Thursday, 22 May 2025

শিল্পী ও শিল্প

হারু বাবু বা হারান বন্দোপাধ্যায় একজন নামী ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত  শিল্পী বালির খটখটিবাগানে থাকতেন । শ্রদ্ধেয় সঙ্গীত শিল্পী তারাপদ চক্রবর্তীর অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে তের বছর সঙ্গীত সাধনা  করেছেন এবং তাঁর অনেক ছাত্রছাত্রী।  কোন‌‌ বাঁধা চাকরি বাকরি করেন নি কোনদিন তিনি , একটাই ভয়ে যে বাঁধাধরা চাকরিতে‌‌‌ তাঁর শিল্প সাধনা ব্যাহত হবে। অল্প বয়স তখন, মনের সুখে সাধনা করে চলেছেন একনিষ্ঠ ভাবে, নাম ছড়িয়ে পড়ছেএই শহর থেকে  ওই শহরে আর খুশীর জোয়ারে ভেসে চলেছেন তিনি । শ্রদ্ধেয় শিল্পী ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য তাঁর  অগ্রজ প্রতিম এবং  তাঁর ভাই পান্নালাল ভট্টাচার্য তাঁর বন্ধু। তাঁরা তিনজনই আকাশবাণীর  নিয়মিত শিল্পী। হারু বাবু গান ক্ল্যাসিক্যাল  এবং ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য ও পান্নালাল ভট্টাচার্য গান ভক্তিগীতি এবং তিনজনই স্ব স্ব ক্ষেত্রে সমুজ্জ্বল । তখন বালি, বেলুড় ও উত্তরপাড়া অঞ্চল সঙ্গীত সাধনায় খুবই অগ্রণী ছিল। প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই সকাল সন্ধ্যায় কিছু না কিছু সঙ্গীত চর্চা শোনা যেত এবং সঙ্গীত শিক্ষকদের ছিল রমরমা বাজার। সুতরাং কেন তাঁরা বাঁধাধরা চাকরিতে‌‌‌  যাবেন? 
কিন্তু পরিবর্তন এল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে । এখন সকাল সন্ধে বেলুড়, বালি, উত্তরপাড়ার ঘরে ঘরে হারমোনিয়াম বা সেতার, সরোদের আওয়াজ বা তার সঙ্গে তবলা সঙ্গতের আওয়াজ শোনা যায়না। হারমোনিয়াম বা তানপুরা বিক্রি ভয়ানকভাবে কমে গেছে । এখন এসেছে টেকনোলজির যুগ। কি বোর্ড এবং  সিনথেজাইজারের সঙ্গে  আরও অনেক যন্ত্রের মিশ্রণে গাওয়া গানে গলার উৎকর্ষতা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। কে ভাল আর কে একটু কম ভাল তা বিচার করা খুবই কঠিন এবং  বিচারকের আসনে যাঁরা বসেন তাঁদের পছন্দ অপছন্দ ই শেষ কথা এবং  সেইখানেও  যাঁরা শ্রোতা তাঁরাও হতভম্ব হয়ে যান। অবশ্য সব যুগেই এটা ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এই যুগে আগের মতন আর দারুণ অনুশীলনে খুব কম জনকেই ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় কারণ পড়াশোনার চাপ এবং  প্রত্যেক শিশুকেই তার বাবা মায়েরা নানা বিষয়ে সেরার সেরা হিসেবে দেখতে চায় যার অবশ্যম্ভাবী ফল সব জিনিস  তারা অল্পবিস্তর জানে কিন্তু কোনটাই তারা ভালভাবে জানেনা। একটু শিখতে শিখতেই বাবামায়েরা তাদের নানাধরণের প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করাতে নিয়ে যান। বনিয়াদ একটু মজবুত না হওয়ায় এদের  বেশীরভাগ ছেলেমেয়েই বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায় । এ ছাড়া এদিক সেদিকে নানারকম স্কুল  ব্যাঙের ছাতার মতন গজিয়ে ওঠায় বাবামায়েদের ও বিভ্রান্তির একশেষ। কিন্তু এদের মধ্যেই যারা একনিষ্ঠভাবে এগিয়ে যায় তারা এই প্রতিযোগিতায় টিকে যায়।
হারুবাবু ও এই পরিবর্তন একদম বুঝতে পারেন নি তাঁর ই মতো অন্যান্য অনেক শিল্পীদের মতন। চাকরি বাকরি ও নেই,  নেই কোন বাঁধা আয়ের ব্যবস্থা, ছেলেমেয়েদের মধ্যেও কমে গেছে ক্ল্যাসিক্যাল গান শেখার ইচ্ছা এবং বেড়েছে চটুল‌ গান শিখে টিভি ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে পাদপ্রদীপের আলোয় আসা। এক সময় চারদিক আলো করে থাকা শিল্পী যাঁর চারপাশে থাকত‌ চামচার দল তারা এখন কোথায় যেন হারিয়ে গেছে । ছাত্রের জন্য‌ একে তাকে অনুরোধ করা এবং শুকনো কথায় চিঁড়ে না ভেজায় উনি বুঝতে পেরে গেছেন যে এইসব স্তাবকের‌ দল তাঁকে এড়িয়ে‌ যাচ্ছে‌ এবং আজকাল আর কাউকে বলেন না। তবে খুবই ঘনিষ্ঠ ছাত্রদের বলেন যে যদি কোন ছোটখাটো একটা কাজের সন্ধান‌ দেয়।‌ অন্তরে সবসময়ই কেঁদে চলেছেন হারুবাবু কি করে এত বড় সংসারটাকে চালাবেন। যখন প্রচুর পয়সা আসতো তখন দুহাত খুলে খরচা করেছেন, বহু লোককে অর্থ সাহায্য করেছেন কিন্তু কোনদিন  তারা সেই অর্থ ফিরিয়ে দেয়নি, বলাই বাহুল্য হারুবাবু মুখ ফুটে কোনদিন তাদের বলতে পারেন নি এবং তারাও সেই দুর্বলতার পুরো সুযোগ নিয়েছে। মাঝে দোকানদার ধারে মাল দিত কিন্তু  ঠিক সময়ের মধ্যে পয়সা না দিতে পারার জন্য তারাও মাল দেওয়া বন্ধ করেছে। চার মেয়ের বড়জন যে খুব ভাল গান করত এবং  হারুবাবু যার ওপর খুব ভরসা করতেন, সে‌ সরস্বতী পূজোর দিন বাড়ি থেকে চলে গেছে একটা ছেলের হাত ধরে যা হারুবাবুকে একদম ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। একমাত্র ছেলে যে বি কম পড়তো সে ও তার তবলার অনুশীলনে ব্যাঘাত ঘটছে দেখে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। সে মোটামুটি রোজগার করেএবং  বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছে। অসুস্থ হারুবাবু আজকাল আর গান গাইতে পারেন না, মেজ মেয়ে এখানে সেখানে ফাংশন করে‌ যা পায়‌ তাই দিয়ে কোনরকমে চলে সংসার।
দীর্ঘদিন  পরে তাঁরই এক ছাত্র  বিদেশ থেকে  এসেছেন তার মাস্টারমশায়ের সঙ্গে দেখা করতে। অশক্ত শরীর নিয়ে  হারু বাবুর আর সেই  সাধ্য নেই প্রিয় ছাত্রকে বুকে জড়িয়ে ধরার , ক্ষীণ স্বরে বললেন, " অশোক, এসেছো, কেমন আছো ?"  অশোক প্লাস্টিকের বেত ওয়ালা চেয়ার টেনে সমস্ত খবর নিল এবং  " মাস্টারমশাই,  আমি এখনই আসছি '' বলে বাইরে বেরিয়ে গেল এবং  কাছাকাছি  এ টি এম থেকে টাকা তুলে নিয়ে এল এবং  মাস্টারমশাই এর হাতে দিল কুড়ি হাজার টাকা এবং  আরও বলল যে মাস্টারমশাই  আমি আবার  আসব । ইতিমধ্যে মাস্টারমশাই এর স্ত্রী চা করে এনেছেন । তাঁর পরনের শাড়ি দেখেই অশোক  বুঝতে পারল‌ যে‌ কি অবস্থার  মধ্য দিয়ে  সংসারটা চলছে। ইতিমধ্যে  তাঁর মেজমেয়ে কোথাও গান শিখিয়ে ফিরে এসেছে এবং সংক্ষেপে সংসারের অবস্থা বলল। চোখের জল ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে দেখে অশোক তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল এবং তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিশদ বিবরণ নিয়ে নিল এবং  ফিরে যাওয়ার আগে আবার আসবে বলে বিদায় নিল।
ফিরে যাওয়ার বেশীদিন বাকি ছিলনা, অশোকের  আর মাস্টারমশাইদের বাড়ি যাওয়া হয়ে ওঠেনি কিন্তু  যাবার আগে মাস্টারমশাই এর মেয়ের অ্যাকাউন্টে একলক্ষ টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে । জানে সে যে এই টাকায় বেশীদিন  চলবে না তবে প্রিয় মাস্টারমশাইকে সে মাঝে মাঝেই কিছু টাকা পাঠাবে বলে মনস্থ করেছে।
এই হচ্ছে  সাবেকি মাস্টারমশাইদের অবস্থা যাঁরা সময়ের সঙ্গে চটুল গান স্বীকার করে নিতে পারেন নি।সরকার এই দুর্দশাগ্রস্ত শিল্পীদের পাশে যদি না দাঁড়ান তবে এই শিল্পীরা নিঃশেষ হয়ে যাবেন এবং শিল্পী ই  যদি না থাকেন তবে শিল্প কি করে সৃষ্টি হবে? 

Saturday, 17 May 2025

দীনবন্ধু মোটর ওয়ার্কস

কলকাতা থেকে এনবিএসটিসির বাসে বহরমপুরের পথে। মাঝে রাস্তাটা খুব খারাপ  থাকায় পৌঁছতে প্রায় ছঘন্টা লেগে গেল ।বিষ্ণুপুর কালীবাড়ির মোড়ের কাছে  এক বিশাল জ্যাম। বাড়ি পৌঁছতে এমনিতেই দেরী হয়েছে, তার উপর বাড়ির গোড়দোরায় এসে এমন জ্যামে মেজাজটা হয়ে গেল তিরিক্ষি। নেমে পড়ল কল্যান, ওখান থেকে  হেঁটেই মেরে দেবে। এখন চাকাওয়ালা ট্রলি ব্যাগের কল্যাণে স্যুটকেস বইতে হয়না, কুলি মজুরদের  পেটে লাথি  পড়েছে এই ট্রলি ব্যাগের জন্য।  অনেকেই নেমে হেঁটে চলে যাচ্ছে। কল্যান নামতেই হঠাৎই একটা লোহার মতন শক্ত হাত তার কাঁধে পড়ল, বলে উঠল আরে কলু না? কল্যানকে তার ছোটবেলার  বন্ধুরা সবাই কলু বলে ডাকত। কিন্তু এতদিন পর সে আসছে নিজের  শহরে, এখানে তাকে ডাকনামে কে ডাকে?  ঘাড়  ঘুরিয়ে  দেখতেই সে দেখে একটা গাঁট্টাগোট্টা কালো কুচকুচে লোক প্রায় তারই বয়সী কিন্তু মাথায় বেশ জমিয়ে টাক পড়েছে তাকে গায়ে হাত দিয়ে  ডাকছে। কলু পড়াশোনায়  বেশ ভাল ই ছিল এবং  পাশ করার পর মোটামুটি  ভাল চাকরি করায়  চেহারায় বিশেষ  কিছু পরিবর্তন  হয়নি‌ কিন্তু যে গায়ে হাত  দিয়ে  ডাকল তাকে তো সে প্রায় চিনতেই পারছে না। 
আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারছি না, একটু বলবেন আপনার পরিচয়? 
আরে আমি দীনু, দীনবন্ধু মজুমদার,  তোর সঙ্গে  একসাথে একই  সেকশনে পড়তাম কৃষ্ণনাথ কলেজ স্কুলে । ক্লাস  সেভেনে  পাশ করতে না পারার জন্য বাবা আমাকে আর পড়ালো না, বাবার সঙ্গে মোটর গ্যারাজেই হাত পাকালাম, আর আমার  ভাই জয়ন্ত পাশ করল বলে বাবা ওকে পড়ালো। ও পাশ করে কলেজ থেকে  গ্র্যাজুয়েট হয়ে ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টে কাজ  করছে আর আমি বাবা চলে যাওয়ার পরে এই গ্যারাজ সামলাচ্ছি।  মনে পড়ল অনেকদিন আগের কথা। ওকে সবাই কালবাউস বলে ডাকত । খুবই  ডাকাবুকো  টাইপের। পড়াশোনায় বিশেষ দরের ছিলনা বটে  কিন্তু  বাবার সঙ্গে ছোটবেলা থেকে মোটর গ্যারাজে কাজ  করে সে একজন নামকরা মিস্ত্রি এবং  বাবার গ্যারাজটাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে সে এক নামকরা গ্যারাজের মালিক। বহু লোক  কাজ করছে, অনেক  গাড়ি ও বাস  দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। ধীরে ধীরে  মনে পড়ছে সব পুরনো‌ দিনের কথা। সাইকেল  চালিয়ে  ও আমাদের  ঐ রাজবাড়ির মতন স্কুলের দোতলা থেকে  নীচে  নামত। স্যারেরা অনেকবার  বারণ করা সত্ত্বেও  সে শুনত না, তার সাইকেলে কন্ট্রোল এতটাই অসাধারণ  ছিল। গায়ে জোর ছিল সাধারণের তুলনায় অনেক বেশী  আর মোটর গ্যারাজে কাজ করার জন্য হাতগুলো যেন লোহা। কিন্তু এইরকম ছেলেদের  মনটা থাকে খুবই  নরম। নিজেরা পড়াশোনা করতে না পারার জন্য তারা কিন্তু  পড়াশোনায় ভাল ছেলেদের খুব  সম্মান করতো। কলু দিল্লী আই আই টিতে চান্স পাওয়ার পর যখন টাকার অভাবে  পড়তে পারেনি তখন ঐ দীনুই তাকে বলেছিল ," কলু, তুই  যা পড় গিয়ে, আমি তোর পড়ার খরচ জোগাব। তারপর তুই যখন বড়  হয়ে যাবি তখন আমার কথা ভাবিস।" মনে পড়ে গেল কলুর সেই পুরনো দিনের কথা । বড় মাটির ভাঁড়ে দুকাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে, পেঁয়াজি আর আলুর চপের সঙ্গে মুড়ি নিয়ে দুই ছোটবেলার বন্ধু স্মৃতিচারণ করছে আর গ্যারাজের সব লোকজন হাঁ করে দেখছে তাদের। তাদের মালিককে তারা কখনো এইভাবে প্রাণখুলে গল্প করতে দেখেছে বলে তাদের মনে পড়েনা। কলুর চোখে সেই কালো কুচকুচে কোঁদা চেহারায় ঝকঝকে সাদা দাঁত আর ভীষণ জ্বলজ্বলে দুটো চোখ অনেকটা নিগ্রোদের মতো সেই কালো মানিক বা কালবাউস আজ মাথার চুল অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে কিন্তু  মনটা তার আজও শিশুর মতোই রয়েছে । 
গ্যারাজ অন্ত প্রাণ  দীনু আজ বহু লোকের  অন্নসংস্থান করছে। নিজে  বিয়ে থাওয়া করেনি। জয়ন্তর ছেলেমেয়েরাই তার নিজের  ছেলেমেয়ে আর এই বিশাল গ্যারাজের লোকজনদের পরিবার ই তার নিজের পরিবার। 
এবার উঠি রে দীনু, বলে বাড়ির দিকে যাওয়ার জন্য একটা রিক্সায় উঠল কলু। ভাবছে লোকে পড়াশোনা কর পড়াশোনা কর বলে পাগল করে দেয়  কিন্তু তারা নিজেরা এত ভাল করে পড়াশোনা করে কি করেছে? একটা ভাল চাকরি, তারপর বিয়ে সংসার  কেবল নিজেদের  নিয়েই শশব্যস্ত, আর পাঁচটা লোকের  কতটা উন্নতি করতে পেরেছে?   অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সেরকম কিছু করতে পেরেছে বলে মনে করতে পারলনা কিন্তু সেখানে দীনু ঐ সামান্য  বিদ্যা নিয়েই বহুলোকের পরিবার সামলেছে, দীনু অনেক বড়মাপের মানুষ ।

Tuesday, 13 May 2025

উবের ড্রাইভার

উবের ড্রাইভারদের সম্পর্কে নানান জনের নানা অভিজ্ঞতা । বেশীরভাগ সময়ই দেখা যায় ফোনে পিন নম্বর এসে গেল এবং  ড্রাইভারের যাবতীয় ঠিকুজি কুলজি সমেত গাড়ির নম্বর এবং হাসি হাসি মুখে ড্রাইভারের ছবি সমেত কতক্ষণে আসছে তাও এসে গেল কিন্তু  নির্দিষ্ট  সময় পরেও তাঁর দেখা নাই রে তাঁর দেখা নাই। ফোনে যোগাযোগ করা হলে অপরপ্রান্ত থেকে প্রশ্ন এসে গেল  কোথায় যাবেন এবং  তার পর মূহুর্তেই নিথর নীরবতা এবং  মোবাইলে চাকা ঘুরতে থাকল এবং  লিখিত মেসেজ আসতে লাগল( অবশ্য যদি খুব দেরী হয় পরিবর্ত গাড়ি না পেলে) । আর দেরী দেখে যদি ক্যান্সেল করা হলো তাহলে আপনার  ঘাড়ে তার কোপ অবশ্যই পড়বে। আমরা যারা পুরনো দিনের লোক তাদের  ভাগ্যে অবশ্যই এই শাস্তি বহাল থাকবে । খোঁজাখুঁজি করে কোথায় কিভাবে ক্যান্সেল করতে হবে পাওয়া যাবেনা এবং  যখন পাওয়া গেল ততক্ষণে সময়  অতিক্রান্ত । অতএব,  গ্যাঁট গচ্ছা যাবেই। আজকের যুগের ছেলেমেয়েদের  কাছে কিন্তু এরা মহা জব্দ। এরা খুটখাট করে ঠিক সময়ের মধ্যেই তাকে ক্যান্সেল করে দেবে। এদের কাছ থেকে  পয়সা ভুগিয়ে ভাগিয়ে নেওয়া শিবের বাবার ও অসাধ্য।  অনেকদিন  আগে একজন বিদগ্ধ ব্যক্তি মন্তব্য করেছিলেন যে কম্পিউটার না জানলে সে অশিক্ষিত। তিনি একজন  ভারতবর্ষের  সেরা ইনস্টিটিউটের ইঞ্জিনিয়ার এবং অত্যন্ত পণ্ডিত  ব্যক্তি,  সুতরাং  তাঁর কথাকে একবাক্যে নস্যাৎ করা যায়না এবং  বাস্তবিক ক্ষেত্রে সেটাই ঠিক । এখন বাচ্চাদের  মোবাইল না খুলে দিলে খাবেনা আর নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি হওয়ার দরুণ বাবা মায়েদের এত ধৈর্য্য ধরে খাওয়ানোর সময় ও নেই। সুতরাং,  প্রেশার কুকারে সেপারেটর দিয়ে ভাত, ডাল, সব্জি সেদ্ধ করে চটপট বাচ্চাকে ডে কেয়ারে দিয়ে অফিসে দৌড়াও। মাঝে কোভিডের জন্য অবশ্য ওয়ার্ক ফ্রম হোম হচ্ছিল এবং  বাবামায়েদের একটু হ্যাপা কম ছিল । কিন্তু কর্মদাতারা দেখলেন যে এদের অভ্যেস খারাপ হয়ে যাচ্ছে এবং  অনেকেই  একই সঙ্গে একাধিক  সংস্থায় যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং,  ঘোরাও চাকা উল্টোদিকে । যাক এ তো হয়ে যাচ্ছে ধান ভানতে  শিবের গাজন গাওয়া। ফিরে যাওয়া যাক উবের ড্রাইভারের কথায় ।
উবের বুক করা হয়েছে  গড়িয়াহাটের অ্যাপোলো ক্লিনিকে ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে বলে। পাঁচ মিনিটে আসছে বলে আর পাত্তাই নেই। ড্রাইভার সাহেব  আসছেন না দেখে ক্যান্সেল করলাম যখন তখন পনের  মিনিট  পেরিয়ে গেছে, গত্যন্তর না দেখে একটা হলুদ ট্যাক্সি ধরে পৌঁছলাম  প্রায় কুড়ি মিনিট বাদে। ওঁরা আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্রায় ক্যান্সেল করেই দিচ্ছিলেন ( হাজার হলেও নামী ডাক্তার তো) কিন্তু অনেক অনুরোধে তাঁরা আর এতটা নির্দয় হতে পারলেন না কিন্তু  আমার দেখানোর সময় অনেকটাই  পিছিয়ে গেল। অনেক কষ্টে একটু জায়গা পেয়ে বসেছি, এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠল, আমার ড্রাইভার সাহেবের গলা, বললেন আপনি অ্যাপোলো ক্লিনিকের জন্য গাড়ি বুক করেছিলেন? আমি বললাম,  হ্যাঁ,  সে তো অনেকক্ষণ আগে আর আপনাদের  দেরী দেখে আমি ক্যান্সেল ও করে দিয়েছি এবং  মিনিট দশেক  হলো আমি পৌঁছে ও গিয়েছি। আমাকে একটু  ধমক দিয়েই বললেন যত্তো সব ভুলভাল পাব্লিক । আমার তখন উত্তর দেওয়ার মতন মানসিক অবস্থা ছিলনা । ঘন্টা পাঁচেক পর ফেরার সময়ের উবের বুক করতে গিয়ে দেখি কোম্পানি আমার উপর ৭৯.৫২ টাকার খাঁড়ার ঘা চাপিয়েছে। আমিও ঠিক করলাম  এই জরিমানা আমি কিছুতেই  দেব না। যাই হোক,  আর একজন সহৃদয় হলুদ  ট্যাক্সির ড্রাইভার  ১৮০ টাকা নিয়ে আমাকে পৌঁছে দিয়ে উদ্ধার  করলেন ।

এ তো গেল এক ধরণের  অভিজ্ঞতা । কয়েকদিন আগে সদ্য হারানো   এক বন্ধুর  শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের পরদিন নিয়মভঙ্গে যেতে হবে । পৌনে একটায় গাড়ি বুক করতেই দেখালো তিন মিনিটে আসছে। মাঝপথে আরও এক বন্ধুকে নিয়ে  যাব, ফোন করলাম তৈরী থাকার জন্য কিন্তু আবার সেই  গোল গোল চাকতি ঘোরা শুরু হলো কিন্তু  যেহেতু পিন নম্বর দিয়ে দিয়েছে আমি ভাবছি এই এল বলে কিন্তু নাহ, পাত্তা নেই আর মেসেজ আসতে শুরু করল ধন্যবাদ  জানিয়ে ধৈর্য্য ধরার জন্য। বন্ধুকে জানালাম সব কথা। দুজনেই যথেষ্ট  ধৈর্য ধরে আছি, শেষমেশ একটা গাড়ি আসছে আট মিনিট বাদে দেখাল। তখন একটা বেজে কুড়ি। দেখতে দেখতে  আট মিনিট  প্রায়‌ এসে গেল । অনেক কষ্টে গলার স্বর যথেষ্ট  মোলায়েম করে ড্রাইভার সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম,  ভাই কোথায়  আছেন,  আসছেন কি, না আপনিও সেই ক্যান্সেল করার দলে? না ,না আমি একজনকে নামিয়ে দিয়েই আসছি। বন্ধুর  দেওয়া ডেড লাইন দেড়টা পেরিয়ে গিয়ে আরও  দু মিনিট  হয়েছে,  নীচে  গাড়ির আওয়াজ পেয়ে ব্যালকনি থেকে দেখলাম একটা সাদা গাড়ি বাড়ির  সামনেই থামল এবং  একটা টেলিফোন  পেলাম  তাঁর কাছ থেকে । নেমে গাড়িতে চেপে বন্ধুকে জানালাম  অলিম্পিকে পদক পাওয়ার কথা এবং  বললাম বাড়ির কাছে এসে একটা ফোন করব । ঝাঁ ঝাঁ করছে রোদ আর পারদের মাত্রা চড়চড়  করে বাড়ছে আর উবেরের এসি পুরো মাত্রায় চড়িয়েও  গরমকে বাগ মানানো যাচ্ছেনা। এর মধ্যেই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির জন্য  বিশাল জ্যাম, গাড়ির চাকা নড়েনা আর ড্রাইভার সাহেবের অবস্থাও তথৈবচ । ভদ্রলোক,  একবার ও বিরক্তি প্রকাশ করছেন না। পৌনে তিনটে নাগাদ  পৌঁছলাম । ততক্ষণে লোকজন ফিরে যেতে শুরু করেছে। ড্রাইভার সাহেব গাড়ি বন্ধ করে বললেন ২৫২ টাকা হয়েছে । আমি একটা পাঁচশ টাকার নোট  দিয়ে বললাম  আমাকে দুশো টাকা দিন। উনি আমাকে আড়াইশো টাকা দিতে চাইছিলেন এই ভেবে যে দুটাকা আমার কাছে নেই। একটু ইতস্তত করে  বললেন যে স্যার  আমার তো হয়েছে দুশো বাহান্ন টাকা। আমি বললাম  ভাই অনেকটা সময় চলে গেছে জ্যামের জন্য , আপনি ওটা রেখে দিন ।

আবার একটা দিন উবেরে যাওয়া। ভদ্রলোককে দেখে কেমন নিষ্পাপ বলে মনে হলো। যেতে হবে বাঙ্গুর অ্যাভিনিউ । পার্ক সার্কাসে  এসে ও কলামন্দিরের দিকে মোড় নিচ্ছে  দেখে বলে উঠলাম  ঐদিকে কেন মোড় নিচ্ছেন, ওদিক দিয়ে তো অনেক ঘুরতে হবে। আপনি ডান দিকে মোড় নিন এবং  ফ্লাই ওভারে উঠুন । ও বলল, হ্যাঁ স্যার,  আমি জিপিএস দেখেই এই দিকে ঘুরলাম কিন্তু এখন দেখছি ভুল করে ফেলেছি। আসল কথা স্যার,  আগে আমি ট্রাক চালাতাম এবং দিল্লী, বোম্বে ও মাদ্রাজ হাইওয়েতে প্রচুর গাড়ি চালিয়েছি এবং  টাকা পয়সা জমিয়ে এবং  লোন নিয়ে  এই গাড়িটা কিনেছি। স্যার,  এই উবের চালানো য় আমি একদম আনকোরা এবং কলকাতার রাস্তাঘাট ও এখনো পর্যন্ত চিনে উঠতে পারিনি । আমি বললাম,  কোন চিন্তা নেই,  আমি আপনাকে রাস্তার ডিরেকশন দিয়ে দেব । গাড়ি চলছে পার্ক সার্কাস ফ্লাইওভার দিয়ে কিন্তু ভীষণ  জ্যাম । একটা অ্যাম্বুল্যান্স হুটার বাজিয়েই চলেছে কিন্তু কারও কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই এমনকি ফ্লাইওভারের জ্যাম মিটলেও গাড়িগুলো একটুও জায়গা ছাড়ছে না। গাড়ির ভেতর থেকে  দেখলাম আইসিইউ অ্যাম্বুল্যান্স অথচ কারও কোন হেলদোল নেই। আমি মনে মনে বিরক্তি প্রকাশ করছি দেখে ড্রাইভারটি বলে উঠল যে স্যার, আমি মাঝে কিছুদিন অ্যাম্বুল্যান্স ও চালিয়েছি। একদিন  এইরকম জ্যামের মধ্যে আটকে গিয়ে একজন রোগীকে চলে যেতে দেখেছি আর সেই দিন থেকে আমি অ্যাম্বুল্যান্স চালানো  বন্ধ করে দিয়েছি। খুব আশ্চর্য লাগল ছেলেটির‌ মনের নরম দিকটা দেখে।
রাস্তা প্রায়ই শেষ হয়ে আসছে।   অনেক ধন্যবাদ জানালো ছেলেটি। বলল যে কয়েকদিন আগে এক ভদ্রলোক গাড়িতে উঠেছিলেন এবং  জিপিএস দেখতে ভুল হাওয়ায় ভদ্রলোক খুব গালমন্দ করেছিলেন। ড্রাইভারটি আরো জানালো যে স্যার, আমি এই উবের চালানো য় নতুন  এবং  আপনি যদি রাস্তা জানেন তাহলে আমাকে বলে দিন কিন্তু উল্টে ভদ্রলোক  আরও গালাগালি করে বললেন যে রাস্তাই যদি না চেনো, তাহলে গাড়ি বের করেছ কেন? এটাও তার একটা অভিজ্ঞতা । পৃথিবীতে কেউই সব কিছু জানেনা, আস্তে আস্তে সব কিছুই রপ্ত হয় কিন্তু আমরা মাঝে মাঝে  এমন ব্যবহার  করি যে আদৌ আমরা মানুষ  কিনা তাতে  সন্দেহ জাগে । পৌঁছলাম গন্তব্যস্থলে এবং  ছেলেটিকে ভাড়ার চেয়েও পঞ্চাশ টাকা বাড়তি দিলাম ছেলেটিকে ঐদিন যে গালাগালি  হজম করতে হয়েছিল  তাকে কিছুটা প্রশমন করার জন্য।
পৃথিবীতে  কেউই আমরা সর্বজ্ঞ নই  এবং আমাদের  প্রত্যেকের মধ্যেই অনেক খামতি আছে কিন্তু আমরা সহমর্মীতা দেখিয়ে নিজেদের আরও  উন্নত করতে পারি এবং  এই পৃথিবীর চেহারাটা কিছুটা হলেও  ভাল করতে পারি।

Tuesday, 6 May 2025

ঝড় উঠেছে

ঝড় দেখার অভিজ্ঞতা প্রায় সবার ই রয়েছে ।তবে এই অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন রকম এবং একই বয়সের লোকের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন লোকের অভিজ্ঞতা বিভিন্ন। মফস্বলের লোকজন যেখানে গাছপালার আধিক্য বেশী সেখানকার লোকজন যেভাবে ঝড়ের উপস্থিতি বুঝতে পারে, কংক্রিটের জঙ্গলে ভরা শহরের লোকজন  সেভাবে টের পায়না ।

ঝড়ের কথা উঠলেই শৈশবের দিনগুলো মনে পড়ে যায়। মায়ের চোখ এড়িয়ে  বন্ধুদের সঙ্গে আমবাগানে যাওয়া এবং ঝড়ের সঙ্গে সঙ্গে  ঘাড়ে মাথায় চড়বড় করে আম পড়া এবং  পকেট ভরে গেলে জামার কোঁচড়ে (তখন লম্বা হাফ হাতা শার্ট  গরমে পরা হতো এবং  তখন টি শার্টের চল ছিলনা)  আম ভরে পরে ভাগ করা হতো বন্ধুদের মধ্যে। সে এক আলাদা আনন্দ ই ছিল। বাগানের মালির চোখ এড়িয়ে আম চুরি করে খাওয়ার  যে আনন্দ তা ভাষায়  বর্ণনা করা যায়না। আস্তে আস্তে বড় হওয়া, উঁচু ক্লাসে ওঠা, মেয়েদের সামনে নিজেকে স্মার্ট দেখানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা( কারণ কোন মেয়েই ঘুরেও দেখেনি) কিন্তু সেই  সময়ের ঝড়কে  ভালবাসার টান কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। ঝড় উঠেছে, চারিদিকে ধূলোয় ধূলোময়, ধূলোটাও উঠছে চক্রাকারে উপরের দিকে  তারপর এদিক থেকে  ওদিক,  চার বন্ধু মিলে  সাইকেল  নিয়ে  ঝড়ের পরিক্রমায় বেরোনো। চোখে মুখে ঢুকছে ধূলো, হাঁ করছিনা কেউ মুখে ধূলো ঢুকে যাবে বলে। এদিকে ওদিকে  টিনের চালার টিন উড়ে গিয়ে ঘরকে করছে বেআব্রু, আর তারই মাঝে চার বন্ধু সাইকেল  চালিয়ে যাচ্ছে  ঝড়ের পরিক্রমায় । প্রায় তিন কিলোমিটার ঝড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে স্টেশন সংলগ্ন দেবুদার দোকানে বসা এবং গরম বোঁদের সংহার--- সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা । আজকালকার ছেলেমেয়েরা  ক্যালরি নিয়ে চিন্তিত আর ঐ সময়ে সবাই বোঁদে এবং  যে দোকানের যা ভাল মিষ্টি তা চেখে চেখে বেড়াতাম এবং এখনও  পর্যন্ত  সেই রকম অসুস্থ না হয়েও চালিয়ে যাচ্ছি। আসলে ছোটবেলার চুরি করে আম যারা না খেয়েছে তারা সেরকম ডাকাবুকো  হতে পারেনি। ধীরে ধীরে  স্কুলের  গণ্ডি ছাড়িয়ে কলেজে ঢোকা মানে পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে  ডেঁপোমি করা কিন্তু  আশ্চর্যের ব্যাপার যে এই চারজনই  কেউ না খেল সিগারেট  বা কেউ  দিল না ইতিউতি উঁকি । ঝড় এদের জীবনে সামান্যতম রেখাপাত ও করতে পারল না। কলেজ  পেরিয়ে কেউ বা চাকরি, কেউ বা ব্যবসা আবার কেউ বা চলে গেল  উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে । দীর্ঘ দিন ছাড়াছাড়ি কিন্তু মনটা যেন কেমন টনটন করে ওঠে বন্ধুদের জন্য, হাঁকপাঁক করে ওঠে  শৈশবে ফিরে  যেতে,  সেই সাইকেল নিয়ে ঝড়ের মধ্যে দিশাহীন  হয়ে ঘুরতে শুধু ঝড়কে উপভোগ  করার জন্য।

এখন সবাই জীবনের  শেষ প্রান্তে উপনীত। এখনও  ঝড় আসে তবে সেই ঝড়কে উপভোগ  করার প্রথাটাও গেছে পালটে। আকাশটা কালো হয়ে এসেছে, মুখ তার ভার, মাঝে মাঝে  দমকা হাওয়ায় জানলা দরজাগুলো দড়াম দড়াম করে পড়ছে ছিটকিনি  না লাগানোর  জন্য, পাখিগুলো হঠাৎই  ঝটপটিয়ে  উড়তে শুরু  করল নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় কিন্তু এলোমেলো হাওয়ায় গন্তব্যস্থল  বদলে যাচ্ছে  কিন্তু তাদের পৌঁছতেই  হবে নির্দিষ্ট  বাসস্থানে যেখানে তার বাচ্চারা রয়েছে । সব জীবজন্তুর ই তার বাচ্চাদের  প্রতি যে স্নেহ তা বোঝা যায় প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে, যেমন প্রকৃত বন্ধু বিপদের সময়ই বোঝা যায়। বাড়িতে শুধু বুড়োবুড়ি। জানলা দরজাগুলো  ভাল করে লাগিয়ে ব্যালকনির  শাটার টেনে দিয়ে  ঝড়কে করছে উপভোগ । এক সময় যখন ছিল বেপরোয়া মনোভাব  আজ তা অনেক স্তিমিত  কিন্তু ঝড়কে উপভোগ করার লোভটা যায়নি। সব জানলা দরজা লাগিয়ে ঝড়কে আমি করব মিতে,  ডরব না তার ভ্রূকুটিতে গান গাইতে  তো কোন আপত্তি নেই,  তাই নয়? 

Monday, 5 May 2025

কিছু কথা

অনেকদিন ধরেই মনটা একদম খাঁ খাঁ করছে। কিছু লিখব মনে হয়, নানান কথা মনে আসে, মনে পড়ায় আমাদের কথা এবার বল , অনেক স্তোকবাক্য দিয়ে তো চালালে, এরপরে নিশ্চয়ই আসবে আমাদের কথা কিন্তু নানা বাহানায় বন্ধ হয়ে যায় তোমার কলম । কখনো বাজারে যেতে হবে,  কখনো বা তোমার রিহার্সাল আবার কখনো বা  বন্ধুর  সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা।এই তো আসছে আবার ফোন, নিশ্চয়ই কোন  বন্ধুর  হবে। আচ্ছা,ঠিক আছে, কথা বলেই আমাদের একটু তুলে ধর‌দেখি। আচ্ছা ঠিক আছে,  কয়েকটা জরুরী ফোন অ্যাটেণ্ড করে বসলাম তাদের কথা তুলে ধরতে কিন্তু কাকে ছেড়ে কার কথা লিখি এই নিয়ে  একটু ধন্দে পড়ে গেলাম। যার কথা লিখব না তারই মুখ  ভার। সবাইকে একটু ঠাণ্ডা করে বসলাম ব্যালকনিতে ফুল এবং পাখিদের কথা লেখার জন্য ।

ব্যালকনির টবে এখন নানারকম ফুল। গোলাপ, জবা ও বেলফুলে ভরে আছে। এ ছাড়াও রয়েছে একটা নাম না জানা ঝাঁকরা গাছে ছোট ছোট সাদা রঙের ফুল অনেকটা চন্দ্রমল্লিকার মতো। গোলাপ ও বাহারিরঙের লাল ও হলুদ আর জবাও যায় কম কিসে?  সেও লাল, কমলা ও হলুদ রঙে নানাভাবে  নিজেদের বিকশিত করে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে। কিন্তু ভোরবেলায় স্লাইডিং শাটার খুলতেই হাল্কা মিষ্টি গন্ধে মন মাতিয়ে দেয় বেলফুলের মিষ্টি গন্ধ। মৌমাছিরা গুনগুন করে একবার এই ফুলে আরেকবার ঐ ফুলে নেচে নেচে মধু খেয়ে যাচ্ছে। আশ্চর্য হয়ে যাই যে এই নিরাভরণেও এত আকৃষ্ট করা যায়!  আশেপাশে সব সময়ই দেখি  কি করে ঝাঁ‌ চকচকে পোশাকে অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায় , কিন্তু  সাধারণ পোশাকে নিজের আচার ব্যবহারে যে অন্যকে আকর্ষিত করা যায় তা তো আর অস্বীকার করা যায়না  কিন্তু সেটা প্রথম দর্শনেই ধরা পড়ে না। অনেকদিন ধরে দেখতে দেখতে তা নজরে আসে। একটা কথা আছে না, খারাপ খবর খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে কিন্তু ভাল কোন খবর তা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়।

কাকে বেশী পছন্দ?  বাহারে গোলাপ বা জবা না গন্ধময় নিরাভরণ সাদা বেলফুল বা ঝাঁকড়া গাছে পাতার ফাঁকে উঁকি দেওয়া সেই ছোট্ট সাদা ফুল?  জবাব নিজের  নিজের পছন্দের কাছে।

Wednesday, 12 February 2025

বাড়ির নাম "ওয়েলকাম"

বলরামপুর  স্টেশন টা তখনো পুরোপুরি স্টেশনের মর্যাদা পায়নি। আশপাশের অনেক গ্রাম থেকে লোকজন এখানকার হাটে আসত। বেশ বড় মাপের হাট, আনাজপত্র থেকে গরু ছাগল ও এই হাটে আসত বেচাকেনার জন্য।  তখন অতশত লরি, ভ্যানের চল ছিলনা,  ভরসা ছিল গরুর গাড়ি ও সাইকেল রিক্সা এবং  রিক্সা ভ্যান। তবে এঁটেল মাটি বৃষ্টিতে এত কাদা হতো যে রিক্সা ভ্যানের কম্মো ছিলনা বর্ষায়  চলা। অতএব তাগড়া বলদ বা মোষ জুতে চলতে হতো বেশী জিনিসপত্র আনার হলে। কিন্তু হাটের দিন  ছিল জমজমাট । সপ্তাহে দুদিন বসে হাট,  দূরদূরান্ত থেকেও লোকজন আসত এই হাটে, সুতরাং লোকজনের অনেকদিনের দাবি ছিল এখানে ট্রেন থামুক। তখন তো এত গ্রাম পঞ্চায়েত বা পঞ্চায়েত সমিতি বা জেলা পরিষদ ছিলনা , ছিলেন বিধানসভার সদস্য এবং  লোকসভার সদস্য যাঁদের দেখা পাওয়া প্রায় ভগবানের দেখা পাওয়ার সামিল। এঁরা নিজেরা কোন অসুবিধায় না পড়লে বা নিজেদের কোন প্রয়োজন না থাকলে ভুলেও  এই পথ মাড়াতেন না। একবার ভোটের প্রচারে এসে গাড়ি নিয়ে গাঁয়ের কাদা রাস্তায় আটকে পড়ে বাধ্য হয়েছিলেন আশ্রয় নিতে গ্রামের ই এক বর্ধিষ্ণু পরিবারে। তাঁরা কিন্তু যথেষ্ট সমাদর করেছিলেন এবং  আলাপচারিতায় গ্রামের ও আশপাশের গ্রামের  লোকের অসুবিধার কথা জানিয়েছিলেন । আর সেই জনপ্রতিনিধির উদ্যোগে হলো বলরামপুর  হল্ট।হাওড়া থেকে ধুলিয়ানগামী ট্রেনের পথে পড়ে এই বলরামপুর । প্যাসেঞ্জার ট্রেন  এখানে থামত। ধীরে ধীরে লোকজন ওঠানামা বেড়ে যাওয়ায় ইনি পেলেন স্টেশনের  মর্যাদা । পর্যায়ক্রমে গ্রামের কাঁচা রাস্তা  হলো পাকা,এখন সেখানে বাস ও মিনিবাস চলছে আর চলছে একটু উঠতি বয়সের ছেলেদের মোটরসাইকেল নিয়ে  দাপাদাপি । স্টেশন থেকে রিক্সায় তিন মাইল দূরে  সেই "ওয়েলকাম"বাড়ি। তখন এদিকে ওদিকে শয়ে শয়ে কাঁচা বাড়ির  মধ্যে ঐ বাড়িটা ছিল জমাটবাঁধা অন্ধকারে লাইট জ্বলা বাড়ি।সুন্দর পাঁচিল দেওয়া গেট ওয়ালা বাড়ি, গেট থেকে বাড়ির দূরত্ব প্রায় একশ ফুট এবং গেটের দুই পাশেও প্রায় একশ ফুট করে সুন্দর পাঁচিল। মাঠ ছেড়ে বাড়িতে ঢুকতে গেলে চড়তে হয় চারটে সিঁড়ি  যার দৈর্ঘ্য পনের ফুট এবং  সি়ঁড়ির দুই প্রান্তে দুটো রোয়াক যেখানে একজন লোক মোটামুটি ভাবে শুতে পারে। বাড়ির মালিক বুড়োবাবু ঐ রকে  আধশোয়া হয়ে  চুরুট খেতেন এবং মাঝে মাঝে শেক্সপিয়ার, মিল্টন বা কীটস বা শেলীর  কবিতা আবৃত্তি করতেন। বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করা লোকজন তত শিক্ষিত  না হওয়ায় হাঁ করে অবাক হয়ে চলে যেত  এবং পারতপক্ষে বুড়োবাবুর মুখোমুখি  হতো না। কেমন যেন  একটা দূরত্ব বজায়  থাকলেই বেশ খানিকটা  নিশ্চিন্তে থাকতো তারা । এই বাড়ি কিন্তু কোন জমিদার বা ছোটখাটো রাজার বাড়ি নয় তবে বুড়ো বাবু ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী এবং  তাঁর বাবা ছিলেন জজসাহেব । এখন যদিও জজদের সম্মান বহুলাংশেই ক্ষয়িষ্ণু ( ওঁরা নিজেরাই অনেকখানি দায়ী) কিন্তু সেই  সময়ে জজসাহেব বা সরকারী কর্মচারীদের ছিল প্রভূত সম্মান । তাঁরা সর্বসমক্ষে আসতেন ভীষণ কম এবং তাঁদের কাজ কর্ম বেশীরভাগ সময়ে চাপরাশিরা করত এবং গেটে থাকা দারোয়ান কাউকে ভিতরে ঢুকতে দিত না কোন সদুত্তর না পেলে।বাড়ির বারান্দায় ছিল জাফরি এবং  তার মধ্যেই  লেখা শব্দ ই ইংরেজিতে" ওয়েলকাম ।" বারান্দার আলোটা জ্বললেই সেই আলো জাফরির ছিদ্র দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করত। কিন্তু সেই বাড়িতে তো সাধারণ মানুষ আসতো ই না, তাহলে কাদের জন্য এই "ওয়েলকাম?" মনে হয় যে সমস্ত হোমরা চোমরা লোকজন আসতেন তাঁদের ই অভ্যর্থনা জানানো হতো। বাঁদিকে ছিল বড় বৈঠকখানা যা পরবর্তীকালে বাইরের ঘর বলে‌ পরিচিত ছিল। এক সময় ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় আলোকময় হয়ে উঠত সেই  বৈঠকখানা কিন্তু কালের গতিতে বিদায় নিয়েছে ঝাড়লণ্ঠন, এসেছে ইলেকট্রিক বালব কিন্তু বালবের শেডগুলো ছিল দারুণ সুন্দর যা এক সুন্দর রুচির বাহক । তবে ঐ সময়েও গ্রামের  বেশীরভাগ জায়গা যখন অন্ধকারে ডুবে থাকত সেই সময়ে ঐ বাড়িতে বিদ্যুতের আলো যেন দম্ভ প্রকাশ করত। বড় বাড়ি, একান্নবর্তী পরিবার , সবার ছেলেমেয়ে নিয়ে  যেন একটা ছোট খাটো গ্রাম । বৈঠকখানা হয়েছে বাইরের ঘর যেখানে সমস্ত ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা,  নানারকম পড়ার আওয়াজে কিরকম একটা অনুরণন হতো আর দূর থেকে  অচেনা লোকদের  একটা পাঠশালা বলেই ভ্রম হতো। একসময়  বাড়ির দুর্গাপূজো কখন যেন বন্ধ হয়ে গেল কিন্তু বাড়ির পূজো ধীরে ধীরে বারোয়ারি পূজোয় পরিণত হলো। প্রতিমার আদল ও পাল্টে গেল ।বুড়োবাবুর বংশধররা  কাজের সূত্রে এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল এবং তাঁর উত্তরাধিকারীরা অত বড় সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণে অসমর্থ হয়ে বাড়ি বিক্রি করে দিল ।

দীর্ঘ দিন পর বুড়ো বাবুর নাতি এসেছেন সুদূর আমেরিকা থেকে,  থাকবেন কিছুদিন । হঠাৎই মনে হলো পরিবারকে নিয়ে বলরামপুর যাবেন এবং দেখবেন  তাঁর  শৈশবকাল  যেখানে কেটেছে সেটা কেমন আছে এবং স্ত্রীও ছেলেমেয়েদের দেখাবেন। যেমন মনে করা, তেমনই কাজ। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বলরামপুরের উদ্দেশ্যে । মাঝপথে একবার নবদ্বীপে থেমে চা খেয়ে রওনা দিলেন তাঁর ছোটবেলার শহরের দিকে। কিছুই  চিনতে পারছেন না জায়গা এতটাই বদলে গেছে। একে তাকে জিজ্ঞেস করে পৌঁছলেন তাঁদের বাড়ির কাছে। প্রোমোটারের থাবা পড়েছে এখানে। বাড়ি ভাঙার কাজ চলছে । অনেকটাই ভাঙা হয়ে গেছে । সুদৃশ্য গাড়ি এবং তার আরোহীদের  দেখে প্রোমোটারের লোকজন ছুটে  এল নতুন কোন কাস্টমার ভেবে। উনি এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখছেন। সুপারভাইজার মোবাইলে খবর পাঠিয়ে দিয়েছে তার মালিককে এবং  তিনিও এসে পড়েছেন নতুন বুকিং এর আশায়। খুব নম্র ও বিনীতভাবে  তাঁদের আমন্ত্রণ জানালেন  অফিসঘরে বসার জন্য।  ছেলেমেয়ে এবং স্ত্রী একটু অধৈর্য‌্য হয়ে পড়েছে ফিরে যাওয়ার জন্য। ভদ্রতার খাতিরে একবার অফিস ঘরে বসলেন যেটা আগে ছিল বৈঠকখানা বা বাইরের  ঘর, কেবল একটাই তফাত এটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এবং  অনেক  ঝকঝকে। অফিস ঘরের বাইরে একটা জায়গায় জাফরিতে লেখা "ওয়েলকাম" টা চোখে পড়ল। একটু বিস্মিত  হয়েই জিজ্ঞেস করলেন  এটা এখানে কেন? স্যার,  আমাদের এই প্রজেক্টের নাম দিয়েছি "ওয়েলকাম" আর এই বলে একটা ব্রোশিওর ধরিয়ে দিল। এই বাড়ির মাঠে আমরা বহু খেলাধূলো করেছি আর পূজো ও করেছি, এর স্মৃতি আমার মনে এখন ও জ্বলজ্বল করছে। "ওয়েলকাম" নামটা আমার বড় ই প্রিয়, তাই আমার এই প্রজেক্টের নাম ওইরকম দিয়েছি স্যার । কানে যেন কেউ গরম সীসা ঢেলে দিল, মাথাটা হেঁট হয়ে গেল এই ভেবে যে একটা অনেক উচ্চতায় উঠেও যারা পূর্বস্মৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা ও করেনা অথচ এই অল্পশিক্ষিত প্রোমোটার তার শৈশবের  স্মৃতিকে সম্মান দিয়ে আমার প্রপিতামহের  সেন্টিমেন্টের দাম দিচ্ছে। চোখের পাতাটা ভিজে আসছে, কোনরকমে তা সামাল দিয়ে গাড়ির দিকে রওনা দিল।

Monday, 10 February 2025

যেথা যাহা পাও কুড়াইয়া লও সুখের তরে

"যেথা যাহা পাও কুড়াইয়া লও সুখের তরে" কথাটা শুনতে বেশ লাগে কিন্তু যদি কিছু আসে অনৈতিক উপায়ে এবং সেটা যদি সুখ আনে, সেটাও কি নেওয়া উচিত ? এই বিষয়ে মতামত ভিন্ন রকমের। কিছু লোক আছেন যাঁরা সামান্যতম অনৈতিক রাস্তাকে এড়িয়ে চলেন তাঁরা এই কথার তীব্র প্রতিবাদ করবেন কিন্তু বহু লোক আছেন যাঁরা সুখের সন্ধানে যে কোনরকম কাজ করতে প্রস্তুত। প্রথম পক্ষ সংখ্যায় খুবই নগণ্য এবং  দ্বিতীয় পক্ষ দলে বেশ ভারী এবং  অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে  পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত  নেওয়া  উচিত কারণ একবার অনৈতিক  পথে গেলে  একেবারে কানাগলির মধ্যে ঢুকে পড়ার সামিল, ফেরার রাস্তা বন্ধ।

সুখ কি, কত রকমের সুখ আছে এইসব নিয়ে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে আকাশে কটা তারা আছে এই নিয়ে কেউ যেন প্রশ্ন করছে।সুখ কি এটা বলা ভীষণ কঠিন । বিরাট বড়লোক, অনেক টাকা পয়সা গাড়ি বাড়ি চাকর বাকর,  দারোয়ান ঢুকতে বেরোতে সেলাম ঠোকে কিন্তু নরম গদিতে শুয়েও তার দুটো চোখের পাতা এক করতে পারেনা অথচ ফুটপাতে থাকা অভুক্ত, অর্ধভুক্ত লোকেরা তার সম্বলের ছেঁড়া মাদুরের ওপর শুয়েই মরার মতন ঘুমায়। সুতরাং টাকা পয়সাই সুখের মানদণ্ড হতে পারেনা। কেউ জ্ঞান পিপাসু, বইয়ের মধ্যে ডুবে থেকেই ঘোর মগ্ন হয়ে থাকেন বা কেউ চিত্রকর তাঁর শিল্পকীর্তির মধ্যেই ডুবে থাকেন বা কোন সঙ্গীত  শিল্পী তাঁর সুরের সাগরে নিমজ্জিত থাকেন।কেউ ভগবানের চিন্তায় মগ্ন থাকতে ভালবাসেন আবার কেউবা পরোপকারে নিজেকে ব্যস্ত রেখে সুখ পান আবার কেউ চৌর্য্য বৃত্তিতে খুশী থাকেন । সুতরাং,  এক একজনের কাছে সুখের সংজ্ঞা এক একরকম। সুতরাং কিসে যে সুখ মিলবে একথা কেউ জোর গলায় বলতে পারবে না। একই বই সবাই পড়লেও বিভিন্ন জনের উপলব্ধি বিভিন্ন রকম ।
জন্ম ইস্তক আমরা সবাই ছুটছি কিন্তু দিশা সবার ভিন্ন। তবে সুখ পাওয়ার একটা মোটামুটি শর্টকাট রাস্তা হচ্ছে যে জ্ঞানত কারও কোন ক্ষতি করা বা ক্ষতির চিন্তা করায় বিরত থাকলে অনেকটাই আনন্দ পাওয়া যায়। পরনিন্দা বা পরশ্রীকাতরতা থেকে যদি নিজেকে দূরে রাখা যায় তাহলেও  অনেক মানসিক শান্তি বজায় থাকে। মানুষের বড় হওয়ার উপর অনেকটাই নির্ভর করে মানসিক গঠন এবং  সে কিভাবে সুখের সন্ধানে নিজেকে ব্যাপৃত করবে তা ও নির্ভর করে সেই মানসিক গঠনের উপর।

কেউ একাকীত্ব পছন্দ করে আবার কেউ লোকজনের সংসর্গ ভালবাসে। অনেকেই বলে যে ও একদম লোকের সঙ্গে মিশতে পারেনা। মনের দরজা খুলে বাইরে না বেরোলে একাকীত্ব কাটবে কি করে? গতকাল কয়েকটা সত্তরোর্ধ্ব একই স্কুলে পড়া  বুড়ো(কিন্তু মনে মনে যুবক) তাদের বুড়িদের নিয়ে যেরকম হৈচৈ করল তাতে আশপাশের  লোকজন একটু শঙ্কিত ই হয়ে উঠেছিল আর ভাবছিল এরা সবাই প্রকৃতিস্থ আছে তো? বুড়োগুলো সবাই স্বকীয়তায় মহীয়ান কিন্তু তারা ফিরে গেছিল তাদের স্কুল জীবনে পুরনো দিনের স্মৃতিচারণায়। কোন স্যার কিভাবে পড়াতেন, তাঁদের মুদ্রাদোষ নিয়ে আলোচনা, বেঞ্চের উপর দাঁড়ানো, টিফিন চুরি, অন্যের ব্যাগ দিয়ে চেয়ার মুছে নেওয়া, লিখতে লিখতে ফাউন্টেন পেনের কালি শেষ হয়ে গেলে পাশের বন্ধুর কাছ থেকে দুফোঁটা কালি নিয়ে আবার  লেখা শুরু করা, পরীক্ষার  সময়ে বাথরুম গিয়ে কারো কাছ থেকে কোন অজানা প্রশ্নের  উত্তর জেনে নেওয়া  বা ট্যারা স্যারের পরীক্ষায় গার্ড দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে হাসাহাসিতে ওই বন্ধুরাই শুধু নয়,তাদের বুড়িরা এবং  আশপাশের লোকজন সবাই হাঁ করে শুনছিল তাদের কথা। আরও একজন তাদের স্কুলের সহপাঠী শুনেই বলল তোরা লাঞ্চ টা শুরু কর ঘন্টা দুয়েক বাদে কারণ ও তখন তার স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করছিল,  পরদিন তার অপারেশন হওয়ার কথা । এইরকম অনাবিল আনন্দের স্বাদ কজন নিতে পারে? স্ট্যাম্প কালেকশন এবং বদলা বদলি করা বা স্কুলের  টিফিনের সময় পাশেই থাকা মেয়েদের স্কুলের দিকে একটা চক্কর মেরে আসা বা লরি বোঝাই আখের মধ্যে থেকে একটা আখ টেনে বার করার কি টেকনিক তা নিয়ে ও যথেষ্ট আলোচনায় সবাই  মশগুল ।হয়তো আশপাশের লোকজন ভাবছিল যে খুশীতে  বুড়োগুলো পাগল হয়ে গেছে । বেঙ্গল হাটারিতে লাঞ্চ সেরে এবং  সেখানকার কর্ণধার  পার্থ ঘোষাল এবং  তাঁর পুরো টিমের সহযোগীতায় এই বুড়োবুড়িদের দল তাঁদের শৈশবে ফিরে গেছিল । সেখানে একপ্রস্থ হৈচৈ করে পরের গন্তব্যস্থল যতীন দাস রোডের উদিপীতে কফি খাওয়া। ওখানকার কফি একটা আলাদা মাত্রা আনে স্বাদে।ওখানকার একটা বিশেষ  জায়গা ছয়টি সরু দেবদারু গাছের একটা শেড যেখানে সচরাচর জায়গাই মেলেনা সেইখানে ভগবানের বিশেষ দয়ায় মিলল ঠাঁই এবং  সেখানেও  ঘন্টা দুয়েক আড্ডা বুড়োবুড়িদের একটু বাড়তি অক্সিজেন যোগাল। সবাই এই জায়গায় বসার অপেক্ষায় থাকে এবং এই বুড়ো খোকাখুকিরা গাড়িতে ওঠামাত্র জায়গাটা ভরে গেল নতুন  দলের দ্বারা ।
এই ধরণের আনন্দ বা খুশী খু়ঁজতে কোন অনৈতিক কাজের প্রয়োজন পড়েনা এবং বন্ধুদের সাহচর্য জীবনে এক আলাদা মাত্রা যোগ করে। মানুষ হয়ে যখন জন্ম হয়েছে তখন একদিন তার পরিসমাপ্তি হবেই কিন্তু এই স্বল্প দিনের মেয়াদে কে কতটা সুখের  ঝুলি ভরতে পারে সেটাই দেখার ।