ঠিক বলেছো, একটা উপায় বের করতেই হবে। এরই মধ্যে অনেকবার আমাদের ই সামলাতে হয়েছে। সূর্যর মাথায় খেলতো নানাধরণের বুদ্ধি। একদিন সুযোগ বুঝে মহারাজের কাছে ব্যাপারটা উত্থাপন করল। আমাদের এই প্রত্যেক মাসের কাজের পর্যালোচনা এখানে না করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে করলে কেমন হয়? "খরচটা তাতে কি বাড়বে না কমবে?" , মহারাজের প্রশ্ন।
সূর্যর চটজলদি উত্তর, " এটা ঘোষের কাছেই জানা যাক।"
তলব হলো আমার। সব কিছুই প্ল্যান মাফিক চলছে। হাজিরা দিতেই ধেয়ে এল প্রশ্ন। চিন্তান্বিত মুখে বললাম, "একটু সময় দিন, আমি হিসেব কষে বলে দিচ্ছি।" খানিকক্ষণ পরে বললাম, " মহারাজ, খরচ খানিকটা কমই হবে। "
"কি করে?"
উত্তর তৈরীই ছিল, বললাম ," এখানে খাওয়ার পিছনে অনেক বেশি খরচ, কারণ লোকসংখ্যা এখানে অনেক বেশি এবং আনুষঙ্গিক খরচও বেশি হয়।"
"ঠিক আছে, তাহলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এই মিটিং হোক।"
অনুমতি মিলতে সূর্যর চিঠি তৈরী। এখন থেকে এক এক মাসে এক এক জায়গায় এই পর্যালোচনা হবে। সেই মতো ঠিক হল পরের মাসে রাজমন্দ্রি এবং তার পরের মাসে বিজয়বাড়ায় হবে এই মিটিং এবং তার পরের মাসে আবার ভাইজাগে।
শনিবার ভোরবেলায় গাড়িতে মহারাজ,সস্ত্রীক শ্রীনিবাসন, আমি ও সূর্য রওনা দিলাম রাজমন্দ্রির পথে। মাঝখানে উদুপি রেস্তোরাঁয় টিফিন করে পৌঁছে গেলাম নরসিমহনের অফিসে। ও ব্যবস্থা করেছে এক হোটেলে আর ইতিমধ্যেই প্রভাকর ও এসে গেছে। বেশ ছিমছাম ব্যবস্থা কিন্তু ওর আয়োজন ছিল একটু বেশ ভারী রকমের যদিও লোকসংখ্যা কম হওয়ায় পুষিয়ে গেছে। রাতে থাকার ব্যবস্থা করেছে সুন্দরী গোদাবরী নদীর পাড়ে গেস্ট হাউসে। ঘুমাব কি, জানলা দিয়ে রাতের গোদাবরীর সৌন্দর্য্য দেখছি।
সুবিশাল গোদাবরী, এপ্রান্ত থেকে দেখা যায়না। অন্ধকারে চোখমেলে রয়েছি কিন্তু প্রায় তিন কিলোমিটার বিস্তৃত নদীর অন্য পাড় দেখার মতো চোখের দৃষ্টি আমার নেই। ট্রেনে যেতে যেতে নদীটা পেরোতে লাগে যে বহু সময়। এই সুবিশাল নদীর অববাহিকায় দুই প্রান্তে গড়ে উঠেছে বহু জনপদ এবং উর্বর হওয়ায় ফসলও হয় প্রচুর। এই কারণে এই মহান নদীকে দক্ষিণ গঙ্গা বলে। পরেরদিন সকাল বেলায় লঞ্চে গোদাবরী ভ্রমণের ব্যবস্থা করেছে নরসিমহন। রাজমন্দ্রির ঘাটে আমরা সবাই পৌঁছে গেছি। শ্রীনিবাসনের স্ত্রীকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য নরসিমহনের স্ত্রীও এসেছেন। সকাল বেলায় লঞ্চের ওপরের ডেকে আমরা সবাই বসে আছি। লঞ্চেই ব্রেকফাস্ট , লাঞ্চ ও চায়ের ব্যবস্থা রয়েছে, এছাড়াও আছে নাচ ও গানের আসর। একটি অল্প বয়সী ছেলে ও মেয়ে যেভাবে নাচল তাতে ওরা যে অতি অল্প সময়েই সিনেমায় নামবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আঁকা বাঁকা গতিতে লঞ্চ চলতে চলতে একটা গ্রামের কাছে এল। কিছু একটা পূজো হচ্ছে। ঢাক, ঢোল, কাঁসর ও নানাধরণের বাঁশি বাজছে, গ্রামের লোকজন ও নাচছে। ভারী মনোরম পরিবেশ। ইতিমধ্যেই পূজো শেষ হয়ে এসেছে। কপাল ভাল ছিল, জুটে গেল প্রসাদ। ওদিকে লঞ্চের লোকজন তাড়া দিচ্ছে। গুটি গুটি পায়ে সবাই এগোলাম লঞ্চের দিকে।
লঞ্চ এগোচ্ছে নিজের মতন আর আমরা মনোরম দৃশ্য উপভোগ করছি। শ্রীনিবাসন মাঝেমধ্যেই ফটো তুলছে আর আমরা সবাই গল্প গুজবে মত্ত। কোন কোন জায়গায় তিনটে চারটে বাঁক,নদীর পাড়ে থাকা পাহাড়গুলো যেন দিক নির্দেশ করছে কোথায় যেতে হবে। গোদাবরীর দুই পাড়ই যেমন উর্বর, তার ছোঁয়াচ ও যেন লেগেছে পাহাড়ের গায়ে। ঘন সবুজ জঙ্গলে ভরা পাহাড়ের দিকে তাকালেই চোখ জুড়িয়ে যায়। লঞ্চ দেখতে দেখতে একটা পাহাড়ের কাছে গিয়ে থামল। ওখানে একটা মন্দির আছে। আমরা খানিকটা উঠে ক্ষান্তি দিলাম এবং ওখানে বসেই নরসিমহনের স্ত্রীর আনা কিছু মুখরোচক খাবার খেলাম। একটু চায়ের কথা ভাবতে ভাবতেই লঞ্চের লোকেরা বলল চা তৈরী হয়ে গেছে। তরিঘরি উঠে পড়লাম চায়ের তেষ্টা মেটাতে। মাঝপথেই হলো লাঞ্চ এবং তারপরেই ফেরার পালা। অনতিদূরে নির্মীয়মাণ পোলাভরমের বাঁধ চোখে পড়ল কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও যাওয়া হলোনা কারণ তাহলে ফিরতে অনেক দেরী হয়ে যাবে।
সন্ধে নামছে, পাহাড়ের ছায়া গোদাবরীর জলে পড়ে আরও মায়াময় করে তুলেছে। নিস্তব্ধ অন্ধকারে লঞ্চের আলো যেন প্রদীপের মতো লাগছে আর ভুটভুট আওয়াজ পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে বলছে ফিরে যা , ফিরে যা। বেশ ঘন অন্ধকার, হঠাৎই লঞ্চ গেল থেমে, আটকে গেছে চড়ায়। যতক্ষণ জোয়ার না আসছে বা অন্য কোন লঞ্চ এসে না টানছে ততক্ষণ নট নড়ন চড়ন। অতএব, অপেক্ষা করা ছাড়া কোন রাস্তা নাই। যাই হোক, খানিকক্ষণ পরেই যেন সোঁ সোঁ করে এক আওয়াজ শোনা গেল আর দুলকি চালে লঞ্চটাও নড়ে উঠল এবং ফের ইঞ্জিন স্টার্ট হলো এবং আমরা ফিরে এলাম বেশ রাতে। রাতের খাবার গেস্ট হাউসে খাবার আগে আমি আর মহারাজ বাদে ওরা একটু বসে খিদেটাকে চাগিয়ে নিল। তারপর হৈ হৈ করে গল্প সেরে গোদাবরীর হাওয়া গায়ে লাগিয়ে টানা ঘুম। পরদিন ছিল সোমবার কিন্তু কি একটা কারণে ছিল ছুটি। বেশ দেরী করে উঠে ব্রেকফাস্ট সেরে এবং লাঞ্চ করেই গাড়িতে চড়ে ফিরে এলাম ভাইজাগে। রথ দেখা কলা বেচা দুইই সম্পন্ন হলো।
No comments:
Post a Comment