Thursday, 30 January 2025

অথ বিবাহ কথা

বহুদিন পর এক ধমাকাদার বিয়ের সাক্ষী হতে পারলাম । বড় শিল্পপতিদের ছেলেমেয়ের বিয়েতে আমাদের মতন উলুখাগড়াদের ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে থাকা ছাড়া আর খবরের কাগজ বা দূরদর্শনের বিভিন্ন চ্যানেলের প্রতিযোগিতামূলক প্রদর্শনের কল্যাণে খুঁটিনাটি খবরের বিশদ বিবরণ জানা ছাড়া আর কিছুই করার  থাকেনা। যে যেমন ওজনদার, তার তেমন সমারোহ। রাজারাজড়ার ঘরের বিয়ে আমাদের মতন আমজনতার মধ্যেও একটা আনন্দের রেশ জাগিয়ে তোলে যদিও  তা সাময়িক। একজন শিল্পপতির ছেলের সঙ্গে আর এক শিল্পপতির মেয়ের  বিয়ে হলো, সারা পৃথিবীর তাবড় তাবড় নেতা মন্ত্রীর সমাগম হলো, কোটি কোটি টাকা কেমন ভুস করে উড়ে‌গেল-- অবশ্যই এক পকেট থেকে আর এক পকেটে আর আমজনতা বলতে লাগল, " কেয়া বাত হ্যায়,  শাদী হো তো অ্যায়সা''। আমরা আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবরে কি দরকার?  না, তা ঠিক নয়, ছোটখাটো ব্যাবসাদার যদি নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যাবসা করতে পারে তাহলে তার ভাগ্যেও শিকে ছিঁড়তে পারে। যেমন  যে পান বানায় খুব  সুন্দর,  সে পানের‌ বরাত পেতে পারে বা কেউ ভাল ঢোল বাজালে সেও ডাক পেতে পারে।

বিয়ে মানে তো একটা ছেলের  সঙ্গে  একটা মেয়ের  বিয়ে নয়, একটা পরিবারের সঙ্গে আর একটা পরিবারের মেলবন্ধন। বিয়ের ব্যাপারটা আজকাল বেশ আধুনিক  হয়ে গেছে। আগে ঘটকদের মাধ্যমে বিয়ের যোগাযোগ হতো। অমুক ঘটকের খুব নাম ডাক, ওর কাছে গেলেই বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাওয়া ছেলেমেয়েদের বিয়ে হবেই হবে। তখন কম্পিউটার না থাকলেও জাবদা খাতায়  ঠিকুজি কুলজি সব থাকত এবং  ঐ ঘটক মশাইরা যেন এক একজন জীবন্ত কম্পিউটার । তাঁর দক্ষিণা তো নাম রেজিস্ট্রেশনের সময় দিতেই হতো , এছাড়া বিয়ে হলে তাঁর  সাম্মানিক দক্ষিনাও বেশ ভাল রকম হতো যার নাম ছিল  ঘটকবিদায়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে  ঘটকমশাইএর জায়গা নিয়েছে বিভিন্ন ম্যাট্রিমোনিয়াল । সেখানেও নাম রেজিস্ট্রি করতে হয় একটা বাঁধা সময়ের জন্য এবং এই ব্যবসাও বেশ রমরমিয়ে চলছে। আত্মীয় স্বজনের সূত্রে সম্বন্ধ এলে পাত্র পাত্রীদের সম্বন্ধে অনেক  খবর জানা যেত। চলতি কথা ছিল  উঠতি ঘরের ছেলে এবং পড়তি ঘরের মেয়ের সম্বন্ধে খোঁজ পড়ত বেশী, বড় জোর সমানে সমানে । পুরুষ শাসিত সমাজে ছেলের বাড়ির  কথাই বেশী  প্রাধান্য পাবে কিন্তু সেটা বিয়ে হওয়া ইস্তক, তার পরেই ছেলের বাবা মা বা কাকা, পিসিরা সব ব্রাত্য, তার জায়গা নেয় মেয়ের বাড়ির লোকজন  মানে মেয়ের বাবা, মা এবং মাসি বা মামারা। সুতরাং,  ঘটের বুদ্ধি একটু খরচ করলেই  সম্পর্কটা বেশ টিকিয়ে রাখা যায়।  বেশী বেগড়বাঁই করলে সম্পর্ক ফুটুস। ম্যাট্রিমোনিয়ালের মাধ্যমে যে সম্পর্কগুলো আসে সেগুলো যথেষ্ট  সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করতে হয় নাহলে পরে ম্যাট্রিমনি সংস্থাকে দোষ. দিয়েও বিশেষ লাভ হবেনা আর তা ছাড়া তারা দায়িত্ব নেবেই বা কেন? ওরা সমস্ত‌ দেওয়া তথ্য পরীক্ষা করে কিনা জানা নেই । তথ্য পরীক্ষা করার জন্য আলাদা সংস্থা আছে এবং তাদের সার্ভিস পেতে গেলে গাঁটের কড়ি খরচ করতে হবে । বাবা মায়ের অনেক কষ্ট লাঘব হয়ে যায় যদি ছেলে মেয়েরা নিজেদের জীবন সঙ্গী বা সঙ্গিনী বেছে নেয়। তারা অনেক দিন ধরে মেলামেশা করার ফলে বুঝতে পারে যে নিজের পছন্দের সঙ্গে কতটা মিলছে এবং  সেই হিসাবে নিজেদের জীবন সঙ্গী  বা সঙ্গিনী বেছে  নেয় । কিন্তু এ সত্ত্বেও কি সব কিছু ঠিকঠাক চলছে? না, এতেও মাঝে মধ্যে চলার পথে কিছু বাধা আসে যার অনিবার্য পরিণতি বিচ্ছেদ । খুবই দুঃখের কথা, কিন্তু বাস্তবে ঘটছে ও তাই। ছেলে, মেয়ে দুজনেই যথেষ্ট  শিক্ষিত এবং  তাদের  দুজনের  ক্যারিয়ারের গ্রাফ ই ঊর্ধমুখী কিন্তু কোন  কারণে তাদের  একই শহরে পোস্টিং না হলে দীর্ঘদিন আলাদা থাকতে হয় যার ফলে মানসিক অবসাদে ভুগতে হয় এবং  একটা স্টেজ পরে সেটা বিচ্ছিন্নতার পথে ঠেলে দেয়। এই সময় কাউকে না কাউকে একটু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। আজকাল সবার ই নিউক্লিয়ার  ফ্যামিলি । সুতরাং  ছেলে বা মেয়েরা তাদের  বাবা মায়ের  সাধ্যানুযায়ী যত্নে বেড়ে ওঠে এবং  বিয়ের  পর সেই মানে একটু ঘাটতি হলেই অসন্তোষ  ধীরে ধীরে পুঞ্জীভূত হতে থাকে এবং বিস্ফোরক অবস্থার দিকে এগোতে থাকে। এইসময় বাবামায়ের ভূমিকা  অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে মায়েদের। এইসময়  কাউন্সেলিং ভয়ানক ভাবে দরকার। কাউন্সেলিং এর পরেও যদি মানিয়ে নেওয়ার অবস্থায় না যাওয়া সম্ভব হয় তাহলে তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি  বিচ্ছেদ । এমন ও ঘটনা চোখে পড়ে যেখানে সন্তান হওয়ার  পরেও  বিচ্ছেদ  ঘটে যায় । অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা কিন্তু এর সাক্ষীও হতে হয়। আজকাল  যে কোন বিয়েই ভীষণ ব্যয়সাপেক্ষ । এত খরচ করেও যদি তার স্থায়িত্বে সন্দেহ থাকে তাহলে তাও রীতিমতো  বেদনাদায়ক ।
বিয়ে স্বভাবতঃই এক গাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠান । এই অনুষ্ঠানে  একটু হালকা মেজাজ আনার জন্য  ঠাকুমা দিদিমাদের এক বিরাট দায়িত্ব ছিল। নানারকম ছড়া বা কবিতা তাঁরা লিখতেন এবং পুস্তিকার আকারে তা প্রকাশ করা হতো।আইবুড়ো ভাত(অনূঢ় বা অনূঢ়া অবস্থায় ভাত খাওয়া) একটা খুব বড়সড় অনুষ্ঠান ছিল ।বিয়ের দিন সকাল বেলায় পাত্রর গায়ে হলুদ  হতো এবং  সেই  হলুদ বীর মুটের কড়ি সমেত পাত্রীর বাড়ি নিয়ে যাওয়া হতো এবং  তারপর পাত্রীর গায়ে হলুদ  হতো। এরপর আর পাত্র বা পাত্রীর কোন খাবার জুটত না একটু আধটু সরবত ছাড়া ।এখন আর এত কষ্ট ছেলে মেয়েদের  দেওয়া হয়না। বিয়ের দিন দিদিমা ঠাকুমারা কিন্তু রীতিমতো নাচতেন,  এখন যেটা সঙ্গীতে হয়। এছাড়া নানারকম ছোটখাটো খেলাধূলোর মাধ্যমে এই গম্ভীর অনুষ্ঠান কে আরও কত প্রাণবন্ত করা যায় তার দিকে  খেয়াল রাখতেন। হোম এবং সপ্তপদী হিন্দুশাস্ত্রমতে বিয়ের  এক অঙ্গাঙ্গী অনুষ্ঠান  এবং  আজও তা পালন করা হয়।

সাম্প্রতিক কালে কয়েকটা বিয়েতে যোগ দিয়ে ভীষণ ভাল লাগল। দিল্লীতে তাজ হোটেলে দুই পরিবারের  একসঙ্গে থেকে বিয়ে বা জয়পুরের রাজবাড়িতে  বন্ধুর  ছেলের বিয়েতে চুটিয়ে আনন্দ করার প্রায় একবছর বাদে একটা ধমাকাদার বিয়ে হলো যেখানে আশপাশের লোকজন  সবাই মিলিতভাবে এত আনন্দ করলো যে কার বাড়ির বিয়ে প্রায় ভুলে যাবার ই দশা। ছেলের বাবা মায়ের তরফ থেকে  সমস্ত আত্মীয়স্বজনদের আগমন এবং পাড়া প্রতিবেশীদের সবার আন্তরিক  যোগদান একটা দারুণ আনন্দময় পরিস্থিতির  সৃষ্টি করেছিল ।  দিল্লী বা জয়পুরের  ডেস্টিনেশন ম্যারেজের মতন এবার ও চুটিয়ে আনন্দ করা হলো। আত্মীয় পরিজনদের সঙ্গে পাড়া প্রতিবেশীদের এই যোগদান একটা বিরল আনন্দের সৃষ্টি করেছে। সবার আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা  নিয়ে দাম্পত্য  জীবন শুরু হোক এই আমাদের  সবার প্রার্থনা। 

Monday, 13 January 2025

পৌষল্যা------তখন ও এখন

শীতের আমেজ শুরু হতেই পৌষল্যা বা বনভোজনের কথা মনে পড়ে এখন যার পোষাকি নাম বা ইংরেজিতে নাম পিকনিক। তখন ক্লাসের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়ে যেত ডিসেম্বর মাসে। নতুন বছরে নতুন ক্লাস শুরু হতো, পড়াশোনার চাপ নেই বললেই চলে, সুতরাং পৌষল্যা নিয়ে গজল্লা  বেশ রসিয়ে রসিয়ে চলত। কোথায় পৌষল্যা হবে সেটা নিয়েও তর্ক বিতর্ক বেশ জোরদার হতো এমন কি মতান্তর মনান্তরের পর্যায়েও চলে যেত। কিন্তু একটা কথা মানতেই হবে যে পৌষল্যা বা বনভোজন নিয়ে একটা ভালরকমের উন্মাদনা থাকত।
স্থান  নির্বাচনের ভার তিন চারজন ডাকাবুকোদের উপর থাকত যারা নিভৃত জায়গার সঙ্গে সঙ্গে খাওয়ার জলের ব্যবস্থা আছে এই কথাটা মাথায় রাখত। বন্ধু সার্কেল পাড়ার মধ্যে হলে সেরকম কিছু জাঁকজমক থাকত না কিন্তু ক্লাব স্তরে হলে বিভিন্ন পাড়ার ছেলেদের সমন্বয়ে বেশ বড়সড় বনভোজন বা পিকনিক হতো। সুতরাং  পৌষল্যা হচ্ছে ছোট স্তরে ( খেলার মধ্যে দুধভাত যেমন) এবং  বনভোজন বা পিকনিক হচ্ছে একটু বড় লেভেলে । যে কোন  খেলায় কাউকে দুধ ভাতে বলা হতো  যে একেবারেই ধর্তব্যের মধ্যে নয় অথচ তাকে বাদ ও দেওয়া যাবেনা।এটা একটা প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে যেত কারণ যাকে দুধভাতে রাখা হতো সে সবসময়ই মনে করত যে সে অন্যদের সমকক্ষ কিন্তু তার বন্ধুদের  চোখে বাচ্চা বা আনাড়ি। যাই হোক,  পৌষল্যা বা বনভোজন হতো সাধারণতঃ লোকালয়ের বাইরে কোন বড়সড় পুকুর বা বিলের পাড়ে কিংবা কোন বনের মাঝে কালিবাড়ির কাছে একটা বড়সড় গাছের নীচে যেখানে একটা চাদর বা বেডকভার  টাঙিয়ে  নেওয়া হতো এবং তার  নীচে রান্নার ব্যবস্থা করা হতো। খাবার জল কালীবাড়ির টিউব ওয়েল থেকে নেওয়া হতো এবং অন্য সব কিছু বিলের জলে করা হতো। রান্না সেরকম বিশেষ কিছু হতো না-- ভাত, ডাল, আলুভাজা বা বেগুন ভাজা, ফুলকপির তরকারি  ও ডিমের ঝোল এবং  শেষ পাতে একটু বোঁদে ও রসগোল্লা । মাংস করলে খরচাও বেশী যা বাচ্চাদের পক্ষে বাবা মায়ের কাছে  চাওয়া যেতনা এবং কেউ একটু বেশী পেল বা কম পেল তাই নিয়ে মন কষাকষির সম্ভাবনা থাকতো ।  সুতরাং মাংস বাদ আর কম খরচের মাংস বা চিকেন ছিল ই না তখন।  নিজেরাই জায়গা পরিষ্কার  করা,মশলা বাঁটা (তখন গুঁড়ো মশলার চল ছিলনা), গর্ত করে উনুন বানানো,চারদিকে গাছগাছড়া থাকায় কাঠের অভাব হতো না এবং  রান্নায় নুন কম বা ঝাল বেশী নিয়ে কেউ মাথাই ঘামাতো না। রান্নার বাসনকোসন কোন গরীব লোককে দিয়ে  মাজিয়ে নেওয়া হতো কিছু খাবার ও সামান্য পয়সার বিনিময়ে । দুর্দান্ত আনন্দ হতো এই পৌষল্যায়।  সাধারণত বাড়িতে আধখানা ডিম খাওয়া হতো কিন্তু এই পৌষল্যায় গোটা ডিম খাওয়া একটা বিরাট ব্যাপার। মোদ্দা কথা, অল্পতেই সন্তুষ্টি কারণ সেই সময় প্রত্যেক বাড়িতেই  পাঁচ সাতটা ছেলেমেয়ে নিয়ে কোন পিসি বা কাকা থাকায় প্রায়  দশজনের মুখে  খাবার জোগানো বড় সহজ ব্যাপার ছিলনা। নিজেরা সমস্ত কাজ করায়  আনন্দের মাত্রা ছিল আকাশ ছোঁয়া। 
ক্লাব স্তরে যখন পিকনিক হতো তখন আমরা নিতান্ত  ছোট হওয়ায় ক্লাবের দাদারাই সব মাথা এবং  ব্যবস্থাপনা তাদের ই। সকাল বেলায় স্নান করে ক্লাবে হাজির  হওয়া এবং লাইন দিয়ে মাড়োয়ারি বাগানে যাওয়া। ঐ বিশাল বাগানবাড়ির নাম কেন মাড়োয়ারি বাগান হয়েছিল তা জানিনা তবে পঞ্চানন তলা থেকে জঙ্গলের পথে আরও মাইলখানেক গেলে পড়ত সেই ফাটক ওয়ালা বিশাল বাগানবাড়ি। অনেকগুলো বাঁধানো পুকুর , নানা ফুল ফলের গাছে ভরা বিশাল বাগানের মধ্যে এক পোড়ো রাজবাড়ি যার আশে পাশে গেলেই গা ছমছম করতো। ভুটানদার ওপর ভার ছিল  আমাদের  সামলানো। আমার দেখা একজন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ভদ্রলোক  যাঁর হাতের ছড়ি কখন যে কার মাথায় পড়বে একটু বেচাল হলেই , কেউ বলতে পারতনা। আর এইরকম দুর্ধর্ষ বোম্বেটেদের সামলানো ঐ ছড়ি ছাড়া সম্ভব হতো‌ না বলেই মনে হয়। কিন্তু কাজ যে একেবারেই কিছু করতে হতো না তা হয়, নতুন  আলুর খোসা বস্তায় ঘসে ওঠাতে হতো। রান্নার ভার রঘুদার ওপর। দুলু দা, বুড়োদা, শক্তি দা, মনা দা, চঞ্চলদা, দোদা দা,মোহন দা, মদন দা, রবি দা, প্রণব দা, কাজল দা, ভুটান দা, পল্টু দা, মিলি দা, ছোকুদা, বীরেনদা ছাড়াও আরও অনেকেই থাকতেন  এই পিকনিকে । খাওয়াদাওয়া সারতে সারতে ছোট দিনের বেলা গড়িয়ে যে কখন সন্ধে হয়ে যেত বুঝতেই  পারতাম না।  সকাল বেলায় পিকনিক স্পটে পৌঁছানোর পর  ডিমসেদ্ধ, পাঁউরুটি ও কলা দিয়ে টিফিন খাওয়া হতো। আলুর খোসা ছাড়ানোর পরেই দড়ি ছাড়া গরুর মতো এদিক সেদিক করে কুল  বা পেয়ারা পেড়ে খাওয়া  হতো। লম্বা লম্বা নারকেল গাছ থেকে  নারকেল  পাড়া আমাদের  কম্মো ছিলনা কিন্তু  ব্রজেন দা পুকুর পাড়ে নারকেল গাছে তরতরিয়ে উঠত এবং  নারকেল পাড়তো। কোন কোন সময় দুচারটে নারকেল পুকুরের জলেও পড়ে যেত। পুকুরগুলো সব বাঁধানো ছিল মানে যাঁদের বাড়ি ছিল তাঁরা  বেশ বড়মাপের জমিদার বা রাজা ছিলেন। অত লোকের রান্না হতে যথেষ্ট  সময়  লাগত আর এর মধ্যেই মনাদার গল্প ও চুটকি সবার মন ভরিয়ে দিত। এইরকম জমজমাট পিকনিক জীবনেও ভোলার নয় কারণ এখানে ছোট বড়সড় সবাইকেই কিছু দায়িত্ব  দেওয়া হতো এবং প্রত্যেকেই সেটা আনন্দের সঙ্গে করতো যেটা এখনকার পিকনিকের থেকে অনেক আলাদা। এখন কাছাকাছি  পিকনিক  স্পট নেই বললেই চলে। লোকসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য আশপাশের ফাঁকা জায়গাগুলোয় বাড়ি ঘর হয়ে গেছে এবং বড়সড় জায়গা খুঁজতে গেলে যেতে হবে গাড়িতে বা বাসে বা ট্রেনে । লোকসংখ্যা বেশী হলে একটা বাসেও হবেনা, অনেক গাড়ি বা বাসের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এ ছাড়া লোকজন বেশী হলে গ্রুপের মধ্যে যে বাঁধন সেটা বহুলাংশেই শিথিল হয়ে যায় । তখন নামেই একটা বড়দলের পিকনিক  কিন্তু তা ছোট ছোট  অনেক গ্রুপের  সমন্বয় । এই গ্রুপের লোকের  সঙ্গে ঐ গ্রুপের  লোকের  বিশেষ  সদ্ভাব নেই। সুতরাং জমাটে পিকনিক  হবার  সম্ভাবনা খুব কম । এ ছাড়া নিজেদের  যোগদান, না থাকার ই সামিল। চাঁদা দিয়েই খালাস। কতটা পেলাম প্রতিদানে এই নিয়ে হিসেব কষতে কষতেই আনন্দের  দফারফা। এছাড়া রয়েছে ক্যাটারার, তারাই খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারটা দেখে বলে পিকনিকে অংশগ্রহণকারীদের ভূমিকা অত্যন্ত নগণ্য। তবুও  এরই মধ্যে দুএকজন বিশেষ  ভূমিকা পালন করেন বলে এখনও এর মধ্যেই কিছু  আনন্দ পাওয়া যায় । এঁরা যদি কোন কারণে  দায়িত্ব  না নেন তাহলে পিকনিকটাই হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। এখন সবকিছুই যেমন নিউক্লিয়ার,  গ্রুপটাও সেরকম নিউক্লিয়ার বাঊ আঁটোসাঁটো হওয়া দরকার । এঁরা আছেন বলে আজ ও কিছু আনন্দ পিকনিকে  পাওয়া যায়। 
আজকের দিনে পিকনিক অবশ্য সারাবছর ধরেই হয় বলে এখানে সেখানে বহু রিসর্ট হয়েছে এবং ঠা ঠা রোদেও এয়ার কণ্ডিশনড ঘরে বসে দিব্যি রমরম করে পিকনিক ও চলছে আর রিসর্টগুলোও চলছে। এখন পৌষল্যা পৌষমাসেই আবদ্ধ নেই, নাম বদলে পিকনিক  হয়েছে এবং বার মাস ধরে চলছে।

Friday, 10 January 2025

প্রত্যাবর্তন

হঠাৎই একটা মেসেজ এল পাশের বাড়ির মেসোমশাই  গতকাল রাতে  অমৃতলোকে যাত্রা করেছেন। একাই থাকতেন তিনি স্ত্রী বিয়োগের পর। এক ছেলে ও এক মেয়ে বিদেশে থাকে, তারা তাদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে মধ্যে আসে তারা বাবা মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে । রবি বাবু ও তাঁর স্ত্রী সুকন্যা দেবী খুশীতে ডগমগ হয়ে উঠতেন, বিশাল বাড়িটা  ঝলমলিয়ে উঠত বাচ্চাদের কলরবে। কয়েকটা দিন হৈচৈ,  তারপরেই ঝিমিয়ে পড়ত গেট ওয়ালা বাড়িটা। কেউ এলে গেলে মাসিমা বলতেন, "বাবা, গেট টা লাগিয়ে দিয়ে যেও। "সেই মাসিমা ও চলে গেছেন গতবছর। তারপরেই রবি বাবুর একাকীত্ব শুরু। লোকজনের আসা যাওয়া কমে গেছে। একটু আধটু লেখাজোখা করে খানিকটা সময় কাটে কিন্তু  দীর্ঘ সময় তো আর কাটতেই চায়না। বেশীক্ষণ লিখতেও আর ভাল লাগেনা। আগে যখন স্ত্রী বেঁচে ছিল তখন লেখার সময় অবধারিতভাবে বলত যে বাজারে যাও সকাল সকাল নাহলে ঐ ঝটতি পটতি জিনিসগুলো তোমার থলিতে ঢুকবে আর আমার প্রাণান্ত। খুবই বিরক্ত হয়ে কলমটা টেবিলের ওপর আছড়ে ফেলে থলিটা নিয়ে বেরিয়ে যেতেন। রাগের মাথায় জিনিস পত্র আনাতেও গণ্ডগোল হয়েযেত যার অবশ্যম্ভাবী ফল গিন্নীর গনগনানি। তখন বিরক্তির মাত্রা আরও বেড়ে যেত কিন্তু আজ কেউ পিছনে  টিকটিক করার নেই, চোখা চোখা বাণে কেউ বিদ্ধ করার নেই,  আছে শুধু নিস্তব্ধতা, তবু লিখতে মন আর চায়না।  পিছন থেকে  খানিকটা বিদ্রূপাত্মক শব্দ উড়ে না এলে কলম যেন আগে বাড়তেই চায়না। সেও যেন বুঝে গেছে ঝাঁকানি শেষ অতএব দাও ক্ষান্তি। রবিবাবু ও বুঝতে পারেন সুকন্যার অনুপস্থিতি তাঁকে নিরুৎসাহী করে তুলেছে। প্রকাশকের তাগাদাও তাঁকে আর উজ্জ্বীবিত করতে পারছে না। অথচ, না লিখলেও পয়সা আসবে না,সঞ্চিত পুঁজিতে পড়বে টান। জীবনের উপান্তে এসে ছেলেমেয়েদের কাছে নিজের  কোন চাহিদার কথা বলতে খুব কুণ্ঠা বোধ হয় । সেই জন্য এক রকম বাধ্য হয়েই কলম খুলে বসতে হয়। কি যেন লিখছিলাম ভুলে গেছি, প্রথম থেকে একবার পড়ে নিয়ে খেই ধরতে হয়। তবু সেই তখনকার মনের অবস্থায়  ফিরে যেতে যথেষ্ট অসুবিধা হচ্ছে। লেখক এক, বিষয় এক, কলম ও এক কিন্তু ভিন্ন মন । গল্পের গতি ভিন্নমুখী।রবি বাবু ভাবেন এটা নিশ্চয়ই সব লেখকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য কারণ শয়ে শয়ে পাতার উপন্যাস তো আর একটা সিটিং এ লেখা সম্ভব নয়। সুতরাং ভিন্ন মানসিকতায় শেষ হয় এই দীর্ঘ উপন্যাস। যাঁরা সেই গতি প্রকৃতি এক ধারায় রাখতে পারেন তাঁরা সত্যিই নমস্য।
কদিন ধরেই  শরীরটা বিশেষ  ভাল যাচ্ছেনা। অল্প অল্প জ্বর, প্যারাসিটামল খেয়ে জ্বর নেমে যাচ্ছে আবার খানিকক্ষণ বাদেই যে কে সেই। বন্ধুবান্ধব আসছে দেখা করতে,  নিয়েও যেতে চাইছে ডাক্তারের কাছে কিন্তু রবি বাবুর মন আর সরছে না। কেবল ই মনে পড়ছে শৈশবের কথা,  ধোপঘাটির মাঠে ফুটবল খেলার কথা এবং খেলা শেষে বৈঁচি পাড়ার কথা,  মণ্ডল বাড়ির বাতাপি লেবু বা ভাদুড়িদের বাড়ির নারকেল চুরির কথা । এক কথায় শৈশবের হাতছানি আর উপেক্ষা করতে পারছেন না রবি বাবু । কাজের মেয়ে রান্না করে যাবার সময় বলে গেল গরম গরম খাবার খেয়ে নিও, ঠাণ্ডা খাবার খেওনা, শরীরটা তোমার ভাল নেই । রবি বাবু কোন উত্তর দিলেননা। ল্যাচটা টেনে দিয়ে চলে গেল দীপা। রবি বাবু কিন্তু সেই শৈশবের দিনগুলোয়  মত্ত, কোনরকম ভ্রূক্ষেপ করলেন না।
দীপা পরদিন সকালে এসে চাবি খুলে ঢুকে দেখে খাবার টেবিলে রাতের খাবার  যেমনকার তেমন সাজানোই আছে। ঘরে ঢুকে দেখে রবিবাবু যেমনভাবে শুয়েছিলেন তেমন ভবেই শুয়ে আছেন, ঠোঁটের ফাঁকে একটু মুচকি হাসি কিন্তু শরীরটা যেন স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশী রকম ই ঠাণ্ডা। কাকু,কাকু বলে অনেক ডাকার পরেও কোন  উত্তর না পেয়ে চিৎকার করে উঠে সবাইকে ডেকে আনল। পাড়ার ডাক্তার বীরেন ভট্টাচার্য এসে পরীক্ষা করে দেখে বললেন, " নাহ্, সব শেষ । কিন্তু ছেলে মেয়ে  কেউই নেই এখানে, খবর দিতে হবে দেহ সৎকারের জন্য। অতএব খবর দিতে হলো পীস হ্যাভেনে। গাড়ি এসে গেছে রবি বাবুর নিথর দেহটা নিয়ে যাওয়ার জন্য। দীপা সারাক্ষণ ই কাঁদছিল ।মুখে মৃদুহাসি  নিয়ে রবি বাবু চললেন শৈশবের বন্ধুদের উদ্দেশ্যে  যেখানে রয়েছে  নিমাই, দেবু, বাবু, মোহন, বিজয়রা ডাণ্ডা গুলি নিয়ে, রয়েছে ছোট বল পিট্টু খেলার জন্য, যেটা রবি বলবে সেটাই খেলবে কারণ আজ ওই হচ্ছে প্রধান অতিথি ।

Sunday, 22 December 2024

"লৌকিকতার পরিবর্তে আশীর্বাদ প্রার্থনীয়"

কোন কোন  লোক থাকেন যাঁরা দাদা ডাকেই খুব আনন্দ পান, তা সে ব্যক্তির বয়স যাই হোক না কেন। এইরকম ই একজন ব্যক্তি বিশুদা।আপামর জনতার বিশুদা, সে আমার বাবার ও বিশু দা, আমার ও বিশুদা, আমার ছেলের ও বিশুদা, আবার তার ছেলেও হয়তো বিশুদা ই বলবে যদি তিনি ততদিন বেঁচে থাকেন । এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিশুদা তাঁর বিশাল দশাসই চেহারা নিয়ে নতুন বাজার যেতে যে উঁচু ধাপিওয়ালা বাড়িটা পড়ে সেখানে বসে থাকেন এবং বাজারগামী  বা বাজার করে ফিরে আসা সমস্ত লোকজন একবার তাঁর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টা সামান্য প্রসারিত করে কোন শব্দ উচ্চারন না করেও ভাল আছেন জিজ্ঞেস করেন এবং প্রত্যুত্তরে বিশুদা ও মাথা নাড়িয়ে কোন কথা না বলেও ভাল থাকার কথা বলেন । কোন কোন সময় হাত তুলেও ভাল থাকার কথা‌ জানান । বিশুদা কে বেশিরভাগ সময়ই আদুর‌ গায়ে দেখা যায়, হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় একটা স্যান্ডো গেঞ্জি, ‌বড়জোর একটা হাতকাটা সোয়েটার বা একটা চাদর । তাঁর  ঠাণ্ডা না লাগার কারণ জিজ্ঞেস করলেই লুঙ্গির ট্যাঁকে গোঁজা একটা তামার পয়সা  বের করে দেখাতেন আর বলতেন বুঝলি পয়সার গরম কাকে বলে? প্রকাণ্ড শরীরের মালিক এই বিশুদা কোথায়  থাকেন,  কে ই বা তাঁর খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেন কিছুই  জানা ছিলনা । কাজকর্মহীন বিশুদা কে দেখা যেত ফুটবলের মাঠে। কোন  বিশেষ দলের সমর্থক ছিলেন বলে মনে হয়না কারণ যে দল ভাল খেলত  তাকেই উৎসাহ  যোগাতেন।হয়তো যে  দলের সমর্থক আমি তার বিরুদ্ধে একটা গোল হয়ে গেল আমার মন খারাপ  হয়ে গেল কিন্তু পাশে বসে থাকা বিশুদা দুহাত তুলে আনন্দ প্রকাশ করলেন এবং আমার মন দ্বিগুণ খারাপ হয়ে গেলেও বিশুদার প্রতি রাগ করতে পারতামনা।শুধু আমি কেন,  কেউই রাগ  করতে পারতনা। এমনই ছিল তাঁর জনপ্রিয়তা। 
খেতে খুব  ভালবাসতেন বিশুদা আর চেনা অচেনা সব লোকই তাঁকে  নিমন্ত্রণ করে আত্মতৃপ্তি লাভ করতেন। বিশুদা কে নেমন্তন্ন করা মানে দশটা লোককে নেমন্তন্ন করা কিন্তু  তা সত্ত্বেও বিশুদা কে লোকে নিমন্ত্রণ করত।উপহার‌ বিশুদার একগাল হাসি সমেত আশীর্বাদ । এ ছাড়া বিশুদার কাছ থকে কেউ কোন উপহার আশা করতনা। তারাশঙ্কর দা ছিলেন একটা স্কুলের  মাস্টারমশাই । তখন স্কুলের  মাস্টারমশাইদের  মাইনে তিন চার মাস  অন্তর হতো। মাইনে পেতেই প্রায় সবটাই চলে যেত ধার শোধকরতে। তবু ও মাইনে পাবার মাসে কোন নিমন্ত্রণ হলে খুব  একটা অসুবিধা হতোনা উপহার দিতে কিন্তু সেই নেমন্তন্ন যদি মাইনে পাওয়ার প্রায় শেষ অবস্থায় পাওয়া যায় তা হলে ধার করা ছাড়া আর কোন রাস্তাই থাকেনা। এইরকম একসময়  তারাশঙ্কর দার বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে তারাদার নেমন্তন্ন হলো, সঙ্গে বিশুদার ও। আর ঐ বন্ধুই হচ্ছে তারাদার মুশকিল আসান । নানা সময় তারা দা তারই শরণাপন্ন হন টাকার দরকারে কিন্তু তাঁর ই মেয়ের বিয়েতে উপহার  দেওয়ার জন্য তাঁর ই কাছে টাকা চাইতে ভীষণ লজ্জ্বা  হচ্ছিল তারাদার। না, কিছুতেই ওর কাছে নেওয়া যাবেনা। অনেক  চিন্তা ভাবনা করে বিডিও অফিসের হেডক্লার্ক মুকুদার শরণাপন্ন হলো। মুকুদা বলল আসতে তারাদাকে তার অফিসে, যদি কোন ব্যবস্থা করাযায়  ধারের। সেদিন ছিল শনিবার শেষ দুটো পিরিয়ড ছিল কেমিস্ট্রি প্র্যাকটিক্যাল । আমার ও ছিল প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস । হেডমাস্টার মশাইকে বলে ম্যানেজ করে আমার ওপর দুটো ক্লাসের  ভার দিয়ে উনি তো মুকুদার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন । মুকুদার সমস্ত চেষ্টা বিফল, কারও কাছে  বাড়তি টাকা নেই  ধার দেওয়ার মতো । তারাদাও খুবই বিমর্ষ । না,বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে  কোন  উপহার  না নিয়ে কিছুতেই  যাবেনা সে। হঠাৎই  মনে পড়ে গেল  বিশুদার ও নিমন্ত্রিত হওয়ার কথা। বিডিও অফিসে অনেক লিফলেট পড়ে ছিল। উই প্ল্যান ফর প্রসপারিটি, রুরাল ডেভেলপমেন্ট,  ফাইভ ইয়ার প্ল্যান এই জাতীয় যত লিফলেট ছিল সবকটা থলি ভর্তি করে নিয়ে এল। স্টেশনারি দোকান থেকে মলাট দেবার লাল, কমলা রঙের অনেক গুলো কাগজ কিনে নিয়ে  এল।  সেলোফেন পেপার দিয়ে  ভাল করে মুড়িয়ে ঐ পুস্তিকাগুলো একটা দেখনদার গিফট প্যাক করে বিশুদার পাশাপাশি বন্ধুর মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেল। বন্ধু তারাদার হাতে সুদৃশ্য প্যাকেট  দেখে একটু আশ্চর্য ই হলো, ভাবল তারা ধারদেনা করে কেন এইরকম একটা দামী উপহার  কিনতে গেল। যাই হোক,  মুখ্য আকর্ষণ বিশুদার আশীর্বাদের পাশে অন্য যে কোন  লোকের উপহার কেমন ম্যাড়মেড়ে। তারা দা তো একেবারে লেপটে রয়েছে বিশুদার সঙ্গে । বিশালদেহী বিশুদার আশীর্বাদের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তারাদার গিফট প্যাকেট দিয়েই তারাদার খাওয়ার জায়গায় প্রস্থান বিশুদা কে নিয়ে। খাওয়া দাওয়ার পরেই যত তাড়াতাড়ি  সম্ভব বাড়ি ফিরে  আসা।
বিয়ে বাড়িতে কনের পাশে কোন বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়রা থাকে যারা কে কি উপহার  দিল তা একটা লম্বা কাগজে লিখে রাখে। মোটামুটি সব গিফটের উপহারদাতার নাম পাওয়া গেলেও  ঐ বিশেষ  প্যাকেট কে দিয়েছেন তা জানা গেল না। আর প্যাকেটটা এত মজবুত ভাবে মোড়ানো  হয়েছে  তাকে ঐ মূহুর্তে  খোলা গেলনা। পরদিন কন্যা বিদায়ের সময় অনেক  উপহারের সঙ্গে সেই মজবুত প্যাকেট ও চলে গেল । শ্বশুরবাড়িতে বিয়ের ঘনঘটা থিতিয়ে যেতেই ছুরি, কাঁচি দিয়ে সেই প্যাকেট খুলতেই পঞ্চবার্ষিকী প্ল্যান,গ্রামীন উন্নয়নের সরকারী ইস্তেহার সব ছড়িয়ে  ছিটিয়ে  পড়ল। সবাই ছিছি করতে লাগল আর মধুমিতার লজ্জ্বায়, দুঃখে কান্না পেয়ে গেল। অষ্টমঙ্গলায় ফিরে এসে মা কে বলল এই উপহারের কথা। মা তো হাঁ করে চেয়ে রইল কিছুই আঁচ করতেই পারলনা কিন্ত ওর বাবা অর্থাৎ  তারাদার বন্ধু কিন্তু বুঝতে পেরেছে যে এটা তারার কাজ। বিয়ের  পর বেশ কিছুদিন  কেটে গেছে । তারাদার মাইনে হয়েছে এবং  ধার শোধের পালা। বন্ধুর  কাছে  এসেছে টাকা ফেরত দিতে  কিন্তু  বন্ধু বলল, " তারা, পঞ্চাশ টাকা  বাড়তি দিবি এবার।" হকচকিয়ে গেল তারা দা। " কেন রে পঞ্চাশ টাকা বাড়তি কেন, তুই কি আজকাল  সুদের  ব্যবসা করছিস না কি?"
"না, সুদের  ব্যবসা নয়, তিরিশ টাকা  মেয়ের  বিয়ের  উপহার  আর কুড়িটাকা মেয়ের  শ্বশুরবাড়িতে  আমার সম্মান  নষ্ট করার জন্য।"
তারা দা যত ই অনুনয় বিনয় করে কিন্তু বন্ধু অনড় এই পেনাল্টিতে । "তোর কাছে টাকা ছিলনা তো তুই  এইসব ছাইপাঁশ এখানে আনলি কেন?"
তারা দা বলল, " দেখ , সবসময়ই টাকা তোর কাছেই নিই কিন্তু  তোর  মেয়ের  বিয়েতে  উপহারের জন্য তোর কাছে  টাকা নেওয়া  কি উচিত? "
" তোকে উপহার দিতেই হবে, এমন কোন  বাধ্যবাধকতা তো নেই ঐ তো বিশুদার মতন তুই ও আশীর্বাদ করতে পারতিস।"
 যাই হোক তারাদাকে বড্ড লজ্জায় ফেলে দিল তার বন্ধু। 
পরে আর কোনদিন  তারা দা ঐ বন্ধুর কাছে টাকা  ধার নিয়েছিল কিনা জানা যায়নি।

Saturday, 7 December 2024

মধুর যাত্রা

হঠাৎই ছেলের ফোন বেশ রাতে, ব্যাগ গুছিয়ে রাখ, যেতে হবে আমাদের মাউন্ট আবু। সবেমাত্র নিউমোনিয়া থেকে সেরে ওঠা আমি চমকে উঠলাম প্রস্তাব শুনে। এখনও  নিউমোনিয়ার ভ্যাক্সিন নেওয়া হয়ে ওঠেনি, আমি তো ভয়েই শুকিয়ে গেলাম। তবু একবার ভাবলাম যে প্রজাপিতা ব্রহ্মকুমারীর বেছে নেওয়া জায়গা মাউন্ট আবুর অপরিসীম শিল্প কীর্তি দিলওয়ারা টেম্পলের পাশে যদি বিলীন হয়ে যেতে পারি তাতে মন্দ কি? সোমবার  ২রা ডিসেম্বর আকাশ এয়ারলাইন্সে দুপুরের টিকিট আমাদের কিন্তু কপালের ফের, যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য দুঘন্টা লেট। কিন্তু সবদিক দিয়েই লোকসান হলো না, প্রত্যেক যাত্রার ই একটা আলাদা মাত্রা থাকে এবং এখানেও তার ব্যাতিক্রম হলো না।
দুপুর বেলায় খাওয়া দাওয়া সেরে এয়ারপোর্ট  পৌঁছলাম । এসে গেল  হুইল চেয়ার । একটু বেচারা বেচারা মুখ করে চেয়ারে বসতেই একটা লজ্জ্বা চারদিক থেকে  ঘিরে এল। দিব্যি হেঁটে চলে হিল্লি দিল্লি করে বেড়াচ্ছি অথচ এয়ারপোর্টে এসেই যেন ঠুঁটো জগন্নাথ । তবু চেষ্টা করি এই হুইল চেয়ার বাহকদের কষ্টটা একটু প্রশমিত করার তাদের পকেটে কিছু গুঁজে দিয়ে একটু লোকচোখের নজর এড়িয়ে  কারণ এদের কর্মকর্তাদের নজরে এলে এদের চাকরি চলে যেতে পারে। আমরা অনেক সময়েই অনেক ভুল কাজ জেনে শুনেই করি। এর বদলে যদি এয়ারলাইন্স আমাদের কাছ থেকে   এই সেবার জন্য কিছু  মূল্য ধার্য করে তাহলে এই মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে হয়না। যাই হোক,  সিকিউরিটি চেক হয়ে যাওয়ার পর বোর্ডিং ও হয়ে গেছে,  এয়ারোব্রিজ দিয়ে তারা এদিক ওদিক করে প্লেনে ঢোকার আগে বেল্ট বাঁধা অবস্থায় চেয়ারে বসে আছি  কিন্তু  প্রতীক্ষার অবসান আর হয়না। প্রায় ঘন্টাখানেক ঐ অবস্থায় থাকার পর জানা গেল  যে যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য প্লেন ছাড়তে দেরী হবে । বেচারা হুইল চেয়ার বাহকদের আরও  দুর্ভোগ বাড়ল, ফের আশি কেজির এই শরীরটাকে টেনে নিয়ে  আবার এক তলায় নিয়ে এল, ফের নতুন করে আবার সিকিউরিটি চেক আর এর ই মাঝে যান্ত্রিক ত্রুটি সারিয়ে নেওয়া। দুটো ঘন্টা  কেমন করে যে কেটে গেল  বুঝতেই পারলাম না।কিন্তু যাদের  যাওয়ার  তাড়া আছে তারা চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে কারণ তাদের  তো অনেক কিছু  সামলাতে হবে, সবাই তো আমাদের  মতো বেকার নয়। যাই হোক,  এয়ারোব্রিজ থেকে মুক্তি পেয়ে রানওয়েতে এসেও আবার অপেক্ষা এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের ক্লিয়ারেন্সের জন্য। এরপর আস্তে আস্তে গড়াতে শুরু কথায় বুঝতে পারলাম যে নির্দেশ  এসে গেছে।
এতক্ষণ যারা হৈচৈ করছিল প্লেন ঠিক সময়ে না ছাড়ার জন্য তারাই বেশ কলরবে মেতে উঠল নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় । কোন কোন  সময়ে ডেসিবেল একটু বেশি ই হয়ে যাচ্ছিল ।  আমাদের দুজনের টিকিট এক জায়গায় হয়নি, পাশে একজন অল্প বয়সী মেয়ে মোবাইলে ভিডিও দেখেই চলেছে আর মাঝে মাঝেই নিজের মনে খিলখিলিয়ে হাসছে‌। পিছনে একটা যুগল(বন্ধু ও  হতে পরে  বা সদ্য প্রেমে পড়া ছেলেমেয়েও হতে পারে) যেখানে ছেলেটি হিন্দি, ইংরেজিতে মিশিয়ে প্রচণ্ডভাবে ইম্প্রেস করে চলেছে। খারাপ  লাগছিল না বিশেষ করে স্ত্রী পাশে না থাকায় ধমক খাওয়ার ভয় ই ছিলনা। সুতরাং লোকজনের কথাবার্তাতেই নিজেকে খুশী রাখার চেষ্টা করছিলাম । সামনের সারিতে এক মুসলিম পরিবার কিন্তু তাদের তিনজনের সিট ও একসাথে হয়নি। কি বেআক্কেলে এয়ারলাইন্সের লোকজন । বাচ্চাটা জানলার ধারে ছাড়া বসবেই না।অল্প বয়সী স্ত্রীর পাশে অন্যান্য লোক বসে থাকবে এটা কিছুতেই  মেনে নিতে  পারছে না বেচারা। 'আইল' সিটে বসে থাকা ভদ্রলোক  বেশ জুত করে বসে সীটবেল্ট বেঁধে ফেলেছেন আর অল্প বয়সী স্বামী তাকে কাতর অনুনয় বিনয় করে চলেছে সীট বদলানোর জন্য । কিন্তু লোকটার মন ভিজল না। অগত্যা বাধ্য হয়েই জানলার ধারে বসে থাকা সীটে দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে উদাসী দৃষ্টিতে পেঁজা তুলোর মতন ভেসে থাকা মেঘের দিকে মনমরা হয়ে তাকিয়ে থাকল। সে আবার আমার ই সারির জানলাতে থাকায় তাকে দেখে একটু কষ্ট ই লাগছিল। পাষাণ হৃদয় লোকটার মন কিন্তু বিন্দুমাত্র টলল না । আমার ও অবস্থা  বিশেষ  সুবিধার নয়। কিন্তু আমার বয়স হয়েছে এবং এইরকম পরিস্থিতির মোকাবিলা মাঝে মাঝেই আমাকে করতে হয়েছে । কিন্তু খিদেটা বেশ  চাগিয়ে উঠেছে আর খাবারগুলো সব তার কাছে থাকা ব্যাগে, সুতরাং,  আমার অবস্থাও বিশেষ সুবিধার নয়, তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। মাথাটা তার বেশ বড়সড় এবং  দাড়ি নিয়ে সমস্ত জানলাটা প্রায় বন্ধ ই হয়ে গেছে। সেই কারণে আমার দিকের ডান দিকের জানলা দিয়ে যতটা দেখা সম্ভব তাই দেখেই মনের স্বাদ  মেটাচ্ছি। প্লেন  চলেছে  পূর্ব থেকে পশ্চিমে, অন্ধকার তাড়া করে চলেছে আলোকে কখন ধরবে বলে। মনে হচ্ছে অ্যানিম্যাল কিংডমে চিতা তাড়া করছে হরিণের পিছনে আর হরিণ প্রাণভয়ে ছুটে চলেছে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। দৃশ্য অপূর্ব কিন্ত দেখার বিষয়ে কখন চিতা হরিণকে ধরে। অবশেষে দৌড়ের সমাপ্তি, লাফিয়ে পড়ে অন্ধকার ধরে ফেলল ক্লান্ত আলোর শিখাকে। আমাদের চারপাশে এত সৌন্দর্য্য ছড়িয়ে আছে আমরা তার দিকে  না তাকিয়ে সামান্য বিষয়ে নিয়েই তুলকালাম করি। প্রায় সাড়ে সাতটা নাগাদ প্লেনের চাকা মাটিতে আলতোভাবে চুমু খাওয়ার জায়গায় সিনেমার ভিলেনের মতো নায়িকার সঙ্গে জবরদস্তি করার মতো ল্যাণ্ড করল এবং  প্রমাণ করল ক্যাপ্টেনের অনভিজ্ঞতা। উবের বুক করে গেস্ট হাউস পৌঁছতে প্রায় নটা বেজে গেল। খাওয়া দাওয়া সারতে বেজে গেল দশটা।কাল গাড়িতে আসবে ছেলে বৌমারা।পাঁচ শ কিলোমিটারের কিছু বেশী রাস্তা আসতে দশ ঘন্টা তো লাগবেই, এ ছাড়া রয়েছে ট্র্যাফিক জ্যাম, কতক্ষণে এসে পৌঁছাতে পারে নির্ভর করছে কত তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বেরোতে পারে তার উপর। 
আমেদাবাদ শহরটা খুব অপরিচিত নয়। তবে যে ভাবে শহরটা দৈর্ঘে প্রস্থে বেড়েছে এবং দেশের দুই শীর্ষস্থানীয় নেতার বাসস্থান হবার কারণে সৌন্দর্য্য আরও ত্বরান্বিত হয়েছে । ওদের না আসা পর্যন্ত আমাদের আর কোন কাজ নেই, এদিক ওদিক  ঘোরা ছাড়া। চারদিকে ফ্লাইওভারের ছড়াছড়ি, চেনা শহরটাও যেন বিদ্রূপ করে বলছে আমি কে বল তো? সত্যিই তো ,চিনতে পারছিনা । তবে ভাগ্য ভাল উবেরের কল্যাণে গাঁঠগচ্ছা বেশী গেলনা। আগে শহর কে দুইভাগে ভাগ করা সাবরমতী নদী ছিল শীর্ণকায়,  এখানে সেখানে ইতস্ততঃ জলরাশি নদীর বুকে জমে থাকা পাথরে ধাক্কা খেয়ে ছোট ছোট তরঙ্গ সৃষ্টি করছে এটা চোখে পড়ত। কিন্তু দুই পাড়েই বেশ খানিকটা জায়গা  ভরাট করে সেখানে হয়েছে রিভার ফ্রন্ট এবং নানারকম আলোয় সজ্জিত হয়ে এক অপূর্ব মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন বয়সী লোকজন এসে পার্কে বসে আছে এবং আলোকমালার সৌন্দর্য্য উপভোগ করছে। দেখে ভাল লাগল যে এতকর্মব্যস্ততার মধ্যেও  লোকজন একটু সময় বের করে নিতে পেরেছে । হারিয়ে যাওয়া যৌবনের কথা মনে পড়ল যে শেষ কবে সবাই একসঙ্গে এসে এইভাবে আনন্দ উপভোগ করেছি। কাজ, কাজ আর কাজ। কাজের মধ্যেই  হারিয়ে গেছে যৌবন, চোখের জ্যোতি কমেছে, দাঁতের ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে তাকে বিদায় জানাতে হয়েছে,  পাক ধরা চুলে কলপ লাগিয়ে নিজের বয়স কমানোর চেষ্টা  হয়তো হয়েছে কিন্তু চটপটে ভাবটা তো বয়সের সঙ্গে ব্যস্তানুপাতি, তা যেন ভয়ানক ভাবে কমে গেছে। মনটাই কেমন যেন  বুড়িয়ে গেছে। কর্মজীবন এবং  পারিবারিক জীবনের মধ্যে একটা ব্যালেন্স যারা রাখতে পারেনা তাদের ই এই দশা হয়। যাই হোক ফিরে এলাম গেস্ট হাউসে ব্যথা আনন্দের  এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে। এক সময় মন যখন ছিল চাঙ্গা তখন কর্মব্যস্ততায় জীবনকে আনন্দময় করে তুলতে পারিনি আর আজ যখন অখণ্ড অবসর তখন শরীর ও মন বিদ্রোহ করে।
প্রায়  এগারটা বেজে গেল  গাড়ী এসে থামল গেস্ট হাউসের সামনে । ওদের ঘর ঠিক করাই ছিল । রাস্তায় খেয়ে নেওয়ায় ঐ হাঙ্গামা হলো না। অল্পবিস্তর কথার মাঝে জানতে পারলাম যে নাতনির পা মচকে গেছে এবং  নাতির ও গায়ে বেশ  জ্বর। সঙ্গে থাকা ওষুধ দেওয়া হলো কিন্তু  মানসিকভাবে একটু ধাক্কা খেলাম, আদৌ যাওয়া হবে  তো? ছেলে বৌমার জন্য খারাপ লাগছিল,  ওদের ও সেই আমাদের মতন দুর্ভাগ্য দেখে। দেখা যাক, কি হয় আগামী কাল । পরদিন ভোর বেলায় উঠে স্নান করে তৈরী হয়ে আছি। সামনের জৈন মন্দিরে এক বিবাহ সম্পন্ন হচ্ছে। মন্দির দর্শন এবং বিবাহ দর্শন, রথ দেখা কলা বেচা দুইই হলো। ফিরে এসে দেখি তখনও ঘুম ভাঙেনি ওদের। দরজায় টোকা দিয়ে জানতে পারলাম যে নাতির জ্বর বা নাতনির পায়ের ব্যথার উপশম হয়নি। সুতরাং,  মাউন্ট আবু যাওয়া আপাতত হচ্ছেনা। আমাদের কষ্ট এতটা হলোনা যতটা আমার বৌমার বা বাচ্চাদের হলো ।আমি নিজের শরীর  সম্বন্ধেও যথেষ্ট সন্দিহান  ছিলাম । কিন্তু দুঃখ যে একেবারেই  হয়নি  তা নয়, কারণ প্রজাপিতা ব্রহ্মকুমারীর  ওই মেডিটেশন হলটা আমাকে বারবার কেমন যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। কোনরকম রিস্ক না নিয়ে আমার পুরনো শহরটাকেই নতুন ভাবে দেখলাম এবং  বাচ্চারাও যথাসম্ভব গাড়ি থেকে না নেমে শহরটাকে দেখল। দুপুরের  খাওয়া স্যাটিলাইটে অবস্থিত নৈবেদ্যম রেস্তোরাঁয় সেরে গেস্ট হাউসে ফিরে আসা এবং  পরদিন সকাল বেলায় বম্বের উদ্দেশ্যে যাত্রা ।
ঠিক কথাই যে মাউন্ট আবু যাওয়া হলো না কিন্তু ছেলে, বৌমা, নাতি,নাতনিদের সঙ্গে একসাথে সময় কাটানো তো আজকাল এক দুর্লভ ব্যাপার।

Friday, 15 November 2024

গুরু নানক জন্ম জয়ন্তী --স্মৃতি রোমন্থন

শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী গুরুনানকজীর আজ জন্মদিন। তাঁর  জন্মদিন নিয়ে একটু দ্বিমত রয়েছে । কেউ কেউ  বলেন যে তাঁর জন্ম হয়েছিল  পাকিস্তানের  নানকানা সাহেবের  তালওয়ান্দি  গ্রামে। কিন্তু ভাইবালা জন্মসখী এবং  অন্যান্য বিশিষ্ট শিখ ধর্মগ্রন্থের লেখকদের পরিভাষায় কার্তিকমাসের পূর্ণিমার দিন  নানকজীর জন্ম হয়েছিল  এবং  সেটাই সরকারের মান্যতা পেয়েছে এবং  সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ  মহা সমারোহে এই দিনটি পালন করেন এবং  তাঁর বাণী প্রচার করেন সঙ্গীত ও লঙ্গরখানায় বহু লোককে খাওয়ানোর মাধ্যমে ।
আজ ১৫ইনভেম্বর ২০২৪ শ্রী নানকজীর জন্মদিন । কিন্তু ৫২ বছর আগে ১৯৭২ সালে কার্তিকপূর্ণিমা ছিল ২০ই নভেম্বর, সোমবার সারা ভারতবর্ষে স্বীকৃত ছুটির দিন  এবং   আমার  বন্ধুবান্ধবেরা ঠিক করল যে শনিবার তাড়াতাড়ি কাজ সেরে লালগোলা প্যাসেঞ্জারে  বহরমপুর  যাবে এবং সেখান থেকে মুর্শিদাবাদ বেড়াতে যাবে রবিবার ও ফিরে আসা সোমবার অর্থাৎ গুরু নানকজীর জন্মদিনে । কোথায়  থাকা হবে? ঠিক হলো তারা সবাই উঠবে আমাদের বাড়ি। শ্যামল দা যেতে পারলেন না, অমরনাথ মিত্র মুস্তাফি,  হরিশচন্দ্র, শিবু, সুজিত, জয়ন্ত, চৌধুরি, শিবুর এক বন্ধু দীপু ও মেয়েদের মধ্যে ছায়াদি,  মাধবিকা ও কনিকা। তখন বহরমপুরে বেশ ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করেছে,অন্তত কলকাতার  তুলনায়  তো যথেষ্ট  ঠাণ্ডা । আমার ঘরে দাদুর দুটো জম্পেশ খাটে ছায়াদিদের শোয়ার ব্যবস্থা হলো, মুস্তাফি সাহেবের ব্যবস্থা হল ঐ বাইরের বিশাল ঘরে আর সুজিত, শিবু , জয়ন্ত, চৌধুরী,  হরিশচন্দ্র ও দীপুদের সদ্য কেনা লালুদার বাড়িতে। সবার জন্য  লেপ, তোষক ও মশারির ব্যবস্থা করতে হয়েছে নাহলে যত ই নাক মুখ চাপা দিয়ে  লেপ মুড়ি দিয়ে  শোওয়া যাক না কেন মশা তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। ওরা সবাই এসেছে এসপ্ল্যানেড থেকে বাসে। আমি একদিন আগে ছুটি নিয়ে  এসে গেছি। দাদাও এসে গেছে বিরাট মাছ নিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে থাকা কুতুবপুর  থেকে। হৈ হৈ ব্যাপার আর কি। বাবা ও আমি সাইকেল  নিয়ে  বাস স্ট্যাণ্ডে ওদের  নিয়ে  আসতে গিয়েছি। লালু দা, সেজদি এবং  আজিমগঞ্জ থেকে  বড়পিসিমাও এসে গেছে ওদের  আদর আপ্যায়নে যাতে কোন ত্রুটি  না হয়। রিক্সা সব বলাই ছিল। ওরা  আলো ঝলমলে জজসাহেবের বাড়িতে এসে পৌঁছানো মাত্র ই  গরমজলে হাত পা ধুয়ে বসে পড়ল বাইরের ঘরে। গরম চা ও  হালকা জলখাবার খেয়ে  বেশ খানিকক্ষণ  আলাপ পরিচয়ে কেটে গেল।   আমাদের  বাড়ির ভেতরের বারান্দায় আসন পেতে রাতের খাওয়া দাওয়া  হলো। মুস্তাফি সাহেব জমিদার বাড়ির ছেলে এবং যথেষ্ট  ভোজন রসিক, বড়সড় মাছের মাথাকে কি করে খেতে হয়, তা দেখিয়ে দিলেন । মুস্তাফি সাহেব বললেন উনি একা বাইরের ঘরে থাকবেন না, তিনিও লালুদার বাড়িতেই থাকবেন । ওখানে তিনটে বেশ বড় ঘর ছিল , ভালভাবেই  সেখানে সবাই ঠিকঠাক ভাবেই ম্যানেজ হয়ে গেল। লালুদার  বাড়িটা ছিল  আমাদের  বাড়ির  তিনটে বাড়ি পরে। সকাল বেলায় গরম চা নিয়ে দাদা, আমি ও লালুদা যখন এলাম তখন দেখি অনেকে ফ্রেশ হয়ে গেলেও হরিশচন্দ্র এবং  মুস্তাফি সাহেব  তখনও  বিছানা ছেড়ে ওঠেন নি। শিবু সুজিতের পিছনে লাগছে এবং  হাসি ঠাট্টার মধ্যে দিয়ে  এবাড়ির আনন্দের  রেশ  ও বাড়িতে পৌঁছে যাচ্ছে।  যাই হোক, এক প্রস্থ চায়ের পর  সবাই স্নান সেরে আমাদের  বাড়িতে এসে গেছে এবং  লুচি, তরকারি, বেগুনভাজা এবং  মিষ্টি সহযোগে জলখাবার সেরে চা খেয়ে একটা মিনিবাসে সবাই রওনা দিলাম  লালবাগের  পথে। একটু বেলাই হয়ে গেল হাজারদুয়ারি  দেখে ফিরে আসায় কিন্তু খিদেটা বেশ চাগিয়ে উঠেছে ইতিমধ্যে । জবরদস্ত খাওয়া দাওয়ার পর দরকার  একটু গা গড়িয়ে নেওয়ার তবে কেউ আর লালুদার বাড়িতে  গেলনা, বাইরের  ঘরেই সবাই মিলে গল্পগুজব করে কাটিয়ে দিল। সন্ধের সময়ে মোহন হাউসে সবাই মিলে সিনেমা দেখতে যাওয়া এবং রাতে মাংস ভাত ও বহরমপুরের বিখ্যাত ছানাবড়া।  অনেক রাত অবধি গল্প গুজব করে রাতে গভীর ঘুম। এদিন আর মুস্তাফি সাহেব লালুদার বাড়িতে গেলেননা, বাইরের ঘরেই শুয়ে পড়লেন। সকাল  হতেই সব চা জলখাবারের ব্যাপার  কিন্তু মুস্তাফি সাহেব বললেন বাসি মাংস  দিয়ে মুড়ি খাবেন। তাই হলো, অন্যরা লুচি তরকারি আর মিষ্টি খেল। দুপুর  বেলায় খাওয়া  মাছের ঝোল,  ভাত, চাটনি দই ও মিষ্টিতে সারা হলো তারপর রিক্সায় চড়ে স্টেশনে লালগোলা প্যাসেঞ্জারে শিয়ালদহে ফিরে আসা । দুদিনের ঠাসা প্রোগ্রাম,  এক ঝাঁক পায়রা ঘুটুর ঘুঁ, ঘুটুর ঘুঁ করতে করতে সবাই  ফিরে এল।
ইতিমধ্যে এদের মধ্যে অনেকেই চলে গেছেন না ফেরার দেশে । শ্যামল দা, মুস্তাফি সাহেব,  সুজিত,  চৌধুরী , দীপু আগেই চলে গেছেন । সেই লিস্টে  নবতম সংযোজন ছায়াদি । হরিশচন্দ্র কোথায় আছেন জানিনা। 
আজ এতদিন  বাদে এই লেখার উদ্দেশ্য স্মৃতিটাকে একটু ঝালিয়ে নেওয়া এবং যারা অবশিষ্ট রয়েছে তাদের হৃদয়ে পুরনো দিনের  একটু বিদ্যুতের ঝলক আনা।

Saturday, 9 November 2024

"বাসুদেব"

বাসুদেব থাকতো সুবীরবাবুর  বাড়িতে। তাকে সেন্ট্রাল স্টেট  ওয়েলফেয়ার  হোম থেকে সুবীরবাবু এনেছিলেন তাঁর বন্ধু ঐ হোমের সুপারিনটেনডেন্ট অসীমবাবুর অনুরোধে। অসীমবাবু ছিলেন অকৃতদার  এবং  খুবই  আমুদে। মানুষটি ছোটখাটো হলেও ছিলেন একজন খুব ভাল বন্দুকবাজ শিকারী। ছুটির দিনে  বেড়িয়ে পড়তেন শিকারের খোঁজে এই জঙ্গলে বা ঐদিকের বিলে  এবং সঙ্গী থাকতেন আদি অকৃত্রিম বন্ধু সুবীরবাবু। কোন সময় রাতে দুই বন্ধু ফিরে এলেন কোন  বনমুরগী বা হাঁস শিকার করে এবং সুবীরবাবুর স্ত্রীকে বললেন, " বৌঠান, বেশ ঝাল ঝাল করে মাংস রাঁধতে হবে, ভাল করে মশলা বাঁটুন; আর ইতিমধ্যে আমরা এটার ছাল চামড়া ছাড়িয়ে পরিষ্কার  করছি। তখনকার দিনে  না ছিল মিক্সি, না ছিল ফ্রিজ বা প্রেশার কুকার । শিল নোড়ায় বাঁটা মশলা ও কড়াইয়ে ঘুচ ঘুচ করে সিদ্ধ  হওয়া মাংসের স্বাদ ই হতো আলাদা। বাসুদেব ছিল  অসীমবাবুর হোম থেকে সদ্য বেড়িয়ে আসা ছেলে। সরকারী নিয়ম অনুযায়ী হোমে একটা বয়সের পরে আর থাকা যায়না । সুতরাং নিয়ম লঙ্ঘন করে অসীমবাবুর পক্ষে বাসুদেবকে ওখানে  রাখা সম্ভব ছিলনা। হোমে থাকাকালীন  ছেলেদের  বিভিন্ন বিষয়ে ট্রেনিং  দেওয়া হয়। যাতে পরবর্তী জীবনে সে নিজেই জীবিকা অর্জনে সক্ষম হয়। কিন্তু চাকরি করব বললেই তো আর চাকরি পাওয়া যায়না। সবসময়ই চাকরির আকাল ছিল, এখনও  আছে এবং  ভবিষ্যতেও থাকবে। যতদিন ও একটা ঠিকমতন চাকরি না‌ পায় ততদিন সুবীরবাবুর  বাড়িতে বাসুদেব  থাকবে এবং  ফাইফরমাশ খাটবে ও খাওয়া দাওয়ার অভাব ওর হবে না। ইতিমধ্যে সুবীরবাবুর ছোট ছেলেটা বছর দুয়েক হয়েছে এবং  তার দেখাশোনা করার  জন্য একটা লোকের  দরকার  ছিল  যেটা বাসুদেব মিটিয়ে দিত। দুজনের  দুজনকেই দরকার  ছিল, অতএব বাসুদেবের  ঠাঁই  হলো সুবীরবাবুর বাড়িতে ।

অসীমবাবুর ব্যবহারের জন্য  উনি সকলের খুব প্রিয় ছিলেন কিন্তু  বন্ধু বলতে সেই সুবীরবাবু এবং  ঐ একটি বাড়ি ছাড়া উনি আর কোথাও যেতেন না। তাঁর হোমটা ছিল স্টেশনের কাছে যা সুবীরবাবুর বাড়ি থেকে  প্রায় আড়াই মাইলদূরে। বেশীরভাগ দিন ই অসীমবাবুর রাতের খাওয়া হতো সুবীরবাবুর বাড়িতে এবং  তারপর সাইকেল চালিয়ে হোমে ফিরে যাওয়া।  একদিন কথায় কথায় বাসুদেবের প্রসঙ্গ উঠল। উনি জানালেন যে একদিন  উনি সকাল বেলায়  উঠে দেখেন দরজার বাইরে  কাঁথায় মোড়ানো একটা  ছোট্ট শিশু । মাঝে মাঝেই  কেঁদে  উঠছে । একে অকৃতদার মানুষ,তার উপর ঐ শহরে কোন  আত্মীয় স্বজন নেই । বাচ্চাটাকে নিয়ে কি করবেন  ভেবেই পাচ্ছিলেন না। অগতির গতি সুবীরবাবু । একটা রিক্সা করে বাচ্চাটাকে নিয়ে সোজা তাঁর বাড়ি। বললেন বৌঠান একটা ব্যবস্থা করতে হবে এই বাচ্চাটার। অনেক ভেবেচিন্তে সুবীরবাবুর  স্ত্রী একটা উপায় বের করলেন । ওঁদের  বাড়িতে কাজ করা শিবানীর কোন সন্তানাদি ছিলনা এবং  এখানে সেখানে  কোন পীঢ় বাবা বা সন্ন্যাসীর  পায়ে মাথা ঠুঁকতো এবং  মানত করতো একটা সন্তানের আশায়। অভাবের সংসার,  একটা বাচ্চাকে মানুষ করা খুব  সহজ কথা নয়,তবুও শিবানীর  মনে হলো এটা ভগবানের দান এবং বাচ্চাটিকে নিতে রাজি হলো। সুবীরবাবুর স্ত্রী শিবানীর  মাইনে একটু বাড়িয়ে দেবেন বলে একটু আশ্বস্ত করলেন। শিবানীর  আদরে মানুষ  হওয়া বাসুদেব একটু বড়সড় হতেই ঠাঁই  হলো সরকারী  হোমে এবং  তারপর আবার  সেই  সুবীরবাবুর বাড়ি।
বাসুদেবের মা কিংবা বাবার মধ্যে কেউ একজন নেপালি ছিল কারণ বাসুদেবের চেহারায় ছিল নেপালিদের মতন হাবভাব। যাই হোক হোমের খাতায় তার পদবী হলো মণ্ডল। বাসুদেব কয়েকবছর হোমে থাকার সুবাদে কাঠের কাজে  হাত পোক্ত করেছে এবং কাজের অপেক্ষা করছে । বাসুদেব  সুবীরবাবুর ছোট  ছেলেটার যাবতীয় বায়না মেটায় যেখানে  কোন পয়সা খরচ হয়না। খুবই ভাল বাসে  ছোট বাচ্চা  সুমনকে। তাকে নিয়ে  কোলে করে ঘোরা, তার সঙ্গে খেলা করা, স্কুলে নিয়ে যাওয়া আসা সবকিছুই আব্দার বাসুদেবের কাছে। সুবীরবাবুর  ব্যবসায় ইদানিং একটু মন্দা চলায় টাকা পয়সা  নিয়ে একটু টানাটানি চলছে।বাসুদেব এটা বুঝতে পারছে কিন্তু কোথায়  যাবে সে এবং একটা চাকরি যোগাড় না করতে পারা পর্যন্ত্য, তাকে সুবীরবাবুর বাড়িতে ই থাকতে হবে। তার পালিত মা শিবানীও বাচ্চা হতে গিয়ে দেহ রক্ষা করেছে আর শিবানীর  স্বামীও মদ খেয়ে লিভারের বারটা বাজিয়ে মারা গেছে। সুতরাং  বাসুদেবের এই বাড়ি ছাড়া আর কোনও  জায়গা নেই। দিন দিন সুবীরবাবুর আর্থিক অবস্থা শোচনীয়  হয়ে পড়ছে কিন্তু তিনি একজন প্রকৃত ভদ্রলোক,  হাজার কষ্টের মধ্যেও  বাসুদেবকে  চলে যেতে  বলছেন না। ব্যবসায় যারা ধার বাকিতে জিনিস পত্র নিয়েছিল তারাও ঠিকমতো পেমেন্ট না করায় তাঁকে ও ধার করতে হয়েছে  এবং সেই ধারের মাত্রা দিন দিন বেড়ে এক অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মাঝে মাঝেই  ঋণদাতারা এসে অপমান করছে যেটা বাসুদেবের একদম সহ্য হচ্ছে না। অসীমবাবু ঐ শহর  থেকে  বদলি হয়ে গেছেন। তিনি থাকলেও হয়তো খানিকটা সুরাহা হতো । যাই হোক বাসুদেব  একদিন  ঘরের  সব কাজ সেরে  পল্টনবাবুর কাঠের  গোলায়  দেখা করল এবং  একটা কাজ চাইল। কোথায়  থাকো জিজ্ঞেস করায় জানালো যে সুবীরবাবুর বাড়িতে  থাকে এবং  একটা চাকরির খুব  দরকার । সুবীরবাবুদের একটা সুনাম ছিল  ভদ্রলোক হিসেবে এবং  কানাঘুষোয়  জানতে পেরেছিলেন তাঁর  দুর্দশার কথা। সুতরাং  তিনি মনে মনে স্থির করেছিলেন  যে বাসুদেবকে একটা কাজ দেবেন ।  কি কি কাজ করতে পার জিজ্ঞেশ করায় বাসুদেব জানালো যে সে হোমে কাঠের  কাজ করতে শিখেছিল এবং  সুযোগ পেলে সে ঐ কাজ ভালভাবেই করতে পারবে। পল্টন বাবু বিশ্বাস  করতেন যে নেপালিরা খুব  বিশ্বস্ত হয়। তিনি ভাবছিলেন  যে কাঠের  গোলায়  তাকে দারোয়ানের কাজে লাগাবেন । দুদিন বাদে তাকে দেখা করতে বললেন। বাসুদেব তো ভগবানের কাছে  প্রার্থনা করতে  লাগল যাতে চাকরিটা সে পায়। বাড়ি ফিরে আসতে বেশ  দেরী  হয়েছে  আর মা( সুবীরবাবুর  স্ত্রীকে সে মা বলে ডাকতো) ভাতের থালা  নিয়ে  বসে আছে, অপেক্ষা করছে তার জন্য। বাসুদেবের  চোখে জল এসে গেল মাকে না খেয়ে বসে থাকতে দেখে। 
 "কোথায়  ছিলি এতক্ষণ? "
কিছু না বলে হাত পা ধুয়ে বসে পড়ল রান্নাঘরে আসন পেতে।
মা জিজ্ঞেস করল আবার কিন্তু কোন উত্তর দিতে পারল না সে , কেবল চোখ  দিয়ে জল বেরোতে থাকল।
মা বলল যে খেয়ে নে বাবা, খাওয়ার সময় চোখের জল ফেলতে নেই।
মায়ের মুখের দিকে  তাকাতে পারছে না সে , কেমন একটা অপরাধ বোধে তার মনটা ভার হয়ে আছে। ভাবছে এত কষ্টের মধ্যেও  মা বা বাবা কেউ কিছু বলছেনা তাকে। যাই হোক,  তাকে এই বাড়ির জন্য কিছু করতেই হবে কিন্তু যতক্ষণ কিছু না হয় ততক্ষণ সে কিছুই  বলবে না। নিজের  বাবা মাকে সে দেখেনি। শিবানী মায়ের  কাছে ছোট অবস্থায়  ছিল, পেয়েছে তাদের  ভালবাসা, তারপর দেবতা তুল্য মানুষ অসীমবাবুর ভালবাসা ও শাসন এবং  সবশেষে এই বাবা মা আর ছোট ভাই যাকে সে বড়দাদার মতো মানুষ  করেছে আর সুবীরবাবুর মেয়েদের  দিদির মতন দেখেছে। আর কি চাই ভগবানের কাছে?  সব  তো তিনি দিয়েছেন। 
দুদিন  পরে বাসুদেব দেখা করেছে পল্টন বাবুর সঙ্গে। কাঠের  গোলায়  তাকে থাকতে হবে রাতে। বাসুদেব  তাঁকে অনুরোধ  করল যে শহরে তাকে কারখানায় রাখার  জন্য কারণ রাতে সেই কাঠগোলায় থাকতে হলে সুবীরবাবুর বাড়িতে  সে কখন  কাজ করবে?  মন তার ভীষণ খারাপ । যারা তাকে এতদিন  আশ্রয় দিয়েছে , দুর্দিনের মধ্যে ও তার খাওয়া পড়া নিয়ে  কিছু বলেন নি,  তাদের  এই বিপদের দিনে সে ছেড়ে চলে যাবে এটা সে কিছুতেই মন থেকে  মেনে নিতে  পারছে না। বাড়ি ফিরে  এল সে। মা তো বুঝতে পারছেন যে কিছু একটা হয়েছে বাসুদেবের কিন্তু কি হয়েছে সেটা বুঝতে  পারছেন না। শেষে মায়ের  কাছে  কাঁদতে কাঁদতে সত্যি কি হয়েছে সেটা বলল। সুবীরবাবু পাশ থেকে  সব শুনতে পেয়েছেন এবং  দুঃখ  পাওয়া সত্ত্বেও তাকে উৎসাহিত করলেন কাজটা নেওয়ার জন্য। পরদিনই বাসুদেব নিজের  কিছু জামা টা পড় ও খানিকটা চাল ডাল ও কিছু দরকারি জিনিস  নিয়ে চলে গেল  কাজে যোগ দিতে, বেশীরভাগ জিনিস ই রইল পড়ে। যাবার আগে বাবা মাকে প্রণাম করে ভাইকে কাঁধে তুলে নাচানাচি করে জলভরা চোখে চলে গেল পল্টনবাবুর  কাঠগোলায় । টালির ছাউনি কাঠগোলায় । বাঁশের বেড়া দিয়ে দরজা, ঐদিকে মেসিনগুলো আর একদিকের কোণে একটা চাটাই,  সতরঞ্চি, মশারি ও চাদর। দিনের  বেলায়  মেশিন চলত, অনেক লোক কাজ করছে, গমগম করছে জায়গাটা কিন্তু সন্ধে নামতেই অন্য সব লোক জন চলে গেল কর থাকল ও একা। জঙ্গলের মধ্যেই মেশিন ঘরের দিকে ইলেকট্রিক বালব জ্বলছে আর নিজে যেখানে  থাকবে সেখানেও একটা টিমটিমে বালব জ্বলছে আর আছে এক কেরোসিনের লন্ঠন যেটা কারেন্ট চলে গেলে কাজে লাগে। বেশীরভাগ সময়েই রাতে নাকি কারেন্ট থাকেনা আর সেই কারণেই নাকি লণ্ঠনের উপযোগিতা অনিবার্য। এই জঙ্গলের মাঝে একা থাকা বেশ কঠিন  ব্যাপার । জন্তু জানোয়ার ছাড়াও  বিষাক্ত সাপ খোপ তো থাকতেই পারে। কিন্তু বাসুদেবের  কোন ভয়ডর বলে কোন জিনিস  নেই । নিজের শরীরটা বেশ শক্তপোক্ত এবং  সাহস ও ছিল অদম্য। একটা বেশ শক্ত বাঁশের  লাঠি আর আছে একটা ছোরা আত্মরক্ষার জন্য। সেদিন ই প্রথম রাত,কিছুতেই ঘুম আসছেনা , কেবল ই মায়ের, বাবার ও ছোট ভাইয়ের  কথা ভাবছে। কখন যে চোখের পাতা ভারী হয়ে লেগে এসেছে খেয়াল  নেই। রোদ বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে মুখের ওপর পড়তে ঘুম ভাঙল। একটু দূরেই একটা ছোট ঘর চোখে পড়ল, সম্ভবত সেটাই বাথরুম । একটা ছোট টিউব ওয়েল রয়েছে  তার ই পাশে। প্রাতঃকৃত্য সেরে স্নান সেরে উনুনে কাঠকুটো জ্বেলে সকালের খাবার  তৈরী করে ফেলল সে। একবার  মেশিন চালু হলে আর অন্য দিকে  তাকাবার সময় পাবে না সে। আগে যে লোকটা ছিল সে বাড়ি গেছিল কয়েকদিনের জন্য কিন্তু  তার পরে সে আর আসে নি । আদৌ আসবে কিনা তাও  জানা নেই । সুতরাং, পল্টনবাবুকে একটা লোক রাখতেই হতো। উনি ভাবছিলেন ও সেইরকম ই আর তারই মাঝে বাসুদেবের আগমন এবং  তার চাকরি । কাঠগোলায়  একটা পুরনো ঝরঝরে সাইকেল আছে।বাসুদেব দেখে নিল যে ওটাকে কি ভাবে কাজে লাগানো  যায় । সাইকেল টাকে ঝেড়ে মুছে রাখল কিন্তু চাকায় হাওয়া নেই।  বেশ খানিকটা দূরে  একটা সাইকেল রিক্সা সারানোর দোকান  আছে, যেখান থেকে ও সাইকেল টা সারিয়ে নিল। সারাদিন কাজ করে পরেরদিন সাইকেল  নিয়ে  সাতসকালে বাবা মা ভাইয়ের  সঙ্গে দেখা করতে আসা। অত সকালে মা বাসুদেবকে দেখেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন কিন্তু পরক্ষণেই ঘোর দুশ্চিন্তায় মন ভরে গেল । হ্যাঁ রে কেমন আছিস বাবা? একটা দিন তোকে দেখিনি  কিন্তু মনে হচ্ছে  কতদিন তোকে দেখিনি ।সুবীরবাবু ও ইতিমধ্যে হাজির,  ভাই ও এসেছে দাদাকে দেখতে। মা চট করে একটু চায়ের জল চাপিয়ে দিয়ে কয়েকটা রুটি করে দিয়েছে। চা ,জলখাবার  খেয়ে তাড়াতাড়ি সাইকেল নিয়ে  কাঠগোলায়  ফিরে আসা । দৈবাত কেউ এসে যদি পড়ে এবং  কাঠগোলায় ঢুকতে না পারে তাহলে তো ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটে যাবে এবং চাকরিটাও চলে যাবার সম্ভাবনা থাকতে পারে। যাই হোক,  কোন বিপত্তি ঘটেনি। কোন লোক আসার আগেই  সে ফিরে এসেছে এবং  কাজ ও সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে । প্রায় রোজই বাসুদেব  সাইকেল নিয়ে চলে আসে এবং  চা ও জলখাবার খেয়ে কাজে চলে যায়। মাস শেষ হলো। আজ মাইনে দেবেন পল্টনবাবু। সবাই খুব  খুশী র মেজাজে। টাকা পেয়ে সবাই খুব খুশী  কিন্তু বাসুদেবের আনন্দের  কোন সীমা নেই কারণ এটাই তার প্রথম রোজগার । সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। ভোরের আলো ফুটতেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে সে। মা অত সকালে  বাসুদেবকে দেখে চমকে উঠেছেন। হ্যাঁ রে শরীর ঠিক আছে তো রে? 
হ্যাঁ মা, ঠিক আছি, ভাল ই আছি। বলে মাকে প্রণাম  করে প্যান্টের পকেট থেকে  মাইনের সব টাকা মায়ের  পায়ের কাছে  রেখে দিল। মায়ের  চোখে জল, উনি কিছুতেই নেবেন না।সুবীরবাবু ও এসে পড়েছেন। তাকেও প্রণাম করল বাসুদেব । ভাই অকাতরে ঘুমোচ্ছে।  বাসুদেব কাঁদছে আর বলছে মা তুমি যদি টাকা না নাও তাহলে আমি বুঝব যে তোমরা আমাকে ছেলের মতো ভালবাসনি। আজকে আমি যেখানেই  থাকি না কেন  তা তোমার   বাবার এবং কাকাবাবুর জন্য। আমাকে তোমরা দূরে সরিয়ে  দিওনা।  যথারীতি চা ও জলখাবার  খেয়ে কাঠগোলার দিকে রওনা দিল। দেখতে দেখতে তিনটে মাস কেটে গেছে বাসুদেবের  ঐ কাঠগোলায় । আর এদিকে ফিরে  এসেছে  সেই আগের  লোক যে বাড়ি গিয়ে অসুস্থ  হয়ে পড়েছিল। পল্টন বাবু একটু ধন্দের মধ্যে পড়ে গেছেন । পুরনো লোকটাকে রাখতে গেলে বাসুদেবকে  ছাড়িয়ে দিতে হয়। আর বাসুদেব এই তিন মাস যেভাবে কাজ করেছে তাকেও হাত ছাড়া করতে চাইছেন না। সমাধান  বেরোল সবচেয়ে  পুরনো  মিস্ত্রীর পরামর্শে। বহাল হলো পুরনো লোক কাঠগোলায় আর বাসুদেবের স্থান হলো ফার্নিচার দোকান  সংলগ্ন কারখানায় আর সঙ্গে বাড়ল মাইনেও। 
বাসুদেব  এখন সুবীরবাবুর বাড়িতে মা ও ভাইয়ের  সঙ্গে। সুবীরবাবুর কাছে যারা ধারে মাল নিয়েছিল  তারাও অনেকে টাকা ফেরত দেওয়ায়  অবস্থার অনেক  উন্নতি হয়েছে । সৎ পথে থাকলে সাময়িক কষ্ট হলেও ভগবান তাদের  শান্তি দেন ।