তিরুপতিতে সবসময়ই ভিড় । ভারতের বিভিন্ন অংশ থেকে দলে দলে লোক আসে বাবা ভেঙ্কটেশের দর্শনে পুণ্যলাভের আশায়। আর আসবে নাই বা কেন। কত লোক কতরকম অনৈতিক কাজ করে পাপস্খালনের উদ্দেশ্যে মন্দিরে বহুমূল্য কিছু জিনিস বাবার চরণে সমর্পণ করে (একরকম ঘুষ দিয়ে) আত্মপ্রসাদ লাভ করে কিন্তু এটা বুঝতে পারেনা যে ঘুষ তুমি যতই দাও চিত্রগুপ্তের খাতায় তা উঠে গেছে এবং ঠিক সময়ে তা প্রকাশিত হবে। অনেকেই এতে বিশ্বাস করে বলে পাপের সংখ্যা কিছুটা হলেও কমে। কিন্তু বর্তমান যুগে সবাই বিনধাস চলে এবং ফলস্বরূপ ছোট বড় কুচোকাচা লোক প্রায় সবাই খুব বেশিমাত্রায় পাপ করে। এরই মধ্যে ও দেখে একটা জায়গায় খুব জটলা আর একটা মেয়ে তারস্বরে চিৎকার করে মানুষের সাহায্য চাইছে আর যথারীতি সাধারণ মানুষ সাহায্য করার বদলে আনন্দ উপভোগ করছে যেমনটি হয়েছিল কুরুপাণ্ডবের দ্যুতসভায় দ্রৌপদীর সঙ্গে। সেইদিন ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপাচার্য, ধৃতরাষ্ট্র ও বিদুর যেমন মৌন ছিলেন তেমনই আজকের জনতাও ছিল মৌন। কিন্তু পাঞ্চালির আর্তনাদে যেমন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, আজও তেমন তিনি একদল কুকুরের রূপ ধরে মেয়েটির সাহায্যে এগিয়ে এলেন। ঘেউ, ঘেউ করে সারমেয় দলের সমবেত স্বর এগিয়ে আসতে লাগল ঐ মেয়েটির দিকে এবং তাতে হেনস্থাকারীরা এদিকে ওদিকে পালাতে লাগল। ক্রমশ ভিড় একটু পাতলা হয়ে এলে একটি কুকুর মেয়েটির খুব কাছে এসে শুঁকে তার অসুস্থতার গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা করল এবং তার দলের অন্যদের সেখানে রেখে দৌড় দিল এবং একটি ছোট্ট হাসপাতালের সামনে ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে শুরু করল এবং নাচতে থাকল। ডাক্তার বা নার্সের মধ্যেও তো অনেক সহৃদয় লোক থাকেন তাঁদেরই মধ্যে একজন নার্স কুকুরটি কি বলতে চাইছে বোঝার জন্য বাইরে এলেন এবং কুকুরটিও তাঁকে দেখে আরও জোরে ঘেউ ঘেউ করে নাচতে থাকল এবং কিছু বলার চেষ্টা করতে থাকল নিজের ভাষায়। ভদ্রমহিলা কুকুরটির কাছে আসতেই সে লেজ নাড়িয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে ডাকতে থাকল এবং তাঁকে অনুসরণ করার অনুরোধ করতে থাকল এবং সেই ভদ্রমহিলাও তাকে অনুসরণ করতে থাকলেন। মেয়েটির ঐ অবস্থা দেখে তিনি তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন এবং সুস্থ করে তোলেন। সুস্থ হবার পরেই মেয়েটি বাবা ভেঙ্কটেশের দর্শনে জেদ করায় কুকুরটিও তাঁর পিছু পিছু চলতে থাকে এবং খানিকটা যাওয়ার পরেই অন্য একদল কুকুর তাদের এলাকায় ঢোকার জন্য শাসাতে থাকে। আর কি করা যাবে, অতএব ফিরে চল নিজের এলাকায় কিন্তু ততক্ষণে সেই মেয়েটি সম্পূর্ণ সুস্থ এবং তাকে হেনস্থাকারীদের হাত থেকে উদ্ধার করার জন্য তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাল। বন্ধুর গল্পশেষে মনে হলো যে আজও তিনি আছেন এবং আর্তের ডাকে সাড়া দেন।
Saturday, 2 December 2023
গল্প হলেও সত্যি ----"ঘেউ"
সকাল বেলায় মোবাইলে বার্তালাপে আমার বন্ধুপ্রতিম ও সহকর্মী তপন বিশ্বাস তার নিজের জীবনের এক দারুণ অভিজ্ঞতা জানালো। কুশল বিনিময়ের প্রাথমিক পর্যায়ের শেষে জানতে পারলাম তার এই বিশেষ অভিজ্ঞতার কথা। ও তখন তিরুপতিতে কর্মরত। তিরুপতির কথা উঠলেই চোখ দুটো কেমন নিজের থেকেই বন্ধ হয়ে যায় আর বিড়বিড় করে বাবা ভেঙ্কটেশের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন হয়, আবার কেউ বা হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে নেয়। আমি এই ব্যাপারে আজকের রাজনীতিবিদদের মতন দলবদলু। বিপদে পড়লে ভগবানের উদ্দেশ্যে প্রণাম আর আনন্দে ভাসা অবস্থায় একদম ভুলে যাবার মাস্টার। তা এইরকম এক দিনে ও ব্রাঞ্চের দিকে চলেছে। ও বরাবরই ব্যাঙ্কের কাজকর্ম শুরু হওয়ার অনেক আগেই পৌঁছে যেত যাতে গ্রাহকদের কোনরকম অসুবিধার মধ্যে না পড়তে হয়। অফিস থেকে কখনোই ও বেশি দূরে থাকতো না যাতে পায়ে হেঁটেই অফিস পৌঁছানো যায়। যারা মানুষকে ভালবাসে তারা প্রকৃতির রূপ ও তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে। ঐ পথচলাতেই নানাধরণের ঘটনা তার স্মৃতির মণিকোঠায় জমা হয় এবং একান্ত আলাপচারীতায় বেরিয়ে আসে মাঝে মাঝে।
Wednesday, 29 November 2023
বেলুন
দোকান থেকে তিতাস কিনে আনল এক বাক্স বেলুন। বাক্স খুলে দেখে কেমন যেন জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে তারা সবাই। কেউ সাদা, কেউ নীল, কেউ লাল, কেউ গোলাপী আবার কেউ বা হলুদ যেন কুকুরের অনেকগুলো বাচ্চা সবাই ভিন্ন ভিন্ন ধরণের। বড় হলে তাদের আকৃতি ও প্রকৃতিও ভিন্ন ধরণের হয়। আগামীকাল গোলুর জন্মদিন উপলক্ষ্যে কিনেছে। ছোট্ট দুই কামরার ফ্ল্যাটে তিতাস ও বাসুর সাম্রাজ্য গোলুকে নিয়ে। গোলু এখন স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে, সুতরাং তার বায়না তার বন্ধুদের তার জন্মদিনে নিমন্ত্রণ করতে হবে। খুবই সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে তারা বড় হয়েছে যদিও ছাত্র এবং ছাত্রী হিসাবে দুজনেই ছিল যথেষ্ট মেধাবী এবং সেই সুবাদেই দুজনেই ভাল চাকরি করছে। কিন্তু যাদের জীবন প্রথম থেকেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসে তাদের থিতু হতে একটু সময় তো লাগবেই। একসঙ্গে ক্লাসে পড়তে পড়তেই একটু একটু ভাল লাগা, তার থেকে প্রেম এবং অবশেষে বিয়ে। বিয়ের পর পরই হাউসিং বোর্ডের ফ্ল্যাট লটারিতে পাওয়া এবং ইনস্টলমেন্টে কেনা যদিও ডাউন পেমেন্ট এর পনের শতাংশ জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হয়েছিল তাদের।
গোলু ভাল স্কুলে চান্স পাওয়ায় মাইনেটাও যথেষ্ট বেশী। সেখানে অনেক বড় বড় লোকের মানে ধনী লোকের ছেলেরা পড়ে, যারা আসা যাওয়া করে গাড়িতে যেখানে তিতাস বা বাসু বাসে করে বা নিদেন পক্ষে অটো করে যাতায়াত করে। গোলুর বন্ধুবান্ধবদের জন্মদিন খুব হৈ হৈ করে উদযাপন হয় এবং বড় কোন ক্লাবে বা হোটেলে। গোলুর ও বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করতে ইচ্ছ করে কিন্তু তিতাস বা বাসুর সেই সামর্থ্য নেই। ছোট্ট দুকামরার ফ্ল্যাটে জন্মদিন পালন অসম্ভব, সুতরাং অগতির গতি ঐ অ্যাসোসিয়েশন হল। সেখানেও ভাড়া আজকাল বেড়েছে, হয়েছে তিন থেকে পাঁচ হাজার। এছাড়াও হল সাজানো , খাওয়াদাওয়া এবং রিটার্ন গিফট সব মিলিয়ে আরও বেশ অনেক টাকা যা তাদের চিন্তার মাঝে ফেলে দেয়। সে আর কি করা যাবে, পরের মাসগুলোয় একটু টেনেটুনে চালাতে হবে। ওদের সময় তো এত হ্যাপা ছিলনা, মা হয়তো একটু পায়েস করে দিল আর তার থেকে আরেকটু বেশী হলে একটু মাংস আনা হলো এবং অবশ্যই রবিবার দিন মাংস বাদ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই বদলায়। এখন বাচ্চারা পায়েস খাক বা না ই খাক, কেক কাটতেই হবে, বেলুন দিয়ে ঘর সাজাতেই হবে। উপরি আছে রিটার্ন গিফট। বাচ্চারা কেউ একা আসেনা, আসে তাদের মা বা বাবা কিংবা দুজনেই। সুতরাং সব কিছু মিলিয়ে একটা বড় ধাক্কা।
অ্যাসোসিয়েশনের হলটা বেলুন দিয়ে সাজানো হয়েছে। দাস ক্যাটারার এর লোকজন এসে নিচে পলিথিনের শিট দিয়ে রান্নার জায়গাটা ঘিরেছে এবং মাঝে মাঝেই বেশ সুন্দর গন্ধ ভেসে আসছে। সন্ধ্যার সময় ঝিমিয়ে থাকা হল বেশ ঝলমলে হয়ে উঠেছে, প্রাণ ফিরে পেয়েছে বাচ্চাদের কলরবে। আজকাল তো বাচ্চা চোখেই পড়েনা। আগে কত ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কলতানে পার্কটা গমগম করতো আর এখন বাচ্চা একটু বড় হতেই নানাধরণের ক্লাসে তাদের ভর্তি করে দিয়ে শৈশবের দফারফা করে দেওয়া হয়। হয় আঁকা, নাহলে নাচ বা গানের ক্লাসে তাদের খেলাধূলার পরিসমাপ্তি। সেই কারণেই এত আনন্দ বাচ্চাদের আর আমরা যারা বুড়ো তারা ওদের চেঁচামেচিতে নিজেদের শৈশবের কথা ভাবছি। বেশ রাত অবধি বাচ্চাদের গুঞ্জনে মনটা বেশ হাল্কা হয়ে গেল। নিজের নাতি নাতনিদের কথা মনে পড়ে চোখটা একটু ছলছল করে উঠল আর অনেক অনেক ভালবাসা ও আশীর্বাদ তাদের উদ্দেশ্যে পাঠানো হলো।
পরদিন সকাল। হলটা আবার কেমন ম্রিয়মান। সাফসুতরো চলছে। গতকাল সন্ধ্যার ফুলে ওঠা বেলুনগুলোর জেল্লা যেন ফিকে হয়ে এসেছে, গুচ্ছে বাঁধা বেলুনগুলো বাইরে এদিকে ওদিকে হেসে খেলে বেড়াচ্ছে। রিক্সাভ্যানে তরকারি নিয়ে আসা বিক্রেতা দুটো গোছা নিজের ছেলেমেয়েদের জন্য নিল আর বাকি গোছাগুলো ম্লান দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু সব্জিতে ভর্তি ভ্যান, বিক্রেতা অস্ফূট স্বরে বলে উঠল," ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই ছোট সে তরী, অতএব ক্ষমা করো মোরে নিজগুণে।" হাওয়ায় ভাসা উপেক্ষিত বেলুন গুলো মাঝেমধ্যেই ফুট ফাট আওয়াজ করে চুপসে যেতে লাগল আর তখনও ফুলে থাকা বেলুনের গায়ে লেজের মতন ঝুলতে থাকল। আহ্, কি হচ্ছেটা কি,ছাড়না মোর হাত কিন্তু ক্ষীণ স্বরে বলে উঠল চুপসে যাওয়া বেলুন, " আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ, সুরের বাঁধনে , অতএব ভেসে চল ধরে মোর হাত।"
Friday, 24 November 2023
হলুদ বসন্ত
জীবন সায়াহ্নে পৌঁছানো মধুকর বাবু ও তাঁর স্ত্রীর বেশিরভাগ সময়ই কাটে গাড়ি বারান্দার ওপরের ছাদে। দুই বুড়োবুড়ির কথোপকথন সেই একই ব্যাপারে সীমিত। কেউ না কেউ তো একজন হয়ে যাবে, তখন কি করে সময় কাটাবে অন্যজন। সবাই তো আর বিপিন রাওয়াতের মতো ভাগ্যবান নন যে একইসঙ্গে দুজনে বিদায় নিলেন এই সুন্দর পৃথিবী থেকে। আরও অনেক ভাগ্যবান আছেন যাঁরা কোন না কোন ভাবে একইসঙ্গে বিদায় নিয়েছেন যাঁদের কথা আমরা জানিনা।
মধুকরের স্ত্রী রীনা খুবই চিন্তিত যে উনি যদি আগে চলে যান তাহলে মধুকরের কি হবে। মধুকর খুবই জেদি ধরণের মানুষ, কোনভাবে কারো সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারেন না। ভীষণ একবগ্গা টাইপের মানুষ প্রথম থেকেই। কেবলই নিজের মতামত অন্যের উপর চাপিয়েই ছিল তাঁর আনন্দ। সুতরাং বুঝতে কোন অসুবিধা হবার কথাই নয়। মেয়েরা তো সর্বংসহা, জলের মতো, যে পাত্রেই রাখা যাক না কেন সেই জায়গাতেই মানিয়ে নেয় কিন্তু যাঁরা একটুও নমনীয় নন তাঁদের তো মহা বিপদ। সেইজন্য রীনা রোজ পূজোর সময় ঠাকুরের কাছে তাঁর মনের কথা ভক্তিভরে বলেন। কিন্তু নিয়তির লিখন অন্যরকম। হঠাৎই একদিন সবাইকে ভাসিয়ে রীনা চলে গেলেন। মধুকরের চোখের জল কেমন যেন শুকিয়ে গেছে। নিথর হয়ে বসে আছেন তাঁর নিজের জায়গায়, একদৃষ্টে চেয়ে আছেন রীনার চেয়ারের দিকে। শববাহী গাড়ি এসে গেছে রীনার নিথর দেহটাকে নিয়ে যেতে। ছেলে মেয়ে বৌমা ও জামাই সবাই বলছে মধুকরকে একবার আসার জন্য কিন্তু ভ্রূক্ষেপ নেই মধুকরের। কারো দিকে ফিরেও তাকাচ্ছেন না তিনি। সবাই খুব অস্বস্তিতে পড়ে গেছে, অন্তত একবারের জন্য তো তাঁর আসা দরকার। নাতি, নাতনিরা কেউ আসতে পারেনি রীনার হঠাত প্রয়াণে। সুতরাং তাদের আবদারেও অন্তত সাড়া দেবার অবকাশ নেই।
মধুকর ছিলেন অত্যন্ত ছাপোষা মানুষ, বিরাট চাহিদা তাঁর কোনদিনই ছিলনা। শৈশবের কঠিন সংগ্রাম এবং দায়িত্ব বোধ তাঁকে কোনদিনই বিরাট স্বাচ্ছল্যের হাতছানি দেয়নি আর পাঁচজনের মতন। জীবনে চাহিদা যাদের কম তাদের কষ্ট ও কম। কারও কাছে হাত পাতার দরকার হয়না, নিজের কষ্ট নিজেই হজম করতে শেখে তারা। সুতরাং একরোখা হবার এটা একটা কারণ হতে পারে। কি ছেলে, কি মেয়ে বা বন্ধুবান্ধব কারও কাছেই মাথা নোয়াতে রাজি নয় তারা। মাঝেমধ্যেই মনে হয় যেন একটু বেশিই অসামাজিক। কিন্তু কে কি ভাবে তাতে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। অনেকটা সেই আপনারে দিয়ে রচিলি রে কি এ , আপনারই আবরণ এর মতো। রিটায়ার করার পর পাওয়া টাকা দিয়ে একটা বড় ফ্রিজ ও ওয়াশিং মেশিন কিনেছেন যাতে রোজ বাজার যাওয়ার ঝামেলা না থাকে বা কাপড়চোপড় কাচার ঝামেলাও বেশি না থাকে। আজকাল কাজের লোকের কথায় কথায় কামাই যাতে খুব অসুবিধার সৃষ্টি না করে। কিন্তু ওয়াশিং মেশিন খুব কম সময়ই ব্যবহার হয়। ফ্রিজ কিন্তু বেশ ভালোই চলছে মধুকরের অবস্থার কথা ভেবে অবশ্য মাঝে মধ্যে তেল সাবানের দরকার তো হয়ই। এইভাবেই বেশ চলছিল কিন্তু বাদ সাধল মেয়ের আবদার। ঐ বুড়ো ফ্রিজটাকে এবার বাতিল না করলেই নয়। বুড়ো হলেই তো তার কদর কমে যায় সে মানুষ ই হোক আর অন্য যে কোন জিনিস হোক না কেন। একদিন ছিলে তুমি ঝকঝকে , ছিল তোমার কদর, কত প্রশংসাই না হতো তোমার কিন্তু আজ তুমি তোমার গ্ল্যামার হারিয়েছ, জায়গা ছেড়ে দাও নতুনকে। এটাই তো জগতের নিয়ম। অতএব প্রকৃতির নিয়মে তোমার জায়গায় এসে যাবে নতুন। পুরোন চেহারাটাকে নিয়ে বদলে দেবে নতুন চেহারা। কিন্তু এই পৃথিবীতে অনেক লোক আছে যারা পুরোন কে ফেলতে ইতস্তত করে, তাদেরই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায় কারণ তাদের বদ্ধমূল ধারণা এদের এখনও অনেক কিছুই দেবার আছে। কিন্তু না, তারা অত্যন্ত সংখ্যালঘু, অতএব ফেলে দাও সেই পুরাতনে।
অনেক সময় চলে গেছে। শববাহী যানের লোকজন একটু বেশিই অধৈর্য হয়ে পড়েছে। তাদের আবার অন্য জায়গায় যেতে হবে। ছেলে এসে মধুকরের পাশে এসে বলল, " বাবা, একবার এস, মাকে শেষবারের মতন বিদায় দাও।" কিন্তু কোন সাড়া নেই । গায়ে হাত দিয়ে একটু ধাক্কা দিতেই চেয়ার থেকে পড়ে গেলেন মধুকর, নিথর নিস্তব্ধ দেহ। রীনার প্রার্থনা শেষমেশ ভগবান মঞ্জুর করলেন।
Monday, 23 October 2023
শারদোৎসবে ইতিহাসের খোঁজে
শারদীয় আর্ট গ্যালারি পরিক্রমা তো বিভিন্ন সংস্থা বা বিভিন্ন লোকের ব্যক্ত করেছেন কিন্তু কোন কোন পূজোর পিছনে হয়তো বা কিছু ইতিহাস লুকিয়ে থাকে যেটা সবসময় বিরাট কিছু না হলে লোকের অজ্ঞানতায়ই থেকে যায়। সেইরকম ই একটা ছোট্ট ইতিহাস মিশ্রিত কাহিনীর অবতারণার প্রচেষ্টা মাত্র।
ভীম বেশ কিছুদিন যাবত ই অন্য পাণ্ডবদের থেকে আলাদা থাকতে বাধ্য হয়েছে নানান কারণে। এর আগে জানাই এর রাজবাড়ির পূজোতেও ভীম ও ভালান্দ্রা অন্যত্র ব্যস্ত থাকায় আসতে পারেনি। অর্জুনের পরিকল্পিত জয়নগরের কাছে বহড়ু গ্রামে এক পারিবারিক পূজোয় যাওয়ার কথা হলো। অর্জুনের ই এক প্রাক্তন সহকর্মী মাণিক ব্যানার্জি তার সমস্ত বন্দোবস্ত করলেন মানে অষ্টমী পূজোয় অঞ্জলি দেওয়া থেকে ভোগ খাওয়া এবং সেই বিখ্যাত বহড়ু গ্রাম পরিদর্শন করানো।
বহড়ু গ্রাম সম্বন্ধে একটু ছোট্ট পরিচয় করানো দরকার। এটি জয়নগরের একটু আগে অবস্থিত এবং খুবই বর্ধিষ্ণু গ্রাম। এইখানেই প্রখ্যাত গায়ক হেমন্ত মুখার্জির পূর্বপুরুষেরা থাকতেন। যাওয়া আসা ছিল তাঁরও। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে নিজের গ্রামে এসেছিলেন এবং শুধু হারমোনিয়ম নিয়ে একটিই গান করেছিলেন, " দিনের শেষে, ঘুমের দেশে ঘোমটা পড়া ঐ ছায়া" আর তার পরেই ফিরে এসে চিরতরে ঘুমের দেশে পাড়ি দেওয়া। বিরাট বাড়ির আর কিছুই অবশিষ্ট নেই সবই হয়ে গেছে বেদখল কিন্তু দখলকারীদের একটা বিষয়ে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হবে। তাঁরা প্রয়াত শিল্পীর একটা স্ট্যাচু বানিয়ে দিয়েছে এবং গলায় আছে অবশ্যই একটা টাটকা গাঁদা ফুলের মালা। এটুকু না করলে তো মান সম্মান কিছুই থাকেনা। যাই হোক, অনতিদূরে প্রয়াত শিল্পী সমিত ভঞ্জদের পৈতৃক বাড়ি। তাঁদের একটা নাটমন্দির ছিল যেখানে এক অষ্টধাতুর মূর্তি ছিল। মানুষের লোভের তো শেষ নেই, সেই অষ্টধাতুর মূর্তি তিন তিনবার চুরি হয় এবং ভগবানের আশীর্বাদে তিনবার ই তা উদ্ধার হয় কিন্তু দুর্ভাগ্য বশত তাঁকে খণ্ডিত বিখণ্ডিত অবস্থায় পাওয়া যায়। এখন ভগবান তো ভাল মানুষের বাবা/ মা ,আবার দুর্বৃত্তের ও বাবা/ মা। সুতরাং সবই তাঁর কৃপা। তাঁরই ইচ্ছেতে লোকে তাঁকে চুরি করেছে এবং খণ্ড বিখণ্ড করেছে আবার তাঁরই ইচ্ছেতে তিনি ফিরে এসেছেন। এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন শমিত ভঞ্জের পূর্বপুরুষ দ্বারকানাথ ভঞ্জ প্রায় দেড়শো বছর আগে। আরও একটি বিখ্যাত জায়গা শ্যামসুন্দরের মন্দির। তদানীন্তন জমিদার ( যাঁকে সাতমহলার জমিদার বলা হতো) বৃন্দাবনে গিয়ে এতটাই মোহিত হয়ে পড়লেন যে ঐ মূর্তিটিকে তিনি এই গ্রামে নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠা করবেন কিন্তু তিনি স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে জানতে পারলেন যে ঐরকম ই একটি মূর্তি তাঁর গ্রামের নাটমন্দিরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কি অপূর্ব সেই মূর্তি। সেই জমিদারের উত্তর পুরুষ পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে তিন একর জমি দান করেন এই আশ্বাসে যে তাঁদের পরিবারের কয়েকজনকে সরকারি চাকরি দেওয়া হবে কিন্তু এই আশ্বাস মৌখিক হবার কারণে তাঁরা কেউই চাকরি পাননি কিন্তু তাঁরা কাগজপত্রের মাধ্যমে সরকারকে তিন একর জমি দান করেন। এই কথা তাঁদের উত্তর পুরুষের মুখ থেকে শোনা, সত্যতা যাচাই করার কোন অবকাশ হয়নি। সেই জমিতেই অবস্থিত আজকের বিডিও অফিস। সেই শ্যামসুন্দরের নামানুসারেই শ্যামসুন্দর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার যিনি মাণিক বাবুর সৌজন্যে আমাদের ছোলার ডালের বরফি খাওয়ালেন কিন্তু কোনরকম পয়সাকড়ি নিলেন না। এই দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শ্রী গোপাল চন্দ্র ঘোষ এবং এখন পরিচালনার দায়িত্বে দুই ভাই শ্রী রঞ্জিত কুমার ঘোষ এবং বাবলু কুমার ঘোষ। রঞ্জিত বাবু তখন দোকানে ছিলেন না, বাবলু বাবু সন্দেশ তৈরীতে ব্যস্ত ছিলেন কিন্তু অত ব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের সবাইকে উনি ছোলার ডালের বরফি খাওয়ালেন এবং বললেন নভেম্বর মাসের শেষ দিক থেকে ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত তাঁর দোকানের মোয়া যেন আমরা অবশ্যই খাই। শীতের আমেজে খেজুরের রস হয় মিষ্টি এবং এক বিশেষ ধানের খই তাঁদের হাতের যাদুস্পর্শে হয়ে ওঠে জয়নগরের মোয়া। এই মোয়া নিয়ে বহড়ু ও জয়নগরের মধ্যে যথেষ্ট রেষারেষি আছে। একজন বলে আমিই সেরা তো আরেকজন বুক বাজিয়ে বলে , " না আমি।" আপাতত মুলতুবি থাক তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা। আমরা নিজেরা আসব, পরখ করব এবং তারপর সিদ্ধান্ত নেব কে সেরা। এরপর আরও এক বিস্ময়ের পালা যা হচ্ছে বহড়ু হাই স্কুল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ও আগে এই স্কুলের প্রতিষ্ঠা এই গ্রামের বিদ্যানুরাগের কথা বহন করে। এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র প্রখ্যাত ডাক্তার শ্রী নীলরতন সরকারের নামে একটি ব্লক আছে এবং শ্রী জ্ঞান ঘোষের ও যথেষ্ট অবদান রয়েছে। এরপরেই আসতে হবে সেই পণ্ডিতালয়ের দুর্গা পূজো। এই পূজার প্রতিষ্ঠা হয় শ্রী কৃষ্ণগোপাল পণ্ডিতের হাত ধরে। স্বপ্নাদিষ্ট কৃষ্ণগোপাল আদেশ পান মায়ের পূজো শুরু করার। কিন্তু নবমীর রাতে তিনি আদেশ পান তাঁকে যেন বিসর্জন না দেওয়া হয়। সেই থেকে মানে নিরানব্বই বছর আগে শুরু হওয়া সেই মায়ের প্রতিমা আজও সেই এক, কেবল প্রতিবছর মায়ের রঙ ও শাড়ি পাল্টানো হয়। তাঁর ই নাতি শ্রী উমাপদ চক্রবর্তীর এখনও পালাক্রমে চালিয়ে আসছেন এই মায়ের পূজো। যেহেতু প্রতিমার বিসর্জন হয়না, সেইকারণে প্রতিদিন দুবেলা মায়ের পূজো হয়। এটা যে কত কঠিন কাজ তা যাঁরা এটা চালান তাঁরাই জানেন। অঞ্জলি দিয়ে , প্রসাদ খেয়ে আবার মাণিক বাবুর পৈতৃক বাড়িতে যাওয়া হলো এবং তাঁদের বাড়িতেও প্রতিষ্ঠিত মা শীতলার মন্দির দর্শন করলাম। মানিকবাবুর বাবা তিরানব্বই বছরের বৃদ্ধ কিন্তু তাঁর অসাধারণ স্মৃতি এবং আমাদের দেখে অত্যন্ত খুশি হলেন। মাণিক বাবুর নানান দিকে আগ্রহ। তাঁর বাড়ির সামনে বিশাল পুকুরে ছিপ ফেললাম কিন্তু আমার তিনবারের প্রচেষ্টা বিফল করে দিয়ে মাছ চারা খেয়ে চলে গেল কিন্তু অর্জুনের একবারের প্রচেষ্টাতেই একটা বেশ বড় মাছ ধরা পড়ল এবং মাণিক বাবুর কয়েকবারের প্রচেষ্টায় একটা মাছ ধরা পড়ল। মাছধরার একটা আলাদাই আনন্দ। কারেনুমতি বৌদির প্রচেষ্টাও সফল হলনা। ভোগ খাওয়ার এক আলাদা আনন্দ। ঐ সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও চক্রবর্তীবাবুদের যা আতিথেয়তা তা হৃদয়স্পর্শ করে গেল। আবার আসতে হবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঐতিহাসিক বহড়ু গ্রাম থেকে বিদায় নিলাম।
Wednesday, 18 October 2023
শারদীয় আর্ট গ্যালারি পরিক্রমা
কলকাতায় প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে ঘুরে দেখার বয়সটা পেরিয়ে গেছে, তবু মাঝে মাঝেই মনটা কেমন অশান্ত হয়ে ওঠে, ফিরে যেতে চায় শৈশবের দিনগুলোতে। অর্জুন আমাদের দুর্দান্ত প্ল্যানার, যা কিছু করে সমস্ত কিছু ভেবে চিন্তে। ঠিক করে ফেলল কিভাবে যাওয়া হবে এবং কোথায় কোথায় যাওয়া হবে। বড়দা যুধিষ্ঠির এবং নিজের রথে আমাদের নয়জনের ( দুঃশলা বোন সমেত) যাত্রা শুরু হলো দ্বিতীয়ার দিন।অনেকদিন ধরেই ভীম ও ভালান্দ্রা অসুস্থ থাকায় পঞ্চপাণ্ডবের একসঙ্গে যাত্রা আর হয়ে ওঠেনা কিন্তু উপরি পাওনা ভগ্নী দুঃশলার উপস্থিতি যিনি কৌরব ও পাণ্ডবদের একমাত্র বোন এবং সবার প্রিয়পাত্রী। যাই হোক অর্জুনের রথে যুধিষ্ঠির, নকুল ও সহদেব মিলে চারজন এবং যুধিষ্ঠিরের রথে দেবিকা, সুভদ্রা,কারেনুমতি ,বিজয়া এবং দুঃশলাসহ মোট পাঁচজন বেরিয়ে পড়লাম। সারথি দুজনেই খুব কুশলী এবং কলকাতার রাস্তার অলিগলি সবই চেনে নিজের হাতের তালুর মতো।
বাইপাস ধরে উল্টোডাঙা হয়ে সোজা পাইকপাড়ায় টালাপার্কে প্রত্যয়ের প্যাণ্ডেলে হাজির হলাম। বিরাট এলাকা জুড়ে এই প্যাণ্ডেল। একপ্রান্তে ঢোকা এবং অন্য প্রান্তে বেরোনোর রাস্তা। মহিলাদের প্রায় সকলের ই পায়ের সমস্যা, দুলকি চালে চলতে নেয় অনেক সময়।বাকি চার পাণ্ডবদের ও বয়স যথেষ্ট হয়েছে এবং যুধিষ্ঠির ও সহদেবের দুই হাঁটুই প্রতিস্থাপন হয়েছে কিন্তু অর্জুন ও নকুল এরই মধ্যে একটু বেশিই সক্ষম। চলছি তো চলছিই, এক রাজবাড়ির আদলে তৈরী হয়েছে প্যাণ্ডেল। কি অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল এই অসাধারণ শৈল্পিক প্যাণ্ডেল। ভাবছিলাম এই শিল্পকর্মের পিছনে কার মাথা রয়েছে? এই শিল্পীদের বেশিরভাগ ই বেশ গরীব কিন্তু দারিদ্র্য তাদের শিল্পীসত্ত্বাকে ধ্বংস করতে পারেনি। নামটা জানার ঔৎসুক্য ছিলই কিন্তু ঠাউরে উঠতে পারছিলাম না কার কাছে জানা যায়। কিন্তু উদ্যোক্তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পেয়েছে শিল্পীদের প্রতি এবং বাইরে বেরোনোর মুখে বড় বড় করে শিল্পীদের নাম লেখা আছে, " সুশান্ত শিবানী পাল।" খুব ভাল লাগল এই ধরণের ব্যবহারে। সাধারণত কাজের বেলায় কাজী আর কাজ ফুরালেই পাজী এটাকেই মান্যতা দেওয়া হয়, কিন্তু এখানে সেটা ব্যতিক্রম। শিল্পীদের মর্যাদা শুধু টাকাতেই নয়, সম্মান দেখানো খুবই প্রয়োজন। কতদিন ধরে তাঁরা কাজ করেছেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন এই রাজবাড়ির ছবিটিকে।
এক একসময় মনে হয় যে কি বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে এই ক্ষণিকের অতিথির জন্য। সমস্ত কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের এই বিশাল অর্থব্যয় কি কোন স্থায়ী শিল্পের পিছনে খরচ করা যেতনা যেখানে বহুলোকের সংবৎসর অন্নসংস্থান হয়। অবশ্য এই ক্ষণিকের শিল্পকে কেন্দ্র করেও বহু দরিদ্র মানুষের কিছুদিনের অন্নসংস্থান হয়। সবচেয়ে বড় অভিশাপ আজকের যুগের জমিদারেরা। সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে তাদের টাকায় নিজেদের আখের গোছান এই বর্তমানের জমিদাররা। শোষণ চিরকাল চলে আসছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে। যে যখন সুযোগ পায় সেই তখন শোষণ করে। সবচেয়ে মজার কথা এই মহাচোররা খবরের কাগজে তাদের ছবি বা খবর বেরোনোয় তাদের মানসম্মান হানি হচ্ছে বলে আদালতে দরখাস্ত করেন এবং মহামান্য আদালত সংবাদ মাধ্যমকে এই খবর প্রকাশে নিরস্ত করেন। আমরা কোন সমাজে বাস করছি? যারা নিগ্রহ করবে তাদের সুরক্ষা দেব না যারা নিগৃহীত হচ্ছেন তাঁদের সহায়তা করব? মহামান্য আদালত, আপনারাও যদি চোখ বন্ধ করে থাকেন এবং সংবাদ মাধ্যমের মুখে কুলুপ এঁটে দেন তাহলে এই নিগৃহীত মানুষগুলো যাবে কোথায়? এদের কথা কে বলবে? শিক্ষিত পাশ করা ছেলেমেয়েদের জায়গায় টাকার বিনিময়ে চোরগুলো চাকরি পেয়েছে, আপনারা তাদের সপক্ষে রায় দিচ্ছেন? ধিক আপনাদের, নিজের বিবেককে জিজ্ঞেস করুন মহামান্য আদালত। আপনারা শুধু নিজেদের ই ছোট করছেন না আপনাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকেও ধিক্কারের শিকার করে তুলছেন। একবার শান্তভাবে ভাবুন , মহামান্য আদালত। কথায় আছে আইন সকলের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে কি সত্যিই তাই? অর্থবলে বলীয়ান জমিদার রা যখন ইচ্ছা তাঁদের বক্তব্য শোনানোর জন্য আপনাদের দরজা খটখট করতে পারেন কিন্তু সাধারণ লোকেরা বছরের পর বছর তাদের বক্তব্য আপনাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। কি বলবেন আপনারা?
যাই হোক , ফিরে আসা যাক সেদিনের কথায়। টালা পার্কের প্রত্যয় ছেড়ে যাওয়া হল বাগবাজার সার্বজনীন পূজো মণ্ডপে। সামনের প্রবেশদ্বার বন্ধ। পাশের দরজা দিয়ে ঢুকে দেখলাম টুকটাক অনেক কাজ বাকি। কিন্তু মায়ের সেই সাবেকি মূর্তি মনের অন্তস্থলে ছাপ ফেলে দিল। বিস্ফারিত চোখে মায়ের সেই রূপ মনটাকে দূরে কোথাও নিয়ে গেল। মাঝখানে সেই বিশাল ঝাড়বাতি এই মণ্ডপের এক বিশেষ আকর্ষণ। মণ্ডপের বাইরে মাঠে তখন দোকান পাট ইতস্তত ভাবে খুলতে শুরু করেছে যেখানে টালাপার্কে দোকান গুলো বেশ গুছিয়ে বসেছে। আলু কাবলি, ঝালমুড়ি বা ঘুগনির সুন্দর গন্ধ নাকে ঢুকে মন মাতিয়ে দিয়েছিল কিন্তু অতটা হেলতে দুলতে হেঁটে এসে রথ কখন নিয়ে চলে আসবে সারথিরা এই ভেবে জিভে জল টেনেই চলে আসতে হল। ভাবলাম বাগবাজারের মাঠে হবে ঐসব আলুকাবলির উপর আক্রমণ। কিন্তু মনের আশা মনেই থেকে গেল। হলনা কিছুই খাওয়া কেবল লেবু চা ছাড়া। যাওয়া যাক, কুমারটুলির পূজো দেখতে। অনেক মেহনত করে এদিক সেদিক করে সারথিরা যখন পৌঁছলেন তখন গিয়ে শুনলাম যে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। মহিলারা অটো রিক্সা চড়ে বড় রাস্তায় এলেন যেখানে সারথিরা আমাদের ছেড়েছিলেন কিন্তু তারা সেখানে নেই এবং বহু লোক এসেছেন তাঁদের প্রতিমা নিতে। বিভিন্ন সাজের মাকে বৃদ্ধ ন্যুব্জ কুব্জ বাড়িগুলো লক্ষ্য করছে, হয়তো বা আমাদেরকেও। একদিন এই বাড়িগুলোই ছিল অসাধারণ সুন্দর। পাশাপাশি , বিপরীত দিকে সুবিশাল হর্ম্য প্রাসাদগুলো পরস্পর পরস্পরের প্রতি স্পর্ধা প্রকাশ করছে যেমন কর্ণ বা অর্জুন কিংবা দুর্যোধন বা ভীমের প্রতি। একমনে দেখছিলাম তাদের দিকে আর ভাবছিলাম যে বয়সকালে এঁরা কতই না সুন্দর ছিলেন। কিন্তু কালের গতিতে সবকিছুই হারিয়ে যায় যেমন গেছে এই সুন্দর প্রাসাদোপম বাড়িগুলো। চোখে কেমন যেন জল চলে এল।
আহিরীটোলা মণ্ডপে যাবার ইচ্ছা ছিল কিন্তু লোকজন জানালো যে তাদের মণ্ডপ ও কুমারটুলির মতন। সুতরাং, এবার চাই পেট পূজো। শতাব্দী প্রাচীন মিত্র কাফেতে অভিযান চালাতে হবে। এটাও অর্জুনের ই পরিকল্পনা। অতএব চল মিত্র কাফে। অপরিসর জায়গা কিন্তু শতাব্দীপ্রাচীন রেস্তোরাঁয় ঢুঁ না মারলে কেমন একটা অপরিপূর্ণতা থেকে যায়। যেমন বলা তেমন কাজ। কিন্তু ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে তরী। অতএব কর অপেক্ষা। বেশ দাঁড়িয়েছিলাম কিন্তু সিগারেটের গন্ধে গা টা কেমন ঘুলিয়ে উঠল। এই জীবনে ঐ স্বাদে আমি বঞ্চিত, সুতরাং এক অস্বস্তিকর অবস্থা। দেখি, আমার ই অনতিদূরে এক প্রতীক্ষারত যুগল কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার যে ভদ্রলোক পাঁশুটে মুখে দাঁড়িয়ে আর তাঁরই সঙ্গিনী একটা বেশ বড় মাপের সিগারেটে টান দিচ্ছে আর মনের সুখে ধোঁয়া ছেড়ে অন্য লোকের কাশি উঠিয়ে দিচ্ছেন। একটু বিরক্ত হয়েই হাত দিয়ে ধোঁয়াটাকে নাকের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে নিজের ফুসফুসটার বারোটা তো বাজাচ্ছ ই, সঙ্গে সঙ্গে তোমার সঙ্গী এবং আমাদের ও। উনি বুঝতে পারলেন ব্যাপার টা এবং সঙ্গে সঙ্গে সরে গেলেন। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় যে ঐ চল্লিশোর্ধ মহিলা আমারই সামনে বসলেন। আমাদের নয়জনের অর্ডার দিতে ওদের একটু দেরী হচ্ছিল আর ওঁরা দুইজন থাকায় ওঁদের তাড়াতাড়ি দিয়ে দিল। আর তাঁরাও ফিস কবিরাজি যত তাড়াতাড়ি পারেন খেয়ে বিদায় নিতে পারলে বাঁচেন। ভদ্রমহিলার তিন আঙুলে একটাই আংটি মানে আংটি একটাই অথচ এমনভাবে তৈরী যে মাঝে একটা পাথর মধ্যমায় এবং দুইদিকে সোনা কিন্তু একটা ভয়ানক ছবি ঐ দুই পাশের আঙুলে মানে তর্জনী ও অনামিকায় যা রীতিমত ভয়ের বাতাবরণ তৈরী করে। কে জানে কোন জ্যোতিষীর পরামর্শে তিনি এটা ধারণ করেছেন। সে যারই পরামর্শে উনি ধারণ করে থাকুন না কেন উনি যে পড়াশোনায় সেরকম কিছু দরের নন সেটা তাঁর চোখেমুখেই প্রতিফলিত। যাই হোক, উনি চলে যাওয়াতে আমি কেমন একটা স্বস্তি পেলাম। এবার আসা যাক, একটু মিত্র কাফের কথায়। উনিশশো দশ সালে শ্রী গণেশ মিত্র এই কাফে খোলেন। কিন্তু উনি ঠিকঠাক চালাতে না পারায় বছর দুই বাদেই বাল্যবন্ধু শ্রী সুশীল রায়কে দিয়ে দেন। সুশীলবাবু ছিলেন একজন অত্যন্ত বাস্তব বোধ সম্পন্ন ব্যক্তি এবং একজন দক্ষ ব্যবসায়ী। সেই কারণেই মিত্র কাফেতে এই কয়টা পূর্তি লেখা আছে।
" মিত্র কাফে "
-------------------------
পেট ভরে খাবার আর প্রাণভরে আড্ডা
উনিশশো দশ সালে শোভাবাজারে শুরু যাত্রা
বন্ধুত্বের মর্যাদা দিতেন সুশীল রায়
ভালভাবে বুঝতেন মানুষ কি চায়।
মিত্র কাফে নাম সেই বন্ধুত্বের স্বীকৃতি
আজ এই নাম মানেই খাবার আর খ্যাতি
এই রেস্তোরাঁর কথা আজ কে না জানে
কলকাতা ছাড়াও আছে আরও অনেক স্থানে।
এই মিত্র কাফেতেই আমরা ফিস কবিরাজি , চিংড়ির কবিরাজি, চিকেন কবিরাজি , ফিস কাটলেট এবং ডায়মন্ড কবিরাজি ধ্বংস করে ফিরে এলাম বাড়ি আর এইবার দুঃশলা ভগ্নী এই সমস্ত বিল মেটালেন। প্রথমে নকুল ও কারেনুমতি এবং পরে সহদেব ও বিজয়াকে রথ থেকে নামিয়ে যুধিষ্ঠির ও অর্জুন রথে বাড়ি ফিরে গেলেন।
একটা কথা বারবার মনে আসছে।কলকাতা তথা সমস্ত পশ্চিমবঙ্গে এত মহান শিল্পী রয়েছেন যাঁদের শিল্পীসত্ত্বা এই বিশেষ সময়ে বিকশিত হবার সুযোগ পায়। আগে আঙুলে গোণা কতিপয় শিল্পীর ছবি আর্ট গ্যালারিতে প্রদর্শিত হতো কিন্তু এই শারদোৎসবে এই বৃহৎ আর্ট গ্যালারিতে সমস্ত ছোটবড় শিল্পীরা তাঁদের স্থান করে নেন।
Monday, 18 September 2023
শ্রদ্ধার্ঘ্য
আমরা সাধারণত মনীষীদের জন্মদিন বা মৃত্যু দিন শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করি এবং কোন সাধারণ মানুষ মারা গেলে আমাদের প্রতিক্রিয়া হয় তাৎক্ষণিক। ভাল মানুষ হলে সবাই বলতে থাকে, " আহা, মানুষটা খুব ভাল ছিল আর খারাপ হলে বলে, গেছে, আপদ গেছে চুকে।" কিন্তু ঐ কয়েকদিন লোকে একটু আধটু হা হুতাশ করে তারপর পৃথিবীর চলার সঙ্গে তাল মিলিয়ে লোকে ভুলে যায়। অবশ্য লোকজন তো পরে, নিজের আপনজন ই শুরু করে দেয় এটা আমার, ওইটা তোমার ( যদি একাধিক সন্তান থাকে)। কিন্তু কিছু কিছু লোক সাধারণ হয়েও এমন কিছু কাজ করে যায় যেটা কিছু লোক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে রাখে( অবশ্যই কৃতার্থবোধ যদি একান্তই থাকে)।
এইরকমই একজন গণপতরাও কদম। কদমজী ছিলেন আমাদের অফিসার্স কোয়ার্টারের সিকিউরিটি গার্ড। অফিস বেরোনোর সময় এবং অফিস থেকে ফেরার সময় দেখা হতো যদি তার ডিউটি থাকত। একটু নাদুস নুদুস গোলগাল চেহারা, মাঝারি উচ্চতা কিন্তু সদা হাস্যময়। আমি যেহেতু একা থাকতাম সেইকারণে টুকটাক কিছু কথাবার্তা আমার সঙ্গে সবসময়ই হতো। রিটায়ার করার কিছুদিন আগে আমার ছেলে ট্রান্সফার হয়ে এল এবং আমার সঙ্গেই থাকল। রিটায়ার করার পরেও কিছুদিন ছিলাম অফিসের কোয়ার্টারে এবং সেই সুবাদে সমস্ত স্টাফদের সঙ্গে সখ্যতা আরও নিবিড় হয়েছিল। টুকটাক কাজ এই কদমজী বা শেলকে জী বা পাটিলজীরাই করে দিত। অফিস থেকে ফেরার পথে প্রায়ই জিলাপি বা সিঙারা বা কোন খাবার কিনে আনতাম শুধু নিজের জন্যই নয় এই সিকিউরিটি গার্ড বা সুইপারের জন্য ও আনতাম। প্রথম প্রথম একটু কুণ্ঠিত হয়ে নিত কিন্তু পরে তারাও খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছিল। এরই মধ্যে কিছু কাজের জন্য কলকাতায় আসতে হয়েছিল ছেলের বিয়ের ব্যাপারে। রান্নার জন্য শোভা দিদি আসত, সুতরাং খাওয়া দাওয়ার অসুবিধে হচ্ছিল না। একদিন সন্ধে বেলায় হঠাৎই মোবাইলটা বেজে উঠল। দেখি কদমজীর ফোন। কি ব্যাপার, কদমজী? ওর উত্তর শুনে মাথা ঘুরে গেল। ছেলের ভীষণ জ্বর, চোখ খুলতেই পারছে না তো কথা বলা তো দূরস্থান। সেদিন ছিল রবিবার, কোন ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছে না। আমি কতকগুলো জ্বরের ওষুধ বলে দিলাম এবং খাওয়াতে বললাম। কিন্তু কদমজী তাঁর পরিচিত এক ডাক্তারের বাড়ি নিয়ে গেল ছেলেকে এবং অনেক অনুরোধ করে তাঁকে দেখতে রাজি করালেন। উনি তাঁর পরিচিত এক ডায়গনস্টিক ক্লিনিকে ফোন করে রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থাও করলেন এবং কদমজী সমস্ত পরীক্ষা করিয়ে ছেলেকে বাড়ি ফিরিয়ে আনলেন এবং ডিউটির রোস্টার বদল করে সারারাত ছেলের পাশেই থাকলেন । পরে আমার অনুরোধ মতন প্যারেল থেকে বম্বে এয়ারপোর্টে ছেলেকে ছেড়ে দিয়ে এবং বিমান কর্মীদের সমস্ত কিছু অবগত করালেন। আমরা কলকাতা এয়ারপোর্ট ওকে নিয়ে সোজা হাসপাতালে ভর্তি করে দিলাম। আবার রক্ত পরীক্ষার পরে ডেঙ্গি ধরা পড়ল এবং প্ল্যাটিলেট কাউন্ট বিপদসীমার অনেক নীচে। সবাই খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। তিনদিন বাদে ছেলের বিয়ের রেজিস্ট্রেশন হবে অথচ প্ল্যাটিলেট সংখ্যার সেরকম কোন উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হচ্ছে না । মেয়েদের বাড়িও ভীষণ উদ্বিগ্ন, আমরা তো বটেই। রেজিস্ট্রেশনের আগের দিন আমরা বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলাম কিন্তু ডাক্তার ছাড়তে রাজি নন। শেষ পর্যন্ত বণ্ড সই করে ওকে বাড়ি নিয়ে এলাম কিন্তু একটা ভয় শেষ পর্যন্ত থেকেই গেল। ভগবানের আশীর্বাদে সবকিছুই নির্বিঘ্নে মিটে গেল কিন্তু আমার ঙ কদমজীর কথা মনেই থেকে গেল।
কদমজীর অ্যাকাউন্ট নম্বর নিয়ে ছেলের জন্য যা খরচ করেছিল তা পাঠিয়ে দিলাম এবং ছেলের জীবন ফিরে পাবার জন্য মনে মনে ভগবানকে এবং তাঁর ই প্রতিনিধি কদমজীকে অনেক ধন্যবাদ জানালাম। এরপর অনেকবার বম্বে এসেছি এবং কদমজীর সঙ্গে দেখাও করতে গিয়েছি কিন্তু দেখা হয়নি কোন না কোন কারণে। কোন সময় ওঁর ডিউটি রাত্রিবেলায় নয়তো ডিউটি করে চলে গেছে বা নিজের গ্রামে গেছে। বছর চারেক আগে ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাস থেকে আসার সময় প্যারেল হয়ে এসেছি কিন্তু কদমজী ছাড়া বাকি সকলের সঙ্গেই দেখা হয়েছে। ওদের চীফ সিকিউরিটি অফিসার শেলকেজীর হাতে মিষ্টির বাক্সটা দিয়ে কদমজীর কথা জিজ্ঞেস করায় উনি জানালেন যে কদমজী চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে পাকাপাকি ভাবে নিজের গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। সুতরাং সেবারও দেখা হলো না। গতকাল একটু হাতে সময় নিয়ে পুরোন বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে লাগলাম। ধূমলজী, ব্যাভারেজী, কদমজী, শেলকেজী সবাইকেই ফোন করলাম এবং শেলকেজী ছাড়া আর কারও কাছ থেকে উত্তর না পেয়ে একটু বেশ ঘাবড়ে গেলাম। শেলকেজীর মুখে জানলাম যে কদমজী করোনার করাল গ্রাসে নিমজ্জিত হয়েছেন এবং পরে ব্যাআরেজীর ফোনে জানলাম যে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী ধূমল ও করোনার শিকার হয়েছে। মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও এদের কাছ থেকে যা পেয়েছি তা অমূল্য এবং ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি এই মহাত্মাদের তাঁর চরণে স্থান দেন।
Thursday, 10 August 2023
তিলু নাপিতের বাড্ডি
তেলুগু ভাষায় বাড্ডি শব্দর অর্থ ছোট দোকান। তিলু পরামাণিক যে কি করে অন্ধ্রপ্রদেশের ভাইজাগ শহরে এসে জুটেছিল সেটা কেউ জানেনা। হয়তো তার বাপ ঠাকুর্দা বন্দর শহর ওয়ালটেয়ারে ( ভাইজাগের পুরোন নাম) কাজের সূত্রে এসেছিল এবং তারপর সেখানেই থেকে গেছে বংশানুক্রমে। তিলু পরামাণিক নামেই বাঙালি, কিন্তু ওখানে থাকতে থাকতে তাদের ভাষা, চলন বলে সবই রপ্ত করে ফেলেছে তাদের মতন। তিলুর ছেলেমেয়েরা সবাই তেলুগু মাধ্যমেই পড়াশোনা করে এবং তার বৌ ও তেলুগু। এসব সত্ত্বেও তিলু নিজেকে বাঙালি বলেই পরিচয় দেয় এবং বাঙালিদের অনুষ্ঠানে নিজেদের সামিল করে।
তিলুর বাড়ি পুরোন শহর বন্দরের কাছাকাছি। পূর্ণ মার্কেটে বাজার করতে গিয়ে মাছ কেনার সময় হলো আলাপ। মাছ বিক্রেতা মহিলা( যাকে আমি দিদি বলে ডাকতাম) কোন এক সময় কলকাতায় থাকার দরুন বাঙলা বলতে পারত এবং কলকাতা থেকে দক্ষিণ দেশে গিয়ে ভাষার সমস্যার জন্য কেউ যদি বাঙলা বলতে পারে বা বুঝতে পারে এমন লোকের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে তবে তার মনে হয় যেন সে হাতে চাঁদ পেয়ে গেছে। সুতরাং মেছুনি দিদি ও তিলুর সঙ্গে আলাপ হওয়ার মানে যেন আকাশে ডানা মেলে ওড়া। মেছুনি দিদির এক বোন আবার আম বিক্রি করত। সুতরাং আম কিনতে হলে ঐ ছোড়দিদির কাছেই কেনা হতো। বাজারের কাছেই ছিল তিলুর এক ছোট্ট সেলুন( কাঠের তৈরী) যেখানে মাত্র দুজনই একসঙ্গে চুল কাটতে পারে। তিলু মোটামুটি ভাবে সারা সপ্তাহ একাই সামাল দেয় কিন্তু রবিবার বা ছুটির দিন ছেলে এসে বাবাকে সাহায্য করে। যাই হোক, বাজার করতে এসে চুল কেটে বাড়ি ফেরা একদম রথ দেখা কলা বেচার মতন। তিন বন্ধু আমরা একসঙ্গে বাজার যেতাম তিনটে স্কুটারে এবং মাসে একবার হতো তিলুর দোকানে লেবু দিয়ে সোডা খাওয়ার ধূম। ওখানে কলকাতার মতন যত্রতত্র চায়ের দোকান মেলেনা কিন্তু পাওয়া যায় লেবু সোডা বা ঘোল( বাটার মিল্ক)। যা রোদের তেজ নিম্বু সোডা বা বাটার মিল্ক ছাড়া চলাও যায় না।
সব সেলুনেই একই ছবি বিশেষ করে মফস্বল বা ছোট শহরে। বম্বেতে কারও দম ফেলার সময়ই নেই, সবাই যেন ছুটছে তো ছুটছেই। চার্চগেট স্টেশনে ট্রেন ঢুকছে আর শয়ে শয়ে লোক সব রেডি হয়ে আছে ঐ ট্রেন থামার আগেই উঠে পড়বে একটু বসার জায়গা পাওয়ার জন্য। ঐ সময় কে ধাক্কা খেয়ে পড়ল বা পড়ে যাওয়া লোকটাকে পদপিষ্ট করে চলে গেল কিনা কারও ভ্রূক্ষেপ নেই। কলকাতায় ও বনগাঁ লোকালেও প্রচণ্ড ভিড় হয় কিন্তু বম্বের ভিড়ের কাছে কিছুই নয়। সুতরাং আমাদের মতন লোকের পক্ষে ঐরকম কিছু করা সম্ভব নয়। পড়ে যাওয়া লোকটাকে উঠিয়ে একটা বেঞ্চে বসিয়ে তার ছিটিয়ে পড়া কাগজ পত্রগুলো উঠিয়ে দিয়ে একটু ফার্স্ট এড দেওয়ার চেষ্টা থাকে। যাই হোক, পুরোন প্রসঙ্গেই ফিরে আসা যাক।
সমস্ত নরসুন্দরের মতন তিলুর ও স্টকে থাকা নানাধরণের গল্পের স্টক থেকে একটার পর একটা গল্প বেরোত চুল কাটার ফাঁকে ফাঁকে। নরসুন্দরদের এটা একটা বিরাট গুণ। অবাধ গতি ওদের নানান বিষয়ে সে শিল্পকলাই হোক বা রাজনীতিই হোক। অন্ধ্রপ্রদেশে অবশ্য রাজনীতি নিয়ে বিশেষ কেউ মাথা ঘামায় না যতটা আমাদের কলকাতায় বা পশ্চিমবঙ্গে হয়। ভোটের সময় স্কুটার বা মোটরসাইকেলের সামনে লাগানো পতাকা দেখেই বোঝা যায় সে কোন দলের। কিন্তু না, সেখানে না আছে কোন মারদাঙ্গা বা বুথ দখল বা রিগিং। ভোটের সময় শেষ তো সব দ্বিচক্রযান পতাকামুক্ত আর একঠেকেই আড্ডা বা পানভোজন। তিলুর কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ভোট নিয়ে বিশেষ আগ্রহ। কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম ওর কটা ছেলেমেয়ে? উত্তরে জানায় ওর পাঁচ ছেলে ও একটা মেয়ে।
অ্যাঁ, পাঁচটা ছেলে ও একটা মেয়ে মানে তোমাদের সংসারে আটজন সদস্য! একটু আশ্চর্য হয়েই জিজ্ঞেস করলাম তোমার বয়স কত এবং আজকের দিনে এত বড় সংসার! ও কিন্তু ভীষণ সপ্রতিভ ভাবেই উত্তর দিল যা শুনে তো আমরা তিনজনেই হাঁ।
ঐ যে ছেলেটাকে দেখছেন ও আমার সেজ ছেলে।
অ্যাঁ, সেজছেলে? আর বাকি রা কোথায়?
বড় দুই ছেলে ছোট দুজনকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে আছে।
গ্রামের বাড়ি! কোথায় তোমাদের গ্রাম?
আর বলবেন না। বসিরহাটের কাছে আমাদের পূর্বপুরুষের বাড়ি। বড় ছেলে শাসকদলের পঞ্চায়েত সদস্য। মেজ ছেলেকে কিন্তু বলেছি বিরোধীদলে থাকতে কারণ যতই পালাবদল হোক না কেন আমাদের বাড়িতে যেন কোন আঁচ না আসে। ছোট দুজন এখনও পড়াশোনা করছে। ওদেরকেও বলে দিয়েছি বাড়িকে সুরক্ষিত রাখতে গেলে যত পার্টি আছে সবজায়গায় যেন আমাদের বাড়ির কোন না কোন সদস্য থাকে।
কথায় আছে, জীবজন্তুর মধ্যে শিয়াল, পাখির মধ্যে কাক আর মানুষের মধ্যেএই নরসুন্দর অসম্ভব চতুর। বাজারের থলিগুলো স্কুটারেই আটকানো রোদেই শুকাচ্ছে। চুলকাটা শেষ করে তিনবন্ধুর বাড়ি ফিরে আসা এবং প্রত্যেক মাসেই নিজের নিজের বাড়িতে গঞ্জনা শোনা আর ভগবানের আশীর্বাদে এক কানে শোনা এবং অপর কান দিয়ে নির্গমনের ব্যবস্থা করা।
Subscribe to:
Posts (Atom)