তখন টুকে পাশ করাটাও একটা শিল্পের পর্যায়ে ছিল। মনোজের মতন কিছু ছেলে ছিল যারা না টুকলে কিছুতেই পাশ করতে পারত না। সুজন দা, পেলু দারা যতটা সময় চোতা তৈরী করতে ব্যয় করতো, তার অর্ধেক সময় পড়াশোনার জন্য দিলে আরামসে পাশ করে যেত। সাধন বাবু নতুন এসেছেন স্কুলে, ভীষণ কড়া ধাতের মানুষ। পরীক্ষার সময় কাউকে ঘাড় ঘোরাতেও দেননা। সুজন দা, পেলু দারা ছিলেন জাত টুকলি মাস্টার। স্কুলের সমস্ত মাস্টার মশাইরা জানতেন যে এরা সারা বছর যেমন টো টো করে ঘুরে বেড়ায় তাতে না টুকলে এরা কিছুতেই পাশ করতে পারবে না। সত্যি সত্যিই তাঁদের সকলের চোখ এড়িয়ে গিয়ে সুজন দারা টুকলি করতো কিনা একটু সন্দেহ আছে। মাস্টার মশাইরা হয়তো জানলেও কিছু বলতেন না বা তাঁদের চোখ এড়িয়েই এদের শিল্পকর্ম চলতো। কিন্তু মনোজ না ছিল সুজন দাদের মত শিল্পী না ছিল পড়াশোনায় দড়। সুতরাং যা হবার, তাই হয়েছে। কিন্তু এহেন শিল্পীরাও সাধনবাবু আসার পরে হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় একেবারেই গোল্লা কারণ সাধন বাবুর কাছে ট্যাঁ ফোঁ করার কোন যো ছিলনা আর তার উপর তিনি ছিলেন ট্যারা। ট্যারারা নানান ধরণের হয়। ওঁর চোখের মণিদুটোই বহির্মুখি হবার কারণে এরা ঠাউরাতে পারেনি যে উনি কোন দিকে তাকাচ্ছেন। কিন্তু এরা হচ্ছে জাত ধুরন্ধর। ওঁর জাল কেটে বেরোনো এদের কাছে প্রায় নস্যি। একবার হেরে গেছে বলে বারবার হার, এ কিছুতেই হতে পারেনা। সুজন একবার বাঁদিকে প্রশ্নপত্র ধরে যেন বুঝতে পারছেনা এইভাবে সাধন বাবুকে জিজ্ঞেস করল আর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চোখের মণির অবস্থান লক্ষ্য করল। আরও একটা অন্য প্রশ্নে কি বলতে চাইছে এটা জানতে চেয়ে সে ডানদিকে প্রশ্নপত্রটা ধরল আর খুবই সূক্ষ্মভাবে তাঁর চোখের মণির অবস্থান লক্ষ্য করল। তার পরের ঘটনা খুবই সরল। শিল্পীদ্বয় ধাঁধার সমাধান ততক্ষণে করে ফেলেছে এবং হাফ ইয়ার্লির হারের বদলা সুদে আসলে মিটিয়ে নিয়েছে বার্ষিক পরীক্ষায়। রতন বাবু খুব কম কথা বলতেন কিন্তু যখন বলতেন তখন সবাই তাঁর কথা মন্ত্রমুগ্ধের মতন শুনতেন। ফাইনাল রেজাল্ট বেরোনোর আগের দিন টিচার্স মিটিং হতো যেখানে হেড মাস্টার মশাই সমস্ত মাস্টার মশাইদের সঙ্গে আলোচনা করতেন পাশ ফেলের ব্যাপারে এবং সেখানে ক্লাস টিচারের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো কোন ছেলে কোনও কারণে রেজাল্ট খারাপ করে ফেলেছে তাকে পাশ করানো হবে কি হবেনা সেখানে হেড মাস্টার মশাই অন্যান্য মাস্টার মশাই বিশেষ করে ক্লাসটিচারকে জিজ্ঞেস করতেন। সেই মিটিংয়ে রতনবাবু বলে উঠলেন, "তাহলে এই বাঁদরগুলো সাধনবাবুকেও হার মানালো।" আর বিশেষভাবে কিছু বললেন না কিন্তু সবাই বুঝলেন যে তাঁর মন্তব্যের লক্ষ্য সুজন ও পেলু।
কলকাতার পকেটমাররাও এক একজন বড় শিল্পী ছিলেন। বাসে ট্রামে বা পথচলতি জনতার পকেট মুহুর্তের মধ্যে ফাঁকা করে দিতে এদের জুড়ি ছিল না। কিন্তু তাদের সেই মগজের ব্যবহার ও একটা শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছেছিল কিন্তু এখন তো সেটাও নেই, সেই শিল্পকর্ম আজ লুপ্ত হয়ে গেছে এখনকার গাজোয়ারির কাছে। এখন একটা ছুরি বা পিস্তল বুকে ঠেকিয়ে সমস্ত জিনিস কেড়েকুড়ে নিচ্ছে। শিল্প এখন পিছনের সিটে। এখন ছাত্ররা টোকা টুকির শিল্প হারিয়ে একটা ছোরা বা পিস্তল দেখিয়ে খোলাখুলিভাবে টুকে চলেছে আর এর পরে ও পাশ করতে না পারলে ঝাণ্ডা ধরে বলছে পাশ করিয়ে দিতে হবে। অথচ সাংবাদিকরা যখন তাদের সহজ সরল ইংরেজি বানান জিজ্ঞেস করছে তারা এর ওর মুখের দিকে চাইছে। কি পরীক্ষা দিচ্ছে তাও তারা জানেনা । কি হবে এদের পাশ করে বা পাশ করিয়ে দিয়ে? একটা কাগজের শংসাপত্র কাছে থাকা ছাড়া আর বেশি কি? এদের দাদাদের ধরে কাকে মারতে হবে, কাকে ভয় দেখাতে হবে এসব ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না। এছাড়া আর কি হবে? বরং যদি হাতে কলমে কিছু কাজ শেখে তাহলে দাদাদের না ধরেও মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে।
ছেলেমেয়েদের উস্কানি দিয়ে উত্তেজিত করা খুবই সহজ কাজ। তারা বাসে ট্রেনে আগুন দিয়ে দেশের সম্পদ নষ্ট করবে আর এই রাজনৈতিক দাদারা তাঁদের ছেলেমেয়েদের বাইরে পাঠিয়ে উচ্চ শিক্ষিত করে এইআমজনতার মাথায় বসিয়ে দিতে পারবে। কবে যে এঁরা দলের কথা না ভেবে দেশের কথা ভাববেন সেটাই দেখার বিষয়।
No comments:
Post a Comment