Monday, 8 September 2025

"মোমবাতি"

পাড়ায় পরিচিত নাম মোম দা। আসল নামটা যে কি খুব কম লোকই জানত। স্কুলে ভাল নাম তো অবশ্যই ছিল কিন্তু মাস্টার মশাইরা পর্যন্ত ওকে মোম বলেই ডাকতেন। মোম আবার কোন ছেলের নাম হয় না কি? মেয়েদের হলেও হতে পারে কিন্তু ছেলেদের --না, একদম ই শোনা যায় না। ছেলেবেলায় মাকে হারিয়ে, পিসি, কাকাদের কাছে মানুষ যাঁরা নিজেরাও কেউ বিয়ে থা করেন নি, দাদার সংসারটাকেই নিজেদের বলে মনে করেছে আর চালিয়েও দিল দিব্যি। ছোটবেলায় মাতৃহারা শিশুদের অবস্থা কিন্তু খুব কষ্টদায়ক, সে বাড়িতে যত ই কাকা, পিসিরা থাকুন না কেন। বাবাও কাজে বেরিয়ে যায়, কাকাও কাজে যায়, অনূঢ়া পিসির বিয়ে নিয়ে ও কারো মাথা ব্যথা হয়নি, বাড়িতে রান্নাবান্না করা ও সংসারটাকে কোনভাবে টেনে নিয়ে যাওয়া , এটাই তার একমাত্র কাজ। দাদারা টাকা রোজগার করে আনছে আর বোন সংসার টেনে চলেছে। এইরকম সংসারে ছেলেদের বড় হয়ে ওঠা খুবই কঠিন। মোমের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ছোট থেকেই নিজেই নিজের অভিভাবক। সকাল বেলায় খাওয়া দাওয়া করে স্কুল এবং সেখান থেকে ফিরে খেলতে বেরিয়ে যাওয়া এবং সন্ধ্যের বেশ পরেও ফিরে এলে জবাবদিহি কারো কাছে করা নেই, পিসি কিছু জিজ্ঞেস করলে হাড্ডা বাড্ডা বলে কিছু বুঝিয়ে দেওয়া, এককথায় অভিভাবকহীন বললেও কিছু অত্যুক্তি হয়না। মোমের একটা ভাই ছিল গজু, সেটাও প্রায় একই রকম,তবু তার মাথার উপরে একজন দাদা ছিল । কিন্তু এই নিজেই নিজের অভিভাবক হবার কারণে এবং পাড়ার পরিবেশ ভাল থাকার জন্য ও বখে যায়নি বরঞ্চ পাড়ার সবাই ওদের প্রতি খুব সহানুভূতিশীল ছিল। খানিকটা স্বার্থ ও ছিল পাড়ার লোকদের কারণ কোন বিপদে আপদে ডাক পড়ত সেই মোমের ই। এইসব ছেলেরা হয় খুব ভাল নয়তো খুব খারাপ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু মোম যে পাড়ায় থাকতো সেটা অত্যন্ত ভদ্রলোকের পাড়া মানে বেশিরভাগ লোকই ভাল, দু চারটে বাজে লোক কি ছিল না, অবশ্যই ছিল কিন্তু তারা ঐ ভদ্রপল্লীকে বিশেষ কলুষিত করতে পারেনি।
মোম স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে বাড়ির কাছেই কলেজে ভর্তি হলো কিন্তু বি এ পরীক্ষার গণ্ডি আর পেরোনো হলো না। নানারকম জনহিতকর কাজে সে নিজেকে ডুবিয়ে দেওয়ায়, পরীক্ষায় পাশ করার জন্য যতটুকু পড়াশোনা করা দরকার সেটুকু আর করা হয়ে উঠল না। সেই সময়  মাস্টার মশাইদের ভয় দেখিয়ে বই খুলে পরীক্ষার রেওয়াজ না থাকায় কলেজের গণ্ডি অধরাই থেকে গেল। ক্লাবে ব্যায়াম করা এবং যে কোন লোকের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য ও খুবই জনপ্রিয় ছিল। তখন স্কুলের সীমা পেরোলেই মোটামুটি একটা সরকারী চাকরি পাওয়া যেত। ইতিমধ্যে মোমের বাবার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটায় বাবার চাকরিটা সে পেল এবং সে আরও দায়িত্বশীল হয়ে উঠল। অফিসের সময়টা ছেড়ে দিয়ে বাকি সময়টা কেবল লোকের উপকার করা এবং বিভিন্ন ভাবে তাদের সাহায্য করা। ডিগ্রীটা একটা কাগজের টুকরো যেটা মানুষকে উন্নতির সোপানে নিয়ে যায় বটে কিন্তু যে নিজের জীবনটাকেই উৎসর্গ করেছে অন্যদের জন্য তার কাছে উন্নতি করা বা প্রমোশন পাওয়া একটা তুচ্ছ ব্যাপার। এদের জীবনে কি প্রেম আসেনা? অবশ্যই আসে কিন্তু এই প্রেম করা বা সংসার করা তাদের কাছে একটা বিলাসিতা করার মতো। সময় কোথায় তার যেখানে অনেক লোক সেই সময়ের জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে?  কাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে, কাকে পরীক্ষার হলে পৌঁছে দিতে হবে, কার বাড়িতে কেউ মারা গেছেন, তার সৎকারের ব্যবস্থা , এইসব করতে গিয়ে নিজের দিকটাই আর ভাল করে দেখা হলো না। কিন্তু পাড়ার কিছু ভদ্রলোক তো সবসময়ই থাকেন যাঁরা তার শুভাকাঙ্ক্ষী, তাঁদের ই একজন মোমের বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। মোম তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করত এবং তাঁর কথা ফেলতে না পেরে বিয়ের পিঁড়িতে বসল। 
বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেল। বাবা, কাকা, পিসি সবাই একে একে চলে গেছেন, ভাই ও কাজের সূত্রে অনেক দূরে রয়েছে, একদিন মোম নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ল কিন্তু আরেকজন মোম তো আশেপাশে নেই যে তাকে নিয়ে যাবে হাসপাতালে। মোমের স্ত্রী পাড়ায় অনেকের খোঁজ করলেন কিন্তু এই বিপদের দিনে কাউকেই পেলেন না পাশে, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই মোম চলে গেল " না ফেরার দেশে।" এই মোমরাই নিজেকে নিঃশেষ করে অন্যদের আলো দেখায় , প্রতিদানে সে কিছুই চায়না। কিন্তু মোমের সঙ্গে যারা জড়িয়ে আছে, তারা কি প্রতিদানে কিছু আশা করতে পারে না?  বটের ছায়ায় আর একটা বট গাছ হয়না। একটা এলাকায় একজন মোম ই হয় যারা নিজেকে নিঃশেষ করে অন্যদের উপকার করে। পূজো প্যাণ্ডেলে মারা যাওয়ার প্রথম বছরে হাসিমুখে মোমের ছবিতে একটা মালা , নীচে নাম লেখা মনোময় চট্টরাজ, বন্ধনীর মধ্যে ছোট্ট করে লেখা মোম, নীচে জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ দেওয়া।
পরের বছর আবার পূজো এল, ক্লাবে আর কোন ছবি দেখা গেল না। এক সময় মোমদার কথা ছাড়া কিছুই হতো না আর এক বছর বাদেই ছবিটা অন্য রকম। এটাই জগতের নিয়ম। যতক্ষণ তুমি আছ, ততক্ষণ ই তোমাকে নিয়ে নাচানাচি, আর ভুলে যেতে মানুষের বেশী সময় লাগে না। মোম দা, সত্যিই তুমি মোমবাতি, নিজেকে জ্বালিয়ে অন্যদের আলো দেখিয়েছ, আজ তুমি নেই আলো জ্বালানোর ও কেউ নেই। যেখানেই থাকো, ভাল থেকো।

No comments:

Post a Comment