Wednesday, 29 May 2024

মশলা মুড়ি ক্রিকেট

সম্প্রতি শেষ হলো পৃথিবীর  সবচেয়ে দামী ক্রিকেট লিগ । দুহাজার আট সালে শুরু হয়েছিল এই ক্রিকেট লিগ। দেখতে দেখতে সতের বছর কেটে গেল এই লিগের, একসময়ের চ্যাম্পিয়ন সব শেষে একদম নীচের সারিতে স্থান পাওয়ায় সেখানকার বাসিন্দাদের ও সমর্থকদের মনে বিষাদের ছায়া। কিন্তু এতে কারও কোন হাত নেই। সবাই তো আর প্রথম স্থানে আসবে না, সুতরাং সবসময়ই কারও না কারও  মনঃকষ্টের ঘটনা ঘটবেই। স্ট্যাটিসটিক্সের কচকচির জন্য অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি আছেন  এবং তাঁরা যথাসাধ্য তথ্য ভিত্তিক আলোচনা করছেন  এবং ভবিষ্যতেও করবেন।  আমার বক্তব্য  সেখানে নয়। এই বিশাল কর্মকাণ্ডে প্রচুর অর্থের  সমাগম  হয়েছে এবং আমাদের  ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড এবং বহু সংস্থা এবং লোকজন বেশ ভাল রকম অর্থোপার্জন করেছেন। খুবই আনন্দের ব্যাপার যে  এই অল্প সময়েই বহুলোকের অবস্থার প্রভূত  উন্নতি হয়েছে কিন্তু মনে একটা ছোট্ট প্রশ্ন  উঁকিঝুঁকি মারছে সেটা যতক্ষণ না প্রকাশ করতে পারছি ততক্ষণ একটা অস্বস্তি থেকেই  যাচ্ছে।
প্রথমত  এই বিশাল যজ্ঞে দশটা দল তাদের  বিরাট  লটবহর নিয়ে প্রস্তুতি চালাচ্ছে, বহুটাকা খরচ করছে। কিন্তু এই খেলায় কেমন যেন  একপেশে ব্যবস্থা। সেরার সেরা বোলাররা বল করছে আর ভাল, মোটামুটি ভাল  ও আনাড়ি ব্যাটসম্যান সবাই  মিলে যেভাবেই হোক না কেন সেই বলকে মেরে পিটিয়ে ছাতু করে দিচ্ছে। লেগ স্টাম্পের  দিকে বল গেলেই ওয়াইড বল এবং ব্যাটিং দলের  একটা রান যোগ হলো আর বোলারকেও একটা বাড়তি বল করতে হলো। নো বল বা বাম্পার দিলে ব্যাটসম্যানদের শরীরে বা মাথায় লেগে ক্ষতি হতে পারে, সেটা না দেওয়া বাঞ্ছনীয়। ছয় ওভার  অবধি ফিল্ডিং সাজানোয় যথেষ্ট  বাধানিষেধ আছে। মোটামুটিভাবে বলা যায়,বেচারা বোলাররা  বল করো আর ব্যাটসম্যানরা  হাঁকরে দিয়ে তাকে বাউণ্ডারি বা ওভারবাউণ্ডারি মারবে আর লোকে আহা আহা বলে হাততালি দেবে। খেলাটা এতটাই বিনোদনের  উপযোগী করা হয়েছে যে কোন উঠতি ক্রিকেটার আর বোলার হতে চাইছে না, সবাই ব্যাটসম্যান হতে চায়। কিন্তু এই ব্যাটসম্যানদের  বেশিরভাগ ই টেকনিকের অভাবে টেস্ট খেলায় চান্স পাওয়ার কথা ভাবতেই  পারেনা। এমন একটা লেভেল প্লেয়িং  ফিল্ড তৈরী করা হোক যাতে প্রকৃত ভাল  বোলার  বা ব্যাটসম্যানরা তাদের  উৎকর্ষতা দেখাতে পারে। অবশ্য  একটা কথা ঠিক  যে লোকের  হাতে সময় এখন খুব কম, পাঁচ দিনের টেস্ট খেলা দেখা  আর সম্ভব হচ্ছেনা। আর দর্শকদের  কথা ভেবেই ক্রিকেটের  এই বিনোদন। 
এবার দেখা যাক, এর কি সুদূর প্রসারী ফল। আমাদের  দেশে ক্রিকেট  এখন হেঁসেলেও ঢুকে পড়েছে।  সবার মধ্যেই  এক চাপা উত্তেজনা। কলকাতা নাইট রাইডার্সে একজন বাঙালি ক্রিকেটার  না থাকলেও  আমরা সবাই কেমন  নীরবে কলকাতা নাইট রাইডার্সের সমর্থক হয়ে গেছি এবং সেইরকম ভাবে মুম্বই বা চেন্নাই এর লোকজন তাদের  প্রদেশের  নামে ক্রিকেট দলের  সমর্থক হয়ে গেছে। হাজার হলেও  রক্ত জলের  চেয়ে বেশী ঘন তাই নয় কি? আমার  মনে একটা প্রশ্ন জাগছে এবার। এই বিশাল অর্থের  কিছু অংশ এই খেলা বা অন্য কোন  খেলা  ঊৎকর্ষতা বাড়ানোর কাজে ব্যয় করা যায় কি না বা সরকারের  তরফে এই খেলাধূলার পিছনে আরও অনেক কিছু করা যায় কি না?  সমস্ত  ছেলেমেয়েরা ই যে পড়াশোনা করে পণ্ডিত  হবে এবং শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের  অবদান  রাখবে তা নয়। যারা নিম্ন মেধা বা মধ্য মেধার কিন্তু খেলাধূলায় পারদর্শী তাদের  শৈশবাবস্থা থেকেই বিভিন্ন  অ্যাকাডেমিতে অন্তর্ভুক্ত করা হোক এবং বিদেশের  মতন সেই অ্যাকাডেমি ই তাদের ভবিষ্যতের খেলোয়াড় তৈরী করুক এবং খেলোয়াড়রাই যখন বয়স হয়ে যাবে তখন  তারাই কোচিং করুক  এবং  সমস্ত  খেলোয়াড়দের একটা পেনশনের ব্যবস্থা হোক যাতে খেলোয়াড় জীবনের  শেষে তাদের  ভবিষ্যতে অর্থাভাবে  পড়তে না হয়। এখন যেমন  ক্লাবগুলোকে বছরে দুলাখ টাকা করে দেওয়া  হয় সেটা নিশ্চয়ই  একটা ভাল  ব্যবস্থা কিন্তু তাতে সত্যিকারের  কতজন  খেলোয়াড় উঠে এসেছেন  তাতে যথেষ্ট  সন্দেহ  আছে। বরঞ্চ এটাই  দেখা  গেছে যে ঐ টাকায় ক্লাবের  বিল্ডিং তৈরী  হয়েছে এবং বিয়ে অন্নপ্রাশন ও শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে ভাড়া দিয়ে ক্লাবের কর্মকর্তাদের  মধ্যদেশ  স্ফীত করেছে  এবং ভোটের  সময় এরাই বিভিন্ন  উপায়ে ভোট নিয়ে আসার কাজ করছে। এছাড়া কিছু রিটায়ার করে যাওয়া লোকদের  তাস খেলার বন্দোবস্ত হয়েছে। 
সবচেয়ে বড় জিনিস  হলো দূরদৃষ্টি  থাকা  এবং সেটাকে সাফল্যমণ্ডিত করতে যথাযোগ্য প্রয়াস নেওয়া। অন্যথা এই টাকা কিছু বাজে লোকের হাতে পড়বে এবং যুব সমাজের কোন  উন্নতি হবেনা।

No comments:

Post a Comment