প্রথম থেকে শুরু করতে গেলে অনেক নাম এসে ভিড় করে, সুতরাং বিশেষ কয়েকজনের সম্বন্ধেই লিখতে হবে নাহলে লিখতে লিখতে শিক্ষক দিবসটাই শেষ হয়ে যাবে। বাড়িতে প্রথম গুরু বাবা ও মাকে বাদ দিলে মনে পড়ে বড়দির ( জ্যাঠামশাইয়ের মা) কথা যাঁর কথা না বললে ভীষণ অসম্পূর্ণ হয়ে যাবে। মালা জপতে জপতে কখন যে গল্প বলার মাঝে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন তা জানতেই পারতাম না। ঠাকুমা আমার ভয়ানক রাশভারী ছিলেন এবং যত ই বয়স কম হোক না কেন বেচাল দেখলে এমন ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকাতেন ভয়ে পালাতে পারলে বাঁচি। আর বড়দি ঠিক উল্টো, বাড়ির সব বাচ্চারাই তাঁর বড় ন্যাওটা। গল্প বলা বিশেষ করে বাচ্চাদের সামনে উপস্থাপন করা তাদের লেভেলে গিয়ে সে এক ভয়ানক কঠিন কাজ। কি যে গল্প বলতেন যা ঠাকুরমার ঝুলি বা ঠাকুর্দার থলিতেও পাওয়া যেত না। খানিকটা নিজে বানিয়ে বানিয়ে বলতেন হয়তো। কি অসাধারণ প্রতিভাময়ী ছিলেন , গল্পের যোগসূত্র কখনোই ছিন্ন হতোনা। আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের সব বাচ্চারাই তাঁর চারপাশে ঘিরে থাকতো। সবার মধ্যে আমার ও ছোড়দির একটা বিশেষ স্থান ছিল তাঁর হৃদয়ে।
বয়স একটু বাড়তেই বাড়ির কাছেই স্বর্গধামে ভর্তি করে দিল ক্লাস ওয়ানে। তখন তো আর নার্শারী বা প্রিপারেটরি বলে কিছু ছিল না, সরাসরি ক্লাস ওয়ানে। সেখানে ঊর্মিলা দির সদা হাস্যমুখ বাচ্চাদের জন্য এক আদর্শ জিনিস কিন্তু একজন দাদু মাস্টারের ক্লাস ফোরের ছেলেকে প্রচণ্ড মারধর স্কুলে যাওয়াকে এক ভীতির পর্যায়ে নিয়ে গেল। দুটো বাড়ির পরেই তৃতীয় বাড়িটাই স্বর্গধাম স্কুল কিন্তু আমার ঐদিন থেকে স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। বাবা, মা ,দিদিরা মায় ঊর্মিলা দি পর্যন্ত বাড়ি এসে নিয়ে যেতে চাইলেও স্কুল যাওয়া আমার নেই। বাড়ির সবাই প্রমাদ গণলো ,ভাবল এর দ্বারা লেখাপড়া কিছুই হবেনা, কোন মুদীর দোকানে কাজ করে খেতে হবে। কিন্তু বড়দির সেই ভালবাসা মেশানো গল্পের ফাঁকে ফাঁকে নানান জিনিস পড়িয়ে দেওয়া ছবিটাই পাল্টে দিল। পরের বছর শহরের সবচেয়ে নামী স্কুল পাঁচ থাম( স্তম্ভ) ওয়ালা রাজবাড়ির মতো দোতলা স্কুলের প্রাইমারি সেকশনে ক্লাস থ্রি তে ভর্তি করে দিল। বাবলি বাবু( হেড মাস্টার মশাই), কন্দর্প বাবু, হীরেন বাবু ও তাঁর ভাই রমেন বাবু এবং ডিস্ট্রিক্ট ইন্সপেক্টর অব স্কুলসের ছেলে দিলীপ অধিকারী। বাবলি বাবু খুব ভাল গান করতেন এবং ক্ল্যাসিকাল গান শেখাতেন। সকাল বেলায় স্কুল, টিফিন দেওয়া হতো, হঠাৎ কি একটা কারণে স্কুলে টিফিন দেওয়া বন্ধ হয়ে গেল। সবসময়েই কিছু পাকা দাদা টাইপের ছেলে থাকে। এঁরা হয়তো সময়ের থেকে একটু বেশি এগিয়ে থাকায় পড়াশোনায় তেমন কিছু করে উঠতে পারেনা। তখন শীতকাল, সুশান্তর গায়ের চাদর টা সামনে সুশান্তর সঙ্গে হাত লাগিয়েছে তপন এবং পিছনে আরও দুজন চারটে কোণ ধরে " টিফিন দেওয়া বন্ধ করা চলবে না, চলবে না" শ্লোগান দিতে দিতে বিশাল করিডরে খুদেদের মিছিল চলছে, হঠাৎ ই কে বলে উঠল হেডমাস্টার মশাই আসছেন। এক মূহুর্তে মিছিল ভোঁ ভাঁ। সবাই দৌড়ে পালিয়েছে, আমি আর দীপক পালাতে পারিনি মানে পালাতে গিয়ে পায়ে পা জড়িয়ে পড়ে গেছি আর শাস্তি হলো বেঞ্চের উপর কান ধরে দাঁড়ানো। তখন থেকেই ঠিক করেছি যে প্রাণ চলে যাক, যত ই ভীতুর ডিম বলুক লোকে , মিছিলে আর হাঁটব না। আজকের দিনেও মিছিলে নেতাদের গায়ে চট করে হাত পড়েনা, চ্যালা চামুণ্ডাগুলোই পুলিশের লাঠি বা কাঁদানে গ্যাস বা জল কামানের শিকার হয়। নেতাদের বলা হয় চলুন, এবার গাড়িতে উঠুন। আর কিছু কুচো কাচা নেতা যাদের স্বপ্ন ই হচ্ছে নেতা হয়ে পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার, তারা পুলিশকে বলে স্যার আমাকেও একটু গাড়িতে ধরে তুলুন না। আর জায়গা নেই বললে হাতে পায়ে ধরে প্রায় কান্নাকাটি করে পুলিশ স্যারকে বলে গাড়িতে উঠে পড়ে। চিত্র সাংবাদিক ফটো তুললে ইশারায় তার ফটোটা যেন আসে এই অনুরোধ করে কারণ ওটাই হবে ভবিষ্যতের উত্থানের চাবিকাঠি।
কান ধরে বেঞ্চের উপর দাঁড়ানোর খবর বাড়িতে পৌঁছে গেছে আর বাড়ি ঢোকা মাত্রই রান্নাঘরের ডাঁটিসার পাখার বাড়ি জুটল কপালে। সেই দিন থেকে দু দুবার প্রচণ্ড অপমানের শিকার হয়ে আমি হলাম ভীতু সম্প্রদায়ভুক্ত।
বৃত্তি পরীক্ষা হলো, কোনদিন ই বৃত্তি পাওয়ার যোগ্য ছিলাম না তবে কাউকে ধরা করা না করেই উৎরে যেতাম। ক্লাস ফাইভে একজন বিশাল চেহারার মাস্টার মশাই এলেন ক্লাস টিচার হয়ে। তিনি আবার নাকি অঙ্ক করাবেন। অসম্ভব বেশি রকম পান খেতেন বলে কথাও কিছু বোঝার উপায় ছিল না আর সারা শরীরে ছিল অসম্ভব বেশি লোম। সব ছেলেরা ওঁকে বলত ভালুক স্যার। ভালুক স্যারের উপদ্রব বেশীদিন সইতে হয়নি কিন্তু অঙ্কের ভাল মাস্টার মশাই পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি এবং যথারীতি সব বিষয়ে মোটামুটি ভাল নম্বর পেলেও অঙ্কে কোনরকমে পাশ করলেই দাদু হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন। বাড়িতে দাদুর কাছে বীজগণিত ও ইংরেজির প্রশিক্ষণ পেতাম। তখন দাদু অসুস্থ, বাড়িতেই দাদুকে স্যালাইন ও রক্ত দেওয়া হচ্ছে । কোন সময় ডান হাত আর কোন সময় বাঁ হাতে দেওয়া হচ্ছে । দাদু খেতেন চুরুট । নিজের হাতে ধরে চুরুট খেতে না পেরে আমাকে ডাকতেন এবং চুরুট ধরিয়ে ঠোঁটে কয়েকটা টান দিয়ে কম্পালসরি মিলিটারি ট্রেনিং রচনা লেখায় ডিকটেশন দিতেন। অসাধারণ স্মৃতি শক্তি । মিল্টনের লিসিডাস মুখস্থ বলতেন । শেক্সপিয়ার আওড়াতেন। মারা যাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত উনি ডিকটেশন দিয়ে গেছেন । ক্লাস সিক্সে খগেন বাবু ক্লাস টিচার হলেন। খুবই ভাল মাস্টার মশাই। ইংরেজি ও ইতিহাসে এম এ পাশ করা খগেনবাবু সত্যিই আদর্শ মাস্টার মশাই। সিস্টেমেটিক ভাবে পড়ানোর জন্য ছাত্ররা সবাই ভাল রেজাল্ট করল এবং অবশ্যই একজন আদর্শ মাস্টার মশাই। স্কুলে বিভিন্ন রকম ছাত্র থাকে যারা মাস্টার মশাইদের নাম বিকৃত করে অন্য নামে ডাকে। সেই স্যাররাও জানতেন কিন্তু লজ্জার মাথা খেয়ে কিছু বলতেন না। কোন একজন মাস্টার মশাই ক্লাসে ঢুকলেই হিস করে শব্দ শুরু হতো মানে ওঁর কথাবার্তা সবসময়ই এমন লেভেলে থাকতো যে ছাত্ররা গুল মারছেন বা গ্যাস দিচ্ছেন বলে হিস করে শব্দ করতো। স্যার ক্লাসে ঢোকামাত্র ই যদি চারপাশ থেকে হিস হিস করে শব্দ আসে তাহলে উনি কি করে পড়াবেন? স্যাররাও জানতেন যে কে বা কারা করছে কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তাদের ঘাঁটাতেন না। একজন স্যারকে চাচা বলে ডাকতো এই বাঁদর গুলো। সবসময় কি মাথার ঠিক থাকে? রাগের চোটে বলে দিলেন বাবা বলে ডাকতে পারিস না? মুশকিল হলো এই কয়েকটা বাঁদর ছেলেদের জন্য আমার মতো বেশীরভাগ ভীতু সম্প্রদায়ভুক্ত ছাত্ররা ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কিন্তু কোন কোন মাস্টার মশাই ছিলেন যাঁদের উপস্থিতি সম্ভ্রম জোগাত। যেমন পার্সোনালিটি তেমনই পড়ানো। তাঁদের কোন ব্যাঙ্গ বিদ্রূপের সম্মুখীন হতে হয়নি। নিত্যহরি বাবু, কাবলি বাবু( রণেন), নারায়ন বাবু, বিজয় বাবু, পচন বাবু( কিশোরী মোহন সরকার ),রাখহরি বাবু, সমাদ্দার বাবুরা এই গোত্রীয়। এঁদের জন্য স্কুল থেকে প্রত্যেক বছরই জেলায় প্রথম এবং সারা বাংলায় উজ্জ্বল স্থান অধিকার করতো।
কলেজেও বিভিন্ন বিভাগে নামকরা অধ্যাপকরা ছিলেন। আমাদের রসায়ন বিভাগের ধীরেন্দ্রনাথ রায়, জিতেন চন্দ, আশীষ চ্যাটার্জি, রাধেশ্যাম মণ্ডল , খগেন কর্মকার, নির্মল সরকার ও সুশীল সান্যাল আলো করে ছিলেন। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে জিতেন মুখার্জি, সুশীল সেন, দিলীপ কর, বীরেশ্বর বন্দোপাধ্যায়রা এক একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। অঙ্কে কৃতান্ত বসু , নিমাই চাঁদ বোলার, অসীম ধর, রাজকৃষ্ণ মাল ও বিজয় বিশ্বাস পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং অত্যন্ত উঁচুমানের অধ্যাপক ছিলেন যাঁদের সাহচর্য আমাদের ভবিষ্যত গড়ে দিয়েছে। ঠিক সেইরকম বিশ্ববিদ্যালয়ে অরুণাভ মজুমদারের অসাধারণ সহায়তা জীবনকে সম্পৃক্ত করেছে।
কর্মজীবনেও শ্যামল ধর, এন সুব্বা রাও, জে সুব্বা রাও এবং দীনকর রাও ,অশোক ভট্টাচার্য এবং রামাইয়া স্যারের সামনে থেকে কি করে পরিচালনা করতে হয় তা শিখতে পেরেছি এবং সবার কাছেই আমি আমার কৃতজ্ঞতা জানাই। এইরকম গুরু বা মাস্টার মশাই ছাড়া নিজেকে যে জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছি তা কখনোই সম্ভব হতো না। তাঁদের সবাইকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।
No comments:
Post a Comment