Monday, 26 September 2022

গরীবের সন্ধানে

পূজো এসে গেছে। চারদিকে  সাজো সাজো রব। এক নিদারুণ  উন্মাদনা সবাইকে কেমন যেন  গ্রাস করেছে। কুচি কাচা থেকে বুড়ো হাবড়া সবাই যেন কেমন  চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন রকম  সমস্যা কিন্তু হিন্দুদের  বিশেষত  বাঙালিদের  সবচেয়ে বড় উৎসব এই দুর্গাপুজো ম্রিয়মান অর্থনীতিকে এক কোরামিন ইঞ্জেকশন দিয়েছে যেন,  চোখ মেলে চাইছে বাঙলার অর্থনীতি।
                     
                   গত দুবছর করোনার প্রকোপে লোক সেরকম ভাবে উৎসব উদযাপন  করতে পারেনি, সাধারণ  গরীবগুর্বোদের অবস্থা তো আরও  তথৈবচ।  চারদিকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের  দুর্দশা ছিল  সীমাহীন। না আছে রোজগার পাতি, না আছে তাদের  ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ভালোমন্দ  কিছু কিনে দেওয়ার সামর্থ্য।  এবছর মায়ের  আগমনের  আগেই করোনা নামক  দৈত্য বিদায় নিয়েছে , অবশ্য একেবারেই  যে আপদ বিদায় হয়েছে তা নয়, নব কলেবরে নতুন নামে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন  কিন্তু টীকার প্রভাবেই হোক আর মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বাড়ার জন্যই হোক তারা এখন  মরিয়া হয়ে গেছে। সমস্ত রাজ্যে দুর্নীতির  রমরমা, এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায় দেখ কিন্তু এ সত্ত্বেও  পূজোর  সংখ্যা বেড়েছে আর তারই সঙ্গে বেড়েছে লোকের  আয় করার ক্ষমতা বিশেষ করে এই সময়। দুর্নীতির নাগপাশে আষ্টে পৃষ্টে বাঁধা সরকারের  নেতা মন্ত্রীরা কিন্তু টিভি চ্যানেলে কোমরবেঁধে ঝগড়া দেখলেই আপ্তবাক্য মনে পড়ে যায় চোরের  মায়ের  বড় গলা। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার উপরতলায় চোর এবং সাধুর কুশল বিনিময় দেখলে মনেই হবেনা যে কিছুক্ষণ  আগেই টিভির  চ্যানেলে এরা প্রায় বাহুযুদ্ধে সামিল হচ্ছিল। আসলে ব্যাপারটা কি,বর্তমান দলে কখন দমবন্ধ  অবস্থা হবে কেউ জানেনা, সুতরাং নতুন  পদক্ষেপে যাতে বিন্দুমাত্র  দুর্ভোগ  না হয়, তার আগাম প্রস্তুতি রাখা সবসময়ই  ভাল। পূজোর বাজেটে কেউ কম যায়না। প্রতিবছর বাজেটের পরিমাণ বেড়েই চলেছে এবং প্রতিটি পূজোরই  পৃষ্ঠপোষক কোন নেতা বা মন্ত্রী। যার যেমন ওজন,  তার বাজেটের ওজন ও সেইরকম।  নেতারা চাপ দেন ব্যবসায়ীদের  আর তাঁরা থোড়াই  নিজের  পকেট থেকে দেন, সুদে আসলে সাধারণ মানুষের পকেট কাটেন।  এর ওপর আছে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা। ফি বছর বাড়ছে পূজোয়  সরকারী অনুদান।  যত পূজো,ততই  অনুদান।  দেশে চাকরির  সংস্থান নেই, যোগ্য চাকরি প্রার্থীকে ঘেঁচুকলা দেখিয়ে অযোগ্য  লোকজনদের উৎকোচের বিনিময়ে চাকরি  দিয়ে  দেওয়া, এ এক অসহনীয়  পরিস্থিতি। ছেলেমেয়েদের মধ্যে পড়াশোনার  চল কমেছে, মাস্টার মশাইদের সম্মান  কমেছে, ফলে ফুলে বেড়েছে শুধু নেতা,মন্ত্রী ও তাঁদের  পারিষদবর্গের। রমরমিয়ে রথের চাকা চালিয়ে যান নেতা, চাকার তলায় পিষ্ট হন সাধারণ জনতা। যত কম  বলা যায় ততই  মানসিক  শান্তি বজায় থাকে। আরে বাবা, এত কথা বলা কেন? খেয়ে দেয়ে চুপ করে বসে থাকতে পারনা? সেটা পারলেই আসবে অপার শান্তি।

গতকয়েক বছর ধরে এক নতুন হুপোৎ হাজির  হয়েছে। সেটা হচ্ছে দরিদ্র জনগণের উপকার করা। কিছু লোকের  এটা বরাবরের অভ্যেস  কারণ তাঁরা হয়তো সেই দারিদ্র্যকে খুবই কাছ থেকে দেখেছেন  কিম্বা তাঁদের যে শিক্ষা প্রাপ্তি ঘটেছে তা সত্যিই খুব সুন্দর। যে কারণেই  হোক না কেন সাধারণ মানুষের কষ্ট  দেখলে তাঁরা স্থির  থাকতে পারেন না এবং তাঁরা সাধ্যমতন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। বহু সংস্থাই আছে যারা বিপদে আপদে সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান এবং এদের মধ্যে রামকৃষ্ণ মিশন এবং ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের  নাম প্রথমেই  মনে পড়ে। এঁরা সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী এবং কোনরকম  নাম কামানোর জন্য  এঁরা কিছু করেন না, এঁদের  কর্মযজ্ঞ বিশাল। এঁরা ছাড়াও  কিছু সংস্থা আছে যারা বিভিন্ন সময়ে সাধারণ জনগণের  পাশে এসে দাঁড়ান। কিন্তু এদের  মধ্যে কতজন নিঃস্বার্থ ভাবে আসেন  তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। এঁরা বিভিন্ন  পেশায় যুক্ত এবং তাঁদের  পেশার  প্রসারের জন্যই  এগিয়ে আসেন।  তাঁদের  দরকার  একটা প্ল্যাটফর্ম  এবং একবার  সেই উঁচুতলার সোপানে উঠতে পারলে আর পায় কে? দুই থেকে চার, চার থেকে আট, এঁদের  খ্যাতি দিনদিন  বেড়ে ওঠে এবং তার সঙ্গেই  বেড়ে ওঠে তাদের ব্যবসায়িক দিক। একটা প্ল্যাটফর্ম  পেলেই সেটা ভাঙিয়ে নানান কায়দায় লোকের  ঘাড় ভাঙা এবং কেষ্টবিষ্টুদের সঙ্গে ওঠাবসার সুবাদে সরকারী, বেসরকারি সুযোগের  সদ্ব্যবহার করেন  এঁরা এবং অধিকাংশ  লোক ই এই জাতীয় মতলববাজ। আর কুম্ভীরাশ্রু বহানোয় এঁদের  জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু এঁরা নিজের গাঁটের  কড়ি থোড়াই খরচ করেন? না, সেই সব হয়ে গেছে প্ল্যাটফর্ম  পাওয়ার আগে। এখন  ধীরে ধীরে সূতোটানার পালা এবং যা খরচ হয়েছে তা সুদে আসলে উঠিয়ে আনা। এঁরা ফটোশুটে  খুবই পারদর্শী এবং এঁদের  বাহন এই গরীব  জনগণ। সুতরাং, গরীব  খোঁজ।  আর এই গরীব  খোঁজার প্রতিযোগিতায় সামিল  হন এই জাতীয় বহুলোক।  আর এই তথাকথিত  গরীবদের ও পোয়াবারো। এরা একবার  এই সংস্থা আর একবার  ওই সংস্থায় মুখ দেখায় এবং তাদের  কাছ থেকে প্রাপ্ত সামগ্রী বাজারে বেচে দেয়। শীতের  সময় যদি একই মানুষ চারটে কম্বল পায় তারা কি চারটে কম্বল গায়ে দেবে না একটা রেখে বাকি তিনটে বিক্রি করবে? আর এই বিতরণের  সময়  পেটোয়া ফটোগ্রাফার  ফটাফট ছবি তুলে বিভিন্ন  জায়গায় পাঠিয়ে দেয় এবং কেল্লা ফতে।এই প্রক্রিয়ায়  সামিল  হয়েছে বহু  ব্যাঙের ছাতার  মতো গজানো সংস্থা এবং বহু  গজুদারা। আর এই তথাকথিত  গরীবরাও আছে খোশ মেজাজে। বহু সংস্থা আবার  এই তথাকথিত  গরীবদের উন্নয়নের জন্য  বিদেশ থেকে প্রচুর টাকা পায় এবং তার  বহুলাংশই  নিজেদের বিলাস ব্যসনে ব্যয় করে এবং নামমাত্র  কিছু গরীবদের  জন্য বরাদ্দ করে। ব্যানার লাগানো, ফেস্টুন লাগানো খান চারেক গাড়ি থেকে কিছু তথাকথিত গরীব দরদী লোক নেমে, " অ্যাই এখানে তোরা কজন আছিস? জামাটা খুলে একটা  নোংরা বা ছেঁড়া গেঞ্জি পড়ে এখানে এসে লাইন  দিয়ে দাঁড়া।" কেউ বা ছেঁড়া লুঙ্গি বা গেঞ্জি আবার কেউ বা আদুর গায়েই খালি পায়ে এসে লাইনে দাঁড়ালো এবং একটা দামী গাড়ি থেকে একটু হিরো গোছের লোক, চোখে দামী সানগ্লাস,  পায়ে হেব্বি জুতো নেমে এলেন  এবং একজন পার্শ্বচর  একটা বড় গোছের  সাদা বাক্স এবং একটা মিনি বোতল তাঁর হাতে দিতে থাকল এবং তিনি সেই লাইনে দাঁড়ানো গরীবদের  হাতে দিতে থাকলেন  এবং  ফটাফট  ছবি উঠতে থাকল।  সবাইকে দেওয়া হলে এক আত্মতৃপ্তির হাসি ও ঢেকুর  তুলে তিনি গাড়িতে উঠে  পড়লেন। সম্প্রচারের গাড়িটাও তাঁর গাড়ির  পিছু পিছু চলে গেল  এবং এই সঙ্গেই সাঙ্গ হল' গরীবদের  উন্নয়নের  পালা । 

সিরিয়ালের শুটিং না  সত্যি সত্যিই কোন জনহিতকারি সংস্থার দান সেটা বোঝা গেলনা কিন্তু একটা জিনিস প্রকট হলো যে সবটাই  মেকি, লাভের  মধ্যে ঐ কয়েক জন গরীবদের অন্তত একদিন  ভাল মন্দ খাওয়া দাওয়া। কবে বন্ধ  হবে এইরকম  চটজলদি দারিদ্র্য  দূর করার কৌশল? যদি সত্যিই  কিছু জনহিতকর কর্ম করতে হয়, তবে এমন কিছু করা দরকার  যাতে লোকজন  নিজের  পায়ে দাঁড়াতে পারে এবং তাদের  ভিক্ষার আশ্রয় না নিতে হয়। ভিক্ষার দান নিতে নিতে তাদের  কর্মক্ষমতা একদম শূন্যে এসে ঠেকে এবং কোন  কাজই তাদের  করতে ইচ্ছা করেনা। কায়িক  পরিশ্রমের ফসল একবার  উঠতে শুরু করলে হাত পাততে  তার লজ্জ্বা বোধ হবে এবং আমরা সেইদিনের প্রতীক্ষায় থাকব। যেদিন  এরা মাথা তুলে দাঁড়াতে শিখবে সেইদিন এই ভেকধারী সমাজসেবীও উধাও  হয়ে যাবে। আমরা কি একটু চেষ্টা করতে পারিনা?

Wednesday, 10 August 2022

বানপ্রস্থ

পূর্বে প্রচলিত কথা ছিল  পঞ্চাশোর্ধে বনং ব্রজেত অর্থাৎ  পঞ্চাশ  পেরোলেই রিটায়ারমেন্ট ফ্রম অ্যাকটিভ লাইফ। রাজা রাজড়ারা তাঁদের  সাধের সাম্রাজ্য সন্তান সন্ততিদের হাতে ন্যস্ত করে বনে চলে যেতেন এবং বাকি জীবনটা ধর্মকর্মে ব্যস্ত থেকে কাটিয়ে দিতেন। কিন্তু একটা খটকা মনের  মধ্যে থেকেই  যায়। রাজা মহারাজারা সাধারণত পরনির্ভরশীল ছিলেন  অর্থাৎ দাসী বাঁদি বা ভৃত্য পরিবৃত থাকতেন এবং তাঁদের সমস্ত কাজ এই চাকর বাকররাই করতো। তাহলে বনে যাবার পর হঠাৎই  নিজের কাজ নিজেরা করতে শুরু করে দেবেন  এটা ভাবা খুবই কষ্টকর। তাহলে কি তাঁরা সমস্ত  লোক লস্কর সমেত যেতেন আর যদি সেটাই হয় তাহলে সেই লোকদের  থাকার  জন্য কাছাকাছি তাদের  বাসস্থান বা বেঁচে থাকার জন্য  নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের জোগাড় করতে হতো যার অর্থ  আরও একটা জনপদ গড়ে ওঠা । তাহলে বন আর কি করে বন থাকে? এই ধন্দ মেটানোর জন্য ভাবতে বাধ্য  হতে হলো যে ঐ ব্যবস্থাপনাই কি আজকের  বৃদ্ধাশ্রমের ব্লুপ্রিন্ট?  নানাভাবে দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রশ্নের  উত্তর  খুঁজে চলেছি, তাই ভাবলাম  যে কোন সহৃদয়  ব্যক্তি হয়তো আমার অনুসন্ধিৎসা মেটাবেন বা আমার  নিজস্ব  চিন্তাধারাকে তাঁদের  মেধা দিয়ে পরিপুষ্ট করবেন। তবে একটা কথা ঠিক যে রাজা বা রানী সাধারণ জনগণের  মতো হাতে বাজারের থলি ঝুলিয়ে দোকান বাজার  করতে যাবেন আর  চাইলেও ঐ বনবাদাড়ে কে দোকান খুলতে যাবে রাজা রানীর চাহিদা মেটানোর জন্য? এইসব আবোল তাবোল চিন্তা মাথার  মধ্যে ঘুরপাক খায়। তারপর তো শরীর সরাগতের ব্যাপার  আছে। রাজা রানীরাও তো আদতে মানুষ।  তাঁদের ও শরীর খারাপ  হতে পারে। আগে না হয় রাজবৈদ্য ছিল, হুকুম  হলেই নিদান নিয়ে তারা হাজির হতো কিন্তু এই বনে তাদের  বয়ে গেছে থাকতে। তারপর তাঁদের  কেউ মারা গেলে  অপরজন  কি করতেন? শবদেহ করা কি তাঁদের  দ্বারা সম্ভব? এই নিদারুণ  অবস্থা থেকে বাঁচার  একমাত্র  উপায় যে কাছাকাছি কোন  লোকালয়ের   উপস্থিতি এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের  দেখভাল  করার  জন্য  পর্যাপ্ত  লোক লস্কর। মানে আজকের  দিনে পেনশন ভোগী। পেনশনের টাকায় যেমনভাবে  চলা দরকার  তেমনভাবে  চলো।

মাঝে মাঝেই মনে হয় বৃদ্ধাশ্রমে চলে গেলে কেমন  হয় বিশেষ করে যখন  সংসারে খিটিমিটি লাগে। তবে মাঝে মাঝে ফ্যাঁস ফোঁস  না হলে সংসারটা  যেন কেমন  পান্তা ভাত হয়ে যায়। অবশ্য  পান্তা ভাতে পেঁয়াজ,  লঙ্কা ছাতু দিয়ে খাওয়াটাও  একটা ভীষণ  ডেলিকেট খাওয়া আর তার মধ্যে যদি শুকনো লঙ্কা ভেজে মাখা  খাওয়া যায় তাহলে সেটা একটা বিশেষ মাত্রা পায়। সুতরাং মাঝে মধ্যে বৃদ্ধাশ্রমের চিন্তা মাথায় আসেনা  এরকম  নয় কিন্তু ভাল মন্দ  সবকিছু মানিয়ে নিয়ে চলাটাই তো জীবনের আর একটা নাম। কালের গতিতে স্বামী স্ত্রীর  দুজনের মধ্যে কেউ না কেউ তো একজন হয়ে যাবে, তখন  কি করা যাবে? সবাই  তো আর   জেনারেল বিপিন রাওয়াত এবং তাঁর  স্ত্রীর  মতন সৌভাগ্যবান বা সৌভাগ্যবতী নন যে দুজনেই  একসঙ্গে চলে যাবেন।  অতএব  কাউকে না কাউকে একা থাকতেই হবে, উপায় নেই। ছেলে মেয়েরাও  দূরে থাকে , কর্ম ব্যস্ততার মধ্যে তাদের ও নিজেদের  সংসার  ছেড়ে বৃদ্ধ বাবা বা মাকে দেখতে আসাও  সবসময়  সম্ভব  হয়ে ওঠেনা।  তাহলে উপায় কি? ছেলের  সংসার  বা মেয়ের সংসারে কাবাব মে হাড্ডি হয়ে থাকা নতুবা নিজের  বাড়িতেই থেকে অপরের স্মৃতিতে বিভোর  হয়ে থাকা  বা নতুন বন্ধুর  খোঁজে বৃদ্ধাশ্রমের পথে পা বাড়ানো। বন্ধুর  খোঁজে বৃদ্ধাশ্রমের  পথে পা বাড়ানো খুব  একটা খারাপ  কিছু নয় কিন্তু সেখানে গিয়েও যে সমমনোভাবাপন্ন লোক পাওয়া যাবে এমন কোন  নিশ্চয়তা নেই। এছাড়া রয়েছে বৃদ্ধাশ্রমের  নিজস্ব  নিয়মকানুন  যা পছন্দ  না হলেও  মেনে চলতেই হবে যদি ওখানে একান্তই থাকতে হয়। তাছাড়া কর্মীদের  মুখঝামটা যে মাঝেমধ্যেই  শুনতে হবেনা এমন গ্যারান্টিও নেই। সুতরাং গরম  কড়াই  থেকে আগুনের  মধ্যে ঝাঁপ দেওয়ার  কোন মানে  আছে কি? বাইরে থেকে ঝাঁ চকচকে রূপ  দেখে না ভোলা শ্রেয়। নিজের  বাড়িতেই  থাকা এবং পাড়া প্রতিবেশীদের  সঙ্গে সৌহার্দ্য পূর্ণ  সম্পর্ক  বজায় রাখাটাই  সবচেয়ে ভাল।  ভগবানের  দেওয়া দান একটা জীবনের  উৎকর্ষতা তারিয়ে তারিয়ে  উপভোগ  করে কালের নিয়মে ফিরে যাবার  আগে দেহদান করে জীবনের  যতপাপ খানিকটা ক্ষালন করা মনে হয় সর্বোত্তম। নিজের  ছোট পরিসর নিজের  সাম্রাজ্য  মনে করে মন চল নিজ নিকেতনে বলে আমার বিচার তুমি কর তব আপনার করে বলে সুন্দর পৃথিবীকে জানাও বিদায়।

Friday, 5 August 2022

বাস্তুহারা

গল্পের  নামটা উদ্বাস্তু না বাস্তুহারা হওয়া উচিত তা নিয়ে একটু ধন্দে ছিলাম। বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী আমি কখনোই  নই, গড়পড়তার চেয়ে একটু সামান্য  বেশি। ভাবলাম  কোন  বন্ধুবান্ধবদের  কাছে জেনে নেব  সমস্ত  ঘটনাটা বর্ণনা করে কি হওয়া উচিত  নামটা। একটু গভীর ভাবে চিন্তা করে বাস্তুহারা নামটাই দিলাম  কারণ  উদ্বাস্তু কথাটা সাধারণত  ব্যবহার  হয় যেখানে কেউ নিজের  দেশ ছেড়ে যে কোন  কারণেই  হোক পালাতে বাধ্য হয় এবং অন্য  দেশে তাকে আশ্রয় নিতে হয় যেমন  হয়েছিল  দেশভাগের  সময়। বাস্তুহারাদের ক্ষেত্রেও প্রায় সেইরকম ই কিন্তু সেটা দেশভাগের জন্য নয়, কোন  প্রাকৃতিক  দুর্যোগ  হেতু বা কারও অত্যাচারের জন্য  যেখানে তার ফিরে যাবার  সম্ভাবনা থাকে। ধারণা ঠিক  নাও হতে পারে এবং সংশোধনের কথাও মনে থেকে গেল। 

সরকারি প্রকল্পে  যে আবাসনগুলো গড়ে উঠেছিল সেগুলো ঠিক তাৎক্ষণিক  চাহিদার কথা মাথায় রেখে, অদূর ভবিষ্যতে কি হতে পারে সেই কথা মাথায় ছিল  বলে বিশেষ  মনে হয়না। সরকারের কাজ   তখন  ছিল জনগণের  সেবা করা এবং সেটাই হওয়া উচিত কিন্তু উন্নয়নের জন্য যে টাকার দরকার সেটা কিভাবে আসবে তা নিয়ে খুব  গভীর  চিন্তাভাবনা ছিল  বলে মনে হয়না। স্বাধীনতার পর  দেশ গড়ে তুলতে অনেক অর্থের  প্রয়োজন। কিন্তু জনগণের  উপর ট্যাক্স  চাপানো চলবে না, তাদের নিখরচায় বা সামান্য টাকার বিনিময়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা দিতে হবে, গরীবদের জন্য  বিনামূল্যে রেশন দিতে হবে, তাদের বিনামূল্যে মাথা গোঁজার ঠাঁই দিতে হবে, নিম্ন মধ্যবিত্ত , মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের জন্য আবাসন তৈরী করে দিতে হবে এবং তা বিক্রি করা হবে কোন  লাভ  না করেই। বিনামূল্যে বা অত্যন্ত  স্বল্প  মূল্যে শিক্ষার  ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এই বিশাল  কর্মযজ্ঞের  জন্য যে অর্থের প্রয়োজন  তার সংস্থান কি করে হবে সেটাও  তো ভাবার প্রয়োজন।  শুধু টাকা  ছাপিয়ে আর বেসরকারী উদ্যোগপতিদের  উপর ট্যাক্স  চাপিয়ে এটা কতটা সম্ভব সেটা  নিয়ে বিশেষ ভাবনাচিন্তা ছিল বলে মনে হয়না। এর উপর ছিল রাজনৈতিক নেতাদের সাধারণ  মানুষের  ভিতর এক ধারণার  সৃষ্টি করা যে বেসরকারী উদ্যোগপতি মানেই  তারা সাধারণ  জনগণের  শত্রু এবং বিশেষ  চিন্তায় উদ্বুদ্ধ  হয়ে এক নতুন কথার আবিষ্কার   শ্রেণীশত্রু  ও শ্রেণীসংগ্রাম। উদ্যোগপতিদের  কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও জাতীয় কথাবার্তা কতটা ভাল  করেছে তাতে যথেষ্ট  সন্দেহ  রয়েছে। অন্তত  একটা জিনিস  করা সম্ভব  হয়েছে, তা রাজনৈতিক  চেতনা বাড়ানোর  নামে মানুষের  মনে হিংসার বীজ খুব  সুন্দর ভাবে বুনে দিতে পেরেছে এবং উত্তরোত্তর  তা বেড়ে এক বিশাল  মহীরুহের আকার ধারণ  করেছে এবং সেটা আজ বিভিন্ন ভাবে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করেছে এবং কখনো তা জাতিভেদে এবং কখনো তা ধর্মভেদের  মাধ্যমে প্রতিফলিত  হয়েছে। কিন্তু যাঁরা এই বীজ বপন করেছেন  তাঁরা সবজায়গায় সুন্দর ভাবে মিলে মিশে আছেন, একবার  সাপের গালে আর একবার  ব্যাঙের  গালে চুমু খাচ্ছেন। 

ফিরে আসা যাক মূল বক্তব্যে। সরকারী উদ্যোগে গড়ে ওঠা আবাসনগুলো মানুষের বেড়ে ওঠা চাহিদার  সঙ্গে তাল না মেলাতে পারায় সেগুলোর পরিবর্ধনের প্রয়োজন অনুভূত হয়েছে এবং বয়স বাড়ার  সঙ্গে সঙ্গে হাত পায়ের জোর  কমেছে এবং উপরতলায় থাকা লোকজনের লিফটের প্রয়োজন মনে হয়েছে। এই আবাসনগুলো যখন  হয়েছিল  তখন কেউ এই চিন্তা করেননি যে বয়স হলে সবার সিঁড়ি ভেঙে চারতলায় বা পাঁচ তলায় উঠতে কষ্ট  হবে এবং লিফটের  চিন্তা মাথায় আসেনি।  অবশ্য  লিফট করে ওঠা লোকজন মানে এক বিশাল  ব্যাপার এবং নিশ্চয়ই  তারা পুঁজিপতি। মনে পড়ে যখন  জ্যোতিবাবুর হিন্দুস্থান  পার্কের  বাড়িতে  লিফট বসানো হয় তখন  কাগজে কাগজে সমালোচনার  প্রতিবেদনে ছেয়ে গিয়েছিল।  সেইরকম ই সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন  তাঁর চেম্বারের সংলগ্ন  বাথরুম  সংস্কারের তীব্র  সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। হয়তো সকলের মনে আছে যে কারও  বাড়িতে ফ্রিজ থাকলে তাকে বুর্জোয়া শ্রেণীভুক্ত করা হতো এবং আরও  কিছুদিন  পরে যখন  সাদাকালো টিভি এল তখন  যার  বাড়িতে টিভি এল তারা ছাড়া পাড়ার  আর সবাই  সেই ঘরের  আনাচে কানাচে পর্যন্ত  দখল করে নিত। আমাদের  মানসিকতা তখন  এর বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেনি। রেডিও তে মোহনবাগান  ইস্টবেঙ্গল  ম্যাচের ধারাবিবরণী অজয় বসু, কমল ভট্টাচার্য এবং পুষ্পেন সরকারের মাধ্যমে সম্প্রচার  একটা গোটা পাড়ার  লোক একসঙ্গে শুনতো।  সুতরাং বোঝা যায় সাধারণ  মানুষের  কি অবস্থা ছিল। আবাসন গুলোর এক্সটেনশন করার জন্য সবাই এককাট্টা  হয়ে দরখাস্ত  করেছে এবং কর্পোরেশনের স্যাংশনের জন্য  প্রয়োজনীয় অর্থের বহু গুণ অর্থ  বিভিন্ন ধাপে সাম্মানিক মূল্য হিসাবে দিতে হয়েছে।  কিন্তু এ সত্ত্বেও  সমস্ত আবাসিকরা বিভিন্ন  কারণে এই উদ্যোগে সামিল  হতে পারেন  নি এবং বহুতলীয়  এই বাড়িগুলোর ফাঁকা অংশগুলো  খানিকটা  হাঁ করা মড়ার মাথার  খুলির  মতন লাগত। এইরকম ই কয়েকটা ফাঁকা জায়গা কিন্তু আমফানের সময় বহু পাখির  আশ্রয়স্থল হয়েছিল।  যখন  প্রবল ঝড়ে সমস্ত গাছগুলো একের পর এক ধূলিসাত হয়ে যাচ্ছে  তখন ঐ পাখিগুলোর কি দুর্দশা। যখন গাছগুলো সাধারণ অবস্থায় থাকে তখন  রোজ সন্ধেবেলায় পাখিদের  মধ্যে অনবরত ঝগড়া লেগেই থাকে। কাকের সঙ্গে শালিকের বা শালিকের নিজেদের  মধ্যে বা শালিকের সঙ্গে ময়নার  ঝগড়া নিত্যদিনের ব্যাপার  কিন্তু আমফানের  সময় সবাই নিজেদের  ঝগড়া ভুলে একসঙ্গে সবাই আশ্রয় নিয়েছে ঐ মড়ার খুলির  মুখের মধ্যে। শাটার টানা ব্যালকনিতে বসে তাদের  ঐ করুণ অবস্থা লক্ষ্য  করেছি। এক্সটেনশন  না করা ঐ ফ্ল্যাটের  ভদ্রলোক কিন্তু খুবই  মানবিকতা দেখিয়েছেন  ঐ অবস্থাতেও।  প্যাকেট প্যাকেট  বিস্কুট,  ভাত ছড়িয়ে দিয়েছেন তাদের  উদ্দেশ্যে এবং ঐ সময়ে তারাও  ঝগড়া ভুলে নিজেদের  মধ্যে ভাগ করে খেয়েছে। সাধারণত  কাকেদের থাকে দাদাগিরি কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার তারা কিন্তু সব বৈরীতা ভুলে নিজেদের  বাঁচিয়ে রেখেছিল।  আস্তে আস্তে আমফান বিদায় নিল, এখন ঘরে ফেরার  পালা। কি ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে তা নির্ধারণ  করার পালা। বহু গাছই  ভেঙে গেছে ,যে কয়েকটা নিজেদের  বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে  তা সবাইকে স্থান  দিতে অপারগ। এখানে কোন সরকারী সহায়তা নেই , নেই কোন  তার  থেকে দুপয়সা  রোজগার করা, আছে শুধু ঐ কয়েকটা এক্সটেনশন  না করা ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন বাড়ির কার্নিশ এবং গাছগুলো  বেড়ে উঠে ডালপালা বিস্তার  করার অপেক্ষা। এরই  মধ্যে   এক্সটেনশন  না করা ফাঁকা ফ্ল্যাটের দেয়াল উঠতে শুরু হয়েছে আর পাখিগুলো একদৃষ্টে  লক্ষ্য  করছে কতটা উঠল ঐ দেওয়াল এবং  দিন গুনছে ফের বাস্তুহারা হবার  আশঙ্কায়। গাছগুলো তো এখনও  সেইভাবে বেড়ে ওঠেনি যাতে সবার বাসস্থানের  স্থান হয়। হায়, কারও পৌষমাস আর কারও  সর্বনাশ। 

Wednesday, 3 August 2022

অথ যৌধেয় বিবাহ কথা

যুধিষ্ঠিরের নিজের  পছন্দের স্ত্রী দেবিকা যদিও সেটা ঘটকালি  করেই এবং তাদের একমাত্র  পুত্র যৌধেয়। মহাভারতে এদিক সেদিক আতিপাতি করে খুঁজেও যৌধেয়র বিয়ের কথা জানা গেলনা এবং অধুনা যৌধেয়র ও বিয়ের কথা প্রায় সেইরকম পর্যায়েই চলে যাচ্ছিল  কিন্তু ভগিনী দুঃশলার অতি আদরের প্রিয়পাত্র যৌধেয়( আজকের  নুটু) তার পিসির  কথা একদমই  ঠেলে ফেলতে পারলনা এবং তারই সহপাঠিনী এবং দীর্ঘদিনের বান্ধবী ও বহু সুখ দুঃখের সমব্যথী তিতলির  সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলে সবাইকে চিন্তামুক্ত করতে চাইল। এখন জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরকে পায় কে, আনন্দে আত্মহারা এবং তারই সঙ্গে দেবিকাও। অন্য পাণ্ডবরাও খুবই খুশি এই খবরে কিন্তু যুধিষ্ঠির ও দেবিকার কপালে ফুটে উঠেছে চিন্তার  ভাঁজ  কারণ ভীম ও বালন্দারার দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি এবং নকুল ও কারেনুমতীর বিশ্ব পরিভ্রমণ। উপস্থিত  কেবল অর্জুন ও সুভদ্রা  এবং সহদেব  ও দেবিকা। অর্জুনের  সহায়তায় যুধিষ্ঠির তাঁর দুই হাঁটুই  প্রতিস্থাপন  করিয়েছেন  এবং সহদেবের ও অবস্থা তথৈবচ। তিনিও যুধিষ্ঠিরের  পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন এবং এখনও টলোমলো অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন নি এবং ইদানীং কালে অর্জুনের শরীরটাও  বিশেষ  যুতসই  নয়। 

নুটু এবং তিতলি দুজনেই  বাইরে থাকে এবং বর্তমানে তিতলি প্রাগে  পোস্ট ডক্টরেট করতে চলে গেছে এবং নুটু ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে থিসিস  জমা দেবার  উদ্যোগ করছে। তিতলিরা যমজ বোন এবং ওর চেয়ে কিছু সময়ের বড় তিয়াস তার বন্ধু শতদ্রুকে বিয়ে করে ক্যালিফোর্নিয়ায় গুগলে কর্মরত। তিতলির কিন্তু মনোগত ইচ্ছা কোন ইনস্টিটিউটে পড়ানো এবং একই মনোভাব নুটু বা যৌধেয়র। নুটু টাটা কনসালটেন্সির তিনবছরের চাকরির সম্পর্কে ছেদ ঘটিয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে রিসার্চ করতে লেগে গেল  এবং সেই কারণেই তার ডক্টরেট করাটাও একটু দেরী হয়ে গেল। কিন্ত জ্ঞান পিপাসা এমনই একটা জিনিস যা মেটাতে মানুষ সহজলভ্য সুখ ছেড়ে অনিশ্চয়তার পিছনে ধাওয়া করে। ঠিক  সময় বের করে নুটু ও তিতলির জীবনে স্থায়িত্ব আনাটা  একটু গোলমেলে হয়ে যাচ্ছিল  কিন্তু ভগবান  যখন সহায় হন তখন কোন বাধাই তার গতিরোধ করতে পারেনা। তিয়াস এবং শতদ্রু কাজের ফাঁকে একটা ছোট্ট  বিরতি নিয়ে সুদূর  আমেরিকা থেকে তিতলির বিয়েতে যোগ দেওয়ার পরদিনই সন্ধের ফ্লাইটে ব্যাক টু আমেরিকা।  

আজকের  যুগের  ছেলেমেয়েদের  যতই  দেখি ততই  আশ্চর্য  হয়ে যাই। আমাদের  সময় যেন  একটা গদাই লস্করি চাল ছিল, হচ্ছে হবে এইরকম ধারণাতেই মন মজে থাকতো কিন্তু এখন এই জেটগতির  যুগে এই এখানে,  এই সেখানে। কি সুন্দর  টাইম ম্যানেজমেন্ট,  একেবারে টাইট শিডিউল, কোথাও কোন নড়চড় হবার  উপায় নেই। নুটু এসেছে রবিবার,  বিয়ে সারলো সোমবার  এবং অষ্টমঙ্গলা সেরে শনিবার ফিরে যাবে ব্যাঙ্গালোরে থিসিস জমা দেবার জন্য। তিতলিও কয়েকদিন পরেই চলে যাবে প্রাগে তার ইনস্টিটিউটে যোগ দিতে। এরই  মধ্যে সময় করে খুব  ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করে যাচ্ছে এবং তাদের  আশীর্বাদ  পাথেয়  করে নিজেদের চলার জীবন মসৃণ করতে। 

সোমবার বিয়ের পর্ব মিটেছে যৌথ উদ্যোগে সময়াভাবের জন্য। মঙ্গলবার  দুপুরে আরও একদফা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজন এবং তারপরেই ভাঙা হাটের  পালা। তিয়াস ও শতদ্রু পাড়ি দিয়েছে তাদের  কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে। বুধবার আত্মীয়স্বজনের  সঙ্গে দেখা করার পালা। সওয়া ছটা নাগাদ নুটু ও তিতলি নামল ধবধবে একটা সাদা গাড়ি থেকে।তরতর করে উঠে চলে এল প্রাণোচ্ছল এক তরুণ ও তরুণী।  এ কুলুকুলু রবে বয়ে যাওয়া নদী নয় এ ঝরঝর করে ঝর্ণার মতো খুবই  পরিচ্ছন্ন  ও মার্জিত কথাবার্তা। নয় নয় করে কিভাবে ঘন্টা দেড়েক সময় কেটে গেল বুঝতেই  পারলাম  না। " উঠি এবার " শুনে সচকিত  হয়ে উঠলাম। মন চাইছিল ঝর্ণার  গান  আরও  কিছুক্ষণ শোনার কিন্তু উপায় নেই তাদের  অনেক কমিটমেন্ট,  সুতরাং বাধা দেওয়া যায়না। একরাশ আনন্দের  ডালি  উজাড় করে দিয়ে রেখে গেল ঝর্ণার অনুরণন। 

Wednesday, 27 July 2022

ভোম্বল

বছর তিরিশ আগেও  মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত দক্ষিণ কলকাতার  এই উপনগরী আজকের বৃদ্ধাবাসে পরিণত হয়নি। বিভিন্ন বয়সের  নানাধরণের ছেলেমেয়েদের কলকলানিতে গমগম করতো এই উপনগরী। আশির দশকের প্রথমভাগে যখন এই উপনগরী সরকারী প্রকল্পে গড়ে ওঠে তখন এক ঝাঁক বিশিষ্ট  বিদ্বজ্জন ও নানা পেশার কলাকুশলীরা এখানে আসেন এবং তাঁদের  মিলিত প্রচেষ্টায় এই উপনগরী সংস্কৃতির  এক প্রাণকেন্দ্র  হয়ে ওঠে। এঁরা সবাই  শহরের  বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন জায়গায় থাকা পাড়া কালচারে অভ্যস্ত ছিলেন এবং ফ্ল্যাট কালচার আত্মস্থ করতে বেশ খানিকটা সময় নিয়েছিলেন। বাসের রুট তখন এদিকে বিশেষ না থাকায় লোকদের  যাতায়াত করা বেশ সমস্যার মধ্যেই ছিল। ধীরে ধীরে লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগল  এবং শহরের অন্যান্য প্রাণ কেন্দ্রের সঙ্গে সংযুক্তি বাড়তে লাগল  বাস, মিনিবাস ও ট্যাক্সির  কল্যাণে। জমজমাট  হয়ে উঠল এখনকার  অন্যতম বৃহৎ বানপ্রস্থাবাস গল্ফগ্রীন।

তখনকার  যুবকরা  আজ প্রায় বৃদ্ধ। যাঁরা প্রৌঢ় ছিলেন তাঁদের অনেকেই  আজ সেই না ফেরার দেশে চলে গেছেন কিন্তু যাবার  আগে তাঁদের অভিজ্ঞতার ঝুলি উজাড় করে দিয়ে গেছেন  এবং আজকের এই মোটামুটি মধ্যবিত্ত ও বিত্তবানদের জন্য  একটা বাসযোগ্য সংস্কৃতি মনোভাবাপন্ন সোসাইটি  গড়ে তুলতে পেরেছেন। তাঁদের জানাই সশ্রদ্ধ নমস্কার। প্রত্যেক  বাড়িতেই তখন একটা দুটো বাচ্চা ছেলেমেয়ে ছিল এবং  সকাল বেলায় স্কুলের বাসের জন্য  বাবা বা মায়ের  হাত ধরে গুটিগুটি  পায়ে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে এবং জলের বোতল হাতে নিয়ে বাসকাকুর অপেক্ষায় থাকত। বিভিন্ন  স্কুলের  বিভিন্ন বাস,  তাদের  কাকুও  ভিন্ন কিন্তু বাসে উঠাতে আসা মা বাবাদের মধ্যে এক বন্ধুত্বের বাঁধন গড়ে উঠতে থাকল ঐ বাচ্চাদের বাসে তুলতে আসার সুবাদে। কোন বাচ্চার জন্মদিনে চেনাজানা বাচ্চাদের  সঙ্গে বাবামায়েরাও আসতেন এবং ধীরে ধীরে প্রীতির বাঁধন ও বেশ  মজবুত  হতে লাগল। স্কুলফেরত বাচ্চারা বাড়ি ফিরেই একটু খাওয়া দাওয়ার পর বিকেল  হতেই হৈ হৈ করে বেড়িয়ে পড়ত খেলার  জন্য এবং সমস্ত  জায়গাটা তাদের  কলকলানিতে  ভরে উঠত। সমাজ বন্ধন দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়েছিল এবংএকটা খুব  সুন্দর  পরিবেশ  গড়ে উঠেছিল।  ধীরে ধীরে এই বাচ্চারা বড় হতে লাগল এবং তাদের  অনেকেই  আজ শহরের  বাইরে এবং কেউ কেউ দেশের ও বাইরে।কিন্তু তাদের  ছোট থেকে বড় হওয়ার  সময়টা মানে মাঝের পনের বিশ বছর অত্যন্ত আনন্দ মুখর ছিল  এই গল্ফগ্রীন এবং এই সময়টা তুলে ধরাটাই আমার  উদ্দেশ্য। 
বাচ্চাদের  খেলার  সঙ্গে সঙ্গে একটু উঁচু ক্লাসে পড়া ছেলেদের সন্ধের  পরেও বেশ  খানিকক্ষণ  আড্ডা চলত এবং খেলার  চেয়ে বেশী  খেলার  সমালোচনা চলত। সৌরভ তখন ছিল  ওদের আইডল এবং ও বেশী রান করলে এরা এত খুশী,  যে উচ্চগ্রামে আলোচনা হতো , দেখেছিস, দাদা স্টেপ আউট করে বাপি বাড়ি যা বলে কি সুন্দর  স্ট্রেট ড্রাইভ করে ছক্কা লাগাল। কিন্তু অল্প  রানে আউট হলেই বলতে থাকত যে ওর ব্যাটটা  অতটা অ্যাঙ্গেলে স্লাইস না করে একটু শরীরের  কাছে রাখলে ঐরকম  বাজে আউট হতো না। এইসব সমালোচনা বেশ মুখরোচক  হতো এবং কেউ পক্ষে বা বিপক্ষে বলে আলোচনাটাকে  একটা অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিত।  চুপ করে একবার  এ বক্তা আরেকবার অন্য বক্তার দিকে তাকাতো  যেন কত বোঝে কিন্তু কোনরকম  বক্তব্য রাখত না সে। ও ছিল  ভোম্বল, সবার প্রিয়। যখন  তার অন্য  সঙ্গী সাথীরা ঐসব আলোচনার মধ্যে না গিয়ে নিজেদের  মধ্যেই  খেলা বা ঝগড়া করত, ভোম্বল কিন্তু ওদের  দিকে ফিরেও তাকাতো না, কেবল আলোচনা শুনত কোনরকম  মন্তব্য  ছাড়াই। রাস্তার  পাশেই  ছিল  একটা টিউবওয়েল এবং আলোচনার কেন্দ্রস্থল  ছিল ওটা। সবাই  চলে গেলে ও খানিকক্ষণ  একাই থাকত কারণ ওর বন্ধুবান্ধবরা তখন  অন্য কোথাও  চলে গেছে। অফিস থেকে  কাউকে ফিরে আসতে দেখলে ও তাকে বাড়ি অবধি পৌঁছে দিত এবং যথাস্থানে ফিরে আসত। খাওয়ার  কথা কখনোই তাকে মনে করতে হয়নি কারণ সে সবার  প্রিয় ছিল।  অন্য  পাড়া  থেকে আসা তাদেরই  সমগোত্রীয়দের প্রতি  সে পুরোমাত্রায় সহানুভূতিশীল  ছিল  এবং তার সাঙ্গপাঙ্গোদের প্রতি কড়া নির্দেশ  ছিল  যেন  কোনরকম  অভদ্রতামূলক  আচরণ  না করা হয়। তার বন্ধুবান্ধবরাও  তাকে খুব  মানত এবং ভোম্বল  ছিল তাদের  অবিসম্বাদিত নেতা। একটা দারুণ  ম্যাজেস্টিক  ভাব ভঙ্গি  ছিল তার। দীর্ঘদিন  পর ছুটিতে  বাড়ি এসেছি এবং যথারীতি দোকান বাজার  করছি কিন্তু সেই লালচে শরীর ও মুখের কাছটা একটু কালো এবং সুন্দর পাকানো  লেজের সাদা ডগাটা নাড়িয়ে আর পিছু পিছু বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে না দিতে দেখায় ভেতরটা কেমন ছ্যাঁত করে উঠল এবং বাড়ি ফিরে এসে ওর খোঁজ নিতেই আমার  আশঙ্কাটা  ঠিক হলো। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। প্রকৃতির  নিয়মে ম্যাজেস্টিক ভোম্বল   আমাদের  সবাইকে ছেড়ে  ফিরে গেছে তাঁর কাছে।

Tuesday, 19 July 2022

সব্যসাচী

সব্যসাচী মানে যার দুহাত একসঙ্গে চলে। মহাভারতে অর্জুনের  সম্বন্ধে জানতে পারি যে তিনি দুইহাতেই তীর চালাতে পারতেন এবং সেই কারণেই  তাঁর অপর এক নাম সব্যসাচী। ছোটবেলায় ঠিক বুঝে উঠতে পারতাম না যে দুটো হাতেই একসঙ্গে কি করে তীর চালানো সম্ভব। স্যারদের  জিজ্ঞেস  করলে শুনতাম  বোস।পাশে বসা বন্ধুরা জামা টেনে বসিয়ে দিত। কিছুতেই প্রশ্নের  উত্তর  পেতাম  না। নিজের  মনে মনেই বলতাম  যে একহাত দিয়ে ধনুকটা ধরে অন্য হাতে তীরটা  ধনুকের  ছিলায় লাগিয়ে টেনে ধরার  পর ছাড়তে হবে। তা সেখানে অর্জুনের  হাতের টিপ বা নিশানা অন্যদের  তুলনায় অনেক নিখুঁত।  ছোটবেলায়  বাঁহাতে ধনুকটা ধরে ডানহাতে পাটকাঠি ভেঙ্গে  বানানো তীর  ধনুকের ছিলায় লাগিয়ে টেনে ধরে ছেড়ে দিয়ে আম পাড়ার  চেষ্টা করেছি কিন্তু আম পড়া তো দূর অস্ত , পাতাও এক আধটা পড়েনি বরঞ্চ আমার তীরটাই গাছে আটকে গেছে এবং দাদাকে বলে লম্বা লাঠি দিয়ে গাছ থেকে তীর নামাতে হয়েছে। এহেন  আমারও  অর্জুনের  মতো সব্যসাচী হবার  বাসনায়  উল্টো হাতে মানে ডান হাতে ধনুক  ধরে বাঁহাত দিয়ে তীর চালাবো বলে প্রস্তুতি নিচ্ছি, হঠাৎই  বড়দির  গলার  আওয়াজ, "অ্যাই ছোটু, হোম টাস্ক করিস নি কেন? আয় এদিকে বলছি " শুনে হকচকিয়ে গেলাম  আর তীর গিয়ে লাগল কলতলায় থাকা  আমাদের  বাড়ির কাজের  লোক সুরধ্বনি মাসির গায়ে। ওরে বাবা রে, মা রে এই দত্যিটার জ্বালায় এবার  মলুম।  যাই হোক, যতটা না লেগেছে  তার চেয়ে বেশী ঢং করে কাজটা সেদিনের  মতো যাতে না করতে হয়  তার জন্য  বিত্তেমি  করতে লাগল। সুরধ্বনি মাসির মোটা হাতে অনেকটা মলম লাগিয়ে দিয়ে কম কাজ করতে বলে মা রান্নাঘরে রাখা উনুনে  হাওয়া দেওয়ার  ডাঁটিওলা  পাখাটার  উল্টোদিক  ধরে পটাপট দুচার ঘা লাগিয়ে দিল আর বলল যা, হোমটাস্ক  না করে খালি খেলে খেলে বেড়ানো, যা পড়তে বোস গিয়ে। মাসির ওপর সমস্ত  রাগ গিয়ে  পড়ল আর বড়দির  ওপরেও।  হঠাৎই  ঐ সময় না ডাকলে হয়তো সেদিন  বাঁহাতেও  তীর চালাতে পারতাম  আর নিজেকে খুদে সব্যসাচী বলে ভাবতে পারতাম। 
এরপর অনেকদিন  কেটে গেছে। দাদার সঙ্গে  বিবেকানন্দ ব্যায়াম সমিতি ক্লাবে গিয়েছি। ওখানে একটা সুন্দর  বক্সিং রিং ছিল। শহরে দুটো রিং ছিল,  একটা এখানে আরও  একটা ছিল গোরাবাজারের শক্তিমন্দিরে।  কিন্তু এখানে ছিল  বিরাট  জায়গা এবং শহরের  মাঝখানে। সেইকারণে এখানে ভিড় হতো অনেক বেশী। হাঁ করে দেখছি দুজন হাতে গ্লাভস পরে বক্সিং লড়ছে আর রেফারি হিসেবে রয়েছেন  দুলুদা। পরে শুনেছিলাম  দুলুদা বেঙ্গল  চ্যাম্পিয়ন  বক্সার  ছিলেন।  আরও  অনেককেই দেখেছি বক্সিং লড়তে যাদের  মধ্যে চঞ্চল দা, রবি দা, শক্তি দা , দোদা  দা, মোহন দা, বীরেন দা, দিলীপ দা,অভয় দারা ছিলেন  এবং প্রত্যেকেই  খুব ভাল  বক্সার  ছিলেন। বীরেন দা, দিলীপ দা খুবই  ভাল ছাত্র  ছিলেন  এবং দুজনেই  ফিজিক্সের  অধ্যাপক  ছিলেন।  বীরেন দা রানাঘাট  কলেজের  হেড অফ দি ডিপার্টমেন্ট ছিলেন  এবং দিলীপ দা বহরমপুর  গার্লস কলেজে  পড়াতেন।  ঐ ক্লাবের  প্রতিষ্ঠাতা  প্রণব দা( পিনু দা) পরে পণ্ডিচেরি চলে যান এবং অরবিন্দ  আশ্রমে শরীর চর্চার অধ্যক্ষ  ছিলেন। পরে তিনি তাঁর জমানো টাকার  একটা বিরাট  অংশ  এই ক্লাবকে দান  করেন। বক্সিং রিংয়ের  দিকে হাঁ করে চেয়ে দেখতাম যে দুজনেই  কেমন ডান হাত, বাঁহাত  একসঙ্গে  চালিয়ে লড়ছে। তখন  ভাবতাম  এরাও  তো তাহলে সব্যসাচী।

বক্সিং এর প্রতি আমার  একটা আলাদাই  আকর্ষণ ছিল। নিজেও লড়তাম এবং শেখাতাম ও বাচ্চাদের। দীর্ঘদিন  বক্সিং কম্পিটিশন  বন্ধ ছিল। ক্লাবের  প্রধান  কর্ণধার  দুলুদা বললেন  যে এবার  কিন্তু বক্সিং কম্পিটিশনটা চালু করতেই হবে। সবচেয়ে উপভোগ্য হবে মলয় এবং দিলীপের লড়াই এবং তারপরেই হবে জয়দেব এবং শ্যামলের  লড়াই। সব মনে মনে ছকে নেওয়া  হচ্ছে কে কার সঙ্গে লড়বে এবং কাকে কি দায়িত্ব  দেওয়া হবে। কিন্তু মানুষ  ভাবে এক, ভগবান করেন  আর এক এবং তাঁর  কথাই  শেষ  কথা। পরের দিন  শো , সব কিছুই  ঠিক ঠাক চলছে, হঠাৎ বাড়ি থেকে খবর এল আগামীকাল  শিলিগুড়িতে জরুরী কাজে যেতেই হবে এবং এগারোটার মধ্যেই  পৌঁছাতে হবে।সুতরাং ঐদিন  রাতেই  কামরূপ এক্সপ্রেস  রাধারঘাট থেকে ধরতেই হবে। রাতে কামরার  দরজা কেউ খুলতেই  চায়না, ভাবে বোধহয় ডাকাত উঠছে। যাই হোক,  অনেক  অনুনয় বিনয় করার পর কেউ একজন খুলে দিলেন। গিজগিজ করছে ভিড়, তিলধারনের স্থান নেই। কাঁধে একটা ছোট ব্যাগ, কোনরকমে একটা  বই বের করে ইন্টারভিউ এর জন্য  প্রস্তুতি নিচ্ছি। পা টনটন করছে, যখন  একদম পারছি না তখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, ঐ জায়গাতেই সোজা হয়ে বসছি আবার  উঠে পড়ছি। এক ভদ্রলোক  তখন  একটু দয়াপরবশ হয়ে অন্যদের চেপে আমাকে একটু  বসার  জায়গা  করে দিলেন। ঐ ভাবেই  সকালে নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে বাসে শিলিগুড়ি পৌঁছলাম  এবং একজন পরিচিতের বাড়ি গিয়ে স্নান করে বেরিয়ে পড়লাম  গন্তব্যস্থলে। সব কিছু  সেরে ফিরতে ফিরতে বিকেল  গড়িয়ে গেল এবং শিলিগুড়ির  আশ্রম রোডে  সেই পরিচিতের বাড়ি খাওয়া দাওয়ার পর আবার ফেরার পালা। কিন্তু আমার ভাগ্য ই খারাপ  ছিল,  ট্রেন লেট করায় বক্সিং কম্পিটিশনের  দ্বিতীয় এবং শেষ দিনেও এসে পৌঁছতে পারলাম না আর, আরও  একবার  সব্যসাচী হওয়া হয়ে উঠলনা।  দ্বিতীয় দিনে ঠিক  সময়ে না পৌঁছানোর জন্য  আমার  সঙ্গে যার লড়ার  কথা ছিল  তাকে ওয়াক ওভার দেওয়া হলো আর শুনে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। 
এরপর কর্মসূত্রে বিভিন্ন  জায়গায়  ঘোরা শুরু হলো। কোন জায়গায় বেশীদিন  থাকতে ইচ্ছে করেনা। বিভিন্ন জায়গায় যাব, সেখানকার  লোকদের  সঙ্গে মিশব  এবং তাদের  সংস্কৃতির  সঙ্গে  পরিচিত হয়ে নিজেকে একটু বেশীরকম অভিজ্ঞ করব এটাই ছিল  মনোগত  বাসনা। তিনবছরের  মেয়াদ  ফুরোবার আগেই নতুন  কোন জায়গায় যাবার  বাসনা মনের মধ্যে চাগিয়ে উঠত।  পোস্টিং হলো বিশাখাপটনম শহরের  দ্বারকানগর শাখায়। ওখানে একজন  বিচিত্র  ধরণের ভদ্রলোকের  সঙ্গে কাজ করবার  সুযোগ  ঘটল। ভদ্রলোকের নাম পাস্তুলা সূর্যনারায়ণ ঐ ব্রাঞ্চের  অ্যাকাউন্টান্ট।  মাঝারি লম্বা, ছিপছিপে চেহারার ভদ্রলোকের  মাথাভর্তি চুল এবং ব্যাকব্রাশ করা। সদাহাস্যময়  ভদ্রলোক কখনও  কাউকে না করতেন  না, যতক্ষণ  সম্ভব  হতো সকলকে  খুশী রাখার চেষ্টা করতেন  । তাঁর পাশে বসে কাজ করতে করতে হঠাৎই  আমার  চোখ পড়ে গেল  তাঁর  দিকে। বিশ্বাস করতেই পারছিনা নিজের  চোখকে।  বারবার  চোখ কচলাচ্ছি আর ভাবছি ঠিক দেখছি তো। উনি বাঁহাতে নিজের  স্ক্রোল যোগ  করছেন  এবং ডান হাতে একটা  চিঠি লিখছেন। আমি নিজের  চোখে না দেখলে, অন্য  কারও কাছে শুনলে কিছুতেই  বিশ্বাস  করতাম  না। আমি অন্য  স্টাফদের  যখন  বলছি তখন  কেউই আশ্চর্য হলনা। মানে  সবাই জানে তাঁর  এই বিশেষ  গুণের  কথা। এই পিংলে চেহারার  ভদ্রলোকের ও এক ভীষণ  নেশা বক্সিং। তখন  এম ভি পি কলোনিতে থাকি। একটা রবিবার  দুপুর  বেলায় ওয়ার্ল্ড  হেভিওয়েট বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াই হবে, সবেমাত্র  খাওয়াদাওয়া সেরে টিভি খুলে বসেছি, হঠাৎ গেট খোলার  আওয়াজে বাইরে এসে দেখি সূর্যনারায়ণকে। আসুন আসুন বলে ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসালাম।  উনি বললেন  টিভি চালু করতে কারণ  উনি বক্সিং লড়াই দেখতে এসেছেন ঋষিকোণ্ডায় চলতে থাকা পিকনিক  ছেড়ে।  আমার  দেখা প্রকৃত  সব্যসাচীর  এই আশ্চর্য রকম  ঝোঁক  দেখে আমি সত্যিই  বিস্ময়ে  হতবাক হয়ে গেলাম।  অনেকেই  হয়তো  দুইহাতেই  লিখতে পারেন  বা কাজ করতে পারেন  কিন্তু একই সঙ্গে দুটো ভিন্ন ধরণের কাজ করতে কাউকেই  দেখিনি। হয়তো এইরকম  প্রতিভাশালী  অনেকেই  আছেন  কিন্তু আমার  দেখা একজনই  সব্যসাচী যাঁর নাম পাস্তুলা সূর্যনারায়ণ। 

Tuesday, 5 July 2022

অর্জুনের অ্যালেন অভিযান

বহুদিন  কোন অভিযান না হওয়ায় সমস্ত পাণ্ডব এবং তাঁদের সহধর্মিনীরা ভীষণ বিষণ্ণ। এযাবত  জানা আছে যে যুদ্ধে যোদ্ধাদের  স্ত্রীরা সাধারণত সহগামী হন না, তাহলে এখানে তার ব্যতিক্রম  কেন? না না, এ সেইরকম অভিযান  নয় এটা হলো ভোজনরসিকের অভিযান,  সুতরাং স্ত্রীরা  সেখানে পিছিয়ে থাকবেন! ঐ চিন্তা ভুলেও  মাথায় এলে পরের কয়েকদিন  অন্তত মুখ শুকিয়ে থাকতে হবে এবং শুকনো পাঁউরুটি চিবিয়ে থাকতে হবে নতুবা বিস্কুট মুখে দিয়ে জল খেতে হবে। অতএব,  ভুলেও  ঐ চিন্তা মাথায় না এনে তাদের ই পরিচালনের ভার দেওয়া ভাল।

হতচ্ছাড়া করোনার  জ্বালায় সেই দুহাজার উনিশের  নভেম্বর মাসের  পর আর কোন বড় অভিযান  হয়নি। সর্বজ্যেষ্ঠ  পাণ্ডব  যুধিষ্ঠিরের  দুই হাঁটু প্রতিস্থাপনের  পরপরই এল কুঁতকুঁতে চোখের  দেশ চীন  থেকে করোনা এবং সমস্ত  পৃথিবীকে ব্যতিব্যস্ত  করে তুলল। এল বহির্বিশ্বের জীবের মুখ ঢাকার মাস্ক, স্যানিটাইজার এবং নভোচারীদের মত পোষাক যার গালভরা নাম পি পি ই কিট। সমস্ত  পৃথিবী জুড়ে এই তিন ব্যবসার  রমরমা আর তার  সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শুরু হলো কিছু অসাধু নার্সিং হোমের ফুলে ফেঁপে ওঠা ব্যবসার। চাচা, আপন প্রাণ  বাঁচা বলে লোকের  ঘটি বাটি বিক্রি করেও যদি আরও  কিছুদিন  এই মায়াবি  পৃথিবীতে থাকা যায় তার জন্য আকুল ব্যাকুলতা। চারিদিকে বহু লোক বেকার হলো কিন্তু নেতা, মন্ত্রী এবং তাদের  সান্ত্রীদের  কিছু কম হলোনা, তারা যথেষ্ট  সুযোগ সন্ধানী এবং কি করলে তাদের  পাঁচ পুরুষ  বসে খেতে পারে তার ঘাঁতঘুঁত সব নখদর্পণে। মাঝখানে একটা ছোট্ট বিরতি হয়েছিল টিভিতে সিরিয়াল  চলার  মাঝে যেমন বিজ্ঞাপনের  বিরতি হয়। আর সেই  ফাঁকেই  স্ট্র্যাটেজিস্ট  অর্জুন অভিযান  চালালেন টোকু সাহেবের  বাগান বাড়িতে এবং তাঁর অভিযান চালানো মানেই সাফল্য।  সেখানে দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম না থাকলেও  অভিযান  অত্যন্ত  সফল। করোনার প্রকোপ যখন  একটু পড়তির মুখে তখন  আবার  সহদেবের হাঁটু প্রতিস্থাপন এবং সেখানেও অর্জুনের  উপস্থিতি মানে এক কথায় যেমন  কানু বিনা গীত হয়না তেমনই  অর্জুন বিনা পাণ্ডব অকল্পনীয়। শরীর থাকলেই যেমন  অসুস্থতা  থাকবে তেমন  অর্জুন ও কিছুদিন বিশ্রাম নিয়ে আবার  পূর্ণোদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়লেন নতুন  অভিযানে।

উত্তর কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়ি  কাছে সেন্ট্রাল  অ্যাভিনিউ ( যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত অ্যাভিনিউ) এর চল্লিশ  নম্বর বাড়ির  একতলায় স্বল্প পরিসরে এই অ্যালেন কিচেন।  একশ ত্রিশ বছর  আগে স্কটিশ  সাহেব  অ্যালেন  তাঁর নামানুসারেএই কিচেনের স্থাপন  করেন। পরে তাঁরই কর্মী  জীবন কৃষ্ণ সাহাকে তিনি এটা দিয়ে দেন। এটা এক ঐতিহ্যবাহী দোকান  এবং এখানকার  চিংড়ির  কাটলেট  ও চিকেন কাটলেটের প্রসিদ্ধি সর্বজনবিদিত। সিংহের  বয়স হলেও  সে সিংহই  থাকে এবং তার তেজের  বিন্দুমাত্র  ঘাটতি হয়না। মধ্যম পাণ্ডব  অর্জুনের  ক্ষেত্রেও  তা ব্যতিক্রম  নয় । তিনি অভিযানের  আগে সমস্ত  সুবিধা অসুবিধার  কথা চিন্তা করে গতকাল অর্থাৎ  পাঁচই জুলাই দিন স্থির  করলেন। যুধিষ্ঠির এবং তাঁর  স্ত্রী দেবিকা,  বোন দুঃশলা, অর্জুন  এবং তাঁর  স্ত্রী চিত্রাঙ্গদা, এবং সহদেব ও তাঁর  স্ত্রী বিজয়া এই অভিযানে অংশগ্রহণ করলেন। ভীম এবং তাঁর স্ত্রী জলন্ধরা দীর্ঘদিন  প্রবাসে থাকায় অভিযানে অংশ নিতে পারেন নি এবং নকুল ও তাঁর সহধর্মিনী কারেনুমতী ইউরোপ ও আমেরিকা পরিভ্রমণে ব্যাপৃত থাকায় তাঁরাও অনুপস্থিত।  কিন্তু নকুলজায়া  কারেনুমতীর ঘ্রাণ শক্তি স্নিফার ডগকেও  হার মানাবে।  তিনি ঠিক  ঐ সময়েই ভিডিও  কল করেছেন এবং তিনি সমস্ত  অভিযানেই  অর্জুনের ই মতন  উৎসাহী হওয়ার জন্য একটু মনে দুঃখ  পেলেন তাঁরা না থাকার জন্য।  তাঁদের  প্রত্যাবর্তনের  পর আরও  একবার  অভিযান  চালানো হবে এই প্রতিশ্রুতির পর তিনি একটু শান্ত হলেন। কিন্তু তাঁর  চোখেমুখে  ফুটে ওঠা যন্ত্রণার অভিব্যক্তি  কারও  নজর এড়ায়নি।

ছোট্ট  দোকান  এই অ্যালেন।  কাঠের  কড়ি বর্গায় ইতিহাস  যেন মিলে মিশে আছে।সামনের  ভাগে রিসেপশন এবং রান্নার  জায়গা এবং ভিতরের  দিকে চারটে টেবিল  সম্বলিত  ষোল জনের  বসার ব্যবস্থা। এর মধ্যে ভিতরের ঘরে ঢুকতেই  বাঁদিকের টেবিলে দুজনের  বসার জায়গা এবং ঐ টেবিলের সামনের দুটো চেয়ার স্থান  পেয়েছে  ভিতরের  দিকে পাশাপাশি রাখা টেবিল  দুটোর  মাঝখানের  pরাজবাড়ির দুটো দেয়াল আলমারি যেখানে প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র থাকে। গাঁটগোঁট  চেহারার চেয়ারগুলোও দামী কাঠের,  নজর পড়লেই বোঝা যায়। সঙ্গে মানানসই টেবিলগুলোও তাই কিন্তু মার্বেল টপ ইতিহাসের হাজার বাহক। মেনু কার্ড চারটে টেবিলে চারটে রাখা,  রকম  আইটেম  নেই কিন্তু যেটাতে ওদের  বৈশিষ্ট্য  তার নীচে কালি দিয়ে দাগ দেওয়া। অর্জুন  তো এই বিষয়ে আগেই রিসার্চ  করে ফেলেছেন  এবং অ্যালেনের বিখ্যাত  চিংড়ির কাটলেট  এবং যারা চিংড়ি খান না বিভিন্ন  কারণে, তাঁরা চিকেন কাটলেটের  অর্ডার  দিলেন। খাঁটি ঘিয়ে  ভাজা দুই কাটলেটই  অনন্য, এ বলে আমাকে দেখ  ও বলে আমাকে দেখ। অসাধারণ অনুভূতি।  সহদেবের আরও  একটু  খেতে ইচ্ছে হওয়ায় দুটো চিকেন  কবিরাজি  চারজন ভাগ করে খেলেন।  যুধিষ্ঠির,  অর্জুন এবং দুঃশলা কাটলেটেই নিবৃত্ত  থাকলেন। এবার  ওঠার  পালা, বাইরে নেমেছে ঝিরঝির করে বৃষ্টি। গাড়িতে উঠতেই  নামল ঝমঝম করে।  স্বল্প পরিসর হওয়ায় বাইরে চওড়া ফুটপাতে রাখা গোটা  আটেক প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে থাকা ছেলেমেয়েরা আমরা গাড়িতে ওঠায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচল এবং তাড়াতাড়ি অ্যালেনে ঢুকে পড়ায় বোঝা গেল  যে এই ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ সব বয়সী লোকদের কাছেই  সমান আকর্ষণীয়। অভিযান  কিন্তু এখানেই সমাপ্ত  নয়। আক্রমণ  শানানো  হলো চিত্তরঞ্জনের রসগোল্লার দিকে। কিন্তু তারা তাদের  ঐতিহ্যমতো ঠিক সাড়ে ছটায় দোকান  বন্ধ করে দেওয়ার ফলে রক্ষা পেল কিন্তু অভিযানের  সমাপ্তি কি এখানেই  হয় যেখানে রয়েছেন  অগ্রগণ্য  অর্জুন।  অতএব পরের আক্রমণ গিরীশ দে ও নকুড় নন্দীর সন্দেশ।  সেখানে আত্মতৃপ্ত  হয়ে খাওয়া এবং সঙ্গে লুন্ঠন ( অবশ্যই  নগদ নারায়ণের সহযোগিতায়)  করে ফিরে আসা  এক দারুণ  অভিজ্ঞতা।