Saturday, 16 March 2024

গুরুকুল

গুরুকুল শব্দটা কানে এলেই মনটা যেন ফিরে চলে যায় পুরোন দিনে, চোখের সামনে ভেসে ওঠে একদল ছোট ছোট ছেলে তাদের মাস্টার মশাইএর কাছে পড়ছে। মাস্টার মশাই বা গুরুদেব মাটির দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে আছেন এবং মাঝে মাঝে একটা হাতপাখা দিয়ে নিজের শরীরকে একটু ঠাণ্ডা করে নিয়ে অর্ধচন্দ্রাকৃতি ভাবে বসে থাকা ছাত্রদের নানা জিনিস বোঝাচ্ছেন এবং ছাত্ররাও তাঁর কথা একমনে শুনছে। এটা খানিকটা টোলের মতন। অমুক চক্কোত্তির টোল কিংবা তমুক শাস্ত্রীর টোল নামেই পরিচিত ছিল।  কিন্তু এই টোলের থেকে  গুরুকুলের মধ্যে যে পার্থক্য ছিল সেটা হচ্ছে গুরুকুলে সমস্ত বিদ্যার্থীরাই  ছিল  আবাসিক অর্থাৎ সেইসমস্ত ছাত্ররা গুরুগৃহে থেকে পড়াশোনা করত এবং গুরুগৃহে সমস্ত কাজ তারাই করতো এবং সেখানেই খাওয়া দাওয়া পড়াশোনার সঙ্গে তারা করতো এবং শিক্ষাশেষে তারা নিজের নিজের ঘরে ফিরে যেত এবং তারাও শিক্ষাদানে ব্রতী হতো। অনেক সময়ই এই শিক্ষার্থীরা বহু দূরদূরান্ত  থেকে শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে আসতো। এই গুরুকুল  শুধুমাত্র পড়াশোনায় ই সীমিত থাকতো না, সঙ্গীতে ও অস্ত্রবিদ্যায় ও প্রচলিত ছিল। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের  গুরুদেবের  কাছে বা ওস্তাদজীর কাছে নাড়া বা গাণ্ডা বাঁধতে হতো এবং যতদিন  একজন গুরুর কাছে শিক্ষা সম্পূর্ণ  না হয় ততদিন সে অন্য কোন গুরু বা ওস্তাদের কাছে  যেতে পারত না। এইভাবেই  তৈরী হতো এক বিশেষ ঘরানা। এক ই রাগের সঙ্গীতশৈলীর পরিবেশন এক ঘরানা  থেকে অন্য ঘরানার থেকে ভিন্ন ধরণের থাকায় বোঝা যেত যে শিল্পীর কি ঘরানা।  অনেক সময় সঙ্গীত সম্মেলনে বিভিন্ন ঘরানার শিল্পীর  সমাবেশ  হতো এবং গুরুজী তাঁর শিষ্যদের নিয়ে নিজের  পরিবেশনের সময় আসতেন এবং নিজের পরিবেশন সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই শিষ্যদের নিয়ে আসর ছেড়ে চলে যেতেন।  এর একটাই উদ্দেশ্য ছিল  যে কোনভাবেই  যেন তাঁর শিষ্যরা অন্য  ঘরানার  শিল্পীদের  দ্বারা প্রভাবিত  না হন। মহাভারতেও এই গুরুকুলের  উল্লেখ  আছে। কৃপাচার্য  বা দ্রোণাচার্যের অস্ত্রশিক্ষা পরশুরাম  বা বলরামের  শিক্ষা থেকে অবশ্যই আলাদা ছিল।

ইদানিংকালে  গুরুকুলের  কথা প্রায় শোনাই যায়না। কিন্তু একেবারেই  শোনা যায়না তা ঠিক  নয়। যাঁরা পিএইচডি করেন তাঁদের একজন গাইডের প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে যাঁর তত্ত্বাবধানে তিনি রিসার্চ  করছেন  তিনি গুরু হলেও সেই গুরুকুলের সোঁদা গন্ধ বিহীন কারণ এখানে ছাত্রকে তাঁর  গুরুগৃহে  থাকতেও হয়না বা তাঁর সংসারের  যাবতীয় কাজ ও করতে হয়না। একটা কথা প্রচলিত আছে যে "কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ,  পাকলে করে ট্যাঁসট্যাঁস।" গুরুকুলের ছাত্রদের  পড়াশোনার  সঙ্গে চরিত্র গঠন ও হতো  এবং কাদামাটির তালকে  যে কোন রূপ দেওয়া যায় কিন্তু  মাটি শুকিয়ে গেলে তাকে আর অন্য কোন রূপ দেওয়া যায়না। সুতরাং, গুরুকুলের নাম শোনামাত্র মনটা একটু ছটফট করে ওঠে আধুনিক  গুরুকুলের চেহারা দেখতে।

রাঁচি থেকে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরে নেতারহাট বলে একটা জায়গা আছে যেখানে এই গুরুকুলের অস্তিত্ব আছে বলে জানা গেল। স্বাভাবিক ভাবেই মনে একটা চিন্তা উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করল। পরের  মুখে ঝাল খেয়ে ঠিক উপলব্ধি করা যায় না। সুযোগ একটা এসে গেল। অর্জুনের প্ল্যান মাফিক সবকিছুই  ঠিকঠাক  হয়ে গেল।  হোটেল প্রভাত বিহার ডিল্যুক্সের অনতিদূরে শ্যালেট হাউস যেখানে বিহার ও উড়িষ্যার  লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার এডোয়ার্ড গেট বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে তৈরী করিয়েছিলেন একটি মনোরম কাঠের বাড়ি এবং সেটা গ্রীষ্মকালীন বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো, এখন সেখানে একটি মিউজিয়াম  তৈরী হয়েছে। মনোরম পরিবেশ কিন্তু সাপ সম্বন্ধে বিশেষ  সতর্কীকরণ থাকায় ঘুরে দেখার  ইচ্ছে সম্বরণ করতে হলো।  মিউজিয়ামের একাংশ বন্ধ থাকলেও  ঘুরে ঘুরে অপরদিকের  দোতলা অংশে বিভিন্ন ধরণের সুষমামণ্ডিত কাঠের  কাজ বিশেষ আকর্ষণ করে। তারই পাশে চোখে পড়ল গৌতম আশ্রম। অনেকটা জায়গা জুড়ে এক একটা আশ্রম। কিন্তু সমস্ত আশ্রমের  গেট ই বন্ধ। মনে হচ্ছে এটাই হয়তো গুরুকুল।  কিন্তু কে দেবে এর আসল পরিচয়? একটার  পর একটা এইরকম আশ্রম।  কোনটার নাম প্রেম আশ্রম, কোনটার নাম আনন্দ আশ্রম। বিরাট এলাকা জুড়ে একটার পর একটা এইরকম বাড়ি এবং তার সংলগ্ন  জমি। অনেক খোঁজ করার পর একটা বাড়ির  সামনে দেখা গেল কয়েকটা ছেলে কোদাল দিয়ে মাটি কোপাচ্ছে। গাড়ি থেকে নেমে জিজ্ঞেস করতে জানা গেল যে ঐটাই  গুরুকুলের একাংশ। কিন্তু কোন বড় কোন মানুষ  চোখে না পড়ায় অনুসন্ধিৎসা মিটলনা।  ঠিক তার পাশেই আরও  একটা গেট খোলা থাকায় ভেতরে ঢুকতেই এক ভদ্রমহিলা বেড়িয়ে এলেন। আগে শুনেছিলাম  যে এই আশ্রমের  পরিচালিকা একজন গুরু মা বা মাতাজী।একটু হেসে নিজেদের পরিচয় দিয়ে আসার  কারণ বললাম। উনি আমাদের  ভেতরে আসতে বললেন। এরপর ভদ্রমহিলার  জায়গা নিলেন  একজন গাঁট্টাগোট্টা ভদ্রলোক যিনি ওঁর স্বামী।  ভদ্রলোক জানালেন  যে এই গুরুকুলে এইরকম  একুশটা আশ্রম রয়েছে এবং প্রত্যেক  আশ্রমে  রয়েছে পঁচিশ জন ছাত্র। তাঁর ই তত্ত্বাবধানে এইছাত্ররা থাকে এবং তাঁর স্ত্রী এই ছাত্রদের খাওয়া দাওয়া ও সমস্ত কিছুই  দেখাশোনা করেন। এই ছাত্রাবাসে বিভিন্ন  শ্রেণীর  ছাত্ররা থাকে এবং পড়াশোনা ছাড়াও  সমস্ত কাজ মায় ঘর ঝাঁট দেওয়া এবং বাথরুম  পরিষ্কার  রাখাও  তাদেরই  দায়িত্ব। এককথায় বলা যায় স্বাবলম্বী হতে শেখা এখানেই হয়। কথায় কথায় জানা গেল যে তিনি ফিজিক্সের  টিচার  এবং তিনি ডক্টরেট। একদম মনেই হয়না চেহারা দেখে, একটা সাধারণ  জামা গায়ে একজন ষণ্ডাগোণ্ডা ধরণের  লোককে দেখলে কেই বা মনে করতে পারে যে ইনি ডক্টর রাকেশ গুপ্ত, পিএইচডি। মানুষের  চেহারা দিয়ে কিছু বিচার  করা যায়না। তাঁর মতন এইরকম বিভিন্ন  শাখার  মাস্টার মশাই রয়েছেন।  যখন  ক্লাস  টেনের  ছাত্রদের  ফিজিক্সের  ক্লাস  থাকে তারা তখন তাঁর  ঘরে এসে পড়াশোনা করে এবং পরবর্তী ক্লাসের মাস্টার মশাইএর  ঘরে তারা চলে যায় এবং তাঁর  ঘরে অন্য  বিভাগের ছাত্ররা আসে। জানতে চাইলাম  যে এই স্কুলে মাস্টার মশাইরা ক্লাসে আসেন না এবং ছাত্ররা মাস্টার মশাইএর ঘরে আসেন , এতে কি বিশেষ  ফল হয়?  উনি জানালেন  যে ছাত্ররা একজন শিক্ষকের ঘর থেকে যখন  আরও একজন শিক্ষকের  ঘরে যায় , ঐ সময়টাতে তাদের  মনটাও একটু ভাল  হয় নিজেদের  মধ্যে কথোপকথনে  এবং  আগের  ক্লাসের যে পড়াটা হয়েছে  তার থেকে সাময়িক  মুক্তি এবং পরের  ক্লাসের  জন্য  মানসিক  প্রস্তুতি মেলে। যুক্তিটা  বেশ গ্রহণযোগ্য মনে হলো। বিরাট  খেলার  মাঠ  এবং  ছাত্রদের বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের  উৎকর্ষতা লাভের  জন্য  সমস্ত সুযোগ  রয়েছে। স্কুলের অ্যাডমিশনের সময় এককালীন  দুশো টাকা দিতে  হয় আর বাকি সমস্ত খরচ ঝাড়খণ্ড সরকারের। পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের পড়াশোনা এবং অন্যান্য বিষয়ে পারদর্শী করার এই সামগ্রিক  প্রয়াস অবশ্যই ধন্যবাদার্হ। ডক্টর গুপ্ত জানালেন  যে মেয়েদের  জন্য ও হাজারিবাগে  ঝাড়খণ্ড সরকারের  একটি স্কুল  রয়েছে। সরকারের  তরফে এই উদ্যোগকে সত্যিই  স্বাগত জানাতে হয়। তথাকথিত  পিছিয়ে পড়া রাজ্য যদি এই প্রয়াস নিতে পারে, অন্য রাজ্য কেন এই বিষয়ে পিছিয়ে থাকবে? সবকিছুই  কি রাজনীতির  আড়ালে হারিয়ে যাবে?

No comments:

Post a Comment