Saturday, 9 January 2021

কে বলে লকডাউন অতি বিষম ভয়ঙ্কর ?

"কে বলে লকডাউন অতি বিষম ভয়ঙ্কর
যাহার স্নেহের ছায়ায় বৃদ্ধি বংশধর"
প্রমিতবাবুর মন খুব খারাপ এই লকডাউনের কারণে আর পাঁচটা লোকের মতোই। ছেলেমেয়েরা সবাই বাইরে থাকে, বিয়ে থা দিয়েছেন বেশ ঘটা করেই। এখন একদম ঝাড়া হাত-পা। যখন মন হবে তখনই স্যুটকেশ গুছিয়ে বেরিয়ে পরা। কিন্তু হতচ্ছাড়া এই  করোনা আর সেই সুবাদে আসা লকডাউন । কাঁহাতক ভাল লাগে দুজন দুজনের দিকে চেয়ে থাকতে। চল্লিশ বছর আগে এক মূহুর্তের জন্য চোখের আড়াল হলেই উশখুশানি শুরু হতো আর এতদিন বাদে বেশী সময় পাশাপাশি থাকলেই খটাখটি। কারণ নেই কোন, হয়তো টিভিতে সিরিয়াল চলছে, দেবলীনা মন্তব্য করলেন কোন নায়িকাকে সমর্থন করে যাকে প্রমিতবাবু একেবারেই সহ্য করতে পারেন না আর এই বিশেষ নায়িকা পর্দায় আসামাত্র শুরু হয় তাঁর গজগজানি। অতএব, একটু বাদেই শুরু হয় মন্তব্য,
"ন্যাকামি যত্ত সব। বাড়িতে বাপমায়ের সঙ্গে করিস এইসব ব্যবহার?" ফোঁস করে উঠলেন দেবলীনা । তোমরা সব পুরুষ মানুষ গুলোই এক গোত্রের, বৌরা এসে বাড়ির কাজের লোকের মতন থাকলে তোমাদের পরম শান্তি। প্রমিত প্রমাদ গণে মানে মানে সটকে পড়ল। সিরিয়ালের গল্প নিয়ে যদি নিজের সংসারে অশান্তি ঘটতে থাকে তাহলে পয়সা খরচ করে টিভিই বা কেনা কেন বা কেবলের টাকা ই বা দেওয়া কেন? এই সহজ ব্যাপারটা কেউ বুঝতে চাইবে না আর এই করে কত সংসারে তুমুল ঘটনা ঘটে যায় তার ইয়ত্তা নেই।কিন্তু বদভ্যাস প্রমিতেরও আছে। সিরিয়াল চলাকালীন ফুট কাটা ই বা কেন? রোজ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, না আর নয় আর রোজই ভুলে যায় আর রোজই কিছু না কিছু নিয়ে ধুন্ধুমার কান্ড। এইসব ছোটখাট টুক টাক ঘটনা নিয়ে প্রমিতের দিন যায় কেটে। এদিকে সিরিয়াল যাঁরা বানান তাঁদেরও বলিহারি। মনেপ্রাণে যৌথ পরিবারের গুণগান অথচ থাকবে সব ছোট ছোট সংসার । স্বামী, স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বাইরের কেউ একেবারে নৈব নৈব চ। বাবা, মা বা ভাইবোনকে নিয়ে সবাই গুছিয়ে রয়েছে এমন কটা পরিবারে দেখা যায়? থাকার সময় আপনি, কোপনি আর দেখানোর সময় দাদা, বৌদি, ননদ, ননদাই, মেজ জা, ছোট জা যত্তোসব ন্যাকামির একশেষ। আসলে আমরা সবাই সবকিছুরই ভাল টা চাই কিন্তু ঐটা বজায় রাখতে গেলে যে পরিমাণ ধকল সহ্য করতে হয় সেটা কেউই নিতে রাজী নয়। সুতরাং যা অবশ্যম্ভাবী তাই হয়। যৌথ পরিবার টিকিয়ে রাখতে গেলে যে পরিমাণ স্বার্থত্যাগ করা দরকার তার বিন্দুমাত্র আমাদের নেই আর সেই কারণে পান থেকে চুন খসলেই তুলকালাম আর শুরু হয়ে যাবে দলবাজি।
যৌথ পরিবার থাকলে ঐ দুচোখ দুচোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো না, একাধিক দুই চোখ নাক সম্বলিত  মানুষ এক ই ছাদের তলায় দেখা যেত আর লোকেও এত অধীর অস্থির হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াত না। প্রমিতের মাস্ক লাগানো মুখ দেখলেই ছোটবেলায় দেখা গরুর গাড়িতে জোতা গরুগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। গরু যাতে মাটিতে মুখ নামিয়ে কিছু না খায় আর সোজা গাড়িটাকে টানে সেই কারণে ওদের মুখে একটা ঠুলি পরিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু অবস্থার চাপে আমরা এখন সেই গরুগুলোর মতন হয়ে গেছি। অবশ্য একেবারে যে সবটাই খারাপ সেটা নয়। মুখের মধ্যে অনাবদ্ধ  দাঁত বা নাকের ওপর দিয়ে ট্রেন চলে যাওয়া নাক মাস্কের আড়ালেই চলে যায় আর লোকের কাছে মাথা হেঁট করার কোন কারণ ই নেই। সুতরাং, করোনা,লকডাউনের একটা ভাল দিক চোখে পড়লো। এই লকডাউনের জন্য বন্ধ হয়েছে ট্রেন ও অন্য যানবাহনাদি  এবং তার ফলে পরিবেশ ও অনেক দূষণ মুক্ত হয়েছে। অনেক ভাল কাজ করেছে করোনা কিন্তু অহেতুক লোকের প্রাণ নিয়ে ছেলে খেলা করাটা খুবই অন্যায়ের ব্যাপার। লোকে একটু ভদ্রসভ্য হয়েছে। ঘরে বৌ থাকা সত্ত্বেও ইতিউতি ছোঁক ছোঁক করা বন্ধ হয়েছে। এক্কেবারে বড় দিদিমনির সামনে থাকা। বাছাধন যাবে কোথায়? যাওয়ার কোন জায়গা নেই, কেউ বাড়িতে ঢুকতেই দেবেনা।সুতরাং বাপু, ভাল ছেলের মতো চুপচাপ চোখের সামনে থাকো আর বেশি ত্যান্ডাই ম্যান্ডাই করলে রাতে খাওয়া বন্ধ।অতএব, তিষ্ঠ। লকডাউনে অফিস যাওয়া বন্ধ। প্রথমদিকে অফিসের মালিকরা কি করবে ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছিল না। কাজ না করিয়ে পয়সা দিতে গেলে গায়ে বড় কচকচ করে। অথচ উপায় ও নেই। আর এদিকে লোকজন কাজ না করে করে লিখতেই ভুলতে বসেছে। এমনিতেই কম্পিউটার আসায় হাতে লেখার চল তো প্রায় শেষ, বানানের তো মা বাপ নেই ,এর উপরে করোনা আসায় লেখাজোখার দফারফা। রাস্তা বেরোল, কর কাজ বাড়ি বসে, তবেই টাকা পাবে। অফিসে এলেই বাথরুম পায়খানার কথা মনে পড়ে যেত কাজ যাতে না করতে হয়, এখন দিনরাত যতবার খুশি যাও কুছ পরোয়া নেহি। বৌয়ের সামনে বেশিবার গেলেই গাঁদাল পাতার ঝোল দিয়ে ভাত ছাড়া আর কিছুই জুটবেনা। বাছাধনেরা, বড্ড জ্বালান জ্বালিয়েছ, এবার নিজেরাই জ্বলে মরো। আরও একটা কথা মনে পড়ে গেল। কত ছেলে মেয়েরা কাজের চাপে নিজেদের সংসারের কথা ভাবতেই পারছিল না। বাড়িতে একসঙ্গে থাকার সুবাদে বাড়িটা একটু ঝলমলে হয়েছে, নতুন অতিথির কথা ভাবার সুযোগ এসেছে আবার কারও ঘরে আসা নতুন চাঁদ বাবা ও মায়ের সাহচর্যে খিলখিল করে বেড়ে উঠেছে যেটা অন্যসময় সম্ভব হতো না। এখনও কি করোনা বা লকডাউনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ফাঁসি দেওয়া যায়? মি লর্ড, আপনাকে একটু সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করতে অনুরোধ করছি।

No comments:

Post a Comment