Wednesday, 29 June 2022

নতুন সূর্যের প্রতীক্ষায়

আর কয়েকদিন  বাদেই আঠারই জুলাই  আমাদের  দেশ ভারতবর্ষে পঞ্চদশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে। এইবার আমরা এক অভূতপূর্ব  জিনিস লক্ষ্য করতে চলেছি যেটা হচ্ছে এই প্রথম এক আদিবাসী ভদ্রমহিলার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ  করা এবং কোন অঘটন না ঘটলে তাঁর এই বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের  পনেরতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়া। এইবার একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক এই উপজাতির পূর্ব  ইতিহাস  খোঁজার জন্য। ইতিহাসের  বই খুঁজলে তাদের সম্বন্ধে হয়তো কিছুটা জানা যাবে কিন্তু তাদের জীবন যাপন সম্পর্কে কিছু ভাসাভাসা খবর জানা যাবে যদি না লেখকের সম্যক জ্ঞান না থাকে।

খুবই কাছ থেকে তাদের  জীবন যাপন করতে দেখার  সুবাদে সামান্য কিছু  সংযোজন করার  চেষ্টা করছি যদিও তা কতটা ফুটিয়ে তুলবে  সেটা সম্বন্ধে যথেষ্ট  সন্দেহ আছে। তবুও সামান্য প্রয়াস। আঠারশো সাতান্ন খ্রীষ্টাব্দের ও বছর দুই আগে অর্থাৎ আঠারশো পঞ্চান্ন সালে  তিরিশের জুন সাঁওতালদের হুল বিদ্রোহ হয়েছিল  যার পুরোভাগে  ছিলেন মুর্মু ভাইবোনেরা । তাঁরা হলেন  সিধু, কানু,  চাঁদ এবং ভৈরব মুর্মু এবং তাঁদের  দুই বোন ফুলো ও ঝানো। তখনকার  সমাজের  মাথাদের ও ব্রিটিশ  শাসকের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল সিধু কানুদের  নেতৃত্বে ষাট হাজার  সাঁওতাল তাদের  তীরধনুকের  উপর ভরসা করে। কিন্তু আগ্নেয়াস্ত্রে বলীয়ান ইংরেজরা তাদের  দমন করতে সফল হয় এবং সিধু  ও কানু বীরগতি প্রাপ্ত হয়। কিন্তু বিদ্রোহের বীজ তারা বপন করে যায় এবং সিপাহী বিদ্রোহের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে যায়।
শাসকের শোষণনীতি  যদি অব্যাহত থাকে তাহলে মনের মধ্যে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুনের  বহিঃপ্রকাশ হবেই সে আজ হোক বা কাল হোক। ব্রিটিশ সরকার তাদের  চিন্তাধারা বদলাতে বাধ্য  হয় এবং এদের সামগ্রিক  উন্নয়নে মাথা ঘামাতে  শুরু করে। তাদের উন্নয়নের জন্য  তাদের  থেকেই গ্রাম প্রধান  বা মোড়লের  সৃষ্টি করেন এবং তাদের  হাতে ট্যাক্স  সংগ্রহ করার অধিকার ও দেওয়া হয়। তাদের  জন্য  বরাদ্দ  জায়গা  যাতে  অন্য কেউ অধিগ্রহণ  করতে না পারে সেটার জন্য ও আইন প্রণয়ন করে। এখনও  সেই ধরণের  আইন বলবত আছে যে ট্রাইবাল (আদিবাসী অধ্যুষিত  এলাকাতে)এরিয়াতে  ট্রাইবাল( আদিবাসী) ছাড়া অন্য  কেউ জমির  মালিক  হতে পারবে না। এই আইনের  ভাল  ও মন্দ উভয় দিক ই রয়েছে। ভাল দিক হলো এতে আদিবাসীদের মূল কাঠামো অপরিবর্তিত  থাকবে  কিন্তু খারাপ  দিক  হলো এই ব্যবস্থায় তারা  আধুনিকতম  সুযোগ সুবিধায় বঞ্চিত থাকতে পারে। কিন্তু এইখানেই  সরকারের  একটা বিশেষ  ভূমিকা রয়েছে। আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের  তত্ত্বাবধানে যদি সামগ্রিক উন্নয়নের  ব্যবস্থা করা যায় তাহলে তাদের মূলকাঠামো অপরিবর্তিত  রেখে তাদের আরও  আধুনিক পরিষেবা দেওয়া যায়।
বিশাখাপটনম স্টিল প্ল্যান্টের ব্রাঞ্চে পোস্টিং থাকার সুবাদে এদের জন্য  কিছু কাজ করার  সুযোগ  এসেছিল।  স্টিল প্ল্যান্টের  জেনারেল  ম্যানেজার একদিন বললেন  যে তাঁদের  বহু কর্মী ও অফিসার যাঁরা আরাকুভ্যালি ও পার্বতীপূরম এলাকার  (আদিবাসী এলাকা) অধিবাসী  এবং  তাঁদের  বাড়ি তৈরির জন্য  ব্যাঙ্ক থেকে কোন রকম ঋণ দেওয়া যায় কিনা। ব্যবসা বৃদ্ধির  একটা বিরাট  সুযোগ হাতছাড়া করার  ইচ্ছা ছিলনা কিন্তু আদিবাসীদের  ছাড়া আর কাউকে বিক্রি করা যাবেনা শুনে একটু মনটা দমে গিয়েছিল  কিন্তু আশা একদম ছেড়ে  দিইনি। তাঁরই  অধীনস্থ  একজন সহকারী জেনারেল ম্যানেজারকে নিয়ে  রওনা দিলাম  আই টি ডি এর(ইন্টিগ্রেটেড ট্রাইবাল  ডেভেলপমেন্ট অথরিটির) উদ্দেশ্যে। তিনি একজন  জয়েন্ট কালেক্টর,  সুতরাং যথেষ্টই  ক্ষমতাবান।  তিনি আশ্বাস  দিলেন যে সরকার  একটা গ্যারান্টির ব্যবস্থা করবে এবং তাঁরাই ঋণ অপরিশোধিত  থাকলে অন্য কোন আদিবাসীদের  বিক্রির  ব্যবস্থা করবেন এবং একান্তই  অবিক্রিত থাকলে তাঁরাই ব্যাঙ্কের  ঋণ পরিশোধের  ব্যবস্থা করবেন।  সমস্ত কথাবার্তা হবার  পর হেড অফিসে প্রপোজাল  পাঠানো হলো কিন্তু ইতিমধ্যেই  বদলির নির্দেশ আসায় আর কিছু করা সম্ভব  হয়ে ওঠেনি এবং তার  ভবিষ্যত  যে কি হয়েছে তাও জানিনা। সকলের  ঐকান্তিক  উদ্যোগ না থাকলে কোন কিছু করাই অসম্ভব হয়ে ওঠে। যে কোন নতুন  উদ্যোগ  নেওয়ার  আগে সবাইকে সেই বিষয়ে অবহিত করা বিশেষ  প্রয়োজন।  অনেকের ই কোন  স্বচ্ছ ধারণা না থাকায় সে বাধার সৃষ্টি করে এবং অহমিকা বশত প্রকল্প  যাতে  বাস্তবায়িত  না হতে পারে তার জন্যও সর্বতোভাবে  চেষ্টা করতে থাকে। 

বছর পঞ্চান্ন ষাট আগের কিছু ব্যক্তিগত  অভিজ্ঞতার  কথা বলা যাক। আমরা তখন  স্কুলে পড়ি। বিবেকানন্দ ব্যায়াম সমিতিকে ডান হাতে রেখে টেক্সটাইল  কলেজের  দিকে যেতে কৃষ্ণনাথ কলেজের  মেন হোস্টেলের  উল্টোদিকে বড় বড় জারুল গাছের  নীচে কয়েক ঘর সাঁওতালদের বাস ছিল। গাছের ডাল থেকে ঝোলানো ঝুড়িতে তাদের  কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র থাকতো। মাঝে মাঝেই  দেখতাম  সেখানে তাদের  বাচ্চাকে শুইয়ে  দিয়ে তারা কাজকর্ম  করতো। গাছের  তলে পরিষ্কার  করে সুন্দর ভাবে নিকানো  থাকতো ঐ জায়গাগুলো। একটু বড় বাচ্চাগুলো ঐখানেই  খেলা করতো আর খুব ছোট শিশুরা ঝোলানো ঝুড়িতে শুয়ে থাকতো। কোন বাড়িতে কিছু পরিষ্কার  করার কাজ থাকলে তাদের ডাকা হতো এবং নামমাত্র  মজুরিতে  তারা কাজ করতো। ছেলেদের  মজুরি ছিল দেড় টাকা এবং মেয়েদের ছিল  একটাকা বা পাঁচ সিকে। বহরমপুর শহরে তখন  গাছগাছড়ার  অভাব ছিল না আর তার সঙ্গে  ছিল  নানাধরণের পাখি। ওরা তীর ধনুক নিয়ে  পাখি শিকার  করতো আর দিনের  শেষে শুকনো কাঠকুটো জ্বালিয়ে তারা রান্নাবান্না করতো। তারা কত কষ্ট করে থাকে  সেইসময় কোন ধারণাই ছিলনা। কিন্তু এত কষ্টের মধ্যেও  তাদের  কালো কোঁদা চেহারার  মধ্যে যে চমক ছিল  তা ভাবলেই  কেমন আশ্চর্য  লাগে। এত অযত্নের মধ্যেও  কালো নিখুঁত  শরীরে এত জ্যোতি কোথা থেকে আসে সেটা নিশ্চয়ই  গবেষণার বিষয়। এখন ছেলেমেয়েদের  মধ্যে নানাধরণের  ক্রীম ব্যবহার  বেড়েছে বটে কিন্তু চামড়ার  সেই উজ্জ্বলতা কোথায়?  স্কুলে পড়ার সময় থেকেই কিছু সামাজিক  দায়িত্ব পালন করতে শিখেছি। আমাদের  পাড়ার ক্লাবের  নাম ছিল  কিশোর  সংঘ এবং  আমাদের  একটা লাইব্রেরি ছিল। অসীম,  প্রদ্যুত,  দেবী , বাসুকি,অরূপ, চিত্ত, নান্টি ( ভাদুড়ি নামেই বেশি পরিচিত  ছিল), বুলান দাকে নিয়ে ছিল  আমাদের  ক্লাব। পাড়ার  সমস্ত  বাড়ি থেকে বাড়তি বইগুলো নিয়ে লাইব্রেরির  যাত্রা শুরু। মুসলমান পাড়ায় চিত্তদের একটা বাড়ি খালি পড়েছিল  এবং চিত্তর বাবার   সম্মতিতে ঐ বাড়িতেই  শুরু হলো লাইব্রেরি। তারপর প্রদ্যুত এবং ভাদুড়ির অক্লান্ত  পরিশ্রমে পাড়ার সব বাড়ি থেকে চাঁদা তুলে লাইব্রেরির  কলেবর বৃদ্ধি  করা হতে লাগল এবং লাইব্রেরির জন্য  কোন পয়সা নেওয়া হতোনা। এরপর  ঠিক  হলো যে বিনাপয়সায় লোকের  চিকিৎসার  ব্যবস্থা করতে হবে। একজন  খুব ভাল বৃদ্ধ হোমিওপ্যাথ ডাক্তার বাবুর  খোঁজ  পাওয়া গেল। তিনিও  আমাদের  উদ্যোগকে সমর্থন  জানালেন। সকলের  সমর্থনে বিনা পয়সায় রোগীদের  হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার  ব্যবস্থা হলো। এরপর আমরা ডাক্তার  রজত ঘোষের  বাড়ির  পাশে কাশিমবাজারের মহারাজের  একটা ছোট্ট  দেড়কাঠা জমি শ্রী সৌমেন নন্দী মহাশয়ের  কাছে দান হিসেবে চাইলাম  এবং তিনিও  সানন্দে সম্মতি দিয়ে ক্লাবকে দান করলেন।  এরপর শুরু হলো ক্লাবের  নিজস্ব  বাড়ি তৈরির উদ্যোগ।  কারো কাছে ইট, কারও কাছে বালি, কারও কাছ  থেকে সিমেন্ট  বা লোহার  রড নিয়ে শুরু করা হলো বাড়ি তৈরির কাজ। নিজেরাও হাত লাগিয়েছি এবং এই সাঁওতালদের থেকেই  জন মজুরের  কাজ করিয়েছি কিন্তু একজন অভিজ্ঞ  রাজমিস্ত্রির সহায়তা নিয়েছি নামমাত্র  পারিশ্রমিকে।  উগ্রবাদীদের টাকার  জুলুম  সমবেতভাবে প্রতিরোধ  করেছি এবং কারও  পক্ষে একটা টাকা নেওয়াও  সম্ভব  হয়নি। এরপর পাশ করে বেড়িয়ে যাওয়ার  পর ঐ ক্লাবের  বাড়ি বিক্রি করে অন্য জায়গায় বড় জায়গা কেনা হয়েছে কিন্তু সময়ের সঙ্গে চিন্তাধারার  আমূল পরিবর্তন  হওয়ায় এইরকম  সমাজ সেবামূলক  কাজ বন্ধ  হয়ে গেছে এবং কেবল পাড়ার  পূজো হওয়া ছাড়া আর কোন  কাজ  হয় বলে জানা নেই।কর্মসূত্রে অনেক  আদিবাসী সহকর্মীদের  পেয়েছি এবং তারাও  যথেষ্ট  দক্ষতার  সঙ্গে তাদের কর্তব্য  পালন  করেছে এবং আজও  করছে। তাদের অনেকেই  রিটায়ার  করে গেছে এবং তাদের  ছেলে মেয়েরাও  যথেষ্ট  উচ্চশিক্ষা লাভ করে অনেকেই উঁচুপদে অধিষ্ঠিত। 

একটা কথা ভেবে খুব ভাল  লাগে যে একসময় যারা ছিল  অবহেলিত আজ তারা নিজেদের  চেষ্টায় এবং সরকারি সহযোগিতায় আজ তারা সামনের  সারিতে আসতে পেরেছে। শ্রী গিরীশ চন্দ্র মুর্মু আজ ভারতবর্ষের  কম্পট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেল।  তার আগে তিনি জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্য প্রশাসক হিসেবে  দায়িত্ব পালন করেছেন।  এইরকম নানাধরণের বিভিন্ন  কাজে তাঁরা দায়িত্ব পালন করছেন  এবং ভারতবর্ষ  তার অভীষ্ট লক্ষ্যে নিশ্চয়ই পৌঁছতে পারবে। আগামী একুশে জুলাই আমরা জানতে পারব যে আমাদের  দেশের  প্রথম নাগরিকের  আসন এই আদিবাসী রমণী অলঙ্কৃত  করেন  কিনা এবং আমরা জাতপাত ধর্মের  উপর উঠতে পারব কিনা।


No comments:

Post a Comment