Thursday, 15 June 2023

পথ চলাতেই আনন্দ( তিন )

বাঙালি ভ্রমণ পিপাসু , আমরাও  তার ব্যতিক্রম নই ।বিভিন্ন সময়ে ভাইজাগে থাকা আমাদের একদল বাঙালি আছেন যাঁদের নাম আমরা পঞ্চপাণ্ডবের  নামানুসারেই রেখেছি এবং তাঁরা হলেন যথাক্রমে যুধিষ্ঠির ও তাঁর সহধর্মিনী দেবিকা, ভীম ও ভালান্দ্রা, অর্জুন ও সুভদ্রা, নকুল ও কারেনুমতি এবং সহদেব ও দেবিকা এবং কৌরব ও পাণ্ডব পক্ষের একমাত্র  সহোদরা দুঃশলা। দুঃশলা কিন্তু পাণ্ডবদের ও অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। আমাদের  এই পঞ্চপাণ্ডবের  যাত্রা বেশ সুন্দর ভাবেই  চলছিল  কিন্তু ইদানীং কালে মহাপরাক্রমশালী ভীম একটু সাংসারিক  কারণে বিচ্ছিন্ন  হয়ে পড়েছেন।  তবে এখানে সমস্ত পাণ্ডবদের উপস্থিতি ছিল। 
পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে মহাবীর অর্জুন  যেমন বাকি ভাইদের  তুলনায় বীরত্বে সর্বাগ্রগণ্য  ছিলেন  এখানেও আমাদের বর্তমান অর্জুন বাকি সকলের  তুলনায় এগিয়ে। কি অসাধারণ প্ল্যানিং, একদম নিখুঁত কারও  কোন অসুবিধা হয়না। আর এইখানেই অন্যরা ঘোড়া দেখে খোঁড়া হবার  মতো সব দায়িত্ব সেই অর্জুনের  উপর চাপিয়েই  নিশ্চিন্ত। অবশ্য সেইরকম  নিখুঁতভাবে করার  মতন ক্ষমতাও কারও নেই। যাই হোক সবাইমিলে আলোচনার পর স্থির হলো যে যাওয়া হবে ভিতরকনিকায় যা উড়িষ্যার কেন্দ্রপাড়া জেলায় অবস্থিত। চৌদ্দ ই  ফেব্রুয়ারি আঠারো সাল ধৌলি এক্সপ্রেসে হাওড়া স্টেশন থেকে রওনা দিলাম এগার জনের  দল। ট্রেনের  মধ্যেই  নিয়ে যাওয়া বিভিন্ন  খাবারের মধ্য  দিয়েই ব্রেকফাস্ট সম্পন্ন  হলো। পাঁচ পরিবারের পাঁচমিশেলি  খাবারে জলখাবার বেশ জমিয়েই  হলো। ভদ্রক  স্টেশনে অর্জুনের কথামতো দুটো বেশ বড় গাড়ি মজুত ছিল।  ভাগাভাগি করে বসে মালপত্র গাড়ির  মাথায় চাপিয়ে যাত্রা শুরু হলো। ঘন্টা তিনেক চলার পর একটা নদীর  ধারে এসে পৌঁছলাম। ট্যুর অপারেটরের লঞ্চ ঠিক করাই ছিল। সমস্ত  মালপত্র গাড়ির  লোকেরাই  উঠিয়ে দিল লঞ্চে এবং বৃদ্ধ পাণ্ডব তাঁদের  স্ত্রীরা পায়ের ব্যথা, কোমরের  ব্যথা নিয়ে হেলে দুলে লঞ্চে উঠলেন।  প্রায় মিনিট কুড়ি চলার  পর বৈতরণী নদীর  অপর পারে পৌঁছলাম।  তাদের  লোকেরাই সবাইকে জেটিতে উঠতে সাহায্য করল এবং নদীর  অপর পাড়ে থাকা দুটো গাড়িতে চাপিয়ে রিসর্টে পৌঁছে দিল। যাওয়া মাত্রই সবাই সরবত খেয়ে একটু ঠাণ্ডা হয়েই নিজেদের  ঘরের  দিকে রওনা দিলাম।  এবার  বিস্ময়ের পালা। এ তো ঘর নয়, এ যে তাঁবু। কোনদিন তাঁবুতে থাকার সুযোগ হয়নি, সুতরাং মনের মনে বেশ এক রোমাঞ্চ অনুভব  করলাম। তাঁবুর  তিনটে ভাগ। প্রথম ভাগে ঢুকে যেমন বসার জন্য  একটা ছোট্ট  বারান্দা হয় সেইরকম।  দুটো চেয়ার রাখা  আছে বসে আড্ডার জন্য।  চেন টেনে বন্ধ করে দিয়ে তালা লাগানোর  ব্যবস্থা আছে অর্থাৎ,  তালা লাগিয়ে দিলে তাঁবুর  ভিতরে যাবার  আর কোন  রাস্তা নেই।  তাঁবুর দ্বিতীয় ভাগ শোবার ঘর যেখানে এ সি ও লাগানো আছে এবং খাট ছাড়াও  টেবিল,  চেয়ার ও আয়নাও মজুদ। আর তৃতীয় ভাগে টয়লেট এবং প্রত্যেক ভাগেই  চেন টেনে বন্ধ করার ব্যবস্থা। তাঁবুর  এত সুন্দর ব্যবস্থা দেখে অর্জুনের প্রশংসা মনে মনেই  করলাম।  লাঞ্চ করতে একটু দেরীই  হয়ে গেল কিন্তু ঝটপট লাঞ্চ সেরেই আমাদের  জন্য  রাখা দুটো গাড়িতে পৌঁছলাম  আবার  সেই নদীর  ধারে যেখান থেকে আমরা ভিতরকনিকায় রিসর্টে আসার জন্য উঠেছিলাম। 
সবাই  বেশ  উত্তেজনার সঙ্গে  উঠেছি। লঞ্চের  ইঞ্জিন  স্টার্ট  হওয়া মাত্রই  কি যেন একটা  সড়সড় করে জলে নেমে গেল। দুঃশলা চেঁচিয়ে উঠলেন,  আরে বাবা এ যে একটা  বেশ বড় ধরণের  কুমির। অর্জুন  তখন  বলে উঠলেন, " ঠিকই  তো, এখানে কুমির ই  তো দেখা যাবে, এটা নোনাজলের কুমিরের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। ক্রমহ্রাসমান এই প্রজাতির  কুমিরের সংরক্ষণ এবং প্রজননের ব্যবস্থা এখানে রয়েছে এবং এছাড়াও  রয়েছে নানাধরণের  পাখি যা একটু লক্ষ্য করলেই চোখে পড়বে।" লঞ্চ তো আওয়াজ করে চলতে শুরু করল এবং আমরাও বিভিন্ন জায়গায় বসে নিজের নিজের মোবাইল ক্যামেরায় ছবি তোলার  জন্য  ব্যস্ত।  ছোট, বড়, মাঝারি নানাধরণের  কুমির  এদিকে ওদিকে দেখা যাচ্ছে আর চিরিক  চিরিক  ধ্বনি করে ফটো উঠছে এর ওর মোবাইলে। আমি দেখছি বিস্তীর্ণ  জলরাশি বিভিন্ন দিকে বাঁক নিয়েছে আর ম্যানগ্রোভের ছায়া জলে পড়ে নদীর  গভীরতা যেন  আরও  বাড়িয়ে দিয়েছে। বৈতরণী, ব্রাহ্মণী, ধামড়া ও পাঠশালা নদীর ভিন্ন ধরণের বাঁক এই ভিতরকনিকাকে মনোহর রূপ দান করেছে। একবার  এই বাঁক, পরক্ষণেই অন্য  বাঁকে লঞ্চ নিজের মনে চলেছে এবং মাঝিরা মাঝেমধ্যেই  চিৎকার  করে বলছে ঐ দেখিয়ে কিতনা  বড়া মগরমচ্ছ ( কুমির)। আমরা হাঁ করে দেখছি আর মনে মনে বেশ ভয় ও পাচ্ছি। ভাবছি, এই বড় কুমিরগুলো যদি লঞ্চে ধাক্কা মারে তাহলে  তো সব জারিজুরি শেষ।  অর্জুনের এখানে ধনুর্বাণ ও নেই আর নেই ভীমের সেই গদা। কি হবে তাহলে? পঞ্চপাণ্ডবদের যতই  বীর বলা হোক না কেন, অর্জুন  আর ভীম ছাড়া বাকি ত্রয়ীকে  কেমন ম্যাদামারা  বলেই মনে হয়। যুধিষ্ঠির  তো ধর্ম আর পাশা খেলেই গেলেন  আর নকুল সহদেবকে তো দুধেভাতে  পাণ্ডব  বলেই মনে হয়। মাঝেমধ্যে মহাভারতের  এখানে সেখানে একটু আধটু তাদের  যুদ্ধ করা বা বীরত্বের  কথা উল্লেখ  আছে বটে যেটা না লিখলে ব্যাসদেবের  কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করত এই রাজতনয়দ্বয়। যাই হোক , আমার  মনের  মধ্যে যেটা ঘোরাফেরা করছিল  সেটা বললাম,  নকুলের কি হচ্ছিল  বলতে পারব না। চোখটা দেখে যে একটু আন্দাজ করব তাও সম্ভব নয় কারণ চোখে রয়েছে রোদ চশমা বা সানগ্লাস।  হঠাৎই  যেতে যেতে লঞ্চটা নদীর  এক কিনারায় পৌঁছাতেই   রোদ পোহানো একটা বিশালাকৃতি কুমির ( প্রায় ফুট পঁচিশেক) লঞ্চের  আওয়াজে বিরক্ত বোধ করে এত দ্রুত  জলে ছুটে এল যে আমার  মনে হল যে জস সিনেমায় দেখা  হাঙরের  লঞ্চকে আক্রমণের  কথা । ভয়ে বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। ভাবছি, এ যাত্রায় বাড়ি ফিরে যেতে পারব কি না। যাই হোক , সেরকম  কিছু  হলো না আর আমরাও যেখান  থেকে  লঞ্চে উঠেছিলাম  সেইখানে ফিরে এলাম। কিন্তু জেটির কাছে এসে দেখি যে জলস্তর থেকে জেটির  উচ্চতা প্রায় দশ ফুট মানে আমরা যখন  যাত্রা শুরু করেছিলাম  তখন  ছিল জোয়ার কিন্তু এখন ভাটার  টানে জলস্তর এতটাই নেমে গেছে যে কি করে  ডাঙায় উঠব তা আর ভেবে পাচ্ছি না। কিন্তু মাঝিরা  এতে অভ্যস্ত।  তারা লঞ্চটা নোঙর  করে লঞ্চ থেকে বিরাট  একটা মোটা তক্তা  জেটির গায়ে ফেলল। কাঠের  পাটাতনে  মাঝে মাঝেই  আড়াআড়িভাবে কাঠের  তক্তা মোটা পেরেক দিয়ে আটকানো যাতে পা পিছলে গড়িয়ে না যায়। এরপর জেটির  উপরে দুজন লোক বাঁশ ধরে দাঁড়িয়ে আছে আর আমরা ভগবানের  নাম স্মরণ করে বাঁশ ধরে কাঠের  পাটাতনের উপর পা রেখে উঠছি। দুএকজন ছাড়া বাকি সবাই কেউ কোমর , কেউ পায়ের ব্যথায়  ভুগছে। জলে পড়লেই কুমিরের  পেটে যে যাবেনা , এই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবেনা। সুতরাং , একে একে সবাই জেটির  ওপরে ওঠার  পর যুধিষ্ঠিরের মুখ থেকে  অস্ফূট স্বর বেরিয়ে এল বিজয়ী ভব এবং চোখেমুখে একরাশ অজানিত আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল।  ডরপোঁক সহদেব  তখন  ভাবছে শুধু  শুধু এত দেরী না করলে জোয়ারের জল থাকত  আর এত কসরত করতে হতো না । গাড়ি দাঁড়িয়েই  ছিল, মিনিট  দশেকের মধ্যেই  রিসর্টে। একটু হাতমুখ ধুয়েই রিসর্টের লাউঞ্জে বসে শুরু হলো চা খাওয়া। এর পরেই লাউঞ্জের পাশেই খানিকটা ফাঁকা জায়গায় কাঠকুটো জ্বালানো  হল এবং তার চারপাশে রাখা হলো চেয়ার এবং ঐ বনফায়ারের মধ্যেই  শুরু হলো গানের আসর। আসতে লাগল প্লেটভর্তি গরম গরম পেঁয়াজি এবং চিকেন  পকোড়া।  ভালান্দারা, কারেনুমতীর গানের গলা যথেষ্টই  ভাল, সুতরাং  বলাই বাহুল্য জমে উঠল আসর। ঐখানে থাকতে থাকতেই লাউঞ্জে ডিনারের  ব্যবস্থা এবং দারুণ  সুস্বাদু সব খাবার দাবার।
এরপর তাঁবুতে যেতে হবে। কেমন  গা ছমছম করছে  কারণ জঙ্গলের  মধ্যে রিসর্ট।  সাপখোপ  ছাড়াও  থাকতে পারে নানাধরণের  জন্তু জানোয়ার।  সঙ্গে নিয়ে যাওয়া কার্বলিক অ্যাসিড চারদিকে ছড়িয়ে দিলাম।  হাতের কাছে রাখলাম  টর্চ  আর একটা বড় ছুরি আত্মরক্ষার জন্য।  বাইরের  চেনটায়  লাগালাম  তালা , দ্বিতীয়টায়  চেনটা সম্পূর্ণ ভাবে টেনে দিলাম  যাতে কোন জন্তুজানোয়ার ভিতরে না আসতে পারে। দুর্গা দুর্গা বলে শুয়ে একঘুমে রাত কাবার।  ভোরের  আলো ফুটে উঠছে। মোবাইল  ও ছুরিটা  নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি ফটো তোলার  বাসনায়। নানাধরণের  পাখির  ডাক, এত মনোরম পরিবেশে নিজের ই কেমন লজ্জ্বা লাগছিল  ঐ ছুরিটা সঙ্গে করে আনার  জন্য।  যাই হোক,  এবার  শুরু হলো দ্বিতীয় দিনের  প্রস্তুতি। ব্রেকফাস্ট করেই আবার  সেই পাড়ে যাওয়া এবং  নদীর  অন্য দিকে যাওয়া। ন্যাশনাল পার্কের কাছে নামা হলো এবং হেলে দুলে ঐ পার্কের  বিশাল  চত্বর পরিক্রমা করার সাধ্য  দুএকজন ছাড়া আর কারও  ছিলনা এবং আগেরদিন ভাটার  টানে জলের স্তর এত নীচে নেমে যাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা বেশ টাটকাই  হয়ে আছে মনে। অতএব,  বাবা ফিরে চল নিজ নিকেতনে ,মানে  রিসর্টে। যদিও  ন্যাশনাল পার্ক  সম্পূর্ণ ভাবে ঘোরা হলো না তবুও যতটা প্রাপ্তি তাতেই মনটা ভরে গেল।  লাঞ্চ সেরে  সামান্য  বিশ্রাম  করেই পারমাদনপুর গ্রামে একটা পুরোন  মন্দির  দর্শন করতে গেলাম।  বেশ জরাজীর্ণ মন্দির,  দেখেই বোঝা যায় কোন  রক্ষণাবেক্ষণ  হয়না। পুরোহিতের চেহারাও  তেমন নধরকান্তি  নয় মানে বোঝাই যাচ্ছে দরিদ্র  গ্রামের  দরিদ্র  পূজারী।  ডেকে একশ টাকা দেওয়ায় খুবই খুশি। একটা ছবিও  তুললাম তাঁর এবং যে অভিব্যক্তি তাঁর চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ল  তা ভাষায় প্রকাশ  করা যায়না। ফিরে এসে চা ও পকোড়া এবং রাতে পাঁঠার  মাংস  ও লুচি পায়েসের সমন্বয় এবং সর্বোপরি গাজরের  হালুয়া --এক দারুণ  অভিজ্ঞতা। পরদিন ফিরে আসার  সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে গাজরের  হালুয়া আমাদের  দিয়ে দেওয়া রাস্তায় খাবার জন্য। এখানে উল্লেখ করা ভাল  যে অর্জুন দীর্ঘদিন  উড়িষ্যায় থাকার ফলে স্থানীয় ভাষার  উপর যথেষ্ট দখল এবং বহুবিধ  লোকের  সংস্পর্শ তাঁকে অত্যন্ত  প্রাজ্ঞ করেছে এবং এই রিসর্টের মালিক আমাদের আতিথেয়তায় সামান্যতম  ত্রুটি হতে দেননি। দ্বিতীয়দিন রাতে তাঁবুতে অনেক স্বাভাবিক  ও সাবলীল  এবং পরদিন  ব্রেকফাস্ট  করে ফিরে আসার  পালা। জোয়ারের  জন্য  জেটিতে কোন কষ্ট  হয়নি কিন্তু একটা দুঃখ চিরদিন  থেকেই যাবে কারণ দুঃশলার  দামী মোবাইল যেখানে অনেক দুষ্প্রাপ্য  ছবি এবং ভিডিও  ছিল তা জলে পড়ে যায় এবং কুমির বাবাজীবন আমাদের  কাউকে পেটে  না ভরতে পারলেও ঐ দামী মোবাইলটি গলাঃধকরণ  করেন
( অবশ্যই  অনুমান) এবং দুধের স্বাদ  ঘোলেই মেটান। 
আবার  লম্বা যাত্রা গাড়িতে ভদ্রক স্টেশন  পর্যন্ত  এবং ঐখানেই  লাঞ্চ করে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ফিরে আসা।

No comments:

Post a Comment