দীর্ঘ দিন পর বুড়ো বাবুর নাতি এসেছেন সুদূর আমেরিকা থেকে, থাকবেন কিছুদিন । হঠাৎই মনে হলো পরিবারকে নিয়ে বলরামপুর যাবেন এবং দেখবেন তাঁর শৈশবকাল যেখানে কেটেছে সেটা কেমন আছে এবং স্ত্রীও ছেলেমেয়েদের দেখাবেন। যেমন মনে করা, তেমনই কাজ। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বলরামপুরের উদ্দেশ্যে । মাঝপথে একবার নবদ্বীপে থেমে চা খেয়ে রওনা দিলেন তাঁর ছোটবেলার শহরের দিকে। কিছুই চিনতে পারছেন না জায়গা এতটাই বদলে গেছে। একে তাকে জিজ্ঞেস করে পৌঁছলেন তাঁদের বাড়ির কাছে। প্রোমোটারের থাবা পড়েছে এখানে। বাড়ি ভাঙার কাজ চলছে । অনেকটাই ভাঙা হয়ে গেছে । সুদৃশ্য গাড়ি এবং তার আরোহীদের দেখে প্রোমোটারের লোকজন ছুটে এল নতুন কোন কাস্টমার ভেবে। উনি এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখছেন। সুপারভাইজার মোবাইলে খবর পাঠিয়ে দিয়েছে তার মালিককে এবং তিনিও এসে পড়েছেন নতুন বুকিং এর আশায়। খুব নম্র ও বিনীতভাবে তাঁদের আমন্ত্রণ জানালেন অফিসঘরে বসার জন্য। ছেলেমেয়ে এবং স্ত্রী একটু অধৈর্য্য হয়ে পড়েছে ফিরে যাওয়ার জন্য। ভদ্রতার খাতিরে একবার অফিস ঘরে বসলেন যেটা আগে ছিল বৈঠকখানা বা বাইরের ঘর, কেবল একটাই তফাত এটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এবং অনেক ঝকঝকে। অফিস ঘরের বাইরে একটা জায়গায় জাফরিতে লেখা "ওয়েলকাম" টা চোখে পড়ল। একটু বিস্মিত হয়েই জিজ্ঞেস করলেন এটা এখানে কেন? স্যার, আমাদের এই প্রজেক্টের নাম দিয়েছি "ওয়েলকাম" আর এই বলে একটা ব্রোশিওর ধরিয়ে দিল। এই বাড়ির মাঠে আমরা বহু খেলাধূলো করেছি আর পূজো ও করেছি, এর স্মৃতি আমার মনে এখন ও জ্বলজ্বল করছে। "ওয়েলকাম" নামটা আমার বড় ই প্রিয়, তাই আমার এই প্রজেক্টের নাম ওইরকম দিয়েছি স্যার । কানে যেন কেউ গরম সীসা ঢেলে দিল, মাথাটা হেঁট হয়ে গেল এই ভেবে যে একটা অনেক উচ্চতায় উঠেও যারা পূর্বস্মৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা ও করেনা অথচ এই অল্পশিক্ষিত প্রোমোটার তার শৈশবের স্মৃতিকে সম্মান দিয়ে আমার প্রপিতামহের সেন্টিমেন্টের দাম দিচ্ছে। চোখের পাতাটা ভিজে আসছে, কোনরকমে তা সামাল দিয়ে গাড়ির দিকে রওনা দিল।
Wednesday, 12 February 2025
বাড়ির নাম "ওয়েলকাম"
বলরামপুর স্টেশন টা তখনো পুরোপুরি স্টেশনের মর্যাদা পায়নি। আশপাশের অনেক গ্রাম থেকে লোকজন এখানকার হাটে আসত। বেশ বড় মাপের হাট, আনাজপত্র থেকে গরু ছাগল ও এই হাটে আসত বেচাকেনার জন্য। তখন অতশত লরি, ভ্যানের চল ছিলনা, ভরসা ছিল গরুর গাড়ি ও সাইকেল রিক্সা এবং রিক্সা ভ্যান। তবে এঁটেল মাটি বৃষ্টিতে এত কাদা হতো যে রিক্সা ভ্যানের কম্মো ছিলনা বর্ষায় চলা। অতএব তাগড়া বলদ বা মোষ জুতে চলতে হতো বেশী জিনিসপত্র আনার হলে। কিন্তু হাটের দিন ছিল জমজমাট । সপ্তাহে দুদিন বসে হাট, দূরদূরান্ত থেকেও লোকজন আসত এই হাটে, সুতরাং লোকজনের অনেকদিনের দাবি ছিল এখানে ট্রেন থামুক। তখন তো এত গ্রাম পঞ্চায়েত বা পঞ্চায়েত সমিতি বা জেলা পরিষদ ছিলনা , ছিলেন বিধানসভার সদস্য এবং লোকসভার সদস্য যাঁদের দেখা পাওয়া প্রায় ভগবানের দেখা পাওয়ার সামিল। এঁরা নিজেরা কোন অসুবিধায় না পড়লে বা নিজেদের কোন প্রয়োজন না থাকলে ভুলেও এই পথ মাড়াতেন না। একবার ভোটের প্রচারে এসে গাড়ি নিয়ে গাঁয়ের কাদা রাস্তায় আটকে পড়ে বাধ্য হয়েছিলেন আশ্রয় নিতে গ্রামের ই এক বর্ধিষ্ণু পরিবারে। তাঁরা কিন্তু যথেষ্ট সমাদর করেছিলেন এবং আলাপচারিতায় গ্রামের ও আশপাশের গ্রামের লোকের অসুবিধার কথা জানিয়েছিলেন । আর সেই জনপ্রতিনিধির উদ্যোগে হলো বলরামপুর হল্ট।হাওড়া থেকে ধুলিয়ানগামী ট্রেনের পথে পড়ে এই বলরামপুর । প্যাসেঞ্জার ট্রেন এখানে থামত। ধীরে ধীরে লোকজন ওঠানামা বেড়ে যাওয়ায় ইনি পেলেন স্টেশনের মর্যাদা । পর্যায়ক্রমে গ্রামের কাঁচা রাস্তা হলো পাকা,এখন সেখানে বাস ও মিনিবাস চলছে আর চলছে একটু উঠতি বয়সের ছেলেদের মোটরসাইকেল নিয়ে দাপাদাপি । স্টেশন থেকে রিক্সায় তিন মাইল দূরে সেই "ওয়েলকাম"বাড়ি। তখন এদিকে ওদিকে শয়ে শয়ে কাঁচা বাড়ির মধ্যে ঐ বাড়িটা ছিল জমাটবাঁধা অন্ধকারে লাইট জ্বলা বাড়ি।সুন্দর পাঁচিল দেওয়া গেট ওয়ালা বাড়ি, গেট থেকে বাড়ির দূরত্ব প্রায় একশ ফুট এবং গেটের দুই পাশেও প্রায় একশ ফুট করে সুন্দর পাঁচিল। মাঠ ছেড়ে বাড়িতে ঢুকতে গেলে চড়তে হয় চারটে সিঁড়ি যার দৈর্ঘ্য পনের ফুট এবং সি়ঁড়ির দুই প্রান্তে দুটো রোয়াক যেখানে একজন লোক মোটামুটি ভাবে শুতে পারে। বাড়ির মালিক বুড়োবাবু ঐ রকে আধশোয়া হয়ে চুরুট খেতেন এবং মাঝে মাঝে শেক্সপিয়ার, মিল্টন বা কীটস বা শেলীর কবিতা আবৃত্তি করতেন। বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করা লোকজন তত শিক্ষিত না হওয়ায় হাঁ করে অবাক হয়ে চলে যেত এবং পারতপক্ষে বুড়োবাবুর মুখোমুখি হতো না। কেমন যেন একটা দূরত্ব বজায় থাকলেই বেশ খানিকটা নিশ্চিন্তে থাকতো তারা । এই বাড়ি কিন্তু কোন জমিদার বা ছোটখাটো রাজার বাড়ি নয় তবে বুড়ো বাবু ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী এবং তাঁর বাবা ছিলেন জজসাহেব । এখন যদিও জজদের সম্মান বহুলাংশেই ক্ষয়িষ্ণু ( ওঁরা নিজেরাই অনেকখানি দায়ী) কিন্তু সেই সময়ে জজসাহেব বা সরকারী কর্মচারীদের ছিল প্রভূত সম্মান । তাঁরা সর্বসমক্ষে আসতেন ভীষণ কম এবং তাঁদের কাজ কর্ম বেশীরভাগ সময়ে চাপরাশিরা করত এবং গেটে থাকা দারোয়ান কাউকে ভিতরে ঢুকতে দিত না কোন সদুত্তর না পেলে।বাড়ির বারান্দায় ছিল জাফরি এবং তার মধ্যেই লেখা শব্দ ই ইংরেজিতে" ওয়েলকাম ।" বারান্দার আলোটা জ্বললেই সেই আলো জাফরির ছিদ্র দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করত। কিন্তু সেই বাড়িতে তো সাধারণ মানুষ আসতো ই না, তাহলে কাদের জন্য এই "ওয়েলকাম?" মনে হয় যে সমস্ত হোমরা চোমরা লোকজন আসতেন তাঁদের ই অভ্যর্থনা জানানো হতো। বাঁদিকে ছিল বড় বৈঠকখানা যা পরবর্তীকালে বাইরের ঘর বলে পরিচিত ছিল। এক সময় ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় আলোকময় হয়ে উঠত সেই বৈঠকখানা কিন্তু কালের গতিতে বিদায় নিয়েছে ঝাড়লণ্ঠন, এসেছে ইলেকট্রিক বালব কিন্তু বালবের শেডগুলো ছিল দারুণ সুন্দর যা এক সুন্দর রুচির বাহক । তবে ঐ সময়েও গ্রামের বেশীরভাগ জায়গা যখন অন্ধকারে ডুবে থাকত সেই সময়ে ঐ বাড়িতে বিদ্যুতের আলো যেন দম্ভ প্রকাশ করত। বড় বাড়ি, একান্নবর্তী পরিবার , সবার ছেলেমেয়ে নিয়ে যেন একটা ছোট খাটো গ্রাম । বৈঠকখানা হয়েছে বাইরের ঘর যেখানে সমস্ত ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, নানারকম পড়ার আওয়াজে কিরকম একটা অনুরণন হতো আর দূর থেকে অচেনা লোকদের একটা পাঠশালা বলেই ভ্রম হতো। একসময় বাড়ির দুর্গাপূজো কখন যেন বন্ধ হয়ে গেল কিন্তু বাড়ির পূজো ধীরে ধীরে বারোয়ারি পূজোয় পরিণত হলো। প্রতিমার আদল ও পাল্টে গেল ।বুড়োবাবুর বংশধররা কাজের সূত্রে এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল এবং তাঁর উত্তরাধিকারীরা অত বড় সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণে অসমর্থ হয়ে বাড়ি বিক্রি করে দিল ।
Monday, 10 February 2025
যেথা যাহা পাও কুড়াইয়া লও সুখের তরে
"যেথা যাহা পাও কুড়াইয়া লও সুখের তরে" কথাটা শুনতে বেশ লাগে কিন্তু যদি কিছু আসে অনৈতিক উপায়ে এবং সেটা যদি সুখ আনে, সেটাও কি নেওয়া উচিত ? এই বিষয়ে মতামত ভিন্ন রকমের। কিছু লোক আছেন যাঁরা সামান্যতম অনৈতিক রাস্তাকে এড়িয়ে চলেন তাঁরা এই কথার তীব্র প্রতিবাদ করবেন কিন্তু বহু লোক আছেন যাঁরা সুখের সন্ধানে যে কোনরকম কাজ করতে প্রস্তুত। প্রথম পক্ষ সংখ্যায় খুবই নগণ্য এবং দ্বিতীয় পক্ষ দলে বেশ ভারী এবং অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত কারণ একবার অনৈতিক পথে গেলে একেবারে কানাগলির মধ্যে ঢুকে পড়ার সামিল, ফেরার রাস্তা বন্ধ।
সুখ কি, কত রকমের সুখ আছে এইসব নিয়ে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে আকাশে কটা তারা আছে এই নিয়ে কেউ যেন প্রশ্ন করছে।সুখ কি এটা বলা ভীষণ কঠিন । বিরাট বড়লোক, অনেক টাকা পয়সা গাড়ি বাড়ি চাকর বাকর, দারোয়ান ঢুকতে বেরোতে সেলাম ঠোকে কিন্তু নরম গদিতে শুয়েও তার দুটো চোখের পাতা এক করতে পারেনা অথচ ফুটপাতে থাকা অভুক্ত, অর্ধভুক্ত লোকেরা তার সম্বলের ছেঁড়া মাদুরের ওপর শুয়েই মরার মতন ঘুমায়। সুতরাং টাকা পয়সাই সুখের মানদণ্ড হতে পারেনা। কেউ জ্ঞান পিপাসু, বইয়ের মধ্যে ডুবে থেকেই ঘোর মগ্ন হয়ে থাকেন বা কেউ চিত্রকর তাঁর শিল্পকীর্তির মধ্যেই ডুবে থাকেন বা কোন সঙ্গীত শিল্পী তাঁর সুরের সাগরে নিমজ্জিত থাকেন।কেউ ভগবানের চিন্তায় মগ্ন থাকতে ভালবাসেন আবার কেউবা পরোপকারে নিজেকে ব্যস্ত রেখে সুখ পান আবার কেউ চৌর্য্য বৃত্তিতে খুশী থাকেন । সুতরাং, এক একজনের কাছে সুখের সংজ্ঞা এক একরকম। সুতরাং কিসে যে সুখ মিলবে একথা কেউ জোর গলায় বলতে পারবে না। একই বই সবাই পড়লেও বিভিন্ন জনের উপলব্ধি বিভিন্ন রকম ।
জন্ম ইস্তক আমরা সবাই ছুটছি কিন্তু দিশা সবার ভিন্ন। তবে সুখ পাওয়ার একটা মোটামুটি শর্টকাট রাস্তা হচ্ছে যে জ্ঞানত কারও কোন ক্ষতি করা বা ক্ষতির চিন্তা করায় বিরত থাকলে অনেকটাই আনন্দ পাওয়া যায়। পরনিন্দা বা পরশ্রীকাতরতা থেকে যদি নিজেকে দূরে রাখা যায় তাহলেও অনেক মানসিক শান্তি বজায় থাকে। মানুষের বড় হওয়ার উপর অনেকটাই নির্ভর করে মানসিক গঠন এবং সে কিভাবে সুখের সন্ধানে নিজেকে ব্যাপৃত করবে তা ও নির্ভর করে সেই মানসিক গঠনের উপর।
কেউ একাকীত্ব পছন্দ করে আবার কেউ লোকজনের সংসর্গ ভালবাসে। অনেকেই বলে যে ও একদম লোকের সঙ্গে মিশতে পারেনা। মনের দরজা খুলে বাইরে না বেরোলে একাকীত্ব কাটবে কি করে? গতকাল কয়েকটা সত্তরোর্ধ্ব একই স্কুলে পড়া বুড়ো(কিন্তু মনে মনে যুবক) তাদের বুড়িদের নিয়ে যেরকম হৈচৈ করল তাতে আশপাশের লোকজন একটু শঙ্কিত ই হয়ে উঠেছিল আর ভাবছিল এরা সবাই প্রকৃতিস্থ আছে তো? বুড়োগুলো সবাই স্বকীয়তায় মহীয়ান কিন্তু তারা ফিরে গেছিল তাদের স্কুল জীবনে পুরনো দিনের স্মৃতিচারণায়। কোন স্যার কিভাবে পড়াতেন, তাঁদের মুদ্রাদোষ নিয়ে আলোচনা, বেঞ্চের উপর দাঁড়ানো, টিফিন চুরি, অন্যের ব্যাগ দিয়ে চেয়ার মুছে নেওয়া, লিখতে লিখতে ফাউন্টেন পেনের কালি শেষ হয়ে গেলে পাশের বন্ধুর কাছ থেকে দুফোঁটা কালি নিয়ে আবার লেখা শুরু করা, পরীক্ষার সময়ে বাথরুম গিয়ে কারো কাছ থেকে কোন অজানা প্রশ্নের উত্তর জেনে নেওয়া বা ট্যারা স্যারের পরীক্ষায় গার্ড দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে হাসাহাসিতে ওই বন্ধুরাই শুধু নয়,তাদের বুড়িরা এবং আশপাশের লোকজন সবাই হাঁ করে শুনছিল তাদের কথা। আরও একজন তাদের স্কুলের সহপাঠী শুনেই বলল তোরা লাঞ্চ টা শুরু কর ঘন্টা দুয়েক বাদে কারণ ও তখন তার স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করছিল, পরদিন তার অপারেশন হওয়ার কথা । এইরকম অনাবিল আনন্দের স্বাদ কজন নিতে পারে? স্ট্যাম্প কালেকশন এবং বদলা বদলি করা বা স্কুলের টিফিনের সময় পাশেই থাকা মেয়েদের স্কুলের দিকে একটা চক্কর মেরে আসা বা লরি বোঝাই আখের মধ্যে থেকে একটা আখ টেনে বার করার কি টেকনিক তা নিয়ে ও যথেষ্ট আলোচনায় সবাই মশগুল ।হয়তো আশপাশের লোকজন ভাবছিল যে খুশীতে বুড়োগুলো পাগল হয়ে গেছে । বেঙ্গল হাটারিতে লাঞ্চ সেরে এবং সেখানকার কর্ণধার পার্থ ঘোষাল এবং তাঁর পুরো টিমের সহযোগীতায় এই বুড়োবুড়িদের দল তাঁদের শৈশবে ফিরে গেছিল । সেখানে একপ্রস্থ হৈচৈ করে পরের গন্তব্যস্থল যতীন দাস রোডের উদিপীতে কফি খাওয়া। ওখানকার কফি একটা আলাদা মাত্রা আনে স্বাদে।ওখানকার একটা বিশেষ জায়গা ছয়টি সরু দেবদারু গাছের একটা শেড যেখানে সচরাচর জায়গাই মেলেনা সেইখানে ভগবানের বিশেষ দয়ায় মিলল ঠাঁই এবং সেখানেও ঘন্টা দুয়েক আড্ডা বুড়োবুড়িদের একটু বাড়তি অক্সিজেন যোগাল। সবাই এই জায়গায় বসার অপেক্ষায় থাকে এবং এই বুড়ো খোকাখুকিরা গাড়িতে ওঠামাত্র জায়গাটা ভরে গেল নতুন দলের দ্বারা ।
এই ধরণের আনন্দ বা খুশী খু়ঁজতে কোন অনৈতিক কাজের প্রয়োজন পড়েনা এবং বন্ধুদের সাহচর্য জীবনে এক আলাদা মাত্রা যোগ করে। মানুষ হয়ে যখন জন্ম হয়েছে তখন একদিন তার পরিসমাপ্তি হবেই কিন্তু এই স্বল্প দিনের মেয়াদে কে কতটা সুখের ঝুলি ভরতে পারে সেটাই দেখার ।
Tuesday, 4 February 2025
বিদায় গোকুল বিদায়
বেশ কাক ভোরে মোবাইল বেজে ওঠায় একটু ভয় পেয়েই গেলাম। কি রে বাবা, এত সকালে কে ডাকে আমায়। একটু ভয় ভয় করেই মোবাইলটা ধরতেই একটা চাপা কান্নায় বুঝলাম কিছু একটা অঘটন ঘটেছে। ঘুম জড়ানো চোখে হ্যালো বলে জিজ্ঞেস করতেই একটা অচেনা মেয়েলি কণ্ঠে কান্নামিশ্রিত গলার আওয়াজ পেলাম এবং গিন্নিকে সঁপে দিলাম । দু মিনিট বাদেই জানলাম যে আমাদের কাজের দিদির স্বামী দেহ রেখেছেন।
মূহুর্তের মধ্যে দিদির মুখটা ভেসে উঠল। বহুদিন ধরে আমাদের বাড়িতে কাজ করছে । দেখতে দেখতে বত্রিশ বছর কি ভাবে কেটে গেছে কেউ বুঝতেই পারিনি । তখন আমাদের ও বয়স কম, দিদিও ছিল যথেষ্ট ছোট, চরকির মতো ঘুরে ঘুরে কাজ করতো এবং বয়স কম থাকায় একাই সমস্ত কাজ সামলে দিত মায় দূরে পার্কের পাশে থাকা টিউব ওয়েল থেকে খাবার জল আনা পর্যন্ত। বাড়িতে সব সময়ই কোন না কোন লোক আসতো কিন্তু দিদির মুখ কখনও ভার দেখিনি। ভীষণ বিশ্বাসী যেটা আজকের দিনে অত্যন্ত বিরল। আমি তো পরিবারকে এখানে রেখে এখানে সেখানে ট্রান্সফার হতাম কিন্তু ভরসা ছিল ঐ বিশ্বাসী ও কর্মঠ দিদির উপর। অনেক সময় নিজে অসুস্থ হয়ে পড়েছি এবং মিসেস কে আমার কাছে আসতে হয়েছে কিন্তু দিদি সামলে দিয়েছে ঐ বিপদের দিনে। শুধু দিদিই নয়, তার স্বামী গোকুল ও পাশে এসে দাঁড়িয়েছে । মানে এক কথায় পরিবারের একজন হয়েই পাশে থেকেছে। কখনও সখনও ওর স্বামী বাড়ির বাইরের কাজ করে দিয়েছে। একদম জানতেই পারিনি যে কখন আমাদের পরিবারের একজন সদস্য তারা হয়ে গেছে । আজ আমার এক সহকর্মীর শ্রাদ্ধ ছিল আর এই দিনেই আমাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন চলে গেল । মাঝখানে কয়েকটা মাস করোনার জন্য ও আমাদের সঙ্গে ছিলনা কিন্তু সেই সময়েও আমাদের আর্থিক সাহায্য অব্যাহত ছিল একজন পরিবারের সদস্য হিসেবে যতখানি করা সম্ভব ততটাই করেছি। বত্রিশ বছরে দিদিও একটু কাহিল হয়ে গেছে এবং তাকে সাহায্য করতে আরও একজন এসে গেছে নয় নয় করে বছর বারো। গোকুলকে আমাদের এলাকায় কিছু কিছু কাজ জুটিয়ে দিতে পেরেছিলাম কিন্তু সেই দূর প্রান্ত থেকে এসে কাজ তার ধরে রাখতে পারেনি।
দিদি একটু চুপচাপ ধরণের ছিল। অন্য বাড়িতে কাজ করলেও কখনও কথা চালাচালির মধ্যে তাকে থাকতে দেখিনি । ওদের মধ্যে এইধরণের চরিত্র মেলা ভার । সব সময়ই একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালবাসতো এবং চেহারায় একটা লক্ষ্মী শ্রী ছিল। একটু আগেই ওরা গোকুলের সৎকার করে ফিরল। দিদির পুত্রবধূ ফোন করে দিদিকে দিল কথা বলার জন্য আর দিদি হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগল আর বলতে লাগল , " বৌদি, আমি তোমাদের বাড়ির কাজটা করব আর কোনও বাড়িতে না করলেও।" তোমাকে কাজ ছাড়তে হবেনা, যতদিন তুমি পারবে আমাদের পরিবারের একজন হয়ে থেকো আর মনটাকে শান্ত কর এই ভেবে যে তোমার স্বামী অনেকদিন ধরে কষ্ট পাচ্ছিল , সেটা দেখেই ভগবান তাকে তাঁর কাছে টেনে নিয়েছেন। কিছু দরকার হলে আমাদের জানিও।
কিছু মানুষ আছে যারা হাজার কষ্ট হলেও সততার পথ ছাড়েনা এবং তাদের মর্যাদা বোধ এতটাই বেশি যে তারা বিনা শ্রমে কারও কাছে বিন্দুমাত্র সাহায্য নেবেনা। এঁদের অবশ্যই সম্মান করা উচিত এবং অনেক পয়সাওয়ালা লোকদের চেয়ে হাজার গুণ ভাল। আমাদের রাজনীতিবিদদের দেখলে ঘৃণা বোধ হয় কিন্তু হাজার অসৎ হলেও তাদেরই দ্বারস্থ হতে হয়। সততার সম্মান আমরা খুব কম ই দিই। আমরা ঐ অসৎ ব্যক্তিদের মাথায় তুলে রাখি , খানিকটা ভয়ে ভক্তির মতন। গোকুল চলে গেল আর দিদিকে বেশ খানিকটা ধাক্কা দিয়ে গেল। এদের অল্প বয়সে বিয়ে হয় এবং এই দীর্ঘ দিনের সম্পর্কের আজ শেষ হলো।
Thursday, 30 January 2025
অথ বিবাহ কথা
বহুদিন পর এক ধমাকাদার বিয়ের সাক্ষী হতে পারলাম । বড় শিল্পপতিদের ছেলেমেয়ের বিয়েতে আমাদের মতন উলুখাগড়াদের ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে থাকা ছাড়া আর খবরের কাগজ বা দূরদর্শনের বিভিন্ন চ্যানেলের প্রতিযোগিতামূলক প্রদর্শনের কল্যাণে খুঁটিনাটি খবরের বিশদ বিবরণ জানা ছাড়া আর কিছুই করার থাকেনা। যে যেমন ওজনদার, তার তেমন সমারোহ। রাজারাজড়ার ঘরের বিয়ে আমাদের মতন আমজনতার মধ্যেও একটা আনন্দের রেশ জাগিয়ে তোলে যদিও তা সাময়িক। একজন শিল্পপতির ছেলের সঙ্গে আর এক শিল্পপতির মেয়ের বিয়ে হলো, সারা পৃথিবীর তাবড় তাবড় নেতা মন্ত্রীর সমাগম হলো, কোটি কোটি টাকা কেমন ভুস করে উড়েগেল-- অবশ্যই এক পকেট থেকে আর এক পকেটে আর আমজনতা বলতে লাগল, " কেয়া বাত হ্যায়, শাদী হো তো অ্যায়সা''। আমরা আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবরে কি দরকার? না, তা ঠিক নয়, ছোটখাটো ব্যাবসাদার যদি নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যাবসা করতে পারে তাহলে তার ভাগ্যেও শিকে ছিঁড়তে পারে। যেমন যে পান বানায় খুব সুন্দর, সে পানের বরাত পেতে পারে বা কেউ ভাল ঢোল বাজালে সেও ডাক পেতে পারে।
বিয়ে মানে তো একটা ছেলের সঙ্গে একটা মেয়ের বিয়ে নয়, একটা পরিবারের সঙ্গে আর একটা পরিবারের মেলবন্ধন। বিয়ের ব্যাপারটা আজকাল বেশ আধুনিক হয়ে গেছে। আগে ঘটকদের মাধ্যমে বিয়ের যোগাযোগ হতো। অমুক ঘটকের খুব নাম ডাক, ওর কাছে গেলেই বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাওয়া ছেলেমেয়েদের বিয়ে হবেই হবে। তখন কম্পিউটার না থাকলেও জাবদা খাতায় ঠিকুজি কুলজি সব থাকত এবং ঐ ঘটক মশাইরা যেন এক একজন জীবন্ত কম্পিউটার । তাঁর দক্ষিণা তো নাম রেজিস্ট্রেশনের সময় দিতেই হতো , এছাড়া বিয়ে হলে তাঁর সাম্মানিক দক্ষিনাও বেশ ভাল রকম হতো যার নাম ছিল ঘটকবিদায়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘটকমশাইএর জায়গা নিয়েছে বিভিন্ন ম্যাট্রিমোনিয়াল । সেখানেও নাম রেজিস্ট্রি করতে হয় একটা বাঁধা সময়ের জন্য এবং এই ব্যবসাও বেশ রমরমিয়ে চলছে। আত্মীয় স্বজনের সূত্রে সম্বন্ধ এলে পাত্র পাত্রীদের সম্বন্ধে অনেক খবর জানা যেত। চলতি কথা ছিল উঠতি ঘরের ছেলে এবং পড়তি ঘরের মেয়ের সম্বন্ধে খোঁজ পড়ত বেশী, বড় জোর সমানে সমানে । পুরুষ শাসিত সমাজে ছেলের বাড়ির কথাই বেশী প্রাধান্য পাবে কিন্তু সেটা বিয়ে হওয়া ইস্তক, তার পরেই ছেলের বাবা মা বা কাকা, পিসিরা সব ব্রাত্য, তার জায়গা নেয় মেয়ের বাড়ির লোকজন মানে মেয়ের বাবা, মা এবং মাসি বা মামারা। সুতরাং, ঘটের বুদ্ধি একটু খরচ করলেই সম্পর্কটা বেশ টিকিয়ে রাখা যায়। বেশী বেগড়বাঁই করলে সম্পর্ক ফুটুস। ম্যাট্রিমোনিয়ালের মাধ্যমে যে সম্পর্কগুলো আসে সেগুলো যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করতে হয় নাহলে পরে ম্যাট্রিমনি সংস্থাকে দোষ. দিয়েও বিশেষ লাভ হবেনা আর তা ছাড়া তারা দায়িত্ব নেবেই বা কেন? ওরা সমস্ত দেওয়া তথ্য পরীক্ষা করে কিনা জানা নেই । তথ্য পরীক্ষা করার জন্য আলাদা সংস্থা আছে এবং তাদের সার্ভিস পেতে গেলে গাঁটের কড়ি খরচ করতে হবে । বাবা মায়ের অনেক কষ্ট লাঘব হয়ে যায় যদি ছেলে মেয়েরা নিজেদের জীবন সঙ্গী বা সঙ্গিনী বেছে নেয়। তারা অনেক দিন ধরে মেলামেশা করার ফলে বুঝতে পারে যে নিজের পছন্দের সঙ্গে কতটা মিলছে এবং সেই হিসাবে নিজেদের জীবন সঙ্গী বা সঙ্গিনী বেছে নেয় । কিন্তু এ সত্ত্বেও কি সব কিছু ঠিকঠাক চলছে? না, এতেও মাঝে মধ্যে চলার পথে কিছু বাধা আসে যার অনিবার্য পরিণতি বিচ্ছেদ । খুবই দুঃখের কথা, কিন্তু বাস্তবে ঘটছে ও তাই। ছেলে, মেয়ে দুজনেই যথেষ্ট শিক্ষিত এবং তাদের দুজনের ক্যারিয়ারের গ্রাফ ই ঊর্ধমুখী কিন্তু কোন কারণে তাদের একই শহরে পোস্টিং না হলে দীর্ঘদিন আলাদা থাকতে হয় যার ফলে মানসিক অবসাদে ভুগতে হয় এবং একটা স্টেজ পরে সেটা বিচ্ছিন্নতার পথে ঠেলে দেয়। এই সময় কাউকে না কাউকে একটু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। আজকাল সবার ই নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি । সুতরাং ছেলে বা মেয়েরা তাদের বাবা মায়ের সাধ্যানুযায়ী যত্নে বেড়ে ওঠে এবং বিয়ের পর সেই মানে একটু ঘাটতি হলেই অসন্তোষ ধীরে ধীরে পুঞ্জীভূত হতে থাকে এবং বিস্ফোরক অবস্থার দিকে এগোতে থাকে। এইসময় বাবামায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে মায়েদের। এইসময় কাউন্সেলিং ভয়ানক ভাবে দরকার। কাউন্সেলিং এর পরেও যদি মানিয়ে নেওয়ার অবস্থায় না যাওয়া সম্ভব হয় তাহলে তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি বিচ্ছেদ । এমন ও ঘটনা চোখে পড়ে যেখানে সন্তান হওয়ার পরেও বিচ্ছেদ ঘটে যায় । অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা কিন্তু এর সাক্ষীও হতে হয়। আজকাল যে কোন বিয়েই ভীষণ ব্যয়সাপেক্ষ । এত খরচ করেও যদি তার স্থায়িত্বে সন্দেহ থাকে তাহলে তাও রীতিমতো বেদনাদায়ক ।
বিয়ে স্বভাবতঃই এক গাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠান । এই অনুষ্ঠানে একটু হালকা মেজাজ আনার জন্য ঠাকুমা দিদিমাদের এক বিরাট দায়িত্ব ছিল। নানারকম ছড়া বা কবিতা তাঁরা লিখতেন এবং পুস্তিকার আকারে তা প্রকাশ করা হতো।আইবুড়ো ভাত(অনূঢ় বা অনূঢ়া অবস্থায় ভাত খাওয়া) একটা খুব বড়সড় অনুষ্ঠান ছিল ।বিয়ের দিন সকাল বেলায় পাত্রর গায়ে হলুদ হতো এবং সেই হলুদ বীর মুটের কড়ি সমেত পাত্রীর বাড়ি নিয়ে যাওয়া হতো এবং তারপর পাত্রীর গায়ে হলুদ হতো। এরপর আর পাত্র বা পাত্রীর কোন খাবার জুটত না একটু আধটু সরবত ছাড়া ।এখন আর এত কষ্ট ছেলে মেয়েদের দেওয়া হয়না। বিয়ের দিন দিদিমা ঠাকুমারা কিন্তু রীতিমতো নাচতেন, এখন যেটা সঙ্গীতে হয়। এছাড়া নানারকম ছোটখাটো খেলাধূলোর মাধ্যমে এই গম্ভীর অনুষ্ঠান কে আরও কত প্রাণবন্ত করা যায় তার দিকে খেয়াল রাখতেন। হোম এবং সপ্তপদী হিন্দুশাস্ত্রমতে বিয়ের এক অঙ্গাঙ্গী অনুষ্ঠান এবং আজও তা পালন করা হয়।
সাম্প্রতিক কালে কয়েকটা বিয়েতে যোগ দিয়ে ভীষণ ভাল লাগল। দিল্লীতে তাজ হোটেলে দুই পরিবারের একসঙ্গে থেকে বিয়ে বা জয়পুরের রাজবাড়িতে বন্ধুর ছেলের বিয়েতে চুটিয়ে আনন্দ করার প্রায় একবছর বাদে একটা ধমাকাদার বিয়ে হলো যেখানে আশপাশের লোকজন সবাই মিলিতভাবে এত আনন্দ করলো যে কার বাড়ির বিয়ে প্রায় ভুলে যাবার ই দশা। ছেলের বাবা মায়ের তরফ থেকে সমস্ত আত্মীয়স্বজনদের আগমন এবং পাড়া প্রতিবেশীদের সবার আন্তরিক যোগদান একটা দারুণ আনন্দময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল । দিল্লী বা জয়পুরের ডেস্টিনেশন ম্যারেজের মতন এবার ও চুটিয়ে আনন্দ করা হলো। আত্মীয় পরিজনদের সঙ্গে পাড়া প্রতিবেশীদের এই যোগদান একটা বিরল আনন্দের সৃষ্টি করেছে। সবার আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা নিয়ে দাম্পত্য জীবন শুরু হোক এই আমাদের সবার প্রার্থনা।
Monday, 13 January 2025
পৌষল্যা------তখন ও এখন
শীতের আমেজ শুরু হতেই পৌষল্যা বা বনভোজনের কথা মনে পড়ে এখন যার পোষাকি নাম বা ইংরেজিতে নাম পিকনিক। তখন ক্লাসের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়ে যেত ডিসেম্বর মাসে। নতুন বছরে নতুন ক্লাস শুরু হতো, পড়াশোনার চাপ নেই বললেই চলে, সুতরাং পৌষল্যা নিয়ে গজল্লা বেশ রসিয়ে রসিয়ে চলত। কোথায় পৌষল্যা হবে সেটা নিয়েও তর্ক বিতর্ক বেশ জোরদার হতো এমন কি মতান্তর মনান্তরের পর্যায়েও চলে যেত। কিন্তু একটা কথা মানতেই হবে যে পৌষল্যা বা বনভোজন নিয়ে একটা ভালরকমের উন্মাদনা থাকত।
স্থান নির্বাচনের ভার তিন চারজন ডাকাবুকোদের উপর থাকত যারা নিভৃত জায়গার সঙ্গে সঙ্গে খাওয়ার জলের ব্যবস্থা আছে এই কথাটা মাথায় রাখত। বন্ধু সার্কেল পাড়ার মধ্যে হলে সেরকম কিছু জাঁকজমক থাকত না কিন্তু ক্লাব স্তরে হলে বিভিন্ন পাড়ার ছেলেদের সমন্বয়ে বেশ বড়সড় বনভোজন বা পিকনিক হতো। সুতরাং পৌষল্যা হচ্ছে ছোট স্তরে ( খেলার মধ্যে দুধভাত যেমন) এবং বনভোজন বা পিকনিক হচ্ছে একটু বড় লেভেলে । যে কোন খেলায় কাউকে দুধ ভাতে বলা হতো যে একেবারেই ধর্তব্যের মধ্যে নয় অথচ তাকে বাদ ও দেওয়া যাবেনা।এটা একটা প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে যেত কারণ যাকে দুধভাতে রাখা হতো সে সবসময়ই মনে করত যে সে অন্যদের সমকক্ষ কিন্তু তার বন্ধুদের চোখে বাচ্চা বা আনাড়ি। যাই হোক, পৌষল্যা বা বনভোজন হতো সাধারণতঃ লোকালয়ের বাইরে কোন বড়সড় পুকুর বা বিলের পাড়ে কিংবা কোন বনের মাঝে কালিবাড়ির কাছে একটা বড়সড় গাছের নীচে যেখানে একটা চাদর বা বেডকভার টাঙিয়ে নেওয়া হতো এবং তার নীচে রান্নার ব্যবস্থা করা হতো। খাবার জল কালীবাড়ির টিউব ওয়েল থেকে নেওয়া হতো এবং অন্য সব কিছু বিলের জলে করা হতো। রান্না সেরকম বিশেষ কিছু হতো না-- ভাত, ডাল, আলুভাজা বা বেগুন ভাজা, ফুলকপির তরকারি ও ডিমের ঝোল এবং শেষ পাতে একটু বোঁদে ও রসগোল্লা । মাংস করলে খরচাও বেশী যা বাচ্চাদের পক্ষে বাবা মায়ের কাছে চাওয়া যেতনা এবং কেউ একটু বেশী পেল বা কম পেল তাই নিয়ে মন কষাকষির সম্ভাবনা থাকতো । সুতরাং মাংস বাদ আর কম খরচের মাংস বা চিকেন ছিল ই না তখন। নিজেরাই জায়গা পরিষ্কার করা,মশলা বাঁটা (তখন গুঁড়ো মশলার চল ছিলনা), গর্ত করে উনুন বানানো,চারদিকে গাছগাছড়া থাকায় কাঠের অভাব হতো না এবং রান্নায় নুন কম বা ঝাল বেশী নিয়ে কেউ মাথাই ঘামাতো না। রান্নার বাসনকোসন কোন গরীব লোককে দিয়ে মাজিয়ে নেওয়া হতো কিছু খাবার ও সামান্য পয়সার বিনিময়ে । দুর্দান্ত আনন্দ হতো এই পৌষল্যায়। সাধারণত বাড়িতে আধখানা ডিম খাওয়া হতো কিন্তু এই পৌষল্যায় গোটা ডিম খাওয়া একটা বিরাট ব্যাপার। মোদ্দা কথা, অল্পতেই সন্তুষ্টি কারণ সেই সময় প্রত্যেক বাড়িতেই পাঁচ সাতটা ছেলেমেয়ে নিয়ে কোন পিসি বা কাকা থাকায় প্রায় দশজনের মুখে খাবার জোগানো বড় সহজ ব্যাপার ছিলনা। নিজেরা সমস্ত কাজ করায় আনন্দের মাত্রা ছিল আকাশ ছোঁয়া।
ক্লাব স্তরে যখন পিকনিক হতো তখন আমরা নিতান্ত ছোট হওয়ায় ক্লাবের দাদারাই সব মাথা এবং ব্যবস্থাপনা তাদের ই। সকাল বেলায় স্নান করে ক্লাবে হাজির হওয়া এবং লাইন দিয়ে মাড়োয়ারি বাগানে যাওয়া। ঐ বিশাল বাগানবাড়ির নাম কেন মাড়োয়ারি বাগান হয়েছিল তা জানিনা তবে পঞ্চানন তলা থেকে জঙ্গলের পথে আরও মাইলখানেক গেলে পড়ত সেই ফাটক ওয়ালা বিশাল বাগানবাড়ি। অনেকগুলো বাঁধানো পুকুর , নানা ফুল ফলের গাছে ভরা বিশাল বাগানের মধ্যে এক পোড়ো রাজবাড়ি যার আশে পাশে গেলেই গা ছমছম করতো। ভুটানদার ওপর ভার ছিল আমাদের সামলানো। আমার দেখা একজন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ভদ্রলোক যাঁর হাতের ছড়ি কখন যে কার মাথায় পড়বে একটু বেচাল হলেই , কেউ বলতে পারতনা। আর এইরকম দুর্ধর্ষ বোম্বেটেদের সামলানো ঐ ছড়ি ছাড়া সম্ভব হতো না বলেই মনে হয়। কিন্তু কাজ যে একেবারেই কিছু করতে হতো না তা হয়, নতুন আলুর খোসা বস্তায় ঘসে ওঠাতে হতো। রান্নার ভার রঘুদার ওপর। দুলু দা, বুড়োদা, শক্তি দা, মনা দা, চঞ্চলদা, দোদা দা,মোহন দা, মদন দা, রবি দা, প্রণব দা, কাজল দা, ভুটান দা, পল্টু দা, মিলি দা, ছোকুদা, বীরেনদা ছাড়াও আরও অনেকেই থাকতেন এই পিকনিকে । খাওয়াদাওয়া সারতে সারতে ছোট দিনের বেলা গড়িয়ে যে কখন সন্ধে হয়ে যেত বুঝতেই পারতাম না। সকাল বেলায় পিকনিক স্পটে পৌঁছানোর পর ডিমসেদ্ধ, পাঁউরুটি ও কলা দিয়ে টিফিন খাওয়া হতো। আলুর খোসা ছাড়ানোর পরেই দড়ি ছাড়া গরুর মতো এদিক সেদিক করে কুল বা পেয়ারা পেড়ে খাওয়া হতো। লম্বা লম্বা নারকেল গাছ থেকে নারকেল পাড়া আমাদের কম্মো ছিলনা কিন্তু ব্রজেন দা পুকুর পাড়ে নারকেল গাছে তরতরিয়ে উঠত এবং নারকেল পাড়তো। কোন কোন সময় দুচারটে নারকেল পুকুরের জলেও পড়ে যেত। পুকুরগুলো সব বাঁধানো ছিল মানে যাঁদের বাড়ি ছিল তাঁরা বেশ বড়মাপের জমিদার বা রাজা ছিলেন। অত লোকের রান্না হতে যথেষ্ট সময় লাগত আর এর মধ্যেই মনাদার গল্প ও চুটকি সবার মন ভরিয়ে দিত। এইরকম জমজমাট পিকনিক জীবনেও ভোলার নয় কারণ এখানে ছোট বড়সড় সবাইকেই কিছু দায়িত্ব দেওয়া হতো এবং প্রত্যেকেই সেটা আনন্দের সঙ্গে করতো যেটা এখনকার পিকনিকের থেকে অনেক আলাদা। এখন কাছাকাছি পিকনিক স্পট নেই বললেই চলে। লোকসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য আশপাশের ফাঁকা জায়গাগুলোয় বাড়ি ঘর হয়ে গেছে এবং বড়সড় জায়গা খুঁজতে গেলে যেতে হবে গাড়িতে বা বাসে বা ট্রেনে । লোকসংখ্যা বেশী হলে একটা বাসেও হবেনা, অনেক গাড়ি বা বাসের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এ ছাড়া লোকজন বেশী হলে গ্রুপের মধ্যে যে বাঁধন সেটা বহুলাংশেই শিথিল হয়ে যায় । তখন নামেই একটা বড়দলের পিকনিক কিন্তু তা ছোট ছোট অনেক গ্রুপের সমন্বয় । এই গ্রুপের লোকের সঙ্গে ঐ গ্রুপের লোকের বিশেষ সদ্ভাব নেই। সুতরাং জমাটে পিকনিক হবার সম্ভাবনা খুব কম । এ ছাড়া নিজেদের যোগদান, না থাকার ই সামিল। চাঁদা দিয়েই খালাস। কতটা পেলাম প্রতিদানে এই নিয়ে হিসেব কষতে কষতেই আনন্দের দফারফা। এছাড়া রয়েছে ক্যাটারার, তারাই খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারটা দেখে বলে পিকনিকে অংশগ্রহণকারীদের ভূমিকা অত্যন্ত নগণ্য। তবুও এরই মধ্যে দুএকজন বিশেষ ভূমিকা পালন করেন বলে এখনও এর মধ্যেই কিছু আনন্দ পাওয়া যায় । এঁরা যদি কোন কারণে দায়িত্ব না নেন তাহলে পিকনিকটাই হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। এখন সবকিছুই যেমন নিউক্লিয়ার, গ্রুপটাও সেরকম নিউক্লিয়ার বাঊ আঁটোসাঁটো হওয়া দরকার । এঁরা আছেন বলে আজ ও কিছু আনন্দ পিকনিকে পাওয়া যায়।
আজকের দিনে পিকনিক অবশ্য সারাবছর ধরেই হয় বলে এখানে সেখানে বহু রিসর্ট হয়েছে এবং ঠা ঠা রোদেও এয়ার কণ্ডিশনড ঘরে বসে দিব্যি রমরম করে পিকনিক ও চলছে আর রিসর্টগুলোও চলছে। এখন পৌষল্যা পৌষমাসেই আবদ্ধ নেই, নাম বদলে পিকনিক হয়েছে এবং বার মাস ধরে চলছে।
Friday, 10 January 2025
প্রত্যাবর্তন
হঠাৎই একটা মেসেজ এল পাশের বাড়ির মেসোমশাই গতকাল রাতে অমৃতলোকে যাত্রা করেছেন। একাই থাকতেন তিনি স্ত্রী বিয়োগের পর। এক ছেলে ও এক মেয়ে বিদেশে থাকে, তারা তাদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে মধ্যে আসে তারা বাবা মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে । রবি বাবু ও তাঁর স্ত্রী সুকন্যা দেবী খুশীতে ডগমগ হয়ে উঠতেন, বিশাল বাড়িটা ঝলমলিয়ে উঠত বাচ্চাদের কলরবে। কয়েকটা দিন হৈচৈ, তারপরেই ঝিমিয়ে পড়ত গেট ওয়ালা বাড়িটা। কেউ এলে গেলে মাসিমা বলতেন, "বাবা, গেট টা লাগিয়ে দিয়ে যেও। "সেই মাসিমা ও চলে গেছেন গতবছর। তারপরেই রবি বাবুর একাকীত্ব শুরু। লোকজনের আসা যাওয়া কমে গেছে। একটু আধটু লেখাজোখা করে খানিকটা সময় কাটে কিন্তু দীর্ঘ সময় তো আর কাটতেই চায়না। বেশীক্ষণ লিখতেও আর ভাল লাগেনা। আগে যখন স্ত্রী বেঁচে ছিল তখন লেখার সময় অবধারিতভাবে বলত যে বাজারে যাও সকাল সকাল নাহলে ঐ ঝটতি পটতি জিনিসগুলো তোমার থলিতে ঢুকবে আর আমার প্রাণান্ত। খুবই বিরক্ত হয়ে কলমটা টেবিলের ওপর আছড়ে ফেলে থলিটা নিয়ে বেরিয়ে যেতেন। রাগের মাথায় জিনিস পত্র আনাতেও গণ্ডগোল হয়েযেত যার অবশ্যম্ভাবী ফল গিন্নীর গনগনানি। তখন বিরক্তির মাত্রা আরও বেড়ে যেত কিন্তু আজ কেউ পিছনে টিকটিক করার নেই, চোখা চোখা বাণে কেউ বিদ্ধ করার নেই, আছে শুধু নিস্তব্ধতা, তবু লিখতে মন আর চায়না। পিছন থেকে খানিকটা বিদ্রূপাত্মক শব্দ উড়ে না এলে কলম যেন আগে বাড়তেই চায়না। সেও যেন বুঝে গেছে ঝাঁকানি শেষ অতএব দাও ক্ষান্তি। রবিবাবু ও বুঝতে পারেন সুকন্যার অনুপস্থিতি তাঁকে নিরুৎসাহী করে তুলেছে। প্রকাশকের তাগাদাও তাঁকে আর উজ্জ্বীবিত করতে পারছে না। অথচ, না লিখলেও পয়সা আসবে না,সঞ্চিত পুঁজিতে পড়বে টান। জীবনের উপান্তে এসে ছেলেমেয়েদের কাছে নিজের কোন চাহিদার কথা বলতে খুব কুণ্ঠা বোধ হয় । সেই জন্য এক রকম বাধ্য হয়েই কলম খুলে বসতে হয়। কি যেন লিখছিলাম ভুলে গেছি, প্রথম থেকে একবার পড়ে নিয়ে খেই ধরতে হয়। তবু সেই তখনকার মনের অবস্থায় ফিরে যেতে যথেষ্ট অসুবিধা হচ্ছে। লেখক এক, বিষয় এক, কলম ও এক কিন্তু ভিন্ন মন । গল্পের গতি ভিন্নমুখী।রবি বাবু ভাবেন এটা নিশ্চয়ই সব লেখকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য কারণ শয়ে শয়ে পাতার উপন্যাস তো আর একটা সিটিং এ লেখা সম্ভব নয়। সুতরাং ভিন্ন মানসিকতায় শেষ হয় এই দীর্ঘ উপন্যাস। যাঁরা সেই গতি প্রকৃতি এক ধারায় রাখতে পারেন তাঁরা সত্যিই নমস্য।
কদিন ধরেই শরীরটা বিশেষ ভাল যাচ্ছেনা। অল্প অল্প জ্বর, প্যারাসিটামল খেয়ে জ্বর নেমে যাচ্ছে আবার খানিকক্ষণ বাদেই যে কে সেই। বন্ধুবান্ধব আসছে দেখা করতে, নিয়েও যেতে চাইছে ডাক্তারের কাছে কিন্তু রবি বাবুর মন আর সরছে না। কেবল ই মনে পড়ছে শৈশবের কথা, ধোপঘাটির মাঠে ফুটবল খেলার কথা এবং খেলা শেষে বৈঁচি পাড়ার কথা, মণ্ডল বাড়ির বাতাপি লেবু বা ভাদুড়িদের বাড়ির নারকেল চুরির কথা । এক কথায় শৈশবের হাতছানি আর উপেক্ষা করতে পারছেন না রবি বাবু । কাজের মেয়ে রান্না করে যাবার সময় বলে গেল গরম গরম খাবার খেয়ে নিও, ঠাণ্ডা খাবার খেওনা, শরীরটা তোমার ভাল নেই । রবি বাবু কোন উত্তর দিলেননা। ল্যাচটা টেনে দিয়ে চলে গেল দীপা। রবি বাবু কিন্তু সেই শৈশবের দিনগুলোয় মত্ত, কোনরকম ভ্রূক্ষেপ করলেন না।
দীপা পরদিন সকালে এসে চাবি খুলে ঢুকে দেখে খাবার টেবিলে রাতের খাবার যেমনকার তেমন সাজানোই আছে। ঘরে ঢুকে দেখে রবিবাবু যেমনভাবে শুয়েছিলেন তেমন ভবেই শুয়ে আছেন, ঠোঁটের ফাঁকে একটু মুচকি হাসি কিন্তু শরীরটা যেন স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশী রকম ই ঠাণ্ডা। কাকু,কাকু বলে অনেক ডাকার পরেও কোন উত্তর না পেয়ে চিৎকার করে উঠে সবাইকে ডেকে আনল। পাড়ার ডাক্তার বীরেন ভট্টাচার্য এসে পরীক্ষা করে দেখে বললেন, " নাহ্, সব শেষ । কিন্তু ছেলে মেয়ে কেউই নেই এখানে, খবর দিতে হবে দেহ সৎকারের জন্য। অতএব খবর দিতে হলো পীস হ্যাভেনে। গাড়ি এসে গেছে রবি বাবুর নিথর দেহটা নিয়ে যাওয়ার জন্য। দীপা সারাক্ষণ ই কাঁদছিল ।মুখে মৃদুহাসি নিয়ে রবি বাবু চললেন শৈশবের বন্ধুদের উদ্দেশ্যে যেখানে রয়েছে নিমাই, দেবু, বাবু, মোহন, বিজয়রা ডাণ্ডা গুলি নিয়ে, রয়েছে ছোট বল পিট্টু খেলার জন্য, যেটা রবি বলবে সেটাই খেলবে কারণ আজ ওই হচ্ছে প্রধান অতিথি ।
Sunday, 22 December 2024
"লৌকিকতার পরিবর্তে আশীর্বাদ প্রার্থনীয়"
কোন কোন লোক থাকেন যাঁরা দাদা ডাকেই খুব আনন্দ পান, তা সে ব্যক্তির বয়স যাই হোক না কেন। এইরকম ই একজন ব্যক্তি বিশুদা।আপামর জনতার বিশুদা, সে আমার বাবার ও বিশু দা, আমার ও বিশুদা, আমার ছেলের ও বিশুদা, আবার তার ছেলেও হয়তো বিশুদা ই বলবে যদি তিনি ততদিন বেঁচে থাকেন । এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিশুদা তাঁর বিশাল দশাসই চেহারা নিয়ে নতুন বাজার যেতে যে উঁচু ধাপিওয়ালা বাড়িটা পড়ে সেখানে বসে থাকেন এবং বাজারগামী বা বাজার করে ফিরে আসা সমস্ত লোকজন একবার তাঁর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টা সামান্য প্রসারিত করে কোন শব্দ উচ্চারন না করেও ভাল আছেন জিজ্ঞেস করেন এবং প্রত্যুত্তরে বিশুদা ও মাথা নাড়িয়ে কোন কথা না বলেও ভাল থাকার কথা বলেন । কোন কোন সময় হাত তুলেও ভাল থাকার কথা জানান । বিশুদা কে বেশিরভাগ সময়ই আদুর গায়ে দেখা যায়, হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় একটা স্যান্ডো গেঞ্জি, বড়জোর একটা হাতকাটা সোয়েটার বা একটা চাদর । তাঁর ঠাণ্ডা না লাগার কারণ জিজ্ঞেস করলেই লুঙ্গির ট্যাঁকে গোঁজা একটা তামার পয়সা বের করে দেখাতেন আর বলতেন বুঝলি পয়সার গরম কাকে বলে? প্রকাণ্ড শরীরের মালিক এই বিশুদা কোথায় থাকেন, কে ই বা তাঁর খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেন কিছুই জানা ছিলনা । কাজকর্মহীন বিশুদা কে দেখা যেত ফুটবলের মাঠে। কোন বিশেষ দলের সমর্থক ছিলেন বলে মনে হয়না কারণ যে দল ভাল খেলত তাকেই উৎসাহ যোগাতেন।হয়তো যে দলের সমর্থক আমি তার বিরুদ্ধে একটা গোল হয়ে গেল আমার মন খারাপ হয়ে গেল কিন্তু পাশে বসে থাকা বিশুদা দুহাত তুলে আনন্দ প্রকাশ করলেন এবং আমার মন দ্বিগুণ খারাপ হয়ে গেলেও বিশুদার প্রতি রাগ করতে পারতামনা।শুধু আমি কেন, কেউই রাগ করতে পারতনা। এমনই ছিল তাঁর জনপ্রিয়তা।
খেতে খুব ভালবাসতেন বিশুদা আর চেনা অচেনা সব লোকই তাঁকে নিমন্ত্রণ করে আত্মতৃপ্তি লাভ করতেন। বিশুদা কে নেমন্তন্ন করা মানে দশটা লোককে নেমন্তন্ন করা কিন্তু তা সত্ত্বেও বিশুদা কে লোকে নিমন্ত্রণ করত।উপহার বিশুদার একগাল হাসি সমেত আশীর্বাদ । এ ছাড়া বিশুদার কাছ থকে কেউ কোন উপহার আশা করতনা। তারাশঙ্কর দা ছিলেন একটা স্কুলের মাস্টারমশাই । তখন স্কুলের মাস্টারমশাইদের মাইনে তিন চার মাস অন্তর হতো। মাইনে পেতেই প্রায় সবটাই চলে যেত ধার শোধকরতে। তবু ও মাইনে পাবার মাসে কোন নিমন্ত্রণ হলে খুব একটা অসুবিধা হতোনা উপহার দিতে কিন্তু সেই নেমন্তন্ন যদি মাইনে পাওয়ার প্রায় শেষ অবস্থায় পাওয়া যায় তা হলে ধার করা ছাড়া আর কোন রাস্তাই থাকেনা। এইরকম একসময় তারাশঙ্কর দার বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে তারাদার নেমন্তন্ন হলো, সঙ্গে বিশুদার ও। আর ঐ বন্ধুই হচ্ছে তারাদার মুশকিল আসান । নানা সময় তারা দা তারই শরণাপন্ন হন টাকার দরকারে কিন্তু তাঁর ই মেয়ের বিয়েতে উপহার দেওয়ার জন্য তাঁর ই কাছে টাকা চাইতে ভীষণ লজ্জ্বা হচ্ছিল তারাদার। না, কিছুতেই ওর কাছে নেওয়া যাবেনা। অনেক চিন্তা ভাবনা করে বিডিও অফিসের হেডক্লার্ক মুকুদার শরণাপন্ন হলো। মুকুদা বলল আসতে তারাদাকে তার অফিসে, যদি কোন ব্যবস্থা করাযায় ধারের। সেদিন ছিল শনিবার শেষ দুটো পিরিয়ড ছিল কেমিস্ট্রি প্র্যাকটিক্যাল । আমার ও ছিল প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস । হেডমাস্টার মশাইকে বলে ম্যানেজ করে আমার ওপর দুটো ক্লাসের ভার দিয়ে উনি তো মুকুদার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন । মুকুদার সমস্ত চেষ্টা বিফল, কারও কাছে বাড়তি টাকা নেই ধার দেওয়ার মতো । তারাদাও খুবই বিমর্ষ । না,বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে কোন উপহার না নিয়ে কিছুতেই যাবেনা সে। হঠাৎই মনে পড়ে গেল বিশুদার ও নিমন্ত্রিত হওয়ার কথা। বিডিও অফিসে অনেক লিফলেট পড়ে ছিল। উই প্ল্যান ফর প্রসপারিটি, রুরাল ডেভেলপমেন্ট, ফাইভ ইয়ার প্ল্যান এই জাতীয় যত লিফলেট ছিল সবকটা থলি ভর্তি করে নিয়ে এল। স্টেশনারি দোকান থেকে মলাট দেবার লাল, কমলা রঙের অনেক গুলো কাগজ কিনে নিয়ে এল। সেলোফেন পেপার দিয়ে ভাল করে মুড়িয়ে ঐ পুস্তিকাগুলো একটা দেখনদার গিফট প্যাক করে বিশুদার পাশাপাশি বন্ধুর মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেল। বন্ধু তারাদার হাতে সুদৃশ্য প্যাকেট দেখে একটু আশ্চর্য ই হলো, ভাবল তারা ধারদেনা করে কেন এইরকম একটা দামী উপহার কিনতে গেল। যাই হোক, মুখ্য আকর্ষণ বিশুদার আশীর্বাদের পাশে অন্য যে কোন লোকের উপহার কেমন ম্যাড়মেড়ে। তারা দা তো একেবারে লেপটে রয়েছে বিশুদার সঙ্গে । বিশালদেহী বিশুদার আশীর্বাদের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তারাদার গিফট প্যাকেট দিয়েই তারাদার খাওয়ার জায়গায় প্রস্থান বিশুদা কে নিয়ে। খাওয়া দাওয়ার পরেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি ফিরে আসা।
বিয়ে বাড়িতে কনের পাশে কোন বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়রা থাকে যারা কে কি উপহার দিল তা একটা লম্বা কাগজে লিখে রাখে। মোটামুটি সব গিফটের উপহারদাতার নাম পাওয়া গেলেও ঐ বিশেষ প্যাকেট কে দিয়েছেন তা জানা গেল না। আর প্যাকেটটা এত মজবুত ভাবে মোড়ানো হয়েছে তাকে ঐ মূহুর্তে খোলা গেলনা। পরদিন কন্যা বিদায়ের সময় অনেক উপহারের সঙ্গে সেই মজবুত প্যাকেট ও চলে গেল । শ্বশুরবাড়িতে বিয়ের ঘনঘটা থিতিয়ে যেতেই ছুরি, কাঁচি দিয়ে সেই প্যাকেট খুলতেই পঞ্চবার্ষিকী প্ল্যান,গ্রামীন উন্নয়নের সরকারী ইস্তেহার সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। সবাই ছিছি করতে লাগল আর মধুমিতার লজ্জ্বায়, দুঃখে কান্না পেয়ে গেল। অষ্টমঙ্গলায় ফিরে এসে মা কে বলল এই উপহারের কথা। মা তো হাঁ করে চেয়ে রইল কিছুই আঁচ করতেই পারলনা কিন্ত ওর বাবা অর্থাৎ তারাদার বন্ধু কিন্তু বুঝতে পেরেছে যে এটা তারার কাজ। বিয়ের পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে । তারাদার মাইনে হয়েছে এবং ধার শোধের পালা। বন্ধুর কাছে এসেছে টাকা ফেরত দিতে কিন্তু বন্ধু বলল, " তারা, পঞ্চাশ টাকা বাড়তি দিবি এবার।" হকচকিয়ে গেল তারা দা। " কেন রে পঞ্চাশ টাকা বাড়তি কেন, তুই কি আজকাল সুদের ব্যবসা করছিস না কি?"
"না, সুদের ব্যবসা নয়, তিরিশ টাকা মেয়ের বিয়ের উপহার আর কুড়িটাকা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে আমার সম্মান নষ্ট করার জন্য।"
তারা দা যত ই অনুনয় বিনয় করে কিন্তু বন্ধু অনড় এই পেনাল্টিতে । "তোর কাছে টাকা ছিলনা তো তুই এইসব ছাইপাঁশ এখানে আনলি কেন?"
তারা দা বলল, " দেখ , সবসময়ই টাকা তোর কাছেই নিই কিন্তু তোর মেয়ের বিয়েতে উপহারের জন্য তোর কাছে টাকা নেওয়া কি উচিত? "
" তোকে উপহার দিতেই হবে, এমন কোন বাধ্যবাধকতা তো নেই ঐ তো বিশুদার মতন তুই ও আশীর্বাদ করতে পারতিস।"
যাই হোক তারাদাকে বড্ড লজ্জায় ফেলে দিল তার বন্ধু।
পরে আর কোনদিন তারা দা ঐ বন্ধুর কাছে টাকা ধার নিয়েছিল কিনা জানা যায়নি।
Subscribe to:
Posts (Atom)