Wednesday, 13 January 2021

মকর সংক্রান্তি

আজকের এই সুন্দর দিনে মনে পড়ে অনেক কথা। পিঠে পুলির কথা মনে পড়লেই জিভে ও চোখে জল চলে আসে। মা, জেঠিমা দের ভোর বেলায় উঠে গঙ্গা স্নান করে এসেই শুরু হয়ে যেত পিঠে পুলির তোড়জোড়। একটা উৎসব উৎসব মেজাজ।কত রকমের পিঠে তাঁরা যে করতেন তার নামধাম মনে রাখা বেশ কঠিন কারণ বহুদিন এত রকমের পিঠে একসঙ্গে খাবার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। সেদ্ধ পিঠে, রস পিঠে, ভাজা পিঠে, পুলি পিঠে এবং তার সঙ্গে খেজুরের গুড়ের পায়েস। ওঃ, জিভে জল আসবেনা আর এগুলো ভাবলে চোখে জল আসবে না? যাই হোক, এর মধ্যেই যতটা সম্ভব ততটা করতে হবে এবং বাকিটা মনে মনে ভেবে রাখতে হবে। মাসিমার করা মালপোয়া, আহা যেন অমৃত। একটু বোস বাবা, গরম গরম ভাজছি , একটু খেয়ে যা বাবা। কি আর্তি তাঁদের কথা বার্তায়, সেটাকে অগ্রাহ্য করা কারও সাধ্য নেই। হাজার পেট ভরা থাকলেও না খেয়ে ওঠার ক্ষমতা ছিলনা। উঠোনের ঐ পাশে রান্নাঘরের বারান্দায় বসে  ছোট্ট উনুনে কড়াইয়ে ঘি ঢেলে মাসিমা মালপোয়া ভেজেই রসে ডুবিয়ে এনে দিচ্ছেন আর এদিকে দাওয়ায় বসে একটার পর একটা মালপোয়া খেয়েই চলেছি। ভাবতেই অবাক লাগে যে কত খেতে পারতাম। মা, জেঠিমা, মাসিমা দের এত আনন্দের সঙ্গে লোককে খাওয়ানোর মধ্যে যে এত তৃপ্তি, সেটা কিছুতেই ভুলতে পারিনা। আজ কেউ ভাল করে খেতেও পারেনা আর সেই আন্তরিকভাবে খাওয়ানো যেন উবে গেছে। এখন বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরাও ক্যালরি মেপে খায়, মিষ্টি বেশিরভাগ বাচ্চা খেতেই চায়না। আর আমাদের সময় শেষে মিষ্টি না হলে মনে হতো কিছুই যেন খাইনি।
সন্ধ্যে বেলার কথা আগেই বলা হয়ে গেল। তাহলে সকালবেলায় কি হলো?  মা, জেঠিমা গঙ্গা স্নানের পর পূজোয় বসলো, তার পর শুরু হয়ে গেল পিঠে করার ধূম। চালের গুঁড়ো ভিজিয়ে একটু নেড়ে নেওয়ার পর নারকেল কুঁড়ে নতুন গুড়ে পাক করে পিঠের মতন তৈরী করে জলে সেদ্ধ করে দিলেই হয়ে গেল সেদ্ধ পিঠে। গুড়ে পাক করা নারকেলের জায়গায় চাঁছি দিলে হবে অন্য রকমের স্বাদ। জলে সেদ্ধ করার জায়গায় ঘন দুধে মিষ্টি দিয়ে( সাধারণত নতুন গুড়ে) ফোটালে হয়ে যাবে পুলি পিঠে কিন্তু সেক্ষেত্রে  পিঠে গুলো হবে ছোট ছোট এবং তার পুর হবে চাঁছির। রস পিঠের জন্য হবে মিষ্টি আলু সেদ্ধ করে পিঠের আকারে ঘিয়ে ভেজে আগে থেকে তৈরী করা ঘন রসে দিয়ে দেওয়া। তারপর খুব সন্তর্পণে একটা একটা করে উঠিয়ে প্লেটে দেওয়া এবং তা মুখে দেওয়া মাত্র মিলিয়ে যাওয়া। সেটা নাহলে কিন্তু রস পিঠের মজা নেওয়া যাবেনা। আর ভাজা পিঠে, সেতো হবে মুগের ডালের। এক নাগাড়ে মিষ্টি খেতে খেতে মুখ মেরে গেলে, দুএকটা ঝাল ঝাল ভাজা মুগের ডালের পিঠে খেলে জমবে ব্যাপারটা আরও ভাল। রাতের খাওয়া যদি ভাজা পিঠে ও পুলি পিঠে এবং পায়েসের মাধ্যমে হয় তাহলে ক্ষতি কি?
এতো গেল বাংলার পৌষ সংক্রান্তি। আমেদাবাদ শহরে থাকাকালীন কিছু বাঙালি পরিবারের কাছাকাছি এসেছিলাম। বাঙালি পরিবার মানে পিঠে পুলি তো আছেই যদিও এত রকমের পিঠে করা সম্ভব নয় কিন্তু বাড়তি আনন্দ ঘুড়ি ওড়ানো। লাহিড়ি দার বাড়িতে দুপুর বেলার নেমন্তন্ন যদিও সকাল থেকেই উপস্থিত থাকতেই হবে। ওদের সনির্বন্ধ অনুরোধ যে সকাল সকাল স্নান সেরেই তাঁদের বাড়িতে উপস্থিত হতে হবে। যাই হোক, পৌঁছতে একটু বেলা হয়ে যাওয়ায় ব্রেকফাস্ট টা এড়িয়ে যাওয়া গেল কিন্তু দুপুর বেলায় সেই আক্রমণ এড়ানো গেলনা। এরপর ওদের ছাদে উঠে ঘুড়ি ওড়ানোর পালা। বাপরে বাপ। আকাশটা যেন ছেয়ে গেছে ঘুড়িতে। রং বেরংয়ের ঘুড়ি। বাড়ির ছেলে মেয়েরাতো বটেই, বাবা মায়েরা পর্যন্ত ঘুড়ি ওড়ানো তে সামিল হয়েছে। একটা একটা ঘুড়ি কাটছে আর ল্যাতরাতে ল্যাতরাতে দূরে কোন ছাদে বা গাছে গিয়ে আটকাচ্ছে। আর কি উল্লাস। আমাদের বাড়িতে ঘুড়ি ওড়ানো ছিল একদম নিষেধ কারণ ন্যাড়া ছাদ। হুঁশ নাশা হয়ে ছুটতে ছুটতে কত ছেলে যে প্রাণ হারিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। সুতরাং প্রাক যৌবনের স্বাদ অস্তাচলে যাওয়া যৌবনে উপভোগ করা , অনেকটাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতন। আনাড়ির ঘুড়ি ওড়ানো খুব মুশকিল। কত রকমের মান্জা, কোনটা তেলতেলে আবার কোনটা ভাতের ফ্যানে কাঁচের গুঁড়ো দিয়ে তৈরী। সেটাতে নাকি টেনে খেলতে হয় আর তেলতেলে মাঞ্জাতে ঢিলে দিয়ে খেলতে হয়। কত রকমের জ্ঞান অর্জন করা এখনও বাকি কে জানে? সন্ধ্যে বেলায় সাবরমতীর তীরে নানান ধরনের ঘুড়ির প্রর্দশনী। বিশালাকৃতির ঘুড়িগুলো নানান সাজে রাখা আছে ,কোনটা রাক্ষস, আবার কোনটা সূর্য। এ বলে আমাকে দেখ ,ও বলে আমায় দেখ। কিন্তু ঘুড়ির এরকম প্রর্দশনী সত্যিই অদেখাই ছিল।
অন্ধ্র প্রদেশের পোঙ্গল সেটাও কিন্তু অনেকটাই বাংলার মতো পেলব। পূর্বের ছোঁয়াই বেশি কারণ ভারতের পূর্ব প্রান্তে তো। সেখানেও পায়েস বা পরমান্নম কিন্তু ঘরে ঘরে। আমাদের সরুচাকলি মোটামুটি ভাবে ওদের দোসার মতো। কিন্তু সরুচাকলিতে যেমন  একটু ঝাল ঝাল হয় দোসাতে সেটা হয়না। কিন্তু উৎসবে মুখরিত হয়ে ওঠে সমস্ত প্রদেশ। 
যদিও পাঞ্জাবের লোঢ়ি বা আসামের বিহু দেখার সুযোগ ঘটেনি কিন্তু এই ফসল ওঠার আনন্দ সমস্ত ভারতবর্ষ ই উপভোগ করে। কিন্তু ঘুরে ফিরে  আসে সেই পিঠে পুলি, মা, কাকিমা, মাসিমাদের ভালবাসা মেশানো।

1 comment:

  1. অসাধারণ এবং nostalgic, অতিতের অনেক কিছুই ফিরে ফিরে দেখালেন।চমৎকার।

    ReplyDelete