Saturday, 2 January 2021

এই তো সেদিন

মনে হয় যেন পেরিয়ে এলেম অন্তবিহীন পথ কিন্তু না, পথের শেষ এখনও হয়নি ,বাকি রয়ে গেছে এখনো অনেক পথ। অপেক্ষা করে আছে অনেক বিপদসঙ্কুল রাস্তা, চলেছি আমি একা, নির্জন চারপাশ। বুক করছে ঢিপ ঢিপ, চারিদিকে ঝিঁঝিঁ পোকা গান গেয়ে চলেছে একটানা। রাস্তায় যদিও আছে ইলেকট্রিক আলো কিন্তু সেটা এতই টিমটিমে কয়েক হাত দূরের জিনিসও ভাল করে ঠাউরান যায় না। এদিকে ওদিকে মাঝে মাঝে হুক্কা হুয়া হুক্কা হুয়া ডাক ভেসে আসছে, বন তুলসীর ঝোপ ঝাড় থেকে জোড়া জোড়া জ্বলন্ত চোখ দেখা যাচ্ছে, ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাবার জোগাড়। না, এটা কোন গ্রামের কথা নয়, কলকাতারই উপকন্ঠে একটা বর্ধিষ্ণু মফস্বলের কথা। প্রচণ্ড ঝড় জলে এখানে ওখানে গাছের ডাল ভেঙে পড়েছে, ছিঁড়ে গেছে ইলেকট্রিকের তার, সাপ্লাই অফিস থেকে এখনও সাপ্লাই বন্ধ করেনি। সুতরাং, বোঝাই যাচ্ছেনা যে কোন তার কারেন্ট বহন করছে আর কোনটা নয়। গানের ক্লাস শেষ করে ফিরছে উপমন্যু। আজ মাষ্টারমশাই অনেক দেরী করে ফিরেছেন এবং বাড়ি ফিরেই এক কাপ চা খেয়ে ও এক খিলি পান মুখে দিয়ে বসলেন তাঁর প্রিয় ছাত্র উপমন্যুকে নিয়ে। জানলা দরজা বন্ধ আর মাস্টারমশাই দারুণ মেজাজে ধরেছেন রাগ মালকোষ। আশপাশে যে ঝড়ের প্রলয় চলছে কোন হুঁশ নেই বীরেন বাবুর। কিন্তু তাঁর ছাত্রটি তো তার মাষ্টারমশাই এর পর্যায়ে আসেনি , সুতরাং সেতো ঐ উচ্চতায় উঠতে পারছে না, কেবলই মনে হচ্ছে যে বাড়ি কি করে ফিরবে। ঝড় জলের আওয়াজ তার কানে বেশ ভালভাবেই ঢুকছে কিন্তু যে মেজাজে স্যার আলাপ করে তান বিস্তার করে চলেছেন সেখানে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটানো গর্হিত অপরাধ হবে। একবার মেন রাস্তায় পড়লে চার পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা হাঁটতেও সে পিছপা হবে না। কিন্তু অনেক রাত্রি হয়ে যাবে পৌঁছতে পিসিমার বাড়ি। কিন্তু জিটি রোডে পড়তেই তো এখনো অনেকটা রাস্তাই বাকি।আর তাছাড়া অন্ধকার রাস্তায় ভাঙা গাছের ডাল বা ছিঁড়ে যাওয়া ইলেকট্রিকের তার সামলে হাঁটা বেশ কঠিন ব্যাপার।

হঠাৎই একটা আওয়াজ ভেসে এলো," শুনছেন, একটু দাঁড়ান। সামনে তার ছিঁড়ে পড়ে আছে, অন্ধকার রাস্তা, একটু ছোঁয়া লাগলেই সর্বনাশ। আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন সেখানেই থাকুন, আমি টর্চ নিয়ে আসছি।"  আচমকা ডাকে ঐ খানেই স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে পড়ল সে। এক মাঝবয়সী মাতৃ স্থানীয় মহিলার গলার আওয়াজ। উপেক্ষা করতে পারলনা সে। ভদ্রমহিলা এলেন এবং টর্চের আলোয় সে দেখল যে একটু দূরেই ছিঁড়ে যাওয়া তার সাপের মতো ছোবল তুলে আছে। যে গতিতে হাঁটছিল সে একটু এগোলেই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে যেত। ভগবান বোধ হয় এইভাবেই মানুষের রূপে আসেন এবং মানুষকে বাঁচান। ধন্যবাদ দিলে তাঁকে ছোট করা হবে কিন্তু ঐ স্বল্পালোকেই চোখের ভাষায় তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বিদায় নিল সে। উনি বেশ শর্টকাট রাস্তায় পৌঁছে দিলেন তাকে। বুকের ভেতর চাপা ভাবটা অনেকটাই হালকা হয়ে গেছে, এখন বাসের অপেক্ষায় থাকা। বালিখাল থেকে একটা গাড়ির হেডলাইট দেখা গেল কিন্তু বাসের ভেতর টা অন্ধকার, সুতরাং রুটের বাস নয় কিংবা হলেও ট্রিপ শেষ করে গ্যারাজ করছে। প্রাণপণে হাত নাড়িয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকল সে ড্রাইভারের। ভাগ্য ভাল বাস ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল।" কোথায় যাবেন? এটা তো সালকিয়াতে গ্যারাজ করতে যাচ্ছে।" " একটু লিলুয়ায় বড় গেটের কাছে নামিয়ে দেবেন?" উঠে পড়ুন বলায় উপমন্যু তো একলাফে বাসে উঠে পড়ল। শেষ বাস চলে গেছে। ভগবানকে ধন্যবাদ দিতে দিতে পৌঁছে গেল সে বড় গেটের কাছে। ওখান থেকে একশো মিটার হাঁটলেই পিসেমসায়ের বাংলো। সবাই শুয়ে পড়েছে, কেবল পিসিমাই ঘরবার করছে। ঘড়িতে তখন রাত্রি সাড়ে এগারটা।
খাওয়া দাওয়া শেষে পিসিমা জিজ্ঞেস করল, " হ্যাঁরে বাবা, আজ এত দেরী কেন হলো?" সব কথা খুলে বলায় পিসিমা দুহাত তুলে কপালে ঠেকাল। ভগবান রক্ষে করেছেন বেটা। যা, শুয়ে পড় এখন। দেখতে দেখতে ছেচল্লিশ বছর কেটে গেছে কিন্তু যেন মনে হয়, এই তো সেদিন।

No comments:

Post a Comment