প্রথমেই আসি সুরোধনি মাসির কথায়। মাসি লোকের বাড়িতে ফাই ফরমাশ খেটে দিন গুজরান করতো। বেচারার ছিল অস্টিও আর্থ্রাইটিস কিন্তু চেহারাটা ছিল বেশ ভারিক্কি এবং সঙ্গে সঙ্গে মেজাজটাও। কিন্তু কারো সাতে পাঁচে থাকত না বেচারা তবুও ছেলে ছোকরারা তার পিছনে পড়ত তার হেলে দুলে চলার কারণে। তাতে ওর কি দোষ- কিছুই না। ওটাতো ওর পায়ের অসুখের জন্য। যেহেতু ও হেলে দুলে চলতো ছেলেরা ওকে বলতো হেলকা ভারী। মাসি কানে একটু কম শুনতে বলে তবু খানিকটা রক্ষা কিন্তু যেই মাত্র ও বুঝতে পারত যে ওকে ঐ বলে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে তখনই শুরু, হতো অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ। ইঁটক্যাল( ইঁট+পাটকেল) দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেব। তাতেও ওর আশ মিটত না ,গজগজ করতে করতে নিঃসৃত হতো ক্ষুরধার সব গালাগালি যা লেখা যায়না। আর যত তার তোড়জোড় ততটাই মজাদার হতো চ্যাঙড়া ছেলেগুলোর কাছে। একদিন মায়ের কাছে কেঁদে কেটে একসা," বৌদি, ছোটনকে একটু বলে ঐ বদমাইশ ছেলেগুলোকে কড়কে দিতে বল না গো।" তা যাই হোক, বললেই কি শোনে, তবুও খানিকটা কমলো কিন্তু চ্যাংরাগুলোর আনন্দ একেবারে বন্ধ হলো মাসীর ইহজগত ছেড়ে চলে যাওয়ায়।
আরও একজনের কথায় এবার আসা যাক। ভজন কাকার বয়স কিছুতেই বাড়তে চায়না মেয়েদের মতন। কি কাকা, কত বয়স হলো? ঐ হবে পঞ্চাশ বাহান্ন। আঁতকে ওঠার মতন অবস্থা। চোখে ভাল দেখেনা, কানে ভাল শোনে না, গাল গেছে ভেঙ্গে তবুও চুলে কলপ লাগানো চাই বয়সকে ধরে রাখতে। ওঁকে দাদু বললেও খুব একটা ভুল হয়না। কিন্তু উনি শুনতে চান দাদা। দাদা বললে খুব খুশি, বলবে চল চা খেয়ে আসি। কাকা শুনলে মোটামুটি নিমরাজি কিন্তু দাদু ডাকলেই শুরু হবে অনর্গল গালাগালি। দাদু বলবি কেন রে, তোরা কি পঞ্চাশ বছরের লোককে দাদু বলিস? কি যে মানসিকতা কে জানে? এই ভজন কাকার জন্য একদিন প্রচণ্ড উত্তম মধ্যম জুটেছিল ভাগ্যে। সেদিনছিল মহানবমী। সন্ধ্যে বেলায় পাড়ার ছেলেরা বিভিন্ন গ্রুপে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিল। তাদেরই কেউ একজন ভজন কাকার থুতনিতে হাত দিয়ে দাদু বলে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আমাদের বাড়িতে পাড়ার দুর্গাপূজায় নবমীর দিন দরিদ্র নর নারায়ণ সেবা হতো এবং ধুনুচি নাচের কম্পিটিশন হতো। সুতরাং, হঠাৎ করে ঠাকুর দেখতে যাওয়াটা আমাদের পক্ষেসহজ ছিলনা। এরই ফাঁকে একটু আশ পাশের ঠাকুর দেখবো বলে আরও দুজনকে নিয়েবেরিয়েছি। ভজন কাকাকে কেউ যে ঐ ভাবে হেনস্থা করেগেছে সে সম্বন্ধে বিন্দুবিসর্গ ধারণাও ছিলনা। হঠাৎই কাকা আমার দিকে তেড়ে এলো আর গালাগালি দিয়ে শুরু করে একটা আধলা ইঁট হাতে ধরে আমার মাথা ফাটাবে বলে। কোন কিছু না বুঝেই কাকার ঐ রণমূর্তি দেখে আমার রিফ্লেক্স কাজে লাগিয়ে পিছন দিক থেকে জাপটে ধরলাম আর কাকা আমার হাতে ইঁট দিয়ে মেরে ক্ষতবিক্ষত করে দিল। রক্ত ঝরছে কিন্তু আমি ছাড়ছি না। ছেড়ে দিলেই উনি আমার মাথা নির্ঘাত ফাটিয়ে দিতেন। কিন্তু ইতিমধ্যে আমার দুই সহযোগী তাঁর হাত থেকে ইঁট ছাড়িয়ে নিয়েছে আর আমিও দে দৌড়। একটা ডিসপেনসারি তে গিয়ে হাতে ওষুধ লাগিয়ে ইনজেকশন নিয়ে মণ্ডপে ফিরে এসেছি। এর কিছুক্ষণ পরে আমার বাবা আসছিলেন ঐ রাস্তা দিয়ে এবং শুনলেন একতরফা কথা আর লজ্জায় মাথা নীচু করে চলে এলেন। বাড়ি এসেই আমার খোঁজ করে জানতে পারলেন যে আমি মণ্ডপে আছি। অন্য ছেলেরা আমাকে বলল যে বাবা আমাকে খুঁজছেন এবং পালানোর জন্য বলল কিন্তু আমি তো কোন দোষ করিনি সুতরাং পালানোর প্রশ্নই নেই। আমি বেরিয়ে আসামাত্রই বাবা আমাকে পেটাতে শুরু করলেন কিন্তু আমি কোন প্রতিবাদ করিনি। মারের চোটে আমার গায়ে হাত পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা। কাঁদতে গেলেও ব্যথালাগছে। সমস্ত লোক খাওয়া হয়ে গেলে পাড়ার লোকদের বসার কথা। কিন্তু আমার খাওয়ার মতন অবস্থা নেই। ইতিমধ্যে কারো কাছে বাবা জানতে পেরেছেন যে আসল ঘটনা কি। তখন বাবার কি অনুশোচনা। দাদা বলল,"বাবা তোকে ডাকছেন।" আমি ধীরে ধীরে তাঁর কাছে আসলে তিনি বললেন," তুমি আমাকে আসল ঘটনা বলনি কেন?" আমি বললাম আপনি তো কিছু জিজ্ঞেস করেন নি, সেই কারণে ই কিছু বলিনি। সেটা আরও কষ্টদায়ক। যাই হোক, বাবার কাছে আমার ঐ প্রথম এবং ঐ শেষ মার খাওয়া। উনি একটা কথা জেনে খুশি হয়েছিলেন যে হাজার কঠিন অবস্থাতেও আমি মিথ্যে কথা বলব না। আর ঐদিকে ভজন কাকাও পরে আসল ঘটনা জেনে খুবই অনুতপ্ত হয়েছিলেন। একদিন আমার কাছে এসে আস্তে আস্তে বললেন ," কিছু মনে করিস না রে ,আমি তোকে ভুল বুঝেছিলাম।" আমি কি আর বলব। পরে একটা সংস্কৃত শ্লোক পড়েছিলাম যেটা জীবনের সর্বক্ষেত্রে কাজে লাগে। " ক্ষণে তুষ্ট, ক্ষণে রুষ্ট, রুষ্ট তুষ্ট ক্ষণে ক্ষণে,
অব্যবস্থিত চিত্তস্য প্রসাদপি ভয়ঙ্কর।" হঠাৎ রেগে গিয়ে কিছু অঘটন ঘটিয়ে পরে তার জন্য পরিতাপ করার কোন মানে হয়না।
এক বিশেষ বন্ধুর কাছে শোনা আরও একটা ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। ভদ্রলোকের মুখে এমন একটা জরুল ছিল যে কারণে তাঁকে খানিকটা বাঁদরের মতো লাগতো। কিছু বিচ্ছু ছেলে কাছে গিয়ে হুপ করে আওয়াজ করলেই নিঃসৃত হতো চোখা চোখা বাণরূপী গালিগালাজ। কোন কোন সময় তিনি ইঁট পাথরও ছুঁড়তেন দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে। ঐ দিকে পাথর ছোঁড়েন তো এদিক থেকে আওয়াজ আসে হুপ। কোনদিক সামলাবেন ভদ্রলোক? এরকম হাজারো খ্যাপামির কাহিনী লিপিবদ্ধ করা যায়। এর উপায় কি? কোন মনস্তত্ত্ববিদ না হয়েও এই কথাটা বলা যায় যে এই ধরণর মন্তব্যকে উপেক্ষা করা । কজনকে পাথর ছুঁড়ে মারা যায়? আর দুর্ভাগ্যক্রমে যদি ঐ পাথর লেগে মারাত্মক কিছু ঘটে যায় তার দায় কিন্তু খুবসহজ নয়।
ভজন কাকা ঐ ঘটনার কিছুদিন পরে কোথায় চলে গেলেন কেউ জানতেই পারলো না। হয়তো আমাকে মারার ঘটনায় উনি খুবই বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন এবং ওঁর বাড়ি ভাড়ায় থাকার জন্য ওঁর চলে যেতে বিশেষ একটা অসুবিধে হয়নি কিন্তু আমাদের শহরে আর কোনদিন ভজন কাকাকে দেখতে পাইনি।