সাধু আমাদের এখানেই খুব সামান্য কাজ করে, সামান্য মানে যৎসামান্য,একদম বড় মুখ করে বলার মতো নয়। কবে এসেছিল এখানে সেটা হয়তো পুরনো লোকজন যাঁরা আছেন তাঁরাই বলতে পারবেন। এসেছিল যখন তখন সে রীতিমতো গাঁট্টাগোঁট্টা যুবক বিহারের কোন জায়গা থেকে। গভর্নমেন্ট হাউসিং কলোনি ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে শহরের উপকণ্ঠে , অ্যালটমেন্ট হচ্ছে ফ্ল্যাটের, লোকজন আসছে ধীরে ধীরে তাদের নতুন বাসস্থানে। অনেকেই এসেছেন ওপার বাংলা থেকে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে কোনরকমে প্রাণ বাঁচিয়ে, আশ্রয় নিয়েছেন কোন আত্মীয় বা পাড়াতুতো পরিচিতের বাড়িতে, তারপর ধীরে ধীরে নিজেদের কর্ম ও অধ্যবসায়ের জোরে পায়ের তলার জমি শক্ত করেছেন এবং আবার জেগে উঠেছেন। তাঁদের পরিশ্রমের প্রশংসা অবশ্যই করতে হয় কারণ এভাবে ঘুরে দাঁড়ানো সহজ কথা নয়। উপনগরী যেখানে গড়ে উঠেছে সেখানে আগে ছিল কচুরিপানা ভর্তি বিশাল জলরাশি। শোনা যায় যে এইখানে নাকি উগ্রপন্থীদের পুলিশের গাড়ি থেকে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হতো এবং পিছন থেকে তাদের গুলি করে মারা হতো। সত্যতা যাচাই করার সুযোগ হয়নি কিন্তু লোকমুখে যতটা রটে তার খানিকটা তো ঘটেই থাকে। যাই হোক, সরকারী উদ্যোগে না লাভ, না লোকসান করে বিশাল উপনগরীর ফ্ল্যাট গুলো আর্থিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হলো এবং বলাই বাহুল্য তৎকালীন সরকারের কাছের লোকরাই সবসময়ের মতোই সেই ফ্ল্যাটের সিংহভাগ দখল করে নিল( সরকারী অনুমোদনে) । শহরের নামজাদা লোকেরাও এলেন এবং কো-অপারেটিভ করার জন্য অনেক ফ্ল্যাটেই কোনরকম স্ট্যাম্প ডিউটি না দিয়েই ফ্ল্যাটের মালিকানা পেলেন। পরবর্তী কালে এঁরাই ফ্ল্যাটের মালিকানা বদলের সময় বিক্রেতা ও ক্রেতাদের কাছ থেকে কিছু সাম্মানিক মূল্য আদায় করলেন যদিও তাঁরা সরকারকে স্ট্যাম্প ডিউটি বাবদ পুরো টাকাই দিয়েছেন। প্রথম থেকেই সরকারের এই নেতিবাচক নীতি অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে নিয়ে গেছে। যাঁদের প্রকৃত সাহায্যের প্রয়োজন ছিল তাঁদের সঙ্গে যাঁদের ক্ষমতা ছিল এই টাকা দেওয়ার তাঁরাও এই লাভ পুরোপুরি ভাবে তুলে নিয়েছেন। নতুন জায়গায় নতুন প্রতিবেশী, পাঁচমিশালি মনোভাব মোটামুটি একটা সাধারণ মতে পৌঁছাতে বেশ সময় লেগেছে। এর মধ্যেই ছিল কম আর্থিক সামর্থ্যের জন্য ফ্ল্যাট, মাঝারি সামর্থ্যের জন্য এবং অধিক সামর্থ্যের জন্য ফ্ল্যাটের বিভাজন এবং তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি যে নাক উঁচু লোকের সঙ্গে সাধারণ লোকের মধ্যে সম্পর্কের বিভাজন। সেই কারণেই বিভিন্ন ফেজে বিভিন্ন লোকদের রাখা হয়েছে যাতে বিভাজনের প্রকৃত রূপ উৎকট না হয়ে পড়ে। উপনগরী তো তৈরী হলো কিন্তু তাদের পরিবারে কাজ করার জন্য বা রান্না করার লোকের তো প্রয়োজন হয়, সুতরাং খুব স্বাভাবিক ভাবেই আশে পাশে গরীব মানুষের ঝুপড়ি তৈরী হলো, বাজার দোকান তাদের মধ্যেই একটু সম্পন্ন লোকেরা শুরু করল। সংখ্যায় অপ্রতুল হওয়ায় পাশের প্রদেশের গরীব মানুষরাও ছুটে এল কর্মসংস্থানের জন্য। "সাধু" এইরকমই একজন যে বিহারের এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে নিজের পেট পালতে এসেছিল এখানে।
আগে সাধুর বাড়ি যাওয়া প্রায় ছিল ই না, থাকতো ওদের জন্য তৈরী করে দেওয়া একটা ছোট ঘর ও একটা বাথরুম যেখানে গাদাগাদি করে কয়েকজন থাকতো। আগে তো পাখাও ছিলনা, কেরোসিনের লণ্ঠন দিয়ে অন্ধকার নাশ করতে হতো তাদের কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জন্য ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হলো এবং তার সঙ্গে পাখা। অবশ্য এটা এমন কিছু বিরাট ব্যাপার নয়। অনেক বাড়িতেই বিদ্যুৎ ছিলনা, কর্পোরেশনের জলের লাইন আলাদা করে বাড়িতে ছিলনা এবং রাস্তার কলের উপর ভরসা করেই তাদের জীবন চলতো। সাধু ভোরবেলা থেকেই উঠে সে যে ফেজে থাকে তা পরিষ্কার করতে লেগে যায় ঝড়, জল বৃষ্টি উপেক্ষা করেই। তার জীবনের একটাই মন্ত্র যে যেখানে সে থাকবে সেখানে একশ শতাংশ তো বটেই তার ও অনেক বেশি সে দেবে। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর একটু শস্তার ছিলিম না টানলে শরীর যে আর চলেনা, সুতরাং ওটা মেনেই নিতে হয়। এই উপনগরীতে অনেক গাছগাছড়া, সুতরাং বসন্তের সময় তো বটেই, সারা বছরই টুপটাপ করে পাতা ঝরছে আর সাধুর ঝাঁট দেওয়াও অব্যাহত। ধীরে ধীরে নানাধরণের লোকজন এসেছে, কেউ পাম্প চালায় আবার কেউ বা ময়লা নিয়ে যায়। এদের ছাড়া কোন সভ্যসমাজ চলতে পারেনা কিন্তু এরাই বড় বেশী উপেক্ষিত। আমরা তেলা মাথায় তেল ঢালতে ভালবাসি কিন্তু যাদের মাথায় একটু হলেও তেলের প্রয়োজন তাদের জন্য খুব কম সময় ই ভাবি। ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে পরিবর্তন আসছে এবং অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যেই এটা বিশেষ ভাবে প্রকট হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক লোকদের মধ্যে ও অনেক ভাল লোক আছেন যাঁরা রাজনীতির ঊর্ধে উঠে মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসেন তবে বেশীরভাগ সময়ই তাঁদের নিজেদের দলের লোকদের প্রতি নজর দেন। এহেন সাধুকে একদিন জুতো পড়ে বেশ ভাল পোশাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম যে কি ব্যাপার? ও জানালো যে বাড়ি থেকে খবর এসেছে যে ওর বিয়ের ঠিক হয়েছে। বিশ্বাস করতেই পারছিলাম না যে সাধুর কোনদিন বিয়ে হতে পারে। অভিনন্দন জানিয়ে ওকে সাধ্যমতো টাকা ও জামাকাপড় দিলাম। ওর অনুপস্থিতি প্রতি মূহুর্তেই অনুভূত হচ্ছিল কারণ ওর বদলে যে কাজ করছিল তা সাধুর ধারেকাছেও নয়। অনেকটা সেই একশো দিনের কাজের লোকদের মতো। ছেলেমেয়ে মিলিয়ে প্রায় আট নয়জনের দল আসে, মেয়েদের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, হাতে বড় ডাণ্ডার সঙ্গে লাগানো ঝাঁটা , একজন এদিকের শুকনো পাতা ওদিকে সরায় আর কেউ ওদিকের সরানো পাতা এদিকে রেখে যায়। দুজন আসে মোটরসাইকেলে যাদের একজন মোবাইলে ফটো তোলে আর একজন চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখে। একটু সময় পরেই সব ভোঁ ভাঁ। ওই অতগুলো লোকের সমবেত কাজের থেকে সাধুর একার কাজ অনেক অনেক গুণ বেশি কিন্তু সাধারণ লোকের ট্যাক্সের টাকা এইভাবে জলে যেতে দেখলে মন খারাপ ছাড়া ভাল হবার নয়।
অনেক উঁচু পদে থাকা লোকজনেরও কর্তব্যনিষ্ঠা সেরকম ভাবে না থাকলেও সমাদৃত হন কিন্তু সাধুর মতো এধারে ওধারে থাকা আরো অনেক সাধুই রয়েছে যাদের কর্মনিষ্ঠা অতুলনীয় কিন্তু তারা চিরকাল ব্রাত্য ই থেকে যায়।
No comments:
Post a Comment