Sunday, 17 August 2025

দাসুর পশুপ্রেম

মফস্বলের ছেলে দাশু একেবারে এলেবেলে ছেলে না হলেও খুব ভাল কিছু ও নয়। মোটামুটি ভাবে পাশ করে যায়। একটু হাঁফালো চেহারা বলে বন্ধুদের উপর খবরদারি করা স্বভাব আছে। তবে মনটা বেশ ভাল আর পশুপাখির প্রতি ওর একটা স্বভাবসিদ্ধ প্রেম বা আকর্ষণ আছে। ছোটবেলায় কোন স্যার পড়িয়েছিলেন "বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর
জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর" ওর মনে ভীষণ ভাবে গেঁথে গিয়েছিল। ছোট থেকেই একটু ক্যাবলা গোছের দাশু পকেটে মুড়ি কিংবা বিস্কুট নিয়ে বেরোত এবং পাড়ার কুকুর লালু, ভোলা, টমি ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গোরা সব ওর পিছন পিছন চলত এবং নিজেদের সীমানা অবধি তো যেত ই , দলবেঁধে অন্যদের ডেরায় ও কখনো সখনো চলে যেত। অনেকেই ওকে ঠাট্টা করে বলতো হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা। কিন্তু সাদাসিধে টাইপের দাশু কিছু মনে করতো না, বরঞ্চ কুকুর বিড়াল বা পশুপাখির মধ্যেই যেন ও ভাল থাকত কারণ অন্য বন্ধুরা ওকে দেখলেই টিটকারী মারত যেটা ওর পছন্দের ছিলনা এবং প্রতিবাদ করলেই ঝগড়াঝাঁটি এবং কোন কোন সময় তা হাতাহাতির পর্যায়েও চলে যেত। তার থেকে ঢের গুনে ভাল এই অবলা জীবজন্তুগুলোর মধ্যে থাকা।  এই পৃথিবীতে সবাই একটু গুরুত্ব পেতে চায়, দাশুই বা তার ব্যতিক্রম কিভাবে হবে? লালু, ভোলা, টমিরা কোন প্রতিবাদ করেনা, ওরা মাঝেমধ্যে একটু মুড়ি বা বিস্কুট পেয়েই সন্তুষ্ট। ওপর বয়সী অন্য ছেলেরা কুকুর দেখলেই ইটের টুকরো তাক করে ছুঁড়ত আর কখনো পায়ে বা গায়ে লাগলে কাঁই কাঁই করে আর্তনাদ করত আর ওদের আর্তনাদ শুনলেই দাশু ঠিক থাকতে না পেরে তাড়া করত যে ঢিল ছুঁড়েছে তার প্রতি এবং তাকে পাকড়াও করে দুচার থাপ্পড় লাগিয়ে দিত। আর এই কারণেই এসব সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে লেগে যেত ঝগড়া। তাদের সবার অনুযোগ যে পাড়ার সব কুকুরগুলোই কি দাশুর যে ওদের ঢিল মারলেই দাশু ফিরে আসবে মারতে? আর দাশুর বক্তব্য ছিল ঐ ঢিলটা যদি তাদের মারা যায় তাহলে ওদের কি লাগবে না? তাহলে শুধু শুধু কেন ঢিল ছোঁড়া তাদের প্রতি যখন তারা কোন দোষ করেনি?

আজ ষাট পঁয়ষট্টি বছর পরে এই তরজা আজ দেশ জুড়ে। সারমেয়প্রেমী বনাম সারমেয় বিদ্বেষী বা নিরপেক্ষ, পৌঁছেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দরজায় এবং আদালত রায় দিয়েছেন যে সারমেয়কুলকে রাস্তাঘাটে যথেচ্ছভাবে চলাফেরা করতে দেওয়া হবেনা এবং তাদের একটা বিশেষ জায়গায় রাখতে হবে যার নাম হবে সারমেয় নগর। সেখানে আর কেউ থাকবে না দাশু, হরি বা বাবলারা যারা ওদের বিস্কুট ভেঙে খাওয়াবে বা মুড়ি বা অন্যান্য খাবার খাওয়াবে।  যেখানে সবাই কুকুর সেখানে নিশ্চয়ই এলাকা দখল থাকবে যেমন মানুষের মধ্যে এক মস্তান বনাম আর এক মস্তান থাকে। মানুষের মধ্যে না হয় বিবাদ মেটানোর জন্য কাউন্সিলর বা বিধায়ক বা বেশি বাড়াবাড়ি হলে থানা, পুলিশ বা মহামান্য বিচারপতি হস্তক্ষেপ করতে পারেন কিন্তু সারমেয় খুলে বিবাদ হলে মিউনিসিপ্যালিটি বা কর্পোরেশনের পক্ষে দায়িত্বে থাকা লোকজন সেটাকে সামলাবেন না কেল্লা ফতে করার জন্য বিষ প্রয়োগ করে তাদের সরিয়ে দেবেন?  মানুষ যখন কাজ করতে হবে বলে করে, তখন তা হয় দায়সারা আর যদি সে অন্তরের ভালবাসা মিশিয়ে কাজটা করে তখন তার মাত্রা হয় আলাদা।

দাশু আর ইহজগতে নেই। থাকলে নিশ্চয়ই এই কাজের দায়িত্ব সে নিজে চেয়ে নিত এটা হলফ করে বলতে পারি। দাশু কিন্তু দু দুবার চৌদ্দটা করে আটাশটা ইঞ্জেকশন নিয়েছে এ সারমেয়দের কামড়ে। প্রথমবার বন্ধু দীপকের বাড়ি থেকে গল্পের বই আনতে গিয়ে ফকির কাকার কুকুরের কামড় খেয়ে। হাসপাতালের কম্পাউন্ডার পবিত্র বাবুর কুকুর কুকুর ডাকে সচকিত হয়ে হাফপ্যান্টের বোতামটা আলগা করে নাভির নিচে নামিয়ে পুটুশ করে ইঞ্জেকশন নিত আর পেটের ঐ জায়গাটা ছোট্ট টমেটোর মতো ফুলে উঠত। দ্বিতীয়বার যখন দাশুর কপালে জোটে কামড় তখন সে রীতিমতো যুবক। ভবানীপুরে শ্বশুরবাড়িতে বৌ ছেলেকে নামিয়ে দিয়ে মিত্রস্কূলের সামনে বাস স্টপে দাঁড়িয়ে আছে অফিস যাওয়ার জন্য। হঠাৎ ই এসপ্ল্যনেডগামী একটা মিনি বাস অনেক ভিড় থাকার জন্য ঐ স্টপে না থেমে স্পীড বাড়িয়ে চলে যাওয়ার মুখে একটা কুকুরের দুর্মতি  হয় রাস্তা পেরোনোর জন্য এবং অবধারিত ভাবে ধাক্কা খেয়ে বোঁ বোঁ করে ঘুরতে ঘুরতে মিনিবাসের সামনের চাকার ডানদিকে নিজের পেটটা চেপে ধরে যেমন আমাদের কোন জায়গায় ধাক্কা লাগলে বা কেটে গেলে আমরা সেই জায়গাটা চেপে ধরি। মিনিবাসটা ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে থেমে গেছে। রাস্তায় এত লোক কিন্তু দাশু গেল এগিয়ে , দুহাত দিয়ে আস্তে করে কুকুরটাকে সরিয়ে দিয়ে পাশে থাকা টিউবওয়েল থেকে আঁজলভরে জল নিয়ে কুকুরের মুখে দিতে গেল আর কুকুরটা জল খেয়ে মারা যাওয়ার আগে ওর বাঁ হাতে ব্যথার চোটে কামড়ে দিল অবশ্যই বুঝতে না পেরে। কোমড়ের উপর কামড় ,অতএব দশ মিলিমিটার করে ফের চৌদ্দটা ইঞ্জেকশন। কিন্তু এ সত্ত্বেও দাশুর সারমেয় প্রীতি বিন্দুমাত্র কমেনি বরং বেড়েছে। শুধু কুকুর ই নয়, বিড়াল বা অন্যান্য পশুপাখির প্রতি ওর বিশেষ ভালবাসা সবসময়ই চোখে পড়ত। কিন্তু দাশু আজ আর নেই। বেঁচে থাকলে সুপ্রিম কোর্টের এই  আদেশ নিয়ে যে ওর কি প্রতিক্রিয়া হতো তা ভাবতেও পারছিনা।
কথায় আছে ন্যাড়া বেলতলায় যায় একবার কিন্তু দাশুরা যায় বারবার। পৃথিবীতে এইরকম দাশু না থাকলে  একেবারে বিবর্ণময় হয়ে যাবে।

Tuesday, 12 August 2025

বিনিময়

প্রত্যেক জীবজন্তুই কিছু প্রত্যাশা করে, কোন কাজের বিনিময়ে টাকা কিংবা প্রশংসা বা টাকার বিনিময়ে কিছু কাজের বরাত যেটাকে একটু খারাপ ভাবে বললে শোনায় ঘুষ বা ভালভাবে বিচার করলে বলা যায় ভালবাসার বিনিময়ে ভালবাসা বা স্নেহের বিনিময়ে শ্রদ্ধা। যদিও গীতায় লেখা আছে কাজ করে যাও কোন ফলের আশা না করেই। এটা যত সহজে বলা যায় বাস্তবে ততটাই কঠিন। সৎকর্ম করে যদি তার স্বীকৃতি না পাওয়া যায় তাহলে সে কতদিন সেই ধরণের কাজ করবে তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বর্তমান পৃথিবীতে সবাই যখন নিজের লাভের জন্য ছুটছে তখন মুষ্টিমেয় কিছু নির্লোভ লোক তাতে বিরত থাকবে এটা আশা করা একটা বাতুলতা মাত্র। তবুও কিছু লোক নিশ্চয়ই রয়েছেন যাঁরা গীতার বাণী অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন এবং হয়তো তাঁদের জন্যই এই কথাটা " কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন" এখনও লোকের মুখে শোনা যায়। অনেকেই গীতার বাণী কথায় কথায় উদ্ধৃত করেন কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে কতটা মেনে চলেন তাতে ঘোর সন্দেহ আছে। তবু একটা কিছু শক্ত খুঁটি দরকার যাকে কেন্দ্র করে গরু ছাগলরা চরে খেতে পারে কিন্তু বৃত্তের বাইরে যেতে পারেনা। খুঁটি যদি শক্ত না হয় তাহলে চরতে চরতে টানে খুঁটিটাই উপড়ে যাবে এবং সবকিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে যাবে। সমুদ্রের ধারে পাহাড়ের গায়ে ঢেউগুলো আছড়ে পড়ে এবং ফিরে আসে দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে কিন্তু পাহাড় অটল অবিচল, দাঁড়িয়ে থাকে আর মৃদু মৃদু হাসে। ধর্মগ্রন্থগুলো ও অনেক টা সেই রকম, আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় কি করা উচিত আর কি না করা।
আমরা পড়ি এই ধর্মগ্রন্থ কিন্তু কতটা মেনে চলি তা আমাদের আধারের উপর নির্ভর করে। এই আধারটাও তৈরী হয় আমরা কিভাবে মানুষ হচ্ছি তার উপর। যে বাড়ির বড় মানুষদের মূল্যবোধ প্রবল সেখানে ছেলেমেয়েরা ও সেই গুণ সবটা না হলেও কিছুটা আত্মস্থ করে। তবে কি চোরের ছেলে ভাল মানুষ হয়না? নিশ্চয়ই হয় কারণ পাঁকেই পদ্মফুল ফোটে। অনেকেই আছেন যাঁরা কথায় কথায় ধর্মগ্রন্থের বাণী বা শ্লোক উচ্চারণ করেন কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তাঁদের আচরণ বিপরীত। তাঁদের জন্য এই কথাটা উপযুক্ত," আমি যা বলছি তাই কর কিন্তু আমি যা করছি তার কোর না।" এঁরা হচ্ছেন ভণ্ড এবং এঁদের আধিক্য ই চতুর্দিকে বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে।
কিন্তু তা বলে কি নিঃস্বার্থপর লোকজন নেই? অবশ্যই আছেন যদিও সংখ্যায় ভীষণ কম। এঁদের জন্য সম্মান ছাড়া আর কিছুই নেই কিন্তু এঁরা কে সম্মান দিল বা দিল না তার তোয়াক্কা করেন না এবং নিজেদের কর্মপথে অবিচল থাকেন। আর এঁদের জন্য ই পৃথিবী এখনও সচল। এঁরা অনেকটা সূর্যের মতন। সূর্য যেমন তার প্রভা দিয়ে পৃথিবীর ৮০০ কোটি মানুষের বেঁচে থাকতে সাহায্য করেও বিনিময়ে কিছুই চায়না এঁরা ও সেইরকম কারো কাছে কোন কিছু প্রত্যাশা না করেই নিজেদের কাজ করে যান। ভগবান এঁদের বাঁচিয়ে রাখুন।

Monday, 28 July 2025

পিতিবেশী

প্রতিবেশী শব্দটা অপভ্রংশ হয়ে পিতিবেশী হয়েছেন আমার ঠাকুমার ( আমরা দাদি বলতাম) কল্যাণে। জমিদার কন্যা ব্রিটিশ আমলে জজসাহেবের পুত্রবধূ, যাঁর স্বামী ও ব্রিটিশ সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যাঁকে অফিস নিয়ে যাওয়া বা বাড়িতে আসার সময় চোগা চাপকান ও পাগড়ি পরিহিত বিরাট গোঁফ ওয়ালা সান্ত্রী আসতো তাঁর মেজাজ তো থাকবেই। ঠাকু্র্দা( আমরা দাদু বলতাম) যত ই রাশভারী হোন না কেন বাড়িতে দাদির কথাই শেষ কথা। ওখানে কারো ট্যাঁ ফোঁ চলবে না , দাদু তখন কেঁচো। আসতে আসতে বড় হচ্ছি, শব্দটা কানে বেসুরো ঠেকতো বলে দাদিকে বললাম," তুমি পিতিবেশী পিতিবেশী বল কেন, প্রতিবেশী বলতে পারোনা?"  অন্য কোন নাতি নাতনীদের কাছে এরকম কথা শুনলে দাদির ঝাঁঝের চোটে তাকে তখনই বাড়ি ছাড়া হতে হতো কিন্তু সবচেয়ে ছোট বলে আমাকে একটু বেশিই ভাল বাসতেন, বলা যায় একটু বেশিই লাই দিতেন। তাই হেসে বললেন," বাবা, তোমরা স্কুলে যাচ্ছো, পড়াশোনা করছো, তোমরা বলবে এরকম কথা, আমরা তো গাঁয়ের মেয়ে, আমরা তো অত পড়াশোনা করিনি ,আমি ঐটাই বলব। " জেদ এটাকেই বলে। বাড়ির অন্য কেউ এই কথা বলে পার পেয়ে যেত না।
পাড়ার কোন ছেলে মেয়ে হুটহাট বাড়িতে ঢুকলে যদি দাদির নজরে পড়ত তাহলে আর রক্ষা নেই, চেঁচিয়ে তার গুষ্টির ষষ্টি পূজো করে দিত। সবাই এক কথায় বলতো দজ্জাল মহিলা। কিন্তু এই দাদিই ছিল অন্য মানুষ যদি তাঁকে জিজ্ঞেস করে কেউ কিছু করত। ছোট বেলায়  তাঁর এই দ্বৈত আচরণ কিছুতেই বোধগম্য হতো না। বাড়িতে দুটো পেয়ারা গাছ, দুটো আম গাছ, ফলের ভারে সবসময়ই নুয়ে পড়তো। টিয়া পাখি, কাঠবিড়ালি এসে পেয়ারা তলা, আমতলা আধখাওয়া ফলে ভরিয়ে দিত, তারা থোড়াই দাদিকে পাত্তা দেয়? পাড়ার ছেলেরা এসে যদি দাদির কাছে ফল পাড়ার কথা বলত, দাদি খুশী হয়ে বলত, " যাও, যত পার নিয়ে যাও " কিন্তু কিছু বদমাইশ ছেলে তো সবসময়ই থাকে, তারা চুপিসারে এসে আম বা পেয়ারা পাড়তে ভালবাসতো, আর এখানেই দাদির আপত্তি, দেখতে পেলেই চেঁচিয়ে ভেবিয়ে পাড়া মাত করে দিত। অবশ্য চুরি করে খাওয়ার মজাই আলাদা। এই দাদির কাছে বসে একদিন রাতে জিজ্ঞেস করলাম , " দাদি, এই পিতিবেশী বা প্রতিবেশী কাকে বলে?" দাদির সোজাসাপটা উত্তর , যে তোমার দরকার অদরকারে তোমার পাশে এসে দাঁড়াবে, সেই তোমার পিতিবেশী।" দাদি গ্রামের মেয়ে হলেও হিন্দু মুসলমান নিয়ে কোনদিন বাড়াবাড়ি করেনি। আমাদের বাড়ির লাগোয়ায় ছিল বাবুয়া খলিফার বাড়ি। বাবুয়া খলিফা পেশায় দর্জি হলেও উনি কিন্তু মৌলভি ছিলেন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে বিয়ে বা নিকা হতো। তাঁর পাঁচ ছেলে সাত্তার ,সাদিক, হুল্লুক, হামিদ ও হানিফ এবং তিনটে মেয়ে ছিল  ফুতু, বুলি ও আমিনা বা " বু"। কয়েকটা বাড়ির পরেই ছিল মুসলমান পাড়া। কিন্তু বাবুয়া খলিফা অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন এবং আমাদের বাড়িতে তাঁর যথেষ্ট আসা যাওয়া ছিল। দাদির পরিভাষায় উনি একজন পিতিবেশী। পশ্চিম দিকে পাখি সান্যালের মাসী শ্বাশুড়ি তিনিও একজন, ওদিকে ভট্টাচার্য পাড়ার ফেনু বাবু ( যিনি খ্রিস্টান ধর্ম নিয়েছিলেন ) তিনিও একজন পিতিবেশী। এছাড়াও পাড়ার সমস্ত বাড়ির ভদ্রমহিলা যাঁরা তাঁর সমবয়সী ছিলেন তাঁরাও পিতিবেশী। জিজ্ঞেস করলাম যে দাদি, তাহলে বাদ গেল কে এবং তুমি এত চেঁচামেচি কর কেন? পাড়ার ছেলেরা আম বা পেয়ারা পাড়তে এলে বা ঘুড়ি ধরতে এলে চেঁচামেচি কর কেন? এবার মুখ খুললেন দাদি, দেখ আমাকে না জিজ্ঞেস করে যদি কেউ কিছু করে তাহলে আমি কেন চেঁচাব না? আমি তো সবসময়ই ওদের বলি আমাকে জিজ্ঞেস করে কাজটা কর। আমি বুঝলাম যে দাদির অহঙ্কারে এই অবজ্ঞা লাগে। সত্যিই তো, একটু বললেই যদি  সোজা রাস্তায় কাজটা হয়ে যায়, তাহলে চুরি চামারি করে দাদিকে 
রাগানো কেন? আসলে ছেলেরা একটু মজা করতে চায়। বাড়ির মাঠে নাটক ও বিচিত্রানুষ্ঠান হবে অথচ আকাশের মুখ ভার। কে হঠাৎ বলে উঠল আমার দাদির কোন নিত্য ব্যবহার্য জিনিস লুকিয়ে রাখ। দাদি জিনিসটা দেখতে না পেয়েই চেঁচামেচি করবে ও গালমন্দ শুরু করবে আর তাতেই নাকি বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে। যা বলা, তাই কাজ। বাদল দা  দাদির ঘটি লুকিয়ে রেখেছে আর দাদি দেখতে না পেয়েই চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে কিন্তু বৃষ্টি বন্ধ হবার কোন লক্ষনই দেখা যাচ্ছে না দেখে ঘটিটাকে চুপিসারে বাদল দা রেখে দিল। অন্ধকারে দাদি ঘটি ফিরে পেতেই একদম ঠাণ্ডা জল হয়ে গেল দাদি। দাদির মাথা গরম হলে একমাত্র রক্ষাকর্তা আমি। না বাবা, না মা বা জ্যাঠামশাই,জেঠিমা কেউ না। দাদু খুব ঠাণ্ডা প্রকৃতির মানুষ, দাদু কিছু বলতে গেলেই উল্টে বিপত্তি, সব নষ্টের মূল হচ্ছো তুমি। ভদ্রলোক দাদু পালাতে পারলে বাঁচেন।

এহেন পিতিবেশীর সংজ্ঞা আবার মনে পড়ে গেল যখন পূর্ব দিকের বাড়ির ভদ্রলোক চলে গেলেন। এই ওড়িয়া পরিবারের সঙ্গে কোনদিন কথাবার্তা ও হয়নি। কিন্তু কেন জানিনা এই পরিবারের সমস্ত সদস্যদের ই দেখে খুব পরিচ্ছন্ন পরিবার বলে মনে হতো। সকাল সন্ধে হুলুধ্বনি, শাঁখ বাজিয়ে পূজো, ছোট ছেলেটা ঘন্টা নাড়িয়ে ব্যালকনিতে এসে তুলসিমঞ্চে জল দিচ্ছে বা ধূপকাঠি জ্বালিয়ে  সন্ধে দিচ্ছে  এসব দেখে মনে হতো যে বাড়ির একটা ভ্যালু সিস্টেম রয়েছে। ওর দিদি টা বিশেষ বড় নয় কিন্তু ভাইকে পড়ানোর ধরণ দেখে নিজের মনের মধ্যেই একটা ছবি এঁকে ফেলেছিলাম। মাঝে মাঝেই বলতাম এই পরিবারের সবাই খুব পরিচ্ছন্ন। কয়েকদিন ধরেই দেখছি অনেক রাত অবধি আলো জ্বলছে, ভাবলাম আজকাল ছেলেমেয়েদের কাজ কর্মের ধারা পাল্টেছে, সেই কারণেই হয়তো দেরী কিন্তু আমার ধারণা ভুল। তারা গোছগাছ করে চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরশু দেখি এয়ার কন্ডিশনারটা খুলছে। একটু অবাক হয়েই গেলাম নতুন এয়ার কন্ডিশনারটা এর মধ্যেই বিগড়ালো? কেবলই মনের মধ্যে একটা অযথা আগ্রহ জেগে উঠছে। কিন্তু কেন, কোনদিন ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলা বা তাঁদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা হয়নি অথচ আমার কৌতুহল কমছে না। গতকাল ছেলেটা বাঁশি বাজাচ্ছিল, কিছুদিন ধরেই শিখছে। খেয়াল করতাম যে আমি যে সরগম গুলো করছি ঐ ছেলেটি সেটা করার চেষ্টা করছে। বেশ আনন্দ হলো, কাউকেই কোনদিন গান শেখাইনি,হয়তো মাঝে মধ্যে কাউকে একটু আধটু দেখিয়ে দিয়েছি বড় জোর। আর এই ছেলেটি একলব্যের মতো নিষ্ঠার সঙ্গে আমি যেগুলো করছি, সেইগুলোই করছে ভেবে খুশিতে মনটা ভরে যেত। আমার মনের ভুল ও হতে পারে। হয়তো যে মাস্টার মশাইয়ের কাছে ছেলেটি শিখছে তিনিই হয়তো ঐগুলো দিয়েছেন কিন্তু আমি মনে মনে ভাবতাম আর প্রার্থনা করতাম যে ছেলেটা যেন খুব ভালভাবে বাজাতে পারে। গতকাল ও ছেলেটি গাছে জল দিয়েছে কিন্তু আজ তাকে বা তার দিদিকে দেখতে পেলাম না। সকাল বেলায় দেখি ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা জামাকাপড় মেলার দড়িটা খুলছেন এবং জামাকাপড়গুলো উঠিয়ে নিচ্ছেন। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম আপনারা কি চলে যাচ্ছেন? 
হ্যাঁ।
শুনে জিজ্ঞেস করলাম কি ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছেন?
না, পল্লীশ্রীতে একটা ফ্ল্যাট কিনেছি, অনেকদিন এখানে ছিলাম, মনটা বেশ খারাপ লাগছে।
আমি বললাম, মন খারাপ করবেন না, নিজের ফ্ল্যাটে চলে যাচ্ছেন, এ তো বড় খুশীর খবর। অভিনন্দন জানালাম এবং বললাম যে কাছেই যাচ্ছেন, সময় সুযোগ করে আসবেন।

এতদিন সামনাসামনি থাকলাম, কোনদিন কোন বাক্যালাপ ও হয়নি, অথচ আজ বিদায় বেলায় তাঁকে আমন্ত্রণ জানালাম বাড়িতে আসার জন্য।  ইনি তাহলে একজন নিশ্চয়ই পিতিবেশী। কিন্তু দাদির কথা অনুযায়ী ইনি কোনভাবেই আমাদের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হননি, তাহলে তো দাদির কথা মিলছে না। না, এঁদের মানসিক তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের সঙ্গে আমার মনের তরঙ্গ মিলে একটা রেসোন্যান্স তৈরী হয়েছে আর সেই কারণেই ওঁদের চলে যাওয়াটা মনের মধ্যে এইরকম একটা ঢেউয়ের সৃষ্টি করেছে। নিশ্চয়ই ইনি পিতিবেশী থুড়ি প্রতিবেশী।

Saturday, 26 July 2025

মনসুখ ভাইয়ের রোজনামচা

আমেদাবাদ শহরে " বাসনা " অঞ্চলে মনসুখ ভাইয়ের আস্তানা। আস্তানা শব্দটা কানে এলেই মনে হয় একটা বাড়ি(গেট ওয়ালা বড় বাড়ি কিংবা নিদেন পক্ষে  একটা ছোট কুঁড়ে ঘর) কিন্তু মনসুখ ভাইয়ের আস্তানা খোঁজ করতে গিয়ে আমি রীতিমতো নাস্তানাবুদ হয়ে গেলাম।

যে গেস্টহাউসে ছিলাম তার বাইরে গেটের ধারে কোন সাতসকালে এসে ঠেলাগাড়ি নিয়ে এসে যেত মনসুখ ভাই, আর সকাল থেকেই তার খরিদ্দার আসতে শুরু করে দিত, কেউ নিত ইডলি বড়া আবার কেউ বা নিত ডাল বড়া ও কান্দা ভাজি( আমাদের পরিভাষায় পেঁয়াজি)। কিন্তু মোটামুটি বেলা বারোটা বাজতেই সেই ঠেলাগাড়ি সমেত মানুষটাই উধাও।  বেশ কিছুদিন হলো গেস্টহাউসেই আছি, ফ্ল্যাটের অ্যালটমেন্ট এখনও আসেনি, অফিস করতে হচ্ছে  সেই গেস্টহাউস থেকেই। সকালের জলখাবারটা মনসুখ ভাইয়ের কাছ থেকেই নিচ্ছি কারণ সেই একঘেয়ে ব্রেড, বাটার আর ওমলেট মুখে রুচছে না। কিন্তু মুশকিল হলো ওর কাছে সবসময়ই ভিড়, আমার কাছে টাকা ওর নেওয়া হয়ে ওঠেনা, বলে বাদ যে একসাথে লে লেঙ্গে, বরাবর(মানে ঠিক আছে)। একটু অস্বস্তি ই হয় কারণ আমার ফিরে আসার সময় সে তো থাকেনা।

এদিকে ফ্ল্যাটের অ্যালটমেন্ট এসে গেছে, আমাকে চলে যেতে হবে। ফিরে এসে দেখি মনসুখ ভাই নেই। গেস্টহাউসের কেয়ারটেকারের কাছে দিতে গেলাম কিন্তু কেন জানি না ও নিল না, সম্ভবত ওর ব্যবসার লাভে ভাগ বসিয়েছে বলে। মনটা খচখচ করছে গরীব মানুষের পয়সা না দিতে পারার জন্য। যাই হোক রবিবার ঠিক করলাম আজ যে ভাবেই হোক ওর পয়সা মেটাবোই। কিন্তু সকালে উঠতে দেরি হওয়ায় এবং শহরের অন্য প্রান্ত থেকে আসতে দেরি হয়ে গেল এবং যথারীতি ও ভাগলবা। কিন্তু আমি ওকে আজ যেভাবেই হোক পয়সা দিয়ে যাব ই ঠিক করেছি। আশেপাশের লোককে জিজ্ঞেস করে তিনটে মোড় পেরিয়ে পেলাম দেখা তার বাড়ি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক সময় গড়িয়ে গেছে। খিদেতে পেট চোঁ চোঁ করছে কারণ বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন রকম দিক নির্দেশন যার ফলে আমার আজ হাঁড়ির হাল।
 মোড়ের কাছে একটা পার্ক আর তার কাছেই এক জৈন মন্দির। মন্দিরের লাগোয়া একটা দেয়ালে রয়েছে মনসুখ ভাইয়ের সেই গাড়ি। চারটে ইট দিয়ে আটকানো আছে গাড়ির চাকা আর একটা শিকল দিয়ে একটা চাকা বাঁধা আছে দেয়ালের রেলিং এর সঙ্গে যাতে গাড়িটা বেসামাল হয়ে অন্য জায়গায় না চলে যায়। গ্যাসের স্টোভ, কড়াই গাড়ির পেটের তলে একটা বাক্সে চলে গেছে যেটা এখন তালা বন্ধ এবং ওপরের পাটাতনে যেখান থেকে অন্য সময় বিক্রি পাট্টা করে সেখানে একটা চটের উপর চাদর বিছিয়ে পরমানন্দে মনসুখ ভাই ঘুমিয়ে আছে। ঘুম ভাঙাতে একটু মনটা খারাপ ই লাগছিল কিন্তু আমাকে আবার ফিরে আসতে হবে ভেবে ডেকেই ফেললাম। সারাদিন এত পরিশ্রম করে যে কয়েকবার ডাকার পর তার ঘুম ভাঙলো এবং চোখ কচলাতে কচলাতে বলল, " সাব, আপ!" ম্যায় আপকো পাস যো বহুত কর্জ হ্যায়, উয়ো চুকানে কে লিয়ে আয়া হুঁ।" এতনা তকলিফ কিঁউ উঠায়া সাব? আপ থোড়ি ভাগনে বালা আদমী হ্যায়? একটু অবাক হয়ে গেলাম ওর আমার উপর ভরসা করা দেখে। সাধারণত কেউ ধারে কোন জিনিস দিতে চায়না আর দিলেও পয়সা ফেরত পাওয়া এক ভাগ্যের ব্যাপার কিন্তু যে লোকটার এই গাড়িটাই সম্বল, এটাই ওর কর্মস্থল এবং ঘর সেই লোকটা কেবল বিশ্বাসের উপর ভরসা করে এত টাকা বাকি থাকা সত্ত্বেও এত নিশ্চিন্তে কি করে ঘুমায়? আসলে যাদের অনেক সম্পদ তারা সামলাতেই ব্যস্ত আর যারা ভগবানের উপর ভরসা করে সামান্য পূঁজি নিয়ে সৎপথে এগিয়ে চলে তারাই বোধহয় এত নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। জিজ্ঞেস করলাম যে বারিশ কা মৌসমমে ক্যায়সে রহতে হ্যায় ইঁহা?  ও দেখালো প্লাস্টিকের চাদর। এই দিয়ে বৃষ্টির সঙ্গে যুদ্ধ করে। এইরকম মনসুখ ভাই সারা দেশে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে এবং যথেষ্ট সততার সঙ্গে বেঁচে আছে আর অন্যদিকে প্রচুর সম্পদের মালিক তারা কত অসদুপায়ে টাকা রোজগারের ফন্দিফিকির খুঁজছে। এরাই  চিরদিন বলীয়ান আর মনসুখ ভাইদের সততার পুণ্যে এই অসৎ লোকগুলো মাথার উপর বসে রাজত্ব করে চলেছে।
মনসুখ ভাই আপনারা বেঁচে থাকুন অনেকদিন। ভগবান আপনাদের মঙ্গল করুন।

Wednesday, 9 July 2025

স্মৃতি ও বিবেক

স্মৃতির সঙ্গে বিবেকের কোন সম্পর্ক আছে কিনা ঠিক জানা নেই। কিন্তু একটা কথা ঠিক যে বিবেকের দংশন হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে টেনে বার করে আনে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই হৃদয় বলে কিছু জিনিস থাকে কিন্তু কোন কোন সময় তা বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে চাপা পড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেনা কিন্তু আগুন যেমন চিরকাল ছাই চাপা পড়ে থাকেনা ঠিক সেই রকমই হৃদয়ের বাহ্যিক প্রকাশ হবেই। বিবেক তাকে ঠিক টেনে আনবেই। দুর্বাসা মুনির আশীর্বাদে কুন্তী সূর্যদেবের আবাহন করতেই ঘটে গেল বিপত্তি, জন্ম হলো কর্ণের এবং কুন্তী তাকে ঝুড়িতে শুইয়ে দিয়ে জলে ভাসিয়ে দিয়ে তখনকার মতো নিজের লজ্জ্বা বাঁচালেন বটে কিন্তু বিবেকের তাগিদেই হোক আর কুরুপাণ্ডবের যুদ্ধে নিজের ই এক সন্তান অন্য পাঁচ সন্তানের সঙ্গে যুদ্ধ যাতে না করে সেই কারণেই হোক, যুদ্ধের আগের দিন সন্ধ্যা বেলায় কর্ণের কাছে নিজের পরিচয় দিতে গেলেন , কিছুটা কি আত্মগ্লানি ঘোচাতে নয়? কবিগুরুর কলমে ঝরেছে, " লোভে যদি কারে দিয়ে থাকি দুখ, ভয়ে হয়ে থাকি কর্ম বিমুখ, পরের পীড়ায় পেয়ে থাকি সুখ মোহের ভরে, আমার বিচার তুমি করো তব আপন করে।" সুতরাং কোন না কোন সময় মানুষ বিবেকের দংশনে কাতর হবেই এবং দীর্ঘদিনের অব্যক্ত যন্ত্রণা বেরিয়ে আসবেই।

সন্তানেরা তাদের বাবা মায়ের অত্যন্ত প্রিয় জিনিস বা শখের জিনিস তাঁদের মৃত্যুর পর বিক্রি করে দেয় হয় লোভের বশে কিংবা একাধিক ভাইবোন থাকলে কে সেই জিনিসটা রাখবে তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে যাতে সম্পর্কের হানি না ঘটে বা সেই জিনিসের রক্ষণাবেক্ষণ আদৌ সম্ভব হবে কিনা সেটা ভেবে বা কিছু অর্থাগম হবে এই আশায়। এখানে ভাবাবেগ কোন কাজ করেনা এবং কারো সেটা থাকলে তাকে নানাভাবে প্রকাশ করতে দেওয়া হয়না। অথচ জিনিসটা হস্তান্তরিত হবার পর ক্রেতা যখন মূল জিনিসটা অবিকৃত রেখে তার সৌন্দর্য বাড়ায়, তখন তাদের বিবেক জাগ্রত হয় বা ভাবাবেগ বেরিয়ে আসে এবং চোখের জল ফেলে। জিনিসটাকে ধরে রাখা যে খুব কঠিন ছিল তা নয় কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তাকে তো ধরে রাখার চেষ্টা করাই হয়নি বা যে ধরে রাখার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিল তাকেও যেন তেন প্রকারেণ তাকে দমিয়ে রাখা হয়েছিল। আমরা কোন জিনিসের মূল্য তার জীবদ্দশায় ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা, তার মূল্যায়ন হয় সেটা হাতছাড়া হবার পর। এটা কি বিবেকের দংশন না আর কিছু?

Thursday, 5 June 2025

পোষ্য

অনেক দূরের পাড়ি, সুতরাং গোটা তিনেক বাস ছেড়ে জানলার ধারে একটা সিট নিয়ে বসে আছি । বাস টার্মিনাসের পাশেই এক অনুষ্ঠান বাড়ি যা সব সময়ই ভর্তি থাকে কারণ বাড়িটার অবস্থান। আগের দিন রাতেই একটা বড়মাপের অনুষ্ঠান  হয়ে গেছে। অনেক বাড়তি উচ্ছিষ্ট খাবার পাশের ভ্যাটে পড়েছে যেখান থেকে ফুটপাতে থাকা কিছু  গরীব মানুষ এবং রাস্তার একদল কুকুর প্রতিযোগিতায় নেমেছে কে কতটা খাবার জোগাড় করতে পারে । মানুষগুলো মাঝে মাঝেই  রাস্তায় পড়ে থাকা ইঁট কুড়িয়ে কুকুরগুলোর দিকে তাক করছে এবং  এরই মধ্যে কুকুরগুলোও কিছু কিছু খাবার নিয়ে  পালাচ্ছে এবং নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করছে। মানুষ এবং কুকুরের প্রতিযোগীতা দেখতে দেখতেই সময়টা কেটে যাচ্ছে কিন্তু বাস ছাড়তে এখনও বেশ খানিকটা দেরী আছে। হঠাৎই জানলার উল্টোদিকে একটা সুন্দর ল্যাব্রাডর কুকুরের দিকে চোখ পড়ল। কুকুরটা আমার ই মতো সেই খাবার কাড়াকাড়ি দেখছে একদৃষ্টে কিন্তু কোথায়  যেন তার সম্মানে বাধছে সেই প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতে । দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে খুব খিদে পেয়েছে কিন্তু কিছুতেই সে ঐদিকে যাচ্ছেনা । অথচ গেলেই ওর চেহারা দেখে কি মানুষ বা কি কুকুরের দল ভয়ে পালাবে। কিন্তু সে ভীষণ দ্বিধাগ্রস্ত। একদিকে তার খিদে আর অন্যদিকে তার সম্মান । 
ভাবতে চেষ্টা করলাম  এইরকম সুন্দর একটা কুকুরকে কে ছেড়ে যেতে পারে?  কিছু লোক আছে যারা বাড়িতে দারুণ একটা কুকুর  পুষবে এবং তাদের নাম ও কোন ছেলের বা মেয়ের নামে রাখবে কুকুরের লিঙ্গ অনুসারে। বাইরের  কোনও লোক তাকে কুকুর বললে তারা খুব রাগ করে এবং তাকে তখন নিজের ছেলে বা মেয়ে বলে মনে করে।  ভালবাসা তো সত্যিই ভাল জিনিস । হৃদয়ের কোমল দিক থাকা তো সত্যিই প্রশংসনীয় কিন্তু কুকুরটা যখন বুড়ো হয়ে যাবে বা নিজেরা যখন বদলি হয়ে যাবে অন্যত্র তখন পোষ্যকে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে তাকে তার ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেওয়া এক ভীষণ অমানবিক কাজ। অনেক লোকই আছেন যাঁরা  পোষ্যকে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যান বা তাঁর ঘনিষ্ট কোনও বন্ধুর কাছে জিম্মা করে দিয়ে যান। এতে তাঁদের মনেও একটা শান্তি থাকে এবং পোষ্য ও ভাল থাকে। 
যাই হোক,  কুকুরটার ঐ অবস্থা দেখে এক প্যাকেট বিস্কুট  কিনে দুটো বিস্কুট দূর থেকে  ছুঁড়ে দিলাম কারণ বেশ ভয় লাগছিল  ঐ বড়সড় কুকুরটাকে দেখে। কিন্তু কুকুরটা একবার বিস্কুটের দিকে তাকিয়ে  মুখটা ফিরিয়ে  নিল কারণ খিদে লাগলেও সে অভ্যস্ত নয়  এরকমভাবে খেতে। মনে একটু সাহস সঞ্চয়  করে এগিয়ে গেলাম তার দিকে, বিস্কুটের প্যাকেট থেকে  একটা বের করে ওর মুখে দিলাম , ও আমার দিকে  একবার তাকালো, কি মনে হলো ওর যেন ওর পুরনো মনিব ই ওকে খেতে দিচ্ছে। একদৃষ্টে চেয়ে রইল আমার পানে, লক্ষ্য  করলাম ওর চোখের কোণে একটু জল।সন্দেহ করছে যে আমার মনিবের চেহারাটা কেমন করে এতটা বদলে গেল । অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে আস্তে করে আমার হাত থেকে বিস্কুট সে নিয়ে চিবোতে লাগল। আমিও সাহস পেয়ে প্যাকেট থেকে একটা একটা করে বিস্কুট নিয়ে ওকে খাওয়াতে থাকলাম আর ও ধীরে ধীরে লেজ নাড়াতে নাড়াতে খেতে থাকল। ইতিমধ্যে বাস ছাড়ার সময় হয়ে গেল বুঝতে পারলাম কণ্ডাক্টরের কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে উঠতে দেখে। মাথায় বার বার করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বাসে উঠলাম । জানলা দিয়ে দেখি সে আবার ও তার মনিবকে হারিয়ে ফেলল ভেবে অপলক দৃষ্টিতে অপসৃয়মান বাসের দিকে চেয়ে আছে। মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত হয়ে গেল । ফিরে আসলাম কয়েকদিন পরে এবং  ফিরে এসে খুঁজতে থাকলাম সেই সুন্দর ল্যাব্রাডর কুকুরটাকে কিন্তু কেউ কোন হদিস দিতে পারল না। কোথায় যে উধাও হয়ে গেল কেউ জানেনা ।

Monday, 2 June 2025

শুধু যাওয়া আসা

ব্যস্ত শহরে প্রায় সব পরিবারের চেহারাই মোটামুটি এক। ছিমছাম সংসার স্বামী, স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ভরপূর। স্বামী এবং  স্ত্রী দুজনের ই বাবা ও মা জীবিত, সুতরাং বাচ্চারা দুই তরফের দাদু, দিদিমা ও ঠাকুর্দা, ঠাকুমার সাহচর্য পায় এবং বাচ্চারা ছুটির সময় আনন্দে  টইটুম্বুর। একই শহরে হলে কিছুদিন এবাড়ি আর কিছুদিন ও বাড়ি আর ভিন্ন শহরে হলে গরমের ছুটি এখানে তো ক্রিসমাসে অন্যখানে। মাঝে মাঝে  দুইপক্ষের দাদু, দিদাদের নিয়ে ছুটি কাটানো। কিন্তু এটা একটা আদর্শ কল্পনায় ভরপূর চিত্র। বেশীরভাগ সময়ই এই ছবি অনুপস্থিত  বিভিন্ন কারণে। যাক ঐসব নিয়ে অন্য কোন সময়‌ আলোচনা করা যাবে।
বড় শহরে স্বামী, স্ত্রী দুজনকেই চাকরি করতে হয় আজকাল  সংসারে  সচ্ছলতা বজায় রাখতে । আগের দিনের মতো একেবারে নিপাট গৃহকর্ত্রী পাওয়া খুবই মুশকিল । তবে একেবারে  যে অমিল তা নয়। হয় স্বামীর বিরাট ব্যবসা কিংবা স্বামী খুবই নামজাদা ডাক্তার বা উকিল,  সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে চাকরি নাও করতে হতে পারে তবে সেখানে স্ত্রীরা নানারকম সামাজিক কাজকর্মে ব্যস্ত থাকেন যার নীট ফল বাচ্চারা মানুষ  হচ্ছে কাজের লোক বা একটু গম্ভীর ভাবে বললে বলতে হয় ন্যানির কাছে। যে যেরকম ওজনদার লোক তাদের ন্যানিরাও সেইরকম ই ওজনদার ।
বিভিন্ন ধরণের সংস্থা রয়েছেন যারা  এই কাজের লোক ( আয়া) বা ন্যানি সরবরাহ করে এবং  বহু লোক সাধারণ ভাবে  বা রিটায়ার করার  পরে এই রমরমা ব্যবসার সঙ্গে  যুক্ত । এখানে বিনিয়োগ সাঙ্ঘাতিক কিছু বেশী নয় তবে পরিচিতি এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ । যার পরিচিতির ব্যাপ্তি যত বেশী সে তত ভালভাবে  ব্যবসা করবে। আর একবার এই বাজারে ঢুকলে তার ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠতে বাধ্য।  এদের একটা ডেটা বেস তৈরী করতে হয় কারণ বিভিন্ন লোকের চাহিদা বিভিন্ন রকম। শুধু বড় শহর ই নয় সব জায়গায়ই এই ব্যবসা এখন রমরমিয়ে চলছে। ছোট শহরে রোজগারের পরিমাণ কম আর বড় শহরে সরকারী  চাকরির  চেয়ে কোন অংশে কম নয়। তাদের মাসে চারদিন ছুটি, খাওয়া দাওয়া সমেত একমাসের বোনাস। যদি সে অন্য  শহর থেকে  আসা লোক হয়ে তবে তাকে বছরে  এক বার/ দুবার ছুটি এবং  যাতায়াত বাবদ এসিতে বাড়ি যাওয়া আসার খরচ দিতে হবে। মফস্বল বা ছোট শহরে আগে যেমন ঠিকে কাজের লোক থাকত এখনও  তা আছে তবে তারা চারটে পাঁচটা বাড়িতে কাজ করে যে পরিমাণ টাকা রোজগার করে তা সিভিক ভলান্টিয়াররাও পায়না। সিভিক ভলান্টিয়ারদের পনের ঘন্টা ষোল ঘন্টা কাজ করার পর তাদের ঊর্ধতন কর্মচারীদের গালমন্দ ও শুনতে হয় এবং  বিনিময়ে তারা পায় মাত্র নয়  হাজার টাকা। সুতরাং,  তারা সুযোগ  পেলেই যে চুরি করবে তাতে আর আশ্চর্য কি?  যারা আবার একটু চালাক চতুর তারা তাদের ওপরয়ালার হয়ে টাকা সংগ্রহ করে এবং সেখান থেকে  একটা ভাল টাকা ভাগ হিসেবে পেয়ে থাকে। আর ভদ্রবেশী ওপর ওয়ালা  সামনে সুন্দর  মুখোশ পড়ে ঐ সিভিক ভলান্টিয়ারকে পিছনে লেলিয়ে দিয়ে সেখান থেকে  দাঁও মারে। কিন্তু ঠিকে কাজের লোকেরা মোটামুটি  সাত আট ঘন্টা কাজ করে পনের  বিশ হাজার টাকা কামিয়ে নেয় । আসা যাওয়ার জন্য‌ বিনে পয়সার ট্রেন এবং যেসমস্ত বাড়িতে কাজকর্ম করছে সেখানে চা, জলখাবার ও দিনের  খাওয়া হয়ে যায়। এছাড়া সরকারী  অনুদান তো আছেই । বড় শহরে আয়া সেন্টার রা বারঘন্টা বা চব্বিশ ঘন্টার লোক সরবরাহ করে এবং তাদের সাম্মানিক মূল্য একমাসের টাকা। আগে গ্রামের লোক গ্রামের  বাইরে প্রায়‌ আসতো ই না কিন্তু যানবাহনের সুযোগ বৃদ্ধি ঘটায় তাদের কাজের সন্ধানে বেরিয়ে আসতে হচ্ছে এবং প্রত্যেক  মানুষ ই চায় তাদের শ্রী বৃদ্ধি  হোক। চাকুরীরত স্বামী স্ত্রীদের ও লোকজন ছাড়া চলবে না কারণ তাদের বাচ্চা না সামলালে তারা দুজনেই  কাজে বেরোতে পারবেন না আর এই কাজের লোকেরা রোজগার করে তাদের ছেলেমেয়েদের ভাল খাওয়া দাওয়া এবং শিক্ষার  ব্যবস্থা করতে পারছে আর মাঝখানে এই আয়া সেন্টারের পরিচালকরা দুইপক্ষের  যোগাযোগ ঘটিয়ে দিয়ে টাকা রোজগার করছে অনেকটা উবের, ওলা বা এয়ার বি এন বির মতো।
এখন এই বাচ্চাগুলোর কি অবস্থা সেটা একটু দেখা যাক। এই কাজের লোক বা ন্যানিরা কাজ না পোষালে চলে যাচ্ছে এবং  আয়া সরবরাহকারী সংস্থারা অন্য  ন্যানিকে দিচ্ছে এবং  নতুন  ন্যানির সঙ্গে একটু মেলবন্ধন হতে না হতেই পুরনো ন্যানি আবার উপস্থিত কারণ নতুন  জায়গায় ডাল না গলায় তিনি আবার  পুরনো জায়গায়  ফিরে এসেছেন এবং  বাচ্চাটাও পুরনো ন্যানিকে ফিরে পেয়ে স্বাভাবিক  হয়েছে  কিন্তু নতুন ন্যানির দোষ টা কি? কিছুই নয়, কারণ যে কোন লোক  নতুন  জায়গায়  এসে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময়ই নেবেই কিন্তু না বাচ্চার মা না বাচ্চাটি সেই সময় দিতে রাজী নয়। অতএব  তাকে চোখের  জল নিয়ে বিদায় নিতে ই হবে যদিও তার সেরকম দোষ হয়তো  নাই। তাকে ছলছলে চোখ নিয়েই বিদায় নিতে হবে কারণ তার  সবচেয়ে  বড় শত্রু সময়।