Saturday, 27 December 2025

"বনলক্ষ্মীর দ্বারে"

সুজন বাবু আজ খুশীতে ডগমগ। অনেকদিন পরে স্ত্রী, ছেলে, বৌমা, নাতি, নাতনিদের নিয়ে শান্তিনিকেতনে দুটো দিন কাটিয়ে ফিরে যাচ্ছেন নিজের বাড়িতে। দুটো দিন কেটেছে তাঁর পছন্দের গার্ডেন বাংলোয়, নানান ধরণের গাছগাছড়ায় ভর্তি আর পাখিদের কূজনে যেখানে ঘুম ভাঙে সেই ছবির মতন গেস্ট হাউসে। সামনে বড় লোহার গেট, গাড়ি পৌঁছে হর্ণ দেওয়া মাত্র দারোয়ান বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল বুকিং আছে কি না এবং ভেতরে ঢুকে দেখে নিয়েই খুলে দিল গেট। দরজা খুলে বেরিয়ে আসতেই একগাল হেসে দারোয়ান মহাদেব বলল," স্যার, আপনি?" সুজন বাবু মনে মনে একটু খুশিই হলেন চিনতে পেরেছে দেখে , প্রত্যেক মানুষেরই একটা অহংবোধ থাকে আর সেটা যখন পরিতৃপ্ত হয় তখনই মানুষের মন খুশিতে ভরে ওঠে। ঢুকেই ডানদিকে গাড়ি রাখার জায়গা, বেশ কয়েকটা বড় গাড়ি থাকতে পারে। গাড়ি আর আগে যাবেনা, সমস্ত মালপত্র ওখানেই নামিয়ে রিক্সা ভ্যানে করে দুজন মহিলা সেটাকে টেনে নিয়ে রিসেপশনে চলে এল। মাল্টিপল অ্যাকটিভিটি তাদের, তারাই রেজিস্টার এগিয়ে দিল, তারাই মালপত্র ওপরে নিয়ে গেল এবং সব ব্যবস্থা করে দিল। ভাল লাগল দেখে, স্থানীয় মহিলারা যাঁরা খুব বেশি পড়াশোনা না করেও স্রেফ মুখের হাসি এবং আন্তরিকতা দিয়ে গ্রাহকদের মন জয় করে নেন না এবং সঙ্গে সঙ্গে গেস্ট হাউসের মর্যাদাও।


শান্তিনিকেতনে সবাই যেন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের মর্যাদা ধরে রাখতে ব্যস্ত। ভারী সুন্দর কাব্যিক নাম তাদের বাড়ির এবং ফুলের বাহার সর্বত্র। কোন বাড়ির নাম খেয়া আবার কোনটার নাম গেহ আবার কেউ বা হলো দর্পণ বা শ্যামশ্রী বা ছান্দিক। ভাল লাগল যে কবিগুরুর আত্মাও হয়তো পরিতৃপ্ত হয়েছেন। এই বাড়ির মালিক একজন শিল্পী এবং তাঁর বাড়ির প্রত্যেকটি কোণে তার ছাপ স্পষ্ট। ডাইনিং হল সম্পূর্ণ কাচের, শীতের হিমেল হাওয়ার সেখানে প্রবেশ নিষেধ। তার ই সংলগ্ন একটা আধুনিক ধারার অ্যাপার্টমেন্ট আর ওই ডাইনিং হলের সোজা লনের উপর দিয়ে হেঁটে গেলে আসবে সেই হেরিটেজ বাংলো যার দুটো তলায় চারটে  অত্যন্ত প্রশস্ত ঘর এবং মাঝখানে বিরাট লাউঞ্জ। বিশাল দুই দেয়ালে দুটো বড় আয়না এবং কারুকার্য মণ্ডিত কাঠের সোফা এবং দেওয়ালে শিল্পীর আঁকা পটচিত্র যা যে কোন শিল্পমনস্ক ব্যক্তিকেই আকর্ষণ করবে। ঐ হেরিটেজ বাংলোর তৃতীয় তলে প্রবেশ নিষেধ। বিশাল উঁচু ঘরের প্রবেশ পথে এক শিল্পময় দরজা যাতে   লাগানো তালা খুলে ঘরে প্রবেশ করতে হবে এবং ডানদিকে একটা বড় বাথরুম। উল্টোদিকের ঘরে বাঁদিকে বাথরুম। বাথরুম থেকে বেরিয়ে শোবার ঘর , সেখানে ও রয়েছে একটা বড় শক্তপোক্ত কাঠের দরজা যাতে তালা ও লাগানো যায়। বিশাল বড় ঘরে রয়েছে আরও দুটো বড় দরজা এবং তার ই সঙ্গে মানানসই জানলা। বড় কাঠের সোফা ও টেবিল রয়েছে একদিকে আর অন্যদিকে রয়েছে সুদ‌শ্য ড্রেসিং টেবিল এবং কাঠের চেয়ার ও টেবিল। একদিকে রয়েছে বিরাট মাপের সাবেকি আমলের কারুকার্য করা খাট যাতে তিনজন খুব ভাল ভাবে শুতে পারে, শীতকালে হয়তো চারজনেও। ড্রেসিং টেবিলের দিকেও একটা বড় খাট যেখানে দুজন আরামে শুতে পারে। আরও একটা দারুন জিনিস চোখে পড়ল যেটা হচ্ছে সুদৃশ্য এক আলনা যেখানে কোট, জামা কাপড় রাখা যায়। বড় খাটের পায়ের দিকে রয়েছে এক প্রকাণ্ড কাঠের সিন্দুক যার ভেতরে রয়েছে বাড়তি লেপ, চাদর ও বালিশ। সিন্দুকের ওপরে রাখা ইলেকট্রিক কেটলি এবং চায়ের সম্ভার, কাপ ও প্লেট। ঘরের দেয়ালেও রয়েছে সুন্দর চিত্রকলা। এককথায় বলা যায় যে হেরিটেজ যেন সর্বাঙ্গে মিশে আছে। একতলায় ও এক ই রকম, বাঁকানো কাঠের সিঁড়ির উল্টোদিকে রয়েছে রিসেপশন এবং সিসিটিভির মনিটর যা চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখছে কি হচ্ছে বা কে এল বা গেল। মানে আধুনিকতায় মোড়ানো হেরিটেজ।

মেন গেটের বাঁদিকে রয়েছে মাড হাউস যার দরজা, জানলা ও কাঠের স্তম্ভগুলো প্রত্যেকটি ই শিল্পময়। বাড়ির মালিক যে শিল্পী তা যেন প্রতি মূহুর্তে মনে পড়িয়ে দেয়। বহু বছরের পুরনো কাঠের স্তম্ভগুলো ইট দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে যা বছর পাঁচেক আগে এসে সুজন বাবু দেখেন নি। হয়তো বা দোতলার ঘরগুলোকে একটু মজবুত করার জন্য। কিন্তু সেই ইটগুলো ও বসানো  হয়েছে শিল্পীর মান রেখেই। এই মাড হাউসে মাঝে মাঝেই সিনেমার শ্যুটিং হয়। পাঁচ বছর আগে যখন প্রথম এসেছিলেন সুজন তখন শিল্পীর স্ত্রী ছিলেন এবং তাঁর স্বামীর শিল্পকর্মের কিছু অ্যালবাম ও দেখেছিলেন যেটা এবার হলো না উনি না থাকায়।
আসার পথে শক্তিগড়ে ব্রেকফাস্ট বেশ ভাল রকমের হওয়ায় লাঞ্চ করার তেমন ইচ্ছে হলোনা, গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পরা হলো সোনাঝুড়ির মেলায়। এই মেলার প্রধান আকর্ষণ আশপাশের গ্রাম থেকে আসা বিভিন্ন ধরনের শিল্পীর হাতের কাজের নমুনা। দেবদারু গাছ, ইউক্যালিপটাস গাছ ও নানাধরণের গাছের ফাঁকে ফাঁকে বসা এই মেলায় ঘুরে ঘুরে নানাবিধ জিনিস কেনা একটা দারুন অভিজ্ঞতা। কেউ বা বিক্রি করছে দই, কেউ বা গামছা আবার কেউ বা বসে আছে পেয়ারা, কামরাঙা বা কদবেল নিয়ে। আচারের তেলে মাখানো পেয়ারা খাওয়া এক বিরল অভিজ্ঞতা। কতরকমের জিনিস এই গ্রামীণ শিল্পীরা যে বিপণন করেন তার ইয়ত্ত্বা নেই এবং দামেও যথেষ্ট শস্তা। কলকাতা এবং অন্যান্য জায়গা থেকে বহুলোক এখানে আসেন ব্যবসার খাতিরে। বাউলরা আগে বসতেন বাঁশের মাচার উপর কিন্তু এখন সেগুলো ভেঙে দেওয়ায় তাদের মাটির উপর ত্রিপল বা প্লাস্টিকের চাদরে বসতে হয়। চারিদিকে নানান কলরব কিন্তু এর ই মধ্যে এই শিল্পীদের গান গাইতে হয়। আদিবাসী মেয়েরা সাধারণত হলুদ শাড়িতে সজ্জিত হয়ে তালে তালে নাচেন এবং কিছু আধুনিকারা তাঁদের সঙ্গে তাল মেলান। প্রথম দিন বাউলদের দেখা মিলল না, বেলাও বেশ বেড়েছে, যাওয়া হলো একজনের রেফারেন্সে আমোলি রেস্তোরাঁয়। গলি ঘুঁজি খুঁজে বের করা রীতিমতো কঠিন কাজ কিন্তু অবশেষে মিলল দেখা তাঁর এবং অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর এল বহু প্রতীক্ষিত কিছু বিশেষ খাবার যা সচরাচর সাধারণ রেস্তোরাঁয় পাওয়া যায়না এবং অবশ্যই তুলনায় দামী অন্তত ঐ জায়গার অনুপাতে। অবশ্য ওটা না হলে চলবেই বা কি করে। যাই হোক ওখান থেকে বিশ্বভারতীর ছাতিম তলায় পৌষ মেলার উদ্বোধনের আয়োজন দেখতে যাওয়া হলো কিন্তু সিকিউরিটি গার্ডের কাছে পাওয়া খবরে বিশেষ উৎসাহী হতে পারা গেলনা। ফিরে আসা হল গেস্ট হাউসে এবং সেখান থেকে ভোরবেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভেসে আসা আওয়াজে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো হলো। গা গড়িমসি করে উঠে জলখাবার খেতে বেশ দেরী হলো এবং কঙ্কালীতলার উদ্দেশ্যে যাওয়া হলো।  বেশ কয়েক বছর বন্ধ থাকার  পর ফের চালু হওয়া পৌষ মেলার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে নানান বিড়ম্বনায় পড়তে হলো ।পুলিশে  পুলিশে  ছয়লাপ । এদিকে রাস্তা খোলা  তো ঐদিকো
 বন্ধ । গাড়ি ছেড়ে  দিয়ে টোটোয় যাত্রা  পৌষ মেলার উদ্দেশ্যে । সেখানে ও কিছু জিনিসপত্র  কেনা হলো কিন্তু অসম্পূর্ণ কেনাকাটা সম্পূর্ণ করতে যাওয়া হলো ফের সোনা ঝুড়ির মেলায়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবার মতো, খাওয়া হলো রাম শ্যামের হোটেলে। ভেজিটেরিয়ান থালি ২০৫টাকা জি এস টি সমেত কিন্তু খাওয়ার গুণগতমান এবং আতিথেয়তা প্রশংসনীয়। খাওয়ার পর ছোটখাটো দুচারটে জিনিস কিনে ফেরার পথে চোখে পড়ল বাউলদের। সুজনের  অত্যন্ত পছন্দের জগন্নাথ দাস বাউলের সন্ধান পেয়ে নমস্কার করে প্রিয় গান"পরের জায়গা পরের জমিন ঘর বানাইয়া আমি রই, আমি তো এই জমির মালিক নই" শুনে মনটা ভরে গেল। বাঁ হাতে একতারা, ডান হাতে মাঝে মাঝে তবলা বা ম্যারাকাশ এবং পায়ে ঝুমুর এবং গলায় দরদ ভরা গান এক আলাদা মাত্রা নিয়ে আসে। নাতি, নাতনী ও ছেলের সঙ্গে আলাপচারিতার মাঝে আরো খান চারেক গান শোনালেন জগন্নাথ দাস বাউল এবং ফিরে আসা গার্ডেন বাংলোয়।

পরের দিন সকাল বেলায় ফিরে আসার পালা। বোঁচকা বুঁচকি সব বাঁধা ছাঁদা শেষ। ব্রেকফাস্ট সারা হয়ে গেছে, মালপত্র গাড়িতে উঠে গেছে, সবাইকে বিদায় জানিয়ে অবশেষে ফেরার পালা। কিন্তু বনলক্ষ্মী তো যাওয়া হলোনা। বিভিন্ন রাস্তা বন্ধ, ঘুরে ঘুরে পৌঁছানো গেল বনলক্ষ্মীর দ্বারে। প্রবেশ পথ একটা বাঁশ দিয়ে আটকানো। গাড়ি পৌঁছাতেই কয়েকটি বাচ্চা ছেলেমেয়েরা ছুটে এল, কারণ জিজ্ঞেস করতেই জানালো তারা সরস্বতী পুজো করবে, তার জন্য চাঁদা চাইছে তারা। কয়েকজন গাড়িওয়ালা খুব বকাবকি করায় ওই শিশুদের মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। কয়েকটা গাড়ির পিছনে থাকা সুজনের নজর সেটা এড়ায়নি। বছর দশ এগারোর ছেলেমেয়েদের এমনভাবে বকুনি দেওয়াটা সুজনের একদমই পছন্দ নয়। মনে পড়ে গেল তার নিজের শৈশবের কথা। শিব পূজোর চাঁদা তুলতে গিয়েছিল সে তার বন্ধুদের সঙ্গে কলেজের মেন হোস্টেলে। কলেজের  পড়ুয়া ড়্গলল্লছাত্ররা প্রথমে তাদের একটা ঘরে বন্ধ করে দিয়েছিল। তারপর কান্নাকাটি করায় তাদের ছেড়ে দিয়েছিল কিন্তু কয়েকটা গান শোনানোর পরে। সুজন সেই সময় খান চার পাঁচেক করার পর ছাড়া পেয়েছিল কিন্তু কয়েকজন ছাত্র যারা একটু কষ্ট পেয়েই হোক বা সহানুভুতিশীল হয়েই হোক একটাকা সাড়ে দশ আনা চাঁদা তুলে দিয়েছিল। তখন সুজন কান্না ভুলে টাকাটা পকেটে ভরে নিয়েছিল।  একটা একটা করে গাড়ি ঢুকছে আর বেরোচ্ছে। ছেলেমেয়েগুলো  একটু দমে গিয়ে পাশেই এক্কা দোক্কা খেলতে শুরু করে দিল। অনেকদিন পর এই খেলাটা দেখে সুজন আবার শৈশবের গভীরে ডুব দিল। আগে তো সেও তার দিদিদের সঙ্গে এক্কা দোক্কা খেলেছে এবং নিজেদের বন্ধুদের সঙ্গে পিট্টু বা গাদন খেলেছে। সবকিছুই মনে পড়ে যাচ্ছে। অবশেষে তাদের গাড়ি ঢুকলো। ও প্রথমে বনলক্ষ্মীর ভেতরে ঢুকল না এবং বাচ্চাদের খেলা দেখতে লাগলো। বছর দশেকের একটি ছিপছিপে চেহারার কোঁকড়ানো চুলের মেয়ের দিকে চোখ পড়ে গেল। কি অপূর্ব সুন্দর রূপ দিয়েছেন ভগবান তাকে। তার নাতনির থেকে বছর খানেক বড় হবে হয়তো, তার সঙ্গে আরো একটি  দীঘল চোখের মেয়ে। সুজন তাদের ডাকলো এবং নাম জিজ্ঞেস করল ও কোন স্কুলে ও কোন ক্লাসে পড়ে জিজ্ঞেস করল। একজন ক্লাস ফোর থেকে ফাইভে উঠবে আর অন্যজন ফাইভ থেকে সিক্সে। ছেলেরাও এগিয়ে এসে বললো, " আঙ্কেল,আমরা সরস্বতী পূজো করব, আমাদের একটু চাঁদা দেবেন?"
"নিশ্চয়ই দেব" বলে জিজ্ঞেস করলেন কত দিতে হবে। ওরা জানালো পাঁচ টাকা,দশ টাকা যা হোক। সুজন ওদের একটা একশো টাকার নোট দিয়ে বললো যে এটা এই গাড়ির তরফ থেকে। ওরা তো খুব খুশি। সবাই ঘিরে ধরেছে ওঁকে। হঠাৎ ই একটা মোটর সাইকেলে স্বামী ও স্ত্রী বনলক্ষ্মী থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে ওরা তাদের কাছে চাঁদা চাইল। ওরা বললো," আমরা মুসলমান, আমরা পূজোর চাঁদা দিই না।" ঐ বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মধ্যে যে সবচেয়ে বড় সেই সুদীপ সরকার ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে উঠবে সুজনকে এসে সরাসরি জিজ্ঞেস করলো, " আঙ্কেল, মুসলমানরা কি পড়াশোনা করেনা?" সুজন প্রায় বোল্ড আউট, বাঁচিয়ে দিল তাদের ই ড্রাইভার আলম ভাই। উনি বললেন, যে চাঁদা না দেওয়ার বাহানায় উনি এইরকম কথা বলেছেন। আমি ও তো মুসলমান, আর ইনি হচ্ছেন আমার দাদা। আমিও তো আমার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছি। মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকল সুদীপের প্রশ্নটা। তাঁর সঙ্গে ও তো পড়তো কুদ্দুস, আকবর, মোর্শেদ, রিয়াজুল, সফিকুল ও রফিকুল রা। তারা তো ওঁর সঙ্গে দূর্গাপূজো, সরস্বতী পুজোর চাঁদা তুলতো, কোনদিন তো এইধরণের প্রশ্ন ওঠেনি, তবে আজ কেন? কেন এই রাজনৈতিক নেতারা মানুষের মনের মধ্যে বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছেন যাতে এই শিশুদের মনটাও কলুষিত হয়ে যায়? বনলক্ষ্মীর দ্বারে এসে নিজেকেই হারিয়ে ফেললেন সুজন, ধীরে ধীরে বৌমা, নাতি নাতনিদের ডেকে গাড়িতে উঠে পড়লেন।

Tuesday, 16 December 2025

"সম্রাটের সম্রাট দর্শন"

ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই দেখা যায় একজন রাজা বা সম্রাট আরও একজন রাজা বা সম্রাট(তিনি যত ই ছোট মাপের হ'ন না কেন) তাঁকে যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদর্শন করেন। মহাভারতে বা অন্য বিদেশী সাহিত্যেও এর প্রচুর নিদর্শন রয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে যেখানে এক দেশের রাজা আর এক দেশ আক্রমণ করেছেন এবং বিজয়ী  হয়েছেন সেক্ষেত্রে অবশ্য আলাদা ব্যাপার। সেখানে পরাজিত রাজাকে বন্দী করে অমানুষিক অত্যাচার করে মেরে ফেলা হয়েছে এবং সমস্ত রকমের লুণ্ঠন করা হয়েছে কিন্তু অবশ্যই তার ব্যতিক্রম ও আছে। যেমন আলেকজাণ্ডার পুরুকে পরাজিত করার পর যখন জিজ্ঞেস করেন তিনি তাঁর কাছে কি রকম ব্যবহার আশা করেন যার উত্তরে রাজা পুরু উত্তর দেন একজন রাজার প্রতি আরেকজন রাজার ব্যবহার। তাঁর এই নির্ভীক উত্তরে আলেকজান্ডার খুশী হয়ে তাঁর রাজ্য ফিরিয়ে দেন এটাই আমরা জেনেছি। আজকের দিনে ও পৃথিবীর মহাশক্তিধর রাষ্ট্রের নেতার ব্যবহার আর একজন ক্ষুদ্র দেশের প্রধানের প্রতি সেই ইঙ্গিত বহন করে। মাঝে মাঝে বড় দাদার মতো ছোট ভাইকে ডেকে এনে কান মলে দেওয়ার মতো ভর্ৎসনা করার নিদর্শন ও কিন্তু আছে যদিও সেটা সংখ্যায় নিতান্তই কম।

সম্রাট যার ভাল নাম সেই নীলু গেছে বাবার সঙ্গে চিড়িয়াখানায়। ছোটবেলা থেকেই নীলু ছিল একটু বেশি পরিমাণেই অনুসন্ধিৎসু এবং ছোটখাটো সব বিষয়েই ওর মনোযোগ ছিল নজরে পড়ার মতো। নীলুদের বড় বাড়ির মাঠে ও বাগানে ছিল নানাধরনের গাছগাছড়া এবং ফুলের গাছ।  রঙ বেরঙের প্রজাপতিগুলো একফুল থেকে অন্য ফুলে নাচতে নাচতে চলে যায় আর নীলু কিন্তু একদৃষ্টে নজর করে যে প্রজাপতিগুলো একটা ফুলের উপর তার দুটো ডানা সোজা উপর করে ত্রিভুজাকৃতি ধারণ করে আবার মাঝেই ডানা দুটো ছড়িয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে নাড়াতে নাড়াতে কখন আরও একটা ফুলের উপর বসার আয়োজন করে।  ফড়িংগুলোর বসার  ধরণ একটু অন্য রকম, তারা মাঝে মাঝেই তাদের নিম্ন ভাগ উপর থেকে  নীচের দিকে বাঁকায় এবং তারপরেই টুক করে অন্য জায়গায় ধাওয়া করে। ছোট থেকেই ওর মৃৎশিল্পের উপর একটা আলাদা ভালবাসা ছিল। বাড়ির কাছে থাকা প্রতিমা শিল্পী বসন্ত এবং কার্তিকের বাড়ি ওকে খুঁজে  পাওয়ার একটা জায়গা ছিল। ওর বয়সী ছেলেরা যখন এদিকে ওদিকে ছুটোছুটি করে খেলা করে নীলু তখন একদৃষ্টিতে দেখে মা দূর্গার মূর্তি তৈরি করা বিশেষ করে সিংহ কি করে অসুরকে আক্রমণ করছে সেটা দেখা। মাঝে মাঝেই ওর নিজের আইডিয়াটাও বলতো বসন্ত বা কার্তিকের কাছে। ও মনে মনে নিজেই প্রতিমা গড়তো এবং ওর ছোট ছোট পেলব নরম আঙ্গুলের ছোঁয়ায় গড়ে উঠত মা দূর্গা বা মা কালীর মূর্তি এবং কেউ ধারণায় আনতে পারতো না যে এটা কোন পাকা শিল্পীর সৃষ্টি নয়। নীলুর শৈশবটাই ছিল শিল্পময়। এহেন নীলুর চিড়িয়াখানা দর্শন ওর  মনে এক বিশেষ প্রতিফলন ফেলল। কেশরধারী সিংহকে দেখে ওর মনে একটা আলাদা অনুভুতির সঞ্চার হলো। ঐরকম যদি একটা সিংহ ওর বন্ধু হতো, ঐ পশুরাজ সমস্ত পশুর সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দিত যে এই নীলু আমার বন্ধু, ও এই বনের মধ্যে যখন ইচ্ছে আসবে যাবে, ওর যেন কোন ক্ষতি কেউ না করে। নীলুর বুকটা দারুণ ফুলে উঠল। সেই সিংহের প্রতি ওর আকর্ষণ যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল। প্রতিভাশালী সৃষ্টিশীল নীলু বড় হয়েছে কিন্তু মনের নিভৃতে সেই সিংহের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার ইচ্ছেটা কিন্তু যায়নি। ভাল চাকরি করার সুবাদে একদিন ও চিড়িয়াখানার অধিকর্তার সঙ্গে দেখা করে ওর মনের ইচ্ছার কথা বলল। উনি শুনে তো খুব খুশি। তিনি বললেন যে আপনার মতো অনেকেই যদি এগিয়ে আসেন এই পশুপাখিদের সংরক্ষণের ব্যাপারে তাহলে তো সত্যিই সেটা খুব আনন্দের। আমরা চাই আরও বহু মানুষ এই ব্যাপারে এগিয়ে আসুন। কথাবার্তা সব পাকা, মাসে বার হাজার টাকা লাগবে ওই সম্রাটের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য । নীলুও সম্রাটের জন্য এই টাকার ব্যয়ভার বহন করতে রাজি। এরপর ই হল একটা বিপত্তি। মোটরসাইকেলে আসার সময় একটা কুকুরকে বাঁচাতে গিয়ে সাঙ্ঘাতিক এক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলো এবং দীর্ঘ সময়ের অপারেশনের পর নীলু বা সম্রাট সুস্থ হয়ে উঠল কিন্তু এর মধ্যেই বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েই ছুটল সেই চিড়িয়াখানার অধিকর্তার সঙ্গে দেখা করতে এবং সেই সিংহটি যার নাম ও সম্রাট তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সই সাবুদ করতে। চিড়িয়াখানার অধিকর্তা সুদর্শন বাবু নীলুকে দেখেই চিনতে পারলেন এবং বললেন," সম্রাট বাবু, কি হয়েছিল আপনার, সেই গেলেন আর এতদিন পরে এলেন, কি ব্যাপার?" নীলুর কাছে সমস্ত ঘটনা জানার পর তিনি একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন," সরি , সম্রাট বাবু, এযাত্রায় আপনার ইচ্ছা পূরণ করতে পারা গেল না কারণ আমাদের সেই সিংহটি যার নাম ও সম্রাট ছিল সে মারা গেছে।"  এক রাশ যন্ত্রণা বুক ঠেলে এগিয়ে এল, ছলছলে চোখে কোন রকমে অশক্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে এসে গাড়ির মধ্যে চুপ করে বসে থাকলো। ড্রাইভার তো হতভম্ব। খানিকক্ষণ পরে জিজ্ঞেস করল, " নীলু দা, শরীরটা ঠিক আছে তো?"
নীলু কোন উত্তর না দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে ইশারা করল স্টার্ট করার জন্য।

Saturday, 13 December 2025

"অথ মার্জার কথা"

 মার্জার বা বিড়ালকে অনেক লোক যেমন ভালবাসেন তেমন ই অনেক লোক মনে প্রাণে ঘৃণা করেন। কেউ কেউ আবার বিড়াল দেখলে ভয়ে সিঁটিয়ে যান, যতক্ষণ তাকে না সরানো হবে ততক্ষণ সে ঐ পথ ই মারাবে না।ভয়ানক জ্বালা। কোন কোন মানুষ আছেন যাঁদের পশুপাখিদের প্রতি স্বাভাবিক ভালবাসা আছে এবং সুযোগ পেলেই তাঁরা এদের খাবার দিয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করেন আবার উল্টোদিকে কেউ কেউ তাদের খাবার তো দেন ই না উপরন্তু অন্য কেউ দিলে রে‌রে করে তেড়ে আসেন এবং নানাভাবে তাদের সমালোচনা করেন এবং খাবার দিয়ে নোংরা করছেন জায়গাটা বলেও গালমন্দ করতে ছাড়েন না। মাঝে মাঝে সমাজ মাধ্যমে লেখালেখি করে জনমত গড়ে তুলে এমনকি থানা পুলিশ পর্যন্ত ও গড়ায়। এঁদের মধ্যে কয়েকজন এমন নাক উঁচু লোক আছেন যাঁদের এইসব ব্যাপারস্যাপারগুলো beneath dignity বলে মনে হয়। অথচ এঁরাই জনসমক্ষে এমন বেশভূষা করে বেরোন যে লোকজন তাদের দেখেন ই না আবার হঠাৎ চোখ পড়ে গেলেও নিজেরাই অপ্রস্তুত হয়ে যান। কিছু তো বলা যাবেনা, ব্যক্তি স্বাধীনতায় আঘাত বলে কথা। এঁরা মাঝে মাঝেই কথায় এমন খই ফোটান যেন মনে হয় কত ই না রুচিশীল ব্যক্তি এঁরা কিন্তু একটু গভীরে খোঁজাখুঁজি করলেই দেখা যাবে যে এদের অনেকেই চরম অসৎ এবং তাঁদের ঐ খারাপ দিক ঢাকতেই তাঁরা এরকম আচরণ করেন।

এবার মূল বিষয়ে ফিরে আসা যাক। মার্জারকুল কিন্তু ভীষণ সুন্দর। তাদের আচার আচরণে রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। সবাই একটু ভালবাসা পেতে চায়। একটু আদর করে খেতে দিলে কি আর এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়? রাস্তা ঘাট নোংরা হয়ে যায় এইরকম সমালোচনার তীর প্রায়শই ছুটে আসে অথচ আমরা যেন ধোয়া তুলসী পাতা। আমাদের দ্বারা কোনরকম দূষণ হচ্ছে না এইরকম গ্যারান্টি কি আমরা দিতে পারি? গাড়িতে যেতে যেতে পথে ঝালমুড়ি ( ভুল হয়ে গেল, এঁরা তো  রাস্তায় পাতি লোকের কাছে ঝালমুড়ি কিনলে এঁদের মানসম্ভ্রম মাটিতে মিশে যাবে)/ মঞ্জিনী বা মিও অ্যামোরের চিকেন প্যাটিস বা রোল কিনে খাওয়া শেষে প্যাকেটটা রাস্তায় ফেলে দিয়ে নোংরা করেন না? খুব কম লোকই আছেন যাঁরা বাক্সটিকে সযত্নে রেখে দিয়ে নিকটবর্তী কোন ডাস্টবিনে ফেলে দেন। এঁদের কথা তবু একটু হজম করা যায় কিন্তু বেশিরভাগ লোকই সমালোচনা করতে হয় ভেবে করেন। তাঁদের কাছে পশুপাখিদের প্রতি ভালবাসা দেখানো একটা অপরাধ বা স্রেফ ন্যাকামো বলে মনে হয়।

আমি সেই ন্যাকার দলের একজন।  কথায় আছে ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায় কিন্তু আমি ন্যাড়ার ও অধম। আমি দু দুবার কুকুরের কামড় খেয়ে চোদ্দটা করে আটাশটা ইঞ্জেকশন নেওয়ার পরেও আমার হুঁশ হয়নি এবং এখনও আমি মনেপ্রাণে পশুপাখিদের ভালবাসি এবং সুযোগ পেলেই একটু আদিখ্যেতা দেখাই। এতে প্রচুর গনগনানি শুনতে হয় কিন্তু আমি তখন কালা ও বোবা। ছাদ সারানোর কাজ সবে শেষ করে মিস্ত্রিরা চাবি দিয়ে গেছে আর আমিও কেমন কাজটা করলো দেখতে গেছি। কখন পিছন পিছন একটা সাদা বিড়াল আমার সঙ্গ নিয়ে পিছু পিছু দেখতে এসেছে খেয়াল করিনি। আমি এদিক সেদিক দেখছি আর মোবাইলে ফটো তুলছি। হঠাৎ কা কা করে অনেকগুলো কাকের আওয়াজে সচকিত হয়ে ভাবছি কোন কাকের বাসা টাসা রয়েছে আর আমাকে দেখে চেঁচামেচি শুরু করেছে। কাকের ঠোকর যাতে না খেতে হয় এইভেবে যেই না পিছন ফিরে চলে আসার চেষ্টা করছি, দেখি সেই সুন্দরী মার্জার আমার পিছনে আর তাকে দেখেই বায়সদের এত আর্তনাদ। তাকে নামানোর চেষ্টা  অনেক ক্ষণ ধরে করার পরে বিফল হয়ে ফিরে এলাম। তিনি তো এলেন ই না উপরন্তু একটু জেদাজেদি করাতে তিনি পাশের বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিলেন এবং ফিরে এলাম। ছাদের দরজা খোলা রাখা যায়না বলে বন্ধ করে এলাম কিন্তু মনটা খচখচ করছে। একজন খুব কাছের প্রতিবেশীকে ফোন করে জানতে পারলাম যে তিনি নেই এবং তাঁর নিদান অনুযায়ী দরজা খুলে রেখেই খানিকক্ষণ এদিক ওদিক পায়চারি করলাম কিন্তু তাঁকে আর দেখা গেল না। ঠাণ্ডা টা বেশ বাড়ছে, নাক দিয়ে জল পড়াতে আরও বেশী মনে হচ্ছে, খানিকক্ষণ থাকার পরে আবার বন্ধ করে চলে এলাম। মনটা একটা ভীষণ অপরাধ বোধে ভুগছে যে এই ঠাণ্ডায় বিড়ালটা না কিছু খেতে পাবে না কোন আশ্রয় পাবে জলের ট্যাঙ্কের নীচে ছাড়া। ফের রাত দশটা নাগাদ গিয়ে আরো একবার টর্চ জ্বেলে খোঁজ করেও কিছু লাভ হলোনা মাঝখান থেকে আমার নাক দিয়ে জল পড়ার মাত্রা বেড়ে গেল। রাতে ঠিক ঘুম ও হলোনা, সকালে উঠেই আরো একবার দেখতে গেলাম কিন্তু না, এবার ও দেখা পেলাম না। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। একটা অপরাধবোধ মনটাকে কুড়ে কুড়ে খেতে লাগল কিন্তু কিছু করার ও নেই বলে মনটাকে সান্ত্বনা দিলাম।

এরমধ্যেই নয় নয় করে চারটে দিন কেটে গেছে। ব্যালকনিতে বসে খবরের কাগজ পড়ছি। হঠাৎ ই চোখ পড়ল সামনে পার্কিং করা বড় কালো গাড়িটার দিকে। একজন লোক নীল জ্যাকেট পড়ে কারও জন্য অপেক্ষা করছে। একটু বাদ বাদ ই ঘড়িটা দেখছে আর মোবাইলে কাউকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। হঠাৎ করেই সেদিনের ঐ সাদা বিড়ালটার মতো একটা বিড়াল লোকটির দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। মুখের দিকে চেয়ে অস্ফূট স্বরে ম্যাও ম্যাও করছে। আমার মনে হলো সেদিনের বিড়ালটাই এবং বেশ খানিকটা আশ্বস্ত বোধ করলাম যে অন্তত আমার জন্য বিড়ালটা মারা যায়নি। মনটা বেশ হালকা লাগছে। বিড়ালটা অনেকক্ষণ দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর লেজটাকে উঠিয়ে লোকটার পায়ের কাছে নিজের গা টা ঘষতে থাকলো। তারপর তড়াক করে লাফ দিয়ে গাড়ির বনেটে উঠে পড়লো। এইবার বেশ স্পষ্ট দেখতে পেলাম যে হ্যাঁ, ইনিই তিনি। লোকটা কথা বলার ফাঁকে ফাঁকেই বিড়ালটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো আর বিড়ালটাও বেশ আদর খেতে লাগলো। বুঝতে অসুবিধা হলোনা যে এটা কারো পোষা বিড়াল। আরও একটা জিনিস ভেবে খুব ভাল লাগলো যে হয়তো এখনও কিছু পাগল রয়েছে যাদের জন্য পৃথিবীটা এখনো পর্যন্ত নীরস হয়ে যায় নি।

Thursday, 13 November 2025

তবে কেমন হতো?

চারিদিকে আলোড়ন পড়ে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে, এবার সাধারণ মানুষের বুদ্ধি শুদ্ধি আর লাগবেনা, স্কুল কলেজ আর যেতে হবেনা, বাড়িতে বসেই রোবটের কাছে সব ঠিকঠাক উত্তর পেয়ে যাবে। অভিভাবকরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি নিয়ে চিন্তা করার দিন শেষ। স্কুল, কলেজের আর দরকার নেই, শিক্ষক শিক্ষিকার দরকার নেই, খরচাপাতি করে একটা বেশ ভাল জাতের রোবট কিনলেই সব হ্যাপা গেল মিটে। বাচ্চাদের স্কুলের বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না, স্কুল ই নেই তো কিসের বাস। বাড়িতে বাচ্চাদের পড়াতে বসানোর ঝামেলা নেই, টাকা রোজগার করো আর মস্তি করো। কিন্তু চাকরিও তো সহজে মিলবে না কারণ সেই রোবটের জয়জয়কার। কোম্পানিগুলো রোবট কিনেই লোকজনদের হটাবে। জিন্দাবাদ ধ্বনিতে আর কান ফাটবে না, আঙুলে গোনা দুচারটে লোক যারা থাকবে তারাও সবসময়ই কি হয় কি হয় ভেবে চিন্তিত থাকবে, বসের কথা না শুনলেই দাঁড় করানো রোবটের দিকে আঙুল দেখাবে। ভারী ঝামেলা হলো , তাই না?  লেখকরা আর নাটক লিখবেন না, প্রেমের গল্প --- সে তো কবে শেষ? প্রেম করার মতো সময় কোথায়? বেশ কয়েক বছর আগেও লেকটা বেশ খোলামেলা ছিল যেটা এখন ঘেরাটোপে বন্দী হয়েছে। কিছুদিন পর হয়তো লেকের হাওয়া খেতে গেলেও ট্যাঁক থেকে পয়সা বের করতে হবে। ধরা যাক, লেকের চারপাশে লোহার রেলিং নেই এবং সন্ধ্যে হয়ে যাবার পরেও প্রেমিক প্রেমিকার পাশে বসে থাকাটা ও পুলিশ বেশ সহানুভূতির চোখেই দেখে। একদিকে একটা ছেলে ও মেয়ে এবং তার থেকে আর একটু দূরেই আরেকটি মেয়েও তার একটি মানুষ রূপী রোবট বন্ধু ( যাকে মেয়েটি সত্যি সত্যিই মানুষ বলে ভেবেছে) বসে গল্প করছে। প্রথম জুটি লেকের জলে পূর্ণিমার চাঁদের গ্রহণ লাগার রূপটা দেখছে। ধীরে ধীরে চাঁদটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আসতে দেখে পাশে বসে থাকা বন্ধুকে বলে উঠল,
" দেখ, দেখ চাঁদটাকে কি সুন্দর লাগছে , তাই না?" ছেলেটি মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পাশে বসে থাকা বান্ধবী ও জলে চাঁদের প্রতিবিম্বের প্রতি। অস্ফূট স্বরে বলে উঠল হুঁ। অদূরে বসে থাকা দ্বিতীয় যুগলের মেয়েটিও বলে উঠল এক ই কথা কিন্তু উত্তর পেল হ্যাঁ, আজ চন্দ্রগ্রহণ ,আজ পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মধ্যে  চলে আসায় এ ছায়াটা পড়েছে, এতে আশ্চর্য হবার কি আছে? মেয়েটা বলে উঠল,
"হ্যাঁ, সে তো জানি, কিন্তু কি সুন্দর লাগছে, তাই না?" উত্তর এল, যতখানি ছায়া পড়েছে, ততটাই জলে দেখা যাচ্ছে, তার বেশীও নয়, কম ও নয়। মেয়েটার মনটা বিরক্তিতে ভরে গেল। এদিকে প্রথম যুগলের প্রেম বেশ ঘনিয়ে উঠেছে, একে অপরের প্রতি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মেয়েটির মন তিক্ততায় ভরে গেছে, বলল এবার ওঠা যাক।
মনে পড়ে গেল স্কুলে বিটি পড়তে আসা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস নেওয়ার একটা ঘটনা। একজন স্যার এসেছেন একটা ক্রাচ নিয়ে বাংলার ক্লাস নিতে। পড়াবেন কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের "হাট" কবিতাটি। পিছনে বসে আছেন বিটি কলেজের প্রিন্সিপাল এবং এক্সটারনাল একজামিনার। স্যার কবিতাটি পড়াতে পড়াতে যেন এক অন্য জগতে চলে গিয়েছিলেন। পিছনে বসে থাকা দুজন একজামিনার সবার অলক্ষ্যে কখন চলে গেছেন কেউ জানেনা আর আমরাও সেই নাম না জানা স্যারের পড়ানোয় একদম মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সমস্ত স্যাররাই যদি এইভাবে পড়াতেন তাহলে পড়াশোনা করার ভীতিতে এত ছেলেমেয়েরা স্কুল ড্রপ আউট হতো না। এখন সেই স্যারের জায়গায় ধরা যাক একজন রোবট ঐ কবিতাটি পড়াচ্ছেন। কি রকম পরিস্থিতি হবে একটু কল্পনা করা যাক।
দূরে দূরে গ্রাম দশ বারোখানি মাঝে একখানি হাট, 
সন্ধ্যায় সেথা জ্বলে না প্রদীপ, প্রভাতে পড়েনা ঝাঁট। 
রোবট স্যার বলবেন, প্রত্যেক গ্রামে তো এক একটা হাট বসতে পারে না কারণ কটাই বা লোক থাকে একটা গ্রামে। যদি ক্রেতার সংখ্যা বেশি না হয় তবে হাট বসবে কেন? আর সেই কারণেই দশ বারোটা গ্রামের মাঝেই একটা হাট বসে। বেচাকেনার শেষে লোকজন চলে গেলে কে ই বা সন্ধ্যে প্রদীপ জ্বালবে আর কে ই বা সকালে ঝাঁট দেবে? সম্পূর্ণ সত্যি কথা কিন্তু মনটা কি ভরে উঠবে?  কবিতা তো শুধু কথাবার্তার কচকচানি  নয়, এর মধ্যে আছে ছন্দ, ভাব আর এটার অভাব ঘটলে সেটা কবিতা হবেনা,  হবে শব্দবন্ধের প্রতিফলন। জানিনা ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ভাব ভালবাসার ও উন্মেষ হবে কিনা। যদি এটাও হয়ে যায় তাহলে আর মানুষের দরকার কি? মানুষ থাকলেই তার খাওয়া পড়া, শিক্ষা দীক্ষা, রোগভোগের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল কিছুই দরকার হবেনা। মন দেওয়া নেওয়ার কোন ব্যাপার নেই। বোমা ফাটিয়ে নিশ্চিহ্ন করার দরকার নেই, দলাদলির দরকার নেই, রাজনৈতিক নেতাদের দরকার নেই, শুধু থাকবে হৃদয়হীন রোবট আর দেশ চলবে ড্যাং ড্যাং করে।
কেমন হবে তাহলে?

Friday, 7 November 2025

ভ্রমণ পিপাসু বাঙালি

"বাসনার সেরা বাসা রসনায়" কোথায় যেন পড়েছিলাম। গ্যাসে, অম্বলে ভোগা বাঙালি রান্নাঘরে অনেক সময় ব্যয় করে এই রসনায় পরিতৃপ্ত হওয়ার জন্য। আরও একটা বিলাসিতা আছে বাঙালির , একটু ফাঁক পেলেই ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়া সে ট্যাঁকের রেস্ত যাই হোক না কেন। দুপুর বেলায় একটা ছোট্ট করে ভাত ঘুম ও বাঙালির আরো এক বিলাসিতা। এইসব নানা বিলাসিতায় ব্যস্ত এক পাঁচমিশালি বয়সের গ্রুপ যার আক্ষরিক নাম সান্ধ্যবাসর হঠাৎ ই চঞ্চল হয়ে উঠল কোথাও বেড়াতে যাওয়ার জন্য। সব গ্রুপেই কোন কোন অত্যন্ত অভিজ্ঞ লোক থাকেন যাঁরা এই বেড়াতে যাওয়ার খুঁটিনাটি সব কিছুই মাথায় রাখেন এবং কার কিসে সুবিধা, অসুবিধা সমস্ত জিনিস মাথায় রাখেন এবং অযথা বেশি কথা না বলে সুন্দর নিটোল ভাবে প্রোগ্রামটা সাজিয়ে রাখেন কিন্তু এই সাজানোর আগে গণতান্ত্রিক উপায়ে সকলের মতামত নেন এবং যাতে সবাইকে মোটামুটি একটা সন্তোষজনক ভাবে খুশী রাখা যায় সেই চেষ্টা আপ্রাণ করেন। গ্রুপে কিছু লোক থাকেন যাঁরা এই প্রোগ্রামের সার্থক রূপায়ণের জন্য প্রচণ্ড পরিশ্রম করেন এবং সবার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন। বাকিদের কেউ কেউ রসিকতা করে প্রোগ্রামটা জমজমাট রাখার চেষ্টা করেন এবং কিছু লোক রসিকতার খোরাক হয়ে অন্যদের বিনোদনে সাহায্য করেন। আর বাকিরা মাঝেমধ্যে ফোড়ন কেটে সর্বাত্মক সাফল্যে সহায়তা করেন।
সান্ধ্যবাসরে আলোচনা হতে থাকল কোথায় যাওয়া যায়। উঠে আসতে থাকে একের পর এক প্রস্তাব। শেষমেষ ঠিক হলো দক্ষিণ রায়ের জমিদারিতে গেলে মন্দ হয়না। শান্তিনিকেতনে সোনা ঝুড়ির মেলায় বাউলের কাছে শোনা গান " পরের জায়গা, পরের জমিন, ঘর বানাইয়া আমি রই, আমি তো এই জমির মালিক নই" মনে পড়ে গেল। দক্ষিণ রায়ের মুলুকে যাওয়া হবে অথচ দক্ষিণ রায়ের কোন মত নেওয়া হলোনা। অনেক সাতপাঁচ ভেবে যাত্রা স্থির হলো। মত নেওয়া হলে জমিদার বাবু হয়তো দর্শন দিতেন আর তাঁর অমতে গিয়ে দর্শন প্রার্থী হলে তিনি দেখা দেবেন কিনা সেটা তাঁর একান্তই মর্জির উপর নির্ভর করছে। যাই হোক, ক্যাপ্টেনের ঘুঁটি সাজানো শুরু হলো। পারফেক্ট প্ল্যানিং শুরু হলো নীরবে এবং তার রূপায়ণ সার্থক হলো এই দ্বিতীয় সারিতে থাকা বিশেষ কয়েকজনের অমানুষিক পরিশ্রমের ফলে। যাতায়াতের সুন্দর ব্যবস্থা, মাঝপথে একটু পেট পূজোর ব্যবস্থা এবং খাওয়া দাওয়া ও বিনোদনের সমস্ত ব্যবস্থা করা প্ল্যানিং এর এক অঙ্গ বিশেষ এবং সমস্ত যাত্রার সফল রূপায়ণ দলের অন্য সমস্ত সদস্য ও সদস্যার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফল।
নভেম্বরের ৫ তারিখে সকাল সাড়ে ছটায় বিরাট লাক্সারি বাস এসে গেছে এবং সান্ধ্যবাসরের অধিকাংশ লোকই এসে গেছেন চাকা লাগানো স্যুটকেস নিয়ে এবং কাঁধে একটা ছোট্ট ব্যাগ যেটা টুকিটাকি দরকারি জিনিসে ভরা। সকাল সাতটায় নধরকান্তি বাসটা একটু যেন নড়ে উঠলো আর শুরু হলো দক্ষিণ রায়ের জমিদারির উদ্দেশ্যে যাত্রা। ঘন্টা দেড়েক চলার পরে এল চা খাওয়া এবং হাত পা ছাড়ানোর জায়গা মালঞ্চের  কাছে নোনা মাটির রেস্তোরাঁ। সেখানে আগে ভাগে বলে রাখা লুচি, আলুর তরকারি ও বিশেষ ভাবে অর্ডার দেওয়া দরবেশ সকলের পেট ও মন জয় করে নিল এবং পরে গরম চা শরীর ও মনকে তরতাজা করে তুলল। আবার যাত্রা শুরু, ফের ঘন্টা দেড়েক চলার পর এল গদখালি। সেখানে নেমে মালপত্র কুলির মাথায় চাপিয়ে  লঞ্চের উদ্দেশ্যে যাত্রা। নীচের ডেকে মালপত্র ও উপরের ডেকে বর্ষীয়ান ও বর্ষিয়সী সদস্য ও সদস্যাদের একে একে তুলে লঞ্চ চলতে শুরু করল দক্ষিণ রায়ের জমিদারির উদ্দেশ্যে। তখন চলছে ভাটার টান , তাই পোঁছাতে লাগল দেড় ঘন্টার উপর। এদিক সেদিক বাঁক নিয়ে পৌঁছে গেল দুলকি জে এফ এম সি দ্বীপে যেখানে রয়েছে হোটেল সোনার বাংলা এবং সেখানেই আমাদের থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে। মালপত্র ও বয়স্ক সদস্য ও সদস্যাদের ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে বা এয়ারপোর্টে চলা মোটরগাড়িতে চাপিয়ে এবং মালপত্র পাঠিয়ে দিয়ে বাকিরা পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেল অনতিদূরে অবস্থিত হোটেলে। চেক ইন করে সমস্ত মালপত্রে লাগানো স্টিকার অনুযায়ী নির্ধারিত ঘরে এবং হাতমুখ ধুয়ে এসেই রেস্তোরাঁয় বসে খেয়ে নেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে সুইমিং পুলে জলের মধ্যে দাপাদাপি করা। সবাই তো আর সাঁতার জানেন না, তাঁরা অন্যদের দাপাদাপি দেখে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে নিলেন এবং অনেক ছবি মোবাইলে ধরে রাখলেন। এরপর যে যার রুমে চলে গেলেন এবং সন্ধ্যে বেলায় হাই টিতে অংশ গ্রহণ করে স্থানীয় অধিবাসীদের নৃত্য পরিবেশনায় সময় কাটাতে যাওয়া হলো। তাদের সঙ্গে আমাদের ও কয়েকজন নাচ গানে মাতিয়ে দিল। এরপর ই একটা মজার ঘটনা ঘটল। হোটেল সোনার বাংলা বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে অনেকগুলো ব্লক তৈরী করেছে। সবকটা ব্লক দোতলা এবং উপর নীচ করে চারটে করে ঘর আছে অর্থাৎ ছোট গ্রুপ হলে একটা ব্লকেই সীমিত থাকবে এবং অন্য কোন লোকের উপস্থিতি থাকবে না আর বড় গ্রুপ হলে দুটো তিনটে ব্লকেই আবদ্ধ থাকবে। আমাদের পঁচিশ জনের গ্রুপে সবাইকেই দোতলায় রাখতে গিয়ে বেশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে হয়েছে। ঝুমুর নাচ দেখে ঘরে ওষুধ খাওয়ার জন্য একাই ঘরে ফিরছি। রাতে আলো আঁধারে রাস্তাটা কেমন যেন গুলিয়ে গেল। এদিক ওদিক ঘুরে ও জায়গাটা ঠিক বাগে আসছে না, কয়েকটা চক্কর লাগিয়েও নিজের ব্লকটা খুঁজে পাচ্ছি না, হঠাৎ ই মনে পড়ল দক্ষিণ রায়ের কথা আর মূহুর্তেই জমিদারের রাগত চক্ষু আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সব দিকটাই ঘেরা আছে কিন্তু তিনি ক্রুদ্ধ হলে কারো কিছু করার থাকেনা। আর তিনি ধরলে তো আর কথাই নেই। ভয়ে লোমগুলো খাড়া হয়ে উঠল। টর্চের নতুন ব্যাটারি বেশ অনেক দূরেই আলোকপাত করে কিন্তু আমি খেয়াল করলাম যে আলোটা ঠিক এক জায়গায় ফোকাস করছে না, কেমন যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে আর ঐ কাঁপা আলোতেই দূরে একটা লোক দেখতে পেয়ে এই ভাই ,এই ভাই বলে ডাকতে থাকলাম। লোকটি কাছে আসার পর তাকে ব্লকের নম্বরটা বলে জিজ্ঞেস করায় সে জানালো যে আমি এই দিকে কেন এসেছি? আরও ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল।
 ভাই, একটু দেখিয়ে দিন না ব্লকটা।
লোকটা আমায় সঙ্গে করে নিয়ে এসে বলল, এবার বাঁ দিকে ঘুরে ডান দিকে গেলেই আমাদের ব্লকটা এসে যাবে। পকেটে ছিল মোবাইল কিন্তু নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না বলে ওটার কথা আর মাথায় আসেনি। যাই হোক, টর্চের আলোয় ব্লকটা খুঁজে পেয়ে ভগবানকে অনেক ধন্যবাদ জানালাম। দোতলায় উঠে দরজা খুলেই দরজাটা বেশ ভাল করে আটকে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। খানিকটা ধাতস্থ হয়ে ওষুধটা খেলাম কিন্তু খিদে তো কোন দিক দিয়ে পালিয়েছে। যেতেই ইচ্ছে করছে না, তবে ওষুধটা খাওয়ার পর একটু মনে জোর পেয়ে বেরিয়ে পড়লাম রেস্তোরাঁর দিকে। একটা কথা ছেলেবেলায় শুনতাম, সদা সত্য কথা বলিবে, কদাচ মিথ্যা কথা কহিবে না। কিন্তু এই সত্য কথাটা বললে যে নিতান্তই ডরপোঁক বলবে সকলে এটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনেক সাহস সঞ্চয় করে সত্যি কথাটাই বলে ফেললাম। দক্ষিণ রায়ের অনেক প্রতিপত্তি শুনেছি কিন্তু তার চিন্তা ও যে কপালে এত ভাঁজ ফেলে সেটা জানা ছিল না।
পরদিন সকাল আটটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট করে বেরোতেই হবে সুন্দরবনের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখতে। দেরী হলেই সময়মতো লাঞ্চ করে বেরোতে পারা যাবে না এবং বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা সেই সময়ের মধ্যে বেরোতে না পারায় কোন দ্বীপে নামা গেলনা কিন্তু লঞ্চে চড়ে বিভিন্ন দ্বীপের পাশ দিয়ে পরিক্রমা করা হলো এবং হোটেলে ফিরেই রেস্তোরাঁয়। স্যুটকেস গোছানোই ছিল এবং কালক্ষেপ না করে ফিরে আসা লঞ্চের দিকে। ভাটার টানে লঞ্চের গতি বাড়ানো যাচ্ছে না, গদখালিতে থাকা বাসে উঠতে বিকেল  গড়িয়ে চারটে। অনেক বয়স্ক সদস্য, সদস্যা ছিলেন।ফিরে আসার পথে আবার সেই নোনা মাটির রেস্তোরাঁয় চায়ে গলা ভেজানো এবং সঙ্গে আলুর টিক্কা ও পনীর পকোড়া। জমাটে এই সফর এসে শেষ হলো রাত্রি আটটার কিছু পরে। কাণ্ডারী আশিস রায় ও তাঁর সুযোগ্য সহযোগী সুব্রত চৌধুরী, উতথ্য লাহিড়ি এবং দেবজ্যোতি ঘটক, অমিত রায় এবং লালমণি চক্রবর্তীর অসাধারণ প্রয়াসে দক্ষিণ রায়ের জমিদারি দর্শন এক দারুণ অভিজ্ঞতা।ফেজ থ্রির অধিবাসীবৃন্দদের সনির্বন্ধ অনুরোধ ফ্ল্যাটের মধ্যে নিজেদের আবদ্ধ না রেখে সান্ধ্যবাসরে যোগদান এবং আমাদের এই ফেজকে সবদিক দিয়ে এক আদর্শ বাসস্থান গড়ে তোলার। এতবড় একটা প্রজেক্টকে সার্থক রূপ দিতে অনেক সময় কিছু ভুল ত্রুটি হতে পারে কিন্তু তার থেকেও অনেক বড় এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অগ্রগতি। আসুন আমরা সবাই এগিয়ে আসি এর বাস্তবায়নে।

Sunday, 12 October 2025

গল্প না ছাই

কথা বলতে যারা ভালবাসে তাদের পড়াশোনা বিশেষ কিছু হয় বলে মনে হয়না কারণ তারা তো চিন্তাই বেশীক্ষণ করতে পারেনা। কিন্তু মানুষ হিসেবে তারা মোটামুটি মন্দ হয় না। তাদের সবাই বাচাল বলে, খুব গভীর কিছু আলোচনার মধ্যে এমন একটা মন্তব্য করে বসে যে উপস্থিত সব লোক না হেসে পারেনা। এইরকম ই একজন মানুষ ছিল সৌম্য বা ডালু। ডালুর ভাল নাম কজন ই বা জানে? স্কুলে, কলেজে এমনকি ইউনিভার্সিটিতেও তার পুরোনো খোলস সে ছাড়তে পারেনি। ডালু যখন কোন কথা খুব সিরিয়াসলি ও বলতো সবাই ভাবত যে ও বোধহয় কোন মজার কথাই বলছে। ডালুর এক ট্রেন সফরের কথা সবার সামনে বলছে কিন্তু সবাই ভাবছে এবার বোধহয় কোন মজার কথা বলবে কিন্তু ওর বক্তব্য শেষ হবার পর কেউ ভাবতেই পারছেনা যে এর মধ্যে কি আর এমন বিশেষত্ব। এটা তো একদমই ডালু সুলভ নয় অর্থাৎ ডালু যে কোন সাধারণ কথা অন্যদের মতো বলতে পারে এটাই কেউ ভাবতে পারছে না।

কলকাতা থেকে টেলিগ্রাম এসেছে," Father ill, come soon."  তখন এটা একটা রেওয়াজ ছিল কোন ছুটিছাটা নিতে হলে এইধরণের একটা টেলিগ্রাম পাঠানো হতো। টেলিগ্রাম এসেছে অফিসে। ম্যানেজার চেম্বারে ডেকে পাঠালেন ডালুকে আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর প্রতিক্রিয়া দেখতে লাগলেন যে টেলিগ্রাম টা পাওয়ার পর। 
স্যার, আমাকে বাড়ি যেতে হবে ।
বাড়ি যেতে হবে মানে? এত কাজ, মাসের প্রথম, বাড়ি যেতে হবে বললেই হবে? তোমার এই কাজ কে সামলাবে?
মনে মনে একটা খুব খারাপ গালাগালি এল কিন্তু সেটা সামলে খুব মোলায়েম করে বলল যে ,"স্যার আমিই বাবার একমাত্র ছেলে, বাবার বিপদে আমি না গেলে কে দেখবে, বলুন।" ওর মুখে এসে গেছিল যে আমি না গেলে কি পাড়ার পঞ্চু এসে দেখবে। ম্যানেজার একটু নরম হয়ে বললেন ,"আচ্ছা শোন, তুমি যাও কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে হবে।"
ডালু বুঝল যে ব্যাটা একটু নরম হয়েছে। হ্যাঁ স্যার, ঠিক আছে স্যার বলে ধন্যবাদ দিয়ে নিজের কাজগুলো পাশের সহকর্মীকে বুঝিয়ে দিতে লাগল।
আসলে সবটাই একটা সেটিং। এতদূরে থেকে হঠাৎ বাড়ি যাব বললেই কি ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায়? আগের দিন সন্ধ্যা বেলায় পাণ্ডিয়ার বাড়ি কাম অফিস হয়ে বাড়ি গেছে টিকিটের জন্য। পাণ্ডিয়া ছিলেন খুব করিৎকর্মা লোক। একদিন আগে জানালেও উনি সাধারণ টিকিট কেটে টিকিট চেকারের সঙ্গে কথা বলে কোন কামরায় উঠতে হবে বলে দিতেন। এমন ই ছিল তাঁর যোগাযোগ, নিতেন মাত্র দশ টাকা বাড়তি। অবশ্য দশটাকার তখন অনেক দাম। কিন্তু পাণ্ডিয়া স্টেশনের কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে সব বলে দিতেন এবং টিকিট চেকারের সঙ্গে দেখা করিয়ে তবে উনি ফিরে আসতেন। এতটাই ছিলেন প্রফেশনাল।

এইরকম ই একটা দিন যখন চেন্নাই হাওড়া মেলে পাণ্ডিয়া উঠিয়ে দিয়েছেন এক কামরায় যেখানে ডালু ছাড়া আর জনা তিন চারেক অন্য লোক আর বাকি সব ছেলেমেয়েরা গরমের ছুটিতে বাড়ি ফিরছে । ডালুর মুখ নিশপিশ করছে কথা বলার জন্য। বাকি যে তিন চারজন তারা কামরার এক প্রান্তে নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় ব্যস্ত এবং মনেই হয় তারাও হয়তো চেন্নাই থেকেই উঠেছে। এই ট্রেন যাত্রায় একটা জিনিস লক্ষ্য করা যায় যে প্রথমে যারা ওঠে তাদের মধ্যে যে আন্তরিকতা বা আলাপচারিতা জমে ওঠে, মাঝপথে ওঠা কোন লোককেই তারা আর সেই গ্রুপে ঢুকতে দেননা। এমনকি পাশের ক্যূপের যাত্রীরাও অন্য লোক বলেই গণ্য হন। আর এখানে তো ডালু এক প্রান্তে আর ছাত্রছাত্রী বাদে লোকগুলো অপর প্রান্তে। সুতরাং, জমবে না, এই ছেলেমেয়েদের সঙ্গেই ভাব জমিয়ে চলতে হবে। ষোল সতেরো ঘন্টার যাত্রা যদি মুখ বুঁজে যেতে হয় তাহলে নির্ঘাত ও অসুস্থ হয়ে পড়বে, বাবাকে দেখতে গিয়ে ওকেই কে দেখে সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। যাই হোক, শ্রীকাকুলামে ট্রেন এসে পৌঁছালো। কামরায় বেশ হকার উঠেছে। এই একটা দারুণ জিনিস সেকেন্ড ক্লাস কম্পার্টমেন্টে। এখানে বিভিন্ন রকম আওয়াজ করে ভিন্ন ভিন্ন হকার ওঠে এবং তাদের সঙ্গেও দুচারটে কথা বিনিময় হয় জিনিস কেনার সময়। খোলামেলা কামরার আলাদাই মেজাজ। চিপস আর চানাচুরের দুটো করে প্যাকেট কিনে একটা সামনে বসা কলেজের ছাত্রটিকে দিল। কিছুতেই নেবেনা সে আর ডালুও ছাড়বে না। হাজার হলেও ডালুর বয়স বেশি এবং লোকজনকে বিশ্বাস করানোতে ও একজন আদর্শ লোক। ছেলেটাকে পটিয়ে ও তার হাতে গুঁজে দিল একটা চিপস ও চানাচুরের প্যাকেট। ধীরে ধীরে জমে উঠল কথাবার্তা। ওঁর কাছেই জানতে পারল যে ওরা ম্যাঙ্গালোরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। এর ই মধ্যে একটা ছোট খাটো চেহারার ভীষণ বুদ্ধিদীপ্ত মেয়ে নজরে পড়ল। এই ছোট মেয়েটা অতি আধুনিকা হয়েও পান খাচ্ছে। এই বয়সের ছেলেমেয়েরা সাধারণত পান খাচ্ছে এটা চোখেই পড়েনা। কোন সময় হয়তো অনুষ্ঠান বাড়িতে খাওয়ার পর খেলেও খেতে পারে কিন্তু ঐ ছোট্ট মেয়েটি পান খাচ্ছে আর সমস্ত ছেলেমেয়েদের বলে দিচ্ছে কি করতে হবে বা কি নয় এটা দেখে ডালু তো থ বনে গেছে। সামনে বসা ছেলেটার কাছে জানতে পারল যে মেয়েটি ঢাকা থেকে পড়তে এসেছে আর ওর নাম জার্মিন। কি দারুণ পার্সোনালিটি মেয়েটার। একে সুন্দর তার উপর যেভাবে কথাবার্তা বলছে কোন ছেলে বা মেয়ে তাকে অস্বীকার করতে পারছেনা। ওই মেয়েটির বাবার নাকি বিরাট ব্যবসা এবং মেয়েটিও প্রচুর পয়সা খরচ করে তার বন্ধুদের পিছনে। একে সুন্দরী তার উপর পয়সা খরচে কোন কার্পণ্য নেই, সুতরাং স্বাভাবিক ভাবেই ছেলেমেয়েরা যে তার কথা মেনে চলবে , এটাই খুব স্বাভাবিক। খাবার দাবার বেরোল ঝুলি থেকে। সবাইকে বিতরণ করার সময় ডালুকেও একটা দিল। খেতে খেতে গান ধরলো তারা, ডালুকেও বলল তাদের সঙ্গে গলা মেলাতে। ডালু ঠিক কাকুর পর্যায়ে না হলেও বড় দাদার মতন কিন্তু সেই সময় ডালু ও ভিড়ে গেল তাদের মধ্যে । রাতের খাবার এসে গেছে, খাওয়া দাওয়া করে সবাই গল্পে মত্ত হলো এবং অনেক রাত অবধি আড্ডা চলল। আর কয়েক ঘণ্টা পরেই হাওড়া স্টেশন এসে যাবে আর তার পরেই দীর্ঘ গরমের ছুটি এবং তারপর আবার ফিরে যাওয়া ও নিজেদের পড়াশোনায় মেতে ওঠা। 
ডালুর মনে পড়ে গেল ইউনিভার্সিটির দিনগুলোর কথা। ছুটির শুরুতে এবং ছুটি শেষে আবার পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে একত্র হওয়া, এটা একটা বিরাট ব্যাপার। কিন্তু এই এত বড় ব্যাচ একসাথে কলকাতা থেকে বাইরে পড়তে যাচ্ছে এটা সে কোনদিন দেখেনি। ডালুর একবার মনে হলো তাহলে কি আমাদের শিবপুর, যাদবপুর বা খড়গপুর আই আই টিরা তাদের জৌলুস হারিয়ে ফেলছে। না তাই নয়, এখনও তারা সেরাদের পর্যায়েই আছে তবে যা হারিয়ে গেছে তা হচ্ছে পড়াশোনা করার পরিবেশ। মেধাবী ছাত্র ছাত্রীরাই এখানে পড়তে আসে কিন্তু রাজনীতি এতটাই কলুষিত করে তুলেছে এই শিক্ষায়তনগুলি যে অভিভাবকরা আর ভরসা করতে পারছেন না। আমরা কি হৃত গৌরব ফেরাতে সচেষ্ট হবো না? 

Thursday, 18 September 2025

যুদ্ধ সতত

সকাল বেলায় হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ পেলাম যাতে লেখা আছে শঙ্খ আর মূর্খ ব্যক্তি অন্যলোকের ফুঁয়ে বাজে। কথাটা নিয়ে একটু গভীর ভাবে চিন্তা করতেই দেখলাম কথাটা একদম সঠিক। শঙ্খের প্রসঙ্গে পরে আসছি, আগে মূর্খদের নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। মূর্খ মানে কি পড়াশোনা না জানা লোক? তার মানে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আলোকিত করা লোকজন সবাই বিচক্ষণ? না, তা তো নয়, বরং বেশীরভাগ সময়ই দেখা যায় যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা সেরকম কিছু উল্লেখযোগ্য নয় কিন্তু তাদের বাস্তব বোধ অত্যন্ত প্রখর এবং জীবনে অনেক বেশী শান্তি প্রাপ্ত অথচ অনেক ডিগ্রিধারী মানসিক দ্বন্দ্বে ছিন্নভিন্ন এবং এর জন্য দায়ী তাদের বাস্তব বোধ কম থাকার জন্য বা নিজের অহমিকাকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য। আগের দিনের ঠাকুমা, দিদিমারা স্কুলের গণ্ডি না মারালেও প্রচণ্ড বাস্তববাদী হবার কারণে যৌথ পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিলেন যেটা আজকের দিনে বিরল যদিও টিভির সিরিয়ালে ঠাকুমা, ঠাকুর্দা, ভাসুর,দেওর, দা আর ননদ দের সংসার দেখা যায় এবং কূটকচালিতে ভরা অনন্তকাল ধরে চলতে দেখা যায় এবং সেই সময়টা অন্য কোন লোকের আগমন নৈব নৈব চ। এই ঝগড়া, বিবাদ আর পিছনে সমালোচনা অথচ সামনে মুখে মধু ঝরে পড়া আর যাই হোক বুদ্ধিমানের পরিচয় নয়। তবুও তাঁদের নেমপ্লেটে বা লেটার বক্সে পিতলের ফলকে জ্বল জ্বল করে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা। স্রেফ বাস্তব বোধ না থাকায় ব্যক্তিগত জীবনে তাঁরা প্রচণ্ড অসুখী। এঁদের অনেকেই কাকে কান নিয়ে গেল শুনেই কাকের পিছনে ধাওয়া করেন। এঁদের কি বলে অভিহিত করা যায় পাঠকের উপর ছেড়ে দেওয়াই বাঞ্ছনীয়।

এবার আসা যাক শঙ্খ প্রসঙ্গে। শঙ্খের ইতিহাস খুঁজতে গেলে একটু পুরাণের দিকে ফিরে যেতে হবে। শঙ্খাসুর বা পাঞ্চজন্য প্রভাস সমুদ্রের অতলে থাকা এক মহাদুষ্ট দৈত্য বা অসুর ছিল । কোন এক অজানিত কারণে সে মহর্ষি সন্দীপনীর ছেলেকে কিডন্যাপ করে সমুদ্রের অতলে তাকে শঙ্খের মধ্যে বন্দী করে রাখল। মনোবাসনা কি ছিল কে জানে?  কিন্তু মহর্ষির শিষ্যরা সব নামজাদা লোক যাঁরা হলেন কৃষ্ণ, বলরাম, সুদামা ও উদ্ধবের মতো অত্যন্ত ওজনদার। সুতরাং কিডন্যাপ করে এত সহজে ছাড় পাওয়ার মতো ব্যাপার নয়। শিষ‌্যরা ঘটনা জানতে পেরেই গুরুদেবের মুখের দিকে চাইতেই সম্মতি মিলল, বললেন," দেখ' তো হে বাপু, ব্যাপারটা কি?" গুরুদক্ষিণা  যদি দিতেই হয়  তাহলে আমার ছেলেটাকে একটু উদ্ধার  করে আন তো। আজকের দিনের মতো, কোন রহিস লোকের ছেলেমেয়েদের কেউ  কোন ক্ষতি করলে সমস্ত পুলিশ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়বে অপরাধীদের ধরার জন্য অথচ কোন এলেবেলে লোকজন প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হলেও পুলিশের কোন হেলদোল থাকেনা।  যাই হোক, কৃষ্ণ, বলরাম তো গেলেন এবং শঙ্খাসুর বা পাঞ্চজনকে হত্যা করেও গুরুদেবের ছেলেকে দেখতে পেলেন না। তবে হাল ছাড়ার লোক তো তাঁরা ছিলেন না , যমরাজের হেফাজত থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এলেন ছেলেকে। ফিরে এসে দেখেন পাঞ্চজনের হাড়গোড় সেই শঙ্খের আকার ধারণ করেছে। কৃষ্ণ সেই শঙ্খকে নিজের করে নিলেন এবং সেই থেকে সেই শঙ্খের নাম হলো পাঞ্চজন্য হরিশঙ্খ। এই শাঁখে ফুঁ দিলে যে নিনাদ সৃষ্টি হতো তা শত্রুদের হৃৎকম্প উপস্থিত করে দিত। মহাভারতের যুদ্ধে এই পাঞ্চজন্যের উল্লেখ রয়েছে এবং এই শঙ্খনিনাদেই শুরু হয়েছিল মহাভারতের যুদ্ধ এবং সূর্যাস্তের পরেই এর নিনাদে সেদিনের মতো যুদ্ধ বন্ধ হতো। 
এখনকার দিনের মতোই আগের দিনেও দেওয়া নেওয়ার বালাই ছিল। এখন আমেরিকা যেমন রাশিয়াকে প্রতিহত করার জন্য পাকিস্তানের সহায়ক তেমনি আগের দিনেও এর প্রচলন ছিল। অগ্নিদেবের প্রচুর ঘি খেয়ে অগ্নিমান্দ্য হলো মানে তাঁর মুখে কিছুই রোচেনা। ব্রহ্মার নিদান হলো, বাপু তোমার শরীরের চর্বি না কমালে তোমার এই রোগ সারবে না। এখনকার ডাক্তারের এই মত যদি কোন রোগী শোনে তাহলে সে চর্বি জাতীয় খাবার বা মিষ্টি খাওয়া কমিয়ে জিমে যাওয়া শুরু করবে বা প্রতিদিন দশহাজার কদম হাঁটা শুরু করবে আর মেয়েরা তো পারলে শুধু হাওয়া আর জল খেয়ে কাঠি সুন্দরী হতে চেষ্টা করবে। সেইরকম অগ্নিদেব ব্রহ্মার কথা শুনে খাণ্ডববন দহন করে নিজের অগ্নিমান্দ্য সারাবার পন্থা ঠিক করলেন কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র সেটা মানবেন কেন, অগ্নিদেব যতবার সেই চেষ্টা করেন দেবরাজ ইন্দ্র বৃষ্টি নামিয়ে ততবার আগুন নিভিয়ে দেন। অগত্যা বাধ্য হয়ে অগ্নিদেব কৃষ্ণ ও অর্জুনের শরণাপন্ন হলেন।  অর্জুন দের ও স্বার্থ ছিল । ইন্দ্রপ্রস্থ  স্থাপনের  জন্য দরকার  ছিল  জমি। অতএব , খাণ্ডববন পুড়িয়ে সেই জমি উদ্ধার করতে হবে। সুতরাং ,নামলেন মাঠে কৃষ্ণ ও অর্জুন , যুদ্ধ হল‌‌ ভয়ানক, খাণ্ডবদহন হলো, অগ্নিদেব হলেন সুস্থ এবং পুরষ্কার স্বরূপ কৃষ্ণ পেলেন  সুদর্শন চক্র এবং অর্জুন পেলেন গাণ্ডীব। কেউ আবার বলেন মহাদেব শিব নাকি বিষ্ণুর ভক্তিতে আপ্লুত হয়ে তাঁকে এই সুদর্শন চক্র দিয়েছিলেন আবার কেউ বলেন স্বয়ং বিশ্বকর্মা সূর্যের শক্তিকে আহরণ করে এই চক্র বিষ্ণুকে দিয়েছিলেন আবার কারো কারো মতে স্বয়ং পরশুরাম নাকি কৃষ্ণের পাঠ সম্পন্ন হলে তাঁকে দিয়েছিলেন এই সুদর্শন চক্র। যাই হোক, যেখান থেকেই পেয়ে থাকুন না কেন বিষ্ণু বা কৃষ্ণের হাতের সুদর্শন চক্র অমোঘ এবং কোন শক্তিই তাকে প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখত না এমনকি শিবের ত্রিশূলের ও না। বিষ্ণুর হাতের গদার নাম ছিল কৌমুদকী। সেই যুগে গদার এক বিশেষ সম্মান ছিল। পৃথিবীবাসীকে দুর্জনের হাত থেকে রক্ষা করার প্রতীক অস্ত্র ছিল গদা, অনেকটা আজকের দিনে আমেরিকার মতো। কেউ বেশি বাড়াবাড়ি করো না, যা বলছি শোন নইলে পড়বে মাথায় ঘা।
বিষ্ণুর কথা যখন হচ্ছেই তখন শেষনাগের কথা না বললে তো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ফেনিল নীল সমুদ্রের উপর সোফায় শায়িত স্বয়ং বিষ্ণুর অর্ধশায়িত ছবি তো প্রায়ই দেখা যায়। ঐ সোফাটিই হচ্ছেন শেষনাগ। শেষ নাগের অপর নাম আদিশেষ যার অর্থ হলো সমস্ত কিছু বিনাশ হয়ে গেলেও তিনি থেকে যাবেন। মহামুনি কাশ্যপ এবং কদ্রুর সর্বজ্যেষ্ঠ সন্তান তাঁর ধার্মিক আচরণের জন্য স্বয়ং ব্রহ্মার আশীর্বাদে বিষ্ণুর সহায়ক হিসেবে থাকার সুযোগ পান। তাঁর উপর ই শায়িত বিষ্ণুর ছবি আমরা প্রায় ই দেখি। ত্রেতাযুগে বিষ্ণু বা রামের সহচর হিসেবে লক্ষণ রূপে দেখি এবং দ্বাপর যুগে তাঁর উপস্থিতি বলরাম হিসেবে। কলিযুগে তিনি কি অবস্থায় কার সহচর হিসেবে আছেন তা বলা কঠিন। তবে আমরা নিজেরা নিজেদের মতো করে ভেবে নিতে পারি।

যুদ্ধ যে শুধু এখন ই হচ্ছে তা নয়, ইতিহাস ঘাঁটলে বা পুরাণ ঘাঁটলেও দেখা যায় এই দেবতার সঙ্গে সেই দেবতার লড়াই। সবাই ভাবে আমি কিসে কম? আমি কেন ওর বশ্যতা স্বীকার করব? সবাই নিজেকে শক্তিশালী দেখতে চায় কিন্তু শক্তিশালী হতে গেলে যে স্বার্থ ত্যাগের প্রয়োজন হয় তা স্বীকার করার মতো মানসিকতা রাখতে পারিনা। যতক্ষণ অন্যদের কাছে মাথা ঝুঁকিয়ে যো হুজুর বলতে পারা যাবে, ততক্ষণ নিজেদের মান সম্মান খোয়া গেলেও প্রাণটা বেঁচে যেতে পারে কিন্তু যখন ই তাদের প্রয়োজন হবে তখন ই তাদের মর্জিমাফিক চলতে হবে নাহলেই বিপদ। যে মূহুর্তে হাত জোড় করা বন্ধ করে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হবে তখনই আসবে নানা দিক থেকে আঘাত কারণ কেউই পছন্দ করবে না যে হাত জোড় করা লোকটা আজ আমার চোখে চোখ রেখে চলছে। অতএব, আমাদের ই বেছে নিতে হবে আমরা কিভাবে থাকব। যুদ্ধ সব যুগেই ছিল, আছে এবং থাকবে কেবল রূপ টা হবে ভিন্ন কিন্তু তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি মানুষের মৃত্যু ও অপরিমেয় ক্ষতি।

Monday, 15 September 2025

গল্পের খোঁজে

মাথাটা একদম খালি খালি লাগছে, কোন চিন্তাই ঠিক ভালভাবে দানা বাঁধছে না তো গল্পের প্লট আসবে কি করে? একটা কিছু মাথায় এল তো মনে হচ্ছে এটা যেন কোথায় পড়েছি বা শুনেছি। ওটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখলে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাব কারণ ওটাও এক ধরণের চুরি যা নিজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার সামিল। তাই এই সাধারণ লোকটার কথাই তুলে ধরার চেষ্টা করা। হয়তো কেউ এই ধরণের লেখা লিখে থাকতে পারেন কিন্তু আমি নিজের কাছে পরিষ্কার যে এটা একান্তই আমার দেখা লোক যার প্রয়োজন সবার কাছে কিন্তু বড় ই উপেক্ষিত।

সাধু আমাদের এখানেই খুব সামান্য কাজ করে, সামান্য মানে যৎসামান্য,একদম বড় মুখ করে বলার মতো নয়। কবে এসেছিল এখানে সেটা হয়তো পুরনো লোকজন যাঁরা আছেন তাঁরাই বলতে পারবেন। এসেছিল যখন তখন সে রীতিমতো গাঁট্টাগোঁট্টা যুবক বিহারের কোন জায়গা থেকে।  গভর্নমেন্ট  হাউসিং কলোনি ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে শহরের উপকণ্ঠে , অ্যালটমেন্ট হচ্ছে ফ্ল্যাটের, লোকজন আসছে ধীরে ধীরে তাদের নতুন বাসস্থানে। অনেকেই এসেছেন ওপার বাংলা থেকে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে কোনরকমে প্রাণ বাঁচিয়ে, আশ্রয় নিয়েছেন কোন আত্মীয় বা পাড়াতুতো পরিচিতের বাড়িতে, তারপর ধীরে ধীরে নিজেদের কর্ম ও অধ্যবসায়ের জোরে পায়ের তলার জমি শক্ত করেছেন এবং আবার জেগে উঠেছেন। তাঁদের পরিশ্রমের প্রশংসা অবশ্যই করতে হয় কারণ এভাবে ঘুরে দাঁড়ানো সহজ কথা নয়। উপনগরী যেখানে গড়ে উঠেছে সেখানে আগে ছিল কচুরিপানা ভর্তি বিশাল জলরাশি। শোনা যায় যে এইখানে নাকি উগ্রপন্থীদের পুলিশের গাড়ি থেকে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হতো এবং পিছন থেকে তাদের গুলি করে মারা হতো। সত্যতা যাচাই করার সুযোগ হয়নি কিন্তু লোকমুখে যতটা রটে তার খানিকটা তো ঘটেই থাকে। যাই হোক, সরকারী উদ্যোগে না লাভ, না লোকসান করে বিশাল উপনগরীর ফ্ল্যাট গুলো আর্থিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হলো এবং বলাই বাহুল্য তৎকালীন সরকারের কাছের লোকরাই সবসময়ের মতোই সেই ফ্ল্যাটের সিংহভাগ দখল করে নিল( সরকারী অনুমোদনে) । শহরের নামজাদা লোকেরাও এলেন এবং কো-অপারেটিভ করার জন্য অনেক ফ্ল্যাটেই কোনরকম স্ট্যাম্প ডিউটি না দিয়েই ফ্ল্যাটের মালিকানা পেলেন। পরবর্তী কালে এঁরাই ফ্ল্যাটের মালিকানা বদলের সময় বিক্রেতা ও ক্রেতাদের কাছ থেকে কিছু সাম্মানিক মূল্য আদায় করলেন যদিও তাঁরা সরকারকে স্ট্যাম্প ডিউটি বাবদ পুরো টাকাই দিয়েছেন। প্রথম থেকেই সরকারের এই নেতিবাচক নীতি অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে নিয়ে গেছে। যাঁদের প্রকৃত সাহায্যের প্রয়োজন ছিল তাঁদের সঙ্গে যাঁদের ক্ষমতা ছিল এই টাকা দেওয়ার তাঁরাও এই লাভ পুরোপুরি ভাবে তুলে নিয়েছেন। নতুন জায়গায় নতুন প্রতিবেশী, পাঁচমিশালি মনোভাব মোটামুটি একটা সাধারণ মতে পৌঁছাতে বেশ সময় লেগেছে। এর মধ্যেই ছিল কম আর্থিক সামর্থ্যের জন্য ফ্ল্যাট, মাঝারি সামর্থ্যের জন্য এবং অধিক সামর্থ্যের জন্য ফ্ল্যাটের বিভাজন  এবং তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি যে নাক উঁচু লোকের সঙ্গে সাধারণ লোকের মধ্যে সম্পর্কের বিভাজন। সেই কারণেই বিভিন্ন ফেজে বিভিন্ন লোকদের রাখা হয়েছে যাতে বিভাজনের প্রকৃত রূপ উৎকট না হয়ে পড়ে।  উপনগরী তো তৈরী হলো কিন্তু তাদের পরিবারে কাজ করার জন্য বা রান্না করার লোকের তো প্রয়োজন হয়, সুতরাং খুব স্বাভাবিক ভাবেই আশে পাশে গরীব মানুষের ঝুপড়ি তৈরী হলো, বাজার দোকান তাদের মধ্যেই একটু সম্পন্ন লোকেরা শুরু করল। সংখ্যায় অপ্রতুল হওয়ায় পাশের প্রদেশের গরীব মানুষরাও ছুটে এল কর্মসংস্থানের জন্য।  "সাধু" এইরকমই একজন যে বিহারের এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে নিজের পেট পালতে এসেছিল এখানে।

আগে সাধুর বাড়ি যাওয়া প্রায় ছিল ই না, থাকতো ওদের জন্য তৈরী করে দেওয়া একটা ছোট ঘর ও একটা বাথরুম যেখানে গাদাগাদি করে কয়েকজন থাকতো। আগে তো পাখাও ছিলনা, কেরোসিনের লণ্ঠন দিয়ে অন্ধকার নাশ করতে হতো তাদের কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জন্য ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হলো এবং তার সঙ্গে পাখা। অবশ্য এটা এমন কিছু বিরাট ব্যাপার নয়। অনেক বাড়িতেই বিদ্যুৎ ছিলনা, কর্পোরেশনের জলের লাইন আলাদা করে বাড়িতে ছিলনা এবং রাস্তার কলের উপর ভরসা করেই তাদের জীবন চলতো। সাধু ভোরবেলা থেকেই উঠে সে যে ফেজে থাকে তা পরিষ্কার করতে লেগে যায় ঝড়, জল বৃষ্টি উপেক্ষা করেই। তার জীবনের একটাই মন্ত্র যে যেখানে সে থাকবে সেখানে একশ শতাংশ তো বটেই তার ও অনেক বেশি সে দেবে। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর একটু শস্তার ছিলিম না টানলে শরীর যে আর চলেনা, সুতরাং ওটা মেনেই নিতে হয়। এই উপনগরীতে অনেক গাছগাছড়া, সুতরাং বসন্তের সময় তো বটেই, সারা বছরই টুপটাপ করে পাতা ঝরছে আর সাধুর ঝাঁট দেওয়াও অব্যাহত। ধীরে ধীরে নানাধরণের লোকজন এসেছে, কেউ পাম্প চালায় আবার কেউ বা ময়লা নিয়ে যায়। এদের ছাড়া কোন সভ্যসমাজ চলতে পারেনা কিন্তু এরাই বড় বেশী উপেক্ষিত। আমরা তেলা মাথায় তেল ঢালতে ভালবাসি কিন্তু যাদের মাথায় একটু হলেও তেলের প্রয়োজন তাদের জন্য খুব কম সময় ই ভাবি। ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে পরিবর্তন আসছে এবং অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যেই এটা বিশেষ ভাবে প্রকট হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক লোকদের মধ্যে ও অনেক ভাল লোক আছেন যাঁরা রাজনীতির ঊর্ধে উঠে মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসেন তবে বেশীরভাগ সময়ই তাঁদের নিজেদের দলের লোকদের প্রতি নজর দেন। এহেন সাধুকে একদিন জুতো পড়ে বেশ ভাল পোশাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম যে কি ব্যাপার? ও জানালো যে বাড়ি থেকে খবর এসেছে যে ওর বিয়ের ঠিক হয়েছে। বিশ্বাস করতেই পারছিলাম না যে সাধুর কোনদিন বিয়ে হতে পারে। অভিনন্দন জানিয়ে ওকে সাধ্যমতো টাকা ও জামাকাপড় দিলাম। ওর অনুপস্থিতি প্রতি মূহুর্তেই অনুভূত হচ্ছিল কারণ ওর বদলে যে কাজ করছিল তা সাধুর ধারেকাছেও নয়। অনেকটা সেই একশো দিনের কাজের লোকদের মতো। ছেলেমেয়ে মিলিয়ে প্রায় আট নয়জনের দল আসে, মেয়েদের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, হাতে বড় ডাণ্ডার সঙ্গে লাগানো ঝাঁটা , একজন এদিকের শুকনো পাতা ওদিকে সরায় আর কেউ ওদিকের সরানো পাতা এদিকে রেখে যায়। দুজন আসে মোটরসাইকেলে যাদের একজন মোবাইলে ফটো তোলে আর একজন চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখে। একটু সময় পরেই সব ভোঁ ভাঁ। ওই অতগুলো লোকের সমবেত কাজের থেকে সাধুর একার কাজ অনেক অনেক গুণ বেশি কিন্তু সাধারণ লোকের ট্যাক্সের টাকা এইভাবে জলে যেতে দেখলে মন খারাপ ছাড়া ভাল হবার নয়। 

অনেক উঁচু পদে থাকা লোকজনেরও কর্তব্যনিষ্ঠা সেরকম ভাবে না থাকলেও সমাদৃত হন কিন্তু সাধুর মতো এধারে ওধারে থাকা আরো অনেক সাধুই রয়েছে যাদের কর্মনিষ্ঠা অতুলনীয় কিন্তু তারা চিরকাল ব্রাত্য ই থেকে যায়।

Monday, 8 September 2025

"মোমবাতি"

পাড়ায় পরিচিত নাম মোম দা। আসল নামটা যে কি খুব কম লোকই জানত। স্কুলে ভাল নাম তো অবশ্যই ছিল কিন্তু মাস্টার মশাইরা পর্যন্ত ওকে মোম বলেই ডাকতেন। মোম আবার কোন ছেলের নাম হয় না কি? মেয়েদের হলেও হতে পারে কিন্তু ছেলেদের --না, একদম ই শোনা যায় না। ছেলেবেলায় মাকে হারিয়ে, পিসি, কাকাদের কাছে মানুষ যাঁরা নিজেরাও কেউ বিয়ে থা করেন নি, দাদার সংসারটাকেই নিজেদের বলে মনে করেছে আর চালিয়েও দিল দিব্যি। ছোটবেলায় মাতৃহারা শিশুদের অবস্থা কিন্তু খুব কষ্টদায়ক, সে বাড়িতে যত ই কাকা, পিসিরা থাকুন না কেন। বাবাও কাজে বেরিয়ে যায়, কাকাও কাজে যায়, অনূঢ়া পিসির বিয়ে নিয়ে ও কারো মাথা ব্যথা হয়নি, বাড়িতে রান্নাবান্না করা ও সংসারটাকে কোনভাবে টেনে নিয়ে যাওয়া , এটাই তার একমাত্র কাজ। দাদারা টাকা রোজগার করে আনছে আর বোন সংসার টেনে চলেছে। এইরকম সংসারে ছেলেদের বড় হয়ে ওঠা খুবই কঠিন। মোমের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ছোট থেকেই নিজেই নিজের অভিভাবক। সকাল বেলায় খাওয়া দাওয়া করে স্কুল এবং সেখান থেকে ফিরে খেলতে বেরিয়ে যাওয়া এবং সন্ধ্যের বেশ পরেও ফিরে এলে জবাবদিহি কারো কাছে করা নেই, পিসি কিছু জিজ্ঞেস করলে হাড্ডা বাড্ডা বলে কিছু বুঝিয়ে দেওয়া, এককথায় অভিভাবকহীন বললেও কিছু অত্যুক্তি হয়না। মোমের একটা ভাই ছিল গজু, সেটাও প্রায় একই রকম,তবু তার মাথার উপরে একজন দাদা ছিল । কিন্তু এই নিজেই নিজের অভিভাবক হবার কারণে এবং পাড়ার পরিবেশ ভাল থাকার জন্য ও বখে যায়নি বরঞ্চ পাড়ার সবাই ওদের প্রতি খুব সহানুভূতিশীল ছিল। খানিকটা স্বার্থ ও ছিল পাড়ার লোকদের কারণ কোন বিপদে আপদে ডাক পড়ত সেই মোমের ই। এইসব ছেলেরা হয় খুব ভাল নয়তো খুব খারাপ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু মোম যে পাড়ায় থাকতো সেটা অত্যন্ত ভদ্রলোকের পাড়া মানে বেশিরভাগ লোকই ভাল, দু চারটে বাজে লোক কি ছিল না, অবশ্যই ছিল কিন্তু তারা ঐ ভদ্রপল্লীকে বিশেষ কলুষিত করতে পারেনি।
মোম স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে বাড়ির কাছেই কলেজে ভর্তি হলো কিন্তু বি এ পরীক্ষার গণ্ডি আর পেরোনো হলো না। নানারকম জনহিতকর কাজে সে নিজেকে ডুবিয়ে দেওয়ায়, পরীক্ষায় পাশ করার জন্য যতটুকু পড়াশোনা করা দরকার সেটুকু আর করা হয়ে উঠল না। সেই সময়  মাস্টার মশাইদের ভয় দেখিয়ে বই খুলে পরীক্ষার রেওয়াজ না থাকায় কলেজের গণ্ডি অধরাই থেকে গেল। ক্লাবে ব্যায়াম করা এবং যে কোন লোকের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য ও খুবই জনপ্রিয় ছিল। তখন স্কুলের সীমা পেরোলেই মোটামুটি একটা সরকারী চাকরি পাওয়া যেত। ইতিমধ্যে মোমের বাবার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটায় বাবার চাকরিটা সে পেল এবং সে আরও দায়িত্বশীল হয়ে উঠল। অফিসের সময়টা ছেড়ে দিয়ে বাকি সময়টা কেবল লোকের উপকার করা এবং বিভিন্ন ভাবে তাদের সাহায্য করা। ডিগ্রীটা একটা কাগজের টুকরো যেটা মানুষকে উন্নতির সোপানে নিয়ে যায় বটে কিন্তু যে নিজের জীবনটাকেই উৎসর্গ করেছে অন্যদের জন্য তার কাছে উন্নতি করা বা প্রমোশন পাওয়া একটা তুচ্ছ ব্যাপার। এদের জীবনে কি প্রেম আসেনা? অবশ্যই আসে কিন্তু এই প্রেম করা বা সংসার করা তাদের কাছে একটা বিলাসিতা করার মতো। সময় কোথায় তার যেখানে অনেক লোক সেই সময়ের জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে?  কাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে, কাকে পরীক্ষার হলে পৌঁছে দিতে হবে, কার বাড়িতে কেউ মারা গেছেন, তার সৎকারের ব্যবস্থা , এইসব করতে গিয়ে নিজের দিকটাই আর ভাল করে দেখা হলো না। কিন্তু পাড়ার কিছু ভদ্রলোক তো সবসময়ই থাকেন যাঁরা তার শুভাকাঙ্ক্ষী, তাঁদের ই একজন মোমের বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। মোম তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করত এবং তাঁর কথা ফেলতে না পেরে বিয়ের পিঁড়িতে বসল। 
বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেল। বাবা, কাকা, পিসি সবাই একে একে চলে গেছেন, ভাই ও কাজের সূত্রে অনেক দূরে রয়েছে, একদিন মোম নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ল কিন্তু আরেকজন মোম তো আশেপাশে নেই যে তাকে নিয়ে যাবে হাসপাতালে। মোমের স্ত্রী পাড়ায় অনেকের খোঁজ করলেন কিন্তু এই বিপদের দিনে কাউকেই পেলেন না পাশে, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই মোম চলে গেল " না ফেরার দেশে।" এই মোমরাই নিজেকে নিঃশেষ করে অন্যদের আলো দেখায় , প্রতিদানে সে কিছুই চায়না। কিন্তু মোমের সঙ্গে যারা জড়িয়ে আছে, তারা কি প্রতিদানে কিছু আশা করতে পারে না?  বটের ছায়ায় আর একটা বট গাছ হয়না। একটা এলাকায় একজন মোম ই হয় যারা নিজেকে নিঃশেষ করে অন্যদের উপকার করে। পূজো প্যাণ্ডেলে মারা যাওয়ার প্রথম বছরে হাসিমুখে মোমের ছবিতে একটা মালা , নীচে নাম লেখা মনোময় চট্টরাজ, বন্ধনীর মধ্যে ছোট্ট করে লেখা মোম, নীচে জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ দেওয়া।
পরের বছর আবার পূজো এল, ক্লাবে আর কোন ছবি দেখা গেল না। এক সময় মোমদার কথা ছাড়া কিছুই হতো না আর এক বছর বাদেই ছবিটা অন্য রকম। এটাই জগতের নিয়ম। যতক্ষণ তুমি আছ, ততক্ষণ ই তোমাকে নিয়ে নাচানাচি, আর ভুলে যেতে মানুষের বেশী সময় লাগে না। মোম দা, সত্যিই তুমি মোমবাতি, নিজেকে জ্বালিয়ে অন্যদের আলো দেখিয়েছ, আজ তুমি নেই আলো জ্বালানোর ও কেউ নেই। যেখানেই থাকো, ভাল থেকো।

Friday, 5 September 2025

শিক্ষক দিবসে গুরু প্রণাম

আজ পাঁচ ই সেপ্টেম্বর, শিক্ষক দিবস হিসেবে আজ বিশেষ সমারোহে দেশব্যাপী উৎসবে মাতোয়ারা। আজ এই বিশেষ দিনে বিভিন্ন ব্যক্তি তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন। একঘেয়েমি যাতে না আসে সেই কারণেই এই বিষয়ে কিছু বক্তব্য রাখতে গেলে একটু ভিন্ন কি লেখা যায় তা নিয়ে বিশেষ চিন্তায় রয়েছি।
প্রথম থেকে শুরু করতে গেলে অনেক নাম এসে ভিড় করে, সুতরাং বিশেষ কয়েকজনের সম্বন্ধেই লিখতে হবে নাহলে লিখতে লিখতে শিক্ষক দিবসটাই শেষ হয়ে যাবে। বাড়িতে প্রথম গুরু বাবা ও মাকে বাদ দিলে মনে পড়ে বড়দির ( জ্যাঠামশাইয়ের মা) কথা যাঁর  কথা না বললে ভীষণ  অসম্পূর্ণ হয়ে যাবে। মালা জপতে জপতে কখন যে গল্প বলার মাঝে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন তা জানতেই পারতাম না। ঠাকুমা আমার ভয়ানক রাশভারী ছিলেন এবং যত ই বয়স কম হোক না কেন বেচাল দেখলে এমন ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকাতেন ভয়ে পালাতে পারলে বাঁচি। আর বড়দি ঠিক উল্টো, বাড়ির সব বাচ্চারাই তাঁর বড় ন্যাওটা। গল্প বলা বিশেষ করে বাচ্চাদের সামনে উপস্থাপন করা তাদের লেভেলে গিয়ে সে এক ভয়ানক কঠিন কাজ। কি যে গল্প বলতেন যা ঠাকুরমার ঝুলি বা ঠাকুর্দার থলিতেও পাওয়া যেত না। খানিকটা নিজে বানিয়ে বানিয়ে বলতেন হয়তো। কি অসাধারণ প্রতিভাময়ী ছিলেন , গল্পের যোগসূত্র কখনোই ছিন্ন হতোনা। আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের সব  বাচ্চারাই তাঁর চারপাশে ঘিরে থাকতো। সবার মধ্যে আমার ও ছোড়দির একটা বিশেষ স্থান ছিল তাঁর হৃদয়ে।
বয়স একটু বাড়তেই বাড়ির কাছেই স্বর্গধামে ভর্তি করে দিল ক্লাস ওয়ানে। তখন তো আর নার্শারী বা প্রিপারেটরি বলে কিছু ছিল না, সরাসরি ক্লাস ওয়ানে। সেখানে ঊর্মিলা দির সদা হাস্যমুখ বাচ্চাদের জন্য এক আদর্শ জিনিস কিন্তু একজন দাদু মাস্টারের ক্লাস ফোরের ছেলেকে প্রচণ্ড মারধর স্কুলে যাওয়াকে এক ভীতির পর্যায়ে নিয়ে গেল। দুটো বাড়ির পরেই তৃতীয় বাড়িটাই স্বর্গধাম স্কুল কিন্তু আমার ঐদিন থেকে স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। বাবা, মা ,দিদিরা মায় ঊর্মিলা দি পর্যন্ত বাড়ি এসে নিয়ে যেতে চাইলেও স্কুল যাওয়া আমার নেই। বাড়ির সবাই প্রমাদ গণলো ,ভাবল এর দ্বারা লেখাপড়া কিছুই হবেনা, কোন মুদীর দোকানে কাজ করে খেতে হবে। কিন্তু বড়দির সেই ভালবাসা মেশানো গল্পের ফাঁকে ফাঁকে নানান জিনিস পড়িয়ে দেওয়া ছবিটাই পাল্টে দিল। পরের বছর শহরের সবচেয়ে নামী স্কুল পাঁচ থাম( স্তম্ভ) ওয়ালা রাজবাড়ির মতো দোতলা স্কুলের প্রাইমারি সেকশনে ক্লাস থ্রি তে ভর্তি করে দিল। বাবলি বাবু( হেড মাস্টার মশাই), কন্দর্প বাবু, হীরেন বাবু ও তাঁর ভাই রমেন বাবু এবং ডিস্ট্রিক্ট ইন্সপেক্টর অব স্কুলসের ছেলে দিলীপ অধিকারী। বাবলি বাবু খুব  ভাল গান করতেন এবং ক্ল্যাসিকাল গান শেখাতেন। সকাল বেলায় স্কুল, টিফিন দেওয়া হতো, হঠাৎ কি একটা কারণে স্কুলে টিফিন দেওয়া বন্ধ হয়ে গেল। সবসময়েই কিছু পাকা দাদা টাইপের ছেলে থাকে। এঁরা হয়তো সময়ের থেকে একটু বেশি এগিয়ে থাকায় পড়াশোনায় তেমন কিছু করে উঠতে পারেনা। তখন শীতকাল, সুশান্তর গায়ের চাদর টা সামনে সুশান্তর সঙ্গে হাত লাগিয়েছে তপন এবং পিছনে আরও দুজন চারটে কোণ ধরে " টিফিন দেওয়া বন্ধ করা চলবে না, চলবে না" শ্লোগান দিতে দিতে বিশাল করিডরে খুদেদের মিছিল চলছে, হঠাৎ ই কে বলে উঠল হেডমাস্টার মশাই আসছেন। এক মূহুর্তে মিছিল ভোঁ ভাঁ। সবাই দৌড়ে পালিয়েছে, আমি আর দীপক পালাতে পারিনি মানে পালাতে গিয়ে পায়ে পা জড়িয়ে পড়ে গেছি আর শাস্তি হলো বেঞ্চের উপর কান ধরে দাঁড়ানো। তখন থেকেই ঠিক করেছি যে প্রাণ চলে যাক, যত ই ভীতুর ডিম বলুক লোকে , মিছিলে আর হাঁটব না। আজকের দিনেও মিছিলে নেতাদের গায়ে চট করে হাত পড়েনা, চ্যালা চামুণ্ডাগুলোই পুলিশের লাঠি বা কাঁদানে গ্যাস বা জল কামানের শিকার হয়। নেতাদের বলা হয় চলুন, এবার গাড়িতে উঠুন। আর কিছু কুচো কাচা নেতা যাদের স্বপ্ন ই হচ্ছে নেতা হয়ে পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার, তারা পুলিশকে বলে স্যার আমাকেও একটু গাড়িতে ধরে তুলুন না। আর জায়গা নেই বললে হাতে পায়ে ধরে প্রায় কান্নাকাটি করে পুলিশ স্যারকে বলে গাড়িতে উঠে পড়ে। চিত্র সাংবাদিক ফটো তুললে ইশারায় তার ফটোটা যেন আসে এই অনুরোধ করে কারণ ওটাই হবে ভবিষ্যতের উত্থানের চাবিকাঠি।
কান ধরে বেঞ্চের উপর দাঁড়ানোর খবর বাড়িতে পৌঁছে গেছে আর বাড়ি ঢোকা মাত্রই রান্নাঘরের ডাঁটিসার পাখার বাড়ি জুটল কপালে। সেই দিন থেকে দু দুবার প্রচণ্ড অপমানের শিকার হয়ে আমি হলাম ভীতু সম্প্রদায়ভুক্ত।
বৃত্তি পরীক্ষা হলো, কোনদিন ই বৃত্তি পাওয়ার যোগ্য ছিলাম না তবে কাউকে ধরা করা না করেই উৎরে যেতাম। ক্লাস ফাইভে একজন বিশাল চেহারার মাস্টার মশাই এলেন ক্লাস টিচার হয়ে। তিনি আবার নাকি অঙ্ক করাবেন। অসম্ভব বেশি রকম পান খেতেন বলে কথাও কিছু বোঝার উপায় ছিল না আর সারা শরীরে ছিল অসম্ভব বেশি লোম। সব ছেলেরা ওঁকে বলত ভালুক স্যার। ভালুক স্যারের উপদ্রব বেশীদিন সইতে হয়নি কিন্তু অঙ্কের ভাল মাস্টার মশাই পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি এবং যথারীতি সব বিষয়ে মোটামুটি ভাল নম্বর পেলেও অঙ্কে কোনরকমে পাশ করলেই দাদু হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন। বাড়িতে দাদুর কাছে বীজগণিত ও ইংরেজির প্রশিক্ষণ পেতাম। তখন দাদু অসুস্থ, বাড়িতেই  দাদুকে স্যালাইন ও রক্ত দেওয়া হচ্ছে । কোন সময় ডান হাত আর কোন সময় বাঁ হাতে দেওয়া হচ্ছে । দাদু খেতেন  চুরুট । নিজের  হাতে ধরে চুরুট  খেতে না পেরে আমাকে  ডাকতেন এবং  চুরুট  ধরিয়ে ঠোঁটে কয়েকটা টান দিয়ে  কম্পালসরি মিলিটারি ট্রেনিং  রচনা লেখায় ডিকটেশন দিতেন। অসাধারণ স্মৃতি শক্তি । মিল্টনের  লিসিডাস মুখস্থ বলতেন । শেক্সপিয়ার আওড়াতেন। মারা যাওয়ার  আগের  দিন  পর্যন্ত উনি ডিকটেশন দিয়ে  গেছেন ।             ক্লাস  সিক্সে খগেন বাবু ক্লাস টিচার হলেন। খুবই ভাল মাস্টার মশাই। ইংরেজি ও ইতিহাসে এম এ পাশ করা খগেনবাবু সত্যিই আদর্শ মাস্টার মশাই। সিস্টেমেটিক ভাবে পড়ানোর জন্য ছাত্ররা সবাই ভাল রেজাল্ট করল এবং অবশ্যই একজন আদর্শ মাস্টার মশাই। স্কুলে বিভিন্ন রকম ছাত্র থাকে যারা  মাস্টার মশাইদের নাম বিকৃত করে অন্য নামে ডাকে। সেই স্যাররাও জানতেন কিন্তু লজ্জার মাথা খেয়ে কিছু বলতেন না। কোন একজন মাস্টার মশাই ক্লাসে ঢুকলেই হিস করে শব্দ শুরু হতো মানে ওঁর কথাবার্তা সবসময়ই এমন লেভেলে থাকতো যে ছাত্ররা গুল মারছেন বা গ্যাস দিচ্ছেন  বলে হিস করে শব্দ করতো। স্যার ক্লাসে ঢোকামাত্র ই যদি চারপাশ থেকে হিস হিস করে শব্দ আসে তাহলে উনি কি করে পড়াবেন?  স্যাররাও জানতেন যে  কে বা কারা করছে কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তাদের ঘাঁটাতেন না। একজন স্যারকে চাচা বলে ডাকতো এই বাঁদর গুলো। সবসময় কি মাথার ঠিক থাকে? রাগের চোটে বলে দিলেন বাবা বলে ডাকতে পারিস না? মুশকিল হলো এই কয়েকটা বাঁদর ছেলেদের জন্য আমার মতো বেশীরভাগ ভীতু সম্প্রদায়ভুক্ত ছাত্ররা ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কিন্তু কোন কোন মাস্টার মশাই ছিলেন যাঁদের উপস্থিতি সম্ভ্রম জোগাত। যেমন পার্সোনালিটি তেমনই পড়ানো। তাঁদের কোন ব্যাঙ্গ বিদ্রূপের সম্মুখীন হতে হয়নি। নিত্যহরি বাবু, কাবলি বাবু( রণেন), নারায়ন বাবু, বিজয় বাবু, পচন বাবু( কিশোরী মোহন সরকার ),রাখহরি বাবু, সমাদ্দার বাবুরা এই গোত্রীয়। এঁদের জন্য স্কুল থেকে প্রত্যেক বছরই জেলায় প্রথম এবং সারা বাংলায় উজ্জ্বল স্থান অধিকার করতো। 
কলেজেও বিভিন্ন বিভাগে নামকরা অধ্যাপকরা ছিলেন। আমাদের রসায়ন বিভাগের ধীরেন্দ্রনাথ রায়, জিতেন চন্দ, আশীষ চ্যাটার্জি, রাধেশ্যাম মণ্ডল , খগেন কর্মকার, নির্মল সরকার ও সুশীল সান্যাল আলো করে ছিলেন। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে জিতেন মুখার্জি, সুশীল সেন, দিলীপ কর, বীরেশ্বর বন্দোপাধ্যায়রা এক একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। অঙ্কে কৃতান্ত বসু , নিমাই চাঁদ বোলার, অসীম ধর, রাজকৃষ্ণ মাল ও বিজয় বিশ্বাস পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং অত্যন্ত উঁচুমানের অধ্যাপক ছিলেন যাঁদের সাহচর্য আমাদের ভবিষ্যত গড়ে দিয়েছে। ঠিক সেইরকম বিশ্ববিদ্যালয়ে অরুণাভ মজুমদারের অসাধারণ সহায়তা জীবনকে সম্পৃক্ত করেছে। 
কর্মজীবনেও শ্যামল ধর,  এন সুব্বা রাও, জে সুব্বা রাও এবং দীনকর রাও  ,অশোক ভট্টাচার্য  এবং রামাইয়া স্যারের সামনে থেকে কি করে পরিচালনা  করতে হয় তা শিখতে পেরেছি এবং সবার কাছেই আমি আমার কৃতজ্ঞতা জানাই। এইরকম গুরু বা মাস্টার মশাই ছাড়া নিজেকে যে জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছি তা কখনোই সম্ভব হতো না। তাঁদের সবাইকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।

Friday, 22 August 2025

পাণ্ডবদের বড়ঘুটু অভিযান

বিশাখাপটনমের পঞ্চপাণ্ডবরা কেরালা সফরের পরেই কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। বয়সজনিত কারণে তারা সেই আগের মতো মন হলেই বেরিয়ে পড়তে পারছেন না। অর্জুন ও গাণ্ডীব নিয়ে সেইরকম টঙ্কার দিতে পারছেন না। এই নাটকের দলের কুশীলবরা বয়সের ভারে কেমন যেন ন্যূব্জ কুব্জ হয়ে পড়েছেন বা জীবনের নানান সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছেন এবং প্রাথমিকতাও স্বাভাবিক ভাবেই বদলে যাচ্ছে। যুধিষ্ঠির এবং তাঁর ভার্যা দেবিকার দুইজনেরই হাঁটু প্রতিস্থাপন হয়েছে, ভগ্নী দুঃশলা যিনি যুধিষ্ঠিরের সঙ্গেই থাকতেন তাঁর ও নিম্নাঙ্গ অবশ হয়ে গেছে, ভীম ও ভালন্ধারা কেরালা সফরের পরেই অসুস্থতার কারণে গদা সঞ্চালনে প্রায় অক্ষম, অর্জুন ও অপারেশনের পরে গাণ্ডীবের টঙ্কারে সেইরকম ভীতি সঞ্চার না করলেও অনেকটাই পুরনো ফর্মে ফিরে এসেছেন। সুভদ্রাই বা কেন পিছিয়ে থাকবেন, তাঁর ও অপারেশন হয়েছে। নকুলের গলব্লাডার অপারেশন ও কারেনুমতির হাঁটু প্রতিস্থাপন ও সহদেবের হাঁটু প্রতিস্থাপন হয়েছে কিন্তু তিনি কিছুটা হলেও সামলে উঠেছেন। অতএব কোন নতুন নাটক মঞ্চস্থ করতে গেলে যুধিষ্ঠির ও ভীমের বদলি চাই ই চাই। গতবছর ২১শে আগস্ট আরাকুভ্যালি অভিযানে যুধিষ্ঠির, দেবিকা, ভীম ও ভালন্ধারার বদলি পাওয়া না গেলেও  পাওয়া গিয়েছিল কৃষ্ণ ও রুক্মিণী  এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন ও ধানুমতীকে কিন্তু দুঃশলা বোনের বদলি না পাওয়ায় চিত্রনাট্যে কিছু রদবদল করতে হয়েছিল এবং সহোদর জায়া বিজয়া ও সুদূর আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছিলেন। নকুল ও কারেনুমতিও সেই অভিযানে ছিলেন না এবং এবার ও সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহেই আমেরিকার উদ্দেশ্যে আকাশ মার্গে যাত্রা করবেন। আমেরিকা থেকে সদ্যফেরত অর্জুন ও সুভদ্রার উপর একটা বাড়তি চাপ স্বভাবতই রয়েছে কোন অভিযানের পরিকল্পনা করা নিয়ে। বরাবরের মতই পাণ্ডবত্রাতা বিচক্ষণ অর্জুন সহদেবকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভ্রমণ সহায়ক বিভাগের ডালহৌসি স্কোয়ারের অফিসে। পরিকল্পনা ছিল দুর্গাপুর নিবাসী ধৃষ্টদ্যুম্নকে নিয়ে মাইথন অভিযানে কিন্তু মনোমত গেস্ট হাউস না পাওয়ায় লালমাটির দেশ মুকুট মনিপুরের অদূরে বড়ঘুটু অতিথি নিবাসে ব্যবস্থা হলো ২০শে আগস্ট একদিনের জন্য। মুকুটমনিপুরের কথা মনে পড়তেই কার যেন লেখা কয়েকটি ছন্দোবদ্ধ শব্দ মনে পড়ে গেল ,
"বাঁধের জলে ভোরের আকাশ ,
বৃষ্টি সবুজ জংলা দুপুর,
লালমাটিতে সন্ধ্যে মেশে,
ধামসা মাদল সাঁওতালি সুর,
ঘরের কাছেই মোটেই না দূর,
চলুন এবার মুকুট মনিপুর।"
দেখতে দেখতে ছয়টা বছর কিভাবে কেটে গেছে জানিনা, তবে স্মৃতিতে এখনও যথেষ্ট সতেজ। পিয়ারলেস গেস্ট হাউসে ভীম ও ভালন্ধারাকে একটা কটেজে ঢুকিয়ে দিয়ে দেবিকা, সুভদ্রা, বিজয়া ও দুঃশলা একটা বড় ঘরে এবং যুধিষ্ঠির, অর্জুন ও সহদেব আরও একটি ঘরে দারুণ আনন্দে রাত কাটিয়েছিল। সকাল বেলায় চায়ের আসর দেবিকা, বিজয়া ও সুভদ্রাদের ঘরে বসেছিল এবং যথারীতি দুঃশলা চায়ের সঙ্গে বিস্কুট ও কেকের ব্যবস্থা করেছিল। আগের দিন রাতে অনেক রাত অবধি হাউসি খেলা তাদের ঘুমের মাত্রা কমিয়ে দিলেও উৎসাহে কিন্তু এতটুকু ভাটা পড়েনি। জলখাবার খেয়েই মুকুটমনিপুরের নদীর জলে নৌকা বিহার ছিল এক আলাদা অভিজ্ঞতা। এই স্মৃতি মনে পড়তেই গুনগুন করে গানের কলি মনে পড়ে গেল," অলি বারবার ফিরে আসে, অলি বারবার ফিরে যায়।" মুকুটমনিপু্রের কাছেই এই বড়ঘুটু অতিথি নিবাস।
তাই বেশ, নাই মামার চাইতে তো কানা মামা ভাল। 
অর্জুনের ব্যবস্থাপনা একদম ঠিকঠাক। ২০শে আগস্ট গাড়িতে বসে সকাল ৬টায় রওনা দিয়ে ৬টা বেজে ২০ মিনিটে সহদেবকে তুলে৬টা ৪৫ মিনিটে নকুল ও কারেনুমতিকে তোলা হলো। এরপর ধানুমতিকে (ধৃষ্টদ্যুম্ন জায়া )তুলে যাত্রা শুরু হলো দুর্গাপুরের পথে যেখানে আছেন ধৃষ্টদ্যুম্ন । বিজয়া মেয়ের কাছে ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকার জন্য এবং কৃষ্ণ ও রুক্মিণীর ঐদিন ই আমেরিকার পথে যাত্রা করার জন্য এই বড়ঘুটু অভিযানে সামিল হননি। প্রাতরাশ সারার জন্য বাছাই হলো গুড়াপস্থিত হিন্দুস্তান ধাবা। আলুর পরোটা ও লুচির মতো পুরি ও ছোলার ডাল এবং মিষ্টি ও চা দিয়ে প্রাতরাশ সেরে দুর্গাপুরের পথে ধৃষ্টদ্যুম্নকে তোলার ব্যবস্থা হলো এবং বড়ঘুটু পৌঁছাতে হয়ে গেল প্রায় আড়াইটা। চেক ইন করেই খেতে বসে যাওয়া। ম্যানেজার শান্তনু ঘোষকে বলেই রাখা ছিল নিরামিষ থালির কথা। ঘি, বেগুন ভাজা, মুগডালের সঙ্গে পোস্তর বড়া ও দুরকম তরকারি ও চাটনি পাঁপড় ভাজা ও মিষ্টি দিয়ে দারুণ সুস্বাদু খাবার আর তার সঙ্গে নরেন কর্মকার, ভবতোষ দেব(বাসু) ও প্রতীক দাসের আতিথেয়তা ভুলিয়ে দিল গেস্টহাউসের খামতি। সরকারি গেস্টহাউসের এইখানেই সীমাবদ্ধতা। কি করলে যে কাস্টমার আরও ভালভাবে উপভোগ করবে সেইদিকে নজর দেওয়াটা তাদের প্রাথমিকতার মধ্যে পড়ে কিনা সন্দেহ আছে। কিন্তু এইসমস্ত ছেলে বা কর্মীদের আন্তরিকতা সত্যিই মনে রাখার মতো। বুকিং করার সময় অফিসের ম্যানেজারের যা বক্তব্য তার সঙ্গে কিন্তু বিস্তর তফাৎ। যাই হোক, সূর্যাস্ত দেখার জন্য ঐ অতিথিশালার মধ্যেই টিলায় উঠতে হলো এবং নয়নাভিরাম দৃশ্য মোবাইলে ক্যামেরাবন্দী হলো। ওখানে আসা আর একজন অতিথি সাবধান করে দিলেন বিছে ও কাঁকড়াবিছে সম্বন্ধে। বেসিনের কল খুলতেই ইঞ্চি নয়েক একটা তেঁতুল বিছের ছবি দেখালেন এবং জামা কাপড় বা মোজা জুতো পরার আগে ভাল করে নে
ঝেড়ে নিতে বললেন। ভয় ধরে গেল মনে, রাতে ঘুমোচ্ছি, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল , টর্চ জ্বেলে দেখে নিলাম যে কোন বিছের আগমন হয়েছে কিনা। আমাদের ড্রাইভার জগদীশ বাইরে বেঞ্চে বসে রাতের নিস্তব্ধতা উপভোগ করছিল, হঠাৎ একটা চিরচিরে জ্বলুনি -- একটা ছোট বিছের আক্রমণ। সময়মতো সেটাকে মুক্ত করেছে বলেই বেঁচে গেল নাহলে ফিরে আসা একটা দুষ্কর কাজ হয়ে যেত। রাতে দেশী কায়দায় চিকেন কারি ও রুটি এবং শেষে মিষ্টি আলাদা মাত্রা আনল।
পরদিন সকাল। ভোরবেলা সহদেব ও ধৃষ্টদ্যুম্ন বেরিয়েছে গ্রাম দেখতে, সঙ্গে সাথী লাল্টু, পল্টু, ঘন্টু ও চুটকি। দূর থেকে আসা লোকজনদের জিজ্ঞেস করছি কোথায় চা ও বিস্কুট ( লাল্টু, পল্টুদের জন্য) পাওয়া যেতে পারে। গতকাল পৌঁছানোর পরেই ওরা আমাদের সাথী। গ্রামের জীব তো, শহরের প্যাঁচ পয়জার ওদের মধ্যে ঢোকেনি। গায়ে, মাথায় হাত বোলানোর অভ্যেসটা বন্ধু দাশুর কাছ থেকে পাওয়া। একটু ভালবাসাতেই তাদের লেজ নাড়ানোয় কমতি নেই। ধৃষ্টদ্যুম্ন গিয়ে ওপর থেকে টাকা নিয়ে এল আর আমরা একে তাকে জিজ্ঞেস করতে করতে কখন দু কিলোমিটার চলে এসেছি চায়ের তেষ্টা মেটাতে ও সঙ্গী সাথীদের বিস্কুটের চাহিদা জোগাতে। গাঁয়ের ছেলেমেয়েরা দাঁতন করছে এবং পথনির্দেশ করছে কোথায় দোকান পাওয়া যাবে। অবশেষে গ্রামের বেশ ভেতরে চলে এসেছি। চা যদিও ভাগ্যে জুটলো না কিন্তু আমাদের সহযোগীদের জন্য বিস্কুট পাওয়া গেল। তিন প্যাকেট বিস্কুট কিনে আমরা ওদের খাওয়াতে খাওয়াতে ফিরে এলাম এবং চা খেয়েই উঠলাম। স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট ( কমপ্লিমেন্টারি বা ফোঁকটে) করলাম, এককথায় দুর্দান্ত।পৌনে দশটা নাগাদ মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম এবং কাঁসাই শিলাই এর সঙ্গমস্থলে এলাম এবং বাঁধের ওপর উঠে নয়নাভিরাম দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করে রওনা দিলাম দুর্গাপুরের উদ্দেশ্যে। মাঝপথে শুরু  হলো বৃষ্টি এবং তার নাচন কোঁদনে রীতিমতো  ভয় ধরে গেল। দেখতে দেখতে দু্র্গাপু্র এসে গেল। ধৃষ্টদ্যুম্ন আর ধানুমতী লাঞ্চ সেরে ওখানেই থেকে গেল আর অর্জুন, সুভদ্রা, নকুল, কারেনুমতি ও সহদেব ফিরে এল কলকাতায়। ছোট্ট অথচ নিটোল অভিযান,মনে রাখার মতো।

Sunday, 17 August 2025

দাসুর পশুপ্রেম

মফস্বলের ছেলে দাশু একেবারে এলেবেলে ছেলে না হলেও খুব ভাল কিছু ও নয়। মোটামুটি ভাবে পাশ করে যায়। একটু হাঁফালো চেহারা বলে বন্ধুদের উপর খবরদারি করা স্বভাব আছে। তবে মনটা বেশ ভাল আর পশুপাখির প্রতি ওর একটা স্বভাবসিদ্ধ প্রেম বা আকর্ষণ আছে। ছোটবেলায় কোন স্যার পড়িয়েছিলেন "বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর
জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর" ওর মনে ভীষণ ভাবে গেঁথে গিয়েছিল। ছোট থেকেই একটু ক্যাবলা গোছের দাশু পকেটে মুড়ি কিংবা বিস্কুট নিয়ে বেরোত এবং পাড়ার কুকুর লালু, ভোলা, টমি ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গোরা সব ওর পিছন পিছন চলত এবং নিজেদের সীমানা অবধি তো যেত ই , দলবেঁধে অন্যদের ডেরায় ও কখনো সখনো চলে যেত। অনেকেই ওকে ঠাট্টা করে বলতো হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা। কিন্তু সাদাসিধে টাইপের দাশু কিছু মনে করতো না, বরঞ্চ কুকুর বিড়াল বা পশুপাখির মধ্যেই যেন ও ভাল থাকত কারণ অন্য বন্ধুরা ওকে দেখলেই টিটকারী মারত যেটা ওর পছন্দের ছিলনা এবং প্রতিবাদ করলেই ঝগড়াঝাঁটি এবং কোন কোন সময় তা হাতাহাতির পর্যায়েও চলে যেত। তার থেকে ঢের গুনে ভাল এই অবলা জীবজন্তুগুলোর মধ্যে থাকা।  এই পৃথিবীতে সবাই একটু গুরুত্ব পেতে চায়, দাশুই বা তার ব্যতিক্রম কিভাবে হবে? লালু, ভোলা, টমিরা কোন প্রতিবাদ করেনা, ওরা মাঝেমধ্যে একটু মুড়ি বা বিস্কুট পেয়েই সন্তুষ্ট। ওপর বয়সী অন্য ছেলেরা কুকুর দেখলেই ইটের টুকরো তাক করে ছুঁড়ত আর কখনো পায়ে বা গায়ে লাগলে কাঁই কাঁই করে আর্তনাদ করত আর ওদের আর্তনাদ শুনলেই দাশু ঠিক থাকতে না পেরে তাড়া করত যে ঢিল ছুঁড়েছে তার প্রতি এবং তাকে পাকড়াও করে দুচার থাপ্পড় লাগিয়ে দিত। আর এই কারণেই এসব সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে লেগে যেত ঝগড়া। তাদের সবার অনুযোগ যে পাড়ার সব কুকুরগুলোই কি দাশুর যে ওদের ঢিল মারলেই দাশু ফিরে আসবে মারতে? আর দাশুর বক্তব্য ছিল ঐ ঢিলটা যদি তাদের মারা যায় তাহলে ওদের কি লাগবে না? তাহলে শুধু শুধু কেন ঢিল ছোঁড়া তাদের প্রতি যখন তারা কোন দোষ করেনি?

আজ ষাট পঁয়ষট্টি বছর পরে এই তরজা আজ দেশ জুড়ে। সারমেয়প্রেমী বনাম সারমেয় বিদ্বেষী বা নিরপেক্ষ, পৌঁছেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দরজায় এবং আদালত রায় দিয়েছেন যে সারমেয়কুলকে রাস্তাঘাটে যথেচ্ছভাবে চলাফেরা করতে দেওয়া হবেনা এবং তাদের একটা বিশেষ জায়গায় রাখতে হবে যার নাম হবে সারমেয় নগর। সেখানে আর কেউ থাকবে না দাশু, হরি বা বাবলারা যারা ওদের বিস্কুট ভেঙে খাওয়াবে বা মুড়ি বা অন্যান্য খাবার খাওয়াবে।  যেখানে সবাই কুকুর সেখানে নিশ্চয়ই এলাকা দখল থাকবে যেমন মানুষের মধ্যে এক মস্তান বনাম আর এক মস্তান থাকে। মানুষের মধ্যে না হয় বিবাদ মেটানোর জন্য কাউন্সিলর বা বিধায়ক বা বেশি বাড়াবাড়ি হলে থানা, পুলিশ বা মহামান্য বিচারপতি হস্তক্ষেপ করতে পারেন কিন্তু সারমেয় খুলে বিবাদ হলে মিউনিসিপ্যালিটি বা কর্পোরেশনের পক্ষে দায়িত্বে থাকা লোকজন সেটাকে সামলাবেন না কেল্লা ফতে করার জন্য বিষ প্রয়োগ করে তাদের সরিয়ে দেবেন?  মানুষ যখন কাজ করতে হবে বলে করে, তখন তা হয় দায়সারা আর যদি সে অন্তরের ভালবাসা মিশিয়ে কাজটা করে তখন তার মাত্রা হয় আলাদা।

দাশু আর ইহজগতে নেই। থাকলে নিশ্চয়ই এই কাজের দায়িত্ব সে নিজে চেয়ে নিত এটা হলফ করে বলতে পারি। দাশু কিন্তু দু দুবার চৌদ্দটা করে আটাশটা ইঞ্জেকশন নিয়েছে এ সারমেয়দের কামড়ে। প্রথমবার বন্ধু দীপকের বাড়ি থেকে গল্পের বই আনতে গিয়ে ফকির কাকার কুকুরের কামড় খেয়ে। হাসপাতালের কম্পাউন্ডার পবিত্র বাবুর কুকুর কুকুর ডাকে সচকিত হয়ে হাফপ্যান্টের বোতামটা আলগা করে নাভির নিচে নামিয়ে পুটুশ করে ইঞ্জেকশন নিত আর পেটের ঐ জায়গাটা ছোট্ট টমেটোর মতো ফুলে উঠত। দ্বিতীয়বার যখন দাশুর কপালে জোটে কামড় তখন সে রীতিমতো যুবক। ভবানীপুরে শ্বশুরবাড়িতে বৌ ছেলেকে নামিয়ে দিয়ে মিত্রস্কূলের সামনে বাস স্টপে দাঁড়িয়ে আছে অফিস যাওয়ার জন্য। হঠাৎ ই এসপ্ল্যনেডগামী একটা মিনি বাস অনেক ভিড় থাকার জন্য ঐ স্টপে না থেমে স্পীড বাড়িয়ে চলে যাওয়ার মুখে একটা কুকুরের দুর্মতি  হয় রাস্তা পেরোনোর জন্য এবং অবধারিত ভাবে ধাক্কা খেয়ে বোঁ বোঁ করে ঘুরতে ঘুরতে মিনিবাসের সামনের চাকার ডানদিকে নিজের পেটটা চেপে ধরে যেমন আমাদের কোন জায়গায় ধাক্কা লাগলে বা কেটে গেলে আমরা সেই জায়গাটা চেপে ধরি। মিনিবাসটা ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে থেমে গেছে। রাস্তায় এত লোক কিন্তু দাশু গেল এগিয়ে , দুহাত দিয়ে আস্তে করে কুকুরটাকে সরিয়ে দিয়ে পাশে থাকা টিউবওয়েল থেকে আঁজলভরে জল নিয়ে কুকুরের মুখে দিতে গেল আর কুকুরটা জল খেয়ে মারা যাওয়ার আগে ওর বাঁ হাতে ব্যথার চোটে কামড়ে দিল অবশ্যই বুঝতে না পেরে। কোমড়ের উপর কামড় ,অতএব দশ মিলিমিটার করে ফের চৌদ্দটা ইঞ্জেকশন। কিন্তু এ সত্ত্বেও দাশুর সারমেয় প্রীতি বিন্দুমাত্র কমেনি বরং বেড়েছে। শুধু কুকুর ই নয়, বিড়াল বা অন্যান্য পশুপাখির প্রতি ওর বিশেষ ভালবাসা সবসময়ই চোখে পড়ত। কিন্তু দাশু আজ আর নেই। বেঁচে থাকলে সুপ্রিম কোর্টের এই  আদেশ নিয়ে যে ওর কি প্রতিক্রিয়া হতো তা ভাবতেও পারছিনা।
কথায় আছে ন্যাড়া বেলতলায় যায় একবার কিন্তু দাশুরা যায় বারবার। পৃথিবীতে এইরকম দাশু না থাকলে  একেবারে বিবর্ণময় হয়ে যাবে।

Tuesday, 12 August 2025

বিনিময়

প্রত্যেক জীবজন্তুই কিছু প্রত্যাশা করে, কোন কাজের বিনিময়ে টাকা কিংবা প্রশংসা বা টাকার বিনিময়ে কিছু কাজের বরাত যেটাকে একটু খারাপ ভাবে বললে শোনায় ঘুষ বা ভালভাবে বিচার করলে বলা যায় ভালবাসার বিনিময়ে ভালবাসা বা স্নেহের বিনিময়ে শ্রদ্ধা। যদিও গীতায় লেখা আছে কাজ করে যাও কোন ফলের আশা না করেই। এটা যত সহজে বলা যায় বাস্তবে ততটাই কঠিন। সৎকর্ম করে যদি তার স্বীকৃতি না পাওয়া যায় তাহলে সে কতদিন সেই ধরণের কাজ করবে তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বর্তমান পৃথিবীতে সবাই যখন নিজের লাভের জন্য ছুটছে তখন মুষ্টিমেয় কিছু নির্লোভ লোক তাতে বিরত থাকবে এটা আশা করা একটা বাতুলতা মাত্র। তবুও কিছু লোক নিশ্চয়ই রয়েছেন যাঁরা গীতার বাণী অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন এবং হয়তো তাঁদের জন্যই এই কথাটা " কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন" এখনও লোকের মুখে শোনা যায়। অনেকেই গীতার বাণী কথায় কথায় উদ্ধৃত করেন কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে কতটা মেনে চলেন তাতে ঘোর সন্দেহ আছে। তবু একটা কিছু শক্ত খুঁটি দরকার যাকে কেন্দ্র করে গরু ছাগলরা চরে খেতে পারে কিন্তু বৃত্তের বাইরে যেতে পারেনা। খুঁটি যদি শক্ত না হয় তাহলে চরতে চরতে টানে খুঁটিটাই উপড়ে যাবে এবং সবকিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে যাবে। সমুদ্রের ধারে পাহাড়ের গায়ে ঢেউগুলো আছড়ে পড়ে এবং ফিরে আসে দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে কিন্তু পাহাড় অটল অবিচল, দাঁড়িয়ে থাকে আর মৃদু মৃদু হাসে। ধর্মগ্রন্থগুলো ও অনেক টা সেই রকম, আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় কি করা উচিত আর কি না করা।
আমরা পড়ি এই ধর্মগ্রন্থ কিন্তু কতটা মেনে চলি তা আমাদের আধারের উপর নির্ভর করে। এই আধারটাও তৈরী হয় আমরা কিভাবে মানুষ হচ্ছি তার উপর। যে বাড়ির বড় মানুষদের মূল্যবোধ প্রবল সেখানে ছেলেমেয়েরা ও সেই গুণ সবটা না হলেও কিছুটা আত্মস্থ করে। তবে কি চোরের ছেলে ভাল মানুষ হয়না? নিশ্চয়ই হয় কারণ পাঁকেই পদ্মফুল ফোটে। অনেকেই আছেন যাঁরা কথায় কথায় ধর্মগ্রন্থের বাণী বা শ্লোক উচ্চারণ করেন কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তাঁদের আচরণ বিপরীত। তাঁদের জন্য এই কথাটা উপযুক্ত," আমি যা বলছি তাই কর কিন্তু আমি যা করছি তার কোর না।" এঁরা হচ্ছেন ভণ্ড এবং এঁদের আধিক্য ই চতুর্দিকে বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে।
কিন্তু তা বলে কি নিঃস্বার্থপর লোকজন নেই? অবশ্যই আছেন যদিও সংখ্যায় ভীষণ কম। এঁদের জন্য সম্মান ছাড়া আর কিছুই নেই কিন্তু এঁরা কে সম্মান দিল বা দিল না তার তোয়াক্কা করেন না এবং নিজেদের কর্মপথে অবিচল থাকেন। আর এঁদের জন্য ই পৃথিবী এখনও সচল। এঁরা অনেকটা সূর্যের মতন। সূর্য যেমন তার প্রভা দিয়ে পৃথিবীর ৮০০ কোটি মানুষের বেঁচে থাকতে সাহায্য করেও বিনিময়ে কিছুই চায়না এঁরা ও সেইরকম কারো কাছে কোন কিছু প্রত্যাশা না করেই নিজেদের কাজ করে যান। ভগবান এঁদের বাঁচিয়ে রাখুন।

Monday, 28 July 2025

পিতিবেশী

প্রতিবেশী শব্দটা অপভ্রংশ হয়ে পিতিবেশী হয়েছেন আমার ঠাকুমার ( আমরা দাদি বলতাম) কল্যাণে। জমিদার কন্যা ব্রিটিশ আমলে জজসাহেবের পুত্রবধূ, যাঁর স্বামী ও ব্রিটিশ সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যাঁকে অফিস নিয়ে যাওয়া বা বাড়িতে আসার সময় চোগা চাপকান ও পাগড়ি পরিহিত বিরাট গোঁফ ওয়ালা সান্ত্রী আসতো তাঁর মেজাজ তো থাকবেই। ঠাকু্র্দা( আমরা দাদু বলতাম) যত ই রাশভারী হোন না কেন বাড়িতে দাদির কথাই শেষ কথা। ওখানে কারো ট্যাঁ ফোঁ চলবে না , দাদু তখন কেঁচো। আসতে আসতে বড় হচ্ছি, শব্দটা কানে বেসুরো ঠেকতো বলে দাদিকে বললাম," তুমি পিতিবেশী পিতিবেশী বল কেন, প্রতিবেশী বলতে পারোনা?"  অন্য কোন নাতি নাতনীদের কাছে এরকম কথা শুনলে দাদির ঝাঁঝের চোটে তাকে তখনই বাড়ি ছাড়া হতে হতো কিন্তু সবচেয়ে ছোট বলে আমাকে একটু বেশিই ভাল বাসতেন, বলা যায় একটু বেশিই লাই দিতেন। তাই হেসে বললেন," বাবা, তোমরা স্কুলে যাচ্ছো, পড়াশোনা করছো, তোমরা বলবে এরকম কথা, আমরা তো গাঁয়ের মেয়ে, আমরা তো অত পড়াশোনা করিনি ,আমি ঐটাই বলব। " জেদ এটাকেই বলে। বাড়ির অন্য কেউ এই কথা বলে পার পেয়ে যেত না।
পাড়ার কোন ছেলে মেয়ে হুটহাট বাড়িতে ঢুকলে যদি দাদির নজরে পড়ত তাহলে আর রক্ষা নেই, চেঁচিয়ে তার গুষ্টির ষষ্টি পূজো করে দিত। সবাই এক কথায় বলতো দজ্জাল মহিলা। কিন্তু এই দাদিই ছিল অন্য মানুষ যদি তাঁকে জিজ্ঞেস করে কেউ কিছু করত। ছোট বেলায়  তাঁর এই দ্বৈত আচরণ কিছুতেই বোধগম্য হতো না। বাড়িতে দুটো পেয়ারা গাছ, দুটো আম গাছ, ফলের ভারে সবসময়ই নুয়ে পড়তো। টিয়া পাখি, কাঠবিড়ালি এসে পেয়ারা তলা, আমতলা আধখাওয়া ফলে ভরিয়ে দিত, তারা থোড়াই দাদিকে পাত্তা দেয়? পাড়ার ছেলেরা এসে যদি দাদির কাছে ফল পাড়ার কথা বলত, দাদি খুশী হয়ে বলত, " যাও, যত পার নিয়ে যাও " কিন্তু কিছু বদমাইশ ছেলে তো সবসময়ই থাকে, তারা চুপিসারে এসে আম বা পেয়ারা পাড়তে ভালবাসতো, আর এখানেই দাদির আপত্তি, দেখতে পেলেই চেঁচিয়ে ভেবিয়ে পাড়া মাত করে দিত। অবশ্য চুরি করে খাওয়ার মজাই আলাদা। এই দাদির কাছে বসে একদিন রাতে জিজ্ঞেস করলাম , " দাদি, এই পিতিবেশী বা প্রতিবেশী কাকে বলে?" দাদির সোজাসাপটা উত্তর , যে তোমার দরকার অদরকারে তোমার পাশে এসে দাঁড়াবে, সেই তোমার পিতিবেশী।" দাদি গ্রামের মেয়ে হলেও হিন্দু মুসলমান নিয়ে কোনদিন বাড়াবাড়ি করেনি। আমাদের বাড়ির লাগোয়ায় ছিল বাবুয়া খলিফার বাড়ি। বাবুয়া খলিফা পেশায় দর্জি হলেও উনি কিন্তু মৌলভি ছিলেন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে বিয়ে বা নিকা হতো। তাঁর পাঁচ ছেলে সাত্তার ,সাদিক, হুল্লুক, হামিদ ও হানিফ এবং তিনটে মেয়ে ছিল  ফুতু, বুলি ও আমিনা বা " বু"। কয়েকটা বাড়ির পরেই ছিল মুসলমান পাড়া। কিন্তু বাবুয়া খলিফা অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন এবং আমাদের বাড়িতে তাঁর যথেষ্ট আসা যাওয়া ছিল। দাদির পরিভাষায় উনি একজন পিতিবেশী। পশ্চিম দিকে পাখি সান্যালের মাসী শ্বাশুড়ি তিনিও একজন, ওদিকে ভট্টাচার্য পাড়ার ফেনু বাবু ( যিনি খ্রিস্টান ধর্ম নিয়েছিলেন ) তিনিও একজন পিতিবেশী। এছাড়াও পাড়ার সমস্ত বাড়ির ভদ্রমহিলা যাঁরা তাঁর সমবয়সী ছিলেন তাঁরাও পিতিবেশী। জিজ্ঞেস করলাম যে দাদি, তাহলে বাদ গেল কে এবং তুমি এত চেঁচামেচি কর কেন? পাড়ার ছেলেরা আম বা পেয়ারা পাড়তে এলে বা ঘুড়ি ধরতে এলে চেঁচামেচি কর কেন? এবার মুখ খুললেন দাদি, দেখ আমাকে না জিজ্ঞেস করে যদি কেউ কিছু করে তাহলে আমি কেন চেঁচাব না? আমি তো সবসময়ই ওদের বলি আমাকে জিজ্ঞেস করে কাজটা কর। আমি বুঝলাম যে দাদির অহঙ্কারে এই অবজ্ঞা লাগে। সত্যিই তো, একটু বললেই যদি  সোজা রাস্তায় কাজটা হয়ে যায়, তাহলে চুরি চামারি করে দাদিকে 
রাগানো কেন? আসলে ছেলেরা একটু মজা করতে চায়। বাড়ির মাঠে নাটক ও বিচিত্রানুষ্ঠান হবে অথচ আকাশের মুখ ভার। কে হঠাৎ বলে উঠল আমার দাদির কোন নিত্য ব্যবহার্য জিনিস লুকিয়ে রাখ। দাদি জিনিসটা দেখতে না পেয়েই চেঁচামেচি করবে ও গালমন্দ শুরু করবে আর তাতেই নাকি বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে। যা বলা, তাই কাজ। বাদল দা  দাদির ঘটি লুকিয়ে রেখেছে আর দাদি দেখতে না পেয়েই চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে কিন্তু বৃষ্টি বন্ধ হবার কোন লক্ষনই দেখা যাচ্ছে না দেখে ঘটিটাকে চুপিসারে বাদল দা রেখে দিল। অন্ধকারে দাদি ঘটি ফিরে পেতেই একদম ঠাণ্ডা জল হয়ে গেল দাদি। দাদির মাথা গরম হলে একমাত্র রক্ষাকর্তা আমি। না বাবা, না মা বা জ্যাঠামশাই,জেঠিমা কেউ না। দাদু খুব ঠাণ্ডা প্রকৃতির মানুষ, দাদু কিছু বলতে গেলেই উল্টে বিপত্তি, সব নষ্টের মূল হচ্ছো তুমি। ভদ্রলোক দাদু পালাতে পারলে বাঁচেন।

এহেন পিতিবেশীর সংজ্ঞা আবার মনে পড়ে গেল যখন পূর্ব দিকের বাড়ির ভদ্রলোক চলে গেলেন। এই ওড়িয়া পরিবারের সঙ্গে কোনদিন কথাবার্তা ও হয়নি। কিন্তু কেন জানিনা এই পরিবারের সমস্ত সদস্যদের ই দেখে খুব পরিচ্ছন্ন পরিবার বলে মনে হতো। সকাল সন্ধে হুলুধ্বনি, শাঁখ বাজিয়ে পূজো, ছোট ছেলেটা ঘন্টা নাড়িয়ে ব্যালকনিতে এসে তুলসিমঞ্চে জল দিচ্ছে বা ধূপকাঠি জ্বালিয়ে  সন্ধে দিচ্ছে  এসব দেখে মনে হতো যে বাড়ির একটা ভ্যালু সিস্টেম রয়েছে। ওর দিদি টা বিশেষ বড় নয় কিন্তু ভাইকে পড়ানোর ধরণ দেখে নিজের মনের মধ্যেই একটা ছবি এঁকে ফেলেছিলাম। মাঝে মাঝেই বলতাম এই পরিবারের সবাই খুব পরিচ্ছন্ন। কয়েকদিন ধরেই দেখছি অনেক রাত অবধি আলো জ্বলছে, ভাবলাম আজকাল ছেলেমেয়েদের কাজ কর্মের ধারা পাল্টেছে, সেই কারণেই হয়তো দেরী কিন্তু আমার ধারণা ভুল। তারা গোছগাছ করে চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরশু দেখি এয়ার কন্ডিশনারটা খুলছে। একটু অবাক হয়েই গেলাম নতুন এয়ার কন্ডিশনারটা এর মধ্যেই বিগড়ালো? কেবলই মনের মধ্যে একটা অযথা আগ্রহ জেগে উঠছে। কিন্তু কেন, কোনদিন ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলা বা তাঁদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা হয়নি অথচ আমার কৌতুহল কমছে না। গতকাল ছেলেটা বাঁশি বাজাচ্ছিল, কিছুদিন ধরেই শিখছে। খেয়াল করতাম যে আমি যে সরগম গুলো করছি ঐ ছেলেটি সেটা করার চেষ্টা করছে। বেশ আনন্দ হলো, কাউকেই কোনদিন গান শেখাইনি,হয়তো মাঝে মধ্যে কাউকে একটু আধটু দেখিয়ে দিয়েছি বড় জোর। আর এই ছেলেটি একলব্যের মতো নিষ্ঠার সঙ্গে আমি যেগুলো করছি, সেইগুলোই করছে ভেবে খুশিতে মনটা ভরে যেত। আমার মনের ভুল ও হতে পারে। হয়তো যে মাস্টার মশাইয়ের কাছে ছেলেটি শিখছে তিনিই হয়তো ঐগুলো দিয়েছেন কিন্তু আমি মনে মনে ভাবতাম আর প্রার্থনা করতাম যে ছেলেটা যেন খুব ভালভাবে বাজাতে পারে। গতকাল ও ছেলেটি গাছে জল দিয়েছে কিন্তু আজ তাকে বা তার দিদিকে দেখতে পেলাম না। সকাল বেলায় দেখি ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা জামাকাপড় মেলার দড়িটা খুলছেন এবং জামাকাপড়গুলো উঠিয়ে নিচ্ছেন। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম আপনারা কি চলে যাচ্ছেন? 
হ্যাঁ।
শুনে জিজ্ঞেস করলাম কি ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছেন?
না, পল্লীশ্রীতে একটা ফ্ল্যাট কিনেছি, অনেকদিন এখানে ছিলাম, মনটা বেশ খারাপ লাগছে।
আমি বললাম, মন খারাপ করবেন না, নিজের ফ্ল্যাটে চলে যাচ্ছেন, এ তো বড় খুশীর খবর। অভিনন্দন জানালাম এবং বললাম যে কাছেই যাচ্ছেন, সময় সুযোগ করে আসবেন।

এতদিন সামনাসামনি থাকলাম, কোনদিন কোন বাক্যালাপ ও হয়নি, অথচ আজ বিদায় বেলায় তাঁকে আমন্ত্রণ জানালাম বাড়িতে আসার জন্য।  ইনি তাহলে একজন নিশ্চয়ই পিতিবেশী। কিন্তু দাদির কথা অনুযায়ী ইনি কোনভাবেই আমাদের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হননি, তাহলে তো দাদির কথা মিলছে না। না, এঁদের মানসিক তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের সঙ্গে আমার মনের তরঙ্গ মিলে একটা রেসোন্যান্স তৈরী হয়েছে আর সেই কারণেই ওঁদের চলে যাওয়াটা মনের মধ্যে এইরকম একটা ঢেউয়ের সৃষ্টি করেছে। নিশ্চয়ই ইনি পিতিবেশী থুড়ি প্রতিবেশী।

Saturday, 26 July 2025

মনসুখ ভাইয়ের রোজনামচা

আমেদাবাদ শহরে " বাসনা " অঞ্চলে মনসুখ ভাইয়ের আস্তানা। আস্তানা শব্দটা কানে এলেই মনে হয় একটা বাড়ি(গেট ওয়ালা বড় বাড়ি কিংবা নিদেন পক্ষে  একটা ছোট কুঁড়ে ঘর) কিন্তু মনসুখ ভাইয়ের আস্তানা খোঁজ করতে গিয়ে আমি রীতিমতো নাস্তানাবুদ হয়ে গেলাম।

যে গেস্টহাউসে ছিলাম তার বাইরে গেটের ধারে কোন সাতসকালে এসে ঠেলাগাড়ি নিয়ে এসে যেত মনসুখ ভাই, আর সকাল থেকেই তার খরিদ্দার আসতে শুরু করে দিত, কেউ নিত ইডলি বড়া আবার কেউ বা নিত ডাল বড়া ও কান্দা ভাজি( আমাদের পরিভাষায় পেঁয়াজি)। কিন্তু মোটামুটি বেলা বারোটা বাজতেই সেই ঠেলাগাড়ি সমেত মানুষটাই উধাও।  বেশ কিছুদিন হলো গেস্টহাউসেই আছি, ফ্ল্যাটের অ্যালটমেন্ট এখনও আসেনি, অফিস করতে হচ্ছে  সেই গেস্টহাউস থেকেই। সকালের জলখাবারটা মনসুখ ভাইয়ের কাছ থেকেই নিচ্ছি কারণ সেই একঘেয়ে ব্রেড, বাটার আর ওমলেট মুখে রুচছে না। কিন্তু মুশকিল হলো ওর কাছে সবসময়ই ভিড়, আমার কাছে টাকা ওর নেওয়া হয়ে ওঠেনা, বলে বাদ যে একসাথে লে লেঙ্গে, বরাবর(মানে ঠিক আছে)। একটু অস্বস্তি ই হয় কারণ আমার ফিরে আসার সময় সে তো থাকেনা।

এদিকে ফ্ল্যাটের অ্যালটমেন্ট এসে গেছে, আমাকে চলে যেতে হবে। ফিরে এসে দেখি মনসুখ ভাই নেই। গেস্টহাউসের কেয়ারটেকারের কাছে দিতে গেলাম কিন্তু কেন জানি না ও নিল না, সম্ভবত ওর ব্যবসার লাভে ভাগ বসিয়েছে বলে। মনটা খচখচ করছে গরীব মানুষের পয়সা না দিতে পারার জন্য। যাই হোক রবিবার ঠিক করলাম আজ যে ভাবেই হোক ওর পয়সা মেটাবোই। কিন্তু সকালে উঠতে দেরি হওয়ায় এবং শহরের অন্য প্রান্ত থেকে আসতে দেরি হয়ে গেল এবং যথারীতি ও ভাগলবা। কিন্তু আমি ওকে আজ যেভাবেই হোক পয়সা দিয়ে যাব ই ঠিক করেছি। আশেপাশের লোককে জিজ্ঞেস করে তিনটে মোড় পেরিয়ে পেলাম দেখা তার বাড়ি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক সময় গড়িয়ে গেছে। খিদেতে পেট চোঁ চোঁ করছে কারণ বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন রকম দিক নির্দেশন যার ফলে আমার আজ হাঁড়ির হাল।
 মোড়ের কাছে একটা পার্ক আর তার কাছেই এক জৈন মন্দির। মন্দিরের লাগোয়া একটা দেয়ালে রয়েছে মনসুখ ভাইয়ের সেই গাড়ি। চারটে ইট দিয়ে আটকানো আছে গাড়ির চাকা আর একটা শিকল দিয়ে একটা চাকা বাঁধা আছে দেয়ালের রেলিং এর সঙ্গে যাতে গাড়িটা বেসামাল হয়ে অন্য জায়গায় না চলে যায়। গ্যাসের স্টোভ, কড়াই গাড়ির পেটের তলে একটা বাক্সে চলে গেছে যেটা এখন তালা বন্ধ এবং ওপরের পাটাতনে যেখান থেকে অন্য সময় বিক্রি পাট্টা করে সেখানে একটা চটের উপর চাদর বিছিয়ে পরমানন্দে মনসুখ ভাই ঘুমিয়ে আছে। ঘুম ভাঙাতে একটু মনটা খারাপ ই লাগছিল কিন্তু আমাকে আবার ফিরে আসতে হবে ভেবে ডেকেই ফেললাম। সারাদিন এত পরিশ্রম করে যে কয়েকবার ডাকার পর তার ঘুম ভাঙলো এবং চোখ কচলাতে কচলাতে বলল, " সাব, আপ!" ম্যায় আপকো পাস যো বহুত কর্জ হ্যায়, উয়ো চুকানে কে লিয়ে আয়া হুঁ।" এতনা তকলিফ কিঁউ উঠায়া সাব? আপ থোড়ি ভাগনে বালা আদমী হ্যায়? একটু অবাক হয়ে গেলাম ওর আমার উপর ভরসা করা দেখে। সাধারণত কেউ ধারে কোন জিনিস দিতে চায়না আর দিলেও পয়সা ফেরত পাওয়া এক ভাগ্যের ব্যাপার কিন্তু যে লোকটার এই গাড়িটাই সম্বল, এটাই ওর কর্মস্থল এবং ঘর সেই লোকটা কেবল বিশ্বাসের উপর ভরসা করে এত টাকা বাকি থাকা সত্ত্বেও এত নিশ্চিন্তে কি করে ঘুমায়? আসলে যাদের অনেক সম্পদ তারা সামলাতেই ব্যস্ত আর যারা ভগবানের উপর ভরসা করে সামান্য পূঁজি নিয়ে সৎপথে এগিয়ে চলে তারাই বোধহয় এত নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। জিজ্ঞেস করলাম যে বারিশ কা মৌসমমে ক্যায়সে রহতে হ্যায় ইঁহা?  ও দেখালো প্লাস্টিকের চাদর। এই দিয়ে বৃষ্টির সঙ্গে যুদ্ধ করে। এইরকম মনসুখ ভাই সারা দেশে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে এবং যথেষ্ট সততার সঙ্গে বেঁচে আছে আর অন্যদিকে প্রচুর সম্পদের মালিক তারা কত অসদুপায়ে টাকা রোজগারের ফন্দিফিকির খুঁজছে। এরাই  চিরদিন বলীয়ান আর মনসুখ ভাইদের সততার পুণ্যে এই অসৎ লোকগুলো মাথার উপর বসে রাজত্ব করে চলেছে।
মনসুখ ভাই আপনারা বেঁচে থাকুন অনেকদিন। ভগবান আপনাদের মঙ্গল করুন।

Wednesday, 9 July 2025

স্মৃতি ও বিবেক

স্মৃতির সঙ্গে বিবেকের কোন সম্পর্ক আছে কিনা ঠিক জানা নেই। কিন্তু একটা কথা ঠিক যে বিবেকের দংশন হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে টেনে বার করে আনে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই হৃদয় বলে কিছু জিনিস থাকে কিন্তু কোন কোন সময় তা বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে চাপা পড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেনা কিন্তু আগুন যেমন চিরকাল ছাই চাপা পড়ে থাকেনা ঠিক সেই রকমই হৃদয়ের বাহ্যিক প্রকাশ হবেই। বিবেক তাকে ঠিক টেনে আনবেই। দুর্বাসা মুনির আশীর্বাদে কুন্তী সূর্যদেবের আবাহন করতেই ঘটে গেল বিপত্তি, জন্ম হলো কর্ণের এবং কুন্তী তাকে ঝুড়িতে শুইয়ে দিয়ে জলে ভাসিয়ে দিয়ে তখনকার মতো নিজের লজ্জ্বা বাঁচালেন বটে কিন্তু বিবেকের তাগিদেই হোক আর কুরুপাণ্ডবের যুদ্ধে নিজের ই এক সন্তান অন্য পাঁচ সন্তানের সঙ্গে যুদ্ধ যাতে না করে সেই কারণেই হোক, যুদ্ধের আগের দিন সন্ধ্যা বেলায় কর্ণের কাছে নিজের পরিচয় দিতে গেলেন , কিছুটা কি আত্মগ্লানি ঘোচাতে নয়? কবিগুরুর কলমে ঝরেছে, " লোভে যদি কারে দিয়ে থাকি দুখ, ভয়ে হয়ে থাকি কর্ম বিমুখ, পরের পীড়ায় পেয়ে থাকি সুখ মোহের ভরে, আমার বিচার তুমি করো তব আপন করে।" সুতরাং কোন না কোন সময় মানুষ বিবেকের দংশনে কাতর হবেই এবং দীর্ঘদিনের অব্যক্ত যন্ত্রণা বেরিয়ে আসবেই।

সন্তানেরা তাদের বাবা মায়ের অত্যন্ত প্রিয় জিনিস বা শখের জিনিস তাঁদের মৃত্যুর পর বিক্রি করে দেয় হয় লোভের বশে কিংবা একাধিক ভাইবোন থাকলে কে সেই জিনিসটা রাখবে তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে যাতে সম্পর্কের হানি না ঘটে বা সেই জিনিসের রক্ষণাবেক্ষণ আদৌ সম্ভব হবে কিনা সেটা ভেবে বা কিছু অর্থাগম হবে এই আশায়। এখানে ভাবাবেগ কোন কাজ করেনা এবং কারো সেটা থাকলে তাকে নানাভাবে প্রকাশ করতে দেওয়া হয়না। অথচ জিনিসটা হস্তান্তরিত হবার পর ক্রেতা যখন মূল জিনিসটা অবিকৃত রেখে তার সৌন্দর্য বাড়ায়, তখন তাদের বিবেক জাগ্রত হয় বা ভাবাবেগ বেরিয়ে আসে এবং চোখের জল ফেলে। জিনিসটাকে ধরে রাখা যে খুব কঠিন ছিল তা নয় কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তাকে তো ধরে রাখার চেষ্টা করাই হয়নি বা যে ধরে রাখার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিল তাকেও যেন তেন প্রকারেণ তাকে দমিয়ে রাখা হয়েছিল। আমরা কোন জিনিসের মূল্য তার জীবদ্দশায় ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা, তার মূল্যায়ন হয় সেটা হাতছাড়া হবার পর। এটা কি বিবেকের দংশন না আর কিছু?

Thursday, 5 June 2025

পোষ্য

অনেক দূরের পাড়ি, সুতরাং গোটা তিনেক বাস ছেড়ে জানলার ধারে একটা সিট নিয়ে বসে আছি । বাস টার্মিনাসের পাশেই এক অনুষ্ঠান বাড়ি যা সব সময়ই ভর্তি থাকে কারণ বাড়িটার অবস্থান। আগের দিন রাতেই একটা বড়মাপের অনুষ্ঠান  হয়ে গেছে। অনেক বাড়তি উচ্ছিষ্ট খাবার পাশের ভ্যাটে পড়েছে যেখান থেকে ফুটপাতে থাকা কিছু  গরীব মানুষ এবং রাস্তার একদল কুকুর প্রতিযোগিতায় নেমেছে কে কতটা খাবার জোগাড় করতে পারে । মানুষগুলো মাঝে মাঝেই  রাস্তায় পড়ে থাকা ইঁট কুড়িয়ে কুকুরগুলোর দিকে তাক করছে এবং  এরই মধ্যে কুকুরগুলোও কিছু কিছু খাবার নিয়ে  পালাচ্ছে এবং নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করছে। মানুষ এবং কুকুরের প্রতিযোগীতা দেখতে দেখতেই সময়টা কেটে যাচ্ছে কিন্তু বাস ছাড়তে এখনও বেশ খানিকটা দেরী আছে। হঠাৎই জানলার উল্টোদিকে একটা সুন্দর ল্যাব্রাডর কুকুরের দিকে চোখ পড়ল। কুকুরটা আমার ই মতো সেই খাবার কাড়াকাড়ি দেখছে একদৃষ্টে কিন্তু কোথায়  যেন তার সম্মানে বাধছে সেই প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতে । দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে খুব খিদে পেয়েছে কিন্তু কিছুতেই সে ঐদিকে যাচ্ছেনা । অথচ গেলেই ওর চেহারা দেখে কি মানুষ বা কি কুকুরের দল ভয়ে পালাবে। কিন্তু সে ভীষণ দ্বিধাগ্রস্ত। একদিকে তার খিদে আর অন্যদিকে তার সম্মান । 
ভাবতে চেষ্টা করলাম  এইরকম সুন্দর একটা কুকুরকে কে ছেড়ে যেতে পারে?  কিছু লোক আছে যারা বাড়িতে দারুণ একটা কুকুর  পুষবে এবং তাদের নাম ও কোন ছেলের বা মেয়ের নামে রাখবে কুকুরের লিঙ্গ অনুসারে। বাইরের  কোনও লোক তাকে কুকুর বললে তারা খুব রাগ করে এবং তাকে তখন নিজের ছেলে বা মেয়ে বলে মনে করে।  ভালবাসা তো সত্যিই ভাল জিনিস । হৃদয়ের কোমল দিক থাকা তো সত্যিই প্রশংসনীয় কিন্তু কুকুরটা যখন বুড়ো হয়ে যাবে বা নিজেরা যখন বদলি হয়ে যাবে অন্যত্র তখন পোষ্যকে রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে তাকে তার ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেওয়া এক ভীষণ অমানবিক কাজ। অনেক লোকই আছেন যাঁরা  পোষ্যকে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যান বা তাঁর ঘনিষ্ট কোনও বন্ধুর কাছে জিম্মা করে দিয়ে যান। এতে তাঁদের মনেও একটা শান্তি থাকে এবং পোষ্য ও ভাল থাকে। 
যাই হোক,  কুকুরটার ঐ অবস্থা দেখে এক প্যাকেট বিস্কুট  কিনে দুটো বিস্কুট দূর থেকে  ছুঁড়ে দিলাম কারণ বেশ ভয় লাগছিল  ঐ বড়সড় কুকুরটাকে দেখে। কিন্তু কুকুরটা একবার বিস্কুটের দিকে তাকিয়ে  মুখটা ফিরিয়ে  নিল কারণ খিদে লাগলেও সে অভ্যস্ত নয়  এরকমভাবে খেতে। মনে একটু সাহস সঞ্চয়  করে এগিয়ে গেলাম তার দিকে, বিস্কুটের প্যাকেট থেকে  একটা বের করে ওর মুখে দিলাম , ও আমার দিকে  একবার তাকালো, কি মনে হলো ওর যেন ওর পুরনো মনিব ই ওকে খেতে দিচ্ছে। একদৃষ্টে চেয়ে রইল আমার পানে, লক্ষ্য  করলাম ওর চোখের কোণে একটু জল।সন্দেহ করছে যে আমার মনিবের চেহারাটা কেমন করে এতটা বদলে গেল । অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে আস্তে করে আমার হাত থেকে বিস্কুট সে নিয়ে চিবোতে লাগল। আমিও সাহস পেয়ে প্যাকেট থেকে একটা একটা করে বিস্কুট নিয়ে ওকে খাওয়াতে থাকলাম আর ও ধীরে ধীরে লেজ নাড়াতে নাড়াতে খেতে থাকল। ইতিমধ্যে বাস ছাড়ার সময় হয়ে গেল বুঝতে পারলাম কণ্ডাক্টরের কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে উঠতে দেখে। মাথায় বার বার করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বাসে উঠলাম । জানলা দিয়ে দেখি সে আবার ও তার মনিবকে হারিয়ে ফেলল ভেবে অপলক দৃষ্টিতে অপসৃয়মান বাসের দিকে চেয়ে আছে। মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত হয়ে গেল । ফিরে আসলাম কয়েকদিন পরে এবং  ফিরে এসে খুঁজতে থাকলাম সেই সুন্দর ল্যাব্রাডর কুকুরটাকে কিন্তু কেউ কোন হদিস দিতে পারল না। কোথায় যে উধাও হয়ে গেল কেউ জানেনা ।

Monday, 2 June 2025

শুধু যাওয়া আসা

ব্যস্ত শহরে প্রায় সব পরিবারের চেহারাই মোটামুটি এক। ছিমছাম সংসার স্বামী, স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ভরপূর। স্বামী এবং  স্ত্রী দুজনের ই বাবা ও মা জীবিত, সুতরাং বাচ্চারা দুই তরফের দাদু, দিদিমা ও ঠাকুর্দা, ঠাকুমার সাহচর্য পায় এবং বাচ্চারা ছুটির সময় আনন্দে  টইটুম্বুর। একই শহরে হলে কিছুদিন এবাড়ি আর কিছুদিন ও বাড়ি আর ভিন্ন শহরে হলে গরমের ছুটি এখানে তো ক্রিসমাসে অন্যখানে। মাঝে মাঝে  দুইপক্ষের দাদু, দিদাদের নিয়ে ছুটি কাটানো। কিন্তু এটা একটা আদর্শ কল্পনায় ভরপূর চিত্র। বেশীরভাগ সময়ই এই ছবি অনুপস্থিত  বিভিন্ন কারণে। যাক ঐসব নিয়ে অন্য কোন সময়‌ আলোচনা করা যাবে।
বড় শহরে স্বামী, স্ত্রী দুজনকেই চাকরি করতে হয় আজকাল  সংসারে  সচ্ছলতা বজায় রাখতে । আগের দিনের মতো একেবারে নিপাট গৃহকর্ত্রী পাওয়া খুবই মুশকিল । তবে একেবারে  যে অমিল তা নয়। হয় স্বামীর বিরাট ব্যবসা কিংবা স্বামী খুবই নামজাদা ডাক্তার বা উকিল,  সেক্ষেত্রে স্ত্রীকে চাকরি নাও করতে হতে পারে তবে সেখানে স্ত্রীরা নানারকম সামাজিক কাজকর্মে ব্যস্ত থাকেন যার নীট ফল বাচ্চারা মানুষ  হচ্ছে কাজের লোক বা একটু গম্ভীর ভাবে বললে বলতে হয় ন্যানির কাছে। যে যেরকম ওজনদার লোক তাদের ন্যানিরাও সেইরকম ই ওজনদার ।
বিভিন্ন ধরণের সংস্থা রয়েছেন যারা  এই কাজের লোক ( আয়া) বা ন্যানি সরবরাহ করে এবং  বহু লোক সাধারণ ভাবে  বা রিটায়ার করার  পরে এই রমরমা ব্যবসার সঙ্গে  যুক্ত । এখানে বিনিয়োগ সাঙ্ঘাতিক কিছু বেশী নয় তবে পরিচিতি এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ । যার পরিচিতির ব্যাপ্তি যত বেশী সে তত ভালভাবে  ব্যবসা করবে। আর একবার এই বাজারে ঢুকলে তার ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠতে বাধ্য।  এদের একটা ডেটা বেস তৈরী করতে হয় কারণ বিভিন্ন লোকের চাহিদা বিভিন্ন রকম। শুধু বড় শহর ই নয় সব জায়গায়ই এই ব্যবসা এখন রমরমিয়ে চলছে। ছোট শহরে রোজগারের পরিমাণ কম আর বড় শহরে সরকারী  চাকরির  চেয়ে কোন অংশে কম নয়। তাদের মাসে চারদিন ছুটি, খাওয়া দাওয়া সমেত একমাসের বোনাস। যদি সে অন্য  শহর থেকে  আসা লোক হয়ে তবে তাকে বছরে  এক বার/ দুবার ছুটি এবং  যাতায়াত বাবদ এসিতে বাড়ি যাওয়া আসার খরচ দিতে হবে। মফস্বল বা ছোট শহরে আগে যেমন ঠিকে কাজের লোক থাকত এখনও  তা আছে তবে তারা চারটে পাঁচটা বাড়িতে কাজ করে যে পরিমাণ টাকা রোজগার করে তা সিভিক ভলান্টিয়াররাও পায়না। সিভিক ভলান্টিয়ারদের পনের ঘন্টা ষোল ঘন্টা কাজ করার পর তাদের ঊর্ধতন কর্মচারীদের গালমন্দ ও শুনতে হয় এবং  বিনিময়ে তারা পায় মাত্র নয়  হাজার টাকা। সুতরাং,  তারা সুযোগ  পেলেই যে চুরি করবে তাতে আর আশ্চর্য কি?  যারা আবার একটু চালাক চতুর তারা তাদের ওপরয়ালার হয়ে টাকা সংগ্রহ করে এবং সেখান থেকে  একটা ভাল টাকা ভাগ হিসেবে পেয়ে থাকে। আর ভদ্রবেশী ওপর ওয়ালা  সামনে সুন্দর  মুখোশ পড়ে ঐ সিভিক ভলান্টিয়ারকে পিছনে লেলিয়ে দিয়ে সেখান থেকে  দাঁও মারে। কিন্তু ঠিকে কাজের লোকেরা মোটামুটি  সাত আট ঘন্টা কাজ করে পনের  বিশ হাজার টাকা কামিয়ে নেয় । আসা যাওয়ার জন্য‌ বিনে পয়সার ট্রেন এবং যেসমস্ত বাড়িতে কাজকর্ম করছে সেখানে চা, জলখাবার ও দিনের  খাওয়া হয়ে যায়। এছাড়া সরকারী  অনুদান তো আছেই । বড় শহরে আয়া সেন্টার রা বারঘন্টা বা চব্বিশ ঘন্টার লোক সরবরাহ করে এবং তাদের সাম্মানিক মূল্য একমাসের টাকা। আগে গ্রামের লোক গ্রামের  বাইরে প্রায়‌ আসতো ই না কিন্তু যানবাহনের সুযোগ বৃদ্ধি ঘটায় তাদের কাজের সন্ধানে বেরিয়ে আসতে হচ্ছে এবং প্রত্যেক  মানুষ ই চায় তাদের শ্রী বৃদ্ধি  হোক। চাকুরীরত স্বামী স্ত্রীদের ও লোকজন ছাড়া চলবে না কারণ তাদের বাচ্চা না সামলালে তারা দুজনেই  কাজে বেরোতে পারবেন না আর এই কাজের লোকেরা রোজগার করে তাদের ছেলেমেয়েদের ভাল খাওয়া দাওয়া এবং শিক্ষার  ব্যবস্থা করতে পারছে আর মাঝখানে এই আয়া সেন্টারের পরিচালকরা দুইপক্ষের  যোগাযোগ ঘটিয়ে দিয়ে টাকা রোজগার করছে অনেকটা উবের, ওলা বা এয়ার বি এন বির মতো।
এখন এই বাচ্চাগুলোর কি অবস্থা সেটা একটু দেখা যাক। এই কাজের লোক বা ন্যানিরা কাজ না পোষালে চলে যাচ্ছে এবং  আয়া সরবরাহকারী সংস্থারা অন্য  ন্যানিকে দিচ্ছে এবং  নতুন  ন্যানির সঙ্গে একটু মেলবন্ধন হতে না হতেই পুরনো ন্যানি আবার উপস্থিত কারণ নতুন  জায়গায় ডাল না গলায় তিনি আবার  পুরনো জায়গায়  ফিরে এসেছেন এবং  বাচ্চাটাও পুরনো ন্যানিকে ফিরে পেয়ে স্বাভাবিক  হয়েছে  কিন্তু নতুন ন্যানির দোষ টা কি? কিছুই নয়, কারণ যে কোন লোক  নতুন  জায়গায়  এসে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময়ই নেবেই কিন্তু না বাচ্চার মা না বাচ্চাটি সেই সময় দিতে রাজী নয়। অতএব  তাকে চোখের  জল নিয়ে বিদায় নিতে ই হবে যদিও তার সেরকম দোষ হয়তো  নাই। তাকে ছলছলে চোখ নিয়েই বিদায় নিতে হবে কারণ তার  সবচেয়ে  বড় শত্রু সময়।

Thursday, 29 May 2025

তারা রা আজ কোথায় গেল

ছোট বেলায় সূর্য অস্ত যেতে না যেতেই অন্ধকার এসে গ্রাস করত পৃথিবীকে আর নীল আকাশে একটা একটা করে হঠাৎ লক্ষ লক্ষ তারা আকাশটাকে ভরিয়ে দিত তাদের ঝিকিমিকি আলো দিয়ে। কৃষ্ণ পক্ষে চাঁদ যখন ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশে ব্যস্ত তখন পৃথিবীর নিকষ কালো অন্ধকার মহিমাণ্বিত হয়ে উঠত এই ছোট ছোট  তারাদের ঝিকিমিকি আলোতে।  খানিকক্ষণের মধ্যেই গোটা আকাশ জুড়ে তারাদের ভিড়, একদৃষ্টে চেয়ে দেখতাম সপ্তর্ষি মণ্ডল, কালপুরুষ ও ধ্রুবতারা এবং অন্ধকার আকাশের অপূর্ব রূপ । বড়মা বলতেন দাদুও আমাদের ছেড়ে তারাদের মধ্যে মিশে  গেছেন । খুঁজতাম দাদুকে ঐ তারাদের ভিড়ে। কখনো মনে হতো এই তারাটাই আমার দাদু,  আমাকে দেখে হাসছেন আর বলছেন বড় হয়ে ভাল করে পড়াশোনা করলে আমিও একদিন দাদুর মতো তারা  হয়ে যাব। খুব আনন্দ হতো দাদুর কাছে  যেতে পারব বলে কারণ দাদু ই তো আমার সঙ্গে খেলতেন আর বলতেন,"ছুটকু আমার সিগারটা নিয়ে আয় তো।" ঐ মোটা সিগার লাইটার জ্বালিয়ে ধরিয়ে সুখটান দিয়েই মিলটনের লিসিডাস বা শেক্সপিয়ারের কোন অংশ আবৃত্তি করতেন। দাদু ছিলেন আমার আইডল এবং খেলার সাথি । সেইদাদু চলে যাওয়ার পর আমাকে বলা হলো দাদু আকাশের তারাদের মধ্যে মিশে গেছেন এবং আমিও তা কখনোই অবিশ্বাস করিনি। স্কুলে স্যারেরা বলতেন উপগ্রহের আলো স্থির আর তারাদের ঝিকিমিকি আর এটাই তাদের পার্থক্য চেনার জন্য‌ । সময়‌ গড়িয়েছে , আমরাও বড় হয়ে জীবনের উপান্তে এসে গেছি,  বিজ্ঞানের অগ্রগতি হয়েছে, জীবন যাপন ও অনেক সহজ হয়েছে, আমাদের কষ্ট করার ক্ষমতাও অনেক কমে গেছে এবং ব্যস্ততার মধ্যে প্রকৃতির সেই অপূর্ব রূপ দেখার চোখ  ও আমরা হারিয়ে ফেলেছি এবং প্রকৃতিও যেন কেমন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে । 
আমরা সাজি অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। গ্রামের মেয়ের সাজ একরকম, শহরের তা থেকে অনেক আলাদা। অবশ্য বিশ্বায়নের দৌলতে গ্রামের মেয়েরাও আর পিছিয়ে নেই, এমন কি কোন কোন সময় তারা শহরের মেয়েদের ও হার মানিয়ে দেয়। শুক্লপক্ষে চাঁদ ধীরে ধীরে পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় এবং  সারা আকাশ একটা অপূর্ব স্নিগ্ধতায় ভরে যায় এবং ঝলমলে আকাশ চাঁদের আলোয় মন ভরিয়ে দেয় কিন্তু  পরদিন ই চাঁদের ম্লান রূপ দেখে মনটা একটু বিষণ্ণ হলেও তার রূপ ও ভোলার নয়। রঙটা একটু চাপা কিন্তু তার গরিমা এতটুকুও কম নয় । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাধেই কি লিখেছিলেন, " কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের  লোক, মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে, কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখ।" কালো মেয়ের কালো রূপ ও যে অসাধারণ হতে পারে তা তাঁর কবিতায় ও গানে প্রকাশ হয়েছে । আদিবাসীদের মধ্যেও কালো ছেলেমেয়েদের চুল, দাঁত ও চোখ দারুণ সুন্দর দেখা যায়।। সুতরাং,  এই ছেলেমেয়েদের মতোই কৃষ্ণপক্ষের আকাশভরা সূর্য তারার রূপ কিসে কম? শুধু দেখবার মতো চোখ চাই।
কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে শিল্পায়নের ও অগ্রগতি হয়েছে  আর প্রকৃতিও হারিয়েছে তার নিজস্ব সত্ত্বা ও রূপ। সন্ধে হলেই আগে যেমন আকাশে ফুটে উঠত তারার মেলা, এখন তা আর দেখা যায়না দূষণের জন্য । এই দূষণ ছড়িয়েছে প্রত্যন্ত গ্রামেও, সেখানেও আর তারারা দূষণের স্তর ভেদ করে প্রকাশ হয়না যেমন আগের দিনের প্রতিভাবান ব্যক্তিরা ( কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবিরা)  সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলেও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন কিন্তু বর্তমানে অন্যায়টাই যখন ন্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে  তখন এই তথাকথিত পণ্ডিত বা বুদ্ধিজীবিরা প্রতিবাদে মুখর হন না। তাঁরাও আজ তারাদের মতোই লুকিয়ে পড়েছেন।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ স্বরূপ নাইটহুড খেতাব ত্যাগ করেছিলেন, আজকের পণ্ডিত ব্যক্তিরা তাঁদের  ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধে উঠে একটুও কি  প্রতিবাদ মুখর হতে পারেননা? তাঁরাও কি সেই সপ্তর্ষি মণ্ডল, ধ্রুবতারা  বা কালপুরুষ,  নীহারিকাদের মতন হারিয়ে যাবেন ? 

বৃষ্টিস্নাত মধ্যাহ্নে পাখিদের কলতান

মাঝে মাঝেই ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে আর রাস্তাটা একটু শুকনো হতে না হতেই আবার ভিজিয়ে দিচ্ছে। আকাশ মুখ ভার করে রয়েছে সবসময়ই কিন্তু এর ফাঁকেই যেই না রোদের ঝলক দেখা দিচ্ছে অমনি পাখিগুলো এসে খেতে চাইছে। ওরা রোজ ই আসে খাবার খেতে এবং ওদের আসার সময় ও ভিন্ন । সাতসকালেই পায়রা আসবে ছোলা খেতে এবং এক প্রস্থ খাওয়া হয়ে গেলেও কাকেরা যখন আসে বিস্কুট খেতে  তখন ও তারা আসবে এবং কাকগুলোকে রীতিমতো সুমো কুস্তিগিরের মতো তেড়ে গিয়ে তাড়িয়ে দিয়ে বিস্কুট খেয়ে নেবে। কাকের অত বড় ঠোঁট থাকা সত্ত্বেও কেন জানিনা ওরা রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যায়। শালিক যেন চশমা পড়া পণ্ডিত মশাই কিন্তু ঝগড়া করার সময় ওর কাছাকাছি কেউ আসতে পারেনা। বুলবুলিরা আসে এবং ডাকতে যখন থাকে তখন  যেন মনে হয় পায়ে ঝুমুর বেঁধে কেউ আসছে। কাঠঠোকরা মাঝে মধ্যে আসে এবং পড়ে থাকা বিস্কুটের গুঁড়োগুলো যখন খায় তখন তার সারা শরীরটা কার্নিশের নীচে ঝুলতে থাকে এবং তার ঝুঁটিওলা মাথা দেখে বোঝা যায় যে তারা এসেছে এবং  সুন্দরভাবে গুঁড়োবিস্কুটগুলো খেয়ে নিয়ে তির তির তির তির  করে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। সাদা কালোয় মনোমুগ্ধকর গাঙ শালিকের দেখাও মাঝে মাঝে মেলে যারা আসে খাবার খেতে কিংবা জল খেতে। আসে ধূসর রঙের ডানায় সবুজ সবুজের ছিটেওলা ঘুঘু যার চোখ দুটো পায়রার চেয়ে ছোট কিন্তু তাদের মতোই গোল গোল চোখ নিয়ে  কিন্তু তারা প্লাস্টিকের ছোট গামলায় রাখা জল খেতে পারেনা, তারা টবের নীচে রাখা চ্যাপ্টা থালার মধ্যে রাখা  জল যায়। অনেকে বলে ঘুঘু আসা নাকি খুব অলক্ষুণে কিন্তু আমার কিন্তু খুব ভাল লাগে ওরা এলে। আসে ছাতারে পাখি, অনেকটা চড়াই পাখির মতো কিন্তু আকারে বড়, দল বেঁধে এবং কর্কশ গলায় হৈচৈ করে খেয়েদেয়ে জল খেয়ে চলে যায়। চড়াই পাখি ভীষণ ভীতু এবং লাজুক, চোখাচোখি হলেই ফুরুৎ করে পালায়। হলুদ শরীরে বাদামী ডানার বসন্তবাউড়ি বা বসন্তবাহারি আসে শীতে কিন্তু অন্য সময়ে যে কোথায় তারা থাকে তার দিশে পাইনে।
বৃষ্টি এখন ধরেছে। রোদ না উঠলেও আলোর আভা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে । কাকগুলো ভিজে একশা হয়ে গেছে। মাঝে মাঝেই ডানা ঝেড়ে জলটা ফেলে শরীর শুকানোর চেষ্টা করছে। হঠাৎই কা কা শব্দে প্রায় গোটা পঞ্চাশেক কাক একটা এমার্জেন্সি মিটিং করতে পাশের বাড়ির ছাদের কার্নিশের উপর বসল এবং মিনিট পাঁচেক পরেই কি সিদ্ধান্ত হলো কে জানে আবার যে যেখান থেকে  এসেছিল ফিরে গেল। একটু দূরে সেগুন গাছের মগডালে একটা খুবই সরু ডালের উপর ছোট্ট একটা কালো পাখি কিন্তু গলার আওয়াজ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ  ডেকে চলেছে  চুঁ চুঁ চুঁ-----চুঁ উ চুঁ। কি যে বার্তা তার বুঝে উঠতে পারিনা। এই পাখিটার ডাক ই শুনতে পাই রাত্রি দুটো আড়াইটায়। এত যে কি কাজের তাড়া বুঝিনা কিন্তু সর্বপ্রথম এই সবাইকে সচকিত করে দেয় ভোর হয়েছে, উঠে পড়।
পার্কের বাদামগাছের পাতাগুলো হয়েছে ঘন সবুজ, আঁশফলের গাছেও এসেছে ফল, কাঁঠাল গাছে আসা এঁচোড় পেড়ে নেওয়া হয়েছে চোরের উপদ্রবে। সেই  তুলনায় সেগুন গাছের  পাতাগুলো এখনও হাল্কা সবুজ রয়েছে । এই সেগুন গাছের একটা বিশেষত্ব রয়েছে যে নীচের দিকের পাতাগুলো  বেজায়  বড় কিন্তু উপরের দিকে পাতাগুলো  ধীরে ধীরে ছোট হয়ে গেছে। একটু দূরে রাধাচূড়া গাছের হলুদ ফুল শুকিয়ে বাদামী রঙের ফল হয়েছে  কিন্তু নীচের দিকে এখনও কিছু ফুল অবশিষ্ট আছে এবং জাহির করছে যে আমরা এখনও শেষ হয়ে যাইনি। ঠাণ্ডা একটা আমেজ, দুটো টিয়া পাখি সেগুন গাছের ডালে এসে বসল কিন্তু কি মনে হলো ট্যাঁ ট্যাঁ করে ডাকতে ডাকতে কোথায় উধাও হয়ে গেল । একটা চিল উড়তে উড়তে হয়তো ক্লান্ত বোধ করায় একটু বসতে না বসতেই কোথা থেকে ছুটে এল একদল কাক কা কা করতে করতে এবং  তাড়া করল সেই ক্লান্ত চিলটাকে। খানিকক্ষণ উপেক্ষা করলেও বেশীক্ষণ টিকতে পারলনা সে , উড়ে চলে গেল দিগন্তের পানে,  হদিশ পেলনা কাকের দল।
আবার শুরু হলো বৃষ্টি, এবার ঝিরঝিরানিটা একটু জোরে। এত যে পাখির দল এখানে সেখানে কলতানে মত্ত ছিল কোথায় উধাও  হলো‌ কে জানে? 

Friday, 23 May 2025

আমফানের পাঁচ বছরের জন্মদিন

দেখতে দেখতে  আমফান পাঁচ বছরে পা দিল। ভয়ঙ্কর সেই অভিজ্ঞতা মনে এখনও  দগদগে ঘায়ের মতো রয়েছে ।ছেলেমেয়েদের পাঁচ বছরের জন্মদিন আজকাল খুব ঘটা করে পালন করা হয়। বাচ্চাদের জন্মদিন মানে সে এক ঘনঘটা। আগে বাড়িতে মা কাকিমারা একটু পায়েস করে দিত, সঙ্গে একটু দু চার রকমের ভাজা আর একটু মাংস। তখন খুব কম বাড়িতে মুরগীর মাংস ঢুকত। যৌথ পরিবারে এর বেশী সম্ভব হতো না। এখন পরিবার  হয়েছে ছোট,  বলা যায় সংক্ষিপ্ততম( যদি হয় একটা বাচ্চা) আর যদি একের থেকে দুই হয়। তাহলে পরিবার সম্পূর্ণ। কাকা, কাকিমা , জ্যাঠামশাই, জেঠিমা নামগুলো কেমন যেন  অচেনা শব্দ শোনায়। ঠাকু্র্দা, ঠাকুমাও যেন শোনা শোনা মনে হয়। তবু মন্দের ভাল মাসিমা ও মেসোমশাই যেটা তার মেদ বর্জন করে হয়েছে মাসি ও মেসো এবং দাদু ও দিদু( দিদিমাও ফিগার নিয়ে সচেতন)একটু চেনা চেনা মনে হয় এবং ইংরেজিতে কাজিন বললে মাসতুতো ও মামাতো ভাইবোনদের বোঝায়, পিসতুতো,  খুড়তুতো ও জ্যাঠতুতো ভাইবোনদের  একটা আলাদা  ইংরেজি প্রতিশব্দের খোঁজে আছেন অভিধান প্রণয়িতারা। যাই হোক  বাচ্চাদের জন্মদিনে এখন কেক কাটা আবশ্যিক, পায়েস হলেও সেটা এক চামচ বা বড়জোর দুচামচ । বাচ্চারা আজকাল  মিষ্টি এড়িয়ে চলে মোটা হয়ে যাবার ভয়ে। সারাদিন  স্কুল,  টিউশন করে খেলাধূলোর সময় নেই,  তাহলে গোলগাল লাল্লু লাল্লু হবে না তো কি হবে?  তাদের মিষ্টি বর্জন তো স্বাভাবিক । এখন বাচ্চাদের বন্ধুবান্ধব এবং  তারা একা আসতে পারবে না বলে তাদের বাবা, মাকে( নিদেন পক্ষে মা) বলতেই হয় আর তা ও সম্ভব না হলে বাচ্চাদের ন্যানিকে নিয়ে আসতে হয়। জন্মদিনের এই ঘনঘটা পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সে এক মহাসমারোহ।

আমফান এর পাঁচবছর পূর্তি আমরা কেউ সেইভাবে মানাতে পারিনি কারণ তার দাপাদাপির ভয়ানক নির্ঘোষ আজও  মনে আছে ভীষণভাবে । গোঁ গোঁ শব্দে ১৫০/১৬০ কিলোমিটার বেগে উত্তর পূর্ব দিক থেকে ধেয়ে আসা ঝড়ের গতি যে কি ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরী করে তা যারা না দেখেছেন তাঁরা কিছুতেই বুঝতে পারবেন না। কলকাতা শহর তো সমুদ্র থেকে প্রায়‌ দুশো কিলোমিটার দূরে  কিন্তু তা সত্ত্বেও তার যা প্রকোপ পড়েছে তাহলে সমুদ্রের ধারে  যে কি অবস্থা তা সহজেই অনুমেয় । কংক্রিটের  বিরাটজঙ্গলে ভরা কলকাতা শহরের গল্ফগ্রীন তো সবুজে সবুজময় গাছপালার আধিক্য এখানে অনেক বেশী অন্য জায়গার তুলনায় । সবুজ গল্ফগ্রীনে তাই ঝড়ের মাতন আলাদা। গাছগুলো প্রাণপণ চেষ্টা করছে তাদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে কিন্তু নাছোড়বান্দা ঝড়ের সঙ্গে কতক্ষণ যুঝতে পারে সেটাই  দেখার বিষয় । দক্ষিণ দিকে একটা বিরাট দারুণ সুন্দরী ইউক্যালিপটাস গাছ ঝড়ের কাছে হাত জোড় করে মিনতি করছে তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কিন্তু নির্দয় আমফানের হৃদয় গলে না কিন্তু তাকে একেবারে মেরে না ফেলে তার অঙ্গ ছেদন করে ছেড়ে দিল । সুন্দরী ইউক্যালিপটাস মনের দুঃখে অন্নজল ত্যাগ করে মৃত্যু বরণ করল। এদিকে ওদিকে যারা বড় যোদ্ধা বলে নিজেদের উপস্থিতি জাহির করত তাদের  একে একে সমূলে উৎপাটিত করে ফেলল আমফান ।  ফেজ থ্রি অ্যাসোসিয়েশন হলের বাঁ দিকে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ ও ডানদিকে একটা রাধাচূড়া গাছ পরস্পর পরস্পরের সম্পূরক ছিল। কৃষ্ণচূড়ার লাল রং আমফানের সহ্য হলো না, তাকে সমূলে উৎপাটিত করে ফেলল আর অনেক কাকুতি মিনতি করায় রাধাচূড়োর ঝুঁটি ছেঁটে দিয়ে তাকে অব্যাহতি দিল। পিছনের হিলহিলে সুপুরী গাছ আমফান যা বলে তাই করে, সুতরাং সে একেবারই ছাড় পেয়ে গেল কিন্তু সে তার পাঁচ বছরের জন্মদিন পালন করতে পারল না, অসুস্থতার কারণে  কর্পোরেশনের লোকজন তাকে কেটে ফেলল। একটা ছোট্ট তিন কোণা পার্কে দুটো কাঠবাদামের গাছ তারাও একদম ছাড় পেলনা কিন্তু তাদের গোস্তাখি সেবারের মতো মাফ করে দিল কিন্তু অবশ‌্য ই তাদের হাত পা ভেঙে দিয়ে।
হাজার হলেও  আমফান তো নিছক ঝড় নয়, সে প্রবল সামুদ্রিক ঝড়। তাকে তো সম্মান জানাতেই হয়। তার জন্মদিনে আমরা ফেজ থ্রির অধিবাসীরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটকের গানের রিহার্সাল দিচ্ছিলাম। যেই না শেষ হলো রিহার্সাল,  অমনি শুরু হলো গোঁ গোঁ আওয়াজে আমফানের পদধ্বনি। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসে জানলা, দরজা বন্ধ করে তাকে স্বাগত জানালাম । আমফান  মোটামুটি খুশী যে আমরা তাকে ভুলে যাইনি এবং একটা সাময়িক ঝলকে আমাদের  গা হাত পা জ্বলে যাওয়া গরম থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে তার আমাদের  প্রতি খুশীর বার্তা দিয়ে বলে গেল," ভুলিও না মোরে কভু, ছিলেম আমি, আছি আমি, থাকব সদাই তবু।"