Tuesday, 6 May 2025

ঝড় উঠেছে

ঝড় দেখার অভিজ্ঞতা প্রায় সবার ই রয়েছে ।তবে এই অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন রকম এবং একই বয়সের লোকের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন লোকের অভিজ্ঞতা বিভিন্ন। মফস্বলের লোকজন যেখানে গাছপালার আধিক্য বেশী সেখানকার লোকজন যেভাবে ঝড়ের উপস্থিতি বুঝতে পারে, কংক্রিটের জঙ্গলে ভরা শহরের লোকজন  সেভাবে টের পায়না ।

ঝড়ের কথা উঠলেই শৈশবের দিনগুলো মনে পড়ে যায়। মায়ের চোখ এড়িয়ে  বন্ধুদের সঙ্গে আমবাগানে যাওয়া এবং ঝড়ের সঙ্গে সঙ্গে  ঘাড়ে মাথায় চড়বড় করে আম পড়া এবং  পকেট ভরে গেলে জামার কোঁচড়ে (তখন লম্বা হাফ হাতা শার্ট  গরমে পরা হতো এবং  তখন টি শার্টের চল ছিলনা)  আম ভরে পরে ভাগ করা হতো বন্ধুদের মধ্যে। সে এক আলাদা আনন্দ ই ছিল। বাগানের মালির চোখ এড়িয়ে আম চুরি করে খাওয়ার  যে আনন্দ তা ভাষায়  বর্ণনা করা যায়না। আস্তে আস্তে বড় হওয়া, উঁচু ক্লাসে ওঠা, মেয়েদের সামনে নিজেকে স্মার্ট দেখানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা( কারণ কোন মেয়েই ঘুরেও দেখেনি) কিন্তু সেই  সময়ের ঝড়কে  ভালবাসার টান কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। ঝড় উঠেছে, চারিদিকে ধূলোয় ধূলোময়, ধূলোটাও উঠছে চক্রাকারে উপরের দিকে  তারপর এদিক থেকে  ওদিক,  চার বন্ধু মিলে  সাইকেল  নিয়ে  ঝড়ের পরিক্রমায় বেরোনো। চোখে মুখে ঢুকছে ধূলো, হাঁ করছিনা কেউ মুখে ধূলো ঢুকে যাবে বলে। এদিকে ওদিকে  টিনের চালার টিন উড়ে গিয়ে ঘরকে করছে বেআব্রু, আর তারই মাঝে চার বন্ধু সাইকেল  চালিয়ে যাচ্ছে  ঝড়ের পরিক্রমায় । প্রায় তিন কিলোমিটার ঝড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে স্টেশন সংলগ্ন দেবুদার দোকানে বসা এবং গরম বোঁদের সংহার--- সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা । আজকালকার ছেলেমেয়েরা  ক্যালরি নিয়ে চিন্তিত আর ঐ সময়ে সবাই বোঁদে এবং  যে দোকানের যা ভাল মিষ্টি তা চেখে চেখে বেড়াতাম এবং এখনও  পর্যন্ত  সেই রকম অসুস্থ না হয়েও চালিয়ে যাচ্ছি। আসলে ছোটবেলার চুরি করে আম যারা না খেয়েছে তারা সেরকম ডাকাবুকো  হতে পারেনি। ধীরে ধীরে  স্কুলের  গণ্ডি ছাড়িয়ে কলেজে ঢোকা মানে পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে  ডেঁপোমি করা কিন্তু  আশ্চর্যের ব্যাপার যে এই চারজনই  কেউ না খেল সিগারেট  বা কেউ  দিল না ইতিউতি উঁকি । ঝড় এদের জীবনে সামান্যতম রেখাপাত ও করতে পারল না। কলেজ  পেরিয়ে কেউ বা চাকরি, কেউ বা ব্যবসা আবার কেউ বা চলে গেল  উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে । দীর্ঘ দিন ছাড়াছাড়ি কিন্তু মনটা যেন কেমন টনটন করে ওঠে বন্ধুদের জন্য, হাঁকপাঁক করে ওঠে  শৈশবে ফিরে  যেতে,  সেই সাইকেল নিয়ে ঝড়ের মধ্যে দিশাহীন  হয়ে ঘুরতে শুধু ঝড়কে উপভোগ  করার জন্য।

এখন সবাই জীবনের  শেষ প্রান্তে উপনীত। এখনও  ঝড় আসে তবে সেই ঝড়কে উপভোগ  করার প্রথাটাও গেছে পালটে। আকাশটা কালো হয়ে এসেছে, মুখ তার ভার, মাঝে মাঝে  দমকা হাওয়ায় জানলা দরজাগুলো দড়াম দড়াম করে পড়ছে ছিটকিনি  না লাগানোর  জন্য, পাখিগুলো হঠাৎই  ঝটপটিয়ে  উড়তে শুরু  করল নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় কিন্তু এলোমেলো হাওয়ায় গন্তব্যস্থল  বদলে যাচ্ছে  কিন্তু তাদের পৌঁছতেই  হবে নির্দিষ্ট  বাসস্থানে যেখানে তার বাচ্চারা রয়েছে । সব জীবজন্তুর ই তার বাচ্চাদের  প্রতি যে স্নেহ তা বোঝা যায় প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে, যেমন প্রকৃত বন্ধু বিপদের সময়ই বোঝা যায়। বাড়িতে শুধু বুড়োবুড়ি। জানলা দরজাগুলো  ভাল করে লাগিয়ে ব্যালকনির  শাটার টেনে দিয়ে  ঝড়কে করছে উপভোগ । এক সময় যখন ছিল বেপরোয়া মনোভাব  আজ তা অনেক স্তিমিত  কিন্তু ঝড়কে উপভোগ করার লোভটা যায়নি। সব জানলা দরজা লাগিয়ে ঝড়কে আমি করব মিতে,  ডরব না তার ভ্রূকুটিতে গান গাইতে  তো কোন আপত্তি নেই,  তাই নয়? 

No comments:

Post a Comment