জীবনের অপর নাম গতি । জীবন যখন গতিহীন হয়ে যায়, তখনই ঘটে মৃত্যু। মানুষ যতক্ষণ চলাফেরা করছেন ততক্ষণ তিনি অমুক বাবু বা তমুক বাবু আর স্পন্দনহীন নিথর দেহটা তার নাম গোত্র হারিয়ে হয়ে যায় বডি। ছোটবেলা থেকেই দুরন্ত, এখানে ওখানে যেতে হলেই দে ছুট, পাড়ার লোকজন বলত ঘোড়া। একটু বড় হতেই সাইকেলের প্রতি আকর্ষণ। জোরে সাইকেল চালিয়ে এখান থেকে সেখান, ভিড়ের মধ্যেও কাটিয়ে কুটিয়ে কাউকে ধাক্কা না মেরে সবার আগে গন্তব্যে পৌঁছানোর এক আলাদা তৃপ্তি। কে কি বলল বা কেউ মেডেল দিল কি দিলনা তাতে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই, নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ানো আর কি। আরও বড় হয়ে স্কুটার বা মোটরসাইকেল নিয়ে তীব্রগতিতে পৌঁছে যাওয়াতেই যেন দারুণ তৃপ্তি। এককথায় জীবনকে গতিময় করে তোলা যেন নিজের কাছে এক চ্যালেঞ্জ।
স্কুলে পড়াকালীন ইংরেজিতে রচনা লিখতে হতো "এ জার্নি বাই ট্রেন" এবং " এ জার্নি বাই বোট"। মাঝে মাঝেই ধাঁধায় পড়ে যেতাম যখন বন্ধুদের মধ্যে আলোচনা শুরু হতো যে কোনটা বেশি আনন্দ দায়ক। আমার তো দুটোই দারুণ লাগে কিন্তু কোনটা বেশি ভাল লাগে তা নিয়ে ধন্দেই থাকতাম। আসলে বেড়ানোর মধ্যেই আনন্দ। যখন ট্রেনে যাই তখন মনে হয় আহ্ এর মতন মজা আর হয়না বিশেষ করে যদি থার্ড ক্লাসে ( বর্তমানে যেটা সেকেন্ড ক্লাস কিন্তু তাতে কোন গদি আঁটা থাকত না) যাওয়া হতো। খটখটে কাঠের বেঞ্চ মাঝে মাঝে ফাঁক, ওপরে একটা বাঙ্ক এবং তারও ওপরে লোহার শিক দিয়ে তৈরী আরও একটা ছোট বাঙ্ক। জেনারেল কম্পার্টমেন্ট হলে তো কথাই নেই, গাদাগাদি ভিড়, পায়ের কাছে বসে লোক, প্যাসেজে বসে লোক, বাথরুম যেতে হলে ত্রাহি ত্রাহি রব। এর গায়ে লাথি,ওর কোমরে ধাক্কা, বিভিন্ন লোকের গায়ে বিভিন্ন রকম গন্ধ ( অবশ্যই সুখকর নয়) সবকিছু সয়ে বাথরুম যদি বা পৌঁছানো গেল দেখা গেল সেটা ভেজানো। ল্যাচটা ঘুরিয়ে ঢোকার চেষ্টা করতেই ভিতর থেকে এক অস্ফূট আর্তনাদ,
" উঁহু, আমি আছি" । তা ভাল কথা , ভেতরে আছ তো ছিটকিনিটা দাওনি কেন বাপু বলে মনে মনে গজরাতে থাকা। এত কষ্টে মরুতীর্থ হিংলাজ হয়ে এসে নিজেকে ঠিক রাখা যে কত কঠিন কাজ সেটা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ জানেনা। ভেতরের লোক বেরোনো মাত্রই একে তাকে গুঁতো মেরে সেঁদিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়া এবং তার পরেই বিপদের মাত্রা অনুধাবন করা। ছিটকিনিটা আছে কিন্তু যেখানে ছিটকিনিটা আটকাবে সেটা নেই বা থাকলেও সেখানে আটকাচ্ছে না। এহেন পরিস্থিতিতে মাথা খাটিয়ে কার্যসিদ্ধি হলে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন হওয়া উচিত। তারপর বীরের মত বাইরে এসে আবার যুদ্ধ করতে করতে নিজের জায়গায় ফিরে যাওয়া। যাবার সময় যাদের গায়ে পা লেগেছিল তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে নিজের পাপস্খালন করা। জায়গায় বসেই অসমাপ্ত কথা বা গল্পের ফের শুরু করা। এর মধ্যেই বিভিন্ন ফেরিওয়ালার ভিন্ন স্বাদের বিপণন এবং এটা সেটা করতে করতে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যাওয়া। এত কষ্টের মধ্যেও আনন্দটা ছিল একেবারেই বিশুদ্ধ নির্মল। তখন মোবাইল বলে কোন জিনিস হতে পারে এটা স্বপ্নেও ভাবতে পারা যেতনা কিন্তু স্মৃতিশক্তি ছিল বড়ই প্রখর এবং নাম ধাম গোত্র সবই যেন মনে থাকত যদিও ভবিষ্যতে আর কোনদিন তার সঙ্গে দেখা হবে কিনা সন্দেহ। এখন রিজার্ভ কম্পার্টমেন্টে যাতায়াত, লোকের সংখ্যা সীমিত কিন্তু বন্ধুত্ব বা আলাপ ঐ ক্যুপের মধ্যেই সীমিত থাকে ,সাইড বার্থেও পৌঁছায় না যদি না তাঁরা পূর্ব পরিচিত না হন। ফার্স্ট ক্লাস ( যা আজকাল উঠেই গেছে) বা এ সি টু টায়ার বা এ সি ফার্স্ট ক্লাসে সেই মজাটা পাওয়া যায়না, সবাই গোমরামুখো হয়ে তাদের স্টেটাস সিম্বল জাহির করে। কেউ কারো সঙ্গে আগ বাড়িয়ে কথা বলবে না পাছে যদি সে ছোট হয়ে যায়। গপ্পিষ্ঠি লোকের পেট ফুলে যাওয়ার অবস্থা। সুতরাং সাধারণ লোক আমার অবস্থা সহজেই অনুমেয়। আমি সেকেন্ড ক্লাসে খুব স্বচ্ছন্দ যেখানে কথা বলতে বলতে গন্তব্য স্থলে পৌঁছাতে পারি।
সাঁতার না জানায় বরাবরই জলে আমার বড্ড ভয়। বাড়ির কাছে গঙ্গা থাকলেও বাড়ির নিষেধে গঙ্গাস্নান হতোনা যদি না কাউকে দাহ করতে যেতে হতো বা ঘাটে পিণ্ডদান করতে হতো। প্রতিমা বিসর্জনের সময় ও কড়া হুঁশিয়ারি, গঙ্গায় নামা চলবে না। সুতরাং নৌকায় চড়া, এটা অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু যেখানেই বাধা নিষেধ সেখানেই তীব্র আকর্ষণ। ফরাক্কা ব্যারেজ হবার আগে গঙ্গা ছিল শীর্ণ, বেশিরভাগ জায়গায় জল থাকত হাঁটু পর্যন্ত। কিন্তু কোন কোন জায়গায় জল থাকত বেশ গভীর। এইরকম ই একটা জায়গা ছিল রাধারঘাট। তখন ওখানে ব্রিজ হয়নি, গাড়ি ঘোড়া সব পেরোত ঐ রাধারঘাটের অস্থায়ী কাঠের ব্রিজ দিয়ে। বর্ষার সময় যখন গঙ্গা টইটুম্বুর তখন কাঠের ব্রিজ আর থাকত না এবং তখন বড় বড় নৌকা জোড়া দিয়ে গাড়িগুলো চলাচল করত আর সাধারণ মানুষের জন্য ছিল নৌকা ও মাঝি। রাধারঘাটের অন্য পাড় থেকে ছাড়ত কান্দি যাওয়ার বাস। ওখান থেকে যেতে হতো খাগড়াঘাট স্টেশন যেখান থেকে হাওড়াগামী বা হাওড়া থেকে উত্তরবঙ্গ বা আসাম যাওয়ার ট্রেন ধরতে হতো। ফরাক্কা স্টেশন পৌঁছে গঙ্গা পেরোতে হতো স্টিমারে এবং অন্য পাড়ে গঙ্গার চর পেরিয়ে মালদহ বা উত্তরবঙ্গের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে উঠতে হতো। যেখানেই বাধা সেখানেই আকর্ষণ। অতএব নৌকায় চড়ে ভরা গঙ্গা এপার ওপার করার মধ্যে ভয় থাকলেও তীব্র আকর্ষণ ও ছিল। সুযোগ জুটে গেল।ক্লাব থেকে নৌকায় লালবাগ ও নসীপুর যাওয়া হবে। বহরমপুর থেকে লালবাগ যেতে হলে স্রোতের বিপরীতে যেতে হয় , সুতরাং শুধু দাঁড় বেয়ে যাওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার ছিল। সুতরাং দাঁড় টানা মাঝি ছাড়াও আরও দুজন মাঝি গুণ টানতো। নৌকার পালে লম্বা দড়ি বেঁধে দুজন মাঝি গঙ্গার পাড় বরাবর টানতে টানতে যেত কিন্তু ফেরার সময় গুণ টানার দরকার পড়ত না কারণ তখন স্রোতের পক্ষে নৌকা চলত। নৌকার ছই এর মধ্যে বসে থাকা এবং নৌকার মধ্যেই রান্না করে খাওয়ার এক আলাদাই মজা। এখানে যেহেতু সবাই চেনাজানা গল্পের পরিধিও ছিল সীমিত। কিন্তু গঙ্গার বাতাসে যাত্রা নিত এক অন্য মাত্রা। হৈ হৈ করে কয়েক ঘন্টা কিভাবে কেটে যেত কিছুই বোঝা যেতনা। এর পরেও জল বিহার হয়েছে বিভিন্ন সময়ে কোন সময় লঞ্চে বা ক্রুজে এবং আনন্দ ও হয়েছে অসামান্য।
ভ্রমণ যাদের প্রিয় তাদের কি ট্রেন বা কি নৌকা বা লঞ্চ সবই আনন্দ দায়ক। তাই কোনটা বেশি ভাল সেটা বলা মুশকিল।
No comments:
Post a Comment