Tuesday, 14 February 2023

"প্রেম দিবস"

প্রেম দিবস বলতে কি বোঝায় এই কথাটা অনেক লোককে জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু একই উত্তর  সকলের কাছে  না পেয়ে আরও বেশি ঘুলিয়ে গেল মাথাটা। কেউ বলে প্রেম এক অতি স্বর্গীয় ব্যাপার, কেমন যেন  একটা ঠাকুরের লীলার মতো ব্যাপার, আবার কেউবা  বলল," অ্যাই তুমি আমাকে ভালবাস? আমি কিন্তু তোমাকে খুব  ভালবাসি।" কিন্তু ব্যাপারটা একতরফা হওয়ার জন্য জিনিসটা খুব মাখো মাখো হলোনা। কিন্তু যেখানে দুই তরফেরই সম্মতি সেখানে আমে দুধের মেলামেশা, যেটা খুবই কম ক্ষেত্রে দেখা যায়। ছোটবেলায় পেটভরে খাওয়ার পরেই কিছু একটা লোভনীয় জিনিস  দেখলেই খিদেটা যেন আবার  চাগিয়ে উঠত আর মায়ের  কাছে একটু জিনিস টা চাইলেই ঠাণ্ডা চোখে এমনভাবে তাকাতো যার মানে চোখের  খিদে ছাড়, জিনিসটা পালিয়ে যাচ্ছেনা, পরে খাবে।  এখন  বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লোকের  চোখের  খিদে। এই ভাল  লাগল তো বলেই ফেলল যে আমি তোমায় ভালবাসি, তারপর  চোখের  মাথা খেয়ে লাজলজ্জ্বাহীন হয়ে এখানে সেখানে ঘোরাঘুরি, তারপর বিয়ে বা আরও দুই কান কাটা হলে লিভ ইন আর তার কিছুদিন  পরেই  সব ভোঁ ভাঁ আর কিছুদিন পর এডালে ইনি তো সেডালে তিনি। আবার  তার উপরেও আর এক কাঠি হয় যখন  একডালে বসে জিরাতে জিরাতে অন্য ডালে অন্য জোড়া কেমন আছে তা পরীক্ষার জন্য  দেখতে আসে। এদের  কাছে প্রেম  মানে চোখের খিদে। সুইচ অন করলেই  ভালবাসা শুরু, সুইচ অফ মানেই  অনেক হয়েছে, এবার কেটে পড়। কিন্তু একটা কথা ভেবে ভীষণ চিন্তা  হচ্ছে। এই ধরা ছাড়ার যুগে যদি সবাই (মানে প্রাক্তন এবং বর্তমান) একই সঙ্গে হাজির হয় বিশেষ একজনের  প্রতি প্রেম নিবেদনে। ওরে বাবা,  ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। কিন্তু তিনি মেসি না এমব্যাপে না নেয়মার কোন মাপের  খেলোয়াড় সেটা তার ড্রিবলিং  না দেখলে বোঝা যাবেনা।

এখন এই প্রেম দিবসের  উৎস কোথায়? এর আগে কি প্রেম বলে কোন বস্তুই  ছিলনা? যতদূর  জানি এই প্রেম আদি অকৃত্রিম নিখাদ  সোনার  মতন। কিন্তু নিখাদ  সোনায়  যেমন অলঙ্কার  তৈরী হয় না, তেমনই প্রেমেও  বোধহয় সামান্য হলেও  একটু সংশয়, একটু কি হবে কি হবেনা এই চিন্তাটা না থাকলে হয়তো ঠিক  দানা বেঁধে ওঠেনা। আমাদের  এক মুশকিল আসান দাদা রতুদার  শরণাপন্ন হলাম।  অকৃতদার হলেও  রতুদার  কাছে যেন সব সমস্যার সমাধান আছে এমন কি প্যামও ( রতুদা প্রেম বলেনা)। রতুদা নাদুস নুদুস  মানুষ বেশ বড় বেলের মতন মাথা, সুতরাং তাঁর মাথা থেকে যে সব সমস্যার সমাধান  মিলবে এটা তো অত্যন্ত স্বাভাবিক  কথা। রতুদার  কাছে এই প্রেম দিবস বা ভ্যালেন্টাইন ডের কথা তুলতেই একগাল  হেসে ফুৎকারে এমনভাবে উড়িয়ে দিলেন  যে এটা আবার  একটা জিজ্ঞেস করার  মতন কথা বা বকলমে তাঁর প্রজ্ঞার  প্রতি নিতান্তই  অবিশ্বাস!  বললেন,  আরে বাবা প্যাম কি একদিনে  হয় রে ভজা? আমি বোকার মতন ফুট কেটে বলে ফেললাম  কিন্তু ঐ কি যে একটা গান আছে না, প্রেম একদিন  এসেছিল  নীরবে আমার  এই দুয়ার প্রান্তে। রতুদার  ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে আমার  হাড়ের  মধ্যে যেন বরফশীতল  হাওয়া বয়ে গেল আর একদম স্পীক টি নট। আরে বাবা শোন, কথার মাঝে ফোড়ন কাটলে কেটে পড় এখান থেকে। রতুদার  জ্ঞান গর্ভ বাণী থেকে বঞ্চিত  হতে চাইনা, বললাম সরি দাদা, আপনি বলুন। তবে শোন। এই প্যাম আট দিনে পুরোপুরি জমে ওঠে। প্রথম  দিন একটা সুন্দর দেখে গোলাপ নিয়ে যদি কোনভাবে দিতে পারলি আর দেখলি যে বেশ খুশী মনেই নিয়েছে,  তবেই দ্বিতীয় দিন  একটু ইনিয়ে বিনিয়ে হাজার  কথা বলার ফাঁকে একটু সুযোগ বুঝে বলবি যে আমি তোমায় ভালবাসি। যদি চোখ  কটমটিয়ে চলে না যায় এবং পরেরদিন আসব বলে সম্মতি দেয় তবেই একটা খুব দামী ভাল চকোলেট যেটা ও বেশ পছন্দ  করে সেটা ওকে প্রেজেন্ট  করবি।
 কিন্তু কি করে বুঝব যে কোন চকোলেট  ও পছন্দ করে? 
একটা আস্ত গাধা তুই। তোর প্যামের দরকার  নেই। প্যামের  জন্য  এলেম দরকার। বাবা,মা যখন  দেখে দেবে  তখন বিয়ের পিঁড়িতে বসবি  অন্যথায়  নয়।  আচ্ছা বলুন বলুন,  তারপর দিন কি করব?
 হাঁদুরাম, যদি চকোলেট নিয়ে  বেশ খুশীতে ডগমগ হয় তবে কথায় কথায় জানতে চেষ্টা করবি  যে কোন  সফ্ট টয় পছন্দ করে  কিনা। যদি বলে হ্যাঁ, তবে পরদিন একটা খুব  ভাল  দোকান  থেকে একটা ব্র্যান্ডেড টেডি  বিয়ার কিনে প্রেজেন্ট করলি। যদি ওটা নিয়ে নেয়, তাহলে পরেরদিন  বলবি যে তোমাকে ছাড়া আমি আর বাঁচব না। কিন্তু খুব বুঝে সুঝে কথা বলিস।  একটু বেসামাল  হলেই কিন্তু সব গুবলেট হয়ে যাবে। অবশ্য  কথাবার্তার গতি প্রকৃতি দেখে তুই বুঝতে পারবি যে ঘটনাটা কোন দিকে গড়াচ্ছে। যদি দেখিস যে পরেরদিন না ঘুমানোর জন্য চোখ  ফুলোফুলো ,তবে সুযোগ বুঝে একটু শরীরের  কাছাকাছি হতে পারিস এবং আলিঙ্গন করলেও করতে পারিস। কিন্তু মনে রাখবি  যে এগুলো সব আজকের  দিনে ভিন্ন  স্টেজের  ইন্টারভিউ। জানিস তো আজকাল  একটা ইন্টারভিউয়ে কোন চাকরি হয়না। বিভিন্ন রাউন্ডের মাধ্যমে ফাইনাল ইন্টারভিউ হয়  এবং তারপর চাকরি। অতএব  বাপু, খুব  সাবধানে এগোস। যদি এই রাউন্ডে উতরে যাস, তাহলে পরেরদিন একটা কিস করার  চেষ্টা করতে পারিস  কিন্তু বারবার  সাবধান করে দিচ্ছি, যে কোন মুহুর্তে বরফ জমা থেকে গলে জল হবার সম্ভাবনাও কিছু কম নয়। যদি এই সাতদিন ভালভাবে উতরে  গেলি তাহলে কোন  ভাল রেস্তোরাঁয় পরেরদিন  অর্থাত  চৌদ্দ ই ফেব্রুয়ারি একটা ক্যাণ্ডেল লাইট ডিনার  করবি অর্থাত  প্যাম দিবস  সম্পূর্ণম।  রতুদার  উত্তর  পেয়ে গেছি । এবার  আমার  দিক থেকে এক ব্রহ্মাস্ত্র  নিক্ষেপ।  আচ্ছা রতুদা, প্রেম সম্বন্ধে এত স্বচ্ছ  ধারণা সত্ত্বেও আপনার  কেন বিয়ে করা হয়ে উঠল না? বলাই বাহুল্য,  উত্তরের  জন্য  অপেক্ষা না করে পড়ি কি মরি দে দৌড়।

Tuesday, 17 January 2023

অনীকের অনেক না বলা কথা(এক)

হাতে সময় খুব কম, কিছু না বলা কথা এখনই না বললে হয়তো আর সময় পাবেনা বলার।  ডাক্তার তো প্রায় জবাব দিয়েই দিয়েছে।
অনীক বোস সুন্দর ল্যান্সডাউন রোডে নতুন খোলা ব্যাঙ্কের হেড ক্যাশিয়ার। ছিমছাম  ব্যাঙ্কের ঝকঝকে কাউন্টার আর গ্রাহকরাও সবাই বেশ ঝকঝকে। গ্রাহকেরা আসছে ,চটপট কাজ সারছে আর কিছু মিষ্টি হাসি দামী সেন্টের গন্ধের  সঙ্গে ছড়িয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। গ্রাহকরাও  বেশ  নামী দামী, নানাধরণের গাড়ি নিয়ে আসেন ব্যাঙ্কের কাজ সারতে যদিও অনেক সময়ই দরকার  পড়েনা গাড়িটা  আনার কারণ বাড়ি থেকে দু পা ফেললেই তো ব্যাঙ্ক। কিন্তু স্টেটাস বলে একটা কথা আছে না যেটা গাড়ি না আনলে ঠিক মানানসই  হয়না। তবে কিছু ব্যবসায়ীরা আসেন  যাঁরা একেবারে কাজ সেরে তাঁর নিজের  কাজে চলে যান।  সেক্ষেত্রে গাড়ি আনাটা  ভীষণ প্রয়োজন। এইরকম  একটা ব্যস্ত দিনে গ্রাহকের আনাগোনা বেশ ভালই চলছে, হঠাৎই  একটা ভীষণ জোরে আওয়াজ এল যেন কিছু একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।  ক্যাশ রিসিপ্ট এবং পেমেন্ট  কাউন্টারেও বেশ লোকজন রয়েছে, এমন সময় ঐ আওয়াজে একটু সতর্ক হয়েই অনীক বেরিয়ে এল কি ব্যাপার ঘটেছে দেখার জন্য।  হেড  ক্যাশিয়ার হবার জন্য স্ট্রংরুমের  চাবি সে সবসময়ই নিজের  কাছেই  এমনভাবে রাখে যাতে চাবি তার শরীরকে স্পর্শ  করে থাকে। ও কখনোই নিজের  ড্রয়ারে  রাখেনা।কাউন্টার ঘুরে বাইরে এসেই দেখে একজন  বৃদ্ধ  ভদ্রলোক উপুড়  হয়ে রাস্তায় পড়ে আছেন  এবং একটা ট্যাক্সি তাঁকে বেশজোরে ধাক্কা মেরে পালিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই আছেন  রাস্তায় কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেন না। উল্টোদিকের হকার্স  কর্ণারে  একটা টিভি সারানোর দোকান  ছিল। ঐ ভদ্রলোক কে নিয়ে একজন কাস্টমারের গাড়িতে বসে থাকা ড্রাইভারকে নিয়ে ভদ্রলোককে উঠিয়ে শিশুমঙ্গল হাসপাতালে নিয়ে গেল  এমার্জেন্সিতে।  ওরা কিন্তু ভর্তি করল না। তখন তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো শম্ভুনাথ পণ্ডিত  হাসপাতালে। সেখানেও  তারা দেখলনা। তখন  অগত্যা পিজি হাসপাতালে যাওয়া হলো এবং সেই টিভি সারানোর দোকানের  লোকটিকে সেই অ্যাক্সিডেন্ট হওয়া ভদ্রলোককে জিম্মা করে অনীক  বলল যে চাবিটা  হ্যান্ড ওভার করে ও ফিরে আসছে। ঐ গাড়ির  মালিক  ছিলেন  ভাল্লা  ফুটওয়্যারের মালিক  মিস্টার  ভাল্লার। তিনি তাঁর  কাজ সারতে সারতে অনীক  ফিরে এসেছে এবং মিস্টার ভাল্লার কাছে তাঁর  অনুমতি ছাড়া গাড়িটি নিয়ে যাওয়ার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে এবং ড্রাইভারের কোন দোষ নেই এবং তাকে প্রায় একরকম  জোর  করেই  সে নিয়ে গেছে একথাও  জানিয়ে দিল যাতে ড্রাইভার বেচারা আর বকুনি না খায়। যাই হোক, চাবিটা অন্য একজনের  কাছে দিয়ে ম্যানেজারের  পারমিশন নিয়ে ট্যাক্সি ধরে ফিরে গেল পিজি হাসপাতালে।
কিন্তু ততক্ষণে ঘটে গেছে বিপত্তি। ঐ বয়স্ক  ভদ্রলোক  ততক্ষণে না ফেরার দেশে চলে যাওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দিয়েছে এবং তারা তো অনীক  এবং টিভি সারানোর দোকানের  মালিককে প্রায় গ্রেফতার করার  জোগাড়। যাই হোক সমস্ত ঘটনা আদ্যোপান্ত  শোনার পর  দুই জনের  নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর  নিয়ে ছেড়ে দিল কিন্তু ততক্ষণে অনেক  সময় পেরিয়ে গেছে। ভদ্রলোকের  পকেট থেকে একটা কাগজে লেখা  ফোন নম্বর দেখে ফোন করে জানা গেল যে সেটা তাঁর  মেয়ের ।ফোন  করে ডেকে আনা হলো তাঁর মেয়েকে। প্রথমে তাদের  সন্দেহ  যে অনীক  এবং টিভির  দোকানের মালিকের  দ্বারাই কিছু  হয়েছে কিন্তু সমস্ত কিছু জানার  পর আর কিছু বললনা। কিন্তু এখানেই সমস্যার  শেষ  নয়। দু চার দিন  বাদে বাদে অনীক দের  ডেকে পাঠায় লালবাজার থেকে। অনেকগুলো ছুটি নষ্ট  হয়েছে তার আর ভদ্রলোককেও  দোকান  বন্ধ  রেখে হাজিরা দিতে হয়েছে এবং ঘন্টার পর ঘন্টা বসেথেকে একই    প্রশ্নের  ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করার  উত্তর  দিতে হয়েছে। একদিন  অত্যন্ত  বিরক্ত  হয়ে অনীক সেই পুলিশ ইন্সপেক্টরকে  বলে ফেলল যে আপনাদের  এই ধরণের  ব্যবহারে অতিষ্ঠ  হয়ে আর কেউ কোনদিন  কার ও বিপদে সাহায্য  করতে এগিয়ে আসবে না। তারপর মৃতের মেয়ে এবং জামাইএর  কাছে লিখিত বয়ান  যে অনীকদের তাঁকে বাঁচানোর  সাহায্য  করা ছাড়া আর কোন  উদ্দেশ্য  ছিলনা নিয়ে তাদের  মুক্তি দেওয়া হলো।
মানবিকতা দেখাতে গিয়েও যে কত বিপদের  সম্মুখীন হতে হয় তার এক প্রকৃষ্ট নিদর্শন।  তা বলে কি অনীকরা আবার ও ঐভাবে কাউকে সাহায্য  করতে এগিয়ে আসবে না?

Friday, 7 October 2022

বুড়ো বুড়ির গপ্পো

বেশ বড় মাপের  পার্কের  একটা দিক সিনিয়র সিটিজেন  মানে বুড়োবুড়িদের জন্য নির্দিষ্ট  হয়েছে। রয়েছে নানাধরণের ফুলের গাছ আর বার্ধক্য নগরীর পার্ক বলে অনেকটা জায়গাই এই বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের জন্য  রাখা হয়েছে। আজকাল শহরের  বিভিন্ন  লোকালয়ে এই ধরণের ছোটখাটো পার্ক হয়েছে যেখানে এই বুড়োবুড়িরা এসে একটু বুকভরে নিঃশ্বাস  নিয়ে নিজেদের  মধ্যে একটু গল্পগুজব  করতে পারে। এই পার্কটা বেশ বড়, সুতরাং বাচ্চাদের জন্য ও অনেকটাই  জায়গা রয়েছে তাদের  খেলাধূলার জন্য,  রয়েছে নানাধরণের উপকরণ, আর তার পাশেই রয়েছে একটা জিমন্যাসিয়াম যেখানে অল্পবয়সীদের ভিড়, নানাধরণের কসরত হচ্ছে সেখানে।  আছে সেখানে কিছু মাঝবয়সীরাও যাঁরা শরীর সচেতন এবং সবচেয়ে মজার  ব্যাপার কিছু মেয়েরাও এই সচেতনাতে  সাড়া দিয়েছেন এবং অবশ্যই  সেখানে কিছু মাঝবয়সী মহিলারাও  আছেন। অবাক  হওয়ার কথা, শ্বাশুড়ি ও বৌমাও রয়েছেন তাঁদের  মধ্যে খানিকটা হাম কিসিসে কম নেহির  মতন ব্যাপার স্যাপার। বাচ্চাদের  নিয়ে মায়েরা কিংবা যেখানে একটু বেশী পয়সা আছে সেখানে কাজের  লোকেরা বাচ্চাদের  নিয়ে খেলাচ্ছে এবং মায়েরা নিজেদের মধ্যে নানান বিষয়ে আলোচনায় মত্ত-- কোন কোন সময় শ্বশুর শ্বাশুড়ির পিণ্ডি চটকানোও তার মধ্যে আছে। উল্টোদিকে শ্বাশুড়িদের মধ্যেও  বৌমা এবং তার  বাপের বাড়ির  নিন্দেবান্দাও  বাদ নেই। অবশ্য  এই সব নিয়েই তো সংসার , নাহলে আর মজাটা কোথায় ?  এই সবনিয়ে  হাজারো সিরিয়াল  হয়ে গেছে আর লোকে  হাঁ করে এই সব মহাভারতের মতো সিরিয়ালগুলো গোগ্রাসে গেলে। ঐসময় যতই প্রিয় বন্ধুই হোক না কেন  নট ওয়েলকাম অ্যাট অল, নো ডিসটার্বেন্স পারমিটেড। যাক গে, আজকের  বিষয় বস্তু হচ্ছে বুড়োবুড়ির গপ্পো।

গেট দিয়ে ঢুকেই ডানদিকে একটা ছোট্ট  সাইনবোর্ডে বাঁকা ট্যারা ভাবে লেখা আছে ফর সিনিয়র সিটিজেন'স ওনলি। সুন্দর  ফুলের গাছ দিয়ে বেড়া দেওয়া বেশ প্রশস্ত একটা জায়গা। সুন্দর সাজানো গোছানো ফুলের গাছ এখানে ওখানে। মাথার  উপর ছাতা করা সিমেন্টের  বাঁধানো গোল বসার  জায়গা অনেকগুলো যেখানে  অনেক ভিন্ন বয়সী ভিন্ন  স্বাদের আলোচনাকারী বুড়োবুড়ি বসে গল্প গুজব করতে পারেন। এখানকার  মেম্বারশিপ প্রায় বাঁধা। নতুন  কোন বুড়ো বুড়ি এলেই হঠাৎ ঐ বাঁধা মেম্বারের জায়গায় বসতে পারবেন  না। ঐ ছাতাগুলোও ভিন্ন  আলোচনাকারী মেম্বারদের জন্য।  কোন জায়গায় ধর্মীয় আলোচনা তো কোথাও  রাজনীতি বা কোথাও   সঙ্গীতের  আলোচনা চলে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে এক রসের  ব্যক্তি অন্য রসে বেমানান। এছাড়াও  রয়েছে বুড়িদের আলাদা বসার  জায়গা। জীবনের  শেষ প্রান্তে এসেও  লেডিজ  আর জেন্টস।  কিছুদিনের  মধ্যেই  তো একই জায়গায় পৌঁছাতে হবে, সেখানেও  কি লেডিজ আর জেন্টস থাকবে? যাই হোক, ঐ বাঁধানো সিমেন্টের ছাতাওয়ালা সিটে মাথা ঢোকানো যে সে  কম্মো নয়, সেখানেও  কারও  রেকমেন্ডেশন বা কেউ হঠাৎই  না ফেরার  দেশে চলে গেছেন  এবং একই ধরণের আলোচনায় অংশ গ্রহণ করবেন এইরকম  লোকই  ঐ বিশেষ  জায়গায় বসতে পারবেন  নাহলে হয়  অন্য টাইম স্লটে বসতে হবে আর তা নাহলে ইতিউতি উঁকিঝুঁকি  মেরে কোথায় জায়গা খালি আছে দেখে বসতে হবে। অন্য পাড়ার  কুকুর  বেপথু হয়ে যদি অন্য কোন  জায়গায় ঢুকে পড়ে তার যা হাল হয় এখানেও  প্রায় সেইরকম অবস্থাই  হয়। এখানে কেউ কামড়াকামড়ি করেনা বটে কিন্তু জোড়া জোড়া কোটরাগত  ঠাণ্ডা  হিমশীতল দৃষ্টিতে নবাগত বৃদ্ধ প্রায় দগ্ধ হয়ে যান।
বিভিন্ন  ছাতার তলায় বিভিন্ন ধরণের আলোচনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বুড়োবুড়িদের খিটিমিটির কথা নয়তো বৌমার উপেক্ষার কথা। সত্তরোর্দ্ধ ব্যক্তিদের আলোচনার বিষয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বৌমার এবং বৌ ন্যাওটা ছেলের উপেক্ষার কথা বিশেষত  যেখানে বাবা ও মা তাঁদের  সন্তানের  উপর নির্ভরশীল আর ষাটোর্দ্ধ  এবং সত্তরের মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্যের কথা, প্রায় হিন্দুস্থান পাকিস্তানের  মতন। এ যদি বলে ডান তো অন্যজন বলেন  বাম। যাক যতই  ডান বাম চলুক  না কেন নিজেদের মধ্যে, জিত  সেই একপক্ষের। আলোচনায় ক্ষান্তি  দিয়ে বলতে হবে আচ্ছা বাবা তুমিই  ঠিক নতুবা কোন অজুহাতে স্থান  ত্যাগ করা, নিদেন পক্ষে বাথরুম  চলে যাওয়া। যাঁরা তুমিই ঠিক  বলতে পারেন  তাঁরা এই সিটে বসবেন না আর যাঁরা তা মেনে নিতে পারেন  না তাঁরা পরদিন  এসে বন্ধুবান্ধবদের  সঙ্গে প্রসঙ্গ উত্থাপন করে খানিকটা হাল্কা হয়ে ফিরে যান তাঁরই  কাছে। এটা ঠিক  কথা  যে একটু  ফ্যাঁস ফোঁস  না হলে সংসারের মজাটা ঠিক  জমেনা। এই ফ্যাঁস ফোঁস  করতে করতেই  একদিন  এই সংসারের  সব মায়া কাটিয়ে চলে যেতে হবে সবাইকে,  কেউ দুদিন  আগে  আর  কেউ দুদিন পরে। 


Monday, 26 September 2022

গরীবের সন্ধানে

পূজো এসে গেছে। চারদিকে  সাজো সাজো রব। এক নিদারুণ  উন্মাদনা সবাইকে কেমন যেন  গ্রাস করেছে। কুচি কাচা থেকে বুড়ো হাবড়া সবাই যেন কেমন  চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন রকম  সমস্যা কিন্তু হিন্দুদের  বিশেষত  বাঙালিদের  সবচেয়ে বড় উৎসব এই দুর্গাপুজো ম্রিয়মান অর্থনীতিকে এক কোরামিন ইঞ্জেকশন দিয়েছে যেন,  চোখ মেলে চাইছে বাঙলার অর্থনীতি।
                     
                   গত দুবছর করোনার প্রকোপে লোক সেরকম ভাবে উৎসব উদযাপন  করতে পারেনি, সাধারণ  গরীবগুর্বোদের অবস্থা তো আরও  তথৈবচ।  চারদিকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের  দুর্দশা ছিল  সীমাহীন। না আছে রোজগার পাতি, না আছে তাদের  ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ভালোমন্দ  কিছু কিনে দেওয়ার সামর্থ্য।  এবছর মায়ের  আগমনের  আগেই করোনা নামক  দৈত্য বিদায় নিয়েছে , অবশ্য একেবারেই  যে আপদ বিদায় হয়েছে তা নয়, নব কলেবরে নতুন নামে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন  কিন্তু টীকার প্রভাবেই হোক আর মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বাড়ার জন্যই হোক তারা এখন  মরিয়া হয়ে গেছে। সমস্ত রাজ্যে দুর্নীতির  রমরমা, এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায় দেখ কিন্তু এ সত্ত্বেও  পূজোর  সংখ্যা বেড়েছে আর তারই সঙ্গে বেড়েছে লোকের  আয় করার ক্ষমতা বিশেষ করে এই সময়। দুর্নীতির নাগপাশে আষ্টে পৃষ্টে বাঁধা সরকারের  নেতা মন্ত্রীরা কিন্তু টিভি চ্যানেলে কোমরবেঁধে ঝগড়া দেখলেই আপ্তবাক্য মনে পড়ে যায় চোরের  মায়ের  বড় গলা। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার উপরতলায় চোর এবং সাধুর কুশল বিনিময় দেখলে মনেই হবেনা যে কিছুক্ষণ  আগেই টিভির  চ্যানেলে এরা প্রায় বাহুযুদ্ধে সামিল হচ্ছিল। আসলে ব্যাপারটা কি,বর্তমান দলে কখন দমবন্ধ  অবস্থা হবে কেউ জানেনা, সুতরাং নতুন  পদক্ষেপে যাতে বিন্দুমাত্র  দুর্ভোগ  না হয়, তার আগাম প্রস্তুতি রাখা সবসময়ই  ভাল। পূজোর বাজেটে কেউ কম যায়না। প্রতিবছর বাজেটের পরিমাণ বেড়েই চলেছে এবং প্রতিটি পূজোরই  পৃষ্ঠপোষক কোন নেতা বা মন্ত্রী। যার যেমন ওজন,  তার বাজেটের ওজন ও সেইরকম।  নেতারা চাপ দেন ব্যবসায়ীদের  আর তাঁরা থোড়াই  নিজের  পকেট থেকে দেন, সুদে আসলে সাধারণ মানুষের পকেট কাটেন।  এর ওপর আছে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা। ফি বছর বাড়ছে পূজোয়  সরকারী অনুদান।  যত পূজো,ততই  অনুদান।  দেশে চাকরির  সংস্থান নেই, যোগ্য চাকরি প্রার্থীকে ঘেঁচুকলা দেখিয়ে অযোগ্য  লোকজনদের উৎকোচের বিনিময়ে চাকরি  দিয়ে  দেওয়া, এ এক অসহনীয়  পরিস্থিতি। ছেলেমেয়েদের মধ্যে পড়াশোনার  চল কমেছে, মাস্টার মশাইদের সম্মান  কমেছে, ফলে ফুলে বেড়েছে শুধু নেতা,মন্ত্রী ও তাঁদের  পারিষদবর্গের। রমরমিয়ে রথের চাকা চালিয়ে যান নেতা, চাকার তলায় পিষ্ট হন সাধারণ জনতা। যত কম  বলা যায় ততই  মানসিক  শান্তি বজায় থাকে। আরে বাবা, এত কথা বলা কেন? খেয়ে দেয়ে চুপ করে বসে থাকতে পারনা? সেটা পারলেই আসবে অপার শান্তি।

গতকয়েক বছর ধরে এক নতুন হুপোৎ হাজির  হয়েছে। সেটা হচ্ছে দরিদ্র জনগণের উপকার করা। কিছু লোকের  এটা বরাবরের অভ্যেস  কারণ তাঁরা হয়তো সেই দারিদ্র্যকে খুবই কাছ থেকে দেখেছেন  কিম্বা তাঁদের যে শিক্ষা প্রাপ্তি ঘটেছে তা সত্যিই খুব সুন্দর। যে কারণেই  হোক না কেন সাধারণ মানুষের কষ্ট  দেখলে তাঁরা স্থির  থাকতে পারেন না এবং তাঁরা সাধ্যমতন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। বহু সংস্থাই আছে যারা বিপদে আপদে সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান এবং এদের মধ্যে রামকৃষ্ণ মিশন এবং ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের  নাম প্রথমেই  মনে পড়ে। এঁরা সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী এবং কোনরকম  নাম কামানোর জন্য  এঁরা কিছু করেন না, এঁদের  কর্মযজ্ঞ বিশাল। এঁরা ছাড়াও  কিছু সংস্থা আছে যারা বিভিন্ন সময়ে সাধারণ জনগণের  পাশে এসে দাঁড়ান। কিন্তু এদের  মধ্যে কতজন নিঃস্বার্থ ভাবে আসেন  তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। এঁরা বিভিন্ন  পেশায় যুক্ত এবং তাঁদের  পেশার  প্রসারের জন্যই  এগিয়ে আসেন।  তাঁদের  দরকার  একটা প্ল্যাটফর্ম  এবং একবার  সেই উঁচুতলার সোপানে উঠতে পারলে আর পায় কে? দুই থেকে চার, চার থেকে আট, এঁদের  খ্যাতি দিনদিন  বেড়ে ওঠে এবং তার সঙ্গেই  বেড়ে ওঠে তাদের ব্যবসায়িক দিক। একটা প্ল্যাটফর্ম  পেলেই সেটা ভাঙিয়ে নানান কায়দায় লোকের  ঘাড় ভাঙা এবং কেষ্টবিষ্টুদের সঙ্গে ওঠাবসার সুবাদে সরকারী, বেসরকারি সুযোগের  সদ্ব্যবহার করেন  এঁরা এবং অধিকাংশ  লোক ই এই জাতীয় মতলববাজ। আর কুম্ভীরাশ্রু বহানোয় এঁদের  জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু এঁরা নিজের গাঁটের  কড়ি থোড়াই খরচ করেন? না, সেই সব হয়ে গেছে প্ল্যাটফর্ম  পাওয়ার আগে। এখন  ধীরে ধীরে সূতোটানার পালা এবং যা খরচ হয়েছে তা সুদে আসলে উঠিয়ে আনা। এঁরা ফটোশুটে  খুবই পারদর্শী এবং এঁদের  বাহন এই গরীব  জনগণ। সুতরাং, গরীব  খোঁজ।  আর এই গরীব  খোঁজার প্রতিযোগিতায় সামিল  হন এই জাতীয় বহুলোক।  আর এই তথাকথিত  গরীবদের ও পোয়াবারো। এরা একবার  এই সংস্থা আর একবার  ওই সংস্থায় মুখ দেখায় এবং তাদের  কাছ থেকে প্রাপ্ত সামগ্রী বাজারে বেচে দেয়। শীতের  সময় যদি একই মানুষ চারটে কম্বল পায় তারা কি চারটে কম্বল গায়ে দেবে না একটা রেখে বাকি তিনটে বিক্রি করবে? আর এই বিতরণের  সময়  পেটোয়া ফটোগ্রাফার  ফটাফট ছবি তুলে বিভিন্ন  জায়গায় পাঠিয়ে দেয় এবং কেল্লা ফতে।এই প্রক্রিয়ায়  সামিল  হয়েছে বহু  ব্যাঙের ছাতার  মতো গজানো সংস্থা এবং বহু  গজুদারা। আর এই তথাকথিত  গরীবরাও আছে খোশ মেজাজে। বহু সংস্থা আবার  এই তথাকথিত  গরীবদের উন্নয়নের জন্য  বিদেশ থেকে প্রচুর টাকা পায় এবং তার  বহুলাংশই  নিজেদের বিলাস ব্যসনে ব্যয় করে এবং নামমাত্র  কিছু গরীবদের  জন্য বরাদ্দ করে। ব্যানার লাগানো, ফেস্টুন লাগানো খান চারেক গাড়ি থেকে কিছু তথাকথিত গরীব দরদী লোক নেমে, " অ্যাই এখানে তোরা কজন আছিস? জামাটা খুলে একটা  নোংরা বা ছেঁড়া গেঞ্জি পড়ে এখানে এসে লাইন  দিয়ে দাঁড়া।" কেউ বা ছেঁড়া লুঙ্গি বা গেঞ্জি আবার কেউ বা আদুর গায়েই খালি পায়ে এসে লাইনে দাঁড়ালো এবং একটা দামী গাড়ি থেকে একটু হিরো গোছের লোক, চোখে দামী সানগ্লাস,  পায়ে হেব্বি জুতো নেমে এলেন  এবং একজন পার্শ্বচর  একটা বড় গোছের  সাদা বাক্স এবং একটা মিনি বোতল তাঁর হাতে দিতে থাকল এবং তিনি সেই লাইনে দাঁড়ানো গরীবদের  হাতে দিতে থাকলেন  এবং  ফটাফট  ছবি উঠতে থাকল।  সবাইকে দেওয়া হলে এক আত্মতৃপ্তির হাসি ও ঢেকুর  তুলে তিনি গাড়িতে উঠে  পড়লেন। সম্প্রচারের গাড়িটাও তাঁর গাড়ির  পিছু পিছু চলে গেল  এবং এই সঙ্গেই সাঙ্গ হল' গরীবদের  উন্নয়নের  পালা । 

সিরিয়ালের শুটিং না  সত্যি সত্যিই কোন জনহিতকারি সংস্থার দান সেটা বোঝা গেলনা কিন্তু একটা জিনিস প্রকট হলো যে সবটাই  মেকি, লাভের  মধ্যে ঐ কয়েক জন গরীবদের অন্তত একদিন  ভাল মন্দ খাওয়া দাওয়া। কবে বন্ধ  হবে এইরকম  চটজলদি দারিদ্র্য  দূর করার কৌশল? যদি সত্যিই  কিছু জনহিতকর কর্ম করতে হয়, তবে এমন কিছু করা দরকার  যাতে লোকজন  নিজের  পায়ে দাঁড়াতে পারে এবং তাদের  ভিক্ষার আশ্রয় না নিতে হয়। ভিক্ষার দান নিতে নিতে তাদের  কর্মক্ষমতা একদম শূন্যে এসে ঠেকে এবং কোন  কাজই তাদের  করতে ইচ্ছা করেনা। কায়িক  পরিশ্রমের ফসল একবার  উঠতে শুরু করলে হাত পাততে  তার লজ্জ্বা বোধ হবে এবং আমরা সেইদিনের প্রতীক্ষায় থাকব। যেদিন  এরা মাথা তুলে দাঁড়াতে শিখবে সেইদিন এই ভেকধারী সমাজসেবীও উধাও  হয়ে যাবে। আমরা কি একটু চেষ্টা করতে পারিনা?

Wednesday, 10 August 2022

বানপ্রস্থ

পূর্বে প্রচলিত কথা ছিল  পঞ্চাশোর্ধে বনং ব্রজেত অর্থাৎ  পঞ্চাশ  পেরোলেই রিটায়ারমেন্ট ফ্রম অ্যাকটিভ লাইফ। রাজা রাজড়ারা তাঁদের  সাধের সাম্রাজ্য সন্তান সন্ততিদের হাতে ন্যস্ত করে বনে চলে যেতেন এবং বাকি জীবনটা ধর্মকর্মে ব্যস্ত থেকে কাটিয়ে দিতেন। কিন্তু একটা খটকা মনের  মধ্যে থেকেই  যায়। রাজা মহারাজারা সাধারণত পরনির্ভরশীল ছিলেন  অর্থাৎ দাসী বাঁদি বা ভৃত্য পরিবৃত থাকতেন এবং তাঁদের সমস্ত কাজ এই চাকর বাকররাই করতো। তাহলে বনে যাবার পর হঠাৎই  নিজের কাজ নিজেরা করতে শুরু করে দেবেন  এটা ভাবা খুবই কষ্টকর। তাহলে কি তাঁরা সমস্ত  লোক লস্কর সমেত যেতেন আর যদি সেটাই হয় তাহলে সেই লোকদের  থাকার  জন্য কাছাকাছি তাদের  বাসস্থান বা বেঁচে থাকার জন্য  নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের জোগাড় করতে হতো যার অর্থ  আরও একটা জনপদ গড়ে ওঠা । তাহলে বন আর কি করে বন থাকে? এই ধন্দ মেটানোর জন্য ভাবতে বাধ্য  হতে হলো যে ঐ ব্যবস্থাপনাই কি আজকের  বৃদ্ধাশ্রমের ব্লুপ্রিন্ট?  নানাভাবে দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রশ্নের  উত্তর  খুঁজে চলেছি, তাই ভাবলাম  যে কোন সহৃদয়  ব্যক্তি হয়তো আমার অনুসন্ধিৎসা মেটাবেন বা আমার  নিজস্ব  চিন্তাধারাকে তাঁদের  মেধা দিয়ে পরিপুষ্ট করবেন। তবে একটা কথা ঠিক যে রাজা বা রানী সাধারণ জনগণের  মতো হাতে বাজারের থলি ঝুলিয়ে দোকান বাজার  করতে যাবেন আর  চাইলেও ঐ বনবাদাড়ে কে দোকান খুলতে যাবে রাজা রানীর চাহিদা মেটানোর জন্য? এইসব আবোল তাবোল চিন্তা মাথার  মধ্যে ঘুরপাক খায়। তারপর তো শরীর সরাগতের ব্যাপার  আছে। রাজা রানীরাও তো আদতে মানুষ।  তাঁদের ও শরীর খারাপ  হতে পারে। আগে না হয় রাজবৈদ্য ছিল, হুকুম  হলেই নিদান নিয়ে তারা হাজির হতো কিন্তু এই বনে তাদের  বয়ে গেছে থাকতে। তারপর তাঁদের  কেউ মারা গেলে  অপরজন  কি করতেন? শবদেহ করা কি তাঁদের  দ্বারা সম্ভব? এই নিদারুণ  অবস্থা থেকে বাঁচার  একমাত্র  উপায় যে কাছাকাছি কোন  লোকালয়ের   উপস্থিতি এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের  দেখভাল  করার  জন্য  পর্যাপ্ত  লোক লস্কর। মানে আজকের  দিনে পেনশন ভোগী। পেনশনের টাকায় যেমনভাবে  চলা দরকার  তেমনভাবে  চলো।

মাঝে মাঝেই মনে হয় বৃদ্ধাশ্রমে চলে গেলে কেমন  হয় বিশেষ করে যখন  সংসারে খিটিমিটি লাগে। তবে মাঝে মাঝে ফ্যাঁস ফোঁস  না হলে সংসারটা  যেন কেমন  পান্তা ভাত হয়ে যায়। অবশ্য  পান্তা ভাতে পেঁয়াজ,  লঙ্কা ছাতু দিয়ে খাওয়াটাও  একটা ভীষণ  ডেলিকেট খাওয়া আর তার মধ্যে যদি শুকনো লঙ্কা ভেজে মাখা  খাওয়া যায় তাহলে সেটা একটা বিশেষ মাত্রা পায়। সুতরাং মাঝে মধ্যে বৃদ্ধাশ্রমের চিন্তা মাথায় আসেনা  এরকম  নয় কিন্তু ভাল মন্দ  সবকিছু মানিয়ে নিয়ে চলাটাই তো জীবনের আর একটা নাম। কালের গতিতে স্বামী স্ত্রীর  দুজনের মধ্যে কেউ না কেউ তো একজন হয়ে যাবে, তখন  কি করা যাবে? সবাই  তো আর   জেনারেল বিপিন রাওয়াত এবং তাঁর  স্ত্রীর  মতন সৌভাগ্যবান বা সৌভাগ্যবতী নন যে দুজনেই  একসঙ্গে চলে যাবেন।  অতএব  কাউকে না কাউকে একা থাকতেই হবে, উপায় নেই। ছেলে মেয়েরাও  দূরে থাকে , কর্ম ব্যস্ততার মধ্যে তাদের ও নিজেদের  সংসার  ছেড়ে বৃদ্ধ বাবা বা মাকে দেখতে আসাও  সবসময়  সম্ভব  হয়ে ওঠেনা।  তাহলে উপায় কি? ছেলের  সংসার  বা মেয়ের সংসারে কাবাব মে হাড্ডি হয়ে থাকা নতুবা নিজের  বাড়িতেই থেকে অপরের স্মৃতিতে বিভোর  হয়ে থাকা  বা নতুন বন্ধুর  খোঁজে বৃদ্ধাশ্রমের পথে পা বাড়ানো। বন্ধুর  খোঁজে বৃদ্ধাশ্রমের  পথে পা বাড়ানো খুব  একটা খারাপ  কিছু নয় কিন্তু সেখানে গিয়েও যে সমমনোভাবাপন্ন লোক পাওয়া যাবে এমন কোন  নিশ্চয়তা নেই। এছাড়া রয়েছে বৃদ্ধাশ্রমের  নিজস্ব  নিয়মকানুন  যা পছন্দ  না হলেও  মেনে চলতেই হবে যদি ওখানে একান্তই থাকতে হয়। তাছাড়া কর্মীদের  মুখঝামটা যে মাঝেমধ্যেই  শুনতে হবেনা এমন গ্যারান্টিও নেই। সুতরাং গরম  কড়াই  থেকে আগুনের  মধ্যে ঝাঁপ দেওয়ার  কোন মানে  আছে কি? বাইরে থেকে ঝাঁ চকচকে রূপ  দেখে না ভোলা শ্রেয়। নিজের  বাড়িতেই  থাকা এবং পাড়া প্রতিবেশীদের  সঙ্গে সৌহার্দ্য পূর্ণ  সম্পর্ক  বজায় রাখাটাই  সবচেয়ে ভাল।  ভগবানের  দেওয়া দান একটা জীবনের  উৎকর্ষতা তারিয়ে তারিয়ে  উপভোগ  করে কালের নিয়মে ফিরে যাবার  আগে দেহদান করে জীবনের  যতপাপ খানিকটা ক্ষালন করা মনে হয় সর্বোত্তম। নিজের  ছোট পরিসর নিজের  সাম্রাজ্য  মনে করে মন চল নিজ নিকেতনে বলে আমার বিচার তুমি কর তব আপনার করে বলে সুন্দর পৃথিবীকে জানাও বিদায়।

Friday, 5 August 2022

বাস্তুহারা

গল্পের  নামটা উদ্বাস্তু না বাস্তুহারা হওয়া উচিত তা নিয়ে একটু ধন্দে ছিলাম। বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী আমি কখনোই  নই, গড়পড়তার চেয়ে একটু সামান্য  বেশি। ভাবলাম  কোন  বন্ধুবান্ধবদের  কাছে জেনে নেব  সমস্ত  ঘটনাটা বর্ণনা করে কি হওয়া উচিত  নামটা। একটু গভীর ভাবে চিন্তা করে বাস্তুহারা নামটাই দিলাম  কারণ  উদ্বাস্তু কথাটা সাধারণত  ব্যবহার  হয় যেখানে কেউ নিজের  দেশ ছেড়ে যে কোন  কারণেই  হোক পালাতে বাধ্য হয় এবং অন্য  দেশে তাকে আশ্রয় নিতে হয় যেমন  হয়েছিল  দেশভাগের  সময়। বাস্তুহারাদের ক্ষেত্রেও প্রায় সেইরকম ই কিন্তু সেটা দেশভাগের জন্য নয়, কোন  প্রাকৃতিক  দুর্যোগ  হেতু বা কারও অত্যাচারের জন্য  যেখানে তার ফিরে যাবার  সম্ভাবনা থাকে। ধারণা ঠিক  নাও হতে পারে এবং সংশোধনের কথাও মনে থেকে গেল। 

সরকারি প্রকল্পে  যে আবাসনগুলো গড়ে উঠেছিল সেগুলো ঠিক তাৎক্ষণিক  চাহিদার কথা মাথায় রেখে, অদূর ভবিষ্যতে কি হতে পারে সেই কথা মাথায় ছিল  বলে বিশেষ  মনে হয়না। সরকারের কাজ   তখন  ছিল জনগণের  সেবা করা এবং সেটাই হওয়া উচিত কিন্তু উন্নয়নের জন্য যে টাকার দরকার সেটা কিভাবে আসবে তা নিয়ে খুব  গভীর  চিন্তাভাবনা ছিল  বলে মনে হয়না। স্বাধীনতার পর  দেশ গড়ে তুলতে অনেক অর্থের  প্রয়োজন। কিন্তু জনগণের  উপর ট্যাক্স  চাপানো চলবে না, তাদের নিখরচায় বা সামান্য টাকার বিনিময়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা দিতে হবে, গরীবদের জন্য  বিনামূল্যে রেশন দিতে হবে, তাদের বিনামূল্যে মাথা গোঁজার ঠাঁই দিতে হবে, নিম্ন মধ্যবিত্ত , মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের জন্য আবাসন তৈরী করে দিতে হবে এবং তা বিক্রি করা হবে কোন  লাভ  না করেই। বিনামূল্যে বা অত্যন্ত  স্বল্প  মূল্যে শিক্ষার  ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এই বিশাল  কর্মযজ্ঞের  জন্য যে অর্থের প্রয়োজন  তার সংস্থান কি করে হবে সেটাও  তো ভাবার প্রয়োজন।  শুধু টাকা  ছাপিয়ে আর বেসরকারী উদ্যোগপতিদের  উপর ট্যাক্স  চাপিয়ে এটা কতটা সম্ভব সেটা  নিয়ে বিশেষ ভাবনাচিন্তা ছিল বলে মনে হয়না। এর উপর ছিল রাজনৈতিক নেতাদের সাধারণ  মানুষের  ভিতর এক ধারণার  সৃষ্টি করা যে বেসরকারী উদ্যোগপতি মানেই  তারা সাধারণ  জনগণের  শত্রু এবং বিশেষ  চিন্তায় উদ্বুদ্ধ  হয়ে এক নতুন কথার আবিষ্কার   শ্রেণীশত্রু  ও শ্রেণীসংগ্রাম। উদ্যোগপতিদের  কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও জাতীয় কথাবার্তা কতটা ভাল  করেছে তাতে যথেষ্ট  সন্দেহ  রয়েছে। অন্তত  একটা জিনিস  করা সম্ভব  হয়েছে, তা রাজনৈতিক  চেতনা বাড়ানোর  নামে মানুষের  মনে হিংসার বীজ খুব  সুন্দর ভাবে বুনে দিতে পেরেছে এবং উত্তরোত্তর  তা বেড়ে এক বিশাল  মহীরুহের আকার ধারণ  করেছে এবং সেটা আজ বিভিন্ন ভাবে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করেছে এবং কখনো তা জাতিভেদে এবং কখনো তা ধর্মভেদের  মাধ্যমে প্রতিফলিত  হয়েছে। কিন্তু যাঁরা এই বীজ বপন করেছেন  তাঁরা সবজায়গায় সুন্দর ভাবে মিলে মিশে আছেন, একবার  সাপের গালে আর একবার  ব্যাঙের  গালে চুমু খাচ্ছেন। 

ফিরে আসা যাক মূল বক্তব্যে। সরকারী উদ্যোগে গড়ে ওঠা আবাসনগুলো মানুষের বেড়ে ওঠা চাহিদার  সঙ্গে তাল না মেলাতে পারায় সেগুলোর পরিবর্ধনের প্রয়োজন অনুভূত হয়েছে এবং বয়স বাড়ার  সঙ্গে সঙ্গে হাত পায়ের জোর  কমেছে এবং উপরতলায় থাকা লোকজনের লিফটের প্রয়োজন মনে হয়েছে। এই আবাসনগুলো যখন  হয়েছিল  তখন কেউ এই চিন্তা করেননি যে বয়স হলে সবার সিঁড়ি ভেঙে চারতলায় বা পাঁচ তলায় উঠতে কষ্ট  হবে এবং লিফটের  চিন্তা মাথায় আসেনি।  অবশ্য  লিফট করে ওঠা লোকজন মানে এক বিশাল  ব্যাপার এবং নিশ্চয়ই  তারা পুঁজিপতি। মনে পড়ে যখন  জ্যোতিবাবুর হিন্দুস্থান  পার্কের  বাড়িতে  লিফট বসানো হয় তখন  কাগজে কাগজে সমালোচনার  প্রতিবেদনে ছেয়ে গিয়েছিল।  সেইরকম ই সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন  তাঁর চেম্বারের সংলগ্ন  বাথরুম  সংস্কারের তীব্র  সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। হয়তো সকলের মনে আছে যে কারও  বাড়িতে ফ্রিজ থাকলে তাকে বুর্জোয়া শ্রেণীভুক্ত করা হতো এবং আরও  কিছুদিন  পরে যখন  সাদাকালো টিভি এল তখন  যার  বাড়িতে টিভি এল তারা ছাড়া পাড়ার  আর সবাই  সেই ঘরের  আনাচে কানাচে পর্যন্ত  দখল করে নিত। আমাদের  মানসিকতা তখন  এর বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেনি। রেডিও তে মোহনবাগান  ইস্টবেঙ্গল  ম্যাচের ধারাবিবরণী অজয় বসু, কমল ভট্টাচার্য এবং পুষ্পেন সরকারের মাধ্যমে সম্প্রচার  একটা গোটা পাড়ার  লোক একসঙ্গে শুনতো।  সুতরাং বোঝা যায় সাধারণ  মানুষের  কি অবস্থা ছিল। আবাসন গুলোর এক্সটেনশন করার জন্য সবাই এককাট্টা  হয়ে দরখাস্ত  করেছে এবং কর্পোরেশনের স্যাংশনের জন্য  প্রয়োজনীয় অর্থের বহু গুণ অর্থ  বিভিন্ন ধাপে সাম্মানিক মূল্য হিসাবে দিতে হয়েছে।  কিন্তু এ সত্ত্বেও  সমস্ত আবাসিকরা বিভিন্ন  কারণে এই উদ্যোগে সামিল  হতে পারেন  নি এবং বহুতলীয়  এই বাড়িগুলোর ফাঁকা অংশগুলো  খানিকটা  হাঁ করা মড়ার মাথার  খুলির  মতন লাগত। এইরকম ই কয়েকটা ফাঁকা জায়গা কিন্তু আমফানের সময় বহু পাখির  আশ্রয়স্থল হয়েছিল।  যখন  প্রবল ঝড়ে সমস্ত গাছগুলো একের পর এক ধূলিসাত হয়ে যাচ্ছে  তখন ঐ পাখিগুলোর কি দুর্দশা। যখন গাছগুলো সাধারণ অবস্থায় থাকে তখন  রোজ সন্ধেবেলায় পাখিদের  মধ্যে অনবরত ঝগড়া লেগেই থাকে। কাকের সঙ্গে শালিকের বা শালিকের নিজেদের  মধ্যে বা শালিকের সঙ্গে ময়নার  ঝগড়া নিত্যদিনের ব্যাপার  কিন্তু আমফানের  সময় সবাই নিজেদের  ঝগড়া ভুলে একসঙ্গে সবাই আশ্রয় নিয়েছে ঐ মড়ার খুলির  মুখের মধ্যে। শাটার টানা ব্যালকনিতে বসে তাদের  ঐ করুণ অবস্থা লক্ষ্য  করেছি। এক্সটেনশন  না করা ঐ ফ্ল্যাটের  ভদ্রলোক কিন্তু খুবই  মানবিকতা দেখিয়েছেন  ঐ অবস্থাতেও।  প্যাকেট প্যাকেট  বিস্কুট,  ভাত ছড়িয়ে দিয়েছেন তাদের  উদ্দেশ্যে এবং ঐ সময়ে তারাও  ঝগড়া ভুলে নিজেদের  মধ্যে ভাগ করে খেয়েছে। সাধারণত  কাকেদের থাকে দাদাগিরি কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার তারা কিন্তু সব বৈরীতা ভুলে নিজেদের  বাঁচিয়ে রেখেছিল।  আস্তে আস্তে আমফান বিদায় নিল, এখন ঘরে ফেরার  পালা। কি ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে তা নির্ধারণ  করার পালা। বহু গাছই  ভেঙে গেছে ,যে কয়েকটা নিজেদের  বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে  তা সবাইকে স্থান  দিতে অপারগ। এখানে কোন সরকারী সহায়তা নেই , নেই কোন  তার  থেকে দুপয়সা  রোজগার করা, আছে শুধু ঐ কয়েকটা এক্সটেনশন  না করা ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন বাড়ির কার্নিশ এবং গাছগুলো  বেড়ে উঠে ডালপালা বিস্তার  করার অপেক্ষা। এরই  মধ্যে   এক্সটেনশন  না করা ফাঁকা ফ্ল্যাটের দেয়াল উঠতে শুরু হয়েছে আর পাখিগুলো একদৃষ্টে  লক্ষ্য  করছে কতটা উঠল ঐ দেওয়াল এবং  দিন গুনছে ফের বাস্তুহারা হবার  আশঙ্কায়। গাছগুলো তো এখনও  সেইভাবে বেড়ে ওঠেনি যাতে সবার বাসস্থানের  স্থান হয়। হায়, কারও পৌষমাস আর কারও  সর্বনাশ। 

Wednesday, 3 August 2022

অথ যৌধেয় বিবাহ কথা

যুধিষ্ঠিরের নিজের  পছন্দের স্ত্রী দেবিকা যদিও সেটা ঘটকালি  করেই এবং তাদের একমাত্র  পুত্র যৌধেয়। মহাভারতে এদিক সেদিক আতিপাতি করে খুঁজেও যৌধেয়র বিয়ের কথা জানা গেলনা এবং অধুনা যৌধেয়র ও বিয়ের কথা প্রায় সেইরকম পর্যায়েই চলে যাচ্ছিল  কিন্তু ভগিনী দুঃশলার অতি আদরের প্রিয়পাত্র যৌধেয়( আজকের  নুটু) তার পিসির  কথা একদমই  ঠেলে ফেলতে পারলনা এবং তারই সহপাঠিনী এবং দীর্ঘদিনের বান্ধবী ও বহু সুখ দুঃখের সমব্যথী তিতলির  সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলে সবাইকে চিন্তামুক্ত করতে চাইল। এখন জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরকে পায় কে, আনন্দে আত্মহারা এবং তারই সঙ্গে দেবিকাও। অন্য পাণ্ডবরাও খুবই খুশি এই খবরে কিন্তু যুধিষ্ঠির ও দেবিকার কপালে ফুটে উঠেছে চিন্তার  ভাঁজ  কারণ ভীম ও বালন্দারার দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি এবং নকুল ও কারেনুমতীর বিশ্ব পরিভ্রমণ। উপস্থিত  কেবল অর্জুন ও সুভদ্রা  এবং সহদেব  ও দেবিকা। অর্জুনের  সহায়তায় যুধিষ্ঠির তাঁর দুই হাঁটুই  প্রতিস্থাপন  করিয়েছেন  এবং সহদেবের ও অবস্থা তথৈবচ। তিনিও যুধিষ্ঠিরের  পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন এবং এখনও টলোমলো অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন নি এবং ইদানীং কালে অর্জুনের শরীরটাও  বিশেষ  যুতসই  নয়। 

নুটু এবং তিতলি দুজনেই  বাইরে থাকে এবং বর্তমানে তিতলি প্রাগে  পোস্ট ডক্টরেট করতে চলে গেছে এবং নুটু ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে থিসিস  জমা দেবার  উদ্যোগ করছে। তিতলিরা যমজ বোন এবং ওর চেয়ে কিছু সময়ের বড় তিয়াস তার বন্ধু শতদ্রুকে বিয়ে করে ক্যালিফোর্নিয়ায় গুগলে কর্মরত। তিতলির কিন্তু মনোগত ইচ্ছা কোন ইনস্টিটিউটে পড়ানো এবং একই মনোভাব নুটু বা যৌধেয়র। নুটু টাটা কনসালটেন্সির তিনবছরের চাকরির সম্পর্কে ছেদ ঘটিয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে রিসার্চ করতে লেগে গেল  এবং সেই কারণেই তার ডক্টরেট করাটাও একটু দেরী হয়ে গেল। কিন্ত জ্ঞান পিপাসা এমনই একটা জিনিস যা মেটাতে মানুষ সহজলভ্য সুখ ছেড়ে অনিশ্চয়তার পিছনে ধাওয়া করে। ঠিক  সময় বের করে নুটু ও তিতলির জীবনে স্থায়িত্ব আনাটা  একটু গোলমেলে হয়ে যাচ্ছিল  কিন্তু ভগবান  যখন সহায় হন তখন কোন বাধাই তার গতিরোধ করতে পারেনা। তিয়াস এবং শতদ্রু কাজের ফাঁকে একটা ছোট্ট  বিরতি নিয়ে সুদূর  আমেরিকা থেকে তিতলির বিয়েতে যোগ দেওয়ার পরদিনই সন্ধের ফ্লাইটে ব্যাক টু আমেরিকা।  

আজকের  যুগের  ছেলেমেয়েদের  যতই  দেখি ততই  আশ্চর্য  হয়ে যাই। আমাদের  সময় যেন  একটা গদাই লস্করি চাল ছিল, হচ্ছে হবে এইরকম ধারণাতেই মন মজে থাকতো কিন্তু এখন এই জেটগতির  যুগে এই এখানে,  এই সেখানে। কি সুন্দর  টাইম ম্যানেজমেন্ট,  একেবারে টাইট শিডিউল, কোথাও কোন নড়চড় হবার  উপায় নেই। নুটু এসেছে রবিবার,  বিয়ে সারলো সোমবার  এবং অষ্টমঙ্গলা সেরে শনিবার ফিরে যাবে ব্যাঙ্গালোরে থিসিস জমা দেবার জন্য। তিতলিও কয়েকদিন পরেই চলে যাবে প্রাগে তার ইনস্টিটিউটে যোগ দিতে। এরই  মধ্যে সময় করে খুব  ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করে যাচ্ছে এবং তাদের  আশীর্বাদ  পাথেয়  করে নিজেদের চলার জীবন মসৃণ করতে। 

সোমবার বিয়ের পর্ব মিটেছে যৌথ উদ্যোগে সময়াভাবের জন্য। মঙ্গলবার  দুপুরে আরও একদফা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজন এবং তারপরেই ভাঙা হাটের  পালা। তিয়াস ও শতদ্রু পাড়ি দিয়েছে তাদের  কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে। বুধবার আত্মীয়স্বজনের  সঙ্গে দেখা করার পালা। সওয়া ছটা নাগাদ নুটু ও তিতলি নামল ধবধবে একটা সাদা গাড়ি থেকে।তরতর করে উঠে চলে এল প্রাণোচ্ছল এক তরুণ ও তরুণী।  এ কুলুকুলু রবে বয়ে যাওয়া নদী নয় এ ঝরঝর করে ঝর্ণার মতো খুবই  পরিচ্ছন্ন  ও মার্জিত কথাবার্তা। নয় নয় করে কিভাবে ঘন্টা দেড়েক সময় কেটে গেল বুঝতেই  পারলাম  না। " উঠি এবার " শুনে সচকিত  হয়ে উঠলাম। মন চাইছিল ঝর্ণার  গান  আরও  কিছুক্ষণ শোনার কিন্তু উপায় নেই তাদের  অনেক কমিটমেন্ট,  সুতরাং বাধা দেওয়া যায়না। একরাশ আনন্দের  ডালি  উজাড় করে দিয়ে রেখে গেল ঝর্ণার অনুরণন।