Friday, 7 November 2025

ভ্রমণ পিপাসু বাঙালি

"বাসনার সেরা বাসা রসনায়" কোথায় যেন পড়েছিলাম। গ্যাসে, অম্বলে ভোগা বাঙালি রান্নাঘরে অনেক সময় ব্যয় করে এই রসনায় পরিতৃপ্ত হওয়ার জন্য। আরও একটা বিলাসিতা আছে বাঙালির , একটু ফাঁক পেলেই ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়া সে ট্যাঁকের রেস্ত যাই হোক না কেন। দুপুর বেলায় একটা ছোট্ট করে ভাত ঘুম ও বাঙালির আরো এক বিলাসিতা। এইসব নানা বিলাসিতায় ব্যস্ত এক পাঁচমিশালি বয়সের গ্রুপ যার আক্ষরিক নাম সান্ধ্যবাসর হঠাৎ ই চঞ্চল হয়ে উঠল কোথাও বেড়াতে যাওয়ার জন্য। সব গ্রুপেই কোন কোন অত্যন্ত অভিজ্ঞ লোক থাকেন যাঁরা এই বেড়াতে যাওয়ার খুঁটিনাটি সব কিছুই মাথায় রাখেন এবং কার কিসে সুবিধা, অসুবিধা সমস্ত জিনিস মাথায় রাখেন এবং অযথা বেশি কথা না বলে সুন্দর নিটোল ভাবে প্রোগ্রামটা সাজিয়ে রাখেন কিন্তু এই সাজানোর আগে গণতান্ত্রিক উপায়ে সকলের মতামত নেন এবং যাতে সবাইকে মোটামুটি একটা সন্তোষজনক ভাবে খুশী রাখা যায় সেই চেষ্টা আপ্রাণ করেন। গ্রুপে কিছু লোক থাকেন যাঁরা এই প্রোগ্রামের সার্থক রূপায়ণের জন্য প্রচণ্ড পরিশ্রম করেন এবং সবার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন। বাকিদের কেউ কেউ রসিকতা করে প্রোগ্রামটা জমজমাট রাখার চেষ্টা করেন এবং কিছু লোক রসিকতার খোরাক হয়ে অন্যদের বিনোদনে সাহায্য করেন। আর বাকিরা মাঝেমধ্যে ফোড়ন কেটে সর্বাত্মক সাফল্যে সহায়তা করেন।
সান্ধ্যবাসরে আলোচনা হতে থাকল কোথায় যাওয়া যায়। উঠে আসতে থাকে একের পর এক প্রস্তাব। শেষমেষ ঠিক হলো দক্ষিণ রায়ের জমিদারিতে গেলে মন্দ হয়না। শান্তিনিকেতনে সোনা ঝুড়ির মেলায় বাউলের কাছে শোনা গান " পরের জায়গা, পরের জমিন, ঘর বানাইয়া আমি রই, আমি তো এই জমির মালিক নই" মনে পড়ে গেল। দক্ষিণ রায়ের মুলুকে যাওয়া হবে অথচ দক্ষিণ রায়ের কোন মত নেওয়া হলোনা। অনেক সাতপাঁচ ভেবে যাত্রা স্থির হলো। মত নেওয়া হলে জমিদার বাবু হয়তো দর্শন দিতেন আর তাঁর অমতে গিয়ে দর্শন প্রার্থী হলে তিনি দেখা দেবেন কিনা সেটা তাঁর একান্তই মর্জির উপর নির্ভর করছে। যাই হোক, ক্যাপ্টেনের ঘুঁটি সাজানো শুরু হলো। পারফেক্ট প্ল্যানিং শুরু হলো নীরবে এবং তার রূপায়ণ সার্থক হলো এই দ্বিতীয় সারিতে থাকা বিশেষ কয়েকজনের অমানুষিক পরিশ্রমের ফলে। যাতায়াতের সুন্দর ব্যবস্থা, মাঝপথে একটু পেট পূজোর ব্যবস্থা এবং খাওয়া দাওয়া ও বিনোদনের সমস্ত ব্যবস্থা করা প্ল্যানিং এর এক অঙ্গ বিশেষ এবং সমস্ত যাত্রার সফল রূপায়ণ দলের অন্য সমস্ত সদস্য ও সদস্যার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফল।
নভেম্বরের ৫ তারিখে সকাল সাড়ে ছটায় বিরাট লাক্সারি বাস এসে গেছে এবং সান্ধ্যবাসরের অধিকাংশ লোকই এসে গেছেন চাকা লাগানো স্যুটকেস নিয়ে এবং কাঁধে একটা ছোট্ট ব্যাগ যেটা টুকিটাকি দরকারি জিনিসে ভরা। সকাল সাতটায় নধরকান্তি বাসটা একটু যেন নড়ে উঠলো আর শুরু হলো দক্ষিণ রায়ের জমিদারির উদ্দেশ্যে যাত্রা। ঘন্টা দেড়েক চলার পরে এল চা খাওয়া এবং হাত পা ছাড়ানোর জায়গা মালঞ্চের  কাছে নোনা মাটির রেস্তোরাঁ। সেখানে আগে ভাগে বলে রাখা লুচি, আলুর তরকারি ও বিশেষ ভাবে অর্ডার দেওয়া দরবেশ সকলের পেট ও মন জয় করে নিল এবং পরে গরম চা শরীর ও মনকে তরতাজা করে তুলল। আবার যাত্রা শুরু, ফের ঘন্টা দেড়েক চলার পর এল গদখালি। সেখানে নেমে মালপত্র কুলির মাথায় চাপিয়ে  লঞ্চের উদ্দেশ্যে যাত্রা। নীচের ডেকে মালপত্র ও উপরের ডেকে বর্ষীয়ান ও বর্ষিয়সী সদস্য ও সদস্যাদের একে একে তুলে লঞ্চ চলতে শুরু করল দক্ষিণ রায়ের জমিদারির উদ্দেশ্যে। তখন চলছে ভাটার টান , তাই পোঁছাতে লাগল দেড় ঘন্টার উপর। এদিক সেদিক বাঁক নিয়ে পৌঁছে গেল দুলকি জে এফ এম সি দ্বীপে যেখানে রয়েছে হোটেল সোনার বাংলা এবং সেখানেই আমাদের থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে। মালপত্র ও বয়স্ক সদস্য ও সদস্যাদের ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে বা এয়ারপোর্টে চলা মোটরগাড়িতে চাপিয়ে এবং মালপত্র পাঠিয়ে দিয়ে বাকিরা পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেল অনতিদূরে অবস্থিত হোটেলে। চেক ইন করে সমস্ত মালপত্রে লাগানো স্টিকার অনুযায়ী নির্ধারিত ঘরে এবং হাতমুখ ধুয়ে এসেই রেস্তোরাঁয় বসে খেয়ে নেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে সুইমিং পুলে জলের মধ্যে দাপাদাপি করা। সবাই তো আর সাঁতার জানেন না, তাঁরা অন্যদের দাপাদাপি দেখে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে নিলেন এবং অনেক ছবি মোবাইলে ধরে রাখলেন। এরপর যে যার রুমে চলে গেলেন এবং সন্ধ্যে বেলায় হাই টিতে অংশ গ্রহণ করে স্থানীয় অধিবাসীদের নৃত্য পরিবেশনায় সময় কাটাতে যাওয়া হলো। তাদের সঙ্গে আমাদের ও কয়েকজন নাচ গানে মাতিয়ে দিল। এরপর ই একটা মজার ঘটনা ঘটল। হোটেল সোনার বাংলা বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে অনেকগুলো ব্লক তৈরী করেছে। সবকটা ব্লক দোতলা এবং উপর নীচ করে চারটে করে ঘর আছে অর্থাৎ ছোট গ্রুপ হলে একটা ব্লকেই সীমিত থাকবে এবং অন্য কোন লোকের উপস্থিতি থাকবে না আর বড় গ্রুপ হলে দুটো তিনটে ব্লকেই আবদ্ধ থাকবে। আমাদের পঁচিশ জনের গ্রুপে সবাইকেই দোতলায় রাখতে গিয়ে বেশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে হয়েছে। ঝুমুর নাচ দেখে ঘরে ওষুধ খাওয়ার জন্য একাই ঘরে ফিরছি। রাতে আলো আঁধারে রাস্তাটা কেমন যেন গুলিয়ে গেল। এদিক ওদিক ঘুরে ও জায়গাটা ঠিক বাগে আসছে না, কয়েকটা চক্কর লাগিয়েও নিজের ব্লকটা খুঁজে পাচ্ছি না, হঠাৎ ই মনে পড়ল দক্ষিণ রায়ের কথা আর মূহুর্তেই জমিদারের রাগত চক্ষু আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সব দিকটাই ঘেরা আছে কিন্তু তিনি ক্রুদ্ধ হলে কারো কিছু করার থাকেনা। আর তিনি ধরলে তো আর কথাই নেই। ভয়ে লোমগুলো খাড়া হয়ে উঠল। টর্চের নতুন ব্যাটারি বেশ অনেক দূরেই আলোকপাত করে কিন্তু আমি খেয়াল করলাম যে আলোটা ঠিক এক জায়গায় ফোকাস করছে না, কেমন যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে আর ঐ কাঁপা আলোতেই দূরে একটা লোক দেখতে পেয়ে এই ভাই ,এই ভাই বলে ডাকতে থাকলাম। লোকটি কাছে আসার পর তাকে ব্লকের নম্বরটা বলে জিজ্ঞেস করায় সে জানালো যে আমি এই দিকে কেন এসেছি? আরও ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল।
 ভাই, একটু দেখিয়ে দিন না ব্লকটা।
লোকটা আমায় সঙ্গে করে নিয়ে এসে বলল, এবার বাঁ দিকে ঘুরে ডান দিকে গেলেই আমাদের ব্লকটা এসে যাবে। পকেটে ছিল মোবাইল কিন্তু নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না বলে ওটার কথা আর মাথায় আসেনি। যাই হোক, টর্চের আলোয় ব্লকটা খুঁজে পেয়ে ভগবানকে অনেক ধন্যবাদ জানালাম। দোতলায় উঠে দরজা খুলেই দরজাটা বেশ ভাল করে আটকে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। খানিকটা ধাতস্থ হয়ে ওষুধটা খেলাম কিন্তু খিদে তো কোন দিক দিয়ে পালিয়েছে। যেতেই ইচ্ছে করছে না, তবে ওষুধটা খাওয়ার পর একটু মনে জোর পেয়ে বেরিয়ে পড়লাম রেস্তোরাঁর দিকে। একটা কথা ছেলেবেলায় শুনতাম, সদা সত্য কথা বলিবে, কদাচ মিথ্যা কথা কহিবে না। কিন্তু এই সত্য কথাটা বললে যে নিতান্তই ডরপোঁক বলবে সকলে এটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনেক সাহস সঞ্চয় করে সত্যি কথাটাই বলে ফেললাম। দক্ষিণ রায়ের অনেক প্রতিপত্তি শুনেছি কিন্তু তার চিন্তা ও যে কপালে এত ভাঁজ ফেলে সেটা জানা ছিল না।
পরদিন সকাল আটটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট করে বেরোতেই হবে সুন্দরবনের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখতে। দেরী হলেই সময়মতো লাঞ্চ করে বেরোতে পারা যাবে না এবং বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা সেই সময়ের মধ্যে বেরোতে না পারায় কোন দ্বীপে নামা গেলনা কিন্তু লঞ্চে চড়ে বিভিন্ন দ্বীপের পাশ দিয়ে পরিক্রমা করা হলো এবং হোটেলে ফিরেই রেস্তোরাঁয়। স্যুটকেস গোছানোই ছিল এবং কালক্ষেপ না করে ফিরে আসা লঞ্চের দিকে। ভাটার টানে লঞ্চের গতি বাড়ানো যাচ্ছে না, গদখালিতে থাকা বাসে উঠতে বিকেল  গড়িয়ে চারটে। অনেক বয়স্ক সদস্য, সদস্যা ছিলেন।ফিরে আসার পথে আবার সেই নোনা মাটির রেস্তোরাঁয় চায়ে গলা ভেজানো এবং সঙ্গে আলুর টিক্কা ও পনীর পকোড়া। জমাটে এই সফর এসে শেষ হলো রাত্রি আটটার কিছু পরে। কাণ্ডারী আশিস রায় ও তাঁর সুযোগ্য সহযোগী সুব্রত চৌধুরী, উতথ্য লাহিড়ি এবং দেবজ্যোতি ঘটক, অমিত রায় এবং লালমণি চক্রবর্তীর অসাধারণ প্রয়াসে দক্ষিণ রায়ের জমিদারি দর্শন এক দারুণ অভিজ্ঞতা।ফেজ থ্রির অধিবাসীবৃন্দদের সনির্বন্ধ অনুরোধ ফ্ল্যাটের মধ্যে নিজেদের আবদ্ধ না রেখে সান্ধ্যবাসরে যোগদান এবং আমাদের এই ফেজকে সবদিক দিয়ে এক আদর্শ বাসস্থান গড়ে তোলার। এতবড় একটা প্রজেক্টকে সার্থক রূপ দিতে অনেক সময় কিছু ভুল ত্রুটি হতে পারে কিন্তু তার থেকেও অনেক বড় এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অগ্রগতি। আসুন আমরা সবাই এগিয়ে আসি এর বাস্তবায়নে।

Sunday, 12 October 2025

গল্প না ছাই

কথা বলতে যারা ভালবাসে তাদের পড়াশোনা বিশেষ কিছু হয় বলে মনে হয়না কারণ তারা তো চিন্তাই বেশীক্ষণ করতে পারেনা। কিন্তু মানুষ হিসেবে তারা মোটামুটি মন্দ হয় না। তাদের সবাই বাচাল বলে, খুব গভীর কিছু আলোচনার মধ্যে এমন একটা মন্তব্য করে বসে যে উপস্থিত সব লোক না হেসে পারেনা। এইরকম ই একজন মানুষ ছিল সৌম্য বা ডালু। ডালুর ভাল নাম কজন ই বা জানে? স্কুলে, কলেজে এমনকি ইউনিভার্সিটিতেও তার পুরোনো খোলস সে ছাড়তে পারেনি। ডালু যখন কোন কথা খুব সিরিয়াসলি ও বলতো সবাই ভাবত যে ও বোধহয় কোন মজার কথাই বলছে। ডালুর এক ট্রেন সফরের কথা সবার সামনে বলছে কিন্তু সবাই ভাবছে এবার বোধহয় কোন মজার কথা বলবে কিন্তু ওর বক্তব্য শেষ হবার পর কেউ ভাবতেই পারছেনা যে এর মধ্যে কি আর এমন বিশেষত্ব। এটা তো একদমই ডালু সুলভ নয় অর্থাৎ ডালু যে কোন সাধারণ কথা অন্যদের মতো বলতে পারে এটাই কেউ ভাবতে পারছে না।

কলকাতা থেকে টেলিগ্রাম এসেছে," Father ill, come soon."  তখন এটা একটা রেওয়াজ ছিল কোন ছুটিছাটা নিতে হলে এইধরণের একটা টেলিগ্রাম পাঠানো হতো। টেলিগ্রাম এসেছে অফিসে। ম্যানেজার চেম্বারে ডেকে পাঠালেন ডালুকে আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর প্রতিক্রিয়া দেখতে লাগলেন যে টেলিগ্রাম টা পাওয়ার পর। 
স্যার, আমাকে বাড়ি যেতে হবে ।
বাড়ি যেতে হবে মানে? এত কাজ, মাসের প্রথম, বাড়ি যেতে হবে বললেই হবে? তোমার এই কাজ কে সামলাবে?
মনে মনে একটা খুব খারাপ গালাগালি এল কিন্তু সেটা সামলে খুব মোলায়েম করে বলল যে ,"স্যার আমিই বাবার একমাত্র ছেলে, বাবার বিপদে আমি না গেলে কে দেখবে, বলুন।" ওর মুখে এসে গেছিল যে আমি না গেলে কি পাড়ার পঞ্চু এসে দেখবে। ম্যানেজার একটু নরম হয়ে বললেন ,"আচ্ছা শোন, তুমি যাও কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে হবে।"
ডালু বুঝল যে ব্যাটা একটু নরম হয়েছে। হ্যাঁ স্যার, ঠিক আছে স্যার বলে ধন্যবাদ দিয়ে নিজের কাজগুলো পাশের সহকর্মীকে বুঝিয়ে দিতে লাগল।
আসলে সবটাই একটা সেটিং। এতদূরে থেকে হঠাৎ বাড়ি যাব বললেই কি ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায়? আগের দিন সন্ধ্যা বেলায় পাণ্ডিয়ার বাড়ি কাম অফিস হয়ে বাড়ি গেছে টিকিটের জন্য। পাণ্ডিয়া ছিলেন খুব করিৎকর্মা লোক। একদিন আগে জানালেও উনি সাধারণ টিকিট কেটে টিকিট চেকারের সঙ্গে কথা বলে কোন কামরায় উঠতে হবে বলে দিতেন। এমন ই ছিল তাঁর যোগাযোগ, নিতেন মাত্র দশ টাকা বাড়তি। অবশ্য দশটাকার তখন অনেক দাম। কিন্তু পাণ্ডিয়া স্টেশনের কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে সব বলে দিতেন এবং টিকিট চেকারের সঙ্গে দেখা করিয়ে তবে উনি ফিরে আসতেন। এতটাই ছিলেন প্রফেশনাল।

এইরকম ই একটা দিন যখন চেন্নাই হাওড়া মেলে পাণ্ডিয়া উঠিয়ে দিয়েছেন এক কামরায় যেখানে ডালু ছাড়া আর জনা তিন চারেক অন্য লোক আর বাকি সব ছেলেমেয়েরা গরমের ছুটিতে বাড়ি ফিরছে । ডালুর মুখ নিশপিশ করছে কথা বলার জন্য। বাকি যে তিন চারজন তারা কামরার এক প্রান্তে নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় ব্যস্ত এবং মনেই হয় তারাও হয়তো চেন্নাই থেকেই উঠেছে। এই ট্রেন যাত্রায় একটা জিনিস লক্ষ্য করা যায় যে প্রথমে যারা ওঠে তাদের মধ্যে যে আন্তরিকতা বা আলাপচারিতা জমে ওঠে, মাঝপথে ওঠা কোন লোককেই তারা আর সেই গ্রুপে ঢুকতে দেননা। এমনকি পাশের ক্যূপের যাত্রীরাও অন্য লোক বলেই গণ্য হন। আর এখানে তো ডালু এক প্রান্তে আর ছাত্রছাত্রী বাদে লোকগুলো অপর প্রান্তে। সুতরাং, জমবে না, এই ছেলেমেয়েদের সঙ্গেই ভাব জমিয়ে চলতে হবে। ষোল সতেরো ঘন্টার যাত্রা যদি মুখ বুঁজে যেতে হয় তাহলে নির্ঘাত ও অসুস্থ হয়ে পড়বে, বাবাকে দেখতে গিয়ে ওকেই কে দেখে সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। যাই হোক, শ্রীকাকুলামে ট্রেন এসে পৌঁছালো। কামরায় বেশ হকার উঠেছে। এই একটা দারুণ জিনিস সেকেন্ড ক্লাস কম্পার্টমেন্টে। এখানে বিভিন্ন রকম আওয়াজ করে ভিন্ন ভিন্ন হকার ওঠে এবং তাদের সঙ্গেও দুচারটে কথা বিনিময় হয় জিনিস কেনার সময়। খোলামেলা কামরার আলাদাই মেজাজ। চিপস আর চানাচুরের দুটো করে প্যাকেট কিনে একটা সামনে বসা কলেজের ছাত্রটিকে দিল। কিছুতেই নেবেনা সে আর ডালুও ছাড়বে না। হাজার হলেও ডালুর বয়স বেশি এবং লোকজনকে বিশ্বাস করানোতে ও একজন আদর্শ লোক। ছেলেটাকে পটিয়ে ও তার হাতে গুঁজে দিল একটা চিপস ও চানাচুরের প্যাকেট। ধীরে ধীরে জমে উঠল কথাবার্তা। ওঁর কাছেই জানতে পারল যে ওরা ম্যাঙ্গালোরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। এর ই মধ্যে একটা ছোট খাটো চেহারার ভীষণ বুদ্ধিদীপ্ত মেয়ে নজরে পড়ল। এই ছোট মেয়েটা অতি আধুনিকা হয়েও পান খাচ্ছে। এই বয়সের ছেলেমেয়েরা সাধারণত পান খাচ্ছে এটা চোখেই পড়েনা। কোন সময় হয়তো অনুষ্ঠান বাড়িতে খাওয়ার পর খেলেও খেতে পারে কিন্তু ঐ ছোট্ট মেয়েটি পান খাচ্ছে আর সমস্ত ছেলেমেয়েদের বলে দিচ্ছে কি করতে হবে বা কি নয় এটা দেখে ডালু তো থ বনে গেছে। সামনে বসা ছেলেটার কাছে জানতে পারল যে মেয়েটি ঢাকা থেকে পড়তে এসেছে আর ওর নাম জার্মিন। কি দারুণ পার্সোনালিটি মেয়েটার। একে সুন্দর তার উপর যেভাবে কথাবার্তা বলছে কোন ছেলে বা মেয়ে তাকে অস্বীকার করতে পারছেনা। ওই মেয়েটির বাবার নাকি বিরাট ব্যবসা এবং মেয়েটিও প্রচুর পয়সা খরচ করে তার বন্ধুদের পিছনে। একে সুন্দরী তার উপর পয়সা খরচে কোন কার্পণ্য নেই, সুতরাং স্বাভাবিক ভাবেই ছেলেমেয়েরা যে তার কথা মেনে চলবে , এটাই খুব স্বাভাবিক। খাবার দাবার বেরোল ঝুলি থেকে। সবাইকে বিতরণ করার সময় ডালুকেও একটা দিল। খেতে খেতে গান ধরলো তারা, ডালুকেও বলল তাদের সঙ্গে গলা মেলাতে। ডালু ঠিক কাকুর পর্যায়ে না হলেও বড় দাদার মতন কিন্তু সেই সময় ডালু ও ভিড়ে গেল তাদের মধ্যে । রাতের খাবার এসে গেছে, খাওয়া দাওয়া করে সবাই গল্পে মত্ত হলো এবং অনেক রাত অবধি আড্ডা চলল। আর কয়েক ঘণ্টা পরেই হাওড়া স্টেশন এসে যাবে আর তার পরেই দীর্ঘ গরমের ছুটি এবং তারপর আবার ফিরে যাওয়া ও নিজেদের পড়াশোনায় মেতে ওঠা। 
ডালুর মনে পড়ে গেল ইউনিভার্সিটির দিনগুলোর কথা। ছুটির শুরুতে এবং ছুটি শেষে আবার পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে একত্র হওয়া, এটা একটা বিরাট ব্যাপার। কিন্তু এই এত বড় ব্যাচ একসাথে কলকাতা থেকে বাইরে পড়তে যাচ্ছে এটা সে কোনদিন দেখেনি। ডালুর একবার মনে হলো তাহলে কি আমাদের শিবপুর, যাদবপুর বা খড়গপুর আই আই টিরা তাদের জৌলুস হারিয়ে ফেলছে। না তাই নয়, এখনও তারা সেরাদের পর্যায়েই আছে তবে যা হারিয়ে গেছে তা হচ্ছে পড়াশোনা করার পরিবেশ। মেধাবী ছাত্র ছাত্রীরাই এখানে পড়তে আসে কিন্তু রাজনীতি এতটাই কলুষিত করে তুলেছে এই শিক্ষায়তনগুলি যে অভিভাবকরা আর ভরসা করতে পারছেন না। আমরা কি হৃত গৌরব ফেরাতে সচেষ্ট হবো না? 

Thursday, 18 September 2025

যুদ্ধ সতত

সকাল বেলায় হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ পেলাম যাতে লেখা আছে শঙ্খ আর মূর্খ ব্যক্তি অন্যলোকের ফুঁয়ে বাজে। কথাটা নিয়ে একটু গভীর ভাবে চিন্তা করতেই দেখলাম কথাটা একদম সঠিক। শঙ্খের প্রসঙ্গে পরে আসছি, আগে মূর্খদের নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। মূর্খ মানে কি পড়াশোনা না জানা লোক? তার মানে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আলোকিত করা লোকজন সবাই বিচক্ষণ? না, তা তো নয়, বরং বেশীরভাগ সময়ই দেখা যায় যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা সেরকম কিছু উল্লেখযোগ্য নয় কিন্তু তাদের বাস্তব বোধ অত্যন্ত প্রখর এবং জীবনে অনেক বেশী শান্তি প্রাপ্ত অথচ অনেক ডিগ্রিধারী মানসিক দ্বন্দ্বে ছিন্নভিন্ন এবং এর জন্য দায়ী তাদের বাস্তব বোধ কম থাকার জন্য বা নিজের অহমিকাকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য। আগের দিনের ঠাকুমা, দিদিমারা স্কুলের গণ্ডি না মারালেও প্রচণ্ড বাস্তববাদী হবার কারণে যৌথ পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিলেন যেটা আজকের দিনে বিরল যদিও টিভির সিরিয়ালে ঠাকুমা, ঠাকুর্দা, ভাসুর,দেওর, দা আর ননদ দের সংসার দেখা যায় এবং কূটকচালিতে ভরা অনন্তকাল ধরে চলতে দেখা যায় এবং সেই সময়টা অন্য কোন লোকের আগমন নৈব নৈব চ। এই ঝগড়া, বিবাদ আর পিছনে সমালোচনা অথচ সামনে মুখে মধু ঝরে পড়া আর যাই হোক বুদ্ধিমানের পরিচয় নয়। তবুও তাঁদের নেমপ্লেটে বা লেটার বক্সে পিতলের ফলকে জ্বল জ্বল করে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা। স্রেফ বাস্তব বোধ না থাকায় ব্যক্তিগত জীবনে তাঁরা প্রচণ্ড অসুখী। এঁদের অনেকেই কাকে কান নিয়ে গেল শুনেই কাকের পিছনে ধাওয়া করেন। এঁদের কি বলে অভিহিত করা যায় পাঠকের উপর ছেড়ে দেওয়াই বাঞ্ছনীয়।

এবার আসা যাক শঙ্খ প্রসঙ্গে। শঙ্খের ইতিহাস খুঁজতে গেলে একটু পুরাণের দিকে ফিরে যেতে হবে। শঙ্খাসুর বা পাঞ্চজন্য প্রভাস সমুদ্রের অতলে থাকা এক মহাদুষ্ট দৈত্য বা অসুর ছিল । কোন এক অজানিত কারণে সে মহর্ষি সন্দীপনীর ছেলেকে কিডন্যাপ করে সমুদ্রের অতলে তাকে শঙ্খের মধ্যে বন্দী করে রাখল। মনোবাসনা কি ছিল কে জানে?  কিন্তু মহর্ষির শিষ্যরা সব নামজাদা লোক যাঁরা হলেন কৃষ্ণ, বলরাম, সুদামা ও উদ্ধবের মতো অত্যন্ত ওজনদার। সুতরাং কিডন্যাপ করে এত সহজে ছাড় পাওয়ার মতো ব্যাপার নয়। শিষ‌্যরা ঘটনা জানতে পেরেই গুরুদেবের মুখের দিকে চাইতেই সম্মতি মিলল, বললেন," দেখ' তো হে বাপু, ব্যাপারটা কি?" গুরুদক্ষিণা  যদি দিতেই হয়  তাহলে আমার ছেলেটাকে একটু উদ্ধার  করে আন তো। আজকের দিনের মতো, কোন রহিস লোকের ছেলেমেয়েদের কেউ  কোন ক্ষতি করলে সমস্ত পুলিশ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়বে অপরাধীদের ধরার জন্য অথচ কোন এলেবেলে লোকজন প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হলেও পুলিশের কোন হেলদোল থাকেনা।  যাই হোক, কৃষ্ণ, বলরাম তো গেলেন এবং শঙ্খাসুর বা পাঞ্চজনকে হত্যা করেও গুরুদেবের ছেলেকে দেখতে পেলেন না। তবে হাল ছাড়ার লোক তো তাঁরা ছিলেন না , যমরাজের হেফাজত থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এলেন ছেলেকে। ফিরে এসে দেখেন পাঞ্চজনের হাড়গোড় সেই শঙ্খের আকার ধারণ করেছে। কৃষ্ণ সেই শঙ্খকে নিজের করে নিলেন এবং সেই থেকে সেই শঙ্খের নাম হলো পাঞ্চজন্য হরিশঙ্খ। এই শাঁখে ফুঁ দিলে যে নিনাদ সৃষ্টি হতো তা শত্রুদের হৃৎকম্প উপস্থিত করে দিত। মহাভারতের যুদ্ধে এই পাঞ্চজন্যের উল্লেখ রয়েছে এবং এই শঙ্খনিনাদেই শুরু হয়েছিল মহাভারতের যুদ্ধ এবং সূর্যাস্তের পরেই এর নিনাদে সেদিনের মতো যুদ্ধ বন্ধ হতো। 
এখনকার দিনের মতোই আগের দিনেও দেওয়া নেওয়ার বালাই ছিল। এখন আমেরিকা যেমন রাশিয়াকে প্রতিহত করার জন্য পাকিস্তানের সহায়ক তেমনি আগের দিনেও এর প্রচলন ছিল। অগ্নিদেবের প্রচুর ঘি খেয়ে অগ্নিমান্দ্য হলো মানে তাঁর মুখে কিছুই রোচেনা। ব্রহ্মার নিদান হলো, বাপু তোমার শরীরের চর্বি না কমালে তোমার এই রোগ সারবে না। এখনকার ডাক্তারের এই মত যদি কোন রোগী শোনে তাহলে সে চর্বি জাতীয় খাবার বা মিষ্টি খাওয়া কমিয়ে জিমে যাওয়া শুরু করবে বা প্রতিদিন দশহাজার কদম হাঁটা শুরু করবে আর মেয়েরা তো পারলে শুধু হাওয়া আর জল খেয়ে কাঠি সুন্দরী হতে চেষ্টা করবে। সেইরকম অগ্নিদেব ব্রহ্মার কথা শুনে খাণ্ডববন দহন করে নিজের অগ্নিমান্দ্য সারাবার পন্থা ঠিক করলেন কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র সেটা মানবেন কেন, অগ্নিদেব যতবার সেই চেষ্টা করেন দেবরাজ ইন্দ্র বৃষ্টি নামিয়ে ততবার আগুন নিভিয়ে দেন। অগত্যা বাধ্য হয়ে অগ্নিদেব কৃষ্ণ ও অর্জুনের শরণাপন্ন হলেন।  অর্জুন দের ও স্বার্থ ছিল । ইন্দ্রপ্রস্থ  স্থাপনের  জন্য দরকার  ছিল  জমি। অতএব , খাণ্ডববন পুড়িয়ে সেই জমি উদ্ধার করতে হবে। সুতরাং ,নামলেন মাঠে কৃষ্ণ ও অর্জুন , যুদ্ধ হল‌‌ ভয়ানক, খাণ্ডবদহন হলো, অগ্নিদেব হলেন সুস্থ এবং পুরষ্কার স্বরূপ কৃষ্ণ পেলেন  সুদর্শন চক্র এবং অর্জুন পেলেন গাণ্ডীব। কেউ আবার বলেন মহাদেব শিব নাকি বিষ্ণুর ভক্তিতে আপ্লুত হয়ে তাঁকে এই সুদর্শন চক্র দিয়েছিলেন আবার কেউ বলেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা সূর্যের শক্তিকে আহরণ করে এই চক্র বিষ্ণুকে দিয়েছিলেন আবার কারো কারো মতে স্বয়ং পরশুরাম নাকি কৃষ্ণের পাঠ সম্পন্ন হলে তাঁকে দিয়েছিলেন এই সুদর্শন চক্র। যাই হোক, যেখান থেকেই পেয়ে থাকুন না কেন বিষ্ণু বা কৃষ্ণের হাতের সুদর্শন চক্র অমোঘ এবং কোন শক্তিই তাকে প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখত না এমনকি শিবের ত্রিশূলের ও না। বিষ্ণুর হাতের গদার নাম ছিল কৌমুদকী। সেই যুগে গদার এক বিশেষ সম্মান ছিল। পৃথিবীবাসীকে দুর্জনের হাত থেকে রক্ষা করার প্রতীক অস্ত্র ছিল গদা, অনেকটা আজকের দিনে আমেরিকার মতো। কেউ বেশি বাড়াবাড়ি করো না, যা বলছি শোন নইলে পড়বে মাথায় ঘা।
বিষ্ণুর কথা যখন হচ্ছেই তখন শেষনাগের কথা না বললে তো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ফেনিল নীল সমুদ্রের উপর সোফায় শায়িত স্বয়ং বিষ্ণুর অর্ধশায়িত ছবি তো প্রায়ই দেখা যায়। ঐ সোফাটিই হচ্ছেন শেষনাগ। শেষ নাগের অপর নাম আদিশেষ যার অর্থ হলো সমস্ত কিছু বিনাশ হয়ে গেলেও তিনি থেকে যাবেন। মহামুনি কাশ্যপ এবং কদ্রুর সর্বজ্যেষ্ঠ সন্তান তাঁর ধার্মিক আচরণের জন্য স্বয়ং ব্রহ্মার আশীর্বাদে বিষ্ণুর সহায়ক হিসেবে থাকার সুযোগ পান। তাঁর উপর ই শায়িত বিষ্ণুর ছবি আমরা প্রায় ই দেখি। ত্রেতাযুগে বিষ্ণু বা রামের সহচর হিসেবে লক্ষণ রূপে দেখি এবং দ্বাপর যুগে তাঁর উপস্থিতি বলরাম হিসেবে। কলিযুগে তিনি কি অবস্থায় কার সহচর হিসেবে আছেন তা বলা কঠিন। তবে আমরা নিজেরা নিজেদের মতো করে ভেবে নিতে পারি।

যুদ্ধ যে শুধু এখন ই হচ্ছে তা নয়, ইতিহাস ঘাঁটলে বা পুরাণ ঘাঁটলেও দেখা যায় এই দেবতার সঙ্গে সেই দেবতার লড়াই। সবাই ভাবে আমি কিসে কম? আমি কেন ওর বশ্যতা স্বীকার করব? সবাই নিজেকে শক্তিশালী দেখতে চায় কিন্তু শক্তিশালী হতে গেলে যে স্বার্থ ত্যাগের প্রয়োজন হয় তা স্বীকার করার মতো মানসিকতা রাখতে পারিনা। যতক্ষণ অন্যদের কাছে মাথা ঝুঁকিয়ে যো হুজুর বলতে পারা যাবে, ততক্ষণ নিজেদের মান সম্মান খোয়া গেলেও প্রাণটা বেঁচে যেতে পারে কিন্তু যখন ই তাদের প্রয়োজন হবে তখন ই তাদের মর্জিমাফিক চলতে হবে নাহলেই বিপদ। যে মূহুর্তে হাত জোড় করা বন্ধ করে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হবে তখনই আসবে নানা দিক থেকে আঘাত কারণ কেউই পছন্দ করবে না যে হাত জোড় করা লোকটা আজ আমার চোখে চোখ রেখে চলছে। অতএব, আমাদের ই বেছে নিতে হবে আমরা কিভাবে থাকব। যুদ্ধ সব যুগেই ছিল, আছে এবং থাকবে কেবল রূপ টা হবে ভিন্ন কিন্তু তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি মানুষের মৃত্যু ও অপরিমেয় ক্ষতি।

Monday, 15 September 2025

গল্পের খোঁজে

মাথাটা একদম খালি খালি লাগছে, কোন চিন্তাই ঠিক ভালভাবে দানা বাঁধছে না তো গল্পের প্লট আসবে কি করে? একটা কিছু মাথায় এল তো মনে হচ্ছে এটা যেন কোথায় পড়েছি বা শুনেছি। ওটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখলে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাব কারণ ওটাও এক ধরণের চুরি যা নিজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার সামিল। তাই এই সাধারণ লোকটার কথাই তুলে ধরার চেষ্টা করা। হয়তো কেউ এই ধরণের লেখা লিখে থাকতে পারেন কিন্তু আমি নিজের কাছে পরিষ্কার যে এটা একান্তই আমার দেখা লোক যার প্রয়োজন সবার কাছে কিন্তু বড় ই উপেক্ষিত।

সাধু আমাদের এখানেই খুব সামান্য কাজ করে, সামান্য মানে যৎসামান্য,একদম বড় মুখ করে বলার মতো নয়। কবে এসেছিল এখানে সেটা হয়তো পুরনো লোকজন যাঁরা আছেন তাঁরাই বলতে পারবেন। এসেছিল যখন তখন সে রীতিমতো গাঁট্টাগোঁট্টা যুবক বিহারের কোন জায়গা থেকে।  গভর্নমেন্ট  হাউসিং কলোনি ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে শহরের উপকণ্ঠে , অ্যালটমেন্ট হচ্ছে ফ্ল্যাটের, লোকজন আসছে ধীরে ধীরে তাদের নতুন বাসস্থানে। অনেকেই এসেছেন ওপার বাংলা থেকে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে কোনরকমে প্রাণ বাঁচিয়ে, আশ্রয় নিয়েছেন কোন আত্মীয় বা পাড়াতুতো পরিচিতের বাড়িতে, তারপর ধীরে ধীরে নিজেদের কর্ম ও অধ্যবসায়ের জোরে পায়ের তলার জমি শক্ত করেছেন এবং আবার জেগে উঠেছেন। তাঁদের পরিশ্রমের প্রশংসা অবশ্যই করতে হয় কারণ এভাবে ঘুরে দাঁড়ানো সহজ কথা নয়। উপনগরী যেখানে গড়ে উঠেছে সেখানে আগে ছিল কচুরিপানা ভর্তি বিশাল জলরাশি। শোনা যায় যে এইখানে নাকি উগ্রপন্থীদের পুলিশের গাড়ি থেকে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হতো এবং পিছন থেকে তাদের গুলি করে মারা হতো। সত্যতা যাচাই করার সুযোগ হয়নি কিন্তু লোকমুখে যতটা রটে তার খানিকটা তো ঘটেই থাকে। যাই হোক, সরকারী উদ্যোগে না লাভ, না লোকসান করে বিশাল উপনগরীর ফ্ল্যাট গুলো আর্থিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হলো এবং বলাই বাহুল্য তৎকালীন সরকারের কাছের লোকরাই সবসময়ের মতোই সেই ফ্ল্যাটের সিংহভাগ দখল করে নিল( সরকারী অনুমোদনে) । শহরের নামজাদা লোকেরাও এলেন এবং কো-অপারেটিভ করার জন্য অনেক ফ্ল্যাটেই কোনরকম স্ট্যাম্প ডিউটি না দিয়েই ফ্ল্যাটের মালিকানা পেলেন। পরবর্তী কালে এঁরাই ফ্ল্যাটের মালিকানা বদলের সময় বিক্রেতা ও ক্রেতাদের কাছ থেকে কিছু সাম্মানিক মূল্য আদায় করলেন যদিও তাঁরা সরকারকে স্ট্যাম্প ডিউটি বাবদ পুরো টাকাই দিয়েছেন। প্রথম থেকেই সরকারের এই নেতিবাচক নীতি অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে নিয়ে গেছে। যাঁদের প্রকৃত সাহায্যের প্রয়োজন ছিল তাঁদের সঙ্গে যাঁদের ক্ষমতা ছিল এই টাকা দেওয়ার তাঁরাও এই লাভ পুরোপুরি ভাবে তুলে নিয়েছেন। নতুন জায়গায় নতুন প্রতিবেশী, পাঁচমিশালি মনোভাব মোটামুটি একটা সাধারণ মতে পৌঁছাতে বেশ সময় লেগেছে। এর মধ্যেই ছিল কম আর্থিক সামর্থ্যের জন্য ফ্ল্যাট, মাঝারি সামর্থ্যের জন্য এবং অধিক সামর্থ্যের জন্য ফ্ল্যাটের বিভাজন  এবং তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি যে নাক উঁচু লোকের সঙ্গে সাধারণ লোকের মধ্যে সম্পর্কের বিভাজন। সেই কারণেই বিভিন্ন ফেজে বিভিন্ন লোকদের রাখা হয়েছে যাতে বিভাজনের প্রকৃত রূপ উৎকট না হয়ে পড়ে।  উপনগরী তো তৈরী হলো কিন্তু তাদের পরিবারে কাজ করার জন্য বা রান্না করার লোকের তো প্রয়োজন হয়, সুতরাং খুব স্বাভাবিক ভাবেই আশে পাশে গরীব মানুষের ঝুপড়ি তৈরী হলো, বাজার দোকান তাদের মধ্যেই একটু সম্পন্ন লোকেরা শুরু করল। সংখ্যায় অপ্রতুল হওয়ায় পাশের প্রদেশের গরীব মানুষরাও ছুটে এল কর্মসংস্থানের জন্য।  "সাধু" এইরকমই একজন যে বিহারের এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে নিজের পেট পালতে এসেছিল এখানে।

আগে সাধুর বাড়ি যাওয়া প্রায় ছিল ই না, থাকতো ওদের জন্য তৈরী করে দেওয়া একটা ছোট ঘর ও একটা বাথরুম যেখানে গাদাগাদি করে কয়েকজন থাকতো। আগে তো পাখাও ছিলনা, কেরোসিনের লণ্ঠন দিয়ে অন্ধকার নাশ করতে হতো তাদের কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জন্য ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হলো এবং তার সঙ্গে পাখা। অবশ্য এটা এমন কিছু বিরাট ব্যাপার নয়। অনেক বাড়িতেই বিদ্যুৎ ছিলনা, কর্পোরেশনের জলের লাইন আলাদা করে বাড়িতে ছিলনা এবং রাস্তার কলের উপর ভরসা করেই তাদের জীবন চলতো। সাধু ভোরবেলা থেকেই উঠে সে যে ফেজে থাকে তা পরিষ্কার করতে লেগে যায় ঝড়, জল বৃষ্টি উপেক্ষা করেই। তার জীবনের একটাই মন্ত্র যে যেখানে সে থাকবে সেখানে একশ শতাংশ তো বটেই তার ও অনেক বেশি সে দেবে। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর একটু শস্তার ছিলিম না টানলে শরীর যে আর চলেনা, সুতরাং ওটা মেনেই নিতে হয়। এই উপনগরীতে অনেক গাছগাছড়া, সুতরাং বসন্তের সময় তো বটেই, সারা বছরই টুপটাপ করে পাতা ঝরছে আর সাধুর ঝাঁট দেওয়াও অব্যাহত। ধীরে ধীরে নানাধরণের লোকজন এসেছে, কেউ পাম্প চালায় আবার কেউ বা ময়লা নিয়ে যায়। এদের ছাড়া কোন সভ্যসমাজ চলতে পারেনা কিন্তু এরাই বড় বেশী উপেক্ষিত। আমরা তেলা মাথায় তেল ঢালতে ভালবাসি কিন্তু যাদের মাথায় একটু হলেও তেলের প্রয়োজন তাদের জন্য খুব কম সময় ই ভাবি। ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে পরিবর্তন আসছে এবং অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যেই এটা বিশেষ ভাবে প্রকট হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক লোকদের মধ্যে ও অনেক ভাল লোক আছেন যাঁরা রাজনীতির ঊর্ধে উঠে মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসেন তবে বেশীরভাগ সময়ই তাঁদের নিজেদের দলের লোকদের প্রতি নজর দেন। এহেন সাধুকে একদিন জুতো পড়ে বেশ ভাল পোশাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম যে কি ব্যাপার? ও জানালো যে বাড়ি থেকে খবর এসেছে যে ওর বিয়ের ঠিক হয়েছে। বিশ্বাস করতেই পারছিলাম না যে সাধুর কোনদিন বিয়ে হতে পারে। অভিনন্দন জানিয়ে ওকে সাধ্যমতো টাকা ও জামাকাপড় দিলাম। ওর অনুপস্থিতি প্রতি মূহুর্তেই অনুভূত হচ্ছিল কারণ ওর বদলে যে কাজ করছিল তা সাধুর ধারেকাছেও নয়। অনেকটা সেই একশো দিনের কাজের লোকদের মতো। ছেলেমেয়ে মিলিয়ে প্রায় আট নয়জনের দল আসে, মেয়েদের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, হাতে বড় ডাণ্ডার সঙ্গে লাগানো ঝাঁটা , একজন এদিকের শুকনো পাতা ওদিকে সরায় আর কেউ ওদিকের সরানো পাতা এদিকে রেখে যায়। দুজন আসে মোটরসাইকেলে যাদের একজন মোবাইলে ফটো তোলে আর একজন চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখে। একটু সময় পরেই সব ভোঁ ভাঁ। ওই অতগুলো লোকের সমবেত কাজের থেকে সাধুর একার কাজ অনেক অনেক গুণ বেশি কিন্তু সাধারণ লোকের ট্যাক্সের টাকা এইভাবে জলে যেতে দেখলে মন খারাপ ছাড়া ভাল হবার নয়। 

অনেক উঁচু পদে থাকা লোকজনেরও কর্তব্যনিষ্ঠা সেরকম ভাবে না থাকলেও সমাদৃত হন কিন্তু সাধুর মতো এধারে ওধারে থাকা আরো অনেক সাধুই রয়েছে যাদের কর্মনিষ্ঠা অতুলনীয় কিন্তু তারা চিরকাল ব্রাত্য ই থেকে যায়।

Monday, 8 September 2025

"মোমবাতি"

পাড়ায় পরিচিত নাম মোম দা। আসল নামটা যে কি খুব কম লোকই জানত। স্কুলে ভাল নাম তো অবশ্যই ছিল কিন্তু মাস্টার মশাইরা পর্যন্ত ওকে মোম বলেই ডাকতেন। মোম আবার কোন ছেলের নাম হয় না কি? মেয়েদের হলেও হতে পারে কিন্তু ছেলেদের --না, একদম ই শোনা যায় না। ছেলেবেলায় মাকে হারিয়ে, পিসি, কাকাদের কাছে মানুষ যাঁরা নিজেরাও কেউ বিয়ে থা করেন নি, দাদার সংসারটাকেই নিজেদের বলে মনে করেছে আর চালিয়েও দিল দিব্যি। ছোটবেলায় মাতৃহারা শিশুদের অবস্থা কিন্তু খুব কষ্টদায়ক, সে বাড়িতে যত ই কাকা, পিসিরা থাকুন না কেন। বাবাও কাজে বেরিয়ে যায়, কাকাও কাজে যায়, অনূঢ়া পিসির বিয়ে নিয়ে ও কারো মাথা ব্যথা হয়নি, বাড়িতে রান্নাবান্না করা ও সংসারটাকে কোনভাবে টেনে নিয়ে যাওয়া , এটাই তার একমাত্র কাজ। দাদারা টাকা রোজগার করে আনছে আর বোন সংসার টেনে চলেছে। এইরকম সংসারে ছেলেদের বড় হয়ে ওঠা খুবই কঠিন। মোমের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ছোট থেকেই নিজেই নিজের অভিভাবক। সকাল বেলায় খাওয়া দাওয়া করে স্কুল এবং সেখান থেকে ফিরে খেলতে বেরিয়ে যাওয়া এবং সন্ধ্যের বেশ পরেও ফিরে এলে জবাবদিহি কারো কাছে করা নেই, পিসি কিছু জিজ্ঞেস করলে হাড্ডা বাড্ডা বলে কিছু বুঝিয়ে দেওয়া, এককথায় অভিভাবকহীন বললেও কিছু অত্যুক্তি হয়না। মোমের একটা ভাই ছিল গজু, সেটাও প্রায় একই রকম,তবু তার মাথার উপরে একজন দাদা ছিল । কিন্তু এই নিজেই নিজের অভিভাবক হবার কারণে এবং পাড়ার পরিবেশ ভাল থাকার জন্য ও বখে যায়নি বরঞ্চ পাড়ার সবাই ওদের প্রতি খুব সহানুভূতিশীল ছিল। খানিকটা স্বার্থ ও ছিল পাড়ার লোকদের কারণ কোন বিপদে আপদে ডাক পড়ত সেই মোমের ই। এইসব ছেলেরা হয় খুব ভাল নয়তো খুব খারাপ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু মোম যে পাড়ায় থাকতো সেটা অত্যন্ত ভদ্রলোকের পাড়া মানে বেশিরভাগ লোকই ভাল, দু চারটে বাজে লোক কি ছিল না, অবশ্যই ছিল কিন্তু তারা ঐ ভদ্রপল্লীকে বিশেষ কলুষিত করতে পারেনি।
মোম স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে বাড়ির কাছেই কলেজে ভর্তি হলো কিন্তু বি এ পরীক্ষার গণ্ডি আর পেরোনো হলো না। নানারকম জনহিতকর কাজে সে নিজেকে ডুবিয়ে দেওয়ায়, পরীক্ষায় পাশ করার জন্য যতটুকু পড়াশোনা করা দরকার সেটুকু আর করা হয়ে উঠল না। সেই সময়  মাস্টার মশাইদের ভয় দেখিয়ে বই খুলে পরীক্ষার রেওয়াজ না থাকায় কলেজের গণ্ডি অধরাই থেকে গেল। ক্লাবে ব্যায়াম করা এবং যে কোন লোকের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য ও খুবই জনপ্রিয় ছিল। তখন স্কুলের সীমা পেরোলেই মোটামুটি একটা সরকারী চাকরি পাওয়া যেত। ইতিমধ্যে মোমের বাবার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটায় বাবার চাকরিটা সে পেল এবং সে আরও দায়িত্বশীল হয়ে উঠল। অফিসের সময়টা ছেড়ে দিয়ে বাকি সময়টা কেবল লোকের উপকার করা এবং বিভিন্ন ভাবে তাদের সাহায্য করা। ডিগ্রীটা একটা কাগজের টুকরো যেটা মানুষকে উন্নতির সোপানে নিয়ে যায় বটে কিন্তু যে নিজের জীবনটাকেই উৎসর্গ করেছে অন্যদের জন্য তার কাছে উন্নতি করা বা প্রমোশন পাওয়া একটা তুচ্ছ ব্যাপার। এদের জীবনে কি প্রেম আসেনা? অবশ্যই আসে কিন্তু এই প্রেম করা বা সংসার করা তাদের কাছে একটা বিলাসিতা করার মতো। সময় কোথায় তার যেখানে অনেক লোক সেই সময়ের জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে?  কাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে, কাকে পরীক্ষার হলে পৌঁছে দিতে হবে, কার বাড়িতে কেউ মারা গেছেন, তার সৎকারের ব্যবস্থা , এইসব করতে গিয়ে নিজের দিকটাই আর ভাল করে দেখা হলো না। কিন্তু পাড়ার কিছু ভদ্রলোক তো সবসময়ই থাকেন যাঁরা তার শুভাকাঙ্ক্ষী, তাঁদের ই একজন মোমের বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। মোম তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করত এবং তাঁর কথা ফেলতে না পেরে বিয়ের পিঁড়িতে বসল। 
বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেল। বাবা, কাকা, পিসি সবাই একে একে চলে গেছেন, ভাই ও কাজের সূত্রে অনেক দূরে রয়েছে, একদিন মোম নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ল কিন্তু আরেকজন মোম তো আশেপাশে নেই যে তাকে নিয়ে যাবে হাসপাতালে। মোমের স্ত্রী পাড়ায় অনেকের খোঁজ করলেন কিন্তু এই বিপদের দিনে কাউকেই পেলেন না পাশে, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই মোম চলে গেল " না ফেরার দেশে।" এই মোমরাই নিজেকে নিঃশেষ করে অন্যদের আলো দেখায় , প্রতিদানে সে কিছুই চায়না। কিন্তু মোমের সঙ্গে যারা জড়িয়ে আছে, তারা কি প্রতিদানে কিছু আশা করতে পারে না?  বটের ছায়ায় আর একটা বট গাছ হয়না। একটা এলাকায় একজন মোম ই হয় যারা নিজেকে নিঃশেষ করে অন্যদের উপকার করে। পূজো প্যাণ্ডেলে মারা যাওয়ার প্রথম বছরে হাসিমুখে মোমের ছবিতে একটা মালা , নীচে নাম লেখা মনোময় চট্টরাজ, বন্ধনীর মধ্যে ছোট্ট করে লেখা মোম, নীচে জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ দেওয়া।
পরের বছর আবার পূজো এল, ক্লাবে আর কোন ছবি দেখা গেল না। এক সময় মোমদার কথা ছাড়া কিছুই হতো না আর এক বছর বাদেই ছবিটা অন্য রকম। এটাই জগতের নিয়ম। যতক্ষণ তুমি আছ, ততক্ষণ ই তোমাকে নিয়ে নাচানাচি, আর ভুলে যেতে মানুষের বেশী সময় লাগে না। মোম দা, সত্যিই তুমি মোমবাতি, নিজেকে জ্বালিয়ে অন্যদের আলো দেখিয়েছ, আজ তুমি নেই আলো জ্বালানোর ও কেউ নেই। যেখানেই থাকো, ভাল থেকো।

Friday, 5 September 2025

শিক্ষক দিবসে গুরু প্রণাম

আজ পাঁচ ই সেপ্টেম্বর, শিক্ষক দিবস হিসেবে আজ বিশেষ সমারোহে দেশব্যাপী উৎসবে মাতোয়ারা। আজ এই বিশেষ দিনে বিভিন্ন ব্যক্তি তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন। একঘেয়েমি যাতে না আসে সেই কারণেই এই বিষয়ে কিছু বক্তব্য রাখতে গেলে একটু ভিন্ন কি লেখা যায় তা নিয়ে বিশেষ চিন্তায় রয়েছি।
প্রথম থেকে শুরু করতে গেলে অনেক নাম এসে ভিড় করে, সুতরাং বিশেষ কয়েকজনের সম্বন্ধেই লিখতে হবে নাহলে লিখতে লিখতে শিক্ষক দিবসটাই শেষ হয়ে যাবে। বাড়িতে প্রথম গুরু বাবা ও মাকে বাদ দিলে মনে পড়ে বড়দির ( জ্যাঠামশাইয়ের মা) কথা যাঁর  কথা না বললে ভীষণ  অসম্পূর্ণ হয়ে যাবে। মালা জপতে জপতে কখন যে গল্প বলার মাঝে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন তা জানতেই পারতাম না। ঠাকুমা আমার ভয়ানক রাশভারী ছিলেন এবং যত ই বয়স কম হোক না কেন বেচাল দেখলে এমন ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকাতেন ভয়ে পালাতে পারলে বাঁচি। আর বড়দি ঠিক উল্টো, বাড়ির সব বাচ্চারাই তাঁর বড় ন্যাওটা। গল্প বলা বিশেষ করে বাচ্চাদের সামনে উপস্থাপন করা তাদের লেভেলে গিয়ে সে এক ভয়ানক কঠিন কাজ। কি যে গল্প বলতেন যা ঠাকুরমার ঝুলি বা ঠাকুর্দার থলিতেও পাওয়া যেত না। খানিকটা নিজে বানিয়ে বানিয়ে বলতেন হয়তো। কি অসাধারণ প্রতিভাময়ী ছিলেন , গল্পের যোগসূত্র কখনোই ছিন্ন হতোনা। আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের সব  বাচ্চারাই তাঁর চারপাশে ঘিরে থাকতো। সবার মধ্যে আমার ও ছোড়দির একটা বিশেষ স্থান ছিল তাঁর হৃদয়ে।
বয়স একটু বাড়তেই বাড়ির কাছেই স্বর্গধামে ভর্তি করে দিল ক্লাস ওয়ানে। তখন তো আর নার্শারী বা প্রিপারেটরি বলে কিছু ছিল না, সরাসরি ক্লাস ওয়ানে। সেখানে ঊর্মিলা দির সদা হাস্যমুখ বাচ্চাদের জন্য এক আদর্শ জিনিস কিন্তু একজন দাদু মাস্টারের ক্লাস ফোরের ছেলেকে প্রচণ্ড মারধর স্কুলে যাওয়াকে এক ভীতির পর্যায়ে নিয়ে গেল। দুটো বাড়ির পরেই তৃতীয় বাড়িটাই স্বর্গধাম স্কুল কিন্তু আমার ঐদিন থেকে স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। বাবা, মা ,দিদিরা মায় ঊর্মিলা দি পর্যন্ত বাড়ি এসে নিয়ে যেতে চাইলেও স্কুল যাওয়া আমার নেই। বাড়ির সবাই প্রমাদ গণলো ,ভাবল এর দ্বারা লেখাপড়া কিছুই হবেনা, কোন মুদীর দোকানে কাজ করে খেতে হবে। কিন্তু বড়দির সেই ভালবাসা মেশানো গল্পের ফাঁকে ফাঁকে নানান জিনিস পড়িয়ে দেওয়া ছবিটাই পাল্টে দিল। পরের বছর শহরের সবচেয়ে নামী স্কুল পাঁচ থাম( স্তম্ভ) ওয়ালা রাজবাড়ির মতো দোতলা স্কুলের প্রাইমারি সেকশনে ক্লাস থ্রি তে ভর্তি করে দিল। বাবলি বাবু( হেড মাস্টার মশাই), কন্দর্প বাবু, হীরেন বাবু ও তাঁর ভাই রমেন বাবু এবং ডিস্ট্রিক্ট ইন্সপেক্টর অব স্কুলসের ছেলে দিলীপ অধিকারী। বাবলি বাবু খুব  ভাল গান করতেন এবং ক্ল্যাসিকাল গান শেখাতেন। সকাল বেলায় স্কুল, টিফিন দেওয়া হতো, হঠাৎ কি একটা কারণে স্কুলে টিফিন দেওয়া বন্ধ হয়ে গেল। সবসময়েই কিছু পাকা দাদা টাইপের ছেলে থাকে। এঁরা হয়তো সময়ের থেকে একটু বেশি এগিয়ে থাকায় পড়াশোনায় তেমন কিছু করে উঠতে পারেনা। তখন শীতকাল, সুশান্তর গায়ের চাদর টা সামনে সুশান্তর সঙ্গে হাত লাগিয়েছে তপন এবং পিছনে আরও দুজন চারটে কোণ ধরে " টিফিন দেওয়া বন্ধ করা চলবে না, চলবে না" শ্লোগান দিতে দিতে বিশাল করিডরে খুদেদের মিছিল চলছে, হঠাৎ ই কে বলে উঠল হেডমাস্টার মশাই আসছেন। এক মূহুর্তে মিছিল ভোঁ ভাঁ। সবাই দৌড়ে পালিয়েছে, আমি আর দীপক পালাতে পারিনি মানে পালাতে গিয়ে পায়ে পা জড়িয়ে পড়ে গেছি আর শাস্তি হলো বেঞ্চের উপর কান ধরে দাঁড়ানো। তখন থেকেই ঠিক করেছি যে প্রাণ চলে যাক, যত ই ভীতুর ডিম বলুক লোকে , মিছিলে আর হাঁটব না। আজকের দিনেও মিছিলে নেতাদের গায়ে চট করে হাত পড়েনা, চ্যালা চামুণ্ডাগুলোই পুলিশের লাঠি বা কাঁদানে গ্যাস বা জল কামানের শিকার হয়। নেতাদের বলা হয় চলুন, এবার গাড়িতে উঠুন। আর কিছু কুচো কাচা নেতা যাদের স্বপ্ন ই হচ্ছে নেতা হয়ে পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার, তারা পুলিশকে বলে স্যার আমাকেও একটু গাড়িতে ধরে তুলুন না। আর জায়গা নেই বললে হাতে পায়ে ধরে প্রায় কান্নাকাটি করে পুলিশ স্যারকে বলে গাড়িতে উঠে পড়ে। চিত্র সাংবাদিক ফটো তুললে ইশারায় তার ফটোটা যেন আসে এই অনুরোধ করে কারণ ওটাই হবে ভবিষ্যতের উত্থানের চাবিকাঠি।
কান ধরে বেঞ্চের উপর দাঁড়ানোর খবর বাড়িতে পৌঁছে গেছে আর বাড়ি ঢোকা মাত্রই রান্নাঘরের ডাঁটিসার পাখার বাড়ি জুটল কপালে। সেই দিন থেকে দু দুবার প্রচণ্ড অপমানের শিকার হয়ে আমি হলাম ভীতু সম্প্রদায়ভুক্ত।
বৃত্তি পরীক্ষা হলো, কোনদিন ই বৃত্তি পাওয়ার যোগ্য ছিলাম না তবে কাউকে ধরা করা না করেই উৎরে যেতাম। ক্লাস ফাইভে একজন বিশাল চেহারার মাস্টার মশাই এলেন ক্লাস টিচার হয়ে। তিনি আবার নাকি অঙ্ক করাবেন। অসম্ভব বেশি রকম পান খেতেন বলে কথাও কিছু বোঝার উপায় ছিল না আর সারা শরীরে ছিল অসম্ভব বেশি লোম। সব ছেলেরা ওঁকে বলত ভালুক স্যার। ভালুক স্যারের উপদ্রব বেশীদিন সইতে হয়নি কিন্তু অঙ্কের ভাল মাস্টার মশাই পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি এবং যথারীতি সব বিষয়ে মোটামুটি ভাল নম্বর পেলেও অঙ্কে কোনরকমে পাশ করলেই দাদু হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন। বাড়িতে দাদুর কাছে বীজগণিত ও ইংরেজির প্রশিক্ষণ পেতাম। তখন দাদু অসুস্থ, বাড়িতেই  দাদুকে স্যালাইন ও রক্ত দেওয়া হচ্ছে । কোন সময় ডান হাত আর কোন সময় বাঁ হাতে দেওয়া হচ্ছে । দাদু খেতেন  চুরুট । নিজের  হাতে ধরে চুরুট  খেতে না পেরে আমাকে  ডাকতেন এবং  চুরুট  ধরিয়ে ঠোঁটে কয়েকটা টান দিয়ে  কম্পালসরি মিলিটারি ট্রেনিং  রচনা লেখায় ডিকটেশন দিতেন। অসাধারণ স্মৃতি শক্তি । মিল্টনের  লিসিডাস মুখস্থ বলতেন । শেক্সপিয়ার আওড়াতেন। মারা যাওয়ার  আগের  দিন  পর্যন্ত উনি ডিকটেশন দিয়ে  গেছেন ।             ক্লাস  সিক্সে খগেন বাবু ক্লাস টিচার হলেন। খুবই ভাল মাস্টার মশাই। ইংরেজি ও ইতিহাসে এম এ পাশ করা খগেনবাবু সত্যিই আদর্শ মাস্টার মশাই। সিস্টেমেটিক ভাবে পড়ানোর জন্য ছাত্ররা সবাই ভাল রেজাল্ট করল এবং অবশ্যই একজন আদর্শ মাস্টার মশাই। স্কুলে বিভিন্ন রকম ছাত্র থাকে যারা  মাস্টার মশাইদের নাম বিকৃত করে অন্য নামে ডাকে। সেই স্যাররাও জানতেন কিন্তু লজ্জার মাথা খেয়ে কিছু বলতেন না। কোন একজন মাস্টার মশাই ক্লাসে ঢুকলেই হিস করে শব্দ শুরু হতো মানে ওঁর কথাবার্তা সবসময়ই এমন লেভেলে থাকতো যে ছাত্ররা গুল মারছেন বা গ্যাস দিচ্ছেন  বলে হিস করে শব্দ করতো। স্যার ক্লাসে ঢোকামাত্র ই যদি চারপাশ থেকে হিস হিস করে শব্দ আসে তাহলে উনি কি করে পড়াবেন?  স্যাররাও জানতেন যে  কে বা কারা করছে কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তাদের ঘাঁটাতেন না। একজন স্যারকে চাচা বলে ডাকতো এই বাঁদর গুলো। সবসময় কি মাথার ঠিক থাকে? রাগের চোটে বলে দিলেন বাবা বলে ডাকতে পারিস না? মুশকিল হলো এই কয়েকটা বাঁদর ছেলেদের জন্য আমার মতো বেশীরভাগ ভীতু সম্প্রদায়ভুক্ত ছাত্ররা ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কিন্তু কোন কোন মাস্টার মশাই ছিলেন যাঁদের উপস্থিতি সম্ভ্রম জোগাত। যেমন পার্সোনালিটি তেমনই পড়ানো। তাঁদের কোন ব্যাঙ্গ বিদ্রূপের সম্মুখীন হতে হয়নি। নিত্যহরি বাবু, কাবলি বাবু( রণেন), নারায়ন বাবু, বিজয় বাবু, পচন বাবু( কিশোরী মোহন সরকার ),রাখহরি বাবু, সমাদ্দার বাবুরা এই গোত্রীয়। এঁদের জন্য স্কুল থেকে প্রত্যেক বছরই জেলায় প্রথম এবং সারা বাংলায় উজ্জ্বল স্থান অধিকার করতো। 
কলেজেও বিভিন্ন বিভাগে নামকরা অধ্যাপকরা ছিলেন। আমাদের রসায়ন বিভাগের ধীরেন্দ্রনাথ রায়, জিতেন চন্দ, আশীষ চ্যাটার্জি, রাধেশ্যাম মণ্ডল , খগেন কর্মকার, নির্মল সরকার ও সুশীল সান্যাল আলো করে ছিলেন। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে জিতেন মুখার্জি, সুশীল সেন, দিলীপ কর, বীরেশ্বর বন্দোপাধ্যায়রা এক একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। অঙ্কে কৃতান্ত বসু , নিমাই চাঁদ বোলার, অসীম ধর, রাজকৃষ্ণ মাল ও বিজয় বিশ্বাস পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং অত্যন্ত উঁচুমানের অধ্যাপক ছিলেন যাঁদের সাহচর্য আমাদের ভবিষ্যত গড়ে দিয়েছে। ঠিক সেইরকম বিশ্ববিদ্যালয়ে অরুণাভ মজুমদারের অসাধারণ সহায়তা জীবনকে সম্পৃক্ত করেছে। 
কর্মজীবনেও শ্যামল ধর,  এন সুব্বা রাও, জে সুব্বা রাও এবং দীনকর রাও  ,অশোক ভট্টাচার্য  এবং রামাইয়া স্যারের সামনে থেকে কি করে পরিচালনা  করতে হয় তা শিখতে পেরেছি এবং সবার কাছেই আমি আমার কৃতজ্ঞতা জানাই। এইরকম গুরু বা মাস্টার মশাই ছাড়া নিজেকে যে জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছি তা কখনোই সম্ভব হতো না। তাঁদের সবাইকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।

Friday, 22 August 2025

পাণ্ডবদের বড়ঘুটু অভিযান

বিশাখাপটনমের পঞ্চপাণ্ডবরা কেরালা সফরের পরেই কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। বয়সজনিত কারণে তারা সেই আগের মতো মন হলেই বেরিয়ে পড়তে পারছেন না। অর্জুন ও গাণ্ডীব নিয়ে সেইরকম টঙ্কার দিতে পারছেন না। এই নাটকের দলের কুশীলবরা বয়সের ভারে কেমন যেন ন্যূব্জ কুব্জ হয়ে পড়েছেন বা জীবনের নানান সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছেন এবং প্রাথমিকতাও স্বাভাবিক ভাবেই বদলে যাচ্ছে। যুধিষ্ঠির এবং তাঁর ভার্যা দেবিকার দুইজনেরই হাঁটু প্রতিস্থাপন হয়েছে, ভগ্নী দুঃশলা যিনি যুধিষ্ঠিরের সঙ্গেই থাকতেন তাঁর ও নিম্নাঙ্গ অবশ হয়ে গেছে, ভীম ও ভালন্ধারা কেরালা সফরের পরেই অসুস্থতার কারণে গদা সঞ্চালনে প্রায় অক্ষম, অর্জুন ও অপারেশনের পরে গাণ্ডীবের টঙ্কারে সেইরকম ভীতি সঞ্চার না করলেও অনেকটাই পুরনো ফর্মে ফিরে এসেছেন। সুভদ্রাই বা কেন পিছিয়ে থাকবেন, তাঁর ও অপারেশন হয়েছে। নকুলের গলব্লাডার অপারেশন ও কারেনুমতির হাঁটু প্রতিস্থাপন ও সহদেবের হাঁটু প্রতিস্থাপন হয়েছে কিন্তু তিনি কিছুটা হলেও সামলে উঠেছেন। অতএব কোন নতুন নাটক মঞ্চস্থ করতে গেলে যুধিষ্ঠির ও ভীমের বদলি চাই ই চাই। গতবছর ২১শে আগস্ট আরাকুভ্যালি অভিযানে যুধিষ্ঠির, দেবিকা, ভীম ও ভালন্ধারার বদলি পাওয়া না গেলেও  পাওয়া গিয়েছিল কৃষ্ণ ও রুক্মিণী  এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন ও ধানুমতীকে কিন্তু দুঃশলা বোনের বদলি না পাওয়ায় চিত্রনাট্যে কিছু রদবদল করতে হয়েছিল এবং সহোদর জায়া বিজয়া ও সুদূর আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছিলেন। নকুল ও কারেনুমতিও সেই অভিযানে ছিলেন না এবং এবার ও সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহেই আমেরিকার উদ্দেশ্যে আকাশ মার্গে যাত্রা করবেন। আমেরিকা থেকে সদ্যফেরত অর্জুন ও সুভদ্রার উপর একটা বাড়তি চাপ স্বভাবতই রয়েছে কোন অভিযানের পরিকল্পনা করা নিয়ে। বরাবরের মতই পাণ্ডবত্রাতা বিচক্ষণ অর্জুন সহদেবকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভ্রমণ সহায়ক বিভাগের ডালহৌসি স্কোয়ারের অফিসে। পরিকল্পনা ছিল দুর্গাপুর নিবাসী ধৃষ্টদ্যুম্নকে নিয়ে মাইথন অভিযানে কিন্তু মনোমত গেস্ট হাউস না পাওয়ায় লালমাটির দেশ মুকুট মনিপুরের অদূরে বড়ঘুটু অতিথি নিবাসে ব্যবস্থা হলো ২০শে আগস্ট একদিনের জন্য। মুকুটমনিপুরের কথা মনে পড়তেই কার যেন লেখা কয়েকটি ছন্দোবদ্ধ শব্দ মনে পড়ে গেল ,
"বাঁধের জলে ভোরের আকাশ ,
বৃষ্টি সবুজ জংলা দুপুর,
লালমাটিতে সন্ধ্যে মেশে,
ধামসা মাদল সাঁওতালি সুর,
ঘরের কাছেই মোটেই না দূর,
চলুন এবার মুকুট মনিপুর।"
দেখতে দেখতে ছয়টা বছর কিভাবে কেটে গেছে জানিনা, তবে স্মৃতিতে এখনও যথেষ্ট সতেজ। পিয়ারলেস গেস্ট হাউসে ভীম ও ভালন্ধারাকে একটা কটেজে ঢুকিয়ে দিয়ে দেবিকা, সুভদ্রা, বিজয়া ও দুঃশলা একটা বড় ঘরে এবং যুধিষ্ঠির, অর্জুন ও সহদেব আরও একটি ঘরে দারুণ আনন্দে রাত কাটিয়েছিল। সকাল বেলায় চায়ের আসর দেবিকা, বিজয়া ও সুভদ্রাদের ঘরে বসেছিল এবং যথারীতি দুঃশলা চায়ের সঙ্গে বিস্কুট ও কেকের ব্যবস্থা করেছিল। আগের দিন রাতে অনেক রাত অবধি হাউসি খেলা তাদের ঘুমের মাত্রা কমিয়ে দিলেও উৎসাহে কিন্তু এতটুকু ভাটা পড়েনি। জলখাবার খেয়েই মুকুটমনিপুরের নদীর জলে নৌকা বিহার ছিল এক আলাদা অভিজ্ঞতা। এই স্মৃতি মনে পড়তেই গুনগুন করে গানের কলি মনে পড়ে গেল," অলি বারবার ফিরে আসে, অলি বারবার ফিরে যায়।" মুকুটমনিপু্রের কাছেই এই বড়ঘুটু অতিথি নিবাস।
তাই বেশ, নাই মামার চাইতে তো কানা মামা ভাল। 
অর্জুনের ব্যবস্থাপনা একদম ঠিকঠাক। ২০শে আগস্ট গাড়িতে বসে সকাল ৬টায় রওনা দিয়ে ৬টা বেজে ২০ মিনিটে সহদেবকে তুলে৬টা ৪৫ মিনিটে নকুল ও কারেনুমতিকে তোলা হলো। এরপর ধানুমতিকে (ধৃষ্টদ্যুম্ন জায়া )তুলে যাত্রা শুরু হলো দুর্গাপুরের পথে যেখানে আছেন ধৃষ্টদ্যুম্ন । বিজয়া মেয়ের কাছে ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকার জন্য এবং কৃষ্ণ ও রুক্মিণীর ঐদিন ই আমেরিকার পথে যাত্রা করার জন্য এই বড়ঘুটু অভিযানে সামিল হননি। প্রাতরাশ সারার জন্য বাছাই হলো গুড়াপস্থিত হিন্দুস্তান ধাবা। আলুর পরোটা ও লুচির মতো পুরি ও ছোলার ডাল এবং মিষ্টি ও চা দিয়ে প্রাতরাশ সেরে দুর্গাপুরের পথে ধৃষ্টদ্যুম্নকে তোলার ব্যবস্থা হলো এবং বড়ঘুটু পৌঁছাতে হয়ে গেল প্রায় আড়াইটা। চেক ইন করেই খেতে বসে যাওয়া। ম্যানেজার শান্তনু ঘোষকে বলেই রাখা ছিল নিরামিষ থালির কথা। ঘি, বেগুন ভাজা, মুগডালের সঙ্গে পোস্তর বড়া ও দুরকম তরকারি ও চাটনি পাঁপড় ভাজা ও মিষ্টি দিয়ে দারুণ সুস্বাদু খাবার আর তার সঙ্গে নরেন কর্মকার, ভবতোষ দেব(বাসু) ও প্রতীক দাসের আতিথেয়তা ভুলিয়ে দিল গেস্টহাউসের খামতি। সরকারি গেস্টহাউসের এইখানেই সীমাবদ্ধতা। কি করলে যে কাস্টমার আরও ভালভাবে উপভোগ করবে সেইদিকে নজর দেওয়াটা তাদের প্রাথমিকতার মধ্যে পড়ে কিনা সন্দেহ আছে। কিন্তু এইসমস্ত ছেলে বা কর্মীদের আন্তরিকতা সত্যিই মনে রাখার মতো। বুকিং করার সময় অফিসের ম্যানেজারের যা বক্তব্য তার সঙ্গে কিন্তু বিস্তর তফাৎ। যাই হোক, সূর্যাস্ত দেখার জন্য ঐ অতিথিশালার মধ্যেই টিলায় উঠতে হলো এবং নয়নাভিরাম দৃশ্য মোবাইলে ক্যামেরাবন্দী হলো। ওখানে আসা আর একজন অতিথি সাবধান করে দিলেন বিছে ও কাঁকড়াবিছে সম্বন্ধে। বেসিনের কল খুলতেই ইঞ্চি নয়েক একটা তেঁতুল বিছের ছবি দেখালেন এবং জামা কাপড় বা মোজা জুতো পরার আগে ভাল করে নে
ঝেড়ে নিতে বললেন। ভয় ধরে গেল মনে, রাতে ঘুমোচ্ছি, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল , টর্চ জ্বেলে দেখে নিলাম যে কোন বিছের আগমন হয়েছে কিনা। আমাদের ড্রাইভার জগদীশ বাইরে বেঞ্চে বসে রাতের নিস্তব্ধতা উপভোগ করছিল, হঠাৎ একটা চিরচিরে জ্বলুনি -- একটা ছোট বিছের আক্রমণ। সময়মতো সেটাকে মুক্ত করেছে বলেই বেঁচে গেল নাহলে ফিরে আসা একটা দুষ্কর কাজ হয়ে যেত। রাতে দেশী কায়দায় চিকেন কারি ও রুটি এবং শেষে মিষ্টি আলাদা মাত্রা আনল।
পরদিন সকাল। ভোরবেলা সহদেব ও ধৃষ্টদ্যুম্ন বেরিয়েছে গ্রাম দেখতে, সঙ্গে সাথী লাল্টু, পল্টু, ঘন্টু ও চুটকি। দূর থেকে আসা লোকজনদের জিজ্ঞেস করছি কোথায় চা ও বিস্কুট ( লাল্টু, পল্টুদের জন্য) পাওয়া যেতে পারে। গতকাল পৌঁছানোর পরেই ওরা আমাদের সাথী। গ্রামের জীব তো, শহরের প্যাঁচ পয়জার ওদের মধ্যে ঢোকেনি। গায়ে, মাথায় হাত বোলানোর অভ্যেসটা বন্ধু দাশুর কাছ থেকে পাওয়া। একটু ভালবাসাতেই তাদের লেজ নাড়ানোয় কমতি নেই। ধৃষ্টদ্যুম্ন গিয়ে ওপর থেকে টাকা নিয়ে এল আর আমরা একে তাকে জিজ্ঞেস করতে করতে কখন দু কিলোমিটার চলে এসেছি চায়ের তেষ্টা মেটাতে ও সঙ্গী সাথীদের বিস্কুটের চাহিদা জোগাতে। গাঁয়ের ছেলেমেয়েরা দাঁতন করছে এবং পথনির্দেশ করছে কোথায় দোকান পাওয়া যাবে। অবশেষে গ্রামের বেশ ভেতরে চলে এসেছি। চা যদিও ভাগ্যে জুটলো না কিন্তু আমাদের সহযোগীদের জন্য বিস্কুট পাওয়া গেল। তিন প্যাকেট বিস্কুট কিনে আমরা ওদের খাওয়াতে খাওয়াতে ফিরে এলাম এবং চা খেয়েই উঠলাম। স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট ( কমপ্লিমেন্টারি বা ফোঁকটে) করলাম, এককথায় দুর্দান্ত।পৌনে দশটা নাগাদ মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম এবং কাঁসাই শিলাই এর সঙ্গমস্থলে এলাম এবং বাঁধের ওপর উঠে নয়নাভিরাম দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করে রওনা দিলাম দুর্গাপুরের উদ্দেশ্যে। মাঝপথে শুরু  হলো বৃষ্টি এবং তার নাচন কোঁদনে রীতিমতো  ভয় ধরে গেল। দেখতে দেখতে দু্র্গাপু্র এসে গেল। ধৃষ্টদ্যুম্ন আর ধানুমতী লাঞ্চ সেরে ওখানেই থেকে গেল আর অর্জুন, সুভদ্রা, নকুল, কারেনুমতি ও সহদেব ফিরে এল কলকাতায়। ছোট্ট অথচ নিটোল অভিযান,মনে রাখার মতো।