Wednesday, 18 October 2023

শারদীয় আর্ট গ্যালারি পরিক্রমা

কলকাতায় প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে ঘুরে দেখার বয়সটা পেরিয়ে গেছে, তবু মাঝে মাঝেই মনটা কেমন অশান্ত হয়ে ওঠে, ফিরে যেতে চায় শৈশবের দিনগুলোতে। অর্জুন  আমাদের  দুর্দান্ত প্ল্যানার,  যা কিছু করে সমস্ত কিছু ভেবে চিন্তে। ঠিক  করে ফেলল কিভাবে যাওয়া হবে এবং কোথায় কোথায় যাওয়া হবে। বড়দা যুধিষ্ঠির এবং নিজের রথে    আমাদের     নয়জনের   ( দুঃশলা বোন সমেত) যাত্রা শুরু হলো দ্বিতীয়ার দিন।অনেকদিন  ধরেই  ভীম ও ভালান্দ্রা অসুস্থ  থাকায় পঞ্চপাণ্ডবের একসঙ্গে যাত্রা আর হয়ে ওঠেনা কিন্তু উপরি পাওনা ভগ্নী দুঃশলার  উপস্থিতি যিনি কৌরব ও পাণ্ডবদের একমাত্র  বোন এবং সবার  প্রিয়পাত্রী। যাই হোক অর্জুনের রথে যুধিষ্ঠির, নকুল ও সহদেব  মিলে চারজন  এবং যুধিষ্ঠিরের রথে দেবিকা, সুভদ্রা,কারেনুমতি ,বিজয়া এবং দুঃশলাসহ মোট পাঁচজন বেরিয়ে পড়লাম।  সারথি দুজনেই  খুব কুশলী  এবং কলকাতার  রাস্তার  অলিগলি সবই চেনে নিজের  হাতের তালুর মতো।
বাইপাস ধরে উল্টোডাঙা হয়ে সোজা পাইকপাড়ায়  টালাপার্কে প্রত্যয়ের প্যাণ্ডেলে হাজির  হলাম।  বিরাট  এলাকা জুড়ে এই প্যাণ্ডেল। একপ্রান্তে ঢোকা এবং অন্য প্রান্তে বেরোনোর রাস্তা। মহিলাদের  প্রায় সকলের ই পায়ের  সমস্যা, দুলকি চালে চলতে নেয় অনেক সময়।বাকি  চার পাণ্ডবদের ও বয়স যথেষ্ট  হয়েছে এবং যুধিষ্ঠির ও সহদেবের দুই  হাঁটুই প্রতিস্থাপন হয়েছে কিন্তু অর্জুন ও নকুল এরই মধ্যে একটু বেশিই সক্ষম। চলছি তো চলছিই,  এক রাজবাড়ির আদলে তৈরী হয়েছে প্যাণ্ডেল। কি অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল   এই  অসাধারণ শৈল্পিক প্যাণ্ডেল।  ভাবছিলাম  এই শিল্পকর্মের পিছনে কার মাথা রয়েছে? এই শিল্পীদের  বেশিরভাগ ই বেশ গরীব  কিন্তু দারিদ্র্য  তাদের  শিল্পীসত্ত্বাকে ধ্বংস  করতে পারেনি। নামটা জানার ঔৎসুক্য  ছিলই কিন্তু ঠাউরে উঠতে পারছিলাম না কার কাছে জানা যায়। কিন্তু উদ্যোক্তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ  পেয়েছে শিল্পীদের প্রতি  এবং  বাইরে বেরোনোর মুখে বড় বড় করে শিল্পীদের নাম লেখা আছে, " সুশান্ত শিবানী পাল।" খুব ভাল লাগল এই ধরণের ব্যবহারে। সাধারণত  কাজের বেলায় কাজী আর কাজ ফুরালেই পাজী এটাকেই মান্যতা দেওয়া  হয়, কিন্তু এখানে সেটা ব্যতিক্রম। শিল্পীদের  মর্যাদা শুধু টাকাতেই নয়, সম্মান দেখানো খুবই  প্রয়োজন।  কতদিন  ধরে তাঁরা কাজ  করেছেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন এই রাজবাড়ির ছবিটিকে। 
এক একসময় মনে হয় যে কি বিপুল পরিমাণ  অর্থ  ব্যয় হয়েছে এই ক্ষণিকের অতিথির জন্য।  সমস্ত কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের এই বিশাল  অর্থব্যয়  কি কোন স্থায়ী শিল্পের  পিছনে খরচ করা যেতনা যেখানে বহুলোকের সংবৎসর অন্নসংস্থান  হয়। অবশ্য  এই ক্ষণিকের  শিল্পকে  কেন্দ্র করেও বহু দরিদ্র  মানুষের  কিছুদিনের অন্নসংস্থান হয়। সবচেয়ে বড় অভিশাপ আজকের  যুগের জমিদারেরা।  সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে তাদের  টাকায় নিজেদের  আখের গোছান এই বর্তমানের জমিদাররা। শোষণ চিরকাল  চলে আসছে এবং ভবিষ্যতেও  চলবে। যে যখন  সুযোগ  পায় সেই তখন শোষণ করে। সবচেয়ে মজার  কথা এই মহাচোররা  খবরের  কাগজে তাদের  ছবি বা খবর বেরোনোয়  তাদের মানসম্মান হানি হচ্ছে বলে আদালতে দরখাস্ত করেন  এবং মহামান্য  আদালত সংবাদ  মাধ্যমকে  এই খবর প্রকাশে নিরস্ত করেন। আমরা কোন সমাজে বাস করছি? যারা নিগ্রহ করবে তাদের  সুরক্ষা দেব না যারা নিগৃহীত  হচ্ছেন তাঁদের  সহায়তা করব?  মহামান্য  আদালত,  আপনারাও  যদি চোখ বন্ধ করে থাকেন এবং  সংবাদ মাধ্যমের  মুখে কুলুপ এঁটে দেন তাহলে এই নিগৃহীত  মানুষগুলো যাবে কোথায়?  এদের কথা কে বলবে? শিক্ষিত  পাশ করা ছেলেমেয়েদের  জায়গায় টাকার বিনিময়ে চোরগুলো চাকরি পেয়েছে, আপনারা তাদের  সপক্ষে রায় দিচ্ছেন? ধিক আপনাদের,  নিজের বিবেককে  জিজ্ঞেস করুন মহামান্য  আদালত।  আপনারা শুধু নিজেদের ই ছোট করছেন না আপনাদের ভবিষ্যত  প্রজন্মকেও  ধিক্কারের শিকার করে তুলছেন।  একবার শান্তভাবে ভাবুন , মহামান্য আদালত। কথায় আছে আইন সকলের  ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য।  কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে কি সত্যিই  তাই? অর্থবলে বলীয়ান জমিদার রা যখন  ইচ্ছা তাঁদের  বক্তব্য  শোনানোর  জন্য  আপনাদের  দরজা খটখট করতে পারেন  কিন্তু সাধারণ লোকেরা বছরের পর বছর তাদের  বক্তব্য আপনাদের  কাছে  তুলে ধরার চেষ্টা করেও ব্যর্থ  হন। কি বলবেন  আপনারা?
যাই হোক , ফিরে আসা যাক সেদিনের  কথায়। টালা পার্কের প্রত্যয় ছেড়ে যাওয়া হল বাগবাজার সার্বজনীন পূজো মণ্ডপে। সামনের প্রবেশদ্বার বন্ধ। পাশের  দরজা দিয়ে ঢুকে দেখলাম টুকটাক  অনেক কাজ বাকি। কিন্তু মায়ের  সেই সাবেকি মূর্তি মনের অন্তস্থলে ছাপ ফেলে দিল। বিস্ফারিত চোখে মায়ের সেই রূপ মনটাকে দূরে কোথাও  নিয়ে গেল। মাঝখানে সেই বিশাল ঝাড়বাতি এই মণ্ডপের  এক বিশেষ  আকর্ষণ। মণ্ডপের বাইরে মাঠে তখন  দোকান পাট ইতস্তত ভাবে খুলতে শুরু করেছে যেখানে টালাপার্কে দোকান গুলো  বেশ গুছিয়ে  বসেছে। আলু কাবলি, ঝালমুড়ি বা ঘুগনির সুন্দর গন্ধ নাকে ঢুকে মন মাতিয়ে দিয়েছিল কিন্তু অতটা হেলতে দুলতে হেঁটে এসে রথ কখন নিয়ে চলে আসবে সারথিরা  এই ভেবে জিভে জল টেনেই চলে আসতে হল। ভাবলাম  বাগবাজারের মাঠে  হবে ঐসব আলুকাবলির উপর আক্রমণ।  কিন্তু মনের  আশা মনেই থেকে গেল। হলনা কিছুই খাওয়া কেবল লেবু চা ছাড়া। যাওয়া যাক, কুমারটুলির পূজো দেখতে। অনেক মেহনত করে এদিক সেদিক করে সারথিরা যখন  পৌঁছলেন  তখন  গিয়ে শুনলাম যে সাধারণের  প্রবেশ  নিষেধ। মহিলারা অটো রিক্সা চড়ে বড় রাস্তায় এলেন যেখানে সারথিরা  আমাদের  ছেড়েছিলেন কিন্তু তারা  সেখানে নেই এবং বহু লোক এসেছেন  তাঁদের  প্রতিমা নিতে। বিভিন্ন  সাজের মাকে বৃদ্ধ ন্যুব্জ কুব্জ  বাড়িগুলো  লক্ষ্য করছে,  হয়তো  বা আমাদেরকেও।  একদিন এই বাড়িগুলোই ছিল অসাধারণ  সুন্দর।  পাশাপাশি , বিপরীত দিকে সুবিশাল  হর্ম্য প্রাসাদগুলো পরস্পর  পরস্পরের প্রতি স্পর্ধা প্রকাশ করছে যেমন কর্ণ বা অর্জুন  কিংবা দুর্যোধন বা ভীমের  প্রতি। একমনে দেখছিলাম  তাদের  দিকে আর ভাবছিলাম  যে বয়সকালে এঁরা কতই না সুন্দর  ছিলেন। কিন্তু কালের গতিতে  সবকিছুই  হারিয়ে যায় যেমন গেছে এই সুন্দর  প্রাসাদোপম  বাড়িগুলো। চোখে কেমন যেন জল চলে এল।
আহিরীটোলা মণ্ডপে  যাবার ইচ্ছা ছিল  কিন্তু লোকজন জানালো যে  তাদের  মণ্ডপ ও কুমারটুলির মতন। সুতরাং, এবার চাই পেট পূজো।  শতাব্দী প্রাচীন  মিত্র কাফেতে অভিযান  চালাতে  হবে। এটাও অর্জুনের ই পরিকল্পনা।  অতএব চল মিত্র কাফে। অপরিসর জায়গা  কিন্তু শতাব্দীপ্রাচীন  রেস্তোরাঁয় ঢুঁ না মারলে কেমন একটা অপরিপূর্ণতা  থেকে যায়। যেমন বলা তেমন কাজ। কিন্তু ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে তরী। অতএব কর অপেক্ষা।  বেশ দাঁড়িয়েছিলাম  কিন্তু সিগারেটের  গন্ধে গা টা  কেমন ঘুলিয়ে উঠল। এই জীবনে ঐ স্বাদে আমি বঞ্চিত,  সুতরাং এক অস্বস্তিকর অবস্থা।  দেখি,  আমার ই অনতিদূরে এক প্রতীক্ষারত যুগল কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার  যে ভদ্রলোক  পাঁশুটে মুখে দাঁড়িয়ে আর তাঁরই  সঙ্গিনী একটা বেশ বড় মাপের  সিগারেটে টান দিচ্ছে  আর মনের  সুখে ধোঁয়া ছেড়ে অন্য লোকের কাশি উঠিয়ে দিচ্ছেন।  একটু বিরক্ত  হয়েই হাত দিয়ে ধোঁয়াটাকে নাকের  কাছ থেকে  দূরে সরিয়ে বোঝানোর  চেষ্টা করলাম যে নিজের  ফুসফুসটার  বারোটা তো বাজাচ্ছ ই, সঙ্গে সঙ্গে তোমার  সঙ্গী এবং  আমাদের ও। উনি বুঝতে পারলেন ব্যাপার টা এবং সঙ্গে সঙ্গে সরে গেলেন।  সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের  বিষয় যে ঐ   চল্লিশোর্ধ মহিলা আমারই  সামনে বসলেন। আমাদের  নয়জনের অর্ডার দিতে ওদের  একটু দেরী  হচ্ছিল আর ওঁরা দুইজন  থাকায় ওঁদের  তাড়াতাড়ি দিয়ে দিল। আর তাঁরাও ফিস কবিরাজি যত তাড়াতাড়ি পারেন  খেয়ে বিদায় নিতে পারলে বাঁচেন। ভদ্রমহিলার  তিন আঙুলে একটাই আংটি মানে আংটি একটাই অথচ এমনভাবে তৈরী  যে মাঝে একটা পাথর মধ্যমায় এবং দুইদিকে সোনা কিন্তু একটা ভয়ানক  ছবি  ঐ দুই পাশের  আঙুলে মানে  তর্জনী ও অনামিকায় যা রীতিমত ভয়ের  বাতাবরণ তৈরী করে। কে জানে কোন জ্যোতিষীর  পরামর্শে তিনি এটা ধারণ করেছেন।  সে যারই  পরামর্শে উনি ধারণ করে থাকুন না কেন উনি যে পড়াশোনায় সেরকম  কিছু দরের  নন সেটা তাঁর চোখেমুখেই  প্রতিফলিত। যাই হোক,  উনি চলে যাওয়াতে আমি কেমন একটা স্বস্তি পেলাম।  এবার  আসা যাক, একটু মিত্র কাফের কথায়। উনিশশো দশ সালে শ্রী গণেশ  মিত্র এই কাফে খোলেন।  কিন্তু উনি ঠিকঠাক চালাতে না পারায় বছর দুই বাদেই বাল্যবন্ধু  শ্রী সুশীল রায়কে দিয়ে দেন। সুশীলবাবু  ছিলেন  একজন অত্যন্ত  বাস্তব বোধ সম্পন্ন ব্যক্তি এবং একজন দক্ষ ব্যবসায়ী। সেই কারণেই  মিত্র কাফেতে এই কয়টা পূর্তি লেখা আছে।
                   "  মিত্র কাফে "
                 -------------------------
পেট ভরে খাবার  আর প্রাণভরে আড্ডা
উনিশশো দশ সালে শোভাবাজারে শুরু যাত্রা
বন্ধুত্বের মর্যাদা দিতেন সুশীল  রায়
ভালভাবে বুঝতেন  মানুষ  কি চায়।
মিত্র কাফে নাম সেই বন্ধুত্বের  স্বীকৃতি
আজ এই নাম মানেই খাবার আর খ্যাতি
এই রেস্তোরাঁর  কথা আজ কে না জানে
কলকাতা ছাড়াও আছে আরও অনেক স্থানে।

এই মিত্র কাফেতেই আমরা ফিস কবিরাজি , চিংড়ির  কবিরাজি, চিকেন কবিরাজি , ফিস কাটলেট এবং ডায়মন্ড কবিরাজি ধ্বংস করে ফিরে এলাম  বাড়ি আর এইবার  দুঃশলা ভগ্নী এই সমস্ত বিল মেটালেন। প্রথমে নকুল ও কারেনুমতি  এবং পরে সহদেব ও বিজয়াকে রথ থেকে নামিয়ে যুধিষ্ঠির  ও অর্জুন  রথে বাড়ি ফিরে গেলেন। 
একটা কথা বারবার  মনে আসছে।কলকাতা তথা সমস্ত পশ্চিমবঙ্গে এত মহান শিল্পী রয়েছেন  যাঁদের শিল্পীসত্ত্বা এই বিশেষ  সময়ে বিকশিত  হবার  সুযোগ পায়। আগে আঙুলে গোণা কতিপয় শিল্পীর ছবি আর্ট গ্যালারিতে প্রদর্শিত হতো কিন্তু এই শারদোৎসবে এই বৃহৎ আর্ট গ্যালারিতে সমস্ত ছোটবড়  শিল্পীরা তাঁদের  স্থান করে নেন।

Monday, 18 September 2023

শ্রদ্ধার্ঘ্য

আমরা সাধারণত মনীষীদের জন্মদিন  বা মৃত্যু দিন শ্রদ্ধার  সঙ্গে পালন করি এবং কোন  সাধারণ মানুষ  মারা গেলে আমাদের  প্রতিক্রিয়া হয় তাৎক্ষণিক। ভাল  মানুষ  হলে সবাই বলতে থাকে, " আহা, মানুষটা খুব  ভাল  ছিল আর খারাপ  হলে বলে, গেছে, আপদ গেছে চুকে।" কিন্তু ঐ কয়েকদিন  লোকে একটু আধটু হা হুতাশ করে তারপর পৃথিবীর চলার  সঙ্গে তাল  মিলিয়ে লোকে ভুলে যায়। অবশ্য  লোকজন তো পরে, নিজের আপনজন ই শুরু করে দেয় এটা আমার,  ওইটা তোমার ( যদি একাধিক  সন্তান  থাকে)। কিন্তু কিছু কিছু লোক সাধারণ  হয়েও এমন কিছু কাজ করে যায় যেটা কিছু লোক জীবনের  শেষ দিন পর্যন্ত মনে রাখে( অবশ্যই  কৃতার্থবোধ  যদি একান্তই থাকে)। 

এইরকমই  একজন গণপতরাও কদম। কদমজী ছিলেন  আমাদের অফিসার্স কোয়ার্টারের  সিকিউরিটি গার্ড। অফিস  বেরোনোর সময় এবং অফিস  থেকে ফেরার  সময় দেখা হতো যদি তার ডিউটি থাকত। একটু  নাদুস নুদুস গোলগাল চেহারা, মাঝারি উচ্চতা কিন্তু সদা হাস্যময়। আমি যেহেতু একা থাকতাম সেইকারণে টুকটাক  কিছু কথাবার্তা আমার  সঙ্গে সবসময়ই  হতো। রিটায়ার করার  কিছুদিন আগে আমার ছেলে ট্রান্সফার  হয়ে এল এবং আমার সঙ্গেই  থাকল। রিটায়ার করার  পরেও  কিছুদিন ছিলাম অফিসের  কোয়ার্টারে এবং সেই সুবাদে সমস্ত  স্টাফদের  সঙ্গে সখ্যতা আরও  নিবিড় হয়েছিল। টুকটাক কাজ এই কদমজী বা শেলকে জী বা পাটিলজীরাই করে দিত। অফিস  থেকে ফেরার পথে প্রায়ই জিলাপি বা সিঙারা বা কোন খাবার কিনে আনতাম শুধু নিজের জন্যই নয় এই সিকিউরিটি গার্ড  বা সুইপারের জন্য ও আনতাম। প্রথম প্রথম একটু কুণ্ঠিত হয়ে নিত কিন্তু পরে তারাও খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছিল।  এরই মধ্যে কিছু কাজের  জন্য কলকাতায় আসতে হয়েছিল  ছেলের  বিয়ের ব্যাপারে। রান্নার জন্য  শোভা দিদি আসত, সুতরাং খাওয়া দাওয়ার অসুবিধে হচ্ছিল না। একদিন সন্ধে বেলায় হঠাৎই  মোবাইলটা বেজে উঠল। দেখি কদমজীর ফোন।  কি ব্যাপার,  কদমজী? ওর উত্তর  শুনে মাথা ঘুরে গেল। ছেলের ভীষণ জ্বর, চোখ খুলতেই পারছে না তো কথা বলা তো দূরস্থান। সেদিন  ছিল রবিবার,  কোন ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছে না। আমি কতকগুলো জ্বরের  ওষুধ বলে দিলাম এবং খাওয়াতে বললাম।  কিন্তু কদমজী তাঁর পরিচিত  এক ডাক্তারের  বাড়ি নিয়ে গেল ছেলেকে এবং অনেক অনুরোধ  করে তাঁকে দেখতে রাজি করালেন। উনি তাঁর পরিচিত  এক ডায়গনস্টিক ক্লিনিকে ফোন করে রক্ত পরীক্ষার  ব্যবস্থাও  করলেন এবং কদমজী সমস্ত  পরীক্ষা করিয়ে ছেলেকে বাড়ি ফিরিয়ে আনলেন এবং ডিউটির রোস্টার বদল করে সারারাত ছেলের  পাশেই থাকলেন । পরে আমার  অনুরোধ মতন প্যারেল থেকে বম্বে এয়ারপোর্টে  ছেলেকে ছেড়ে দিয়ে এবং বিমান কর্মীদের  সমস্ত  কিছু অবগত করালেন।  আমরা কলকাতা এয়ারপোর্ট ওকে নিয়ে সোজা হাসপাতালে  ভর্তি করে দিলাম।  আবার  রক্ত পরীক্ষার পরে ডেঙ্গি ধরা পড়ল এবং প্ল্যাটিলেট কাউন্ট বিপদসীমার  অনেক নীচে। সবাই  খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম।  তিনদিন  বাদে ছেলের  বিয়ের রেজিস্ট্রেশন হবে অথচ প্ল্যাটিলেট সংখ্যার  সেরকম  কোন  উল্লেখযোগ্য  বৃদ্ধি হচ্ছে না । মেয়েদের বাড়িও ভীষণ  উদ্বিগ্ন,  আমরা তো বটেই। রেজিস্ট্রেশনের  আগের  দিন  আমরা বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলাম কিন্তু ডাক্তার ছাড়তে রাজি নন। শেষ পর্যন্ত বণ্ড সই করে ওকে বাড়ি নিয়ে এলাম  কিন্তু একটা ভয় শেষ পর্যন্ত থেকেই  গেল। ভগবানের আশীর্বাদে সবকিছুই  নির্বিঘ্নে মিটে গেল কিন্তু আমার  ঙ কদমজীর কথা মনেই থেকে গেল।

কদমজীর  অ্যাকাউন্ট নম্বর  নিয়ে ছেলের জন্য  যা খরচ করেছিল তা পাঠিয়ে দিলাম  এবং ছেলের  জীবন  ফিরে পাবার জন্য মনে মনে ভগবানকে এবং তাঁর ই প্রতিনিধি কদমজীকে অনেক ধন্যবাদ  জানালাম।  এরপর অনেকবার  বম্বে এসেছি এবং কদমজীর  সঙ্গে দেখাও করতে গিয়েছি কিন্তু দেখা হয়নি কোন না কোন কারণে। কোন  সময় ওঁর ডিউটি রাত্রিবেলায় নয়তো ডিউটি করে চলে গেছে বা নিজের  গ্রামে গেছে। বছর চারেক আগে  ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাস থেকে আসার  সময় প্যারেল  হয়ে এসেছি কিন্তু কদমজী ছাড়া বাকি সকলের  সঙ্গেই  দেখা হয়েছে। ওদের  চীফ সিকিউরিটি অফিসার শেলকেজীর হাতে মিষ্টির  বাক্সটা দিয়ে কদমজীর কথা জিজ্ঞেস করায় উনি জানালেন যে কদমজী চাকরিতে ইস্তফা  দিয়ে পাকাপাকি ভাবে নিজের গ্রামের বাড়িতে চলে  গেছে। সুতরাং সেবারও  দেখা হলো না। গতকাল  একটু হাতে সময় নিয়ে পুরোন  বন্ধুদের  সঙ্গে যোগাযোগ  করতে লাগলাম। ধূমলজী,  ব্যাভারেজী,  কদমজী, শেলকেজী সবাইকেই  ফোন  করলাম  এবং শেলকেজী ছাড়া আর কারও  কাছ থেকে উত্তর না পেয়ে একটু বেশ ঘাবড়ে গেলাম। শেলকেজীর  মুখে জানলাম যে কদমজী করোনার  করাল গ্রাসে নিমজ্জিত  হয়েছেন  এবং  পরে ব্যাআরেজীর ফোনে জানলাম যে আমার অত্যন্ত  ঘনিষ্ঠ সহযোগী  ধূমল ও করোনার শিকার  হয়েছে। মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত  হয়ে গেল। রক্তের  সম্পর্ক  না থাকলেও এদের  কাছ থেকে যা পেয়েছি তা অমূল্য  এবং ভগবানের  কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি এই মহাত্মাদের তাঁর চরণে স্থান দেন।

Thursday, 10 August 2023

তিলু নাপিতের বাড্ডি

তেলুগু ভাষায় বাড্ডি শব্দর অর্থ ছোট দোকান।  তিলু পরামাণিক যে কি করে অন্ধ্রপ্রদেশের ভাইজাগ শহরে এসে জুটেছিল সেটা কেউ জানেনা। হয়তো তার বাপ ঠাকুর্দা বন্দর শহর ওয়ালটেয়ারে ( ভাইজাগের  পুরোন নাম) কাজের সূত্রে এসেছিল এবং তারপর সেখানেই থেকে গেছে বংশানুক্রমে। তিলু পরামাণিক নামেই বাঙালি, কিন্তু ওখানে থাকতে থাকতে তাদের  ভাষা, চলন বলে সবই রপ্ত করে ফেলেছে তাদের মতন। তিলুর ছেলেমেয়েরা সবাই  তেলুগু মাধ্যমেই  পড়াশোনা করে এবং তার বৌ ও তেলুগু।  এসব  সত্ত্বেও তিলু  নিজেকে  বাঙালি  বলেই পরিচয় দেয় এবং বাঙালিদের অনুষ্ঠানে নিজেদের  সামিল  করে।

তিলুর বাড়ি পুরোন শহর বন্দরের  কাছাকাছি।  পূর্ণ মার্কেটে বাজার  করতে গিয়ে মাছ কেনার  সময় হলো আলাপ। মাছ বিক্রেতা  মহিলা( যাকে আমি দিদি বলে ডাকতাম) কোন  এক সময়  কলকাতায় থাকার দরুন  বাঙলা বলতে পারত এবং কলকাতা থেকে দক্ষিণ দেশে গিয়ে ভাষার  সমস্যার জন্য কেউ যদি বাঙলা বলতে পারে বা বুঝতে পারে এমন লোকের সঙ্গে পরিচিত  হতে পারে তবে তার মনে হয় যেন সে হাতে চাঁদ পেয়ে গেছে।  সুতরাং মেছুনি দিদি ও তিলুর সঙ্গে আলাপ  হওয়ার মানে  যেন আকাশে ডানা মেলে ওড়া। মেছুনি দিদির এক বোন আবার  আম বিক্রি করত। সুতরাং আম কিনতে হলে ঐ ছোড়দিদির কাছেই  কেনা হতো। বাজারের  কাছেই  ছিল তিলুর এক ছোট্ট  সেলুন( কাঠের তৈরী) যেখানে মাত্র  দুজনই একসঙ্গে চুল কাটতে পারে।  তিলু মোটামুটি ভাবে সারা সপ্তাহ  একাই সামাল দেয় কিন্তু রবিবার বা ছুটির  দিন ছেলে এসে বাবাকে সাহায্য  করে। যাই হোক, বাজার  করতে এসে চুল কেটে বাড়ি ফেরা একদম রথ দেখা কলা বেচার মতন। তিন বন্ধু আমরা একসঙ্গে বাজার  যেতাম তিনটে  স্কুটারে এবং  মাসে একবার  হতো তিলুর দোকানে লেবু দিয়ে সোডা খাওয়ার ধূম। ওখানে কলকাতার  মতন যত্রতত্র চায়ের দোকান  মেলেনা কিন্তু পাওয়া যায় লেবু সোডা বা ঘোল( বাটার মিল্ক)। যা রোদের  তেজ নিম্বু সোডা  বা বাটার মিল্ক ছাড়া চলাও  যায় না।

সব সেলুনেই একই ছবি বিশেষ করে মফস্বল বা ছোট  শহরে। বম্বেতে কারও দম ফেলার সময়ই  নেই,  সবাই যেন  ছুটছে তো ছুটছেই।  চার্চগেট  স্টেশনে  ট্রেন  ঢুকছে আর শয়ে শয়ে  লোক সব রেডি হয়ে আছে ঐ ট্রেন  থামার আগেই উঠে পড়বে একটু  বসার জায়গা পাওয়ার জন্য। ঐ সময় কে ধাক্কা  খেয়ে পড়ল বা পড়ে যাওয়া লোকটাকে পদপিষ্ট করে চলে গেল কিনা কারও  ভ্রূক্ষেপ নেই। কলকাতায় ও বনগাঁ লোকালেও প্রচণ্ড  ভিড়  হয়  কিন্তু বম্বের  ভিড়ের  কাছে  কিছুই  নয়। সুতরাং আমাদের মতন লোকের পক্ষে ঐরকম  কিছু করা সম্ভব  নয়। পড়ে  যাওয়া লোকটাকে উঠিয়ে একটা বেঞ্চে বসিয়ে তার  ছিটিয়ে পড়া কাগজ পত্রগুলো উঠিয়ে দিয়ে একটু ফার্স্ট এড দেওয়ার  চেষ্টা থাকে। যাই হোক, পুরোন  প্রসঙ্গেই  ফিরে আসা যাক। 
সমস্ত  নরসুন্দরের মতন তিলুর ও স্টকে  থাকা নানাধরণের গল্পের  স্টক থেকে  একটার পর একটা  গল্প বেরোত চুল কাটার  ফাঁকে ফাঁকে।  নরসুন্দরদের এটা একটা বিরাট গুণ। অবাধ গতি ওদের নানান বিষয়ে সে শিল্পকলাই  হোক বা রাজনীতিই  হোক। অন্ধ্রপ্রদেশে অবশ্য  রাজনীতি নিয়ে বিশেষ  কেউ মাথা ঘামায় না যতটা আমাদের কলকাতায় বা পশ্চিমবঙ্গে হয়। ভোটের  সময়  স্কুটার বা মোটরসাইকেলের সামনে লাগানো পতাকা  দেখেই বোঝা যায় সে কোন দলের।  কিন্তু না, সেখানে না আছে কোন  মারদাঙ্গা বা বুথ দখল বা রিগিং।  ভোটের  সময় শেষ তো সব দ্বিচক্রযান পতাকামুক্ত আর একঠেকেই আড্ডা বা পানভোজন। তিলুর কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের  ভোট নিয়ে বিশেষ আগ্রহ।  কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম  ওর কটা ছেলেমেয়ে? উত্তরে জানায় ওর পাঁচ ছেলে ও একটা মেয়ে।  
অ্যাঁ, পাঁচটা ছেলে ও একটা মেয়ে মানে তোমাদের  সংসারে আটজন সদস্য! একটু আশ্চর্য  হয়েই জিজ্ঞেস  করলাম তোমার  বয়স কত এবং  আজকের  দিনে এত বড় সংসার!  ও কিন্তু ভীষণ  সপ্রতিভ ভাবেই উত্তর  দিল যা শুনে তো আমরা তিনজনেই  হাঁ। 
ঐ যে ছেলেটাকে দেখছেন ও আমার  সেজ ছেলে। 
অ্যাঁ, সেজছেলে? আর বাকি রা কোথায়?
বড় দুই ছেলে ছোট  দুজনকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে আছে।
গ্রামের  বাড়ি! কোথায় তোমাদের  গ্রাম?
আর বলবেন না। বসিরহাটের কাছে আমাদের  পূর্বপুরুষের  বাড়ি। বড় ছেলে শাসকদলের পঞ্চায়েত সদস্য।  মেজ ছেলেকে কিন্তু বলেছি বিরোধীদলে থাকতে কারণ যতই  পালাবদল  হোক না কেন আমাদের  বাড়িতে যেন কোন আঁচ না আসে।  ছোট  দুজন এখনও  পড়াশোনা করছে। ওদেরকেও  বলে দিয়েছি বাড়িকে  সুরক্ষিত রাখতে গেলে যত পার্টি আছে সবজায়গায় যেন  আমাদের  বাড়ির  কোন  না কোন সদস্য  থাকে। 
কথায় আছে, জীবজন্তুর  মধ্যে শিয়াল,  পাখির মধ্যে কাক আর মানুষের  মধ্যেএই নরসুন্দর  অসম্ভব  চতুর। বাজারের  থলিগুলো  স্কুটারেই  আটকানো রোদেই  শুকাচ্ছে।  চুলকাটা শেষ করে তিনবন্ধুর বাড়ি ফিরে আসা এবং  প্রত্যেক  মাসেই  নিজের  নিজের  বাড়িতে গঞ্জনা শোনা আর ভগবানের  আশীর্বাদে এক কানে শোনা এবং অপর কান দিয়ে নির্গমনের ব্যবস্থা করা।

Thursday, 3 August 2023

ছোট্ট পৃথিবী

সোমবাবুর রোজ একবার  বাজারে যাওয়া চাই। কিছু লাগুক বা না লাগুক প্রত্যেক দিন  অভ্যেস বশত একবার  চক্কর না দিলে সোমবাবুর দিনটা যেন কেমন  পানসে হয়ে যায়। আর যাওয়া মানেই প্রয়োজন  না থাকলেও কিছু না কিছু উনি আনবেনই আর গিন্নীর কাছে অবধারিত ভাবে বকুনিও খাবেন। মাঝে মাঝেই বকুনির  মাত্রাটা একটু বেশি হয়ে গেলে সোমবাবুর বাইরে বেরিয়ে যাওয়া এবং সেটাও  ঐ বাজারমুখী কিন্তু এবার  আর কোন জিনিস  আনা নয়, ওঁর মনটাকে একটু শান্ত করা। বন্ধুরা বলেন  আপনার  ঐ বাজারে কি আছে বলুন তো? রোজ ঐদিকে না গিয়ে একটু আধটু অন্য দিকে কি যেতে পারেন  না? গিন্নীর বকুনি আর বন্ধুদের শ্লেষ প্রায় একই রকম মনে হয় তাঁর কাছে। আসলে উনি যান এক বিশেষ টানে। কত রকমের লোক জন আসে বাজারে, তাদের  মানসিকতা তাদের  কেনাকাটার মাধ্যমে বোঝা যায়। কেউ এমন দরদস্তুর করে যে বিক্রেতা তাদের  আসতে দেখলেই ভাল জিনিস টা প্লাস্টিকের থলিতে ভরে রেখে দিয়ে বলে ওটা বিক্রি হয়ে গেছে। আবার  কিছু লোক এসে দাঁড়াতেই তারা বুঝে যায় যে কি জিনিস নেবেন  এবং কতটা নেবেন এবং সেই মতো বেছে বেছে ভাল জিনিসটা তাঁদের  জন্য  রেডি করে রাখে। এঁরা কোন দর দাম করেন না এবং টাকার  হিসেবটাও  করেন না। ওঁরা ভাল করেই জানেন  যে এইলোকটা তাঁর কাছে বেশি দাম নেবেনা এবং অবশ্যই ভাল জিনিসটাই  দেবে। কিন্তু সব মানুষ  তো সমান হয়না এবং বিক্রেতাদের ও সেই অনুযায়ী স্ট্র্যাটেজি নিতে হয়।

পচা মাছওয়ালা কিন্তু একেবারেই  পচা মাছ বিক্রি করেনা বরঞ্চ তার মাছটাই বাজারের  সেরা মাছ। কিন্তু সেই ছোট বয়সেই তার বাবা মায়েরা তার নামটা পচা দেওয়ায় এবং ভাগ্যের দোষে বা গুণে তাকে মাছ বিক্রি করতে হওয়ায় তাকে সবাই  পচা মাছওয়ালা বলেই ডাকে। মাঝেমধ্যে যে একটু মন খারাপ  হয়না তা নয় তবে তার যা বিক্রি তাতে বেশিক্ষণ  মন খারাপ করার  মতো সময় তার থাকেনা। পচার পাশে পানুবাবু অন্য রকম মাছ রাখেন এবং তাঁর খরিদ্দার ও সব বাঁধা। আর মাছ কিনতে গেলে চেনা লোকের কাছেই কেনা উচিত  নাহলে ঠকে যাওয়ার  সম্ভাবনা প্রবল। সোমবাবু আবার  মাছের  ভীষণ  ভক্ত নন কিন্তু কিনলে হয় পচা নাহলে পানুবাবুর কাছেই কেনেন। সমস্ত মাছবিক্রেতাই  কর্পোরেশনের তৈরী উঁচু দাওয়াতে  বসে এবং প্রত্যেকের বিক্রি করার জায়গার  নীচে একটা ছোট্ট  গোডাউন মতো আছে যেখানে অবিক্রিত মাছগুলো নুন আর বরফ মেশানো ক্রেটের মধ্যে থাকে এবং বাইরে থেকে তালা দেবার  ব্যবস্থাও  রয়েছে। সেইরকম  মাংস বিক্রেতাদের ছোট্ট গোডাউনে ছাগল  ভরা থাকে। তবে দাওয়ার  ওপর বসে বিক্রি করতে হলে কর্পোরেশনকে টাকা দিতে হয় এবং স্থানীয় নেতাদের  চাহিদাও  মাঝেমধ্যেই পূরণ  করতে হয়। বাজারের  ভেতর  যারা মাটিতে বসে তাদের  দক্ষিণার মাত্রা কম হয় এবং বাজারের  বাইরে রাস্তার  দুধারে বসা বিক্রেতারা  কেউই এই কুচো নেতাদের হাত থেকে রেহাই  পায়না। আগে যারা সাইকেল  চালিয়ে আসত, এখন তারা আসে মোটর সাইকেলে।  চোখদুটো লাল ভাঁটার মতো, মনে হয় ক্লিপ দিয়ে চোখের  পাতাটা আটকে রেখে চোখটা খোলা রেখেছে। কাশীনাথের কাছে মোটরসাইকেল থামিয়ে জলদগম্ভীর স্বরে বলে ওঠে দাদা," শোন্ এইসবগুলো বাড়িতে দিয়ে আয় তাড়াতাড়ি।" কাশীনাথ তার খরিদ্দারদের দাঁড় করিয়ে রেখে ভয়ে আগে তার ফরমায়েশ মতো জিনিসগুলো দিয়ে আসে। ওর দেরী হলে পরদিন  থেকে ওর বাজারে  আসা বন্ধ এবং রোজগার পাতিও বন্ধ। সোমবাবুর ইচ্ছে করে টেনে দুই চড় লাগাতে কিন্তু সেই দাদার  ভয়ে সবাই  তটস্থ কারণ ও সেখানকার  কাউন্সিলরের ডানহাত, প্রোমোটারি করে, দালালি করে এবং নানাউপায়ে নিজের ও কাউন্সিলরের পকেট ভরে। সুতরাং তাকে ঘাঁটানো  মানে সাপের  লেজে পা দেওয়া। অত সাহস কার আছে? সবচেয়ে মজার  ব্যাপার  যে যদি কোন  পটপরিবর্তন হয় তাহলেও  এরা কিন্তু সেই একই জায়গায় থাকবে কারণ এরা হচ্ছে বাহুবলী কেবল মনিবটা  রামের  জায়গায় শ্যাম হবে।

পচা মাছওয়ালার উল্টোদিকে মহাদেব  বসে সামান্য  কাঁচা লঙ্কা, কাঁচা হলুদ, ধনেপাতা আর কারিপাতা  নিয়ে। সামান্য পুঁজি, সামান্য ই মালপত্র,  কিই বা বিক্রি করবে আর কিই বা লাভ হবে আর পেটটাই  বা কিভাবে চলবে? সোমবাবুর কোন  দরকার  না থাকলেও  ঐ মহাদেবের  দর্শন চাইই চাই। রোজ বাজারে গিয়ে দশ কুড়ি টাকা ওকে দেওয়া চাই। নামটাই মহাদেব,  শীর্ণকায় হাড় জিরজিরে চেহারাটার  দিকে চোখ পড়লে চোখে জল এসে যায়। সোমবাবুর ঐ সামান্য সাহায্য ওকে খুব অল্প  হলেও  সাহায্য করে। ঐ মায়াময় চেহারাটার দিকে নজর পড়লেই সোমবাবুর আর মাথার  ঠিক থাকেনা। মহাদেব  লজ্জ্বার খাতিরে সামান্য  হলেও  কিছু জিনিস  দিতে চায় যেটার দরকার নেই আদৌ এবং আনলেও বাড়িতে অশান্তি। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই  চলে সোমবাবুর  আনাগোনা।
এরই মাঝে এসে গেল করোনার  মহামারী। বাজারের সব ঝাঁপ বন্ধ। লোকজন  ঠেলায় করে তরকারিপাতি বাড়ির সামনে নিয়ে আসছে। আবাসনের  বাসিন্দারা থলি ঝুলিয়ে মালপত্র  তুলে নিচ্ছে এবং টাকাপয়সা দিয়ে দিচ্ছে এবং বাকি টাকাও ঐ থলির মাধ্যমেই  ওঠানামা করছে। ঐ সবজিগুলো স্যানিটাইজার দিয়ে একপ্রস্থ মাখামাখি হবার পরে আবার  যতটা সাবধানে সম্ভব  ধোওয়া হচ্ছে এবং তার ব্যবহার হচ্ছে। ধীরে ধীরে করোনার প্রকোপ কমে এসেছে। লোকজন বাজারে প্রায় নিয়মিত  হয়ে এসেছে। পচা মাছওয়ালা, পানুবাবু, কাশীনাথরা সবাই আছে কিন্তু মহাদেবের জায়গাটা খালি। সোমবাবু কয়েকদিন গিয়েছেন এবং মহাদেবের  খোঁজ করেছেন  কিন্তু কেউ কোন  খবর দিতে পারেনি। হঠাৎই  যেন  মহাদেব  উধাও  হয়ে গেল  বাজার থেকে, জানিনা করোনার  প্রকোপে  না খিদের জ্বালায়? বাজারে আসার  তাগিদটাই যেন  হারিয়ে গেছে সোমবাবুর কাছ থেকে।

Saturday, 22 July 2023

নদীবক্ষে নিশিযাপন

নৌকায় চড়া বা লঞ্চে যাওয়া বা স্টিমারে পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা বেশ ভালোই হয়েছে কিন্তু নদীবক্ষে নিশিযাপন করার  সুযোগ কোনদিন  হয়নি।সেই সুযোগ ও এসে গেল যখন আমাদের অর্জুন বলল যে ফ্লোটেলে একটা রাত্রি কাটালে কেমন হয়? সবাই  একযোগে মাথা নাড়ালো, বলল ভালোই প্রস্তাব। কথায় আছে যে খায় চিনি তাকে যোগান চিন্তামণি । কিন্তু মনের মধ্যে একটা সংশয় থেকেই যায়, কতটা ব্যয়সাপেক্ষ হবে সেই থাকাটা। অর্জুন কিন্তু ব্যাপারটা আঁচ করে ফেলেছে ততক্ষণে, বলল,"না ,সেরকম কিছুই  নয়, আসলে ও একটা অনুষ্ঠান করার জন্য কয়েকটা ঘর বুকিং বাবদ কিছু টাকা অ্যাডভান্স দিয়েছিল কিন্তু অনুষ্ঠান সূচি বদলে যাওয়ায় ওকে অন্য ব্যবস্থা করতে হয়েছে এবং ফ্লোটেল কর্তৃপক্ষ ও টাকা ফেরত দিতে রাজী  নয়। অতএব,  ঐ টাকা অ্যাডজাস্ট  করতে  হলে ওখানে গিয়েই থাকতে হবে।"  একটু কেমন কেমন লাগছে অথচ অর্জুন টাকাও নেবেনা আমাদের  কাছ থেকে। প্রথমে একটু নিমরাজি  থাকলেও ক্যাপ্টেনের  কথা ফেলা যায় না। অতএব  ঠিক হলো যে  একুশে মে শনিবার যাওয়া হবে এবং ওখানে রাত কাটিয়ে রবিবার  ফিরে আসা।

ফ্লোটেল হচ্ছে একটা সুন্দর ছোট্ট জাহাজ যেটা স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার পূর্বাঞ্চল লোকাল হেড অফিসের  উল্টোদিকে।  কয়েক বছর আগে আমাদের  স্কুলের     বন্ধুদের প্রায় একান্ন বছর বাদে গেট টুগেদার  হয়েছিল  এবং ওখানে আমরা ডিনার করেছিলাম  কিন্তু থাকার সুযোগ ঘটেনি। ওখানে দুটোর  সময় চেক ইন, কিন্তু খাওয়া দাওয়া সেরে পৌঁছাতে প্রায় বেলা চারটে। অর্জুন  বিরাট বড় প্ল্যানার, খুঁটিনাটি  সবকিছুই  একদম ঠিকঠাক ।নয়জনের  চারটে কেবিন এবং সবটাই গঙ্গার  দিকে কিন্তু একটা কেবিন  হয়ে গেল  অন্য ডেকে। কিন্তু অর্জুন  চাইছে সবার একটা ডেকে ই  হোক। রিসেপশনে একটা ছোট খাটো চেহারার মেয়ে কিন্তু অসম্ভব  ঝকঝকে চেহারা এবং ভীষণ  স্মার্ট। নাবিকের  ড্রেস, মাথায় তাদের  মতন টুপি-- এককথায় বলা যেতে পারে নাবিকোচিত। সুন্দর আঙুলগুলো  যথোচিত ম্যানিকিওর করা এবং বিভিন্ন  আঙুলে বিভিন্ন রকম চিত্র। ল্যাপটপে তার আঙ্গুলগুলো নটরাজের  নৃত্য করছে এবং অসম্ভব দক্ষতার সঙ্গে অর্জুনের সঙ্গে মোকাবিলা করছে। যদিও  সে বলল যে একটা ডেকে ই করে দেবে কিন্তু  শেষমেশ  তা হলো না । তখন  নিজেরাই বলাবলি করলাম যে একটাই তো রাত্রি, কেটে যাবে কোনভাবে।

বিকেল বেলায় ঠিক  আছে গঙ্গারতি দেখার।  অর্জুন  তার ও ব্যবস্থা করে রেখেছে। গাড়িগুলো আমাদের  ছেড়ে দিল যেখান  থেকে লঞ্চটা ছাড়বে কিন্তু একটু ভুল বোঝাবুঝির জন্য  অনেকখানি পিছনে হেঁটে আসতে হলো এবং দেখা  গেল যে ফ্লোটেল থেকে হেঁটেই  আসা যেত। যাই হোক, তিনটে লঞ্চ পেরিয়ে আমাদের  লঞ্চে পৌঁছলাম।  লঞ্চের  ওপরের  ডেকে উঠতে সব নড়বড়ে বুড়োবুড়িদের একদম দফারফা। যাই হোক, ওপরে উঠে বসার পর ইঞ্জিন  স্টার্ট করল আর ধীরে ধীরে যেখানে আরতি হচ্ছিল  তার একটু দূরেই নোঙর করল। বারাণসীর আদলে এখানে গঙ্গা আরতি শুরু হলো। একদিকে সূর্যাস্ত, অন্যদিকে আরতি এবং পিছনে মাঝে মাঝে চক্ররেলের হর্ন মিলেমিশে এক অন্য আবহাওয়ার সৃষ্টি হলো। গঙ্গার  জলের  যে ভিন্ন ভিন্ন রঙ হয় তা না দেখলে বিশ্বাস ই করা যায়না। ছবিগুলো মনের  মধ্যে গেঁথে আছে যেটা এখানে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আরতি শেষে  লঞ্চ  আবার  স্টার্ট করে যেখান থেকে উঠেছিলাম  সেখানেই নামিয়ে দিল এবং বাবুঘাটে স্পেশাল চা খেয়ে এলাম ফিরে ফ্লোটেলে। বাতাসে আদ্রতা থাকায় ঘামে জবজব শরীরটা এসে ঠাণ্ডা করে  রাতের  খাবারের জন্য সর্বোচ্চ ডেকে এসে পৌঁছলাম।  হরেক রকমের খাবার,  কোনটা ছেড়ে কোনটা খাব ভেবে  পাচ্ছি না,  তবে তার মধ্যেই  যেগুলো সচরাচর  বাড়িতে খাওয়া হয়না সেগুলোর দিকেই  নজর দিলাম। আগের বার যখন  এসেছিলাম  তখন খাবারের মান ততটা ভাল  ছিলনা কিন্তু এখন বেসরকারি  হাতে যাওয়ায় খাবারের মান এবং সার্ভিসের প্রভূত  উন্নতি হয়েছে। যাই হোক খাওয়া সেরে কেবিনে ফিরে আসা এবং মহিলাদের হাউসি খেলা শুরু।

অবাক হয়ে জানলা দিয়ে গঙ্গার  নানান রূপ  চোখে  পড়ছে এবং মোবাইল ক্যামেরায় একের পর এক ছবি তুলে চলেছি। দুটো পরিবারের  চারজন  দুটো কেবিনে চলে গেল, তৃতীয় কেবিনে তিনজন  মহিলা এবং চতুর্থ কেবিনে আমরা দুই বন্ধু। রাতটা বেশ গভীর  হয়েছে, বন্ধুও  বেশ  গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন আর আমারও  চোখটা একটু লেগে এসেছে। হঠাৎই  যেন মনে হল জাহাজটাকে যেন কেউ ধাক্কা দিয়ে ডাকছে আর বলছে  চল্, এবার  তো ভাসার পালা। এদিকে জাহাজের ও  এলানো   শরীরে ঘুমটা  বেশ জাঁকিয়ে  এসেছে কিন্তু আমি যেন সেই জলের  বার্তা পেলাম " অ্যাই  ওঠ,  ছবি তুলবি না?" আমার  শরীরটা ও যথেষ্ট ক্লান্ত কিন্তু আমি সেই ডাকের হাতছানি  উপেক্ষা  করতে পারলাম না। আস্তে আস্তে বন্ধুর ঘুম না ভাঙিয়ে  একাই নদীর  সঙ্গে প্রেমে মত্ত হলাম।  সোঁ সোঁ করে আওয়াজ  করে জলের  ঢেউ একের পর এক ধাক্কা দিচ্ছে জাহাজটাকে আর দুলে দুলে উঠছে  সেই জাহাজ  মানে আমাদের ফ্লোটেল। একের পর এক ফটো তুলে চলেছি আর তন্ময় হয়ে দেখছি গঙ্গার  রূপ গভীর  নিশীথ রাতে। ডান দিকে দেখছি হাওড়া ব্রিজ আর জেটির  আলো আর বাঁদিকে দেখছি দ্বিতীয় হুগলি ব্রিজের আলো আর মাঝখানে আমি রয়েছি জেগে এই অসাধারণ রূপ দেখার  আশায়।  কখনও কখনও একটা নৌকো লন্ঠন জ্বেলে চলছে মাছ ধরার  আশায়। নিকষ কালো অন্ধকারে সেই চলমান নৌকো এক ভৌতিক  আবেশ সৃষ্টি করেছে। দেখতে দেখতে অন্ধকার আস্তে আস্তে ফিকে হতে লাগল এবং ভোরের আলো ফুটে উঠল। কিন্তু সমস্ত  রাত্রির  জাগরণ শরীরে কোন ক্লান্তির  ছাপ ই ফেলতে পারেনি কারণ আনন্দটা যে পরিমাণ  উপভোগ করেছি তা ক্লান্তিকে  আসতে দেয়নি। কেবিনে থাকা চায়ের ব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে চাঙ্গা হয়ে সাতসকালেই হাঁটতে বেরিয়ে পড়লাম হাইকোর্ট পাড়ার গলিতে। ফিরে এসে স্নান করে দুর্দান্ত  ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম বাড়ির  দিকে। ফেরার  পথে এলগিন রোডে আমূলের এক দোকানে নানাধরণের আইসক্রিমের স্বাদ চেটেপুটে  নিয়ে সোজা বাড়ি।
অসাধারণ এই ফ্লোটেলে থাকার  অভিজ্ঞতা বিশেষ করে রাতের বেলায় গঙ্গার এই আকর্ষণীয় রূপ  চিরদিন  মনে রাখার মতো।

Thursday, 20 July 2023

পথ চলাতেই আনন্দ ( চার)

পরিকল্পনা করার পর কোন  জায়গায় যাওয়া হলে আনন্দ  অবশ্যই হয় কিন্তু হঠাৎই ঠিক করে বেরিয়ে পড়লে এবং তা যদি সব ঠিকঠাক মতো হয় তাহলে সেটার  একটা বিশেষ আনন্দ  আছে। একজন বাঁশির  পোঁ ধরল এবং বাকি সবাই তার  সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলল এবং সৃষ্টি হলো এক অপূর্ব সুরের মূর্ছনার ।

জুলাই মাসের  কেমন যেন  একটা আলাদাই  আকর্ষণ আছে। যতগুলো ছোট ট্রিপ হয়েছে সবই  এই জুলাই মাসে। একটা ঘরোয়া আসরে একটা ধুয়ো  উঠল যে ঝাড়গ্রামে গেলে কেমন হয়? হাত পা ঝাড়া চারটে পরিবারের নয়জন  সদস্য একযোগে হ্যাঁ হ্যাঁ করে সমস্বরে বলে উঠল। অতএব যাওয়া এবং অবশ্যই তার ভার আমাদের অর্জুনের উপর চাপলো এবং নিখুঁত  পরিকল্পনার জোরে যাওয়া ঠিক  হলো। সকাল  সাতটায়  একটা তের সিটারের গাড়িতে যাত্রা শুরু হলো। দুই পরিবারের পাঁচজন পাশাপাশি থাকায় সময়ের  খানিকটা সাশ্রয় হলো এবং বাকি দুই পরিবারের চারজনকে তাদের  বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাত্রা শুরু।  এই অল্প সময়ের মধ্যেই কে কি সঙ্গে নেবে তা ঠিক  হয়ে গেছে এবং ড্রাইভার সমেত দশজনের জন্য বিভিন্ন উপকরণ নেওয়া হয়েছে। কেউ নিয়েছে পরোটা তো কেউ করেছে ঘুগনি ও মালপোয়া এবং কেউ  নিয়েছে কেক। এছাড়াও  রয়েছে নানাধরণের বিস্কুট,  চকোলেট।  কি করে বাদ যায় মুড়ি,চানাচুর এবং তার সঙ্গতকারী পেঁয়াজ,  কাঁচালঙ্কা এবং ধনেপাতা ও আচাড়ের তেল?
ঘ বুড়োবুড়িগুলো যেন ফিরে গেছে তাদের  কৈশোরে। একমাত্র  কচিকাঁচা  হচ্ছে ড্রাইভার যে গাড়ি চালানোর  ফাঁকে ফাঁকে কাটছে ফোড়ন। দার্জিলিঙের চা নেওয়া হয়েছে ফ্লাস্কে,  সুতরাং পুরোপুরি আসর জমজমাট। কোন  বুড়ো আবার  বায়না ধরেছে সিঙারার  এবং মিষ্টির দোকানের জন্য বিখ্যাত কলকাতার বিভিন্ন নামী দোকানের  সামনে দিয়ে গাড়ি যাওয়া মাত্রই  সেই বুড়ো হাঁ হাঁ করে উঠছে গাড়ি থামানোর জন্য  কিন্তু বাকি বুড়োবুড়িদের কড়া নির্দেশ অমান্য  করার  সাহস ছোকরা ড্রাইভার আর দেখাচ্ছে না।

সাড়ে বারোট নাগাদ  পৌঁছলাম  ঝাড়গ্রামের রাজবাড়ি। রাজবাড়ির লাগোয়া সরকার পরিচালিত  ট্যুরিস্ট লজ। কিন্তু সেখানে না থেকে দুটো দিন রাজবাড়ির অতিথি হয়ে একটু রাজারা কেমন থাকে তার একটু গন্ধ পাওয়ার চেষ্টা। এক বন্ধুকে জানানো মাত্র ও বলে উঠল কিরে ফিরে এসে আমাদের মতন প্রজাদের সঙ্গে যোগাযোগ  রাখবি তো? মনে মনে একটু গর্ব হচ্ছিল  যে আমরাও  দিন এনে দিন খেয়ে রাজা হতে পারি। প্রশস্ত  বারান্দায় সোফাতে বসতেই চোখটা একটু লেগে এল। ওরে বাবা, আমার মাথায় কে যেন একটা  পাগড়ি বেঁধে দিচ্ছে। গায়ের পাঞ্জাবিটাও কেমন যেন মখমলের  মতো। পায়ে হীরে,  মণিমুক্তো খচিত নাগরাই জুতো। একি,  কোমরের  বাঁদিকে বাঁকা মতন  কি যেন একটা জিনিস।  ওরে বাবা এ যে খাপে ভরা তলোয়ার।  হাতে তালি দিতেই আশপাশ থেকে ছুটে এল দাসী বান্দাদের দল। চোখ কচলাচ্ছি,  গায়ে চিমটি কাটছি কিন্তু তারা আমার  হুকুম  তামিল  করার  জন্য  আছে দাঁড়িয়ে। কি বলব তাদের  ঠিক করতে পারছিনা। হঠাৎই  গায়ে ধাক্কা পড়ল , দিবাস্বপ্ন গেল ভেঙে। মনে মনে বললাম,  চাই না মা গো রাজা হতে। কিন্তু ঘোর তখনও কাটেনি। মাথায় হাত দিয়ে দেখছি শুধুই চুল। গায়ে অবশ্যই পাঞ্জাবি কিন্তু বাঁদিকে তলোয়ারের জায়গায় রয়েছে বড় মুঠোফোন।  আমি আমিতেই আছি। যাক বাবা বাঁচা গেল। সবসময়ই নিজের কাজ নিজে করতে যে অভ্যস্ত তাকে হঠাৎ যদি দাসী বাঁদী পরিবৃত  হয়ে থাকতে হয়  তাহলে যে কি জ্বালা হয়  সেটা  হাড়ে হাড়ে টের পেলাম  ছোট্ট স্বপ্নের মাধ্যমে।

ম্যানেজারের  পদবী বোধ হয় "জানা" আর ভীষণই রাজভক্ত। রাজাদের  অবস্থা তথৈবচ  হলেও এই বান্দাদের কথায় কথায় রাজাসাহেব আর রাণীমার  উল্লেখ তার প্রভুভক্তির পরিচয় দিচ্ছিল। এই যে মাছটা  খাচ্ছেন , ওটা ঐ দুধপুকুরের মাছ। আপনাদের জন্য ই ধরিয়েছি স্যার।  বিরাট  কাতলা স্যার,  মাছটা  কেমন  লাগছে স্যার? সত্যিই টাটকা মাছ যদি চালানি  না হয় , বরফ না পড়ে, তার স্বাদ তো ভাল হবেই-- সে রাজবাড়ির পুকুরের হোক বা পাঁচু জেলের পুকুরেরই হোক। এই যে  পনীরটা খাচ্ছেন  না স্যার,  এটা রাজবাড়ির গরুর দুধের।  কি নরম, বলুন  না স্যার ।হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক  বলেছেন। বম্বেতে পাঞ্জাব ডেয়ারির পনীরের  কথা মনে পড়ছিল। কিন্তু লোকটার  এত রাজভক্তি দেখে বুঝতে পারিনি যে ব্যাটা আমাদের জবাই করার  ধান্দা করছে। শুক্তো , মুসুরির ডাল , পোস্তর বড়া, পনীরের ডালনা আর রাজবাড়ির কাতলাতে  সম্পন্ন  হলো  দিনের ভূরিভোজ। এরপর দিবানিদ্রায় চেষ্টা করলাম সেই সুখের স্বপ্ন দেখার কিন্তু ততক্ষণে নিজের ওজন টা বুঝে গেছি এবং হাজার চেষ্টাতেও  সেই স্বপ্ন আর দেখা হলোনা। সুন্দর রাজবাড়ি, সামনে বিশাল  দুটো  গেট, সেইখানে গেঞ্জি পরে দারোয়ান আছে। বেমক্কা  ঢোকা নিষেধ। অযাচিত ভাবে প্রবেশ করলে আছে জরিমানার  বিধান,  মানে রাজাদের  যা যা থাকা প্রয়োজন  তা সবই আছে কিন্তু পেয়াদা বা বরকন্দাজের সেই পেল্লাই  গোঁফ নেই বা নেই তাদের হাতে বর্শা  বা  মাথাটা পিতলে মোড়া তেল চুকচুকে  লাঠি। রাজবাড়ির  দোতলায় থাকেন  বর্তমানের রাজা রানী,  একতলায় করেছেন গেস্ট হাউস। দক্ষিণ দিকে রয়েছে রিসেপশন । রয়েছে নানাধরণের  গাছ , রয়েছে নার্সারি। রাজবাড়ির প্রাঙ্গনে রয়েছে ফোয়ারা আর একদিকে রয়েছে বিশেষ  অতিথিশালা যেখানে কোন নেতামন্ত্রীরা এলে অবস্থান  করেন। নেতা মন্ত্রীরা তো আর যে সে লোক নন। ভোটের  আগে করজোড়ে  তাঁরা ভোট ভিক্ষা করেন আর একবার  নির্বাচিত  হয়ে  গেলেই ভো কাট্টা পাঁচবছরের জন্য।  আজকাল  আবার  করজোড়ে ভোট ভিক্ষাও  উঠে গেছে। কিছু দাপুটে দামাল  ছেলেদের জোগাড় করো , সংবৎসর  তাদের  মদমাংসের বন্দোবস্ত করো আর ভোটের সময় তাদের  লেলিয়ে  দাও যাতে অন্যমতের কোন লোক ভোট না দিতে পারে । সরকারী চাকুরেরা কথা শুনতে বাধ্য নাহলে বদলি করে দাও। আই অ্যাম ইয়োর  সার্ভেন্ট এবং ইন্ডিয়ান পেট সার্ভিস বলে দুটো  শ্রেণী আছে যারা  ভীষণ  কঠিন  পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচিত  হয় এবং আনুগত্য  সংবিধানের প্রতি না রেখে শাসকদলের চাটুকারে  পরিণত হয়। সবার  সহযোগীতায়  এই দাম্ভিক নেতাগুলো  আবার  ফিরে আসেন  এবং যত সাদা জামাকাপড় এঁরা পড়েন ততই মলিন  এঁদের  ভিতরটা। 
রাজবাড়ির প্রশস্ত  বারান্দায় রয়েছে রাজা, রানীর ছবি এবং রয়েছে চুয়াল্লিশ সালে ভাইসরয় প্রদত্ত জমিদার থেকে রাজা হবার  সনদপত্র। প্রত্যেক ঘরেই রয়েছে রাজা রানীর ছবি এবং নানাধরণের  পেন্টিং। সাবেকি আমলের  দরজা, জানলা যেমন আর পাঁচটা জমিদার বা রাজবাড়িতে হয়। আসবাবপত্র ও আগের দিনের মতো। বাথরুমগুলো যথেষ্ট বড়, ঘরের  সঙ্গে মানানসই। মহিলারা বিরাট খাটে বসে হাউসি  খেলছেন এবং এক বৌদি অসম্ভব  ভাগ্যশালী, বারবার  তিনিই  জেতেন। অন্য বৌদিদের  নিদান দেওয়া হলো যখন  উনি ঘুমাবেন তখন তাঁর কপালে নিজেদের কপাল ঘষে নিতে। তাতে কিছুটা হলেও  ভাগ্যের  পরিবর্তন হতে পারে। বিকেল গড়িয়ে আসছে,  সবাইকে  তাড়া দিয়ে বের করা হলো শহরের  আশেপাশের জায়গাগুলো দেখার জন্য। রাজবাড়িটা শহরের  একটু বাইরে। বাজার,  দোকান সবই আছে যেমন একটা মফস্বলের শহরে  থাকে। চোখে পড়ল গোটা দুয়েক শপিং মল।জেলার  সদর দফতর হওয়াতে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে শহরটা। শহরের  একটা মোড়ে আছে  সাবিত্রী মন্দির।  মন্দির চত্বরের বাইরে গাড়ি  রেখে দেখি মন্দির বন্ধ।  অনেক  পুণ্যার্থী বসে আছে দর্শনের জন্য,  আমরাও সামিল হলাম তাদের সঙ্গে। কথিত আছে যে রাজস্থানের সামন্তরাজা  সর্বেশ্বর সিং পুরীতে জগন্নাথ দর্শন করে ফেরার পথে এই জঙ্গল মহলে অবস্থান করেন এবং স্থানীয় মালরাজাকে পরাস্ত করে মল্লদেব উপাধি গ্রহণ করেন। পরে স্বপ্নাদেশ পেয়ে এখানে এই পাথরের  মন্দির স্থাপন করেন  এবং প্রায় তিনশ পঞ্চাশ বছর ধরে অত্যন্ত  নিষ্ঠার সঙ্গে সাবিত্রী দেবী রূপে পূজিত হয়ে আসছেন। রাজা সর্বেশ্বর সিং এই মন্দিরের পাশে একটা বিরাট পুকুর খনন করা কালীন বহু পুরাতাত্ত্বিক জিনিস পাওয়া যায় এবং ইতিহাসে এক নতুন  অধ্যায়ের সংযোজন করে। কিছুক্ষণ পরেই পুরোহিতের আগমন হলো এবং আমরাও  দেবীমাতা সাবিত্রী দর্শন করে রাজবাড়িতে ফিরে এলাম। রাতে খাওয়া সেরে মেয়েদের  আর একপ্রস্থ হাউসি খেলা এবং যথারীতি হাসিঠাট্টায় বুড়োবুড়িদের দিন শেষ। পরেরদিন  ব্রেকফাস্ট করে গাড়ি নিয়ে বেলপাহাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। দুপাশে বিস্তীর্ণ শালবনের অপূর্ব  নয়নাভিরাম দৃশ্য। এখানে ওখানে সি আর পি এফের ক্যাম্প চোখে পড়ল অনেকটাই কাবাব মে হাড্ডির মতো। কিন্তু  না থাকলেও উপায় নেই। জঙ্গল মহলে রাজত্ব করে সন্ত্রাসবাদীরা বিভিন্ন  রাজনৈতিক দলের  মদতে। কোন সময় রেলের লাইন উপড়ে দিয়ে বিধ্বংসী দুর্ঘটনা ঘটানো এবং  কাজ শেষ   হলেই তাকে এনকাউন্টার করে মেরে ফেলে প্রমাণ লোপাট করে দেওয়া। আবার  নতুন একজন সন্ত্রাসবাদী তৈরী করা। সুতরাং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্যই  এই আধাসামরিক সুরক্ষাবলের উপস্থিতি। কিন্তু রাজনীতির পাশা পালটালে আবার  কি চেহারা হবে সেটা ভাবার  বিষয়। যাই হোক, বেলপাহাড়ি ছাড়িয়ে যাত্রা শুরু হলো তারাফেণী ব্যারেজ এবং ঘাগরা ঝর্ণার  দিকে। খুব কিছু বড় নয় তারাফেণী ব্যারেজ কিন্তু মন্দের ভাল।  কিন্তু ঘাগরায় ঝর্ণার  সেরকম  মেজাজ  কিছুই  দেখা  গেলনা ঐখানে পিকনিক  স্পট ছাড়া। অবশেষে বেলা গড়ার আগেই ফিরে আসা। পরদিন  চলে আসতে হবে। ব্রেকফাস্ট সেরে সমস্ত  মালপত্র  একটা ঘরে রেখে দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম চিল্কিগড়ের রাজবাড়ি ও কনকদূর্গা মন্দির দর্শনের উদ্দেশ্যে এবং ফেরার  পথে মিউজিয়াম দেখা। কিন্তু ইতিমধ্যেই  আমাদের  একজনের  বাড়ির  চাবিসমেত মানিব্যাগ না পাওয়ায়  তড়িঘড়ি ফিরে আসতে হলো মিউজিয়াম  বা রাজবাড়ি না দেখেই।  ফিরে এসে ব্যাগ পাওয়া গেলেও আবার  নতুন করে বেড়ানোর মানসিকতা হারিয়ে গেল। অতএব,  কিছুক্ষণ  অপেক্ষা করে রাজবাড়ির  বিশেষ  কচিপাঁঠার ঝোলে মধ্যাহ্নভোজন সেরে ফিরে আসা। এই প্রসঙ্গে গেস্ট হাউসের  ম্যানেজার" জানা" সম্বন্ধে আরও  একবার  না বললেই  নয়। রাজভক্তির এক বিশেষ  নমুনা এই জানাবাবু। কথায় কথায় রাজাসাহেব বা রাণীমা না বললে বোধহয় ভদ্রলোকের ভাত হজমই হবেনা। যাই হোক,  আজকের  দিনেও  এইরকম  প্রভুভক্তি এক বিরল নিদর্শন।  অবশেষে এই বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের পরস্পরের  প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আনন্দ  উপভোগ করা  এক অতীব আনন্দের  কথা। আমাদের  ছেলেমেয়েদের  কর্মসূত্রে বাইরে থাকতেই হবে। সুতরাং সমমনস্ক কয়েকটি পরিবারের এই যৌথ ভ্রমণ আমাদের  একাকীত্ব অনেকটাই দূর করতে পারে।

Thursday, 13 July 2023

রামকেষ্টর উইল

খুবই সাদাসিধে মানুষ  রামকেষ্ট।  একটা পুরোন সাইকেল  করে সে এদিক সেদিক  চষে নানাধরণের কাজকর্ম করে এবং তা দিয়েই মোটামুটিভাবে সংসারটা চালিয়ে নেয়। মাঝেমধ্যেই  যে একটু আধটু ধার বাকি হয়না তা নয়, কিন্তু টাকা পাওয়ামাত্র আগে দেনা মিটিয়ে বাড়ি আসবে। অভাব অনটনই তো সংসারে ঝগড়াঝাঁটির মূল কারণ  কিন্তু তার বৌ যখন  রাগে গনর গনর করে তখন  চুপ করে থাকে বেচারার মতো। খানিকটা রাগ পড়লে বলবে এক কাপ চায়ের কথা আর তাতেই একপ্রস্থ ঝাঁঝালো আওয়াজ । মুখ পাঁশুটে করে ঘরে চলে যায় রামকেষ্ট।  এবার নিভার একটু মনঃকষ্টের পালা। দুধ নেই, চিনি নেই একটু জল গরম করে চা পাতা দিয়ে কোনরকম  একটু চায়ের রঙধরা  জল এগিয়ে দিয়ে আসে। আর তাতেই কি খুশি রামকেষ্ট।  চা খেয়ে একটু ধাতস্থ  হয়ে  স্নান করে ভাত খেয়েই একটু ঘুম আর তারপরেই সেই ঠা ঠা রোদে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়া লোকের  কাছে টাকা আদায়ের জন্য। এই হচ্ছে রামকেষ্টর রোজকার কাজ, কি শীত,কি গ্রীষ্ম বা কি বর্ষা। গরমকালে লু  বইছে, ঘাড়ের  কাছে একটা তোয়ালে রুমাল  দিয়ে কলারটা যাতে নোংরা না হয় তার দিকে খেয়াল রাখা কিন্তু ঘামে সর্বাঙ্গ ভিজে গেলেও উপায় নেই, সেই ঘাম শরীরেই  শুকায় আবার  নতুন  করে ভিজে ওঠে। একটা চিরাচরিত প্রথা আছে, কেউ ধারের টাকা  একবারে মেটায় না, তিন চারবার ঘুরিয়ে তবেই  দেবে তাও হয়তো পুরোটা নয়। কিন্তু উপায় নেই, সকালে স্কুলে পড়ানোর পরেও তাকে এই কাজটা করতেই হয় বাড়তি রোজগার করার জন্য নাহলে এতগুলো লোকের  মুখে দুমুঠো  কি করে জোগাবে? স্কুলে পড়ানোর সুবাদে একটা সুবিধা অবশ্যই ছিল,  লোকে মাস্টার জী বলে সম্বোধন করত সে টাকা মেটাক বা না ই মেটাক।  সামনাসামনি গালাগালি দিয়ে কেউ অন্তত কোনদিন  কথা বলেনি । কিন্তু পিছনে কেউ  অন্য রকম কিছু বলবেনা তার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না।

এইরকম অবস্থা কিন্তু বরাবর ছিলনা তার। মহা ঠাটবাটে তার দিন চলছিল। পড়াশোনা চলছিল  শ্রীরামপুর কলেজে। একদিন কলেজে বাইবেল  ক্লাস চলাকালীন  অন্য একজন ছাত্র কিছু একটা কথা বলায়  শিক্ষক সাহেব সেই ছাত্রকে নিদারুণ ভাবে প্রহার করেন।  প্রহারের মাত্রাটা একটু  বেশিই হয়ে যাওয়ায় রামকেষ্ট এবং তার  তিনবন্ধু মিলিত ভাবে প্রতিবাদ  করে । তখন  বৃটিশ জমানা,  কয়েকজন নেটিভ ছাত্র সাহেব অধ্যাপকের কাজের  প্রতিবাদ  করবে এটা একদমই  আশা করা যায়না। সুতরাং করা হলো তাদের  বহিষ্কার। আবার  প্রতিবাদ শুরু হলো। বাইবেল  ক্লাসে  কথা বলা অপরাধ কিন্তু ঐ ছাত্রটিকে যেভাবে মারা হয়েছে সেটা একটু বাড়াবাড়ি পর্যায়ের।  কলেজের অধ্যক্ষ ডেকে পাঠালেন ছাত্র এবং শিক্ষককে আলাদা আলাদাভাবে। শিক্ষক  অধ্যক্ষকে জানান  যে ঐ ছাত্ররা তাঁকে মেরেছে।  অধ্যক্ষ ও ছিলেন বৃটিশ,  সুতরাং কোন কথা নয়, তাদের সবাইকেই  রাস্টিকেট করা হলো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তখন  শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর কাছে আর্জি জানালেন ঐ চার ছাত্র এবং তাদের অভিভাবকেরা এবং  সাহেবের মিথ্যে কথা তাঁর  কানে তুললেন।  উনি বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন এবং সব শুনে বুঝতে পারলেন  যে সাহেব অধ্যাপক মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন।  যাই হোক, একটা সমাধান সূত্র তিনি বের করলেন।  উনি বললেন  যে তোমাদের  রাস্টিকেট করা হচ্ছে না কিন্তু তোমরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য কোন কলেজ থেকে  প্রথম বর্ষ থেকে পড়তে পারবে। রাস্টিকেট হলে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কলেজেই  পড়তে পারতো না। তখন তারা ছিল  তৃতীয় বর্ষের ছাত্র,  সুতরাং তাদের  তিনটে বছর  নষ্ট  হলো। রামকেষ্টর বাবা, ঠাকুর্দারা সব বড় বড় সরকারী চাকরি করতেন,  সুতরাং তাঁরা আর জিনিসটাকে  বেশী গুরুত্ব দিলেন না। তখনকার দিনে শ্রীরামপুরে থেকে ভবানীপুরে চুল কাটতে আসাটা একটু বাড়াবাড়িই ছিল। পাশ করেই রেলে একটা চাকরি, তারপরেই বিয়ে রামকেষ্টকে আর পায় কে? কিন্তু বলেনা, মাথা  যাদের গরম তাদের  হঠকারিতার ফল অবশ্যই  আসে। একদিন  দুম করে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে চাকরিতেই  দিল ইস্তফা।  ছিল বাবার পয়সা, নেমে গেল ব্যবসায়। কিন্তু  সহজ  সরল লোকের দ্বারা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া  সহজ কথা নয়। সুতরাং, যা হবার  তাই হলো। প্রচুর টাকা লোকসান হল সেখানে। বড় বড় ব্যবসাদাররা ধারে জিনিস নিয়ে আর টাকা দেয়না, আজ দেবো কাল দেবো করে ব্যবসাটাকেই  লাটে  ওঠালো। গোদের উপর বিষফোড়া হল ব্যাঙের  ছাতার মত গজিয়ে ওঠা ব্যাঙ্কের  লালবাতি জ্বলা।  সুতরাং ইমারতের  ইট খসা  শুরু হলো। এরপর  একের পর এক ব্যবসা শুরু করল এবং যথারীতি মুখ  থুবড়ে পড়া। এককথায় রামকেষ্টর  সুদিন এবং দুর্দিন দুইই খুব কাছ থেকে দেখা। বহু অভিজ্ঞতা  সমৃদ্ধ রামকেষ্ট কিন্তু নিজে আদ্যোপান্ত সৎ এবং কঠোর পরিশ্রমী  আর সেই কারণেই ঐ অত্যন্ত  দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা থেকেও মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা একটা আদর্শ  উদাহরণ। 

কোন কোন মানুষ  ভাগ্যের সহায়তায় এবং পরিশ্রমের দ্বারা অনেক  উঁচু জায়গায় তার স্থান  করে নেয়। আবার  কিছু কিছু লোক অত্যন্ত সৎ এবং পরিশ্রমী হওয়া সত্ত্বেও দুর্ভাগা হবার জন্য একটু এগিয়েই থেমে যায়। যদি কোন  লোককে পাথর ভেঙে, জঙ্গল সাফ করে রাস্তা তৈরী করে এগোতে হয় তাতে তার পরিশ্রমের বেশিরভাগটাই ঐ কাজে চলে যায় এবং তার পক্ষে আর বেশী দূর এগোনো সম্ভব হয়না। রামকেষ্টর  ক্ষেত্রেও  তা ব্যতিক্রম নয়। রিটায়ার করার  একমাস পরেই পরিশ্রমী রামকেষ্ট একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ল এবং সেটাই তার অন্তিম যাত্রা। জীবনের  বেশিরভাগ সময়টাই তার সংগ্রাম  করে কেটেছে , সুতরাং বুড়িয়ে  যাওয়াটাই স্বাভাবিক। একটা মেয়ের বিয়ে বাড়ির কাছেই হয়েছিল এবং তাকে খুব  ভালবাসতো রামকেষ্ট।  শরীরটা  বিশেষ ভাল  যাচ্ছেনা কিছুদিন ধরে। একদিন রামকেষ্ট বাড়ি ফেরার  পথে তার মেয়ের বাড়ি এসে একটা বন্ধ করা খাম তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, " এই খামটা তোমার কাছে রাখো এবং এটা আমার মারা যাবার পরেই খুলবে।" মেয়েও  তার  বিশ্বাসের অমর্যাদা করেনি। হঠাৎই  একদিন  অসুস্থ  হয়ে পড়ল সে যখন  তার পাশে স্ত্রী, ছেলে বা বৌমা কেউ ই নেই। একা বাড়িতে, কি করে খবর দেবে মেয়েকে বুঝে পাচ্ছেনা।  হঠাৎই  বাড়ির  সামনে দিয়ে যাওয়া পাড়ার ই একজন লক্ষ্য  করল রামকেষ্টর অবস্থা এবং সঙ্গে সঙ্গেই মেয়ের বাড়িতে খবর দিল এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করল। বাড়ির কাছেই  গঙ্গার ধারে হাসপাতালে ভর্তি হল রামকেষ্ট।  এরপর  খবর দিল  তার  ছোটছেলেকে কিন্তু মানুষ যখন অন্তিম যাত্রা শুরু করে তখন  পৃথিবীর  কোন  শক্তির  ক্ষমতা নেই তাকে প্রতিহত করে। রামকেষ্ট ও চলে গেলেন কয়েকদিন হাসপাতালে থেকে। ছোটছেলেও খুবই  প্রিয় ছিল  রামকেষ্টর এবং প্রায় বন্ধুর মতো আচরণ ছিল তাদের মধ্যে। কিন্তু কোমায় চলে যাওয়া রামকেষ্ট  আর বিশেষ কিছুই  বলতে পারল না তার প্রিয় সন্তান  এবং বন্ধুকে। চলে গেলেন  রামকেষ্ট এবং তাঁর মেয়ে  যথারীতি খামটা এনে ভাইয়ের  হাতে দিল।খাম খুলে এক অপার  বিস্ময়। একটা ছোট্ট  চিঠি আর সঙ্গে আরও  একটা ছোট্ট  খাম। দিদিই  চিঠিটা পড়ল। ছোট্ট  কয়েক লাইনের।  আমি আমার  স্ত্রী, ছেলেমেয়েদের জন্য  কোনও  সুখ দিতে পারিনি যার জন্য  আমি অত্যন্ত দুঃখিত।  সেই কারণেই  আমার  মৃত্যুর পর আমার  ছেলেমেয়েদের  কাঁধে কোনরকম  বোঝা  চাপাতে চাইনা। ছোট্ট  খামে রাখা আছে মাত্র  একশ বারো টাকা। ঐ টাকা দিয়ে আমার জন্য  তিলকাঞ্চন শ্রাদ্ধ এবং সম্ভব হলে বারোজন ব্রাহ্মণকে অন্তত ডাল ভাত খাওয়াবে।  কারও জন্য  কিছু না করতে পারার জন্য  আমাকে ক্ষমা কোর। জানিনা আশীর্বাদ  করার যোগ্যতা আমার  আছে কি না তবুও  জানাই তোমাদের প্রতি আশীর্বাদ।  এবার  আমি আসি।
সবার চোখে জল কিন্তু কারও মুখে নেই কোন কথা।  সবার মুখেই এক কথা, রামকেষ্ট  একজন অত্যন্ত সৎ এবং ভদ্রলোক  ছিলেন। তাঁর আত্মার  শান্তি হোক।