Saturday, 4 May 2024

প্রেম করে বিয়ে বনাম সম্বন্ধ করে বিয়ে

প্রেম করে বিয়ে ভাল  না সম্বন্ধ করে বিয়ে করা ভাল  এই নিয়ে তর্ক বহু যুগ ধরে চলে আসছে। দুই তরফেই চোখা চোখা যুক্তি ,কেউ কারো থেকে কম নয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার যে একপক্ষ যখন  বক্তব্য  রাখেন তখন  মনে হয় ইনি যা বলছেন সেটাই  ঠিক আবার  পরমূহুর্তেই যখন  অপর পক্ষের  বক্তব্য  শুনি তখন মনে হয় নাহ্ এই ঠিক  বলছে। যাই হোক,  একটু দুই তরফের  বক্তব্য ই শোনা যাক তারপর না হয় ঠিক করা যাবে কোনটা ভাল  আর কোনটা খারাপ। 

দুপক্ষের ই বাঘা বাঘা বক্তা( পুরুষ ও মহিলা) রয়েছেন  এবং সঞ্চালকের ভূমিকায় রয়েছেন দুঁদে সাংবাদিক  প্রজাপতি দে মহাশয়।
কাকে দিয়ে শুরু করবেন বিতর্ক  এই নিয়ে একটু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন প্রজাপতি। কিন্তু তাঁর মতো সাংবাদিকের  কাছে এ তো নিতান্তই  জলভাত। উনি প্রথম বলার  সুযোগ  প্রেম করে বিয়ে করা ভাল  এদের দিলেন। 
প্রথম পক্ষের  বক্তারা অনেক  ইনিয়ে বিনিয়ে প্রেমের  মাহাত্ম্য বর্ণনা করলেন এবং সেই  বর্ণনা করতে  গিয়ে কত কি যে বললেন শুনে মাথাটা ভোঁ  ভোঁ  করতে লাগল। মহাভারতের  যুগ থেকে শুরু করে পঞ্চাশ বছর আগেও যেরকম ভাবে প্রেম নিয়ে একটা গদগদ  ভাব ছিল তা খুবই সুন্দর ভাবে পেশ করলেন কিন্তু এই আধুনিক  যুগে ছেলেমেয়েদের  হাতে খুবই  কম সময়, অত ধানাইপানাই করার  সময় নেই। সুতরাং আগের দিনে কড়াইয়ে মাংস চাপিয়ে  ভাল  করে কষে তারপর জল ঢালা এবং খুব  কম করে ঘন্টা দুয়েক মাংস রান্নার  গন্ধ ছড়িয়ে খিদেটা  দ্বিগুণ  করে তোলাটা একটা দারুণ ব্যাপার ছিল।  রবিবার যেদিন  মাংস  হতো সেদিন  ভাতের চাল বেশী করে নিতে হতো। ওগো তুমি আমার প্রাণ,তোমাকে না পেলে আমার  এই জীবনটাই  ব্যর্থ হয়ে যাবে এই ধরণের চিঠি চাপাটি চলতো। অবশ্য  এই প্রেমের দরুন অনেক অমর সাহিত্যের  সৃষ্টি ও হতো। অনেকসময় খেঁদি পেঁচি মেয়েকেও প্রেমিকের চোখে অমাবস্যার পর প্রথমা বা দ্বিতীয়ার চাঁদ না বলে পূর্ণিমার চাঁদ বলে বর্ণনা করা হতো বা ট্যারা প্রেমিককে  পদ্মলোচন বলে মনে করা হতো। এককথায় বলা চলে পীরিতে মজিল মন, কি বা হাড়ি কি বা ডোম। তখন  অবশ্য  জাতপাত  নিয়ে বড্ড বেশীরকম  মাতামাতি করা হতো। ব্রাহ্মণ না কায়স্থ বা কুলীন না অকুলীন এইসব নিয়ে অনেক বঙ্গবিচার  হতো। শুধু ছেলেমেয়েদের  মধ্যে প্রেম হলেই সব হয়ে গেল এমন নয় তার পরিণতি বিয়েতে গড়াত তাদের  বাবা মায়ের  সম্মতি পেলে। নাহলে ভো  কাট্টা। প্রেমে ব্যর্থ  হয়ে কেউ কেউ আত্মঘাতী হতো আবার কেউ বা বিরহে  সারাজীবন  বিয়ে না করেই কাটিয়ে দিত। কিন্তু প্রেমের  পরিণতি যদি বিয়ে অবধি গড়াতো তাহলে সেই বিয়ের মাধুর্য ই ছিল আলাদা। অনেক কচকচানির পর এবার  অন্য পক্ষের বক্তব্য  শোনা যাক।

ছেলেমেয়েদের  সময় এখন  খুবই কম। ধৈর্য অত নেই শোনার যে চাঁদের  দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন ঠোঁট ফাঁক করে বলবে যে সেই তার হৃদয়ের নাথ। এখন প্রেসার কুকারের যুগ,  ফটাফট ম্যারিনেট করে চার পাঁচটা স্টিম দিয়ে নামিয়ে বসে পড় খেতে। অত সুন্দর গন্ধ ও বেরোবে না কিন্তু খাওয়া তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। দু চারদিনের আলাপ,  তার মধ্যেই প্রেমের প্রস্তাব এবং সম্মতি এবং বাবা  মায়েরা  হচ্ছে রাবার স্ট্যাম্প অনেকটা আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতির  মতো। নামেই তিনি একনম্বর  কিন্তু আসল ক্ষমতা অন্যজনের কাছে।  সুতরাং ছেলে ও মেয়ের উভয়ের  সম্মতি থাকলে হয়ে গেল  বিয়ে। আনুষ্ঠানিক ভাবে বাবা মায়েরা তাঁদের  সম্মতি দিলে ভাল  আর না দিলে থোড়াই  কেয়ার, রেজিস্ট্রি করে স্বামী স্ত্রী হয়ে গেল। 

এখন  দেখার  বিষয় যে কোন বিয়েটা বেশী মধুর হলো। বিয়ে মানে তো শুধু একটা ছেলের সঙ্গে একটা মেয়ের  বিয়েই নয় , একটা পরিবারের  সঙ্গে আর একটি পরিবারের সম্বন্ধ গড়ে ওঠা। সুতরাং অনেক  খোঁজ খবর নিয়ে এই সম্বন্ধ  গড়ে ওঠে মানে এককথায় যাকে বলে ডিউ ডিলিজেন্স নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ সত্ত্বেও  কি সব বিয়েই মধুর  হয়েছে বা যেখানে ছেলে বা মেয়ে নিজের পছন্দ মতো বিয়ে করেছে  তারা কি খুব  অসুখী?  আসল কথা, যদি বোঝাপড়া  থাকে নিজেদের  মধ্যে এবং পারস্পরিক  শ্রদ্ধা থাকে তবে সেই বিয়ে সেটা সম্বন্ধ করেই হোক বা প্রেম করেই হোক তা সুখের  হয়। 
জনতার মধ্য থেকে একটা হাত গুটি গুটি করে উঠল  যার মালিক একটি অল্পবয়সী মেয়ে। একটু দ্বিধাগ্রস্ত  হয়েই সে প্রজাপতি বাবুর  উদ্দেশ্যে একটা প্রশ্ন  রাখার জন্য  অনুমতি চাইল। ঐ বয়সী কোন ছেলেমেয়েই ঐ অনুষ্ঠানে ছিলনা। প্রজাপতি আর কি করেন,  আচ্ছা দেখাই  যায়না কি প্রশ্ন  মেয়েটি রাখে বলে সম্মতি দিলেন। উপস্থিত  জনতা খানিকটা ঔৎসুক্যবশত নিজেদের  মধ্যে চাওয়াচায়ি করতে থাকলেন। আচ্ছা স্যার,  হাইব্রিড বিয়ে হলে কেমন  হয়?
হাইব্রিড  বিয়ে! সবাই  হাঁ হয়ে গেলেন এই অদ্ভূত বিয়ের কথা শুনে। এইরকম  বিয়ের কথা তো সকলেরই অজানা। একযোগে বহু জোড়া বিস্মিত চোখের দৃষ্টি মেয়েটির  দিকে ধেয়ে  এল। কোন কোন  বয়স্ক মানুষ  অস্ফূট স্বরে বলে ফেললেন এঁচোড়ে পাকা মেয়ে কোথাকার। কিন্তু প্রজাপতি দুঁদে সাংবাদিক।  তিনি বললেন  যে একটু বিশদভাবে  বললে বুঝতে সুবিধে হয় কারণ এই বিশেষ বিয়ে সম্বন্ধে কারও  কোন ধারণা নেই। মেয়েটি এইবার  বলল যে ধরুন কোন  ছেলের সঙ্গে কোন মেয়ের প্রেম হলো কিন্তু কোন কারণে সেটা ম্যাচিওর করলনা এবং দুজনেই পরবর্তী কালে সংসারী হলো এবং দুজনের মধ্যেই  একটা সুসম্পর্ক  থেকে গেল। 
কেউ কেউ  বলে উঠলেন এ তো পরকীয়া। আবার  কেউ কেউ  বললেন  যে না, এটাকে পরকীয়া বলা ঠিক  হবেনা বরং এটাকে প্লেটোনিক লাভ বলা উচিত। সময় প্রায় শেষ  হয়ে আসছে দেখে প্রজাপতি পাকা খেলোয়াড়দের  মতো বললেন  যে আজকের  বিতর্ক  ছিল কোন বিয়ে ভাল  প্রেম করে না সম্বন্ধ করে। আপনার  কথামতো হাইব্রিড  বিয়ে নিয়ে অন্য একদিন  ভালভাবে আলোচনা করা যাবে।
  প্রজাপতি দে  ফল অমীমাংসিত বলে ঘোষণা  করলেন।  সুতরাং বরাবরের  মতো এই আলোচনাতেও ঠিক হলোনা কোনটা ভাল  আর কোনটা বিষময়।

No comments:

Post a Comment