Friday, 24 June 2022

ভবঘুরে ও বাউণ্ডুলে

ভবঘুরে এবং বাউণ্ডুলে প্রায় সমার্থক হলেও পার্থক্য এদের  মধ্যে যোজনবিস্তৃত। ভবঘুরেরা সাধারণত  চালচুলোহীন, আজ এখানে তো কাল সেখানে,কেউ কিছু খেতে দিলে খায় নাহলে সারাদিন  অনাহারে কাটে। কখনো সখনো কোন অনুষ্ঠান বাড়িতে কিছু খাবার  উদ্বৃত্ত  হলে তারা এদের ডেকে কিছু দিয়ে দেয় আর  খাবার না বাঁচলে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া পাতায় পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট রাস্তার কুকুরগুলোর সঙ্গে মারামারি করে ছিনিয়ে নিয়ে খায়। এদের  জীবনধারণের প্রধান উপায় ভিক্ষা এবং মাঝে মধ্যেই  কোন সংস্থার উদ্যোগে গরীবদের খাওয়ার বন্দোবস্ত  হলে দুটো পেট ভরে খেতে পাওয়া। অনেকেই এই কথা বলেন  যে ভিক্ষা দেওয়া ঠিক  নয় এবং এতে মানুষকে আরও অলস করে তোলে। ঠিক আছে , মানলাম কথাটা। কিন্তু এদের  কর্মমুখী করবে কে? কে এদের  কাজের  ব্যবস্থা করবে, কি করে এদের  পেট চলবে একটু দয়া করে বলে দেবেন? প্রত্যেক  সরকারেই  একটা সমাজকল্যাণ দফতর থাকে এবং একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত  মন্ত্রীও  থাকেন কিন্তু বুকে  হাত দিয়ে কজন বলতে পারবেন  যে এই দফতরের  সমস্ত লোকই হৃদয়বান? কিছু কাজ তো নিশ্চয়ই  এদের করতে হয় লোক দেখানোর  জন্য  কিন্তু ঐ খাতে বরাদ্দ  টাকা কতটা তাদের  উদ্দেশ্যে ব্যবহার  হয় তাতে যথেষ্ট  সন্দেহ  আছে। এর বেশীরভাগ টাকাটাই নেতা, মন্ত্রী ও সরকারি আমলাদের রমরমাতেই চলে যায়, নামমাত্র  এদের  উন্নয়নের জন্য  ব্যবহার হয়। কথাটা সত্যিই  এবং তার থেকেও  বেশী তেতো। এটা সমস্ত দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য,  কোথাও  একটু ভাল তো কোথাও  চোখে পড়ার মতো নয়। মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্টের মতো শহরে কিছু কাজের  ব্যবস্থা কি করা যায় না? সবই সম্ভব  যদি থাকে সদিচ্ছা। শহরের  এই বিরাট  কর্মহীন গরীবদের  জন্য কিছু কর্মসংস্থান কিভাবে করা যায় তারজন্য সমাজবিজ্ঞানীদের  সাহায্য নেওয়া হোক। এরজন্য  থিওরিসর্বস্ব জ্ঞানীগুণীর প্রয়োজন  নেই, দরকার  বাস্তব সম্মত প্রকল্প এবং এই বিশাল কর্মযজ্ঞে তাদের  সামিল করা। এইপ্রসঙ্গে একজনের  কথা ভীষণ ভাবে মনে পড়ছে এবং তিনি হচ্ছেন  আজকের  আমূলের( আনন্দ মিল্ক ইউনিয়ন লিমিটেড) স্রষ্টা শ্রী ভার্গিস ক্যুরিয়েনের। উনিশশো ছিচল্লিশ সালে ভারতবর্ষের  সহকারী প্রধানমন্ত্রী সর্দার  বল্লভভাই প্যাটেলের অনুপ্রেরণায়  শ্রী ত্রিভুবনদাস প্যাটেলের উদ্যোগে গড়ে ওঠে গুজরাট মিল্ক মার্কেটিং ফেডারেশন।  তিনিই  আনেন  শ্রী ক্যুরিয়েনকে জেনারেল ম্যানেজার  হিসেবে এবং যদিও  তিনি জীবনের  শেষ দিন পর্যন্ত  চেয়ারম্যান ছিলেন কিন্তু এর সমস্ত  পরিচালন ভার শ্রী ক্যুরিয়েনের উপর ন্যস্ত করেন। তাঁর মৃত্যুর  পর সর্বময় কর্তা হন শ্রী ক্যুরিয়েন এবং তাঁর  স্বপ্ন সাকার করতে সমস্ত সদস্যদের উজ্জীবিত করেন  এবং তার ফলস্বরূপ  আজকের  বিশ্বের  বৃহত্তম  দুধ প্রস্তুতকারী এবং অষ্টম  বৃহত্তম দুধ ও ডেয়ারিজাত সামগ্রীর  সংস্থা। এইরকম  বিশাল  কর্মযজ্ঞে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে দরকার  অনেক ভার্গিস ক্যুরিয়েনের কিন্তু সমস্ত ক্ষেত্রেই অদূরদর্শী রাজনৈতিক নেতাদের  হস্তক্ষেপ এই কর্মযজ্ঞের অন্তরায়।

অন্যদিকে বাউণ্ডুলে হচ্ছে তারা যারা ঘরের  খেয়ে বনের  মোষ তাড়িয়ে বেড়ায়। তাদের ঘরে খাবারের  চিন্তা না থাকায় তাদের  মুখে মারিতং জগত। অবশ্য  কোন কোন সময় এরাও সমাজের  অনেক উপকারে আসে। যেমন অনেক  সংস্থা মাঝেমধ্যেই  এই ভবঘুরেদের খাওয়ানোর  বন্দোবস্ত করে বা জামাকাপড় দেয়, তখন  এই সংস্থার  সাফল্যের  পিছনে অনেক  বাউণ্ডুলেরই অবদান  থাকে। এরা সবসময় যে রাজনৈতিক  ছত্রছায়ায় থাকে তা নয়, অনেক ক্ষেত্রেই  তারা অন্যের বিপদে এগিয়ে আসে। সুতরাং কেউই ফেলনার  নয়। শুধু দরকার কাকে দিয়ে কি কাজ করানো যায় সেইসম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারণা।

সরকারী উদ্যোগেই সমস্ত  কাজ হয়ে যাবে এটা আশা  করা ভুল। বেসরকারী সংস্থার ও হাত বাড়ানো দরকার।  রামকৃষ্ণ মিশন,  ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ এবং আরও  অনেক  স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই ভাল কাজে এগিয়ে আসে কিন্তু জনসাধারণের মধ্যে এই সার্বিক ভাবে সাহায্য  করার মনোভাব যতদিন  না জাগবে  ততদিন সুন্দর সমাজ গড়ার স্বপ্ন কোনদিন ই  বাস্তবায়িত হবেনা।

No comments:

Post a Comment