প্রতিবার বাদাম গাছের বাসিন্দারা যখন সেগুনগাছে আশ্রয় নিতে চায় তখনও যেমন ঝগড়া আবার তার কিছুদিন পরে সেগুন গাছের বাসিন্দারা বাদাম গাছে আসতে চাইলে তখনও হয় ঝগড়া। আমরা যারা ব্যালকনিতে সময় কাটাই, দুই দল পাখিদের ঝগড়া দেখে ভাবি কেন একটু বোঝাপড়া নেই দুইদল পাখিদের মধ্যে কিন্তু একবারও এটা ভেবে দেখিনা এই স্বভাব তো আমাদের ও , আমরাও কাউকে সহ্য করতে পারিনা। এই অন্তর্কলহ শুধু মানুষ নয় পশুপাখি সবার মধ্যেই বিদ্যমান।
Wednesday, 22 May 2024
পরিবর্তন
ব্যালকনিতে বসে ঋতু পরিবর্তন দেখা একটা দারুণ অনুভূতি। কয়েকদিন আগে গ্রীষ্মের দাবদাহে সমস্ত পশুপাখি ও তাদের আবাসস্থল গাছগুলো যেন ধুঁকছিল। যদিও পার্কের মধ্যে থাকা বাদাম গাছটা তাদের পুরোন পাতাগুলো ঝেড়ে ফেলে নতুন সবুজ পাতায় নিজেদের সাজিয়ে নিয়েছিল কিন্তু সেগুন গাছের বৃদ্ধ পাতাগুলো যেন গাছের মায়া ছাড়তেই পারছে না তখনও যুদ্ধ করে চলেছে ঐ মারাত্মক দাবদাহের সঙ্গে। কিন্তু কতক্ষণ আর যুঝবে? স্পার্টার মুষ্টিমেয় সৈনিক যেমন বিশাল পারস্য বাহিনীকে বেশিক্ষণ আটকে রাখতে পারেনি এই বৃদ্ধ ও ন্যূব্জ পাতাগুলোও কালের নিয়মে টুপটাপ আওয়াজ করে ঝরে পড়তে লাগল আর কিছুদিনের মধ্যেই ঐ বড় গাছটার মাথা যেন ন্যাড়া হয়ে গেল। এদিকে বাদাম গাছের ন্যাড়া মাথায় চুল(পাতা) গজিয়ে বেশ ঝাঁকড়া হয়েছে, কচি পাতাগুলো তাদের কৈশোর ছাড়িয়ে যৌবনে পা দিতে না দিতেই বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে। কিন্তু রোজ সন্ধে হতে না হতেই কিচির মিচির শব্দে পাখিদের ঝগড়া শোনা যায়। মুশকিল হলো যাদের আশ্রয়স্থল ছিল সেগুন গাছ, পাতা ঝরে পড়ায় তারা শুধু সরু ডালে কি করে থাকবে, সারাদিন এখানে সেখানে উড়ে উড়ে খাবারের সন্ধানে শরীর ও মন উভয়েই ক্লান্ত। এরপর তো একটু ভাল ঘুমের ভীষণ প্রয়োজন, তাই তারা উড়ে আসে বাদাম গাছের ঘন পাতায় ঢাকা ডালে একটু বিশ্রামের জন্য। কিন্তু বাদাম গাছের স্থায়ী বাসিন্দা যেসব পাখি তাদের প্রতিবাদ আছে এবং সেই কারণেই কিচির মিচির করে নিত্যদিন ঝগড়া। এই ঝগড়া কিন্তু বেশিদিন স্থায়ী হয় না। দেখি সেগুন গাছের সমস্ত ডালে ছোট ছোট গুটির মতন কিসব যেন। ধীরে ধীরে রোদের তেজ স্তিমিত হয়ে গেলে গুটিগুলো যেন সভয়ে চোখ মেলতে শুরু করে। আস্তে আস্তে গজায় ছোট্ট ছোট্ট পাতা আর বৃষ্টির একটু আলতো চাবুকেই সচকিত হয়ে ওঠে সেই নবীন পাতাগুলো, মেলে ধরতে শুরু করে নিজেদের। ন্যাড়া মাথায় প্রথম যখন চুল গজাতে শুরু করে এবং তার পর যখন সেটা বাড়তে বাড়তে সমস্ত মাথাটাকে ঢেকে ফেলে অনেকটা সেইরকম। কচি কচি হলদে পাতাগুলো বৃষ্টির পরশে ধীরে ধীরে সবুজ থেকে ঘন সবুজ হতে শুরু করেছে আর এই গাছের বাসিন্দারাও নিজভূমে ফিরে আসছে আর তাদের কলহের কিচির মিচির স্তিমিত হয়ে আসছে।
Sunday, 5 May 2024
লালু, ভোলা, কালু, টমি ও দীপু বনাম মতি,ড্যাকা,পেঁচো ও ঝগড়ু
দলের পাণ্ডা লালু একদিন তার অ্যাসিস্ট্যান্ট ভোলাকে কঠোর নির্দেশ দিল যে মতি ও তার দলবল মাঝেমধ্যেই তাদের সীমানায় এসে হামলা করে যাচ্ছে যখন তারা অন্য দিকে ব্যস্ত থাকে, যেটা একদমই বরদাস্ত করা হবেনা। ভোলাকেও তো নানাদিকে ছোটাছুটি করতে হয় আর তাদের এলাকাটাও তো যথেষ্ট বড় আর সেই ফাঁকেই মতি তার দলবল নিয়ে এসে এখানে এসে গরম দেখিয়ে যাবে এটাও বাঞ্ছনীয় নয়। আর দল বাড়াব বললেই তো বাড়ানো যায়না, কারণ আনুগত্য না থাকলে তাকে দলে টানলে লাভের চাইতে ক্ষতিই বেশী। সুতরাং খুব বুঝে শুনে পদক্ষেপ নিতে হবে। টমিকে বলল, " তুই তো মোটামুটি বাড়ির আশেপাশেই থাকিস, তুইই একটু নজর রাখবি বেশী করে আর কোনরকম খারাপ কিছু আঁচ করলেই একটা আওয়াজ দিবি আর বাকিটা আমরা দেখে নেব। মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল সে।
এদিকে মতির এলাকাটা বেশী বড় নয় এবং তার দলের পরিধিও ধীরে ধীরে বাড়ছে, সুতরাং, এলাকা না বাড়ালে তাদের চলছেই না। লালু, ভোলারা খুবই সতর্ক, কোনভাবেই যেন বেনোজল না ঢুকে পড়ে। একবার দলে অবাঞ্ছিত কেউ এসে গেলে তাকে গেলাও যায়না আবার উগরেও ফেলা যায়না। খুবই নিয়মানুবর্তী তাদের দল। ওদের বুদ্ধি দেয় দীপু যে বড়লোক বাপ মায়ের অপোগণ্ড ছেলে কিন্তু লালু, ভোলা, কালু, টমিদের মেন্টর সে। সবসময়ই প্যান্টের দুই পকেটে বিস্কুট নিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর লালু ভোলাদের স্পনসর হিসেবে কাজ করে আর সেই কারণেই তার কদর ই আলাদা। অন্যদিকে ঝগড়ু খেটে খাওয়া বাবা মায়ের ছেলে আর তাই ট্যাঁকের জোর ও কম কিন্তু ও খুবই কমিটেড। বিরোধীপক্ষ হলেও দীপুর কাছে ঝগড়ুর একটা আলাদা সম্মান আছে। দুই যুযুধান গোষ্ঠীর মেন্টর রা মাঝেমধ্যেই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে যে কিভাবে সংঘর্ষ এড়ানো যায় কিন্তু এ সত্ত্বেও ছোটখাট ঝামেলা লেগেই থাকে।
লালুর শরীরটা ইদানীং বেশী ভাল যাচ্ছেনা, সুতরাং ভোলাকেই দলের অনেকটাই সামলাতে হচ্ছে। মিউনিসিপ্যালিটি থেকে লোক আসছে সারমেয়কুলের সংখ্যা কমানোর উদ্দেশ্যে এবং বিভিন্ন পাড়ায় তারা সমীক্ষা চালাচ্ছে। বাড়ির কুকুরের গলায় বেল্ট এবং পাড়ার ভাল কুকুরের গলায় দড়ি বেঁধে দিয়ে চিহ্নিত করা হতো যে এদের ধরে নিয়ে যাওয়া বা বিষমেশানো মিষ্টি খাইয়ে মেরে ফেলা চলবে না। লালু, ভোলা, কালু বা টমিদের স্বভাব এতই ভাল ছিল যে ওদের কেউ ক্ষতি করতে চাইলে সমস্ত পাড়ার লোক হাঁ হাঁ করে উঠত। কিন্তু মতিদের এলাকা সবই খেটে খাওয়া মানুষদের পাড়া যারা সকাল হতেই কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে এবং ঝগড়ুও তার ব্যতিক্রম নয়। সুতরাং মিউনিসিপ্যালিটির লোক আসার সময় সে মতিদের খেয়াল রাখতে পারেনি এবং এতই নির্দয় সেই লোকগুলো, মতিকে দেখে তারা বিষমেশানো মিষ্টি খাইয়ে দিয়েছে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ঐ তরতাজা তাগড়া কুকুরটা ছটফট করে মারা গেল। দীপু যখন জানতে পারল যে মতিকে বিষ খাওয়ানো হয়েছে, ছুটল তাকে দেখতে। দীপু বাড়ির সকলের কাছে অপদার্থ হলেও তার একটা হৃদয় বলে বস্তু ছিল এবং কারণে অকারণে পশুপাখির উপর কোন ধরণের অত্যাচার সে সহ্য করতে পারত না আর সেই কারণেই সমস্ত জীবজন্তুরা তাকে খুব ভাল বাসতো। এমন কি চিরশত্রু লালু ভোলাদের মেন্টর হলেও মতি বা তার দলবল তাকে কোনদিন তাড়া করেনি। ড্যাকারা তাদের নেতা মতির ঐ হাল দেখে পাড়া ছাড়া, এসে পড়েছে লালু, ভোলাদের পাড়ায় কিন্তু না, আজ তারা আর নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি ভুলে গিয়ে দীপুর পিছন পিছন এসেছে মতিকে দেখতে। মতির এই হাল দেখে দীপুর চোখে জল এসে গেল। পকেট থেকে বিস্কুট বের করে মতির মুখের কাছে দিল কিন্তু মতির চোখ দিয়ে জল বেরোনো ছাড়া আর কিছুই হলো না। পাশের কল থেকে হাতের আঁজলে করে জল মতির মুখের কাছে দিল, সামান্য একটু জল হয়তো মুখের ভেতর গেল আর বাকিটা ঐ জায়গার চারপাশ টা একটু ভিজিয়ে দিল। মিউনিসিপ্যালিটির লোকগুলো হতভম্ব, তারাও ভাবতে পারেনি খেটে খাওয়া মানুষের এলাকায় বেড়ে ওঠা এক প্রতিবাদী কুকুরের মৃত্যুর জন্য বড়লোকের ছেলে দীপুর এহেন আচরণ। একটু বাদেই একটা দড়ির ফাঁস মতির পিছনের পায়ে লাগিয়ে টানতে টানতে নিয়ে গেল, রেখে গেল কাঁচা রাস্তায় মতির শরীরের দাগ। পকেটে রাখা সমস্ত বিস্কুট আজ দীপু লালু, ভোলা কালু টমিদের সঙ্গে ড্যাকাদের মধ্যেও ভাগ করে দিল। ওরা আজ একটু থ, বিস্কুট টা শুঁকল কিন্তু কেউ খেলনা, হয়তো বা সন্দেহ তাদের ও মতির মতন অবস্থা হবে না তো।
এর পর থেকে লালু, ভোলাদের দলে ড্যাকারাও সামিল হয়ে গেল এবং রেষারেষি একদম বন্ধ।
Saturday, 4 May 2024
প্রেম করে বিয়ে বনাম সম্বন্ধ করে বিয়ে
প্রেম করে বিয়ে ভাল না সম্বন্ধ করে বিয়ে করা ভাল এই নিয়ে তর্ক বহু যুগ ধরে চলে আসছে। দুই তরফেই চোখা চোখা যুক্তি ,কেউ কারো থেকে কম নয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার যে একপক্ষ যখন বক্তব্য রাখেন তখন মনে হয় ইনি যা বলছেন সেটাই ঠিক আবার পরমূহুর্তেই যখন অপর পক্ষের বক্তব্য শুনি তখন মনে হয় নাহ্ এই ঠিক বলছে। যাই হোক, একটু দুই তরফের বক্তব্য ই শোনা যাক তারপর না হয় ঠিক করা যাবে কোনটা ভাল আর কোনটা খারাপ।
দুপক্ষের ই বাঘা বাঘা বক্তা( পুরুষ ও মহিলা) রয়েছেন এবং সঞ্চালকের ভূমিকায় রয়েছেন দুঁদে সাংবাদিক প্রজাপতি দে মহাশয়।
কাকে দিয়ে শুরু করবেন বিতর্ক এই নিয়ে একটু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন প্রজাপতি। কিন্তু তাঁর মতো সাংবাদিকের কাছে এ তো নিতান্তই জলভাত। উনি প্রথম বলার সুযোগ প্রেম করে বিয়ে করা ভাল এদের দিলেন।
প্রথম পক্ষের বক্তারা অনেক ইনিয়ে বিনিয়ে প্রেমের মাহাত্ম্য বর্ণনা করলেন এবং সেই বর্ণনা করতে গিয়ে কত কি যে বললেন শুনে মাথাটা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। মহাভারতের যুগ থেকে শুরু করে পঞ্চাশ বছর আগেও যেরকম ভাবে প্রেম নিয়ে একটা গদগদ ভাব ছিল তা খুবই সুন্দর ভাবে পেশ করলেন কিন্তু এই আধুনিক যুগে ছেলেমেয়েদের হাতে খুবই কম সময়, অত ধানাইপানাই করার সময় নেই। সুতরাং আগের দিনে কড়াইয়ে মাংস চাপিয়ে ভাল করে কষে তারপর জল ঢালা এবং খুব কম করে ঘন্টা দুয়েক মাংস রান্নার গন্ধ ছড়িয়ে খিদেটা দ্বিগুণ করে তোলাটা একটা দারুণ ব্যাপার ছিল। রবিবার যেদিন মাংস হতো সেদিন ভাতের চাল বেশী করে নিতে হতো। ওগো তুমি আমার প্রাণ,তোমাকে না পেলে আমার এই জীবনটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে এই ধরণের চিঠি চাপাটি চলতো। অবশ্য এই প্রেমের দরুন অনেক অমর সাহিত্যের সৃষ্টি ও হতো। অনেকসময় খেঁদি পেঁচি মেয়েকেও প্রেমিকের চোখে অমাবস্যার পর প্রথমা বা দ্বিতীয়ার চাঁদ না বলে পূর্ণিমার চাঁদ বলে বর্ণনা করা হতো বা ট্যারা প্রেমিককে পদ্মলোচন বলে মনে করা হতো। এককথায় বলা চলে পীরিতে মজিল মন, কি বা হাড়ি কি বা ডোম। তখন অবশ্য জাতপাত নিয়ে বড্ড বেশীরকম মাতামাতি করা হতো। ব্রাহ্মণ না কায়স্থ বা কুলীন না অকুলীন এইসব নিয়ে অনেক বঙ্গবিচার হতো। শুধু ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রেম হলেই সব হয়ে গেল এমন নয় তার পরিণতি বিয়েতে গড়াত তাদের বাবা মায়ের সম্মতি পেলে। নাহলে ভো কাট্টা। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কেউ কেউ আত্মঘাতী হতো আবার কেউ বা বিরহে সারাজীবন বিয়ে না করেই কাটিয়ে দিত। কিন্তু প্রেমের পরিণতি যদি বিয়ে অবধি গড়াতো তাহলে সেই বিয়ের মাধুর্য ই ছিল আলাদা। অনেক কচকচানির পর এবার অন্য পক্ষের বক্তব্য শোনা যাক।
ছেলেমেয়েদের সময় এখন খুবই কম। ধৈর্য অত নেই শোনার যে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন ঠোঁট ফাঁক করে বলবে যে সেই তার হৃদয়ের নাথ। এখন প্রেসার কুকারের যুগ, ফটাফট ম্যারিনেট করে চার পাঁচটা স্টিম দিয়ে নামিয়ে বসে পড় খেতে। অত সুন্দর গন্ধ ও বেরোবে না কিন্তু খাওয়া তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। দু চারদিনের আলাপ, তার মধ্যেই প্রেমের প্রস্তাব এবং সম্মতি এবং বাবা মায়েরা হচ্ছে রাবার স্ট্যাম্প অনেকটা আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতির মতো। নামেই তিনি একনম্বর কিন্তু আসল ক্ষমতা অন্যজনের কাছে। সুতরাং ছেলে ও মেয়ের উভয়ের সম্মতি থাকলে হয়ে গেল বিয়ে। আনুষ্ঠানিক ভাবে বাবা মায়েরা তাঁদের সম্মতি দিলে ভাল আর না দিলে থোড়াই কেয়ার, রেজিস্ট্রি করে স্বামী স্ত্রী হয়ে গেল।
এখন দেখার বিষয় যে কোন বিয়েটা বেশী মধুর হলো। বিয়ে মানে তো শুধু একটা ছেলের সঙ্গে একটা মেয়ের বিয়েই নয় , একটা পরিবারের সঙ্গে আর একটি পরিবারের সম্বন্ধ গড়ে ওঠা। সুতরাং অনেক খোঁজ খবর নিয়ে এই সম্বন্ধ গড়ে ওঠে মানে এককথায় যাকে বলে ডিউ ডিলিজেন্স নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ সত্ত্বেও কি সব বিয়েই মধুর হয়েছে বা যেখানে ছেলে বা মেয়ে নিজের পছন্দ মতো বিয়ে করেছে তারা কি খুব অসুখী? আসল কথা, যদি বোঝাপড়া থাকে নিজেদের মধ্যে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকে তবে সেই বিয়ে সেটা সম্বন্ধ করেই হোক বা প্রেম করেই হোক তা সুখের হয়।
জনতার মধ্য থেকে একটা হাত গুটি গুটি করে উঠল যার মালিক একটি অল্পবয়সী মেয়ে। একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়েই সে প্রজাপতি বাবুর উদ্দেশ্যে একটা প্রশ্ন রাখার জন্য অনুমতি চাইল। ঐ বয়সী কোন ছেলেমেয়েই ঐ অনুষ্ঠানে ছিলনা। প্রজাপতি আর কি করেন, আচ্ছা দেখাই যায়না কি প্রশ্ন মেয়েটি রাখে বলে সম্মতি দিলেন। উপস্থিত জনতা খানিকটা ঔৎসুক্যবশত নিজেদের মধ্যে চাওয়াচায়ি করতে থাকলেন। আচ্ছা স্যার, হাইব্রিড বিয়ে হলে কেমন হয়?
হাইব্রিড বিয়ে! সবাই হাঁ হয়ে গেলেন এই অদ্ভূত বিয়ের কথা শুনে। এইরকম বিয়ের কথা তো সকলেরই অজানা। একযোগে বহু জোড়া বিস্মিত চোখের দৃষ্টি মেয়েটির দিকে ধেয়ে এল। কোন কোন বয়স্ক মানুষ অস্ফূট স্বরে বলে ফেললেন এঁচোড়ে পাকা মেয়ে কোথাকার। কিন্তু প্রজাপতি দুঁদে সাংবাদিক। তিনি বললেন যে একটু বিশদভাবে বললে বুঝতে সুবিধে হয় কারণ এই বিশেষ বিয়ে সম্বন্ধে কারও কোন ধারণা নেই। মেয়েটি এইবার বলল যে ধরুন কোন ছেলের সঙ্গে কোন মেয়ের প্রেম হলো কিন্তু কোন কারণে সেটা ম্যাচিওর করলনা এবং দুজনেই পরবর্তী কালে সংসারী হলো এবং দুজনের মধ্যেই একটা সুসম্পর্ক থেকে গেল।
কেউ কেউ বলে উঠলেন এ তো পরকীয়া। আবার কেউ কেউ বললেন যে না, এটাকে পরকীয়া বলা ঠিক হবেনা বরং এটাকে প্লেটোনিক লাভ বলা উচিত। সময় প্রায় শেষ হয়ে আসছে দেখে প্রজাপতি পাকা খেলোয়াড়দের মতো বললেন যে আজকের বিতর্ক ছিল কোন বিয়ে ভাল প্রেম করে না সম্বন্ধ করে। আপনার কথামতো হাইব্রিড বিয়ে নিয়ে অন্য একদিন ভালভাবে আলোচনা করা যাবে।
প্রজাপতি দে ফল অমীমাংসিত বলে ঘোষণা করলেন। সুতরাং বরাবরের মতো এই আলোচনাতেও ঠিক হলোনা কোনটা ভাল আর কোনটা বিষময়।
Wednesday, 1 May 2024
দমকা হাওয়া
টুটুটু টুটুটু টুটু, টুটুটু টুটুটু টুটু রিং টোনে সচকিত মোবাইলে দৌড়ে এল সুনন্দ, কে ফোন করেছে দেখতে। হ্যালো বলতেই একটা দারুণ সুরেলা গলায় আওয়াজ ভেসে এল কানে," কাকু, কেমন আছেন?"
গলাটা চেনা চেনা কিন্তু এই মূহুর্তে মনে পড়ছে না। কিন্তু এতটুকুও বিচলিত না হয়ে অত্যন্ত সপ্রতিভ ভাবে উত্তর দিল, " ভাল, তুমি কেমন আছো?" কিন্তু মনটা তখন খুঁজতে শুরু করেছে এই দুরন্ত কণ্ঠস্বরের মালকিন কে।ব্রেনে একটু খোঁচাখুঁচি করতেই মনে পড়ে গেল বছর সাতেক আগে মুম্বই গামী দুরন্ত এক্সপ্রেসে এক সহযাত্রীনির কথা। হ্যাঁ, অবশ্যই তিনি। কিন্তু ঐ ভদ্রমহিলাকে সুনন্দ তো আপনি সম্বোধন করে কথা বলেছিল, আজ হঠাত তুমি বলে ফেলে একটু লজ্জা লজ্জা বোধ হচ্ছিল। আসলে কাকু বলে কেউ ডাকলে তাকে আপনি বলে উত্তর দিলে হয়তো তাকে অপ্রস্তুত করে ফেলা হয়। যাইহোক, কথোপকথন বেশ ভালোই হলো। কাকিমা কেমন আছেন, বম্বে আসলে একবার আমাদের বাড়ি আসবেন এই জাতীয় কথাবার্তায় শেষ হলো ফোনালাপ।
কিছুদিন ধরেই মনে হচ্ছিল সেই অসামান্য কণ্ঠস্বরের অধিকারিনীর কথা কিন্তু নামটা কিছুতেই মনে আনতে পারছিলনা সুনন্দ। ফোন ছাড়ার পরেই ফোনে নামটা দেখার চেষ্টা করল কিন্তু চেনা নম্বর নয়, অন্তত এই মোবাইলে নম্বর টা নেই। পুরোন
ছোট মোবাইলে এই নম্বর টা ডায়াল করতেই ফুটে উঠল নাম শ্রাবস্তী মজুমদার। এতক্ষণে সমস্ত ট্রেন যাত্রার পুঙ্খানুপুঙ্খ ঘটনা মনে পড়ে গেল। একেই বলে টেলিপ্যাথি, সুনন্দ ও চিন্তা করছিল আর সেও কিনা আজই তাকে টেলিফোন করে খবরাখবর নিল।
শ্রাবস্তীর বাবা টাটার উচ্চপদস্থ অফিসার ছিলেন। ওর স্বামী গৌরবের বাবাও ঐখানেই তাঁরই সমকক্ষ অফিসার ছিলেন এবং ছিলেন অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। তাঁদের বন্ধুত্ব তাঁদের ছেলেমেয়েদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল এবং গৌরব ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্নেল পদে ছিল। শ্রাবস্তী ছিল খুবই ডাকাবুকো ধরণের। পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে খেলাধূলায় ও ছিল চরম উৎকর্ষতা। কিন্তু একদিন দুর্ভাগ্যবশত প্যারাসেলিং করার সময় প্যারাসুট ঠিকঠাক না খোলায় এক মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়ে যায় এবং ভগবানের অশেষ করুণায় ও প্রাণে বেঁচে যায় কিন্তু তার মেরুদন্ডে আঘাতের জন্য তার হাত পা অবশ হয়ে যায়। কিন্তু দারুণ লড়াকু শ্রাবস্তী হার মানার মেয়েই নয় এবং দুর্জয় মনোবল এবং গৌরব ও তার পরিবার শ্রাবস্তীর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোয় তার পুনরুত্থান হয় এবং গৌরব শ্রাবস্তীকেই বিয়ে করে যা আজকের দিনে বিরল ঘটনা। কথায় কথায় ছাড়াছাড়ি, এমনকি ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেছে তখনও ছাড়াছাড়ি এবং বাবা বা মায়ের বিয়েতে ছেলে মেয়েরাও সেলিব্রেট করছে, এই ধরণের ঘটনাও আকছার আর সেইখানে ভালবাসার মর্যাদা দিতে গৌরবের শ্রাবস্তীকে বিয়ে করা এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা। এ বোধহয় আমাদের ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিকারীদের পক্ষেই সম্ভব। সেলাম জানাই ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমস্ত সেনা এবং আধিকারিকদের। গর্বে বুক ভরে ওঠে গৌরবদের মত ছেলেদের কথা ভেবে। ট্রেনে যখন দেখা হয় তখন সে ভাল করে ফোনটাও ধরতে পারছিল না এবং ভয়েস মেসেজ সে পাঠাচ্ছিল। আর তাতেই আমার কান তার অসাধারণ কণ্ঠের পরিচয় পেয়েছিল। ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাসে তার স্বামী গৌরবের সঙ্গে সুনন্দর পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে সুনন্দর ছেলের সঙ্গেও। কথায় কথায় সুনন্দ জেনেছিল তার স্বামী গৌরবের ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমির কথা এবং সুনন্দর ছেলের ই ব্যাচের কিন্তু তার ছেলে সেখান থেকে বেড়িয়ে সিভিলিয়ান জব করেছিল। একই ব্যাচের হওয়ায় আলাদা স্কোয়াড্রন হলেও পরস্পরকে চিনতে পারল এবং মিনিট পাঁচেক কথাবার্তার পরেই ওরা নিজেদের গাড়িতে উঠল।
দুহাজার একুশের পাঁচই মে শেষ কথা হয়েছিল যখন শ্রাবস্তীর মা ও শ্বাশুড়ি দুজনেই কয়েকদিনের ব্যবধানে এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছিলেন। বাবা এবং শ্বশুর মশাই আগেই চলে গিয়েছিলেন। সুনন্দ জানতে পারল যে আমেরিকায় অস্ত্রোপচারের পর সে এখন যথেষ্ট ভাল আছে এবং নিজের কাজ নিজেই করতে পারছে। গৌরবের প্রতি সে কৃতজ্ঞ যে বিপদের দিনে সে পাশে না দাঁড়ালে শ্রাবস্তী হয়তো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতেই পারতো না। আমাদের দেশে হাজার হাজার গৌরব জন্ম নিক যাতে আমাদের সমাজ কলুষ মুক্ত হয়।
Tuesday, 30 April 2024
ফিরে দেখা
সময়টা আটাত্তর সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষাশেষি, সম্ভবত আটাশ তারিখ। থাকি লেক গার্ডেন্স স্টেশন প্ল্যাটফর্মের শেষ যেখানে হয়েছে সেই ঢাল দিয়ে নেমেই ডান দিকে দ্বিতীয় বাড়ির গ্যারাজের উপরের ঘরে। দুই দিকে তিন/ চার ফুট জমি ছেড়ে তৈরী বাড়িটা লম্বাটে ধরণের, সামনে গ্যারাজ রাস্তামুখো আর বাড়িটা ট্রেনের লাইনকে লম্বালম্বিভাবে ধরে ফেলত যদি না রেলের জমির সীমানা বরাবর লোহার পোলগুলো না থাকত। লাইনটা বালিগঞ্জ থেকে লেক গার্ডেন্স হয়ে টালিগঞ্জ ধরে বজবজের দিকে চলে গেছে। তিনদিকে জানলা( রাস্তার দিকটা বন্ধ) ,আর গ্যারাজের উপর হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙার কোন উপায় ছিলনা। ঘরের আসবাবপত্র বলতে একটা চৌকি, একটা বই ভর্তি ট্রাঙ্ক, একটা স্যুটকেস এবং একটা হারমোনিয়াম , তানপুরা আর একটা টেবিল ফ্যান যেটা আমার বাড়িওয়ালি মাসিমা দিয়েছিলেন। দিনের খাওয়া বাইরে হোটেলে আর রাতে মাসিমার কাছে।
ঐ বাড়িতে যাওয়ার পিছনেও একটা ছোট্ট গল্প আছে। ঐ সময় কোন ব্যাচেলর ছেলের ঘর ভাড়া পাওয়া একটা ভয়ানক কঠিন ব্যাপার ছিল। ব্যাচেলর মানেই ঘরে বসে মদ খাবে, মাঝে মধ্যে মেয়েবন্ধুরা এসে হৈ চৈ করবে আর এইসব কারণেই কোন বাড়ির মালিক এদের ভাড়া দিতে চাইত না। সত্যিই তো, বাড়ির মধ্যে বেলেল্লাপনা কার সহ্য হবে? ঐ বাড়ি টা একটা ছোট পরিবারকে দেওয়া হবে বলে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল এবং সেই কারণেই এক স্বামী স্ত্রী ও ছিল দাবিদার কিন্তু কেন জানিনা মাসিমার পছন্দ আমাকেই হলো। এই বাড়িতে থাকা চার বছর হয়ে গেল কিন্তু বাড়ির ঠিকানা জানিনা। হঠাৎই বাবা একদিন জিজ্ঞেস করায় আমি কোন উত্তর দিতে পারলাম না আর বাড়ির সবাই আশ্চর্য হয়ে গেল । চারবছর থাকার পরেও যদি কেউ ঠিকানা না জানে তাহলে তাকে উদোমাদা ছাড়া আর কি বলে? লজ্জায় মুখ লাল হয়ে গেল । ফিরে এসেই মাসিমাকে ঠিকানা জিজ্ঞেস কথায় সবাই হেসেই খুন। যাই হোক জানা গেল পঁয়ত্রিশ এ, চারুচন্দ্র প্লেস ইস্ট । জানিয়ে দিলাম বাড়িতে । এতদিন ছিলাম ঠিকানাবিহীন, আজ আমার ঘর হলো।
একটা কঠিন নিয়মের মধ্যে দিন কাটছিল। ভোরবেলায় উঠে রেওয়াজ, তারপর স্নান করে ব্রেকফাস্ট করে আনোয়ার শা রোডে যোগেশ চন্দ্র চৌধুরী 'ল' কলেজে, তারপর অফিস, গানের ক্লাস, বাড়ি ফিরে খাওয়াদাওয়া সেরে একটু পড়াশোনা আর দশটার সময় ঘুমিয়ে পড়া। বেশ চলছিল রুটিন, হঠাৎই এল বৃষ্টি। প্রথমদিকে এত তেজ ছিলনা , কলেজ অফিস তবু ম্যানেজ করা যাচ্ছিল, কিন্তু আটাশ তারিখ সকালে কলেজের পাশে থাকা চায়ের দোকানে যেখানে প্রত্যেক দিন আমরা চা খেতাম , তার মালিক ঝন্টু দা বলল , " দাদা, আকাশের অবস্থা ভাল নয়, আপনি এই দু পাউণ্ড রুটি আর কিছু বিস্কুট নিয়ে যান। আপনি তো একাই থাকেন, কিছু না হলেও পেটে কিছু পড়বে।" নিয়ে নিলাম রুটি ও বিস্কুট কিন্তু মাঝে জন ( ওর আসল নাম ছিল অমিয় ব্যানার্জি, কিন্তু ক্লাসের সবাই ওকে জঙ্গলি বা জঙ যার ভদ্রস্থ নাম জন) আমাকে একটা রিকোয়েস্ট করে বলল," আমার বাড়ি থেকে টাকা আসেনি, পয়সাও কিছু নেই, আমাকে তোর কাছে দুদিন থাকতে দিবি?" এর পরে তো আর কিছু বলা যায়না। চলে আয় বলে ফেললাম কিন্তু পরে যে কি ঘটল সেটা না বললেই নয়। মাসিমা তো আমার মতনই খাবার করেছিলেন, সেটাই দুজনে মিলে ভাগ করে খেলাম। পরদিন সকাল বেলায় জল থৈ থৈ করছে, দোকান পাট সব বন্ধ। কোন গাড়ি, বাস বা ট্যাক্সি রাস্তায় দেখা যাচ্ছেনা, শুধু জল আর জল। লেক গার্ডেন্স থেকে হাঁটতে হাঁটতে দেশপ্রিয় পার্কের অফিসে। যাদের না বেরোলে একদমই চলবে না তারা এসেছে টাকা তুলতে কারণ তখন কোন এটিএম ছিলনা। জন আমার সঙ্গেই এসেছে। তারামহল, কেরালা কাফে সব বন্ধ। ল্যান্সডাউন রোড জলে জলময়, কোথাও হাঁটুজল তো কোথাও কোমর পর্যন্ত । ল্যান্সডাউন মার্কেটের কাছে কয়েকটা হোটেল ছিল, জল ভেঙে সেখানে ও যাওয়া হলো কিন্তু সব বন্ধ। হঠাত মনে পড়ল শিশুমঙ্গল হাসপাতালের কাছে আমাদের ক্লাসের একটা মেয়ে থাকে। সেখানেও গিয়ে চা, বিস্কুট আর চানাচুর ছাড়া আর কিছুই মিলল না। লজ্জায় মুখ ফুটে বলতেও পারলাম না যে একটু ভাত ডাল খাওয়ালে ভাল হয়। খিদে তো লেগেছে, পকেটে টাকাও আছে কিন্তু নেই কোন খাবার।দুজনে মিলে প্রিয়া সিনেমায় ঢুকে পড়লাম কিন্তু পেট করছে চোঁ চোঁ, সিনেমা দেখতে ভাল লাগে নাকি? ইন্টারভ্যালে বাইরে এসে কিছু বাদাম ভাজা খেয়ে সিনেমা না দেখেই আবার জল ভেঙে লেক গার্ডেন্সের বাড়িতে ফেরা । রাতে ঐ পাঁউরুটি খানিকটা খেয়ে আর কলসির জল কিছুটা গলায় ঢেলে দুই বন্ধুতে ঐ চৌকিতে কোনরকমে রাতটা কাবার করলাম। এদিকে খাবার জল ও শেষ হয়ে আসছে। সমস্ত কলগুলো জলের তলায় এবং তখন বোতলের জল ও ছিল না। সেই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ভগবানকে ডাকা ছাড়া আর কোনও রাস্তাই ছিলনা। তিনদিন পর বৃষ্টির যেন একটু ঢুলুনি এল। জলটাও বেশ নেমে এল। একটা দুটো করে বাস চালু হল। শুনলাম ট্রেন ও চলতে শুরু করেছে।জনের কাছে কোন টাকা না থাকায় ওকে গোটা তিরিশেক টাকা দিলাম এবং জল নামতে থাকায় বন্ধ হোটেলগুলোও খুলতে থাকল। তিনদিন পর লেক গার্ডেন্সের বেনারসী হোটেলে যখন দুজনে মিলে ভাত খাচ্ছি তখন মনে হচ্ছিল যেন কতকাল এই হাভাতেগুলো খায়নি। যাই হোক, জন কে শেষ পর্যন্ত যে পেট ভরে খাইয়ে বাড়ি পাঠাতে পেরেছিলাম এটা ভেবেও খানিকটা স্বস্তি পেয়েছিলাম । জন ও ফিরে গেল আর আমার ও মাসিমার কাছে খাওয়া শুরু হলো কিন্তু এরপর জনের সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি।
Friday, 26 April 2024
এক বিরল অভিজ্ঞতা
এক বন্ধুর মুখে শোনা তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার কথা। চেষ্টা করছি তার হুবহু বর্ণনার কিন্তু স্মৃতি যদি বিরোধীতা করে তাহলে নিজগুণে মাফ করার প্রার্থনা রইল।
বন্ধু আমার তার নিজের এক বন্ধুর সঙ্গে একটা প্রকল্পে জুড়ে গেছিল যে বিশেষ এক আদিবাসীদের মধ্যে বিয়ে কিভাবে সম্পন্ন হয়। শুনতে যতটা সহজ সরল নির্বিষ মনে হচ্ছিল, বাস্তবে কিন্তু যথেষ্ট কঠিন ছিল। প্রথমত, ঐ আদিবাসীদের গ্রামে যাওয়া এবং তাও তাদের বিয়ের মরশুমে এবং সর্বোপরি একজন নিমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যাওয়া। কিন্তু আমার বন্ধুর বন্ধু ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কৃতী ছাত্র এবং গবেষণা রত এবং অমায়িক হবার জন্য তার বন্ধুত্বের পরিধিও ছিল বিরাট। তারই সঙ্গে কলেজে পাঠরত এক বন্ধুর কথা মনে পড়ল যে ছিল আদিবাসী সম্প্রদায়ের এবং তারই এক আত্মীয়ার বিয়ের কথা চলছিল। কিছুদিনের মধ্যেই সেই সম্পর্ক বিয়েতে পূর্ণতা পেতেই সুযোগটা এসে গেল।
ঝাড়গ্রামের অনতিদূরে এক আদিবাসী গ্রাম। তারা দুজনেই ঝাড়গ্রামের ট্যুরিস্ট লজে উঠল এবং বন্ধুর গ্রামে যেখানে বিয়ে হবে সেখানে পৌঁছে গেল। শহরের ঝাঁ চকচকে বিয়ের থেকে এটা সম্পূর্ণ আলাদা। ছোট ছোট চালার মাঝে একটা প্রশস্ত জায়গা যেটা পরিষ্কার করা হয়েছে এবং গোবর দিয়ে নিকানোর ফলে একটা আলাদা মাত্রা পেয়েছে। ছাদনাতলার চারপাশে চারটে কলাগাছ পোঁতা হয়েছে এবং আমপাতা সূতলির দড়িতে বেঁধে চারটে কলাগাছকে চারকোণে বেঁধে একটা বর্গক্ষেত্রাকার জায়গা করা হয়েছে। পাত্র পক্ষের ধামসা মাদলে চারিদিক দিরি দিরি দিম দিরি দিরি দিম শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে এবং কন্যাপক্ষের কয়েকজন মেয়ে সেই তালে তালে নৃত্যের ছন্দে জায়গাটা মাতিয়ে তুলেছে । যতক্ষণ এই বিয়ের অনুষ্ঠান চলতে থাকল ততক্ষণ এই ধামসা মাদল ও নৃত্য পালাক্রমে চলত থাকল আর এক দারুণ মাদকতা সৃষ্টি হল আকাশে বাতাসে। কন্যার মামা পাত্রীকে একটা বড় ঝুড়িতে বসিয়ে মাথায় নিয়ে সমস্ত অতিথি অভ্যাগতদের কাছে নিয়ে যাচ্ছিল এবং পাত্রী তার কোলে রাখা এক মাটির হাঁড়িতে থাকা হাড়িয়ায় ( ভাত পচিয়ে একরকম তৈরী মদ) বড় ডালসমেত একটা আমের শাখা সেই হাড়িয়ায় ডুবিয়ে অনেকটা যেমন পূজোর পরে শান্তিজল দেওয়া হয় সেইরকম ভাবে ছিটাচ্ছিল। এরপর পালা পাত্রের, সেই হাড়িয়ায় সিক্ত আম্রপল্লব দিয়ে পাত্রের মাথায় সপাং সপাং করে মার। পাতায় লেগে থাকা হাড়িয়া যখন চুঁয়ে চুঁয়ে গাল দিয়ে গড়িয়ে মুখের কাছে আসছে তখন জিভ দিয়ে একবার এদিক একবার ওদিক করে তার আস্বাদ গ্রহণ করা।
এরপর চলল পাত্রপক্ষ ও কন্যাপক্ষের আত্মীয়স্বজনের আলাপ করানোর পালা। গানের মধ্য দিয়েই সেই আলাপ পরিচয়ের সমাপ্তি। কোনরকম আগে থেকে কোন প্রস্তুতি না নিয়ে এই পরিচয় পর্ব একটা দারুণ অনুভূতি। এরপর পালা উদরপূর্তির। প্রত্যেক অতিথিকে একটা গ্লাসে সেই হাড়িয়া দেওয়া হয়েছে এবং শালপাতার চোঙায় দেওয়া মুড়িতে ঝোলা গুড় দেওয়া হচ্ছে আর অতিথিরাও সেই গুড় মুড়ি খাচ্ছে আর হাড়িয়ার গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে। আমার বন্ধু তো কোনদিন হাড়িয়া খায়নি আর ওটা না খেলেও দুইপক্ষকেই অপমান করার সামিল। যাই হোক , কপালে যা থাকে বলে ছোট্ট একটা চুমুক যেই না দিয়েছে অমনি জ্বলন শুরু হলো সেই গলা থেকে নামতে নাভির শেষ অবধি এক অসহ্য জ্বালা। গুড় মুড়ি তো শেষ হলো কিন্তু গ্লাসের হাড়িয়ায় চুমুক দেওয়ার সাহস আর হলো না। এরপর এল ভাত এবং অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী। যে পরিমাণ ভাত দেওয়া হল পাতে আমাদের পরিভাষায় তা বিড়াল না ডিঙানো ভাতের পরিমাণ। আমাদের চারপাঁচজন লোক তা খেতে পারে। যাই হোক, খাওয়া দাওয়া সেরে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা ঝুলিতে ভরে ফিরে আসা।
সম্পূর্ণ শোনার ভিত্তিতে এই ঘটনার অবতারণা। কিছু ভূলভ্রান্তি থাকলে অবশ্যই ক্ষমা প্রার্থী।
Thursday, 18 April 2024
গরমের ছুটি
ছোটবেলায় গরমের ছুটির কথা মনে পড়লেই একটা আলাদা উন্মাদনা জেগে ওঠে। তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি, সকাল বেলায় স্কুল। প্রাইমারি স্কুলের ক্লাস শেষ হলেই একটু বাদেই সেকেন্ডারি স্কুল সাড়ে দশটা থেকে শুরু হবে। সুতরাং দশটার মধ্যেই ক্লাস শেষ, আর মজাই মজা। একটু খেয়েদেয়েই বাড়ির মাঠে বা হুইলার হোস্টেলের মাঠে বল নিয়ে খেলা। রোদের তাপ বাড়লেও কোন তোয়াক্কাই নেই। বাড়ি ফিরে অবশ্যই বকুনি খাওয়া কিন্তু যেন গা সয়ে গেছে, ভ্রূক্ষেপ নেই। কয়েকদিন বাদেই গরমের ছুটি পড়বে। শহরে আমবাগানের ছড়াছড়ি। কালবৈশাখীর ঝড় হলে তো বটেই, এমনিতেও মোটামুটি একটু দমকা হাওয়া দিলেই আমের ভারে নুয়ে পড়া গাছগুলো যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে ওঠে," বাব্বা, আর পারিনা তোদের ভার বইতে , এবার দে একটু মুক্তি।" কাশীশ্বরী স্কুলের পাশেই কেবু সিংহদের বিরাট আমবাগান, পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। শুধু আম ই নয়, লিচু, জাম, বেল, নারকেল গাছের সারিতে ভর্তি সেই বাগান আর রয়েছে তাদের পাহারাদার। কিন্তু কাশীশ্বরী স্কুলের পাঁচিলের দিকে একটা গর্ত রোজ ই একটু একটু করে বাড়ছে যাতে ঐ গর্ত দিয়ে বাগানে ঢোকা যায়। ঐ পাঁচিলটা হচ্ছে স্কুল ও বাগানের মাঝে, সুতরাং সারাবার দায় কার সেটা নিয়ে একটু ঠেলাঠেলি তো আছেই কিন্তু বাগানের ফল সামলাতে গেলে সিংহদের ই উদ্যোগ নিতে হয় । নেয় ও তারা কিন্তু যারা ফল চুরি করে তাদের দৌরাত্ম্যে রোজ ই গর্ত টা একটু একটু করে বাড়ে আর সেই ফাঁক দিয়েই রোজকার চোর, সঙ্গে আমাদের মতন ছিঁচকেরাও ঢোকে। একদিন সবাই বাগানে ঢুকেছি, আম কুড়াচ্ছি আর মাঝে মাঝেই দু চারটে ঢিল ও ছুঁড়ছি আর পটাপট আম ও পড়ছে। বিশুর উপর ভার ছিল আম কুড়ানোর। যতক্ষণ আম কুড়ানো হচ্ছিল ততক্ষণ কোনও সাড়াশব্দ নেই আর মালিরাও টের পায়নি কিন্তু ঢিল ছুঁড়তেই রে রে করে তেড়ে এল মালিরা ,আমরা তো সব ভাগলবা, পড়ল ধরা ক্যাবলা বিশু। মালিরা তাকে ধরে নিয়ে গেল মালকিন সিংয়ের কাছে যারা আবার বিশুদের ই আত্মীয়। উনি তো এক লহমায় চিনতে পেরেছেন বিশুকে, বললেন, " আমি তোমাকে বিলক্ষণ চিনি, দাঁড়াও তোমার বাবাকে খবর দিচ্ছি।" তিনি মালিকে বললেন বিশুর জামাটা খুলে নিতে। হাড় জিরজিরে বিশুর খালি গায়ে বাড়ি ফিরে আসা। মায়ের চোখ এড়িয়ে বাড়ি ফিরেই অন্য একটা জামা চড়িয়ে তখনকার মতো রেহাই। কিন্তু বিপদ বাড়ল তখনই যখন সিংহদের বাড়ি থেকে সেই মালি জামা সমেত এক ঝুড়ি আম নিয়ে বিশুদের বাড়ি দিয়ে গেল। বিশুদের বাড়িতে প্রত্যেক বার ই আম আসে সিংহদের বাড়ি থেকে কিন্তু সঙ্গে বিশুর জামা দেখে বিশুর মা একটু আশ্চর্য হয়ে গেলেন। কি ব্যাপার, এই জামা কোথা থেকে পেলে তুমি জিজ্ঞেস করতেই সব কুকীর্তি ফাঁস। বিশু তো ঐ মালিকে আসতে দেখেই বাড়ির ত্রিসীমানায় নেই, কিন্তু বাড়ি তো ফিরতেই হবে, ভেবেই পাচ্ছেনা কি উত্তর দেবে ও। যা হবার হবে, সত্যি কথাই বলবে বিশু। জানে ভাল করে যে মায়ের ডাঁটিসার রান্নাঘরের পাখাটার ঘা কতক পড়বে পিঠে, তবুও সত্যি ই বলবে। মা তো জিজ্ঞেস করলো,আর বিশুও সবিস্তারে সব ঘটনাই বলল। ভাবছে এই বোধহয় পড়ল পিঠে কিন্তু না, সেটা হলনা, উনি খুব শান্ত ভাবে বললেন যে দেখ, ওরা আমাদের আত্মীয়, প্রত্যেক বার আমাদের বাড়িতে ওরা আম পাঠায়,সেক্ষেত্রে ওদের বাড়ির বাগানে যাওয়া একদম উচিত হয় নি। মায়ের পা ধরে কেঁদে ফেলল বিশু এবং প্রতিজ্ঞা করল বন্ধুরা হাজার বার বললেও ও আর যাবেনা। মা কিছু না বললেও বিশু মনে মনে খুবই লজ্জিত এবং তার জন্য বাবামায়েদের সম্মান নষ্ট হয়েছে এই ভেবে নিজেই কাঁদতে লাগল।
কদিন বাদেই গরমের ছুটি পড়ছে এবং স্কুলেও ছিল এক দারুণ ট্র্যাডিশন। সমস্ত মাস্টার মশাইদের মিষ্টি খাওয়াতো ছাত্ররা। যে সমস্ত মাস্টার মশাই রা ঐ বিভাগের ক্লাস নিতেন তাঁদের সকলকেই খাওয়ানো হতো এবং প্রত্যেক মাস্টার মশাইরাই আমন্ত্রিত হতেন। ছাত্ররা নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে এই খরচটাই সামলাতো। শুধু প্রাইমারি সেকশনেই নয় সেকেন্ডারি সেকশনেও এই ব্যবস্থাটা দীর্ঘদিন চালু ছিল। মাস্টার মশাইরাও গরমের ছুটিতে টাস্ক দিতেন আর বলতেন যে একদম ফাঁকি মারবে না, ভাল করে পড়াশোনা করবে। প্রাইভেট পড়ানো থাকলেও মাস্টার মশাইরা ছাত্রদের পড়াশোনার বিষয়ে যথেষ্ট সাহায্য করতেন। এক অদ্ভুত সুন্দর ছাত্র মাস্টার মশাইদের সম্পর্ক। শুধু ছাত্ররাই নয় তাদের বাবামায়েদের সঙ্গেও এক সুন্দর সম্পর্ক থাকত। সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে মাস্টার মশাইদের সঙ্গে সম্পর্ক ও অনেক বদলেছে, এখন অনেকটাই যেন আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক। মাস্টার মশাই রাও ছাত্রদের ভালবাসতে ভুলে গেছেন, ছাত্ররাও মাস্টার মশাইদের সম্মান জানাতে ভুলে গেছে, অনেকসময় ই মাস্টার মশাইদের নিগৃহীত ও হতে হচ্ছে। আমরা চলেছি কোথায়? পারিনা কি ফিরিয়ে আনতে সেই সোনালী দিনগুলো?
Subscribe to:
Posts (Atom)