Thursday, 18 September 2025

যুদ্ধ সতত

সকাল বেলায় হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ পেলাম যাতে লেখা আছে শঙ্খ আর মূর্খ ব্যক্তি অন্যলোকের ফুঁয়ে বাজে। কথাটা নিয়ে একটু গভীর ভাবে চিন্তা করতেই দেখলাম কথাটা একদম সঠিক। শঙ্খের প্রসঙ্গে পরে আসছি, আগে মূর্খদের নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। মূর্খ মানে কি পড়াশোনা না জানা লোক? তার মানে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আলোকিত করা লোকজন সবাই বিচক্ষণ? না, তা তো নয়, বরং বেশীরভাগ সময়ই দেখা যায় যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা সেরকম কিছু উল্লেখযোগ্য নয় কিন্তু তাদের বাস্তব বোধ অত্যন্ত প্রখর এবং জীবনে অনেক বেশী শান্তি প্রাপ্ত অথচ অনেক ডিগ্রিধারী মানসিক দ্বন্দ্বে ছিন্নভিন্ন এবং এর জন্য দায়ী তাদের বাস্তব বোধ কম থাকার জন্য বা নিজের অহমিকাকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য। আগের দিনের ঠাকুমা, দিদিমারা স্কুলের গণ্ডি না মারালেও প্রচণ্ড বাস্তববাদী হবার কারণে যৌথ পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিলেন যেটা আজকের দিনে বিরল যদিও টিভির সিরিয়ালে ঠাকুমা, ঠাকুর্দা, ভাসুর,দেওর, দা আর ননদ দের সংসার দেখা যায় এবং কূটকচালিতে ভরা অনন্তকাল ধরে চলতে দেখা যায় এবং সেই সময়টা অন্য কোন লোকের আগমন নৈব নৈব চ। এই ঝগড়া, বিবাদ আর পিছনে সমালোচনা অথচ সামনে মুখে মধু ঝরে পড়া আর যাই হোক বুদ্ধিমানের পরিচয় নয়। তবুও তাঁদের নেমপ্লেটে বা লেটার বক্সে পিতলের ফলকে জ্বল জ্বল করে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা। স্রেফ বাস্তব বোধ না থাকায় ব্যক্তিগত জীবনে তাঁরা প্রচণ্ড অসুখী। এঁদের অনেকেই কাকে কান নিয়ে গেল শুনেই কাকের পিছনে ধাওয়া করেন। এঁদের কি বলে অভিহিত করা যায় পাঠকের উপর ছেড়ে দেওয়াই বাঞ্ছনীয়।

এবার আসা যাক শঙ্খ প্রসঙ্গে। শঙ্খের ইতিহাস খুঁজতে গেলে একটু পুরাণের দিকে ফিরে যেতে হবে। শঙ্খাসুর বা পাঞ্চজন্য প্রভাস সমুদ্রের অতলে থাকা এক মহাদুষ্ট দৈত্য বা অসুর ছিল । কোন এক অজানিত কারণে সে মহর্ষি সন্দীপনীর ছেলেকে কিডন্যাপ করে সমুদ্রের অতলে তাকে শঙ্খের মধ্যে বন্দী করে রাখল। মনোবাসনা কি ছিল কে জানে?  কিন্তু মহর্ষির শিষ্যরা সব নামজাদা লোক যাঁরা হলেন কৃষ্ণ, বলরাম, সুদামা ও উদ্ধবের মতো অত্যন্ত ওজনদার। সুতরাং কিডন্যাপ করে এত সহজে ছাড় পাওয়ার মতো ব্যাপার নয়। শিষ‌্যরা ঘটনা জানতে পেরেই গুরুদেবের মুখের দিকে চাইতেই সম্মতি মিলল, বললেন," দেখ' তো হে বাপু, ব্যাপারটা কি?" গুরুদক্ষিণা  যদি দিতেই হয়  তাহলে আমার ছেলেটাকে একটু উদ্ধার  করে আন তো। আজকের দিনের মতো, কোন রহিস লোকের ছেলেমেয়েদের কেউ  কোন ক্ষতি করলে সমস্ত পুলিশ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়বে অপরাধীদের ধরার জন্য অথচ কোন এলেবেলে লোকজন প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হলেও পুলিশের কোন হেলদোল থাকেনা।  যাই হোক, কৃষ্ণ, বলরাম তো গেলেন এবং শঙ্খাসুর বা পাঞ্চজনকে হত্যা করেও গুরুদেবের ছেলেকে দেখতে পেলেন না। তবে হাল ছাড়ার লোক তো তাঁরা ছিলেন না , যমরাজের হেফাজত থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এলেন ছেলেকে। ফিরে এসে দেখেন পাঞ্চজনের হাড়গোড় সেই শঙ্খের আকার ধারণ করেছে। কৃষ্ণ সেই শঙ্খকে নিজের করে নিলেন এবং সেই থেকে সেই শঙ্খের নাম হলো পাঞ্চজন্য হরিশঙ্খ। এই শাঁখে ফুঁ দিলে যে নিনাদ সৃষ্টি হতো তা শত্রুদের হৃৎকম্প উপস্থিত করে দিত। মহাভারতের যুদ্ধে এই পাঞ্চজন্যের উল্লেখ রয়েছে এবং এই শঙ্খনিনাদেই শুরু হয়েছিল মহাভারতের যুদ্ধ এবং সূর্যাস্তের পরেই এর নিনাদে সেদিনের মতো যুদ্ধ বন্ধ হতো। 
এখনকার দিনের মতোই আগের দিনেও দেওয়া নেওয়ার বালাই ছিল। এখন আমেরিকা যেমন রাশিয়াকে প্রতিহত করার জন্য পাকিস্তানের সহায়ক তেমনি আগের দিনেও এর প্রচলন ছিল। অগ্নিদেবের প্রচুর ঘি খেয়ে অগ্নিমান্দ্য হলো মানে তাঁর মুখে কিছুই রোচেনা। ব্রহ্মার নিদান হলো, বাপু তোমার শরীরের চর্বি না কমালে তোমার এই রোগ সারবে না। এখনকার ডাক্তারের এই মত যদি কোন রোগী শোনে তাহলে সে চর্বি জাতীয় খাবার বা মিষ্টি খাওয়া কমিয়ে জিমে যাওয়া শুরু করবে বা প্রতিদিন দশহাজার কদম হাঁটা শুরু করবে আর মেয়েরা তো পারলে শুধু হাওয়া আর জল খেয়ে কাঠি সুন্দরী হতে চেষ্টা করবে। সেইরকম অগ্নিদেব ব্রহ্মার কথা শুনে খাণ্ডববন দহন করে নিজের অগ্নিমান্দ্য সারাবার পন্থা ঠিক করলেন কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র সেটা মানবেন কেন, অগ্নিদেব যতবার সেই চেষ্টা করেন দেবরাজ ইন্দ্র বৃষ্টি নামিয়ে ততবার আগুন নিভিয়ে দেন। অগত্যা বাধ্য হয়ে অগ্নিদেব কৃষ্ণ ও অর্জুনের শরণাপন্ন হলেন।  অর্জুন দের ও স্বার্থ ছিল । ইন্দ্রপ্রস্থ  স্থাপনের  জন্য দরকার  ছিল  জমি। অতএব , খাণ্ডববন পুড়িয়ে সেই জমি উদ্ধার করতে হবে। সুতরাং ,নামলেন মাঠে কৃষ্ণ ও অর্জুন , যুদ্ধ হল‌‌ ভয়ানক, খাণ্ডবদহন হলো, অগ্নিদেব হলেন সুস্থ এবং পুরষ্কার স্বরূপ কৃষ্ণ পেলেন  সুদর্শন চক্র এবং অর্জুন পেলেন গাণ্ডীব। কেউ আবার বলেন মহাদেব শিব নাকি বিষ্ণুর ভক্তিতে আপ্লুত হয়ে তাঁকে এই সুদর্শন চক্র দিয়েছিলেন আবার কেউ বলেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা সূর্যের শক্তিকে আহরণ করে এই চক্র বিষ্ণুকে দিয়েছিলেন আবার কারো কারো মতে স্বয়ং পরশুরাম নাকি কৃষ্ণের পাঠ সম্পন্ন হলে তাঁকে দিয়েছিলেন এই সুদর্শন চক্র। যাই হোক, যেখান থেকেই পেয়ে থাকুন না কেন বিষ্ণু বা কৃষ্ণের হাতের সুদর্শন চক্র অমোঘ এবং কোন শক্তিই তাকে প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখত না এমনকি শিবের ত্রিশূলের ও না। বিষ্ণুর হাতের গদার নাম ছিল কৌমুদকী। সেই যুগে গদার এক বিশেষ সম্মান ছিল। পৃথিবীবাসীকে দুর্জনের হাত থেকে রক্ষা করার প্রতীক অস্ত্র ছিল গদা, অনেকটা আজকের দিনে আমেরিকার মতো। কেউ বেশি বাড়াবাড়ি করো না, যা বলছি শোন নইলে পড়বে মাথায় ঘা।
বিষ্ণুর কথা যখন হচ্ছেই তখন শেষনাগের কথা না বললে তো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ফেনিল নীল সমুদ্রের উপর সোফায় শায়িত স্বয়ং বিষ্ণুর অর্ধশায়িত ছবি তো প্রায়ই দেখা যায়। ঐ সোফাটিই হচ্ছেন শেষনাগ। শেষ নাগের অপর নাম আদিশেষ যার অর্থ হলো সমস্ত কিছু বিনাশ হয়ে গেলেও তিনি থেকে যাবেন। মহামুনি কাশ্যপ এবং কদ্রুর সর্বজ্যেষ্ঠ সন্তান তাঁর ধার্মিক আচরণের জন্য স্বয়ং ব্রহ্মার আশীর্বাদে বিষ্ণুর সহায়ক হিসেবে থাকার সুযোগ পান। তাঁর উপর ই শায়িত বিষ্ণুর ছবি আমরা প্রায় ই দেখি। ত্রেতাযুগে বিষ্ণু বা রামের সহচর হিসেবে লক্ষণ রূপে দেখি এবং দ্বাপর যুগে তাঁর উপস্থিতি বলরাম হিসেবে। কলিযুগে তিনি কি অবস্থায় কার সহচর হিসেবে আছেন তা বলা কঠিন। তবে আমরা নিজেরা নিজেদের মতো করে ভেবে নিতে পারি।

যুদ্ধ যে শুধু এখন ই হচ্ছে তা নয়, ইতিহাস ঘাঁটলে বা পুরাণ ঘাঁটলেও দেখা যায় এই দেবতার সঙ্গে সেই দেবতার লড়াই। সবাই ভাবে আমি কিসে কম? আমি কেন ওর বশ্যতা স্বীকার করব? সবাই নিজেকে শক্তিশালী দেখতে চায় কিন্তু শক্তিশালী হতে গেলে যে স্বার্থ ত্যাগের প্রয়োজন হয় তা স্বীকার করার মতো মানসিকতা রাখতে পারিনা। যতক্ষণ অন্যদের কাছে মাথা ঝুঁকিয়ে যো হুজুর বলতে পারা যাবে, ততক্ষণ নিজেদের মান সম্মান খোয়া গেলেও প্রাণটা বেঁচে যেতে পারে কিন্তু যখন ই তাদের প্রয়োজন হবে তখন ই তাদের মর্জিমাফিক চলতে হবে নাহলেই বিপদ। যে মূহুর্তে হাত জোড় করা বন্ধ করে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হবে তখনই আসবে নানা দিক থেকে আঘাত কারণ কেউই পছন্দ করবে না যে হাত জোড় করা লোকটা আজ আমার চোখে চোখ রেখে চলছে। অতএব, আমাদের ই বেছে নিতে হবে আমরা কিভাবে থাকব। যুদ্ধ সব যুগেই ছিল, আছে এবং থাকবে কেবল রূপ টা হবে ভিন্ন কিন্তু তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি মানুষের মৃত্যু ও অপরিমেয় ক্ষতি।

No comments:

Post a Comment