Thursday, 19 May 2022

একজন লেখকের অপমৃত্যু

গজুদার সঙ্গে আমার  পরিচয়  একটা অনুষ্ঠানে। চেহারার সেরকম  জেল্লা না থাকলেও তাঁকে দেখে নিজের মনে হয়েছিল যে ভদ্রলোক  বেশ করিত কর্মাএবং খুব  সৎ লোক। আজকাল  তো ঝাঁ চকচকে চেহারার  লোকদের  দেখলেই কেমন বুকটা ছমছম করে। কেতাদুরস্ত চেহারার লোক  কথায় কথায় কাঁধ ঝাঁকানি দেয়, কথাবার্তা বা আচার ব্যবহারে যথেষ্ট  কৃত্রিমতা, নজরে  এলেই কেমন যেন  সিঁটিয়ে যাই। হয়তো নিজের একটু গ্রাম্য ভাব থাকার এরজন্য  খানিকটা দায়ি। কিন্তু এটা মনে মনে ঠিক  করেই  নিই যে এঁর সঙ্গে একটু দূরত্ব  রাখাই ভাল। কিন্তু গজুদার নিজেকে একটু গুটিয়ে রাখা কিন্তু কথা বলার সময় সোজাসাপটা  কথাবার্তা আর অমায়িক  ব্যবহার আমাকে তাঁর  প্রতি একটু বেশিই  আকৃষ্ট করেছিল। বুঝলাম  এই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার পটবে।  অনুষ্ঠান  ছিল আমাদের  ক্লাবের এবং অন্য একজন  মেম্বারের  সঙ্গে তিনি এসেছেন। সত্য দা সমস্ত  মেম্বারের সঙ্গে গজুদার  পরিচয় করিয়ে দিলেন কারণ  আমাদের সকলের উপর মেম্বার বাড়ানোর  ভার ছিল। আমাদের  ক্লাবের  নিজস্ব  কোন ঘর ছিলনা এবং ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কোন  মেম্বারের বাড়িতে ক্লাবের  মিটিং হতো বা নিদেন পক্ষে কোন  রেস্তোরাঁয় বা ছোট খাটো হলে। আমি একটু গায়ে পড়েই গজুদার সঙ্গে গভীর  আলাপ  করতে চাইলাম।  কথায় কথায় জানলাম যে উনি একজন  কেন্দ্রীয় সরকারের  উচ্চপদস্থ  কর্মচারী এবং সম্প্রতি তিনি রিটায়ার করেছেন। ধীরে ধীরে সম্পর্কের  গভীরতা বাড়তে থাকল এবং ব্যক্তিগত  স্তরে সেটা প্রায় পৌঁছে গেল। পরস্পরের  বাড়ি যাওয়া আসাতে বন্ধুত্বের গভীরতা বেশ জমে উঠল। 

কয়েক বছরের মধ্যেই  তাঁর  ওপর একটা  কেজো লোকের  তকমা সেঁটে গেল এবং তারই  ফলশ্রুতি তিনি হলেন  সম্পাদক এবং পরের বছর সভাপতি। আমাদের  ক্লাব ছিল সভাপতি  ভিত্তিক মানে তাঁর  কথাই হতো শেষ কথা যদিও  তিনি অন্যান্য সদস্যদের  মতামত ও নিতেন কিন্তু তিনি কোন সিদ্ধান্ত নিলে তা সকলেই মেনে চলতো। কিন্তু একটা কথা ঠিক  যে তিনি  সভাপতি থাকাকালীন  ক্লাবের যেরকম  রমরমা সেটা আর কোন  সময়েই হয়নি। প্রাণের স্পন্দন সবার  মধ্যেই সংক্রামিত  হয়েছিল। একটা কথা আছে না যে কোন  কোন সময় একটা ঝাঁকানির  প্রয়োজন  হয় যেমন গাড়ি চালানোর সময় কোন  সেরকম  পরিপক্ক নয় ড্রাইভারের  গিয়ার চেঞ্জের সময় হয়। গজুদার কোন কোন  সিদ্ধান্ত  সেরকম স্থির মস্তিষ্ক  প্রসূত না হলেও  তাঁর ঐকান্তিক ইচ্ছা আর অক্লান্ত  পরিশ্রম তাঁকে সাফল্যের  শিখরে পৌঁছে  দিয়েছিল।

কথায় কথায় জেনেছিলাম তিনি তাঁর  কর্ম ক্ষেত্রে একজন সর্বভারতীয় সম্পাদক ছিলেন  এবং তাঁর  সেই  অভিজ্ঞতাই ক্লাবের  উন্নতির  শিখরে পৌঁছতে   সাহায্য  করেছিল।  একটা গাড়ি সে যতই  পুরোন  হোক না কেন যদি চালু থাকে তা বসে থাকা এক নতুন  গাড়ির  থেকেও  ভাল  সার্ভিস  দেয়। সভাপতির  টার্ম ছিল  একবছর এবং দ্বিতীয়বার সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করার কোন  নিয়ম  না থাকায় চলন্ত গাড়িটা যেন ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। পরে টুকটাক  রিপেয়ারিং হলেও  সেই মাত্রায় আর পৌঁছাল না। ধীরে ধীরে ক্রমহ্রাসমান  সদস্য সংখ্যা ক্লাবকে একটা প্রায় সাইনবোর্ডে  পরিণত করল যদিও  গজুদার  কোন পরিশ্রমে ঘাটতি ছিলনা কিন্তু কথা আছে না যথা রাজা তথা প্রজা। যদি সভাপতি শুধু আসনে বসার  জন্য ই হয় তাহলে তাকে ধাক্কা দিয়ে আর কতদূর  নিয়ে যাওয়া যায়? 

কিন্তু প্রতিভা এমনই  একটা জিনিস  যা কোন না কোন ভাবে বিচ্ছুরিত  হবেই। শুরু হলো গজুদার  লেখা এবং কিছুদিনের  মধ্যেই  লেখাগুলোর  প্রাসঙ্গিকতা ভীষণ  বলিষ্ঠ ভাবে প্রতীয়মান  হতে লাগল।  যে কোন  লেখক, তিনি যাই লিখুন  না কেন, যদি পাঠকের  পৃষ্ঠপোষকতা না পান তাহলে তাঁর  উদ্যমে অবশ্য ই ভাটা  পড়তে বাধ্য। কিন্তু কেউ যদি তাঁকে উৎসাহ দেন তা ছোট্ট  চারাগাছে  জল দিয়ে মহীরুহে  পরিণত করতে পারে। গজুদার প্রচেষ্টায় আমার  কাজ  ছিল সেই চারাগাছে জল দেওয়ার মতন। প্রথম প্রথম সেই বলিষ্ঠতা না থাকলেও  ক্রমে ক্রমে তা যথেষ্ট  মজবুত  লেখা হতে থাকল। একের  পর এক লেখা আসতে লাগল  এবং আমিও  চাতক পাখির  মতো লেখার  আশায় থাকতাম।  তারপর হঠাৎই  দেখি যে লেখার  সংখ্যা কমে কমে  একেবারেই  শূন্যে এসে ঠেকে গেল। ভাবছি হয়তো গজুদা বাইরে গেছেন কিংবা অন্য কোন কাজে ব্যস্ত আছেন।  কয়েকবার  টেলিফোন  করেও সাড়াশব্দ না পাওয়ায় যথেষ্ট  উদ্বিগ্ন  হয়ে পড়লাম।  হঠাৎই  একদিন  টেলিফোনের  অন্য প্রান্ত থেকে সাড়া পেলাম।  লেখা না আসার  কারণ  জানতে চাওয়ায় যা উত্তর  পেলাম  তাতে স্তম্ভিত  হয়ে গেলাম।  শুনলাম  বৌদি মানে গজুদার  স্ত্রী মানসিক ভাবে অসুস্থ।  প্রচন্ড  ধাক্কা খেলাম উত্তর শুনে। তিনি এতটাই  শুচিবাইগ্রস্ত হয়ে গেছেন  যে কেবল স্নান  আর ঠাকুর  দেবতাদের  সেবা ছাড়া আর কিছুই  করেন না। দুর্ভাগ্যবশত তাঁদের  কোন সন্তানাদি না থাকায় সংসারের  সেই আঠাটাই কোনদিন  জমাট  বাঁধেনি। আর তার নীটফল মানসিক  অবসাদ। বৌদি কারো  হাতের  রান্না খাবেন  না, হোম ডেলিভারি তো দূর অস্ত। সুতরাং গজুদাকেই ঘর ঝাঁট দেওয়া, মোছা, রান্না বান্না সব কিছুই  করতে  হয়। তারপরও  লিখতে বসলেই  বৌদির  চেঁচামেচি  শুরু হয়ে যায়। শুনে মনটা  খুব খারাপ হয়ে গেল। এই ব্রহ্মান্ডে একা সূর্য ই তো নয়, বহু ছোট বড় নক্ষত্র, গ্রহ উপগ্রহ  আছে যদিও  সূর্য  তুলনামূলক ভাবে কাছে থাকার  জন্য  তার উপস্থিতি সব সময়ই মনে পড়িয়ে দেয় কিন্তু রাতের আকাশে যখন  তিনি থাকেন  না তখন  চাঁদের  স্নিগ্ধ মহিমা বা ঝিকমিক করতে থাকা বহুদূরের নক্ষত্রগুলো  কি দৃষ্টিনন্দন  নয়? গজুদার লেখা রবীন্দ্রনাথ  বা অন্যান্য  নামী সাহিত্যিকদের  মতো না হলেও  তার ও একটা আলাদা বৈচিত্র্য  রয়েছে। বিরিয়ানি খেলেও  শুক্তোর ও তো একটা আলাদা স্বাদ  আছে।


উদ্বৃত্ত

ফাটকওয়ালা বাড়িটার সামনে আজ অনেক লোকের ভিড়। অনুত্তম  বা ডাকনামে  অনু বলে যার পরিচিতি, এই পাড়ারই  ছেলে কিন্তু অনেকদিন  বাদে নিজের শহরে এসে দেখছে অনেক পরিবর্তন। বেশ ডাকাবুকোই তো ছিল  সে এবং সেই কারণেই  তার পরিচিতির  ব্যাপ্তি ছিল বিস্তৃত।  খেলাধূলো, পড়াশোনায় যথেষ্ট  নামী ছেলে থাকায় সকলেরই  খুব  প্রিয় ছিল। কিন্তু বহুদিন পরে ফিরে এসে এতটা পরিবর্তন  সে আশা করেনি। ফাটকওয়ালা বিশাল বাড়িটা তার যথেষ্টই  পরিচিত এবং ঐ বাড়িতেই  থাকা উদো দা তো একসময় অনুর আইডল ছিল। দীর্ঘদেহী উদো দার চেহারা ছিল পেটানো এবং উনিও  খেলাধূলোয় বিশেষ  পারদর্শী এবং যে কোন  লোকের  বিপদে আপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন  বলে উদো দা যে সকলের কাছের মানুষ  হবেন  সেটা বলাই বাহুল্য এবং অন্য অনেকের  মতোই  অনুও উদো দার ভীষণ  বড় ভক্ত ছিল।

উদো দার ভাল  নাম একটা নিশ্চয়ই  ছিল কিন্তু খুব  কম লোকই  তার ভালনামটা জানত। আর নাম জেনে কাজ কি? প্রয়োজনে রাত বিরেতে যাকে ডাকলেই  পাশে পাওয়া যায় তাতে নামের  কি দরকার, উদো দা উদো দা ই। ব্যাস সাফ কথা। কিন্তু ঐ নামের  পিছনে একটা রহস্য  বা সত্য লুকিয়ে আছে যেটা অনু ভাবলেও  ঠিক  বুঝে উঠতে পারেনি। উদো দা যে স্কুলে পড়তেন  সেই স্কুলের  মাস্টার মশাই ছিলেন  সদানন্দ বাবু।  পাড়ার পূজো উদো দাদের  বাড়িতেই  হতো। একদিন  সদানন্দ বাবু গল্প  করতে করতে বলে ফেললেন  উদো দার  ভাল নাম। সবাই  উদগ্রীব  হয়ে শুনছে স্যারের কথা। উদো দার আসল নাম  উদ্বৃত্ত নারায়ণ মিত্র। সবাই  হাঁ হয়ে গেল ঐ অদ্ভুত  নাম শুনে।  সদা দা, এইরকম  নামকরণের  কি অর্থ  থাকতে পারে, পানু বাবু জিজ্ঞেস করলেন।  সদানন্দ বাবু অনেক  পুরনো লোক, উদো  দার দাদুকে ভাল মতন চিনতেন।  তাহলে  শুনুন  ঐ নামের  পিছনে আসল কি কারণ। এই যে বিশাল  বাড়িটা দেখছেন  যেখানে  আমরা বছর বছর  পূজো করছি, এটা উদোর  দাদুর  বাড়ি। উদোর  বাবারা ছিল পাঁচ ভাই এবং উদোর বাবা  ছিল  সবচেয়ে বড় ভাই। বলদেব বাবু বা উদোর  বাবা, এই যে দেখছেন  উদোকে, তার এককাঠি বাড়া।বলদেব  বাবুও  ভীষণ  জনদরদী ছিলেন এবং তাঁর ই গুণ উদো পেয়েছে। তাঁর ছোট ভাইদের  সব বিয়ে থা হয়ে ছেলেপুলে হয়ে যাওয়ার  পর বলদেব বাবু  যখন  কুমড়োকাটা  ভাসুরের  দায়িত্ব  পালন  করছেন  তখন  মায়ের  একান্ত অনুরোধ  ফেলতে না পেরে বলদেব বাবু বিয়ে করেন  আর তার  বেশ  কয়েকবছর  পর উদোর  আগমন। বলু দা বা বলদেব বাবুর  সম্বন্ধে তাঁর ডাকসাইটে জাঁদরেল উকিল বাবা কোনদিন ই উচ্চাশা  পোষণ করতেন না এবং কথায় কথায় অপদার্থ  হারামজাদাটার কিস্যু হবেনা বলতেন  যদিও  বলুদাও ওকালতি  করতেন কিন্তু বাবার সঙ্গে কিছুতেই  বনতো না। বলদেব বাবু ছিলেন  জনতার  উকিল  আর উদো টাও পড়াশোনায় খারাপ  ছিলনা এবং বাবার মতোই সেও হয়েছিল  জনতার উকিল। ওর দাদু অবশ্য  উদোর  ওকালতি  দেখে যেতে পারেননি কিন্তু স্কুলে ভর্তির  সময় খানিকটা  তাচ্ছিল্য ভরেই  নাম দেন উদ্বৃত্ত নারায়ণ মিত্র।  সেই উদ্বৃত্ত  মুখে মুখে  হয়েছে উদো।

উদো দা ছিলেন  অকৃতদার।  জনগণের  সেবা, বিনা পয়সায় বা নামমাত্র  পয়সায় গরীবগুর্বোদের  হয়ে মামলা লড়া এই ছিল  তাঁর  নেশা। পয়সা বিশেষ  করতে পারেন নি উদো দা কিন্তু তাঁর  দরজা ছিল  সব সময়ের জন্য  খোলা। মামলা  জিতে টাকা না দিতে পেরে গরীব মানুষ টা হয়তো মদের  একটা বোতল দিয়েছে, তাই সই। হারামজাদা আমাকে এবার  না খাইয়েই  মারবে বলে বোতলটা  রেখে দিয়েছেন আর আরও  একটা তীক্ষ্ণ  গালাগাল  বর্ষণ করে ভাগিয়ে  দিয়েছেন। আজ শহরের  এখানে ওখানে ছড়িয়ে থাকা  মুসলমান পাড়া, বাগদী পাড়া, মেথর পাড়া, মুচি পাড়া, ডোম পাড়ার আবাল বৃদ্ধ বনিতা জড়ো  হয়েছে তাদের চলে যাওয়া বাপ মা উদো দাকে একবার চোখের  শেষ দেখাটা  দেখতে এসেছে ফাটকখোলা বাড়ির মাঠে। কাল থেকে ফাটকটা  বন্ধ  হয়ে যাবে চিরতরের  জন্য  এই সাধারণ  মানুষ গুলোর  কাছে, পাহারা দেবে উদো দার ডাকসাইটে জাঁদরেল উকিল দাদুর  ভূত। ঐ বড় মাঠটা  আজ কানায় কানায়  ভর্তি এই অতি সাধারণ  গরীবগুর্বোদের ভিড়ে। কান্নার  রোল  উঠেছে আমাদের  বাপ মা চলে গেল বলে। ভগবান,  আল্লা এ কি তোমার  বিচার? হঠাৎই আর্তনাদ ভরা চিৎকারের  রেশ  বেড়ে গেল উদো দার  ভাইপোকে দেখে। ওই মুখাগ্নি  করবে বলে এসেছে , বড্ড ভালবাসত  যে ওকে। ওর জলভরা  চোখ অনুকে  দেখেও  চিনতে পারল না যদিও  অনু তাকে চিনতে পেরেছে। অনুর মনটা ও খুবই  ভারাক্রান্ত।  এতদিন  বাদে চেনা শহরটায়  এসে অনেকের কাছে অচেনা কিন্তু যে লোকটা  চিনতে পারতো সেই লোকটাও  আজ বহু দূরে  চলে গেছে। 

সংসারে যতদিন  প্রয়োজন ততদিন ই সবাই  মনে রাখে আর প্রয়োজন ফুরোলেই  হয়ে যায় উদ্বৃত্ত। তখন  উদো দা বা উদ্বৃত্ত নারায়ণ মিত্র জানতে পারে যে এই জনমের  মতো তার প্রয়োজন শেষ। অতএব,  চলো ফিরে যাই তাঁর  কোলে।

 

Sunday, 13 March 2022

মেলি নয়ন সুদূর পানে

কেমন করে যে বয়ে গেল  যৌবনের  ঝলমলে দিনগুলো নিজেরই অজান্তে নিজেই জানিনা। দেশের  একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চললাম ছুটে কাজের তাগিদে, সামনে ঝুলছে প্রমোশনের ললিপপ; অতএব ছোট তার পিছনে, সমস্ত ব্যক্তিগত এবং সংসারের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য  বিসর্জন  দিয়ে, পৌঁছাতেই হবে সেই সোপানে। আমরা সবাই  পিরামিডের শীর্ষ বিন্দুতে পৌঁছাতে চেষ্টা করি কিন্তু নিজের নিজের সামর্থ্য ও চেষ্টা অনুযায়ী বিভিন্ন স্তরে আটকে যাই । এটাই স্বাভাবিক।  যে যত পরিশ্রম করবে সে ততটাই  উঁচুতে উঠবে অবশ্য  ভাগ্যের  কিছুটা সহায়তা থাকা চাই। বহুসময় এমনও দেখা যায় যে দুজনেই তুল্যমূল্য  কিন্তু একজনের  ভাগ্য সহায়ক হওয়ায় সে পরের স্তরে পৌঁছে গেল এবং অন্যজন তার পূর্বতন জায়গায়ই থেকে গেল। আবার  এমনও হয় যে একটা গাড়ি একটা সিগন্যালে  এগিয়ে গিয়েও পরের সিগন্যালে  আটকে গেল। এটা হামেশাই  হয় এবং ভবিষ্যতেও হবে। কখন বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এল খেয়ালই নেই, একদিন  একটা সীল করা খামে সেবা নিবৃত্ত হবার পরোয়ানা এসে গেল এবং ঝুলন্ত ললিপপটা চোখের  সামনে থেকে অদৃশ্য  হয়ে গেল। মাসের শেষ দিনে একটা বিশেষ  সভায় হঠাৎই হয়ে গেলাম  বিশেষ অতিথি এবং সেদিনের  সভার কেন্দ্রীয় আকর্ষণ। বেশিরভাগ লোকই সেদিন প্রশংসার বানে ভাসিয়ে দিল আবার  পিছনে কেউ কেউ  চাপা গলায় বলল,"যাক বাবা,বাঁচা গেছে, আপদ বিদায় হয়েছে।" এটাই স্বাভাবিক।  কোন লোকই  সবাইকে খুশী করতে পারেনা আর সবাইকে খুশী করতে গেলে তাকে নিজেকেই  অসুখী হতে হবে। যাই হোক,  একটা চলন্ত গাড়ি হঠাৎই  ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষায় থেমে গেল। যে মানুষটা গতকাল  অবধি ঘুম থেকে উঠেই প্রাতঃকৃত্য সেরে স্নান করে অফিস  যাবার  তোড়জোর করতো, আজও অভ্যেস বশত তাই করল কিন্তু আজ ড্রাইভার  এলনা  ব্রীফকেস নিয়ে যেতে, কেমন যেন অজানা অচেনা হয়ে গেল সবার কাছে,  হয়ে গেল  অপাংক্তেয়। সময়ই সময় এখন কিন্তু কি করে যে সময়টা কাটাবে তার কোন  ব্যাখ্যা নেই তার কাছে। যারা আগে থাকতেই  নিজেদের  রিটায়ারমেন্ট  প্ল্যানিং করে রাখে তারা কিছুদিন পরেই নতুন জায়গায় খাপ খাওয়ানোর কথা ভাবতে থাকে আর যারা এটা করতে অপারগ বা রিটায়ারমেন্টের পরে অপ্রয়োজনীয় তাদের হয় মুস্কিল। নতুন বন্ধুর খোঁজে তাদের  থাকতে হয়। ভাগ্য ভাল হলে মনের মতো বন্ধু মেলে আর তা নাহলেই প্রয়োজনের বন্ধুর খোঁজ করতে হয় । বেশিরভাগ  ক্ষেত্রেই  এই প্রয়োজনের বন্ধু মেলে , প্রয়োজন শেষ তো বন্ধুত্বও  শেষ। প্রকৃত বন্ধুর দেখা মেলাই ভার। তাহলে জীবনের  বাকি কটা দিন  কিভাবে কাটবে? যদি আত্মীয়স্বজন কাছাকাছি থাকে এবং তাদের  সঙ্গে সুসম্পর্ক  থাকে তবে তাদের নিয়ে একসঙ্গে ছোটখাট কোন ট্যুর করা যেতে পারে এবং এতেও মোটামুটি দুচার দিন বাইরে ঘুরে এলেও কিছু বিশুদ্ধ  বাতাসে শরীর ও মন চাঙ্গা হয়ে যাবে। তবে এই আত্মীয়স্বজনের  সঙ্গে সম্পর্ক তো একদিনেই  গড়ে ওঠেনা,  এরজন্য দরকার  দীর্ঘদিনের  নিরলস প্রচেষ্টা। এটা না থাকলে হঠাৎ কাউকে যেতে বললেই  সে যেতে রাজি  হবে এটা আশা করাই বাতুলতা।

ভগবানের  আশীর্বাদে আমাদের আত্মীয়স্বজনের  সঙ্গে মোটামুটি ভাল  সম্পর্ক  থাকার  সুবাদে মাঝে মাঝেই নির্মল বাতাসের  সন্ধানে আমরা বেরিয়ে পড়ি। মাঝে দুটো বছর আপদ করোনার  উৎপাতে এটা যথেষ্ট  ব্যাহত হয়েছে, শুধু আমাদেরই  নয় ,সবাইকে ব্যতিব্যস্ত করে ছেড়েছে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে কোথাও  যাওয়ার  ভীষণ  প্রয়োজন।  গোদের উপর বিষফোড়ার মতন আবার  বহুদিনের  হাঁটুর ব্যথাকে বিদায় জানাতে হাঁটু প্রতিস্থাপন  করতে হয়েছে। সুতরাং শারীরিক  ও মানসিক ভাবে প্রায় বিপর্যস্ত  অবস্থা। যাই হোক, সবার সঙ্গে আলাপ আলোচনার পর ঠিক  হলো ঘাটশিলা যাওয়া হবে। সেখানে প্রখ্যাত  লেখক বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের স্মৃতিবিজড়িত কিছু ঘটনার  সঙ্গে পরিচিত  হওয়া এবং সুবর্ণরেখার  ধারে কিছু সময় কাটানোর এক প্রলুব্ধ হাতছানি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাসপাতালের লাউঞ্জে বসে ডাক্তার বাবুর জন্য  অপেক্ষারত সময়ে যোগাযোগ করলাম  ওখানকার  এক হোটেলের সঙ্গে। ম্যানেজারের  সপ্রতিভ জবাবে খুবই  খুশি হয়ে জানুয়ারির  তেইশ এবং চব্বিশ  তারিখে কুড়ি জনের জন্য  দশটা ঘর বুক করা হলো শহর থেকে একটু দূরে। কিন্তু একটা মুশকিল  হলো যে একতলা, দোতলা এবং তিনতলায় মিলে দশটা ঘর হলো এবং খাওয়া দাওয়ার  ব্যবস্থা তারাই করবে জানালো। কিন্তু আবার  সেই করোনা নামক দৈত্যর তৃতীয় ঢেউ এসে পড়ায় সমস্ত  উৎসাহে আবার  জল পড়ে গেল। এর মধ্যে একজন  আসবে বম্বে থেকে, সুতরাং তার আসার  পরেই দিন স্থির করতে হবে এবং মার্চ মাসের  নয় তারিখ  সকাল বেলায় যাত্রা করে এগার তারিখ  সন্ধেবেলায় ফিরে আসা। বাস ঠিক  করা হলো এবং সাড়ে পাঁচটায় যাত্রা শুরু করে সবাইকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা দুটো বেজে গেল। ইতিমধ্যে এক বিপত্তি ঘটেছে। যে হোটেল  প্রথমে বুক করা হয়েছিল এবং পরে বহুচেষ্টায় তারিখ  বদলানো  হয়েছিল  তারা জানালো  যে তাদের  পক্ষে খাওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব  নয়। এক ভীষণ সমস্যার মুখোমুখি হলাম।  আমাদের  সবাই সিনিয়র  সিটিজেন, কেউ কেউ সুপার ডুপার সিনিয়র  সিটিজেন।  এদের  খাওয়ার ব্যবস্থা না করলে সেখানে যাওয়াই বৃথা। অতএব শুরু হলো অন্য হোটেলের  খোঁজ।  ভগবান  সহায় হলে সব কিছুই সম্ভব। বিভূতিভূষণের বাড়ির  কাছেই  এক হোটেলের  খোঁজ  পাওয়া গেল, নাম তার হোটেল বিভূতি বিহার। এই হোটেলের  ম্যানেজার  ওমপ্রকাশ জী অত্যন্ত  ভদ্রলোক।  তিনি আমাদের  সবার  জন্য  একতলায় ব্যবস্থা করে দিলেন।  আগেভাগে বলে দেওয়ায় খাওয়ার  কোন কষ্টই হলোনা। বিকেল  বেলায় বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের  বাড়ি দেখা হলো। বাড়ির কম্পাউন্ডেই  একটা বাংলা মাধ্যমের  স্কুল চালান স্থানীয় কিছু বাংলাপ্রেমী ভদ্রলোক কোনরকম  সরকারি অনুদান  ছাড়াই।  তাঁদের  নিরলস প্রচেষ্টা এবং আমাদের  মতন কিছু বেড়াতে আসা লোকজনদের  সহায়তায় স্কুলটি চলে এবং কিছু সাংস্কৃতিক  অনুষ্ঠান ও করে তারা। যাই হোক কিছু টুকরো টুকরো স্মৃতি সঞ্চয় করে  সুবর্ণরেখার তীরে সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করার জন্য রওনা দিলাম। মাঝপথে হিন্দুস্থান কপারের কারখানাকে রেখে ফিরে আসতে আমাদের দেরী হয়ে যাওয়ার জন্য মাঝপথেই দিনকর সেদিনের  মতো আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। অতএব,  হোটেলেই ফিরে আসা এবং বিশ্রাম  নেওয়া। অনেকটা জায়গা জুড়ে হোটেলের অবস্থান  এবং নানা ফুলের  সমাহারে এক অপূর্ব সুন্দর দোতলা হোটেল। দশ তারিখ  ভোরবেলায় উঠে স্নান করে জায়গার  চারপাশ  ঘুরছি এবং কোনও  জায়গায় চা পাওয়া যায় কিনা তার খোঁজ করছি কিন্তু না, আশে পাশে কোন চায়ের দোকান  নজরে  এলনা। হঠাত,  দূরে দেখি একটা দাড়িওয়ালা লোক বাবা জী হোটেলের  সামনে ঝাঁট দিচ্ছে। ওকে জিজ্ঞেস  করলাম  কখন খুলবে এই হোটেল? ও জানালো যে একটু পরে আসবে মালিক। আমি এধার ওধার ঘুরে চা না পেয়ে ভগ্নমনোরথ হয়ে যখন  ফিরছি তখন দেখি দাড়িওয়ালা বাবাজীর ঝাঁট দেওয়া শেষ।  এখনও  আসেনি লোক জিজ্ঞেস করায় সে হোটেল সংলগ্ন  একটা বাড়ি থেকে একজন মহিলাকে ডেকে আনল। আমি জিজ্ঞেস করলাম  বহেনজী, অভি চায়ে  মিল সকতা হায়? হাঁ, বাবুজী  অভি বনা কে দে রহা হুঁ। তুলসী পাতা দিয়ে খাঁটি দুধের  চায়ে  হাল্কা মিষ্টি দিয়ে যে চা খেলাম,  এককথায় অপূর্ব।  ওখানে আসা দুটো দেহাতি ছেলে, দাড়িওয়ালা বাবাজী এবং কুনি দেবী( হোটেলের  মালকিন) এবং আমার  দুকাপ চায়ের  দাম ষাট টাকা মিটিয়ে ফিরে এলাম।  বাড়তি  প্রাপ্তির  মধ্যে কুনি দেবীর ঘরে ভাজা একমুঠো মুড়ি সম্পূর্ণ আলাদা স্বাদের। সন্ধেবেলায় তাঁকে বলে রাখা কুড়িজনের  জন্য  চা হয়ে গেল ত্রিশটা,  এতই ভাল  লেগেছে সকলের। 

পরের দিন অর্থাৎ দশ তারিখ সকাল বেলায় ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়ে পড়লাম  গালুডি ড্যামের  দিকে। শীর্ণকায় নদীর কঙ্কালসার ফল্গুধারায় উজ্জীবিত  হয়নি বাঁধের ধরে রাখা জল, সুতরাং একটু হতাশই হতে হলো কিন্তু বর্ষার  আগমনে এই বাঁধই জলে টইটম্বুর হয়ে ওঠে এবং বিস্তীর্ণ এলাকার চাষে হাত বাড়িয়ে দেয়। খানিকক্ষণ  থেকে রওনা দেওয়া হলো যাদুগুড়ায় রঙ্কিনী দেবীর  মন্দিরের  উদ্দেশ্যে। যাদুগুড়া বিখ্যাত তার ইউরেনিয়াম ভান্ডারের  জন্য। সুতরাং ভারত সরকারের  কড়া নজরদারিই  স্বাভাবিক।  যাই  হোক,  তাকে পেরিয়ে রঙ্কিনী দেবীর  মন্দির  পৌঁছলাম।  মায়ের  মন্দিরে দূরদূরান্ত থেকে বহু লোক পূজো দিতে আসা মনস্কামনা পূরণের জন্য। একটা জিনিস  চোখে  পড়ল যে পুণ্যার্থীরা সবাই খুব  সুশৃঙ্খলভাবে পূজো দিচ্ছেন  যা সাধারণত অন্যান্য  মন্দিরে সচরাচর  চোখে পড়েনা। এরপর যাত্রা শুরু হলো নয়নাভিরাম  বুরুডি ড্যামের দিকে। এটা গালুডির মতো আধুনিকা নয় বরং বেশ পৃথুলা। সুতরাং এক বিস্তীর্ণ  সুগভীর জলরাশি মনকে বেশ টানে। ওখানে নৌকাবিহারের ব্যবস্থা ছিল  কিন্তু সময় হাতে না থাকায় এবং এত সুপার সিনিয়র সিটিজেনদের  নিয়ে তা অসমাপ্ত রেখেই  চলে আসতে হলো। ওখান থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের  টিলায় থাকা ঝর্ণা ধারা না দেখেই চলে আসতে  হলো। আসলে আমাদের  একটা ভুল  হয়েছিল কোন গাইড না নেওয়ায় আর আমাদের  ড্রাইভার ও ছিল  আনকোড়া। হোটেলে ফিরে এসে খাওয়ার পর একটু  ছোট্ট  ভাতঘুম দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম রামকৃষ্ণ মিশনের  উদ্দেশ্যে। সান্ধ্য আরতির এক বিশেষ  আকর্ষণ  এই রামকৃষ্ণ মিশন।  হোটেলে ফিরে আমাদের  সদা যুবতী তিরানব্বই বছরের  মাসিমা চল্লিশ পঞ্চাশের আধুনিকাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নাচে গানে মেতে উঠলেন যা সব পাওয়াকেই  ছাড়িয়ে গেল। পরের দিন এগার  তারিখ  ফেরার পালা। ব্রেকফাস্ট সেরে চল ফিরে নিজ নিজ ডেরায়,  মাঝখানে কোলাঘাটে শের ই পাঞ্জাবে অবশ্যই মধ্যাহ্নভোজন সেরে।

Saturday, 26 February 2022

সাঁঝ বসন্ত

হে বিটপী, ত্যজিয়া পুরাতনে
বরণ করেছ সতেজ নবীনে
উঠেছ সাজিয়া নব কলেবরে
ভেবেছ  কি কভু সেই পাখিদের 
ছিল যারা তব পুরাতন আশ্রয়ে
হইবে কি দশা ঘর ছাড়া হয়ে 
সাধ্য কি আছে সতেজ নবীনে
বিতাড়িত  করি শঙ্কা? বলিতে পারিতে 
হে পুরাতন, রহো না বক্ষে আরও  কিছুক্ষণ 
ফিরিত  আস্থা শঙ্কিত পাখিদের। 

Sunday, 13 February 2022

গল্প হলেও সত্যি

কোন কোন সময় যখন  শুনি যে এক অত্যন্ত  দরিদ্র পরিবারের থেকে একটা ছেলে বা মেয়ে ধনুকের ছিলা থেকে বেরিয়ে আপন গতিতে এগিয়ে চলেছে তখন মনে হয় আমি কি স্বপ্ন দেখছি না জেগে আছি। নিজের গায়ে চিমটি কেটে অনুভব করতে চেষ্টা করি যে এ কি গল্প না সত্যি। 

গতকাল  এক বন্ধুর বাড়ি থেকে ফেরার  সময় এইরকম  এক ঘটনার  মুখোমুখি হ'লাম। ওখান থেকে ফেরার  উপায় হয় নিজের গাড়ি নিয়ে যাও না হলে বেশ খানিকটা দূর হেঁটে এসে অটোতে চড়ে মেন রোডে এসে ট্যাক্সি নাও কিংবা ভাগ্য ভাল  থাকলে ট্যাক্সি পাওয়া গেলে সরাসরি বাড়ি ফিরে এস আর একান্তই  কিছু না থাকলে উবের নিয়ে চলে এস। কিন্তু এত নানান দিকে রাস্তা আর খোঁড়াখুঁড়ির দৌলতে উবের  পেলেও তাকে যথাযথ ডিরেক্শন  দিয়ে নিয়ে আসা বন্ধুর সাহায্য  ছাড়া  সম্ভবই  নয়। যাই হোক,  শেষ পন্থাই নিতে হ'ল অর্থাৎ বন্ধুর সাহায্য  নিয়ে উবেরে চলে আসা।

অনেক ঘোরাঘুরি করে ভদ্রলোক অনেকবার  টেলিফোন  করে এসে উপস্থিত  হলেন। এসেই হাঁফ ছেড়ে বললেন, " বাপরে, ফর্টিস হাসপাতাল  থেকে হাঁটু অপারেশন করা এক রোগীকে এখানেই  ছাড়তে এসে আমারও  অপারেশন করা স্পাইন্যাল কর্ডের ব্যথাটা চাগিয়ে উঠল।" আঁতকে উঠে আমার  গলা থেকে " অ্যাঁ" শব্দটা বেরিয়ে এল। 
স্যার,  আপনার  কি লাগল? 
না, না, না। ভাগ্যচক্রে আপনি এক হাঁটু অপারেশন করা রোগীকে নিয়ে এসে আবারও এক হাঁটু অপারেশন করা রোগীকে নিয়ে যাচ্ছেন। ধীরে ধীরে গল্পটা জমে উঠল রাস্তা সরু হওয়ার জন্য এবং গাড়ি নিয়ে তাড়াতাড়ি না যেতে পারার জন্য। করোনার  দৌলতে বাড়ির বাইরে না যেতে পারার জন্য একটু কথা বলার জন্য  ভিতরটা  হাঁকপাঁক  করে। সুতরাং যে কোন  লোক পেলেই তার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে এবং তার হাঁড়ির খবর জানতে ইচ্ছে করে। কথায় কথায় জানলাম  যে সদানন্দ বাবুর( উবর ড্রাইভারের  নাম সদানন্দ সরকার) স্পাইন্যাল কর্ডের অপারেশন  হয়েছে এবং কোনরকম পয়সা খরচ না করেই। একটু  বিস্মিত  হয়েই জিজ্ঞেস  করলাম,  কোথায়, কোন সহৃদয়  ডাক্তারের সহায়তায়?  তার  উত্তরে তিনি জানালেন  যে সরকারি হাসপাতাল  পি জি হাসপাতালে ডাক্তার  অমিতাভ  চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে একদম নিখরচায়। সঙ্গে সঙ্গে বহু সমালোচিত মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসাও করলেন। শুনে মনটা একটু আশ্বস্ত  হ'ল যে পি জি হাসপাতালে শুধু বদমাস  দুর্নীতিবাজ নেতাদের  পুলিশের  হাত থেকে বাঁচার জন্যই নয়, সাধারণ  লোকেরও কিছু চিকিৎসা হয়। এটাই তো হওয়ার  কথা,  কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এটা দালালদের মাধ্যমে এখন রাজনৈতিক  দাদাদের কব্জায় চলে গেছে । কথায় কথায় জানলাম যে তাঁর একটা স্টেন্ট ও বসেছে নিখরচায়। ঔৎসুক্য না চেপে জিজ্ঞেস  করেই বসলাম যে পি জি হাসপাতালে দু দুবার  বিনা খরচে চিকিৎসা করালেন , কোন নেতাকে ধরে ? উনি তো পরিষ্কার  জানালেন  যে কোন নেতাকে না ধরেই আউটডোরে দেখিয়ে তাঁর চিকিৎসার  ব্যবস্থা হয়েছে যদিও  এখনও  আমার  সন্দেহটা এখনও  যায়নি। আবার  জিজ্ঞেস করলাম যে স্পাইন্যাল কর্ডের  অপারেশনের  পরে গাড়ি চালাচ্ছেন,  কোন অসুবিধা হচ্ছে না? উনি বললেন,  গাড়ি না চালালে সংসার  কি করে চালাবেন। বাড়িতে কে কে আছেন  জিজ্ঞেস করায় উনি জানালেন  যে তাঁরা স্বামী , স্ত্রী এবং তাঁদের একমাত্র  ছেলে।
" ছেলে কি করে?"
উত্তর  শুনে মাথা একদম ঘুরে গেল। ছেলে অ্যাস্ট্রোফিজিক্সে এম এস সি করে পি এইচ ডি করছে। নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র সৌহার্দ্য,  সদানন্দ  সরকারের  একমাত্র  সন্তান, ডক্টরেট  করে তার  বাবাকে গাড়ি চালানো থেকে বিরত করবে এই প্রার্থনাই  ভগবানের  কাছে করি। আরও  অনেক  সৌহার্দ্যর সমাহার আমাদের দেশে আসুক এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাক এই আশা নিয়েই  বেঁচে থাকি।

Friday, 31 December 2021

নববর্ষ

বিষে বিষময় দুহাজার বিশ
মারণ গরল আনিল  একুশ 
তবুও আশায় থাকি অহর্নিশ 
আসিবে মঙ্গলদায়ী দুহাজার বাইশ

নতুন বছরের অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইল। 

এযুগের দধীচি

পুরাণে মহর্ষি  দধীচির সম্বন্ধে জানেনা এমন লোকের  সংখ্যা খুবই  কম। যারা একদম নিতান্তই কোন  খবর  রাখেন না তারা ব্যতীত প্রায় সমস্ত লোকই মহর্ষি  দধীচির আত্মত্যাগের কথা জানেন। তিনি তাঁর  প্রাণ ত্যাগ  করেছিলেন দেবতাদের অসুরদের বিরুদ্ধে জয়লাভ  করার জন্য। 
দেবরাজ  ইন্দ্র তাঁর সহযোগী অন্য দেবতারা স্বর্গ থেকে প্রায় বিতাড়িত  অসুরদের দ্বারা। অসুরদের  দলপতি বৃত্রা শিবের আশীর্বাদে প্রায় অমরত্ব লাভ করেছিলেন। তাকে কোন  অস্ত্রের দ্বারা বধ করা যাবেনা। তাহলে তাকে হারাবে কে? আর সঙ্গে সঙ্গে দেবরাজ  ইন্দ্রকেও  তাঁর  চ্যালা চামুন্ডা সমেত  স্বর্গ থেকে চাটি বাটি গোটাতে  হবে। স্বয়ং রাজা ইন্দ্র মুখ কালো করে ভগবান  বিষ্ণুর শরণাপন্ন  হলেন। রাজনীতি তখনও  ছিল  এখনকার  মতো। রাশিয়া বা আমেরিকা এখন যেমন একবার  ভারতের  গালে আর একবার  পাকিস্তানের গালে চুমু খায়, তখনও  ভগবান  বিষ্ণু এবং মহেশ্বর  আমেরিকা রাশিয়ার  রোল প্লে করতো। স্বয়ং ভোলানাথ অল্পেই  তুষ্ট হন এবং বেশি কূটকচালির মধ্যে না গিয়ে খুব বেশি না ভেবেই চাওয়া এমন একটা বরকে  তথাস্তু বলে বসতেন যে তাকে সামলাতে অন্যদের  দফারফা। রাশিয়া যদি প্যালেস্টাইনকে  সমর্থন  করে তবে আমেরিকাকে ইস্রায়েলের  সমর্থনে নামতেই  হয়। সুতরাং স্বয়ং বিষ্ণু যে দেবরাজ  ইন্দ্রকে বুদ্ধি দেবেন  এতে আর আশ্চর্য  কি আছে। তিনি দেবরাজ  ইন্দ্রকে বললেন যে যাও মহর্ষি দধীচির কাছে এবং তাঁর কাছে তাঁর  অস্থি র প্রার্থনা কর। স্বর্গের  এইসব ব্যাপার স্যাপার  বড্ড গোলমেলে। দেবরাজ  ইন্দ্র, তুমি রাজা। দেবতাদের  দেখভাল  করা  তো তোমার  কাজ। কেমন তোমার  কূটনীতি হে? তুমি তো ঠিকমতো  সামলাতেই  পারনি।  তুমি থাকতে কেমন করে অসুর বাবাজী স্বয়ং মহেশ্বরের কাছ থেকে বর নিয়ে চলে গেল আর তুমি কি তখন  আঙুল  চুষছিলে? আরও  একটা জিনিস  কিছুতেই  বোধগম্য  হয়না। রাজ্যপাট  তোমার,  সামলাবে তুমি। কথায় কথায় তোমাকে দাদা ধরতে হবে কেন শুনি? অনেক  ভাবনা চিন্তার  পর একটা মিল এখনকার  রাজনীতির  সঙ্গে মিল খুঁজে পেলাম। সংবিধান  অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর সর্বময়  ক্ষমতা কিন্তু কোথা থেকে তাঁর মাথার উপর উড়ে এসে জুড়ে বসল ন্যাশনাল অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল যার মতামত ছাড়া পাতাও  হেলবে না। অতএব যা হবার  তাই  হলো। দেবরাজ  ইন্দ্রর ক্ষেত্রেও  তার কোন  ব্যতিক্রম  নয়। সুতরাং  আমেরিকান বিষ্ণুর কথামতন  মহর্ষি দধীচির  কাছে যাওয়া এবং আবদার  ধরা, ঋষিবর, " আপনি প্রাণ ত্যাগ  করুন  এবং আপনার  অস্থি দিয়ে আমি অস্ত্র বানাবো এবং সেই  অস্ত্রে  আমি বৃত্রাসুরকে বধ করে স্বর্গ  উদ্ধার  করব।" মহর্ষি জ্ঞানী পুরুষ , উনি দেবরাজ ইন্দ্রর আগমনের  কারণ জানেন এবং একটা শর্ত  আরোপ করলেন। তিনি বললেন যে সমস্ত নদীতে অবগাহন করার পর তিনি প্রাণ ত্যাগ  করবেন। কিন্তু ইন্দ্রর আর তর সইছে  না অথচ মহর্ষিকে হত্যাও  করতে পারছেন  না। আর ঐদিকে  ঊর্বশী,  মেনকাদের  নৃত্য গীত  কতদিন  শোনা হয়নি আর সেই জায়গায় অসুররা আহ্লাদিত  হচ্ছে তাদের  নৃত্য গীতে,  এটা ভেবেই  দেবরাজের মন খুব খারাপ  হয়ে গেল। তিনি তখন  সমস্ত নদীর  জল একত্রিত  করে সেইখানে নিয়ে এলেন  এবং মহর্ষিকে বললেন, " এইখানেই  সব নদীর  জল আছে যেটা  যোগবলে আপনি জেনে নিতে পারেন  যে সব ঠিক ঠাক আছে কিনা।" এখনকার  যেমন অডিটরের  সামনে  সমস্ত বই খাতা ফেলে দিয়ে বলা হয় দেখে নিন স্যার একবার  চোখ বুলিয়ে আর চট করে সই করে স্ট্যাম্প লাগিয়ে দিন। আমাকে আর বলতে হবেনা বাপধন,  আমি বুঝেছি তোমার  যথেষ্ট  তাড়া। মুনিবর তাঁর  
কথামতন সেই জলে অবগাহন  করে স্বেচ্ছায় প্রাণ ত্যাগ করে দেবরাজ  ইন্দ্রকে ব্রহ্মহত্যা থেকে নিষ্কৃতি দিলেন। আহ্লাদে আটখানা দেবরাজ  ইন্দ্র তাঁর  অস্থি নিয়ে সঁপে দিলেন  বিশ্বকর্মার  হাতে এবং তিনি মহর্ষির মেরুদন্ড  দিয়ে বানালেন বজ্র এবং সেই বজ্রাঘাতে  নিধন হলো বৃত্রাসুর এবং দেবতারাও  ফিরে পেলেন  তাঁদের মনসবদারি। আর বেশ  লোকদেখানি শান্তি স্থাপন হলো ভগবান  বিষ্ণুর মহেশ্বরের  সঙ্গে। ব্রিটেন আমেরিকা ও রাশিয়া যেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের  পুনর্মিলন  হলো।

এ তো গেল সেই পুরানের কচকচানি। এবার  আসা যাক আজকের  দধীচির  কথায়। স্বার্থ ত্যাগের  মহান আদর্শ  মহর্ষি দধীচির।  অনেকটা আমাদের  পরমবীর চক্রের  মতন।  আমেরিকা বা রাশিয়া কেউ প্যাটন ট্যাঙ্ক  বা স্যাবার জেট বা এফ সিক্সটিন  বা মিগ  বিক্রি করে যুদ্ধ করতে সাহায্য  করে কিন্তু সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর  আর কেউ নিজে মাঠে ময়দানে নেমে যুদ্ধ  করতে এগিয়ে আসেনি। তোমরা আমাদের  অস্ত্র কেনো, যুদ্ধ  কর। ফেল কড়ি,  মাখ তেল। তোমরা যত যুদ্ধ  করবে কর, অস্ত্র চাই কেনো আর আমাদের  অর্থভাণ্ডার সমৃদ্ধ কর। ব্রহ্মা তো সৃষ্টি করেই খালাস,  গোল বাধে বিষ্ণু আর মহেশ্বরের।  তা,  যা চলছিল  সেটা এখনও  চলছে। আমাদের  স্লোগানের  মতো চলছে, চলবে। এখনও  ইতি উতি  খুঁজলে  কিছু দধীচির  সন্ধান  মেলে। সংখ্যায় অল্প হলেও  এরা আছে এবং এদের  এই স্বার্থহীন কাজের  জন্য  সমস্ত  পৃথিবীটা চলছে। সেবা নিবৃত্ত  হবার  পরেও  তাদের  এই অসামান্য  সেবা যে কত অসহায় লোককে অন্ধের  যষ্টির মতো সঠিক  পথে চালিত  করে তার ইয়ত্ত্বা নেই। কোনরকম  দ্বিধা না করে এরা যে কত লোকের  উপকার  করে সেটা ভাবলেই অবাক হতে হয়। কার স্বামী অসুস্থ  হয়েছেন  বা গত হয়েছেন  এই দধীচিরা কারও  ডাকের অপেক্ষা করেন না, কেমনভাবে বাতাস যেন  তাদের  কানে পৌঁছে দেয় ওখানে তোমার  প্রয়োজন আর সেও ছোটে নির্দ্বিধায়। গুরু রামদাস যখন  শিবাজীকে ভিক্ষার  সন্ধানে বেরোতে নির্দেশ  দেন তখন যথেষ্ট  অন্ধকার। শিবাজী বলেন, " প্রভু, ভিক্ষা, এখন!  এখনও  তো হয়নি প্রভাত।" গুরু রামদাস  বলেন,  " প্রভাত কি রাত্রির  অবসানে ? যখনই  চিত্ত জেগেছে, তখনই  হয়েছে প্রভাত।  চল যাই, ভিক্ষার  সন্ধানে।"  এই দধীচিদের অন্তরেই  গুরুদেবের  অধিষ্ঠান  এবং এরা স্বতঃপ্রণোদিত  হয়েই সমস্ত কিছু উপেক্ষা করে এগিয়ে যান  অন্যের  সাহায্যে। এঁরা বয়োঃকনিষ্ঠ  হলেও  এঁদের  জানাই  শত সহস্র  প্রণাম।