Friday, 5 September 2025

শিক্ষক দিবসে গুরু প্রণাম

আজ পাঁচ ই সেপ্টেম্বর, শিক্ষক দিবস হিসেবে আজ বিশেষ সমারোহে দেশব্যাপী উৎসবে মাতোয়ারা। আজ এই বিশেষ দিনে বিভিন্ন ব্যক্তি তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন। একঘেয়েমি যাতে না আসে সেই কারণেই এই বিষয়ে কিছু বক্তব্য রাখতে গেলে একটু ভিন্ন কি লেখা যায় তা নিয়ে বিশেষ চিন্তায় রয়েছি।
প্রথম থেকে শুরু করতে গেলে অনেক নাম এসে ভিড় করে, সুতরাং বিশেষ কয়েকজনের সম্বন্ধেই লিখতে হবে নাহলে লিখতে লিখতে শিক্ষক দিবসটাই শেষ হয়ে যাবে। বাড়িতে প্রথম গুরু বাবা ও মাকে বাদ দিলে মনে পড়ে বড়দির ( জ্যাঠামশাইয়ের মা) কথা যাঁর  কথা না বললে ভীষণ  অসম্পূর্ণ হয়ে যাবে। মালা জপতে জপতে কখন যে গল্প বলার মাঝে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন তা জানতেই পারতাম না। ঠাকুমা আমার ভয়ানক রাশভারী ছিলেন এবং যত ই বয়স কম হোক না কেন বেচাল দেখলে এমন ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকাতেন ভয়ে পালাতে পারলে বাঁচি। আর বড়দি ঠিক উল্টো, বাড়ির সব বাচ্চারাই তাঁর বড় ন্যাওটা। গল্প বলা বিশেষ করে বাচ্চাদের সামনে উপস্থাপন করা তাদের লেভেলে গিয়ে সে এক ভয়ানক কঠিন কাজ। কি যে গল্প বলতেন যা ঠাকুরমার ঝুলি বা ঠাকুর্দার থলিতেও পাওয়া যেত না। খানিকটা নিজে বানিয়ে বানিয়ে বলতেন হয়তো। কি অসাধারণ প্রতিভাময়ী ছিলেন , গল্পের যোগসূত্র কখনোই ছিন্ন হতোনা। আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের সব  বাচ্চারাই তাঁর চারপাশে ঘিরে থাকতো। সবার মধ্যে আমার ও ছোড়দির একটা বিশেষ স্থান ছিল তাঁর হৃদয়ে।
বয়স একটু বাড়তেই বাড়ির কাছেই স্বর্গধামে ভর্তি করে দিল ক্লাস ওয়ানে। তখন তো আর নার্শারী বা প্রিপারেটরি বলে কিছু ছিল না, সরাসরি ক্লাস ওয়ানে। সেখানে ঊর্মিলা দির সদা হাস্যমুখ বাচ্চাদের জন্য এক আদর্শ জিনিস কিন্তু একজন দাদু মাস্টারের ক্লাস ফোরের ছেলেকে প্রচণ্ড মারধর স্কুলে যাওয়াকে এক ভীতির পর্যায়ে নিয়ে গেল। দুটো বাড়ির পরেই তৃতীয় বাড়িটাই স্বর্গধাম স্কুল কিন্তু আমার ঐদিন থেকে স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। বাবা, মা ,দিদিরা মায় ঊর্মিলা দি পর্যন্ত বাড়ি এসে নিয়ে যেতে চাইলেও স্কুল যাওয়া আমার নেই। বাড়ির সবাই প্রমাদ গণলো ,ভাবল এর দ্বারা লেখাপড়া কিছুই হবেনা, কোন মুদীর দোকানে কাজ করে খেতে হবে। কিন্তু বড়দির সেই ভালবাসা মেশানো গল্পের ফাঁকে ফাঁকে নানান জিনিস পড়িয়ে দেওয়া ছবিটাই পাল্টে দিল। পরের বছর শহরের সবচেয়ে নামী স্কুল পাঁচ থাম( স্তম্ভ) ওয়ালা রাজবাড়ির মতো দোতলা স্কুলের প্রাইমারি সেকশনে ক্লাস থ্রি তে ভর্তি করে দিল। বাবলি বাবু( হেড মাস্টার মশাই), কন্দর্প বাবু, হীরেন বাবু ও তাঁর ভাই রমেন বাবু এবং ডিস্ট্রিক্ট ইন্সপেক্টর অব স্কুলসের ছেলে দিলীপ অধিকারী। বাবলি বাবু খুব  ভাল গান করতেন এবং ক্ল্যাসিকাল গান শেখাতেন। সকাল বেলায় স্কুল, টিফিন দেওয়া হতো, হঠাৎ কি একটা কারণে স্কুলে টিফিন দেওয়া বন্ধ হয়ে গেল। সবসময়েই কিছু পাকা দাদা টাইপের ছেলে থাকে। এঁরা হয়তো সময়ের থেকে একটু বেশি এগিয়ে থাকায় পড়াশোনায় তেমন কিছু করে উঠতে পারেনা। তখন শীতকাল, সুশান্তর গায়ের চাদর টা সামনে সুশান্তর সঙ্গে হাত লাগিয়েছে তপন এবং পিছনে আরও দুজন চারটে কোণ ধরে " টিফিন দেওয়া বন্ধ করা চলবে না, চলবে না" শ্লোগান দিতে দিতে বিশাল করিডরে খুদেদের মিছিল চলছে, হঠাৎ ই কে বলে উঠল হেডমাস্টার মশাই আসছেন। এক মূহুর্তে মিছিল ভোঁ ভাঁ। সবাই দৌড়ে পালিয়েছে, আমি আর দীপক পালাতে পারিনি মানে পালাতে গিয়ে পায়ে পা জড়িয়ে পড়ে গেছি আর শাস্তি হলো বেঞ্চের উপর কান ধরে দাঁড়ানো। তখন থেকেই ঠিক করেছি যে প্রাণ চলে যাক, যত ই ভীতুর ডিম বলুক লোকে , মিছিলে আর হাঁটব না। আজকের দিনেও মিছিলে নেতাদের গায়ে চট করে হাত পড়েনা, চ্যালা চামুণ্ডাগুলোই পুলিশের লাঠি বা কাঁদানে গ্যাস বা জল কামানের শিকার হয়। নেতাদের বলা হয় চলুন, এবার গাড়িতে উঠুন। আর কিছু কুচো কাচা নেতা যাদের স্বপ্ন ই হচ্ছে নেতা হয়ে পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার, তারা পুলিশকে বলে স্যার আমাকেও একটু গাড়িতে ধরে তুলুন না। আর জায়গা নেই বললে হাতে পায়ে ধরে প্রায় কান্নাকাটি করে পুলিশ স্যারকে বলে গাড়িতে উঠে পড়ে। চিত্র সাংবাদিক ফটো তুললে ইশারায় তার ফটোটা যেন আসে এই অনুরোধ করে কারণ ওটাই হবে ভবিষ্যতের উত্থানের চাবিকাঠি।
কান ধরে বেঞ্চের উপর দাঁড়ানোর খবর বাড়িতে পৌঁছে গেছে আর বাড়ি ঢোকা মাত্রই রান্নাঘরের ডাঁটিসার পাখার বাড়ি জুটল কপালে। সেই দিন থেকে দু দুবার প্রচণ্ড অপমানের শিকার হয়ে আমি হলাম ভীতু সম্প্রদায়ভুক্ত।
বৃত্তি পরীক্ষা হলো, কোনদিন ই বৃত্তি পাওয়ার যোগ্য ছিলাম না তবে কাউকে ধরা করা না করেই উৎরে যেতাম। ক্লাস ফাইভে একজন বিশাল চেহারার মাস্টার মশাই এলেন ক্লাস টিচার হয়ে। তিনি আবার নাকি অঙ্ক করাবেন। অসম্ভব বেশি রকম পান খেতেন বলে কথাও কিছু বোঝার উপায় ছিল না আর সারা শরীরে ছিল অসম্ভব বেশি লোম। সব ছেলেরা ওঁকে বলত ভালুক স্যার। ভালুক স্যারের উপদ্রব বেশীদিন সইতে হয়নি কিন্তু অঙ্কের ভাল মাস্টার মশাই পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি এবং যথারীতি সব বিষয়ে মোটামুটি ভাল নম্বর পেলেও অঙ্কে কোনরকমে পাশ করলেই দাদু হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন। বাড়িতে দাদুর কাছে বীজগণিত ও ইংরেজির প্রশিক্ষণ পেতাম। তখন দাদু অসুস্থ, বাড়িতেই  দাদুকে স্যালাইন ও রক্ত দেওয়া হচ্ছে । কোন সময় ডান হাত আর কোন সময় বাঁ হাতে দেওয়া হচ্ছে । দাদু খেতেন  চুরুট । নিজের  হাতে ধরে চুরুট  খেতে না পেরে আমাকে  ডাকতেন এবং  চুরুট  ধরিয়ে ঠোঁটে কয়েকটা টান দিয়ে  কম্পালসরি মিলিটারি ট্রেনিং  রচনা লেখায় ডিকটেশন দিতেন। অসাধারণ স্মৃতি শক্তি । মিল্টনের  লিসিডাস মুখস্থ বলতেন । শেক্সপিয়ার আওড়াতেন। মারা যাওয়ার  আগের  দিন  পর্যন্ত উনি ডিকটেশন দিয়ে  গেছেন ।             ক্লাস  সিক্সে খগেন বাবু ক্লাস টিচার হলেন। খুবই ভাল মাস্টার মশাই। ইংরেজি ও ইতিহাসে এম এ পাশ করা খগেনবাবু সত্যিই আদর্শ মাস্টার মশাই। সিস্টেমেটিক ভাবে পড়ানোর জন্য ছাত্ররা সবাই ভাল রেজাল্ট করল এবং অবশ্যই একজন আদর্শ মাস্টার মশাই। স্কুলে বিভিন্ন রকম ছাত্র থাকে যারা  মাস্টার মশাইদের নাম বিকৃত করে অন্য নামে ডাকে। সেই স্যাররাও জানতেন কিন্তু লজ্জার মাথা খেয়ে কিছু বলতেন না। কোন একজন মাস্টার মশাই ক্লাসে ঢুকলেই হিস করে শব্দ শুরু হতো মানে ওঁর কথাবার্তা সবসময়ই এমন লেভেলে থাকতো যে ছাত্ররা গুল মারছেন বা গ্যাস দিচ্ছেন  বলে হিস করে শব্দ করতো। স্যার ক্লাসে ঢোকামাত্র ই যদি চারপাশ থেকে হিস হিস করে শব্দ আসে তাহলে উনি কি করে পড়াবেন?  স্যাররাও জানতেন যে  কে বা কারা করছে কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তাদের ঘাঁটাতেন না। একজন স্যারকে চাচা বলে ডাকতো এই বাঁদর গুলো। সবসময় কি মাথার ঠিক থাকে? রাগের চোটে বলে দিলেন বাবা বলে ডাকতে পারিস না? মুশকিল হলো এই কয়েকটা বাঁদর ছেলেদের জন্য আমার মতো বেশীরভাগ ভীতু সম্প্রদায়ভুক্ত ছাত্ররা ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কিন্তু কোন কোন মাস্টার মশাই ছিলেন যাঁদের উপস্থিতি সম্ভ্রম জোগাত। যেমন পার্সোনালিটি তেমনই পড়ানো। তাঁদের কোন ব্যাঙ্গ বিদ্রূপের সম্মুখীন হতে হয়নি। নিত্যহরি বাবু, কাবলি বাবু( রণেন), নারায়ন বাবু, বিজয় বাবু, পচন বাবু( কিশোরী মোহন সরকার ),রাখহরি বাবু, সমাদ্দার বাবুরা এই গোত্রীয়। এঁদের জন্য স্কুল থেকে প্রত্যেক বছরই জেলায় প্রথম এবং সারা বাংলায় উজ্জ্বল স্থান অধিকার করতো। 
কলেজেও বিভিন্ন বিভাগে নামকরা অধ্যাপকরা ছিলেন। আমাদের রসায়ন বিভাগের ধীরেন্দ্রনাথ রায়, জিতেন চন্দ, আশীষ চ্যাটার্জি, রাধেশ্যাম মণ্ডল , খগেন কর্মকার, নির্মল সরকার ও সুশীল সান্যাল আলো করে ছিলেন। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে জিতেন মুখার্জি, সুশীল সেন, দিলীপ কর, বীরেশ্বর বন্দোপাধ্যায়রা এক একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। অঙ্কে কৃতান্ত বসু , নিমাই চাঁদ বোলার, অসীম ধর, রাজকৃষ্ণ মাল ও বিজয় বিশ্বাস পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং অত্যন্ত উঁচুমানের অধ্যাপক ছিলেন যাঁদের সাহচর্য আমাদের ভবিষ্যত গড়ে দিয়েছে। ঠিক সেইরকম বিশ্ববিদ্যালয়ে অরুণাভ মজুমদারের অসাধারণ সহায়তা জীবনকে সম্পৃক্ত করেছে। 
কর্মজীবনেও শ্যামল ধর,  এন সুব্বা রাও, জে সুব্বা রাও এবং দীনকর রাও  ,অশোক ভট্টাচার্য  এবং রামাইয়া স্যারের সামনে থেকে কি করে পরিচালনা  করতে হয় তা শিখতে পেরেছি এবং সবার কাছেই আমি আমার কৃতজ্ঞতা জানাই। এইরকম গুরু বা মাস্টার মশাই ছাড়া নিজেকে যে জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছি তা কখনোই সম্ভব হতো না। তাঁদের সবাইকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।

Friday, 22 August 2025

পাণ্ডবদের বড়ঘুটু অভিযান

বিশাখাপটনমের পঞ্চপাণ্ডবরা কেরালা সফরের পরেই কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। বয়সজনিত কারণে তারা সেই আগের মতো মন হলেই বেরিয়ে পড়তে পারছেন না। অর্জুন ও গাণ্ডীব নিয়ে সেইরকম টঙ্কার দিতে পারছেন না। এই নাটকের দলের কুশীলবরা বয়সের ভারে কেমন যেন ন্যূব্জ কুব্জ হয়ে পড়েছেন বা জীবনের নানান সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছেন এবং প্রাথমিকতাও স্বাভাবিক ভাবেই বদলে যাচ্ছে। যুধিষ্ঠির এবং তাঁর ভার্যা দেবিকার দুইজনেরই হাঁটু প্রতিস্থাপন হয়েছে, ভগ্নী দুঃশলা যিনি যুধিষ্ঠিরের সঙ্গেই থাকতেন তাঁর ও নিম্নাঙ্গ অবশ হয়ে গেছে, ভীম ও ভালন্ধারা কেরালা সফরের পরেই অসুস্থতার কারণে গদা সঞ্চালনে প্রায় অক্ষম, অর্জুন ও অপারেশনের পরে গাণ্ডীবের টঙ্কারে সেইরকম ভীতি সঞ্চার না করলেও অনেকটাই পুরনো ফর্মে ফিরে এসেছেন। সুভদ্রাই বা কেন পিছিয়ে থাকবেন, তাঁর ও অপারেশন হয়েছে। নকুলের গলব্লাডার অপারেশন ও কারেনুমতির হাঁটু প্রতিস্থাপন ও সহদেবের হাঁটু প্রতিস্থাপন হয়েছে কিন্তু তিনি কিছুটা হলেও সামলে উঠেছেন। অতএব কোন নতুন নাটক মঞ্চস্থ করতে গেলে যুধিষ্ঠির ও ভীমের বদলি চাই ই চাই। গতবছর ২১শে আগস্ট আরাকুভ্যালি অভিযানে যুধিষ্ঠির, দেবিকা, ভীম ও ভালন্ধারার বদলি পাওয়া না গেলেও  পাওয়া গিয়েছিল কৃষ্ণ ও রুক্মিণী  এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন ও ধানুমতীকে কিন্তু দুঃশলা বোনের বদলি না পাওয়ায় চিত্রনাট্যে কিছু রদবদল করতে হয়েছিল এবং সহোদর জায়া বিজয়া ও সুদূর আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছিলেন। নকুল ও কারেনুমতিও সেই অভিযানে ছিলেন না এবং এবার ও সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহেই আমেরিকার উদ্দেশ্যে আকাশ মার্গে যাত্রা করবেন। আমেরিকা থেকে সদ্যফেরত অর্জুন ও সুভদ্রার উপর একটা বাড়তি চাপ স্বভাবতই রয়েছে কোন অভিযানের পরিকল্পনা করা নিয়ে। বরাবরের মতই পাণ্ডবত্রাতা বিচক্ষণ অর্জুন সহদেবকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভ্রমণ সহায়ক বিভাগের ডালহৌসি স্কোয়ারের অফিসে। পরিকল্পনা ছিল দুর্গাপুর নিবাসী ধৃষ্টদ্যুম্নকে নিয়ে মাইথন অভিযানে কিন্তু মনোমত গেস্ট হাউস না পাওয়ায় লালমাটির দেশ মুকুট মনিপুরের অদূরে বড়ঘুটু অতিথি নিবাসে ব্যবস্থা হলো ২০শে আগস্ট একদিনের জন্য। মুকুটমনিপুরের কথা মনে পড়তেই কার যেন লেখা কয়েকটি ছন্দোবদ্ধ শব্দ মনে পড়ে গেল ,
"বাঁধের জলে ভোরের আকাশ ,
বৃষ্টি সবুজ জংলা দুপুর,
লালমাটিতে সন্ধ্যে মেশে,
ধামসা মাদল সাঁওতালি সুর,
ঘরের কাছেই মোটেই না দূর,
চলুন এবার মুকুট মনিপুর।"
দেখতে দেখতে ছয়টা বছর কিভাবে কেটে গেছে জানিনা, তবে স্মৃতিতে এখনও যথেষ্ট সতেজ। পিয়ারলেস গেস্ট হাউসে ভীম ও ভালন্ধারাকে একটা কটেজে ঢুকিয়ে দিয়ে দেবিকা, সুভদ্রা, বিজয়া ও দুঃশলা একটা বড় ঘরে এবং যুধিষ্ঠির, অর্জুন ও সহদেব আরও একটি ঘরে দারুণ আনন্দে রাত কাটিয়েছিল। সকাল বেলায় চায়ের আসর দেবিকা, বিজয়া ও সুভদ্রাদের ঘরে বসেছিল এবং যথারীতি দুঃশলা চায়ের সঙ্গে বিস্কুট ও কেকের ব্যবস্থা করেছিল। আগের দিন রাতে অনেক রাত অবধি হাউসি খেলা তাদের ঘুমের মাত্রা কমিয়ে দিলেও উৎসাহে কিন্তু এতটুকু ভাটা পড়েনি। জলখাবার খেয়েই মুকুটমনিপুরের নদীর জলে নৌকা বিহার ছিল এক আলাদা অভিজ্ঞতা। এই স্মৃতি মনে পড়তেই গুনগুন করে গানের কলি মনে পড়ে গেল," অলি বারবার ফিরে আসে, অলি বারবার ফিরে যায়।" মুকুটমনিপু্রের কাছেই এই বড়ঘুটু অতিথি নিবাস।
তাই বেশ, নাই মামার চাইতে তো কানা মামা ভাল। 
অর্জুনের ব্যবস্থাপনা একদম ঠিকঠাক। ২০শে আগস্ট গাড়িতে বসে সকাল ৬টায় রওনা দিয়ে ৬টা বেজে ২০ মিনিটে সহদেবকে তুলে৬টা ৪৫ মিনিটে নকুল ও কারেনুমতিকে তোলা হলো। এরপর ধানুমতিকে (ধৃষ্টদ্যুম্ন জায়া )তুলে যাত্রা শুরু হলো দুর্গাপুরের পথে যেখানে আছেন ধৃষ্টদ্যুম্ন । বিজয়া মেয়ের কাছে ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকার জন্য এবং কৃষ্ণ ও রুক্মিণীর ঐদিন ই আমেরিকার পথে যাত্রা করার জন্য এই বড়ঘুটু অভিযানে সামিল হননি। প্রাতরাশ সারার জন্য বাছাই হলো গুড়াপস্থিত হিন্দুস্তান ধাবা। আলুর পরোটা ও লুচির মতো পুরি ও ছোলার ডাল এবং মিষ্টি ও চা দিয়ে প্রাতরাশ সেরে দুর্গাপুরের পথে ধৃষ্টদ্যুম্নকে তোলার ব্যবস্থা হলো এবং বড়ঘুটু পৌঁছাতে হয়ে গেল প্রায় আড়াইটা। চেক ইন করেই খেতে বসে যাওয়া। ম্যানেজার শান্তনু ঘোষকে বলেই রাখা ছিল নিরামিষ থালির কথা। ঘি, বেগুন ভাজা, মুগডালের সঙ্গে পোস্তর বড়া ও দুরকম তরকারি ও চাটনি পাঁপড় ভাজা ও মিষ্টি দিয়ে দারুণ সুস্বাদু খাবার আর তার সঙ্গে নরেন কর্মকার, ভবতোষ দেব(বাসু) ও প্রতীক দাসের আতিথেয়তা ভুলিয়ে দিল গেস্টহাউসের খামতি। সরকারি গেস্টহাউসের এইখানেই সীমাবদ্ধতা। কি করলে যে কাস্টমার আরও ভালভাবে উপভোগ করবে সেইদিকে নজর দেওয়াটা তাদের প্রাথমিকতার মধ্যে পড়ে কিনা সন্দেহ আছে। কিন্তু এইসমস্ত ছেলে বা কর্মীদের আন্তরিকতা সত্যিই মনে রাখার মতো। বুকিং করার সময় অফিসের ম্যানেজারের যা বক্তব্য তার সঙ্গে কিন্তু বিস্তর তফাৎ। যাই হোক, সূর্যাস্ত দেখার জন্য ঐ অতিথিশালার মধ্যেই টিলায় উঠতে হলো এবং নয়নাভিরাম দৃশ্য মোবাইলে ক্যামেরাবন্দী হলো। ওখানে আসা আর একজন অতিথি সাবধান করে দিলেন বিছে ও কাঁকড়াবিছে সম্বন্ধে। বেসিনের কল খুলতেই ইঞ্চি নয়েক একটা তেঁতুল বিছের ছবি দেখালেন এবং জামা কাপড় বা মোজা জুতো পরার আগে ভাল করে নে
ঝেড়ে নিতে বললেন। ভয় ধরে গেল মনে, রাতে ঘুমোচ্ছি, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল , টর্চ জ্বেলে দেখে নিলাম যে কোন বিছের আগমন হয়েছে কিনা। আমাদের ড্রাইভার জগদীশ বাইরে বেঞ্চে বসে রাতের নিস্তব্ধতা উপভোগ করছিল, হঠাৎ একটা চিরচিরে জ্বলুনি -- একটা ছোট বিছের আক্রমণ। সময়মতো সেটাকে মুক্ত করেছে বলেই বেঁচে গেল নাহলে ফিরে আসা একটা দুষ্কর কাজ হয়ে যেত। রাতে দেশী কায়দায় চিকেন কারি ও রুটি এবং শেষে মিষ্টি আলাদা মাত্রা আনল।
পরদিন সকাল। ভোরবেলা সহদেব ও ধৃষ্টদ্যুম্ন বেরিয়েছে গ্রাম দেখতে, সঙ্গে সাথী লাল্টু, পল্টু, ঘন্টু ও চুটকি। দূর থেকে আসা লোকজনদের জিজ্ঞেস করছি কোথায় চা ও বিস্কুট ( লাল্টু, পল্টুদের জন্য) পাওয়া যেতে পারে। গতকাল পৌঁছানোর পরেই ওরা আমাদের সাথী। গ্রামের জীব তো, শহরের প্যাঁচ পয়জার ওদের মধ্যে ঢোকেনি। গায়ে, মাথায় হাত বোলানোর অভ্যেসটা বন্ধু দাশুর কাছ থেকে পাওয়া। একটু ভালবাসাতেই তাদের লেজ নাড়ানোয় কমতি নেই। ধৃষ্টদ্যুম্ন গিয়ে ওপর থেকে টাকা নিয়ে এল আর আমরা একে তাকে জিজ্ঞেস করতে করতে কখন দু কিলোমিটার চলে এসেছি চায়ের তেষ্টা মেটাতে ও সঙ্গী সাথীদের বিস্কুটের চাহিদা জোগাতে। গাঁয়ের ছেলেমেয়েরা দাঁতন করছে এবং পথনির্দেশ করছে কোথায় দোকান পাওয়া যাবে। অবশেষে গ্রামের বেশ ভেতরে চলে এসেছি। চা যদিও ভাগ্যে জুটলো না কিন্তু আমাদের সহযোগীদের জন্য বিস্কুট পাওয়া গেল। তিন প্যাকেট বিস্কুট কিনে আমরা ওদের খাওয়াতে খাওয়াতে ফিরে এলাম এবং চা খেয়েই উঠলাম। স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট ( কমপ্লিমেন্টারি বা ফোঁকটে) করলাম, এককথায় দুর্দান্ত।পৌনে দশটা নাগাদ মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম এবং কাঁসাই শিলাই এর সঙ্গমস্থলে এলাম এবং বাঁধের ওপর উঠে নয়নাভিরাম দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করে রওনা দিলাম দুর্গাপুরের উদ্দেশ্যে। মাঝপথে শুরু  হলো বৃষ্টি এবং তার নাচন কোঁদনে রীতিমতো  ভয় ধরে গেল। দেখতে দেখতে দু্র্গাপু্র এসে গেল। ধৃষ্টদ্যুম্ন আর ধানুমতী লাঞ্চ সেরে ওখানেই থেকে গেল আর অর্জুন, সুভদ্রা, নকুল, কারেনুমতি ও সহদেব ফিরে এল কলকাতায়। ছোট্ট অথচ নিটোল অভিযান,মনে রাখার মতো।

Sunday, 17 August 2025

দাসুর পশুপ্রেম

মফস্বলের ছেলে দাশু একেবারে এলেবেলে ছেলে না হলেও খুব ভাল কিছু ও নয়। মোটামুটি ভাবে পাশ করে যায়। একটু হাঁফালো চেহারা বলে বন্ধুদের উপর খবরদারি করা স্বভাব আছে। তবে মনটা বেশ ভাল আর পশুপাখির প্রতি ওর একটা স্বভাবসিদ্ধ প্রেম বা আকর্ষণ আছে। ছোটবেলায় কোন স্যার পড়িয়েছিলেন "বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর
জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর" ওর মনে ভীষণ ভাবে গেঁথে গিয়েছিল। ছোট থেকেই একটু ক্যাবলা গোছের দাশু পকেটে মুড়ি কিংবা বিস্কুট নিয়ে বেরোত এবং পাড়ার কুকুর লালু, ভোলা, টমি ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গোরা সব ওর পিছন পিছন চলত এবং নিজেদের সীমানা অবধি তো যেত ই , দলবেঁধে অন্যদের ডেরায় ও কখনো সখনো চলে যেত। অনেকেই ওকে ঠাট্টা করে বলতো হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা। কিন্তু সাদাসিধে টাইপের দাশু কিছু মনে করতো না, বরঞ্চ কুকুর বিড়াল বা পশুপাখির মধ্যেই যেন ও ভাল থাকত কারণ অন্য বন্ধুরা ওকে দেখলেই টিটকারী মারত যেটা ওর পছন্দের ছিলনা এবং প্রতিবাদ করলেই ঝগড়াঝাঁটি এবং কোন কোন সময় তা হাতাহাতির পর্যায়েও চলে যেত। তার থেকে ঢের গুনে ভাল এই অবলা জীবজন্তুগুলোর মধ্যে থাকা।  এই পৃথিবীতে সবাই একটু গুরুত্ব পেতে চায়, দাশুই বা তার ব্যতিক্রম কিভাবে হবে? লালু, ভোলা, টমিরা কোন প্রতিবাদ করেনা, ওরা মাঝেমধ্যে একটু মুড়ি বা বিস্কুট পেয়েই সন্তুষ্ট। ওপর বয়সী অন্য ছেলেরা কুকুর দেখলেই ইটের টুকরো তাক করে ছুঁড়ত আর কখনো পায়ে বা গায়ে লাগলে কাঁই কাঁই করে আর্তনাদ করত আর ওদের আর্তনাদ শুনলেই দাশু ঠিক থাকতে না পেরে তাড়া করত যে ঢিল ছুঁড়েছে তার প্রতি এবং তাকে পাকড়াও করে দুচার থাপ্পড় লাগিয়ে দিত। আর এই কারণেই এসব সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে লেগে যেত ঝগড়া। তাদের সবার অনুযোগ যে পাড়ার সব কুকুরগুলোই কি দাশুর যে ওদের ঢিল মারলেই দাশু ফিরে আসবে মারতে? আর দাশুর বক্তব্য ছিল ঐ ঢিলটা যদি তাদের মারা যায় তাহলে ওদের কি লাগবে না? তাহলে শুধু শুধু কেন ঢিল ছোঁড়া তাদের প্রতি যখন তারা কোন দোষ করেনি?

আজ ষাট পঁয়ষট্টি বছর পরে এই তরজা আজ দেশ জুড়ে। সারমেয়প্রেমী বনাম সারমেয় বিদ্বেষী বা নিরপেক্ষ, পৌঁছেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দরজায় এবং আদালত রায় দিয়েছেন যে সারমেয়কুলকে রাস্তাঘাটে যথেচ্ছভাবে চলাফেরা করতে দেওয়া হবেনা এবং তাদের একটা বিশেষ জায়গায় রাখতে হবে যার নাম হবে সারমেয় নগর। সেখানে আর কেউ থাকবে না দাশু, হরি বা বাবলারা যারা ওদের বিস্কুট ভেঙে খাওয়াবে বা মুড়ি বা অন্যান্য খাবার খাওয়াবে।  যেখানে সবাই কুকুর সেখানে নিশ্চয়ই এলাকা দখল থাকবে যেমন মানুষের মধ্যে এক মস্তান বনাম আর এক মস্তান থাকে। মানুষের মধ্যে না হয় বিবাদ মেটানোর জন্য কাউন্সিলর বা বিধায়ক বা বেশি বাড়াবাড়ি হলে থানা, পুলিশ বা মহামান্য বিচারপতি হস্তক্ষেপ করতে পারেন কিন্তু সারমেয় খুলে বিবাদ হলে মিউনিসিপ্যালিটি বা কর্পোরেশনের পক্ষে দায়িত্বে থাকা লোকজন সেটাকে সামলাবেন না কেল্লা ফতে করার জন্য বিষ প্রয়োগ করে তাদের সরিয়ে দেবেন?  মানুষ যখন কাজ করতে হবে বলে করে, তখন তা হয় দায়সারা আর যদি সে অন্তরের ভালবাসা মিশিয়ে কাজটা করে তখন তার মাত্রা হয় আলাদা।

দাশু আর ইহজগতে নেই। থাকলে নিশ্চয়ই এই কাজের দায়িত্ব সে নিজে চেয়ে নিত এটা হলফ করে বলতে পারি। দাশু কিন্তু দু দুবার চৌদ্দটা করে আটাশটা ইঞ্জেকশন নিয়েছে এ সারমেয়দের কামড়ে। প্রথমবার বন্ধু দীপকের বাড়ি থেকে গল্পের বই আনতে গিয়ে ফকির কাকার কুকুরের কামড় খেয়ে। হাসপাতালের কম্পাউন্ডার পবিত্র বাবুর কুকুর কুকুর ডাকে সচকিত হয়ে হাফপ্যান্টের বোতামটা আলগা করে নাভির নিচে নামিয়ে পুটুশ করে ইঞ্জেকশন নিত আর পেটের ঐ জায়গাটা ছোট্ট টমেটোর মতো ফুলে উঠত। দ্বিতীয়বার যখন দাশুর কপালে জোটে কামড় তখন সে রীতিমতো যুবক। ভবানীপুরে শ্বশুরবাড়িতে বৌ ছেলেকে নামিয়ে দিয়ে মিত্রস্কূলের সামনে বাস স্টপে দাঁড়িয়ে আছে অফিস যাওয়ার জন্য। হঠাৎ ই এসপ্ল্যনেডগামী একটা মিনি বাস অনেক ভিড় থাকার জন্য ঐ স্টপে না থেমে স্পীড বাড়িয়ে চলে যাওয়ার মুখে একটা কুকুরের দুর্মতি  হয় রাস্তা পেরোনোর জন্য এবং অবধারিত ভাবে ধাক্কা খেয়ে বোঁ বোঁ করে ঘুরতে ঘুরতে মিনিবাসের সামনের চাকার ডানদিকে নিজের পেটটা চেপে ধরে যেমন আমাদের কোন জায়গায় ধাক্কা লাগলে বা কেটে গেলে আমরা সেই জায়গাটা চেপে ধরি। মিনিবাসটা ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে থেমে গেছে। রাস্তায় এত লোক কিন্তু দাশু গেল এগিয়ে , দুহাত দিয়ে আস্তে করে কুকুরটাকে সরিয়ে দিয়ে পাশে থাকা টিউবওয়েল থেকে আঁজলভরে জল নিয়ে কুকুরের মুখে দিতে গেল আর কুকুরটা জল খেয়ে মারা যাওয়ার আগে ওর বাঁ হাতে ব্যথার চোটে কামড়ে দিল অবশ্যই বুঝতে না পেরে। কোমড়ের উপর কামড় ,অতএব দশ মিলিমিটার করে ফের চৌদ্দটা ইঞ্জেকশন। কিন্তু এ সত্ত্বেও দাশুর সারমেয় প্রীতি বিন্দুমাত্র কমেনি বরং বেড়েছে। শুধু কুকুর ই নয়, বিড়াল বা অন্যান্য পশুপাখির প্রতি ওর বিশেষ ভালবাসা সবসময়ই চোখে পড়ত। কিন্তু দাশু আজ আর নেই। বেঁচে থাকলে সুপ্রিম কোর্টের এই  আদেশ নিয়ে যে ওর কি প্রতিক্রিয়া হতো তা ভাবতেও পারছিনা।
কথায় আছে ন্যাড়া বেলতলায় যায় একবার কিন্তু দাশুরা যায় বারবার। পৃথিবীতে এইরকম দাশু না থাকলে  একেবারে বিবর্ণময় হয়ে যাবে।

Tuesday, 12 August 2025

বিনিময়

প্রত্যেক জীবজন্তুই কিছু প্রত্যাশা করে, কোন কাজের বিনিময়ে টাকা কিংবা প্রশংসা বা টাকার বিনিময়ে কিছু কাজের বরাত যেটাকে একটু খারাপ ভাবে বললে শোনায় ঘুষ বা ভালভাবে বিচার করলে বলা যায় ভালবাসার বিনিময়ে ভালবাসা বা স্নেহের বিনিময়ে শ্রদ্ধা। যদিও গীতায় লেখা আছে কাজ করে যাও কোন ফলের আশা না করেই। এটা যত সহজে বলা যায় বাস্তবে ততটাই কঠিন। সৎকর্ম করে যদি তার স্বীকৃতি না পাওয়া যায় তাহলে সে কতদিন সেই ধরণের কাজ করবে তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বর্তমান পৃথিবীতে সবাই যখন নিজের লাভের জন্য ছুটছে তখন মুষ্টিমেয় কিছু নির্লোভ লোক তাতে বিরত থাকবে এটা আশা করা একটা বাতুলতা মাত্র। তবুও কিছু লোক নিশ্চয়ই রয়েছেন যাঁরা গীতার বাণী অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন এবং হয়তো তাঁদের জন্যই এই কথাটা " কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন" এখনও লোকের মুখে শোনা যায়। অনেকেই গীতার বাণী কথায় কথায় উদ্ধৃত করেন কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে কতটা মেনে চলেন তাতে ঘোর সন্দেহ আছে। তবু একটা কিছু শক্ত খুঁটি দরকার যাকে কেন্দ্র করে গরু ছাগলরা চরে খেতে পারে কিন্তু বৃত্তের বাইরে যেতে পারেনা। খুঁটি যদি শক্ত না হয় তাহলে চরতে চরতে টানে খুঁটিটাই উপড়ে যাবে এবং সবকিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে যাবে। সমুদ্রের ধারে পাহাড়ের গায়ে ঢেউগুলো আছড়ে পড়ে এবং ফিরে আসে দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে কিন্তু পাহাড় অটল অবিচল, দাঁড়িয়ে থাকে আর মৃদু মৃদু হাসে। ধর্মগ্রন্থগুলো ও অনেক টা সেই রকম, আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় কি করা উচিত আর কি না করা।
আমরা পড়ি এই ধর্মগ্রন্থ কিন্তু কতটা মেনে চলি তা আমাদের আধারের উপর নির্ভর করে। এই আধারটাও তৈরী হয় আমরা কিভাবে মানুষ হচ্ছি তার উপর। যে বাড়ির বড় মানুষদের মূল্যবোধ প্রবল সেখানে ছেলেমেয়েরা ও সেই গুণ সবটা না হলেও কিছুটা আত্মস্থ করে। তবে কি চোরের ছেলে ভাল মানুষ হয়না? নিশ্চয়ই হয় কারণ পাঁকেই পদ্মফুল ফোটে। অনেকেই আছেন যাঁরা কথায় কথায় ধর্মগ্রন্থের বাণী বা শ্লোক উচ্চারণ করেন কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তাঁদের আচরণ বিপরীত। তাঁদের জন্য এই কথাটা উপযুক্ত," আমি যা বলছি তাই কর কিন্তু আমি যা করছি তার কোর না।" এঁরা হচ্ছেন ভণ্ড এবং এঁদের আধিক্য ই চতুর্দিকে বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে।
কিন্তু তা বলে কি নিঃস্বার্থপর লোকজন নেই? অবশ্যই আছেন যদিও সংখ্যায় ভীষণ কম। এঁদের জন্য সম্মান ছাড়া আর কিছুই নেই কিন্তু এঁরা কে সম্মান দিল বা দিল না তার তোয়াক্কা করেন না এবং নিজেদের কর্মপথে অবিচল থাকেন। আর এঁদের জন্য ই পৃথিবী এখনও সচল। এঁরা অনেকটা সূর্যের মতন। সূর্য যেমন তার প্রভা দিয়ে পৃথিবীর ৮০০ কোটি মানুষের বেঁচে থাকতে সাহায্য করেও বিনিময়ে কিছুই চায়না এঁরা ও সেইরকম কারো কাছে কোন কিছু প্রত্যাশা না করেই নিজেদের কাজ করে যান। ভগবান এঁদের বাঁচিয়ে রাখুন।

Monday, 28 July 2025

পিতিবেশী

প্রতিবেশী শব্দটা অপভ্রংশ হয়ে পিতিবেশী হয়েছেন আমার ঠাকুমার ( আমরা দাদি বলতাম) কল্যাণে। জমিদার কন্যা ব্রিটিশ আমলে জজসাহেবের পুত্রবধূ, যাঁর স্বামী ও ব্রিটিশ সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যাঁকে অফিস নিয়ে যাওয়া বা বাড়িতে আসার সময় চোগা চাপকান ও পাগড়ি পরিহিত বিরাট গোঁফ ওয়ালা সান্ত্রী আসতো তাঁর মেজাজ তো থাকবেই। ঠাকু্র্দা( আমরা দাদু বলতাম) যত ই রাশভারী হোন না কেন বাড়িতে দাদির কথাই শেষ কথা। ওখানে কারো ট্যাঁ ফোঁ চলবে না , দাদু তখন কেঁচো। আসতে আসতে বড় হচ্ছি, শব্দটা কানে বেসুরো ঠেকতো বলে দাদিকে বললাম," তুমি পিতিবেশী পিতিবেশী বল কেন, প্রতিবেশী বলতে পারোনা?"  অন্য কোন নাতি নাতনীদের কাছে এরকম কথা শুনলে দাদির ঝাঁঝের চোটে তাকে তখনই বাড়ি ছাড়া হতে হতো কিন্তু সবচেয়ে ছোট বলে আমাকে একটু বেশিই ভাল বাসতেন, বলা যায় একটু বেশিই লাই দিতেন। তাই হেসে বললেন," বাবা, তোমরা স্কুলে যাচ্ছো, পড়াশোনা করছো, তোমরা বলবে এরকম কথা, আমরা তো গাঁয়ের মেয়ে, আমরা তো অত পড়াশোনা করিনি ,আমি ঐটাই বলব। " জেদ এটাকেই বলে। বাড়ির অন্য কেউ এই কথা বলে পার পেয়ে যেত না।
পাড়ার কোন ছেলে মেয়ে হুটহাট বাড়িতে ঢুকলে যদি দাদির নজরে পড়ত তাহলে আর রক্ষা নেই, চেঁচিয়ে তার গুষ্টির ষষ্টি পূজো করে দিত। সবাই এক কথায় বলতো দজ্জাল মহিলা। কিন্তু এই দাদিই ছিল অন্য মানুষ যদি তাঁকে জিজ্ঞেস করে কেউ কিছু করত। ছোট বেলায়  তাঁর এই দ্বৈত আচরণ কিছুতেই বোধগম্য হতো না। বাড়িতে দুটো পেয়ারা গাছ, দুটো আম গাছ, ফলের ভারে সবসময়ই নুয়ে পড়তো। টিয়া পাখি, কাঠবিড়ালি এসে পেয়ারা তলা, আমতলা আধখাওয়া ফলে ভরিয়ে দিত, তারা থোড়াই দাদিকে পাত্তা দেয়? পাড়ার ছেলেরা এসে যদি দাদির কাছে ফল পাড়ার কথা বলত, দাদি খুশী হয়ে বলত, " যাও, যত পার নিয়ে যাও " কিন্তু কিছু বদমাইশ ছেলে তো সবসময়ই থাকে, তারা চুপিসারে এসে আম বা পেয়ারা পাড়তে ভালবাসতো, আর এখানেই দাদির আপত্তি, দেখতে পেলেই চেঁচিয়ে ভেবিয়ে পাড়া মাত করে দিত। অবশ্য চুরি করে খাওয়ার মজাই আলাদা। এই দাদির কাছে বসে একদিন রাতে জিজ্ঞেস করলাম , " দাদি, এই পিতিবেশী বা প্রতিবেশী কাকে বলে?" দাদির সোজাসাপটা উত্তর , যে তোমার দরকার অদরকারে তোমার পাশে এসে দাঁড়াবে, সেই তোমার পিতিবেশী।" দাদি গ্রামের মেয়ে হলেও হিন্দু মুসলমান নিয়ে কোনদিন বাড়াবাড়ি করেনি। আমাদের বাড়ির লাগোয়ায় ছিল বাবুয়া খলিফার বাড়ি। বাবুয়া খলিফা পেশায় দর্জি হলেও উনি কিন্তু মৌলভি ছিলেন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে বিয়ে বা নিকা হতো। তাঁর পাঁচ ছেলে সাত্তার ,সাদিক, হুল্লুক, হামিদ ও হানিফ এবং তিনটে মেয়ে ছিল  ফুতু, বুলি ও আমিনা বা " বু"। কয়েকটা বাড়ির পরেই ছিল মুসলমান পাড়া। কিন্তু বাবুয়া খলিফা অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন এবং আমাদের বাড়িতে তাঁর যথেষ্ট আসা যাওয়া ছিল। দাদির পরিভাষায় উনি একজন পিতিবেশী। পশ্চিম দিকে পাখি সান্যালের মাসী শ্বাশুড়ি তিনিও একজন, ওদিকে ভট্টাচার্য পাড়ার ফেনু বাবু ( যিনি খ্রিস্টান ধর্ম নিয়েছিলেন ) তিনিও একজন পিতিবেশী। এছাড়াও পাড়ার সমস্ত বাড়ির ভদ্রমহিলা যাঁরা তাঁর সমবয়সী ছিলেন তাঁরাও পিতিবেশী। জিজ্ঞেস করলাম যে দাদি, তাহলে বাদ গেল কে এবং তুমি এত চেঁচামেচি কর কেন? পাড়ার ছেলেরা আম বা পেয়ারা পাড়তে এলে বা ঘুড়ি ধরতে এলে চেঁচামেচি কর কেন? এবার মুখ খুললেন দাদি, দেখ আমাকে না জিজ্ঞেস করে যদি কেউ কিছু করে তাহলে আমি কেন চেঁচাব না? আমি তো সবসময়ই ওদের বলি আমাকে জিজ্ঞেস করে কাজটা কর। আমি বুঝলাম যে দাদির অহঙ্কারে এই অবজ্ঞা লাগে। সত্যিই তো, একটু বললেই যদি  সোজা রাস্তায় কাজটা হয়ে যায়, তাহলে চুরি চামারি করে দাদিকে 
রাগানো কেন? আসলে ছেলেরা একটু মজা করতে চায়। বাড়ির মাঠে নাটক ও বিচিত্রানুষ্ঠান হবে অথচ আকাশের মুখ ভার। কে হঠাৎ বলে উঠল আমার দাদির কোন নিত্য ব্যবহার্য জিনিস লুকিয়ে রাখ। দাদি জিনিসটা দেখতে না পেয়েই চেঁচামেচি করবে ও গালমন্দ শুরু করবে আর তাতেই নাকি বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে। যা বলা, তাই কাজ। বাদল দা  দাদির ঘটি লুকিয়ে রেখেছে আর দাদি দেখতে না পেয়েই চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে কিন্তু বৃষ্টি বন্ধ হবার কোন লক্ষনই দেখা যাচ্ছে না দেখে ঘটিটাকে চুপিসারে বাদল দা রেখে দিল। অন্ধকারে দাদি ঘটি ফিরে পেতেই একদম ঠাণ্ডা জল হয়ে গেল দাদি। দাদির মাথা গরম হলে একমাত্র রক্ষাকর্তা আমি। না বাবা, না মা বা জ্যাঠামশাই,জেঠিমা কেউ না। দাদু খুব ঠাণ্ডা প্রকৃতির মানুষ, দাদু কিছু বলতে গেলেই উল্টে বিপত্তি, সব নষ্টের মূল হচ্ছো তুমি। ভদ্রলোক দাদু পালাতে পারলে বাঁচেন।

এহেন পিতিবেশীর সংজ্ঞা আবার মনে পড়ে গেল যখন পূর্ব দিকের বাড়ির ভদ্রলোক চলে গেলেন। এই ওড়িয়া পরিবারের সঙ্গে কোনদিন কথাবার্তা ও হয়নি। কিন্তু কেন জানিনা এই পরিবারের সমস্ত সদস্যদের ই দেখে খুব পরিচ্ছন্ন পরিবার বলে মনে হতো। সকাল সন্ধে হুলুধ্বনি, শাঁখ বাজিয়ে পূজো, ছোট ছেলেটা ঘন্টা নাড়িয়ে ব্যালকনিতে এসে তুলসিমঞ্চে জল দিচ্ছে বা ধূপকাঠি জ্বালিয়ে  সন্ধে দিচ্ছে  এসব দেখে মনে হতো যে বাড়ির একটা ভ্যালু সিস্টেম রয়েছে। ওর দিদি টা বিশেষ বড় নয় কিন্তু ভাইকে পড়ানোর ধরণ দেখে নিজের মনের মধ্যেই একটা ছবি এঁকে ফেলেছিলাম। মাঝে মাঝেই বলতাম এই পরিবারের সবাই খুব পরিচ্ছন্ন। কয়েকদিন ধরেই দেখছি অনেক রাত অবধি আলো জ্বলছে, ভাবলাম আজকাল ছেলেমেয়েদের কাজ কর্মের ধারা পাল্টেছে, সেই কারণেই হয়তো দেরী কিন্তু আমার ধারণা ভুল। তারা গোছগাছ করে চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরশু দেখি এয়ার কন্ডিশনারটা খুলছে। একটু অবাক হয়েই গেলাম নতুন এয়ার কন্ডিশনারটা এর মধ্যেই বিগড়ালো? কেবলই মনের মধ্যে একটা অযথা আগ্রহ জেগে উঠছে। কিন্তু কেন, কোনদিন ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলা বা তাঁদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা হয়নি অথচ আমার কৌতুহল কমছে না। গতকাল ছেলেটা বাঁশি বাজাচ্ছিল, কিছুদিন ধরেই শিখছে। খেয়াল করতাম যে আমি যে সরগম গুলো করছি ঐ ছেলেটি সেটা করার চেষ্টা করছে। বেশ আনন্দ হলো, কাউকেই কোনদিন গান শেখাইনি,হয়তো মাঝে মধ্যে কাউকে একটু আধটু দেখিয়ে দিয়েছি বড় জোর। আর এই ছেলেটি একলব্যের মতো নিষ্ঠার সঙ্গে আমি যেগুলো করছি, সেইগুলোই করছে ভেবে খুশিতে মনটা ভরে যেত। আমার মনের ভুল ও হতে পারে। হয়তো যে মাস্টার মশাইয়ের কাছে ছেলেটি শিখছে তিনিই হয়তো ঐগুলো দিয়েছেন কিন্তু আমি মনে মনে ভাবতাম আর প্রার্থনা করতাম যে ছেলেটা যেন খুব ভালভাবে বাজাতে পারে। গতকাল ও ছেলেটি গাছে জল দিয়েছে কিন্তু আজ তাকে বা তার দিদিকে দেখতে পেলাম না। সকাল বেলায় দেখি ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা জামাকাপড় মেলার দড়িটা খুলছেন এবং জামাকাপড়গুলো উঠিয়ে নিচ্ছেন। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম আপনারা কি চলে যাচ্ছেন? 
হ্যাঁ।
শুনে জিজ্ঞেস করলাম কি ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছেন?
না, পল্লীশ্রীতে একটা ফ্ল্যাট কিনেছি, অনেকদিন এখানে ছিলাম, মনটা বেশ খারাপ লাগছে।
আমি বললাম, মন খারাপ করবেন না, নিজের ফ্ল্যাটে চলে যাচ্ছেন, এ তো বড় খুশীর খবর। অভিনন্দন জানালাম এবং বললাম যে কাছেই যাচ্ছেন, সময় সুযোগ করে আসবেন।

এতদিন সামনাসামনি থাকলাম, কোনদিন কোন বাক্যালাপ ও হয়নি, অথচ আজ বিদায় বেলায় তাঁকে আমন্ত্রণ জানালাম বাড়িতে আসার জন্য।  ইনি তাহলে একজন নিশ্চয়ই পিতিবেশী। কিন্তু দাদির কথা অনুযায়ী ইনি কোনভাবেই আমাদের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হননি, তাহলে তো দাদির কথা মিলছে না। না, এঁদের মানসিক তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের সঙ্গে আমার মনের তরঙ্গ মিলে একটা রেসোন্যান্স তৈরী হয়েছে আর সেই কারণেই ওঁদের চলে যাওয়াটা মনের মধ্যে এইরকম একটা ঢেউয়ের সৃষ্টি করেছে। নিশ্চয়ই ইনি পিতিবেশী থুড়ি প্রতিবেশী।

Saturday, 26 July 2025

মনসুখ ভাইয়ের রোজনামচা

আমেদাবাদ শহরে " বাসনা " অঞ্চলে মনসুখ ভাইয়ের আস্তানা। আস্তানা শব্দটা কানে এলেই মনে হয় একটা বাড়ি(গেট ওয়ালা বড় বাড়ি কিংবা নিদেন পক্ষে  একটা ছোট কুঁড়ে ঘর) কিন্তু মনসুখ ভাইয়ের আস্তানা খোঁজ করতে গিয়ে আমি রীতিমতো নাস্তানাবুদ হয়ে গেলাম।

যে গেস্টহাউসে ছিলাম তার বাইরে গেটের ধারে কোন সাতসকালে এসে ঠেলাগাড়ি নিয়ে এসে যেত মনসুখ ভাই, আর সকাল থেকেই তার খরিদ্দার আসতে শুরু করে দিত, কেউ নিত ইডলি বড়া আবার কেউ বা নিত ডাল বড়া ও কান্দা ভাজি( আমাদের পরিভাষায় পেঁয়াজি)। কিন্তু মোটামুটি বেলা বারোটা বাজতেই সেই ঠেলাগাড়ি সমেত মানুষটাই উধাও।  বেশ কিছুদিন হলো গেস্টহাউসেই আছি, ফ্ল্যাটের অ্যালটমেন্ট এখনও আসেনি, অফিস করতে হচ্ছে  সেই গেস্টহাউস থেকেই। সকালের জলখাবারটা মনসুখ ভাইয়ের কাছ থেকেই নিচ্ছি কারণ সেই একঘেয়ে ব্রেড, বাটার আর ওমলেট মুখে রুচছে না। কিন্তু মুশকিল হলো ওর কাছে সবসময়ই ভিড়, আমার কাছে টাকা ওর নেওয়া হয়ে ওঠেনা, বলে বাদ যে একসাথে লে লেঙ্গে, বরাবর(মানে ঠিক আছে)। একটু অস্বস্তি ই হয় কারণ আমার ফিরে আসার সময় সে তো থাকেনা।

এদিকে ফ্ল্যাটের অ্যালটমেন্ট এসে গেছে, আমাকে চলে যেতে হবে। ফিরে এসে দেখি মনসুখ ভাই নেই। গেস্টহাউসের কেয়ারটেকারের কাছে দিতে গেলাম কিন্তু কেন জানি না ও নিল না, সম্ভবত ওর ব্যবসার লাভে ভাগ বসিয়েছে বলে। মনটা খচখচ করছে গরীব মানুষের পয়সা না দিতে পারার জন্য। যাই হোক রবিবার ঠিক করলাম আজ যে ভাবেই হোক ওর পয়সা মেটাবোই। কিন্তু সকালে উঠতে দেরি হওয়ায় এবং শহরের অন্য প্রান্ত থেকে আসতে দেরি হয়ে গেল এবং যথারীতি ও ভাগলবা। কিন্তু আমি ওকে আজ যেভাবেই হোক পয়সা দিয়ে যাব ই ঠিক করেছি। আশেপাশের লোককে জিজ্ঞেস করে তিনটে মোড় পেরিয়ে পেলাম দেখা তার বাড়ি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক সময় গড়িয়ে গেছে। খিদেতে পেট চোঁ চোঁ করছে কারণ বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন রকম দিক নির্দেশন যার ফলে আমার আজ হাঁড়ির হাল।
 মোড়ের কাছে একটা পার্ক আর তার কাছেই এক জৈন মন্দির। মন্দিরের লাগোয়া একটা দেয়ালে রয়েছে মনসুখ ভাইয়ের সেই গাড়ি। চারটে ইট দিয়ে আটকানো আছে গাড়ির চাকা আর একটা শিকল দিয়ে একটা চাকা বাঁধা আছে দেয়ালের রেলিং এর সঙ্গে যাতে গাড়িটা বেসামাল হয়ে অন্য জায়গায় না চলে যায়। গ্যাসের স্টোভ, কড়াই গাড়ির পেটের তলে একটা বাক্সে চলে গেছে যেটা এখন তালা বন্ধ এবং ওপরের পাটাতনে যেখান থেকে অন্য সময় বিক্রি পাট্টা করে সেখানে একটা চটের উপর চাদর বিছিয়ে পরমানন্দে মনসুখ ভাই ঘুমিয়ে আছে। ঘুম ভাঙাতে একটু মনটা খারাপ ই লাগছিল কিন্তু আমাকে আবার ফিরে আসতে হবে ভেবে ডেকেই ফেললাম। সারাদিন এত পরিশ্রম করে যে কয়েকবার ডাকার পর তার ঘুম ভাঙলো এবং চোখ কচলাতে কচলাতে বলল, " সাব, আপ!" ম্যায় আপকো পাস যো বহুত কর্জ হ্যায়, উয়ো চুকানে কে লিয়ে আয়া হুঁ।" এতনা তকলিফ কিঁউ উঠায়া সাব? আপ থোড়ি ভাগনে বালা আদমী হ্যায়? একটু অবাক হয়ে গেলাম ওর আমার উপর ভরসা করা দেখে। সাধারণত কেউ ধারে কোন জিনিস দিতে চায়না আর দিলেও পয়সা ফেরত পাওয়া এক ভাগ্যের ব্যাপার কিন্তু যে লোকটার এই গাড়িটাই সম্বল, এটাই ওর কর্মস্থল এবং ঘর সেই লোকটা কেবল বিশ্বাসের উপর ভরসা করে এত টাকা বাকি থাকা সত্ত্বেও এত নিশ্চিন্তে কি করে ঘুমায়? আসলে যাদের অনেক সম্পদ তারা সামলাতেই ব্যস্ত আর যারা ভগবানের উপর ভরসা করে সামান্য পূঁজি নিয়ে সৎপথে এগিয়ে চলে তারাই বোধহয় এত নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। জিজ্ঞেস করলাম যে বারিশ কা মৌসমমে ক্যায়সে রহতে হ্যায় ইঁহা?  ও দেখালো প্লাস্টিকের চাদর। এই দিয়ে বৃষ্টির সঙ্গে যুদ্ধ করে। এইরকম মনসুখ ভাই সারা দেশে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে এবং যথেষ্ট সততার সঙ্গে বেঁচে আছে আর অন্যদিকে প্রচুর সম্পদের মালিক তারা কত অসদুপায়ে টাকা রোজগারের ফন্দিফিকির খুঁজছে। এরাই  চিরদিন বলীয়ান আর মনসুখ ভাইদের সততার পুণ্যে এই অসৎ লোকগুলো মাথার উপর বসে রাজত্ব করে চলেছে।
মনসুখ ভাই আপনারা বেঁচে থাকুন অনেকদিন। ভগবান আপনাদের মঙ্গল করুন।

Wednesday, 9 July 2025

স্মৃতি ও বিবেক

স্মৃতির সঙ্গে বিবেকের কোন সম্পর্ক আছে কিনা ঠিক জানা নেই। কিন্তু একটা কথা ঠিক যে বিবেকের দংশন হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে টেনে বার করে আনে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই হৃদয় বলে কিছু জিনিস থাকে কিন্তু কোন কোন সময় তা বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে চাপা পড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেনা কিন্তু আগুন যেমন চিরকাল ছাই চাপা পড়ে থাকেনা ঠিক সেই রকমই হৃদয়ের বাহ্যিক প্রকাশ হবেই। বিবেক তাকে ঠিক টেনে আনবেই। দুর্বাসা মুনির আশীর্বাদে কুন্তী সূর্যদেবের আবাহন করতেই ঘটে গেল বিপত্তি, জন্ম হলো কর্ণের এবং কুন্তী তাকে ঝুড়িতে শুইয়ে দিয়ে জলে ভাসিয়ে দিয়ে তখনকার মতো নিজের লজ্জ্বা বাঁচালেন বটে কিন্তু বিবেকের তাগিদেই হোক আর কুরুপাণ্ডবের যুদ্ধে নিজের ই এক সন্তান অন্য পাঁচ সন্তানের সঙ্গে যুদ্ধ যাতে না করে সেই কারণেই হোক, যুদ্ধের আগের দিন সন্ধ্যা বেলায় কর্ণের কাছে নিজের পরিচয় দিতে গেলেন , কিছুটা কি আত্মগ্লানি ঘোচাতে নয়? কবিগুরুর কলমে ঝরেছে, " লোভে যদি কারে দিয়ে থাকি দুখ, ভয়ে হয়ে থাকি কর্ম বিমুখ, পরের পীড়ায় পেয়ে থাকি সুখ মোহের ভরে, আমার বিচার তুমি করো তব আপন করে।" সুতরাং কোন না কোন সময় মানুষ বিবেকের দংশনে কাতর হবেই এবং দীর্ঘদিনের অব্যক্ত যন্ত্রণা বেরিয়ে আসবেই।

সন্তানেরা তাদের বাবা মায়ের অত্যন্ত প্রিয় জিনিস বা শখের জিনিস তাঁদের মৃত্যুর পর বিক্রি করে দেয় হয় লোভের বশে কিংবা একাধিক ভাইবোন থাকলে কে সেই জিনিসটা রাখবে তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে যাতে সম্পর্কের হানি না ঘটে বা সেই জিনিসের রক্ষণাবেক্ষণ আদৌ সম্ভব হবে কিনা সেটা ভেবে বা কিছু অর্থাগম হবে এই আশায়। এখানে ভাবাবেগ কোন কাজ করেনা এবং কারো সেটা থাকলে তাকে নানাভাবে প্রকাশ করতে দেওয়া হয়না। অথচ জিনিসটা হস্তান্তরিত হবার পর ক্রেতা যখন মূল জিনিসটা অবিকৃত রেখে তার সৌন্দর্য বাড়ায়, তখন তাদের বিবেক জাগ্রত হয় বা ভাবাবেগ বেরিয়ে আসে এবং চোখের জল ফেলে। জিনিসটাকে ধরে রাখা যে খুব কঠিন ছিল তা নয় কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তাকে তো ধরে রাখার চেষ্টা করাই হয়নি বা যে ধরে রাখার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিল তাকেও যেন তেন প্রকারেণ তাকে দমিয়ে রাখা হয়েছিল। আমরা কোন জিনিসের মূল্য তার জীবদ্দশায় ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা, তার মূল্যায়ন হয় সেটা হাতছাড়া হবার পর। এটা কি বিবেকের দংশন না আর কিছু?