Saturday, 6 April 2024

সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত

অনেক সময় আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে কোনটা বেশী আকর্ষণীয় ---- সূর্যোদয় না সূর্যাস্ত? দুই যুযুধান গোষ্ঠীর ই অনেক বাঘা বাঘা প্রবক্তা রয়েছেন যাঁরা আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে জামার আস্তিন গোটাচ্ছেন অপর পক্ষকে ঘায়েল করার জন্য তাঁদের  যুক্তি দিয়ে। সত্যি কথা বলতে কি কোনদিন  সিরিয়াসলি ভেবেই দেখিনি যে কোনটা বেশী সুন্দর। 
সূর্যোদয়ের পক্ষে প্রথম বক্তা তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন কবিগুরুর আজি এ প্রভাতে রবির কর আবৃত্তি করে। বর্ণনা তাঁর দারুণ সুন্দর,  বক্তব্য ও অত্যন্ত বলিষ্ঠ।  ভোর বেলায় ধীরে ধীরে আলো ফুটে উঠছে আর অন্ধকারের ঘনত্ব ধীরে ধীরে কমছে, পূর্ব দিকে লাল আভা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে,ঘোষণা করছে তাঁর  আগমন বার্তা। পাহাড় এবং সমুদ্রে সূর্যোদয় একটু যেন ভিন্ন। পাহাড়ের চূড়ার  পিছন দিক থেকে তিনি যেন টুকি টুকি বলে লুকিয়ে পড়ছেন আর অনেকক্ষণ  একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখটা একটু কচলে ভাল করে দেখার জন্য   যেই না হাতটা চোখে দিয়েছে অমনিই তাঁর  আত্মপ্রকাশ  হলো আর সূর্যোদয় দেখার  জন্য  হাজির  সমস্ত লোক সমস্বরে চিৎকার  করে উঠল। বেচারা ভদ্রলোক,  সেইসময় ই তাঁর  চোখ রগড়াতে হলো। আগামীকাল  আবার  আকাশের  অবস্থা কেমন থাকবে না থাকবে এই ভেবে মনটা খুব খারাপ  হয়ে গেল। তবেএটা সাময়িক  প্রতিক্রিয়া। তিনি প্রচণ্ড জোরালোভাবে বক্তব্য  রাখতে থাকলেন  যে নতুন সূর্যর আগমনে নতুন  দিগন্ত  খুলে যাবে এবং পৃথিবী নতুন উদ্যমে জেগে উঠবে এবং ঝেড়ে ফেলবে পুরোন  সবকিছু। নতুন প্রভাত, নতুন উদ্যম,নতুন আশা সরিয়ে ফেলবে  মনের জঞ্জাল।  এইসব নানাবিধ বিশেষণে তাঁর  বক্তব্য  পেশ হলো এবং পরিশেষে বিরাট হাততালি। জনগণের অভিব্যক্তি দেখে খুবই খুশী বক্তা, ডায়াস ছেড়ে তাঁর  চেয়ারের  দিকে এগিয়ে গেলেন। হাততালি আর থামতেই চায়না। এই পরিস্থিতিতে  এসে অপর পক্ষের  বক্তব্য  রাখা ভয়ানক  কঠিন।  যাই হোক,  হাততালির  রেশ একটু কমতেই অন্যপক্ষের বক্তা ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য  রাখার জন্য  মাইক তুলে নিলেন  হাতে। মনে হচ্ছে তাঁর  বক্তব্য  শোনার জন্য  কেউই খুব  আগ্রহী নন। এইরকম  প্রতিকূল  পরিবেশে বক্তব্য  পেশ করা বেশ কঠিন। কিন্তু তিনিও  অত্যন্ত  পণ্ডিত মানুষ,  জনতাকে কি করে আকর্ষণ  করতে হয় তাও তাঁর  অজানা নয়। তিনি শুরু করলেন হাট কবিতা থেকে উদ্ধৃত করে, " বকের পাখায়  আলোক লুকায় ছাড়িয়া পূবের  মাঠ, দূরে দূরে গ্রামে জ্বলে ওঠে দীপ আঁধারেতে থাকে হাট।" পরক্ষণেই  তিনি শ্রোতাদের বিভিন্ন  শ্রেণী থেকে তাঁদের  বয়স জিজ্ঞেস  করতে শুরু করলেন।  কেউ বা বলেন পঁচিশ  তিরিশ, কেউ বা বলেন  সত্তর এবং দেখা গেল বর্ষীয়ান  লোকের  সংখ্যাই অধিকতর যেটার অ্যাডভান্টেজ তিনি পুরোপুরি নেওয়ার চেষ্টা করলেন। শুরু হলো সূর্যাস্তের  সময় পাহাড়ের  বর্ণনা। জ্বলন্ত সূর্য কেমন ম্রিয়মান  হয়ে  আসছে, গনগনে  হলুদ  রঙ কেমন স্তিমিত হয়ে  লাল হয়ে আসছে, আঁধারের  কালগ্রাস যেন গিলে ফেলতে চাইছে সেই পরম শক্তিমান সূর্যকে আর তিনি যেন পাহাড়ের  আড়ালে সেই শক্তিমান অন্ধকারের  থেকে লুকিয়ে পড়তে চাইছেন।  কিন্তু নাছোড়  আঁধার, ছাড়িবনা আজ তোমারে, নির্বল করে গ্রাসিব আজি দেখাব বিশ্বমাঝারে।  সূর্যের  এই আত্মসমর্পণ বিষাদিল আজি মোরে। অসাধারণ এই রূপ সূর্যাস্তের এককথায় অবর্ণনীয়।  সূর্যোদয়ের পরাক্রমী রূপ এবং সূর্যাস্তের এই আত্মসমর্পণের  রূপ এ তো চিরন্তন সত্য।  আমরা আজ জীবন  সায়াহ্নে পৌঁছেছি,  আমাদের  নিজেদের  সাধ্যমত  এই বিশ্বসংসারে দিয়েছি যা পরিপুষ্ট  করেছে আগামীদিনের প্রজন্মকে এবং তারাও তাদের  নিজেদের  সাধ্যমত  এই সংসারে  তাদের কর্তব্য করবে এবং এই চক্র চলতে থাকবে চিরদিন যতদিন  মানব সভ্যতা বজায় থাকবে। পরিশেষে এটাই বলি যে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত এক প্রবহমান  চক্র এবং তাদের  দুজনকেই  জানাই স্বাগত।
হাততালিতে গমগম করে উঠল সারা হল এবং এখানে কোন হারজিত  নেই, সবাই বিজয়ী, বিজয়ী মানবসমাজ। 

Wednesday, 3 April 2024

চল বেড়িয়ে পড়ি

দীর্ঘদিন ধরে প্ল্যান করে বেড়িয়ে পড়ার মধ্যে অবশ্যই আনন্দ আছে কিন্তু হঠাৎই যাব মনে করে দুম করে বেড়ানোর আনন্দ  বোধ হয় আরেকটু বেশী যদি সবকিছুই ঠিকঠাক চলে। কিন্তু তার জন্য যিনি প্ল্যান করলেন  তাঁকে অনেক বেশী ঝুঁকি নিতে হয়, যেটা অল্পবয়সীদের পক্ষে নেওয়া সম্ভব কিন্তু অনেকদিন  আগে যাঁরা যৌবনকে বিদায় জানিয়েছেন তাঁদের  অনেক হিসেব করে এগোতে হয়।

গরমের ছুটিতে  ছেলে, বৌমা ও নাতি নাতনিদের আসা নিয়ে বাসু বাবু ও তাঁর  স্ত্রী খুব  উত্তেজিত।  ঘরদোর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন  করা নিয়ে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে নিত্যদিন কিছু না কিছু নিয়ে মতান্তর চলছেই। মানে পরিষ্কার  করতে গিয়ে এলোমেলোভাবে চলায় অভ্যস্ত বাসুবাবু নিজের জিনিসপত্র ঠিক জায়গায় দেখতে না পেয়ে মাথা গরম করছেন  আর আগুনকে আগুন  দিয়ে নেভানোর নীতি মেনে বাসুগিন্নীর তাঁর থেকে দুই ডিগ্রী উপরে গলা চড়ানোতে ব্যাপারটা খুব সাধারণ জায়গায় থেমে থাকছে না। আশেপাশের বাড়িতে রীতিমত গুঞ্জন  উঠছে যে বাসু বাবুর বাড়িতে নিশ্চয়ই  বিশেষ কিছু  হতে চলেছে। অবশ্য  এই ফ্যাঁস ফোঁস  যতদিন  চলতে থাকবে ততদিন ই ভাল। যে কোন  একটা স্তব্ধ হয়ে গেলেই ব্যালকনিতে বসে গাছ, পাখি দেখা ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। যাই হোক, এর ই মধ্যে ভাঙা নৌকায় আধখানা ভালবাসা নিয়ে ছেলে আর নাতনি এসে পৌঁছেছে। বৌমার অফিসের  কাজ আর নাতির  ক্লাস কামাই না করানোতে তারা পরে আসবে। দুধের  স্বাদ ঘোলে মেটাতে হলো বাসুবাবুদের। একদিন  কেটে গেল, পরদিন বৌমার নাতিকে নিয়ে আসার কথা। হঠাত খেতে খেতে ছেলে বাবা মাকে সুটকেস গোছানোর  কথা বলতেই তাঁরা আকাশ  থেকে পড়লেন।  একটু শাল, সোয়েটার নেবার কথা বলতেই একটু ধন্দে পড়ে গেলেন বাসুবাবুরা। কি বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না তাঁরা কিন্তু নাতনির আবদারের কাছে মাথা নোয়াতেই হলো । প্ল্যানটা কি জিজ্ঞেস  করাতে তাঁরা জানলেন যে পরদিন  তাঁদের  যেতে  হচ্ছে বাগডোগরা এবং সেখানে সন্ধে বেলায়  বৌমা আসবে নাতিকে নিয়ে এবং সেইদিন  শিলিগুড়িতে থেকে পরদিন যাত্রা হবে কালিম্পঙের পথে। বাসুবাবুরা তো পৌঁছলেন  বাগডোগরা  কিন্তু জানা গেল যে বৌমার  ফ্লাইট কোন বিশেষ  কারণে বাতিল  হয়েছে। সুতরাং প্ল্যান বাতিল করে শিলিগুড়ির কোন  এক হোটেলে যেতে হলো। হোটেল  তারা ঠিকই করে রেখেছিল কিন্তু বৌমা ও নাতিকে বাদ দিয়েই তারা হোটেল  সালুজাতে গিয়ে উঠল। রাতের খাবার  ঐ হোটেলের  রেস্তোরাঁয় সেরে পরদিন সকালে গাড়িতে বাগডোগরা এয়ারপোর্টে বৌমা ও নাতনিকে নিয়ে সরাসরি কালিম্পঙের পথে দিল রওনা। এখন পুরো পরিবার সমেত চেটেপুটে আনন্দ নিতে নিতে চললেন বাসু বাবু ও তাঁর  পরিবার।  মাঝপথে প্রয়াস হোটেলে চায়ের সঙ্গে একটু হাত পা ছাড়িয়ে নিয়ে আবার  চলা শুরু হলো কালিম্পঙের  পথে। বেলাবেলি কালিম্পঙের হোটেল এলগিন সিলভার ওকসে পৌঁছালেন তাঁরা। স্বাগত জানাতে এলগিন হোটেলে মজুত ছিল রাশিয়ান হাস্কি  "ফেরো।" অত বড় সাদা ধবধবে লোমশ কুকুর ফেরোকে দেখে একটু ভয় ই পেয়েছিলেন  তাঁরা কিন্তু এই কাজ ফেরো  গত পনের বছর থেকে করে আসছে। সুতরাং, খুব  শান্তভাবে সবাইকে একঝলক দেখে নিয়ে সব ঠিক আছে এই গ্রীন সিগন্যাল  দিয়ে দিল। দারুণ সুন্দর  এই হোটেল  এলগিন সিলভার ওকস।  দোতলায় পাশাপাশি দুটো ঘরে তাঁদের  ঠাঁই হলো এবং পর্দা সরিয়ে জানলা দিয়ে অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য দেখা গেল। কোথায় যাব, এইখানে বসে থাকলেই তো হৃদয় মন জুড়িয়ে যায়। একটু ফ্রেশ হয়ে  একতলায় ডাইনিং হলে লাঞ্চ করতে আসতে হলো। যেমন সুন্দর  হোটেল, তেমনই সুন্দর  হোটেলের  কর্মীবৃন্দ এবং অসাধারণ খাবার  মেনু। কোনটা ছেড়ে কোনটা খাওয়া উচিত এটা ভাবতে ভাবতেই  একটু একটু করে সব জিনিস  চাখতে চাখতেই  পেট একেবারে ভরপুর।একটু বিশ্রাম  নিয়ে হোটেলের লনে বসে চা খাওয়া সাব্যস্ত হলো। একটু দূরে দূরে রয়েছে ছাতা যাকে ঘিরে রয়েছে বেতের চেয়ার। এইরকম ই একটা ছাতার তলে তাঁরা বসে চায়ের সঙ্গে কিছু টা ও অর্ডার করলেন।  সুসজ্জিত  ওয়েটার কিছুক্ষণ পরেই হাসিমুখে হাজির।  নাতি নাতনিদের আবার  অন্য কিছুর  বায়না, তাও হাসিমুখে তাদের  আবদার মেটালেন সেই সুন্দর  হাসির ওয়েটার।  ভাল  হোটেলের  এইটাই বিশেষত্ব কারণ গোমরামুখো স্টাফদের কেউই পছন্দ  করে না এবং হোটেলের সুনাম  এদের সঙ্গেই জড়িত। রাস্তার পাশেই হোটেল এবং আস্তে আস্তে সেই রাস্তা উপরের দিকে চলে গিয়েছে যার ফলে হোটেলের জানলা দিয়ে অনেক দূর অবধি নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখা যায়। ভিতরের দিকের লনে বসে দূর উপত্যকায় গাছপালা ঘেরা কিছু বসতি, সন্ধে বেলায় আলো জ্বলে উঠে তা আরও  মনোরম  হয়ে উঠেছিল। লনে নানাধরণের ফুলগাছ, একপাশে ফেরোর জন্য  সুন্দর  ঘর, মাঝেমাঝেই এসে তদারকি করে যাচ্ছে অতিথিদের  কোন অসুবিধে হচ্ছে কি না, তারপর নিজের ঘরে গিয়ে বিশ্রাম  কর্তামশায়ের। অনেক রাত অবধি চুপ করে বসে পাহাড়ের  সেই চোখ জুড়ানো দৃশ্য  দেখে রাতের  খাবারের  জন্য ডাইনিং হলে জমায়েত  হলো সবাই। পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে কালিম্পঙ শহরের  দ্রষ্টব্য স্থান দেখার জন্য বেড়িয়ে পড়লেন তাঁরা। ছোট্ট শহর পরিক্রমায় বেশিক্ষণ সময় লাগেনা, তাই বিভিন্ন স্থানে অনেকক্ষণ সময় কাটাতে কোন অসুবিধা হলো না তাঁদের। আর্মির  একটা ক্যাম্পের খুব  কাছে একটা বৌদ্ধমন্দির যেখানে প্রার্থনা চলছে আর সেই কারণেই ভেতরে না গিয়ে বাইরে থেকে পরিক্রমা সেরেই ফিরতে হলো। বৌদ্ধমন্দিরগুলোয় গেলেই কেমন যেন একটা শান্তির পরিবেশ অনুভূত  হয়। এরপর তাঁরা গেলেন  কালিম্পঙের  সায়েন্স  সেন্টারে। অনেকটা ওপরে এই সায়েন্স সেন্টার যেখানে আমাদের  ভারতবর্ষের নামী বিজ্ঞানীদের আবক্ষ মূর্তি দেখে সত্যিই ভীষণ আনন্দ  হয়। কে নেই সেখানে? ডক্টর হোমি ভাবা, বিক্রম সরাভাই,  সি ভি রমন, বীরবল সাহনি,  জগদীশ চন্দ্র বোস, রামানুজম , সত্যেন বোস এবং আরও  অনেক দিকপাল বিজ্ঞানীদের দেখে মনটা উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে। নাতি নাতনির ঔৎসুক্য বাবা মা এবং ঠাকুমা ও ঠাকুর্দাদের মধ্যে সঞ্চারিত  হলো এবং ছোট হলেও  ছিমছাম  এক সুন্দর অডিটোরিয়াম যা সবাইকেই  আকৃষ্ট করে। এবার যাওয়ার পালা ডেলো পার্কে। গাড়ি যেখানে পার্ক করা হলো সেখান থেকে অনেকটা ওপরে উঠতে  হয় ডেলো পার্কের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে। বেশ হাঁফ ধরে যাচ্ছিল  বাসুবাবু ও তাঁর  স্ত্রীর কিন্তু এতদূর এসে না দেখে ফিরে যাওয়া যায়না। সুতরাং মাঝে মাঝেই বিশ্রাম করে ওপরে উঠলেন তাঁরা। ওপরে উঠে পৌঁছানো মাত্রই ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হলো।পাহাড়ে বৃষ্টি নামলে যে কত নয়নাভিরাম দৃশ্য  হয় তা সাধারণ  লোকের পক্ষে বর্ণনা করা মুশকিল। কিন্তু ভাসমান  মেঘের একটু দয়ার সঞ্চার হলো,  তাই হাসতে হাসতে ভেসে চলল অন্য দিকে আর বৃষ্টি ও হলো  উধাও।  উপস্থিত সমস্ত  ছেলেমেয়েরা এবং বৃদ্ধ বৃদ্ধারা  সবাই মনে মনে বলে উঠল, " বনরাজি উচ্ছসিল তোমার আগমনে, এখন যাও ফিরে ওই দূরদিগন্তের পানে।" মেঘ সে তো কারো তোয়াক্কা করেনা, চলে গেল , ঘরেখে গেল নূপুরের ছন্দ।  নাতি নাতনিদের ঘোড়ার  পিঠে চড়া, সে এক অপূর্ব  অভিজ্ঞতা। ফিরে আসা হলো এলগিনে ফেরোর সান্নিধ্যে। পরের দিন সকাল বেলায় ব্রেকফাস্ট  সেরে গ্যাংটকের রাজধানী সিকিমের উদ্দেশ্যে যাত্রা। বিদায় ফেরো, বিদায়। জানা নেই এর পরের বার এখানে এলে বৃদ্ধ ফেরো আবার  অভিবাদন  করবে কি না।

শুরু হলো গ্যাংটকের পথে যাত্রা। সাথী সেই পরমাসুন্দরী তিস্তা চলেছে তার নিজস্ব তালে। কত জনপদকে  সিঞ্চিত করেছে তার অববাহিকায় কিন্তু তার রুদ্রমূর্তিও সাঙ্ঘাতিক।  উত্তাল জলরাশিতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম।  অনেকটা মা দূর্গার মতন মনে হয়। মায়ের  সেই শান্ত স্নিগ্ধ অভয়ারূপ আর অসুরবিনাশীর রূপ দুটোই যেমন চরম, তিস্তার  রূপ ও অনেকটাই  সেইরকম। কোন কোন জায়গায় চোখে পড়ল ছেলেমেয়েদের  ওয়াটার র‌্যা্ফটিং, নিপুণ  হাতে তাদের নৌকাটাকে জলের  স্রোতের  সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে। নাতনি বড় হলেও নাতিও কিছু কম যায়না। প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করে তুলছে  তাদের  মা ও বাবাকে। মাঝপথে থামতে থামতে ছবি তোলার জন্য পৌঁছাতে খানিকটা বেশী সময়ই  লাগল। এসে পড়ল গ্যাংটকের নরখিল হোটেল।  মনে হয় এটাও সেই কালিম্পঙের এলগিন সিলভার ওকসের একটা চেন। সাজানো গোছানোতে সেই এলগিনের ই প্রতিচ্ছবি। পাশেই একটা স্টেডিয়াম যেখানে চলছে ছেলেদের খেলা। বাইরের লনে বসে থাকতে থাকতেই  ফেরোর ই এক ছোট সংস্করণ দেখে চমকে ওঠার মতো ব্যাপার।  এখানেও  একটা রাশিয়ান  হাস্কি সাদা ধবধবে লোমশ কুকুর,  নাম যার হিলটন।  হিলটনের  বোধহয  এখনও  ট্রেনিং শেষ  হয়নি কারণ  বয়স তার খুবই কম।  যাই হোক সখ্যতা জমতে বেশী সময় লাগল না। ও তো বাচ্চাদের ও খুব  ন্যাওটা। যাই হোক, খাওয়া দাওয়া সেরে গ্যাংটকের ম্যালে যাওয়া স্থির  হলো। ভারী সুন্দর  এই ম্যাল, গমগম করছে এবং শহরের  মান মর্যাদা বাড়াতে সদাই উন্মুখ।বছর পাঁচেক আগে দুহাজার  আঠারো সালে নভেম্বরের  শেষাশেষি একবার  আসার  সৌভাগ্য  হয়েছিল পাণ্ডবসাথী হয়ে কিন্তু এতটুকুও গ্ল্যামার কমেনি সেই ম্যালের। শহরের  প্রাণ কেন্দ্র এই ম্যাল। রাতে নরখিলের অপূর্ব খাবার এবং থাকার এই সুন্দর  বন্দোবস্তে বাসুবাবুদের আনন্দের  শেষ নেই। আগের বারেও  হোটেলটা ছিল ফায়ার ব্রিগেডের ঠিক উল্টোদিকে এবং প্রত্যেকটি ঘরের  জানলা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘায় সূর্যোদয় দেখা যেত। বাসুবাবুদের মনে পড়ল ভোরবেলায় অর্জুনের ডাকে কয়েক মুহুর্ত হলেও সেই সূর্যোদয় তাঁরা দেখেছিলেন।  এর পরে দিন তিনেক থাকলেও তিনি আর দেখা  দেননি, লুকিয়েছিলেন মেঘের ফাঁকে। পরদিন  সকালে বেড়িয়ে পড়লেন বাঞ্জাখারি ঝর্ণা দেখতে এবং সেখান থেকে রামটেক বৌদ্ধ মঠের  উদ্দেশ্যে। রামটেক বৌদ্ধমঠের কাছে কোন  গাড়িকে  যেতে দেওয়া হয়না। মিলিটারিদের  গাড়িতে বৃদ্ধ এবং অক্ষমদের  মঠের  গেট অবধি পৌঁছে দেওয়া হয়। বাসুবাবুদের বয়স দেখে এবং চলাফেরায় অসুবিধা দেখে আর্মির গাড়ি তাঁদের  পৌঁছে দিল এবং ছোট  বলে নাতি নাতনিরাও তাঁদের সঙ্গে গেল। তাঁর  ছেলে এবং বৌমা হাঁটতে হাঁটতে অনেক উপরে থাকা মঠে  পৌঁছাল। মঠের ভিতরে অনেকখানি বর্গক্ষেত্রাকার জায়গা যেখানে সন্ন্যাসীরা  বিভিন্ন  শারীরিক কসরত দেখাচ্ছিলেন যেটা সচরাচর  চোখে পড়েনা। ফেরার পথে আর গাড়ির  প্রয়োজন  হলো না কারণ ঢালু রাস্তা। মাঝপথে ঐখানেই একটা হোটেলে কিছু খেয়ে নিয়ে নরখিল হোটেলে ফেরার পালা। ফেরার পথে  চোখে পড়ল কোন কোন জায়গায় সাদা কাপড়ের  ফ্ল্যাগ বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে  আবার কোন কোন জায়গায় সেটা লাল , হলুদ এবং নানা রঙবেরঙের । বাসুবাবুর মনটা উশখুশ করছে কারণটা জানার জন্য  কিন্তু কোন সঠিক  উত্তর  হাতড়াতে না পেরে স্থানীয় ড্রাইভারের  শরণাপন্ন  হলেন। ড্রাইভার  জানাল যে কারও বাড়িতে কোন মৃত্যুশোক হলে সাদা কাপড় এবং কোন  আনন্দানুষ্ঠান হলে রঙবেরঙের পতাকা লাগানো  হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে এই শোকের পরিবেশ একশ আটদিন পর্যন্ত  রাখা হয়।  ঠিক সেইরকম ই  আনন্দানুষ্ঠান ও ঐভাবেই পালন করা হয়। আমরা ভাবি আমরা অনেক কিছুই জানি কিন্তু প্রকৃত পক্ষে আমাদের  জানার থেকে অজানাই  বেশী। সামনা সামনি দুটো ঘরে বাসুবাবুরা এবং তাঁদের  ছেলে বৌমারা আছেন।  নাতনি ঠাকুমা অন্ত প্রাণ,  অতএব বলাই বাহুল্য যে তিনি তাঁদের  সঙ্গেই থাকবেন।  ভোরবেলায় ছোট্ট  ছয় বছরের নাতনি উঠে তার ঠাম্মাম ও ভাইয়ের  জন্য চা করেছে এবং ডাকছে  ভাই ওঠো, ওঠো। ঘরেই রাখা ইলেকট্রিক  কেটলিতে জল গরম করে, চা বানিয়ে ঠাম্মাম এবং ভাইকে ডাকছে , এটা অভাবনীয়।  প্রত্যেক মানুষকেই একদিন  এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়েচলে যেতে হবে কিন্তু কোন কোন সৌভাগ্যবানের এই বাড়তি পাওনা ভগবানের  আশীর্বাদ  বলেই মনে হয়। অনেকেই কথায় কথায় বলেন  যে আজকালকার  ছেলেমেয়েদের  মধ্যে সভ্যতা ভব্যতার  বড়ই  অভাব কিন্তু না তারা খুব  নিশ্চুপে  দেখে যে তার বাবা এবং মা তাদের বাবামায়েদের  সঙ্গে কিভাবে ব্যবহার করছে এবং কোনরকম  বইয়ে না পড়লেও  তাদের মস্তিষ্কতে কিভাবে যেন ঢুকে যায়। বাসুবাবুর হৃদয় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল কৃতজ্ঞতায়  ভগবানের প্রতি। পরেরদিন  সকালে যাত্রা শুরু নাথুলার  পথে। 
সঙ্গে নেওয়া হয়েছে কর্পূর এবং অক্সিজেন  সিলিন্ডার নাথুলার উচ্চতার  কথা ভেবে কারণ আগের বার বাবামন্দিরের কাছে গিয়ে অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে প্রায় মরতে বসেছিলেন  বাসুবাবু। নাথু লা তো বাবামন্দিরের চেয়েও উঁচুতে। সুতরাং এবার  আর কোন রকম রিস্ক নেওয়া নয়। তবে হিমালয়ের  কোলে যদি কারও  মৃত্যু  হয় সেটা তো ভগবানের ই আশীর্বাদ।  কিন্তু মানুষ ভাবে যে আরও  কিছুদিন  বাঁচলে হয় না?  লম্বা জীবন  নিয়ে কি হবে যদি তা অন্য কারও  প্রয়োজনে না লাগে? সব কথা জেনেও  মানুষ  তো নিজেকেই সবচেয়ে বেশী ভালবাসে। পথে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব  রূপ ধরা হলো মোবাইল ক্যামেরায়। সামনে চলছে নাথু লার রাস্তা। মাঝপথে নাথু লা যাওয়ার  জন্য  প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র সংগ্রহ করা হলো। তারপর পিঁপড়ের সারির মতো গাড়ি চলতে শুরু করল নাথুলার পথে। পথে পড়ল সোমগো বা ছাঙ্গু লেক কিন্তু ওখানে না থেমে আগে নাথুলা যাওয়াই  সাব্যস্ত  হলো।  প্রচুর  গাড়ি ওখানে। কোথায় পার্কিং করা হয়েছে না দেখলে ফেরার  সময় গাড়ি খুঁজে পাওয়াই মুশকিল।  যাই হোক, বাসুবাবু ও তাঁর  স্ত্রী খানিকটা উঠে একটা প্রশস্ত জায়গায় বসলেন।  ছেলে, বৌমা ও নাতি নাতনিদের  বয়স কম হবার  কারণে আরও  অনেক  উপরে উঠল।  অনতিদূরে চীনের  সীমানা। আমাদের  দেশের প্রহরীদের  তাই সদাই সতর্ক থাকতে হয়। খানিকক্ষণ সময় ওখানে কাটিয়ে এবার  ফেরার  পালা। গাড়ির ড্রাইভার আগেই  বলেছিল কোথায় থাকবে,  সুতরাং খুঁজে পেতে সময় লাগল না। চারিদিকে  বরফ, ওখানে খানিকক্ষণ  থাকলেই কেমন হাঁফ ধরে যায় আর আমাদের  জওয়ানরা প্রাণপাত  পরিশ্রম করে আমাদের নিশ্চিন্তে ঘুমানোর  বন্দোবস্ত করে অথচ সুযোগ  পেলেই  আমরা তাদের  গালিগালাজ  করতে ছাড়িনা।  কি বিচিত্র  মানুষের  এই ব্যবহার।  এবার  সুন্দরী নাথুলাকে বিদায় জানিয়ে ফেরার পালা। মাঝপথে সোম গোতে( ছাঙ্গু লেকে) খানিকক্ষণ বিশ্রাম এবং চা ও খাবার খাওয়া। নাতি ও নাতনির বাসনা হলো চমরি গরুর পিঠে চাপা। আর তা ই বা অপূর্ণ  থাকে কেন? সন্ধেবেলায় হোটেল  নরখিলের লনে হিলটনের  সঙ্গে খানিকটা সময় কাটানো। পরদিন  সকাল  বেলায় ফিরে আসার  প্রস্তুতি। গাড়িতে বসে আসতে আসতেই বাসুবাবুর মনে হলো যেন  হঠাৎই  একটা স্বপ্ন চোখের  সামনে বাস্তব রূপ  নিল। মাঝখানে খানিকটা চায়ের  ব্রেক  এবং লাঞ্চ  ব্রেক করে ছেলে বৌমারা নাতি নাতনিদের নিয়ে বম্বের  পথে এবং বাসুবাবুদের কলকাতার ফ্লাইট  ধরা। একটা সপ্তাহ যে কি করে চোখের  নিমেষে অদৃশ্য  হয়ে গেল  ভাবলেই যেন  গায়ে কাঁটা দেয়। আসলে বোম্বাই  কা বাবু বিবিরা সব ঠিক  করে রাখলেও  কলকাত্তাইয়াদের একেবারে অন্ধকারে রেখে দিয়েছিলেন।  মাঝেমধ্যে এরকম হলে ক্ষতি কি?

Saturday, 30 March 2024

আশ্রিত ও আশ্রয়দাতা

এই প্রসঙ্গে কিছু মন্তব্য করতে গেলেই  মহানতা বা মহানুভাবিতার কথা এসে যায়। যদি কেউ প্রশ্ন করে কে বেশী মহান, তবে সবাই একবাক্যে বলবে যে অবশ্যই  আশ্রয়দাতা। কোন সন্দেহ ই নেই তাতে। এই স্বার্থপরতার যুগে যেখানে সবাই  আপনি কোপনি নিয়েই ব্যস্ত সেখানে অন্যের কথা ভাবার মতন লোক ই বিরল। একটু গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ  করলে দেখা যাবে প্রকৃত চিত্রটা। এই কঠিন  যুগে  যেখানে নিজের অস্তিত্ব  টিকিয়ে রাখাটাই  এক বিরাট সমস্যা সেইখানে এই পরার্থে চিন্তা করাটাই এক বিশেষ গুণের পরিচয়। যদি জিজ্ঞেস করা হয় কেন এই পরের জন্য  ভাবা, তবে কয়েকটা উত্তর  অবশ্যই  মনে আসবে। প্রথম এবং সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর  হলো যে আশ্রয়দাতা অত্যন্ত  উদার মনোভাবাপন্ন।  নাক সিঁটকে কোন কোন  সমালোচক  বলবে যে না না ব্যাপারটাকে এত সহজ সরলভাবে দেখাটা মোটেও  উচিত  হবেনা। তাঁদের  মতে দেখ বাপু কোন স্বার্থ পিছনে লুকিয়ে আছে কিনা কিম্বা এটাও বলা অস্বাভাবিক  নয় যে তাঁর  আত্মমহিমার প্রচার  করা।সে যাই  হোক, ব্যাপারটাতে যে একটা মানবিক  দিক আছে সেটা একেবারেই  অনস্বীকার্য। 

সন্ধে হতেই কিচির মিচির কলরবে পাখিরা শশব্যস্ত নিজের নিজের জায়গা দখল করতে। রোজ করবে তারা ঝগড়া অথচ আশ্রয়দাতা গাছ কিন্তু নির্বিকার।  সে কিন্তু ভুলেও মাথা ঘামায়না তাদের  এই কলহে। সে জানে অন্ধকার  একটু বেশী ঘনিয়ে এলেই সবকিছুই  থিতিয়ে যাবে এবং তার অল্পক্ষণ পরেই ঘুমে ঢুলতে থাকবে ক্লান্ত এই পাখিরা। আচ্ছা, এই পাখিগুলো তো একই জায়গায় থাকে, তাহলে রোজ ঝগড়া কেন? ভাবতে বসলে মনে হয় যে প্রতিদিন আশ্রয়স্থলের কিছু না কিছু পরিবর্তন  অবশ্যই  হয়। প্রতিদিন গাছের তলায় একগাদা পাতা  পড়ে থাকে, চাঁদু বা মনোজ রোজ ঝাঁট দিয়ে  জায়গাটা পরিষ্কার  করে বলে আমরা ঠিক বুঝতে পারিনা যে গাছের মধ্যে কি পরিবর্তন  এসেছে। যে পাতার ডালে আগেরদিন শালিকটা বা বুলবুলিটা বসেছিল  সেটা ঝরে পড়ে গেলে তো তাকে অন্যত্র বসতেই  হবে আর সেইখানে যে আগেরদিন  বসেছিল  তারসঙ্গে তো ঝগড়া হবেই। কিন্তু গাছের এটা গা সয়ে গেছে। সে জানে যে পুরাতনকে একদিন  না একদিন  নতুনকে  জায়গা ছেড়ে দিতেই হবে এবং আবহমান  এই চক্র চিরদিন  চলতে থাকবে যতদিন  তার নিজের  অস্তিত্ব ই টলোমলো না হয়ে যাবে। আশ্রয়দাতা গাছ এখন এক শান্তির  নীড়ে  পরিণত হয়েছে, পাখিদের  কলরব সব গেছে থেমে, ঢুলুনি শুরু হয়েছে তাদের। পরদিন  ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই আবার  শুরু হয়ে যাবে পাখিদের  ব্যস্ততা এবং গাছ আবার  সেই প্রতীক্ষায় থাকবে সন্ধে নামার জন্য কখন তার অধিবাসীরা আবার  শুরু করবে কিচির মিচির করে ঝগড়া।

মানুষের  মধ্যেও  রয়েছে গাছের মতন মানসিকতার লোক যদিও  এখন অনেকটাই  গেছে কমে। পঞ্চাশ ষাট বছর আগে বহু সহৃদয় ব্যক্তি ছিলেন  যাঁদের আশ্রয়ে বহু দুঃস্থ অথচ মেধাবী ছেলেরা নিখরচায় খেয়েদেয়ে স্কুল ও কলেজে পড়েছেন এবং পরবর্তী জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। কেউ হয়েছেন  মাস্টারমশাই, কেউ বা আবার  অধ্যাপক আবার  কেউ বা হয়েছেন  ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বা উকিল বা জজ। তাঁরা কি নিজের  স্বার্থ  দেখেছিলেন  এই ছাত্রদের গড়ে ওঠার পিছনে? না, একদমই  নয়। হয়তো বা মনের মধ্যে একটা সুপ্ত বাসনা লোকের  হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া। তাঁদের  অনেকেই ছিলেন  হয়তো সুদের ব্যবসায়ী বা বড়মাপের জমিদার বা রাজা এবং ব্যক্তিগত জীবনেও হয়তো খুব স্বচ্ছ মাপের  ছিলেন না কিন্তু তাঁদের  মধ্যেও  অনেকেই এই আশ্রয়দাতার ভূমিকা  পালন  করেছিলেন এবং স্কুল, কলেজ  বা হাসপাতাল তৈরির ব্যাপারে অগ্রণী ছিলেন। তাঁদের  এই অসামান্য দানকে কোনভাবেই  অস্বীকার করা যায় না। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া যায় তাঁরা নাম কামানোর জন্য এটা করেছিলেন (সমালোচকদের মতে) তবুও এটামানতেই হবে যে সমাজ এতে বহুলাংশে উপকৃত  হয়েছে। সমালোচকদের অনেকেই বলেছেন  যে তাঁদের  নিজেদের  স্বার্থসিদ্ধির জন্য এইসব কাজ করেছেন।  এইকথাটাকে একেবারে নস্যাৎ করে না দিয়ে একটু তাঁদের  দৃষ্টিভঙ্গিটাকে একটু গভীরে গিয়ে দেখা যাক। আগে বহু ভূমিপতিরাই নিজেদের  থাকার জায়গাকে বাসযোগ্য  করে তোলার  জন্য বহুলোককে জমিজমা  দিয়েছেন।  চাষী, ধোপা,  নাপিত, জেলে , কামার, কুমোর বা বামুনদের তাঁরা জমি বা পুকুর দিয়ে তাঁদের  নিজেদের  জায়গাটাকে খুব  সুন্দর এক গ্রামে পরিণত করেছেন।  গ্রামে তাঁরা স্কুল তৈরী করেছেন যেখানে আশপাশের গ্রাম  থেকে বহু ছেলেরা পড়াশোনা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।  এতে যে সেই ভূমিপতিরাই লাভবান  হয়েছেন তা নয়, দুই পক্ষই  এটা থেকে  উপকৃত  হয়েছেন।  কোন  জনপদ গড়ে উঠলে যে শুধু ভূমিপতিরাই  লাভবান  হন তা নয়, দুই পক্ষই উপকৃত  হন এর থেকে। অধুনা একমতের  প্রচলন হয়েছে যে শাসক এবং শোষক। শাসক মানেই তারা খারাপ  এবং তারা শোষণ করেছে দুর্বল সমাজকে এবং তাদের  মুনাফা বাড়িয়েই চলেছে এবং দরিদ্র আরও  দরিদ্র হয়েছে। অর্থনৈতিক  বৈষম্য  অবশ্যই আছে কিন্তু দুর্বল শ্রেণীর মনের মধ্যে এই বিষটা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তার নীট ফল আমরা দেখেছি যে একের পর এক শিল্প আমাদের রাজ্য থেকে অন্যত্র চলে গেছে এবং আমাদের  রাজ্যর স্থান প্রায় নীচের দিকে কিছু অত্যন্ত  অনগ্রসর  রাজ্যের  উপরে। কোনটা ভাল  আর কোনটা মন্দ  সেটা নিয়ে ভাবার  সময় হয়েছে।

আশ্রিত ও আশ্রয়দাতার উভয়ের ই স্থির মস্তিষ্কে চিন্তা করা উচিত  যে একে অন্যের  পরিপূরক এবং কেউ  কাউকে ছেড়ে থাকতে পারেনা। সহমর্মিতা একটা আলাদা জিনিস  এবং এটাকে যতদিন  বাঁচিয়ে রাখা যায় ততই  মঙ্গল। 

Saturday, 16 March 2024

গুরুকুল

গুরুকুল শব্দটা কানে এলেই মনটা যেন ফিরে চলে যায় পুরোন দিনে, চোখের সামনে ভেসে ওঠে একদল ছোট ছোট ছেলে তাদের মাস্টার মশাইএর কাছে পড়ছে। মাস্টার মশাই বা গুরুদেব মাটির দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে আছেন এবং মাঝে মাঝে একটা হাতপাখা দিয়ে নিজের শরীরকে একটু ঠাণ্ডা করে নিয়ে অর্ধচন্দ্রাকৃতি ভাবে বসে থাকা ছাত্রদের নানা জিনিস বোঝাচ্ছেন এবং ছাত্ররাও তাঁর কথা একমনে শুনছে। এটা খানিকটা টোলের মতন। অমুক চক্কোত্তির টোল কিংবা তমুক শাস্ত্রীর টোল নামেই পরিচিত ছিল।  কিন্তু এই টোলের থেকে  গুরুকুলের মধ্যে যে পার্থক্য ছিল সেটা হচ্ছে গুরুকুলে সমস্ত বিদ্যার্থীরাই  ছিল  আবাসিক অর্থাৎ সেইসমস্ত ছাত্ররা গুরুগৃহে থেকে পড়াশোনা করত এবং গুরুগৃহে সমস্ত কাজ তারাই করতো এবং সেখানেই খাওয়া দাওয়া পড়াশোনার সঙ্গে তারা করতো এবং শিক্ষাশেষে তারা নিজের নিজের ঘরে ফিরে যেত এবং তারাও শিক্ষাদানে ব্রতী হতো। অনেক সময়ই এই শিক্ষার্থীরা বহু দূরদূরান্ত  থেকে শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে আসতো। এই গুরুকুল  শুধুমাত্র পড়াশোনায় ই সীমিত থাকতো না, সঙ্গীতে ও অস্ত্রবিদ্যায় ও প্রচলিত ছিল। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের  গুরুদেবের  কাছে বা ওস্তাদজীর কাছে নাড়া বা গাণ্ডা বাঁধতে হতো এবং যতদিন  একজন গুরুর কাছে শিক্ষা সম্পূর্ণ  না হয় ততদিন সে অন্য কোন গুরু বা ওস্তাদের কাছে  যেতে পারত না। এইভাবেই  তৈরী হতো এক বিশেষ ঘরানা। এক ই রাগের সঙ্গীতশৈলীর পরিবেশন এক ঘরানা  থেকে অন্য ঘরানার থেকে ভিন্ন ধরণের থাকায় বোঝা যেত যে শিল্পীর কি ঘরানা।  অনেক সময় সঙ্গীত সম্মেলনে বিভিন্ন ঘরানার শিল্পীর  সমাবেশ  হতো এবং গুরুজী তাঁর শিষ্যদের নিয়ে নিজের  পরিবেশনের সময় আসতেন এবং নিজের পরিবেশন সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই শিষ্যদের নিয়ে আসর ছেড়ে চলে যেতেন।  এর একটাই উদ্দেশ্য ছিল  যে কোনভাবেই  যেন তাঁর শিষ্যরা অন্য  ঘরানার  শিল্পীদের  দ্বারা প্রভাবিত  না হন। মহাভারতেও এই গুরুকুলের  উল্লেখ  আছে। কৃপাচার্য  বা দ্রোণাচার্যের অস্ত্রশিক্ষা পরশুরাম  বা বলরামের  শিক্ষা থেকে অবশ্যই আলাদা ছিল।

ইদানিংকালে  গুরুকুলের  কথা প্রায় শোনাই যায়না। কিন্তু একেবারেই  শোনা যায়না তা ঠিক  নয়। যাঁরা পিএইচডি করেন তাঁদের একজন গাইডের প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে যাঁর তত্ত্বাবধানে তিনি রিসার্চ  করছেন  তিনি গুরু হলেও সেই গুরুকুলের সোঁদা গন্ধ বিহীন কারণ এখানে ছাত্রকে তাঁর  গুরুগৃহে  থাকতেও হয়না বা তাঁর সংসারের  যাবতীয় কাজ ও করতে হয়না। একটা কথা প্রচলিত আছে যে "কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ,  পাকলে করে ট্যাঁসট্যাঁস।" গুরুকুলের ছাত্রদের  পড়াশোনার  সঙ্গে চরিত্র গঠন ও হতো  এবং কাদামাটির তালকে  যে কোন রূপ দেওয়া যায় কিন্তু  মাটি শুকিয়ে গেলে তাকে আর অন্য কোন রূপ দেওয়া যায়না। সুতরাং, গুরুকুলের নাম শোনামাত্র মনটা একটু ছটফট করে ওঠে আধুনিক  গুরুকুলের চেহারা দেখতে।

রাঁচি থেকে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরে নেতারহাট বলে একটা জায়গা আছে যেখানে এই গুরুকুলের অস্তিত্ব আছে বলে জানা গেল। স্বাভাবিক ভাবেই মনে একটা চিন্তা উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করল। পরের  মুখে ঝাল খেয়ে ঠিক উপলব্ধি করা যায় না। সুযোগ একটা এসে গেল। অর্জুনের প্ল্যান মাফিক সবকিছুই  ঠিকঠাক  হয়ে গেল।  হোটেল প্রভাত বিহার ডিল্যুক্সের অনতিদূরে শ্যালেট হাউস যেখানে বিহার ও উড়িষ্যার  লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার এডোয়ার্ড গেট বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে তৈরী করিয়েছিলেন একটি মনোরম কাঠের বাড়ি এবং সেটা গ্রীষ্মকালীন বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো, এখন সেখানে একটি মিউজিয়াম  তৈরী হয়েছে। মনোরম পরিবেশ কিন্তু সাপ সম্বন্ধে বিশেষ  সতর্কীকরণ থাকায় ঘুরে দেখার  ইচ্ছে সম্বরণ করতে হলো।  মিউজিয়ামের একাংশ বন্ধ থাকলেও  ঘুরে ঘুরে অপরদিকের  দোতলা অংশে বিভিন্ন ধরণের সুষমামণ্ডিত কাঠের  কাজ বিশেষ আকর্ষণ করে। তারই পাশে চোখে পড়ল গৌতম আশ্রম। অনেকটা জায়গা জুড়ে এক একটা আশ্রম। কিন্তু সমস্ত আশ্রমের  গেট ই বন্ধ। মনে হচ্ছে এটাই হয়তো গুরুকুল।  কিন্তু কে দেবে এর আসল পরিচয়? একটার  পর একটা এইরকম আশ্রম।  কোনটার নাম প্রেম আশ্রম, কোনটার নাম আনন্দ আশ্রম। বিরাট এলাকা জুড়ে একটার পর একটা এইরকম বাড়ি এবং তার সংলগ্ন  জমি। অনেক খোঁজ করার পর একটা বাড়ির  সামনে দেখা গেল কয়েকটা ছেলে কোদাল দিয়ে মাটি কোপাচ্ছে। গাড়ি থেকে নেমে জিজ্ঞেস করতে জানা গেল যে ঐটাই  গুরুকুলের একাংশ। কিন্তু কোন বড় কোন মানুষ  চোখে না পড়ায় অনুসন্ধিৎসা মিটলনা।  ঠিক তার পাশেই আরও  একটা গেট খোলা থাকায় ভেতরে ঢুকতেই এক ভদ্রমহিলা বেড়িয়ে এলেন। আগে শুনেছিলাম  যে এই আশ্রমের  পরিচালিকা একজন গুরু মা বা মাতাজী।একটু হেসে নিজেদের পরিচয় দিয়ে আসার  কারণ বললাম। উনি আমাদের  ভেতরে আসতে বললেন। এরপর ভদ্রমহিলার  জায়গা নিলেন  একজন গাঁট্টাগোট্টা ভদ্রলোক যিনি ওঁর স্বামী।  ভদ্রলোক জানালেন  যে এই গুরুকুলে এইরকম  একুশটা আশ্রম রয়েছে এবং প্রত্যেক  আশ্রমে  রয়েছে পঁচিশ জন ছাত্র। তাঁর ই তত্ত্বাবধানে এইছাত্ররা থাকে এবং তাঁর স্ত্রী এই ছাত্রদের খাওয়া দাওয়া ও সমস্ত কিছুই  দেখাশোনা করেন। এই ছাত্রাবাসে বিভিন্ন  শ্রেণীর  ছাত্ররা থাকে এবং পড়াশোনা ছাড়াও  সমস্ত কাজ মায় ঘর ঝাঁট দেওয়া এবং বাথরুম  পরিষ্কার  রাখাও  তাদেরই  দায়িত্ব। এককথায় বলা যায় স্বাবলম্বী হতে শেখা এখানেই হয়। কথায় কথায় জানা গেল যে তিনি ফিজিক্সের  টিচার  এবং তিনি ডক্টরেট। একদম মনেই হয়না চেহারা দেখে, একটা সাধারণ  জামা গায়ে একজন ষণ্ডাগোণ্ডা ধরণের  লোককে দেখলে কেই বা মনে করতে পারে যে ইনি ডক্টর রাকেশ গুপ্ত, পিএইচডি। মানুষের  চেহারা দিয়ে কিছু বিচার  করা যায়না। তাঁর মতন এইরকম বিভিন্ন  শাখার  মাস্টার মশাই রয়েছেন।  যখন  ক্লাস  টেনের  ছাত্রদের  ফিজিক্সের  ক্লাস  থাকে তারা তখন তাঁর  ঘরে এসে পড়াশোনা করে এবং পরবর্তী ক্লাসের মাস্টার মশাইএর  ঘরে তারা চলে যায় এবং তাঁর  ঘরে অন্য  বিভাগের ছাত্ররা আসে। জানতে চাইলাম  যে এই স্কুলে মাস্টার মশাইরা ক্লাসে আসেন না এবং ছাত্ররা মাস্টার মশাইএর ঘরে আসেন , এতে কি বিশেষ  ফল হয়?  উনি জানালেন  যে ছাত্ররা একজন শিক্ষকের ঘর থেকে যখন  আরও একজন শিক্ষকের  ঘরে যায় , ঐ সময়টাতে তাদের  মনটাও একটু ভাল  হয় নিজেদের  মধ্যে কথোপকথনে  এবং  আগের  ক্লাসের যে পড়াটা হয়েছে  তার থেকে সাময়িক  মুক্তি এবং পরের  ক্লাসের  জন্য  মানসিক  প্রস্তুতি মেলে। যুক্তিটা  বেশ গ্রহণযোগ্য মনে হলো। বিরাট  খেলার  মাঠ  এবং  ছাত্রদের বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের  উৎকর্ষতা লাভের  জন্য  সমস্ত সুযোগ  রয়েছে। স্কুলের অ্যাডমিশনের সময় এককালীন  দুশো টাকা দিতে  হয় আর বাকি সমস্ত খরচ ঝাড়খণ্ড সরকারের। পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের পড়াশোনা এবং অন্যান্য বিষয়ে পারদর্শী করার এই সামগ্রিক  প্রয়াস অবশ্যই ধন্যবাদার্হ। ডক্টর গুপ্ত জানালেন  যে মেয়েদের  জন্য ও হাজারিবাগে  ঝাড়খণ্ড সরকারের  একটি স্কুল  রয়েছে। সরকারের  তরফে এই উদ্যোগকে সত্যিই  স্বাগত জানাতে হয়। তথাকথিত  পিছিয়ে পড়া রাজ্য যদি এই প্রয়াস নিতে পারে, অন্য রাজ্য কেন এই বিষয়ে পিছিয়ে থাকবে? সবকিছুই  কি রাজনীতির  আড়ালে হারিয়ে যাবে?

Monday, 11 March 2024

প্রেম আসছে

বসন্ত এসে গেছে, মদন দেব ও ইতি উঁকি ঝুঁকি মারতে শুরু করেছেন, সুযোগের অপেক্ষায় কাকে কখন তাঁর পঞ্চশরে বিদ্ধ করা যায়। আগে তাঁকে এত বেশি কারিগরি করতে হতো না কারণ ছেলেমেয়েগুলো ছিল  হ্যাবলার একশেষ। কিন্তু এখনকার  ছেলে ও মেয়ে ভীষণ  ক্যালকুলেটিভ,  ছোট্ট বয়স থেকেই আখেরে কোথায় লাভ হবে সেটা না জেনে এক পা ও এগোবে না। তা বলে কি খুঁজে পেতে দু চারটে হ্যাবলাও জুটবে না? আলবত  জুটবে এই আশায় বুক বেঁধে তিনি এদিক সেদিক খুঁজে বেড়াচ্ছেন সেই হ্যাবলাগুলোকে।

বসন্ত এলেও রোদের তাপ বেশ বেড়ে উঠেছে, ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে একটা গাছের তলা খুঁজছেন তিনি। সেটাও আজকাল  বড্ড অমিল। গাছ একটু বড় হতেই না হতেই বুকড  ফর শিবু দা বা বড় ঠাকুর বা শ্রী হনুমানজীর।  তাঁদের  মতো ছোটখাট দেবতাদের  কেউ পাত্তাই দেয়না। কিন্তু এটা মানুষ ভুলে যায় এই পঞ্চশরে বিদ্ধ না হলে জীবনটাই জ্বলেপুড়ে  খাক। ছোটবেলায় হলে কাট্টি, বড় বয়সে হলে ডিভোর্স।  আর ডিভোর্স যেন ঘরে ঘরে। কচিকাঁচা দম্পতি থেকে বুড়োবুড়ির ডিভোর্স যেন আকছার  ঘটনা। জজসাহেবরা পর্যন্ত হয়রান। কোর্টে উচ্ছেদ  আর বিচ্ছেদ  সামলাতে সামলাতে নিজের পারিবারিক জীবনে পর্যন্ত  অশান্তির  একশেষ। উৎস সেই একই  জায়গায়। মদনদেবের কথা তখন  মনে পড়ে। কিন্তু ততক্ষণে তিনি তো পগারপাড়।  অতএব,  মদনদেবের ও মন্দির তৈরী  করার তোড়জোড় করতে হবে। দরকার  হলে বিভিন্ন বয়সের স্বামী স্ত্রী বা প্রেমিক  প্রেমিকাদের মিছিল  করে ডেপুটেশন দিতে হবে। মদনদেব তো মিটি মিটি হাসছেন। যতই  বাবার মাথায় জল ঢালো বা শনিবার বড়ঠাকুরের সামনে ধর্ণা দাও বা  নির্বিঘ্নে জীবন যাপনের জন্য  হনুমান চালিশা  পড়, এই বিশেষ জায়গায় আমার  আশীর্বাদ ছাড়া এক পা ও চলতে পারবে না।হতে পারি আমি নাক কান গলার ডাক্তার  কিন্তু রাতে কানব্যথা  হলে আমি ছাড়া অন্য  কেউ সেখানে আসবে না। অতএব,  কর ভজনা আমার,  লাগাও মন্দির। 

প্রেম বললেই কৈশোরের প্রেমের  কথা মনে পড়ে। একটু কারো বিলোল কটাক্ষে হৃদয় হলো উদ্বেলিত,  তবেই না? মদন দেবের তীরগুলো যেন  ঠিক ছুঁচের  মতো, নরম চামড়ায় পুটুশ করে ঢুকে জ্বালা ধরাতে  পারে। কিন্তু কথায় আছে না, কাঁচায়  না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ট্যাঁসট্যাঁস।  সুতরাং, বয়স হলে চামড়া ও মোটা, তীর ও ঢোকেনা,  প্রেম ও আর আসেনা। তাহলে কিশোর বয়সের প্রেম ছাড়া আর কোনটাকেই প্রেম বলা যাবে না? যাবে, কিন্তু ব্যাপারটা একটু খটোমটো। অপারেশনের  আগে বুড়োমানুষের হাতে চ্যানেল করা হাসপাতালের স্টাফদের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ  হয়ে দাঁড়ায় যদিও  অনেকের কাছেই এটা  একটা জল ভাত।  শিরা খুঁজে পেতেই তাদের  হিমশিম খেতে হয়। ঠিক  সেরকমই বুড়োবুড়িদের মধ্যে প্রেম সঞ্চার করা। এরা অনেক সুখ দুঃখের মুখোমুখি হয়েছে। এদের  কাত করা বা হাতে চ্যানেল করা ও একই রকম কঠিন কাজ। মদনদেবকে অনেক ভেবেচিন্তে এগোতে হয়। প্রথমে দে বুড়োর সঙ্গে বুড়োর বৌ বুড়ির সংসারে আগুন  লাগিয়ে। ক্রমাগত  বুড়ির কাছে ধ্যাঁতানি খেয়ে খেয়ে বুড়ো একেবারে খাপচুরিয়াস। ভাল করে চোখে দেখেনা , কানে শোনেনা,  হাঁটুতে কোমড়ে উঠতে বসতে ব্যথা তবুও  জজসাহেবের সামনে ডিভোর্স নেবার  জন্য  আর্জি জানাতে আসা। বেচারা জজসাহেব ছেলের  বয়সী কিন্তু খাণ্ডারনি বুড়ির সামনে একেবারে কেঁচো।  বুড়োর প্রতি সমবেদনা থাকলেও এই বয়সে বুড়ো কি করে বাঁচবে এই চিন্তায় ঘোর মগ্ন। ঠিক করতে না পেরে শুনানির তারিখ  পিছিয়ে দেন এই ভেবে যে এর মধ্যে যদি দুই যুযুধান পক্ষ  নিজেদের  মধ্যে মিটমাট  করে নেয় বা ভগবান  যদি কোন  একজনকে তাঁর নিজের  কাছে ডেকে নেন এই ভেবে। কিন্তু মোটামুটি শক্ত সামর্থ্য বুড়োবুড়িদের ক্ষেত্রে ডিসিশন  নেওয়া সুবিধা  হয়। মদনদেব হয়তো এরকম ক্ষেত্রে অন্য এক জুড়িদের মধ্যে কাউকে আলাদা করে দেন এবং দুইজোড়া বুড়োবুড়িদের মধ্যে বিপক্ষ লিঙ্গের  মাঝে সেতুবন্ধনের চেষ্টা করেন। ওঁর একটা কেস করা নিয়ে কথা যেমন ভাল হোক, মন্দ হোক একটা পলিসি তো গছিয়ে দাও, আমার রোজগার হলেই হবে। সুতরাং এখানেও  তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।  এইভাবেই  দেখা যায় একজন প্রখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ যাঁর নিজেরই  রয়েছে বিবাহযোগ্য পুত্র ও কন্যা তিনিও তাঁর প্রেম করে বিয়ে করা স্ত্রীকে আইনত বিচ্ছেদ  নিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে চড়ে বসলেন।  একবারও  তাঁর মনে পড়লনা তাঁর  ছেলেমেয়েদের মনে সেটা কি রকম  প্রভাব ফেলবে। আগের দিনে হয়তো দাঁতে দাঁত চেপে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিত এবং প্রাকবিবাহ জীবনে অসম্পূর্ণ প্রেমের  সমাপ্তি ঘটাতে ব্যগ্র হতো এবং সেটাও অত্যন্ত  চুপিসারে কিংবা সেরকম কিছু না থাকলে নিষিদ্ধ পল্লীতে গিয়ে নিজেকে একটু হাল্কা করে আসত। কিন্তু আজকের  দিনে সবাই খুব সাহসী এবং অধৈর্য্য এবং চটজলদি সমাধান  হচ্ছে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া এবং সকল দ্বন্দ্ব বিরোধ  মিটিয়ে নিজেকে নতুন ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা তাতে  ছেলেমেয়েদের উপর কি প্রতিক্রিয়া হলো, তার থোড়াই কেয়ার। এইসব ক্ষেত্রে মদনদেবের কারিগুরি যে আছে সেটা কে অস্বীকার করবে? 
অতএব,  প্রেম ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও  থাকবে তবে কতটা ঘন সেটা পরিস্থিতির  উপর নির্ভরশীল।  সুতরাং, মদনদেবের  মন্দির  এবার  হলো বলে।

Monday, 4 March 2024

গুড় খাও/ গুড় যাও

সুবোধ বাবুর মেয়েজামাইরা এসেছে প্রায় ৪বছর পরে,  সঙ্গে তাদের ছোট্ট মেয়ে সদ্য বছর  বেরিয়েছে। ওরা যেখানে থাকে সেখানে ঠাণ্ডা, সুতরাং আমরা যেখানে গরম জামাকাপড় নিয়ে শশব্যস্ত,  ওরা একটা পাতলা টি শার্টেই স্বচ্ছন্দ । সুবোধ বাবুর স্ত্রী শমি ও  আজকাল ঠিক সবকিছু সামলে উঠতে পারেন না বয়সোচিত কারণে। সুতরাং একরকম বাধ্য হয়েই ন্যানি সেন্টারে করতে হয়েছে ফোন । খানিকক্ষণ পরেই মোটরবাইকের পিছনে বসে  ন্যানি এলেন। একটা ছোট্ট ইন্টারভিউ হলো, কোথায় কাজ করেছে,  কি ধরণের কাজ করেছে,  নাম ধাম, প্যান কার্ড, আধার কার্ডের ফটোকপি দেখে নিয়ে কি করতে হবে বুঝিয়ে  দেওয়া হল।
বাচ্চার কাজ করতে হবে  বলে স্নান করে নিতে বলা হলো। মিনু স্নান সেরে তুলির কাছে যেতেই তুলি একবার  চোখ মেলে দেখে নিল যে কার কাছে  তাকে যেতে হচ্ছে । ওদের  ওখানে তো মানুষ জন ই কম দেখা যায়,  সুতরাং একটা লোক অন্তত তার কাছে সবসময় থাকবে ভেবে কোনরকম  কান্নাকাটি  না করেই হাসিমুখে চলে গেল। কিন্তু খাওয়ানোর সময়ই হল বিপদ,  ও তো ইংরাজি ভিডিও  দেখা  ছাড়া খেতেই চায়না  আর মিনু জানেইনা ইংরাজি । ও কাকিমা, কি করে খাওয়াই বল তো? এই খুদে মেয়ে যে আমার  কাছে  একদম আসছে নি। শমি এবার প্রমাদ গুনলো। একদিন  এসেই যদি বলে পারছি না তাহলে তো সেন্টারে আবার  খবর দিতে হয়। খুবই ঠাণ্ডা মাথার মহিলা শমি, কোনরকম বিচলিত না হয়ে মেয়ে তিতলিকে বলল ভিডিও চালু করে দিতে।ভিডিও চালু হতেই ছোট্ট তুলি গিলে নিল । তিতলি বলে উঠল গুড জব। তারপর যতবার তুলি খাবার খায়  তিতলি বলে ওঠে গুড জব। তখনকার  মতো সমস্যার সমাধান হলেও পুরোপুরি  মিটল না। মিনুকে দেখিয়ে দেওয়া হল  কি করে ভিডিও চালু করতে এবং বন্ধ করতে হয় ।
মিনু  একটু চালু হলো এবং  তুলির সঙ্গে  ভাব ও জমলো। সুবোধ বাবুর তো কাজ কর্ম বিশেষ  কিছুই  নেই,   নাতি নাতনিদের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া। কিন্তু  তুলিকে খাওয়ানোর সময়  কি রকম  একটা  শব্দ কানে খটখট করে বাজছে। প্রত্যেক বার  গেলার পর মিনুর গলায়  আওয়াজ  বেরোচ্ছে  গুড় খাও,  গুড় খাও । যাদবপুর থেকে  বেশ কিছুদিন  হলো আখের গুড় কিনে এনেছেন এবং তা থেকে  তিনি তো রোজ ই খানিকটা  করে  খান। তাহলে এত গুড়  আসছে কি করে? মাঝে মাঝে  তিতলি ও তুলিকে খাওয়ার জন্য  উৎসাহিত করছে। তারপর মিনু ও বলতে শুরু  করল গুড় যাও যেটা সুবোধ বাবুর কান এড়ায়  নি। মিনুকে ডেকে বললেন যে গুড জব বলো। হঠাৎ ই মিনুর মুখের  চেহারাটা কেমন যেন  হয়ে গেল  আর বলল ," কাকু আমরা তো গেরামের লোক,  ইঞ্জিরি তো জানিনা , আর তুলি ও ইঞ্জিরি ছাড়া কিছুই  বোঝেনা,  আমাকে দিয়ে এই কাজ  হবেনা। তোমরা সেন্টারে  বলে অন্য  লোক  নিয়ে  নাও গো।" একেবারে থ বনে গেলেন তিনি । ও যদি চলে যায়  তাহলে আর যাই হোক  সুবোধ বাবুর  নিজের  যে কি হবে ভেবেই ভেতরে ভেতরে  শঙ্কিত হয়ে উঠলেন আর বললেন তুমি যেমন ইঞ্জিরি জানো, তেমনই বল। আর তুলিরা যতদিন  থাকবে  তুমি ছাড়া আর কেউ এ বাড়িতে  আসবে না।

পাত্র পক্ষ কন্যা পক্ষ

চর্বিত চর্বন এই বিষয়টি নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে এবং বিভিন্ন ভাবে এই ব্যাপারে তাঁদের  নিজ নিজ অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন। সেই হিসেবে দেখতে গেলে এই বহু আলোচিত বিষয়ে নতুন কোন সংযোজন হবে কিনা তাতেও যথেষ্ট সন্দেহ  রয়েছে । যদি কোনও ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েও যায় তবে নিজগুণে ক্ষমা করে  নেবার  জন্য  অনুরোধ থাকল। 
পাত্র পক্ষ বলতে যে ছেলের বিয়ে হচ্ছে তার  পরিবার  বা আত্মীয়দের  বলা হয় এবং  কন্যাপক্ষ বললে যে মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে হতে চলেছে তার পরিবার  এবং আত্মীয়দের  বলা হয়। কিছুদিন আগেও  পাত্র পক্ষ  মানেই হেব্বি রেলা আর পাত্রীপক্ষ সদাই ত্রস্ত কি হয় কি হয় ভেবে কিন্তু বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরেই একেবারে বিপরীত  চিত্র। হুঁ হুঁ বাবা, খুব  মজাকি করেছ, নাও এবার  বোঝ ঠ্যালা। এমন পিরকি দেব না, জীবনেও  এমুখো  হবেনা। বিয়ের  আগে পাত্র পক্ষের  হাঁকডাক  সব একদম ছুঁচ ফোটানো  বেলুনের মতন চুপসে যায়। কিন্তু কেন এমন অবস্থার উদ্ভব  হয়? বিয়ের দিন পর্যন্ত  পাত্র পক্ষের নানান বাজে বায়নার জেরে কন্যাপক্ষের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় হয়। এটা দিতে হবে, ওটা দিতে হবে, এসব করা চলবে না, আমাদের  এটাই রীতি এইসব নানান বায়নাক্কায় মেয়ের  বাবা মায়ের  অবস্থা রীতিমত  করুণ হয়ে ওঠে। বিয়ের দিন  বরযাত্রীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ  হয়ে ওঠে মেয়ের বাড়ির  লোকজন। লুচিটা কাঁচা হয়ে আছে  বলে ছুঁড়ে ফেলে দিল  কিংবা মাছের ছালটাই সার বলে মন্তব্য  করল কিংবা মাংসটা  কি দাদু পাঁঠার বলে মন্তব্য করতে থাকল এবং একটা বরযাত্রীর বাঁদরামোই অন্যদের মধ্যে সংক্রামিত হতে থাকল।  কিন্তু এদের  মধ্যেই  অনেকেই  ভদ্রলোক  আছেন  তাঁরা লজ্জ্বা পেলেও সংখ্যায় কম হবার  কারণে তাঁদের  মিনমিনে প্রতিবাদ বাঁদরগুলোর অসভ্যতার কাছে ম্রিয়মান  হয়ে গেল। কিন্তু এদের মধ্যেই  যদি এক আধজন  কেউকাটা থাকে তাহলেই  জিনিসটা আর বেশীদূর  এগোয় না। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার  তা হয়ে গেছে। একবার মনটা বিষিয়ে গেলে আর কিছুতেই তা পূর্বাবস্থায় আসেনা। কথায় আছে না, হাড় ভাঙিলে  জোড়া লাগে মন ভাঙিলে আর তো নয় , এখানেও সেই একই  ব্যাপার। 
বিয়ে শেষ।বরযাত্রীরা সব ফিরে গেছে। পরদিন  কান্নাকাটির পালা শেষ  হলে কন্যা চোখের জলে বুক ভাসিয়ে বিদায় নিয়েছেন এবং মেয়েদের  বাড়িতে এক শূন্য  নিস্তব্ধতা।  কালরাত্রি( মানে বিয়ের  পরদিন  রাত্রে) বিবাহিতা স্ত্রী তাঁর স্বামীর  সঙ্গে শোবেন না। এ এক মহাজ্বালা। একে তো যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে সে ই অজানা তার ওপর তাদের  পরিবারের অন্য লোকজনদের  সঙ্গে যদি শুতে হয় তাহলে যে কি অবস্থা তা সহজেই  অনুমেয়। তার সুবিধা অসুবিধার কথা জানানোর জন্য  মেয়ের  বাড়ি থেকে মেয়ের ই ঘনিষ্ঠ  কেউ আসত এবং তার কি চাই বা না চাই এইসব কথাগুলো  বলত। এ তো গেল চল্লিশ পঞ্চাশ বছর আগের  বিয়ের  কথা।
এবার  আসা যাক এখনকার  বিয়ের  কথায়। এখনকার  বেশিরভাগ ছেলে মেয়েই  নিজেদের  পছন্দের  জীবন সাথী খুঁজে নেয়। বাবা মায়ের  ঝক্কি অনেকটাই কমে যায়। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই  শোনা গেল যে অমুকের  আবার নাকি বিয়ে।  মানে? মানে ঠিক বনিবনা  হচ্ছেনা তাই জীবনসাথীও পাল্টানো দরকার।  এ তো একেবারে হক কথা। তুমি স্বামী বলেই যা খুশি করবে আর আমি তা চুপচাপ মেনে নেব? অতএব,  পথ দেখ বাপু।  আমি চললাম। কোনটা ভাল আর কোনটা মন্দ তা নিয়ে বিস্তর তর্ক বিতর্ক  হতে পারে কিন্তু আসল লক্ষ্য  তো সংসারে শান্তি। কিন্তু সেই শান্তিটাই যদি না থাকে তাহলে কি হবে? নারীবাদীদের  কথায় মেয়েরা কি চিরকাল  পড়ে পড়ে মার খাবে? অতএব  বেরিয়ে এস বাপু,  আমাদের  দল ভারী কর। আমরা সেই কোন কাল থেকে একা একা চলছি, আমাদের  লেজটা যখন  কাটাই গেছে তখন  তোদের  লেজটা না কাটলে তো আমাদের সকলের  পক্ষে মানহানিকর।  অতএব,  আয় বাবা, আমাদের  দল ভারী কর।  নিজেদের  সংসারের বারোটা তো বাজিয়েইছে, তোরাই বা কেন আনন্দে থাকবি। তোদের স্বাধীনতা খর্বকারী স্বামী এবং তার পরিবার  নিপাত  যাক। এইসব বদবুদ্ধিধারী তথাকথিত সোশ্যাল অ্যাকটিভিস্ট আর যাই করুন না কেন কচিকাঁচাদের আখেরে কিছুই  লাভ হয়না। হয়তো অনেক ক্ষেত্রেই  স্বামী এবং তার পরিবারের  লোকজন  নানাধরণের মন্তব্যে মেয়েটির  জীবন  অতিষ্ঠ  করে তোলে এবং অনেক ক্ষেত্রেই  সেই শারীরিক  ও মানসিক  অত্যাচার  সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এইসব ক্ষেত্রে এইরকম নারীবাদীদের এগিয়ে এসে মেয়েটিকে প্রয়োজনীয় সাহায্য  দেওয়ার  ভীষণ ভাবে দরকার। এই সূক্ষ্ম সীমারেখাটির  জ্ঞান  খুব কম লোকের  মধ্যেই  দেখা যায় এবং বহুক্ষেত্রেই এর অপব্যবহার হয়।

আচ্ছা এই দুই ব্যবস্থার  মধ্যে কোন মেলবন্ধন  আনা যায় না? একটু চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি? দুই পক্ষই  যদি একটু সহনশীল হয় তাহলে মনে হয় কিছু একটা সমাধান সূত্র  বেরিয়ে আসতে পারে। সমাজ বিজ্ঞানীরা হয়তো এর সমাধান সূত্র খুঁজে পেতে পারেন।  কিন্তু আমরা তো আপামর জনতা।  জ্ঞানগম্যিও তথৈবচ।  তবে একটা কথা মনে হয় যে পারস্পরিক  সম্মান ও শ্রদ্ধা মিশ্রিত  ভালবাসা এর সমাধান  হলেও  হতে পারে। পারস্পরিক  সম্মান  তখনই  আসতে পারে যখন আমার  বদলে আমাদের  বলে ভাবতে পারি। আগে প্রত্যেক বাড়িতেই  পাঁচ সাতটা ছেলেমেয়ে খুবই  সাধারণ  ব্যাপার ছিল। কিন্তু সময়ের  সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাওয়া সমাজ ব্যবস্থায় যৌথ পরিবারের  অবলুপ্তি এবং ছোট্ট  নিউক্লিয়ার  ফ্যামিলির আগমন এর জন্য  অনেকটাই দায়ী। এখন কোন পরিবারেই  একটা বা দুটো ছেলেমেয়ের  বেশী দেখা যায়না। একটা সন্তান কোনরকমে মানুষ করতে না করতেই বাবা মা বুড়িয়ে  যায়। দ্বিতীয় সন্তানের  কথা ভাবলেই গায়ে  জ্বর আসে। কে ওঠাবে  এই হ্যাপা। আগে যৌথ পরিবারে বাবা মায়ের  সঙ্গে কাকা কাকিমা বা পিসিরা সামলে দিত।  এখন তো ছেলে মেয়েরা কাকা পিসির সম্পর্ক  ভোলার  পথে। আর একটা ছেলে বা মেয়ে হবার  সুবাদে  বাবা  বা মায়েরা  তাদের  সাধ্যের  বাইরে গিয়েও  ছেলে বা মেয়ের  শখ আহ্লাদ  মেটায়। সুতরাং সেই ছেলে বা মেয়েরা  ছোট থেকেই কারো  সঙ্গে ভাগ করে নিতে  শিখবে না এটাই কি স্বাভাবিক  নয়? এই স্বার্থপরতা একবার  জন্মে গেলে তার মূলোৎপাটন বাস্তবিক ই অসম্ভব । তা এরাই যখন  বড় হবে তখন  এরাই এক একজন মহা স্বার্থপর  হবে, কোন ব্যতিক্রম  হবে কি? না, নিশ্চয়ই না। এর পর আছে বৈষম্যমূলক  আচরণ।  অণু পরিবারের  সদস্য হবার জন্য কাকা, পিসিদের অনুপস্থিতি এদের  বিশেষ ভাবে ভাবায় না বরং মাসি, মামা ( যতই দূরের  হোক না কেন) এবং  দাদু, দিদিমারা এদের অনেক কাছের লোক হয় ঠাকুর্দা,  ঠাকুমার  চেয়ে। এটাই খুব  স্বাভাবিক।  বাচ্চারা ছোট থেকেই তার মায়ের  কাছে দাদু দিদিমার এবং মাসি মামাদের সম্বন্ধে জানে যেটা তাদের  বাবার কাছ থেকে শোনার  অবকাশ  পায় না। সুতরাং একপেশে ব্যবহারটাই  বেশী হবে এটাই আশা করা যায়।  মেয়ের মা বা বাবা তার  শ্বশুর বা শাশুড়ির  থেকে  বেশী আপন হবে সেটাই  বেশী স্বাভাবিক।  সুতরাং  সেটাই  যে নাতি  বা নাতনিদের  মধ্যে ছড়াবে  এটাই স্বাভাবিক। 
সব কিছুরই  কিছু ভাল  কিছু মন্দ   দিক আছে আর  আমরা যদি মন্দ দিকটা না দেখি তাহলে আমরাও  অসম্পূর্ণ  হয়ে যাব এবং সঙ্গে সঙ্গে  ভবিষ্যত  প্রজন্ম ও।  তাই সবাইকে অনুরোধ করি এই  সমস্যার  সমাধান  খোঁজার  জন্য।