Saturday, 18 December 2021

বিয়েবাড়ির চাটনি খবর

বিয়েবাড়িতে নানা ঘটনা ঘটে যেগুলো খুবই মজাদার  রসাল হয় এবং বিয়ে মিটে গেলেও তার রেশ  বহুদিন বজায় থাকে। অনেক মজাদার  ঘটনা ঘটলেও সব ঘটনার  সাক্ষী হওয়া কোন লোকের  পক্ষেই সম্ভব  নয়। সেইকারণে এই প্রবন্ধের  সংযোজন হতেই  থাকবে এবং এই প্রবন্ধ  কবে শেষ হবে তা একমাত্র ভগবানই বলতে পারেন। সবার কাছেই  অনুরোধ  থাকল  যে মুখরোচক কিছু খবরের  সন্ধান থাকলে যদি জানান তাহলে একটা  সার্থক গল্প দাঁড়ায়।

তখন মফস্বলে টেবিল  চেয়ারে বসে খাওয়া চালু হয়নি, ক্যাটারার  তো কোন দূরস্থান। বাড়ির শক্ত সামর্থ্য লোকেরাই পরিবেশন করত এবং লোকজন যদি সেরকম না থাকত তবে পাড়ার  লোকজন এসে কার্যোদ্ধার করে দিত। বিয়েবাড়িতে  তখন  মাটিতে বসেই  খাওয়া দাওয়ার রেওয়াজ  ছিল। পরিবেশনকারীরা পাজামা বা প্যান্টের উপর গামছা বা তোয়ালে জড়িয়ে শুরু করে দিত। টিমের  একজন ক্যাপ্টেন  থাকতেন  যিনি বাড়ির  মালিকের  সঙ্গে আলোচনা করে নিতেন  যে কত গেস্ট আছে এবং সেই সঙ্গে দেখে নিতেন যে কত পরিমাণ  খাবার  আছে। সেই বুঝে ঢালাও  পরিবেশন  বা হাত টেনে পরিবেশন করার  নির্দেশ তাঁর  টিমের  লোকজনদের  দিতেন। তবে প্রথম  দুটো ব্যাচ একটু টেনেই  পরিবেশন করা হতো।তারপর মালের স্টক এবং গেস্ট সংখ্যা বুঝে পরিবেশন করা হতো। তখন  আইসক্রিমের  চল আসেনি। দইয়ের হাঁড়ি বা মালসা  এক হাতে নিয়ে আর এক হাতে একটু বড় ধরণের  চামচ দিয়ে খুবই  মোলায়েমভাবে দইএর  উপর চালিয়ে দিতে হতো। সুতরাং, বুঝতে অসুবিধে  হয়না যে সবচেয়ে  অভিজ্ঞ পরিবেশকের হাতে এটা ন্যস্ত  হতো। পাঁচসেরি  একটা দইয়ের মালসা  এক হাতে নিয়ে ঝুঁকে পড়ে দই পরিবেশন করা কত কঠিন  কাজ  ছিল  সেটা অনুমেয়। এরপর  সবাই  চায় দইয়ের মাথা, আর নিজের  মাথা ঠাণ্ডা রেখে পরিবেশন করা এক দুরূহ  ব্যাপার ছিল। আর কিছু লোক  খেতেই  আসত যেন  মনে হয় সাতজন্মের খাওয়া ঐদিন ই খাবে। কিছু লোক  শুধু মাছ, মাংস  আর মিষ্টিই  খাবে যেন  বাড়িতে ঐরকম ই খায়। লাল শাকে বাদাম ভাজা আর তার উপর ছেটানো নারকেল কোঁড়া  দিয়ে শুরু করে নৌকার  মতন  বেগুন ভাজা কলাপাতায় পটাপট  পড়ত। এরপর গরম গরম  লুচিএবং আলুর দম বা এঁচোড়ের  ডালনা বা আলু পটলের তরকারি বা মটরশুঁটির কচুরী এবং আলু ফুলকপির  তরকারি( শীতের সময়) এবং এরপর আসত পোলাও এবং মাছের  কালিয়া এবং তারপর আসত পাঁঠার  মাংস। কম্পিটিশন করে খাবার  লোকজন এইবার  জামার হাতা ভাল করে গুটিয়ে নিয়ে বলতে থাকল বালতিটা  এখানেই  রেখে অন্য  বালতিতে  বাকিদের  সব দিন। আহা রে , চাঁদু,  বাড়িতে কটা পিস মাংস  খাও।  তখন  জিনিস পত্রের দাম  শস্তা হলেও  মাইনেও ছিল কম। সুতরাং, বাড়িতেও দুই তিন টুকরোর  মধ্যেই  সীমিত থাকত। এটাই  স্বাভাবিক। কেউ  অন্য কিছু না খেয়ে শুধু মাছ বা মাংস বা মিষ্টি খাবে এটা ঠিক  নয়। তবে অনেক  লোকেই তখন  খেতে পারত এবং সেই খাওয়াতে  যদি সামঞ্জস্য  থাকে তাহলে ঠিক  আছে। যেমন কেউ  লুচি, পোলাও এবং তার আনুষঙ্গিক  তরকারিপাতি খেয়ে মাছ বা মাংস খায় এবং তারপর আনুপাতিক হারে দই বা মিষ্টি খায় তাহলে আলাদা কথা। অনেকে রস চেপে রসগোল্লা খাওয়ার  সংখ্যা বাড়ায়। পরিবেশনকারিদের মধ্যেও  বেশ রসিক মানুষ থাকত  আর বলত ছানাচ্যাপ্টা দেব? এরকমই  সহকর্মীর  এক বিয়েতে বরযাত্রীদের  একজন আর একজনকে উস্কে দিল।   একজন সহকর্মী রসগোল্লা যতই  দেয় ততই  আলাদা একটা মাটির  ভাঁড়ে রস চিপে ফেলে দেয় এবং ছানাটা মুখের  মধ্যে দেয়।  পরিবেশন যিনি করছেন তিনি মনে মনে খুব  ক্ষুব্ধ  হলেও  কিছু বলতে পারছেন না। হাজার  হলেও  বরযাত্রী বলে কথা। যে সহকর্মীকে উস্কে দিয়েছিল সে একটু দূরে বসেছিল। সে একজন  পরিবেশনকারিকে ডেকে বলল," দাদা, একটা কথা বলব ? কিছু মনে করবেন  না তো?" না, না, না বলুন।  ঐ যে ভদ্রলোক  রসগোল্লা খাচ্ছেন,  উনি বেগুন ভাজা খেতে খুবই  ভালবাসেন  কিন্তু এখন যখন  মিষ্টি দেওয়া হচ্ছে,ও লজ্জ্বার খাতিরে চাইতে  পারছে না। ওকে গোটা কয়েক  বেগুন ভাজা এনে দেবেন? হ্যাঁ, হ্যাঁ, এটা একটা কথা হলো? উনি সঙ্গে সঙ্গে একটা ট্রেতে গোটা আটেক  বড় বেগুন ভাজা এনে দিল  তার পাতে। আরে এ কি করছেন,  এ কি করছেন? না, না, একদম লজ্জ্বা পাবেন না। আমি মিষ্টির  বালতি নিয়ে আসছি। তার রস চেপে রসগোল্লা
খাওয়া মাথায় উঠল। ও তো বুঝতেই পেরেছে  যে এটা কার কম্মো। কিন্তু  এভাবে ওকে নিরস্ত করা ছাড়া আর কোন  রাস্তা ছিলনা।

এবার  আসা যাক  আরও  একটা মজাদার ঘটনায়। এটা ছিল  একটা মোটামুটি ঘ্যামা বিয়ে। বিরাট ব্যবসা ওদের। জুট মিল, কাপড়ের  দোকান ( হোলসেল ও রিটেল),সোনার  দোকান ও পেট্রোল পাম্প।  এছাড়াও  পুকুর,  জমি জমা, এককথায় বিশাল  ব্যাপার।  ওরা অনেক ভাই। সুতরাং বিশাল  ব্যবসা সামলানো কোন বড় ব্যাপার ই নয়। ওদের যিনি বড় ভাই মানে তিনি শুধু বয়সেই বড় নন ওদের  ব্যবসা সাম্রাজ্যের ও মুখ্য মাথা। বিশাল  বাড়ি ওদের, একটা নয়, দু দুটো তিনতলা বাড়ি। মাঝখানে  বিশাল  উঠোন । দুটো বাড়ির ছাদে ম্যারাপ বাঁধা । একটা বাড়ির  ছাদে যখন  খাওয়া দাওয়া হয় তখন  অন্য  বাড়ির  ছাদ পরিষ্কার  করা হয়। এখন আমরা দু কামরা বা তিন কামরার ফ্ল্যাটে থাকা লোক। সুতরাং, বিয়ে বা অন্য  কোন অনুষ্ঠান  করতে গেলে হল বা রিসর্ট ভাড়া করতে হয়। কিন্তু তখন তো ফ্ল্যাট  কালচার  আসেনি, স্টেশনে নেমে রায় ভিলা বা চৌধুরী  ম্যানসন যাব বললে রিক্সাওয়ালারা বসিয়ে নিয়ে মহাসমাদরে নিয়ে এসে বাড়ি পৌঁছে দিত। অনেক সময়ই তারা ভাড়া চাইতেও  লজ্জা পেত। ভাড়া জিজ্ঞেস  করলে তারা বলত যা হয় দেবেন কারণ ভাড়া চাইলে যদি বাবুদের সম্মান  নষ্ট হয়ে যায়। বাবুদের বাড়ির  অতিথি মানে তাদের ও যেন অতিথি। আর্থিক  ও সামাজিক  বৈষম্য  থাকলেও কেমন যেন  একটা সৌহার্দ্য  ও প্রীতির সম্পর্ক  ছিল যা কালক্রমে আজ নিশ্চিহ্ন। যাই হোক,  ফিরে আসা যাক  সেই বিয়েবাড়ির কথায়। এখানে সব কিছুই  ঢালাও। এই বিয়ে বাড়িতে খাওয়ার  প্রতিযোগিতা হতো ।শহরের  বিভিন্ন  ক্লাবকে তাঁরা নিমন্ত্রণ  করতেন এবং সেরা পেটুক মশাইকে তাঁরা পুরস্কার  দিতেন। বিভিন্ন  ক্লাবের  বিশাল দেহী  পালোয়ান তো আসতেনই,  সঙ্গে কিছু কুকুর পেটওয়ালা ডিগডিগে মার্কা লোক ও আসত এবং প্রায়শই  দেখা যেত এই লোকগুলোই  সিংহভাগ  পুরস্কার  নিয়ে যেত। আরও  একটা জিনিস  ছিল যেটা  হচ্ছে অতিথিপরায়ণাতা। খাওয়ার  সময় তদারকি ছাড়াও  খাবার  শেষে বেরোনোর  সময় জিজ্ঞেস করতেন  পেট ভরে ঠিকঠাক  করে খেয়েছে তো? কোন  ত্রুটি হয়নি তো? ট্যাডপোল দা বড় সাইজের  চল্লিশটা লুচির  সঙ্গে প্রয়োজনীয় তরকারি বা মাছ, মাংসের সঙ্গে বালতিখানেক পোলাও  ও বড় এক হাঁড়ি দইয়ের সঙ্গে পরিমাণ  মতো রসস্থ বোঁদে ও বড় সাইজের  রসগোল্লা ও সন্দেশ  মিলিয়ে খান পঞ্চাশেক  মিষ্টি খেয়ে বড় একটা ঢেকুর  তুলে ট্যাডপোল দা খাওয়া সমাপ্ত করতেন।  এ হেন  বৃকোদরের প্রথম পুরস্কার  বাঁধা। দ্বিতীয় বা তৃতীয় বা সান্ত্বনা পুরস্কারগুলো কুকুরপেটওয়ালা হরি বা ভজাদের  কপালে জুটতো। 
এবার  আসা যাক, আরও  একটা আধুনিক বনেদী বাড়ির  বিয়েতে যেখানে বনেদীয়ানা এবং অতিথিপরায়ণতার সংমিশ্রণ সুন্দর ভাবে প্রতীয়মান।  কলকাতা থেকে জনা তিরিশেক এবং বম্বে থেকেও সম সংখ্যক বরযাত্রীদের দিল্লী যাবার  ব্যবস্থা হয়েছে প্লেনে এবং সেখান থেকে একটু দূরে ফরিদাবাদের  সূরযকুণ্ডে  তাজ হোটেলে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। কলকাতা থেকে দিল্লির যাত্রায় সাতজনের  জন্য  হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা হয়েছে।এরমধ্যে চারজনের  অপারেশন  বা অসুস্থতা এবং বাকি তিনজন অশীতিপর  বৃদ্ধা। কিন্তু এমনই ব্যাপার  যে এই বিয়েতে যেতেই  হবে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের  কথা এঁদের  মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশী বয়স্কা তিনিই সবচেয়ে বেশী ফিট। তাঁর সম্বন্ধে পরে কিছু বলতেই  হবে কারণ তিনি অনন্যা এবং  তাঁর  বয়স তিরানব্বই। তিনি পাত্রের  ঠাকুমা। যাই  হোক শীতের  শুরুতেও  দিল্লী যথেষ্টই  ঠাণ্ডা এবং শীতকাতুরে  বাঙালির তার জন্য  প্রস্তুতি সহজেই অনুমেয়। যাই হোক, সন্ধ্যে নাগাদ  দিল্লী বিমানবন্দরে পৌঁছে, মালপত্র  নিয়ে অনেকগুলো গাড়ি এবং একখানা বাসে সবাই  তাজ হোটেলে এসে পৌঁছাল। গোলাপ দিয়ে সম্বর্ধনার  পর মাটির  ভাঁড়ে গরম চায়ের  অভ্যর্থনা এক অসাধারণ অনুভূতি। খানিকটা গলা গরম করে যাওয়া হ'ল নিজের নিজের ঘরে এবং কিছুটা আনপ্যাক করতে না করতেই  সমন এসে গেছে ডিনারের। আক্রমণ  শুরু হ'ল থরে থরে সাজানো বিভিন্ন  সামগ্রীর।  ব্যূফে সিস্টেমে যার যা প্রাণে চায়  বাধানিষেধহীন হয়ে তাই দিয়ে পেট ভরাও।  কেউ  দেখতেও যাচ্ছেনা, বাধাও দিচ্ছেনা। হঠাৎই  মনে হ'ল ট্যাডপোল দা বেঁচে থাকলে কি যৎপরোনাস্তি আনন্দিতই  না হতেন। টানা ঘুমের  পরে সকালে উঠে নিজেই নিজের  চা বানিয়ে খেয়ে নেওয়া, সঙ্গে থাকা বিভিন্ন  ধরণের  স্ন্যাকসের সহযোগে।  সকাল বেলায় ব্রেকফাস্ট  ঐ হোটেলের ই একটা রেস্তোরাঁয়।  এরই মধ্যে একজনের জুতোর  সোল গেছে খুলে। সে বেচারা খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসেছে রিসেপশনে  জিজ্ঞেস  করতে কাছাকাছি কোন জুতোর দোকান  বা রিপেয়ার করার কোন জায়গা আছে কিনা । এদিকে পাত্রীর দাদার  নজরে সেটা পড়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে বলে দিল এক অডি গাড়ির  ড্রাইভারকে। কি আর করে বেচারা। আরও  একজনকে সঙ্গে  নিয়ে চলল মুচির খোঁজে অডি গাড়িতে চড়ে।  মুচি যেখানে বসে তার থেকে অনেক  দূরে গাড়ি রেখে খোঁড়াতে খোঁড়াতে পকেট  থেকে খুলে যাওয়া সোলটা বের করে বলল ইসকো বানানা পড়েগা। ঠিক হায় সাব অভি পেস্টিং কর দেতে । নহী নহী ভাই আপ পেস্টিং করকে সিলাই ভি কর দিজিয়ে। তো সাব, উসমে তো বহুত  টাইম লগেগা। কুছ পরোয়া নেহী।   এর পর সঙ্গীতের  জন্য রিহার্সাল  শুরু। নাচগানের মাধ্যমে দুই পরিবারের  আরও  কাছাকাছি  আসা এই সঙ্গীতের উদ্দেশ্য। ঐদিন  সকাল  বেলায় বম্বে থেকে একটা টিম এবং কলকাতা থেকে আরও একটা টিম চলে এল সঙ্গীত সন্ধ্যাকে  আরও  মধুময় করতে। শুরু হ'ল অমিতাভ  বচ্চনের  গলায় গণেশ বন্দনা দিয়ে আর তারপরেই শুরু হ'ল নৃত্য গীতের সুষমামণ্ডিত পরিবেশন। ঐ অল্প সময়ের মধ্যেই  কি দারুণ  রিহার্সাল, দেখার মতন। যাই  হোক, রাতের  ডিনারের  পর গল্প, গল্প আর গল্প।
পরদিন  ঘুম ভাঙতে একটু দেরী হ'ল। সকাল  বেলায় নান্দীমুখ  ও গায়ে হলুদ। দুটো পাশাপাশি স্যুইটে পাত্রপক্ষ ও পাত্রীপক্ষের  অবস্থান।  সুতরাং গায়ে হলুদের  তত্ত্ব নিয়ে যাওয়া আসাতে  কোনসময় ব্যয় হ'লনা। সন্ধ্যে বেলায় বিয়ে, পাত্র এল করতে বিয়ে রোলস রয়েস  নিয়ে।  বিয়ের  মণ্ডপ খোলা জায়গায়। ঠাণ্ডা হাওয়ার  কামড়ে বসে থাকা যায়না কিন্তু চারদিকে হিটার  জ্বালিয়ে দেওয়ায় খুবই  মনোরম পরিবেশ তৈরী হয়েছিল আর কবিগুরুর  গান আগুনের  পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে মনে পড়ে যাচ্ছিল। এদিকে প্রশস্ত  হলে খাওয়া দাওয়া চলছে। বিভিন্ন  অতিথিরা আসছেন,  যাচ্ছেন  ও তাঁদের পছন্দ মতন খাওয়া দাওয়া করছেন  আর ঐদিকে অনুরাগ রাস্তোগীর ব্যাণ্ডের অপূর্ব  সুর একের পর এক মূর্ছনা সৃষ্টি করে চলেছে। এক অপূর্ব  মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। লাঠি হাতে এক স্যুট পরিহিত ভদ্রলোক রাস্তোগীর গানের ভিডিও  করছিলেন এবং আলাপ করলেন।  বাঁশি, স্যাক্সোফোন, বেহালা ও কীবোর্ডের সন্তুলন মিশ্রণে  একের পর এক পুরনো  দিনের গান বেজে উঠছে আর ছেলে, বুড়ো, মেয়ে, বুড়িদের শরীর  হিন্দোলিত হচ্ছে। উপস্থিত  জনগণের  মধ্যে সবচেয়ে বর্ষীয়ান  ভদ্রমহিলার  শরীরের আন্দোলন  দেখে লাঠি হাতে হাঁটা ভদ্রলোক ঐ ভদ্রমহিলার  হাত ধরে নাচার  জন্য  অনুরোধ  করলেন।  ঐ বর্ষীয়সী  ভদ্রমহিলা তাঁর অনুরোধ  উপেক্ষা  করতে পারলেন  না। তিনিও পুরোদস্তুর নাচে অংশগ্রহণ করলেন  এবং রাস্তোগীরাও  অত্যন্ত  উদ্বুদ্ধ  হয়ে উঠলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আরও  অনেক  বর্ষীয়ান  ভদ্রলোক ও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে তাল মেলালেন। কি অসাধারণ  প্রাপ্তি বর্ণনা করা যায়না। যাই হোক,  পরদিন  সকালে ব্রেকফাস্ট  করে ফিরে আসার  পালা। চারদিনের লোকজনের  ব্যবহার এতটাই  মধুর  ছিল  যে এটাকে একটা তেল খাওয়া  মেশিনের  সঙ্গে তুলনা করা যায়। পার্থক্য  এইটাই  যে মেশিনের  চলন প্রাণহীন  কিন্তু এখানে প্রত্যেকটি লোকের ব্যবহার  হৃদয়মিশ্রিত।

Thursday, 16 December 2021

সময়

সে এক বড্ড দামাল ছেলে, নামটা ছিল  সময়
ধরতে তাকে চেষ্টা সবাই  করে কিন্তু কেবলই হাত ফসকে সে পালায়
পৃথিবীর আলো যখন  চোখে পড়ে খেলতে থাকে আপনমনে নিজ মাতৃক্রোড়ে 
কেমনভাবে যায় যে কেটে বেলা,এবার  স্কুলে ভর্তি হবার  পালা
বন্ধু অনেক হ'ল যে ইস্কুলে ,কেউ বা তারা থাকল আমার  সাথে
কেউ বা গেল মেডিক্যালে কেউ বা অন্য পথে
আগের দিনে ছিল  পেশা ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তারি
কেউ  বা হতো উকিল নয়তো কেউ বা প্রফেসারি
এখন তো ভাই  হরেক পেশা কেউ হয় এম বি এ
কম্পিউটারের অনেক  শাখা কেউ বা এম সি এ
ভিন্ন  পেশায় বন্ধু জোটে ভিন্ন তাদের মত
কথায় কথায় মান অভিমান পাল্টায় তাদের পথ
মেলেনা সেই  স্কুলের দিনের  বন্ধু নির্ভেজাল 
মান অভিমান ভুলে না যাওয়ায় কেটে যায় সেই তাল
চুলে ধরে পাক নড়ে যায় দাঁত শেষের আমন্ত্রণ 
বুঝতেই পারি দিনের শেষে সন্ধ্যার  আগমন
নিয়মের ফেরে সন্ধ্যার পরে রাত্রি প্রতীক্ষায়
ছেড়ে যেতে হবে এই ধরাধাম নূতন যাত্রায়
তবুও  চেষ্টা করে যাই শুধু সময়কে  ধরিবার
সময় শুধুই  হাসিয়া বলে আমি দুর্নিবার।


Wednesday, 15 December 2021

স্বপ্নের খোঁজে লেখক নিখোঁজ

মোহনবাবুর আজ খুব আনন্দ ।দীর্ঘদিন  কাজ করার  ফাঁকে আজ একটু লম্বা ছুটি পেয়েছেন। গিন্নীর অনেক অনুযোগ আজ একটু প্রশমিত করার  সুযোগ  এসেছে। যখনই  ছুটির  দরখাস্ত  করেছেন তখনই কর্তৃপক্ষের অনুরোধ  এসেছে একটু পিছানো  যায়না? মোহনবাবুর স্বভাবই  এরকম যে উনি কখনোই কর্তৃপক্ষের  আদেশ অমান্য  করেন নি। কিন্তু এবার  তাঁর ঊর্ধ্বতন  কর্তৃপক্ষ আর না করতে পারেন নি মুখরক্ষার খাতিরে। যাই হোক মহানন্দে গুনগুন করতে করতে বাড়ি ফিরছেন। অফিসের  শেষে সাধারণত  মোহনবাবু এতটাই  ক্লান্ত হয়ে  ফেরেন যে বাড়ি ফিরে হাত মুখ ধুয়ে একটা বড় গামলার  মতন  কাপ চা না খেলে কথাই  বলতে ইচ্ছা করেনা। খাওয়া দাওয়া করার  পরে এই মোহনবাবুর একটা ব্যাপার আছে। কিছু না কিছু উনি লিখবেন। আজ সেই মানুষটার অন্য রকম চেহারা দেখে গিন্নী রীতা রীতিমত  চিন্তিত হয়ে পড়ল। কি গো, আজ কি লটারির  টিকিটে কিছু ভালোমন্দ  পেয়েছ নাকি?  মোহন বা রীতা কেউই  কারো নাম ধরে ডাকেনা। হ্যাঁগো, শুনছো  এরই মধ্যে ঘোরাফেরা করে। নাম ধরে ডাকতে  স্বামী বা স্ত্রীর  দুজনেরই  কেমন  লজ্জ্বা লজ্জ্বা ভাব। আজ মোহন বিনয়ের কাছ থেকে গরম গরম আলুর  চপ ও পেঁয়াজি  কিনে এনেছে। আজ শুধু চা নয় সঙ্গে তেল মাখিয়ে  মুড়ির  সঙ্গে বেশ জম্পেশ  করে আলুর চপ ও পেঁয়াজি খাচ্ছে। হঠাৎই  রীতাকে টেনে নিয়ে মুখে এক গাল মুড়ি ও আলুর  চপ ঠুঁসে  দিয়েছে, রীতা হকচকিয়ে গেল। এই বুড়ো বয়সে কি মাথার  গন্ডগোল  হল কিনা ভেবে খুবই  দুশ্চিন্তাগ্রস্ত  হলো। কি ব্যাপার,  আজ কি ভীমরতি হলো নাকি? মোহন আর হেঁয়ালির  মধ্যে রাখল না, বলল যে  অবশেষে  ছুটি পাওয়া গেছে,  আমরা যাব বেড়াতে সবাইকে নিয়ে।  তার মানে? এর মানে খুবই  সহজ। আমরা সবাই  বেড়াতে যাব । সবাই  মানে? সবাই  মানে আমরা সবাই, বাবা, মা, তোমার  বাবা, মা আমরা সবাই।  এতজন বুড়ো মানুষকে নিয়ে যেতে তোমার  বুক একটুও  কাঁপছে না? 
না। আমি  সবাইকেই  নিয়ে যাব। 
ট্র্যাভেল এজেন্টকে বলে একটু  বেশিই  টাকা দিয়ে হায়দরাবাদ  যাবার  টিকিট  কাটা হলো। টিকিট কাটা হলে উনি যাত্রাটা কি রকম  হবে সেটা নিয়ে মোটামুটি একটা নিবন্ধ খাড়া করলেন।  মোহনবাবু ছেলে, বৌমা, নাতি, নাতনি, মেয়ে, জামাই, বাবা, মা, শ্বশুর, শ্বাশুড়ি এবং নিজেদের  টিকিট নিয়ে বারটা টিকিট  কেটে  রওনা দিলেন তাঁরা সবাই।  খুব  ভাল  চলছে গাড়ি। চার বুড়োবুড়ি সেই পুরনো  দিনের কথাই  রোমন্থন  করে চলেছে। এদিকে ছেলে, বৌমা ও মেয়ে, জামাই তারাও  গল্পে মত্ত। মোহন ও রীতা তাদের  নাতি ও নাতনিদের  নিয়ে ব্যস্ত।  হঠাৎই  ট্রেন টা একটা বড় স্টেশনে এসে থামল। অনেকক্ষণ  ধরেই ট্রেন টা থেমে আছে। গল্প করতে করতে সবার  চোখই  বেশ  লেগে এসেছে আর এই ফাঁকে ক্ষুদে দুটো কখন সবার  অলক্ষ্যে  ট্রেন  থেকে নেমে স্টেশন  চত্বরে খেলতে শুরু করে দিয়েছে। হঠাৎই  একটা হ্যাঁচকা টান, ট্রেন টা চলতে শুরু করেছে। তখনও কারো খেয়াল  হয়নি যে বাচ্চা দুটো গেল  কোথায়? এরপর ট্রেন টা আস্তে আস্তে স্পীড  নিতে শুরু করেছে। হঠাৎই  মোহনের  খেয়াল  হলো যে বাচ্চা দুটো নেই। দরজার  কাছে ছুটে এসে দেখে তারা ট্রেনের  পিছনে ছুটছে কাঁদতে কাঁদতে। কালবিলম্ব না করে প্ল্যাটফর্মে লাফিয়ে নামল এবং নাতিকে কোনরকমে কামরায় প্রায় ছুঁড়ে ঢুকিয়ে দিয়ে নাতনির নাম ধরে ডাকতে থাকল কিন্তু কেমন  যেন  হাওয়ায়  উবে গেল।  ইতিমধ্যে ট্রেনটি অনেক দূর চলে গেছে  শুধু ট্রেনের  পিছনে লাল আলোটা দেখা যাচ্ছে। বোঝাই  যাচ্ছেনা যে ট্রেনটি থেমেছে না চলে যাচ্ছে। আর মোহন  পাগলের  মতন নাতনির নাম ধরে ডেকে এদিক ওদিক  ছোটাছুটি করছে।  স্বাভাবিক ভাবে জিআরপি কে খবর দেওয়ার  কথা তার  মনেও আসেনি। হঠাৎই  কেমন  ভাবে যে মোহনের  মাথা বিগড়ে  গেল এবং কি করে যে সে উধাও  হয়ে গেল  কেউ জানতেও পারল না। লাইনে লাইনে সে খোঁজে তার  নাতনিকে। 
তার  ছেলে, বৌমা, মেয়ে জামাই রা সকালে উঠে দেখে যে তাদের  বাবা বা শ্বশুর মশাই তাঁর বার্থে  নেই । প্রথমে তারা ভাবল যে হয়তো টয়লেটে  গেছেন কিন্তু অনেকক্ষণ  পরেও তাঁকে  দেখতে না পেয়ে বিজিয়ানগরম স্টেশনে জিআরপিতে  জানাল। মোহনের  বাবা, মা এবং রীতার  বাবা মা ও  খুবই  অস্থির  হয়ে পড়েছেন কিন্তু তাঁরা এতই বৃদ্ধ যে কি করা উচিত  তা তাঁরা  বুঝে  উঠতে পারছেন না। নাতি ও নাতনি তারাও এতটাই  ছোট  যে তারাও কেমন  ভীষণ  চুপচাপ  হয়ে গেছে।  রীতা তার ছেলেমেয়েদের  সঙ্গে আলোচনা করে বিজয়বাড়ায়  নেমে যাওয়ার স্থির করলেন  এবং স্টেশন  মাস্টারের সঙ্গে দেখা  করে আদ্যোপান্ত  বললেন এবং তিনিই  তাদের  ফেরার  বন্দোবস্ত  করলেন কিন্তু মোহনের  কোন খোঁজ পাওয়া গেলনা। আসলে মোহন  স্বপ্ন  দেখে তার  নাতি নাতনিদের  খেলতে দেখে মাঝরাতে কোথায় যে নেমে গেলেন  কেউ জানতেই পারল না। মোহনের  খোঁজ  এখনও  পর্যন্ত  পাওয়া যায়নি। সাধারণত  একই সঙ্গে চার জেনারেশন দেখাই যায়না কারণ  আজকাল  ছেলে বা মেয়েরা অল্প বয়সে বিয়ে করেনা, বড় জোর  তিন  জেনারেশন দেখা যায়। কিন্তু চার জেনারেশনের  একসঙ্গে যাত্রা  এক বিরল ব্যাপার। তার যে এরকম নিদারুণ পরিণতি হবে এটা সকলের বুদ্ধির অগোচরে। 

Thursday, 11 November 2021

গানের আসর

গানের আসর বিভিন্ন ধরনের হয়। কোথাও  ক্ল্যাসিকাল, কোথাও  রবীন্দ্র সঙ্গীত,  কোথাও আধুনিক  আবার কোথাও  বা পাঁচমিশেলি। আসরের  শ্রোতাও সেখানে ভিন্ন, ভিন্ন  তাদের  স্বাদ যার প্রতিফলন  হয় তাদের  পোশাক আশাকে। উচ্চমার্গের  ক্ল্যাসিকাল গানের আসরে খুঁজে পাওয়া যায় ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত ভদ্রলোকের, চোখে তাদের  চশমা যেটা প্রায় নাকে নেমে এসেছে কিন্তু অত্যন্ত  দক্ষতার সঙ্গে সেটা ম্যানেজ করছেন যাতে না পড়ে যায়। শীতের  সময়েই  সাধারণত এই অনুষ্ঠানগুলো হয় এবং শালটা  কাঁধের  উপর ফেলে একটু শিল্পী বা সাহিত্যিক টাইপের আঁতেল মার্কা ভাব করে অনুষ্ঠানে আসেন এবং কথা যেখানে না বললেই  নয় সেখানে বলেন এবং  বেশিরভাগ  সময়েই  মাথা নেড়ে সম্মতিসূচক  ঘাড় নাড়েন এবং মাঝে মধ্যেই  হুম  বলে একটা আওয়াজ  বেরোয়। আর ঠিক  পছন্দ  না হলে ঠোঁটটা একটু সামান্য বিস্তার করেই আবার  যথাস্থানে  ফিরে যায়। অনুষ্ঠান  শুরু হতেই এঁদের  মাথা নাড়ার জন্য এবং বাহ বাহ আওয়াজে শিল্পীর মনঃসংযোগে কখনও  বাধা সৃষ্টি হয় এবং শিল্পীর বিরক্তিকর  দৃষ্টি তাঁদের  উপর প্রতিফলিত  হয়।
মহিলাদের শাড়ি ও গয়নার প্রতিযোগিতা এই অনুষ্ঠানের মধ্যে দেখা যায়। আর দেখা যায় মেক আপের প্রতিযোগিতা। ভাল  অনুষ্ঠান  দেখব না এদের  দেখব এই নিয়ে রীতিমত  ধন্দে পড়ে যেতে হয়। দামী শাল কিন্তু শীত নিবারণ করার  বদলে গয়নাগাঁটির  প্রদর্শনে সহায়তা করে। যাই হোক,  এটা এলিট সমাজের অনুষ্ঠান  এবং এঁরা যতটা সম্ভব  সামনের  সারির  টিকিট  সংগ্রহ  করেন  এবং যতটা গান বোঝেন তার থেকে বেশী  বোঝার  ভান  করেন। দেখা যায় যাঁরা ছোটখাট  শিল্পী বা সত্যিই  শিল্পানুরাগী  তাঁরা আপাদমস্তক  চাদর বা শালে মুড়ে সবচেয়ে কম দামের  টিকিটে একদম পিছনের  সারিতে বসে সুরজালের মায়ায়  বুঁদ  হয়ে রয়েছেন। এতো গেল ক্ল্যাসিকাল গানের আসর।  এবার  আসা যাক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের  অনুষ্ঠান। বিশ্বভারতীর কপিরাইট  শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন শিল্পীদের রবীন্দ্র সঙ্গীতের পরিবেশন যেন অবাধ স্বাধীনতা পেয়ে গেছে। যে যেমন ইচ্ছা গেয়ে চলেছে, কারও  কিছু বলার  নেই।  এঁদের  মধ্যে অনেকেই  হয়তো বেশ  নাম করে ফেলেছেন  এবং স্বঘোষিত  অথরিটির  তকমা লাগিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু অতীতের প্রথিতযশা শিল্পীদের  গাওয়া গানের  সঙ্গে এদের আকাশ পাতাল তফাত। হয়তো আমাদের  সকলের  মনে আছে যে দেবব্রত বিশ্বাসের  মতন শিল্পীর  গাওয়া গানও বিশ্বভারতী মিউজিক  বোর্ডের  অনুমোদন  না পাওয়ায় রেকর্ড  হিসেবে বেরোয়নি। এই নিয়ে শিল্পীর  মনঃকষ্টের  কোন শেষ  ছিলনা। তাহলে আজ যাঁরা পয়সা দিয়ে রেকর্ড  করছেন তাঁদের  কি অবস্থা হতো ভাবতেই  ভয় লাগে। সুতরাং, যাঁরা সুবিনয় রায়, সুচিত্রা মিত্র  বা কণিকা বন্দোপাধ্যায়ের  গান শুনেছেন  তাঁরা চট করে এমুখো হবেন  না। কিন্তু এখনও  কিছু শিল্পী আছেন যাঁরা ঐ প্রবাদপ্রতিম শিল্পীদের যোগ্য উত্তরসূরী হিসাবে বিশুদ্ধ ভাবেই  গাইছেন এবং যোগ্য  সম্মান পাচ্ছেন। 
এবার  আসা যাক, পাঁচমিশেলি ঝকমক রামা হো টাইপের  গানের  আসরে। যেমন শিল্পী তেমনই  শ্রোতা। টাইট জিনস,  অন্ধকারেও সান গ্লাস পরা, সাধারণ  লোক পরলে যখন তখন  হোঁচট খেয়ে মরবে। বড় বড় ড্রাম, হাতে লাঠি সোঁটা( ড্রাম বাজানোর  কাঠি) , হাতে নানান ধরণের গিটার,  শিল্পীদের  মাথায়  বাঁধা চকরা বকরা রুমাল, দেখলেই গা টা কেমন ঘুলিয়ে ওঠে। শ্রোতাদের চেহারা এবং বেশবাস ও প্রায় একই রকম। প্রায় ষোল সতের  বছর আগে বান্দ্রায়  অনেক রাতে একগুচ্ছ আধুনিকা কে ছেঁড়া, ফাটা জিনসের প্যান্ট পরতে দেখে নিজের  চোখকেই  বিশ্বাস  করতে পারিনি। কিন্তু এখন  তো দেখছি এগুলো আকছার। শিল্পীর  গলায় নেই কোন সুর যা ঢাকা পড়ে যায় বাজনার  গগনভেদী  আওয়াজে। সুতরাং, মান বাঁচিয়ে পাশ কাটানোই  ভাল। 

এবার  আসা যাক, এক বিচিত্র  গানের  আসরে। যাঁরা খুব ভোরে ওঠেন তাঁরা নিশ্চয়ই  এই গানের  সঙ্গে পরিচিত  হয়েছেন। ভোরের  আলো ফুটতে না ফুটতেই শুরু হয়ে যায়  এই কলতান। টিয়া , বুলবুল, পায়রা, কাক,শালিক, চড়াই,  ঘুঘু ,কোকিল, কাঠঠোকরার  তির তির তির তির তির তির ডাক এবং মাঝে মাঝেই  বসন্ত বাউরির টুই টুই রব মনকে ভীষণ  পবিত্র  করে তোলে। শ্রোতা  কে আছে না আছে তার  বিন্দুমাত্র  তোয়াক্কা না করে নিজেদের  মনে আপন খেয়ালে গেয়ে চলে নতুন দিনের  আগমনবার্তা। এই আসরের  কিন্তু কোন  তুলনা নেই । সবাই  নিজেদের  সাধ্য মতো  গেয়ে চলেছে, কোথাও কোন সমালোচক  নেই, আছে শুধু সঙ্গীত  এবং এ এক অপূর্ব  বিচিত্রানুষ্ঠান।

Sunday, 7 November 2021

আত্মীয়

আত্মীয় শব্দটা শুনলেই মনে হয় যেন কোন রক্তের সম্পর্ক  আছে কিন্তু ঘটনাচক্রে শব্দটা একটু গোলমেলে। প্রায়শই  দেখা যায় যেখানে কোন  রক্তের  সম্পর্ক ই নেই সেখানেই  প্রগাঢ় বন্ধুত্ব এবং রক্তের  সম্পর্কে একদম লাঠালাঠি ব্যাপার। কিন্তু এরকম  উলট পুরান কেন? আসলে আত্মীয় মানে যেখানে আত্মার  সম্পর্ক  আছে বা যোগ আছে এবং সেখানে রক্তের সম্পর্ক  থাকতেও পারে নাও পারে। অনেক ঘটনা মনে আসে এ সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলে কিন্তু কিছু কিছু ঘটনার  কথা বললেই এই শব্দের  তাৎপর্য বোঝা যাবে।

আমেদাবাদে ওসমানপুরায় গুজরাট বিদ্যাপীঠের পাশের  গলির ডালবড়া অত্যন্ত বিখ্যাত। ভাল করে ফাঁটানো ডালের  বড়া লেবুর রসে জারিত পেঁয়াজ কুচি এবং গরম তেলের  কড়াইয়ে  একবার  ছেড়ে দিয়েই উঠিয়ে নেওয়া আধভাজা কাঁচালঙ্কার  যে কি অপূর্ব  স্বাদ সেটা যে না খেয়েছে সে কিছুতেই  বুঝতে পারবে না। অনুজের  এটা ছিল  খুবই  পছন্দের  খাবার  এবং বহুদিন  অফিসের  পরে রান্না করে খেতে ইচ্ছে না হলে বেশ খানিকটা  ডালবড়া  খেয়েই উদরপূর্তি করতো। পাশেই ছিল  তুকারামজীর সাইকেল ভ্যানে লাগানো দোকান যেখানে ভাত, ডাল, তরকারি পাওয়া যেত। মাঝে মাঝে অনুজ তুকারামজীর  দোকানের খদ্দেরও   হয়ে যেত। ডালবড়ার দোকান এবং তুকারামজীর দোকানের  সামনে সারি সারি বেঞ্চ পাতা থাকত যেখানে বসে খরিদ্দাররা  বসে খেতে পারতো। বেঞ্চগুলোর সামনে পাতা থাকতো টুল যেখানে  লোকে খাবার রাখত। অফিসের  খুব কাছেই তার বাড়ি এবং দোকান গুলো থাকার জন্য খুব  বেশি সময় যেতনা খাবার  সংগ্রহের জন্য। ডালবড়াই হোক আর তুকারামজীর  দোকানের রুটি তরকারিই হোক একটা দৃশ্য  অনুজের  নজর এড়ায় না। একটা অন্ধ লোককে রোজ তুকারামজীর  দোকানের  সামনে বসে থাকতে দেখত। কৌতূহলবশত একদিন জিজ্ঞেস  করে ফেলল তুকারামজী এই লোকটিকে রোজ দোকানের  সামনে বসে থাকতে দেখি, কি ব্যাপার? জবাবে সে জানালো যে ওর নাম জিতুভাই এবং ও সারাদিন  ভিক্ষা করে রাত্রিবেলায় ও এখানে আসে খাবার  খেতে। অনুজ একটু আগ্রহ  দেখিয়ে আরও  জিজ্ঞেস  করল ওর খেতে  কত টাকা লাগে এবং তার উত্তরে সে জানালো যে দশ টাকা কিন্তু ও জিতুভাইয়ের  কাছে কোন  পয়সা নেয়না। আশ্চর্য ব্যাপার,  রাস্তার  ফুটপাথের ধারে চালানো এক দোকানের  মালিক  এই গরীব  অন্ধ মানুষটিকে অন্তত  একবেলা পেটভরে খাবার  জোগায় অথচ এত পয়সাওয়ালা লোক চারিদিকে এত বাজে পয়সা খরচ করে কিন্তু কাউকে কিছু দিতে গেলেই এদের  প্রাণ বেরিয়ে যায়। 

অনুজের  বদলির  অর্ডার  এসে গেছে কারণ তার এখানে থাকার  মেয়াদ  শেষ। রিলিভারকে চার্জ বুঝিয়ে দিতে আরও  তিন চার দিন  লাগবে। তুকারামজী, একটা কথা বলব আপনাকে? বলুন স্যার।  তুকারামজী, আপনি তো জিতুভাইকে রোজই খাওয়ান,  আমাকে একটু ওর সেবা করতে দেবেন? তুকারাম তো একটু অবাক হয়ে গেল, বলল আপনি কেন দেবেন? অনুজ  জানালো যে ওর বদলি  হয়ে গেছে এবং সে একহাজার  টাকা দিতে চায় জিতুভাইয়ের  খাবারের  জন্য। তুকারামজী একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল কিন্তু অনুজ তার হাতে জোর করে টাকাটা গুঁজে দিল। জিতুভাইয়ের  সঙ্গে না তুকারাম না অনুজ কারো কোন  রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও কোথাও  যেন  একটা যোগ  রয়েছে যার নাম আত্মীয়তা। 
 

Saturday, 6 November 2021

ভাই ফোঁটা

আজ ভাই ফোঁটা, কালী পূজোর  পর দ্বিতীয় দিন।  কেউ  কেউ  বলেন  ভাই  দ্বিতীয়া। কোন কোন  রাজ্যে একে বলে ভাই  দুজ। যে নামেই  বলা হোক না কেন এই বিশেষ অনুষ্ঠানে ভাইদের  একেবারে পোয়াবারো। দূর দূরান্ত থেকে ভাইরা আসতেন বোন  বা দিদির কাছে ফোঁটা নিতে। যে সমস্ত  ভাইরা ছিল ভোজন রসিক এবং উদরের অন্তস্থলের পরিধি ছিল বিশাল,  এই বিশেষ  দিনে বোনেরা সাধ্য মতন যোগাড়যন্ত্র করত ভাইদের  উদরের  পরিতৃপ্তির জন্য। বিশাল চেহারার মালিক হলেই যে সে খুব  খেতে পারবে, এমন নয়। কিন্তু অনেক রোগা পাতলা লোক যাদের কুকুরের পেট বলত তাদের  খাওয়া দেখলে লোকে তাজ্জব  হয়ে যেত। বোনদের ভাগ্যেও  যে কিছু জুটত না তা নয় । যদি ভাইয়েরা একটু সুপ্রতিষ্ঠিত  হতো তাহলে তো কথাই নেই। সৈনিক  ভাইরা এই অনুষ্ঠানকে  অত্যন্ত  মর্যাদা দেয় এবং বহু সিনেমায় দেখা গেলেও  এটা সত্যি যে ওরা অনেক কষ্ট করেও বোনের  কাছে ফোঁটা নিতে আসে। বোনেরা, ভাইয়ের কপালে দিলাম  ফোঁটা , যমের দুয়ারে  পড়ল কাঁটা এই কথাগুলো বলে সত্যিই  যমের  দরজা আটকাতে পারে কি না জানিনা কিন্তু প্রার্থনার  তো একটা জোর আছে আর এই প্রার্থনা শুনতেই  তো এত দূর থেকে ছুটে আসা। যে কোন মূহুর্তে শত্রুর  বা আতঙ্কবাদীর ছুটে আসা বুলেটে সচল দেহটা  নিশ্চল হয়ে যেতে পারে যেটা আমাদের মতন সাধারণ নাগরিকদের  সম্ভাবনা খুবই  কম। সুতরাং আমাদের মতন স্বার্থপর আত্মসুখী  লোকেরা এক ভালোমন্দ  খাওয়া ছাড়া আর কিছুই  ভাবতে পারিনা। বোনদের ভাগ্যে জোটে হয় কিছু টাকা না হয় একটা শাড়ি, হালফিলে একটা মোবাইল  কিংবা ট্যাবলেট অবশ্য  বোন যদি আধুনিকা  হয়। সাহিত্যের  প্রতি আকর্ষণ  থাকলে ভাল লেখকের  বই ও জোটে।একটা কথা  কিন্তু আমাকে বেশ বিব্রত করে। ভাইয়ের  কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের  দুয়ারে পড়ল  কাঁটার পরের দুটো লাইন  সম্বন্ধে আমার  সংশয় কিছুতেই যায়না।যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার  ভাইকে ফোঁটা । যমুনা যমকে বাঁচাতে কার দুয়ারে কাঁটা দেয়? তার মানে যমকে চমকানোর জন্য  আরও  বড় কেউ  আছে? প্রশ্নের  উত্তর  খুঁজেই  চলেছি, উত্তর  এখনও  অধরা।

এবার  যাওয়া যাক আগের  দিনের  ভাই ফোঁটায়  তারপর আসা যাবে এখনকার  ভাইফোঁটায়। আগে তো প্রত্যেক সংসারেই পাঁচ সাতজন  ছেলেমেয়ে ছিল এবং আশেপাশে মাসিমা বা পিসিমারা থাকতেন এবং তাঁদের  সংসারেও ভাইবোনের সংখ্যাও  ঐ একই রকম ছিল। সুতরাং ভাই ফোঁটা মানেই একবিরাট উৎসবমুখর দিন। লম্বা বারান্দায় আসন পেতে নিজের ভাইয়েরা, পিসতুতো মাসতুতো ভাইয়েরা একসঙ্গে বসে ফোঁটার  অপেক্ষায় বসে থাকা এবং দিদিদের সিনিয়রিটি হিসেবে ফোঁটা দেওয়া এবং সবার  ফোঁটা শেষ হলে সমস্ত দিদি বোনেরা হাত লাগিয়ে এক একজনের  প্লেট ধরে ভাইদের  হাতে তুলে দেওয়া। দিদি, বোনদের  সংখ্যা বেশি হলে সবার  হাত একটা প্লেটে লাগানো সম্ভব  না হলে বলা হতো অন্তত গায়ে হাত লাগিয়ে রাখ। বসে বসে কিন্তু আড়চোখে  কোন প্লেটে বেশি পড়েছে বা কোন  প্লেটে কম এটা দেখা চলতো এবং মনে মনে যিনি দিয়েছেন তার মুন্ডপাত করা। কিন্তু এ সত্ত্বেও একটা বিপুল  আনন্দ উপভোগ  করা যেত।  যে ভাইরা দূরে থাকার জন্য  ফোঁটা নিতে আসতে পারেনি তার মঙ্গল  কামনা করতে দরজার  চৌকাঠে ফোঁটা দিত। ফোঁটা শেষ হতে হতে মেয়েদের  জলখাবারের পালা এবং সেটাও  মিটতে মিটতে বেলা গড়িয়ে যেত। এরপর দুপুরের খাওয়া এবং সেই  পর্ব শেষ  হতে প্রায়  চা খাওয়ার  সময়। কিন্তু এত কষ্ট সত্ত্বেও  সব দিদিদের  বা মা বোনদের  মুখের  হাসিটা মিলাতো না। তবে কতটা জোর করে হাসি বা কতটা স্বতঃস্ফূর্ত  সেটা তখনই বোঝা যেত না। বোঝা যেত যখন  মা বলতো একটু পা টা টিপে দেওয়ার  জন্য।  গৃহকর্তা কতটা চাপের  মধ্যে থাকতেন সেটা তাঁর গম্ভীর মুখের অভিব্যক্তি থেকে বুঝতে হতো। তবুও  তিনি এই উৎসবের আনন্দের  অন্তরায়  হতেন না। আজ আমরা যখন  ঐ জায়গায় এসেছি তখন সেদিনের  গৃহকর্তার গম্ভীর মুখের  কারণ  বুঝতে পারি।

এখন প্রত্যেক  পরিবারেই ছেলেমেয়েদের  সংখ্যা হয় এক বা বড় জোর দুই। যদি দুজনই ছেলে বা দুজনই মেয়ে হয় তাহলে এই উৎসবের  আনন্দ উপভোগ  করার জন্য  মাসতুতো বা পিসতুতো  ভাই বোনদের  সাহায্য  নিতে হয়। আর কাছাকাছি কেউ না থাকলে কমপ্লেক্সের  ভাই  বোনদের সাহায্য  নিয়ে উৎসবের  আনন্দ  উপভোগ করতে হয়। আগে পায়েস  যেমন ভাইফোঁটার  বা জন্মদিনের  এক বিশেষ  অঙ্গ  ছিল এখন সেই জায়গায় এসে গেছে কেক। আনন্দ  এখন কতটা  ফিকে হয়ে গেছে সেটা যারা দুটো অবস্থারই সাক্ষী তারা বুঝতে পারে, অন্যরা নয়। 

আজ জীবন  সায়াহ্নে পৌঁছে যখন মূল্যায়ন  করতে যাই তখন  ভাবতে চেষ্টা করি যে কোন  অবস্থাটা ভাল  ছিল।  দুই অবস্থারই  কিছু  সদর্থক এবং নঞর্থক  দিক আছে কিন্তু একটা কথা স্বীকার  করতেই  হবে যে কিছু পেতে গেলে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতেই  হয়। গতবছর  যা ছিল  এবছরে তা  নেই। গতবছর  এইদিনে  আমার  বড়দি করোনার জন্য  ফোঁটা দিতে না পারলেও দরজার চৌকাঠে ফোঁটা দিয়ে আশীর্বাদ  জানালো আর তার  কিছুদিন  পরেই তিনি করোনাক্রান্ত হয়ে আমাদের  ছেড়ে চলে গেল। তার আগের বছর  চলে গেলেন  আমার অত্যন্ত  শ্রদ্ধেয় রামাইয়া  সাহেব।  জানিনা পরের বছর  আবার সবাইকে পাব কিনা।


Thursday, 4 November 2021

কবি

ছন্দোময় জীবনে  প্রবেশ  করিনি আমি
ডানা নাই মোর আকাশে উড়িনা আমি
কবি পরিচিতির যোগ্য  নই যে আমি
অতি সাধারণ মানুষের মতো আমি।