Friday, 15 November 2024

গুরু নানক জন্ম জয়ন্তী --স্মৃতি রোমন্থন

শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী গুরুনানকজীর আজ জন্মদিন। তাঁর  জন্মদিন নিয়ে একটু দ্বিমত রয়েছে । কেউ কেউ  বলেন যে তাঁর জন্ম হয়েছিল  পাকিস্তানের  নানকানা সাহেবের  তালওয়ান্দি  গ্রামে। কিন্তু ভাইবালা জন্মসখী এবং  অন্যান্য বিশিষ্ট শিখ ধর্মগ্রন্থের লেখকদের পরিভাষায় কার্তিকমাসের পূর্ণিমার দিন  নানকজীর জন্ম হয়েছিল  এবং  সেটাই সরকারের মান্যতা পেয়েছে এবং  সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ  মহা সমারোহে এই দিনটি পালন করেন এবং  তাঁর বাণী প্রচার করেন সঙ্গীত ও লঙ্গরখানায় বহু লোককে খাওয়ানোর মাধ্যমে ।
আজ ১৫ইনভেম্বর ২০২৪ শ্রী নানকজীর জন্মদিন । কিন্তু ৫২ বছর আগে ১৯৭২ সালে কার্তিকপূর্ণিমা ছিল ২০ই নভেম্বর, সোমবার সারা ভারতবর্ষে স্বীকৃত ছুটির দিন  এবং   আমার  বন্ধুবান্ধবেরা ঠিক করল যে শনিবার তাড়াতাড়ি কাজ সেরে লালগোলা প্যাসেঞ্জারে  বহরমপুর  যাবে এবং সেখান থেকে মুর্শিদাবাদ বেড়াতে যাবে রবিবার ও ফিরে আসা সোমবার অর্থাৎ গুরু নানকজীর জন্মদিনে । কোথায়  থাকা হবে? ঠিক হলো তারা সবাই উঠবে আমাদের বাড়ি। শ্যামল দা যেতে পারলেন না, অমরনাথ মিত্র মুস্তাফি,  হরিশচন্দ্র, শিবু, সুজিত, জয়ন্ত, চৌধুরি, শিবুর এক বন্ধু দীপু ও মেয়েদের মধ্যে ছায়াদি,  মাধবিকা ও কনিকা। তখন বহরমপুরে বেশ ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করেছে,অন্তত কলকাতার  তুলনায়  তো যথেষ্ট  ঠাণ্ডা । আমার ঘরে দাদুর দুটো জম্পেশ খাটে ছায়াদিদের শোয়ার ব্যবস্থা হলো, মুস্তাফি সাহেবের ব্যবস্থা হল ঐ বাইরের বিশাল ঘরে আর সুজিত, শিবু , জয়ন্ত, চৌধুরী,  হরিশচন্দ্র ও দীপুদের সদ্য কেনা লালুদার বাড়িতে। সবার জন্য  লেপ, তোষক ও মশারির ব্যবস্থা করতে হয়েছে নাহলে যত ই নাক মুখ চাপা দিয়ে  লেপ মুড়ি দিয়ে  শোওয়া যাক না কেন মশা তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। ওরা সবাই এসেছে এসপ্ল্যানেড থেকে বাসে। আমি একদিন আগে ছুটি নিয়ে  এসে গেছি। দাদাও এসে গেছে বিরাট মাছ নিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে থাকা কুতুবপুর  থেকে। হৈ হৈ ব্যাপার আর কি। বাবা ও আমি সাইকেল  নিয়ে  বাস স্ট্যাণ্ডে ওদের  নিয়ে  আসতে গিয়েছি। লালু দা, সেজদি এবং  আজিমগঞ্জ থেকে  বড়পিসিমাও এসে গেছে ওদের  আদর আপ্যায়নে যাতে কোন ত্রুটি  না হয়। রিক্সা সব বলাই ছিল। ওরা  আলো ঝলমলে জজসাহেবের বাড়িতে এসে পৌঁছানো মাত্র ই  গরমজলে হাত পা ধুয়ে বসে পড়ল বাইরের ঘরে। গরম চা ও  হালকা জলখাবার খেয়ে  বেশ খানিকক্ষণ  আলাপ পরিচয়ে কেটে গেল।   আমাদের  বাড়ির ভেতরের বারান্দায় আসন পেতে রাতের খাওয়া দাওয়া  হলো। মুস্তাফি সাহেব জমিদার বাড়ির ছেলে এবং যথেষ্ট  ভোজন রসিক, বড়সড় মাছের মাথাকে কি করে খেতে হয়, তা দেখিয়ে দিলেন । মুস্তাফি সাহেব বললেন উনি একা বাইরের ঘরে থাকবেন না, তিনিও লালুদার বাড়িতেই থাকবেন । ওখানে তিনটে বেশ বড় ঘর ছিল , ভালভাবেই  সেখানে সবাই ঠিকঠাক ভাবেই ম্যানেজ হয়ে গেল। লালুদার  বাড়িটা ছিল  আমাদের  বাড়ির  তিনটে বাড়ি পরে। সকাল বেলায় গরম চা নিয়ে দাদা, আমি ও লালুদা যখন এলাম তখন দেখি অনেকে ফ্রেশ হয়ে গেলেও হরিশচন্দ্র এবং  মুস্তাফি সাহেব  তখনও  বিছানা ছেড়ে ওঠেন নি। শিবু সুজিতের পিছনে লাগছে এবং  হাসি ঠাট্টার মধ্যে দিয়ে  এবাড়ির আনন্দের  রেশ  ও বাড়িতে পৌঁছে যাচ্ছে।  যাই হোক, এক প্রস্থ চায়ের পর  সবাই স্নান সেরে আমাদের  বাড়িতে এসে গেছে এবং  লুচি, তরকারি, বেগুনভাজা এবং  মিষ্টি সহযোগে জলখাবার সেরে চা খেয়ে একটা মিনিবাসে সবাই রওনা দিলাম  লালবাগের  পথে। একটু বেলাই হয়ে গেল হাজারদুয়ারি  দেখে ফিরে আসায় কিন্তু খিদেটা বেশ চাগিয়ে উঠেছে ইতিমধ্যে । জবরদস্ত খাওয়া দাওয়ার পর দরকার  একটু গা গড়িয়ে নেওয়ার তবে কেউ আর লালুদার বাড়িতে  গেলনা, বাইরের  ঘরেই সবাই মিলে গল্পগুজব করে কাটিয়ে দিল। সন্ধের সময়ে মোহন হাউসে সবাই মিলে সিনেমা দেখতে যাওয়া এবং রাতে মাংস ভাত ও বহরমপুরের বিখ্যাত ছানাবড়া।  অনেক রাত অবধি গল্প গুজব করে রাতে গভীর ঘুম। এদিন আর মুস্তাফি সাহেব লালুদার বাড়িতে গেলেননা, বাইরের ঘরেই শুয়ে পড়লেন। সকাল  হতেই সব চা জলখাবারের ব্যাপার  কিন্তু মুস্তাফি সাহেব বললেন বাসি মাংস  দিয়ে মুড়ি খাবেন। তাই হলো, অন্যরা লুচি তরকারি আর মিষ্টি খেল। দুপুর  বেলায় খাওয়া  মাছের ঝোল,  ভাত, চাটনি দই ও মিষ্টিতে সারা হলো তারপর রিক্সায় চড়ে স্টেশনে লালগোলা প্যাসেঞ্জারে শিয়ালদহে ফিরে আসা । দুদিনের ঠাসা প্রোগ্রাম,  এক ঝাঁক পায়রা ঘুটুর ঘুঁ, ঘুটুর ঘুঁ করতে করতে সবাই  ফিরে এল।
ইতিমধ্যে এদের মধ্যে অনেকেই চলে গেছেন না ফেরার দেশে । শ্যামল দা, মুস্তাফি সাহেব,  সুজিত,  চৌধুরী , দীপু আগেই চলে গেছেন । সেই লিস্টে  নবতম সংযোজন ছায়াদি । হরিশচন্দ্র কোথায় আছেন জানিনা। 
আজ এতদিন  বাদে এই লেখার উদ্দেশ্য স্মৃতিটাকে একটু ঝালিয়ে নেওয়া এবং যারা অবশিষ্ট রয়েছে তাদের হৃদয়ে পুরনো দিনের  একটু বিদ্যুতের ঝলক আনা।

Saturday, 9 November 2024

"বাসুদেব"

বাসুদেব থাকতো সুবীরবাবুর  বাড়িতে। তাকে সেন্ট্রাল স্টেট  ওয়েলফেয়ার  হোম থেকে সুবীরবাবু এনেছিলেন তাঁর বন্ধু ঐ হোমের সুপারিনটেনডেন্ট অসীমবাবুর অনুরোধে। অসীমবাবু ছিলেন অকৃতদার  এবং  খুবই  আমুদে। মানুষটি ছোটখাটো হলেও ছিলেন একজন খুব ভাল বন্দুকবাজ শিকারী। ছুটির দিনে  বেড়িয়ে পড়তেন শিকারের খোঁজে এই জঙ্গলে বা ঐদিকের বিলে  এবং সঙ্গী থাকতেন আদি অকৃত্রিম বন্ধু সুবীরবাবু। কোন সময় রাতে দুই বন্ধু ফিরে এলেন কোন  বনমুরগী বা হাঁস শিকার করে এবং সুবীরবাবুর স্ত্রীকে বললেন, " বৌঠান, বেশ ঝাল ঝাল করে মাংস রাঁধতে হবে, ভাল করে মশলা বাঁটুন; আর ইতিমধ্যে আমরা এটার ছাল চামড়া ছাড়িয়ে পরিষ্কার  করছি। তখনকার দিনে  না ছিল মিক্সি, না ছিল ফ্রিজ বা প্রেশার কুকার । শিল নোড়ায় বাঁটা মশলা ও কড়াইয়ে ঘুচ ঘুচ করে সিদ্ধ  হওয়া মাংসের স্বাদ ই হতো আলাদা। বাসুদেব ছিল  অসীমবাবুর হোম থেকে সদ্য বেড়িয়ে আসা ছেলে। সরকারী নিয়ম অনুযায়ী হোমে একটা বয়সের পরে আর থাকা যায়না । সুতরাং নিয়ম লঙ্ঘন করে অসীমবাবুর পক্ষে বাসুদেবকে ওখানে  রাখা সম্ভব ছিলনা। হোমে থাকাকালীন  ছেলেদের  বিভিন্ন বিষয়ে ট্রেনিং  দেওয়া হয়। যাতে পরবর্তী জীবনে সে নিজেই জীবিকা অর্জনে সক্ষম হয়। কিন্তু চাকরি করব বললেই তো আর চাকরি পাওয়া যায়না। সবসময়ই চাকরির আকাল ছিল, এখনও  আছে এবং  ভবিষ্যতেও থাকবে। যতদিন ও একটা ঠিকমতন চাকরি না‌ পায় ততদিন সুবীরবাবুর  বাড়িতে বাসুদেব  থাকবে এবং  ফাইফরমাশ খাটবে ও খাওয়া দাওয়ার অভাব ওর হবে না। ইতিমধ্যে সুবীরবাবুর ছোট ছেলেটা বছর দুয়েক হয়েছে এবং  তার দেখাশোনা করার  জন্য একটা লোকের  দরকার  ছিল  যেটা বাসুদেব মিটিয়ে দিত। দুজনের  দুজনকেই দরকার  ছিল, অতএব বাসুদেবের  ঠাঁই  হলো সুবীরবাবুর বাড়িতে ।

অসীমবাবুর ব্যবহারের জন্য  উনি সকলের খুব প্রিয় ছিলেন কিন্তু  বন্ধু বলতে সেই সুবীরবাবু এবং  ঐ একটি বাড়ি ছাড়া উনি আর কোথাও যেতেন না। তাঁর হোমটা ছিল স্টেশনের কাছে যা সুবীরবাবুর বাড়ি থেকে  প্রায় আড়াই মাইলদূরে। বেশীরভাগ দিন ই অসীমবাবুর রাতের খাওয়া হতো সুবীরবাবুর বাড়িতে এবং  তারপর সাইকেল চালিয়ে হোমে ফিরে যাওয়া।  একদিন কথায় কথায় বাসুদেবের প্রসঙ্গ উঠল। উনি জানালেন যে একদিন  উনি সকাল বেলায়  উঠে দেখেন দরজার বাইরে  কাঁথায় মোড়ানো একটা  ছোট্ট শিশু । মাঝে মাঝেই  কেঁদে  উঠছে । একে অকৃতদার মানুষ,তার উপর ঐ শহরে কোন  আত্মীয় স্বজন নেই । বাচ্চাটাকে নিয়ে কি করবেন  ভেবেই পাচ্ছিলেন না। অগতির গতি সুবীরবাবু । একটা রিক্সা করে বাচ্চাটাকে নিয়ে সোজা তাঁর বাড়ি। বললেন বৌঠান একটা ব্যবস্থা করতে হবে এই বাচ্চাটার। অনেক ভেবেচিন্তে সুবীরবাবুর  স্ত্রী একটা উপায় বের করলেন । ওঁদের  বাড়িতে কাজ করা শিবানীর কোন সন্তানাদি ছিলনা এবং  এখানে সেখানে  কোন পীঢ় বাবা বা সন্ন্যাসীর  পায়ে মাথা ঠুঁকতো এবং  মানত করতো একটা সন্তানের আশায়। অভাবের সংসার,  একটা বাচ্চাকে মানুষ করা খুব  সহজ কথা নয়,তবুও শিবানীর  মনে হলো এটা ভগবানের দান এবং বাচ্চাটিকে নিতে রাজি হলো। সুবীরবাবুর স্ত্রী শিবানীর  মাইনে একটু বাড়িয়ে দেবেন বলে একটু আশ্বস্ত করলেন। শিবানীর  আদরে মানুষ  হওয়া বাসুদেব একটু বড়সড় হতেই ঠাঁই  হলো সরকারী  হোমে এবং  তারপর আবার  সেই  সুবীরবাবুর বাড়ি।
বাসুদেবের মা কিংবা বাবার মধ্যে কেউ একজন নেপালি ছিল কারণ বাসুদেবের চেহারায় ছিল নেপালিদের মতন হাবভাব। যাই হোক হোমের খাতায় তার পদবী হলো মণ্ডল। বাসুদেব কয়েকবছর হোমে থাকার সুবাদে কাঠের কাজে  হাত পোক্ত করেছে এবং কাজের অপেক্ষা করছে । বাসুদেব  সুবীরবাবুর ছোট  ছেলেটার যাবতীয় বায়না মেটায় যেখানে  কোন পয়সা খরচ হয়না। খুবই ভাল বাসে  ছোট বাচ্চা  সুমনকে। তাকে নিয়ে  কোলে করে ঘোরা, তার সঙ্গে খেলা করা, স্কুলে নিয়ে যাওয়া আসা সবকিছুই আব্দার বাসুদেবের কাছে। সুবীরবাবুর  ব্যবসায় ইদানিং একটু মন্দা চলায় টাকা পয়সা  নিয়ে একটু টানাটানি চলছে।বাসুদেব এটা বুঝতে পারছে কিন্তু কোথায়  যাবে সে এবং একটা চাকরি যোগাড় না করতে পারা পর্যন্ত্য, তাকে সুবীরবাবুর বাড়িতে ই থাকতে হবে। তার পালিত মা শিবানীও বাচ্চা হতে গিয়ে দেহ রক্ষা করেছে আর শিবানীর  স্বামীও মদ খেয়ে লিভারের বারটা বাজিয়ে মারা গেছে। সুতরাং  বাসুদেবের এই বাড়ি ছাড়া আর কোনও  জায়গা নেই। দিন দিন সুবীরবাবুর আর্থিক অবস্থা শোচনীয়  হয়ে পড়ছে কিন্তু তিনি একজন প্রকৃত ভদ্রলোক,  হাজার কষ্টের মধ্যেও  বাসুদেবকে  চলে যেতে  বলছেন না। ব্যবসায় যারা ধার বাকিতে জিনিস পত্র নিয়েছিল তারাও ঠিকমতো পেমেন্ট না করায় তাঁকে ও ধার করতে হয়েছে  এবং সেই ধারের মাত্রা দিন দিন বেড়ে এক অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মাঝে মাঝেই  ঋণদাতারা এসে অপমান করছে যেটা বাসুদেবের একদম সহ্য হচ্ছে না। অসীমবাবু ঐ শহর  থেকে  বদলি হয়ে গেছেন। তিনি থাকলেও হয়তো খানিকটা সুরাহা হতো । যাই হোক বাসুদেব  একদিন  ঘরের  সব কাজ সেরে  পল্টনবাবুর কাঠের  গোলায়  দেখা করল এবং  একটা কাজ চাইল। কোথায়  থাকো জিজ্ঞেস করায় জানালো যে সুবীরবাবুর বাড়িতে  থাকে এবং  একটা চাকরির খুব  দরকার । সুবীরবাবুদের একটা সুনাম ছিল  ভদ্রলোক হিসেবে এবং  কানাঘুষোয়  জানতে পেরেছিলেন তাঁর  দুর্দশার কথা। সুতরাং  তিনি মনে মনে স্থির করেছিলেন  যে বাসুদেবকে একটা কাজ দেবেন ।  কি কি কাজ করতে পার জিজ্ঞেশ করায় বাসুদেব জানালো যে সে হোমে কাঠের  কাজ করতে শিখেছিল এবং  সুযোগ পেলে সে ঐ কাজ ভালভাবেই করতে পারবে। পল্টন বাবু বিশ্বাস  করতেন যে নেপালিরা খুব  বিশ্বস্ত হয়। তিনি ভাবছিলেন  যে কাঠের  গোলায়  তাকে দারোয়ানের কাজে লাগাবেন । দুদিন বাদে তাকে দেখা করতে বললেন। বাসুদেব তো ভগবানের কাছে  প্রার্থনা করতে  লাগল যাতে চাকরিটা সে পায়। বাড়ি ফিরে আসতে বেশ  দেরী  হয়েছে  আর মা( সুবীরবাবুর  স্ত্রীকে সে মা বলে ডাকতো) ভাতের থালা  নিয়ে  বসে আছে, অপেক্ষা করছে তার জন্য। বাসুদেবের  চোখে জল এসে গেল মাকে না খেয়ে বসে থাকতে দেখে। 
 "কোথায়  ছিলি এতক্ষণ? "
কিছু না বলে হাত পা ধুয়ে বসে পড়ল রান্নাঘরে আসন পেতে।
মা জিজ্ঞেস করল আবার কিন্তু কোন উত্তর দিতে পারল না সে , কেবল চোখ  দিয়ে জল বেরোতে থাকল।
মা বলল যে খেয়ে নে বাবা, খাওয়ার সময় চোখের জল ফেলতে নেই।
মায়ের মুখের দিকে  তাকাতে পারছে না সে , কেমন একটা অপরাধ বোধে তার মনটা ভার হয়ে আছে। ভাবছে এত কষ্টের মধ্যেও  মা বা বাবা কেউ কিছু বলছেনা তাকে। যাই হোক,  তাকে এই বাড়ির জন্য কিছু করতেই হবে কিন্তু যতক্ষণ কিছু না হয় ততক্ষণ সে কিছুই  বলবে না। নিজের  বাবা মাকে সে দেখেনি। শিবানী মায়ের  কাছে ছোট অবস্থায়  ছিল, পেয়েছে তাদের  ভালবাসা, তারপর দেবতা তুল্য মানুষ অসীমবাবুর ভালবাসা ও শাসন এবং  সবশেষে এই বাবা মা আর ছোট ভাই যাকে সে বড়দাদার মতো মানুষ  করেছে আর সুবীরবাবুর মেয়েদের  দিদির মতন দেখেছে। আর কি চাই ভগবানের কাছে?  সব  তো তিনি দিয়েছেন। 
দুদিন  পরে বাসুদেব দেখা করেছে পল্টন বাবুর সঙ্গে। কাঠের  গোলায়  তাকে থাকতে হবে রাতে। বাসুদেব  তাঁকে অনুরোধ  করল যে শহরে তাকে কারখানায় রাখার  জন্য কারণ রাতে সেই কাঠগোলায় থাকতে হলে সুবীরবাবুর বাড়িতে  সে কখন  কাজ করবে?  মন তার ভীষণ খারাপ । যারা তাকে এতদিন  আশ্রয় দিয়েছে , দুর্দিনের মধ্যে ও তার খাওয়া পড়া নিয়ে  কিছু বলেন নি,  তাদের  এই বিপদের দিনে সে ছেড়ে চলে যাবে এটা সে কিছুতেই মন থেকে  মেনে নিতে  পারছে না। বাড়ি ফিরে  এল সে। মা তো বুঝতে পারছেন যে কিছু একটা হয়েছে বাসুদেবের কিন্তু কি হয়েছে সেটা বুঝতে  পারছেন না। শেষে মায়ের  কাছে  কাঁদতে কাঁদতে সত্যি কি হয়েছে সেটা বলল। সুবীরবাবু পাশ থেকে  সব শুনতে পেয়েছেন এবং  দুঃখ  পাওয়া সত্ত্বেও তাকে উৎসাহিত করলেন কাজটা নেওয়ার জন্য। পরদিনই বাসুদেব নিজের  কিছু জামা টা পড় ও খানিকটা চাল ডাল ও কিছু দরকারি জিনিস  নিয়ে চলে গেল  কাজে যোগ দিতে, বেশীরভাগ জিনিস ই রইল পড়ে। যাবার আগে বাবা মাকে প্রণাম করে ভাইকে কাঁধে তুলে নাচানাচি করে জলভরা চোখে চলে গেল পল্টনবাবুর  কাঠগোলায় । টালির ছাউনি কাঠগোলায় । বাঁশের বেড়া দিয়ে দরজা, ঐদিকে মেসিনগুলো আর একদিকের কোণে একটা চাটাই,  সতরঞ্চি, মশারি ও চাদর। দিনের  বেলায়  মেশিন চলত, অনেক লোক কাজ করছে, গমগম করছে জায়গাটা কিন্তু সন্ধে নামতেই অন্য সব লোক জন চলে গেল কর থাকল ও একা। জঙ্গলের মধ্যেই মেশিন ঘরের দিকে ইলেকট্রিক বালব জ্বলছে আর নিজে যেখানে  থাকবে সেখানেও একটা টিমটিমে বালব জ্বলছে আর আছে এক কেরোসিনের লন্ঠন যেটা কারেন্ট চলে গেলে কাজে লাগে। বেশীরভাগ সময়েই রাতে নাকি কারেন্ট থাকেনা আর সেই কারণেই নাকি লণ্ঠনের উপযোগিতা অনিবার্য। এই জঙ্গলের মাঝে একা থাকা বেশ কঠিন  ব্যাপার । জন্তু জানোয়ার ছাড়াও  বিষাক্ত সাপ খোপ তো থাকতেই পারে। কিন্তু বাসুদেবের  কোন ভয়ডর বলে কোন জিনিস  নেই । নিজের শরীরটা বেশ শক্তপোক্ত এবং  সাহস ও ছিল অদম্য। একটা বেশ শক্ত বাঁশের  লাঠি আর আছে একটা ছোরা আত্মরক্ষার জন্য। সেদিন ই প্রথম রাত,কিছুতেই ঘুম আসছেনা , কেবল ই মায়ের, বাবার ও ছোট ভাইয়ের  কথা ভাবছে। কখন যে চোখের পাতা ভারী হয়ে লেগে এসেছে খেয়াল  নেই। রোদ বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে মুখের ওপর পড়তে ঘুম ভাঙল। একটু দূরেই একটা ছোট ঘর চোখে পড়ল, সম্ভবত সেটাই বাথরুম । একটা ছোট টিউব ওয়েল রয়েছে  তার ই পাশে। প্রাতঃকৃত্য সেরে স্নান সেরে উনুনে কাঠকুটো জ্বেলে সকালের খাবার  তৈরী করে ফেলল সে। একবার  মেশিন চালু হলে আর অন্য দিকে  তাকাবার সময় পাবে না সে। আগে যে লোকটা ছিল সে বাড়ি গেছিল কয়েকদিনের জন্য কিন্তু  তার পরে সে আর আসে নি । আদৌ আসবে কিনা তাও  জানা নেই । সুতরাং, পল্টনবাবুকে একটা লোক রাখতেই হতো। উনি ভাবছিলেন ও সেইরকম ই আর তারই মাঝে বাসুদেবের আগমন এবং  তার চাকরি । কাঠগোলায়  একটা পুরনো ঝরঝরে সাইকেল আছে।বাসুদেব দেখে নিল যে ওটাকে কি ভাবে কাজে লাগানো  যায় । সাইকেল টাকে ঝেড়ে মুছে রাখল কিন্তু চাকায় হাওয়া নেই।  বেশ খানিকটা দূরে  একটা সাইকেল রিক্সা সারানোর দোকান  আছে, যেখান থেকে ও সাইকেল টা সারিয়ে নিল। সারাদিন কাজ করে পরেরদিন সাইকেল  নিয়ে  সাতসকালে বাবা মা ভাইয়ের  সঙ্গে দেখা করতে আসা। অত সকালে মা বাসুদেবকে দেখেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন কিন্তু পরক্ষণেই ঘোর দুশ্চিন্তায় মন ভরে গেল । হ্যাঁ রে কেমন আছিস বাবা? একটা দিন তোকে দেখিনি  কিন্তু মনে হচ্ছে  কতদিন তোকে দেখিনি ।সুবীরবাবু ও ইতিমধ্যে হাজির,  ভাই ও এসেছে দাদাকে দেখতে। মা চট করে একটু চায়ের জল চাপিয়ে দিয়ে কয়েকটা রুটি করে দিয়েছে। চা ,জলখাবার  খেয়ে তাড়াতাড়ি সাইকেল নিয়ে  কাঠগোলায়  ফিরে আসা । দৈবাত কেউ এসে যদি পড়ে এবং  কাঠগোলায় ঢুকতে না পারে তাহলে তো ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটে যাবে এবং চাকরিটাও চলে যাবার সম্ভাবনা থাকতে পারে। যাই হোক,  কোন বিপত্তি ঘটেনি। কোন লোক আসার আগেই  সে ফিরে এসেছে এবং  কাজ ও সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে । প্রায় রোজই বাসুদেব  সাইকেল নিয়ে চলে আসে এবং  চা ও জলখাবার খেয়ে কাজে চলে যায়। মাস শেষ হলো। আজ মাইনে দেবেন পল্টনবাবু। সবাই খুব  খুশী র মেজাজে। টাকা পেয়ে সবাই খুব খুশী  কিন্তু বাসুদেবের আনন্দের  কোন সীমা নেই কারণ এটাই তার প্রথম রোজগার । সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। ভোরের আলো ফুটতেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে সে। মা অত সকালে  বাসুদেবকে দেখে চমকে উঠেছেন। হ্যাঁ রে শরীর ঠিক আছে তো রে? 
হ্যাঁ মা, ঠিক আছি, ভাল ই আছি। বলে মাকে প্রণাম  করে প্যান্টের পকেট থেকে  মাইনের সব টাকা মায়ের  পায়ের কাছে  রেখে দিল। মায়ের  চোখে জল, উনি কিছুতেই নেবেন না।সুবীরবাবু ও এসে পড়েছেন। তাকেও প্রণাম করল বাসুদেব । ভাই অকাতরে ঘুমোচ্ছে।  বাসুদেব কাঁদছে আর বলছে মা তুমি যদি টাকা না নাও তাহলে আমি বুঝব যে তোমরা আমাকে ছেলের মতো ভালবাসনি। আজকে আমি যেখানেই  থাকি না কেন  তা তোমার   বাবার এবং কাকাবাবুর জন্য। আমাকে তোমরা দূরে সরিয়ে  দিওনা।  যথারীতি চা ও জলখাবার  খেয়ে কাঠগোলার দিকে রওনা দিল। দেখতে দেখতে তিনটে মাস কেটে গেছে বাসুদেবের  ঐ কাঠগোলায় । আর এদিকে ফিরে  এসেছে  সেই আগের  লোক যে বাড়ি গিয়ে অসুস্থ  হয়ে পড়েছিল। পল্টন বাবু একটু ধন্দের মধ্যে পড়ে গেছেন । পুরনো লোকটাকে রাখতে গেলে বাসুদেবকে  ছাড়িয়ে দিতে হয়। আর বাসুদেব এই তিন মাস যেভাবে কাজ করেছে তাকেও হাত ছাড়া করতে চাইছেন না। সমাধান  বেরোল সবচেয়ে  পুরনো  মিস্ত্রীর পরামর্শে। বহাল হলো পুরনো লোক কাঠগোলায় আর বাসুদেবের স্থান হলো ফার্নিচার দোকান  সংলগ্ন কারখানায় আর সঙ্গে বাড়ল মাইনেও। 
বাসুদেব  এখন সুবীরবাবুর বাড়িতে মা ও ভাইয়ের  সঙ্গে। সুবীরবাবুর কাছে যারা ধারে মাল নিয়েছিল  তারাও অনেকে টাকা ফেরত দেওয়ায়  অবস্থার অনেক  উন্নতি হয়েছে । সৎ পথে থাকলে সাময়িক কষ্ট হলেও ভগবান তাদের  শান্তি দেন ।

Wednesday, 6 November 2024

বন্ধন

বন্ধন কি, কেন আসে, কোথা থেকে আসে এইসব নানাধরণের  চিন্তা য় মাথাটা কেমন ভার হয়ে গেল । বন্ধন তো ভালবাসার ই আর একটা রূপ। রক্তের সম্পর্ক থাকতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই । অনেক সময়ই দেখা যায়  যে সম্পূর্ণ একজন অজানা ব্যক্তির প্রতি তীব্র আকর্ষণ আবার  কোন রক্তের সম্পর্কের প্রতি  একেবারেই ভ্রূক্ষেপহীন। সব সময় যে কোন ব্যক্তি ই হতে হবে এমন কোন  কথা নেই, কোন প্রাণীর প্রতিও হতে পারে। সুতরাং,  সংক্ষেপে বলা যায় যে ভালবাসা না থাকলে বন্ধন আসতে পারেনা। ডাক্তারি শাস্ত্রে বলে অক্সিটোসিন ভালবাসার উৎস। এটা না থাকলে ভালবাসা ভুলেও আসবে না। সুতরাং যে সংসারে একটু খুটোখুটি চলছে সেখানে ডাক্তার বাবুরা একবার ভেবে দেখতে পারেন  যে বিবদমান  ব্যক্তিদের মধ্যে কোনভাবে এটা সঞ্চার করা যায়না কিনা।
অনেকদিন ধরেই নাতি নাতনিরা আবদার করছে ওদের সঙ্গে  কিছুদিন  কাটিয়ে যাওয়ার কিন্তু নানা কারণে  তা আর হয়ে উঠছে না। এবার  কিন্তু আর ছাড় পাওয়া গেলনা। ছেলে টিকিট কেটে পাঠিয়ে দিয়েছে,  আর বারবার তাদের অনুরোধ  ফেলাও যাচ্ছে না। ভাইফোঁটার দিন  সন্ধের ফ্লাইটে রওনা  দেওয়া হলো। দুজনের ই হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা হয়েছে। এতে সুবিধা ও আছে আবার  অসুবিধা ও রয়েছে । মালপত্রের সঙ্গে নিজেদেরকেও একটা লাগেজের( মাল বলতে একটু লজ্জ্বা লাগল) মতন মনে হতে লাগল। দিব্যি হেঁটে যাওয়া যায় তবে অনেকটা  রাস্তা  চলতে হবে।এ ছাড়াও রয়েছে  চেক ইন করা, সিকিওরিটি চেক করার সময় মোবাইল,  মানি ব্যাগ মায় কোমরের বেল্টটা পর্যন্ত খুলে এক্সরে মেশিনে চেক করানো এক ভীষণ ঝামেলার ব্যাপার  যেটা সামলে দেয় ঐ হুইল চেয়ার  বাহকেরা। নিজেরা বোকার মতো হুইল চেয়ারে বসে সবকিছুই লক্ষ্য  করা একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মোকাবিলা করা। সিকিওরিটির লোকজন একটু করুণার সঙ্গে ব্যবহার করে এটা ভাবলেই কেমন ভেতরে ভেতরে  কুঁকড়ে যেতে হয়। যাই হোক,  হুইল চেয়ারে বসলে লাইনে না দাঁড়িয়ে অন্যদের টাটা বাই বাই করে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এগিয়ে  যাওয়া। হাতে যে ব্যাগটা যাবে তাকে কোলের ওপর বসিয়ে বেল্ট বাঁধা অবস্থায় চেয়ারে অসহায়ভাবে বসে থাকা । একা থাকলে খুবই বিশ্রী লাগত কিন্তু দুজনে থাকায় একটু কম হয়েছিল অস্বস্তি। কিন্তু বোর্ডিংয়ের সময় একেবারে শেষে হুইল চেয়ারের যাত্রীদের নিয়ে যাওয়া মানে প্রায় দুঘন্টার বেশী সময়  ধরে ঐ বাঁধা ছাঁদা  অবস্থায় বসে থাকা কোন সুখকর পরিস্থিতি  নয়। এয়ারোব্রিজ হলে গড়গড়িয়ে প্লেনের দরজা অবধি পৌঁছে যাওয়া যায় কিন্তু বাসে করে গিয়ে তারপর সিঁড়ি দিয়ে একটা প্রায় আশি কেজির জ্যান্ত লাগেজকে ওঠানো সেটা খুব সহজ সাধ্য নয়। কিন্তু ঐ অবস্থায় চেয়ার থেকে নেমে আমি চলে যেতে  পারব বলাটাও নিজেকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করা ছাড়া আর কিছুই নয়। এয়ারলাইন্সের  নিয়ম অনুযায়ী ঐ হুইল চেয়ার বাহকদের কিছু টাকা পয়সা দেওয়া বারণ। ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি যে হুইল চেয়ার ব্যবহারকারীদের কাছে কিছু টাকা নেওয়া  উচিত আর সেক্ষেত্রে  নিজেদের  অপরাধ বোধে ভুগতে হয়না। যাই হোক দুঘন্টা ধরে  বোর্ডিং গেটের সামনে বসে নানা ধরণের যাত্রীদের নানারকম ব্যবহার লক্ষ্য করা সেটাও একটা বিরাট ব্যাপার । ভিনদেশী একটা ছোট্ট শিশু নিজের  মনে গান করে চলেছে, ভাষাটা বুঝতে না পারলেও সুরেলা মিষ্টি সুর সব বাধা অতিক্রম করে মনে যথেষ্ট আনন্দের  সঞ্চার করছে। একে একে সবাই চলে গেল নিজেদের গন্তব্যস্হলের প্লেনের  দিকে, চলে গেল সেই মিষ্টি বাচ্চাটাও।  বোর্ডিংয়ের সময়ে একটা জিনিস নজরে এল। প্রায়োরিটি বোর্ডিং বলে একটা কথা কানে এল। যারা বিজনেস ক্লাস বা এক্সিকিউটিভ ক্লাস বা  প্রিমিয়ার ইকনমি  ক্লাসের যাত্রী তারা একটু আগে যাবেন । একজন সাধারণ ইকনমি ক্লাসের টিকিটধারী তাদের সঙ্গে একসাথে  যেতে পারবেন না। কথাটা কানে গেল যখন একজন সাধারণ ইকনমি ক্লাসের যাত্রী হয়তো ঠিকমতন না শুনেই ঐ প্রায়োরিটি বোর্ডিং এর যাত্রীদের সঙ্গে যেতে গিয়েছিলেন এবং তাঁকে যেতে দেওয়া হলোনা এবং বলেও দেওয়া হলো। ব্যাপার টা হচ্ছে  ফেল কড়ি মাখো তেল।    
এরপর ই শুরু হলো আমাদের  বোর্ডিং। সবশেষে আমরা চারজন হুইল চেয়ারের যাত্রী। 

নাতি নাতনিদের কাছে বলা হয়নি যে আমরা তাদের  সঙ্গে কদিন কাটাতে আসছি। হঠাৎই এসে তাদের সারপ্রাইজ দেওয়াটাই উদ্দেশ্য । কিন্তু বাচ্চারা  ভীষণ বুদ্ধিমান । তারা ঠিক জেগে বসে আছে। আট বছরের মিশু আর সাড়ে চার বছরের লিও, ওরাই আমাদের সারপ্রাইজ দেওয়াটা বানচাল করে দিল যারা নটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে তারাই সাড়ে এগারটা অবধি জেগে আমাদের ভালোবাসায় ভরিয়ে দিল। বুড়ো বয়সের সমস্যা হলো যে একজায়গায় যেখানে  ওঁরা থাকেন সেইখানে ই তাঁরা খুব স্বচ্ছন্দে  থাকেন এবং বাইরে বেড়াতে গেলেও দুচারদিনের বেশী থাকতে চাননা । যদিও মিশু এবং লিওর খুব ব্যস্ত শিডিউল কিন্তু তাদের ওর ই মধ্যে অন্ধকার রাতে বিদ্যুত ঝলকের মতো উপস্থিতি আমাদের মতো বুড়োবুড়িদের শরীরে অক্সিটোসিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং ভালবাসা আরও কিছুদিন বাঁচার তাগিদ বাড়িয়ে দেয়।

Monday, 28 October 2024

বুদ্ধিজীবি

বুদ্ধিজীবির সংজ্ঞা বেশ কঠিন বলেই মনে  হয় আমার কাছে । খুব বেশি বুদ্ধি মগজে নেই বলে কোনরকমে একটা কাজ জুটিয়ে সারা জীবন ঐখানেই কেটে গেছে । আজকালকার ছেলেমেয়েরা খুব বুদ্ধিদীপ্ত ও ঝকঝকে । তারা বেশ মাথা খাটিয়ে কোন এক  সংস্থায় বছর দুয়েক কাটিয়ে ফুরুৎ করে উড়ে যায় আরেক সংস্থায়, মাইনেও বেড়ে যায় তিরিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ -- যার যেমন বারগেন করার ক্ষমতা তার উপর । কয়েক বছরের মধ্যেই  একটা কোম্পানির কেউকেটা। তারা কাজটাকে ভালবাসে কোম্পানিকে নয়। তারা কি বুদ্ধিজীবি নয়?  কিছু লোক সংস্থায় ঢোকা ইস্তক রিটায়ার করার দিন পর্যন্ত  সব কাজ ঠিকঠাক করে পরবর্তী যে লোক এসেছে তার জায়গায় তাকে সমস্ত কিছু বুঝিয়ে দিয়েও তার শান্তি নেই । একটু কিছু অসুবিধা হলেই তার স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি তাঁকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেন বা অনেক  সময়েই তাঁকে অফিসে আসতে বলেন। ইনি তো কখনোই  বুদ্ধিজীবি নন, তবে কি ইনি  বোকা ? না, ইনি বোকা নন, ইনি একজন  ভাল মানুষ যিনি তাঁর জীবনের সেরা সময় তাঁর সংস্থাকে দিয়েছেন এবং অনেক  সময়ই  পরিবারকে বঞ্চিত করে কোম্পানির জন্য প্রাণপাত করেছেন । বিনিময়ে কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা একটু মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে কাজটা গুছিয়ে নিয়েছেন এবং বাহবা কুড়িয়েছেন। তবে এই কর্তাব্যক্তিরা কি বুদ্ধিজীবি? অবশ্যই । যারাই নিজের  মাথা খাটিয়ে অন্যদের  মাথায়  কাঁঠাল ভেঙ্গে নিজের  কার্যসিদ্ধি করেছেন  তিনি  তো বুদ্ধিজীবি বটেই। কিন্তু ঝকঝকে বুদ্ধিদীপ্ত  ছেলেমেয়েদের  সঙ্গে এদের একাসনে ফেলাটা ঠিক হবেনা । 

আজকের দিনে  বুদ্ধিজীবি বললে কেমন একটা তির্যক  শব্দ বলেই মনে হয়। কেউ হয়তো লেখক বা  কোন শিল্পী( চিত্রকর বা সঙ্গীত বা নাট্যকলায় পারদর্শী) যখন প্রয়োজন মতো নিজের অবস্থান বদল করতে পারেন তখন তিনিই বুদ্ধিজীবি বলেই গণ্য হন। অবশ্যই এই শিল্পীরা নিজেদের চোখ কান খোলা রেখে কোনদিকে বাতাস বইছে সেটা বুঝতে পারেন এবং সেই মতন নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন। এঁদের নানা রঙের জামা আছে এবং সময় মতন এঁরা জামা বদল করেন এবং বলেন আমি তোমাদের ই লোক যদিও নিজের  সুবিধা ছাড়া আর  কিছুই  বোঝেন না এঁরা। 
সুমিত আজকাল একটু লেখালেখি করছে এবং  পাঠকমহলে ওর লেখা বেশ নজর কেড়েছে । বাচ্চাদের জন্য লেখা ছড়া গ্রাম ও মফস্বলে বেশ পরিচিতি পেয়েছে। শহরে বাচ্চারা একটু ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ার জন্যই  হোক বা একটু বেশি চালাক চতুর হবার জন্যই হোক ছড়ার দিকে নজর দেয়না। নানারকম লেখা যেমন ছোটগল্প, উপন্যাসেও বেশ ভালরকম প্রশংসা পেয়েছে। অনেক জায়গা থেকে প্রধান অতিথি হবার আমন্ত্রণ পাচ্ছে। সেদিন বই মেলায়  তো ওকে দেখে  বেশ ভীড় জমে গেল অনেকেই ওর অটোগ্রাফ  নিতে চাইছিল। দেখে বেশ ভাল লাগছিল কারণ প্রথম দিকে ও আমাকে পড়তে দিত ওর লেখাগুলো। উৎসাহ  ওকে দিয়েছি এবং  ধীরে ধীরে ওর লেখা  আরও  পরিণত হয়েছে। সেই জন্য ওর সাফল্যে নিজেকে রামচন্দ্রের  সেতু বন্ধনে কাঠবিড়ালির মতন মনে হচ্ছিল । কিন্তু ওকে কেউ বুদ্ধিজীবি বললে ও খুবই রেগে যেত। একদিন ওকে বললাম, " তুমি এত রেগে যাও কেন?"
ও রাগ না কমিয়ে বলল যে ও একটা নীতি মেনে চলে যা সরকারী নীতির পরিপন্থী। অতএব ও বুদ্ধিজীবি বলে ছাপ নিতে রাজি নয়।"
সত্যিই তো এঁদের  অনেকেই  একসময় তাঁদের লেখা ও গানে বা অন্যশিল্পকলায়  তাঁদের  ছাপ রেখেছেন এবং অনেক লোককে উদ্বুদ্ধ করেছেন, হঠাৎই  কিছু স্বীকৃতির বিনিময়ে বা কিছু  সুবিধার বিনিময়ে কেন তাঁরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দিয়েছেন এটা বোধগম্য হয়না। তাঁদের কাছে বিনীত অনুরোধ যে আপনারা স্বকীয়তায়  ভাস্বর, আপনারা সেই মহিমায় বিরাজ করুন,  কেউ যেন আপনাদের  এইভাবে কলঙ্কিত করতে না পারে ।

Monday, 14 October 2024

সাবেকি দু্র্গাপূজো বনাম থিম পূজো

এখন শহর ও শহরতলীতে থিম পূজোর ঘনঘটা যা ধীরে ধীরে  গ্রাস করছে গ্রামের মানুষকেও। সাবেকি পূজো শহরাঞ্চলে খুব  কম জায়গায়ই  হচ্ছে আজকাল । বাঙালি আগে প্রতিদিন মানে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীতে অঞ্জলি দিত। পূজো মানেই হৈ হৈ, যে যেখানেই থাকুক না কেন পূজোর সময় নিজের  কোটরে এসে হাজির। হাতে হাত লাগিয়ে রাত জেগে পূজো মণ্ডপ করা, নিজেদের  মধ্যেই  যাদের  শৈল্পিক ধারণা আছে তারাই প্রতিমার ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরী করা এবং মৃৎশিল্পীদের কারখানা বাড়ি থেকে প্রতিমা আনা সব ই নিজেরাই করত যার ফলে পূজোর প্রতি পদক্ষেপে পাড়ার ছেলেদের ঘাম লেগে থাকতো এবং আনন্দটাও ছিল অবর্ণনীয় । আস্তে আস্তে পাড়ার ছবিটা  বদলে গেছে। একটা জমির উপর একটা বাড়ির জায়গা দখল করেছে বহুতল বাড়ি যেখানে  অনেক পরিবার  একসঙ্গে থাকলেও সম্পর্কের আঠা তেমনভাবে লাগেনি যার নীট ফল বাড়ির কেউ অসুস্থ  হলে  বা মারা গেলে কোন সংস্থাকে খবর দিতে  হয় যেটা আগে ভাবাই যেত না। তখন কি তাহলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবার অনেক  লোক ছিল ? হয়তো খানিকটা  তাই। প্রত্যেক বাড়িতেই পাঁচ সাতটা ছেলে মেয়ে  ছিল। দু একটা ছেলেপিলে যারা লেখা পড়ার ধার সেরকম ভাবে মাড়াতো না তারাই এই পরোপকারে ঝাঁপিয়ে পড়ত। যারা খুবই ভাল  পড়াশোনায়  তারা এগিয়ে  না এলেও মধ্য মেধার ছেলেমেয়েরাও যোগ দিত। এক কথায় পাড়া থেকেই সবাই এগিয়ে আসত এবং যে কোন  সমস্যার সমাধান পাড়ার  লোকজন সামলে দিত। ধীরে ধীরে  চারদিন অঞ্জলির বদলে অষ্টমী ও দশমীতে অঞ্জলি দেওয়া ঠিক হলো। অষ্টমীর অঞ্জলি দেওয়ার  সময়ই ভীড় সামাল দেওয়া এক বিরাট ব্যাপার ছিল। প্রথমে বুড়োবুড়িদের অঞ্জলি দেওয়া,  তারপর মাঝ বয়সী এবং  সবশেষে চেটো চ্যাংড়াদের । এই সময়টাতে অঞ্জলি দেওয়ার ফাঁকে একটু চোখাচোখি বা একঝলক মিষ্টি হাসির মধ্যে মন্ত্র পড়া এবং  ফুল ছোঁড়ার সময় কোন  নির্দিষ্টের গায়ে বা মাথায় ফুলের আঘাত। দশমীতে অঞ্জলি দেওয়ার পর অপরাজিতার ডাল হাতে বাঁধার একটা রেওয়াজ ছিল বিশেষ করে অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে। মা, মাসি বা কাকি, পিসিরাও এটাতে একটু উৎসাহ  যোগাতেন, হয়তো বা নিজেদের  পুরনো দিনের  কথা ভেবে । অবশ্যই এটা খুব  একটা দোষের নয় কারণ সব বাবা মা ই চায় যে তার মেয়ের  একটা ভাল  ছেলের  সঙ্গে  বিয়ে হোক। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ই এটা ঠিক  না হলেও দু চারটে যে পরিণতি পেতনা  তা নয়। যাই হোক,  পূজো নিয়ে একটা বিরাট  হৈচৈ হতো এবং  সেটা সাবেকি পূজোয়।
 এখন এসেছে থিমের পূজো । কোন শিল্পী কোন বিশেষ  জায়গার আদলে মণ্ডপ বানিয়ে তাঁর শৈল্পিক  ধারণা  বাস্তবায়িত করেন এবং অনেক সময়ে ও অর্থ ব্যয়ে  এবং  যথেষ্ট উঁচু মানের হয় কিন্তু প্রতিমা দর্শন করে ভক্তি রসে উদ্বেলিত হয়ে মনে মনে  মা মাগো বলে ডাকটা আসেনা। আবছা আলো আঁধারিতে মা সেখানে গৌণ এবং  মণ্ডপ সজ্জা মুখ্য। সেখানে প্রবেশের জন্য কাউকে ধরা ধরি করে পাস যোগাড় করতে হয়ে। এই পাসের ও আছে রকমফের। সাদাসিধে পাস, ভি আই পি পাস আবার ভি ভি আই পি পাস। যার যেমন  ওজন তিনি তেমন পাসের অধিকারী। সুতরাং এখানে মণ্ডপসজ্জাই হচ্ছে মুখ্য। তা, এত কৃতিত্বের অধিকারী যাঁরা তাঁদের  শিল্পকীর্তি এক বিশাল প্রাঙ্গনে প্রদর্শনের ব্যবস্থা সরকারী বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়  করা যায়না এবং  তাঁদের  যথাযথভাবে সম্মানিত করা যায়না? এতে প্রচুর  লোকের  কর্মসংস্থান হবে এবং  শিল্পীরাও তাঁদের যথাযথ সম্মান পেতে পারেন কিন্তু যে প্রতিমার দিকে তাকিয়ে সেই ভক্তিরস না আসে সেইরকম ঠাকুর  করার কি দরকার?  এটা না হাঁস না সজারু হয়ে গেল  হাঁসজারু । একটু ভেবে দেখার অনুরোধ  কি রাখতে পারি? 

Sunday, 13 October 2024

গুপ্তিপাড়ার ভ্যাবল

ভ্যাবল আমার খুব ছোটবেলার বন্ধু না হলেও নয় নয় করে পঞ্চাশ বছর মনের খুব কাছাকাছি ছিল। পড়াশোনা শেষ করেই টগবগে তারুণ্যে ভরপুর আমরা একই সংস্থায় যোগ দিয়ে খুব কাছাকাছি চলে এলাম । পঞ্চাশ বছর নিতান্ত কম সময় নয় , এর মধ্যে নানারকম অবস্থায় কেটে গেছে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছি কর্মসূত্রে কিন্তু বন্ধুত্বের যে সূক্ষ্ম তার, তাতে কোন সময়ই মরচে পড়েনি বা ছিন্ন হয়নি। রয়েছি দুজন দুই প্রান্তে, হঠাৎই মোবাইলের রিংটোনে দুজনে পড়লাম বাঁধা। মোবাইল ধরতেই সেই চেনাগলায় ভেসে এল, "শোন,একটা গান তুললাম।গানটা শুনে কেমন লাগল বলবে।"  গান শুরু হলো, দরাজ গলায় গান, সকাল টা বেশ ভাল ভাবেই শুরু হলো । চলল পুরনো দিনের  কথা, মাঝে মাঝেই কিছু খিস্তি, গালাগালি আর তার পরেই  হা হা করে হাসি যা থামতেই  চায়না। ঘন্টা দেড়েক সময় যে কোথা দিয়ে  চলে গেল বুঝতেই পারলাম না।
এই ছিল ভ্যাবল যার ছোটবেলা কেটেছে গুপ্তিপাড়ায় । সবচেয়ে ছোট ভ্যাবল ছোটবেলাতেই  মা কে হারিয়ে বাবার কাছে মা ও বাবার দুজনের আদর একসঙ্গে পেয়েছে। তখন ও থাকে উত্তরপাড়ার ভদ্রকালীতে আর আমি থাকি পিসিমার  বাড়ি লিলুয়ায়।একটা রবিবার  ও আমাকে নিমন্ত্রন করল দুপুর বেলায় খাবার জন্য। লিলুয়া থেকে বালিখাল
৫৪ নম্বর বাসে গিয়ে ওখান থেকে  বাস বদলে পৌঁছে গেলাম  ভদ্রকালী । বাস স্টপেই দাঁড়ানো ভ্যাবল নিয়ে গেল তার বাড়ি। ওর বাবা ই রান্না করেছিলেন ইলিশ মাছ,  অসাধারণ রান্না। সারা দুপুর  তিনজন মিলে কত গল্প  এবং তারপর ফিরে আসা। প্রথম আলাপের কয়েকদিন পরে লাঞ্চ রুমে  ওর দরাজ গলায়  গান  শুনে ওকে বললাম  গান শেখার কথা। একদিন অফিস শেষে ও চলে গেল এলগিন রোডের  মুখে ডায়োশেসন স্কুলের উল্টোদিকে  থাকা স্কুল  সৌরভে যেখানে  প্রবাদ প্রতিম পণ্ডিত  জ্ঞান প্রকাশ ঘোষ  শেখাতেন। ও কিন্তু কোনরকম দ্বিধা না করে সোজা চলে গেল ভিতরে এবং  জিজ্ঞেস করায় ও বলল আমি সেরা লোকের  কাছে  গান  শিখতে চাই। যে কোনদিন গান  করেনি সে যদি এই ধরণের কথা বলে তাহলে বুঝতে হয় তার প্রত্যয় কতটা। যাই হোক  একজন  বিশিষ্ট শিল্পী শ্রীমতি স্নিগ্ধা বন্দোপাধ্যায় ওকে জিজ্ঞেস করলেন যে আগে কোনদিন  ও কারও কাছে  শিখেছে কি না। ও সরাসরি জানালো যে "না"।উনি তখন বললেন  যে তুমি একটা গান করতে পারবে?  ও সম্মতি জানিয়েই " আমার  আপনার  চেয়ে আপন যে জন খুঁজি তারে আমি আপনায়" গানটা ওর নিজস্ব ভঙ্গীমায় গাইল আর স্নিগ্ধা বন্দোপাধ্যায়  তো ওর গলা শুনে স্তম্ভিত । উনি জানালেন  যে ভ্যাবলকে উনি গান শেখাবেন। চলল কিছুদিন  এইভাবেই এবং স্ববভাবতই গলাও হলো অনেক  পরিশীলিত।
অনেকবার আমাকে এবং  চৌধুরীকে নিয়ে যেতে চেয়েছে তার গ্রামের বাড়ি গুপ্তিপাড়ায়  কিন্তু কোন না কোন  কারণে যাওয়া হয়ে  ওঠেনি।
অনেকদিন পরে আমাদের  অর্জুন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন বিভাগের উদ্যোগে মহাষ্টমীর দিন  হুগলী সফরের টিকিট কাটল। আমাদের দলটাও  গেছে ভেঙে। কেউ শারীরিক কারণে, কেউ বা বিদেশে আবার কেউ  বা পরিবারের কোন  সদস্যের অসুস্থতার জন্য অনুপস্থিত । বাকি রইল অর্জুন আর সহদেব এবং তাদের  পরিবার মানে মোট চার জন। ভোর ছটায়  উপস্থিতি, সুতরাং ঠিক পাঁচটায় রওনা দিয়ে পৌনে ছটায় রবীন্দ্র সদন পৌঁছে গেলাম ,মনে পড়ে গেল শৈশবের কথা যখন কবির জন্মোৎসব উপলক্ষ্যে নামী শিল্পীদের গান শুনতে আসতাম।এখন বহুদিন পর এসেছি যখন রবীন্দ্র সদন  তার গৌরব অনেকটাই হারিয়েছে নন্দনের কাছে।ঐসময়ে ছিলনা নন্দন যার ফলে আমাদের কাছে রবীন্দ্র সদন ই ছিল প্রথম প্রেমের মতো মিষ্টি।আতিথেয়তায়  কোন  ত্রুটি নেই,  যাওয়া মাত্র ই চা, বিস্কুটের আপ্যায়ন আমাদের মতো হাজির হওয়া গুটিকতক লোকের  কাছে। পাশেই একটা বড় ভলভো বাস দাঁড়িয়ে আছে আমাদের  হুগলী সফরের জন্য কিন্তু এখনও বহু মানুষের আসা বাকি। সুতরাং ঠিক সময়ে যে বাস ছাড়বে না এটা নিশ্চিত । সদন প্রাঙ্গনে ছাতিম গাছটা  ফুলে ভরে গেছে  আর একটা মিষ্টি গন্ধের রেশ আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। পাশেই একটা বড় বট গাছ। মোবাইল ক্যামেরা তার দিকে তাক করতেই একটা দারুণ সুন্দর  জিনিস চোখে পড়ল। জুম করতেই দেখি বটগাছের ফুল । জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই জিনিসটা পড়ল চোখে।  ধরে রাখলাম ক্যামেরায় । একটু বিরক্ত ই বোধ করছিলাম সময়ানুবর্তীতা না থাকায় কিন্তু প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য্য  ভুলিয়ে দিল। বাস যাত্রা শুরু করল ঠিক সাতটা বেজে পাঁচ মিনিটে । বিদ্যাসাগর সেতু ধরে বাস চলতে লাগল শ্রীরামপুরের দিকে। ওঠা মাত্র ই একটা বেশ বড়সড় বাক্সে সফরের প্রথম উপহার উদ্যোক্তাদের  তরফ থেকে এবং  সঙ্গে একটা জলের বোতল। আমাদের বিরক্তি উদ্যোক্তাদের আতিথেয়তায় দূর হয়ে গেল । খাবারের গুণমান যথেষ্ট ভাল । অনেক জিনিস আছে, সামান্য কিছু খেয়েই বাক্স বন্ধ করে উপরে রাখা হলো। খানিকক্ষণ পরেই পৌঁছে গেলাম একসময় ওলন্দাজ উপনিবেশ শ্রীরামপুর । মনে পড়ে গেল উইলিয়াম কেরী, জোসুয়া মার্সম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ডের কথা যাঁরা অগ্রনী ছিলেন খ্রীষ্ট ধর্ম প্রচার এর  সঙ্গে এদেশে শিক্ষা প্রসারে । ১৮০০ সালে ১০ই জানুয়ারী  তাঁদের  প্রেস থেকে বেরোয়  সমাচার দর্পণ। সেই ঐতিহাসিক বিরাট হলে বসার ব্যবস্থা । একটু হাত পা ছাড়িয়ে নিয়ে চা খেয়ে টোটোয় চড়ে শহর পরিক্রমা। বাবা একসময় শ্রীরামপুর কলেজে পড়েছিলেন; সুতরাং  কলেজটা না দেখলে মনে আক্ষেপ থেকে যেত। গাইড মশায়ের অনুমতি নিয়ে  কলেজটা দেখে এলাম। গঙ্গার ধারে বহু পুরনো শহর, আধুনিকতার ছোঁয়া সেভাবে লাগেনি। কলেজের গেট বন্ধ থাকায় ভিতরে যাওয়া হলো না, বাইরে থেকেই এক ঝলক চোখের দেখা আর  মনে করার চেষ্টা  যে এখানেই বাবা, মিঠালাল কাকারা( বাবার মুখে শোনা) পড়তেন । চলে এলাম রাজবাড়ির পূজো দেখতে। রাজবাড়ির  সেই জাঁকজমক আর  নেই, তারাও আমাদের মতন ই ছাপোষা হয়ে গেছেন কিন্তু  তবুও রাজবাড়ি  বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাথায় মুকুট কোমরে ঝোলানো  তলোয়ার আর মণিমানিক্য  খচিত রাজপোষাক। দালানের স্তম্ভগুলো এখনও  যেন বুক  ফুলিয়ে বলে আমরা আছি। ওখান থেকে  যাওয়া  হলো শতাব্দী প্রাচীন  গোস্বামী বাড়ির  পূজোয়। ওখানে আমাদের  অঞ্জলি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল  যার ফলে আমরাও খুব খুশী হয়েছিলাম। এর পর যাওয়া হলো শেওড়াফুলি রাজবাড়ির পূজো দেখতে। এখানে চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়। কয়েক বছর আগে ডায়মণ্ড হারবারের দিকে এক প্রাচীন  বাড়ির  পূজো  দেখতে  গিয়ে একটু  অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সামনে পড়ে গিয়েছিলাম। সেখানে বলি দেওয়া হয়। কোনরকমে অন্যদিকে পালিয়ে গিয়ে ঐ দৃশ্য থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলাম । এরপর আমাদের  গন্তব্যস্থল বাঁশবেড়িয়ার  হংসেশ্বরী মন্দির । দারুণ  সুন্দর  মন্দিরটির  রক্ষণাবেক্ষণের ভার সরকার নেওয়ায় একটু উন্নতি চোখে পড়ল কারণ উপযুক্ত দেবোত্তর  সম্পত্তি এবং ট্রাস্ট না থাকলে এই পুরনো দিনের  পূজোগুলো ধীরে ধীরে  অবলুপ্ত হয়ে যাবে। সরকারের ক্লাবগুলোতে অনুদান  বন্ধ রেখে এটা ভেবে দেখতে পারে তবে ক্লাবগুলোতে অনুদান দেওয়া  মানে ভোটের সময় তাদের হয়ে প্রচার  করা এবং  ভোটবাক্সে তার প্রতিফলন ঘটানো। এরপর যাত্রা শুরু  গুপ্তিপাড়ার পথে। খানিকক্ষণ চলার পর এলাম সেখানে। এসে পৌঁছলাম  বৃন্দাবনচন্দ্র মঠে। এখানে চারটে মন্দির আছে। বৃন্দাবনচন্দ্র ও কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির  আটচালার কিন্তু  রামচন্দ্র মন্দির  একচালার। পোড়ামাটির  কাজ দেখার  মতন। এই মঠের চতুর্থ  মন্দির চৈতন্যদেবের  মন্দির সবচেয়ে  পুরনো । মনটা ভরে গেল এক অপূর্ব পবিত্রতায় । ওখান থেকে হাটখোলা পাড়ায় সেনবাড়ির শতাব্দী প্রাচীন দুর্গা পুজো দেখা হলো।সেনবাড়িতে একটা  অদ্ভূত জিনিস  চোখে  পড়ল ঝুলন্ত অবস্থায়। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে ওটা না কি তিমি মাছের শিরদাঁড়া । বহুদিন আগে তাঁদের  পূর্বজরা না কি ঐ মাছ শিকার করেছিলেন এবং  তাঁদের  শৌর্যের  প্রতীক হিসেবে তিনি দালানে ঝুলছেন। এবার দুপুর বেলায় খাবার ব্যবস্থা । যেমন খাবারের  গুণমান তেমন ই সুস্বাদু রান্না । সর্বোপরি আতিথেয়তা অতুলনীয় । খাওয়া দাওয়ার পর একটু দূ্রেই তেলিপাড়ায় কনকদূর্গার মন্দির দর্শন করে ফেরার পালা।
গুপ্তিপাড়ায় খোঁজ করলাম  কোন বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার যাঁরা ঐ মাস্টারমশাই বা ভ্যাবল সম্বন্ধে কোনও  খবর দিতে পারেন । কিন্তু  না, পেলাম না ঐ অল্প সময়ের মধ্যে । ভ্যাবল আমাদের  ছেড়ে পাড়ি দিয়েছে  না ফেরার  দেশে দুবছর আগে চৌঠা জুন কিন্তু রেখে গেছে তার গুপ্তিপাড়াকে। মনটা খুব খারাপ  হয়ে গেল  এই ভেবে  যে কতবার হাজার অনুরোধেও তার শৈশবের গ্রামে  আসতে  পারিনি  আর আজ যখন  এলাম তখন  গুপ্তিপাড়া ভ্যাবলশূন্য। আমার জানা ছিলনা যে এরা গুপ্তিপাড়ায় আসবে,  জানতে পারলে  হয়তো আসতাম না।

Thursday, 25 July 2024

চুল, দাড়ি ও গোঁফ

নাম যদিও  আলাদা কিন্তু গোত্র সব এক। অ্যাপোলো হাসপাতালে ডাক্তার বাবুর অপেক্ষায় বসে থাকতে হচ্ছে ঘন্টার পর ঘন্টা কারণ তিনি যথেষ্টই ওজনদার  এবং তাঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে বেশ কালঘাম ছুটে যায়। অবশ্য সমস্ত নামী ডাক্তারদের জন্যই এই অপেক্ষা করতেই হয় কারণ তাঁরা শুধু ভাল ছাত্র ই নন, বহু পরিশ্রম করে তাঁদের ঐ জায়গায় পৌঁছতে হয়েছে। সুতরাং তাঁদের দেখাতে গেলে তো এইটুকু কষ্ট করতেই হবে। কিন্তু সময় তো কাটতেই চায় না। সুতরাং নেই কাজ তো খই ভাজ, লোকজনের চুল, দাড়ি, গোঁফের দিকে নজর পড়ল। সঙ্গে কেউ থাকলে গল্পগুজব করে সময়টা কাটানো যেত।

চুল, দাড়ি, গোঁফের অগ্রজ হচ্ছে চুল। জন্মের সাথে সাথেই তিনি  সঙ্গের সাথি এবং দাড়ি বা গোঁফ তার তুলনায় বয়সে অনেক ছোট । একটা বয়সের পর তারা ধীরে ধীরে আসেন। এদের  প্রকারভেদ মানুষের চেহারাই পাল্টে দেয়। চাঁচরকেশী তো আজকাল  চোখে খুব কম পড়ে আমাদের দেশে কিন্তু আফ্রিকার লোকজনের মধ্যে এর আধিক্য। সেইরকম মেয়েদের মধ্যেও ঢেউ খেলানো চুল খুব কমই  চোখে পড়ে। যাদের  থাকে তারাও সেলুনে গিয়ে তাকে নানা পদ্ধতিতে পকেট থেকে বেশ ভাল পয়সা খরচ করে সোজা করে আসে। স্বাভাবিক চুলের  সৌন্দর্য্যটাই গায়েব।  তা কি আর করা যাবে। চুল তোমার,  পয়সা তোমার, চাহিদাও তোমার।  অতএব হাওয়া উঠলে হাওয়াতেই গা ভাসিয়ে দাও। আমাদের  আদিবাসীদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে নিকষ কালো কষ্টিপাথরের চেহারার মধ্যে উজ্জ্বল দুটো চোখ আর শ্বেতশুভ্র দাঁত লেপাঝোপা নাকের খামতিকে ছাপিয়ে চোখ টানে। অদ্ভূত এক সরলতা তাদের  ট্রেডমার্ক। কিন্তু শহর কলকাতায় তো সেই সৌন্দর্য তো চোখে পড়েনা। নানাধরণের লোকজন লাউঞ্জে  বসে আছে, আর আমার চোখ পরিক্রমা করে চলেছে এক মাথা থেকে আরেক মাথায়। কারও টাক( টাকেরও প্রকারভেদ) আবার কারও সাদা চুলের মাথা তাঁদের  ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করছে আবার কারও চুলে কলপ করে বয়সটাকে প্রাণপণে ধরে রাখার  চেষ্টা আবার  কারও মাথায় রঙবেরঙের পাখি যেন বাসা বেঁধেছে। মেয়েদের মধ্যে বেশিরভাগের ই চুল ঘাড়ের কাছেই শেষ  হয়েছে ,একটা ক্লিপ কিংবা গার্ডার দিয়ে অনুশাসিত,  এদিক ওদিক  হবার  যো নেই। হাঁটু ছাড়িয়ে লম্বা চুলের  গোছা খুঁজতে গেলে বোধহয়  গ্লোবট্রটার হতে হবে অথচ কিছুদিন  আগেও অনেক মেয়েরাই এই অপরূপ  সৌন্দর্য্যের অধিকারিনী ছিলেন।  আজকাল মেয়েদের বাইরে বেরোতে  হয়, কেশবিন্যাসের  সময় কোথায়? আগে মা বা কাকিমারা চুল যত্ন করে বেঁধে দিতেন,  সুতরাং সেটা সম্ভব হতো কিন্তু আজকের দিনে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে সেটা আকাশ কুসুম।  মাকে ও বেরোতে হচ্ছে, মেয়েকেও  বেরোতে হচ্ছে, অতএব বিদায় কর লম্বা চুলকে। বিউটি পার্লারে গিয়ে ছেঁটে এস। নিজেকে ঐ লম্বা চুলের কসরত করতে গেলে বালিশের  উপর চুল বিছিয়ে জট ছাড়াতে  হতো, তারপর তো খোঁপা বাঁধা। সময়ের সাশ্রয় করতে চল বিউটি পার্লার। তবু আজকের  দিনেও  দক্ষিণ ভারতের  রাজ্যগুলিতে মেয়েদের এইধরণের কবরীবিন্যাস দেখা যায়। যাই হোক ফিরে আসা যাক অ্যাপোলো হাসপাতালের লাউঞ্জে।

দাড়ি গোঁফ তো একচেটিয়া পুরুষদের অধিকার।  চাপ দাড়িওয়ালা বাঙালির খোঁজ  পাওয়া কঠিন  কারণ পেটরোগা গ্যাস অম্বলে ভোগা  খিঞ্জিবি শরীরে  একদমই  বেমানান যেটা পাঞ্জাবিদের মধ্যে একচেটিয়া।  লম্বা চওড়া শরীরে ওটা মানায়। আমাদের  বাঙালিদের মধ্যেও  যাঁরা ঐ ধরনের চেহারার অধিকারী তাঁরাও  কেউ ঐরকম  বীরত্ব ব্যাঞ্জক দাড়ি রাখেন না, রাখেন তাঁরা ইন্টেলেকচুয়াল  ফ্রেঞ্চকাট  দাড়ি যেখানে গোঁফ এবং দাড়ি ঠোঁটকে ঘিরে রেখে তাঁদের  ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করে। হাসলেও দাড়ি গোঁফের বৃত্তও  মাত্রা ছাড়ায় না। কারও  গোঁফ বাঙলার বাঘ স্যার আশুতোষের মত ঝোলানো আবার কারও সরু গোঁফ শেষ হবার মুখে একটু ঊর্ধগামী, কেমন যেন  একটু ঔদ্ধত্যপূর্ণ।  কারও গোঁফ  আবার সরু কিন্তু কথাই  বলুক আর না ই বলুক যেন মনে হয় সদাই হাসছে। চওড়া গালপাট্টা গোঁফ জুলফির সঙ্গে মিশে দীর্ঘদেহী চেহারাকে আরও পরাক্রান্ত করে তুলেছে সেইরকম  গোঁফ  আমাদের  বাংলায় বিরল। জয়পুরে বন্ধুর  ছেলের  বিয়েতে গিয়ে এইরকম এক বীরপুরুষের দেখা পেয়েছিলাম।  প্রায় সাতফুট লম্বা চেহারার সঙ্গে মানানসই গোঁফ দেখা একটা আলাদা অভিজ্ঞতা। বাঙালিসুলভ বা বাংলায় থাকা অন্য প্রদেশের লোকজন যাঁরা প্রায় বাঙালি হয়ে  গেছেন তাঁদেরও দেখলাম  বাঙালি ধাঁচের ই গোঁফদাড়ি। ইতিমধ্যেই  ডাক পড়ে গেল আমার,  প্রেসক্রিপসনের ফাইল নিয়ে বড় ডাক্তারবাবুর চেম্বারে ঢুকে পড়ায় আর চুল, দাড়ি গোঁফের বিচার  করা গেলনা কিন্তু নয় নয় করে ঘন্টা পাঁচেক সময় যে কি করে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না।