Friday, 24 November 2023

হলুদ বসন্ত

জীবন সায়াহ্নে পৌঁছানো মধুকর বাবু ও তাঁর  স্ত্রীর বেশিরভাগ সময়ই কাটে গাড়ি বারান্দার ওপরের ছাদে। দুই বুড়োবুড়ির কথোপকথন সেই একই ব্যাপারে সীমিত। কেউ না কেউ তো একজন হয়ে যাবে, তখন কি করে সময় কাটাবে অন্যজন। সবাই  তো আর  বিপিন রাওয়াতের মতো ভাগ্যবান নন যে একইসঙ্গে দুজনে বিদায় নিলেন  এই সুন্দর পৃথিবী থেকে। আরও অনেক ভাগ্যবান  আছেন যাঁরা কোন না কোন ভাবে একইসঙ্গে বিদায় নিয়েছেন যাঁদের কথা আমরা জানিনা। 
মধুকরের স্ত্রী রীনা খুবই  চিন্তিত  যে উনি যদি আগে চলে যান তাহলে মধুকরের কি হবে। মধুকর খুবই জেদি ধরণের মানুষ, কোনভাবে কারো সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারেন না। ভীষণ একবগ্গা টাইপের মানুষ প্রথম থেকেই। কেবলই নিজের মতামত অন্যের উপর চাপিয়েই ছিল  তাঁর আনন্দ।  সুতরাং বুঝতে কোন অসুবিধা হবার কথাই নয়। মেয়েরা তো সর্বংসহা, জলের  মতো, যে পাত্রেই রাখা যাক না কেন  সেই জায়গাতেই মানিয়ে নেয় কিন্তু যাঁরা একটুও  নমনীয় নন তাঁদের  তো মহা বিপদ। সেইজন্য রীনা রোজ পূজোর  সময় ঠাকুরের কাছে তাঁর মনের কথা ভক্তিভরে বলেন। কিন্তু নিয়তির লিখন অন্যরকম। হঠাৎই একদিন সবাইকে ভাসিয়ে রীনা চলে গেলেন। মধুকরের চোখের জল কেমন যেন শুকিয়ে গেছে। নিথর হয়ে বসে আছেন  তাঁর নিজের  জায়গায়, একদৃষ্টে চেয়ে আছেন  রীনার চেয়ারের দিকে। শববাহী গাড়ি এসে গেছে রীনার নিথর দেহটাকে নিয়ে যেতে। ছেলে মেয়ে বৌমা ও জামাই সবাই  বলছে মধুকরকে একবার  আসার জন্য  কিন্তু ভ্রূক্ষেপ নেই মধুকরের।  কারো দিকে ফিরেও তাকাচ্ছেন না তিনি। সবাই খুব  অস্বস্তিতে পড়ে গেছে, অন্তত একবারের জন্য  তো তাঁর  আসা দরকার। নাতি, নাতনিরা কেউ আসতে পারেনি রীনার  হঠাত প্রয়াণে। সুতরাং তাদের  আবদারেও  অন্তত  সাড়া দেবার অবকাশ  নেই।

মধুকর ছিলেন  অত্যন্ত  ছাপোষা মানুষ,  বিরাট চাহিদা তাঁর কোনদিনই  ছিলনা। শৈশবের কঠিন  সংগ্রাম এবং দায়িত্ব বোধ তাঁকে কোনদিনই বিরাট স্বাচ্ছল্যের হাতছানি দেয়নি আর পাঁচজনের মতন। জীবনে  চাহিদা যাদের  কম তাদের কষ্ট ও কম। কারও  কাছে হাত পাতার দরকার হয়না, নিজের কষ্ট নিজেই   হজম করতে শেখে তারা। সুতরাং একরোখা হবার এটা একটা কারণ হতে পারে। কি ছেলে, কি মেয়ে বা বন্ধুবান্ধব কারও  কাছেই  মাথা নোয়াতে  রাজি নয় তারা। মাঝেমধ্যেই  মনে হয়  যেন  একটু বেশিই অসামাজিক।  কিন্তু কে কি ভাবে তাতে তাদের  বিন্দুমাত্র  আগ্রহ  নেই। অনেকটা সেই আপনারে দিয়ে রচিলি রে কি এ , আপনারই আবরণ এর মতো। রিটায়ার করার পর পাওয়া টাকা দিয়ে একটা বড় ফ্রিজ ও ওয়াশিং মেশিন কিনেছেন যাতে  রোজ বাজার যাওয়ার ঝামেলা না থাকে বা কাপড়চোপড় কাচার  ঝামেলাও  বেশি না থাকে। আজকাল  কাজের  লোকের কথায় কথায় কামাই যাতে খুব  অসুবিধার সৃষ্টি না করে। কিন্তু ওয়াশিং মেশিন খুব  কম সময়ই ব্যবহার  হয়। ফ্রিজ কিন্তু বেশ ভালোই চলছে মধুকরের অবস্থার  কথা ভেবে অবশ্য মাঝে মধ্যে তেল সাবানের দরকার তো হয়ই।  এইভাবেই  বেশ চলছিল কিন্তু বাদ সাধল  মেয়ের আবদার। ঐ বুড়ো ফ্রিজটাকে এবার বাতিল  না করলেই  নয়। বুড়ো হলেই তো তার কদর কমে যায় সে মানুষ ই হোক  আর অন্য  যে কোন  জিনিস  হোক  না কেন। একদিন  ছিলে তুমি ঝকঝকে , ছিল তোমার কদর, কত প্রশংসাই না হতো তোমার কিন্তু আজ তুমি তোমার গ্ল্যামার হারিয়েছ,  জায়গা ছেড়ে দাও নতুনকে।  এটাই  তো জগতের  নিয়ম। অতএব প্রকৃতির নিয়মে তোমার জায়গায় এসে যাবে নতুন।  পুরোন চেহারাটাকে নিয়ে বদলে দেবে নতুন চেহারা। কিন্তু এই পৃথিবীতে অনেক লোক আছে যারা পুরোন কে ফেলতে ইতস্তত  করে, তাদেরই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায় কারণ তাদের বদ্ধমূল  ধারণা এদের  এখনও  অনেক কিছুই  দেবার  আছে। কিন্তু না, তারা অত্যন্ত  সংখ্যালঘু, অতএব ফেলে দাও সেই পুরাতনে। 
অনেক  সময় চলে গেছে।  শববাহী যানের  লোকজন  একটু বেশিই  অধৈর্য হয়ে পড়েছে। তাদের  আবার  অন্য জায়গায় যেতে হবে। ছেলে এসে মধুকরের পাশে এসে বলল, " বাবা, একবার  এস, মাকে শেষবারের  মতন বিদায় দাও।" কিন্তু কোন  সাড়া নেই । গায়ে হাত দিয়ে একটু ধাক্কা দিতেই চেয়ার থেকে পড়ে গেলেন  মধুকর,  নিথর নিস্তব্ধ  দেহ। রীনার  প্রার্থনা শেষমেশ ভগবান মঞ্জুর করলেন। 

Monday, 23 October 2023

শারদোৎসবে ইতিহাসের খোঁজে

শারদীয় আর্ট গ্যালারি পরিক্রমা তো বিভিন্ন সংস্থা বা বিভিন্ন  লোকের ব্যক্ত করেছেন কিন্তু কোন কোন পূজোর  পিছনে হয়তো বা কিছু ইতিহাস  লুকিয়ে থাকে যেটা সবসময় বিরাট  কিছু না হলে লোকের  অজ্ঞানতায়ই  থেকে যায়। সেইরকম ই একটা ছোট্ট ইতিহাস মিশ্রিত কাহিনীর অবতারণার  প্রচেষ্টা মাত্র।
ভীম বেশ কিছুদিন যাবত ই অন্য পাণ্ডবদের থেকে আলাদা থাকতে বাধ্য  হয়েছে নানান কারণে। এর আগে জানাই এর রাজবাড়ির পূজোতেও  ভীম ও ভালান্দ্রা অন্যত্র  ব্যস্ত থাকায় আসতে পারেনি। অর্জুনের  পরিকল্পিত জয়নগরের কাছে বহড়ু গ্রামে এক পারিবারিক পূজোয় যাওয়ার  কথা হলো। অর্জুনের ই এক প্রাক্তন  সহকর্মী মাণিক ব্যানার্জি তার সমস্ত  বন্দোবস্ত করলেন মানে অষ্টমী পূজোয় অঞ্জলি দেওয়া থেকে ভোগ খাওয়া এবং সেই বিখ্যাত  বহড়ু গ্রাম পরিদর্শন করানো।

বহড়ু গ্রাম সম্বন্ধে একটু ছোট্ট  পরিচয় করানো দরকার। এটি জয়নগরের একটু আগে অবস্থিত এবং খুবই  বর্ধিষ্ণু গ্রাম। এইখানেই  প্রখ্যাত গায়ক হেমন্ত মুখার্জির পূর্বপুরুষেরা থাকতেন।  যাওয়া আসা ছিল তাঁরও। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে নিজের  গ্রামে এসেছিলেন  এবং শুধু হারমোনিয়ম  নিয়ে একটিই  গান করেছিলেন, " দিনের  শেষে, ঘুমের দেশে ঘোমটা পড়া ঐ ছায়া" আর তার পরেই ফিরে এসে চিরতরে ঘুমের  দেশে পাড়ি দেওয়া। বিরাট  বাড়ির  আর কিছুই  অবশিষ্ট  নেই সবই হয়ে গেছে বেদখল  কিন্তু দখলকারীদের একটা বিষয়ে অবশ্যই  ধন্যবাদ দিতে হবে। তাঁরা প্রয়াত  শিল্পীর একটা স্ট্যাচু বানিয়ে দিয়েছে এবং গলায় আছে অবশ্যই একটা টাটকা গাঁদা ফুলের  মালা। এটুকু না করলে তো মান সম্মান  কিছুই  থাকেনা। যাই হোক, অনতিদূরে প্রয়াত শিল্পী সমিত  ভঞ্জদের  পৈতৃক বাড়ি। তাঁদের  একটা নাটমন্দির ছিল যেখানে এক অষ্টধাতুর  মূর্তি ছিল। মানুষের  লোভের  তো শেষ  নেই, সেই অষ্টধাতুর মূর্তি তিন তিনবার  চুরি হয় এবং ভগবানের  আশীর্বাদে তিনবার ই তা উদ্ধার  হয় কিন্তু দুর্ভাগ্য বশত তাঁকে খণ্ডিত বিখণ্ডিত অবস্থায় পাওয়া যায়। এখন ভগবান তো ভাল মানুষের বাবা/ মা ,আবার  দুর্বৃত্তের ও বাবা/ মা। সুতরাং  সবই তাঁর  কৃপা। তাঁরই  ইচ্ছেতে লোকে তাঁকে চুরি করেছে  এবং খণ্ড বিখণ্ড করেছে আবার  তাঁরই  ইচ্ছেতে তিনি ফিরে এসেছেন। এই মন্দিরের  প্রতিষ্ঠা করেন শমিত ভঞ্জের পূর্বপুরুষ  দ্বারকানাথ ভঞ্জ প্রায় দেড়শো বছর  আগে। আরও  একটি বিখ্যাত  জায়গা শ্যামসুন্দরের মন্দির।  তদানীন্তন  জমিদার ( যাঁকে সাতমহলার  জমিদার  বলা হতো) বৃন্দাবনে  গিয়ে এতটাই  মোহিত হয়ে পড়লেন  যে ঐ মূর্তিটিকে তিনি এই গ্রামে নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠা করবেন কিন্তু তিনি স্বপ্নাদিষ্ট  হয়ে জানতে পারলেন  যে ঐরকম ই একটি মূর্তি তাঁর গ্রামের  নাটমন্দিরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কি অপূর্ব  সেই মূর্তি। সেই জমিদারের  উত্তর পুরুষ  পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে তিন একর জমি দান করেন  এই আশ্বাসে যে তাঁদের  পরিবারের  কয়েকজনকে সরকারি চাকরি দেওয়া হবে কিন্তু এই আশ্বাস মৌখিক  হবার কারণে তাঁরা কেউই চাকরি পাননি কিন্তু তাঁরা কাগজপত্রের মাধ্যমে সরকারকে তিন একর জমি দান করেন। এই কথা তাঁদের উত্তর পুরুষের  মুখ থেকে শোনা, সত্যতা যাচাই করার  কোন  অবকাশ  হয়নি। সেই জমিতেই  অবস্থিত আজকের  বিডিও অফিস।  সেই শ্যামসুন্দরের নামানুসারেই শ্যামসুন্দর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার  যিনি মাণিক বাবুর  সৌজন্যে আমাদের  ছোলার  ডালের  বরফি  খাওয়ালেন কিন্তু  কোনরকম  পয়সাকড়ি নিলেন না। এই দোকানটি  প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শ্রী গোপাল চন্দ্র ঘোষ  এবং এখন পরিচালনার  দায়িত্বে দুই ভাই  শ্রী রঞ্জিত কুমার ঘোষ  এবং বাবলু কুমার ঘোষ।  রঞ্জিত বাবু তখন  দোকানে ছিলেন না, বাবলু বাবু  সন্দেশ তৈরীতে ব্যস্ত  ছিলেন  কিন্তু অত ব্যস্ততার মধ্যেও  আমাদের  সবাইকে উনি ছোলার ডালের বরফি  খাওয়ালেন এবং বললেন  নভেম্বর মাসের শেষ  দিক থেকে ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত  তাঁর দোকানের  মোয়া  যেন  আমরা অবশ্যই  খাই। শীতের  আমেজে খেজুরের রস হয় মিষ্টি এবং এক বিশেষ ধানের খই তাঁদের  হাতের  যাদুস্পর্শে হয়ে ওঠে জয়নগরের মোয়া।  এই মোয়া  নিয়ে বহড়ু ও জয়নগরের মধ্যে যথেষ্ট  রেষারেষি আছে। একজন বলে আমিই সেরা তো আরেকজন বুক বাজিয়ে বলে , " না আমি।" আপাতত  মুলতুবি থাক তাদের  প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা। আমরা নিজেরা আসব, পরখ করব এবং তারপর সিদ্ধান্ত  নেব কে সেরা। এরপর আরও  এক বিস্ময়ের  পালা যা হচ্ছে বহড়ু হাই স্কুল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ও আগে এই স্কুলের  প্রতিষ্ঠা এই গ্রামের  বিদ্যানুরাগের কথা বহন করে। এই স্কুলের  প্রাক্তন  ছাত্র প্রখ্যাত  ডাক্তার  শ্রী নীলরতন  সরকারের  নামে একটি ব্লক আছে এবং শ্রী জ্ঞান ঘোষের ও যথেষ্ট  অবদান  রয়েছে।  এরপরেই  আসতে হবে  সেই পণ্ডিতালয়ের  দুর্গা পূজো। এই পূজার  প্রতিষ্ঠা হয় শ্রী কৃষ্ণগোপাল পণ্ডিতের  হাত ধরে। স্বপ্নাদিষ্ট  কৃষ্ণগোপাল আদেশ  পান মায়ের পূজো শুরু করার। কিন্তু নবমীর  রাতে তিনি আদেশ  পান তাঁকে যেন বিসর্জন  না দেওয়া হয়। সেই থেকে মানে নিরানব্বই  বছর  আগে শুরু হওয়া সেই মায়ের প্রতিমা আজও সেই এক, কেবল প্রতিবছর মায়ের  রঙ ও শাড়ি পাল্টানো হয়। তাঁর ই নাতি শ্রী উমাপদ চক্রবর্তীর এখনও  পালাক্রমে চালিয়ে আসছেন  এই মায়ের  পূজো। যেহেতু প্রতিমার  বিসর্জন  হয়না, সেইকারণে  প্রতিদিন  দুবেলা মায়ের  পূজো হয়। এটা যে কত কঠিন  কাজ তা যাঁরা এটা চালান তাঁরাই জানেন। অঞ্জলি দিয়ে , প্রসাদ  খেয়ে আবার  মাণিক বাবুর  পৈতৃক  বাড়িতে যাওয়া হলো এবং তাঁদের  বাড়িতেও প্রতিষ্ঠিত  মা শীতলার  মন্দির  দর্শন  করলাম।  মানিকবাবুর বাবা তিরানব্বই  বছরের  বৃদ্ধ কিন্তু তাঁর  অসাধারণ  স্মৃতি এবং আমাদের  দেখে অত্যন্ত  খুশি হলেন।  মাণিক বাবুর  নানান দিকে আগ্রহ। তাঁর  বাড়ির  সামনে বিশাল  পুকুরে ছিপ ফেললাম  কিন্তু আমার  তিনবারের প্রচেষ্টা বিফল করে দিয়ে মাছ চারা খেয়ে চলে গেল  কিন্তু অর্জুনের  একবারের প্রচেষ্টাতেই একটা বেশ বড় মাছ ধরা পড়ল এবং মাণিক বাবুর কয়েকবারের প্রচেষ্টায় একটা মাছ ধরা পড়ল।  মাছধরার একটা আলাদাই  আনন্দ। কারেনুমতি বৌদির প্রচেষ্টাও  সফল হলনা।  ভোগ খাওয়ার  এক আলাদা আনন্দ।  ঐ সীমিত  ক্ষমতার  মধ্যেও  চক্রবর্তীবাবুদের যা আতিথেয়তা তা হৃদয়স্পর্শ করে গেল।  আবার  আসতে হবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঐতিহাসিক  বহড়ু গ্রাম  থেকে বিদায় নিলাম। 

Wednesday, 18 October 2023

শারদীয় আর্ট গ্যালারি পরিক্রমা

কলকাতায় প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে ঘুরে দেখার বয়সটা পেরিয়ে গেছে, তবু মাঝে মাঝেই মনটা কেমন অশান্ত হয়ে ওঠে, ফিরে যেতে চায় শৈশবের দিনগুলোতে। অর্জুন  আমাদের  দুর্দান্ত প্ল্যানার,  যা কিছু করে সমস্ত কিছু ভেবে চিন্তে। ঠিক  করে ফেলল কিভাবে যাওয়া হবে এবং কোথায় কোথায় যাওয়া হবে। বড়দা যুধিষ্ঠির এবং নিজের রথে    আমাদের     নয়জনের   ( দুঃশলা বোন সমেত) যাত্রা শুরু হলো দ্বিতীয়ার দিন।অনেকদিন  ধরেই  ভীম ও ভালান্দ্রা অসুস্থ  থাকায় পঞ্চপাণ্ডবের একসঙ্গে যাত্রা আর হয়ে ওঠেনা কিন্তু উপরি পাওনা ভগ্নী দুঃশলার  উপস্থিতি যিনি কৌরব ও পাণ্ডবদের একমাত্র  বোন এবং সবার  প্রিয়পাত্রী। যাই হোক অর্জুনের রথে যুধিষ্ঠির, নকুল ও সহদেব  মিলে চারজন  এবং যুধিষ্ঠিরের রথে দেবিকা, সুভদ্রা,কারেনুমতি ,বিজয়া এবং দুঃশলাসহ মোট পাঁচজন বেরিয়ে পড়লাম।  সারথি দুজনেই  খুব কুশলী  এবং কলকাতার  রাস্তার  অলিগলি সবই চেনে নিজের  হাতের তালুর মতো।
বাইপাস ধরে উল্টোডাঙা হয়ে সোজা পাইকপাড়ায়  টালাপার্কে প্রত্যয়ের প্যাণ্ডেলে হাজির  হলাম।  বিরাট  এলাকা জুড়ে এই প্যাণ্ডেল। একপ্রান্তে ঢোকা এবং অন্য প্রান্তে বেরোনোর রাস্তা। মহিলাদের  প্রায় সকলের ই পায়ের  সমস্যা, দুলকি চালে চলতে নেয় অনেক সময়।বাকি  চার পাণ্ডবদের ও বয়স যথেষ্ট  হয়েছে এবং যুধিষ্ঠির ও সহদেবের দুই  হাঁটুই প্রতিস্থাপন হয়েছে কিন্তু অর্জুন ও নকুল এরই মধ্যে একটু বেশিই সক্ষম। চলছি তো চলছিই,  এক রাজবাড়ির আদলে তৈরী হয়েছে প্যাণ্ডেল। কি অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল   এই  অসাধারণ শৈল্পিক প্যাণ্ডেল।  ভাবছিলাম  এই শিল্পকর্মের পিছনে কার মাথা রয়েছে? এই শিল্পীদের  বেশিরভাগ ই বেশ গরীব  কিন্তু দারিদ্র্য  তাদের  শিল্পীসত্ত্বাকে ধ্বংস  করতে পারেনি। নামটা জানার ঔৎসুক্য  ছিলই কিন্তু ঠাউরে উঠতে পারছিলাম না কার কাছে জানা যায়। কিন্তু উদ্যোক্তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ  পেয়েছে শিল্পীদের প্রতি  এবং  বাইরে বেরোনোর মুখে বড় বড় করে শিল্পীদের নাম লেখা আছে, " সুশান্ত শিবানী পাল।" খুব ভাল লাগল এই ধরণের ব্যবহারে। সাধারণত  কাজের বেলায় কাজী আর কাজ ফুরালেই পাজী এটাকেই মান্যতা দেওয়া  হয়, কিন্তু এখানে সেটা ব্যতিক্রম। শিল্পীদের  মর্যাদা শুধু টাকাতেই নয়, সম্মান দেখানো খুবই  প্রয়োজন।  কতদিন  ধরে তাঁরা কাজ  করেছেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন এই রাজবাড়ির ছবিটিকে। 
এক একসময় মনে হয় যে কি বিপুল পরিমাণ  অর্থ  ব্যয় হয়েছে এই ক্ষণিকের অতিথির জন্য।  সমস্ত কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের এই বিশাল  অর্থব্যয়  কি কোন স্থায়ী শিল্পের  পিছনে খরচ করা যেতনা যেখানে বহুলোকের সংবৎসর অন্নসংস্থান  হয়। অবশ্য  এই ক্ষণিকের  শিল্পকে  কেন্দ্র করেও বহু দরিদ্র  মানুষের  কিছুদিনের অন্নসংস্থান হয়। সবচেয়ে বড় অভিশাপ আজকের  যুগের জমিদারেরা।  সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে তাদের  টাকায় নিজেদের  আখের গোছান এই বর্তমানের জমিদাররা। শোষণ চিরকাল  চলে আসছে এবং ভবিষ্যতেও  চলবে। যে যখন  সুযোগ  পায় সেই তখন শোষণ করে। সবচেয়ে মজার  কথা এই মহাচোররা  খবরের  কাগজে তাদের  ছবি বা খবর বেরোনোয়  তাদের মানসম্মান হানি হচ্ছে বলে আদালতে দরখাস্ত করেন  এবং মহামান্য  আদালত সংবাদ  মাধ্যমকে  এই খবর প্রকাশে নিরস্ত করেন। আমরা কোন সমাজে বাস করছি? যারা নিগ্রহ করবে তাদের  সুরক্ষা দেব না যারা নিগৃহীত  হচ্ছেন তাঁদের  সহায়তা করব?  মহামান্য  আদালত,  আপনারাও  যদি চোখ বন্ধ করে থাকেন এবং  সংবাদ মাধ্যমের  মুখে কুলুপ এঁটে দেন তাহলে এই নিগৃহীত  মানুষগুলো যাবে কোথায়?  এদের কথা কে বলবে? শিক্ষিত  পাশ করা ছেলেমেয়েদের  জায়গায় টাকার বিনিময়ে চোরগুলো চাকরি পেয়েছে, আপনারা তাদের  সপক্ষে রায় দিচ্ছেন? ধিক আপনাদের,  নিজের বিবেককে  জিজ্ঞেস করুন মহামান্য  আদালত।  আপনারা শুধু নিজেদের ই ছোট করছেন না আপনাদের ভবিষ্যত  প্রজন্মকেও  ধিক্কারের শিকার করে তুলছেন।  একবার শান্তভাবে ভাবুন , মহামান্য আদালত। কথায় আছে আইন সকলের  ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য।  কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে কি সত্যিই  তাই? অর্থবলে বলীয়ান জমিদার রা যখন  ইচ্ছা তাঁদের  বক্তব্য  শোনানোর  জন্য  আপনাদের  দরজা খটখট করতে পারেন  কিন্তু সাধারণ লোকেরা বছরের পর বছর তাদের  বক্তব্য আপনাদের  কাছে  তুলে ধরার চেষ্টা করেও ব্যর্থ  হন। কি বলবেন  আপনারা?
যাই হোক , ফিরে আসা যাক সেদিনের  কথায়। টালা পার্কের প্রত্যয় ছেড়ে যাওয়া হল বাগবাজার সার্বজনীন পূজো মণ্ডপে। সামনের প্রবেশদ্বার বন্ধ। পাশের  দরজা দিয়ে ঢুকে দেখলাম টুকটাক  অনেক কাজ বাকি। কিন্তু মায়ের  সেই সাবেকি মূর্তি মনের অন্তস্থলে ছাপ ফেলে দিল। বিস্ফারিত চোখে মায়ের সেই রূপ মনটাকে দূরে কোথাও  নিয়ে গেল। মাঝখানে সেই বিশাল ঝাড়বাতি এই মণ্ডপের  এক বিশেষ  আকর্ষণ। মণ্ডপের বাইরে মাঠে তখন  দোকান পাট ইতস্তত ভাবে খুলতে শুরু করেছে যেখানে টালাপার্কে দোকান গুলো  বেশ গুছিয়ে  বসেছে। আলু কাবলি, ঝালমুড়ি বা ঘুগনির সুন্দর গন্ধ নাকে ঢুকে মন মাতিয়ে দিয়েছিল কিন্তু অতটা হেলতে দুলতে হেঁটে এসে রথ কখন নিয়ে চলে আসবে সারথিরা  এই ভেবে জিভে জল টেনেই চলে আসতে হল। ভাবলাম  বাগবাজারের মাঠে  হবে ঐসব আলুকাবলির উপর আক্রমণ।  কিন্তু মনের  আশা মনেই থেকে গেল। হলনা কিছুই খাওয়া কেবল লেবু চা ছাড়া। যাওয়া যাক, কুমারটুলির পূজো দেখতে। অনেক মেহনত করে এদিক সেদিক করে সারথিরা যখন  পৌঁছলেন  তখন  গিয়ে শুনলাম যে সাধারণের  প্রবেশ  নিষেধ। মহিলারা অটো রিক্সা চড়ে বড় রাস্তায় এলেন যেখানে সারথিরা  আমাদের  ছেড়েছিলেন কিন্তু তারা  সেখানে নেই এবং বহু লোক এসেছেন  তাঁদের  প্রতিমা নিতে। বিভিন্ন  সাজের মাকে বৃদ্ধ ন্যুব্জ কুব্জ  বাড়িগুলো  লক্ষ্য করছে,  হয়তো  বা আমাদেরকেও।  একদিন এই বাড়িগুলোই ছিল অসাধারণ  সুন্দর।  পাশাপাশি , বিপরীত দিকে সুবিশাল  হর্ম্য প্রাসাদগুলো পরস্পর  পরস্পরের প্রতি স্পর্ধা প্রকাশ করছে যেমন কর্ণ বা অর্জুন  কিংবা দুর্যোধন বা ভীমের  প্রতি। একমনে দেখছিলাম  তাদের  দিকে আর ভাবছিলাম  যে বয়সকালে এঁরা কতই না সুন্দর  ছিলেন। কিন্তু কালের গতিতে  সবকিছুই  হারিয়ে যায় যেমন গেছে এই সুন্দর  প্রাসাদোপম  বাড়িগুলো। চোখে কেমন যেন জল চলে এল।
আহিরীটোলা মণ্ডপে  যাবার ইচ্ছা ছিল  কিন্তু লোকজন জানালো যে  তাদের  মণ্ডপ ও কুমারটুলির মতন। সুতরাং, এবার চাই পেট পূজো।  শতাব্দী প্রাচীন  মিত্র কাফেতে অভিযান  চালাতে  হবে। এটাও অর্জুনের ই পরিকল্পনা।  অতএব চল মিত্র কাফে। অপরিসর জায়গা  কিন্তু শতাব্দীপ্রাচীন  রেস্তোরাঁয় ঢুঁ না মারলে কেমন একটা অপরিপূর্ণতা  থেকে যায়। যেমন বলা তেমন কাজ। কিন্তু ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে তরী। অতএব কর অপেক্ষা।  বেশ দাঁড়িয়েছিলাম  কিন্তু সিগারেটের  গন্ধে গা টা  কেমন ঘুলিয়ে উঠল। এই জীবনে ঐ স্বাদে আমি বঞ্চিত,  সুতরাং এক অস্বস্তিকর অবস্থা।  দেখি,  আমার ই অনতিদূরে এক প্রতীক্ষারত যুগল কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার  যে ভদ্রলোক  পাঁশুটে মুখে দাঁড়িয়ে আর তাঁরই  সঙ্গিনী একটা বেশ বড় মাপের  সিগারেটে টান দিচ্ছে  আর মনের  সুখে ধোঁয়া ছেড়ে অন্য লোকের কাশি উঠিয়ে দিচ্ছেন।  একটু বিরক্ত  হয়েই হাত দিয়ে ধোঁয়াটাকে নাকের  কাছ থেকে  দূরে সরিয়ে বোঝানোর  চেষ্টা করলাম যে নিজের  ফুসফুসটার  বারোটা তো বাজাচ্ছ ই, সঙ্গে সঙ্গে তোমার  সঙ্গী এবং  আমাদের ও। উনি বুঝতে পারলেন ব্যাপার টা এবং সঙ্গে সঙ্গে সরে গেলেন।  সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের  বিষয় যে ঐ   চল্লিশোর্ধ মহিলা আমারই  সামনে বসলেন। আমাদের  নয়জনের অর্ডার দিতে ওদের  একটু দেরী  হচ্ছিল আর ওঁরা দুইজন  থাকায় ওঁদের  তাড়াতাড়ি দিয়ে দিল। আর তাঁরাও ফিস কবিরাজি যত তাড়াতাড়ি পারেন  খেয়ে বিদায় নিতে পারলে বাঁচেন। ভদ্রমহিলার  তিন আঙুলে একটাই আংটি মানে আংটি একটাই অথচ এমনভাবে তৈরী  যে মাঝে একটা পাথর মধ্যমায় এবং দুইদিকে সোনা কিন্তু একটা ভয়ানক  ছবি  ঐ দুই পাশের  আঙুলে মানে  তর্জনী ও অনামিকায় যা রীতিমত ভয়ের  বাতাবরণ তৈরী করে। কে জানে কোন জ্যোতিষীর  পরামর্শে তিনি এটা ধারণ করেছেন।  সে যারই  পরামর্শে উনি ধারণ করে থাকুন না কেন উনি যে পড়াশোনায় সেরকম  কিছু দরের  নন সেটা তাঁর চোখেমুখেই  প্রতিফলিত। যাই হোক,  উনি চলে যাওয়াতে আমি কেমন একটা স্বস্তি পেলাম।  এবার  আসা যাক, একটু মিত্র কাফের কথায়। উনিশশো দশ সালে শ্রী গণেশ  মিত্র এই কাফে খোলেন।  কিন্তু উনি ঠিকঠাক চালাতে না পারায় বছর দুই বাদেই বাল্যবন্ধু  শ্রী সুশীল রায়কে দিয়ে দেন। সুশীলবাবু  ছিলেন  একজন অত্যন্ত  বাস্তব বোধ সম্পন্ন ব্যক্তি এবং একজন দক্ষ ব্যবসায়ী। সেই কারণেই  মিত্র কাফেতে এই কয়টা পূর্তি লেখা আছে।
                   "  মিত্র কাফে "
                 -------------------------
পেট ভরে খাবার  আর প্রাণভরে আড্ডা
উনিশশো দশ সালে শোভাবাজারে শুরু যাত্রা
বন্ধুত্বের মর্যাদা দিতেন সুশীল  রায়
ভালভাবে বুঝতেন  মানুষ  কি চায়।
মিত্র কাফে নাম সেই বন্ধুত্বের  স্বীকৃতি
আজ এই নাম মানেই খাবার আর খ্যাতি
এই রেস্তোরাঁর  কথা আজ কে না জানে
কলকাতা ছাড়াও আছে আরও অনেক স্থানে।

এই মিত্র কাফেতেই আমরা ফিস কবিরাজি , চিংড়ির  কবিরাজি, চিকেন কবিরাজি , ফিস কাটলেট এবং ডায়মন্ড কবিরাজি ধ্বংস করে ফিরে এলাম  বাড়ি আর এইবার  দুঃশলা ভগ্নী এই সমস্ত বিল মেটালেন। প্রথমে নকুল ও কারেনুমতি  এবং পরে সহদেব ও বিজয়াকে রথ থেকে নামিয়ে যুধিষ্ঠির  ও অর্জুন  রথে বাড়ি ফিরে গেলেন। 
একটা কথা বারবার  মনে আসছে।কলকাতা তথা সমস্ত পশ্চিমবঙ্গে এত মহান শিল্পী রয়েছেন  যাঁদের শিল্পীসত্ত্বা এই বিশেষ  সময়ে বিকশিত  হবার  সুযোগ পায়। আগে আঙুলে গোণা কতিপয় শিল্পীর ছবি আর্ট গ্যালারিতে প্রদর্শিত হতো কিন্তু এই শারদোৎসবে এই বৃহৎ আর্ট গ্যালারিতে সমস্ত ছোটবড়  শিল্পীরা তাঁদের  স্থান করে নেন।

Monday, 18 September 2023

শ্রদ্ধার্ঘ্য

আমরা সাধারণত মনীষীদের জন্মদিন  বা মৃত্যু দিন শ্রদ্ধার  সঙ্গে পালন করি এবং কোন  সাধারণ মানুষ  মারা গেলে আমাদের  প্রতিক্রিয়া হয় তাৎক্ষণিক। ভাল  মানুষ  হলে সবাই বলতে থাকে, " আহা, মানুষটা খুব  ভাল  ছিল আর খারাপ  হলে বলে, গেছে, আপদ গেছে চুকে।" কিন্তু ঐ কয়েকদিন  লোকে একটু আধটু হা হুতাশ করে তারপর পৃথিবীর চলার  সঙ্গে তাল  মিলিয়ে লোকে ভুলে যায়। অবশ্য  লোকজন তো পরে, নিজের আপনজন ই শুরু করে দেয় এটা আমার,  ওইটা তোমার ( যদি একাধিক  সন্তান  থাকে)। কিন্তু কিছু কিছু লোক সাধারণ  হয়েও এমন কিছু কাজ করে যায় যেটা কিছু লোক জীবনের  শেষ দিন পর্যন্ত মনে রাখে( অবশ্যই  কৃতার্থবোধ  যদি একান্তই থাকে)। 

এইরকমই  একজন গণপতরাও কদম। কদমজী ছিলেন  আমাদের অফিসার্স কোয়ার্টারের  সিকিউরিটি গার্ড। অফিস  বেরোনোর সময় এবং অফিস  থেকে ফেরার  সময় দেখা হতো যদি তার ডিউটি থাকত। একটু  নাদুস নুদুস গোলগাল চেহারা, মাঝারি উচ্চতা কিন্তু সদা হাস্যময়। আমি যেহেতু একা থাকতাম সেইকারণে টুকটাক  কিছু কথাবার্তা আমার  সঙ্গে সবসময়ই  হতো। রিটায়ার করার  কিছুদিন আগে আমার ছেলে ট্রান্সফার  হয়ে এল এবং আমার সঙ্গেই  থাকল। রিটায়ার করার  পরেও  কিছুদিন ছিলাম অফিসের  কোয়ার্টারে এবং সেই সুবাদে সমস্ত  স্টাফদের  সঙ্গে সখ্যতা আরও  নিবিড় হয়েছিল। টুকটাক কাজ এই কদমজী বা শেলকে জী বা পাটিলজীরাই করে দিত। অফিস  থেকে ফেরার পথে প্রায়ই জিলাপি বা সিঙারা বা কোন খাবার কিনে আনতাম শুধু নিজের জন্যই নয় এই সিকিউরিটি গার্ড  বা সুইপারের জন্য ও আনতাম। প্রথম প্রথম একটু কুণ্ঠিত হয়ে নিত কিন্তু পরে তারাও খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছিল।  এরই মধ্যে কিছু কাজের  জন্য কলকাতায় আসতে হয়েছিল  ছেলের  বিয়ের ব্যাপারে। রান্নার জন্য  শোভা দিদি আসত, সুতরাং খাওয়া দাওয়ার অসুবিধে হচ্ছিল না। একদিন সন্ধে বেলায় হঠাৎই  মোবাইলটা বেজে উঠল। দেখি কদমজীর ফোন।  কি ব্যাপার,  কদমজী? ওর উত্তর  শুনে মাথা ঘুরে গেল। ছেলের ভীষণ জ্বর, চোখ খুলতেই পারছে না তো কথা বলা তো দূরস্থান। সেদিন  ছিল রবিবার,  কোন ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছে না। আমি কতকগুলো জ্বরের  ওষুধ বলে দিলাম এবং খাওয়াতে বললাম।  কিন্তু কদমজী তাঁর পরিচিত  এক ডাক্তারের  বাড়ি নিয়ে গেল ছেলেকে এবং অনেক অনুরোধ  করে তাঁকে দেখতে রাজি করালেন। উনি তাঁর পরিচিত  এক ডায়গনস্টিক ক্লিনিকে ফোন করে রক্ত পরীক্ষার  ব্যবস্থাও  করলেন এবং কদমজী সমস্ত  পরীক্ষা করিয়ে ছেলেকে বাড়ি ফিরিয়ে আনলেন এবং ডিউটির রোস্টার বদল করে সারারাত ছেলের  পাশেই থাকলেন । পরে আমার  অনুরোধ মতন প্যারেল থেকে বম্বে এয়ারপোর্টে  ছেলেকে ছেড়ে দিয়ে এবং বিমান কর্মীদের  সমস্ত  কিছু অবগত করালেন।  আমরা কলকাতা এয়ারপোর্ট ওকে নিয়ে সোজা হাসপাতালে  ভর্তি করে দিলাম।  আবার  রক্ত পরীক্ষার পরে ডেঙ্গি ধরা পড়ল এবং প্ল্যাটিলেট কাউন্ট বিপদসীমার  অনেক নীচে। সবাই  খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম।  তিনদিন  বাদে ছেলের  বিয়ের রেজিস্ট্রেশন হবে অথচ প্ল্যাটিলেট সংখ্যার  সেরকম  কোন  উল্লেখযোগ্য  বৃদ্ধি হচ্ছে না । মেয়েদের বাড়িও ভীষণ  উদ্বিগ্ন,  আমরা তো বটেই। রেজিস্ট্রেশনের  আগের  দিন  আমরা বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলাম কিন্তু ডাক্তার ছাড়তে রাজি নন। শেষ পর্যন্ত বণ্ড সই করে ওকে বাড়ি নিয়ে এলাম  কিন্তু একটা ভয় শেষ পর্যন্ত থেকেই  গেল। ভগবানের আশীর্বাদে সবকিছুই  নির্বিঘ্নে মিটে গেল কিন্তু আমার  ঙ কদমজীর কথা মনেই থেকে গেল।

কদমজীর  অ্যাকাউন্ট নম্বর  নিয়ে ছেলের জন্য  যা খরচ করেছিল তা পাঠিয়ে দিলাম  এবং ছেলের  জীবন  ফিরে পাবার জন্য মনে মনে ভগবানকে এবং তাঁর ই প্রতিনিধি কদমজীকে অনেক ধন্যবাদ  জানালাম।  এরপর অনেকবার  বম্বে এসেছি এবং কদমজীর  সঙ্গে দেখাও করতে গিয়েছি কিন্তু দেখা হয়নি কোন না কোন কারণে। কোন  সময় ওঁর ডিউটি রাত্রিবেলায় নয়তো ডিউটি করে চলে গেছে বা নিজের  গ্রামে গেছে। বছর চারেক আগে  ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাস থেকে আসার  সময় প্যারেল  হয়ে এসেছি কিন্তু কদমজী ছাড়া বাকি সকলের  সঙ্গেই  দেখা হয়েছে। ওদের  চীফ সিকিউরিটি অফিসার শেলকেজীর হাতে মিষ্টির  বাক্সটা দিয়ে কদমজীর কথা জিজ্ঞেস করায় উনি জানালেন যে কদমজী চাকরিতে ইস্তফা  দিয়ে পাকাপাকি ভাবে নিজের গ্রামের বাড়িতে চলে  গেছে। সুতরাং সেবারও  দেখা হলো না। গতকাল  একটু হাতে সময় নিয়ে পুরোন  বন্ধুদের  সঙ্গে যোগাযোগ  করতে লাগলাম। ধূমলজী,  ব্যাভারেজী,  কদমজী, শেলকেজী সবাইকেই  ফোন  করলাম  এবং শেলকেজী ছাড়া আর কারও  কাছ থেকে উত্তর না পেয়ে একটু বেশ ঘাবড়ে গেলাম। শেলকেজীর  মুখে জানলাম যে কদমজী করোনার  করাল গ্রাসে নিমজ্জিত  হয়েছেন  এবং  পরে ব্যাআরেজীর ফোনে জানলাম যে আমার অত্যন্ত  ঘনিষ্ঠ সহযোগী  ধূমল ও করোনার শিকার  হয়েছে। মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত  হয়ে গেল। রক্তের  সম্পর্ক  না থাকলেও এদের  কাছ থেকে যা পেয়েছি তা অমূল্য  এবং ভগবানের  কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি এই মহাত্মাদের তাঁর চরণে স্থান দেন।

Thursday, 10 August 2023

তিলু নাপিতের বাড্ডি

তেলুগু ভাষায় বাড্ডি শব্দর অর্থ ছোট দোকান।  তিলু পরামাণিক যে কি করে অন্ধ্রপ্রদেশের ভাইজাগ শহরে এসে জুটেছিল সেটা কেউ জানেনা। হয়তো তার বাপ ঠাকুর্দা বন্দর শহর ওয়ালটেয়ারে ( ভাইজাগের  পুরোন নাম) কাজের সূত্রে এসেছিল এবং তারপর সেখানেই থেকে গেছে বংশানুক্রমে। তিলু পরামাণিক নামেই বাঙালি, কিন্তু ওখানে থাকতে থাকতে তাদের  ভাষা, চলন বলে সবই রপ্ত করে ফেলেছে তাদের মতন। তিলুর ছেলেমেয়েরা সবাই  তেলুগু মাধ্যমেই  পড়াশোনা করে এবং তার বৌ ও তেলুগু।  এসব  সত্ত্বেও তিলু  নিজেকে  বাঙালি  বলেই পরিচয় দেয় এবং বাঙালিদের অনুষ্ঠানে নিজেদের  সামিল  করে।

তিলুর বাড়ি পুরোন শহর বন্দরের  কাছাকাছি।  পূর্ণ মার্কেটে বাজার  করতে গিয়ে মাছ কেনার  সময় হলো আলাপ। মাছ বিক্রেতা  মহিলা( যাকে আমি দিদি বলে ডাকতাম) কোন  এক সময়  কলকাতায় থাকার দরুন  বাঙলা বলতে পারত এবং কলকাতা থেকে দক্ষিণ দেশে গিয়ে ভাষার  সমস্যার জন্য কেউ যদি বাঙলা বলতে পারে বা বুঝতে পারে এমন লোকের সঙ্গে পরিচিত  হতে পারে তবে তার মনে হয় যেন সে হাতে চাঁদ পেয়ে গেছে।  সুতরাং মেছুনি দিদি ও তিলুর সঙ্গে আলাপ  হওয়ার মানে  যেন আকাশে ডানা মেলে ওড়া। মেছুনি দিদির এক বোন আবার  আম বিক্রি করত। সুতরাং আম কিনতে হলে ঐ ছোড়দিদির কাছেই  কেনা হতো। বাজারের  কাছেই  ছিল তিলুর এক ছোট্ট  সেলুন( কাঠের তৈরী) যেখানে মাত্র  দুজনই একসঙ্গে চুল কাটতে পারে।  তিলু মোটামুটি ভাবে সারা সপ্তাহ  একাই সামাল দেয় কিন্তু রবিবার বা ছুটির  দিন ছেলে এসে বাবাকে সাহায্য  করে। যাই হোক, বাজার  করতে এসে চুল কেটে বাড়ি ফেরা একদম রথ দেখা কলা বেচার মতন। তিন বন্ধু আমরা একসঙ্গে বাজার  যেতাম তিনটে  স্কুটারে এবং  মাসে একবার  হতো তিলুর দোকানে লেবু দিয়ে সোডা খাওয়ার ধূম। ওখানে কলকাতার  মতন যত্রতত্র চায়ের দোকান  মেলেনা কিন্তু পাওয়া যায় লেবু সোডা বা ঘোল( বাটার মিল্ক)। যা রোদের  তেজ নিম্বু সোডা  বা বাটার মিল্ক ছাড়া চলাও  যায় না।

সব সেলুনেই একই ছবি বিশেষ করে মফস্বল বা ছোট  শহরে। বম্বেতে কারও দম ফেলার সময়ই  নেই,  সবাই যেন  ছুটছে তো ছুটছেই।  চার্চগেট  স্টেশনে  ট্রেন  ঢুকছে আর শয়ে শয়ে  লোক সব রেডি হয়ে আছে ঐ ট্রেন  থামার আগেই উঠে পড়বে একটু  বসার জায়গা পাওয়ার জন্য। ঐ সময় কে ধাক্কা  খেয়ে পড়ল বা পড়ে যাওয়া লোকটাকে পদপিষ্ট করে চলে গেল কিনা কারও  ভ্রূক্ষেপ নেই। কলকাতায় ও বনগাঁ লোকালেও প্রচণ্ড  ভিড়  হয়  কিন্তু বম্বের  ভিড়ের  কাছে  কিছুই  নয়। সুতরাং আমাদের মতন লোকের পক্ষে ঐরকম  কিছু করা সম্ভব  নয়। পড়ে  যাওয়া লোকটাকে উঠিয়ে একটা বেঞ্চে বসিয়ে তার  ছিটিয়ে পড়া কাগজ পত্রগুলো উঠিয়ে দিয়ে একটু ফার্স্ট এড দেওয়ার  চেষ্টা থাকে। যাই হোক, পুরোন  প্রসঙ্গেই  ফিরে আসা যাক। 
সমস্ত  নরসুন্দরের মতন তিলুর ও স্টকে  থাকা নানাধরণের গল্পের  স্টক থেকে  একটার পর একটা  গল্প বেরোত চুল কাটার  ফাঁকে ফাঁকে।  নরসুন্দরদের এটা একটা বিরাট গুণ। অবাধ গতি ওদের নানান বিষয়ে সে শিল্পকলাই  হোক বা রাজনীতিই  হোক। অন্ধ্রপ্রদেশে অবশ্য  রাজনীতি নিয়ে বিশেষ  কেউ মাথা ঘামায় না যতটা আমাদের কলকাতায় বা পশ্চিমবঙ্গে হয়। ভোটের  সময়  স্কুটার বা মোটরসাইকেলের সামনে লাগানো পতাকা  দেখেই বোঝা যায় সে কোন দলের।  কিন্তু না, সেখানে না আছে কোন  মারদাঙ্গা বা বুথ দখল বা রিগিং।  ভোটের  সময় শেষ তো সব দ্বিচক্রযান পতাকামুক্ত আর একঠেকেই আড্ডা বা পানভোজন। তিলুর কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের  ভোট নিয়ে বিশেষ আগ্রহ।  কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম  ওর কটা ছেলেমেয়ে? উত্তরে জানায় ওর পাঁচ ছেলে ও একটা মেয়ে।  
অ্যাঁ, পাঁচটা ছেলে ও একটা মেয়ে মানে তোমাদের  সংসারে আটজন সদস্য! একটু আশ্চর্য  হয়েই জিজ্ঞেস  করলাম তোমার  বয়স কত এবং  আজকের  দিনে এত বড় সংসার!  ও কিন্তু ভীষণ  সপ্রতিভ ভাবেই উত্তর  দিল যা শুনে তো আমরা তিনজনেই  হাঁ। 
ঐ যে ছেলেটাকে দেখছেন ও আমার  সেজ ছেলে। 
অ্যাঁ, সেজছেলে? আর বাকি রা কোথায়?
বড় দুই ছেলে ছোট  দুজনকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে আছে।
গ্রামের  বাড়ি! কোথায় তোমাদের  গ্রাম?
আর বলবেন না। বসিরহাটের কাছে আমাদের  পূর্বপুরুষের  বাড়ি। বড় ছেলে শাসকদলের পঞ্চায়েত সদস্য।  মেজ ছেলেকে কিন্তু বলেছি বিরোধীদলে থাকতে কারণ যতই  পালাবদল  হোক না কেন আমাদের  বাড়িতে যেন কোন আঁচ না আসে।  ছোট  দুজন এখনও  পড়াশোনা করছে। ওদেরকেও  বলে দিয়েছি বাড়িকে  সুরক্ষিত রাখতে গেলে যত পার্টি আছে সবজায়গায় যেন  আমাদের  বাড়ির  কোন  না কোন সদস্য  থাকে। 
কথায় আছে, জীবজন্তুর  মধ্যে শিয়াল,  পাখির মধ্যে কাক আর মানুষের  মধ্যেএই নরসুন্দর  অসম্ভব  চতুর। বাজারের  থলিগুলো  স্কুটারেই  আটকানো রোদেই  শুকাচ্ছে।  চুলকাটা শেষ করে তিনবন্ধুর বাড়ি ফিরে আসা এবং  প্রত্যেক  মাসেই  নিজের  নিজের  বাড়িতে গঞ্জনা শোনা আর ভগবানের  আশীর্বাদে এক কানে শোনা এবং অপর কান দিয়ে নির্গমনের ব্যবস্থা করা।

Thursday, 3 August 2023

ছোট্ট পৃথিবী

সোমবাবুর রোজ একবার  বাজারে যাওয়া চাই। কিছু লাগুক বা না লাগুক প্রত্যেক দিন  অভ্যেস বশত একবার  চক্কর না দিলে সোমবাবুর দিনটা যেন কেমন  পানসে হয়ে যায়। আর যাওয়া মানেই প্রয়োজন  না থাকলেও কিছু না কিছু উনি আনবেনই আর গিন্নীর কাছে অবধারিত ভাবে বকুনিও খাবেন। মাঝে মাঝেই বকুনির  মাত্রাটা একটু বেশি হয়ে গেলে সোমবাবুর বাইরে বেরিয়ে যাওয়া এবং সেটাও  ঐ বাজারমুখী কিন্তু এবার  আর কোন জিনিস  আনা নয়, ওঁর মনটাকে একটু শান্ত করা। বন্ধুরা বলেন  আপনার  ঐ বাজারে কি আছে বলুন তো? রোজ ঐদিকে না গিয়ে একটু আধটু অন্য দিকে কি যেতে পারেন  না? গিন্নীর বকুনি আর বন্ধুদের শ্লেষ প্রায় একই রকম মনে হয় তাঁর কাছে। আসলে উনি যান এক বিশেষ টানে। কত রকমের লোক জন আসে বাজারে, তাদের  মানসিকতা তাদের  কেনাকাটার মাধ্যমে বোঝা যায়। কেউ এমন দরদস্তুর করে যে বিক্রেতা তাদের  আসতে দেখলেই ভাল জিনিস টা প্লাস্টিকের থলিতে ভরে রেখে দিয়ে বলে ওটা বিক্রি হয়ে গেছে। আবার  কিছু লোক এসে দাঁড়াতেই তারা বুঝে যায় যে কি জিনিস নেবেন  এবং কতটা নেবেন এবং সেই মতো বেছে বেছে ভাল জিনিসটা তাঁদের  জন্য  রেডি করে রাখে। এঁরা কোন দর দাম করেন না এবং টাকার  হিসেবটাও  করেন না। ওঁরা ভাল করেই জানেন  যে এইলোকটা তাঁর কাছে বেশি দাম নেবেনা এবং অবশ্যই ভাল জিনিসটাই  দেবে। কিন্তু সব মানুষ  তো সমান হয়না এবং বিক্রেতাদের ও সেই অনুযায়ী স্ট্র্যাটেজি নিতে হয়।

পচা মাছওয়ালা কিন্তু একেবারেই  পচা মাছ বিক্রি করেনা বরঞ্চ তার মাছটাই বাজারের  সেরা মাছ। কিন্তু সেই ছোট বয়সেই তার বাবা মায়েরা তার নামটা পচা দেওয়ায় এবং ভাগ্যের দোষে বা গুণে তাকে মাছ বিক্রি করতে হওয়ায় তাকে সবাই  পচা মাছওয়ালা বলেই ডাকে। মাঝেমধ্যে যে একটু মন খারাপ  হয়না তা নয় তবে তার যা বিক্রি তাতে বেশিক্ষণ  মন খারাপ করার  মতো সময় তার থাকেনা। পচার পাশে পানুবাবু অন্য রকম মাছ রাখেন এবং তাঁর খরিদ্দার ও সব বাঁধা। আর মাছ কিনতে গেলে চেনা লোকের কাছেই কেনা উচিত  নাহলে ঠকে যাওয়ার  সম্ভাবনা প্রবল। সোমবাবু আবার  মাছের  ভীষণ  ভক্ত নন কিন্তু কিনলে হয় পচা নাহলে পানুবাবুর কাছেই কেনেন। সমস্ত মাছবিক্রেতাই  কর্পোরেশনের তৈরী উঁচু দাওয়াতে  বসে এবং প্রত্যেকের বিক্রি করার জায়গার  নীচে একটা ছোট্ট  গোডাউন মতো আছে যেখানে অবিক্রিত মাছগুলো নুন আর বরফ মেশানো ক্রেটের মধ্যে থাকে এবং বাইরে থেকে তালা দেবার  ব্যবস্থাও  রয়েছে। সেইরকম  মাংস বিক্রেতাদের ছোট্ট গোডাউনে ছাগল  ভরা থাকে। তবে দাওয়ার  ওপর বসে বিক্রি করতে হলে কর্পোরেশনকে টাকা দিতে হয় এবং স্থানীয় নেতাদের  চাহিদাও  মাঝেমধ্যেই পূরণ  করতে হয়। বাজারের  ভেতর  যারা মাটিতে বসে তাদের  দক্ষিণার মাত্রা কম হয় এবং বাজারের  বাইরে রাস্তার  দুধারে বসা বিক্রেতারা  কেউই এই কুচো নেতাদের হাত থেকে রেহাই  পায়না। আগে যারা সাইকেল  চালিয়ে আসত, এখন তারা আসে মোটর সাইকেলে।  চোখদুটো লাল ভাঁটার মতো, মনে হয় ক্লিপ দিয়ে চোখের  পাতাটা আটকে রেখে চোখটা খোলা রেখেছে। কাশীনাথের কাছে মোটরসাইকেল থামিয়ে জলদগম্ভীর স্বরে বলে ওঠে দাদা," শোন্ এইসবগুলো বাড়িতে দিয়ে আয় তাড়াতাড়ি।" কাশীনাথ তার খরিদ্দারদের দাঁড় করিয়ে রেখে ভয়ে আগে তার ফরমায়েশ মতো জিনিসগুলো দিয়ে আসে। ওর দেরী হলে পরদিন  থেকে ওর বাজারে  আসা বন্ধ এবং রোজগার পাতিও বন্ধ। সোমবাবুর ইচ্ছে করে টেনে দুই চড় লাগাতে কিন্তু সেই দাদার  ভয়ে সবাই  তটস্থ কারণ ও সেখানকার  কাউন্সিলরের ডানহাত, প্রোমোটারি করে, দালালি করে এবং নানাউপায়ে নিজের ও কাউন্সিলরের পকেট ভরে। সুতরাং তাকে ঘাঁটানো  মানে সাপের  লেজে পা দেওয়া। অত সাহস কার আছে? সবচেয়ে মজার  ব্যাপার  যে যদি কোন  পটপরিবর্তন হয় তাহলেও  এরা কিন্তু সেই একই জায়গায় থাকবে কারণ এরা হচ্ছে বাহুবলী কেবল মনিবটা  রামের  জায়গায় শ্যাম হবে।

পচা মাছওয়ালার উল্টোদিকে মহাদেব  বসে সামান্য  কাঁচা লঙ্কা, কাঁচা হলুদ, ধনেপাতা আর কারিপাতা  নিয়ে। সামান্য পুঁজি, সামান্য ই মালপত্র,  কিই বা বিক্রি করবে আর কিই বা লাভ হবে আর পেটটাই  বা কিভাবে চলবে? সোমবাবুর কোন  দরকার  না থাকলেও  ঐ মহাদেবের  দর্শন চাইই চাই। রোজ বাজারে গিয়ে দশ কুড়ি টাকা ওকে দেওয়া চাই। নামটাই মহাদেব,  শীর্ণকায় হাড় জিরজিরে চেহারাটার  দিকে চোখ পড়লে চোখে জল এসে যায়। সোমবাবুর ঐ সামান্য সাহায্য ওকে খুব অল্প  হলেও  সাহায্য করে। ঐ মায়াময় চেহারাটার দিকে নজর পড়লেই সোমবাবুর আর মাথার  ঠিক থাকেনা। মহাদেব  লজ্জ্বার খাতিরে সামান্য  হলেও  কিছু জিনিস  দিতে চায় যেটার দরকার নেই আদৌ এবং আনলেও বাড়িতে অশান্তি। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই  চলে সোমবাবুর  আনাগোনা।
এরই মাঝে এসে গেল করোনার  মহামারী। বাজারের সব ঝাঁপ বন্ধ। লোকজন  ঠেলায় করে তরকারিপাতি বাড়ির সামনে নিয়ে আসছে। আবাসনের  বাসিন্দারা থলি ঝুলিয়ে মালপত্র  তুলে নিচ্ছে এবং টাকাপয়সা দিয়ে দিচ্ছে এবং বাকি টাকাও ঐ থলির মাধ্যমেই  ওঠানামা করছে। ঐ সবজিগুলো স্যানিটাইজার দিয়ে একপ্রস্থ মাখামাখি হবার পরে আবার  যতটা সাবধানে সম্ভব  ধোওয়া হচ্ছে এবং তার ব্যবহার হচ্ছে। ধীরে ধীরে করোনার প্রকোপ কমে এসেছে। লোকজন বাজারে প্রায় নিয়মিত  হয়ে এসেছে। পচা মাছওয়ালা, পানুবাবু, কাশীনাথরা সবাই আছে কিন্তু মহাদেবের জায়গাটা খালি। সোমবাবু কয়েকদিন গিয়েছেন এবং মহাদেবের  খোঁজ করেছেন  কিন্তু কেউ কোন  খবর দিতে পারেনি। হঠাৎই  যেন  মহাদেব  উধাও  হয়ে গেল  বাজার থেকে, জানিনা করোনার  প্রকোপে  না খিদের জ্বালায়? বাজারে আসার  তাগিদটাই যেন  হারিয়ে গেছে সোমবাবুর কাছ থেকে।

Saturday, 22 July 2023

নদীবক্ষে নিশিযাপন

নৌকায় চড়া বা লঞ্চে যাওয়া বা স্টিমারে পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা বেশ ভালোই হয়েছে কিন্তু নদীবক্ষে নিশিযাপন করার  সুযোগ কোনদিন  হয়নি।সেই সুযোগ ও এসে গেল যখন আমাদের অর্জুন বলল যে ফ্লোটেলে একটা রাত্রি কাটালে কেমন হয়? সবাই  একযোগে মাথা নাড়ালো, বলল ভালোই প্রস্তাব। কথায় আছে যে খায় চিনি তাকে যোগান চিন্তামণি । কিন্তু মনের মধ্যে একটা সংশয় থেকেই যায়, কতটা ব্যয়সাপেক্ষ হবে সেই থাকাটা। অর্জুন কিন্তু ব্যাপারটা আঁচ করে ফেলেছে ততক্ষণে, বলল,"না ,সেরকম কিছুই  নয়, আসলে ও একটা অনুষ্ঠান করার জন্য কয়েকটা ঘর বুকিং বাবদ কিছু টাকা অ্যাডভান্স দিয়েছিল কিন্তু অনুষ্ঠান সূচি বদলে যাওয়ায় ওকে অন্য ব্যবস্থা করতে হয়েছে এবং ফ্লোটেল কর্তৃপক্ষ ও টাকা ফেরত দিতে রাজী  নয়। অতএব,  ঐ টাকা অ্যাডজাস্ট  করতে  হলে ওখানে গিয়েই থাকতে হবে।"  একটু কেমন কেমন লাগছে অথচ অর্জুন টাকাও নেবেনা আমাদের  কাছ থেকে। প্রথমে একটু নিমরাজি  থাকলেও ক্যাপ্টেনের  কথা ফেলা যায় না। অতএব  ঠিক হলো যে  একুশে মে শনিবার যাওয়া হবে এবং ওখানে রাত কাটিয়ে রবিবার  ফিরে আসা।

ফ্লোটেল হচ্ছে একটা সুন্দর ছোট্ট জাহাজ যেটা স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার পূর্বাঞ্চল লোকাল হেড অফিসের  উল্টোদিকে।  কয়েক বছর আগে আমাদের  স্কুলের     বন্ধুদের প্রায় একান্ন বছর বাদে গেট টুগেদার  হয়েছিল  এবং ওখানে আমরা ডিনার করেছিলাম  কিন্তু থাকার সুযোগ ঘটেনি। ওখানে দুটোর  সময় চেক ইন, কিন্তু খাওয়া দাওয়া সেরে পৌঁছাতে প্রায় বেলা চারটে। অর্জুন  বিরাট বড় প্ল্যানার, খুঁটিনাটি  সবকিছুই  একদম ঠিকঠাক ।নয়জনের  চারটে কেবিন এবং সবটাই গঙ্গার  দিকে কিন্তু একটা কেবিন  হয়ে গেল  অন্য ডেকে। কিন্তু অর্জুন  চাইছে সবার একটা ডেকে ই  হোক। রিসেপশনে একটা ছোট খাটো চেহারার মেয়ে কিন্তু অসম্ভব  ঝকঝকে চেহারা এবং ভীষণ  স্মার্ট। নাবিকের  ড্রেস, মাথায় তাদের  মতন টুপি-- এককথায় বলা যেতে পারে নাবিকোচিত। সুন্দর আঙুলগুলো  যথোচিত ম্যানিকিওর করা এবং বিভিন্ন  আঙুলে বিভিন্ন রকম চিত্র। ল্যাপটপে তার আঙ্গুলগুলো নটরাজের  নৃত্য করছে এবং অসম্ভব দক্ষতার সঙ্গে অর্জুনের সঙ্গে মোকাবিলা করছে। যদিও  সে বলল যে একটা ডেকে ই করে দেবে কিন্তু  শেষমেশ  তা হলো না । তখন  নিজেরাই বলাবলি করলাম যে একটাই তো রাত্রি, কেটে যাবে কোনভাবে।

বিকেল বেলায় ঠিক  আছে গঙ্গারতি দেখার।  অর্জুন  তার ও ব্যবস্থা করে রেখেছে। গাড়িগুলো আমাদের  ছেড়ে দিল যেখান  থেকে লঞ্চটা ছাড়বে কিন্তু একটু ভুল বোঝাবুঝির জন্য  অনেকখানি পিছনে হেঁটে আসতে হলো এবং দেখা  গেল যে ফ্লোটেল থেকে হেঁটেই  আসা যেত। যাই হোক, তিনটে লঞ্চ পেরিয়ে আমাদের  লঞ্চে পৌঁছলাম।  লঞ্চের  ওপরের  ডেকে উঠতে সব নড়বড়ে বুড়োবুড়িদের একদম দফারফা। যাই হোক, ওপরে উঠে বসার পর ইঞ্জিন  স্টার্ট করল আর ধীরে ধীরে যেখানে আরতি হচ্ছিল  তার একটু দূরেই নোঙর করল। বারাণসীর আদলে এখানে গঙ্গা আরতি শুরু হলো। একদিকে সূর্যাস্ত, অন্যদিকে আরতি এবং পিছনে মাঝে মাঝে চক্ররেলের হর্ন মিলেমিশে এক অন্য আবহাওয়ার সৃষ্টি হলো। গঙ্গার  জলের  যে ভিন্ন ভিন্ন রঙ হয় তা না দেখলে বিশ্বাস ই করা যায়না। ছবিগুলো মনের  মধ্যে গেঁথে আছে যেটা এখানে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আরতি শেষে  লঞ্চ  আবার  স্টার্ট করে যেখান থেকে উঠেছিলাম  সেখানেই নামিয়ে দিল এবং বাবুঘাটে স্পেশাল চা খেয়ে এলাম ফিরে ফ্লোটেলে। বাতাসে আদ্রতা থাকায় ঘামে জবজব শরীরটা এসে ঠাণ্ডা করে  রাতের  খাবারের জন্য সর্বোচ্চ ডেকে এসে পৌঁছলাম।  হরেক রকমের খাবার,  কোনটা ছেড়ে কোনটা খাব ভেবে  পাচ্ছি না,  তবে তার মধ্যেই  যেগুলো সচরাচর  বাড়িতে খাওয়া হয়না সেগুলোর দিকেই  নজর দিলাম। আগের বার যখন  এসেছিলাম  তখন খাবারের মান ততটা ভাল  ছিলনা কিন্তু এখন বেসরকারি  হাতে যাওয়ায় খাবারের মান এবং সার্ভিসের প্রভূত  উন্নতি হয়েছে। যাই হোক খাওয়া সেরে কেবিনে ফিরে আসা এবং মহিলাদের হাউসি খেলা শুরু।

অবাক হয়ে জানলা দিয়ে গঙ্গার  নানান রূপ  চোখে  পড়ছে এবং মোবাইল ক্যামেরায় একের পর এক ছবি তুলে চলেছি। দুটো পরিবারের  চারজন  দুটো কেবিনে চলে গেল, তৃতীয় কেবিনে তিনজন  মহিলা এবং চতুর্থ কেবিনে আমরা দুই বন্ধু। রাতটা বেশ গভীর  হয়েছে, বন্ধুও  বেশ  গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন আর আমারও  চোখটা একটু লেগে এসেছে। হঠাৎই  যেন মনে হল জাহাজটাকে যেন কেউ ধাক্কা দিয়ে ডাকছে আর বলছে  চল্, এবার  তো ভাসার পালা। এদিকে জাহাজের ও  এলানো   শরীরে ঘুমটা  বেশ জাঁকিয়ে  এসেছে কিন্তু আমি যেন সেই জলের  বার্তা পেলাম " অ্যাই  ওঠ,  ছবি তুলবি না?" আমার  শরীরটা ও যথেষ্ট ক্লান্ত কিন্তু আমি সেই ডাকের হাতছানি  উপেক্ষা  করতে পারলাম না। আস্তে আস্তে বন্ধুর ঘুম না ভাঙিয়ে  একাই নদীর  সঙ্গে প্রেমে মত্ত হলাম।  সোঁ সোঁ করে আওয়াজ  করে জলের  ঢেউ একের পর এক ধাক্কা দিচ্ছে জাহাজটাকে আর দুলে দুলে উঠছে  সেই জাহাজ  মানে আমাদের ফ্লোটেল। একের পর এক ফটো তুলে চলেছি আর তন্ময় হয়ে দেখছি গঙ্গার  রূপ গভীর  নিশীথ রাতে। ডান দিকে দেখছি হাওড়া ব্রিজ আর জেটির  আলো আর বাঁদিকে দেখছি দ্বিতীয় হুগলি ব্রিজের আলো আর মাঝখানে আমি রয়েছি জেগে এই অসাধারণ রূপ দেখার  আশায়।  কখনও কখনও একটা নৌকো লন্ঠন জ্বেলে চলছে মাছ ধরার  আশায়। নিকষ কালো অন্ধকারে সেই চলমান নৌকো এক ভৌতিক  আবেশ সৃষ্টি করেছে। দেখতে দেখতে অন্ধকার আস্তে আস্তে ফিকে হতে লাগল এবং ভোরের আলো ফুটে উঠল। কিন্তু সমস্ত  রাত্রির  জাগরণ শরীরে কোন ক্লান্তির  ছাপ ই ফেলতে পারেনি কারণ আনন্দটা যে পরিমাণ  উপভোগ করেছি তা ক্লান্তিকে  আসতে দেয়নি। কেবিনে থাকা চায়ের ব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে চাঙ্গা হয়ে সাতসকালেই হাঁটতে বেরিয়ে পড়লাম হাইকোর্ট পাড়ার গলিতে। ফিরে এসে স্নান করে দুর্দান্ত  ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম বাড়ির  দিকে। ফেরার  পথে এলগিন রোডে আমূলের এক দোকানে নানাধরণের আইসক্রিমের স্বাদ চেটেপুটে  নিয়ে সোজা বাড়ি।
অসাধারণ এই ফ্লোটেলে থাকার  অভিজ্ঞতা বিশেষ করে রাতের বেলায় গঙ্গার এই আকর্ষণীয় রূপ  চিরদিন  মনে রাখার মতো।