Thursday, 18 April 2024

গরমের ছুটি

ছোটবেলায় গরমের ছুটির কথা মনে পড়লেই একটা আলাদা উন্মাদনা জেগে ওঠে। তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি, সকাল বেলায় স্কুল। প্রাইমারি স্কুলের ক্লাস শেষ হলেই একটু বাদেই সেকেন্ডারি স্কুল সাড়ে দশটা থেকে শুরু হবে। সুতরাং দশটার মধ্যেই  ক্লাস শেষ, আর মজাই মজা। একটু খেয়েদেয়েই বাড়ির  মাঠে বা হুইলার হোস্টেলের মাঠে বল নিয়ে খেলা। রোদের  তাপ বাড়লেও কোন তোয়াক্কাই নেই। বাড়ি ফিরে অবশ্যই  বকুনি খাওয়া কিন্তু যেন গা সয়ে গেছে, ভ্রূক্ষেপ নেই। কয়েকদিন  বাদেই গরমের  ছুটি পড়বে। শহরে আমবাগানের ছড়াছড়ি।  কালবৈশাখীর ঝড় হলে তো বটেই, এমনিতেও মোটামুটি একটু দমকা হাওয়া দিলেই আমের ভারে নুয়ে পড়া গাছগুলো যেন একটু  স্বস্তির  নিঃশ্বাস ফেলে বলে ওঠে," বাব্বা,  আর পারিনা তোদের ভার বইতে , এবার  দে একটু মুক্তি।"  কাশীশ্বরী স্কুলের পাশেই কেবু সিংহদের বিরাট আমবাগান, পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। শুধু আম ই নয়, লিচু, জাম, বেল, নারকেল গাছের সারিতে ভর্তি সেই বাগান আর রয়েছে তাদের  পাহারাদার। কিন্তু কাশীশ্বরী স্কুলের  পাঁচিলের  দিকে একটা গর্ত রোজ ই একটু একটু করে বাড়ছে যাতে ঐ গর্ত দিয়ে বাগানে ঢোকা যায়। ঐ পাঁচিলটা হচ্ছে স্কুল ও বাগানের মাঝে, সুতরাং সারাবার দায় কার সেটা নিয়ে একটু ঠেলাঠেলি তো আছেই কিন্তু বাগানের  ফল সামলাতে গেলে সিংহদের ই উদ্যোগ  নিতে হয় । নেয় ও তারা কিন্তু যারা ফল চুরি করে তাদের  দৌরাত্ম্যে রোজ ই গর্ত টা একটু একটু করে বাড়ে আর সেই  ফাঁক দিয়েই রোজকার  চোর, সঙ্গে আমাদের  মতন ছিঁচকেরাও ঢোকে। একদিন  সবাই বাগানে  ঢুকেছি,  আম কুড়াচ্ছি আর মাঝে মাঝেই দু চারটে ঢিল ও ছুঁড়ছি আর পটাপট আম ও পড়ছে। বিশুর উপর ভার ছিল আম কুড়ানোর। যতক্ষণ  আম কুড়ানো হচ্ছিল   ততক্ষণ  কোনও  সাড়াশব্দ  নেই আর মালিরাও টের পায়নি কিন্তু ঢিল  ছুঁড়তেই  রে রে করে তেড়ে এল মালিরা ,আমরা তো সব ভাগলবা, পড়ল ধরা ক্যাবলা  বিশু। মালিরা তাকে ধরে নিয়ে গেল মালকিন সিংয়ের কাছে যারা আবার  বিশুদের ই আত্মীয়। উনি তো এক লহমায়  চিনতে পেরেছেন  বিশুকে, বললেন, " আমি তোমাকে বিলক্ষণ চিনি, দাঁড়াও তোমার  বাবাকে খবর দিচ্ছি।" তিনি মালিকে বললেন  বিশুর জামাটা খুলে নিতে। হাড় জিরজিরে বিশুর খালি গায়ে বাড়ি ফিরে আসা। মায়ের চোখ এড়িয়ে বাড়ি ফিরেই অন্য একটা জামা চড়িয়ে তখনকার মতো রেহাই। কিন্তু বিপদ বাড়ল তখনই  যখন  সিংহদের  বাড়ি থেকে সেই মালি জামা সমেত  এক ঝুড়ি আম নিয়ে বিশুদের  বাড়ি দিয়ে গেল। বিশুদের  বাড়িতে প্রত্যেক বার ই আম আসে সিংহদের  বাড়ি থেকে কিন্তু সঙ্গে বিশুর  জামা দেখে বিশুর মা একটু আশ্চর্য  হয়ে গেলেন।  কি ব্যাপার,  এই জামা কোথা থেকে পেলে তুমি জিজ্ঞেস  করতেই সব কুকীর্তি ফাঁস। বিশু তো ঐ মালিকে আসতে দেখেই বাড়ির  ত্রিসীমানায় নেই,  কিন্তু বাড়ি তো ফিরতেই  হবে, ভেবেই পাচ্ছেনা কি উত্তর  দেবে ও। যা হবার  হবে, সত্যি কথাই  বলবে বিশু। জানে ভাল  করে যে মায়ের ডাঁটিসার রান্নাঘরের  পাখাটার ঘা কতক পড়বে পিঠে, তবুও  সত্যি ই বলবে। মা তো জিজ্ঞেস করলো,আর বিশুও সবিস্তারে সব ঘটনাই বলল। ভাবছে এই বোধহয় পড়ল পিঠে কিন্তু না, সেটা হলনা, উনি খুব শান্ত ভাবে বললেন যে দেখ, ওরা আমাদের  আত্মীয়, প্রত্যেক বার আমাদের  বাড়িতে ওরা আম পাঠায়,সেক্ষেত্রে ওদের  বাড়ির  বাগানে যাওয়া একদম উচিত  হয় নি। মায়ের  পা ধরে কেঁদে ফেলল  বিশু এবং প্রতিজ্ঞা করল বন্ধুরা হাজার  বার বললেও ও আর যাবেনা। মা কিছু না বললেও  বিশু মনে মনে খুবই  লজ্জিত এবং তার জন্য বাবামায়েদের সম্মান নষ্ট হয়েছে এই ভেবে নিজেই কাঁদতে লাগল।
 কদিন বাদেই গরমের ছুটি পড়ছে এবং স্কুলেও  ছিল এক দারুণ  ট্র্যাডিশন।  সমস্ত মাস্টার মশাইদের মিষ্টি খাওয়াতো  ছাত্ররা। যে সমস্ত মাস্টার মশাই রা ঐ বিভাগের  ক্লাস  নিতেন তাঁদের  সকলকেই  খাওয়ানো হতো এবং প্রত্যেক  মাস্টার মশাইরাই আমন্ত্রিত হতেন। ছাত্ররা নিজেদের  মধ্যে চাঁদা তুলে এই খরচটাই সামলাতো।  শুধু প্রাইমারি সেকশনেই  নয় সেকেন্ডারি সেকশনেও এই ব্যবস্থাটা  দীর্ঘদিন চালু ছিল।  মাস্টার মশাইরাও গরমের  ছুটিতে টাস্ক দিতেন আর বলতেন যে একদম ফাঁকি মারবে না, ভাল করে পড়াশোনা করবে।  প্রাইভেট  পড়ানো থাকলেও  মাস্টার মশাইরা ছাত্রদের পড়াশোনার বিষয়ে যথেষ্ট সাহায্য  করতেন। এক অদ্ভুত সুন্দর  ছাত্র মাস্টার মশাইদের  সম্পর্ক।  শুধু ছাত্ররাই  নয় তাদের  বাবামায়েদের  সঙ্গেও  এক সুন্দর  সম্পর্ক  থাকত।  সমাজের  পরিবর্তনের  সঙ্গে মাস্টার মশাইদের সঙ্গে সম্পর্ক ও অনেক বদলেছে, এখন অনেকটাই  যেন আর্থিক  লেনদেনের সম্পর্ক।  মাস্টার মশাই রাও ছাত্রদের  ভালবাসতে ভুলে গেছেন,  ছাত্ররাও  মাস্টার মশাইদের সম্মান জানাতে ভুলে গেছে, অনেকসময় ই মাস্টার মশাইদের নিগৃহীত ও হতে হচ্ছে। আমরা চলেছি কোথায়? পারিনা কি ফিরিয়ে আনতে সেই সোনালী দিনগুলো?

No comments:

Post a Comment