Tuesday, 30 April 2024

ফিরে দেখা

সময়টা আটাত্তর সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষাশেষি, সম্ভবত আটাশ তারিখ। থাকি লেক গার্ডেন্স স্টেশন প্ল্যাটফর্মের শেষ যেখানে হয়েছে সেই ঢাল দিয়ে নেমেই ডান দিকে দ্বিতীয় বাড়ির  গ্যারাজের উপরের ঘরে। দুই দিকে তিন/ চার ফুট জমি ছেড়ে তৈরী বাড়িটা লম্বাটে ধরণের,  সামনে গ্যারাজ রাস্তামুখো আর বাড়িটা ট্রেনের  লাইনকে লম্বালম্বিভাবে ধরে ফেলত যদি না রেলের জমির সীমানা বরাবর লোহার পোলগুলো না থাকত। লাইনটা বালিগঞ্জ থেকে লেক গার্ডেন্স  হয়ে টালিগঞ্জ ধরে বজবজের  দিকে চলে গেছে। তিনদিকে জানলা( রাস্তার দিকটা বন্ধ) ,আর গ্যারাজের উপর হওয়ার  জন্য  দাঁড়িয়ে  আড়মোড়া ভাঙার কোন উপায়  ছিলনা। ঘরের আসবাবপত্র বলতে একটা চৌকি, একটা বই ভর্তি  ট্রাঙ্ক, একটা স্যুটকেস এবং একটা হারমোনিয়াম , তানপুরা আর একটা টেবিল ফ্যান যেটা আমার  বাড়িওয়ালি মাসিমা দিয়েছিলেন। দিনের খাওয়া বাইরে হোটেলে আর রাতে মাসিমার কাছে।

ঐ বাড়িতে  যাওয়ার পিছনেও একটা ছোট্ট গল্প আছে। ঐ সময় কোন ব্যাচেলর ছেলের ঘর ভাড়া  পাওয়া একটা ভয়ানক কঠিন ব্যাপার ছিল। ব্যাচেলর মানেই ঘরে বসে  মদ খাবে, মাঝে মধ্যে মেয়েবন্ধুরা এসে হৈ চৈ করবে আর এইসব কারণেই কোন বাড়ির মালিক এদের ভাড়া দিতে চাইত না। সত্যিই তো, বাড়ির  মধ্যে বেলেল্লাপনা  কার সহ্য হবে?  ঐ বাড়ি টা একটা ছোট পরিবারকে দেওয়া  হবে বলে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল এবং  সেই কারণেই এক স্বামী স্ত্রী ও ছিল দাবিদার কিন্তু কেন জানিনা  মাসিমার পছন্দ আমাকেই হলো। এই বাড়িতে থাকা চার বছর হয়ে গেল  কিন্তু বাড়ির  ঠিকানা জানিনা। হঠাৎই  বাবা একদিন জিজ্ঞেস  করায়  আমি কোন  উত্তর দিতে পারলাম না আর বাড়ির সবাই  আশ্চর্য  হয়ে গেল । চারবছর থাকার পরেও যদি কেউ  ঠিকানা না জানে তাহলে  তাকে উদোমাদা ছাড়া আর কি বলে?  লজ্জায় মুখ লাল হয়ে গেল । ফিরে এসেই মাসিমাকে ঠিকানা জিজ্ঞেস  কথায় সবাই হেসেই খুন। যাই হোক  জানা গেল  পঁয়ত্রিশ এ, চারুচন্দ্র প্লেস ইস্ট । জানিয়ে দিলাম বাড়িতে । এতদিন  ছিলাম ঠিকানাবিহীন, আজ আমার ঘর হলো।

একটা কঠিন নিয়মের  মধ্যে  দিন কাটছিল। ভোরবেলায়  উঠে রেওয়াজ,  তারপর স্নান করে ব্রেকফাস্ট করে আনোয়ার শা রোডে যোগেশ চন্দ্র চৌধুরী 'ল' কলেজে, তারপর অফিস, গানের ক্লাস, বাড়ি ফিরে খাওয়াদাওয়া সেরে একটু পড়াশোনা আর দশটার সময়  ঘুমিয়ে  পড়া।  বেশ চলছিল রুটিন, হঠাৎই  এল বৃষ্টি। প্রথমদিকে এত তেজ ছিলনা , কলেজ অফিস তবু ম্যানেজ  করা যাচ্ছিল,  কিন্তু আটাশ তারিখ সকালে  কলেজের পাশে থাকা  চায়ের দোকানে যেখানে  প্রত্যেক দিন আমরা চা খেতাম , তার মালিক ঝন্টু দা বলল , " দাদা, আকাশের অবস্থা ভাল নয়,  আপনি এই দু পাউণ্ড রুটি আর কিছু  বিস্কুট  নিয়ে যান। আপনি তো একাই থাকেন,  কিছু না হলেও পেটে কিছু পড়বে।"  নিয়ে নিলাম রুটি ও বিস্কুট কিন্তু মাঝে জন ( ওর আসল নাম ছিল  অমিয় ব্যানার্জি, কিন্তু ক্লাসের সবাই  ওকে জঙ্গলি বা জঙ  যার ভদ্রস্থ নাম জন)  আমাকে একটা রিকোয়েস্ট  করে বলল," আমার  বাড়ি থেকে  টাকা আসেনি, পয়সাও কিছু নেই,  আমাকে তোর কাছে দুদিন  থাকতে দিবি?" এর পরে তো আর কিছু বলা যায়না। চলে আয় বলে ফেললাম কিন্তু  পরে যে কি  ঘটল সেটা না বললেই  নয়। মাসিমা তো আমার  মতনই  খাবার  করেছিলেন,  সেটাই দুজনে মিলে ভাগ করে খেলাম। পরদিন সকাল  বেলায় জল থৈ থৈ করছে, দোকান পাট সব বন্ধ। কোন  গাড়ি, বাস বা ট্যাক্সি রাস্তায় দেখা যাচ্ছেনা, শুধু জল আর জল। লেক গার্ডেন্স থেকে হাঁটতে হাঁটতে দেশপ্রিয় পার্কের  অফিসে। যাদের না বেরোলে একদমই  চলবে না তারা এসেছে টাকা তুলতে কারণ তখন  কোন এটিএম ছিলনা। জন আমার  সঙ্গেই  এসেছে। তারামহল, কেরালা কাফে সব বন্ধ। ল্যান্সডাউন রোড জলে জলময়, কোথাও হাঁটুজল  তো কোথাও কোমর পর্যন্ত । ল্যান্সডাউন  মার্কেটের কাছে কয়েকটা হোটেল ছিল, জল ভেঙে সেখানে ও যাওয়া হলো কিন্তু সব বন্ধ। হঠাত মনে পড়ল শিশুমঙ্গল হাসপাতালের  কাছে আমাদের  ক্লাসের একটা মেয়ে থাকে। সেখানেও গিয়ে চা, বিস্কুট আর চানাচুর ছাড়া আর কিছুই মিলল না। লজ্জায়  মুখ ফুটে বলতেও পারলাম না যে একটু ভাত ডাল  খাওয়ালে ভাল হয়। খিদে তো লেগেছে, পকেটে টাকাও আছে কিন্তু নেই  কোন  খাবার।দুজনে মিলে প্রিয়া সিনেমায়  ঢুকে পড়লাম কিন্তু  পেট করছে চোঁ চোঁ, সিনেমা দেখতে  ভাল লাগে নাকি?  ইন্টারভ্যালে বাইরে এসে কিছু বাদাম ভাজা খেয়ে সিনেমা না দেখেই আবার জল ভেঙে  লেক গার্ডেন্সের বাড়িতে ফেরা । রাতে ঐ পাঁউরুটি খানিকটা খেয়ে আর কলসির জল কিছুটা গলায়  ঢেলে দুই বন্ধুতে ঐ চৌকিতে কোনরকমে রাতটা কাবার করলাম। এদিকে খাবার  জল ও শেষ  হয়ে আসছে। সমস্ত কলগুলো জলের তলায় এবং তখন বোতলের জল ও ছিল না। সেই যুদ্ধকালীন  পরিস্থিতিতে  ভগবানকে ডাকা ছাড়া আর কোনও  রাস্তাই ছিলনা। তিনদিন পর বৃষ্টির যেন  একটু ঢুলুনি এল। জলটাও বেশ নেমে এল। একটা দুটো করে বাস চালু হল। শুনলাম  ট্রেন ও চলতে শুরু করেছে।জনের কাছে কোন  টাকা না থাকায়  ওকে গোটা  তিরিশেক টাকা দিলাম  এবং  জল নামতে থাকায়  বন্ধ হোটেলগুলোও খুলতে থাকল। তিনদিন পর লেক গার্ডেন্সের  বেনারসী হোটেলে যখন  দুজনে মিলে  ভাত খাচ্ছি তখন মনে হচ্ছিল  যেন কতকাল এই হাভাতেগুলো খায়নি। যাই হোক,  জন কে শেষ পর্যন্ত যে পেট ভরে খাইয়ে বাড়ি পাঠাতে পেরেছিলাম এটা ভেবেও খানিকটা স্বস্তি পেয়েছিলাম । জন ও ফিরে গেল আর আমার ও মাসিমার কাছে খাওয়া শুরু হলো কিন্তু এরপর জনের সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি।

No comments:

Post a Comment