Saturday, 13 May 2023

বিবর্ণ স্মৃতি

অনেক দাম দিয়ে কেনা কত ঝলমলে কাপড় জামাও  কালের  গতিতে কেমন বিবর্ণ হয়ে যায় সেখানে স্মৃতির  জোয়ারে যে ভাটা পড়বে তাতে আর কি সন্দেহ আছে? ফেলে আসা দিনগুলোর  দিকে পিছন ফিরে তাকালেই মনে পড়ে অনেক ঘটনা, সবগুলোই  যে প্রয়োজনীয় তা নয় ,অনেক হাব্জি গুব্জি ও মনে আসে আবার  অনেক  কথাই হাজার  মনে করার  চেষ্টা করা সত্ত্বেও  মনে পড়েনা  তখনই।  বয়স নিশ্চয়ই  একটা ব্যাপার,  সেটাকে অস্বীকার ও করা যায় না। কিন্তু কোন এক সময় হঠাৎই  তিনি উদয় হন মনের  মধ্যে এবং আবার ও ভুলে যাবার  আগে যদি তাকে শব্দবদ্ধ না করা যায় তাহলে তা চিরতরেই  বিস্মৃতির আড়ালে চলে যেতে পারে।

এইরকমই আমার  কিছু পুরোনো বন্ধুর  কথা মনে পড়ছে যারা আমাকে ছেড়ে দিয়ে পাড়ি জমিয়েছে  না ফেরার দেশে। খুবই অন্তরঙ্গ, আমার খুশীতে তাদের ও খুশী , দুঃখে পিঠে হাত রেখে বলতো," এত ভেঙে পড়ার  কিছু নেই, আমরা তো পাশে আছি; আবার  ফিনিক্স  পাখির মতো উড়ে যাবি  আকাশে আর সঙ্গে সঙ্গে আমরাও  উড়ব  তোর সাথে।" চাকরির সূত্রে একঝাঁক পায়রা এসে হাজির  হলো কলকাতার  বুকে সুদূর দক্ষিণ  দেশ হতে। নক্ষত্রের  সমাবেশ  বলা যেতে পারে। কেউ বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের  উদীয়মান নক্ষত্র,  কেউ বা বিখ্যাত  লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের ঝলমলে ছাত্রী আবার  কেউ বা অসুস্থতার কারণে স্কুল ফাইনাল  পরীক্ষার  উজ্জ্বলতম ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও  পড়াশোনা চালিয়ে যেতে অসমর্থ।  কিন্তু আগুন  তো চিরদিন ছাই চাপা পড়ে থাকতে পারেনা, তা কোন না কোন  সময় প্রতিভাত  হবেই। তাদের  কাজের  মাধ্যমেই সেই প্রতিভার বিচ্ছুরণ হতে লাগল যার অবশ্যম্ভাবী প্রতিফলন সেই অফিসের কাজের মধ্যে। তার নাম যশ বাংলা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ল  দাক্ষিণাত্যে এবং ধীরে ধীরে ভারতবর্ষের  বিভিন্ন  প্রান্তে। অফিসের  উত্তরণের  সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গতকারীদের ও উত্তরণ  হলো এবং ভারতবর্ষের  বিভিন্ন  প্রান্তে তারা পতাকা বহন করতে লাগল। কিন্তু কর্মসূত্রে গেঁথে ওঠা মালার পুঁতিগুলো  এদিক সেদিক  ছড়িয়ে পড়লেও মনে মনে সর্বক্ষণ ই একটা আশা যে আবার আসিব ফিরে, মিলিব সবার সাথে সেই পুরাতন ঝিলের ধারে। হাসিব, খেলিব  গাহিব সবাই সেই পুরাতন গান।  হয়তো  সবটাই  হয়ে ওঠেনি কিন্তু পুরোন সেই স্মৃতির  রেশ আজও ঝলমলে হয়ে আছে। খোলা আকাশের  নীচে  বসে গান, তর্ক বিতর্ক,  মান অভিমান  সবই মনে পড়ছে, মনে পড়ছে সেই ছুটির দিন সবাই মিলে পুরোন কলকাতা পরিক্রমার  কথা। সবাই মিলে তারামহলে টিফিন  খেতে যাওয়া বা অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে  নাটক  দেখতে যাওয়া বা রবীন্দ্র সদনে স্বনামধন্য  শিল্পীদের  অনুষ্ঠান  শুনতে যাওয়া সবকিছুই  মনে পড়ছে  আর আবার  ভুলে যাবার  আগে তাকে স্মৃতির  মণিকোঠায় সাজিয়ে রাখতে চাই।

সেদিনের তরুণরা আজ প্রায় বৃদ্ধ, অনেকেই  আজ এই সুন্দর  পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে আবার  কেউ কেউ অপেক্ষারত জিনিসপত্র  গোছগাছ করে । ডাক এলেই চলে যাবে। যারা এই মূহুর্তে রয়েছে তারা ব্যস্ত   স্মৃতি রোমন্থনে। কখনও সখনো মিটিং হলে বা পিকনিক  হলে তারা একত্রিত  হয় কিন্তু ঐ আনন্দের  মধ্যেও চোখদুটো খোঁজে  সেই পুরোন বন্ধুদের  আর সবার অলক্ষ্যে রুমাল দিয়ে চোখটা মোছে এবং চশমার  কাচটা পরিষ্কার  করে নেয়। চৌধুরীর  হাতটা ছিল ভারী মিষ্টি। তবলার  বোলগুলো যেন প্রাণ  পেত তার আলতো আঙ্গুলের  টোকায়। স্বভাবটাও ছিল বড় মিষ্টি তার সদাহাস্য  মুখের  মতন। কত ছেলেমেয়েদের  সে উৎসাহ যুগিয়েছে গান  বাজনা করার  জন্য  এবং পরবর্তীকালে তারা যথেষ্ট  ভাল  গান করেছে। সুজিতের ছিল প্রাণখোলা গলা এবং কি শ্যামাসঙ্গীত বা ভক্তিগীতি বা রবীন্দ্র সঙ্গীত বা অতুলপ্রসাদী বা রজনীকান্তের  গান যা কিছুই গাইত  তা একটা আলাদা মাত্রা পেত। মাধবিকা গাইত  প্রধানত নজরুল গীতি এবং পুরোদস্তুর  প্রশিক্ষণের  ছাপ তার গলায় ছিল।  প্রিয়রমা, কণিকা সবাই অফিসের  ফাংশনে রীতিমত অংশ গ্রহণ করতো এবং অনুষ্ঠানকে  প্রাণবন্ত করে তুলত। ম্যানেজমেন্ট বললে জয়ন্তর  কথা সবচেয়ে আগে আসবে। ও ছিল  মেরুদন্ড,  কথা কম কাজ বেশি। তৃপ্তিদার  কথা অবশ্যই  বলতে হবে। হঠাৎই  একটা কাগজ  নিয়ে খসখস করে গান লিখে, তার সুর ও দিয়ে দিত এবং চৌধুরী  ও আমাকে দুই হাতে শক্ত  করে ধরে লাঞ্চরুমে দরজা বন্ধ  করে গান শুনতে বাধ্য  করতো। দরজা বন্ধ করে তার পিছনে চেয়ার টেনে বসে( যাতে আমরা বাইরে পালিয়ে যেতে না পারি) হারমোনিয়ম টেনে নিয়ে স্বরচিত  এবং সুরারোপিত গান আমাদের  শুনতে বাধ্য  করতো। তবলায়  চৌধুরীর হাজার  চেষ্টাও গানকে তালে রাখতে পারত না। একদিকে গলা আর অন্যদিকে  হারমোনিয়মের সুর, সে যে কি ভয়ানক অভিজ্ঞতা তা বলে বোঝানো যায়না। গান শেষ  হলে মতামত  জানতে চাইলে কি যে বলা  উচিত  ভেবে পেতাম  না। অনেক ভেবে চিন্তে একটা জুতসই উত্তর  খুঁজে পেয়েছিলাম  এবং সেটা হলো যে ঠিকই  আছে তবে একটু স্কেলটা  চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে যার চটজলদি  সমাধান ছিল  ও একটা স্কেলচেঞ্জ  হারমোনিয়ম কিনে ফেলবে। আর চৌধুরীর  উত্তর  ছিল, তালটা কেটে যাচ্ছে তো, একটু ডেটল লাগাতে হবে। এহেন  তৃপ্তিদা রবীন্দ্র সদনে অফিসের  অনুষ্ঠানে সোলো  গাইবেই  গাইবে যেখানে গাইবেন শ্রদ্ধেয় সাগর সেন এবং ফিরোজা  বেগম।  ত্রাতা  সেই একজন, সুজিত  ব্যানার্জি। অনেক কষ্টে বুঝিয়ে সুজিয়ে কোরাস গানে অংশগ্রহণ  এবং তাকে একেবারে পিছনের  দিকে রাখা যাতে তার গলা মাইক্রোফোনে ধরা না পড়ে। এইসব আনন্দের মুহুর্ত গুলো যদি না বলা হয় তবে সমস্ত প্রচেষ্টাই  একেবারে পানসে  হয়ে যাবে এবং ম্যাড়মেড়ে হয়ে যাবে। সবচেয়ে গ্ল্যামারাস ছিলেন আমাদের  অফিসের  প্রধান  শ্যামল ধর। ছিলেন  অমরনাথ  মিত্র মুস্তাফি এবং ব্রেবোর্ন রোড শাখার প্রধান শচীন  দাশগুপ্ত এবং সুব্রত রায়চৌধুরী।  ছিল শিবু ,সুশান্ত, মোহন, তরুণ,  শচী, নির্মল এবং অবনী। ছায়াদির উপস্থিতি ছিল একদম নির্বাক কিন্তু প্রয়োজনীয় যা কিছু করা দরকার  তা উনি নিঃশব্দেই  করতেন।

আজ আমরা অনেককেই হারিয়েছি। স্যার ( শ্যামল ধর), অমরনাথ মিত্র মুস্তাফি,  শচীন  দাশগুপ্ত,  সুব্রত রায়চৌধুরী, মোহন,  শুভ সবাই একে একে চলে গেছেন এবং হৃদয়ে এক একটা মোক্ষম  আঘাত  হেনে গেছেন। বিনয় দা, কান্তি দা, মধু( পাল), বাড়ারি, সবিতা, বিভাস এবং সাহা সর্দার আমাদের  কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন। বিদায় নিয়েছে সমীর,পার্থ ও স্বপন, খলিল ও ভগীরথ কিন্তু চৌধুরীর চলে যাওয়া মন থেকে কিছুতেই  মেনে নিতে পারিনি, সেইরকম  মানতে পারিনি অসীম  ধৈর্য্যশীলা সবিতার  চলে যাওয়াকেও। কিন্তু গতবছর উপর্যুপরি  দুই দিনে চৌঠা জুন এবং পাঁচই জুন সুজিত  এবং শঙ্খপাণির প্রয়াণ এক মহা ধাক্কা। দুজনেই  ছিল একাধারে বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ী।  আজ তাদের  চলে যাওয়া প্রায়  বছর গড়াতে চলল কিন্তু যে রেশ তারা  মনের মাঝে রেখে গেছে  তা ভোলা কঠিন। তাদের  সকলের  প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিবর্ণ স্মৃতিকে  একটু ঝাড়পোঁছ করে চাগিয়ে তোলার অক্ষম  প্রচেষ্টা। 

Sunday, 7 May 2023

জীবন যে রকম

হাসপাতালের  বেডে শুয়ে আছেন তমাল। আত্মীয়স্বজন  যারা এসেছে  তারা আছে শেষের  প্রতীক্ষায় কারণ ডাক্তারবাবু জবাব  দিয়ে দিয়েছেন। তমাল অকৃতদার,  কয়েকজন  ভাগ্নে, ভাগ্নী, ভাইপো ভাইঝি ছাড়া রয়েছে দাদা, বৌদি ও বোন, ভগ্নীপতিরা। যথেষ্ট  উচ্চপদেই  আসীন ছিলেন তমাল  সুতরাং সেবা নিবৃত্ত হবার পর পয়সাকড়ির কোন অভাব ছিলনা তাঁর। একাই থাকতেন  তমাল  কারণ  কোনদিন অন্যের  সংসারে বোঝা হবার  মানসিকতা তার ছিলনা। ভাইবোনদের  সংসার  গড়ে দেওয়ার  পিছনেও ছিল তার যথেষ্ট  অবদান আর এটা করতে করতেই  কখন যে নিজের  বেলা গড়িয়ে গেছে খেয়াল  করতেও  পারেন নি। বাবা তো অনেকদিন  আগেই চলে গেছেন,  মা অনেকবার  বন্ধু বান্ধবদের  বলেছেন  একটা ভাল মেয়ে দেখে দেওয়ার জন্য  কিন্তু কোন কোন সম্বন্ধ  এলেও নানাধরণের বাগড়ায়  তা বিয়ে অবধি আর এগোয় নি। এহেন  পরিস্থিতিতে তমাল  যে সুস্থ  হয়ে ফিরে আসেন  তা কেউ ই চায়না। ডাক্তার  জবাব  দেয়ার পর যেন সবার চোখগুলোই যেন চকচক করে উঠছিল আর মনে মনে সবাই  হিসেব  কষছিল  ভাগে কত আসবে।
কিন্তু ভগবানের  হিসেবটা ছিল যেন  অন্য রকম। সেই স্থির  চোখের  তারাগুলো যেন ঈষৎ নড়ে উঠল। নার্স একটু গভীর ভাবেই লক্ষ্য  করতে থাকলেন এবং তারপর ডাক্তার বাবুকে খুব  চাপা গলায় কিছু বললেন।  ডাক্তার বাবু তৎক্ষণাৎ প্রায় দৌড়ে এসে পরীক্ষা করলেন  এবং নার্সকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ  দিলেন।  ধীরে ধীরে তমালের  জ্ঞান  ফিরে আসতে লাগল  এবং আত্মীয়স্বজনের  মধ্যে ততোধিক  বিরক্তি প্রকাশ  পেতে লাগল  কিন্তু আমরা তো সবাই  এক একজন  নায়ক, নায়িকা , সুতরাং মনের  বিরক্তি মনেই রেখে মুখ হাসি হাসি করে ক্যাফেটেরিয়ার দিকে এগোল।
তমালের  মা কিছুদিন  আগেই চলে গেছেন।  বেশ ভারিক্কি চালের ভদ্রমহিলা কিন্তু ঠোঁট সামান্য  ফাঁক করেই তাঁর প্রসন্নতা  বা অপ্রসন্নতা বুঝিয়ে দিতেন। রজত  ছিল তমালের  অত্যন্ত  প্রিয় বন্ধু এবং তমালের  মা ও তাকে বিশেষ  স্নেহ করতেন।  রজত ও তমালের  জন্য  কয়েকটা সম্বন্ধ  নিয়ে এসেছিল  কিন্তু তমালকে  ভড়কানোর জন্য  তার ভাইবোনেরা ছিল যথেষ্ট  চতুর। যাই হোক, তমালের  মা ছিলেন  বয়সকালে যথেষ্ট  সুন্দরী এবং তমালের  বাবা বেঁচে থাকাকালীন কপালে একটা বড় সিঁদুরের  টিপ পড়তেন যা তাঁকে একটা আলাদা সৌন্দর্য্য এনে দিত অনেকটাই সারদা মায়ের মতন। সারদা মায়ের  ছবির  দিকে তাকালে যেমন সমস্ত অন্তরটা  জুড়িয়ে যায় ঠিক সেইরকম। রজত ছোটবেলায় তার মাকে হারিয়েছিল এবং তমালের  মায়ের  মধ্যেই  সে যেন  নিজের মাকে খুঁজে পেত। তমালের  মা তো চলে গেছেন  এখন রজত ই তার একমাত্র  অভিন্ন  হৃদয় বন্ধু  যে সত্যি সত্যিই তমালের  চলে যাওয়ার  মূহুর্তে অত্যন্ত  দুঃখী ছিল কারণ  তার  সঙ্গে তো  কোন আর্থিক  লেনদেনের  সম্পর্ক  ছিল না।  ভিজিটিং আওয়ার্স  প্রায় শেষ  হয়ে  আসছে, রজতের এখনও  ভেতরে যাওয়া হয়নি কারণ স্বার্থাণ্বেষীদের  আনাগোনা এখনও  অব্যাহত।  সবাই  দেখা করে এসেছে বুড়োটা এখনও  কি করে যমের  দুয়োর থেকে ফিরে এল, সবার চোখে মুখে অপার বিস্ময়। কিন্তু  এই কদিন  রজত  প্রায় সব সময়ই  তার বন্ধুর জন্য  হাসপাতালে পরে থেকেছে যা ডাক্তার  বা নার্স কারও  চোখ এড়ায় নি। তারাও  তো রক্ত মাংসে গড়া মানুষ,  তারাও  বুঝতে পারে কে ধান্দাবাজ  আর কে নয়। ভিজিটিং  আওয়ার্স  শেষ হয়ে যাবার  পরে সে দেখল তমাল  তখন  অনেকটাই স্বাভাবিক  হয়ে এসেছে। হঠাৎই  মা বলে একটা দীর্ঘশ্বাস  ছাড়ল  সে আর ভিতরের  জমা কার্বন ডাই অক্সিজেন যেন অনেকটাই  বেরিয়ে এল এবং তার জায়গা নিল অক্সিজেন। 
এই মা শব্দটা এমনই  যে একবার  ডাকলে শরীরে  ও মনে একটা ইলেকট্রিক  চার্জের মতন হয়ে যায় যেমন  হয় ওম শব্দ  উচ্চারণ  করলে বা আল্লা হো আকবর  উচ্চারণ  করলে কারণ  শরীরের  ভেতরের  কার্বন ডাই অক্সাইড বেরিয়ে অক্সিজেনের  প্রবেশ। অনেক সময়ই প্রচণ্ড মাথা যন্ত্রনা  হলে গভীর ভাবে শ্বাস নিলে এবং ছাড়লে তার উপশম  হয় বা মা বলে এক গভীর শ্বাস ছাড়লেও সেই ফল পাওয়া যায়। কিন্তু মা যদি স্বল্পাবাসে পরিহিত  হন তাঁকে কি সন্তানেরা  মা বলে ততটাই ভক্তি করে? ছোটবেলায় সন্তানেরা  মায়ের  কাজের  প্রতিবাদ  করতে পারেনা কিন্তু যখনই  তারা উপযুক্ত  বয়স প্রাপ্ত হয় তখন  মায়ের প্রতি যে শ্রদ্ধার  আসন সেটা কেমন যেন  টলোমলো  হয়ে যায়।
তমাল  এই যাত্রায়  ফিরে এসেছে এবং  আজ তার হাসপাতাল  থেকে ছুটি হবে। আত্মীয়স্বজন  ভাবছে এবার কার ঘাড়ে পড়বে এই বুড়ো, কেউ হ্যাপা সামলাতে রাজি নয়। সমস্ত ফর্ম্যালিটি  সম্পূর্ণ,  মেডিক্লেমের  থেকে  পয়সাকড়ি যা আসার  ছিল তা এসে গেছে এবং বাড়তি পয়সা মিটিয়ে  দেওয়া হয়ে গেছে। হঠাৎই  তমাল  রজতের  হাত ধরে বলল , " চল তোর বাড়ি। "

Saturday, 1 April 2023

যুগল মালি

স্কুলের  অশিক্ষক কর্মীদের  নাম মনে করতে গেলেই যুগল কাকার কথা মনে পড়ে।মনে পড়ে আরও অনেকের কথা যারা শিক্ষক না হয়েও আমাদের  অনেক শিক্ষা দিয়েছেন তাদের  আচার ব্যবহারের মাধ্যমে। শিক্ষা মানে তো শুধু স্কুলে বা কলেজে গিয়ে কয়েকপাতা মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় নিজের  সাধ্যমত লিখে এসে ক্লাশের গণ্ডি পেরোনো নয়, যা পড়লাম  তা ব্যবহারিক জীবনে কতটা প্রতিফলিত  করতে পারলাম,  সেটাই বড় ব্যাপার। সেইজন্য পুঁথিগত বিদ্যার কচকচানিতে অনেক সময়ই  মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে যায়। ডিগ্রির মোহে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটা তকমা এঁটে নিজেদের  অনেক পণ্ডিত বলে মনে হতে পারে কিন্তু সেই পাণ্ডিত্য যদি ব্যবহারিক জীবনে কোন মানুষের  কাজে না লাগে তাহলে একটা ভাল স্টিলের ছুরি কিনে সাজিয়ে রাখার  মতো হবে ।মানুষের  সেবার  জন্য  ভীষণ  বড় মাপের  পণ্ডিত  হওয়ার চেয়ে তার সেবামূলক মনোবৃত্তি অনেক  বেশি প্রয়োজন। সুতরাং আজকের প্রতিবেদন এই প্রায় অশিক্ষিত ( মানে স্কুল বা কলেজের গণ্ডি না পেরোনো) মানুষদের  নিয়ে।

যুগল কাকা ছিলেন  আমাদের  স্কুলের অশিক্ষক  কর্মী।  মাথায় বেশি লম্বা নন কিন্তু বয়সকালে যে শরীরটা বেশ মজবুত  ছিল তা দেখলেই বোঝা যেত। আর তাঁর মাথাটা ছিল বেশ বড় মাপের। হাঁটুর ওপর ধুতি আর হাফ হাতা প্রায় লাল হয়ে যাওয়া সাদা শার্ট থাকত পরনে আর খালি পা বেশিরভাগ সময়েই। কখনো সখনো বাইরে বেরোতে হলে পায়ে গলাতো টায়ার কেটে তৈরী করা চটি যা অনেকদিন চলত কারণ সেইসময় ছিলনা হাওয়াই  চটি। বেশিরভাগ গরীব মানুষ ই খালি পায়ে হাঁটত আর কোন বিশেষ জায়গায় যেতে হলে সম্বল ছিল তাদের  টায়ার কেটে তৈরি  করা চটি। 
প্রাইমারি স্কুল  হতো সকালবেলায়। সাতসকালে দেখতাম যুগলকাকাকে  স্কুলের  সামনে থাকা বাগানে নানাধরণের ফুলগাছের পরিচর্যা করতে। রাজবাড়ি সদৃশ ছয়টি বিশাল থামওয়ালা স্কুলের বাগানের বাঁদিকে ছিল  একটা বিশাল  ইউক্যালিপটাস গাছ আর ডানদিকে ছিল একটা রাধাচূড়া ও কৃষ্ণচূড়া গাছ যা স্কুলের  সৌন্দর্য্য  আরও অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। বৃত্তাকার বাগানে যুগল কাকার যত্নে লালিত হরেক ফুলের সমাহার। কাঁটাতারের  বেড়ায় ঘেরা সেই বাগানের  কোন ফুল ছেঁড়া প্রায় দুঃসাধ্য ব্যাপার। হেডমাস্টারমশাইএর বাড়ি ছিল  স্কুলের  পরিধির  মধ্যে এবং তাঁর  বাড়ির  পাশেই  ছিল যুগল কাকার চালাবাড়ি। হেড মাস্টার মশাই এর বাড়ির দোকান বাজার ও যুগল কাকাই করে দিতেন কারণ আমরা কোনদিন হেড মাস্টার মশাইকে বা তাঁর  ছেলেকে বাজার  করতে দেখিনি এবং যুগল কাকাকেই দেখতাম  বাজারের থলি হাতে নিয়ে। খুবই  কম কথা উনি বলতেন  মানে স্যারের  কাছাকাছি থেকে উনিও চোখ উঠিয়ে একবার  দেখে নিয়ে সমস্ত ব্যাপারটা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করতেন এবং প্রয়োজন মতো হেডমাস্টার মশাইএর কানে তুলে দিতেন। তখন  কিছুতেই  বুঝে উঠতে পারতাম না আমাদের করা দুষ্টুমি কি করে হেডমাস্টার মশাই এর কানে চলে যায়। হেডমাস্টার মশাইএর ঘরের  সংলগ্ন  ছিল অফিস ঘর এবং দীর্ঘ বারান্দার পরের ঘরটাই  ছিল  স্যারদের  বসার  ঘর। লম্বা টেবিলের  দুই পাশে সারি সারি পাতা চেয়ারে ঘর আলো করা  সমস্ত  দিকপাল মাস্টার মশাইরা বসতেন। দেখে মনে হতো যেন এক ঝাঁক তারা, কেউ  দ্যুতিময় আবার  কেউ বা সামান্য  নিষ্প্রভ।  জেলার  সবচেয়ে নাম করা স্কুল, ছাত্র এবং মাস্টার মশাইরা সবাই  যেন একটা চাপা অহঙ্কারে ভুগতাম।

সকাল সাড়ে দশটায় পিতলের  ঘন্টায় কাঠের  হাতুড়ির ঘা পড়ে শুরু হতো স্কুল আর বন্ধ হয়ে যেত গেট। দেরী করে এলে ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকানো যুগল কাকাকে বোঝানো প্রায় একটা ভয়ানক ব্যাপার ছিল।  শিক্ষা দীক্ষা বিশেষ  না থাকলেও  স্কুলের  ডিসিপ্লিনের প্রথম পাঠ কিন্তু তাঁর ই কাছে। সমস্ত ক্লাশে নোটিশ  নিয়ে যাওয়া ঐ অতবড় স্কুলের  চত্বরে একা যুগল কাকার  পক্ষে আর সামাল দেওয়া সম্ভব হয়ে উঠছিল না। আর তাছাড়া দিন দিন তো বয়স বাড়া বই কম তো হচ্ছিল না। সুতরাং তাঁর  জায়গায় অন্য  লোক  নেওয়ার  প্রয়োজন হয়ে পড়ল। কিন্তু তখন  তো এত শত বুঝতাম না। গরমের ছুটির  পর আর সেই পরিচিত  মুখ যুগল কাকা কে দেখতে পাচ্ছিনা, আমাদের  পাড়ারই বাদাম  বিক্রি করা কাঁদনকে(ভাল  নাম সুষেন) দেখছি নোটিশ  নিয়ে আসতে। প্রথম  প্রথম ভাবলাম  যে ও হয়তো কিছুদিন  সামাল দিতে এসেছে যুগলকাকার জায়গায় কিন্তু তা নয়, যুগল কাকা যে সবার  অলক্ষ্যে আমাদের  কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন সেটা জানতে পারলাম কাঁদনের একদিন  বিনা পয়সায় বাদাম খাওয়ানোর মাধ্যমে।

ব্যালকনিতে বসে আজ হঠাৎই  যুগল কাকা আমার  মনে উদয় হলেন বুঝতে পারছি না কিন্তু একটা জিনিস  ঠিক যে মনের মধ্যে কেউ গভীর  ছাপ না ফেললে ষাট বছর পরেও  সে মনের  দালানে  উঁকিঝুঁকি  মারতে পারেনা।

Wednesday, 8 March 2023

বখাটে ভগবান

ভগবানকে দেখেছ কিনা জিজ্ঞেস করলে সবাই  হাঁ করে এমনভাবে চেয়ে থাকবে যেন একটা পাগল কোথা থেকে এসে জুটেছে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবকেও বহু লোক পাগলের  আখ্যা দিয়েছেন,  আবার  কেউ বা তাঁকে ভণ্ড জাতীয় কিছু বিরূপ মন্তব্য করেছেন আবার  সেইখানেই  তাঁর অনেক অনেক  শিষ্যও  হয়েছেন। আজ সমস্ত পৃথিবীর বুকে রামকৃষ্ণ মঠ ছড়িয়ে আছে, সেটা কি বিনা কারণে হয়েছে?  তাঁর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর শিষ্যদের মাধ্যমে যাঁদের  মধ্যে স্বামী  বিবেকানন্দের নাম কে না জানে? তিনি ছাড়াও  আরও অনেক শিষ্যদেরও  যথেষ্ট  অবদান  রয়েছে। লেখাপড়া না জানা মানুষটা কি রকম প্রাঞ্জলভাবে ভগবান  এবং সমস্ত  জটিল প্রশ্নের  সমাধান  দিয়েছেন  তা বিভিন্ন  গল্পের  মাধ্যমে পরিস্ফূট  হয়েছে।
স্বামী বিবেকানন্দ  তো বলেছেন, " বহুরূপে সম্মুখে তোমার  ছাড়ি কোথা খুঁজিছ  ঈশ্বর, 
জীবে প্রেম  করে যেই জন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর। " সুতরাং যাঁরাই বিভিন্ন  কাজের  মাধ্যমে সেবা করছেন, তাঁরা সবাই  ভগবানের ই দেওয়া কাজ করছেন। তাঁরই  সৃষ্টি ভাল মানুষ  এবং তাঁরই  সৃষ্টি চোর, ডাকাত এবং বদমাস লোকেরাও। চোররাও  চুরি করতে যাবার আগে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে যেন বেশ ভাল  কিছু  দাঁও মারতে পারে এবং অবশ্যই যেন  ধরা না পড়ে। এ তো গেল সেইসব ভগবানের  দাস দাসীদের কথা বা সেবকদের কথা। কিন্তু প্রশ্ন  হচ্ছে ভগবানকে কেউ দেখেছেন  কি না? যদি দেখে থাকেন  তাহলে তিনি দেখতে কেমন? 
আমরা সবাই  তাঁকে দেখেছি কিন্তু ভিন্ন  ভিন্ন  রূপে। আমার দেখা ভগবান  সেই রকে বসে থাকা গুলতানি  করা কিছু চেটো চ্যাংড়া ছেলেদের  মধ্যে। বাপের পয়সায় রাজা উজির মারা ছেলেরা যাদের দৌরাত্ম্যে পাড়ার মেয়েরা এবং তাদের  বাবামায়েরা সদাই  সন্ত্রস্ত, কি হয় কি হয় ভাব সদাই  মনের মধ্যে ঘুরপাক  খায় কিন্তু কারও  বিপদে আপদে বুক চিতিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া  সেই তথাকথিত  বাজে ছেলেরা বা বখাটে ছেলেরা। এদের  সময়ই  সময়। কুছ  পরোয়া  নেই এই মন নিয়ে আপনাকে বিপন্মুক্ত করে তবেই এদের  শান্তি। এরা কিন্তু মাঝপথে আপনাকে বিপদে ফেলে পালাবে না। এদের  নীতি হলো মরদ কি বাত, হাতি কি দাঁত। এরা হয়তো কেউই বেশী পড়াশোনার ধার ধারেনি  কিংবা কেউ কেউ দুয়েকটা  ধাপ এগোলেও প্রতিযোগিতায়  এরা কেউ এঁটেও  উঠতে পারবে না। তবে এরা করবে টা কি? কি করে এদের  সংসার চলবে? আর এদের  বাবামায়েদের পক্ষেও একটা সময়ের পরে এদের  টানা সম্ভব  নয়। তাহলে এরা কি চিরকাল  এইভাবেই থাকবে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই  এদের  শোষণ করে রাজনৈতিক  নেতারা। তাঁরা নিজেদের  স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে এদের ব্যবহার  করে এবং প্রয়োজন  মিটলেই এদের  ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কেউ বা এই দলের  আবার  কেউ বা অন্য দলের।  এদের  ভবিষ্যত  দেখার দায়িত্ব কার? এই বিশাল  যুবসমাজের  সুকুমার বৃত্তিগুলো  এই দাদাদের  কল্যাণে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং এদের  হাতে তুলে দেওয়া হবে ছোরা, বন্দুক এবং বোমা। কিছুদিনের মধ্যেই  যারা দুদিন  আগেই  গলায় গলায় বন্ধু ছিল  তারাই হয়ে উঠবে পরস্পরের  শত্রু। তবে এটাকে সামলানোর  উপায় কি, কোন রাস্তাই কি খোলা নেই? আছে, সমস্যা যখন আছে তখন  তার সমাধান ও আছে। একটু ভেবেই  দেখা যাক না কেন এই সমাধানের রাস্তা খোঁজার। 
আচ্ছা আমাদের  রাজ্যে তো ক্লাবগুলোকে প্রতি বছরই কিছু অনুদান  দেওয়া হয়। এই অনুদানকেই একটু অন্যরকম ভাবে দিলে কিছুটা বেকার সমস্যার সমাধান ও হয় আর সাধারণ জনগণের ও কিছু উপকার হয়। আজকাল  প্রত্যেক সংসার ই খুব ছোট হয়, একটা কি দুটো বাচ্চা। সমস্ত বাবা মায়েরাই আপ্রাণ চেষ্টা করেন তাঁদের  সন্তানদের  নিজেদের  সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও ভালভাবে শিক্ষা দান করার।  যদি তারা খুব ভাল ভাবে সফল হয় তারা জীবিকার সন্ধানে বিদেশে  চলে যায় এবং সেখানেই তারা থিতু হয়ে যায়। মেয়েদের  বিয়ে হওয়ার পর  তারাও অনেক সময়ই বাইরেই থেকে যায় এবং এখানে আমাদের  দেশে বৃদ্ধ  বাবা মায়েরা অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকেন। এঁদের  মধ্যে যাঁদের  অনেক  পয়সা আছে তাঁরা বিলাস বহুল বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে পারেন কিন্তু যাঁদের  পয়সা মোটামুটি আছে কিন্তু সেরকম  আহামরি কিছু নেই তাঁরা এইসব ক্লাবের  ভরসা থাকতে পারেন অবশ্যই  কিছু টাকার বিনিময়ে। এতে বহু কর্মসংস্থান হতে পারে এবং এই ক্লাবগুলোই  সরকারের  পরিপূরক  হিসাবে কাজ করতে পারে। যাঁদের অর্থ সংস্থান সেরকম  নয় তাঁরাও  এই ক্লাবগুলোর সাহায্যে যাতে বঞ্চিত  না হন সেদিকে সরকারের  নজরদারি অবশ্যই  থাকা উচিত।  এই ক্লাবগুলো হবে সম্পূর্ণ  অরাজনৈতিক, ধর্ম নিরপেক্ষ  এবং জাতপাতের  ঊর্ধে  নাহলে সবই পণ্ডশ্রম হবে এবং কিছু ক্ষমতাসম্পন্ন  লোকের কুক্ষিগত  হবে। এই ক্লাবগুলির  সঙ্গে হাসপাতালের  সমন্বয় থাকবে এবং সমস্ত  জনগণ এতে উপকৃত  হবেন। কিন্তু এইসবের  পিছনে যে মূলকারণ  থাকবে তা  হলো  সমবেদনা এবং সংবেদনশীলতা।
কিছুদিন  আগে একজন পরিচিত  ভদ্রলোক  যিনি অত্যন্ত  পরোপকারী তিনি অসুস্থ  হয়ে পড়লেন।  অনেক  বড় বড় ডাক্তার  দেখানোর  পর তাঁরা এই রায় দিলেন  যে একটা বড় ধরণের অপারেশন করা দরকার।  তাঁর পরিবারের লোকজন এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে রক্ত  নেওয়া সত্ত্বেও  তা অপ্রতুল হলো। বিভিন্ন  সংস্থার  সঙ্গে যোগাযোগ  করার  পর  একজন হৃদয়বান ব্যক্তি এগিয়ে এলেন এবং তিনি দুইজনের  খবর দিলেন  যাঁরা রক্ত দান করতে ইচ্ছুক। সম্পূর্ণ  অজানা অচেনা ভদ্রলোক যাঁদের  একজনের  একটি ছোট্ট  দশকর্মা  ভাণ্ডারের দোকান  এবং অন্যজন উবের সংস্থার  মোটরসাইকেল চালক। সেদিন  ছিল  রবিবার।  তিনি দোকান  বন্ধ  করে দূরে থাকা হাসপাতালে যেখানে ভদ্রলোক  ভর্তি আছেন  রক্ত দিতে চলে এলেন  এবং অন্য জন সকাল  থেকে যাত্রী সেবা দিয়ে ব্লাড ব্যাঙ্ক  বন্ধ  হবার আগে পৌঁছে গেলেন রক্ত  দেবার  জন্য।  এটা এমনই  এক জিনিস  যা টাকা দিলেও মেলেনা।  অনেকে এখানে সেখানে রক্ত দান শিবিরে রক্ত দান  করেন এবং বিনিময়ে তাঁরা একটা কার্ড ও পান কিন্তু কিছু হাসপাতাল  আছে তাঁরা এই কার্ড স্বীকার  করেন না এবং তাঁরা তাঁদের  ওখানেই  রক্ত  দেবার জন্য চাপ দেন। তাহলে রক্ত দান শিবিরে প্রাপ্ত রক্তগুলো কি কাজে আসবে যদি ঐ কার্ড গুলো ভবিষ্যতে অন্য  হাসপাতালে না নেওয়া হয়? এই দুজন ভদ্রলোক ই যাঁরা নিজেদের  কথা না ভেবে সম্পূর্ণ  এক অপরিচিত  ব্যক্তিকে সাহায্যের  জন্য  এগিয়ে এসেছেন  এঁরাই  আমার  কাছে ভগবান।  পরিচিত  কেউ বা আত্মীয় কেউ রক্ত দান করতে পারেন  কিন্তু এই সামান্য  ব্যক্তিরাই নিজগুণে তাঁদের  অসাধারণত্ব প্রমাণ  করেছেন  এবং  অন্য লোকে তাঁদের  কি হিসেবে দেখবেন জানিনা ,আমার  কাছে এঁরাই  প্রকৃত ভগবান ।
 

Monday, 6 March 2023

দোলপূর্ণিমা ও হোলি

আজ দোলপূর্ণিমায় সারা শহর মেতে উঠেছে দোলযাত্রা উদযাপনে।  বরাবরের মতো গল্ফগ্রীন  এই ব্যাপারে ভীষণ  অগ্রণী এবং আমাদের কাউন্সিলর শ্রী তপন দাশগুপ্ত  মহাশয়ের উদ্যোগে পুরোপুরি শান্তিনিকেতনের ঢঙে এখানে সেন্ট্রাল পার্কে দোলযাত্রার অনুষ্ঠান  সম্পন্ন হয়। গল্ফগ্রীনে কলকাতার  অন্যান্য জায়গার  তুলনায় গাছপালার আধিক্য একটু বেশী হওয়ায় পরিবেশটাও অনেক  শান্ত এবং লালপলাশের উপস্থিতি এই বসন্তোৎসবকে একটা আলাদা মাত্রা দেয়। বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের যথাযথভাবে প্রশিক্ষণ  দিয়ে অভিজ্ঞ শিল্পীরা এই অনুষ্ঠানের উপযুক্ত  করে তোলেন  এবং নাচ ও গানের মাধ্যমে গল্ফগ্রীনকে উৎসব মুখরিত করে তোলেন।  অনেক বর্ষীয়ান শিল্পীরাও  অংশ গ্রহণ করে অনুষ্ঠানটিকে  মনোজ্ঞ  করে তোলেন। 
নীল দিগন্তে ওই ফুলের আগুন  লাগল গানে মনটাও হিন্দোলিত হয়ে ওঠে কিন্তু এবার  যেন  কোন অজ্ঞাত  কারণে মনটা তেমন ভাবে সাড়া দিলনা।  হয়তো বা বয়সজনিত কারণ  কিংবা কোন নিকট আত্মীয় বা বন্ধুর অসুস্থতার কারণেও হতে পারে। এই সব কারণগুলো তো প্রত্যেক  বছর ই কিছু  কম বা কিছু বেশী পরিমাণে থাকেই তবে এইবার  এরকম  কেন মনে হচ্ছে। চিন্তার  গভীরে ডুব দিয়ে কারণ  অনুসন্ধানে মন দিলাম।  হ্যাঁ , পেলাম খুঁজে। হাজার হাজার  যোগ্য  চাকরিপ্রার্থীরা উপেক্ষিত  হয়ে দিনের পর দিন  বিভিন্ন  জায়গায় অবস্থানরত আর তাদের  জায়গায় অযোগ্য  প্রার্থীরা টাকার বিনিময়ে রাজনৈতিক নেতাদের হাত ধরে সেইসব জায়গা দখল  করে বসে আছে এবং এই অযোগ্য অশিক্ষিতদের হাতে ভবিষ্যত  প্রজন্ম কতটা  সুরক্ষিত সেটা ভাবার  সময় ভীষণ ভাবে এসেছে।  প্রত্যেক  যুগেই  মানে বিভিন্ন  সরকারের  আমলেই  এটা হয়েছে কিন্তু গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এই ব্যাপকতা ভবিষ্যত প্রজন্মকে কিভাবে পিছিয়ে দিয়েছে এটা ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। মধ্যবিত্ত  সংসারে সবার  পক্ষে প্রাইভেট স্কুলে পড়ানো সম্ভব নয় কারণ  অতিরিক্ত খরচ তাঁদের  পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। কিন্তু এই অসৎ  রাজনৈতিক  নেতারা তাঁদের  ছেলেমেয়েদের  ভুলেও  এই সরকারী স্কুলে পড়তে পাঠাবেন না। অনেকটা এইরকম  কথা," ডু হোয়াট আই সে, ডোন্ট  ডু হোয়াট আই ডু।" নেতাদের  ছেলেমেয়েরা ভাল স্কুল,  ভাল  কলেজে পড়ে তাঁদের  মতন নেতা হবে আর সাধারণ  মানুষের ছেলেমেয়েরা তাঁদের  তাঁবেদারি করবে আর এই ব্যবস্থাটাই পাকাপোক্ত করার  ভীষণ প্রয়োজন। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এই ঘূণ যাঁরা ধরিয়েছেন তাঁদের  কি ধরণের  শাস্তি হওয়া উচিত  তার প্রতিবিধান করবেন আদালত। সর্বস্তরে এই ব্যাপক দুর্নীতির প্রকোপে মন আজ ভীষণ ভারাক্রান্ত  এবং মন আর সায় দিচ্ছেনা গেয়ে উঠতে, " ওরে বকুল পারুল, ওরে শাল পিয়ালের বন, কোনখানে আজ পাই এমন মনের  মতো ঠাঁই, যেথায়  ফাগুন ভরে দেব দিয়ে সকল মন।"
হে বসন্ত,  আমায় মাফ করো, এবারের  মতো আমায় রেহাই  দাও, আমাকে ঐ যোগ্য  চাকরি প্রার্থীদের সমব্যথী হতে দাও। জীবন সায়াহ্নে এসে একবার অন্তত এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করে আমায় এই অন্যায়ের  বিরুদ্ধে প্রতিবাদ  করতে দাও।

Tuesday, 14 February 2023

"প্রেম দিবস"

প্রেম দিবস বলতে কি বোঝায় এই কথাটা অনেক লোককে জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু একই উত্তর  সকলের কাছে  না পেয়ে আরও বেশি ঘুলিয়ে গেল মাথাটা। কেউ বলে প্রেম এক অতি স্বর্গীয় ব্যাপার, কেমন যেন  একটা ঠাকুরের লীলার মতো ব্যাপার, আবার কেউবা  বলল," অ্যাই তুমি আমাকে ভালবাস? আমি কিন্তু তোমাকে খুব  ভালবাসি।" কিন্তু ব্যাপারটা একতরফা হওয়ার জন্য জিনিসটা খুব মাখো মাখো হলোনা। কিন্তু যেখানে দুই তরফেরই সম্মতি সেখানে আমে দুধের মেলামেশা, যেটা খুবই কম ক্ষেত্রে দেখা যায়। ছোটবেলায় পেটভরে খাওয়ার পরেই কিছু একটা লোভনীয় জিনিস  দেখলেই খিদেটা যেন আবার  চাগিয়ে উঠত আর মায়ের  কাছে একটু জিনিস টা চাইলেই ঠাণ্ডা চোখে এমনভাবে তাকাতো যার মানে চোখের  খিদে ছাড়, জিনিসটা পালিয়ে যাচ্ছেনা, পরে খাবে।  এখন  বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লোকের  চোখের  খিদে। এই ভাল  লাগল তো বলেই ফেলল যে আমি তোমায় ভালবাসি, তারপর  চোখের  মাথা খেয়ে লাজলজ্জ্বাহীন হয়ে এখানে সেখানে ঘোরাঘুরি, তারপর বিয়ে বা আরও দুই কান কাটা হলে লিভ ইন আর তার কিছুদিন  পরেই  সব ভোঁ ভাঁ আর কিছুদিন পর এডালে ইনি তো সেডালে তিনি। আবার  তার উপরেও আর এক কাঠি হয় যখন  একডালে বসে জিরাতে জিরাতে অন্য ডালে অন্য জোড়া কেমন আছে তা পরীক্ষার জন্য  দেখতে আসে। এদের  কাছে প্রেম  মানে চোখের খিদে। সুইচ অন করলেই  ভালবাসা শুরু, সুইচ অফ মানেই  অনেক হয়েছে, এবার কেটে পড়। কিন্তু একটা কথা ভেবে ভীষণ চিন্তা  হচ্ছে। এই ধরা ছাড়ার যুগে যদি সবাই (মানে প্রাক্তন এবং বর্তমান) একই সঙ্গে হাজির হয় বিশেষ একজনের  প্রতি প্রেম নিবেদনে। ওরে বাবা,  ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। কিন্তু তিনি মেসি না এমব্যাপে না নেয়মার কোন মাপের  খেলোয়াড় সেটা তার ড্রিবলিং  না দেখলে বোঝা যাবেনা।

এখন এই প্রেম দিবসের  উৎস কোথায়? এর আগে কি প্রেম বলে কোন বস্তুই  ছিলনা? যতদূর  জানি এই প্রেম আদি অকৃত্রিম নিখাদ  সোনার  মতন। কিন্তু নিখাদ  সোনায়  যেমন অলঙ্কার  তৈরী হয় না, তেমনই প্রেমেও  বোধহয় সামান্য হলেও  একটু সংশয়, একটু কি হবে কি হবেনা এই চিন্তাটা না থাকলে হয়তো ঠিক  দানা বেঁধে ওঠেনা। আমাদের  এক মুশকিল আসান দাদা রতুদার  শরণাপন্ন হলাম।  অকৃতদার হলেও  রতুদার  কাছে যেন সব সমস্যার সমাধান আছে এমন কি প্যামও ( রতুদা প্রেম বলেনা)। রতুদা নাদুস নুদুস  মানুষ বেশ বড় বেলের মতন মাথা, সুতরাং তাঁর মাথা থেকে যে সব সমস্যার সমাধান  মিলবে এটা তো অত্যন্ত স্বাভাবিক  কথা। রতুদার  কাছে এই প্রেম দিবস বা ভ্যালেন্টাইন ডের কথা তুলতেই একগাল  হেসে ফুৎকারে এমনভাবে উড়িয়ে দিলেন  যে এটা আবার  একটা জিজ্ঞেস করার  মতন কথা বা বকলমে তাঁর প্রজ্ঞার  প্রতি নিতান্তই  অবিশ্বাস!  বললেন,  আরে বাবা প্যাম কি একদিনে  হয় রে ভজা? আমি বোকার মতন ফুট কেটে বলে ফেললাম  কিন্তু ঐ কি যে একটা গান আছে না, প্রেম একদিন  এসেছিল  নীরবে আমার  এই দুয়ার প্রান্তে। রতুদার  ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে আমার  হাড়ের  মধ্যে যেন বরফশীতল  হাওয়া বয়ে গেল আর একদম স্পীক টি নট। আরে বাবা শোন, কথার মাঝে ফোড়ন কাটলে কেটে পড় এখান থেকে। রতুদার  জ্ঞান গর্ভ বাণী থেকে বঞ্চিত  হতে চাইনা, বললাম সরি দাদা, আপনি বলুন। তবে শোন। এই প্যাম আট দিনে পুরোপুরি জমে ওঠে। প্রথম  দিন একটা সুন্দর দেখে গোলাপ নিয়ে যদি কোনভাবে দিতে পারলি আর দেখলি যে বেশ খুশী মনেই নিয়েছে,  তবেই দ্বিতীয় দিন  একটু ইনিয়ে বিনিয়ে হাজার  কথা বলার ফাঁকে একটু সুযোগ বুঝে বলবি যে আমি তোমায় ভালবাসি। যদি চোখ  কটমটিয়ে চলে না যায় এবং পরেরদিন আসব বলে সম্মতি দেয় তবেই একটা খুব দামী ভাল চকোলেট যেটা ও বেশ পছন্দ  করে সেটা ওকে প্রেজেন্ট  করবি।
 কিন্তু কি করে বুঝব যে কোন চকোলেট  ও পছন্দ করে? 
একটা আস্ত গাধা তুই। তোর প্যামের দরকার  নেই। প্যামের  জন্য  এলেম দরকার। বাবা,মা যখন  দেখে দেবে  তখন বিয়ের পিঁড়িতে বসবি  অন্যথায়  নয়।  আচ্ছা বলুন বলুন,  তারপর দিন কি করব?
 হাঁদুরাম, যদি চকোলেট নিয়ে  বেশ খুশীতে ডগমগ হয় তবে কথায় কথায় জানতে চেষ্টা করবি  যে কোন  সফ্ট টয় পছন্দ করে  কিনা। যদি বলে হ্যাঁ, তবে পরদিন একটা খুব  ভাল  দোকান  থেকে একটা ব্র্যান্ডেড টেডি  বিয়ার কিনে প্রেজেন্ট করলি। যদি ওটা নিয়ে নেয়, তাহলে পরেরদিন  বলবি যে তোমাকে ছাড়া আমি আর বাঁচব না। কিন্তু খুব বুঝে সুঝে কথা বলিস।  একটু বেসামাল  হলেই কিন্তু সব গুবলেট হয়ে যাবে। অবশ্য  কথাবার্তার গতি প্রকৃতি দেখে তুই বুঝতে পারবি যে ঘটনাটা কোন দিকে গড়াচ্ছে। যদি দেখিস যে পরেরদিন না ঘুমানোর জন্য চোখ  ফুলোফুলো ,তবে সুযোগ বুঝে একটু শরীরের  কাছাকাছি হতে পারিস এবং আলিঙ্গন করলেও করতে পারিস। কিন্তু মনে রাখবি  যে এগুলো সব আজকের  দিনে ভিন্ন  স্টেজের  ইন্টারভিউ। জানিস তো আজকাল  একটা ইন্টারভিউয়ে কোন চাকরি হয়না। বিভিন্ন রাউন্ডের মাধ্যমে ফাইনাল ইন্টারভিউ হয়  এবং তারপর চাকরি। অতএব  বাপু, খুব  সাবধানে এগোস। যদি এই রাউন্ডে উতরে যাস, তাহলে পরেরদিন একটা কিস করার  চেষ্টা করতে পারিস  কিন্তু বারবার  সাবধান করে দিচ্ছি, যে কোন মুহুর্তে বরফ জমা থেকে গলে জল হবার সম্ভাবনাও কিছু কম নয়। যদি এই সাতদিন ভালভাবে উতরে  গেলি তাহলে কোন  ভাল রেস্তোরাঁয় পরেরদিন  অর্থাত  চৌদ্দ ই ফেব্রুয়ারি একটা ক্যাণ্ডেল লাইট ডিনার  করবি অর্থাত  প্যাম দিবস  সম্পূর্ণম।  রতুদার  উত্তর  পেয়ে গেছি । এবার  আমার  দিক থেকে এক ব্রহ্মাস্ত্র  নিক্ষেপ।  আচ্ছা রতুদা, প্রেম সম্বন্ধে এত স্বচ্ছ  ধারণা সত্ত্বেও আপনার  কেন বিয়ে করা হয়ে উঠল না? বলাই বাহুল্য,  উত্তরের  জন্য  অপেক্ষা না করে পড়ি কি মরি দে দৌড়।

Tuesday, 17 January 2023

অনীকের অনেক না বলা কথা(এক)

হাতে সময় খুব কম, কিছু না বলা কথা এখনই না বললে হয়তো আর সময় পাবেনা বলার।  ডাক্তার তো প্রায় জবাব দিয়েই দিয়েছে।
অনীক বোস সুন্দর ল্যান্সডাউন রোডে নতুন খোলা ব্যাঙ্কের হেড ক্যাশিয়ার। ছিমছাম  ব্যাঙ্কের ঝকঝকে কাউন্টার আর গ্রাহকরাও সবাই বেশ ঝকঝকে। গ্রাহকেরা আসছে ,চটপট কাজ সারছে আর কিছু মিষ্টি হাসি দামী সেন্টের গন্ধের  সঙ্গে ছড়িয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। গ্রাহকরাও  বেশ  নামী দামী, নানাধরণের গাড়ি নিয়ে আসেন ব্যাঙ্কের কাজ সারতে যদিও অনেক সময়ই দরকার  পড়েনা গাড়িটা  আনার কারণ বাড়ি থেকে দু পা ফেললেই তো ব্যাঙ্ক। কিন্তু স্টেটাস বলে একটা কথা আছে না যেটা গাড়ি না আনলে ঠিক মানানসই  হয়না। তবে কিছু ব্যবসায়ীরা আসেন  যাঁরা একেবারে কাজ সেরে তাঁর নিজের  কাজে চলে যান।  সেক্ষেত্রে গাড়ি আনাটা  ভীষণ প্রয়োজন। এইরকম  একটা ব্যস্ত দিনে গ্রাহকের আনাগোনা বেশ ভালই চলছে, হঠাৎই  একটা ভীষণ জোরে আওয়াজ এল যেন কিছু একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।  ক্যাশ রিসিপ্ট এবং পেমেন্ট  কাউন্টারেও বেশ লোকজন রয়েছে, এমন সময় ঐ আওয়াজে একটু সতর্ক হয়েই অনীক বেরিয়ে এল কি ব্যাপার ঘটেছে দেখার জন্য।  হেড  ক্যাশিয়ার হবার জন্য স্ট্রংরুমের  চাবি সে সবসময়ই নিজের  কাছেই  এমনভাবে রাখে যাতে চাবি তার শরীরকে স্পর্শ  করে থাকে। ও কখনোই নিজের  ড্রয়ারে  রাখেনা।কাউন্টার ঘুরে বাইরে এসেই দেখে একজন  বৃদ্ধ  ভদ্রলোক উপুড়  হয়ে রাস্তায় পড়ে আছেন  এবং একটা ট্যাক্সি তাঁকে বেশজোরে ধাক্কা মেরে পালিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই আছেন  রাস্তায় কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেন না। উল্টোদিকের হকার্স  কর্ণারে  একটা টিভি সারানোর দোকান  ছিল। ঐ ভদ্রলোক কে নিয়ে একজন কাস্টমারের গাড়িতে বসে থাকা ড্রাইভারকে নিয়ে ভদ্রলোককে উঠিয়ে শিশুমঙ্গল হাসপাতালে নিয়ে গেল  এমার্জেন্সিতে।  ওরা কিন্তু ভর্তি করল না। তখন তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো শম্ভুনাথ পণ্ডিত  হাসপাতালে। সেখানেও  তারা দেখলনা। তখন  অগত্যা পিজি হাসপাতালে যাওয়া হলো এবং সেই টিভি সারানোর দোকানের  লোকটিকে সেই অ্যাক্সিডেন্ট হওয়া ভদ্রলোককে জিম্মা করে অনীক  বলল যে চাবিটা  হ্যান্ড ওভার করে ও ফিরে আসছে। ঐ গাড়ির  মালিক  ছিলেন  ভাল্লা  ফুটওয়্যারের মালিক  মিস্টার  ভাল্লার। তিনি তাঁর  কাজ সারতে সারতে অনীক  ফিরে এসেছে এবং মিস্টার ভাল্লার কাছে তাঁর  অনুমতি ছাড়া গাড়িটি নিয়ে যাওয়ার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে এবং ড্রাইভারের কোন দোষ নেই এবং তাকে প্রায় একরকম  জোর  করেই  সে নিয়ে গেছে একথাও  জানিয়ে দিল যাতে ড্রাইভার বেচারা আর বকুনি না খায়। যাই হোক, চাবিটা অন্য একজনের  কাছে দিয়ে ম্যানেজারের  পারমিশন নিয়ে ট্যাক্সি ধরে ফিরে গেল পিজি হাসপাতালে।
কিন্তু ততক্ষণে ঘটে গেছে বিপত্তি। ঐ বয়স্ক  ভদ্রলোক  ততক্ষণে না ফেরার দেশে চলে যাওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দিয়েছে এবং তারা তো অনীক  এবং টিভি সারানোর দোকানের  মালিককে প্রায় গ্রেফতার করার  জোগাড়। যাই হোক সমস্ত ঘটনা আদ্যোপান্ত  শোনার পর  দুই জনের  নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর  নিয়ে ছেড়ে দিল কিন্তু ততক্ষণে অনেক  সময় পেরিয়ে গেছে। ভদ্রলোকের  পকেট থেকে একটা কাগজে লেখা  ফোন নম্বর দেখে ফোন করে জানা গেল যে সেটা তাঁর  মেয়ের ।ফোন  করে ডেকে আনা হলো তাঁর মেয়েকে। প্রথমে তাদের  সন্দেহ  যে অনীক  এবং টিভির  দোকানের মালিকের  দ্বারাই কিছু  হয়েছে কিন্তু সমস্ত কিছু জানার  পর আর কিছু বললনা। কিন্তু এখানেই সমস্যার  শেষ  নয়। দু চার দিন  বাদে বাদে অনীক দের  ডেকে পাঠায় লালবাজার থেকে। অনেকগুলো ছুটি নষ্ট  হয়েছে তার আর ভদ্রলোককেও  দোকান  বন্ধ  রেখে হাজিরা দিতে হয়েছে এবং ঘন্টার পর ঘন্টা বসেথেকে একই    প্রশ্নের  ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করার  উত্তর  দিতে হয়েছে। একদিন  অত্যন্ত  বিরক্ত  হয়ে অনীক সেই পুলিশ ইন্সপেক্টরকে  বলে ফেলল যে আপনাদের  এই ধরণের  ব্যবহারে অতিষ্ঠ  হয়ে আর কেউ কোনদিন  কার ও বিপদে সাহায্য  করতে এগিয়ে আসবে না। তারপর মৃতের মেয়ে এবং জামাইএর  কাছে লিখিত বয়ান  যে অনীকদের তাঁকে বাঁচানোর  সাহায্য  করা ছাড়া আর কোন  উদ্দেশ্য  ছিলনা নিয়ে তাদের  মুক্তি দেওয়া হলো।
মানবিকতা দেখাতে গিয়েও যে কত বিপদের  সম্মুখীন হতে হয় তার এক প্রকৃষ্ট নিদর্শন।  তা বলে কি অনীকরা আবার ও ঐভাবে কাউকে সাহায্য  করতে এগিয়ে আসবে না?