Saturday, 9 January 2021

পৌষল্যা

আগে পৌষ মাসে পিকনিক করাকে বলা হতো পৌষল্যা। এখন যেমন বারোমাস ই এখানে সেখানে পিকনিক করার ঘনঘটা, আগে সাধারণত পৌষমাসে বেশ ঠাণ্ডার আমেজে বনভোজন করার মজাটা মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। এর মানে কিন্তু এই নয় যে গরমকালে বা বছরের অন্যসময় যে পিকনিকগুলো হচ্ছে তাতে মজা নেই।  কাঠফাটা রোদে কোন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রিসর্টে গিয়ে, সুইমিং পুলে সাঁতার কেটে হৈচৈ করে খানাপিনা করে কতলোক ই তো পিকনিকের আনন্দ উপভোগ করছে কিন্তু কজনের এই সাধ্য আছে এত পয়সা খরচ করার। সুতরাং, সাধারণ মানুষের পিকনিকের আনন্দ উপভোগ করার উপযুক্ত সময় শীতকাল। এইসময় খেয়েদেয়ে ঘুরে বেড়িয়ে মজা লোটে বেশি ভাগ সাধারণ লোক। 
বনভোজন বা পিকনিক ছিল প্রকৃতপক্ষেই বনে ভোজন। কয়েকদিন আগে জায়গা দেখে আসা হতো, কাছাকাছি জলের জন্য কোন পুকুর বা টিউবওয়েল আছে কিনা এবং যতজন যাবে তাদের বসার মতো উপযুক্ত জায়গা আছে কিনা । তখন কারো কাছে এত পারমিশন নেওয়ার দরকার পড়তো না যদি না সেই জায়গাটা কারও ব্যক্তিগত জায়গা না হতো।
কয়েকটা জায়গা দেখার পর ঠিক করা হতো কোন জায়গায় যাওয়া হবে। বিষ্টুপুর কালীবাড়ির কাছে ছিল একটা প্রকান্ড বিল যেখান থেকে রান্নাবান্নার জন্য প্রয়োজনীয় জল এবং খাবার জলের চাহিদা  কালীবাড়ির টিউবওয়েল থেকে নেওয়া হতো। তখন কালীবাড়ির আশেপাশে বেশ জঙ্গল ছিল এবং বাড়ি ঘর ছিল বেশ দূরে দূরে। পাড়ার ছেলেদের পৌষল্যার জন্য আদর্শ জায়গা কারণ ঐ পিকনিকে কুড়ি পঁচিশের বেশি লোক হতো না। কিন্তু ক্লাবের পিকনিকে লোক হতো মোটামুটি শতখানেক। সুতরাং, তার জন্য আদর্শ জায়গা মাড়োয়ারি বাগান। ঐরকম নাম কেন ছিল সেটা কোনদিনই জানা যায়নি এবং এর মালিক কোন মাড়োয়ারি ছিল সেটাও জানতে পারা যায়নি। তখন তো বয়স খুবই কম কিন্তু ক্লাবের ডিসিপ্লিন ছিল খুব ভালো। শীতের সকালে বেলা আটটার মধ্যে ক্লাবে পৌঁছে যাওয়া এবং তার পর লাইন করে  মাইল দুয়েক হেঁটে মাড়োয়ারি বাগানে যাওয়া। ছিল বোধহয় কোন রাজারাজড়ার বাড়ি। পঞ্চানন তলা ছাড়িয়ে  জঙ্গলের মাঝে সরু রাস্তা দিয়ে বেশ খানিকটা হাঁটার পর বিরাট একটা কারুকার্য করা লোহার গেট। সেটা পেরোলেই চারিদিকে প্রচুর আম, কাঁঠাল, জাম, নারকোল,সফেদা,পেয়ারা ও কুলগাছ। ছিল বিরাট বিরাট আরও কত গাছ যার নামধাম জানতাম না। কত বিঘা জায়গা বলা মুশকিল কিন্তু ছিল বড় বড় দুটো পুকুর এবং বাঁধানো ঘাট যা থেকে বোঝা যায় বাড়ির মালিকের ঐশ্বর্য এবং তাঁর রুচিবোধ। পুকুরের পাড়ে একটা বিশাল দোতলা বাড়ি যেটা আজকালকার পাঁচ ছয়তলা বাড়ির উচ্চতার সমান। বাড়ির কাছে যেতেই একটা ছমছমে ভাব, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতো। কিন্তু ক্লাবের দাদাদের একদম হুঁশিয়ারি ছিল যে ঐ বাড়ির কাছে বা পুকুর পাড়ে কেউ যেন না যায়। কিন্তু আমরা তাঁদের চোখ এড়িয়ে যেতাম কি আছে দেখতে। একটা কথা আছে না , যে ওখানে যাবেনা বললে সেইখানেই যেতে ইচ্ছে করে আর এচোড়ে পাকা ছেলে হলে তো কথাই নেই, সে ঐখানেই যাবে।
ফুরর করে বেজে উঠল বাঁশি, প্রকাশ বলে উঠল, "এই, ভুটান দার বাঁশি বেজেছে, চল তাড়াতাড়ি নাহলে ভুটান দার বেতের ঘা খেতে হবে।" সবাই তাড়াতাড়ি এসে পড়লাম কিন্তু দেখি আমাদের আগেই মোটামুটি সবাই এসে গেছে। ভাগ্য ভাল, সেদিন ভুটান দার মেজাজটা বেশ ভালই ছিল, তাই বেতের বাড়ি খেলাম না কিন্তু একটা ঠান্ডা দৃষ্টি আমাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত মাপ নিয়ে নিল। বোঝা গেল এবার ছাড় পেয়েছ ভাল কথা কিন্তু ফের যদি দেরী হয় তাহলে কিন্তু সরু লিকলিকে বেত টা আমাদের পিঠে নির্ঘাত পড়বে। যাই হোক, লাইনে দাঁড়িয়ে রুটি, কলা ও ডিম সেদ্ধ নিয়ে দৌড় মারলাম। রান্নার তদারকি করছেন রঘু দা আর ওদিকে দুলু দা , দোদা দা, মোহন দা, শক্তি দা,চঞ্চল দা, রবিদা,বিশ্বনাথ দা, মদন দা, নগেন দারা বসে গল্পগুজব করছেন আর মধ্যমণি হয়ে একটার পর একটা মজার গল্প বলে চলেছেন মনা দা আর সবার পেট ফাটার জোগাড়। পল্টু দা, ছোকুদা, গোপালদা, মিলিদা, দিলীপ দারা সবাই দ্বিতীয় সার্কেলে বসে মনাদার গল্প শুনছে। সুদীপ, অজিত, অভয়, রানা, জয়ন্ত রা ক্রিকেট ব্যাট ও বল এনেছে আর ওদের সঙ্গেই ভিড়ে আছে  আরও অনেকে। কিন্তু বিচ্ছুদের মধ‌্যে আমরা পড়ি আমরা কোথায় সফেদা বা কুল পাওয়া যায় তাই দেখতে ব্যস্ত। আরও একটা জিনিস যে ঐ বাড়িতে কে থাকে সেটা জানার চেষ্টা। বাড়ির সদর দরজায় দেখি এক পেল্লাই সাইজের তালা। এদিকে ওদিকে ঘুরতে ঘুরতে দেখি একটা জানলা ভাঙা কিন্তু সেখান দিয়ে ঢোকার সাহস আমাদের কারো হলো না। আমরা একটা পেয়ারা গাছে অনেক পেয়ারা দেখে তাতেই মজে গেলাম। হঠাৎ একটা গোঙানির আওয়াজ পেয়ে পেয়ারা গাছ থেকে দুরদার লাফ দিয়ে পালাতে লাগলাম। হঠাৎ দেখি, খন্চা নেই আমাদের মধ্যে। ওর ভাই কুশু ছিল আমাদের সঙ্গে। ও বললো, এই দাদাকে দেখেছিস? নাতো। খোঁজ খোঁজ। গিয়ে দেখি ওর মুখ দিয়ে গ্যাজলা বেরোচ্ছে আর হাত পা সব শক্ত হয়ে গেছে। পুকুর থেকে জল এনে ওর চোখে মুখে ছেটানোর পরে ওর জ্ঞান ফিরে এল। একটু পরে আস্তে আস্তে ও সুস্থ হয়ে ওঠার পর আমরা ফিরে এলাম। কিন্তু কি করে জানিনা, ভুটান দার কানে চলে গেছে খবরটা। ফুরর করে বেজে উঠল বাঁশি আর আমরাও চোরের মতন মুখ করে কোনরকমে হাজির হলাম। এদিকে খাবার তৈরি। খাবার আগে আর বকাবকি করলেন না। অ্যাই বাচ্চারা, চঞ্চল দার গলার আওয়াজ, তোমরা সবাই লাইন দিয়ে বসে পড়। খাওয়া দাওয়া শেষে হাত ধুতে যাওয়ার সময় মাথায় পড়ল একটা ঠান্ডা অথচ শক্ত হাতের চাঁটি। দেখি ভুটান দা। ভাবছিস, আমি কিছু টের পাইনি?  বাড়ি যাওয়ার পরে টের পাবি। বুঝলাম, মিথ্যে কথা বলে কোন লাভ নেই। বললাম আর কোনদিন করবনা। আপনি বাড়িতে যেন বলবেন না তাহলে আর ভবিষ্যতে বাড়ি থেকে কোনদিন আসতে দেবেনা। ঠিক আছে, মনে থাকে যেন।
আজ এতদিন বাদে কতজন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, ক্লাব কিন্তু রয়েছে কিন্তু মাড়োয়ারি বাগান আছে কিনা জানিনা । হয়তো কোন প্রমোটারের কবলে চলে গেছে এবং কোন হোটেল হয়তো হয়ে গেছে।

No comments:

Post a Comment