Wednesday, 15 December 2021

স্বপ্নের খোঁজে লেখক নিখোঁজ

মোহনবাবুর আজ খুব আনন্দ ।দীর্ঘদিন  কাজ করার  ফাঁকে আজ একটু লম্বা ছুটি পেয়েছেন। গিন্নীর অনেক অনুযোগ আজ একটু প্রশমিত করার  সুযোগ  এসেছে। যখনই  ছুটির  দরখাস্ত  করেছেন তখনই কর্তৃপক্ষের অনুরোধ  এসেছে একটু পিছানো  যায়না? মোহনবাবুর স্বভাবই  এরকম যে উনি কখনোই কর্তৃপক্ষের  আদেশ অমান্য  করেন নি। কিন্তু এবার  তাঁর ঊর্ধ্বতন  কর্তৃপক্ষ আর না করতে পারেন নি মুখরক্ষার খাতিরে। যাই হোক মহানন্দে গুনগুন করতে করতে বাড়ি ফিরছেন। অফিসের  শেষে সাধারণত  মোহনবাবু এতটাই  ক্লান্ত হয়ে  ফেরেন যে বাড়ি ফিরে হাত মুখ ধুয়ে একটা বড় গামলার  মতন  কাপ চা না খেলে কথাই  বলতে ইচ্ছা করেনা। খাওয়া দাওয়া করার  পরে এই মোহনবাবুর একটা ব্যাপার আছে। কিছু না কিছু উনি লিখবেন। আজ সেই মানুষটার অন্য রকম চেহারা দেখে গিন্নী রীতা রীতিমত  চিন্তিত হয়ে পড়ল। কি গো, আজ কি লটারির  টিকিটে কিছু ভালোমন্দ  পেয়েছ নাকি?  মোহন বা রীতা কেউই  কারো নাম ধরে ডাকেনা। হ্যাঁগো, শুনছো  এরই মধ্যে ঘোরাফেরা করে। নাম ধরে ডাকতে  স্বামী বা স্ত্রীর  দুজনেরই  কেমন  লজ্জ্বা লজ্জ্বা ভাব। আজ মোহন বিনয়ের কাছ থেকে গরম গরম আলুর  চপ ও পেঁয়াজি  কিনে এনেছে। আজ শুধু চা নয় সঙ্গে তেল মাখিয়ে  মুড়ির  সঙ্গে বেশ জম্পেশ  করে আলুর চপ ও পেঁয়াজি খাচ্ছে। হঠাৎই  রীতাকে টেনে নিয়ে মুখে এক গাল মুড়ি ও আলুর  চপ ঠুঁসে  দিয়েছে, রীতা হকচকিয়ে গেল। এই বুড়ো বয়সে কি মাথার  গন্ডগোল  হল কিনা ভেবে খুবই  দুশ্চিন্তাগ্রস্ত  হলো। কি ব্যাপার,  আজ কি ভীমরতি হলো নাকি? মোহন আর হেঁয়ালির  মধ্যে রাখল না, বলল যে  অবশেষে  ছুটি পাওয়া গেছে,  আমরা যাব বেড়াতে সবাইকে নিয়ে।  তার মানে? এর মানে খুবই  সহজ। আমরা সবাই  বেড়াতে যাব । সবাই  মানে? সবাই  মানে আমরা সবাই, বাবা, মা, তোমার  বাবা, মা আমরা সবাই।  এতজন বুড়ো মানুষকে নিয়ে যেতে তোমার  বুক একটুও  কাঁপছে না? 
না। আমি  সবাইকেই  নিয়ে যাব। 
ট্র্যাভেল এজেন্টকে বলে একটু  বেশিই  টাকা দিয়ে হায়দরাবাদ  যাবার  টিকিট  কাটা হলো। টিকিট কাটা হলে উনি যাত্রাটা কি রকম  হবে সেটা নিয়ে মোটামুটি একটা নিবন্ধ খাড়া করলেন।  মোহনবাবু ছেলে, বৌমা, নাতি, নাতনি, মেয়ে, জামাই, বাবা, মা, শ্বশুর, শ্বাশুড়ি এবং নিজেদের  টিকিট নিয়ে বারটা টিকিট  কেটে  রওনা দিলেন তাঁরা সবাই।  খুব  ভাল  চলছে গাড়ি। চার বুড়োবুড়ি সেই পুরনো  দিনের কথাই  রোমন্থন  করে চলেছে। এদিকে ছেলে, বৌমা ও মেয়ে, জামাই তারাও  গল্পে মত্ত। মোহন ও রীতা তাদের  নাতি ও নাতনিদের  নিয়ে ব্যস্ত।  হঠাৎই  ট্রেন টা একটা বড় স্টেশনে এসে থামল। অনেকক্ষণ  ধরেই ট্রেন টা থেমে আছে। গল্প করতে করতে সবার  চোখই  বেশ  লেগে এসেছে আর এই ফাঁকে ক্ষুদে দুটো কখন সবার  অলক্ষ্যে  ট্রেন  থেকে নেমে স্টেশন  চত্বরে খেলতে শুরু করে দিয়েছে। হঠাৎই  একটা হ্যাঁচকা টান, ট্রেন টা চলতে শুরু করেছে। তখনও কারো খেয়াল  হয়নি যে বাচ্চা দুটো গেল  কোথায়? এরপর ট্রেন টা আস্তে আস্তে স্পীড  নিতে শুরু করেছে। হঠাৎই  মোহনের  খেয়াল  হলো যে বাচ্চা দুটো নেই। দরজার  কাছে ছুটে এসে দেখে তারা ট্রেনের  পিছনে ছুটছে কাঁদতে কাঁদতে। কালবিলম্ব না করে প্ল্যাটফর্মে লাফিয়ে নামল এবং নাতিকে কোনরকমে কামরায় প্রায় ছুঁড়ে ঢুকিয়ে দিয়ে নাতনির নাম ধরে ডাকতে থাকল কিন্তু কেমন  যেন  হাওয়ায়  উবে গেল।  ইতিমধ্যে ট্রেনটি অনেক দূর চলে গেছে  শুধু ট্রেনের  পিছনে লাল আলোটা দেখা যাচ্ছে। বোঝাই  যাচ্ছেনা যে ট্রেনটি থেমেছে না চলে যাচ্ছে। আর মোহন  পাগলের  মতন নাতনির নাম ধরে ডেকে এদিক ওদিক  ছোটাছুটি করছে।  স্বাভাবিক ভাবে জিআরপি কে খবর দেওয়ার  কথা তার  মনেও আসেনি। হঠাৎই  কেমন  ভাবে যে মোহনের  মাথা বিগড়ে  গেল এবং কি করে যে সে উধাও  হয়ে গেল  কেউ জানতেও পারল না। লাইনে লাইনে সে খোঁজে তার  নাতনিকে। 
তার  ছেলে, বৌমা, মেয়ে জামাই রা সকালে উঠে দেখে যে তাদের  বাবা বা শ্বশুর মশাই তাঁর বার্থে  নেই । প্রথমে তারা ভাবল যে হয়তো টয়লেটে  গেছেন কিন্তু অনেকক্ষণ  পরেও তাঁকে  দেখতে না পেয়ে বিজিয়ানগরম স্টেশনে জিআরপিতে  জানাল। মোহনের  বাবা, মা এবং রীতার  বাবা মা ও  খুবই  অস্থির  হয়ে পড়েছেন কিন্তু তাঁরা এতই বৃদ্ধ যে কি করা উচিত  তা তাঁরা  বুঝে  উঠতে পারছেন না। নাতি ও নাতনি তারাও এতটাই  ছোট  যে তারাও কেমন  ভীষণ  চুপচাপ  হয়ে গেছে।  রীতা তার ছেলেমেয়েদের  সঙ্গে আলোচনা করে বিজয়বাড়ায়  নেমে যাওয়ার স্থির করলেন  এবং স্টেশন  মাস্টারের সঙ্গে দেখা  করে আদ্যোপান্ত  বললেন এবং তিনিই  তাদের  ফেরার  বন্দোবস্ত  করলেন কিন্তু মোহনের  কোন খোঁজ পাওয়া গেলনা। আসলে মোহন  স্বপ্ন  দেখে তার  নাতি নাতনিদের  খেলতে দেখে মাঝরাতে কোথায় যে নেমে গেলেন  কেউ জানতেই পারল না। মোহনের  খোঁজ  এখনও  পর্যন্ত  পাওয়া যায়নি। সাধারণত  একই সঙ্গে চার জেনারেশন দেখাই যায়না কারণ  আজকাল  ছেলে বা মেয়েরা অল্প বয়সে বিয়ে করেনা, বড় জোর  তিন  জেনারেশন দেখা যায়। কিন্তু চার জেনারেশনের  একসঙ্গে যাত্রা  এক বিরল ব্যাপার। তার যে এরকম নিদারুণ পরিণতি হবে এটা সকলের বুদ্ধির অগোচরে। 

Thursday, 11 November 2021

গানের আসর

গানের আসর বিভিন্ন ধরনের হয়। কোথাও  ক্ল্যাসিকাল, কোথাও  রবীন্দ্র সঙ্গীত,  কোথাও আধুনিক  আবার কোথাও  বা পাঁচমিশেলি। আসরের  শ্রোতাও সেখানে ভিন্ন, ভিন্ন  তাদের  স্বাদ যার প্রতিফলন  হয় তাদের  পোশাক আশাকে। উচ্চমার্গের  ক্ল্যাসিকাল গানের আসরে খুঁজে পাওয়া যায় ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত ভদ্রলোকের, চোখে তাদের  চশমা যেটা প্রায় নাকে নেমে এসেছে কিন্তু অত্যন্ত  দক্ষতার সঙ্গে সেটা ম্যানেজ করছেন যাতে না পড়ে যায়। শীতের  সময়েই  সাধারণত এই অনুষ্ঠানগুলো হয় এবং শালটা  কাঁধের  উপর ফেলে একটু শিল্পী বা সাহিত্যিক টাইপের আঁতেল মার্কা ভাব করে অনুষ্ঠানে আসেন এবং কথা যেখানে না বললেই  নয় সেখানে বলেন এবং  বেশিরভাগ  সময়েই  মাথা নেড়ে সম্মতিসূচক  ঘাড় নাড়েন এবং মাঝে মধ্যেই  হুম  বলে একটা আওয়াজ  বেরোয়। আর ঠিক  পছন্দ  না হলে ঠোঁটটা একটু সামান্য বিস্তার করেই আবার  যথাস্থানে  ফিরে যায়। অনুষ্ঠান  শুরু হতেই এঁদের  মাথা নাড়ার জন্য এবং বাহ বাহ আওয়াজে শিল্পীর মনঃসংযোগে কখনও  বাধা সৃষ্টি হয় এবং শিল্পীর বিরক্তিকর  দৃষ্টি তাঁদের  উপর প্রতিফলিত  হয়।
মহিলাদের শাড়ি ও গয়নার প্রতিযোগিতা এই অনুষ্ঠানের মধ্যে দেখা যায়। আর দেখা যায় মেক আপের প্রতিযোগিতা। ভাল  অনুষ্ঠান  দেখব না এদের  দেখব এই নিয়ে রীতিমত  ধন্দে পড়ে যেতে হয়। দামী শাল কিন্তু শীত নিবারণ করার  বদলে গয়নাগাঁটির  প্রদর্শনে সহায়তা করে। যাই হোক,  এটা এলিট সমাজের অনুষ্ঠান  এবং এঁরা যতটা সম্ভব  সামনের  সারির  টিকিট  সংগ্রহ  করেন  এবং যতটা গান বোঝেন তার থেকে বেশী  বোঝার  ভান  করেন। দেখা যায় যাঁরা ছোটখাট  শিল্পী বা সত্যিই  শিল্পানুরাগী  তাঁরা আপাদমস্তক  চাদর বা শালে মুড়ে সবচেয়ে কম দামের  টিকিটে একদম পিছনের  সারিতে বসে সুরজালের মায়ায়  বুঁদ  হয়ে রয়েছেন। এতো গেল ক্ল্যাসিকাল গানের আসর।  এবার  আসা যাক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের  অনুষ্ঠান। বিশ্বভারতীর কপিরাইট  শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন শিল্পীদের রবীন্দ্র সঙ্গীতের পরিবেশন যেন অবাধ স্বাধীনতা পেয়ে গেছে। যে যেমন ইচ্ছা গেয়ে চলেছে, কারও  কিছু বলার  নেই।  এঁদের  মধ্যে অনেকেই  হয়তো বেশ  নাম করে ফেলেছেন  এবং স্বঘোষিত  অথরিটির  তকমা লাগিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু অতীতের প্রথিতযশা শিল্পীদের  গাওয়া গানের  সঙ্গে এদের আকাশ পাতাল তফাত। হয়তো আমাদের  সকলের  মনে আছে যে দেবব্রত বিশ্বাসের  মতন শিল্পীর  গাওয়া গানও বিশ্বভারতী মিউজিক  বোর্ডের  অনুমোদন  না পাওয়ায় রেকর্ড  হিসেবে বেরোয়নি। এই নিয়ে শিল্পীর  মনঃকষ্টের  কোন শেষ  ছিলনা। তাহলে আজ যাঁরা পয়সা দিয়ে রেকর্ড  করছেন তাঁদের  কি অবস্থা হতো ভাবতেই  ভয় লাগে। সুতরাং, যাঁরা সুবিনয় রায়, সুচিত্রা মিত্র  বা কণিকা বন্দোপাধ্যায়ের  গান শুনেছেন  তাঁরা চট করে এমুখো হবেন  না। কিন্তু এখনও  কিছু শিল্পী আছেন যাঁরা ঐ প্রবাদপ্রতিম শিল্পীদের যোগ্য উত্তরসূরী হিসাবে বিশুদ্ধ ভাবেই  গাইছেন এবং যোগ্য  সম্মান পাচ্ছেন। 
এবার  আসা যাক, পাঁচমিশেলি ঝকমক রামা হো টাইপের  গানের  আসরে। যেমন শিল্পী তেমনই  শ্রোতা। টাইট জিনস,  অন্ধকারেও সান গ্লাস পরা, সাধারণ  লোক পরলে যখন তখন  হোঁচট খেয়ে মরবে। বড় বড় ড্রাম, হাতে লাঠি সোঁটা( ড্রাম বাজানোর  কাঠি) , হাতে নানান ধরণের গিটার,  শিল্পীদের  মাথায়  বাঁধা চকরা বকরা রুমাল, দেখলেই গা টা কেমন ঘুলিয়ে ওঠে। শ্রোতাদের চেহারা এবং বেশবাস ও প্রায় একই রকম। প্রায় ষোল সতের  বছর আগে বান্দ্রায়  অনেক রাতে একগুচ্ছ আধুনিকা কে ছেঁড়া, ফাটা জিনসের প্যান্ট পরতে দেখে নিজের  চোখকেই  বিশ্বাস  করতে পারিনি। কিন্তু এখন  তো দেখছি এগুলো আকছার। শিল্পীর  গলায় নেই কোন সুর যা ঢাকা পড়ে যায় বাজনার  গগনভেদী  আওয়াজে। সুতরাং, মান বাঁচিয়ে পাশ কাটানোই  ভাল। 

এবার  আসা যাক, এক বিচিত্র  গানের  আসরে। যাঁরা খুব ভোরে ওঠেন তাঁরা নিশ্চয়ই  এই গানের  সঙ্গে পরিচিত  হয়েছেন। ভোরের  আলো ফুটতে না ফুটতেই শুরু হয়ে যায়  এই কলতান। টিয়া , বুলবুল, পায়রা, কাক,শালিক, চড়াই,  ঘুঘু ,কোকিল, কাঠঠোকরার  তির তির তির তির তির তির ডাক এবং মাঝে মাঝেই  বসন্ত বাউরির টুই টুই রব মনকে ভীষণ  পবিত্র  করে তোলে। শ্রোতা  কে আছে না আছে তার  বিন্দুমাত্র  তোয়াক্কা না করে নিজেদের  মনে আপন খেয়ালে গেয়ে চলে নতুন দিনের  আগমনবার্তা। এই আসরের  কিন্তু কোন  তুলনা নেই । সবাই  নিজেদের  সাধ্য মতো  গেয়ে চলেছে, কোথাও কোন সমালোচক  নেই, আছে শুধু সঙ্গীত  এবং এ এক অপূর্ব  বিচিত্রানুষ্ঠান।

Sunday, 7 November 2021

আত্মীয়

আত্মীয় শব্দটা শুনলেই মনে হয় যেন কোন রক্তের সম্পর্ক  আছে কিন্তু ঘটনাচক্রে শব্দটা একটু গোলমেলে। প্রায়শই  দেখা যায় যেখানে কোন  রক্তের  সম্পর্ক ই নেই সেখানেই  প্রগাঢ় বন্ধুত্ব এবং রক্তের  সম্পর্কে একদম লাঠালাঠি ব্যাপার। কিন্তু এরকম  উলট পুরান কেন? আসলে আত্মীয় মানে যেখানে আত্মার  সম্পর্ক  আছে বা যোগ আছে এবং সেখানে রক্তের সম্পর্ক  থাকতেও পারে নাও পারে। অনেক ঘটনা মনে আসে এ সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলে কিন্তু কিছু কিছু ঘটনার  কথা বললেই এই শব্দের  তাৎপর্য বোঝা যাবে।

আমেদাবাদে ওসমানপুরায় গুজরাট বিদ্যাপীঠের পাশের  গলির ডালবড়া অত্যন্ত বিখ্যাত। ভাল করে ফাঁটানো ডালের  বড়া লেবুর রসে জারিত পেঁয়াজ কুচি এবং গরম তেলের  কড়াইয়ে  একবার  ছেড়ে দিয়েই উঠিয়ে নেওয়া আধভাজা কাঁচালঙ্কার  যে কি অপূর্ব  স্বাদ সেটা যে না খেয়েছে সে কিছুতেই  বুঝতে পারবে না। অনুজের  এটা ছিল  খুবই  পছন্দের  খাবার  এবং বহুদিন  অফিসের  পরে রান্না করে খেতে ইচ্ছে না হলে বেশ খানিকটা  ডালবড়া  খেয়েই উদরপূর্তি করতো। পাশেই ছিল  তুকারামজীর সাইকেল ভ্যানে লাগানো দোকান যেখানে ভাত, ডাল, তরকারি পাওয়া যেত। মাঝে মাঝে অনুজ তুকারামজীর  দোকানের খদ্দেরও   হয়ে যেত। ডালবড়ার দোকান এবং তুকারামজীর দোকানের  সামনে সারি সারি বেঞ্চ পাতা থাকত যেখানে বসে খরিদ্দাররা  বসে খেতে পারতো। বেঞ্চগুলোর সামনে পাতা থাকতো টুল যেখানে  লোকে খাবার রাখত। অফিসের  খুব কাছেই তার বাড়ি এবং দোকান গুলো থাকার জন্য খুব  বেশি সময় যেতনা খাবার  সংগ্রহের জন্য। ডালবড়াই হোক আর তুকারামজীর  দোকানের রুটি তরকারিই হোক একটা দৃশ্য  অনুজের  নজর এড়ায় না। একটা অন্ধ লোককে রোজ তুকারামজীর  দোকানের  সামনে বসে থাকতে দেখত। কৌতূহলবশত একদিন জিজ্ঞেস  করে ফেলল তুকারামজী এই লোকটিকে রোজ দোকানের  সামনে বসে থাকতে দেখি, কি ব্যাপার? জবাবে সে জানালো যে ওর নাম জিতুভাই এবং ও সারাদিন  ভিক্ষা করে রাত্রিবেলায় ও এখানে আসে খাবার  খেতে। অনুজ একটু আগ্রহ  দেখিয়ে আরও  জিজ্ঞেস  করল ওর খেতে  কত টাকা লাগে এবং তার উত্তরে সে জানালো যে দশ টাকা কিন্তু ও জিতুভাইয়ের  কাছে কোন  পয়সা নেয়না। আশ্চর্য ব্যাপার,  রাস্তার  ফুটপাথের ধারে চালানো এক দোকানের  মালিক  এই গরীব  অন্ধ মানুষটিকে অন্তত  একবেলা পেটভরে খাবার  জোগায় অথচ এত পয়সাওয়ালা লোক চারিদিকে এত বাজে পয়সা খরচ করে কিন্তু কাউকে কিছু দিতে গেলেই এদের  প্রাণ বেরিয়ে যায়। 

অনুজের  বদলির  অর্ডার  এসে গেছে কারণ তার এখানে থাকার  মেয়াদ  শেষ। রিলিভারকে চার্জ বুঝিয়ে দিতে আরও  তিন চার দিন  লাগবে। তুকারামজী, একটা কথা বলব আপনাকে? বলুন স্যার।  তুকারামজী, আপনি তো জিতুভাইকে রোজই খাওয়ান,  আমাকে একটু ওর সেবা করতে দেবেন? তুকারাম তো একটু অবাক হয়ে গেল, বলল আপনি কেন দেবেন? অনুজ  জানালো যে ওর বদলি  হয়ে গেছে এবং সে একহাজার  টাকা দিতে চায় জিতুভাইয়ের  খাবারের  জন্য। তুকারামজী একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল কিন্তু অনুজ তার হাতে জোর করে টাকাটা গুঁজে দিল। জিতুভাইয়ের  সঙ্গে না তুকারাম না অনুজ কারো কোন  রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও কোথাও  যেন  একটা যোগ  রয়েছে যার নাম আত্মীয়তা। 
 

Saturday, 6 November 2021

ভাই ফোঁটা

আজ ভাই ফোঁটা, কালী পূজোর  পর দ্বিতীয় দিন।  কেউ  কেউ  বলেন  ভাই  দ্বিতীয়া। কোন কোন  রাজ্যে একে বলে ভাই  দুজ। যে নামেই  বলা হোক না কেন এই বিশেষ অনুষ্ঠানে ভাইদের  একেবারে পোয়াবারো। দূর দূরান্ত থেকে ভাইরা আসতেন বোন  বা দিদির কাছে ফোঁটা নিতে। যে সমস্ত  ভাইরা ছিল ভোজন রসিক এবং উদরের অন্তস্থলের পরিধি ছিল বিশাল,  এই বিশেষ  দিনে বোনেরা সাধ্য মতন যোগাড়যন্ত্র করত ভাইদের  উদরের  পরিতৃপ্তির জন্য। বিশাল চেহারার মালিক হলেই যে সে খুব  খেতে পারবে, এমন নয়। কিন্তু অনেক রোগা পাতলা লোক যাদের কুকুরের পেট বলত তাদের  খাওয়া দেখলে লোকে তাজ্জব  হয়ে যেত। বোনদের ভাগ্যেও  যে কিছু জুটত না তা নয় । যদি ভাইয়েরা একটু সুপ্রতিষ্ঠিত  হতো তাহলে তো কথাই নেই। সৈনিক  ভাইরা এই অনুষ্ঠানকে  অত্যন্ত  মর্যাদা দেয় এবং বহু সিনেমায় দেখা গেলেও  এটা সত্যি যে ওরা অনেক কষ্ট করেও বোনের  কাছে ফোঁটা নিতে আসে। বোনেরা, ভাইয়ের কপালে দিলাম  ফোঁটা , যমের দুয়ারে  পড়ল কাঁটা এই কথাগুলো বলে সত্যিই  যমের  দরজা আটকাতে পারে কি না জানিনা কিন্তু প্রার্থনার  তো একটা জোর আছে আর এই প্রার্থনা শুনতেই  তো এত দূর থেকে ছুটে আসা। যে কোন মূহুর্তে শত্রুর  বা আতঙ্কবাদীর ছুটে আসা বুলেটে সচল দেহটা  নিশ্চল হয়ে যেতে পারে যেটা আমাদের মতন সাধারণ নাগরিকদের  সম্ভাবনা খুবই  কম। সুতরাং আমাদের মতন স্বার্থপর আত্মসুখী  লোকেরা এক ভালোমন্দ  খাওয়া ছাড়া আর কিছুই  ভাবতে পারিনা। বোনদের ভাগ্যে জোটে হয় কিছু টাকা না হয় একটা শাড়ি, হালফিলে একটা মোবাইল  কিংবা ট্যাবলেট অবশ্য  বোন যদি আধুনিকা  হয়। সাহিত্যের  প্রতি আকর্ষণ  থাকলে ভাল লেখকের  বই ও জোটে।একটা কথা  কিন্তু আমাকে বেশ বিব্রত করে। ভাইয়ের  কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের  দুয়ারে পড়ল  কাঁটার পরের দুটো লাইন  সম্বন্ধে আমার  সংশয় কিছুতেই যায়না।যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার  ভাইকে ফোঁটা । যমুনা যমকে বাঁচাতে কার দুয়ারে কাঁটা দেয়? তার মানে যমকে চমকানোর জন্য  আরও  বড় কেউ  আছে? প্রশ্নের  উত্তর  খুঁজেই  চলেছি, উত্তর  এখনও  অধরা।

এবার  যাওয়া যাক আগের  দিনের  ভাই ফোঁটায়  তারপর আসা যাবে এখনকার  ভাইফোঁটায়। আগে তো প্রত্যেক সংসারেই পাঁচ সাতজন  ছেলেমেয়ে ছিল এবং আশেপাশে মাসিমা বা পিসিমারা থাকতেন এবং তাঁদের  সংসারেও ভাইবোনের সংখ্যাও  ঐ একই রকম ছিল। সুতরাং ভাই ফোঁটা মানেই একবিরাট উৎসবমুখর দিন। লম্বা বারান্দায় আসন পেতে নিজের ভাইয়েরা, পিসতুতো মাসতুতো ভাইয়েরা একসঙ্গে বসে ফোঁটার  অপেক্ষায় বসে থাকা এবং দিদিদের সিনিয়রিটি হিসেবে ফোঁটা দেওয়া এবং সবার  ফোঁটা শেষ হলে সমস্ত দিদি বোনেরা হাত লাগিয়ে এক একজনের  প্লেট ধরে ভাইদের  হাতে তুলে দেওয়া। দিদি, বোনদের  সংখ্যা বেশি হলে সবার  হাত একটা প্লেটে লাগানো সম্ভব  না হলে বলা হতো অন্তত গায়ে হাত লাগিয়ে রাখ। বসে বসে কিন্তু আড়চোখে  কোন প্লেটে বেশি পড়েছে বা কোন  প্লেটে কম এটা দেখা চলতো এবং মনে মনে যিনি দিয়েছেন তার মুন্ডপাত করা। কিন্তু এ সত্ত্বেও একটা বিপুল  আনন্দ উপভোগ  করা যেত।  যে ভাইরা দূরে থাকার জন্য  ফোঁটা নিতে আসতে পারেনি তার মঙ্গল  কামনা করতে দরজার  চৌকাঠে ফোঁটা দিত। ফোঁটা শেষ হতে হতে মেয়েদের  জলখাবারের পালা এবং সেটাও  মিটতে মিটতে বেলা গড়িয়ে যেত। এরপর দুপুরের খাওয়া এবং সেই  পর্ব শেষ  হতে প্রায়  চা খাওয়ার  সময়। কিন্তু এত কষ্ট সত্ত্বেও  সব দিদিদের  বা মা বোনদের  মুখের  হাসিটা মিলাতো না। তবে কতটা জোর করে হাসি বা কতটা স্বতঃস্ফূর্ত  সেটা তখনই বোঝা যেত না। বোঝা যেত যখন  মা বলতো একটু পা টা টিপে দেওয়ার  জন্য।  গৃহকর্তা কতটা চাপের  মধ্যে থাকতেন সেটা তাঁর গম্ভীর মুখের অভিব্যক্তি থেকে বুঝতে হতো। তবুও  তিনি এই উৎসবের আনন্দের  অন্তরায়  হতেন না। আজ আমরা যখন  ঐ জায়গায় এসেছি তখন সেদিনের  গৃহকর্তার গম্ভীর মুখের  কারণ  বুঝতে পারি।

এখন প্রত্যেক  পরিবারেই ছেলেমেয়েদের  সংখ্যা হয় এক বা বড় জোর দুই। যদি দুজনই ছেলে বা দুজনই মেয়ে হয় তাহলে এই উৎসবের  আনন্দ উপভোগ  করার জন্য  মাসতুতো বা পিসতুতো  ভাই বোনদের  সাহায্য  নিতে হয়। আর কাছাকাছি কেউ না থাকলে কমপ্লেক্সের  ভাই  বোনদের সাহায্য  নিয়ে উৎসবের  আনন্দ  উপভোগ করতে হয়। আগে পায়েস  যেমন ভাইফোঁটার  বা জন্মদিনের  এক বিশেষ  অঙ্গ  ছিল এখন সেই জায়গায় এসে গেছে কেক। আনন্দ  এখন কতটা  ফিকে হয়ে গেছে সেটা যারা দুটো অবস্থারই সাক্ষী তারা বুঝতে পারে, অন্যরা নয়। 

আজ জীবন  সায়াহ্নে পৌঁছে যখন মূল্যায়ন  করতে যাই তখন  ভাবতে চেষ্টা করি যে কোন  অবস্থাটা ভাল  ছিল।  দুই অবস্থারই  কিছু  সদর্থক এবং নঞর্থক  দিক আছে কিন্তু একটা কথা স্বীকার  করতেই  হবে যে কিছু পেতে গেলে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতেই  হয়। গতবছর  যা ছিল  এবছরে তা  নেই। গতবছর  এইদিনে  আমার  বড়দি করোনার জন্য  ফোঁটা দিতে না পারলেও দরজার চৌকাঠে ফোঁটা দিয়ে আশীর্বাদ  জানালো আর তার  কিছুদিন  পরেই তিনি করোনাক্রান্ত হয়ে আমাদের  ছেড়ে চলে গেল। তার আগের বছর  চলে গেলেন  আমার অত্যন্ত  শ্রদ্ধেয় রামাইয়া  সাহেব।  জানিনা পরের বছর  আবার সবাইকে পাব কিনা।


Thursday, 4 November 2021

কবি

ছন্দোময় জীবনে  প্রবেশ  করিনি আমি
ডানা নাই মোর আকাশে উড়িনা আমি
কবি পরিচিতির যোগ্য  নই যে আমি
অতি সাধারণ মানুষের মতো আমি।


Wednesday, 27 October 2021

গল্প নয় আর লেখকও নই।

গল্প নয় আর লেখক নই। কিছু পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণা।।
বয়স তখন খুবই কম। লোকে গান করতে বললে লাজ লজ্জাহীন হয়েই গান শুরু করে দিতাম। সুতরাং, বয়সটা সহজেই অনুমেয়।

পাড়ার দুর্গাপুজো আমাদের বাড়ীর মাঠেই হতো অন্তত জন্ম ইশতক দেখছি। বাইরের বারান্দায় আমাদের ঠাকুর বানাতো ধীরেন পাল। পাড়ার লোকের চাঁদা দিয়েই হতো পূজো ছিলনা কোনো স্পন্সরশিপ বা বিজ্ঞাপন। ধীরেন কাকার প্রায় হাতে খড়ি আমাদের পাড়ার দুর্গা প্রতিমা দিয়ে। সুতরাং যত কম পয়সা দিয়ে করিয়ে নেয়া যায় আর কি। সব যুগেই একটা শোষণের পন্থা চলে এসেছে। মাত্র চল্লিশ টাকা দিয়ে তাকে দিয়ে দুর্গা ঠাকুর বানানো হতো। ছিল অনেক বড় বড় শিল্পী কিন্তু তারা আমাদের ধরা ছোয়াঁর বাইরে। সব চেয়ে দামী ছিলেন যামিনী পাল, তার পরে বিমল পাল, শীতল দাস এবং বাঙাল রা। লোকে বলতো বাঙাল নাকি যামিনী পালের ছাঁচ চুরি করেছে। কি করে? যামিনী পালের ঠাকুর বিসর্জনের পরে বাঙাল নাকি তার লোকজন দিয়ে মায়ের মূর্তির মাথাটা ভেঙে নিয়ে এসেছিল এবং যামিনী পালের মতনই মায়ের মুখ বানাতো ওই ছাঁচ দিয়ে। সত্যি বাঙাল সেটা করেছিল কিনা কারো জানা নেই কিন্তু লোকমুখে প্রচার হয়ে গিয়েছিল চোর বাঙাল। বাঙাল কে এভাবে বলাটা এখন মনে হয় তার শিল্পকীর্তিকে নিচে দেখানো। যাই হোক বাকিদের নিজস্বতা ছিল কিন্তু যামিনী পালের নাম উঠলেই বাঙাল এর নামটা উঠে আসতো।

এবার আসি ধীরেন কাকার কথায়। আমাকে খুব ভাল বাসতো কারণ সবাইকে ধীরেন কাকাকে বকতে শুনতাম। যে লোকটার শিল্প সম্বন্ধে জ্ঞান শূন্য সেও এসে জ্ঞান দিত। মাঝে মাঝে ধীরেন কাকাকে নীরবে চোখ মুছতে দেখতাম। আমি ছোট হলেও ধীরেন কাকার সমব্যথী ছিলাম।  ঠাকুর তৈরীর কয়েকটা ধাপ আছে। শুকনো খড় দিয়ে প্রথমে শরীরটা মোটামুটি ভালো ভাবে বেঁধে তারপর একমাটির প্রলেপ পড়তো। তারপর দুমাটির প্রলেপ। তারপর রোদে শুকানো এবং সাদা রং হতো এবং তারপর যে রঙে প্রতিমাকে রাঙানো হবে সেটা হতো। এরপর চোখ আঁকা এবং সবশেষে চালি বসানো হতো। ধীরেন কাকা বাবার কাছে অনুমতি নিয়ে আমাদের   বাড়ীর বাইরের বারান্দায় সব কাজটাই করতো এবং নিজের বাড়ী ফিরে যাবার আগে সব জায়গাটা পরিষ্কার করে যেত। ধীরেন কাকার চ্যালা হিসেবে আমিও খুব গর্ব অনুভব করতাম মনে মনে। কাকা মাঝে জল খেতে চাইলে আমি চুরি করে দু চারটে নারকেলের নাড়ু নিয়ে দিতাম। কাকা জিজ্ঞেস করতো মাকে বলেছ তো? আমি থাকতাম চুপ করে। একদিন মা কি কারণে বাইরে আসলে ধীরেন কাকা বলে উঠলো " বৌদি নারকেলের নারুটা খুব ভালো হয়েছে। মা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কোনোরকমে সামলে নিলো । পরে আমাকে বললো তুমি আমাকে না বলে কেন এই কাজ করেছ? আমি কেঁদে ফেললাম বললাম মা কাকার খুব খিদে পেয়েছিল কিন্তু কিছু বলছিল না।রোজ যে মুড়ির একটা ছোট্ট পুঁটলি আনে আজ তাও ছিলোনা। মা বললো আছছা ঠিক আছে কিন্তু এবার থেকে আমায় জিজ্ঞেস করে দেবে। আমি কেবল মাথাটা নাড়ালাম। অসুরের চেহারাটা কি রকম হবে কাকা আমায়  জিজ্ঞেস করলো। আমি বললাম মদন দার মতন করতে হবে। মদনদা জুনিয়র ভারতশ্রী হয়েছে আর চেহারাটাও ছিল গ্রীক দের মতন। মদনদাকে নকল করার মতো আমার চেহারা কোনোদিন ছিলোনা কিন্তু মদন দা যেভাবে দেখাত সেইভাবে দেখাতে পাটকাঠির মতন চেহারায় যখন দেখালাম তখন সবাই হাসতে থাকলো কেবল ধীরেন কাকা ছাড়া। কাকা সেইমতন খড় বেঁধে ,যেখানে যেমন মাসল হবে প্রয়োজনীয় খড় বাঁধল। আমার না আছে পড়াশুনো না আছে অন্য কিছু । বুঁদ হয়ে দেখতাম ধীরেন কাকার কাজ আর অন্যান্য শিল্পীদের কাজ দেখে এসে কাকাকে বলতাম। জানিনা ধীরেন কাকা তার থেকে কোন কিছু নিয়েছিলেন কিনা। প্রায় বছর পাঁচেক কাকা আমাদের দুর্গা, কালী ,লক্ষ্মী এবং সরস্বতী ঠাকুর করেছিলেন। তারপর দীর্ঘদিন কেটে গেছে কাকার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ নেই। এখন ধীরেন কাকা নিশ্চয়ই বেঁচে নেই কিন্তু হঠাৎ এক ঝলক দমকা হাওয়ায় স্মৃতির পুরোনো পাতাটা উল্টে গেল আর এদিক ওদিক থেকে উড়ে যাওয়া পাতাগুলো যথাসম্ভব  একত্রিত  করে লিপিবদ্ধ করে ফেললাম। 

Tuesday, 19 October 2021

ঝুলনযাত্রা

আজ শ্রাবণের পূর্ণিমাতে কি এনেছিস, বল্?


কি চাই বল্? তোদের জন্য ঝুলনযাত্রা এনেছি এখন, খুশী কি না বল্। সত্যিই তো, ঝুলনযাত্রা এমনই  এক অনুষ্ঠান  যা সমগ্র উত্তর, পশ্চিম এবং পূর্ব ভারতে মহা সমারোহে পালিত হয়। হোলি এবং জন্মাষ্টমীর পরেই এই গুরুত্বপূর্ণ  উৎসব যা হিন্দুরা অত্যন্ত ধূমধাম  করে পালন করেন। রাধা এবং কৃষ্ণকে  নিয়ে বহু চর্চিত প্রেমগাথা  এই উৎসবের  মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। ঝুলনযাত্রা মানে কোনসময় রাধা দোলনায় বসে আছেন এবং শ্যামসুন্দর  তাঁকে দোলা দিচ্ছেন এবং মাঝে এত জোরে তিনি দোলা দিতে থাকলেন যে শ্রীরাধা ভীত সন্ত্রস্ত  হয়ে পড়লেন এবং হে মাধব আমায় রক্ষা করো এবং সেই  সুযোগে শ্যামসুন্দর তাঁর পাশে দোলনায় বসে পড়লেন  এবং শ্রীরাধার  সখীরা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলেন।  আবার  কোন  কোন  ক্ষেত্রে শ্রীরাধা এবং শ্রীমাধব  পরস্পর উল্টোদিকে দোলায় দুলছেন  এবং সখীরা তাঁদের  সেবা করছেন। প্রায় ষাট বছর আগে ইসকন ( ইন্টারন্যাশনাল  সোসাইটি  ফর কৃষ্ণ কনসাসনেস)  মানে উনিশশো বাহাত্তর সালে তাঁদের  মন্দির  বা অফিস  রাসবিহারী মোড়ে প্রতাপাদিত্য  রোডের  সন্নিকটে খোলে এবং পরবর্তীকালে স্থান সঙ্কুলান  না হওয়ায় থিয়েটার রোডে তাদের  মন্দির  স্থাপন  করে। ধীরে ধীরে এর কলেবর  বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন  জায়গায় এঁদের  সম্প্রসারণ  হয় এবং বর্তমানে কলকাতা থেকে একশ  চল্লিশ  কিলোমিটার  দূরে মায়াপুরে সর্ববৃহৎ মন্দির  স্থাপন  করেন  এবং এটাই এঁদের  হেড অফিস। যাই হোক, এবার  ফিরে আসা  যাক ঝুলনযাত্রায়।

প্রচন্ড  গরমের পরে বৃষ্টি আসায় সবাই  খানিকটা হাঁফ  ছেড়ে বাঁচে।শুকিয়ে যাওয়া গাছপালা স্বস্তির  নিঃশ্বাস ফেলে আবার  সবুজ  পাতায় সেজে ওঠে আর এর মধ্যেই শ্রাবণ  পূর্ণিমার স্নিগ্ধ  আলোকে শুরু হয় ঝুলনোৎসব।  শৈশবের  সেই ঝলমলে দিনগুলো চোখের  সামনে জ্বলজ্বল  করে ওঠে। শেখর, মলয়, প্রকাশ  এবং আমার কাজ ছিল  পাড়ার যত ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের  নিয়ে শহরের  অলিতে গলিতে দু পা অন্তর বাড়িতে বাড়িতে বিভিন্ন  রকমের  পুতুল দিয়ে সাজানো ঝুলন দেখানো। ঘাসের চাপড়া  দিয়ে তৈরী হতো পাহাড়, তার  মধ্যেই  করা হতো কুলু কুলু বয়ে যাওয়া ঝর্ণা।  অদূরে শহরের  রাস্তা এবং চলছে রিক্সা , চলছে গাড়ি এবং রাস্তার  মোড়ে  ট্রাফিক পুলিশ। একটু দূরে করা হতো বাজার,  নানারকম  তরি তরকারি  নিয়ে বসতো বুড়ি মা এবং ক্রেতা হিসেবে  থাকতো কিছু  লোকজন।  আমরা যদি আজে বাজে দাম বলতাম  তাহলে সূত্রে বাঁধা বুড়ির মাথা  নাড়িয়ে দেওয়া হতো যার অর্থ  না ঐদামে সে বিক্রি করবেনা। পাহাড়ের  মাঝখানে থাকতো  একটা দোলনা যেখানে শ্রীরাধা ও শ্রীকৃষ্ণ  বসে থাকতেন  এবং দোল খেতেন।  কোন একটা বাড়িতে সবরকমের  পুতুল  না থাকায় বিভিন্ন  বাড়ি থেকে এইসমস্ত  পুতুল  সংগ্রহ করা হতো এবং ঝুলন  শেষে ঐ পুতুলগুলো আবার  ফিরিয়ে দেওয়া হতো। তুতু,  জলু,  টিঙ্কু, রিঙ্কু,  ইতি, গজু,ঝকান এবং আরও  অনেক ছোট ছোট  ছেলেমেয়েদের  ঝুলনোৎসব দেখিয়ে আনা আমাদের  কাজ ছিল। তখন বাড়িতে বাড়িতে টিভির  আক্রমণ  ছিলনা আর সেই কারণেই  খেলাধূলো  ছেড়ে দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা চোখ সাঁটিয়ে  বসে থাকা ছিলনা, ছিল ক্লাবে যাওয়া, ড্রিল করা,মেয়েদের  খো খো খেলা বা যোগাসন  করা এবং রাস্তার  আলো জ্বলে ওঠার  আগেই  বাড়ি ফিরে হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসা এবং রাত নটার  আগে খেয়েদেয়ে ঘুম। আবার  সকালে উঠে পড়তে বসা এবং স্কুলে যাওয়া এবং স্কুল  থেকে ফিরেই  কিছু খেয়ে ক্লাবে যাওয়া। এই ছিল  দৈনন্দিন  রুটিন এবং মাঝে মাঝেই  এইধরণের  পূজো, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে এক বিশেষ  আনন্দ  পাওয়া।

সময়ের  পরিবর্তনে সবকিছুই  পরিবর্তন  হয়েছে। পড়াশোনার  ধাঁচ পাল্টেছে, জীবন যাত্রায় এসেছে বহুল পরিবর্তন কিন্তু এরই মধ্যে সেই অনাবিল  আনন্দ  যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। চাকা তো আর উল্টোদিকে ঘুরবে না, সুতরাং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে  এবং যারা পারবে না তারা পিছনে পড়ে থাকবে। জানিনা এখন  কটা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা  ঝুলনোৎসব  পালন করে এবং আনন্দ  উপভোগ  করে।