অনেক রথী মহারথীর মাঝে একটা অবাঞ্ছিত লোককে দেখে সবার ভ্রূকুঞ্চন শুরু হয়ে গেল। ইতিউতি ফিসফাস থেকে একটা চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। একজন হোমরাচোমরা গোছের উদ্যোক্তা তাকে এসে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করল," অ্যাই, তুইই গুরুদেবের কলমটা চুরি করেছিলি না? " আজ্ঞে হ্যাঁ। "হতভাগা, গুরুদেবের কলম চুরি করে তুইই আবার এই সুন্দর অনুষ্ঠানে এসেছিস? চিনতে পারছিস আমাকে? আমিই তোকে জেলে চালান করেছিলাম। হুঁ, হুঁ আমিই সেই কোর্ট ইন্সপেক্টর শরত ঘোষ। আমার চোখকে ফাঁকি? স্বর্গ, মর্ত্ত, পাতাল যেখানেই থাকো না কেন ঠিইক খুঁজে বের করব। এখন এখান থেকে দূর হ ,ব্যাটা চোর কোথাকার। " শরত বাবুর গলার আওয়াজ নেহাতই কম নয়। চেঁচামেচির আওয়াজ গুরুদেবের কানে পৌঁছেছে। উনি শশব্যস্ত হয়ে সশরীরে উপস্থিত। আহা হা, ছেড়ে দিন বেচারিকে। কিন্তু শরতবাবু ইতিমধ্যেই গদাম করে একটা কিল বসিয়ে দিয়েছেন তার পিঠে। বেচারার নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হবার জোগাড়। ইতিমধ্যেই অ্যাডভোকেট সৌরীনবাবু মানে সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের আগমন। তিনি কোনমতে চোরকে শরতবাবুর হাত থেকে উদ্ধার করে সস্নেহে জিজ্ঞেস করলেন, বাপু তুমি গুরুদেবের কলমটি কেন চুরি করলে? উত্তরে চোর যা বলল তাতে অনেকেই বিস্মিত হয়ে গেল। চোর জানালো যে সে ভাবত যে গুরুদেবের অত সুন্দর সুন্দর লেখা ঐ কলমের জন্যই হয়। এত সুন্দর সুন্দর কবিতা লেখেন তিনি যে তার সর্বদাই মনে হতো গুরুদেবের ছান্দিক জীবনের পিছনের ঐ কলম। তার নিজের জীবন কখনোই পদ্য হয়ে উঠতে পারেনি এবং সদাই গদ্যময়। সে যে একেবারেই গোমূর্খ তা নয় কিন্তু কবিতার ছন্দ কেন যেন আসেনা তার কলমে। সুতরাং সে কখনোই কবি হতে পারেনি, অ-কবিই থেকে গেছে। ঝলমলে ডগ শোয়ের মাঝে নেড়ি কুত্তার যে অবস্থা হয় কবিকূলের মাঝে অ-কবির সেই অবস্থাই হলো। চোখের জলে টলটল করছে এহেন অবস্থায় সে সভাত্যাগ করল আর অন্যান্য বহু গুণীজনের চোখে জল সিঞ্চিত করে গেল।
Saturday, 8 May 2021
কবি ও অ-কবি
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। অনেক জ্ঞানী গুণী মানুষের সমাগম। সবাই এসেছেন কবিকে একবার চোখের দেখা দেখতে। উনি যে সবার প্রিয়। বেশীর ভাগ মানুষ এসেছেন কবিকে ভালবাসার জন্য আবার কেউ কেউ এসেছেন স্ট্যাটাস সিম্বল বজায় রাখতে। এ যেন পন্ডিত রবিশঙ্কর বা বিলায়েত খানের সেতার শোনার জন্য সবচেয়ে দামী টিকিট কেটে হলে আসা। কমদামী টিকিট ওঁরা ভুলেও বসবেন না। ঝাঁ চকচকে জামা কাপড়, গয়নাগাঁটি লোককে দেখানোর এ এক অপূর্ব সুযোগ। পিছনে কারা বসে? ওরা সঙ্গীত হয়তো একটু আধটু বোঝে কিন্তু রেস্তয় টান পড়ার ভয়ে তারা আসে শুধু সঙ্গীত শুনতেই আসে। ওরা কি বুঝবে এইসব দামী গয়নাগাঁটির কদর। ঐখানে বসব, নৈব নৈব চ। সুতরাং অমুক দাদা,তমুক ভাইকে ধরে একেবারে সামনের সারির টিকিট চাই। বাজাতে বাজাতে পন্ডিতজীর বা ওস্তাদজীর একবার চোখ যদি পড়ে তাহলে জীবনটাই ধন্য হয়ে গেল। আর যদি বা একটা অটোগ্রাফ নেওয়া যায় তাহলে তো তিন চার পুরুষের স্মৃতি রোমন্থন চলতে থাকবে। যাক এসব কথা। এবার আসল প্রসঙ্গে আসা যাক।
Sunday, 11 April 2021
তুই, তুমি,আপনি
শমীক দা ছিলেন রীতিমত প্রেমিক মানুষ। যেমন দেখতে, তেমনই পয়সাওয়ালা। প্রায়শই লোকে তাঁকে প্রদীপ কুমার বলেন ভাবতো। লাল টুকটুকে চেহারা আর পরতেন নিপাট করা ফিনফিনে ধুতি আর গিলে করা পাঞ্জাবি। ঐ হোস্টেলেই থাকা একজন অঙ্কের প্রফেসর তাঁর মাস মাইনের বেশিরভাগ টাকাটাই সংসার খরচা বাবদ মানি অর্ডার করে দিয়ে কোনরকমে নিজের পিছনে খরচ করতেন। শমীক দা প্রথমে সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হয়ে অঙ্কের ক্লাসে ঐ স্যারকে দেখে এমন কিছু মন্তব্য করেছিলেন যাতে তাঁর চামচা কিছু ছেলেমেয়ে খুব উল্লসিত হলেও বেশ কিছু পড়াশোনা করতে আসা ছেলেদের চাপে তাঁকে গুটিয়ে যেতে হয়েছিল কারণ সময়টা ছিল ষাটের দশকের শেষ ভাগ। স্যার কিন্তু কোন কথা বলেন নি যদিও মনে মনে খুবই কষ্ট পেয়েছিলেন। তখনকার দিনে স্যারদের সামনে সিগারেট খাওয়ার কথা কেউ ভাবতেও পারতো না। কিন্তু বড়লোকের আদরে বাঁদর হয়ে যাওয়া শমীক দা স্যারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় স্যারের মুখের ওপরই ধোঁয়া ছেড়ে দিতেন। স্যার কিছুই বলতেন না।একদিন ঐ ক্লাসের ই একটি মেয়ে রেখা সরাসরি শমীক দাকে চার্জ করল।" কি ভেবেছেন বলুন তো? অনেকদিন ধরেই দেখছি আপনি স্যারকে সবসময় অপমান করার চেষ্টা করেন কিন্তু উনি আপনাকে কিছুই বলেন না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে উনি অপমানিত হন না। আপনার অনেক টাকা থাকতে পারে কিন্তু আপনি ওঁর নখের ও যোগ্য নন।" স্যার কিছু না বললেও মনে মনে খুব খুশী হয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই সব ছেলেগুলোও যারা রেখার একটু ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করতো কিন্তু শমীক দার পয়সায় খাওয়া কিছু ছেলেদের জন্য কাছে ঘেঁষতেও সাহস করতো না।
শমীক দার সঙ্গে রেখার একটু কাছাকাছি আসার সম্ভাবনাটা প্রায় এটাতেই শেষ। তখনকার প্রেম নিবেদন একটা কিরকম যেন ছিল। একটা ফিসফিসানি চুপিচুপি কথা একান সেকান হতে হতে পাত্র এবং পাত্রীর কানে পৌঁছে যেত, তারপর সেটা টিকবে কি টিকবে না নির্ভর করতো পরিস্থিতির উপর। যদি পাত্র শাঁসালো হতো মানে বাবার প্রচুর টাকা, বাড়ি গাড়ি জমিজমা আছে তাহলে আপত্তির তো কোন কারণ ই নেই। কত সুন্দরী মেয়েরা কতছেলেদের বুক ভাসিয়ে চলে গেছে তার ইয়ত্তা নেই। এইরকম ই এক ফিসফিসানি রেখার কানে পৌঁছেছিল কিন্তু ও ছিল এক অন্যধাতের মেয়ে। ঐরকম মাকাল ফলকে ও কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না। সুতরাং সুযোগের অপেক্ষায় থাকা রেখা এর পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করল এবং ফল যা হবার তাই হলো। শমীক দার আপনি থেকে তুমিতে আসা আর হয়ে উঠল না। হঠাৎই একদিন দেখি একটা অ্যাম্বাসডার গাড়ি এসে থামল হোস্টেলের সামনে। এক সুপুরুষ ভদ্রলোক নামলেন গাড়ি থেকে এবং সরাসরি চলে গেলেন স্যারের ঘরের দিকে। দেখি স্যারের হাত ধরে মাথা ঝুঁকিয়ে কিছু যেন বলছেন আর স্যার মাথা নাড়িয়ে একটু করুণ করুণ মুখে কিছু বলছেন যে না না কিছুই হয়নি।
তখন একই ক্লাসে পড়া ছেলেমেয়েরাও আপনি আপনি করেই কথা বলতো এবং বেশ কিছুদিন যাবার পর আপনি থেকে তুমি বা তুই সম্বোধনে আসত সম্পর্কের গভীরতার উপর। দুটো ছেলের মধ্যে সম্বোধন একধাপ বা দুই ধাপ নামতো। এখানে ধাপটা এইরকম। আপনি (এক), তুমি(দুই) এবং তুই( তিন)। কিন্তু একটা ছেলে এবং একটা মেয়ের সম্বোধন এক থেকে তিনে নামলেও এক থেকে দুইয়ে নামলেই ছেলেমেয়েদের মধ্য গুঞ্জন শুরু হয়ে যেত। জানিস ,বলেই ফিসফিসানি শুরু হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছেলেমেয়েরা আজকাল অনেক সহজভাবেই মিশতে শুরু করেছে এবং তিন থেকে দুই বা এক যাবার প্রশ্নই নেই। বন্ধুত্বের পরিণতি যদি বিয়ে অবধিও গড়ায় তাহলেও তুই থেকে তুমি সম্বোধনে আসেনা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রুতিশক্তি কম হবার উপকারিতাটা বোঝা যায় কারণ কানে আর খটকা লাগেনা।
Saturday, 10 April 2021
বিশ্বাসঘাতক
বেজে উঠেছে ভোটের দামামা। চারিদিকে সাজ সাজ রব। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি নয়। নেতারা রয়েছেন নিজেদের জায়গায়। দল বলে একটা বস্তু আছে কিন্তু ওটা একটা ছাতার মতন। আমরা সবাই রাজা নিজেদের রাজ্যে, রয়েছে আমাদের নিজস্ব বাহিনী। প্রয়োজন মতো তাদের ব্যবহার হয় কেউ ট্যাঁ ফো করলে কিন্তু বেকায়দায় পড়লেই ঢুকে পড় সেই ছাতার তলায়। ছাতার মালিক তাদেরই সেখানে আশ্রয় দেয় যাদের নজরানা বেশ পছন্দ মাফিক হয়। নাহলে নিজের হ্যাপা নিজেই সামলাও। অনেকটাই সেই আগের দিনের রাজা, সামন্ত ও জমিদারের মতো। আমরা যারা শান্তিপ্রিয় নাগরিক, তাদের হয়েছে জ্বালা। না পারি এদের বিরুদ্ধাচরণ করতে, না পারি মন থেকে মেনে নিতে। সুতরাং গুমরে গুমরে মর।
ভোট আসে, ভোট যায় কিন্তু আমরা যে তিমিরে সেই তিমিরে। দিনদিন বয়স জনিত কারণে শরীর অশক্ত হচ্ছে , দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসছে আর হয়ে পড়ছি পরের উপর নির্ভরশীল। মনটা এখনও সচল থাকাতে ভাবি যে আর নয়, এবার রুখে দাঁড়ানোর পালা। পরিচিত ব্যক্তিরা ভোটের স্লিপ দিতে আসেন এবং যথারীতি মুখে একগাল হাসি নিয়ে কেউ বাঁদিকে আবার কেউ ডানদিকে মাথা হেলিয়ে চোখের ভাষায় জিজ্ঞেস করেন ভাল তো? আরও একটা অনুচ্চারিত অনুরোধ একটু দেখবেন। এই মানুষটিকে কিছুতেই ফেলা যায়না। বিপদে আপদে এই বর্ষীয়ান মানুষটিই আপনার পাশে এসে দাঁড়ান। কোন কোন সময় মনে হয়, এইসমস্ত ভাল মানুষগুলো কেন একটা নিজেদের দল করেন না যাঁরা আমাদের মতন সাধারণ মানুষের পাশে সবসময়ই থাকবেন। হয়তো সবটাই অলীক কল্পনা। সেইকারণে ভোট দিতে গিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাই। কাকে ভোট দেব? নিজের বিবেক অনুযায়ী না পাশেথাকা সেই ভাল মানুষটির দলকে যার পরিবর্তন চাইছিলাম? শেষমেশ নিজের বিবেকের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে স্বার্থান্বেষী হয়ে সেই ভাল মানুষের দলকে যারা বছরের পর বছর সাধারণ জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে এসেছে। কে বিশ্বাসঘাতক? আমি না সেই দল?
ভাইজাগের ডাইরি : সিরকা 1988
Tuesday, 16 March 2021
"ও রাজা তোর কাপড় কোথায়---- কিছু ধেয়ে আসা প্রশ্নের উত্তর "
অনেকেই আজকাল কিছু প্রশ্ন করেই সমস্যা তুলে ধরেন কিন্তু তার সমাধানের কোন সুরাহা না দিয়েই। অবশ্য প্রশ্ন করা খুব সহজ ব্যাপার নয় এবং যথেষ্ট বুকের পাটা না থাকলে তো একেবারেই নয়। আর উত্তর, সেটা তো অন্যলোকের কাজ। মাথা খুঁড়ে মর এবার।
একটা প্রশ্ন উঠে এসেছে যে প্রাক দুহাজার চৌদ্দ সালে যে ব্যাঙ্ক গুলো লক্ষাধিক কোটি লাভ করছিল তারা হঠাৎই আজ ধুঁকছে কেন এবং তাদের বাঁচাতে কেন সরকারকে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা মূলধনে ঢালতে হলো? এই প্রশ্ন জাগাটা খুবই স্বাভাবিক এবং তার উত্তরটাও প্রায় সকলেই জানেন। কিন্তু এর পিছনের ঘটনা অনেকেই জেনেও না জানার ভান করেন। দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ অনাদায়ী ঋণের বাস্তব অবস্থা যেকোন ভাবেই হোক না কেন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নজরে আনেন নি বা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক দেখেও দেখেননি। কিন্তু যখন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর স্বয়ং রঘুরাম রাজন সংসদে জানালেন যে বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী ঋণ বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলি তাঁদের নজরে আনেননি তখন রীতিমত হৈচৈ পড়ে যায়। তিনি আরও জানান যে এই ঋণের বেশিরভাগ টাই দুহাজার ছয় থেকে দুহাজার আট সালের। নিয়মানুযায়ী প্রত্যেক ঋণের জন্যই প্রভিশনিং করতে হয় এবং যতক্ষণ অনাদায়ী ঋণের শত প্রতিশত প্রভিশনিং না করা হচ্ছে ততক্ষণ লোনকে রাইট অফ করা যায়না। এমন ও হতে পারে যে লোন দেবার কিছুদিন পরেই বোঝা গেল যে লোনটা পরিশোধ করতে পারবেনা তখন পুরো লোনের টাকাটাই প্রভিশনিং করতে হয় যার অর্থ সরাসরি লাভ কমে যাওয়া ।সুতরাং, যে ব্যাঙ্ক গুলো এতদিন লাভ দেখিয়ে এসেছে তারা আসলে লোকসানে ছিল এবং অনাদায়ী ঋণ না দেখানোয় তারা লাভ দেখিয়েছে। এরপর দুহাজার চৌদ্দ সালে জুন মাসে সরকারকে সেন্ট্রাল রিপোজিটরি অব্ ইনফরমেশন অন লার্জ ক্রেডিটস গঠন করতে হয় যাতে ভবিষ্যতে এই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।
সরকারি মালিকানাধীন এবং বেসরকারি মালিকানাধীন ব্যাঙ্কের মধ্যে পার্থক্য এখানেই যে যেখানে সরকারের শেয়ার একান্ন শতাংশের বেশি সেটা সরকারি ব্যাঙ্ক আর অন্যথায় বেসরকারী মালিকানাধীন। যে কোন ব্যবসার মূল লক্ষ্য যে সংস্থা যাতে লাভ করে এবং শেয়ার হোল্ডারদের লভ্যাংশ বেশি দিতে পারে। ব্যাঙ্ক যখন সরকারের অধীনে আনা হয় তখন মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল যে এই ব্যাঙ্ক গুলো লাভ করবে এবং সেই লাভ জনগণের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে। কিন্তু সরকারকে যদি জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে ব্যাঙ্কের পুনরুজ্জীবনের জন্য ব্যবহার করতে হয় তাহলে তো মূল উদ্দেশ্য ই ব্যর্থ হয়। এই কথাটা মনে রাখতে হবে সরকারি ব্যাঙ্ক বলেই সেটা যেমন ইচ্ছা চলবে তা হয়না। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে সরকারি প্রকল্প ও যেমন বাস্তবায়িত করতে হবে তেমনই সেই ঋণ শোধ করার ব্যবস্থাও করতে হবে যেটা একটা দুরূহ কাজ। কারণ রাজনৈতিক নেতাদের চাপে অনেক ঋণ দিতে হয় আবার এই নেতারা ই ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধ না করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। এটা অনেকটাই চোরকে চুরি করতে বলা আর গৃহস্থকে সজাগ থাকতে বলা। এঁদের চরিত্র বদলানো শিবের বাবার অসাধ্য। তবে সবাইকে এই দলে ফেলা যায়না। এখনও অনেক রাজনীতিবিদ রয়েছেন যাঁরা প্রকৃত ই সৎ কিন্তু তাঁরা আজ বিরল প্রজাতির। এই ধরণের চাপ বেসরকারি ব্যাঙ্কের উপর চাপানো যায়না বলে তাদের লাভ বা মুনাফা অনেক বেশি এবং অনেক বেশি লভ্যাংশ তাদের বিনিয়োগকারীদের তাঁরা দিতে পারেন যার নীট ফল আরও বেশিসংখ্যক বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট হন এবং শেয়ারের মূল্য ও চরচরিয়ে বেড়ে যায়। আর এই কারণেই এইচ ডি এফ সি ব্যাঙ্কের ব্যালান্স সিট এবং ব্রাঞ্চের সংখ্যা স্টেট ব্যাঙ্কের এক চতুর্থাংশ হলেও মার্কেট ক্যাপিটালিজেশন স্টেট ব্যাঙ্কের প্রায় দ্বিগুণ এবং আমাদের দেশের এক নম্বর ব্যাঙ্ক। খুব সহজেই যদি উত্তর খুঁজতে হয় তাহলে বলা যায় যে ঐ ব্যাঙ্ক স্টেট ব্যাঙ্কের চেয়ে বেশি যোগ্য। কিন্তু এই উত্তরটা এত সহজ নয়। স্টেট ব্যাঙ্ক করে আমজনতার ব্যাঙ্কিং আর তারা করে বিশেষ শ্রেণীর ব্যাঙ্কিং। সরকারের যাবতীয় প্রকল্পের রূপায়ণ স্টেট ব্যাঙ্কের এবং অন্যান্য সরকারি মালিকানাধীন ব্যাঙ্কের মাধ্যমে হয় যেটা বেসরকারী ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সুতরাং তারা যেখানে বেশি লাভ হবে সেখানেই ঋণ দেবে এবং সেটা যাতে পরিশোধ হয় তার ও ব্যবস্থা করে। প্রত্যন্ত গ্রামে তাদের উপস্থিতি খুবই নগণ্য। তাহলে আমজনতাকে পরিষেবা কে দেবে-- সেই সরকারি ব্যাঙ্ক। সুতরাং দুজনের খেলার জমি এক নয় এবং তুলনা করাটা সামগ্রিক ভাবে একটু অবিচার ই হবে সরকারি ব্যাঙ্কের প্রতি।
এবার আসা যাক সুদের হার কমে যাওয়ার ব্যাপারে।সুদের হার কমে গেলে যাঁরা ব্যাঙ্কের সুদের উপর নির্ভরশীল তাঁদের সংসার চালানো ভীষণ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। অথচ, দিনদিন জিনিস পত্রের দাম হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে।বৃদ্ধ বয়সে মানুষের খাবার খরচ কমে যায় কিন্তু ওষুধের খরচ বহুদিন বৃদ্ধি পায়। তাহলে উপায় কি? নোট ছাপিয়ে সমস্যার কোন সমাধান হবেনা। সেক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতি হবে। ব্যাঙ্ক কে আগের মতন সুদ দিতে গেলে ঋণে অন্তত চার শতাংশ সুদ বেশি নিতে হবে । আর তা না হলে তাকে ব্যবসা গোটাতে হবে। কর্মীদের বেতন ও ভাতা, বিদ্যুতের খরচ এবং অন্যান্য খরচ মিটিয়ে লাভ করতে হলে ব্যাঙ্ক কে প্রায় তের বা চৌদ্দ শতাংশ সুদ পেতেই হবে। প্রায়রিটি সেক্টরে কমপক্ষে মোট ঋণের চল্লিশ শতাংশ হতে হবে। মোট ঋণের এক শতাংশ অতি দরিদ্র মানুষের জন্য দিতে হবে চার শতাংশ সুদে। এদিকে ব্যাঙ্কের মোট ঋণ মোটামুটিভাবে সমস্ত জমারাশির ষাট শতাংশ অতিক্রম করবে না। এছাড়াও ব্যাঙ্ক কে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে কিছু টাকা স্ট্যাটুটরি লিকুইডিটি রেডিও, ক্যাশ রিজার্ভ রেসিও বাবদ রাখতে হয়। সামান্য একটা উদাহরণ দিলে জিনিস টা একটু পরিষ্কার হবে। যদি মোট ঋণ ষাট টাকা হয় তবে প্রায়রিটি সেক্টরে কম সে কম চব্বিশ টাকা দিতে হবে এবং ষাট পয়সা ডি আই আর লোন দিতে হবে আর বাকি পঁয়ত্রিশ টাকা চল্লিশ পয়সা কমার্শিয়াল ও ইনস্টিটিউশনাল লোন বাবদ দিতে হবে যেখানে বেশি হারে সুদ পাবে ব্যাঙ্ক। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কস্ট অব ক্যাপিটাল কম হতেই হবে। এছাড়াও বিদেশ থেকে অনেক কম সুদে লোন পাওয়ার সুযোগ থাকার জন্য বড় শিল্পপতিরা বিদেশ থেকে লোন নেবে এবং সেক্ষেত্রে আমাদের দেশীয় ব্যাঙ্কগুলো আরও ধুঁকতে থাকবে। যদি বড় শিল্পপতিরা লোন না নেন তাহলে উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গেলে সুদের হার কমাতেই হবে। আর এইখানেই অর্থনীতিবিদদের অনেক জটিল গণনা করতে হয়। আমরা এই জটিল গণনা না বুঝলেও কিছুটা আন্দাজ করার চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু যদি বোঝার চেষ্টাই না করি তাহলে সব আলোচনাই বৃথা। এছাড়াও ঐ সময় মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল অনেক বেশি যেমন আট সালে 8.35, নয় সালে 10.88,দশ সালে 11.99,এগারোয় 8.86,বারোয়9.31, তেরোয় 10.91, আর চৌদ্দ সালে 6.35. বাস্তবিক ক্ষেত্রে আমরা ঐ সময় ঋণাত্মক সুদের হার পেয়েছি। কিন্তু এটা অত্যন্ত সত্যি কথা যে সংসার চালাতে সবাই হিমসিম খাচ্ছে। এটাও খুব সত্যি যে মধ্যবিত্তরা চারদিক থেকে মার খাচ্ছে। নেতাদের চোখ ছলছল করে ওঠে গরীবদের কথা ভেবে। যতরকম ভাবে পার তাদের সাবসিডি দেবার কথা ভাবো আর তার থেকে খানিকটা নিজেদের পকেটে না গেলে ভাবব কেন? যত্রতত্র দান, গরীবদের নামে প্রকল্প চালু করে নিজেদের পকেট ভরাতে না পারলে আমাদের দেখবে কে? সাবসিডি দিয়ে লোকদের অথর্ব না করে যাতে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে সেই প্রচেষ্টা কেউ করতে চায়না কারণ তখন ঐ লোকজনেরা নেতাদের পাশে ভিড় করবেনা।
একটা কথা মনে রাখা দরকার যে অলাভজনক সরকারি সংস্থা বেসরকারী হাতে গেলে ক্ষতি কিসের? দিনের পর দিন সাধারণ ট্যাক্সদাতাদের টাকায় কিছু লোক মৌরসিপাট্টা করে আয়েস করে বসে বসে খাবে আর এই ট্যাক্সদাতারা নির্বাক দর্শক হয়ে থাকবে এটা চলতে পারেনা। যদি কাজ করতে ইচ্ছা না করে তবে সরে দাঁড়াও, বহুলোক কাজের প্রতীক্ষায় রয়েছে। বেসরকারী শিল্পপতিরা নিষ্ক্রিয়তাকে বরদাস্ত করবেনা। আরও একটা কথা জানার আছে যে কোন উন্নত দেশে সরকারের কাজ রেগুলেটরের। ব্যবসা চালানো সরকারের কাজ নয়। কমিউনিস্ট দেশ চীন তার ষাট শতাংশ সরকারি মালিকানাধীন উদ্যোগ বেসরকারী উদ্যোগপতিদের হাতে তুলে দিয়েছে এবং ফল স্বরূপ আজ চীন পৃথিবীর এক অন্যতম শক্তিধর দেশ। সমস্ত পৃথিবীর মানচিত্র থেকে কমিউনিজম আজ বিলুপ্ত প্রায়। একমাত্র দেশ চীন , তারাও আজ রিফর্মের পথে হাঁটছে আর আমাদের দেশের নব্য কমরেডরা এখনও পুরানো ধারণাতেই নিমজ্জিত।
কর্পোরেট ট্যাক্স কম করাতেই কয়েকজন শিল্পপতির সম্পদ আড়াই আড়াইশো শতাংশ বেড়েছে এই ধারণাটা আদ্যোপান্ত ভুল। শেয়ার মার্কেট সম্বন্ধে যাঁদের বিন্দুমাত্র ধারণা আছে তাঁরা জানেন যে বাজারে তাঁদের উপর ভরসা না থাকলে তাঁদের শেয়ারের দাম কখনোই বাড়বেনা আর সেই কারণেই এইচ ডি এফ সি ব্যাঙ্ক স্টেট ব্যাঙ্কের থেকে অনেক ছোট হলেও তারাই আজ ভারতবর্ষের বৃহত্তম ব্যাঙ্ক ( মার্কেট ক্যাপিটালিজেশন হিসাবে)।
এখন ভাবার সময় আমরা শক্তিশালী উন্নত দেশ হবো না উন্নতিশীল দেশ হিসাবে ভিক্ষার পাত্র নিয়ে উন্নত দেশের মুখাপেক্ষী থাকব।
Sunday, 24 January 2021
খ্যাপামি সংকলন
ক্ষ্যাপা নানা ধরণের হয় এবং তাদের খ্যাপামিও। মাঝে মাঝে যখন ঐ কথাগুলো মনে পড়ে তখন নিজের মনেই হাসি আসে কিন্তু একটা কথা আছে না, যে আনন্দ সবসময় অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে হয় কিন্তু দুঃখটা অন্তরেই চেপে রাখা ভাল। এবার আসা যাক এক এক করে সেই ক্ষ্যাপা খেপির উপাখ্যান।
প্রথমেই আসি সুরোধনি মাসির কথায়। মাসি লোকের বাড়িতে ফাই ফরমাশ খেটে দিন গুজরান করতো। বেচারার ছিল অস্টিও আর্থ্রাইটিস কিন্তু চেহারাটা ছিল বেশ ভারিক্কি এবং সঙ্গে সঙ্গে মেজাজটাও। কিন্তু কারো সাতে পাঁচে থাকত না বেচারা তবুও ছেলে ছোকরারা তার পিছনে পড়ত তার হেলে দুলে চলার কারণে। তাতে ওর কি দোষ- কিছুই না। ওটাতো ওর পায়ের অসুখের জন্য। যেহেতু ও হেলে দুলে চলতো ছেলেরা ওকে বলতো হেলকা ভারী। মাসি কানে একটু কম শুনতে বলে তবু খানিকটা রক্ষা কিন্তু যেই মাত্র ও বুঝতে পারত যে ওকে ঐ বলে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে তখনই শুরু, হতো অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ। ইঁটক্যাল( ইঁট+পাটকেল) দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেব। তাতেও ওর আশ মিটত না ,গজগজ করতে করতে নিঃসৃত হতো ক্ষুরধার সব গালাগালি যা লেখা যায়না। আর যত তার তোড়জোড় ততটাই মজাদার হতো চ্যাঙড়া ছেলেগুলোর কাছে। একদিন মায়ের কাছে কেঁদে কেটে একসা," বৌদি, ছোটনকে একটু বলে ঐ বদমাইশ ছেলেগুলোকে কড়কে দিতে বল না গো।" তা যাই হোক, বললেই কি শোনে, তবুও খানিকটা কমলো কিন্তু চ্যাংরাগুলোর আনন্দ একেবারে বন্ধ হলো মাসীর ইহজগত ছেড়ে চলে যাওয়ায়।
আরও একজনের কথায় এবার আসা যাক। ভজন কাকার বয়স কিছুতেই বাড়তে চায়না মেয়েদের মতন। কি কাকা, কত বয়স হলো? ঐ হবে পঞ্চাশ বাহান্ন। আঁতকে ওঠার মতন অবস্থা। চোখে ভাল দেখেনা, কানে ভাল শোনে না, গাল গেছে ভেঙ্গে তবুও চুলে কলপ লাগানো চাই বয়সকে ধরে রাখতে। ওঁকে দাদু বললেও খুব একটা ভুল হয়না। কিন্তু উনি শুনতে চান দাদা। দাদা বললে খুব খুশি, বলবে চল চা খেয়ে আসি। কাকা শুনলে মোটামুটি নিমরাজি কিন্তু দাদু ডাকলেই শুরু হবে অনর্গল গালাগালি। দাদু বলবি কেন রে, তোরা কি পঞ্চাশ বছরের লোককে দাদু বলিস? কি যে মানসিকতা কে জানে? এই ভজন কাকার জন্য একদিন প্রচণ্ড উত্তম মধ্যম জুটেছিল ভাগ্যে। সেদিনছিল মহানবমী। সন্ধ্যে বেলায় পাড়ার ছেলেরা বিভিন্ন গ্রুপে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিল। তাদেরই কেউ একজন ভজন কাকার থুতনিতে হাত দিয়ে দাদু বলে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আমাদের বাড়িতে পাড়ার দুর্গাপূজায় নবমীর দিন দরিদ্র নর নারায়ণ সেবা হতো এবং ধুনুচি নাচের কম্পিটিশন হতো। সুতরাং, হঠাৎ করে ঠাকুর দেখতে যাওয়াটা আমাদের পক্ষেসহজ ছিলনা। এরই ফাঁকে একটু আশ পাশের ঠাকুর দেখবো বলে আরও দুজনকে নিয়েবেরিয়েছি। ভজন কাকাকে কেউ যে ঐ ভাবে হেনস্থা করেগেছে সে সম্বন্ধে বিন্দুবিসর্গ ধারণাও ছিলনা। হঠাৎই কাকা আমার দিকে তেড়ে এলো আর গালাগালি দিয়ে শুরু করে একটা আধলা ইঁট হাতে ধরে আমার মাথা ফাটাবে বলে। কোন কিছু না বুঝেই কাকার ঐ রণমূর্তি দেখে আমার রিফ্লেক্স কাজে লাগিয়ে পিছন দিক থেকে জাপটে ধরলাম আর কাকা আমার হাতে ইঁট দিয়ে মেরে ক্ষতবিক্ষত করে দিল। রক্ত ঝরছে কিন্তু আমি ছাড়ছি না। ছেড়ে দিলেই উনি আমার মাথা নির্ঘাত ফাটিয়ে দিতেন। কিন্তু ইতিমধ্যে আমার দুই সহযোগী তাঁর হাত থেকে ইঁট ছাড়িয়ে নিয়েছে আর আমিও দে দৌড়। একটা ডিসপেনসারি তে গিয়ে হাতে ওষুধ লাগিয়ে ইনজেকশন নিয়ে মণ্ডপে ফিরে এসেছি। এর কিছুক্ষণ পরে আমার বাবা আসছিলেন ঐ রাস্তা দিয়ে এবং শুনলেন একতরফা কথা আর লজ্জায় মাথা নীচু করে চলে এলেন। বাড়ি এসেই আমার খোঁজ করে জানতে পারলেন যে আমি মণ্ডপে আছি। অন্য ছেলেরা আমাকে বলল যে বাবা আমাকে খুঁজছেন এবং পালানোর জন্য বলল কিন্তু আমি তো কোন দোষ করিনি সুতরাং পালানোর প্রশ্নই নেই। আমি বেরিয়ে আসামাত্রই বাবা আমাকে পেটাতে শুরু করলেন কিন্তু আমি কোন প্রতিবাদ করিনি। মারের চোটে আমার গায়ে হাত পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা। কাঁদতে গেলেও ব্যথালাগছে। সমস্ত লোক খাওয়া হয়ে গেলে পাড়ার লোকদের বসার কথা। কিন্তু আমার খাওয়ার মতন অবস্থা নেই। ইতিমধ্যে কারো কাছে বাবা জানতে পেরেছেন যে আসল ঘটনা কি। তখন বাবার কি অনুশোচনা। দাদা বলল,"বাবা তোকে ডাকছেন।" আমি ধীরে ধীরে তাঁর কাছে আসলে তিনি বললেন," তুমি আমাকে আসল ঘটনা বলনি কেন?" আমি বললাম আপনি তো কিছু জিজ্ঞেস করেন নি, সেই কারণে ই কিছু বলিনি। সেটা আরও কষ্টদায়ক। যাই হোক, বাবার কাছে আমার ঐ প্রথম এবং ঐ শেষ মার খাওয়া। উনি একটা কথা জেনে খুশি হয়েছিলেন যে হাজার কঠিন অবস্থাতেও আমি মিথ্যে কথা বলব না। আর ঐদিকে ভজন কাকাও পরে আসল ঘটনা জেনে খুবই অনুতপ্ত হয়েছিলেন। একদিন আমার কাছে এসে আস্তে আস্তে বললেন ," কিছু মনে করিস না রে ,আমি তোকে ভুল বুঝেছিলাম।" আমি কি আর বলব। পরে একটা সংস্কৃত শ্লোক পড়েছিলাম যেটা জীবনের সর্বক্ষেত্রে কাজে লাগে। " ক্ষণে তুষ্ট, ক্ষণে রুষ্ট, রুষ্ট তুষ্ট ক্ষণে ক্ষণে,
অব্যবস্থিত চিত্তস্য প্রসাদপি ভয়ঙ্কর।" হঠাৎ রেগে গিয়ে কিছু অঘটন ঘটিয়ে পরে তার জন্য পরিতাপ করার কোন মানে হয়না।
এক বিশেষ বন্ধুর কাছে শোনা আরও একটা ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। ভদ্রলোকের মুখে এমন একটা জরুল ছিল যে কারণে তাঁকে খানিকটা বাঁদরের মতো লাগতো। কিছু বিচ্ছু ছেলে কাছে গিয়ে হুপ করে আওয়াজ করলেই নিঃসৃত হতো চোখা চোখা বাণরূপী গালিগালাজ। কোন কোন সময় তিনি ইঁট পাথরও ছুঁড়তেন দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে। ঐ দিকে পাথর ছোঁড়েন তো এদিক থেকে আওয়াজ আসে হুপ। কোনদিক সামলাবেন ভদ্রলোক? এরকম হাজারো খ্যাপামির কাহিনী লিপিবদ্ধ করা যায়। এর উপায় কি? কোন মনস্তত্ত্ববিদ না হয়েও এই কথাটা বলা যায় যে এই ধরণর মন্তব্যকে উপেক্ষা করা । কজনকে পাথর ছুঁড়ে মারা যায়? আর দুর্ভাগ্যক্রমে যদি ঐ পাথর লেগে মারাত্মক কিছু ঘটে যায় তার দায় কিন্তু খুবসহজ নয়।
ভজন কাকা ঐ ঘটনার কিছুদিন পরে কোথায় চলে গেলেন কেউ জানতেই পারলো না। হয়তো আমাকে মারার ঘটনায় উনি খুবই বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন এবং ওঁর বাড়ি ভাড়ায় থাকার জন্য ওঁর চলে যেতে বিশেষ একটা অসুবিধে হয়নি কিন্তু আমাদের শহরে আর কোনদিন ভজন কাকাকে দেখতে পাইনি।
Wednesday, 13 January 2021
মকর সংক্রান্তি
আজকের এই সুন্দর দিনে মনে পড়ে অনেক কথা। পিঠে পুলির কথা মনে পড়লেই জিভে ও চোখে জল চলে আসে। মা, জেঠিমা দের ভোর বেলায় উঠে গঙ্গা স্নান করে এসেই শুরু হয়ে যেত পিঠে পুলির তোড়জোড়। একটা উৎসব উৎসব মেজাজ।কত রকমের পিঠে তাঁরা যে করতেন তার নামধাম মনে রাখা বেশ কঠিন কারণ বহুদিন এত রকমের পিঠে একসঙ্গে খাবার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। সেদ্ধ পিঠে, রস পিঠে, ভাজা পিঠে, পুলি পিঠে এবং তার সঙ্গে খেজুরের গুড়ের পায়েস। ওঃ, জিভে জল আসবেনা আর এগুলো ভাবলে চোখে জল আসবে না? যাই হোক, এর মধ্যেই যতটা সম্ভব ততটা করতে হবে এবং বাকিটা মনে মনে ভেবে রাখতে হবে। মাসিমার করা মালপোয়া, আহা যেন অমৃত। একটু বোস বাবা, গরম গরম ভাজছি , একটু খেয়ে যা বাবা। কি আর্তি তাঁদের কথা বার্তায়, সেটাকে অগ্রাহ্য করা কারও সাধ্য নেই। হাজার পেট ভরা থাকলেও না খেয়ে ওঠার ক্ষমতা ছিলনা। উঠোনের ঐ পাশে রান্নাঘরের বারান্দায় বসে ছোট্ট উনুনে কড়াইয়ে ঘি ঢেলে মাসিমা মালপোয়া ভেজেই রসে ডুবিয়ে এনে দিচ্ছেন আর এদিকে দাওয়ায় বসে একটার পর একটা মালপোয়া খেয়েই চলেছি। ভাবতেই অবাক লাগে যে কত খেতে পারতাম। মা, জেঠিমা, মাসিমা দের এত আনন্দের সঙ্গে লোককে খাওয়ানোর মধ্যে যে এত তৃপ্তি, সেটা কিছুতেই ভুলতে পারিনা। আজ কেউ ভাল করে খেতেও পারেনা আর সেই আন্তরিকভাবে খাওয়ানো যেন উবে গেছে। এখন বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরাও ক্যালরি মেপে খায়, মিষ্টি বেশিরভাগ বাচ্চা খেতেই চায়না। আর আমাদের সময় শেষে মিষ্টি না হলে মনে হতো কিছুই যেন খাইনি।
সন্ধ্যে বেলার কথা আগেই বলা হয়ে গেল। তাহলে সকালবেলায় কি হলো? মা, জেঠিমা গঙ্গা স্নানের পর পূজোয় বসলো, তার পর শুরু হয়ে গেল পিঠে করার ধূম। চালের গুঁড়ো ভিজিয়ে একটু নেড়ে নেওয়ার পর নারকেল কুঁড়ে নতুন গুড়ে পাক করে পিঠের মতন তৈরী করে জলে সেদ্ধ করে দিলেই হয়ে গেল সেদ্ধ পিঠে। গুড়ে পাক করা নারকেলের জায়গায় চাঁছি দিলে হবে অন্য রকমের স্বাদ। জলে সেদ্ধ করার জায়গায় ঘন দুধে মিষ্টি দিয়ে( সাধারণত নতুন গুড়ে) ফোটালে হয়ে যাবে পুলি পিঠে কিন্তু সেক্ষেত্রে পিঠে গুলো হবে ছোট ছোট এবং তার পুর হবে চাঁছির। রস পিঠের জন্য হবে মিষ্টি আলু সেদ্ধ করে পিঠের আকারে ঘিয়ে ভেজে আগে থেকে তৈরী করা ঘন রসে দিয়ে দেওয়া। তারপর খুব সন্তর্পণে একটা একটা করে উঠিয়ে প্লেটে দেওয়া এবং তা মুখে দেওয়া মাত্র মিলিয়ে যাওয়া। সেটা নাহলে কিন্তু রস পিঠের মজা নেওয়া যাবেনা। আর ভাজা পিঠে, সেতো হবে মুগের ডালের। এক নাগাড়ে মিষ্টি খেতে খেতে মুখ মেরে গেলে, দুএকটা ঝাল ঝাল ভাজা মুগের ডালের পিঠে খেলে জমবে ব্যাপারটা আরও ভাল। রাতের খাওয়া যদি ভাজা পিঠে ও পুলি পিঠে এবং পায়েসের মাধ্যমে হয় তাহলে ক্ষতি কি?
এতো গেল বাংলার পৌষ সংক্রান্তি। আমেদাবাদ শহরে থাকাকালীন কিছু বাঙালি পরিবারের কাছাকাছি এসেছিলাম। বাঙালি পরিবার মানে পিঠে পুলি তো আছেই যদিও এত রকমের পিঠে করা সম্ভব নয় কিন্তু বাড়তি আনন্দ ঘুড়ি ওড়ানো। লাহিড়ি দার বাড়িতে দুপুর বেলার নেমন্তন্ন যদিও সকাল থেকেই উপস্থিত থাকতেই হবে। ওদের সনির্বন্ধ অনুরোধ যে সকাল সকাল স্নান সেরেই তাঁদের বাড়িতে উপস্থিত হতে হবে। যাই হোক, পৌঁছতে একটু বেলা হয়ে যাওয়ায় ব্রেকফাস্ট টা এড়িয়ে যাওয়া গেল কিন্তু দুপুর বেলায় সেই আক্রমণ এড়ানো গেলনা। এরপর ওদের ছাদে উঠে ঘুড়ি ওড়ানোর পালা। বাপরে বাপ। আকাশটা যেন ছেয়ে গেছে ঘুড়িতে। রং বেরংয়ের ঘুড়ি। বাড়ির ছেলে মেয়েরাতো বটেই, বাবা মায়েরা পর্যন্ত ঘুড়ি ওড়ানো তে সামিল হয়েছে। একটা একটা ঘুড়ি কাটছে আর ল্যাতরাতে ল্যাতরাতে দূরে কোন ছাদে বা গাছে গিয়ে আটকাচ্ছে। আর কি উল্লাস। আমাদের বাড়িতে ঘুড়ি ওড়ানো ছিল একদম নিষেধ কারণ ন্যাড়া ছাদ। হুঁশ নাশা হয়ে ছুটতে ছুটতে কত ছেলে যে প্রাণ হারিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। সুতরাং প্রাক যৌবনের স্বাদ অস্তাচলে যাওয়া যৌবনে উপভোগ করা , অনেকটাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতন। আনাড়ির ঘুড়ি ওড়ানো খুব মুশকিল। কত রকমের মান্জা, কোনটা তেলতেলে আবার কোনটা ভাতের ফ্যানে কাঁচের গুঁড়ো দিয়ে তৈরী। সেটাতে নাকি টেনে খেলতে হয় আর তেলতেলে মাঞ্জাতে ঢিলে দিয়ে খেলতে হয়। কত রকমের জ্ঞান অর্জন করা এখনও বাকি কে জানে? সন্ধ্যে বেলায় সাবরমতীর তীরে নানান ধরনের ঘুড়ির প্রর্দশনী। বিশালাকৃতির ঘুড়িগুলো নানান সাজে রাখা আছে ,কোনটা রাক্ষস, আবার কোনটা সূর্য। এ বলে আমাকে দেখ ,ও বলে আমায় দেখ। কিন্তু ঘুড়ির এরকম প্রর্দশনী সত্যিই অদেখাই ছিল।
অন্ধ্র প্রদেশের পোঙ্গল সেটাও কিন্তু অনেকটাই বাংলার মতো পেলব। পূর্বের ছোঁয়াই বেশি কারণ ভারতের পূর্ব প্রান্তে তো। সেখানেও পায়েস বা পরমান্নম কিন্তু ঘরে ঘরে। আমাদের সরুচাকলি মোটামুটি ভাবে ওদের দোসার মতো। কিন্তু সরুচাকলিতে যেমন একটু ঝাল ঝাল হয় দোসাতে সেটা হয়না। কিন্তু উৎসবে মুখরিত হয়ে ওঠে সমস্ত প্রদেশ।
যদিও পাঞ্জাবের লোঢ়ি বা আসামের বিহু দেখার সুযোগ ঘটেনি কিন্তু এই ফসল ওঠার আনন্দ সমস্ত ভারতবর্ষ ই উপভোগ করে। কিন্তু ঘুরে ফিরে আসে সেই পিঠে পুলি, মা, কাকিমা, মাসিমাদের ভালবাসা মেশানো।
Subscribe to:
Posts (Atom)
