Saturday, 27 December 2025

"বনলক্ষ্মীর দ্বারে"

সুজন বাবু আজ খুশীতে ডগমগ। অনেকদিন পরে স্ত্রী, ছেলে, বৌমা, নাতি, নাতনিদের নিয়ে শান্তিনিকেতনে দুটো দিন কাটিয়ে ফিরে যাচ্ছেন নিজের বাড়িতে। দুটো দিন কেটেছে তাঁর পছন্দের গার্ডেন বাংলোয়, নানান ধরণের গাছগাছড়ায় ভর্তি আর পাখিদের কূজনে যেখানে ঘুম ভাঙে সেই ছবির মতন গেস্ট হাউসে। সামনে বড় লোহার গেট, গাড়ি পৌঁছে হর্ণ দেওয়া মাত্র দারোয়ান বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল বুকিং আছে কি না এবং ভেতরে ঢুকে দেখে নিয়েই খুলে দিল গেট। দরজা খুলে বেরিয়ে আসতেই একগাল হেসে দারোয়ান মহাদেব বলল," স্যার, আপনি?" সুজন বাবু মনে মনে একটু খুশিই হলেন চিনতে পেরেছে দেখে , প্রত্যেক মানুষেরই একটা অহংবোধ থাকে আর সেটা যখন পরিতৃপ্ত হয় তখনই মানুষের মন খুশিতে ভরে ওঠে। ঢুকেই ডানদিকে গাড়ি রাখার জায়গা, বেশ কয়েকটা বড় গাড়ি থাকতে পারে। গাড়ি আর আগে যাবেনা, সমস্ত মালপত্র ওখানেই নামিয়ে রিক্সা ভ্যানে করে দুজন মহিলা সেটাকে টেনে নিয়ে রিসেপশনে চলে এল। মাল্টিপল অ্যাকটিভিটি তাদের, তারাই রেজিস্টার এগিয়ে দিল, তারাই মালপত্র ওপরে নিয়ে গেল এবং সব ব্যবস্থা করে দিল। ভাল লাগল দেখে, স্থানীয় মহিলারা যাঁরা খুব বেশি পড়াশোনা না করেও স্রেফ মুখের হাসি এবং আন্তরিকতা দিয়ে গ্রাহকদের মন জয় করে নেন না এবং সঙ্গে সঙ্গে গেস্ট হাউসের মর্যাদাও।


শান্তিনিকেতনে সবাই যেন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের মর্যাদা ধরে রাখতে ব্যস্ত। ভারী সুন্দর কাব্যিক নাম তাদের বাড়ির এবং ফুলের বাহার সর্বত্র। কোন বাড়ির নাম খেয়া আবার কোনটার নাম গেহ আবার কেউ বা হলো দর্পণ বা শ্যামশ্রী বা ছান্দিক। ভাল লাগল যে কবিগুরুর আত্মাও হয়তো পরিতৃপ্ত হয়েছেন। এই বাড়ির মালিক একজন শিল্পী এবং তাঁর বাড়ির প্রত্যেকটি কোণে তার ছাপ স্পষ্ট। ডাইনিং হল সম্পূর্ণ কাচের, শীতের হিমেল হাওয়ার সেখানে প্রবেশ নিষেধ। তার ই সংলগ্ন একটা আধুনিক ধারার অ্যাপার্টমেন্ট আর ওই ডাইনিং হলের সোজা লনের উপর দিয়ে হেঁটে গেলে আসবে সেই হেরিটেজ বাংলো যার দুটো তলায় চারটে  অত্যন্ত প্রশস্ত ঘর এবং মাঝখানে বিরাট লাউঞ্জ। বিশাল দুই দেয়ালে দুটো বড় আয়না এবং কারুকার্য মণ্ডিত কাঠের সোফা এবং দেওয়ালে শিল্পীর আঁকা পটচিত্র যা যে কোন শিল্পমনস্ক ব্যক্তিকেই আকর্ষণ করবে। ঐ হেরিটেজ বাংলোর তৃতীয় তলে প্রবেশ নিষেধ। বিশাল উঁচু ঘরের প্রবেশ পথে এক শিল্পময় দরজা যাতে   লাগানো তালা খুলে ঘরে প্রবেশ করতে হবে এবং ডানদিকে একটা বড় বাথরুম। উল্টোদিকের ঘরে বাঁদিকে বাথরুম। বাথরুম থেকে বেরিয়ে শোবার ঘর , সেখানে ও রয়েছে একটা বড় শক্তপোক্ত কাঠের দরজা যাতে তালা ও লাগানো যায়। বিশাল বড় ঘরে রয়েছে আরও দুটো বড় দরজা এবং তার ই সঙ্গে মানানসই জানলা। বড় কাঠের সোফা ও টেবিল রয়েছে একদিকে আর অন্যদিকে রয়েছে সুদ‌শ্য ড্রেসিং টেবিল এবং কাঠের চেয়ার ও টেবিল। একদিকে রয়েছে বিরাট মাপের সাবেকি আমলের কারুকার্য করা খাট যাতে তিনজন খুব ভাল ভাবে শুতে পারে, শীতকালে হয়তো চারজনেও। ড্রেসিং টেবিলের দিকেও একটা বড় খাট যেখানে দুজন আরামে শুতে পারে। আরও একটা দারুন জিনিস চোখে পড়ল যেটা হচ্ছে সুদৃশ্য এক আলনা যেখানে কোট, জামা কাপড় রাখা যায়। বড় খাটের পায়ের দিকে রয়েছে এক প্রকাণ্ড কাঠের সিন্দুক যার ভেতরে রয়েছে বাড়তি লেপ, চাদর ও বালিশ। সিন্দুকের ওপরে রাখা ইলেকট্রিক কেটলি এবং চায়ের সম্ভার, কাপ ও প্লেট। ঘরের দেয়ালেও রয়েছে সুন্দর চিত্রকলা। এককথায় বলা যায় যে হেরিটেজ যেন সর্বাঙ্গে মিশে আছে। একতলায় ও এক ই রকম, বাঁকানো কাঠের সিঁড়ির উল্টোদিকে রয়েছে রিসেপশন এবং সিসিটিভির মনিটর যা চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখছে কি হচ্ছে বা কে এল বা গেল। মানে আধুনিকতায় মোড়ানো হেরিটেজ।

মেন গেটের বাঁদিকে রয়েছে মাড হাউস যার দরজা, জানলা ও কাঠের স্তম্ভগুলো প্রত্যেকটি ই শিল্পময়। বাড়ির মালিক যে শিল্পী তা যেন প্রতি মূহুর্তে মনে পড়িয়ে দেয়। বহু বছরের পুরনো কাঠের স্তম্ভগুলো ইট দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে যা বছর পাঁচেক আগে এসে সুজন বাবু দেখেন নি। হয়তো বা দোতলার ঘরগুলোকে একটু মজবুত করার জন্য। কিন্তু সেই ইটগুলো ও বসানো  হয়েছে শিল্পীর মান রেখেই। এই মাড হাউসে মাঝে মাঝেই সিনেমার শ্যুটিং হয়। পাঁচ বছর আগে যখন প্রথম এসেছিলেন সুজন তখন শিল্পীর স্ত্রী ছিলেন এবং তাঁর স্বামীর শিল্পকর্মের কিছু অ্যালবাম ও দেখেছিলেন যেটা এবার হলো না উনি না থাকায়।
আসার পথে শক্তিগড়ে ব্রেকফাস্ট বেশ ভাল রকমের হওয়ায় লাঞ্চ করার তেমন ইচ্ছে হলোনা, গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পরা হলো সোনাঝুড়ির মেলায়। এই মেলার প্রধান আকর্ষণ আশপাশের গ্রাম থেকে আসা বিভিন্ন ধরনের শিল্পীর হাতের কাজের নমুনা। দেবদারু গাছ, ইউক্যালিপটাস গাছ ও নানাধরণের গাছের ফাঁকে ফাঁকে বসা এই মেলায় ঘুরে ঘুরে নানাবিধ জিনিস কেনা একটা দারুন অভিজ্ঞতা। কেউ বা বিক্রি করছে দই, কেউ বা গামছা আবার কেউ বা বসে আছে পেয়ারা, কামরাঙা বা কদবেল নিয়ে। আচারের তেলে মাখানো পেয়ারা খাওয়া এক বিরল অভিজ্ঞতা। কতরকমের জিনিস এই গ্রামীণ শিল্পীরা যে বিপণন করেন তার ইয়ত্ত্বা নেই এবং দামেও যথেষ্ট শস্তা। কলকাতা এবং অন্যান্য জায়গা থেকে বহুলোক এখানে আসেন ব্যবসার খাতিরে। বাউলরা আগে বসতেন বাঁশের মাচার উপর কিন্তু এখন সেগুলো ভেঙে দেওয়ায় তাদের মাটির উপর ত্রিপল বা প্লাস্টিকের চাদরে বসতে হয়। চারিদিকে নানান কলরব কিন্তু এর ই মধ্যে এই শিল্পীদের গান গাইতে হয়। আদিবাসী মেয়েরা সাধারণত হলুদ শাড়িতে সজ্জিত হয়ে তালে তালে নাচেন এবং কিছু আধুনিকারা তাঁদের সঙ্গে তাল মেলান। প্রথম দিন বাউলদের দেখা মিলল না, বেলাও বেশ বেড়েছে, যাওয়া হলো একজনের রেফারেন্সে আমোলি রেস্তোরাঁয়। গলি ঘুঁজি খুঁজে বের করা রীতিমতো কঠিন কাজ কিন্তু অবশেষে মিলল দেখা তাঁর এবং অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর এল বহু প্রতীক্ষিত কিছু বিশেষ খাবার যা সচরাচর সাধারণ রেস্তোরাঁয় পাওয়া যায়না এবং অবশ্যই তুলনায় দামী অন্তত ঐ জায়গার অনুপাতে। অবশ্য ওটা না হলে চলবেই বা কি করে। যাই হোক ওখান থেকে বিশ্বভারতীর ছাতিম তলায় পৌষ মেলার উদ্বোধনের আয়োজন দেখতে যাওয়া হলো কিন্তু সিকিউরিটি গার্ডের কাছে পাওয়া খবরে বিশেষ উৎসাহী হতে পারা গেলনা। ফিরে আসা হল গেস্ট হাউসে এবং সেখান থেকে ভোরবেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভেসে আসা আওয়াজে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো হলো। গা গড়িমসি করে উঠে জলখাবার খেতে বেশ দেরী হলো এবং কঙ্কালীতলার উদ্দেশ্যে যাওয়া হলো।  বেশ কয়েক বছর বন্ধ থাকার  পর ফের চালু হওয়া পৌষ মেলার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে নানান বিড়ম্বনায় পড়তে হলো ।পুলিশে  পুলিশে  ছয়লাপ । এদিকে রাস্তা খোলা  তো ঐদিকো
 বন্ধ । গাড়ি ছেড়ে  দিয়ে টোটোয় যাত্রা  পৌষ মেলার উদ্দেশ্যে । সেখানে ও কিছু জিনিসপত্র  কেনা হলো কিন্তু অসম্পূর্ণ কেনাকাটা সম্পূর্ণ করতে যাওয়া হলো ফের সোনা ঝুড়ির মেলায়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবার মতো, খাওয়া হলো রাম শ্যামের হোটেলে। ভেজিটেরিয়ান থালি ২০৫টাকা জি এস টি সমেত কিন্তু খাওয়ার গুণগতমান এবং আতিথেয়তা প্রশংসনীয়। খাওয়ার পর ছোটখাটো দুচারটে জিনিস কিনে ফেরার পথে চোখে পড়ল বাউলদের। সুজনের  অত্যন্ত পছন্দের জগন্নাথ দাস বাউলের সন্ধান পেয়ে নমস্কার করে প্রিয় গান"পরের জায়গা পরের জমিন ঘর বানাইয়া আমি রই, আমি তো এই জমির মালিক নই" শুনে মনটা ভরে গেল। বাঁ হাতে একতারা, ডান হাতে মাঝে মাঝে তবলা বা ম্যারাকাশ এবং পায়ে ঝুমুর এবং গলায় দরদ ভরা গান এক আলাদা মাত্রা নিয়ে আসে। নাতি, নাতনী ও ছেলের সঙ্গে আলাপচারিতার মাঝে আরো খান চারেক গান শোনালেন জগন্নাথ দাস বাউল এবং ফিরে আসা গার্ডেন বাংলোয়।

পরের দিন সকাল বেলায় ফিরে আসার পালা। বোঁচকা বুঁচকি সব বাঁধা ছাঁদা শেষ। ব্রেকফাস্ট সারা হয়ে গেছে, মালপত্র গাড়িতে উঠে গেছে, সবাইকে বিদায় জানিয়ে অবশেষে ফেরার পালা। কিন্তু বনলক্ষ্মী তো যাওয়া হলোনা। বিভিন্ন রাস্তা বন্ধ, ঘুরে ঘুরে পৌঁছানো গেল বনলক্ষ্মীর দ্বারে। প্রবেশ পথ একটা বাঁশ দিয়ে আটকানো। গাড়ি পৌঁছাতেই কয়েকটি বাচ্চা ছেলেমেয়েরা ছুটে এল, কারণ জিজ্ঞেস করতেই জানালো তারা সরস্বতী পুজো করবে, তার জন্য চাঁদা চাইছে তারা। কয়েকজন গাড়িওয়ালা খুব বকাবকি করায় ওই শিশুদের মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। কয়েকটা গাড়ির পিছনে থাকা সুজনের নজর সেটা এড়ায়নি। বছর দশ এগারোর ছেলেমেয়েদের এমনভাবে বকুনি দেওয়াটা সুজনের একদমই পছন্দ নয়। মনে পড়ে গেল তার নিজের শৈশবের কথা। শিব পূজোর চাঁদা তুলতে গিয়েছিল সে তার বন্ধুদের সঙ্গে কলেজের মেন হোস্টেলে। কলেজের  পড়ুয়া ড়্গলল্লছাত্ররা প্রথমে তাদের একটা ঘরে বন্ধ করে দিয়েছিল। তারপর কান্নাকাটি করায় তাদের ছেড়ে দিয়েছিল কিন্তু কয়েকটা গান শোনানোর পরে। সুজন সেই সময় খান চার পাঁচেক করার পর ছাড়া পেয়েছিল কিন্তু কয়েকজন ছাত্র যারা একটু কষ্ট পেয়েই হোক বা সহানুভুতিশীল হয়েই হোক একটাকা সাড়ে দশ আনা চাঁদা তুলে দিয়েছিল। তখন সুজন কান্না ভুলে টাকাটা পকেটে ভরে নিয়েছিল।  একটা একটা করে গাড়ি ঢুকছে আর বেরোচ্ছে। ছেলেমেয়েগুলো  একটু দমে গিয়ে পাশেই এক্কা দোক্কা খেলতে শুরু করে দিল। অনেকদিন পর এই খেলাটা দেখে সুজন আবার শৈশবের গভীরে ডুব দিল। আগে তো সেও তার দিদিদের সঙ্গে এক্কা দোক্কা খেলেছে এবং নিজেদের বন্ধুদের সঙ্গে পিট্টু বা গাদন খেলেছে। সবকিছুই মনে পড়ে যাচ্ছে। অবশেষে তাদের গাড়ি ঢুকলো। ও প্রথমে বনলক্ষ্মীর ভেতরে ঢুকল না এবং বাচ্চাদের খেলা দেখতে লাগলো। বছর দশেকের একটি ছিপছিপে চেহারার কোঁকড়ানো চুলের মেয়ের দিকে চোখ পড়ে গেল। কি অপূর্ব সুন্দর রূপ দিয়েছেন ভগবান তাকে। তার নাতনির থেকে বছর খানেক বড় হবে হয়তো, তার সঙ্গে আরো একটি  দীঘল চোখের মেয়ে। সুজন তাদের ডাকলো এবং নাম জিজ্ঞেস করল ও কোন স্কুলে ও কোন ক্লাসে পড়ে জিজ্ঞেস করল। একজন ক্লাস ফোর থেকে ফাইভে উঠবে আর অন্যজন ফাইভ থেকে সিক্সে। ছেলেরাও এগিয়ে এসে বললো, " আঙ্কেল,আমরা সরস্বতী পূজো করব, আমাদের একটু চাঁদা দেবেন?"
"নিশ্চয়ই দেব" বলে জিজ্ঞেস করলেন কত দিতে হবে। ওরা জানালো পাঁচ টাকা,দশ টাকা যা হোক। সুজন ওদের একটা একশো টাকার নোট দিয়ে বললো যে এটা এই গাড়ির তরফ থেকে। ওরা তো খুব খুশি। সবাই ঘিরে ধরেছে ওঁকে। হঠাৎ ই একটা মোটর সাইকেলে স্বামী ও স্ত্রী বনলক্ষ্মী থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে ওরা তাদের কাছে চাঁদা চাইল। ওরা বললো," আমরা মুসলমান, আমরা পূজোর চাঁদা দিই না।" ঐ বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মধ্যে যে সবচেয়ে বড় সেই সুদীপ সরকার ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে উঠবে সুজনকে এসে সরাসরি জিজ্ঞেস করলো, " আঙ্কেল, মুসলমানরা কি পড়াশোনা করেনা?" সুজন প্রায় বোল্ড আউট, বাঁচিয়ে দিল তাদের ই ড্রাইভার আলম ভাই। উনি বললেন, যে চাঁদা না দেওয়ার বাহানায় উনি এইরকম কথা বলেছেন। আমি ও তো মুসলমান, আর ইনি হচ্ছেন আমার দাদা। আমিও তো আমার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছি। মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকল সুদীপের প্রশ্নটা। তাঁর সঙ্গে ও তো পড়তো কুদ্দুস, আকবর, মোর্শেদ, রিয়াজুল, সফিকুল ও রফিকুল রা। তারা তো ওঁর সঙ্গে দূর্গাপূজো, সরস্বতী পুজোর চাঁদা তুলতো, কোনদিন তো এইধরণের প্রশ্ন ওঠেনি, তবে আজ কেন? কেন এই রাজনৈতিক নেতারা মানুষের মনের মধ্যে বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছেন যাতে এই শিশুদের মনটাও কলুষিত হয়ে যায়? বনলক্ষ্মীর দ্বারে এসে নিজেকেই হারিয়ে ফেললেন সুজন, ধীরে ধীরে বৌমা, নাতি নাতনিদের ডেকে গাড়িতে উঠে পড়লেন।

Tuesday, 16 December 2025

"সম্রাটের সম্রাট দর্শন"

ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই দেখা যায় একজন রাজা বা সম্রাট আরও একজন রাজা বা সম্রাট(তিনি যত ই ছোট মাপের হ'ন না কেন) তাঁকে যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদর্শন করেন। মহাভারতে বা অন্য বিদেশী সাহিত্যেও এর প্রচুর নিদর্শন রয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে যেখানে এক দেশের রাজা আর এক দেশ আক্রমণ করেছেন এবং বিজয়ী  হয়েছেন সেক্ষেত্রে অবশ্য আলাদা ব্যাপার। সেখানে পরাজিত রাজাকে বন্দী করে অমানুষিক অত্যাচার করে মেরে ফেলা হয়েছে এবং সমস্ত রকমের লুণ্ঠন করা হয়েছে কিন্তু অবশ্যই তার ব্যতিক্রম ও আছে। যেমন আলেকজাণ্ডার পুরুকে পরাজিত করার পর যখন জিজ্ঞেস করেন তিনি তাঁর কাছে কি রকম ব্যবহার আশা করেন যার উত্তরে রাজা পুরু উত্তর দেন একজন রাজার প্রতি আরেকজন রাজার ব্যবহার। তাঁর এই নির্ভীক উত্তরে আলেকজান্ডার খুশী হয়ে তাঁর রাজ্য ফিরিয়ে দেন এটাই আমরা জেনেছি। আজকের দিনে ও পৃথিবীর মহাশক্তিধর রাষ্ট্রের নেতার ব্যবহার আর একজন ক্ষুদ্র দেশের প্রধানের প্রতি সেই ইঙ্গিত বহন করে। মাঝে মাঝে বড় দাদার মতো ছোট ভাইকে ডেকে এনে কান মলে দেওয়ার মতো ভর্ৎসনা করার নিদর্শন ও কিন্তু আছে যদিও সেটা সংখ্যায় নিতান্তই কম।

সম্রাট যার ভাল নাম সেই নীলু গেছে বাবার সঙ্গে চিড়িয়াখানায়। ছোটবেলা থেকেই নীলু ছিল একটু বেশি পরিমাণেই অনুসন্ধিৎসু এবং ছোটখাটো সব বিষয়েই ওর মনোযোগ ছিল নজরে পড়ার মতো। নীলুদের বড় বাড়ির মাঠে ও বাগানে ছিল নানাধরনের গাছগাছড়া এবং ফুলের গাছ।  রঙ বেরঙের প্রজাপতিগুলো একফুল থেকে অন্য ফুলে নাচতে নাচতে চলে যায় আর নীলু কিন্তু একদৃষ্টে নজর করে যে প্রজাপতিগুলো একটা ফুলের উপর তার দুটো ডানা সোজা উপর করে ত্রিভুজাকৃতি ধারণ করে আবার মাঝেই ডানা দুটো ছড়িয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে নাড়াতে নাড়াতে কখন আরও একটা ফুলের উপর বসার আয়োজন করে।  ফড়িংগুলোর বসার  ধরণ একটু অন্য রকম, তারা মাঝে মাঝেই তাদের নিম্ন ভাগ উপর থেকে  নীচের দিকে বাঁকায় এবং তারপরেই টুক করে অন্য জায়গায় ধাওয়া করে। ছোট থেকেই ওর মৃৎশিল্পের উপর একটা আলাদা ভালবাসা ছিল। বাড়ির কাছে থাকা প্রতিমা শিল্পী বসন্ত এবং কার্তিকের বাড়ি ওকে খুঁজে  পাওয়ার একটা জায়গা ছিল। ওর বয়সী ছেলেরা যখন এদিকে ওদিকে ছুটোছুটি করে খেলা করে নীলু তখন একদৃষ্টিতে দেখে মা দূর্গার মূর্তি তৈরি করা বিশেষ করে সিংহ কি করে অসুরকে আক্রমণ করছে সেটা দেখা। মাঝে মাঝেই ওর নিজের আইডিয়াটাও বলতো বসন্ত বা কার্তিকের কাছে। ও মনে মনে নিজেই প্রতিমা গড়তো এবং ওর ছোট ছোট পেলব নরম আঙ্গুলের ছোঁয়ায় গড়ে উঠত মা দূর্গা বা মা কালীর মূর্তি এবং কেউ ধারণায় আনতে পারতো না যে এটা কোন পাকা শিল্পীর সৃষ্টি নয়। নীলুর শৈশবটাই ছিল শিল্পময়। এহেন নীলুর চিড়িয়াখানা দর্শন ওর  মনে এক বিশেষ প্রতিফলন ফেলল। কেশরধারী সিংহকে দেখে ওর মনে একটা আলাদা অনুভুতির সঞ্চার হলো। ঐরকম যদি একটা সিংহ ওর বন্ধু হতো, ঐ পশুরাজ সমস্ত পশুর সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দিত যে এই নীলু আমার বন্ধু, ও এই বনের মধ্যে যখন ইচ্ছে আসবে যাবে, ওর যেন কোন ক্ষতি কেউ না করে। নীলুর বুকটা দারুণ ফুলে উঠল। সেই সিংহের প্রতি ওর আকর্ষণ যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল। প্রতিভাশালী সৃষ্টিশীল নীলু বড় হয়েছে কিন্তু মনের নিভৃতে সেই সিংহের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার ইচ্ছেটা কিন্তু যায়নি। ভাল চাকরি করার সুবাদে একদিন ও চিড়িয়াখানার অধিকর্তার সঙ্গে দেখা করে ওর মনের ইচ্ছার কথা বলল। উনি শুনে তো খুব খুশি। তিনি বললেন যে আপনার মতো অনেকেই যদি এগিয়ে আসেন এই পশুপাখিদের সংরক্ষণের ব্যাপারে তাহলে তো সত্যিই সেটা খুব আনন্দের। আমরা চাই আরও বহু মানুষ এই ব্যাপারে এগিয়ে আসুন। কথাবার্তা সব পাকা, মাসে বার হাজার টাকা লাগবে ওই সম্রাটের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য । নীলুও সম্রাটের জন্য এই টাকার ব্যয়ভার বহন করতে রাজি। এরপর ই হল একটা বিপত্তি। মোটরসাইকেলে আসার সময় একটা কুকুরকে বাঁচাতে গিয়ে সাঙ্ঘাতিক এক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলো এবং দীর্ঘ সময়ের অপারেশনের পর নীলু বা সম্রাট সুস্থ হয়ে উঠল কিন্তু এর মধ্যেই বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েই ছুটল সেই চিড়িয়াখানার অধিকর্তার সঙ্গে দেখা করতে এবং সেই সিংহটি যার নাম ও সম্রাট তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সই সাবুদ করতে। চিড়িয়াখানার অধিকর্তা সুদর্শন বাবু নীলুকে দেখেই চিনতে পারলেন এবং বললেন," সম্রাট বাবু, কি হয়েছিল আপনার, সেই গেলেন আর এতদিন পরে এলেন, কি ব্যাপার?" নীলুর কাছে সমস্ত ঘটনা জানার পর তিনি একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন," সরি , সম্রাট বাবু, এযাত্রায় আপনার ইচ্ছা পূরণ করতে পারা গেল না কারণ আমাদের সেই সিংহটি যার নাম ও সম্রাট ছিল সে মারা গেছে।"  এক রাশ যন্ত্রণা বুক ঠেলে এগিয়ে এল, ছলছলে চোখে কোন রকমে অশক্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে এসে গাড়ির মধ্যে চুপ করে বসে থাকলো। ড্রাইভার তো হতভম্ব। খানিকক্ষণ পরে জিজ্ঞেস করল, " নীলু দা, শরীরটা ঠিক আছে তো?"
নীলু কোন উত্তর না দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে ইশারা করল স্টার্ট করার জন্য।

Saturday, 13 December 2025

"অথ মার্জার কথা"

 মার্জার বা বিড়ালকে অনেক লোক যেমন ভালবাসেন তেমন ই অনেক লোক মনে প্রাণে ঘৃণা করেন। কেউ কেউ আবার বিড়াল দেখলে ভয়ে সিঁটিয়ে যান, যতক্ষণ তাকে না সরানো হবে ততক্ষণ সে ঐ পথ ই মারাবে না।ভয়ানক জ্বালা। কোন কোন মানুষ আছেন যাঁদের পশুপাখিদের প্রতি স্বাভাবিক ভালবাসা আছে এবং সুযোগ পেলেই তাঁরা এদের খাবার দিয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করেন আবার উল্টোদিকে কেউ কেউ তাদের খাবার তো দেন ই না উপরন্তু অন্য কেউ দিলে রে‌রে করে তেড়ে আসেন এবং নানাভাবে তাদের সমালোচনা করেন এবং খাবার দিয়ে নোংরা করছেন জায়গাটা বলেও গালমন্দ করতে ছাড়েন না। মাঝে মাঝে সমাজ মাধ্যমে লেখালেখি করে জনমত গড়ে তুলে এমনকি থানা পুলিশ পর্যন্ত ও গড়ায়। এঁদের মধ্যে কয়েকজন এমন নাক উঁচু লোক আছেন যাঁদের এইসব ব্যাপারস্যাপারগুলো beneath dignity বলে মনে হয়। অথচ এঁরাই জনসমক্ষে এমন বেশভূষা করে বেরোন যে লোকজন তাদের দেখেন ই না আবার হঠাৎ চোখ পড়ে গেলেও নিজেরাই অপ্রস্তুত হয়ে যান। কিছু তো বলা যাবেনা, ব্যক্তি স্বাধীনতায় আঘাত বলে কথা। এঁরা মাঝে মাঝেই কথায় এমন খই ফোটান যেন মনে হয় কত ই না রুচিশীল ব্যক্তি এঁরা কিন্তু একটু গভীরে খোঁজাখুঁজি করলেই দেখা যাবে যে এদের অনেকেই চরম অসৎ এবং তাঁদের ঐ খারাপ দিক ঢাকতেই তাঁরা এরকম আচরণ করেন।

এবার মূল বিষয়ে ফিরে আসা যাক। মার্জারকুল কিন্তু ভীষণ সুন্দর। তাদের আচার আচরণে রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। সবাই একটু ভালবাসা পেতে চায়। একটু আদর করে খেতে দিলে কি আর এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়? রাস্তা ঘাট নোংরা হয়ে যায় এইরকম সমালোচনার তীর প্রায়শই ছুটে আসে অথচ আমরা যেন ধোয়া তুলসী পাতা। আমাদের দ্বারা কোনরকম দূষণ হচ্ছে না এইরকম গ্যারান্টি কি আমরা দিতে পারি? গাড়িতে যেতে যেতে পথে ঝালমুড়ি ( ভুল হয়ে গেল, এঁরা তো  রাস্তায় পাতি লোকের কাছে ঝালমুড়ি কিনলে এঁদের মানসম্ভ্রম মাটিতে মিশে যাবে)/ মঞ্জিনী বা মিও অ্যামোরের চিকেন প্যাটিস বা রোল কিনে খাওয়া শেষে প্যাকেটটা রাস্তায় ফেলে দিয়ে নোংরা করেন না? খুব কম লোকই আছেন যাঁরা বাক্সটিকে সযত্নে রেখে দিয়ে নিকটবর্তী কোন ডাস্টবিনে ফেলে দেন। এঁদের কথা তবু একটু হজম করা যায় কিন্তু বেশিরভাগ লোকই সমালোচনা করতে হয় ভেবে করেন। তাঁদের কাছে পশুপাখিদের প্রতি ভালবাসা দেখানো একটা অপরাধ বা স্রেফ ন্যাকামো বলে মনে হয়।

আমি সেই ন্যাকার দলের একজন।  কথায় আছে ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায় কিন্তু আমি ন্যাড়ার ও অধম। আমি দু দুবার কুকুরের কামড় খেয়ে চোদ্দটা করে আটাশটা ইঞ্জেকশন নেওয়ার পরেও আমার হুঁশ হয়নি এবং এখনও আমি মনেপ্রাণে পশুপাখিদের ভালবাসি এবং সুযোগ পেলেই একটু আদিখ্যেতা দেখাই। এতে প্রচুর গনগনানি শুনতে হয় কিন্তু আমি তখন কালা ও বোবা। ছাদ সারানোর কাজ সবে শেষ করে মিস্ত্রিরা চাবি দিয়ে গেছে আর আমিও কেমন কাজটা করলো দেখতে গেছি। কখন পিছন পিছন একটা সাদা বিড়াল আমার সঙ্গ নিয়ে পিছু পিছু দেখতে এসেছে খেয়াল করিনি। আমি এদিক সেদিক দেখছি আর মোবাইলে ফটো তুলছি। হঠাৎ কা কা করে অনেকগুলো কাকের আওয়াজে সচকিত হয়ে ভাবছি কোন কাকের বাসা টাসা রয়েছে আর আমাকে দেখে চেঁচামেচি শুরু করেছে। কাকের ঠোকর যাতে না খেতে হয় এইভেবে যেই না পিছন ফিরে চলে আসার চেষ্টা করছি, দেখি সেই সুন্দরী মার্জার আমার পিছনে আর তাকে দেখেই বায়সদের এত আর্তনাদ। তাকে নামানোর চেষ্টা  অনেক ক্ষণ ধরে করার পরে বিফল হয়ে ফিরে এলাম। তিনি তো এলেন ই না উপরন্তু একটু জেদাজেদি করাতে তিনি পাশের বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিলেন এবং ফিরে এলাম। ছাদের দরজা খোলা রাখা যায়না বলে বন্ধ করে এলাম কিন্তু মনটা খচখচ করছে। একজন খুব কাছের প্রতিবেশীকে ফোন করে জানতে পারলাম যে তিনি নেই এবং তাঁর নিদান অনুযায়ী দরজা খুলে রেখেই খানিকক্ষণ এদিক ওদিক পায়চারি করলাম কিন্তু তাঁকে আর দেখা গেল না। ঠাণ্ডা টা বেশ বাড়ছে, নাক দিয়ে জল পড়াতে আরও বেশী মনে হচ্ছে, খানিকক্ষণ থাকার পরে আবার বন্ধ করে চলে এলাম। মনটা একটা ভীষণ অপরাধ বোধে ভুগছে যে এই ঠাণ্ডায় বিড়ালটা না কিছু খেতে পাবে না কোন আশ্রয় পাবে জলের ট্যাঙ্কের নীচে ছাড়া। ফের রাত দশটা নাগাদ গিয়ে আরো একবার টর্চ জ্বেলে খোঁজ করেও কিছু লাভ হলোনা মাঝখান থেকে আমার নাক দিয়ে জল পড়ার মাত্রা বেড়ে গেল। রাতে ঠিক ঘুম ও হলোনা, সকালে উঠেই আরো একবার দেখতে গেলাম কিন্তু না, এবার ও দেখা পেলাম না। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। একটা অপরাধবোধ মনটাকে কুড়ে কুড়ে খেতে লাগল কিন্তু কিছু করার ও নেই বলে মনটাকে সান্ত্বনা দিলাম।

এরমধ্যেই নয় নয় করে চারটে দিন কেটে গেছে। ব্যালকনিতে বসে খবরের কাগজ পড়ছি। হঠাৎ ই চোখ পড়ল সামনে পার্কিং করা বড় কালো গাড়িটার দিকে। একজন লোক নীল জ্যাকেট পড়ে কারও জন্য অপেক্ষা করছে। একটু বাদ বাদ ই ঘড়িটা দেখছে আর মোবাইলে কাউকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। হঠাৎ করেই সেদিনের ঐ সাদা বিড়ালটার মতো একটা বিড়াল লোকটির দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। মুখের দিকে চেয়ে অস্ফূট স্বরে ম্যাও ম্যাও করছে। আমার মনে হলো সেদিনের বিড়ালটাই এবং বেশ খানিকটা আশ্বস্ত বোধ করলাম যে অন্তত আমার জন্য বিড়ালটা মারা যায়নি। মনটা বেশ হালকা লাগছে। বিড়ালটা অনেকক্ষণ দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর লেজটাকে উঠিয়ে লোকটার পায়ের কাছে নিজের গা টা ঘষতে থাকলো। তারপর তড়াক করে লাফ দিয়ে গাড়ির বনেটে উঠে পড়লো। এইবার বেশ স্পষ্ট দেখতে পেলাম যে হ্যাঁ, ইনিই তিনি। লোকটা কথা বলার ফাঁকে ফাঁকেই বিড়ালটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো আর বিড়ালটাও বেশ আদর খেতে লাগলো। বুঝতে অসুবিধা হলোনা যে এটা কারো পোষা বিড়াল। আরও একটা জিনিস ভেবে খুব ভাল লাগলো যে হয়তো এখনও কিছু পাগল রয়েছে যাদের জন্য পৃথিবীটা এখনো পর্যন্ত নীরস হয়ে যায় নি।

Thursday, 13 November 2025

তবে কেমন হতো?

চারিদিকে আলোড়ন পড়ে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে, এবার সাধারণ মানুষের বুদ্ধি শুদ্ধি আর লাগবেনা, স্কুল কলেজ আর যেতে হবেনা, বাড়িতে বসেই রোবটের কাছে সব ঠিকঠাক উত্তর পেয়ে যাবে। অভিভাবকরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি নিয়ে চিন্তা করার দিন শেষ। স্কুল, কলেজের আর দরকার নেই, শিক্ষক শিক্ষিকার দরকার নেই, খরচাপাতি করে একটা বেশ ভাল জাতের রোবট কিনলেই সব হ্যাপা গেল মিটে। বাচ্চাদের স্কুলের বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না, স্কুল ই নেই তো কিসের বাস। বাড়িতে বাচ্চাদের পড়াতে বসানোর ঝামেলা নেই, টাকা রোজগার করো আর মস্তি করো। কিন্তু চাকরিও তো সহজে মিলবে না কারণ সেই রোবটের জয়জয়কার। কোম্পানিগুলো রোবট কিনেই লোকজনদের হটাবে। জিন্দাবাদ ধ্বনিতে আর কান ফাটবে না, আঙুলে গোনা দুচারটে লোক যারা থাকবে তারাও সবসময়ই কি হয় কি হয় ভেবে চিন্তিত থাকবে, বসের কথা না শুনলেই দাঁড় করানো রোবটের দিকে আঙুল দেখাবে। ভারী ঝামেলা হলো , তাই না?  লেখকরা আর নাটক লিখবেন না, প্রেমের গল্প --- সে তো কবে শেষ? প্রেম করার মতো সময় কোথায়? বেশ কয়েক বছর আগেও লেকটা বেশ খোলামেলা ছিল যেটা এখন ঘেরাটোপে বন্দী হয়েছে। কিছুদিন পর হয়তো লেকের হাওয়া খেতে গেলেও ট্যাঁক থেকে পয়সা বের করতে হবে। ধরা যাক, লেকের চারপাশে লোহার রেলিং নেই এবং সন্ধ্যে হয়ে যাবার পরেও প্রেমিক প্রেমিকার পাশে বসে থাকাটা ও পুলিশ বেশ সহানুভূতির চোখেই দেখে। একদিকে একটা ছেলে ও মেয়ে এবং তার থেকে আর একটু দূরেই আরেকটি মেয়েও তার একটি মানুষ রূপী রোবট বন্ধু ( যাকে মেয়েটি সত্যি সত্যিই মানুষ বলে ভেবেছে) বসে গল্প করছে। প্রথম জুটি লেকের জলে পূর্ণিমার চাঁদের গ্রহণ লাগার রূপটা দেখছে। ধীরে ধীরে চাঁদটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আসতে দেখে পাশে বসে থাকা বন্ধুকে বলে উঠল,
" দেখ, দেখ চাঁদটাকে কি সুন্দর লাগছে , তাই না?" ছেলেটি মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পাশে বসে থাকা বান্ধবী ও জলে চাঁদের প্রতিবিম্বের প্রতি। অস্ফূট স্বরে বলে উঠল হুঁ। অদূরে বসে থাকা দ্বিতীয় যুগলের মেয়েটিও বলে উঠল এক ই কথা কিন্তু উত্তর পেল হ্যাঁ, আজ চন্দ্রগ্রহণ ,আজ পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মধ্যে  চলে আসায় এ ছায়াটা পড়েছে, এতে আশ্চর্য হবার কি আছে? মেয়েটা বলে উঠল,
"হ্যাঁ, সে তো জানি, কিন্তু কি সুন্দর লাগছে, তাই না?" উত্তর এল, যতখানি ছায়া পড়েছে, ততটাই জলে দেখা যাচ্ছে, তার বেশীও নয়, কম ও নয়। মেয়েটার মনটা বিরক্তিতে ভরে গেল। এদিকে প্রথম যুগলের প্রেম বেশ ঘনিয়ে উঠেছে, একে অপরের প্রতি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মেয়েটির মন তিক্ততায় ভরে গেছে, বলল এবার ওঠা যাক।
মনে পড়ে গেল স্কুলে বিটি পড়তে আসা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস নেওয়ার একটা ঘটনা। একজন স্যার এসেছেন একটা ক্রাচ নিয়ে বাংলার ক্লাস নিতে। পড়াবেন কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের "হাট" কবিতাটি। পিছনে বসে আছেন বিটি কলেজের প্রিন্সিপাল এবং এক্সটারনাল একজামিনার। স্যার কবিতাটি পড়াতে পড়াতে যেন এক অন্য জগতে চলে গিয়েছিলেন। পিছনে বসে থাকা দুজন একজামিনার সবার অলক্ষ্যে কখন চলে গেছেন কেউ জানেনা আর আমরাও সেই নাম না জানা স্যারের পড়ানোয় একদম মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সমস্ত স্যাররাই যদি এইভাবে পড়াতেন তাহলে পড়াশোনা করার ভীতিতে এত ছেলেমেয়েরা স্কুল ড্রপ আউট হতো না। এখন সেই স্যারের জায়গায় ধরা যাক একজন রোবট ঐ কবিতাটি পড়াচ্ছেন। কি রকম পরিস্থিতি হবে একটু কল্পনা করা যাক।
দূরে দূরে গ্রাম দশ বারোখানি মাঝে একখানি হাট, 
সন্ধ্যায় সেথা জ্বলে না প্রদীপ, প্রভাতে পড়েনা ঝাঁট। 
রোবট স্যার বলবেন, প্রত্যেক গ্রামে তো এক একটা হাট বসতে পারে না কারণ কটাই বা লোক থাকে একটা গ্রামে। যদি ক্রেতার সংখ্যা বেশি না হয় তবে হাট বসবে কেন? আর সেই কারণেই দশ বারোটা গ্রামের মাঝেই একটা হাট বসে। বেচাকেনার শেষে লোকজন চলে গেলে কে ই বা সন্ধ্যে প্রদীপ জ্বালবে আর কে ই বা সকালে ঝাঁট দেবে? সম্পূর্ণ সত্যি কথা কিন্তু মনটা কি ভরে উঠবে?  কবিতা তো শুধু কথাবার্তার কচকচানি  নয়, এর মধ্যে আছে ছন্দ, ভাব আর এটার অভাব ঘটলে সেটা কবিতা হবেনা,  হবে শব্দবন্ধের প্রতিফলন। জানিনা ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ভাব ভালবাসার ও উন্মেষ হবে কিনা। যদি এটাও হয়ে যায় তাহলে আর মানুষের দরকার কি? মানুষ থাকলেই তার খাওয়া পড়া, শিক্ষা দীক্ষা, রোগভোগের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল কিছুই দরকার হবেনা। মন দেওয়া নেওয়ার কোন ব্যাপার নেই। বোমা ফাটিয়ে নিশ্চিহ্ন করার দরকার নেই, দলাদলির দরকার নেই, রাজনৈতিক নেতাদের দরকার নেই, শুধু থাকবে হৃদয়হীন রোবট আর দেশ চলবে ড্যাং ড্যাং করে।
কেমন হবে তাহলে?

Friday, 7 November 2025

ভ্রমণ পিপাসু বাঙালি

"বাসনার সেরা বাসা রসনায়" কোথায় যেন পড়েছিলাম। গ্যাসে, অম্বলে ভোগা বাঙালি রান্নাঘরে অনেক সময় ব্যয় করে এই রসনায় পরিতৃপ্ত হওয়ার জন্য। আরও একটা বিলাসিতা আছে বাঙালির , একটু ফাঁক পেলেই ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়া সে ট্যাঁকের রেস্ত যাই হোক না কেন। দুপুর বেলায় একটা ছোট্ট করে ভাত ঘুম ও বাঙালির আরো এক বিলাসিতা। এইসব নানা বিলাসিতায় ব্যস্ত এক পাঁচমিশালি বয়সের গ্রুপ যার আক্ষরিক নাম সান্ধ্যবাসর হঠাৎ ই চঞ্চল হয়ে উঠল কোথাও বেড়াতে যাওয়ার জন্য। সব গ্রুপেই কোন কোন অত্যন্ত অভিজ্ঞ লোক থাকেন যাঁরা এই বেড়াতে যাওয়ার খুঁটিনাটি সব কিছুই মাথায় রাখেন এবং কার কিসে সুবিধা, অসুবিধা সমস্ত জিনিস মাথায় রাখেন এবং অযথা বেশি কথা না বলে সুন্দর নিটোল ভাবে প্রোগ্রামটা সাজিয়ে রাখেন কিন্তু এই সাজানোর আগে গণতান্ত্রিক উপায়ে সকলের মতামত নেন এবং যাতে সবাইকে মোটামুটি একটা সন্তোষজনক ভাবে খুশী রাখা যায় সেই চেষ্টা আপ্রাণ করেন। গ্রুপে কিছু লোক থাকেন যাঁরা এই প্রোগ্রামের সার্থক রূপায়ণের জন্য প্রচণ্ড পরিশ্রম করেন এবং সবার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন। বাকিদের কেউ কেউ রসিকতা করে প্রোগ্রামটা জমজমাট রাখার চেষ্টা করেন এবং কিছু লোক রসিকতার খোরাক হয়ে অন্যদের বিনোদনে সাহায্য করেন। আর বাকিরা মাঝেমধ্যে ফোড়ন কেটে সর্বাত্মক সাফল্যে সহায়তা করেন।
সান্ধ্যবাসরে আলোচনা হতে থাকল কোথায় যাওয়া যায়। উঠে আসতে থাকে একের পর এক প্রস্তাব। শেষমেষ ঠিক হলো দক্ষিণ রায়ের জমিদারিতে গেলে মন্দ হয়না। শান্তিনিকেতনে সোনা ঝুড়ির মেলায় বাউলের কাছে শোনা গান " পরের জায়গা, পরের জমিন, ঘর বানাইয়া আমি রই, আমি তো এই জমির মালিক নই" মনে পড়ে গেল। দক্ষিণ রায়ের মুলুকে যাওয়া হবে অথচ দক্ষিণ রায়ের কোন মত নেওয়া হলোনা। অনেক সাতপাঁচ ভেবে যাত্রা স্থির হলো। মত নেওয়া হলে জমিদার বাবু হয়তো দর্শন দিতেন আর তাঁর অমতে গিয়ে দর্শন প্রার্থী হলে তিনি দেখা দেবেন কিনা সেটা তাঁর একান্তই মর্জির উপর নির্ভর করছে। যাই হোক, ক্যাপ্টেনের ঘুঁটি সাজানো শুরু হলো। পারফেক্ট প্ল্যানিং শুরু হলো নীরবে এবং তার রূপায়ণ সার্থক হলো এই দ্বিতীয় সারিতে থাকা বিশেষ কয়েকজনের অমানুষিক পরিশ্রমের ফলে। যাতায়াতের সুন্দর ব্যবস্থা, মাঝপথে একটু পেট পূজোর ব্যবস্থা এবং খাওয়া দাওয়া ও বিনোদনের সমস্ত ব্যবস্থা করা প্ল্যানিং এর এক অঙ্গ বিশেষ এবং সমস্ত যাত্রার সফল রূপায়ণ দলের অন্য সমস্ত সদস্য ও সদস্যার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফল।
নভেম্বরের ৫ তারিখে সকাল সাড়ে ছটায় বিরাট লাক্সারি বাস এসে গেছে এবং সান্ধ্যবাসরের অধিকাংশ লোকই এসে গেছেন চাকা লাগানো স্যুটকেস নিয়ে এবং কাঁধে একটা ছোট্ট ব্যাগ যেটা টুকিটাকি দরকারি জিনিসে ভরা। সকাল সাতটায় নধরকান্তি বাসটা একটু যেন নড়ে উঠলো আর শুরু হলো দক্ষিণ রায়ের জমিদারির উদ্দেশ্যে যাত্রা। ঘন্টা দেড়েক চলার পরে এল চা খাওয়া এবং হাত পা ছাড়ানোর জায়গা মালঞ্চের  কাছে নোনা মাটির রেস্তোরাঁ। সেখানে আগে ভাগে বলে রাখা লুচি, আলুর তরকারি ও বিশেষ ভাবে অর্ডার দেওয়া দরবেশ সকলের পেট ও মন জয় করে নিল এবং পরে গরম চা শরীর ও মনকে তরতাজা করে তুলল। আবার যাত্রা শুরু, ফের ঘন্টা দেড়েক চলার পর এল গদখালি। সেখানে নেমে মালপত্র কুলির মাথায় চাপিয়ে  লঞ্চের উদ্দেশ্যে যাত্রা। নীচের ডেকে মালপত্র ও উপরের ডেকে বর্ষীয়ান ও বর্ষিয়সী সদস্য ও সদস্যাদের একে একে তুলে লঞ্চ চলতে শুরু করল দক্ষিণ রায়ের জমিদারির উদ্দেশ্যে। তখন চলছে ভাটার টান , তাই পোঁছাতে লাগল দেড় ঘন্টার উপর। এদিক সেদিক বাঁক নিয়ে পৌঁছে গেল দুলকি জে এফ এম সি দ্বীপে যেখানে রয়েছে হোটেল সোনার বাংলা এবং সেখানেই আমাদের থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে। মালপত্র ও বয়স্ক সদস্য ও সদস্যাদের ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে বা এয়ারপোর্টে চলা মোটরগাড়িতে চাপিয়ে এবং মালপত্র পাঠিয়ে দিয়ে বাকিরা পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেল অনতিদূরে অবস্থিত হোটেলে। চেক ইন করে সমস্ত মালপত্রে লাগানো স্টিকার অনুযায়ী নির্ধারিত ঘরে এবং হাতমুখ ধুয়ে এসেই রেস্তোরাঁয় বসে খেয়ে নেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে সুইমিং পুলে জলের মধ্যে দাপাদাপি করা। সবাই তো আর সাঁতার জানেন না, তাঁরা অন্যদের দাপাদাপি দেখে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে নিলেন এবং অনেক ছবি মোবাইলে ধরে রাখলেন। এরপর যে যার রুমে চলে গেলেন এবং সন্ধ্যে বেলায় হাই টিতে অংশ গ্রহণ করে স্থানীয় অধিবাসীদের নৃত্য পরিবেশনায় সময় কাটাতে যাওয়া হলো। তাদের সঙ্গে আমাদের ও কয়েকজন নাচ গানে মাতিয়ে দিল। এরপর ই একটা মজার ঘটনা ঘটল। হোটেল সোনার বাংলা বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে অনেকগুলো ব্লক তৈরী করেছে। সবকটা ব্লক দোতলা এবং উপর নীচ করে চারটে করে ঘর আছে অর্থাৎ ছোট গ্রুপ হলে একটা ব্লকেই সীমিত থাকবে এবং অন্য কোন লোকের উপস্থিতি থাকবে না আর বড় গ্রুপ হলে দুটো তিনটে ব্লকেই আবদ্ধ থাকবে। আমাদের পঁচিশ জনের গ্রুপে সবাইকেই দোতলায় রাখতে গিয়ে বেশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে হয়েছে। ঝুমুর নাচ দেখে ঘরে ওষুধ খাওয়ার জন্য একাই ঘরে ফিরছি। রাতে আলো আঁধারে রাস্তাটা কেমন যেন গুলিয়ে গেল। এদিক ওদিক ঘুরে ও জায়গাটা ঠিক বাগে আসছে না, কয়েকটা চক্কর লাগিয়েও নিজের ব্লকটা খুঁজে পাচ্ছি না, হঠাৎ ই মনে পড়ল দক্ষিণ রায়ের কথা আর মূহুর্তেই জমিদারের রাগত চক্ষু আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সব দিকটাই ঘেরা আছে কিন্তু তিনি ক্রুদ্ধ হলে কারো কিছু করার থাকেনা। আর তিনি ধরলে তো আর কথাই নেই। ভয়ে লোমগুলো খাড়া হয়ে উঠল। টর্চের নতুন ব্যাটারি বেশ অনেক দূরেই আলোকপাত করে কিন্তু আমি খেয়াল করলাম যে আলোটা ঠিক এক জায়গায় ফোকাস করছে না, কেমন যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে আর ঐ কাঁপা আলোতেই দূরে একটা লোক দেখতে পেয়ে এই ভাই ,এই ভাই বলে ডাকতে থাকলাম। লোকটি কাছে আসার পর তাকে ব্লকের নম্বরটা বলে জিজ্ঞেস করায় সে জানালো যে আমি এই দিকে কেন এসেছি? আরও ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল।
 ভাই, একটু দেখিয়ে দিন না ব্লকটা।
লোকটা আমায় সঙ্গে করে নিয়ে এসে বলল, এবার বাঁ দিকে ঘুরে ডান দিকে গেলেই আমাদের ব্লকটা এসে যাবে। পকেটে ছিল মোবাইল কিন্তু নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না বলে ওটার কথা আর মাথায় আসেনি। যাই হোক, টর্চের আলোয় ব্লকটা খুঁজে পেয়ে ভগবানকে অনেক ধন্যবাদ জানালাম। দোতলায় উঠে দরজা খুলেই দরজাটা বেশ ভাল করে আটকে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। খানিকটা ধাতস্থ হয়ে ওষুধটা খেলাম কিন্তু খিদে তো কোন দিক দিয়ে পালিয়েছে। যেতেই ইচ্ছে করছে না, তবে ওষুধটা খাওয়ার পর একটু মনে জোর পেয়ে বেরিয়ে পড়লাম রেস্তোরাঁর দিকে। একটা কথা ছেলেবেলায় শুনতাম, সদা সত্য কথা বলিবে, কদাচ মিথ্যা কথা কহিবে না। কিন্তু এই সত্য কথাটা বললে যে নিতান্তই ডরপোঁক বলবে সকলে এটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনেক সাহস সঞ্চয় করে সত্যি কথাটাই বলে ফেললাম। দক্ষিণ রায়ের অনেক প্রতিপত্তি শুনেছি কিন্তু তার চিন্তা ও যে কপালে এত ভাঁজ ফেলে সেটা জানা ছিল না।
পরদিন সকাল আটটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট করে বেরোতেই হবে সুন্দরবনের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখতে। দেরী হলেই সময়মতো লাঞ্চ করে বেরোতে পারা যাবে না এবং বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা সেই সময়ের মধ্যে বেরোতে না পারায় কোন দ্বীপে নামা গেলনা কিন্তু লঞ্চে চড়ে বিভিন্ন দ্বীপের পাশ দিয়ে পরিক্রমা করা হলো এবং হোটেলে ফিরেই রেস্তোরাঁয়। স্যুটকেস গোছানোই ছিল এবং কালক্ষেপ না করে ফিরে আসা লঞ্চের দিকে। ভাটার টানে লঞ্চের গতি বাড়ানো যাচ্ছে না, গদখালিতে থাকা বাসে উঠতে বিকেল  গড়িয়ে চারটে। অনেক বয়স্ক সদস্য, সদস্যা ছিলেন।ফিরে আসার পথে আবার সেই নোনা মাটির রেস্তোরাঁয় চায়ে গলা ভেজানো এবং সঙ্গে আলুর টিক্কা ও পনীর পকোড়া। জমাটে এই সফর এসে শেষ হলো রাত্রি আটটার কিছু পরে। কাণ্ডারী আশিস রায় ও তাঁর সুযোগ্য সহযোগী সুব্রত চৌধুরী, উতথ্য লাহিড়ি এবং দেবজ্যোতি ঘটক, অমিত রায় এবং লালমণি চক্রবর্তীর অসাধারণ প্রয়াসে দক্ষিণ রায়ের জমিদারি দর্শন এক দারুণ অভিজ্ঞতা।ফেজ থ্রির অধিবাসীবৃন্দদের সনির্বন্ধ অনুরোধ ফ্ল্যাটের মধ্যে নিজেদের আবদ্ধ না রেখে সান্ধ্যবাসরে যোগদান এবং আমাদের এই ফেজকে সবদিক দিয়ে এক আদর্শ বাসস্থান গড়ে তোলার। এতবড় একটা প্রজেক্টকে সার্থক রূপ দিতে অনেক সময় কিছু ভুল ত্রুটি হতে পারে কিন্তু তার থেকেও অনেক বড় এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অগ্রগতি। আসুন আমরা সবাই এগিয়ে আসি এর বাস্তবায়নে।

Sunday, 12 October 2025

গল্প না ছাই

কথা বলতে যারা ভালবাসে তাদের পড়াশোনা বিশেষ কিছু হয় বলে মনে হয়না কারণ তারা তো চিন্তাই বেশীক্ষণ করতে পারেনা। কিন্তু মানুষ হিসেবে তারা মোটামুটি মন্দ হয় না। তাদের সবাই বাচাল বলে, খুব গভীর কিছু আলোচনার মধ্যে এমন একটা মন্তব্য করে বসে যে উপস্থিত সব লোক না হেসে পারেনা। এইরকম ই একজন মানুষ ছিল সৌম্য বা ডালু। ডালুর ভাল নাম কজন ই বা জানে? স্কুলে, কলেজে এমনকি ইউনিভার্সিটিতেও তার পুরোনো খোলস সে ছাড়তে পারেনি। ডালু যখন কোন কথা খুব সিরিয়াসলি ও বলতো সবাই ভাবত যে ও বোধহয় কোন মজার কথাই বলছে। ডালুর এক ট্রেন সফরের কথা সবার সামনে বলছে কিন্তু সবাই ভাবছে এবার বোধহয় কোন মজার কথা বলবে কিন্তু ওর বক্তব্য শেষ হবার পর কেউ ভাবতেই পারছেনা যে এর মধ্যে কি আর এমন বিশেষত্ব। এটা তো একদমই ডালু সুলভ নয় অর্থাৎ ডালু যে কোন সাধারণ কথা অন্যদের মতো বলতে পারে এটাই কেউ ভাবতে পারছে না।

কলকাতা থেকে টেলিগ্রাম এসেছে," Father ill, come soon."  তখন এটা একটা রেওয়াজ ছিল কোন ছুটিছাটা নিতে হলে এইধরণের একটা টেলিগ্রাম পাঠানো হতো। টেলিগ্রাম এসেছে অফিসে। ম্যানেজার চেম্বারে ডেকে পাঠালেন ডালুকে আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর প্রতিক্রিয়া দেখতে লাগলেন যে টেলিগ্রাম টা পাওয়ার পর। 
স্যার, আমাকে বাড়ি যেতে হবে ।
বাড়ি যেতে হবে মানে? এত কাজ, মাসের প্রথম, বাড়ি যেতে হবে বললেই হবে? তোমার এই কাজ কে সামলাবে?
মনে মনে একটা খুব খারাপ গালাগালি এল কিন্তু সেটা সামলে খুব মোলায়েম করে বলল যে ,"স্যার আমিই বাবার একমাত্র ছেলে, বাবার বিপদে আমি না গেলে কে দেখবে, বলুন।" ওর মুখে এসে গেছিল যে আমি না গেলে কি পাড়ার পঞ্চু এসে দেখবে। ম্যানেজার একটু নরম হয়ে বললেন ,"আচ্ছা শোন, তুমি যাও কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে হবে।"
ডালু বুঝল যে ব্যাটা একটু নরম হয়েছে। হ্যাঁ স্যার, ঠিক আছে স্যার বলে ধন্যবাদ দিয়ে নিজের কাজগুলো পাশের সহকর্মীকে বুঝিয়ে দিতে লাগল।
আসলে সবটাই একটা সেটিং। এতদূরে থেকে হঠাৎ বাড়ি যাব বললেই কি ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায়? আগের দিন সন্ধ্যা বেলায় পাণ্ডিয়ার বাড়ি কাম অফিস হয়ে বাড়ি গেছে টিকিটের জন্য। পাণ্ডিয়া ছিলেন খুব করিৎকর্মা লোক। একদিন আগে জানালেও উনি সাধারণ টিকিট কেটে টিকিট চেকারের সঙ্গে কথা বলে কোন কামরায় উঠতে হবে বলে দিতেন। এমন ই ছিল তাঁর যোগাযোগ, নিতেন মাত্র দশ টাকা বাড়তি। অবশ্য দশটাকার তখন অনেক দাম। কিন্তু পাণ্ডিয়া স্টেশনের কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে সব বলে দিতেন এবং টিকিট চেকারের সঙ্গে দেখা করিয়ে তবে উনি ফিরে আসতেন। এতটাই ছিলেন প্রফেশনাল।

এইরকম ই একটা দিন যখন চেন্নাই হাওড়া মেলে পাণ্ডিয়া উঠিয়ে দিয়েছেন এক কামরায় যেখানে ডালু ছাড়া আর জনা তিন চারেক অন্য লোক আর বাকি সব ছেলেমেয়েরা গরমের ছুটিতে বাড়ি ফিরছে । ডালুর মুখ নিশপিশ করছে কথা বলার জন্য। বাকি যে তিন চারজন তারা কামরার এক প্রান্তে নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় ব্যস্ত এবং মনেই হয় তারাও হয়তো চেন্নাই থেকেই উঠেছে। এই ট্রেন যাত্রায় একটা জিনিস লক্ষ্য করা যায় যে প্রথমে যারা ওঠে তাদের মধ্যে যে আন্তরিকতা বা আলাপচারিতা জমে ওঠে, মাঝপথে ওঠা কোন লোককেই তারা আর সেই গ্রুপে ঢুকতে দেননা। এমনকি পাশের ক্যূপের যাত্রীরাও অন্য লোক বলেই গণ্য হন। আর এখানে তো ডালু এক প্রান্তে আর ছাত্রছাত্রী বাদে লোকগুলো অপর প্রান্তে। সুতরাং, জমবে না, এই ছেলেমেয়েদের সঙ্গেই ভাব জমিয়ে চলতে হবে। ষোল সতেরো ঘন্টার যাত্রা যদি মুখ বুঁজে যেতে হয় তাহলে নির্ঘাত ও অসুস্থ হয়ে পড়বে, বাবাকে দেখতে গিয়ে ওকেই কে দেখে সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। যাই হোক, শ্রীকাকুলামে ট্রেন এসে পৌঁছালো। কামরায় বেশ হকার উঠেছে। এই একটা দারুণ জিনিস সেকেন্ড ক্লাস কম্পার্টমেন্টে। এখানে বিভিন্ন রকম আওয়াজ করে ভিন্ন ভিন্ন হকার ওঠে এবং তাদের সঙ্গেও দুচারটে কথা বিনিময় হয় জিনিস কেনার সময়। খোলামেলা কামরার আলাদাই মেজাজ। চিপস আর চানাচুরের দুটো করে প্যাকেট কিনে একটা সামনে বসা কলেজের ছাত্রটিকে দিল। কিছুতেই নেবেনা সে আর ডালুও ছাড়বে না। হাজার হলেও ডালুর বয়স বেশি এবং লোকজনকে বিশ্বাস করানোতে ও একজন আদর্শ লোক। ছেলেটাকে পটিয়ে ও তার হাতে গুঁজে দিল একটা চিপস ও চানাচুরের প্যাকেট। ধীরে ধীরে জমে উঠল কথাবার্তা। ওঁর কাছেই জানতে পারল যে ওরা ম্যাঙ্গালোরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। এর ই মধ্যে একটা ছোট খাটো চেহারার ভীষণ বুদ্ধিদীপ্ত মেয়ে নজরে পড়ল। এই ছোট মেয়েটা অতি আধুনিকা হয়েও পান খাচ্ছে। এই বয়সের ছেলেমেয়েরা সাধারণত পান খাচ্ছে এটা চোখেই পড়েনা। কোন সময় হয়তো অনুষ্ঠান বাড়িতে খাওয়ার পর খেলেও খেতে পারে কিন্তু ঐ ছোট্ট মেয়েটি পান খাচ্ছে আর সমস্ত ছেলেমেয়েদের বলে দিচ্ছে কি করতে হবে বা কি নয় এটা দেখে ডালু তো থ বনে গেছে। সামনে বসা ছেলেটার কাছে জানতে পারল যে মেয়েটি ঢাকা থেকে পড়তে এসেছে আর ওর নাম জার্মিন। কি দারুণ পার্সোনালিটি মেয়েটার। একে সুন্দর তার উপর যেভাবে কথাবার্তা বলছে কোন ছেলে বা মেয়ে তাকে অস্বীকার করতে পারছেনা। ওই মেয়েটির বাবার নাকি বিরাট ব্যবসা এবং মেয়েটিও প্রচুর পয়সা খরচ করে তার বন্ধুদের পিছনে। একে সুন্দরী তার উপর পয়সা খরচে কোন কার্পণ্য নেই, সুতরাং স্বাভাবিক ভাবেই ছেলেমেয়েরা যে তার কথা মেনে চলবে , এটাই খুব স্বাভাবিক। খাবার দাবার বেরোল ঝুলি থেকে। সবাইকে বিতরণ করার সময় ডালুকেও একটা দিল। খেতে খেতে গান ধরলো তারা, ডালুকেও বলল তাদের সঙ্গে গলা মেলাতে। ডালু ঠিক কাকুর পর্যায়ে না হলেও বড় দাদার মতন কিন্তু সেই সময় ডালু ও ভিড়ে গেল তাদের মধ্যে । রাতের খাবার এসে গেছে, খাওয়া দাওয়া করে সবাই গল্পে মত্ত হলো এবং অনেক রাত অবধি আড্ডা চলল। আর কয়েক ঘণ্টা পরেই হাওড়া স্টেশন এসে যাবে আর তার পরেই দীর্ঘ গরমের ছুটি এবং তারপর আবার ফিরে যাওয়া ও নিজেদের পড়াশোনায় মেতে ওঠা। 
ডালুর মনে পড়ে গেল ইউনিভার্সিটির দিনগুলোর কথা। ছুটির শুরুতে এবং ছুটি শেষে আবার পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে একত্র হওয়া, এটা একটা বিরাট ব্যাপার। কিন্তু এই এত বড় ব্যাচ একসাথে কলকাতা থেকে বাইরে পড়তে যাচ্ছে এটা সে কোনদিন দেখেনি। ডালুর একবার মনে হলো তাহলে কি আমাদের শিবপুর, যাদবপুর বা খড়গপুর আই আই টিরা তাদের জৌলুস হারিয়ে ফেলছে। না তাই নয়, এখনও তারা সেরাদের পর্যায়েই আছে তবে যা হারিয়ে গেছে তা হচ্ছে পড়াশোনা করার পরিবেশ। মেধাবী ছাত্র ছাত্রীরাই এখানে পড়তে আসে কিন্তু রাজনীতি এতটাই কলুষিত করে তুলেছে এই শিক্ষায়তনগুলি যে অভিভাবকরা আর ভরসা করতে পারছেন না। আমরা কি হৃত গৌরব ফেরাতে সচেষ্ট হবো না? 

Thursday, 18 September 2025

যুদ্ধ সতত

সকাল বেলায় হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ পেলাম যাতে লেখা আছে শঙ্খ আর মূর্খ ব্যক্তি অন্যলোকের ফুঁয়ে বাজে। কথাটা নিয়ে একটু গভীর ভাবে চিন্তা করতেই দেখলাম কথাটা একদম সঠিক। শঙ্খের প্রসঙ্গে পরে আসছি, আগে মূর্খদের নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। মূর্খ মানে কি পড়াশোনা না জানা লোক? তার মানে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আলোকিত করা লোকজন সবাই বিচক্ষণ? না, তা তো নয়, বরং বেশীরভাগ সময়ই দেখা যায় যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা সেরকম কিছু উল্লেখযোগ্য নয় কিন্তু তাদের বাস্তব বোধ অত্যন্ত প্রখর এবং জীবনে অনেক বেশী শান্তি প্রাপ্ত অথচ অনেক ডিগ্রিধারী মানসিক দ্বন্দ্বে ছিন্নভিন্ন এবং এর জন্য দায়ী তাদের বাস্তব বোধ কম থাকার জন্য বা নিজের অহমিকাকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য। আগের দিনের ঠাকুমা, দিদিমারা স্কুলের গণ্ডি না মারালেও প্রচণ্ড বাস্তববাদী হবার কারণে যৌথ পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিলেন যেটা আজকের দিনে বিরল যদিও টিভির সিরিয়ালে ঠাকুমা, ঠাকুর্দা, ভাসুর,দেওর, দা আর ননদ দের সংসার দেখা যায় এবং কূটকচালিতে ভরা অনন্তকাল ধরে চলতে দেখা যায় এবং সেই সময়টা অন্য কোন লোকের আগমন নৈব নৈব চ। এই ঝগড়া, বিবাদ আর পিছনে সমালোচনা অথচ সামনে মুখে মধু ঝরে পড়া আর যাই হোক বুদ্ধিমানের পরিচয় নয়। তবুও তাঁদের নেমপ্লেটে বা লেটার বক্সে পিতলের ফলকে জ্বল জ্বল করে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা। স্রেফ বাস্তব বোধ না থাকায় ব্যক্তিগত জীবনে তাঁরা প্রচণ্ড অসুখী। এঁদের অনেকেই কাকে কান নিয়ে গেল শুনেই কাকের পিছনে ধাওয়া করেন। এঁদের কি বলে অভিহিত করা যায় পাঠকের উপর ছেড়ে দেওয়াই বাঞ্ছনীয়।

এবার আসা যাক শঙ্খ প্রসঙ্গে। শঙ্খের ইতিহাস খুঁজতে গেলে একটু পুরাণের দিকে ফিরে যেতে হবে। শঙ্খাসুর বা পাঞ্চজন্য প্রভাস সমুদ্রের অতলে থাকা এক মহাদুষ্ট দৈত্য বা অসুর ছিল । কোন এক অজানিত কারণে সে মহর্ষি সন্দীপনীর ছেলেকে কিডন্যাপ করে সমুদ্রের অতলে তাকে শঙ্খের মধ্যে বন্দী করে রাখল। মনোবাসনা কি ছিল কে জানে?  কিন্তু মহর্ষির শিষ্যরা সব নামজাদা লোক যাঁরা হলেন কৃষ্ণ, বলরাম, সুদামা ও উদ্ধবের মতো অত্যন্ত ওজনদার। সুতরাং কিডন্যাপ করে এত সহজে ছাড় পাওয়ার মতো ব্যাপার নয়। শিষ‌্যরা ঘটনা জানতে পেরেই গুরুদেবের মুখের দিকে চাইতেই সম্মতি মিলল, বললেন," দেখ' তো হে বাপু, ব্যাপারটা কি?" গুরুদক্ষিণা  যদি দিতেই হয়  তাহলে আমার ছেলেটাকে একটু উদ্ধার  করে আন তো। আজকের দিনের মতো, কোন রহিস লোকের ছেলেমেয়েদের কেউ  কোন ক্ষতি করলে সমস্ত পুলিশ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়বে অপরাধীদের ধরার জন্য অথচ কোন এলেবেলে লোকজন প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হলেও পুলিশের কোন হেলদোল থাকেনা।  যাই হোক, কৃষ্ণ, বলরাম তো গেলেন এবং শঙ্খাসুর বা পাঞ্চজনকে হত্যা করেও গুরুদেবের ছেলেকে দেখতে পেলেন না। তবে হাল ছাড়ার লোক তো তাঁরা ছিলেন না , যমরাজের হেফাজত থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এলেন ছেলেকে। ফিরে এসে দেখেন পাঞ্চজনের হাড়গোড় সেই শঙ্খের আকার ধারণ করেছে। কৃষ্ণ সেই শঙ্খকে নিজের করে নিলেন এবং সেই থেকে সেই শঙ্খের নাম হলো পাঞ্চজন্য হরিশঙ্খ। এই শাঁখে ফুঁ দিলে যে নিনাদ সৃষ্টি হতো তা শত্রুদের হৃৎকম্প উপস্থিত করে দিত। মহাভারতের যুদ্ধে এই পাঞ্চজন্যের উল্লেখ রয়েছে এবং এই শঙ্খনিনাদেই শুরু হয়েছিল মহাভারতের যুদ্ধ এবং সূর্যাস্তের পরেই এর নিনাদে সেদিনের মতো যুদ্ধ বন্ধ হতো। 
এখনকার দিনের মতোই আগের দিনেও দেওয়া নেওয়ার বালাই ছিল। এখন আমেরিকা যেমন রাশিয়াকে প্রতিহত করার জন্য পাকিস্তানের সহায়ক তেমনি আগের দিনেও এর প্রচলন ছিল। অগ্নিদেবের প্রচুর ঘি খেয়ে অগ্নিমান্দ্য হলো মানে তাঁর মুখে কিছুই রোচেনা। ব্রহ্মার নিদান হলো, বাপু তোমার শরীরের চর্বি না কমালে তোমার এই রোগ সারবে না। এখনকার ডাক্তারের এই মত যদি কোন রোগী শোনে তাহলে সে চর্বি জাতীয় খাবার বা মিষ্টি খাওয়া কমিয়ে জিমে যাওয়া শুরু করবে বা প্রতিদিন দশহাজার কদম হাঁটা শুরু করবে আর মেয়েরা তো পারলে শুধু হাওয়া আর জল খেয়ে কাঠি সুন্দরী হতে চেষ্টা করবে। সেইরকম অগ্নিদেব ব্রহ্মার কথা শুনে খাণ্ডববন দহন করে নিজের অগ্নিমান্দ্য সারাবার পন্থা ঠিক করলেন কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র সেটা মানবেন কেন, অগ্নিদেব যতবার সেই চেষ্টা করেন দেবরাজ ইন্দ্র বৃষ্টি নামিয়ে ততবার আগুন নিভিয়ে দেন। অগত্যা বাধ্য হয়ে অগ্নিদেব কৃষ্ণ ও অর্জুনের শরণাপন্ন হলেন।  অর্জুন দের ও স্বার্থ ছিল । ইন্দ্রপ্রস্থ  স্থাপনের  জন্য দরকার  ছিল  জমি। অতএব , খাণ্ডববন পুড়িয়ে সেই জমি উদ্ধার করতে হবে। সুতরাং ,নামলেন মাঠে কৃষ্ণ ও অর্জুন , যুদ্ধ হল‌‌ ভয়ানক, খাণ্ডবদহন হলো, অগ্নিদেব হলেন সুস্থ এবং পুরষ্কার স্বরূপ কৃষ্ণ পেলেন  সুদর্শন চক্র এবং অর্জুন পেলেন গাণ্ডীব। কেউ আবার বলেন মহাদেব শিব নাকি বিষ্ণুর ভক্তিতে আপ্লুত হয়ে তাঁকে এই সুদর্শন চক্র দিয়েছিলেন আবার কেউ বলেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা সূর্যের শক্তিকে আহরণ করে এই চক্র বিষ্ণুকে দিয়েছিলেন আবার কারো কারো মতে স্বয়ং পরশুরাম নাকি কৃষ্ণের পাঠ সম্পন্ন হলে তাঁকে দিয়েছিলেন এই সুদর্শন চক্র। যাই হোক, যেখান থেকেই পেয়ে থাকুন না কেন বিষ্ণু বা কৃষ্ণের হাতের সুদর্শন চক্র অমোঘ এবং কোন শক্তিই তাকে প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখত না এমনকি শিবের ত্রিশূলের ও না। বিষ্ণুর হাতের গদার নাম ছিল কৌমুদকী। সেই যুগে গদার এক বিশেষ সম্মান ছিল। পৃথিবীবাসীকে দুর্জনের হাত থেকে রক্ষা করার প্রতীক অস্ত্র ছিল গদা, অনেকটা আজকের দিনে আমেরিকার মতো। কেউ বেশি বাড়াবাড়ি করো না, যা বলছি শোন নইলে পড়বে মাথায় ঘা।
বিষ্ণুর কথা যখন হচ্ছেই তখন শেষনাগের কথা না বললে তো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ফেনিল নীল সমুদ্রের উপর সোফায় শায়িত স্বয়ং বিষ্ণুর অর্ধশায়িত ছবি তো প্রায়ই দেখা যায়। ঐ সোফাটিই হচ্ছেন শেষনাগ। শেষ নাগের অপর নাম আদিশেষ যার অর্থ হলো সমস্ত কিছু বিনাশ হয়ে গেলেও তিনি থেকে যাবেন। মহামুনি কাশ্যপ এবং কদ্রুর সর্বজ্যেষ্ঠ সন্তান তাঁর ধার্মিক আচরণের জন্য স্বয়ং ব্রহ্মার আশীর্বাদে বিষ্ণুর সহায়ক হিসেবে থাকার সুযোগ পান। তাঁর উপর ই শায়িত বিষ্ণুর ছবি আমরা প্রায় ই দেখি। ত্রেতাযুগে বিষ্ণু বা রামের সহচর হিসেবে লক্ষণ রূপে দেখি এবং দ্বাপর যুগে তাঁর উপস্থিতি বলরাম হিসেবে। কলিযুগে তিনি কি অবস্থায় কার সহচর হিসেবে আছেন তা বলা কঠিন। তবে আমরা নিজেরা নিজেদের মতো করে ভেবে নিতে পারি।

যুদ্ধ যে শুধু এখন ই হচ্ছে তা নয়, ইতিহাস ঘাঁটলে বা পুরাণ ঘাঁটলেও দেখা যায় এই দেবতার সঙ্গে সেই দেবতার লড়াই। সবাই ভাবে আমি কিসে কম? আমি কেন ওর বশ্যতা স্বীকার করব? সবাই নিজেকে শক্তিশালী দেখতে চায় কিন্তু শক্তিশালী হতে গেলে যে স্বার্থ ত্যাগের প্রয়োজন হয় তা স্বীকার করার মতো মানসিকতা রাখতে পারিনা। যতক্ষণ অন্যদের কাছে মাথা ঝুঁকিয়ে যো হুজুর বলতে পারা যাবে, ততক্ষণ নিজেদের মান সম্মান খোয়া গেলেও প্রাণটা বেঁচে যেতে পারে কিন্তু যখন ই তাদের প্রয়োজন হবে তখন ই তাদের মর্জিমাফিক চলতে হবে নাহলেই বিপদ। যে মূহুর্তে হাত জোড় করা বন্ধ করে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হবে তখনই আসবে নানা দিক থেকে আঘাত কারণ কেউই পছন্দ করবে না যে হাত জোড় করা লোকটা আজ আমার চোখে চোখ রেখে চলছে। অতএব, আমাদের ই বেছে নিতে হবে আমরা কিভাবে থাকব। যুদ্ধ সব যুগেই ছিল, আছে এবং থাকবে কেবল রূপ টা হবে ভিন্ন কিন্তু তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি মানুষের মৃত্যু ও অপরিমেয় ক্ষতি।