Wednesday, 29 June 2022

নতুন সূর্যের প্রতীক্ষায়

আর কয়েকদিন  বাদেই আঠারই জুলাই  আমাদের  দেশ ভারতবর্ষে পঞ্চদশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে। এইবার আমরা এক অভূতপূর্ব  জিনিস লক্ষ্য করতে চলেছি যেটা হচ্ছে এই প্রথম এক আদিবাসী ভদ্রমহিলার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ  করা এবং কোন অঘটন না ঘটলে তাঁর এই বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের  পনেরতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়া। এইবার একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক এই উপজাতির পূর্ব  ইতিহাস  খোঁজার জন্য। ইতিহাসের  বই খুঁজলে তাদের সম্বন্ধে হয়তো কিছুটা জানা যাবে কিন্তু তাদের জীবন যাপন সম্পর্কে কিছু ভাসাভাসা খবর জানা যাবে যদি না লেখকের সম্যক জ্ঞান না থাকে।

খুবই কাছ থেকে তাদের  জীবন যাপন করতে দেখার  সুবাদে সামান্য কিছু  সংযোজন করার  চেষ্টা করছি যদিও তা কতটা ফুটিয়ে তুলবে  সেটা সম্বন্ধে যথেষ্ট  সন্দেহ আছে। তবুও সামান্য প্রয়াস। আঠারশো সাতান্ন খ্রীষ্টাব্দের ও বছর দুই আগে অর্থাৎ আঠারশো পঞ্চান্ন সালে  তিরিশের জুন সাঁওতালদের হুল বিদ্রোহ হয়েছিল  যার পুরোভাগে  ছিলেন মুর্মু ভাইবোনেরা । তাঁরা হলেন  সিধু, কানু,  চাঁদ এবং ভৈরব মুর্মু এবং তাঁদের  দুই বোন ফুলো ও ঝানো। তখনকার  সমাজের  মাথাদের ও ব্রিটিশ  শাসকের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল সিধু কানুদের  নেতৃত্বে ষাট হাজার  সাঁওতাল তাদের  তীরধনুকের  উপর ভরসা করে। কিন্তু আগ্নেয়াস্ত্রে বলীয়ান ইংরেজরা তাদের  দমন করতে সফল হয় এবং সিধু  ও কানু বীরগতি প্রাপ্ত হয়। কিন্তু বিদ্রোহের বীজ তারা বপন করে যায় এবং সিপাহী বিদ্রোহের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে যায়।
শাসকের শোষণনীতি  যদি অব্যাহত থাকে তাহলে মনের মধ্যে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুনের  বহিঃপ্রকাশ হবেই সে আজ হোক বা কাল হোক। ব্রিটিশ সরকার তাদের  চিন্তাধারা বদলাতে বাধ্য  হয় এবং এদের সামগ্রিক  উন্নয়নে মাথা ঘামাতে  শুরু করে। তাদের উন্নয়নের জন্য  তাদের  থেকেই গ্রাম প্রধান  বা মোড়লের  সৃষ্টি করেন এবং তাদের  হাতে ট্যাক্স  সংগ্রহ করার অধিকার ও দেওয়া হয়। তাদের  জন্য  বরাদ্দ  জায়গা  যাতে  অন্য কেউ অধিগ্রহণ  করতে না পারে সেটার জন্য ও আইন প্রণয়ন করে। এখনও  সেই ধরণের  আইন বলবত আছে যে ট্রাইবাল (আদিবাসী অধ্যুষিত  এলাকাতে)এরিয়াতে  ট্রাইবাল( আদিবাসী) ছাড়া অন্য  কেউ জমির  মালিক  হতে পারবে না। এই আইনের  ভাল  ও মন্দ উভয় দিক ই রয়েছে। ভাল দিক হলো এতে আদিবাসীদের মূল কাঠামো অপরিবর্তিত  থাকবে  কিন্তু খারাপ  দিক  হলো এই ব্যবস্থায় তারা  আধুনিকতম  সুযোগ সুবিধায় বঞ্চিত থাকতে পারে। কিন্তু এইখানেই  সরকারের  একটা বিশেষ  ভূমিকা রয়েছে। আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের  তত্ত্বাবধানে যদি সামগ্রিক উন্নয়নের  ব্যবস্থা করা যায় তাহলে তাদের মূলকাঠামো অপরিবর্তিত  রেখে তাদের আরও  আধুনিক পরিষেবা দেওয়া যায়।
বিশাখাপটনম স্টিল প্ল্যান্টের ব্রাঞ্চে পোস্টিং থাকার সুবাদে এদের জন্য  কিছু কাজ করার  সুযোগ  এসেছিল।  স্টিল প্ল্যান্টের  জেনারেল  ম্যানেজার একদিন বললেন  যে তাঁদের  বহু কর্মী ও অফিসার যাঁরা আরাকুভ্যালি ও পার্বতীপূরম এলাকার  (আদিবাসী এলাকা) অধিবাসী  এবং  তাঁদের  বাড়ি তৈরির জন্য  ব্যাঙ্ক থেকে কোন রকম ঋণ দেওয়া যায় কিনা। ব্যবসা বৃদ্ধির  একটা বিরাট  সুযোগ হাতছাড়া করার  ইচ্ছা ছিলনা কিন্তু আদিবাসীদের  ছাড়া আর কাউকে বিক্রি করা যাবেনা শুনে একটু মনটা দমে গিয়েছিল  কিন্তু আশা একদম ছেড়ে  দিইনি। তাঁরই  অধীনস্থ  একজন সহকারী জেনারেল ম্যানেজারকে নিয়ে  রওনা দিলাম  আই টি ডি এর(ইন্টিগ্রেটেড ট্রাইবাল  ডেভেলপমেন্ট অথরিটির) উদ্দেশ্যে। তিনি একজন  জয়েন্ট কালেক্টর,  সুতরাং যথেষ্টই  ক্ষমতাবান।  তিনি আশ্বাস  দিলেন যে সরকার  একটা গ্যারান্টির ব্যবস্থা করবে এবং তাঁরাই ঋণ অপরিশোধিত  থাকলে অন্য কোন আদিবাসীদের  বিক্রির  ব্যবস্থা করবেন এবং একান্তই  অবিক্রিত থাকলে তাঁরাই ব্যাঙ্কের  ঋণ পরিশোধের  ব্যবস্থা করবেন।  সমস্ত কথাবার্তা হবার  পর হেড অফিসে প্রপোজাল  পাঠানো হলো কিন্তু ইতিমধ্যেই  বদলির নির্দেশ আসায় আর কিছু করা সম্ভব  হয়ে ওঠেনি এবং তার  ভবিষ্যত  যে কি হয়েছে তাও জানিনা। সকলের  ঐকান্তিক  উদ্যোগ না থাকলে কোন কিছু করাই অসম্ভব হয়ে ওঠে। যে কোন নতুন  উদ্যোগ  নেওয়ার  আগে সবাইকে সেই বিষয়ে অবহিত করা বিশেষ  প্রয়োজন।  অনেকের ই কোন  স্বচ্ছ ধারণা না থাকায় সে বাধার সৃষ্টি করে এবং অহমিকা বশত প্রকল্প  যাতে  বাস্তবায়িত  না হতে পারে তার জন্যও সর্বতোভাবে  চেষ্টা করতে থাকে। 

বছর পঞ্চান্ন ষাট আগের কিছু ব্যক্তিগত  অভিজ্ঞতার  কথা বলা যাক। আমরা তখন  স্কুলে পড়ি। বিবেকানন্দ ব্যায়াম সমিতিকে ডান হাতে রেখে টেক্সটাইল  কলেজের  দিকে যেতে কৃষ্ণনাথ কলেজের  মেন হোস্টেলের  উল্টোদিকে বড় বড় জারুল গাছের  নীচে কয়েক ঘর সাঁওতালদের বাস ছিল। গাছের ডাল থেকে ঝোলানো ঝুড়িতে তাদের  কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র থাকতো। মাঝে মাঝেই  দেখতাম  সেখানে তাদের  বাচ্চাকে শুইয়ে  দিয়ে তারা কাজকর্ম  করতো। গাছের  তলে পরিষ্কার  করে সুন্দর ভাবে নিকানো  থাকতো ঐ জায়গাগুলো। একটু বড় বাচ্চাগুলো ঐখানেই  খেলা করতো আর খুব ছোট শিশুরা ঝোলানো ঝুড়িতে শুয়ে থাকতো। কোন বাড়িতে কিছু পরিষ্কার  করার কাজ থাকলে তাদের ডাকা হতো এবং নামমাত্র  মজুরিতে  তারা কাজ করতো। ছেলেদের  মজুরি ছিল দেড় টাকা এবং মেয়েদের ছিল  একটাকা বা পাঁচ সিকে। বহরমপুর শহরে তখন  গাছগাছড়ার  অভাব ছিল না আর তার সঙ্গে  ছিল  নানাধরণের পাখি। ওরা তীর ধনুক নিয়ে  পাখি শিকার  করতো আর দিনের  শেষে শুকনো কাঠকুটো জ্বালিয়ে তারা রান্নাবান্না করতো। তারা কত কষ্ট করে থাকে  সেইসময় কোন ধারণাই ছিলনা। কিন্তু এত কষ্টের মধ্যেও  তাদের  কালো কোঁদা চেহারার  মধ্যে যে চমক ছিল  তা ভাবলেই  কেমন আশ্চর্য  লাগে। এত অযত্নের মধ্যেও  কালো নিখুঁত  শরীরে এত জ্যোতি কোথা থেকে আসে সেটা নিশ্চয়ই  গবেষণার বিষয়। এখন ছেলেমেয়েদের  মধ্যে নানাধরণের  ক্রীম ব্যবহার  বেড়েছে বটে কিন্তু চামড়ার  সেই উজ্জ্বলতা কোথায়?  স্কুলে পড়ার সময় থেকেই কিছু সামাজিক  দায়িত্ব পালন করতে শিখেছি। আমাদের  পাড়ার ক্লাবের  নাম ছিল  কিশোর  সংঘ এবং  আমাদের  একটা লাইব্রেরি ছিল। অসীম,  প্রদ্যুত,  দেবী , বাসুকি,অরূপ, চিত্ত, নান্টি ( ভাদুড়ি নামেই বেশি পরিচিত  ছিল), বুলান দাকে নিয়ে ছিল  আমাদের  ক্লাব। পাড়ার  সমস্ত  বাড়ি থেকে বাড়তি বইগুলো নিয়ে লাইব্রেরির  যাত্রা শুরু। মুসলমান পাড়ায় চিত্তদের একটা বাড়ি খালি পড়েছিল  এবং চিত্তর বাবার   সম্মতিতে ঐ বাড়িতেই  শুরু হলো লাইব্রেরি। তারপর প্রদ্যুত এবং ভাদুড়ির অক্লান্ত  পরিশ্রমে পাড়ার সব বাড়ি থেকে চাঁদা তুলে লাইব্রেরির  কলেবর বৃদ্ধি  করা হতে লাগল এবং লাইব্রেরির জন্য  কোন পয়সা নেওয়া হতোনা। এরপর  ঠিক  হলো যে বিনাপয়সায় লোকের  চিকিৎসার  ব্যবস্থা করতে হবে। একজন  খুব ভাল বৃদ্ধ হোমিওপ্যাথ ডাক্তার বাবুর  খোঁজ  পাওয়া গেল। তিনিও  আমাদের  উদ্যোগকে সমর্থন  জানালেন। সকলের  সমর্থনে বিনা পয়সায় রোগীদের  হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার  ব্যবস্থা হলো। এরপর আমরা ডাক্তার  রজত ঘোষের  বাড়ির  পাশে কাশিমবাজারের মহারাজের  একটা ছোট্ট  দেড়কাঠা জমি শ্রী সৌমেন নন্দী মহাশয়ের  কাছে দান হিসেবে চাইলাম  এবং তিনিও  সানন্দে সম্মতি দিয়ে ক্লাবকে দান করলেন।  এরপর শুরু হলো ক্লাবের  নিজস্ব  বাড়ি তৈরির উদ্যোগ।  কারো কাছে ইট, কারও কাছে বালি, কারও কাছ  থেকে সিমেন্ট  বা লোহার  রড নিয়ে শুরু করা হলো বাড়ি তৈরির কাজ। নিজেরাও হাত লাগিয়েছি এবং এই সাঁওতালদের থেকেই  জন মজুরের  কাজ করিয়েছি কিন্তু একজন অভিজ্ঞ  রাজমিস্ত্রির সহায়তা নিয়েছি নামমাত্র  পারিশ্রমিকে।  উগ্রবাদীদের টাকার  জুলুম  সমবেতভাবে প্রতিরোধ  করেছি এবং কারও  পক্ষে একটা টাকা নেওয়াও  সম্ভব  হয়নি। এরপর পাশ করে বেড়িয়ে যাওয়ার  পর ঐ ক্লাবের  বাড়ি বিক্রি করে অন্য জায়গায় বড় জায়গা কেনা হয়েছে কিন্তু সময়ের সঙ্গে চিন্তাধারার  আমূল পরিবর্তন  হওয়ায় এইরকম  সমাজ সেবামূলক  কাজ বন্ধ  হয়ে গেছে এবং কেবল পাড়ার  পূজো হওয়া ছাড়া আর কোন  কাজ  হয় বলে জানা নেই।কর্মসূত্রে অনেক  আদিবাসী সহকর্মীদের  পেয়েছি এবং তারাও  যথেষ্ট  দক্ষতার  সঙ্গে তাদের কর্তব্য  পালন  করেছে এবং আজও  করছে। তাদের অনেকেই  রিটায়ার  করে গেছে এবং তাদের  ছেলে মেয়েরাও  যথেষ্ট  উচ্চশিক্ষা লাভ করে অনেকেই উঁচুপদে অধিষ্ঠিত। 

একটা কথা ভেবে খুব ভাল  লাগে যে একসময় যারা ছিল  অবহেলিত আজ তারা নিজেদের  চেষ্টায় এবং সরকারি সহযোগিতায় আজ তারা সামনের  সারিতে আসতে পেরেছে। শ্রী গিরীশ চন্দ্র মুর্মু আজ ভারতবর্ষের  কম্পট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেল।  তার আগে তিনি জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্য প্রশাসক হিসেবে  দায়িত্ব পালন করেছেন।  এইরকম নানাধরণের বিভিন্ন  কাজে তাঁরা দায়িত্ব পালন করছেন  এবং ভারতবর্ষ  তার অভীষ্ট লক্ষ্যে নিশ্চয়ই পৌঁছতে পারবে। আগামী একুশে জুলাই আমরা জানতে পারব যে আমাদের  দেশের  প্রথম নাগরিকের  আসন এই আদিবাসী রমণী অলঙ্কৃত  করেন  কিনা এবং আমরা জাতপাত ধর্মের  উপর উঠতে পারব কিনা।


Friday, 24 June 2022

ভবঘুরে ও বাউণ্ডুলে

ভবঘুরে এবং বাউণ্ডুলে প্রায় সমার্থক হলেও পার্থক্য এদের  মধ্যে যোজনবিস্তৃত। ভবঘুরেরা সাধারণত  চালচুলোহীন, আজ এখানে তো কাল সেখানে,কেউ কিছু খেতে দিলে খায় নাহলে সারাদিন  অনাহারে কাটে। কখনো সখনো কোন অনুষ্ঠান বাড়িতে কিছু খাবার  উদ্বৃত্ত  হলে তারা এদের ডেকে কিছু দিয়ে দেয় আর  খাবার না বাঁচলে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া পাতায় পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট রাস্তার কুকুরগুলোর সঙ্গে মারামারি করে ছিনিয়ে নিয়ে খায়। এদের  জীবনধারণের প্রধান উপায় ভিক্ষা এবং মাঝে মধ্যেই  কোন সংস্থার উদ্যোগে গরীবদের খাওয়ার বন্দোবস্ত  হলে দুটো পেট ভরে খেতে পাওয়া। অনেকেই এই কথা বলেন  যে ভিক্ষা দেওয়া ঠিক  নয় এবং এতে মানুষকে আরও অলস করে তোলে। ঠিক আছে , মানলাম কথাটা। কিন্তু এদের  কর্মমুখী করবে কে? কে এদের  কাজের  ব্যবস্থা করবে, কি করে এদের  পেট চলবে একটু দয়া করে বলে দেবেন? প্রত্যেক  সরকারেই  একটা সমাজকল্যাণ দফতর থাকে এবং একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত  মন্ত্রীও  থাকেন কিন্তু বুকে  হাত দিয়ে কজন বলতে পারবেন  যে এই দফতরের  সমস্ত লোকই হৃদয়বান? কিছু কাজ তো নিশ্চয়ই  এদের করতে হয় লোক দেখানোর  জন্য  কিন্তু ঐ খাতে বরাদ্দ  টাকা কতটা তাদের  উদ্দেশ্যে ব্যবহার  হয় তাতে যথেষ্ট  সন্দেহ  আছে। এর বেশীরভাগ টাকাটাই নেতা, মন্ত্রী ও সরকারি আমলাদের রমরমাতেই চলে যায়, নামমাত্র  এদের  উন্নয়নের জন্য  ব্যবহার হয়। কথাটা সত্যিই  এবং তার থেকেও  বেশী তেতো। এটা সমস্ত দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য,  কোথাও  একটু ভাল তো কোথাও  চোখে পড়ার মতো নয়। মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্টের মতো শহরে কিছু কাজের  ব্যবস্থা কি করা যায় না? সবই সম্ভব  যদি থাকে সদিচ্ছা। শহরের  এই বিরাট  কর্মহীন গরীবদের  জন্য কিছু কর্মসংস্থান কিভাবে করা যায় তারজন্য সমাজবিজ্ঞানীদের  সাহায্য নেওয়া হোক। এরজন্য  থিওরিসর্বস্ব জ্ঞানীগুণীর প্রয়োজন  নেই, দরকার  বাস্তব সম্মত প্রকল্প এবং এই বিশাল কর্মযজ্ঞে তাদের  সামিল করা। এইপ্রসঙ্গে একজনের  কথা ভীষণ ভাবে মনে পড়ছে এবং তিনি হচ্ছেন  আজকের  আমূলের( আনন্দ মিল্ক ইউনিয়ন লিমিটেড) স্রষ্টা শ্রী ভার্গিস ক্যুরিয়েনের। উনিশশো ছিচল্লিশ সালে ভারতবর্ষের  সহকারী প্রধানমন্ত্রী সর্দার  বল্লভভাই প্যাটেলের অনুপ্রেরণায়  শ্রী ত্রিভুবনদাস প্যাটেলের উদ্যোগে গড়ে ওঠে গুজরাট মিল্ক মার্কেটিং ফেডারেশন।  তিনিই  আনেন  শ্রী ক্যুরিয়েনকে জেনারেল ম্যানেজার  হিসেবে এবং যদিও  তিনি জীবনের  শেষ দিন পর্যন্ত  চেয়ারম্যান ছিলেন কিন্তু এর সমস্ত  পরিচালন ভার শ্রী ক্যুরিয়েনের উপর ন্যস্ত করেন। তাঁর মৃত্যুর  পর সর্বময় কর্তা হন শ্রী ক্যুরিয়েন এবং তাঁর  স্বপ্ন সাকার করতে সমস্ত সদস্যদের উজ্জীবিত করেন  এবং তার ফলস্বরূপ  আজকের  বিশ্বের  বৃহত্তম  দুধ প্রস্তুতকারী এবং অষ্টম  বৃহত্তম দুধ ও ডেয়ারিজাত সামগ্রীর  সংস্থা। এইরকম  বিশাল  কর্মযজ্ঞে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে দরকার  অনেক ভার্গিস ক্যুরিয়েনের কিন্তু সমস্ত ক্ষেত্রেই অদূরদর্শী রাজনৈতিক নেতাদের  হস্তক্ষেপ এই কর্মযজ্ঞের অন্তরায়।

অন্যদিকে বাউণ্ডুলে হচ্ছে তারা যারা ঘরের  খেয়ে বনের  মোষ তাড়িয়ে বেড়ায়। তাদের ঘরে খাবারের  চিন্তা না থাকায় তাদের  মুখে মারিতং জগত। অবশ্য  কোন কোন সময় এরাও সমাজের  অনেক উপকারে আসে। যেমন অনেক  সংস্থা মাঝেমধ্যেই  এই ভবঘুরেদের খাওয়ানোর  বন্দোবস্ত করে বা জামাকাপড় দেয়, তখন  এই সংস্থার  সাফল্যের  পিছনে অনেক  বাউণ্ডুলেরই অবদান  থাকে। এরা সবসময় যে রাজনৈতিক  ছত্রছায়ায় থাকে তা নয়, অনেক ক্ষেত্রেই  তারা অন্যের বিপদে এগিয়ে আসে। সুতরাং কেউই ফেলনার  নয়। শুধু দরকার কাকে দিয়ে কি কাজ করানো যায় সেইসম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারণা।

সরকারী উদ্যোগেই সমস্ত  কাজ হয়ে যাবে এটা আশা  করা ভুল। বেসরকারী সংস্থার ও হাত বাড়ানো দরকার।  রামকৃষ্ণ মিশন,  ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ এবং আরও  অনেক  স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই ভাল কাজে এগিয়ে আসে কিন্তু জনসাধারণের মধ্যে এই সার্বিক ভাবে সাহায্য  করার মনোভাব যতদিন  না জাগবে  ততদিন সুন্দর সমাজ গড়ার স্বপ্ন কোনদিন ই  বাস্তবায়িত হবেনা।

Friday, 17 June 2022

পরীক্ষা ---- সেকাল ও একাল

বার্ষিক পরীক্ষা তখন  শীতকালে হতো, রেজাল্ট  বার হতো তেইশে ডিসেম্বর। তারপর কদিন ছুটির আমেজ। বড়দিনে চার্চের সেজে ওঠার ধূম, তারপর দেখতে দেখতে পুরোনো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরে আবার  সাজো সাজো রব। তখন  এখনকার  মতন সারা বছর ক্রিকেট  খেলা হতো না, কেবলই শীতের সময় মরশুমী ফুলের মতো ক্রিকেট  উঠত ফুটে মাঠে ময়দানে, অলিতে গলিতে। থান ইটের উইকেট বানিয়ে রাস্তায় ( যেসব রাস্তায় বেশি গাড়ি ঘোড়া চলত না) জমে উঠত ক্রিকেট।  মাঝে মাঝেই  পাড়ার  বড়রা শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢুকে পড়তেন এবং তাতে আরও  জমে উঠত খেলাটা। জলখাবার খেয়ে স্নান করে ভাত খাওয়ার  আগে পর্যন্ত  একপ্রস্থ খেলা, খাওয়া দাওয়ার পর বিকেল  গড়িয়ে সন্ধে পর্যন্ত  আরও  এক প্রস্থ খেলা। এই সময়টা হতো এই পাড়ার অমুক সঙ্ঘের  সঙ্গে ঐ পাড়ার তমুক  ক্লাবের খেলা। বিবেকানন্দ  ব্যায়াম  সমিতির  ছোটদের সঙ্গে খাগড়াঘাট বালকসঙ্ঘের  খেলা। বিবেকানন্দ ক্লাবের ছোটদের  ইনচার্জ ভুটানদা হতেন আম্পায়ার সে যে কোন  ক্লাবের  ছোটদের  সঙ্গেই  খেলা হোক না কেন। আর ভুটান দা আম্পায়ার  থাকা মানেই বিবেকানন্দ ক্লাবের জয় অনিবার্য।  কোনভাবে একবার  পায়ে বল লাগলে আর রক্ষা নেই, ভুটানদার আঙ্গুল  উঠে গেছে আউট সঙ্কেত  দিয়ে। কিন্তু নিজের ক্লাবের  ক্ষেত্রে সেটা নৈব নৈব চ। সেইকারণে কোন ম্যাচ  ঠিক  করতে গেলে প্রতিপক্ষ  টিম জিজ্ঞেস করতো কোন মাঠে খেলা  হবে আর ভুটানদার  আম্পায়ার  হওয়া চলবে না এই কড়ারে ম্যাচ  ঠিক হতো। ভুটানদার  ক্লাবের প্রতি অসীম  ভালবাসা কিন্তু ছিল অতুলনীয়। কিন্তু পরীক্ষার  কথা বলতে গিয়ে ক্রিকেট খেলার  কথা আসছে কেন? তখন  ক্লাবের  সেরা খেলোয়াড় ছিল  মনোজ, যেমন ব্যাট করতো আর তেমনই  করতো বোলিং। ভুটানদার  প্রধান  অস্ত্র  ছিল সে। এই মনোজ খেলাধূলোয় যেমন ওস্তাদ  ছিল,  পড়াশোনায় তেমনই  মা গঙ্গা। মনোজের  কিন্তু দুর্ভাগ্য,  ও দ্বিতীয়বারেও  এই ক্লাসের গেরো পেরোতে  পারেনি। অবশ্য  এটা কিছু নতুন  নয়। প্রত্যেক  ক্লাসেই  মনোজের  ভীষণ মায়া পড়ে যায়। ঐ বেঞ্চ, ঐ জানলার ধার মনোজকে ভীষণ ভালবেসে  ফেলে। এইবার  মনোজের  বাবা খুবই  রেগে  গেছেন আর বলেছেন  ক্লাবের কোন কথাই  যেন  তাঁর কানে না আসে। খুবই  স্বাভাবিক ব্যাপার  এটা, প্রত্যেক ক্লাসেই  যদি এমন মমত্ববোধ জেগে ওঠে তাহলে তো মুশকিল। ভুটানদার  ক্লাবের প্রতি প্রেম যতই  থাকুক  না কেন পড়াশোনার  দিকটাতেও  তাঁর নজর ছিল  খুবই  বেশি। 
তখন  টুকে পাশ করাটাও একটা শিল্পের  পর্যায়ে ছিল। মনোজের  মতন  কিছু  ছেলে ছিল যারা না টুকলে কিছুতেই  পাশ করতে পারত না। সুজন দা, পেলু দারা যতটা সময় চোতা তৈরী করতে ব্যয় করতো, তার অর্ধেক সময় পড়াশোনার জন্য  দিলে আরামসে  পাশ করে যেত। সাধন বাবু নতুন  এসেছেন স্কুলে, ভীষণ  কড়া ধাতের মানুষ।  পরীক্ষার  সময় কাউকে ঘাড় ঘোরাতেও  দেননা। সুজন দা, পেলু দারা ছিলেন  জাত টুকলি মাস্টার।  স্কুলের  সমস্ত  মাস্টার মশাইরা জানতেন  যে এরা সারা বছর যেমন টো টো করে ঘুরে বেড়ায় তাতে না টুকলে এরা কিছুতেই  পাশ করতে পারবে না। সত্যি সত্যিই  তাঁদের  সকলের  চোখ এড়িয়ে গিয়ে সুজন দারা টুকলি করতো কিনা একটু সন্দেহ  আছে। মাস্টার মশাইরা হয়তো জানলেও  কিছু বলতেন  না বা তাঁদের  চোখ এড়িয়েই  এদের শিল্পকর্ম  চলতো। কিন্তু মনোজ না ছিল  সুজন দাদের মত শিল্পী না ছিল পড়াশোনায় দড়। সুতরাং যা হবার,  তাই হয়েছে। কিন্তু এহেন শিল্পীরাও সাধনবাবু আসার  পরে হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় একেবারেই  গোল্লা কারণ সাধন বাবুর কাছে ট্যাঁ ফোঁ করার  কোন যো ছিলনা আর তার উপর তিনি ছিলেন  ট্যারা। ট্যারারা নানান ধরণের হয়। ওঁর চোখের মণিদুটোই  বহির্মুখি হবার কারণে এরা ঠাউরাতে পারেনি যে উনি কোন  দিকে তাকাচ্ছেন। কিন্তু এরা হচ্ছে জাত ধুরন্ধর।  ওঁর জাল কেটে বেরোনো এদের  কাছে প্রায় নস্যি। একবার  হেরে গেছে বলে বারবার  হার,  এ কিছুতেই  হতে পারেনা। সুজন একবার বাঁদিকে প্রশ্নপত্র  ধরে যেন  বুঝতে পারছেনা এইভাবে সাধন বাবুকে জিজ্ঞেস করল আর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর  চোখের  মণির অবস্থান  লক্ষ্য  করল। আরও একটা অন্য প্রশ্নে কি বলতে চাইছে  এটা  জানতে চেয়ে সে ডানদিকে প্রশ্নপত্রটা  ধরল আর খুবই  সূক্ষ্মভাবে তাঁর চোখের  মণির অবস্থান  লক্ষ্য করল। তার পরের ঘটনা খুবই সরল। শিল্পীদ্বয়  ধাঁধার সমাধান  ততক্ষণে করে ফেলেছে এবং হাফ ইয়ার্লির  হারের বদলা সুদে আসলে মিটিয়ে নিয়েছে বার্ষিক পরীক্ষায়। রতন বাবু খুব  কম কথা বলতেন  কিন্তু যখন  বলতেন তখন  সবাই তাঁর কথা মন্ত্রমুগ্ধের মতন শুনতেন। ফাইনাল  রেজাল্ট  বেরোনোর  আগের দিন  টিচার্স মিটিং হতো যেখানে হেড মাস্টার  মশাই সমস্ত  মাস্টার মশাইদের সঙ্গে আলোচনা করতেন  পাশ ফেলের ব্যাপারে এবং সেখানে ক্লাস টিচারের ভূমিকা ছিল খুবই  গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো  কোন ছেলে কোনও কারণে রেজাল্ট খারাপ করে ফেলেছে তাকে পাশ  করানো হবে কি হবেনা সেখানে হেড মাস্টার মশাই অন্যান্য মাস্টার মশাই  বিশেষ করে ক্লাসটিচারকে জিজ্ঞেস করতেন। সেই  মিটিংয়ে রতনবাবু বলে উঠলেন, "তাহলে এই বাঁদরগুলো সাধনবাবুকেও হার মানালো।" আর বিশেষভাবে কিছু বললেন না কিন্তু  সবাই বুঝলেন  যে তাঁর মন্তব্যের  লক্ষ্য  সুজন ও পেলু। 
কলকাতার  পকেটমাররাও  এক একজন বড় শিল্পী ছিলেন।  বাসে ট্রামে  বা পথচলতি  জনতার পকেট মুহুর্তের মধ্যে ফাঁকা করে দিতে এদের  জুড়ি ছিল না। কিন্তু তাদের  সেই মগজের ব্যবহার ও একটা শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছেছিল  কিন্তু এখন তো সেটাও নেই, সেই শিল্পকর্ম আজ লুপ্ত হয়ে গেছে এখনকার গাজোয়ারির  কাছে। এখন  একটা ছুরি বা পিস্তল বুকে ঠেকিয়ে সমস্ত  জিনিস  কেড়েকুড়ে নিচ্ছে। শিল্প এখন পিছনের  সিটে। এখন  ছাত্ররা টোকা টুকির শিল্প হারিয়ে  একটা ছোরা  বা পিস্তল দেখিয়ে খোলাখুলিভাবে টুকে চলেছে  আর এর পরে ও পাশ করতে না পারলে ঝাণ্ডা ধরে বলছে পাশ করিয়ে দিতে হবে। অথচ সাংবাদিকরা যখন  তাদের  সহজ সরল ইংরেজি  বানান  জিজ্ঞেস করছে তারা এর ওর মুখের  দিকে চাইছে। কি পরীক্ষা দিচ্ছে তাও তারা জানেনা । কি হবে এদের পাশ করে বা পাশ করিয়ে দিয়ে? একটা কাগজের  শংসাপত্র কাছে থাকা ছাড়া আর বেশি কি? এদের দাদাদের ধরে কাকে মারতে হবে, কাকে ভয় দেখাতে  হবে এসব ছাড়া আর কিছুই  করতে পারবে না। এছাড়া আর কি হবে? বরং যদি হাতে কলমে  কিছু কাজ শেখে তাহলে দাদাদের না ধরেও মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে।
ছেলেমেয়েদের  উস্কানি  দিয়ে উত্তেজিত করা খুবই  সহজ কাজ। তারা বাসে ট্রেনে আগুন  দিয়ে দেশের  সম্পদ  নষ্ট  করবে আর এই রাজনৈতিক  দাদারা  তাঁদের  ছেলেমেয়েদের  বাইরে পাঠিয়ে উচ্চ শিক্ষিত করে এইআমজনতার মাথায় বসিয়ে দিতে পারবে। কবে যে এঁরা দলের  কথা না ভেবে দেশের  কথা ভাববেন  সেটাই  দেখার  বিষয়।

Thursday, 2 June 2022

নিরুদ্দিষ্টের প্রতি আহ্বান

উদো দাকে তো শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হলো বহু লোকের  চোখের জলের  মধ্যে। অনুত্তমের মনটা খুব  খারাপ।  শ্মশানে না গেলেও মনটা কিন্তু ওখানেই  চলে গেছে। ইতস্তত করছে সে, যাবে না অন্য কারও  সঙ্গে খানিকটা সময় কাটাবে। আচ্ছা দেখা যাক পানু দাকে পাওয়া যায় কিনা। পানু দা ছিল  অনুর দাদার  বন্ধু কিন্তু চারদিকে মন দিলে আসল যে জিনিস পড়াশোনা সেটা ভীষণ ভাবে ব্যাহত হয়। সুতরাং গড়াতে গড়াতে অনুর ক্লাসমেট  হয়ে গেছিল। তবে অনু কিন্তু পানুদাকে যথেষ্ট  সম্মান দিয়েই কথা বলতো। শুধু তার দাদার  বন্ধু বলেই নয়, পানুদা ছিল  একটা সত্যিকারের ভাল ছেলে এবং উদো দার একজন পরম চ্যালা। ব্যাগারঠ্যালা কাজ তো আর একা করা যায়না, তারজন্য  দরকার  একটা টিম  যেখানে সবাই  মোটামুটি সম মনোভাবাপন্ন এবং একজনকে তাদের  দলপতি হিসেবে স্বীকার  করে নেওয়া। টিম লিডার বা দলপতি হবার  যোগ্যতা উদো দার তো নিঃসন্দেহে ছিল  এবং তাঁর  চ্যালা চামুন্ডা  হবার  যোগ্যতা পানুদা বা অনুর ও ছিল। 

পানুদা থাকতো আমোদিনী পিসির বাড়ি ছাড়িয়ে পাকুড়তলায়।  ওর বাবার  ছিল  যথেষ্ট  পয়সা। কন্ট্র্যাকটরি,  রেশনের  ডিলারশিপ,  কয়লার  ডিপো ছাড়াও  জমিজমা থেকে রোজগারে একদম  যাকে বলে ফুলে ফেঁপে ঢাঁই। কিন্তু ভদ্রলোক  ছিলেন  খুবই  সাদামাটা, কখনও  উঁচু গলায় কথা বলতেন না , পোশাক আশাকেও ছিলেন খুবই  সাধারণ  কিন্তু ব্যবসায়ী বুদ্ধি ছিল  অত্যন্ত প্রখর। আগের  দিনে সব বাড়িতেই  পাঁচসাতটা ছেলেমেয়ে ছিল খুবই  স্বাভাবিক। আর তাঁর বাড়িতে হাম দো হামারা দোর  তো প্রশ্নই  নেই। কাঁচু দা, পানুদা, পিংলে,  মন্ডা ও যদুরা  ছিল  পাঁচ ভাই আর ছিল  মাঝে রত্নাদি যে অনুর  দিদির  সমবয়সী। পাড়াটা  ছিল  জমজমাট।  সবাই  সবাইকে চিনতো আর জমায়েত  বেশিরভাগ সময়েই  উদো দাদের  মাঠে নয়তো বেলতলায়।  পানুদার বাড়ি যেতে পড়তো ভেলু ঘোষের  বাথান এবং কোরবান শেখদের মসজিদ ।পাকুড়তলা পেরোলেই ছিল  মুসলমান পাড়া। আরও  একটু এগোলেই ছিল  হরি ধোবানির বাড়ি। তার  ডানদিকে ছিল  ভট্টাচার্য পাড়া আর বাঁদিকে চলে গেল রানীবাগান। বহুদিন পর  এদিকে এসেছে অনু, চারদিকে অনেক বাড়িঘর হয়ে গেছে , চেনা জায়গাই  যেন  কেমন অজানা অচেনা  হয়ে গেছে আর যেন  জিজ্ঞেস  করছে কে হে বাপু তুমি, কাকে দরকার? আমোদিনী পিসির  বাড়িটা ছিল  অনেকটা জায়গার উপর। মাটির  বাড়ি হলেও ছাদটা  ছিল  টিনের চাদরে মোড়া। মাঝখানে ছিল  একটা বড় উঠোন  আর অন্যদিকে ছিল  পিসির  মুড়িভাজার  জায়গা। বড় মাটির  খোলায়  কাঠের উনুনে পিসির  চালভাজা,  মুড়ি, ভাজা কলাইএর ডাল, ছোলাভাজা ও জাঁতায় পেষা ছাতুর যে কি দারুণ  স্বাদ বলে বোঝানো যাবেনা। জাঁতায়  পেষা হতো বলে  ছাতুটা মাখার পর একদম চন্দনের  মতন হতোনা কিন্তু সে এক অসাধারণ স্বাদ। পানুদার বাড়ি যাওয়ার মুখে খানিকক্ষণ  দাঁড়ালো অনু কাউকে যদি দেখতে পাওয়া যায়। পিসি তো বহুদিন আগেই  চলে গেছে তবুও  পুরোনো দিনের  কথা মনে করে একটু থামল। এদিক ওদিক  থেকে বেশ কয়েক জোড়া চোখ তার  দিকে লক্ষ্য রাখছে অজানা অচেনা  অনুর  দিকে । কাউকে খুঁজছেন  প্রশ্নে একটু থতমত খেয়ে গেল সে। 
না, কাউকে না, এখানেই  তো আমোদিনী পিসি  থাকতো, তাই না? 
হ্যাঁ, উনি তো বহুদিন  আগেই মারা গেছেন।  তা আপনি কি ওনার কেউ হন? 
 এটা এক মারাত্মক  ধরনের  বাউন্সার। সত্যিই  তো উনি তো  রক্তের  সম্পর্কের  কেউ নন কিন্তু তা সত্ত্বেও  অনেক কিছু। পিসির  যেমন  চেহারা ছিল  তেমনই মানানসই  ছিল তাঁর  রাশভরা  ব্যক্তিত্ব।  মুড়িভাজা বা চালভাজার সময় কেউ কিছু জিনিস  চাইলে সটান বলে দিত, বাপু একটু অপেক্ষা  করতে হবে। সকাল বেলায় স্নান  পূজো সেরে শুদ্ধ  কাপড়ে পিসির চাল বা মুড়ি ভাজা শুরু হতো। বিক্রি করার সময় ছিল  আলাদা। পড়াশোনা না জানা পিসির  কাজের  প্রতি যে নিষ্ঠা ছিল তার সিকিভাগ ও যদি কারও  থাকে তাই যথেষ্ট। এরই  মধ্যে একজন উদো দারই সমবয়সী একজন বিশাল  চেহারার  ভদ্রলোক এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন আর অনুর  দিকে আপাদমস্তক  দেখতে লাগলেন।  
চেনা চেনা লাগছে মনে হচ্ছে। তা আপনাকে তো উদোর বাড়ির  মাঠে দেখলাম মনে হয়। কে বটেন আপনি?
 অনু চিনতে পেরেছে জটু দাকে, একসময়ের  বিখ্যাত  ব্যায়ামবীর  জটু ঘোষ , কমল ভান্ডারীর সময়ের মিঃ জুনিয়র  ইন্ডিয়া। আপনি তো জটু দা। 
হ্যাঁ তাতো ঠিক,  কিন্তু আপনাকে তো ঠিক  মনে করতে পারছি না। 
আমি অনুত্তম, অনু। 
ও হো, এবার  ঠিক  মনে পড়েছে। তা কবে এলা? এখন  কোথায় থাকো? তোমরা তো  বহুদিন  আগে চলে গেছ।  তা, এখন কোথায় এসেছো? 
 মাসিমার বাড়ি, স্বর্ণময়ী  রোডে। 
ও তাই ভাবছি, চেনা চেনা লাগছে কিন্তু মনে করতে পারছিলাম না। 
আপনি কেমন আছেন  জটু দা, এখনও  শরীরচর্চা করেন? 
ওই একটু আধটু, বাড়ির পিছন দিকে ফাঁকা জায়গাটাতেই করি। তা এখানে কাকে খুঁজছো?  
অনেকদিন  পর  এসেছিলাম  এই পুরোন  পাড়াটাকে দেখতে। এসে দেখি উদো দা চলে গেছেন।  তারপর ভাবলাম  পানুদার  সঙ্গে একটু  দেখা করি।
আরে পানু তো অনেকদিন আগেই  এখান  থেকে চলে গেছে। ওদের  ভায়ে ভায়ে গন্ডগোল  হয়ে সবাই  অন্য অন্য জায়গায় চলে গেছে। একমাত্র  কাঁচু  আছে কিন্তু  ওর শরীরটাও  বিশেষ  সুবিধার  নয়।
তা ওদের  এতবড়  ব্যবসা?
সব ছোট ছোট হয়ে গেছে গো। লাঠি যখন  একসঙ্গে বাঁধা থাকে তখন  তার জোরই আলাদা। আর বাঁধন খুললেই তখন  একে অন্যের  শত্রু  হয়ে যায় গো। অত বিশাল  ব্যবসা সব নিজেদের  ঝটাপটিতে  শেষ  হয়ে গেল। পানুটা বিয়ে থা করেনি , ওর এইসব ঝুটঝামেলা ভাল  না লাগায় কোথায় যে চলে গেল কেউ জানেনা গো।

মনটা খারাপ  হয়ে গেল  অনুর। ভাল  মানুষ  হতে গেলে পড়াশোনায় ভাল  হতেই হবে এমন কোন কথা নেই। কত লোক আছে যাদের  মধ্যে অনেক বেশি মনুষ্যত্ববোধ  রয়েছে, যারা ঘরের খেয়ে বনের  মোষ তাড়ায়। তারা নিজের বলে কিছুই  ভাবেনা, অন্যের  বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে অথচ রাজনীতির  ধারও মাড়ায় না ,এইরকম  বিরল প্রজাতির  মানুষ  এখন  ভীষণ  কম, প্রায় নেই বললেই  চলে। এখন হচ্ছে স্বার্থের  যুগ, যতক্ষণ  স্বার্থ  রয়েছে ততক্ষণ  আছে আর তারপরেই  সব ভোঁ ভাঁ। আর একমূহুর্ত থাকতে ইচ্ছা করছিল না অনুর। একবার  যদি কোন জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়া হয় তবে সেই জায়গায় আর ফিরে আসা উচিত  নয়। এলে মোহভঙ্গ  ছাড়া আর কিছুই  হয় না।
নিরুদ্দিষ্টের প্রতি  কাতর আহ্বান  করলেও চারিদিক  থেকে অট্টহাসি ছাড়া  আর কিছুই  শোনা যায়না। যা অতীত,  সুন্দর স্মৃতি যা  মনের  গহনে  রয়েছে  তাকে বর্তমানের লেজার রশ্মির সামনে না আনাই  শ্রেয়।