Saturday, 17 May 2025

দীনবন্ধু মোটর ওয়ার্কস

কলকাতা থেকে এনবিএসটিসির বাসে বহরমপুরের পথে। মাঝে রাস্তাটা খুব খারাপ  থাকায় পৌঁছতে প্রায় ছঘন্টা লেগে গেল ।বিষ্ণুপুর কালীবাড়ির মোড়ের কাছে  এক বিশাল জ্যাম। বাড়ি পৌঁছতে এমনিতেই দেরী হয়েছে, তার উপর বাড়ির গোড়দোরায় এসে এমন জ্যামে মেজাজটা হয়ে গেল তিরিক্ষি। নেমে পড়ল কল্যান, ওখান থেকে  হেঁটেই মেরে দেবে। এখন চাকাওয়ালা ট্রলি ব্যাগের কল্যাণে স্যুটকেস বইতে হয়না, কুলি মজুরদের  পেটে লাথি  পড়েছে এই ট্রলি ব্যাগের জন্য।  অনেকেই নেমে হেঁটে চলে যাচ্ছে। কল্যান নামতেই হঠাৎই একটা লোহার মতন শক্ত হাত তার কাঁধে পড়ল, বলে উঠল আরে কলু না? কল্যানকে তার ছোটবেলার  বন্ধুরা সবাই কলু বলে ডাকত। কিন্তু এতদিন পর সে আসছে নিজের  শহরে, এখানে তাকে ডাকনামে কে ডাকে?  ঘাড়  ঘুরিয়ে  দেখতেই সে দেখে একটা গাঁট্টাগোট্টা কালো কুচকুচে লোক প্রায় তারই বয়সী কিন্তু মাথায় বেশ জমিয়ে টাক পড়েছে তাকে গায়ে হাত দিয়ে  ডাকছে। কলু পড়াশোনায়  বেশ ভাল ই ছিল এবং  পাশ করার পর মোটামুটি  ভাল চাকরি করায়  চেহারায় বিশেষ  কিছু পরিবর্তন  হয়নি‌ কিন্তু যে গায়ে হাত  দিয়ে  ডাকল তাকে তো সে প্রায় চিনতেই পারছে না। 
আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারছি না, একটু বলবেন আপনার পরিচয়? 
আরে আমি দীনু, দীনবন্ধু মজুমদার,  তোর সঙ্গে  একসাথে একই  সেকশনে পড়তাম কৃষ্ণনাথ কলেজ স্কুলে । ক্লাস  সেভেনে  পাশ করতে না পারার জন্য বাবা আমাকে আর পড়ালো না, বাবার সঙ্গে মোটর গ্যারাজেই হাত পাকালাম, আর আমার  ভাই জয়ন্ত পাশ করল বলে বাবা ওকে পড়ালো। ও পাশ করে কলেজ থেকে  গ্র্যাজুয়েট হয়ে ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টে কাজ  করছে আর আমি বাবা চলে যাওয়ার পরে এই গ্যারাজ সামলাচ্ছি।  মনে পড়ল অনেকদিন আগের কথা। ওকে সবাই কালবাউস বলে ডাকত । খুবই  ডাকাবুকো  টাইপের। পড়াশোনায় বিশেষ দরের ছিলনা বটে  কিন্তু  বাবার সঙ্গে ছোটবেলা থেকে মোটর গ্যারাজে কাজ  করে সে একজন নামকরা মিস্ত্রি এবং  বাবার গ্যারাজটাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে সে এক নামকরা গ্যারাজের মালিক। বহু লোক  কাজ করছে, অনেক  গাড়ি ও বাস  দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। ধীরে ধীরে  মনে পড়ছে সব পুরনো‌ দিনের কথা। সাইকেল  চালিয়ে  ও আমাদের  ঐ রাজবাড়ির মতন স্কুলের দোতলা থেকে  নীচে  নামত। স্যারেরা অনেকবার  বারণ করা সত্ত্বেও  সে শুনত না, তার সাইকেলে কন্ট্রোল এতটাই অসাধারণ  ছিল। গায়ে জোর ছিল সাধারণের তুলনায় অনেক বেশী  আর মোটর গ্যারাজে কাজ করার জন্য হাতগুলো যেন লোহা। কিন্তু এইরকম ছেলেদের  মনটা থাকে খুবই  নরম। নিজেরা পড়াশোনা করতে না পারার জন্য তারা কিন্তু  পড়াশোনায় ভাল ছেলেদের খুব  সম্মান করতো। কলু দিল্লী আই আই টিতে চান্স পাওয়ার পর যখন টাকার অভাবে  পড়তে পারেনি তখন ঐ দীনুই তাকে বলেছিল ," কলু, তুই  যা পড় গিয়ে, আমি তোর পড়ার খরচ জোগাব। তারপর তুই যখন বড়  হয়ে যাবি তখন আমার কথা ভাবিস।" মনে পড়ে গেল কলুর সেই পুরনো দিনের কথা । বড় মাটির ভাঁড়ে দুকাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে, পেঁয়াজি আর আলুর চপের সঙ্গে মুড়ি নিয়ে দুই ছোটবেলার বন্ধু স্মৃতিচারণ করছে আর গ্যারাজের সব লোকজন হাঁ করে দেখছে তাদের। তাদের মালিককে তারা কখনো এইভাবে প্রাণখুলে গল্প করতে দেখেছে বলে তাদের মনে পড়েনা। কলুর চোখে সেই কালো কুচকুচে কোঁদা চেহারায় ঝকঝকে সাদা দাঁত আর ভীষণ জ্বলজ্বলে দুটো চোখ অনেকটা নিগ্রোদের মতো সেই কালো মানিক বা কালবাউস আজ মাথার চুল অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে কিন্তু  মনটা তার আজও শিশুর মতোই রয়েছে । 
গ্যারাজ অন্ত প্রাণ  দীনু আজ বহু লোকের  অন্নসংস্থান করছে। নিজে  বিয়ে থাওয়া করেনি। জয়ন্তর ছেলেমেয়েরাই তার নিজের  ছেলেমেয়ে আর এই বিশাল গ্যারাজের লোকজনদের পরিবার ই তার নিজের পরিবার। 
এবার উঠি রে দীনু, বলে বাড়ির দিকে যাওয়ার জন্য একটা রিক্সায় উঠল কলু। ভাবছে লোকে পড়াশোনা কর পড়াশোনা কর বলে পাগল করে দেয়  কিন্তু তারা নিজেরা এত ভাল করে পড়াশোনা করে কি করেছে? একটা ভাল চাকরি, তারপর বিয়ে সংসার  কেবল নিজেদের  নিয়েই শশব্যস্ত, আর পাঁচটা লোকের  কতটা উন্নতি করতে পেরেছে?   অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সেরকম কিছু করতে পেরেছে বলে মনে করতে পারলনা কিন্তু সেখানে দীনু ঐ সামান্য  বিদ্যা নিয়েই বহুলোকের পরিবার সামলেছে, দীনু অনেক বড়মাপের মানুষ ।

No comments:

Post a Comment