Friday, 15 October 2021

কুমড়ো কাটা ভাসুর

আগে যখন  যৌথ পরিবার  ছিল তখন প্রত্যেক  সংসারেই পাঁচ সাতটা ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের ও তাদের  বাবা মায়েদের এবং অনেক ক্ষেত্রে বোন ভগ্নীপতিও তাদের  সংসার এর মধ্যেই  থেকে যেত। পুরোনো কলকাতায় বিশেষ করে উত্তর কলকাতায় এইরকম  বড় বাড়িতে এক ছাদের তলায় বহু মানুষের বাস ছিল। মফস্বলেও  এইরকম  বাড়ির  সংখ্যা নিতান্ত  কম ছিলনা। এইসব যৌথ পরিবারকে ধরে রাখতো  তাদের  জমিদারি কিংবা পারিবারিক  ব্যবসা। ব্যাঙ্কে যৌথ হিন্দু পরিবারের  অ্যাকাউন্টে সংখ্যাও  নিতান্ত  কম ছিলনা। এখনও  অবশ্য  এইরকম  অ্যাকাউন্ট  আছে কিন্তু সেটা কি করে কম ট্যাক্স দেওয়া যায় সেই চিন্তা মাথার  মধ্যে ঘোরার  জন্য। পারিবারিক  ব্যবসার তো অ্যাকাউন্ট  রাখতেই  হবে ,সেখানে দোষের  কিছু নেই  কিন্তু ট্যাক্স  ফাঁকি দেবার  উদ্দেশ্যে যখন  সেটা ব্যবহৃত  হয় তখন  সেটা নিশ্চয়ই  গর্হিত  অপরাধ।  অবশ্য  এখানে ছোট  বড় সবার  মানসিকতাই  এক। আইনের  প্রাবধানে যেটা করা সম্ভব  সেটা করেও  রিটার্নে কিছু আয় না দেখানো এটা একটা স্বভাবে পরিণত হয়ে গেছে। গতবছর অর্থাৎ দুহাজার কুড়ি সালে সেপ্টেম্বর  মাসে লোকসভায় জানানো এক তথ্য  অনুযায়ী মাত্র এক শতাংশ  লোক ইনকাম  ট্যাক্স  দেয়। কেউ কেউ  বলেন, না এটা ঠিক  নয়,  এটা প্রায় এক দশমিক  ছয় শতাংশ সাবালক লোকদের  অর্থাৎ যাঁরা রোজগার  করেন। এঁদের  মধ্যেই রয়েছেন  দরিদ্র এবং অতি দরিদ্র যাঁদের  নুন আনতে পান্তা ফুরায়  তাঁদের  ট্যাক্স  দেওয়ার প্রশ্ন  তো আসেই না বরং তাঁদের  বেঁচে থাকার  জন্য  সরকারকে নানাধরণের  সাহায্য  করতে হয়। আর এই সাহায্য  পাওয়ার  জন্য তাঁদের  রাজনৈতিক  নেতাদের  দ্বারস্থ হতে হয় এবং এইখানেই  চলে কেরামতি। আমরা তোমাদের জন্য  চোখের জল ফেলব, তোমাদের  কথা যথাযথ জায়গায় পৌঁছে দেব, সব ঠিক আছে কিন্তু  তাতে আমাদের  পেট চলবে কি করে? তোমরা আমাদের  কিছু ভাগ দাও আর তোমরা ও বেঁচে থাকো আর আমাদেরও  শাঁসালো করে রাখো। তোমাদের  ভাগের  টাকায় আমাদের  ছেলেমেয়েরা ভাল  স্কুলে পড়বে, বড় হয়ে বিদেশ  যাবে, সেখান  থেকে মেধা না থাকলেও  একটা সার্টিফিকেট  কিনে আনবে যার জোরে ভাল  চাকরি না পেলেও নেতা হতে কোন আপত্তি নেই,  তাদের দিকে তোমরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে আর বলবে বাবুসাহেবকে জেতাতেই  হবে, উনি তো আমাদের  ঘরের  ছেলে। এই খেলা  চলতেই  থাকবে ততদিন পর্যন্ত  যতদিন  এই সাধারণ  মানুষের  জ্ঞাননেত্র  উন্মীলিত না হয় এবং সেই আশা সুদূর  পরাহত। তোমাদের  ছেলেমেয়েরা মিউনিসিপ্যাল স্কুলে পড়ুক,  পড়াশোনা কিছু হোক না হোক ,দুপুর বেলায় কিছু খাবার  খাক আর ফিরে এসে গুলতানি করুক আর একটু বড় হয়ে আমাদের  পার্টিতে নাম লেখাক। যখন  দরকার  পড়বে তখন  কারো বাড়িতে বোমা মেরে বা দরকার  পড়লে প্রতিবাদী কন্ঠ চিরতরে স্তব্ধ  করে দিয়ে আমাদের  পার্টির পাকাপাকি সদস্য  হয়ে যাবে। দরকার  পড়লে আমরাই তোমাদের  পুলিশের  হাজতে পাঠিয়ে দিয়ে চিরতরে সরকারি চাকরির  সুযোগ  বন্ধ করে দিয়ে আমাদের  অঙ্গুলিহেলনে নাচতে বাধ্য  করবো। তোমাদের  জন্য  মাঝেমধ্যেই  চোখে গ্লিসারিন দিয়ে চোখের  জল ফেলব, মাঝে মাঝেই কিছু শাঁসালো মানুষকে ঠান্ডা চোখে হুমকি দিয়ে টাকা তুলে তোমাদের  খাওয়াব আর ফটোগ্রাফার  আমাদের ফটো  তুলে বিভিন্ন  পত্রপত্রিকায়  ছাড়বে আর লোকে ধন্য ধন্য  করবে। এই চক্রব্যূহ  থেকে বেরোনোর  কোন রাস্তা নেই। 

কিন্তু এতসব কিছু বলার  সঙ্গে কুমড়োকাটা ভাসুরের কি সম্পর্ক?  যে কোন যৌথ পরিবারেই  এক আধটা ভাই থাকতো যারা বিয়ে থা না করে সংসারের যাবতীয় খুঁটিনাটি সব কাজ করতো এবং বাবা মায়েদের  দেখাশোনা ,বাজার  করা, ভাইদের  বাচ্চাদের খেলতে মাঠে নিয়ে যাওয়া , ভাই ভাদ্দর বৌদের  সিনেমার  টিকিট  কেটে আনা মায় যাবতীয় ফাই ফরমাস  খাটা এইসব কাজ করা। এঁদের  মধ্যে কেউ যদি সর্বজ্যেষ্ঠ  হতেন তাহলে  বৃদ্ধ বাবা মায়ের সমস্ত  কিছু  দায়দায়িত্ব সামলে সংসারের সব ঝামেলা মেটাতে গিয়ে আর বিয়েই করা হয়ে  উঠতো না। এঁরা নিজের  প্রয়োজনের কথা বলতেই পারতেন  না এবং যদি বা কোন বিয়ের সম্বন্ধ  এল সেটাকেও  কিভাবে নাকচ করতে হয় তা এঁদের  ওপর যারা নির্ভরশীল  তাদের  কাছে শিক্ষনীয়  ছিল। কোন কোন বাবা মা বলতেন  বা অন্যান্য  ছেলে বা বৌমারা তাঁদের  বলতে বাধ্য  করতেন যে ও তো বিয়ে করবে না বলেছে। আর সেই বড় ভাই  কি করে লজ্জ্বার মাথা খেয়ে বলেন  যে আমি বিয়ে করব। সেটা বলাও হতো না আর তিনি অকৃতদার হয়ে সবার  প্রতি দায়িত্ব পালন করে একদিন  পৃথিবীর মায়া ছাড়াতেন। অত বড় সংসারে সবার  মুখে খাবার  জোগাতে  শস্তার  তরকারি কুমড়ো আসত কিন্তু কোন ভাই বা ভাইয়ের  বৌদের  ঐ কুমড়ো কাটার ইচ্ছে না থাকায় সেই  অগতির  গতি বড়ভাসুরকে অনুরোধ  কুমড়ো কেটে দেওয়ার জন্য।  যুক্তি শুনলে মাথা ঘুরে যাবে। কুমড়ো কাটলে  তাদের  স্বামীদের  জীবন হানির  আশঙ্কা থাকে। এই কথা শোনার  পর আর কোন ভদ্রলোক  আর কুমড়ো  না কেটে থাকতে পারেন।  কে চান তার ভাইয়ের  বৌ বিধবা হন।এই কারণেই  তাঁদের  কুমড়ো কাটা ভাসুর বলা হতো। 

এবার  আসি আমাদের  দেশের  নব্য যুগের কুমড়ো কাটা ভাসুর কে হতে পারেন? হয়তো এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে খুব  কম হলেও এখনও  আছেন এইসমস্ত বিরল প্রজাতির  মানুষ  যাঁরা নিজেদের  স্বার্থ না দেখেই অন্যের  সাহায্যে এগিয়ে আসেন। নিশ্চয়ই  একজনের  কথা বিশেষ ভাবে মনে আসে আর তিনি হচ্ছেন  টাটা গোষ্ঠীর  কর্ণধার  শ্রী রতন টাটা মহাশয়। দেশের  প্রয়োজনে, দশের  প্রয়োজনে তিনি যেভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাতে একনম্বর  কুমড়োকাটা ভাসুর  তিনিই হতে পারেন। ভারতের  মতন এত বড় দেশে আরও  অনেক  ভাই রয়েছেন  কিন্তু তাঁরা নিজেদের  সম্পদ বাড়িয়েছেন এবং তুলনামূলক ভাবে  দেশের জন্য  সেরকম কিছু করেন  নি। অবশ্য  একেবারেই  কিছু করেন  নি বললে সত্যের অপলাপ হবে কারণ  তাঁরা বহুলোকের অন্নসংস্থান করেছেন  এবং দেশের  অগ্রগতিতে যথেষ্ট  সাহায্য করেছেন  কিন্তু তাঁরা কেউই এঁর সমগোত্রীয়  নন। অকৃতদার  এই  ভদ্রলোক বিভিন্ন  সময়ে যথেষ্ট  অপমানিত  হয়েছেন  কিন্তু তিনি ন্যাড়া বেলতলায় একবার  যান এই প্রবাদ বাক্যটিকে  মিথ্যা প্রমাণিত  করেছেন।  তাঁর  দীর্ঘ জীবন  কামনা করি এবং ভগবানের  কাছে অশেষ প্রার্থনা আরও  অনেক  রতন টাটা সৃষ্টি করুন  তিনি যাতে আমাদের  মতন স্বার্থপর  লোকেরা যারা আমাদের  কোন দায়িত্ব  নেই এবং অন্যের  ঘাড়ে দায়িত্ব  চাপিয়ে আরও  নিশ্চিন্তমনে  ঘুমাতে পারি।
  
 

Monday, 23 August 2021

ITU 9 Bed No.2 of RTIICS

অনেকদিন ধরেই  ভাবছি জীবনের প্রথম হাসপাতালে থাকার  অভিজ্ঞতা একটু লিপিবদ্ধ করার কিন্তু শরীর টা জুৎসই  না থাকার জন্য কিছুতেই  তা হয়ে উঠছিল না। আজ শরীরটা একটু ফুরফুরে অনুভব করতেই বসে পড়তে ইচ্ছে হলো একটু দুচার কলম লিখে ফেলার ঘটনাক্রম ভুলে যাবার  আগেই। 
অনেকদিন  ধরেই হাঁটুর  ব্যথা একদম কাহিল করে দিয়েছে। বন্ধ সমস্ত  রকমের  কাজকর্ম  করা। গোদের ওপর বিষফোড়া করোনা। বাড়িতে যারা দেখা করতে আসত, তারাও  ভয়ে বাড়ি থেকে বেরোয় না। সামাজিক  মেলামেশা একদম বন্ধ। বন্ধুবর  অমিত বাবু যাঁর সেলুনে  চুল কাটা ছাড়াও বাড়তি পাওনা ছিল  চা এবং অসাধারণ  ভক্তি গীতি। ভারী মিষ্টি গলা ছিল  তাঁর, যদিও  কস্মিনকালেও  তিনি গান  শেখেন নি। তাঁর চলে যাওয়াটা এক ভীষণ  আঘাত যদিও  বয়স মাত্র  পঞ্চান্ন। এই করোনার  মাঝে যখনই  সরকার নিয়মকানুন একটু  শিথিল  করেছেন  তখনই  বন্ধু আমার সকাল  বেলায় দোকান  খোলার আগেই  আমার  বাড়িতে  এসে আমাকে ভদ্রলোক  বানিয়ে গেছেন। সেইদিন ও তিনি এসেছিলেন এবং তাঁর গুরুদেবের আশ্রমে লোকনাথ বাবার জন্মতিথি  পালনের  জন্য চাঁদা নিয়ে গেলেন আর তার কয়েকদিন  বাদেই তাঁর  ছেলের  কাছথেকে  তাঁর  হঠাৎই  চলে যাওয়ার  খবর পেয়ে একদম বাকশূন্য  হয়ে গেলাম। এই অতিমারিতে অনেক আত্মীয়স্বজন,  বন্ধুবান্ধবদের হারিয়ে হাসপাতাল সম্বন্ধে এক অত্যন্ত  ভয়াবহ ধারণা হয়েছিল। হাঁটুর  অবস্থা দিনদিন  খারাপ  হচ্ছে কিন্তু অপারেশনের  কথা ভাবতেই  পারছিনা এই অতিমারি এবং হাসপাতালের  কথা ভেবে।এরপর  অনেক কিছু  সমস্যা এসে যাচ্ছে একের পর এক। সহধর্মিনী এসে পড়লেন বম্বে থেকে। ইতিমধ্যেই  বন্ধুবর  অমলবাবু একদিন  সার্জেনের  কাছে নিয়ে গেলেন এবং মোটামুটিভাবে স্থির হয়ে গেল অপারেশনের। আগে যাঁকে দেখিয়েছিলাম তিনি পিয়ারলেস হাসপাতাল  ছাড়া কোথাও  করেন না কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যবহার ঠিক  মনঃপূত  না হওয়ায় একরকম  বাধ্য হয়েই  অন্য ডাক্তার এবং অন্য হাসপাতালের  খোঁজ  করতে হলো। আমার  ভাগ্নী এবং একজন  বন্ধুস্থানীয়  দাদা যাঁর  কাছে হাঁটু অপারেশন করিয়েছেন এবং খুব ভাল  আছেন তাঁর  সঙ্গেই  যোগাযোগ  করলাম এবং বলা যায় প্রথম দর্শনেই  প্রেম। 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাসপাতালে ডাক্তার সৌম্য চক্রবর্তীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া হল এবং সেটাও আমাদের  অর্জুন অমলবাবুর তত্ত্বাবধানে। স্থিতপ্রাজ্ঞ  অমলবাবুই ছিলেন  হোতা আমাদের  দাদাস্থানীয় বন্ধু বিমান দার অপারেশনের  সময় এবং সেই একই  ডাক্তার  সৌম্য চক্রবর্তীর কাছে। ওঁর প্রথম  হাঁটু আঠারই  ডিসেম্বর দুহাজার উনিশে এবং দ্বিতীয় হাঁটু বিশে  ডিসেম্বর  করা হয়েছিল এবং তিনি এখন  সম্পূর্ণ  সুস্থ।  তাঁর  সেই  প্রথম  অভিজ্ঞতার ফলের হিসাব আমি অপারেশনের  আগে যেসব  পরীক্ষা করানোর  দরকার  সেগুলো করিয়ে নিয়েছিলাম  এবং তাতে আমাদের পরিশ্রমের  সুরাহা হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে দিন স্থির হল যে উনিশে জুলাই  প্রথম  হাঁটু এবং একুশে জুলাই  দ্বিতীয় হাঁটুর অপারেশন  হবে। আঠারই  জুলাই  সমস্ত  বন্ধুবান্ধব  একরকম  প্রায় ব্যান্ডপার্টি  বাজিয়ে আমাকে ভর্তি করে দিল  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাসপাতালে। আমার  মনে হচ্ছিল  সতীদাহের সময় ঢাকঢোল বাজিয়ে সতীকে যেমন স্বামীর চিন্তায় সহমরণে যেতে বাধ্য  করা হতো ঠিক সেরকমই  যেন খানিকটা। আবার  কোন কোন সময় এটাও  মনে হচ্ছিল  যে পাঁঠাকে  বলি দেবার  আগে স্নান  করিয়ে কপালে সিঁদুর পরিয়ে যূপকাষ্ঠের সামনে যখন আনা হয় তখন  পাঁঠার যেরকম  মনের  অবস্থা হয় আমারও  যেন সেই অবস্থা। কিন্তু যে কষ্ট এই কয়েকবছর  পেয়েছি সেটা যখন ভাবছিলাম  তখন  মনে মনে একটা বল ভরসা পাচ্ছিলাম  এবং পাঁঠার  থেকে মনের দিক সামান্য একটু হলেও ঘএগিয়েছিলাম। অবশ্য  পাঁঠার  মনে এই ভাবোদয় যদি কখনও  হয় যে আমার  জন্মই হয়েছে লোককে মাংস খাওয়ানোর  জন্য, তাহলে ভগবানের  সামনে যদি উৎসর্গ হতে পারি তাহলে  পুণ্য বই পাপ তো হবেনা। যাই হোক,  মনের  মধ্যে যে ঝড় চলছিল তা বাইরে কিছুতেই  আসতে দেওয়া যাবেনা। ভিজিটিং  আওয়ার্স শেষ  হবার  পরেই  সাজো সাজো  রব পড়ে গেল। একজন  মেল নার্স  এসে বাঁহাতে  চ্যানেল  করে গেলেন। তিনি হঠাৎই জিজ্ঞেস  করে বসলেন যে স্যার  এই অল্পবয়সে আপনি কেন  হাঁটুর অপারেশন করাচ্ছেন? আমি তো হতচকিত হয়ে গেলাম।  তার  মানে সত্তর  বছরের পরে অপারেশন  না করালে আবার  কবে করাব? তিনি উত্তর শুনে একটু ঘাবড়ে  গেলেন।  অ্যাঁ, আপনার  বয়স সত্তর? হ্যাঁ, এই দুদিন  আগেই  জন্মদিনে পায়েস খেয়ে, কেক কেটে বাংলিশ হয়ে তবেই  না এসেছি এখানে। না না স্যার, বিশ্বাস  করুন , আপনাকে দেখে  পঞ্চাশ বাহান্নর বেশি লাগছেই  না। উত্তরটা শুনে মনে মনে ভাবলাম হুঁহুঁ বাবা, গডরেজ  কালি মেহেন্দি কি কামাল।  জানিনা কতটা আমার  মনোবল বাড়ানোর  জন্য  আর কতটাই  বা সত্যতা  আছে তার  মধ্যে। কিন্তু মনে মনে একটা খুশির  আমেজ ছড়িয়ে গেল। ঠাঁই  হয়েছে কেবিন নম্বর  আঠারোয় । অপারেশনের  আগে যা যা করণীয় একে একে তা সমাপ্ত হচ্ছে কিন্তু মনে বেশ খুশি খুশি ভাব। সকাল  বেলায় স্নান সেরে রেডি হয়ে বসে আছি ।অন্য একজন  নার্স  এসে অ্যাপ্রন পরিয়ে দিলেন এবং স্ট্রেচারে শুয়ে অপারেশন থিয়েটারের  দিকে যাত্রা শুরু হল। নিজেকে কেমন  যেন  একটা রাজা রাজা মনে হচ্ছিল।  ঐসময়  আমিই  তো আকর্ষণের  কেন্দ্রবিন্দু। ওটিতে  ঢোকার  আগের  মূহুর্তে দেখলাম ভাই  দেবাশিস, বন্ধু অমলবাবু ও  আমার  স্ত্রীকে। হাত নাড়িয়ে একটু হেসে সবার কাছে বিদায় নিয়ে যুদ্ধযাত্রায়  রওনা দিলাম। 
শুরু হল অ্যানেসথেসিয়ার কামাল। শিরদাঁড়ার  নীচের  দিকে পুটুশ  পুটুশ  করে গোটা চারেক  ইঞ্জেকশন দেওয়া হল এবং আমাকে বলা হল শুয়ে পড়ার জন্য। এর খানিকক্ষণ  পরে আমাকে বলা হল পা দুটো তোলার জন্য।  আমি বহু চেষ্টা করেও পা নড়াতেই  পারলাম  না। তখন  শুনতে পেলাম  যে ঠিক  আছে, অ্যানেসথেসিয়া সাকসেসফুল।  চোখের  উপর একটা কাপড় দিয়ে দেওয়া হল এবং মাথা ওঠাতে বারণ করা হল। ইতিমধ্যেই ডাক্তার  সৌম্য চক্রবর্তী এসে গেছেন  এবং আমাকে সকালের  শুভেচ্ছা  জানিয়ে তাঁদের  কাজ  শুরু করে দিলেন।  মাথা এবং শরীরের  মাঝে একটা পর্দা টেনে দেওয়া হল যাতে আমি  মাথা তুলে কি হচ্ছে তা দেখতে যেন  না পাই।
খানিকক্ষণ  পরে করাত চলার ভয়ানক  আওয়াজ  কানে আসছে কিন্তু টের পাচ্ছিনা কিছুই।  অবশ্য  টের পেলে যে কি হতো ভগবান  জানেন। এরপর  শুরু হল হাতুড়ির আওয়াজ। নতুন  হাঁটুর  প্রতিস্থাপন  চলছে কিন্তু আমার  মনে হচ্ছে কামারশালায়  কাস্তে,  কোদাল  তৈরী হচ্ছে। সবার কথাই  শুনতে পাচ্ছি কিন্তু স্পীকটি  নট। এর খানিকক্ষণ  পরে ডাক্তার সৌম্য চক্রবর্তীর  গলা, শ্যামল বাবু ,অপারেশন  হান্ড্রেড  পার্সেন্ট  সাকসেসফুল।  খুব ভাল  হয়েছে।  উনিতো বিদায় নিলেন  এবং এর কিছুক্ষণ  পরে আবার  রাজার মতো স্ট্রেচারে শুয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম এবং দেখা হল ঐ তিনজনের সঙ্গে। এবার  ঠাঁই  হল ছতলায়   নয় নম্বর আই টি ইউ এর দুনম্বর  বেডে।  সন্ধে বেলায় ডাক্তার সৌম্য চক্রবর্তী এলেন  এবং একটা ইন্টারভেনাস চালাতে বললেন  এবং হার্ট বিট পঞ্চাশ হলেই যেন  ওটা বন্ধ করে দেওয়া হয় কারণ ঐ ওষুধটা চালালে হার্ট বিট কম হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে  এটাও  বলে গেলেন  যে কোনরকম  অসুবিধে হলেই যেন  তাঁকে খবর দেওয়া হয়। শরীরের  বিভিন্ন  জায়গায় নানান জাতীয় নল লাগানো, ভিন্ন ধরণের  কাজ তাদের।  নড়াচড়া করার  উপায় নেই। মাঝরাতে হাতটা পায়ের  দিকে লাগল। চমকে উঠলাম। এটা কার শরীর? আমি কি শবদেহের স্তূপের  মধ্যে শুয়ে আছি , না কি? টিভিতে দেখেছিলাম  করোনার  সময় স্তূপীকৃত লাশের  মধ্যে থেকে  বড় লোহার  আঁকশি  দিয়ে একটা একটা লাশ কি করে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমারও  খানিকটা সেরকমই  মনে হচ্ছিল  কিন্তু উপায় নেই,  এখন  এই অবস্থায়ই  থাকতে হবে। মাঝে মাঝেই একজন  দুজন  আসছে এবং মনিটরের  দিকে নজর দিচ্ছে। কোনসময় নতুন  স্যালাইন চালাচ্ছে বা কোন সময় ওষুধ  দিচ্ছে চ্যানেল  দিয়ে। ইতিমধ্যে ডিউটি বদল হচ্ছে। বিভিন্ন  ধরনের  ইউনিফর্ম,  কারো সবুজ, কারও খয়েরি  আবার  কারও  বা নেভি ব্লু। যাদের  সবুজ  ড্রেস  তারা জুনিয়র  নার্স, খয়েরি রঙ পরিহিতরা  সিনিয়র  নার্স এবং নীল পোশাকধারীরা ডাক্তার। এসবগুলো  হয়তো সবাই  জানে কিন্তু  আমি যেহেতু হাসপাতালে প্রথম  এসেছি সেহেতু সবকিছুই  আমার  কাছে নতুন। বৃদ্ধ লোকের অ,আ,ক,খ শেখার  মতন। রাতের  ডিউটির রোস্টারের সঙ্গে মেলানো হচ্ছে কে কে এসেছে আর যারা নির্দিষ্ট  সময়ের  মধ্যে আসেনি তাদের  জায়গায় ডবল ডিউটি করতে বলা হচ্ছে কাউকে কাউকে। এটা কেউ কেউ  করতে চায় আবার  কারও কারও খুবই অনীহা। এইরকম  একজন ইচ্ছুক  ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম কেন  সে ডবল ডিউটি করতে চায়? উত্তরে জানলাম  যে এটাতে সে ওভারটাইম বাবদ পাঁচশো টাকা এবং ফ্রীতে  খাবার  পাবে। সত্যিই তো, গরীব ঘরের  ছেলে, মাইনে বাবদ আঠার হাজার  টাকা থেকে পি এফ বাবদ  কিছু টাকা কাটিয়ে, ঘর ভাড়া মাসে আট,নহাজার  টাকা দিয়ে, বাড়িতে কিছু টাকা পাঠিয়ে কিই বা তারা খাবে আর কিই বা জমাবে?  চারিদিকে এত সমস্যা কিন্তু সমাধানের  রাস্তা আমার  জানা নেই। শুনি আর কেবলই  কষ্ট  পাই। তবে একটা জিনিস  নজরে পড়ল যে এত কষ্ট  সত্ত্বেও মুখের হাসি কিন্তু মেলায় নি এবং সেবার যে আদর্শ  তার  থেকে এতটুকু ও বিচ্যুতি ঘটেনি। আমার  উল্টোদিকের  সারির বেড সাতনম্বরে একজন বর্ষীয়ান বিধবা ভদ্রমহিলা যাঁর  কোন সন্তান সন্ততি নেই কিন্তু পয়সার কোন অভাব  নেই কেবলই  অস্ফূট স্বরে বলে চলেছেন ঠাকুর  আমায় এবার  নিষ্কৃতি দাও আর দুই  চোখে বয়ে চলেছে অবিশ্রান্ত জলের  ধারা। একটি অল্পবয়সী মেয়ে( নার্স) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে চলেছে আর বলছে দিদা, কাঁদছো কেন , তুমি ভাল  হয়ে যাবে আর আবার  আগের মতো সব কিছু ঠিক  হয়ে যাবে। কিন্তু অন্ধের  কি বা দিন  আর কিই বা রাত্রি। খুব  ইচ্ছে হচ্ছিল  তাঁর সঙ্গে কথা বলার  কিন্তু দূরত্বের জন্য সে আশা আর পূর্ণ  হল না। আর নয় নম্বর  বেডে একজন  রোগী কিন্তু সম্পূর্ণ  ভিন্ন  চরিত্রের।  কেবলই  চেঁচাচ্ছেন আর পয়সার  গরম দেখাচ্ছেন  আর নার্স,  ডাক্তার  সবাইকেই  গালিগালাজ  করে চলেছেন। সবাই  অতিষ্ঠ  হয়ে উঠেছে। হক, হক করে আওয়াজ আসছে আর ডাক্তার,  নার্সদের মুন্ডপাত হচ্ছে আর তার সাথেই ঐ ওয়ার্ডের  সমস্ত  রোগীদের দফারফা। কয়েকজন  ডাক্তার  এসে তাঁর  ভিতরের  কফটা  বের  করে দেবার পরেই শুরু হল জল জল বলে  তারস্বরে চিৎকার। জল দেওয়ার পরেই শুরু হল বাটি বাটি বলে চিৎকার  এবং যথারীতি গালাগালি  কিন্তু একজনের ও মুখ থেকে কোন খারাপ শব্দ বেরোল না। খুবই  ভাল লাগল তাদের  অসাধারণ  ট্রেনিং এর কথা ভেবে। এর  জন্য আমি নিশ্চয়ই  বাহবা দেব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। এত কষ্টের  মধ্যেও  যে ছেলেমেয়েরা হাসিমুখে সেবা করে চলেছে তার  জন্য  কোন প্রশংসাই  যথেষ্ট  নয়। উনিশ তারিখ  রাতে একটি ছেলে এল আমাকে দেখাশোনা করার  জন্য।  নাম জিজ্ঞেস  করায় জানালো যে রাজেশ  দেবনাথ। চোখেমুখে  তার  ফুটে উঠছে সহৃদয়তা। এতটুকু চোখের  পাতা এক না করে শুধু আমাকেই  নয় সমস্ত  রোগীদের  যেভাবে দেখাশোনা করল তাতে মনটা শ্রদ্ধায় ভরে উঠল। সকাল  বেলায় তার রিলিভারকে  সমস্ত  কিছু বুঝিয়ে দিয়ে আঙ্কল আমি যাচ্ছি। এই মেয়েটি এখন  আপনাকে দেখবে। ইতিমধ্যেই  চলে এসেছে আমার পায়ের এক্সরে করতে, কেমন  হয়েছে অপারেশন  দেখার  জন্য। এরপর  দুজন এলেন পায়ে ব্রেস পরিয়ে হাঁটানোর  জন্য। আমার  দেখাশোনা করার জন্য যে মেয়েটি এসেছিল তার নাম দেবলীনা। একটু বেশিই  কষ্টের  মধ্যে থাকে সে, যেটা বোঝা যাচ্ছিল  তার  ব্যবহারে। সব কিছুই  করছে মেয়েটি কিন্তু চোখেমুখে  খুব  ক্লান্তির  ছাপ। এরমধ্যেই  আর একটি মেয়ে তাকে কিছু বলেছে সাহায্যের জন্য কিন্তু ও তার  আবেদনে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সাড়া দিলনাএবং আমার ই পরিচর্যা করতে থাকল। আমি তাকে বললাম  দেবলীনা তুমি বরং ওকে গিয়ে একটু সাহায্য  কর। ও বেচারা ঠিক  বুঝতে পারছেনা কি করা উচিত।  তার উত্তরে সে বলল যে  একদিন  দেবলীনা  ওর কাছে সাহায্য  চাওয়ায়  সে করেনি। আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম  যে ঠিক  আছে তুমি তাকে সাহায্য  করে বুঝিয়ে দাও  যে সেদিনের  ব্যবহার  তার  ঠিক ছিলনা। কিছুক্ষণ  পরেই  তাদের  দুজনের চোখেমুখে ফুটে ওঠা  আনন্দ  দেখে নিজের  মনটাই খুশিতে ভরেj উঠল।ইতিমধ্যেই  দিন গড়িয়ে সন্ধে হল, এল দীপা আমাকে দেখার  জন্য। সারারাত  আমার পায়ের  কাছে বসে মনিটর করছে।কখনও  চালাচ্ছে স্যালাইন  কখনও  অন্য  ওষুধ। পরের দিন  সকালেই  ডান হাঁটুর অপারেশন আর দীপা যেন  এক অতন্দ্র প্রহরী। যারাই  এসেছে আমার দেখাশোনা করতে তারা সবাই  নর্থ ইস্টের  ছেলেমেয়ে। কেউ ত্রিপুরার,  কেউ মেঘালয়ের,  কেউ বা নাগাল্যান্ডের আবার  কেউ  বা মণিপুরের। মনে মনে গেয়ে উঠলাম  বিবিধের  মাঝে দেখ মিলন মহান। ইতিমধ্যেই সেই গালাগাল দেওয়া ভদ্রলোক কে অন্য  কোথাও  পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে আর বেশ শান্তির  পরিবেশ  তৈরী হয়ে গেছে ওয়ার্ডে। দ্বিতীয় অপারেশনটাও বেশ রাজকীয় ভাবেই  সম্পন্ন  হয়ে গেছে এবং সন্ধেবেলায় যার সান্নিধ্য  আমি পেলাম  তার নাম  পরমার্থ। পরমার্থ ভৌমিক,  ত্রিপুরার  ছেলে। রাত্রি পৌনে বারটায় সে আমার ড্রেস চেঞ্জ করে দিল।  রাত দেড়টায় দেখি  সে এদিক থেকে ওদিক করছে এবং প্রত্যেকটি রোগীদের  খেয়াল  রাখছে। মনটা অপূর্ব  কৃতজ্ঞতায়  ভরে উঠল।  ডেকে বললাম,  ভাই  আপনি একটু বসবেন  না? স্যার,  আমি যদি বসি তাহলে আপনাদের  কে দেখবে? এই উত্তরে আমি আশ্চর্য  হয়ে গেলাম  ছেলেটির  কমিটমেন্ট  দেখে। অনেক উচ্চপদে  আসীন  লোকদেরও  এই ধরণের  আচরণ  দেখা যায়না আবার  খুব  সাধারণ  লোকের ও এই ধরণের  আচরণ শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে  দেয়। ওর ফোন নম্বর নেবার  জন্য  মনটা হাঁকপাঁক করতে লাগল এবং অবশেষে নিলাম ও। আরও  কিছু ছেলেমেয়েদের  ব্যবহার খুবই মনে রাখার  মতন। অভিজিত, রণজিত,  স্বাতী এবং আরও  একজনের যার নামটা জিজ্ঞেস  করা হয়নি। আমি তার  নাম দিয়েছি ত্রিপুরেশ্বরী।  ছোট্ট খাট্টো সুন্দর মেয়েটি সকাল  বেলায় এসেই মিষ্টি সুরে জিজ্ঞেস  করত," দাদু ,কেমন  আছ?" মনটা আনন্দে ভরে যেত। কেউ ডাকে স্যার, কেউ ডাকে আঙ্কল আবার  কেউ বা ডাকে কাকু কিন্তু দাদু ডাকের একটা আলাদাই  মাহাত্ম্য।  আমার  ভাইপো, ভাগ্নী দের ছেলেমেয়েরা কেউ ডাকে দাদাভাই,কেউ বা বলে ছোড়দাভাই। আর নিজের  নাতনি ডাকে ভাই  বলে কিন্তু দাদু ডাকের একটা আলাদাই মজা। হঠাৎই  লাফিয়ে একটা জেনারেশন  উঠে পড়লাম  কিন্তু যে আনন্দ  পেলাম  তা ভাষায় বর্ণনা  করতে  পারব না। আজ বাইশ তারিখ,  আই টি ইউ থেকে আমার  বিদায় নেওয়ার পালা। তার আগে যথারীতি এক্সরে নেওয়া এবং হাঁটানোর  পালা শেষ।  লাঞ্চের পরে আমাকে চলে যেতে হবে। এদিকে একনম্বর  বেডে একজন রোগীনী  এলেন  অপারেশনের পর।  যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন  আর ব্রাত্য  ব্রাত্য  বলে ডাকছেন। মাঝে মাঝেই  মা মা বলে যন্ত্রণায় ডেকে উঠছেন। মনটা খুব খারাপ লাগতে শুরু করল কিন্তু আমার  তো কিছুই  করার নেই।  অবশেষে রণজিত  আমার  কষ্টের  অবসান  ঘটিয়ে আমাকে আটতলায়  কুড়ি নম্বর  কেবিনে স্থানান্তরিত  করল।
বাইশে  জুলাই বিকেল বেলায় বাড়ির লোকজন এসেছে। অনেকদিন পর তাদের  দেখে আইটিইউ ছাড়ার  দুঃখ খানিকটা কমলো।  কিন্তু করোনার থাবা আবার  নতুন  করে বসতে শুরু করায় বিধি নিষেধের  মাত্রাটাও  বেড়ে গেল।  একজনের  বেশি লোককে আসতে দিচ্ছেনা। অথচ বন্ধুবান্ধবদের সংখ্যাও নিতান্ত কম নয় কিন্তু স্বাস্থ্য বিধির কথা চিন্তা করে একরকম  বাধ্য হয়েই দেখতে আসা বন্ধ করতে হলো। এরই মধ্যে অতনু আরটি পিসিআর  টেস্ট করিয়ে ফেলেছে আমার  সঙ্গে থাকবে বলে কিন্তু শনিবার রাতে রিপোর্ট  আসায় কেবলমাত্র  রবিবারের  জন্য  ওর থাকাটা অনেকটাই  নিরর্থক  হয়ে যাবে বলে ওকে নিষেধ ই করলাম।  যদি ও থাকতো তাহলে ওকে কেবিনের মধ্যেই  বন্দি থাকতে হতো কারণ  ওরা কেবিনে থাকা লোকদের  বাইরে যেতে দিচ্ছেনা।আর আমাকে সোমবার  ছেড়ে দেবে বলেছে। পরমার্থ এখানে শেরউইন বলে একজনের নাম উল্লেখ করেছিল। ও আমার সঙ্গে এসে দেখাও করলো। এও খুব  ভাল  ছেলে। দীপক  দাস, গৌতম মাইতি প্রত্যেকে খুব ভাল  ছেলে। এত ভাল  লোকদের  সংস্পর্শে এসে বাড়ির  লোকের  না আসাটা যেন  কিছুই  মনে হচ্ছিল না। দেখতে দেখতেই  সোমবার  বা ছাব্বিশ  তারিখ  এসে গেল।  আমাকে আজ ছেড়ে দেবে। কিন্তু সকাল থেকেই  মনটা কেমন  একটা বিষণ্ণতায়  ভরে গেল। মজুমদার দা ও দোলা বৌদি আসতে চেয়েছিলেন  কিন্তু সেই একজন ছাড়া কাউকে যেতে না দেওয়ার জন্য  বারণ করলাম। এদিকে সমস্ত ফর্ম্যালিটি পূর্ণ করে আমাদের অর্জুন  বা ভট্টাচার্য  সাহেব এবং দেবাশিস নীচে অপেক্ষা করতে লাগল। এদিকে পিউ এবং আমার  সহধর্মিনী নীচে অপেক্ষারত।  সমস্ত  কাগজপত্র  গোছগাছ করে দীপক  দাস আমাকে বিদায় জানাল। আমি দেবাশিসকে বললাম  ওদের  কিছু দেবার  জন্য  কিন্তু কাউকেই  রাজি করাতে পারলাম না। এবার  আবার রাজার  মতন ফিরে আসার  পালা। স্ট্রেচারে শুয়ে আমি যখন  আসছি তখন  আমার  দুচোখে জলের  ধারা দেখে সিস্টার  দুজন জিজ্ঞেস  করলেন, " আঙ্কল, বাড়ি যাওয়ার  সময় তো লোকে খুব  উৎফুল্ল  থাকে, আর আপনার  চোখে জল?" না ভাই, এটা হচ্ছে আপনাদের  ভালবাসা ও সহযোগিতার  ফল।
পৃথিবীতে ভালবাসা খুবই  দুর্মূল্য। আমি কতজনকে ভালবাসতে পেরেছি জানিনা কিন্তু যে পরিমাণ  ভালবাসা সকলের  কাছ থেকে পেয়েছি  তার  জন্য  আমি ভগবানের  কাছে অশেষ  কৃতজ্ঞ। অজয় ভাই ও লালুবাবু  ছুটে এসেছেন  সমস্ত  কাজ ফেলে যদি রক্ত লাগে তবে তাঁরা দেবেন।  সুদীপ্ত ছুটে এসেছে যদি কোন ডকুমেন্টের দরকার  হয়। আমি সকলের কাছে কৃতজ্ঞ  তাদের  শুভেচ্ছার জন্য । ভগবান  সকলের  মঙ্গল  করুন। 

Saturday, 8 May 2021

কবি ও অ-কবি

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ  ঠাকুরের  জন্মদিন। অনেক জ্ঞানী গুণী মানুষের  সমাগম। সবাই  এসেছেন  কবিকে একবার  চোখের  দেখা দেখতে। উনি যে সবার  প্রিয়। বেশীর ভাগ মানুষ  এসেছেন  কবিকে ভালবাসার জন্য আবার  কেউ কেউ  এসেছেন  স্ট্যাটাস  সিম্বল  বজায় রাখতে। এ যেন  পন্ডিত  রবিশঙ্কর  বা বিলায়েত খানের সেতার  শোনার জন্য সবচেয়ে দামী টিকিট কেটে হলে আসা। কমদামী টিকিট ওঁরা ভুলেও বসবেন না। ঝাঁ চকচকে জামা কাপড়, গয়নাগাঁটি লোককে দেখানোর এ এক অপূর্ব  সুযোগ। পিছনে কারা বসে? ওরা সঙ্গীত হয়তো একটু আধটু বোঝে কিন্তু রেস্তয় টান পড়ার ভয়ে তারা আসে শুধু সঙ্গীত শুনতেই আসে। ওরা কি বুঝবে এইসব দামী গয়নাগাঁটির  কদর। ঐখানে বসব, নৈব নৈব চ। সুতরাং অমুক  দাদা,তমুক ভাইকে ধরে একেবারে সামনের  সারির  টিকিট  চাই। বাজাতে বাজাতে পন্ডিতজীর  বা ওস্তাদজীর একবার  চোখ যদি পড়ে তাহলে জীবনটাই ধন্য হয়ে গেল।  আর যদি বা একটা অটোগ্রাফ  নেওয়া  যায় তাহলে তো তিন চার  পুরুষের  স্মৃতি রোমন্থন  চলতে থাকবে। যাক এসব কথা। এবার  আসল প্রসঙ্গে  আসা যাক। 

অনেক রথী মহারথীর  মাঝে একটা অবাঞ্ছিত  লোককে দেখে সবার  ভ্রূকুঞ্চন  শুরু হয়ে  গেল। ইতিউতি  ফিসফাস থেকে একটা চাপা গুঞ্জন  ছড়িয়ে পড়ল। একজন হোমরাচোমরা গোছের  উদ্যোক্তা তাকে এসে চেপে ধরে জিজ্ঞেস  করল," অ্যাই, তুইই  গুরুদেবের  কলমটা  চুরি করেছিলি  না? " আজ্ঞে হ্যাঁ। "হতভাগা, গুরুদেবের  কলম চুরি করে তুইই  আবার এই সুন্দর  অনুষ্ঠানে এসেছিস? চিনতে পারছিস  আমাকে? আমিই তোকে জেলে চালান  করেছিলাম।  হুঁ, হুঁ আমিই সেই  কোর্ট ইন্সপেক্টর  শরত  ঘোষ। আমার  চোখকে ফাঁকি? স্বর্গ, মর্ত্ত,  পাতাল যেখানেই থাকো না কেন  ঠিইক  খুঁজে  বের করব। এখন  এখান থেকে দূর হ ,ব্যাটা চোর কোথাকার। "  শরত বাবুর  গলার  আওয়াজ  নেহাতই  কম নয়। চেঁচামেচির  আওয়াজ গুরুদেবের  কানে পৌঁছেছে। উনি শশব্যস্ত  হয়ে সশরীরে উপস্থিত।  আহা হা, ছেড়ে দিন  বেচারিকে। কিন্তু শরতবাবু ইতিমধ্যেই  গদাম করে একটা কিল বসিয়ে দিয়েছেন  তার  পিঠে। বেচারার  নিঃশ্বাস  প্রায় বন্ধ হবার  জোগাড়। ইতিমধ্যেই  অ্যাডভোকেট  সৌরীনবাবু  মানে সৌরীন্দ্রমোহন  মুখোপাধ্যায়ের  আগমন। তিনি কোনমতে চোরকে শরতবাবুর হাত থেকে উদ্ধার  করে সস্নেহে  জিজ্ঞেস  করলেন, বাপু তুমি গুরুদেবের  কলমটি কেন চুরি করলে? উত্তরে চোর যা বলল তাতে  অনেকেই  বিস্মিত  হয়ে গেল। চোর  জানালো যে সে ভাবত যে গুরুদেবের  অত সুন্দর সুন্দর  লেখা ঐ কলমের  জন্যই  হয়। এত সুন্দর সুন্দর  কবিতা লেখেন তিনি যে তার সর্বদাই  মনে হতো গুরুদেবের  ছান্দিক জীবনের  পিছনের ঐ কলম। তার  নিজের  জীবন  কখনোই  পদ্য হয়ে উঠতে পারেনি এবং সদাই গদ্যময়। সে যে একেবারেই  গোমূর্খ তা নয় কিন্তু কবিতার  ছন্দ  কেন  যেন  আসেনা তার  কলমে। সুতরাং সে কখনোই  কবি হতে পারেনি, অ-কবিই থেকে গেছে। ঝলমলে ডগ শোয়ের  মাঝে নেড়ি  কুত্তার  যে অবস্থা হয় কবিকূলের  মাঝে অ-কবির সেই অবস্থাই হলো। চোখের  জলে টলটল করছে এহেন  অবস্থায় সে সভাত্যাগ  করল আর অন্যান্য  বহু গুণীজনের চোখে জল সিঞ্চিত  করে গেল।

Sunday, 11 April 2021

তুই, তুমি,আপনি

শমীক দা ছিলেন  রীতিমত  প্রেমিক মানুষ।  যেমন  দেখতে, তেমনই  পয়সাওয়ালা। প্রায়শই  লোকে তাঁকে প্রদীপ কুমার  বলেন ভাবতো। লাল টুকটুকে চেহারা আর পরতেন নিপাট করা ফিনফিনে ধুতি আর গিলে করা পাঞ্জাবি। ঐ হোস্টেলেই থাকা একজন অঙ্কের প্রফেসর তাঁর মাস মাইনের বেশিরভাগ  টাকাটাই  সংসার খরচা বাবদ মানি অর্ডার করে দিয়ে কোনরকমে নিজের  পিছনে খরচ করতেন। শমীক দা প্রথমে সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হয়ে অঙ্কের ক্লাসে ঐ স্যারকে দেখে এমন কিছু মন্তব্য  করেছিলেন  যাতে তাঁর চামচা  কিছু ছেলেমেয়ে  খুব উল্লসিত  হলেও বেশ কিছু পড়াশোনা করতে আসা ছেলেদের চাপে তাঁকে গুটিয়ে যেতে হয়েছিল  কারণ  সময়টা ছিল  ষাটের  দশকের শেষ ভাগ। স্যার কিন্তু কোন কথা বলেন নি যদিও  মনে মনে খুবই  কষ্ট পেয়েছিলেন।  তখনকার  দিনে স্যারদের  সামনে সিগারেট  খাওয়ার   কথা কেউ ভাবতেও  পারতো না। কিন্তু বড়লোকের  আদরে বাঁদর হয়ে যাওয়া শমীক দা স্যারের  পাশ দিয়ে যাওয়ার  সময় স্যারের  মুখের  ওপরই  ধোঁয়া ছেড়ে দিতেন। স্যার  কিছুই  বলতেন না।একদিন  ঐ ক্লাসের ই একটি  মেয়ে রেখা সরাসরি শমীক দাকে চার্জ করল।" কি ভেবেছেন বলুন তো? অনেকদিন  ধরেই  দেখছি  আপনি স্যারকে সবসময়  অপমান  করার  চেষ্টা করেন কিন্তু উনি আপনাকে কিছুই  বলেন না। কিন্তু  তার মানে এই নয় যে উনি অপমানিত  হন না। আপনার  অনেক  টাকা থাকতে পারে কিন্তু আপনি ওঁর নখের ও যোগ্য  নন।" স্যার  কিছু না বললেও  মনে মনে খুব  খুশী হয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই সব ছেলেগুলোও যারা রেখার একটু ঘনিষ্ঠ  হবার  চেষ্টা করতো কিন্তু শমীক দার পয়সায়  খাওয়া কিছু ছেলেদের জন্য  কাছে ঘেঁষতেও  সাহস করতো না।

শমীক দার সঙ্গে রেখার একটু কাছাকাছি আসার সম্ভাবনাটা  প্রায় এটাতেই শেষ। তখনকার  প্রেম  নিবেদন  একটা কিরকম যেন  ছিল। একটা ফিসফিসানি চুপিচুপি  কথা একান  সেকান  হতে হতে পাত্র এবং পাত্রীর  কানে পৌঁছে যেত, তারপর সেটা  টিকবে কি টিকবে না নির্ভর করতো পরিস্থিতির  উপর। যদি পাত্র শাঁসালো  হতো মানে বাবার  প্রচুর টাকা, বাড়ি গাড়ি জমিজমা  আছে তাহলে আপত্তির  তো কোন কারণ ই নেই। কত সুন্দরী মেয়েরা কতছেলেদের  বুক ভাসিয়ে চলে গেছে তার ইয়ত্তা  নেই। এইরকম ই এক ফিসফিসানি  রেখার কানে পৌঁছেছিল  কিন্তু ও ছিল  এক অন্যধাতের  মেয়ে।  ঐরকম  মাকাল  ফলকে  ও কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না। সুতরাং সুযোগের  অপেক্ষায় থাকা রেখা  এর পুরোপুরি  সদ্ব্যবহার  করল এবং ফল যা হবার  তাই হলো। শমীক  দার আপনি থেকে তুমিতে  আসা আর হয়ে উঠল না। হঠাৎই  একদিন  দেখি একটা অ্যাম্বাসডার  গাড়ি এসে থামল  হোস্টেলের সামনে। এক সুপুরুষ ভদ্রলোক  নামলেন  গাড়ি থেকে এবং সরাসরি চলে গেলেন  স্যারের  ঘরের  দিকে। দেখি স্যারের  হাত  ধরে মাথা ঝুঁকিয়ে কিছু যেন বলছেন  আর স্যার  মাথা নাড়িয়ে একটু করুণ করুণ মুখে কিছু  বলছেন  যে না না কিছুই  হয়নি।
তখন একই  ক্লাসে পড়া ছেলেমেয়েরাও  আপনি আপনি করেই কথা  বলতো এবং বেশ  কিছুদিন  যাবার পর  আপনি থেকে তুমি বা তুই সম্বোধনে  আসত সম্পর্কের  গভীরতার  উপর। দুটো ছেলের মধ্যে সম্বোধন একধাপ বা দুই ধাপ নামতো। এখানে ধাপটা  এইরকম।  আপনি (এক), তুমি(দুই) এবং তুই( তিন)। কিন্তু একটা ছেলে এবং একটা মেয়ের সম্বোধন  এক থেকে তিনে নামলেও এক থেকে দুইয়ে  নামলেই ছেলেমেয়েদের  মধ্য  গুঞ্জন  শুরু হয়ে যেত। জানিস ,বলেই ফিসফিসানি শুরু হতো। কিন্তু সময়ের  সঙ্গে সঙ্গে ছেলেমেয়েরা আজকাল  অনেক সহজভাবেই  মিশতে শুরু করেছে এবং তিন থেকে দুই বা এক যাবার  প্রশ্নই  নেই। বন্ধুত্বের পরিণতি  যদি বিয়ে অবধিও  গড়ায় তাহলেও তুই থেকে তুমি সম্বোধনে আসেনা। বয়স বাড়ার  সঙ্গে সঙ্গে শ্রুতিশক্তি কম হবার  উপকারিতাটা  বোঝা যায় কারণ  কানে আর খটকা লাগেনা।

Saturday, 10 April 2021

বিশ্বাসঘাতক

বেজে উঠেছে ভোটের  দামামা। চারিদিকে সাজ সাজ  রব। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি নয়। নেতারা রয়েছেন  নিজেদের  জায়গায়। দল বলে একটা বস্তু আছে কিন্তু ওটা একটা ছাতার মতন। আমরা সবাই  রাজা নিজেদের  রাজ্যে, রয়েছে  আমাদের  নিজস্ব  বাহিনী। প্রয়োজন  মতো তাদের  ব্যবহার  হয় কেউ ট্যাঁ ফো করলে কিন্তু বেকায়দায় পড়লেই ঢুকে পড় সেই ছাতার  তলায়। ছাতার  মালিক  তাদেরই  সেখানে আশ্রয় দেয় যাদের  নজরানা বেশ  পছন্দ মাফিক  হয়। নাহলে নিজের  হ্যাপা নিজেই সামলাও। অনেকটাই  সেই আগের  দিনের  রাজা, সামন্ত ও জমিদারের  মতো। আমরা যারা শান্তিপ্রিয়  নাগরিক, তাদের  হয়েছে  জ্বালা। না পারি এদের  বিরুদ্ধাচরণ  করতে, না পারি মন থেকে মেনে নিতে। সুতরাং গুমরে গুমরে মর।
ভোট আসে, ভোট যায় কিন্তু আমরা যে তিমিরে  সেই তিমিরে। দিনদিন  বয়স জনিত কারণে শরীর অশক্ত হচ্ছে , দৃষ্টিশক্তি  ক্ষীণ  হয়ে আসছে আর হয়ে পড়ছি পরের উপর নির্ভরশীল। মনটা এখনও  সচল থাকাতে ভাবি যে আর নয়, এবার  রুখে দাঁড়ানোর  পালা। পরিচিত  ব্যক্তিরা ভোটের  স্লিপ দিতে আসেন এবং যথারীতি মুখে একগাল হাসি নিয়ে কেউ বাঁদিকে আবার কেউ  ডানদিকে মাথা হেলিয়ে চোখের  ভাষায় জিজ্ঞেস করেন  ভাল তো? আরও  একটা অনুচ্চারিত  অনুরোধ  একটু দেখবেন।  এই মানুষটিকে  কিছুতেই  ফেলা যায়না। বিপদে আপদে  এই বর্ষীয়ান  মানুষটিই  আপনার  পাশে এসে দাঁড়ান। কোন কোন সময় মনে হয়, এইসমস্ত  ভাল মানুষগুলো কেন একটা নিজেদের  দল করেন না যাঁরা আমাদের  মতন সাধারণ  মানুষের  পাশে সবসময়ই  থাকবেন। হয়তো সবটাই  অলীক কল্পনা। সেইকারণে ভোট  দিতে গিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত  হয়ে যাই। কাকে ভোট  দেব? নিজের  বিবেক অনুযায়ী না পাশেথাকা  সেই  ভাল মানুষটির  দলকে যার পরিবর্তন  চাইছিলাম? শেষমেশ নিজের  বিবেকের  সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে স্বার্থান্বেষী হয়ে সেই  ভাল মানুষের  দলকে যারা বছরের পর বছর  সাধারণ  জনগণের  সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে এসেছে। কে বিশ্বাসঘাতক? আমি না সেই  দল?

ভাইজাগের ডাইরি : সিরকা 1988



সবেমাত্র বদলি হয়ে এসেছি বিশাখাপত্তনমে। সঙ্গে মা, স্ত্রী ও ছেলে। ভাষা একেবারেই অন্যরকম।আমাদের বাংলা বা ইংরেজি বা হিন্দিরসঙ্গে কোন মিল এইমুহূর্তে খুঁজে পাচ্ছিনা। সুতরাং আকারে, ইঙ্গিতে যতটা বোঝানো যায় আরকি। সন্ধ্যে বেলায় অফিস থেকে ফিরে একটু জায়গাটা দেখতে বেড়িয়েছি। অবশ্যই বাড়ির আশে পাশে কারণ বেশিদূর গেলে বাড়ি ফিরতে অসুবিধে হতে পারে এই ভেবেই কাছাকাছি থাকাই শ্রেয় ভেবেছি। বাড়ির পাশেই ছোট ছোটসাইকেল ভ্যানে সুন্দর বাজার বসেছে অনেক। ছোট ছোট এল ই ডি বালবের আলোয় চত্ত্বরটা খুবসুন্দর হয়ে উঠেছে। স্বপনের বাড়িটা প্রায় একদম মোড়ের মাথায়। ডান পাশে রবিদের বাড়ি আর বাঁ পাশে প্রসাদের বাড়ি আর পিছনেই মধুসূদনের বাড়ি। রবিদের বাড়ির পাশ দিয়েই একটা গলির মত রাস্তা চলে গেছে যেখানে থাকেন কানাড়া আম্মা। উনি আবার বাঙালিদের খুবই ভালবাসেন এবং মান্না দে ওঁর খুব প্রিয় শিল্পী।

Tuesday, 16 March 2021

"ও রাজা তোর কাপড় কোথায়---- কিছু ধেয়ে আসা প্রশ্নের উত্তর "

অনেকেই  আজকাল  কিছু প্রশ্ন করেই সমস্যা তুলে ধরেন কিন্তু তার  সমাধানের কোন সুরাহা না দিয়েই। অবশ্য প্রশ্ন  করা খুব সহজ ব্যাপার  নয় এবং যথেষ্ট  বুকের  পাটা  না থাকলে  তো একেবারেই  নয়। আর উত্তর,  সেটা তো অন্যলোকের  কাজ। মাথা খুঁড়ে মর এবার। 
একটা প্রশ্ন  উঠে এসেছে  যে প্রাক  দুহাজার  চৌদ্দ সালে যে ব্যাঙ্ক গুলো লক্ষাধিক  কোটি লাভ করছিল তারা হঠাৎই  আজ ধুঁকছে  কেন এবং তাদের  বাঁচাতে  কেন সরকারকে লক্ষ লক্ষ  কোটি টাকা মূলধনে  ঢালতে হলো? এই প্রশ্ন  জাগাটা খুবই  স্বাভাবিক এবং তার  উত্তরটাও  প্রায় সকলেই  জানেন।  কিন্তু  এর পিছনের  ঘটনা অনেকেই  জেনেও  না জানার  ভান করেন। দীর্ঘদিন ধরেই  ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ  অনাদায়ী  ঋণের বাস্তব  অবস্থা যেকোন  ভাবেই  হোক  না কেন  রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নজরে আনেন  নি বা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক দেখেও দেখেননি।  কিন্তু যখন  রিজার্ভ ব্যাঙ্কের  গভর্নর  স্বয়ং রঘুরাম  রাজন সংসদে জানালেন  যে বিপুল পরিমাণ  অনাদায়ী  ঋণ বাণিজ্যিক  ব্যাঙ্কগুলি তাঁদের  নজরে  আনেননি তখন  রীতিমত  হৈচৈ  পড়ে যায়। তিনি আরও জানান  যে এই ঋণের  বেশিরভাগ টাই দুহাজার  ছয় থেকে  দুহাজার আট সালের। নিয়মানুযায়ী  প্রত্যেক  ঋণের জন্যই প্রভিশনিং করতে  হয় এবং যতক্ষণ অনাদায়ী  ঋণের শত প্রতিশত প্রভিশনিং না করা হচ্ছে ততক্ষণ  লোনকে  রাইট অফ করা যায়না। এমন ও হতে পারে যে লোন দেবার  কিছুদিন  পরেই  বোঝা গেল  যে লোনটা পরিশোধ  করতে  পারবেনা তখন  পুরো লোনের  টাকাটাই প্রভিশনিং  করতে হয় যার অর্থ  সরাসরি লাভ কমে যাওয়া ।সুতরাং, যে ব্যাঙ্ক গুলো এতদিন  লাভ  দেখিয়ে এসেছে  তারা আসলে  লোকসানে  ছিল  এবং অনাদায়ী  ঋণ না দেখানোয় তারা লাভ  দেখিয়েছে। এরপর  দুহাজার চৌদ্দ  সালে  জুন মাসে সরকারকে সেন্ট্রাল রিপোজিটরি  অব্  ইনফরমেশন  অন লার্জ ক্রেডিটস  গঠন করতে হয় যাতে  ভবিষ্যতে এই ধরণের  ঘটনার  পুনরাবৃত্তি না হয়।
সরকারি মালিকানাধীন এবং বেসরকারি মালিকানাধীন ব্যাঙ্কের  মধ্যে পার্থক্য  এখানেই  যে যেখানে  সরকারের  শেয়ার  একান্ন  শতাংশের  বেশি সেটা সরকারি  ব্যাঙ্ক  আর অন্যথায় বেসরকারী  মালিকানাধীন। যে কোন ব্যবসার মূল লক্ষ্য যে সংস্থা  যাতে লাভ করে এবং শেয়ার হোল্ডারদের লভ্যাংশ বেশি  দিতে পারে। ব্যাঙ্ক  যখন  সরকারের  অধীনে আনা হয় তখন  মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল  যে এই ব্যাঙ্ক গুলো লাভ করবে এবং সেই লাভ  জনগণের  উদ্দেশ্যে ব্যবহার  করা হবে। কিন্তু  সরকারকে  যদি জনগণের  ট্যাক্সের  টাকা থেকে ব্যাঙ্কের  পুনরুজ্জীবনের  জন্য ব্যবহার  করতে হয় তাহলে  তো মূল উদ্দেশ্য ই ব্যর্থ হয়। এই কথাটা মনে রাখতে হবে সরকারি ব্যাঙ্ক বলেই সেটা যেমন  ইচ্ছা চলবে তা হয়না। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে সরকারি প্রকল্প ও যেমন বাস্তবায়িত  করতে হবে তেমনই সেই  ঋণ শোধ  করার  ব্যবস্থাও করতে হবে  যেটা একটা দুরূহ কাজ। কারণ  রাজনৈতিক  নেতাদের  চাপে অনেক  ঋণ দিতে হয় আবার  এই নেতারা ই ঋণগ্রহীতাদের  ঋণ পরিশোধ  না করার  জন্য উদ্বুদ্ধ  করেন।  এটা অনেকটাই  চোরকে  চুরি করতে  বলা আর গৃহস্থকে  সজাগ থাকতে বলা। এঁদের  চরিত্র  বদলানো শিবের  বাবার  অসাধ্য। তবে সবাইকে  এই দলে ফেলা যায়না। এখনও  অনেক  রাজনীতিবিদ  রয়েছেন  যাঁরা প্রকৃত ই সৎ কিন্তু তাঁরা আজ বিরল প্রজাতির।  এই ধরণের  চাপ বেসরকারি ব্যাঙ্কের  উপর চাপানো যায়না বলে তাদের লাভ  বা মুনাফা অনেক  বেশি এবং অনেক  বেশি লভ্যাংশ তাদের বিনিয়োগকারীদের তাঁরা দিতে পারেন যার নীট  ফল আরও  বেশিসংখ্যক বিনিয়োগকারী  আকৃষ্ট হন  এবং শেয়ারের  মূল্য ও চরচরিয়ে বেড়ে যায়। আর এই কারণেই  এইচ ডি এফ সি  ব্যাঙ্কের  ব্যালান্স  সিট এবং ব্রাঞ্চের সংখ্যা স্টেট ব্যাঙ্কের এক চতুর্থাংশ হলেও মার্কেট  ক্যাপিটালিজেশন  স্টেট ব্যাঙ্কের প্রায় দ্বিগুণ এবং আমাদের  দেশের  এক নম্বর  ব্যাঙ্ক। খুব সহজেই  যদি উত্তর  খুঁজতে  হয় তাহলে বলা যায় যে ঐ ব্যাঙ্ক  স্টেট ব্যাঙ্কের  চেয়ে বেশি যোগ্য।  কিন্তু এই উত্তরটা এত সহজ নয়। স্টেট ব্যাঙ্ক  করে আমজনতার  ব্যাঙ্কিং আর তারা করে বিশেষ শ্রেণীর  ব্যাঙ্কিং। সরকারের  যাবতীয় প্রকল্পের  রূপায়ণ স্টেট ব্যাঙ্কের  এবং অন্যান্য  সরকারি মালিকানাধীন ব্যাঙ্কের  মাধ্যমে হয় যেটা বেসরকারী  ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য  নয়। সুতরাং তারা যেখানে বেশি লাভ  হবে সেখানেই ঋণ দেবে এবং সেটা যাতে পরিশোধ  হয় তার ও ব্যবস্থা করে। প্রত্যন্ত  গ্রামে তাদের  উপস্থিতি খুবই নগণ্য। তাহলে আমজনতাকে  পরিষেবা কে দেবে-- সেই  সরকারি  ব্যাঙ্ক। সুতরাং দুজনের খেলার  জমি এক নয় এবং তুলনা করাটা সামগ্রিক ভাবে একটু অবিচার ই হবে সরকারি ব্যাঙ্কের  প্রতি। 

এবার  আসা যাক  সুদের হার  কমে যাওয়ার  ব্যাপারে।সুদের  হার  কমে গেলে  যাঁরা ব্যাঙ্কের  সুদের  উপর নির্ভরশীল তাঁদের  সংসার  চালানো ভীষণ কষ্টসাধ্য  হয়ে পড়ে। অথচ, দিনদিন জিনিস পত্রের  দাম  হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে।বৃদ্ধ বয়সে মানুষের খাবার  খরচ কমে যায় কিন্তু ওষুধের খরচ বহুদিন বৃদ্ধি পায়। তাহলে উপায় কি? নোট ছাপিয়ে সমস্যার কোন সমাধান  হবেনা। সেক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতি  হবে। ব্যাঙ্ক কে আগের  মতন সুদ দিতে গেলে ঋণে অন্তত চার শতাংশ সুদ বেশি নিতে হবে । আর তা না হলে তাকে ব্যবসা গোটাতে হবে। কর্মীদের বেতন ও ভাতা, বিদ্যুতের  খরচ এবং অন্যান্য  খরচ মিটিয়ে লাভ  করতে হলে ব্যাঙ্ক  কে প্রায় তের  বা চৌদ্দ  শতাংশ  সুদ পেতেই  হবে। প্রায়রিটি সেক্টরে  কমপক্ষে মোট ঋণের  চল্লিশ  শতাংশ  হতে হবে। মোট ঋণের  এক শতাংশ  অতি দরিদ্র মানুষের  জন্য দিতে হবে চার শতাংশ  সুদে। এদিকে ব্যাঙ্কের মোট ঋণ মোটামুটিভাবে  সমস্ত জমারাশির  ষাট শতাংশ  অতিক্রম  করবে না। এছাড়াও  ব্যাঙ্ক কে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের  কাছে কিছু টাকা স্ট্যাটুটরি  লিকুইডিটি রেডিও, ক্যাশ রিজার্ভ  রেসিও  বাবদ রাখতে হয়। সামান্য  একটা উদাহরণ দিলে জিনিস টা একটু পরিষ্কার  হবে। যদি মোট  ঋণ ষাট  টাকা হয় তবে প্রায়রিটি  সেক্টরে কম সে কম চব্বিশ টাকা দিতে হবে এবং ষাট  পয়সা  ডি আই আর লোন দিতে হবে আর বাকি পঁয়ত্রিশ টাকা চল্লিশ  পয়সা কমার্শিয়াল ও ইনস্টিটিউশনাল  লোন বাবদ দিতে হবে যেখানে বেশি হারে সুদ পাবে ব্যাঙ্ক।  কিন্তু  আন্তর্জাতিক  বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কস্ট অব ক্যাপিটাল কম হতেই  হবে। এছাড়াও  বিদেশ  থেকে অনেক কম সুদে লোন পাওয়ার সুযোগ  থাকার জন্য বড় শিল্পপতিরা  বিদেশ  থেকে লোন নেবে এবং সেক্ষেত্রে আমাদের  দেশীয় ব্যাঙ্কগুলো আরও  ধুঁকতে থাকবে। যদি বড় শিল্পপতিরা লোন না নেন তাহলে উৎপাদন  ব্যাহত হবে এবং বেকারের  সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গেলে সুদের  হার  কমাতেই  হবে। আর এইখানেই  অর্থনীতিবিদদের  অনেক জটিল  গণনা করতে হয়। আমরা এই জটিল  গণনা না বুঝলেও কিছুটা আন্দাজ  করার চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু যদি বোঝার  চেষ্টাই  না করি তাহলে সব আলোচনাই  বৃথা। এছাড়াও ঐ  সময়  মুদ্রাস্ফীতির হার  ছিল  অনেক  বেশি যেমন  আট সালে 8.35, নয় সালে 10.88,দশ সালে 11.99,এগারোয় 8.86,বারোয়9.31, তেরোয় 10.91, আর চৌদ্দ  সালে 6.35. বাস্তবিক  ক্ষেত্রে আমরা ঐ সময় ঋণাত্মক  সুদের হার  পেয়েছি। কিন্তু এটা অত্যন্ত  সত্যি কথা যে সংসার  চালাতে সবাই  হিমসিম  খাচ্ছে। এটাও খুব  সত্যি যে মধ্যবিত্তরা  চারদিক  থেকে মার খাচ্ছে। নেতাদের  চোখ ছলছল করে ওঠে গরীবদের  কথা ভেবে। যতরকম  ভাবে পার তাদের  সাবসিডি দেবার  কথা ভাবো আর তার  থেকে খানিকটা নিজেদের  পকেটে না গেলে ভাবব কেন?  যত্রতত্র  দান, গরীবদের  নামে প্রকল্প  চালু করে নিজেদের  পকেট ভরাতে না পারলে আমাদের  দেখবে কে? সাবসিডি  দিয়ে লোকদের  অথর্ব  না করে যাতে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে সেই প্রচেষ্টা  কেউ  করতে চায়না কারণ  তখন  ঐ লোকজনেরা নেতাদের  পাশে ভিড় করবেনা। 

একটা কথা মনে রাখা দরকার  যে অলাভজনক  সরকারি সংস্থা বেসরকারী  হাতে গেলে ক্ষতি কিসের? দিনের পর দিন  সাধারণ  ট্যাক্সদাতাদের  টাকায় কিছু লোক মৌরসিপাট্টা করে আয়েস  করে বসে বসে খাবে আর এই ট্যাক্সদাতারা নির্বাক দর্শক  হয়ে থাকবে এটা চলতে পারেনা। যদি কাজ করতে ইচ্ছা না করে তবে সরে দাঁড়াও, বহুলোক  কাজের প্রতীক্ষায় রয়েছে। বেসরকারী শিল্পপতিরা নিষ্ক্রিয়তাকে  বরদাস্ত  করবেনা। আরও  একটা কথা জানার আছে যে কোন উন্নত দেশে সরকারের  কাজ রেগুলেটরের।  ব্যবসা চালানো সরকারের  কাজ  নয়। কমিউনিস্ট  দেশ চীন  তার  ষাট শতাংশ  সরকারি মালিকানাধীন উদ্যোগ বেসরকারী উদ্যোগপতিদের হাতে তুলে দিয়েছে এবং ফল স্বরূপ  আজ চীন  পৃথিবীর  এক অন্যতম  শক্তিধর দেশ।  সমস্ত  পৃথিবীর  মানচিত্র  থেকে কমিউনিজম  আজ বিলুপ্ত প্রায়। একমাত্র  দেশ  চীন , তারাও  আজ রিফর্মের  পথে হাঁটছে  আর আমাদের  দেশের  নব্য কমরেডরা এখনও  পুরানো ধারণাতেই নিমজ্জিত। 

কর্পোরেট  ট্যাক্স কম করাতেই কয়েকজন  শিল্পপতির  সম্পদ আড়াই আড়াইশো  শতাংশ বেড়েছে এই ধারণাটা  আদ্যোপান্ত  ভুল। শেয়ার  মার্কেট  সম্বন্ধে যাঁদের  বিন্দুমাত্র  ধারণা আছে  তাঁরা জানেন  যে বাজারে তাঁদের  উপর ভরসা না থাকলে তাঁদের শেয়ারের  দাম  কখনোই বাড়বেনা  আর সেই কারণেই  এইচ ডি এফ সি ব্যাঙ্ক  স্টেট ব্যাঙ্কের  থেকে অনেক ছোট  হলেও  তারাই  আজ ভারতবর্ষের  বৃহত্তম  ব্যাঙ্ক ( মার্কেট ক্যাপিটালিজেশন  হিসাবে)। 

এখন ভাবার  সময় আমরা শক্তিশালী  উন্নত  দেশ হবো না উন্নতিশীল দেশ হিসাবে ভিক্ষার  পাত্র নিয়ে উন্নত দেশের  মুখাপেক্ষী থাকব।