এবং তা মুখে দেওয়া মাত্র মিলিয়ে যাওয়া। সেটা নাহলে কিন্তু রস পিঠের মজা নেওয়া যাবেনা। আর ভাজা পিঠে, সেতো হবে মুগের ডালের। এক নাগাড়ে মিষ্টি খেতে খেতে মুখ মেরে গেলে, দুএকটা ঝাল ঝাল ভাজা মুগের ডালের পিঠে খেলে জমবে ব্যাপারটা আরও ভাল। রাতের খাওয়া যদি ভাজা পিঠে ও পুলি পিঠে এবং পায়েসের মাধ্যমে হয় তাহলে ক্ষতি কি?
এতো গেল বাংলার পৌষ সংক্রান্তি। আমেদাবাদ শহরে থাকাকালীন কিছু বাঙালি পরিবারের কাছাকাছি এসেছিলাম। বাঙালি পরিবার মানে পিঠে পুলি তো আছেই যদিও এত রকমের পিঠে করা সম্ভব নয় কিন্তু বাড়তি আনন্দ ঘুড়ি ওড়ানো। লাহিড়ি দার বাড়িতে দুপুর বেলার নেমন্তন্ন যদিও সকাল থেকেই উপস্থিত থাকতেই হবে। ওদের সনির্বন্ধ অনুরোধ যে সকাল সকাল স্নান সেরেই তাঁদের বাড়িতে উপস্থিত হতে হবে। যাই হোক, পৌঁছতে একটু বেলা হয়ে যাওয়ায় ব্রেকফাস্ট টা এড়িয়ে যাওয়া গেল কিন্তু দুপুর বেলায় সেই আক্রমণ এড়ানো গেলনা। এরপর ওদের ছাদে উঠে ঘুড়ি ওড়ানোর পালা। বাপরে বাপ। আকাশটা যেন ছেয়ে গেছে ঘুড়িতে। রং বেরংয়ের ঘুড়ি। বাড়ির ছেলে মেয়েরাতো বটেই, বাবা মায়েরা পর্যন্ত ঘুড়ি ওড়ানো তে সামিল হয়েছে। একটা একটা ঘুড়ি কাটছে আর ল্যাতরাতে ল্যাতরাতে দূরে কোন ছাদে বা গাছে গিয়ে আটকাচ্ছে। আর কি উল্লাস। আমাদের বাড়িতে ঘুড়ি ওড়ানো ছিল একদম নিষেধ কারণ ন্যাড়া ছাদ। হুঁশ নাশা হয়ে ছুটতে ছুটতে কত ছেলে যে প্রাণ হারিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। সুতরাং প্রাক যৌবনের স্বাদ অস্তাচলে যাওয়া যৌবনে উপভোগ করা , অনেকটাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতন। আনাড়ির ঘুড়ি ওড়ানো খুব মুশকিল। কত রকমের মান্জা, কোনটা তেলতেলে আবার কোনটা ভাতের ফ্যানে কাঁচের গুঁড়ো দিয়ে তৈরী। সেটাতে নাকি টেনে খেলতে হয় আর তেলতেলে মাঞ্জাতে ঢিলে দিয়ে খেলতে হয়। কত রকমের জ্ঞান অর্জন করা এখনও বাকি কে জানে? সন্ধ্যে বেলায় সাবরমতীর তীরে নানান ধরনের ঘুড়ির প্রর্দশনী। বিশালাকৃতির ঘুড়িগুলো নানান সাজে রাখা আছে ,কোনটা রাক্ষস, আবার কোনটা সূর্য। এ বলে আমাকে দেখ ,ও বলে আমায় দেখ। কিন্তু ঘুড়ির এরকম প্রর্দশনী সত্যিই অদেখাই ছিল।
অন্ধ্র প্রদেশের পোঙ্গল সেটাও কিন্তু অনেকটাই বাংলার মতো পেলব। পূর্বের ছোঁয়াই বেশি কারণ ভারতের পূর্ব প্রান্তে তো। সেখানেও পায়েস বা পরমান্নম কিন্তু ঘরে ঘরে। আমাদের সরুচাকলি মোটামুটি ভাবে ওদের দোসার মতো। কিন্তু সরুচাকলিতে যেমন  একটু ঝাল ঝাল হয় দোসাতে সেটা হয়না। কিন্তু উৎসবে মুখরিত হয়ে ওঠে সমস্ত প্রদেশ। 
যদিও পাঞ্জাবের লোঢ়ি বা আসামের বিহু দেখার সুযোগ ঘটেনি কিন্তু এই ফসল ওঠার আনন্দ সমস্ত ভারতবর্ষ ই উপভোগ করে। কিন্তু ঘুরে ফিরে  আসে সেই পিঠে পুলি, মা, কাকিমা, মাসিমাদের ভালবাসা মেশানো।

Saturday, 9 January 2021

পৌষল্যা

আগে পৌষ মাসে পিকনিক করাকে বলা হতো পৌষল্যা। এখন যেমন বারোমাস ই এখানে সেখানে পিকনিক করার ঘনঘটা, আগে সাধারণত পৌষমাসে বেশ ঠাণ্ডার আমেজে বনভোজন করার মজাটা মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। এর মানে কিন্তু এই নয় যে গরমকালে বা বছরের অন্যসময় যে পিকনিকগুলো হচ্ছে তাতে মজা নেই।  কাঠফাটা রোদে কোন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রিসর্টে গিয়ে, সুইমিং পুলে সাঁতার কেটে হৈচৈ করে খানাপিনা করে কতলোক ই তো পিকনিকের আনন্দ উপভোগ করছে কিন্তু কজনের এই সাধ্য আছে এত পয়সা খরচ করার। সুতরাং, সাধারণ মানুষের পিকনিকের আনন্দ উপভোগ করার উপযুক্ত সময় শীতকাল। এইসময় খেয়েদেয়ে ঘুরে বেড়িয়ে মজা লোটে বেশি ভাগ সাধারণ লোক। 
বনভোজন বা পিকনিক ছিল প্রকৃতপক্ষেই বনে ভোজন। কয়েকদিন আগে জায়গা দেখে আসা হতো, কাছাকাছি জলের জন্য কোন পুকুর বা টিউবওয়েল আছে কিনা এবং যতজন যাবে তাদের বসার মতো উপযুক্ত জায়গা আছে কিনা । তখন কারো কাছে এত পারমিশন নেওয়ার দরকার পড়তো না যদি না সেই জায়গাটা কারও ব্যক্তিগত জায়গা না হতো।
কয়েকটা জায়গা দেখার পর ঠিক করা হতো কোন জায়গায় যাওয়া হবে। বিষ্টুপুর কালীবাড়ির কাছে ছিল একটা প্রকান্ড বিল যেখান থেকে রান্নাবান্নার জন্য প্রয়োজনীয় জল এবং খাবার জলের চাহিদা  কালীবাড়ির টিউবওয়েল থেকে নেওয়া হতো। তখন কালীবাড়ির আশেপাশে বেশ জঙ্গল ছিল এবং বাড়ি ঘর ছিল বেশ দূরে দূরে। পাড়ার ছেলেদের পৌষল্যার জন্য আদর্শ জায়গা কারণ ঐ পিকনিকে কুড়ি পঁচিশের বেশি লোক হতো না। কিন্তু ক্লাবের পিকনিকে লোক হতো মোটামুটি শতখানেক। সুতরাং, তার জন্য আদর্শ জায়গা মাড়োয়ারি বাগান। ঐরকম নাম কেন ছিল সেটা কোনদিনই জানা যায়নি এবং এর মালিক কোন মাড়োয়ারি ছিল সেটাও জানতে পারা যায়নি। তখন তো বয়স খুবই কম কিন্তু ক্লাবের ডিসিপ্লিন ছিল খুব ভালো। শীতের সকালে বেলা আটটার মধ্যে ক্লাবে পৌঁছে যাওয়া এবং তার পর লাইন করে  মাইল দুয়েক হেঁটে মাড়োয়ারি বাগানে যাওয়া। ছিল বোধহয় কোন রাজারাজড়ার বাড়ি। পঞ্চানন তলা ছাড়িয়ে  জঙ্গলের মাঝে সরু রাস্তা দিয়ে বেশ খানিকটা হাঁটার পর বিরাট একটা কারুকার্য করা লোহার গেট। সেটা পেরোলেই চারিদিকে প্রচুর আম, কাঁঠাল, জাম, নারকোল,সফেদা,পেয়ারা ও কুলগাছ। ছিল বিরাট বিরাট আরও কত গাছ যার নামধাম জানতাম না। কত বিঘা জায়গা বলা মুশকিল কিন্তু ছিল বড় বড় দুটো পুকুর এবং বাঁধানো ঘাট যা থেকে বোঝা যায় বাড়ির মালিকের ঐশ্বর্য এবং তাঁর রুচিবোধ। পুকুরের পাড়ে একটা বিশাল দোতলা বাড়ি যেটা আজকালকার পাঁচ ছয়তলা বাড়ির উচ্চতার সমান। বাড়ির কাছে যেতেই একটা ছমছমে ভাব, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতো। কিন্তু ক্লাবের দাদাদের একদম হুঁশিয়ারি ছিল যে ঐ বাড়ির কাছে বা পুকুর পাড়ে কেউ যেন না যায়। কিন্তু আমরা তাঁদের চোখ এড়িয়ে যেতাম কি আছে দেখতে। একটা কথা আছে না , যে ওখানে যাবেনা বললে সেইখানেই যেতে ইচ্ছে করে আর এচোড়ে পাকা ছেলে হলে তো কথাই নেই, সে ঐখানেই যাবে।
ফুরর করে বেজে উঠল বাঁশি, প্রকাশ বলে উঠল, "এই, ভুটান দার বাঁশি বেজেছে, চল তাড়াতাড়ি নাহলে ভুটান দার বেতের ঘা খেতে হবে।" সবাই তাড়াতাড়ি এসে পড়লাম কিন্তু দেখি আমাদের আগেই মোটামুটি সবাই এসে গেছে। ভাগ্য ভাল, সেদিন ভুটান দার মেজাজটা বেশ ভালই ছিল, তাই বেতের বাড়ি খেলাম না কিন্তু একটা ঠান্ডা দৃষ্টি আমাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত মাপ নিয়ে নিল। বোঝা গেল এবার ছাড় পেয়েছ ভাল কথা কিন্তু ফের যদি দেরী হয় তাহলে কিন্তু সরু লিকলিকে বেত টা আমাদের পিঠে নির্ঘাত পড়বে। যাই হোক, লাইনে দাঁড়িয়ে রুটি, কলা ও ডিম সেদ্ধ নিয়ে দৌড় মারলাম। রান্নার তদারকি করছেন রঘু দা আর ওদিকে দুলু দা , দোদা দা, মোহন দা, শক্তি দা,চঞ্চল দা, রবিদা,বিশ্বনাথ দা, মদন দা, নগেন দারা বসে গল্পগুজব করছেন আর মধ্যমণি হয়ে একটার পর একটা মজার গল্প বলে চলেছেন মনা দা আর সবার পেট ফাটার জোগাড়। পল্টু দা, ছোকুদা, গোপালদা, মিলিদা, দিলীপ দারা সবাই দ্বিতীয় সার্কেলে বসে মনাদার গল্প শুনছে। সুদীপ, অজিত, অভয়, রানা, জয়ন্ত রা ক্রিকেট ব্যাট ও বল এনেছে আর ওদের সঙ্গেই ভিড়ে আছে  আরও অনেকে। কিন্তু বিচ্ছুদের মধ‌্যে আমরা পড়ি আমরা কোথায় সফেদা বা কুল পাওয়া যায় তাই দেখতে ব্যস্ত। আরও একটা জিনিস যে ঐ বাড়িতে কে থাকে সেটা জানার চেষ্টা। বাড়ির সদর দরজায় দেখি এক পেল্লাই সাইজের তালা। এদিকে ওদিকে ঘুরতে ঘুরতে দেখি একটা জানলা ভাঙা কিন্তু সেখান দিয়ে ঢোকার সাহস আমাদের কারো হলো না। আমরা একটা পেয়ারা গাছে অনেক পেয়ারা দেখে তাতেই মজে গেলাম। হঠাৎ একটা গোঙানির আওয়াজ পেয়ে পেয়ারা গাছ থেকে দুরদার লাফ দিয়ে পালাতে লাগলাম। হঠাৎ দেখি, খন্চা নেই আমাদের মধ্যে। ওর ভাই কুশু ছিল আমাদের সঙ্গে। ও বললো, এই দাদাকে দেখেছিস? নাতো। খোঁজ খোঁজ। গিয়ে দেখি ওর মুখ দিয়ে গ্যাজলা বেরোচ্ছে আর হাত পা সব শক্ত হয়ে গেছে। পুকুর থেকে জল এনে ওর চোখে মুখে ছেটানোর পরে ওর জ্ঞান ফিরে এল। একটু পরে আস্তে আস্তে ও সুস্থ হয়ে ওঠার পর আমরা ফিরে এলাম। কিন্তু কি করে জানিনা, ভুটান দার কানে চলে গেছে খবরটা। ফুরর করে বেজে উঠল বাঁশি আর আমরাও চোরের মতন মুখ করে কোনরকমে হাজির হলাম। এদিকে খাবার তৈরি। খাবার আগে আর বকাবকি করলেন না। অ্যাই বাচ্চারা, চঞ্চল দার গলার আওয়াজ, তোমরা সবাই লাইন দিয়ে বসে পড়। খাওয়া দাওয়া শেষে হাত ধুতে যাওয়ার সময় মাথায় পড়ল একটা ঠান্ডা অথচ শক্ত হাতের চাঁটি। দেখি ভুটান দা। ভাবছিস, আমি কিছু টের পাইনি?  বাড়ি যাওয়ার পরে টের পাবি। বুঝলাম, মিথ্যে কথা বলে কোন লাভ নেই। বললাম আর কোনদিন করবনা। আপনি বাড়িতে যেন বলবেন না তাহলে আর ভবিষ্যতে বাড়ি থেকে কোনদিন আসতে দেবেনা। ঠিক আছে, মনে থাকে যেন।
আজ এতদিন বাদে কতজন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, ক্লাব কিন্তু রয়েছে কিন্তু মাড়োয়ারি বাগান আছে কিনা জানিনা । হয়তো কোন প্রমোটারের কবলে চলে গেছে এবং কোন হোটেল হয়তো হয়ে গেছে।

কে বলে লকডাউন অতি বিষম ভয়ঙ্কর ?

"কে বলে লকডাউন অতি বিষম ভয়ঙ্কর
যাহার স্নেহের ছায়ায় বৃদ্ধি বংশধর"
প্রমিতবাবুর মন খুব খারাপ এই লকডাউনের কারণে আর পাঁচটা লোকের মতোই। ছেলেমেয়েরা সবাই বাইরে থাকে, বিয়ে থা দিয়েছেন বেশ ঘটা করেই। এখন একদম ঝাড়া হাত-পা। যখন মন হবে তখনই স্যুটকেশ গুছিয়ে বেরিয়ে পরা। কিন্তু হতচ্ছাড়া এই  করোনা আর সেই সুবাদে আসা লকডাউন । কাঁহাতক ভাল লাগে দুজন দুজনের দিকে চেয়ে থাকতে। চল্লিশ বছর আগে এক মূহুর্তের জন্য চোখের আড়াল হলেই উশখুশানি শুরু হতো আর এতদিন বাদে বেশী সময় পাশাপাশি থাকলেই খটাখটি। কারণ নেই কোন, হয়তো টিভিতে সিরিয়াল চলছে, দেবলীনা মন্তব্য করলেন কোন নায়িকাকে সমর্থন করে যাকে প্রমিতবাবু একেবারেই সহ্য করতে পারেন না আর এই বিশেষ নায়িকা পর্দায় আসামাত্র শুরু হয় তাঁর গজগজানি। অতএব, একটু বাদেই শুরু হয় মন্তব্য,
"ন্যাকামি যত্ত সব। বাড়িতে বাপমায়ের সঙ্গে করিস এইসব ব্যবহার?" ফোঁস করে উঠলেন দেবলীনা । তোমরা সব পুরুষ মানুষ গুলোই এক গোত্রের, বৌরা এসে বাড়ির কাজের লোকের মতন থাকলে তোমাদের পরম শান্তি। প্রমিত প্রমাদ গণে মানে মানে সটকে পড়ল। সিরিয়ালের গল্প নিয়ে যদি নিজের সংসারে অশান্তি ঘটতে থাকে তাহলে পয়সা খরচ করে টিভিই বা কেনা কেন বা কেবলের টাকা ই বা দেওয়া কেন? এই সহজ ব্যাপারটা কেউ বুঝতে চাইবে না আর এই করে কত সংসারে তুমুল ঘটনা ঘটে যায় তার ইয়ত্তা নেই।কিন্তু বদভ্যাস প্রমিতেরও আছে। সিরিয়াল চলাকালীন ফুট কাটা ই বা কেন? রোজ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, না আর নয় আর রোজই ভুলে যায় আর রোজই কিছু না কিছু নিয়ে ধুন্ধুমার কান্ড। এইসব ছোটখাট টুক টাক ঘটনা নিয়ে প্রমিতের দিন যায় কেটে। এদিকে সিরিয়াল যাঁরা বানান তাঁদেরও বলিহারি। মনেপ্রাণে যৌথ পরিবারের গুণগান অথচ থাকবে সব ছোট ছোট সংসার । স্বামী, স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বাইরের কেউ একেবারে নৈব নৈব চ। বাবা, মা বা ভাইবোনকে নিয়ে সবাই গুছিয়ে রয়েছে এমন কটা পরিবারে দেখা যায়? থাকার সময় আপনি, কোপনি আর দেখানোর সময় দাদা, বৌদি, ননদ, ননদাই, মেজ জা, ছোট জা যত্তোসব ন্যাকামির একশেষ। আসলে আমরা সবাই সবকিছুরই ভাল টা চাই কিন্তু ঐটা বজায় রাখতে গেলে যে পরিমাণ ধকল সহ্য করতে হয় সেটা কেউই নিতে রাজী নয়। সুতরাং যা অবশ্যম্ভাবী তাই হয়। যৌথ পরিবার টিকিয়ে রাখতে গেলে যে পরিমাণ স্বার্থত্যাগ করা দরকার তার বিন্দুমাত্র আমাদের নেই আর সেই কারণে পান থেকে চুন খসলেই তুলকালাম আর শুরু হয়ে যাবে দলবাজি।
যৌথ পরিবার থাকলে ঐ দুচোখ দুচোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো না, একাধিক দুই চোখ নাক সম্বলিত  মানুষ এক ই ছাদের তলায় দেখা যেত আর লোকেও এত অধীর অস্থির হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াত না। প্রমিতের মাস্ক লাগানো মুখ দেখলেই ছোটবেলায় দেখা গরুর গাড়িতে জোতা গরুগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। গরু যাতে মাটিতে মুখ নামিয়ে কিছু না খায় আর সোজা গাড়িটাকে টানে সেই কারণে ওদের মুখে একটা ঠুলি পরিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু অবস্থার চাপে আমরা এখন সেই গরুগুলোর মতন হয়ে গেছি। অবশ্য একেবারে যে সবটাই খারাপ সেটা নয়। মুখের মধ্যে অনাবদ্ধ  দাঁত বা নাকের ওপর দিয়ে ট্রেন চলে যাওয়া নাক মাস্কের আড়ালেই চলে যায় আর লোকের কাছে মাথা হেঁট করার কোন কারণ ই নেই। সুতরাং, করোনা,লকডাউনের একটা ভাল দিক চোখে পড়লো। এই লকডাউনের জন্য বন্ধ হয়েছে ট্রেন ও অন্য যানবাহনাদি  এবং তার ফলে পরিবেশ ও অনেক দূষণ মুক্ত হয়েছে। অনেক ভাল কাজ করেছে করোনা কিন্তু অহেতুক লোকের প্রাণ নিয়ে ছেলে খেলা করাটা খুবই অন্যায়ের ব্যাপার। লোকে একটু ভদ্রসভ্য হয়েছে। ঘরে বৌ থাকা সত্ত্বেও ইতিউতি ছোঁক ছোঁক করা বন্ধ হয়েছে। এক্কেবারে বড় দিদিমনির সামনে থাকা। বাছাধন যাবে কোথায়? যাওয়ার কোন জায়গা নেই, কেউ বাড়িতে ঢুকতেই দেবেনা।সুতরাং বাপু, ভাল ছেলের মতো চুপচাপ চোখের সামনে থাকো আর বেশি ত্যান্ডাই ম্যান্ডাই করলে রাতে খাওয়া বন্ধ।অতএব, তিষ্ঠ। লকডাউনে অফিস যাওয়া বন্ধ। প্রথমদিকে অফিসের মালিকরা কি করবে ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছিল না। কাজ না করিয়ে পয়সা দিতে গেলে গায়ে বড় কচকচ করে। অথচ উপায় ও নেই। আর এদিকে লোকজন কাজ না করে করে লিখতেই ভুলতে বসেছে। এমনিতেই কম্পিউটার আসায় হাতে লেখার চল তো প্রায় শেষ, বানানের তো মা বাপ নেই ,এর উপরে করোনা আসায় লেখাজোখার দফারফা। রাস্তা বেরোল, কর কাজ বাড়ি বসে, তবেই টাকা পাবে। অফিসে এলেই বাথরুম পায়খানার কথা মনে পড়ে যেত কাজ যাতে না করতে হয়, এখন দিনরাত যতবার খুশি যাও কুছ পরোয়া নেহি। বৌয়ের সামনে বেশিবার গেলেই গাঁদাল পাতার ঝোল দিয়ে ভাত ছাড়া আর কিছুই জুটবেনা। বাছাধনেরা, বড্ড জ্বালান জ্বালিয়েছ, এবার নিজেরাই জ্বলে মরো। আরও একটা কথা মনে পড়ে গেল। কত ছেলে মেয়েরা কাজের চাপে নিজেদের সংসারের কথা ভাবতেই পারছিল না। বাড়িতে একসঙ্গে থাকার সুবাদে বাড়িটা একটু ঝলমলে হয়েছে, নতুন অতিথির কথা ভাবার সুযোগ এসেছে আবার কারও ঘরে আসা নতুন চাঁদ বাবা ও মায়ের সাহচর্যে খিলখিল করে বেড়ে উঠেছে যেটা অন্যসময় সম্ভব হতো না। এখনও কি করোনা বা লকডাউনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ফাঁসি দেওয়া যায়? মি লর্ড, আপনাকে একটু সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করতে অনুরোধ করছি।

Saturday, 2 January 2021

এই তো সেদিন

মনে হয় যেন পেরিয়ে এলেম অন্তবিহীন পথ কিন্তু না, পথের শেষ এখনও হয়নি ,বাকি রয়ে গেছে এখনো অনেক পথ। অপেক্ষা করে আছে অনেক বিপদসঙ্কুল রাস্তা, চলেছি আমি একা, নির্জন চারপাশ। বুক করছে ঢিপ ঢিপ, চারিদিকে ঝিঁঝিঁ পোকা গান গেয়ে চলেছে একটানা। রাস্তায় যদিও আছে ইলেকট্রিক আলো কিন্তু সেটা এতই টিমটিমে কয়েক হাত দূরের জিনিসও ভাল করে ঠাউরান যায় না। এদিকে ওদিকে মাঝে মাঝে হুক্কা হুয়া হুক্কা হুয়া ডাক ভেসে আসছে, বন তুলসীর ঝোপ ঝাড় থেকে জোড়া জোড়া জ্বলন্ত চোখ দেখা যাচ্ছে, ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাবার জোগাড়। না, এটা কোন গ্রামের কথা নয়, কলকাতারই উপকন্ঠে একটা বর্ধিষ্ণু মফস্বলের কথা। প্রচণ্ড ঝড় জলে এখানে ওখানে গাছের ডাল ভেঙে পড়েছে, ছিঁড়ে গেছে ইলেকট্রিকের তার, সাপ্লাই অফিস থেকে এখনও সাপ্লাই বন্ধ করেনি। সুতরাং, বোঝাই যাচ্ছেনা যে কোন তার কারেন্ট বহন করছে আর কোনটা নয়। গানের ক্লাস শেষ করে ফিরছে উপমন্যু। আজ মাষ্টারমশাই অনেক দেরী করে ফিরেছেন এবং বাড়ি ফিরেই এক কাপ চা খেয়ে ও এক খিলি পান মুখে দিয়ে বসলেন তাঁর প্রিয় ছাত্র উপমন্যুকে নিয়ে। জানলা দরজা বন্ধ আর মাস্টারমশাই দারুণ মেজাজে ধরেছেন রাগ মালকোষ। আশপাশে যে ঝড়ের প্রলয় চলছে কোন হুঁশ নেই বীরেন বাবুর। কিন্তু তাঁর ছাত্রটি তো তার মাষ্টারমশাই এর পর্যায়ে আসেনি , সুতরাং সেতো ঐ উচ্চতায় উঠতে পারছে না, কেবলই মনে হচ্ছে যে বাড়ি কি করে ফিরবে। ঝড় জলের আওয়াজ তার কানে বেশ ভালভাবেই ঢুকছে কিন্তু যে মেজাজে স্যার আলাপ করে তান বিস্তার করে চলেছেন সেখানে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটানো গর্হিত অপরাধ হবে। একবার মেন রাস্তায় পড়লে চার পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা হাঁটতেও সে পিছপা হবে না। কিন্তু অনেক রাত্রি হয়ে যাবে পৌঁছতে পিসিমার বাড়ি। কিন্তু জিটি রোডে পড়তেই তো এখনো অনেকটা রাস্তাই বাকি।আর তাছাড়া অন্ধকার রাস্তায় ভাঙা গাছের ডাল বা ছিঁড়ে যাওয়া ইলেকট্রিকের তার সামলে হাঁটা বেশ কঠিন ব্যাপার।

হঠাৎই একটা আওয়াজ ভেসে এলো," শুনছেন, একটু দাঁড়ান। সামনে তার ছিঁড়ে পড়ে আছে, অন্ধকার রাস্তা, একটু ছোঁয়া লাগলেই সর্বনাশ। আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন সেখানেই থাকুন, আমি টর্চ নিয়ে আসছি।"  আচমকা ডাকে ঐ খানেই স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে পড়ল সে। এক মাঝবয়সী মাতৃ স্থানীয় মহিলার গলার আওয়াজ। উপেক্ষা করতে পারলনা সে। ভদ্রমহিলা এলেন এবং টর্চের আলোয় সে দেখল যে একটু দূরেই ছিঁড়ে যাওয়া তার সাপের মতো ছোবল তুলে আছে। যে গতিতে হাঁটছিল সে একটু এগোলেই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে যেত। ভগবান বোধ হয় এইভাবেই মানুষের রূপে আসেন এবং মানুষকে বাঁচান। ধন্যবাদ দিলে তাঁকে ছোট করা হবে কিন্তু ঐ স্বল্পালোকেই চোখের ভাষায় তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বিদায় নিল সে। উনি বেশ শর্টকাট রাস্তায় পৌঁছে দিলেন তাকে। বুকের ভেতর চাপা ভাবটা অনেকটাই হালকা হয়ে গেছে, এখন বাসের অপেক্ষায় থাকা। বালিখাল থেকে একটা গাড়ির হেডলাইট দেখা গেল কিন্তু বাসের ভেতর টা অন্ধকার, সুতরাং রুটের বাস নয় কিংবা হলেও ট্রিপ শেষ করে গ্যারাজ করছে। প্রাণপণে হাত নাড়িয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকল সে ড্রাইভারের। ভাগ্য ভাল বাস ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল।" কোথায় যাবেন? এটা তো সালকিয়াতে গ্যারাজ করতে যাচ্ছে।" " একটু লিলুয়ায় বড় গেটের কাছে নামিয়ে দেবেন?" উঠে পড়ুন বলায় উপমন্যু তো একলাফে বাসে উঠে পড়ল। শেষ বাস চলে গেছে। ভগবানকে ধন্যবাদ দিতে দিতে পৌঁছে গেল সে বড় গেটের কাছে। ওখান থেকে একশো মিটার হাঁটলেই পিসেমসায়ের বাংলো। সবাই শুয়ে পড়েছে, কেবল পিসিমাই ঘরবার করছে। ঘড়িতে তখন রাত্রি সাড়ে এগারটা।
খাওয়া দাওয়া শেষে পিসিমা জিজ্ঞেস করল, " হ্যাঁরে বাবা, আজ এত দেরী কেন হলো?" সব কথা খুলে বলায় পিসিমা দুহাত তুলে কপালে ঠেকাল। ভগবান রক্ষে করেছেন বেটা। যা, শুয়ে পড় এখন। দেখতে দেখতে ছেচল্লিশ বছর কেটে গেছে কিন্তু যেন মনে হয়, এই তো সেদিন।